হে সখা পর্ব-৩৯+৪০+৪১

0
79

#হে_সখা
#অক্ষরময়ী
ঊনচত্বারিংশ পর্ব

সারারাত দুজনের কারোরই চোখ জুড়ে ঘুম এলো না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে রাত পেরিয়ে গেলো। চব্বিশ ঘন্টার এ দূরত্ব রেহবারের নিকট অন্ততকাল ঠেকছে। হাঁপিয়ে উঠেছে এ নীরব কলহে। নাস্তার টেবিলে নীরবে খাবার গ্রহণ করছিলো দুজনে৷ গুলিস্তার দিকে সরাসরি না তাকালেও রেহবার বুঝতে পারছে একটু পরপর গুলিস্তা ওর দিকে তাকাচ্ছে। এতো লুকোচুরি পছন্দ হলো না রেহবারের। চোখ তুলে সরাসরি গুলিস্তার দিকে তাকালো। গুলিস্তা তখন রেহবারের দিকেই তাকিয়ে। ধরা পরে যাওয়ায় হকচকিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। রেহবার কিন্তু চোখ নামিয়ে নিলো না। শান্ত চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো। তারপর গায়ে হিম শীতল কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
– বাচ্চা নিতে চাও না কেনো?

আবার সেই একই টপিক নিয়ে প্রশ্ন করায় গুলিস্তা ভারী বিরক্ত হলো। মুখে খাবার তুলতে থাকা হাতটি থেমে গেলো মাঝপথে। রেহবারের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি মেলালো সেই শান্ত চোখে। অত:পর হাতের খাবারটি প্লেটে রেখে দিয়ে বললো,
– আমার পছন্দ না৷
– তোমার একার পছন্দের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারো না। সন্তান আমাদের দুজনের, তাই সিদ্ধান্তটাও দুজন মিলে নেওয়া জরুরি।

গুলিস্তা কিছু বললো না৷ ওর শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকা রেহবারকে ক্ষেপিয়ে তুললো।

– আমি বাবা হতে চাই। আমি চাই আমাদের ঘর আলো করে একটি ফুটফুটে সন্তান আসুক। এখন বলো, কি সিদ্ধান্ত নিবে তুমি?

গুলিস্তার কোনো তাড়া নেই। সে ধীরে সুস্থে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আধখাওয়া খাবারের প্লেটটি তুলে নিলো। স্বাভাবিকভাবে বললো,
– আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না। তোমার সন্তান প্রয়োজন হলে আরেকটা বিয়ে করে তার সাথে মিলেমিশে বাচ্চা পয়দা করো।

এঁটো প্লেট নিয়ে চলে গেলো কিচেনে৷ ওর যাওয়ার পাণে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো রেহবার। কি বলে গেলো মেয়েটা! এটা কি আদোও তার চেনা ফুল? হতেই পারে না। এতোটা ঔদ্ধত্য! এতোটা পরিবর্তন! কি করে মেনে নেওয়া যায়? বিস্ময়ে রেহবারের ভাষা হারিয়ে গেছে। ফোনে লিতুনের কল আসায় সে যাত্রায় ধ্যান ভাঙলো। দ্রুত বেরিয়ে গেলো অফিসের উদ্দেশ্যে।

টানা কয়েকদিন দুজনার মাঝে নীরব কলহ চললো। গুলিস্তার সাথে এ দুরত্ব রেহবারকে কষ্ট দিলেও এবার সে নিজেও প্রচন্ড আঘাত পেয়েছে৷ মানসিকভাবে এতোটাই ক্ষত বিক্ষত হয়েছে যে গুলিস্তার মনের অবস্থা বুঝার মতো অবস্থায় সে নেই। এই মেয়েটাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কম প্রচেষ্টা তো করেনি। অথচ পেছন ফিরে রেহবারকেই ছোবল মারলো! কথা বলে না দেখে এতোদিন কষ্ট পাচ্ছিলো আর এখন কথার ছোবল সইতে পারছে না৷ ভেবেই বিদ্রুপের হাসি দেখা দিলো রেহবারের ঠোঁটে।

সেদিন যে বড় মুখ করে বললো, বাচ্চা দরকার হলে আরেকটা বিয়ে করে নিতে। এখন যদি রেহবার সত্যি বিয়ে করে নেয়, তাহলে ওর কি অবস্থা হবে সেটা কি ভেবে দেখেছে? ও বরাবর এমন করে। ভাবনা চিন্তা না করে একটা কথা বলে দেয়। এতে অন্যজন কতোটা আঘাতপ্রাপ্ত হলো, তা ভাবে না।

অফিস থেকে ফিরে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে কিচেনের দিকে তাকালো। সেখানে গুলিস্তাকে দেখতে না পেয়ে কপালে ভাঁজ পরলো সুক্ষ্ম। প্রতিদিন এখানেই দেখা যেতো। আজকে কোথায় গেলো? নীরবে প্রস্থান করে নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো। প্রায় আধা ঘন্টা পেরিয়ে গেছে তবুও গুলিস্তার দেখা মিললো না। এই কয়েকদিনে রেহবারের রাগ ভাঙানোর সরাসরি কোনো চেষ্টা গুলিস্তা করেনি। তবে অকারণ রেহবারের আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। খেতে ডাকতো, একটু পরপর কফি নিয়ে এসে হাজির হতো স্টাডিরুমে। এই মুহূর্তে ওকে আশেপাশে কোথাও দেখতে না পেয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ব্যালকনিতে উঁকি দিলো। তিতানের খাঁচার একটি অংশ দেখা যাচ্ছে। আশেপাশে গুলিস্তা নেই। নিচে নেমে এসে ড্রয়িংরুম, ডাইনিং, কিচেন, ওয়াশরুম সকল জায়গায় চেক করে দেখলো। কোথাও খুঁজে না পেয়ে ছাদে চলে গেলো। সেখানে দাঁড়িয়ে বাড়ির পুরো এরিয়ায় নজর বুলালো। নাহ, কোথাও নেই। রেহবারের ভারী চিন্তা হলো। ঘরে ফিরে গিয়ে ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা বোধ করলেও মনের ভেতরের চাপা অভিমানের কারণে গলা ছেড়ে গুলিস্তাকে ডাকতে পারছে না।

ব্যালকনির দরজা খুলে তিতানের খাঁচার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বুক ধক করে উঠলো। তিতান নেই। ওর মাটির হাড়ি দিয়ে তৈরি বাড়িতে কিংবা লোহার খাঁচায়, কোথাও তিতান নেই। অস্থিরভাবে পেছনে ফিরে তাকাতেই কোথা থেকে যেনো উড়ে এসে রেহবারের কাঁধে বসলো তিতান। তিতানকে ফিরে পেয়ে ক্ষণিক সময়ের জন্য রেহবারের ঠোঁটে হাসি ফুটলেও তিতানকে খাঁচার বাইরে দেখে ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেলো। ও খাঁচার বাহিরে এলো কীভাবে? যদি উড়ে চলে যেতো! গুলিস্তা কি ওকে খাঁচা থেকে বের করেছে? মেয়েটা এমন কান্ড জ্ঞানহীন কেনো? এলোমেলো প্রশ্নে রেহবারের সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেলো। একহাতে তিতানকে ধরে সামনে নিয়ে এসে খাঁচায় রেখে দিলো। তিতান কোনো প্রতিবাদ করলো না। খাঁচার দরজা বন্ধ করে সামান্য ঝুঁকে তিতানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রেহবার জিজ্ঞাসা করলো,
– তোর ফুল কোথায়?

তিতান তার ডানাগুলো ঝাপটে বললো,
– ফুল কাঁদে, ফুল কাঁদে।

রেহবারের মনে হয় দুনিয়া দুলে উঠলো। অস্থির দৃষ্টি ফেললো ব্যালকনির চতুর্দিকে। তিতান এখানেই কোথাও ছিলো। গুলিস্তাকে দেখতে না পেয়ে চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিলো। নিজেকে শান্ত করে আবার সুক্ষ্মভাবে দেখলো। দোলনার পেছনে এককোনায় ফ্লোরে বসে আছে গুলিস্তা। হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে গুটিশুটি হয়ে বসে থাকার কারনে এতোক্ষণ বুঝা যাচ্ছিলো না। সবুজ গাছের আর গুলিস্তার গায়ের সবুজ শাড়ি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এমন ভঙ্গুর অবস্থায় ওকে দেখে রেহবারের ইচ্ছে করলো ছুটে গিয়ে দু হাতে আগলে নিতে কিন্তু ওই যে ইগোর কাছে বাঁধা পরে রইলো। সে তো কোনো ভুল করেনি। যে করেছে তার কি ক্ষমা চাওয়া উচিত নয়? অবশ্যই উচিত।

হালকা কেশে গলা পরিষ্কার করে গুলিস্তার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো। হঠাৎ শব্দ পেয়ে গুলিস্তা মাথা তুলে তাকিয়ে খানিকটা ভড়কে গেলেও দ্রুত সামলে নিলো নিজেকে। স্তব্ধ চোখজোড়া রেহবারের মুখশ্রীতে নিবদ্ধ রইলো অনেকক্ষণ। গুলিস্তার ভেজা চোখ, সিক্ত পল্লবদ্বয়, গালে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ দেখে রেহবার খেই হারিয়ে ফেলেছে। কী যেনো বলতে এসেছিলো! মনে পরছে না৷ তার উপর গুলিস্তাকে ওভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ বাদে গুলিস্তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কাঠ কাঠ স্বরে বললো,
– এক কাপ কফি হবে? প্রচন্ড মাথা ধরেছে।

গুলিস্তার উত্তরের অপেক্ষা না করে ঘরে ফিরে এসে আটকে রাখা শ্বাস ফেললো। সেদিনের পর আজকেই প্রথম নিজে থেকে কথা বলতে যাওয়া। তাও আবার গুলিস্তাকে দুঃখবিলাশ থেকে বাঁচাতেই এই আবদার। কাজে ব্যস্ত থাকলে কান্না করার সময় কোথায় পাবে!

গুলিস্তা অবশ্য নিজের মন খারাপের কিংবা নিজের দুঃখ-কষ্টের দায় আরেকজনের উপর কখনো চাপিয়ে দেয় না। দিতে জানেই না। তীব্র মন খারাপে কারো সান্নিধ্য জাদুর কাঠির ছোঁয়ার মতো কাজ করে৷ ছুঁয়ে দিলেই কষ্টরা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়৷ একথা কি গুলিস্তা জানে? জানে না তো৷ গুলিস্তার কষ্টে কখনো কেউ এগিয়ে আসেনি। পাশে এসে মমতা ভরা হাতটি রাখেনি মাথায়। তাই দুঃখ ভুলার মন্ত্র সে জানে না। শুধু সময়ের সাথে সেই দুঃখ ফিকে হয়ে যায়, এটাই জানে। তাই তো সময় বয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করছে। রেহবারের রাগ কমলে সে আবার আগের মতো হয়ে যাবে। রেগে থাকার মুহুর্তে বিরক্ত করতে গেলে মায়ের মতো আবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলে মুশকিল হয়ে যাবে। ওমন ভয়াল রুপ কি করে সামলাবে গুলিস্তা? এর থেকে অপেক্ষা করাই শ্রেয়। হাতের উল্টোদিক দিয়ে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ালো। কফি বানাতে হবে। দুঃখবিলাশ করতে গিয়ে দুনিয়াদারি সব ভুলতে বসেছিলো। এজন্যই সে কোনো অনুভূতিকে বেশিক্ষণ জিইয়ে রাখে না। মনের গোপন কুঠুরিতে আবদ্ধ করে তালা বন্ধ করে স্বাভাবিকভাবে ঘুরে বেড়ায়।

কিন্তু পুরনো সেই মন্ত্রগুলো এখন কেনো যেনো কাজ করছে না। মনের কোথাও একটা ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে, যা গুলিস্তা ধরতে পারছে না। তবে এই পরিবর্তনে খুব সমস্যা হচ্ছে৷ রেহবারের এড়িয়ে চলা ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে৷ এসব যাতে গুলিস্তাকে পীড়া না দেয়, তাই জাগতিক অনুভূতিগুলোকে মনের কুঠুরিতে তালাবদ্ধ করে রাখতে চাইছে। কিন্তু সেই তালা ভেঙে কষ্টরা দলা পাকিয়ে উঠছে বারবার। ঘরে ফিরে রেহবারের জড়িয়ে ধরা, ফুল বলে কারনে অকারণে ডেকে উঠা, রান্নাঘরে এসে দুষ্টামি করা, সময়ে অসময়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরা – সবকিছু মধুর স্মৃতি হয়ে চোখের সামনে ভাসে। ভুলে থাকতে চাইলেও বারংবার এসে পীড়া দিচ্ছে। এক হাতে কড়াইয়ে খুন্তি নাড়িয়ে অন্য হাতে চোখ হতে গড়িয়ে পরা জল মুছে ফেললো। আজ কেনো যেনো বুকের ভেতরটা একটু বেশিই পুড়ছে৷

স্টাডিরুমের দিকে তাকিয়ে সন্তপর্ণে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নায় মনোযোগ দিলো। টেবিলে খাবার গুছিয়ে যথা সময়ে রেহবারের স্টাডিরুমের দরজায় নক করলো। ভেতর থেকে কোনো জবাব আসবে না জেনে কিছুসময় অপেক্ষা করে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। রেহবার তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। অন্যদিন নিজেকে স্বাভাবিক রেখে রেহবারের চোখে চোখ করে কথা বললেও আজকে চোখের দিকে তাকালো না। কেনো যেনো ভীষণ কান্না পাচ্ছে। ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বললো,
– টেবিলে খাবার দিয়েছি। খেতে এসো৷

নীরব সম্মতি জানিয়ে রেহবার ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো। অন্যদিন ডিনার করতে আসতে বলে হলরুমে ফিরে গেলেও আজকে দাঁড়িয়ে রইলো। রেহবারের সাথেই নিচে নামলো। খেতে বসেও গুলিস্তার মনের উদাসীনতা কমলো না বরং বাড়লো। রেহবারের প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে নিজে চুপচাপ বসে রইলো। খেতে ইচ্ছে করছে না। কী এক মুশকিল! আগে কখনো গুলিস্তার এমন হয় নি। যা কিছু হয়ে যাক, সে তার যাবতীয় কাজকর্ম নিয়ম মেনে করেছে। ঘুম থেকে উঠেছে, পেট পুড়ে খেয়েছে, ঘর গুছিয়েছে, মায়ের বকা খেয়েছে, মার খেয়েছে আবার রাতের বেলা ভরপেট খেয়ে শান্তির ঘুম দিয়েছে। কিন্তু আজকাল সবকিছুতেই বড্ড বেহিসাবি, খামখেয়ালীপনা আকড়ে ধরতে চাইছে। খাওয়ার সময় গুলিস্তাকে খেয়াল করলো রেহবার। না খেয়ে চুপচাপ মনমরা হয়ে বসে আছে । খাচ্ছে না কেনো প্রশ্নটা জিহ্বার ডগায় আসলেও সেটা গিলে ফেললো। কিন্তু এর পরিবর্তে যেনো হারিয়ে গেলো নিজের ক্ষুধা। অল্প কিছু খাবার মুখে দিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে পরলো।

কিচেন গুছিয়ে রেখে গুলিস্তা ঘরে ফিরে গেলো তবে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলো না। বিছানায় হেলান দিয়ে বিজনেস বিষয়ক একটি বই পড়ছিলো রেহবার। সেদিকে একনজর দেখে ব্যালকনিতে চলে গেলো। আজকাল তিতানকে খাঁচার ভেতর থেকে বের করলেও সে পালিয়ে যায় না। গুলিস্তার হাতে কিংবা ঘাড়ে বসে থাকে।
খাঁচা খুলে তিতানকে নিয়ে দোলনায় বসে পরলো। চঞ্চল তিতান মনে হয় গুলিস্তার মন খারাপের আভাস পেয়েছে। অন্যদিন দুষ্টামি করলেও আজকে গুলিস্তার কাধে বসে গলায় মাথা ঠেকালো। তারপর দুজনে চুপচাপ চোখে বুঁজে বসে রইলো অন্ধকারে।

ঘড়ির কাটা জানান দিচ্ছে রাত অনেকটা গভীর। বেড টেবিলের উপর বইটি রেখে রিডিং গ্লাস চোখ থেকে খুলে রাখলো। টেবিলল্যাম্প নিভিয়ে দিয়ে ঘুমানোর উদ্দেশ্যে বালিশে মাথা রাখার পর রেহবারের খেয়াল হলো গুলিস্তা এখনো ব্যালকনিতে। মধ্যরাত পর্যন্ত ব্যালকনিতে কি করছে ভাবনা উঁকি দিতেই মনকে শাসালো। যা ইচ্ছে করুক। আজকাল মনমর্জি মতো কাজ করতে শিখেছে। স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বতন্ত্র নাগরিক। রেহবারের কি অধিকার সেখানে হস্তক্ষেপ করার। চোখ বন্ধ করে ঘুমের অপেক্ষা করতে লাগলো।
কিন্তু ঘুম কিছুতেই আসছে না। এদিকে রেহবারও জেদ ধরেছে কোনোকিছুকে পরোয়া করবে না। শেষমেশ সময় ও পরিস্থিতি কোনোটাই রেহবারের অনুকূলে রইলো না। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামলো৷ তবুও গুলিস্তা ঘরে ফিরছে না দেখে রেহবারের ভীষণ মেজাজ খারাপ হলো৷ রাগটা গুলিস্তার উপর হলো নাকি নিজের উপর বুঝা গেলো না। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে বিছানা থেকে নামলো। ধুপধাপ পা ফেলে গেলো ব্যালকনিতে। পশ্চিমের গ্রিল ভেদ করে বৃষ্টির ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে ব্যালকনির কিছু অংশ। শীতল বাতাসে রেহবারের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো অথচ দোলনায় নিশ্চল বসে আছে গুলিস্তা। রেহবারের এখন আর হতাশ লাগে না। শুধুই বিরক্তি বাড়ে। গুলিস্তার সামনে দাঁড়িয়ে কন্ঠেও বিরক্তি ঢেলে দিয়ে বললো,
– বৃষ্টির মধ্যে বসে জ্বর না বাঁধিয়ে ঘরে এসো।

রেহবারের কথায় গুলিস্তা ও তিতান দুজনেরই ধ্যান ভঙ্গ হলো। তিতান গুলিস্তার কাছ থেকে উড়ে এসে রেহবারের মাথার উপর বসে চুল খামচে ধরলো। তখনি তিতানকে খেয়াল করলো রেহবার। দুষ্টু তিতান এতোক্ষণ শান্ত হয়ে বসে ছিলো নাকি! কবে এমন ভদ্র হলো?
– তোকেও বাইরে ঘুমাতে হবে না। তুই ঘরে ঘুমাবি আজকে।

খাঁচাটি ঘরে নিয়ে এসে এককোণে রেখে তিতানকে সেখানে ওর বাসায় ঢুকিয়ে দিলো। রেহবার নিজেও বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে কম্ফোটার টেনে নিলো গায়ে।

ওরা চলে যেতেই গুলিস্তা ধীরগতিতে দোলনা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বৃষ্টির ঝাপটা এসে গায়ের কাপড় কিছুটা ভিজে গেছে। মৃদু কিন্তু তেজি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেললো গুলিস্তা। আবার কাপড় বদলাতে হবে। অথচ একটু নড়াচড়া করতে ইচ্ছে করছে না। উপায় না দেখে ভারী শরীরটাকে টেনে হিচড়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো। হালকা অন্ধকার ঘরে রেহবারের অবয়ব স্পষ্ট। ঘুমিয়ে পরেছে নিশ্চয়ই।

রেহবার ঘুমায়নি৷ চোখ বুঝে থাকলেও গুলিস্তার উপস্থিতি ঠিকই টের পেয়েছে৷ ব্যালকনি থেকে ফেরার অপেক্ষায় কান খাড়া করে রেখেছিলো৷ ও ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করতেই রেহবার চিৎ হয়ে শুয়ে চোখের উপর হাতে রেখে একদম সোজা হয়ে বিছানায় পরে রইলো। আশ্চর্য! ঘুম আসছে না কেনো?

হালকা বেগুনি রঙের সুতি শাড়ি গায়ে জড়িয়ে নিজের জায়গায় শুয়ে পরলো গুলিস্তা৷ ঘুম আসছে না। সারাদিন চোখ বেয়ে এতো জল গড়িয়ে পরার পরেও এখন আবার চোখ ছাপিয়ে জল নামছে৷ কী আজব! এতো পানি আসছে কোথা থেকে? গুলিস্তা ভারী বিরক্ত হলো। বৃথা চেষ্টা করলো চোখের জল আটকানোর৷ কিন্তু সেগুলো বাধা মানলো না। এক পাশে কাত হয়ে শুয়ে থাকার কারনে চোখের পানি নাক গড়িয়ে ধীরে ধীরে কানের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। বৃষ্টির কারনে মাথার চুল এমনিতেই আধাভেজা হয়ে আছে। সেগুলো বালিশের উপর ছড়িয়ে দেওয়া৷ চোখের পানিতে কানের কাছে চুলগুলো আরও বেশি করছে ভিজছে। উফ! ভারী বিরক্ত হলো নিজের উপর। সোজা হয়ে শুয়ে তাকালো রেহবারের দিকে। কতো শান্তিতে ঘুমাচ্ছে! অথচ এই মানুষটার কারনে গুলিস্তার পুরোটা উল্টেপাল্টে যাচ্ছে। দিন, রাত সবকিছু। নিয়মে আবদ্ধ জীবনটা কেমন খাপছাড়া হয়ে গেছে। গুলিস্তা মানিয়ে নিতে পারছে না৷ ওকে এমন অস্বস্তির মধ্যে ফেলে রেখে নিজে প্রশান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে। ব্যাপারটা গুলিস্তার পছন্দ হলোন না। রাগ হওয়ার কথা কিন্তু গুলিস্তার কষ্ট হতে লাগলো। আজ-কাল যা কিছু ঘটছে, তাতেই কষ্ট বাড়ছে৷

অস্থির লাগতে শুরু করলে নিজের বালিশ ছেড়ে রেহবারের দিকে এগিয়ে গেলো। নিজেও ঢুকে পরলো রেহবারের কম্ফোটারের ভেতর। রেহবারের প্রশস্ত শরীরের উপর সোজাসুজিভাবে শুয়ে পরে মুখ লুকালো রেহবারের বুকে। দু হাতে শক্ত করে জাপটে ধরলো।৷ হঠাৎ এমন আক্রমণে চমকে উঠলো রেহবার। চোখের উপর থেকে হাত সরাতেই নিজের বুকের উপর গুলিস্তাকে আবিষ্কার করে থমকে রইলো কিছু সময়ের জন্য। কি করবে বুঝতে পারছে না। রেহবারকে নিশ্চল থাকতে দেখে গুলিস্তার ভারী দুঃখ হলো। এতোটা অবহেলা কি মেনে নেওয়া যায়! সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। বিলাপের সুরে বললো,
– স্যরি। আর এমন হবে না। এখন থেকে আমি আর কোনো কথাই বলবো না। কথা বলতে নিলে উল্টাপাল্টা কথা বলে তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেলছি৷ এর থেকে ভালো, আমি চুপ করেই থাকবো। কেনো এতো বকবক করতে গেলাম কে জানে! আর হবে না। প্রমিজ। তুমি এভাবে রাগ করে থেকো না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। এতো কষ্ট আগে কখনো হয়নি বিশ্বাস করো। এতো যন্ত্রণা আমি নিতে পারছি না৷ এই রেহবার, কিছু বলো না। সত্যি আর হবে না৷ এবারের মতো মাফ করে দেও।

গুলিস্তার হাতের ধাক্কায় রেহবারের ধ্যান ভঙ্গ হলো। এতোক্ষণে ওর বলা কথাগুলো বোধগম্য হলো। কাঁদতে কাঁদতে গুলিস্তা হেঁচকি তুলছে। রেহবার দ্রুত ওকে নিজের দু হাতের বাঁধনে জড়িয়ে ধরলো। শুয়ে থাকার কারনে এর থেকে বেশি নড়াচড়া করা সম্ভব হচ্ছে না। গুলিস্তার শরীর ভীষণভাবে কেঁপে কেঁপে উঠছে। রেহবার ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
– এভাবে কাঁদছো কেনো? কান্না থামাও। অসুস্থ হয়ে পরবে তো।

গুলিস্তা থামলো না। উল্টো কান্নার গতি বাড়লো। ফোপাঁতে ফোপাঁতে বললো,
– একটা বাচ্চাই তো, তোমার দিকে তাকিয়ে সয়ে নিবো। শিখে নিবো সবকিছু। তবুও তুমি আমার উপর এভাবে রাগ করে থেকো না৷ আমার ভালো লাগছে না কোনোকিছু।

ওর মাথায় হাত বুলিয়ে রেহবার থুতনি ঠেকালো মাথায়। আলতো স্বরে বললো,
– সেসব পরে দেখা যাবে। আগে তুমি শান্ত হও। এভাবে কাঁদলে শরীর খারাপ করবে।

রেহবারের সান্নিধ্যে গুলিস্তার কান্না থেমে গেলেও তখনো শরীর কাঁপছে। রেহবার ওকে ওভাবেই জড়িয়ে ধরে রইলো। সম্পূর্ণভাবে শান্ত হয়ে এলে প্রশ্ন করলো,
– বাচ্চার ব্যাপারে আমি রেগে নেই ফুল। তোমার বাচ্চা চাই না, সে ব্যাপারে আমরা বসে ভালোভাবে কথা বলতে পারতাম। কিন্তু তুমি ফট করে বলে বসলে, আরেকটা বিয়ে করে নাও। কথাটা বলার আগে তোমার ভাবা উচিত ছিলো। সামান্য কারনে কিংবা কোনো অক্ষমতার কারনে যদি তোমাকে ছাড়ার কথা ভাবতে পারতাম, তাহলে কি অনেক আগেই আমাদের পথ আলাদা হয়ে যেতো না? আরেকটা বিয়ে করার কারণ খুঁজতে গেলে অনেক আগেই করে নিতে পারতাম। সমস্যার মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে পালিয়ে বেড়ানোর মতো ভীতু আমি নই। আমার কথা না হয় বাদ দিলাম। তুমি নিজের কথা ভাবো। আমি বিয়ে করে নিলে তোমার কি হবে ভেবেছো? এই কয়েকদিনের দুরত্বে হাঁপিয়ে উঠেছো অথচ বিয়ে করে নিলে আমাদের মাঝে জনম জনমের দুরত্ব সৃষ্টি হবে৷ চিরতরে হারাতে হবে আমাকে। পারবে সইতে? তখন কষ্ট হবে না?

রেহবারের বুকে থুতনি ঠেকিয়ে গুলিস্তা তাকালো ওর দিকে। মনে হচ্ছে বহুকাল পরে দুজন দুজনার দিকে ভালোবেসে তাকালো।
– ঘরে বউ থাকতে তুমি কোন সাহসে আরেকটা বিয়ে করবে?
– তুমিই তো অনুমতি দিলে।
– আমি বললেই বিয়ে করতে হবে?
– এমন সুযোগ হাতছাড়া করা বোকামি।
– তুমি ভীষণ পাজি মানুষ।

গুলিস্তার কথায় দুষ্টুমি মাখা হাসি ফুটলো রেহবারের মুখে।
– নিজের বউয়ের চোখে প্রত্যেক স্বামী পাজি মানুষ।
– সত্যি বিয়ে করে নিতে?
– আমি তো মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সুন্দরী একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করবো। তাকে নিয়ে ঘুরবো, ফিরবো। তোমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বউকে আদর করবো। তুমি কিচেনে রান্না করছো, আমি একপাশে আমার বউয়ের সাথে খুনসুটি করছি। এদিকে হিংসায় তরকারির সাথে তুমিও জ্বলে পুড়ে যাচ্ছো।
– বয়েই গেছে আমার জ্বলে পুড়ে যেতে।
– তাই নাকি? হিংসা হতো না?
– মোটেও না।
– সকালে উঠে নতুন বউকে ডাকছি, তার হাতের চা খাচ্ছি, ডাইনিং টেবিলে বসে ওকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছি, একসাথে বাজার-সদাই করছি, ছুটির দিনে ঘুরছি, এই ঘরে এই বিছানায় ওর সাথে…

রেহবারকে তার কথা শেষ করতে দেওয়া হলো না। দু হাতে অনবরত কিল ঘুষি পরতে লাগলো রেহবারের বুকে। সাথে চিল্লাচ্ছে গুলিস্তা,
– চুপ করো। আর একটা বাজে কথা বলবে না।

এলোপাতাড়ি আক্রমণে রেহবার কুপোকাত। দু হাতের সাহায্যেও নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না।
– আরে থামো। মজা করছিলাম।

থামছে না দেখে রেহবার নিজের শরীর ঘুরিয়ে গুলিস্তাকে বিছানায় ফেলে দিলো। দু হাতে ওর হাত দুটো চেপে ধরে ঠেকালো মাথার উপরে। নিজের শরীরের ভার গুলিস্তার উপর ছেড়ে দিতেই গুলিস্তা হাসফাস করতে শুরু করলো।
– এতোক্ষণ বড্ড শক্তি দেখাচ্ছিলে। এখন দেখাও দেখি।

শ্বাস আটকে যাচ্ছে। তবুও গুলিস্তা তাকিয়ে আছে রেহবারের দিকে। একটু আগের রাগ কোথায় যেনো মিলিয়ে গেছে। তার পরিবর্তে শরীর জুড়ে নতুন অনুভূতির ছোটাছুটি। শক্তপোক্ত, ভারী শরীরটার নিচে দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার তীব্র বাসনা। কামনার ভাষা মুখে প্রকাশ করতে হয় না। শরীর থেকে শরীরে ছড়িয়ে পরে। রেহবারের শরীরকেও নিমিষেই গ্রাস করে নিলো। ফুলেল ঘ্রাণে মন-মস্তিষ্ক দুটোই হয়ে উঠলো চনমনে। শিরায় শিরায় তীব্র উত্তেজনা। গুলিস্তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট নেশার মতো টানছে। তাতে ডুব দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করলো না রেহবার। কয়েকদিনের বিরহে, নিঃসঙ্গতায় গুলিস্তার ভেতর বাহির শূণ্য হয়ে গিয়েছে। মনের আঙ্গিনা খা খা করছে। রেহবারের ভালোবাসায় সিক্ত হতে লাগলো সেই শুকনো মরুভূমি। শূণ্য গুলিস্তা নিজেকে পূর্ণ করতে নিজেকে সঁপে দিলো রেহবারের হাতে। যা ইচ্ছে করুক, বিনিময়ে শুধু শান্তি দিক গুলিস্তাকে।

চলবে…

#হে_সখা
#অক্ষরময়ী
চত্বারিংশ পর্ব

– বুঝলি তিতান, মানুষ বড্ড স্বার্থপর। সবাই শুধু নিজের কথা ভাবে, নিজের লাভ খোঁজে। রেহবারও শেষমেশ সেই তো নিজের কথাই ভাবলো, বল? মন চাইলো, বলে দিলো ‘বাচ্চা চাই’। আমার তো চাই না। সেই কথা কি ভাবলো? ভাবলো না তো।

পানির বালতিতে এক ডুব দিয়ে ডানা ঝাপটে চতুর্দিকে পানি ছিটিয়ে দিলো তিতান। গোসল করতে সে ভীষণ পছন্দ করে। ওকে উৎফুল্ল দেখে মলিন হাসলো গুলিস্তা৷ পানির বালতি সরিয়ে রেখে ফ্লোর পরিষ্কার করে একটু আরাম করে বসতেই তিতান এসে বসলো ঘাড়ের উপর৷ ওর ভেজা পালক থেকে পানি গড়িয়ে পরে গুলিস্তার ব্লাউজ গেলো ভিজে। হায় হায় করে উঠলো গুলিস্তা।
– দিলি তো ভিজিয়ে! একটু আগেই শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে ছিলাম।

তিতান আরেক দফা গা ঝাড়া দিলো। হতাশ হয়ে গুলিস্তা পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে বললো,
– আমি কীভাবে বাচ্চা মানুষ করবো রে? আমি তো আমার মায়ের মেয়ে। তার মতো আমিও আমার বাচ্চাকে কষ্ট দিবো, তাই না? আমার মতোই একটা বাচ্চা ঘরের কোণে একলা কাঁদবে। কাঁদতে কাঁদতে কান্না ভুলে যাবে৷ উফঃ! কী যন্ত্রণা! বাচ্চারা কখন কি চায় কীভাবে বুঝবো বল? একটা বাচ্চা মায়ের আদর-যত্ন বিহীন বড় হবে৷ নরক যন্ত্রণা ভোগ করবে এটা আমি চাই না। তিতান, তুই কি বুঝতে পারছিস আমাকে? কেউ তো আমাকে বুঝতে চায় না রে। সবাই শুধু নিজের সিদ্ধান্ত আমার উপর চাপিয়ে দেয়। সেসব আমি বরাবর হাসি মুখে মেনে নিয়েছি। কিন্তু এবার আমার ভয় করছে রে।

– তুমি ভয় পাচ্ছো? কীসের ভয়?

নিস্তব্ধ দুপুরে রেহবারের আকস্মিক কথা বলায় গুলিস্তার সারাদেহ কেঁপে উঠলো। মেয়েটা ভীষণ চমকেছে দেখে রেহবার নিজেও অপ্রস্তুত হলো। ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে গুলিস্তার দু বাহুতে হাত রেখে বললো,
– স্যরি, স্যরি। খুব চমকেছো?

নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে গুলিস্তা উত্তর দিলো,
– ঠিক আছি।
– দরজা বন্ধ করার সময় বেশ জোরেই তো শব্দ হলো। তুমি শুনতে পাওনি?
– খেয়াল করিনি মনে হয়।
– তাই তো দেখছি। কি এতো কথা বলো তিতানের সাথে? আজকাল আমাকে সময়ই দেও না। কীসের ভয়ের কথা বলছিলে? কোনো সমস্যা?
– তেমন কিছু না। এমনিতেই তিতানের সাথে কথা বলছিলাম।

গুলিস্তার কথা রেহবারের বিশ্বাস হলো না। দুজনের মাঝে খুব সুক্ষ্ম একটা পর্দা গুলিস্তা নিজে টেনে দিয়েছে। রেহবার অনুভব করতে পারে কিন্তু ছুঁতে পারে না। বাচ্চা নিয়ে সেই ঝামেলার পর এখন সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক চলছে। সেদিনের পর বাচ্চা নেওয়ার প্রসঙ্গে রেহবার আর কথা বাড়ায়নি। গুলিস্তা যেহেতু মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়, তাই সে ব্যাপারে না এগোনোই ভালো। দীর্ঘ নয়মাস একজন নারী তার দেহে সন্তান ধারণ করে। অবর্ণনীয় প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করে তাকে জন্ম দেয়। জন্মের পর সন্তানের লালনপালনের সিংহভাগ দায়িত্ব পরে নারীর কাঁধেই। তাই সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যাপারে নারীর মতামত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গুলিস্তা যখন শারীরিক ও মানসিক উভয়ই দিক থেকে প্রস্তুত হবে তখনই সন্তানের ব্যাপারে ভাববে। এর আগে নয়।
রেহবারের দিক থেকে সব স্বাভাবিক রইলেও গুলিস্তার মধ্যে কিছু একটা ঠিক নেই। পরিবর্তনটা রেহবার অনুভব করতে পারে কিন্তু অভিযোগের কোনো অপশন নেই। কারন গুলিস্তার সহজ স্বাভাবিক আচরণ। ওর দিক থেকেও সবকিছু আগের মতোই চলছে। তবে আজকাল রেহবারের আশেপাশে থেকেও গুলিস্তা যেনো খুব দূরে। একজন আরেকজনের সাথে ঘনিষ্টভাবে খুব কাছাকাছি থাকলেও গুলিস্তার হৃদয় রেহবার ছুঁতে পারে না। হাসির আড়ালে মন খারাপের আবছা ছায়া দেখা যায়। খোলা মনের অপরপাশে কিছু একটা আড়ালে রয়ে গেছে বুঝা যায়। কিন্তু তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। খুব সতর্কতার সাথে একটা সুযোগ খুঁজতে থাকে রেহবার। সুযোগ পেলেই অভিযোগ করবে। আমাদের মাঝে এমন দূরত্ব কেনো সৃষ্টি করলে, ফুল? কিন্তু খুব নিপুণতার সাথে গুলিস্তা ভালো থাকার, স্বাভাবিক থাকার অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছে। এসব দেখে রেহবারের মনে সারাক্ষণএকটা কিন্তু খচখচ করে।

– ইশ! কত্তো দেরী হয়ে গেলো! লাঞ্চ করবে না? নিচে চলো।
হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো গুলিস্তা। রেহবার উঠলো ধীরে সুস্থে। গুলিস্তার ঘাড় থেকে তিতানকে নিজের হাতে নিয়ে বললো,
– তোমার গায়ের কাপড় ভিজে গেছে৷ চেঞ্জ করে নেও। আমি ডাইনিং টেবিল সাজিয়ে ফেলছি।

সম্মতি জানিয়ে গুলিস্তা চলে যেতেই তিতানের দিকে তাকিয়ে রেহবার বললো,
– দেখলি কীভাবে প্রশ্ন এড়িয়ে গেলো? আজকাল বড্ড চালাক হয়েছে। আমার থেকে কথা লুকায়। তোকে বলছি কেনো! তুই তো ওর ক্রাইম পার্টনার। সারাক্ষণ দুজনে দুটো মুখ একখানে করে গুটুর গুটুর করতে থাকিস। এখন আমাকে আর প্রয়োজন পরে না। মাঝেমধ্যে আমার নিজের উপরেই রাগ লাগে। কেনো যে তোকে বাড়ি বয়ে আনতে গেলাম! তোকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেছে। তুই না থাকলে ঠিকই আমার কাছে এসে মনের গোপন কুঠুরি খুলে বসতো। কিন্তু এখন আমার কাছে মন খারাপের কোনো গল্প করে না। কোনো সমস্যার সমাধান চাইতে আসে না। আমার সামনে একজন নিখুঁত, দক্ষ, আদর্শ বউ হিসেবে নিজেকে প্রেজেন্ট করে। অথচ ও জানেই না, ভুলে ভরা অগোছালো বউটাকে আমি কতোটা ভালোবাসি। ইচ্ছে তো করছে এখুনি তোকে বিদায় করি। বের করে দেই বাড়ি থেকে।

রেহবারের কথা শেষ হওয়ার আগেই তিতান ফুড়ুৎ করে উড়ে চলে গেলো ঘরের ভেতর। গুলিস্তা মাত্রই ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে। তিতান গিয়ে সরাসরি গুলিস্তার চারপাশে চক্রাকারে উড়তে শুরু করলো। সেই সাথে একনাগাড়ে চিৎকার করলো,
– রেবার বকা দেয়। বাড়ি বের করে দেয়। রেবার বকা দেয়।

রেহবার নামটা উচ্চারণ করতে পারে না তিতান। মাঝখানের হ বাদ দিয়ে রেবার ডাকে। তাতে খুব একটা সমস্যা হয় না গুলিস্তার৷ তিতানের অস্পষ্ট কথাও সে বুঝে নেয়। এই মুহূর্তে তিতানের কন্ঠে রেহবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনে অবাক হয়ে রেহবারের দিকে তাকালো। রেহবার নিজেও বাকরুদ্ধ। বজ্জাত পাখিটা এভাবে ফাঁসিয়ে দিবে কে জানতো! মালকিনের অন্তঃপ্রাণ হয়েছে একেবারে। রেহবার ভেবে পায় না এখন কি অযুহাত দেখাবে গুলিস্তাকে। ভ্যাবলা হাসি দিয়ে আমতা আমতা করে বললো,
– ওই হয়েছে কি! একটু বকা দিয়েছি আরকি। তোমাকে ভিজিয়ে দিয়েছে, না? তাই বকা দিলাম। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছি। তাই তোমার কাছে নালিশ দিচ্ছে আমার নামে।

দু অক্ষরের ‘ওহ’ বলে উত্তর দিলো গুলিস্তা। তিতানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
– কেউ বের করে দিবে না। আমি আছি না?

তারপর রেহবারের দিকে তাকিয়ে বললো,
– চলো, খেতে চলো।

রেহবার যেনো হাঁফ ছেড়ে বাচলো। এই চতুর পাখিকে পরে দেখে নিবে।

***

ক্যালেন্ডারের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে গুলিস্তা। অন্য কেউ হলে এতোক্ষণে খুশিতে লাফালাফি শুরু করে দিতো। কিন্তু গুলিস্তার সেরকম কোনো অনুভূতি হচ্ছে না। শুধু মনটা একটু হালকা লাগছে। একটা দুঃশ্চিন্তার ভার নেমে গেলো মাথা থেকে। ধীর পায়ে হেঁটে বেডের কিনারায় পা ঝুলিয়ে বসলো। রেহবারের অফিস থেকে বের হতে এখনো প্রায় এক ঘন্টা বাকি। এখুনি কল দেওয়া যাবে না। মানুষটা অস্থির হয়ে পরবে। এর থেকে ভালো হয় যখন কাজ শেষ করে অফিস থেকে বের হবে, তখন ফোন দিলে। বেড টেবিল থেকে মোবাইলটি হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।

রেহবার তখন মাত্রই অফিস থেকে বেরিয়ে পার্কিং থেকে গাড়িটি বের করে মেইনরোডে উঠিয়েছে৷ ফোনে গুলিস্তার কল দেখে রাস্তার এক পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কল রিসিভ করলো।
– হ্যালো।
– অফিসে থেকে বেরিয়েছো?
– মাত্র বের হলাম।
– ড্রাইভ করছো?
– নাহ। রোড সাইডে ব্রেক করেছি। কেনো? জরুরি কিছু বলবে?
– তেমন কিছু না। আসার পথে ডিসপেনসারি দেখলে একটা প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট নিয়ে এসো।

রেহবার যেনো শ্বাস নিতে ভুলে গেলো। মেয়েটা কি বলছে সেটা কি সে নিজেও বুঝতে পারছে না? তেমন কিছু না বলে একি বললো! রেহবারের পায়ের নিচের ঠাঁইটুকু মনে হয় সরে গেল। নিজেকে ভীষণ হালকা মনে হচ্ছে। এর থেকে বেশি কিছু সে অনুভব করতে পারছে না। ওকে চুপ থাকতে দেখে গুলিস্তা ডাকলো,
– তুমি ঠিক আছো? শুনতে পাচ্ছো?
– ফুল?
– হুম।
– এটা জরুরি কিছু নয়?
– পরপর দু মাস পিরিয়ড মিস হয়েছে। তাই ভাবলাম টেস্ট করে দেখি। সামান্য ব্যাপার। মনে করে নিয়ে এসো কিন্তু।

ফোন কেটে দিলো গুলিস্তা। তবুও ফোন কানে ধরে অনেকক্ষণ বসে রইলো রেহবার। কেমন কাঠখোট্টা আচরণ হয়েছে মেয়েটার! রেহবারের অবাক লাগে।

গুলিস্তার নিকট জরুরি কিছু না হলেও রেহবারের নিকট এর থেকে জরুরি আর কিছু হতে পারে না। নামকরা ডিসপেনসারি থেকে গুণে গুণে পাঁচটি ভিন্ন ব্র‍্যান্ডের টেস্ট কিট কিনে নিয়েছে৷ সেগুলো হাতে নিয়ে গুলিস্তা ওয়াশরুমে প্রবেশ করেছে থেকে সে বেডরুমে পায়েচারি করছে। বিছানায় বসে অস্থির রেহবারকে শান্ত চোখে দেখছে তিতান। রেহবারের মধ্যে যতোটা অস্থিরতা, তিতানের মধ্যে ততোটাই স্থিরতা।
রেহবারের মনে হচ্ছে অন্ততকাল পেরিয়ে গেছে তবুও গুলিস্তা বের হচ্ছে না। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সজোরে আঘাত করতে ইচ্ছে করলেও নিজেকে সংযত করে আলতো করে টোকা দিয়ে ডাকলো,
– ফুল, এই ফুল। আর কতোক্ষণ লাগবে?
– পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে।
– বাইরে এসে অপেক্ষা করো। আমি একা অপেক্ষা করতে পারছি না।

গুলিস্তা বের হলো না। গুণে গুণে সাত মিনিট পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হলো। লম্বা লম্বা পা ফেলে গুলিস্তার নিকট পৌঁছে গেলো রেহবার। প্রশ্ন নিয়ে তাকালো ওর দিকে। গুলিস্তা সেই প্রশ্নের উত্তর দিলো খুব শান্ত কন্ঠে। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে এক হাতে দুটো কিট, অন্য হাতে তিনটি কিট উঁচু করে ধরে বললো,
– পজেটিভ এসেছে। সবগুলোতেই একই রেজাল্ট।

এতোটুকু কথাতে কী যেনো মিশে ছিলো রেহবার জানে না৷ শুধু জানে তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। খুশিতে হাউমাউ করে কান্না করার মতো বোকা কাজটি করতে ইচ্ছে করছে। অনেক কষ্টে নিজের ইচ্ছেকে সংবরণ করলেও জল জমে চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এলো। সেই দৃষ্টি মেলে দেখলো গুলিস্তার দু হাতে প্রদর্শনকৃত কিটগুলোতে দুটো করে লাল রেখা। ঘোলা দৃষ্টিতে সেসব আবছা দেখাচ্ছে৷

দু চোখ বন্ধ করে মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাতে ভুললো না। ডাস্টবিনে ময়লা ফেলে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসতেই গুলিস্তাকে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসালো রেহবার। নিজে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসলো। কোলের উপর রাখা গুলিস্তার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে সন্ধানী দৃষ্টিতে ওর মুখে উত্তর খুঁজতে লাগলো। কিন্তু বিভ্রান্ত করলো গুলিস্তার ঠোঁটের মুচকি হাসি, মুখভরা চাপা আনন্দ, দু চোখের উদাসীনতা। কোনটা প্রকৃত অনুভূতি? বোধগম্য হলো না রেহবারের। বাধ্য হয়ে প্রশ্ন করলো,
– ফুল, ইট ওয়াজ ওকে উইথ মি। আমি অপেক্ষা করতে পারতাম। সেদিন আমার মনে হয়েছে একটা বাচ্চা নিলে মন্দ হতো। তাই তোমাকে বলেছি। তুমি না করেছো, আমি মেনে নিয়েছি। আমার কোনো আক্ষেপ ছিলো না, কষ্ট ছিলো না। সেই ঘটনার রেশ ধরে, নিজের উপর চাপ নিয়ে যদি এই পদক্ষেপ নিয়ে থাকো তাহলে….

কি বলবে শব্দ খুঁজে পেলো না রেহবার। গুলিস্তা উতলা হলো না। চোখে চোখ রেখে অপেক্ষা করলো।
– তাহলে?
– এমনটা করা উচিত হয়নি।
– তাহলে এখন কি করা উচিত হবে?

গুলিস্তা কি ইঙ্গিত করছে? কোনোভাবে বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার কথা ভাবছে না তো? বুকে ধাক্কা খেলো ভীষণ। দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে গুলিস্তার কোলে চেয়ে ভাবতে লাগলো, কী এক গোলকধাঁধা সৃষ্টি হলো!
– রিলেক্স। চাপে পরে কোনো স্টেপ নেইনি৷ মন থেকে সায় এসেছে তাই নিয়েছি।

গুলিস্তার কথায় রেহবারের বুকের উপর থেকে বিশাল এক পাথর নেমে গেলো। হাতে ধরে রাখা গুলিস্তার হাত দুটোর উল্টোপিঠে চুমু এঁ কে বললো,
– কালকে হসপিটালে গিয়ে টেস্ট করে আসবো, ঠিক আছে?
– আচ্ছা।

চলবে..

#হে_সখা
#অক্ষরময়ী
একচত্বারিংশ পর্ব

– তবুও তুমি বেবিটা রাখতে চাও?

চল্লিশ উর্ধ ডাক্তার আভার প্রশ্নে গুলিস্তা মলিন হাসলো। পেটের উপর দু হাত রেখে সেদিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
– ও ঠিক আছে?

পেশা জীবনে এমন অনেক পেশেন্ট আভা দেখেছেন। নিজের কথা না ভেবে সন্তানের কথা ভাবে। তবে তাদের মধ্যে উৎসাহ, আনন্দ থাকে ভরপুর। গুলিস্তার মধ্যে সেসবের কিছুটা কমতি রয়েছে।
– হ্যাঁ। নাইন উইকস রানিং। পজিশন ঠিকঠাক। ফিটাস যথেষ্ট হেলথি।

অফিসের জরুরি কল এটেন্ট করে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে এলো রেহবার। গুলিস্তার পাশের চেয়ারে বসে বললো,
– স্যরি। জরুরি কল ছিলো।
– ইটস ওকে।

ওকে বললেও ডাক্তারের চেহারা মোটেও ওকে ধরনের মনে হচ্ছে না। কেমন রাগী, গম্ভীর চেহারা নিয়ে বসে আছে। একটু আগে রুম ছেড়ে বের হওয়ার সময় এমন ছিলো না। দ্বিধায় বাধা পরতে পরতেও রেববার জানতে চাইলো,
– ডিড আই মিস সামথিং? এনিথিং রং ডক্টর?

আভা উত্তর দেওয়ার আগে মুখে হাসি ঝুলিয়ে গুলিস্তা উত্তর দিলো,
– সব ঠিক আছে। ডক্টর কিছু খাবারের কথা বলছিলেন। ডায়েট চার্ট ফর প্রেগন্যান্ট ওম্যান।
– আমাকে বুঝিয়ে দিন ডক্টর। ও এমনিতেও ফাঁকিবাজ। খেতে চায় না।

রেহবারের কথায় গুলিস্তা আলতো হাসে। ডায়েট চার্টের সাথে কিছু ভিটামিন, ক্যালসিয়াম সাজেস্ট করেন আভা।

গুলিস্তার প্রেগন্যান্সির খবরে আম্বিয়া খাতুন যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন। হাসতে হাসতে চাপা ব্যাথা হয়ে গিয়েছে তবুও উনার মুখ থেকে হাসি সরছে না। মায়ের উচ্ছ্বাস দেখে ল্যাপটপের এপাশে রেহবার নিজেও হাসছে। স্টাডিরুমে বসে আম্বিয়া খাতুনের সাথে কথা বলছে রেহবার ও গুলিস্তা। রেহবার যখন গুলিস্তার প্রেগন্যান্সির খবর জানালো গুলিস্তাকে দেখতে চাইলেন আম্বিয়া খাতুন। লাজে ভরা চেহারা নিয়ে রেহবারের চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে গুলিস্তা। হঠাৎ খেয়াল হতেই আম্বিয়া খাতুন ধমকে উঠলেন,
– ওকে দাঁড় করিয়ে রেখে তুই বসে আছিস কেনো? ওকে বসতে দে।

ধমক খেয়ে রেহবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। গুলিস্তাকে বসতে বললে সে কিছুতেই বসবে না।
– আমি ঠিক আছি। তুমি বসো প্লিজ। আমি এখুনি চলে যাবো। রান্না বসিয়ে এসেছি।

সেসব কথা রেহবার শুনলো না। জোর করে বসিয়ে দিয়ে নিজে চেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
– ওসব রান্নাবান্নার পেছনে দৌড়ঝাপ করা এখন বন্ধ। নিজের ও বাচ্চার দিকে খেয়াল রাখো। রেস্ট নেও, বাচ্চাকে সময় দেও। রেহবার, মালাকে বল রান্নাবান্নার দায়িত্ব নিতে।

মায়ের কথায় রেহবার সম্মতি জানানোর আগেই গুলিস্তা বললো,
– রান্নাটা আমি নিজে হাতে করতে চাই মা। সব কাজ ছেড়ে ঘরে বসে থাকলে সময় কাটবে কি করে?
– তাও ঠিক৷ তবে ছোটাছুটি করবে না। একলা কীভাবে কি করবে ভেবে আমার চিন্তা হচ্ছে৷ ইচ্ছে করছে এখনি ছুটে চলে যাই৷ রাহিলটারও পরীক্ষা কয়েকদিন পর৷ পরীক্ষা শেষ হতেই আমি চলে আসবো। এই কয়েকটা দিন না হয় দূর থেকেই দিকনির্দেশনা দিয়ে যাই। তুমি কিন্তু মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে এবং মেনে চলবে। ঠিক আছে?

একপাশে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানায় গুলিস্তা।
– প্রথমে গায়ের এই পোশাকটা পাল্টাতে হবে। হালকা ওজনের কাপড় পরো। পায়ে পা লেগে পরে যাওয়ার ভয় থাকবে না এমন। সালোয়ার কামিজগুলো আছে না? ওগুলো পরো৷ না থাকলে রেহবার নতুন এনে দিবে। আর সিড়ি বেয়ে উঠানামা কম করবে৷ প্রথম কয়েকটা মাস হাটাচলা কম করার চেষ্টা করো। আর শোনা যখন যেটা খেতে মন চাইবে সেটাই খাবে। ঘরে না থাকলে আনিয়ে নিবে। মাঝরাত হলেও রেহবারকে আনতে পাঠাবে। এনে না দিলে আমাকে জানাবে। ওকে আমি দেখে নিবো।

মায়ের ধমকে রেহবার হাসলো। ল্যাপটপের দিকে ঝুকে বললো,
– আমি এখানেই আছি মা। আমার সামনে বসে আমার বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করছো? এতো তাড়াতাড়ি পর হয়ে গেলাম!
– এখন আর আমি তোকে চিনি না।

আম্বিয়া খাতুনের দিকনির্দেশনা এবং ইন্টারনেটের সহায়তায় গুলিস্তার প্রেগন্যান্সি পিরিয়ড ভালোই কাটছে। কোনো কারনে রেহবারকে বিরক্ত করতে হয় না। তবুও রেহবার তক্কেতক্কে থাকে কখন কি প্রয়োজন পরে। চাওয়ার আগেই সবকিছু হাজির করে ফেলে। ডাক্তার আভার ডায়েট চার্ট ও আম্বিয়া খাতুনের উপদেশ দুই মিলিয়ে কেনাকাটা করে। আম্বিয়া খাতুনের মতে, এসময় মেয়েদের খাবারের প্রতি রুচির পরিবর্তন ঘটে। ভিন্ন প্রকৃতির খাবারের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। টক খেতে ইচ্ছে করে। ফাস্টফুডের ক্রেভিংস জাগে। কিন্তু গুলিস্তা তো মহামানবি। ওর কিছু লাগে না। আগে যেমন ছিলো এখনো তেমন আছে। শুধু প্রথম কয়েকদিন সকালবেলা বমি কর‍তে দেখা গেছে। সেদিন খেতে বসে হঠাৎ করে উঠে গিয়ে কিচেনের বেসিনে হড়বড়িয়ে বমি করতে লাগলো। সাহায্যের জন্য রেহবার এগিয়ে যেতেই সেকি রাগ! তুমি উঠে এলে কেনো? খাওয়া ফেলে কেউ এভাবে উঠে আসে! আমি ঠিক আছি। তুমি খেতে যাও। খেতে পারবে কি? রুচি নষ্ট হয়ে গেছে নিশ্চয়ই।

গুলিস্তার কথায় ভীষণ মেজাজ খারাপ হলেও রেহবার কিছু বলেনি। পেছন থেকে গুলিস্তার চুল সামলে ধরে ছিলো। মা তার দেহে বাচ্চা ক্যারি করছে বলে মায়ের দেহে সব সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাই বলে কি বাবা হিসেবে অসুস্থ মায়ের পাশে রেহবার একটু দাঁড়াতে পারবে না? অবশ্যই পারবে। একজন স্বামী হিসেবে এবং বাবা হিসেবে এটা তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু গুলিস্তা তাকে এমনভাবে দূরে ঠেলে দেয় যেনো সে পাশের বাড়ির কেউ। রাগ হলেও রেহবার কিছু বলে না, পাত্তাও দেয় না। নিজের মতো যতোটা পারে সাহায্য করার চেষ্টা করে।
আইসক্রিম এনে ফ্রিজে রাখে, মাঝরাতে পিজ্জা বানিয়ে হাজির হয় বেডরুমে। রাস্তার ধারে আম গাছ থেকে কাঁচা আম পেরে নিয়ে আসে। সারা বাজার খুঁজে পাকা তেতুল কিনে। গুলিস্তা কোনোকিছু আবদার না করলেও রেহবার কিছু নিয়ে আসলে সাদরে গ্রহণ করে।

একটা আউটডোর মিটিং থেকে ফেরার সময় পুরাতন পুকুরঘাটের পাশে গরু জ বা ই করার দৃশ্য চোখে পরে। রেহবারের মনে পরে গত সপ্তাহে গরুর কলিজা দিয়ে গুলিস্তা একটু বেশি ভাত খেয়েছিলো৷ তাই গাড়ি থামিয়ে আজও গরুর কলিজাটুকু সম্পূর্ণ কিনে নিলো। বাড়ি ফিরে মালার সহায়তায় সেগুলো কেটে রান্না করে প্লেটে ভাত নিয়ে ঘরের দিকে গেলো।
ব্যালকনিতে বসে এই অবেলায় কুটকুট করে চিপস খাচ্ছে গুলিস্তা৷ ফ্লোরের উপরে বসে সামনের দিকে দু পা ছড়িয়ে বসেছে। ফোলা পেটের কারনে পেছনের দিকে একটু হেলে বসতে হয়েছে। ওর সামনে বসে ফ্লোর থেকে চিপস তুলে খাচ্ছে তিতান। ব্যালকনিতে রাখা টি টেবিলের উপর ভাতের প্লেটটি রেখে রেহবার বললো,
– কতোবার বলেছি এভাবে ফ্লোরের উপর বসবে না। ঠান্ডা লেগে যাবে। তুমি কিন্তু আজকাল কোনো কথা শুনছো না। উঠো দেখি। আমার হাত ধরে ধীরে ধীরে উঠো।

রেহবারের সহায়তায় ফ্লোর থেকে উঠে দোলনায় বসলো। টুল টেনে নিয়ে গুলিস্তার সামনে বসলো রেহবার। ওর হাতে ভাতের প্লেট দেখে গুলিস্তা বললো,
– এখন খাবো না। খিদে নেই।
– অবেলায় চিপস খেলে ক্ষুধা থাকবে কি করে! খালি পেটে কেউ ভাজাপোড়া খায়! অল্প একটু ভাত খাও। বেশি খেতে হবে না।

ওদের দুজনের মাঝে উড়ে এসে বসলো তিতান। ওকে দেখে রেহবার ধমক দিলো।
– ও চিপস খাচ্ছে দেখে তুইও সঙ্গ দিচ্ছিলি! এসময় চিপস খাওয়া ক্ষতিকর। কোথায় বারণ করবি তা না করে নিজেও খেতে বসে গেলি। এখন আবার চলে এলি ভাত খেতে!

প্রেগন্যান্সির ফাইনাল স্টেজে এসে গুলিস্তা ভীষণ ভেঙে পরলো। এতোদিনের সাহস, জেদ, কঠোরতা সব যেনো তুলোর মতো উড়ে যাচ্ছে। দু হাতে আকড়ে ধরেও আটকে রাখা যাচ্ছে না। আজকে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। অন্যবার নিজেই রেহবারকে সাথে নিতো না। রেহবার যতোবারই যেতে চেয়েছে গুলিস্তা বেছে বেছে রেহবারের ব্যস্ত শিডিউলের দিন অ্যাপয়েন্টমেন্টের ডেট ফেলেছিলো। তবুও বেচারা রেহবার অফিস যাওয়ার পথে গুলিস্তাকে হসপিটালে নামিয়ে দিয়ে যেতো। ফেরার পথে গুলিস্তা উবার ডেকে নিতো। বাড়ি ফিরে রেহবারকে না জানানো পর্যন্ত রেহবারের শ্বাস আটকে থাকতো। সেই গুলিস্তার আজকে বড্ড ইচ্ছে করছে রেহবার ওর সাথে যাক। এদিকে রেহবার ছুটোছুটি করে রেডি হচ্ছে। একটা জরুরি মিটিং আছে। ডেইরি মিল্ক কোম্পানির আউটডোর ইভেন্ট। অনেক বড় ইভেন্ট। ডিল কনফার্ম হয়ে গেলে অর্ধেক চিন্তা মুক্ত হওয়া যাবে। তবে দুঃশ্চিন্তাও বাড়বে দ্বিগুণ। বিগ ডিলে সফলতা ছোঁয়ার চান্স যেমন থাকে অনেক, তেমনি ঝরে পরার আশংকাও থাকে প্রবল। এই একটা ইভেন্ট হাইক্লাস বিজনেস ওয়াল্ডে রেহবারের কোম্পানিকে নতুন পরিচয় তৈরি করে দিতে পারে। একটি সফল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। তাই তো রেহবার কোনো কমতি রাখতে চায় না। বিছানায় বসে থাকা গুলিস্তার কপালে চুমু দিয়ে বললো,
– জরুরি মিটিং আছে। কল দিতে পারবো না। তুমি কিন্তু মনে করে খাবার খাবে। আমাকে মেসেজ দিয়ে আপডেট জানাবে। নিচে নামতে হবে না। মালা খাবার দিয়ে যাবে। আসছি আমি।

বন্ধ চোখজোড়া খুলে গুলিস্তা একটুখানি হেসে রেহবারের কথায় সম্মতি জানালো। তারপর বললো,
– ডক্টরের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।

চিন্তার রেখা দেখা দিলো রেহবারের কপালে।
– ওহ শীট! আজকেই থাকতে হলো। এমন একটা কথা আমি ভুলে গেলাম কি করে!
– উবার ডেকে নিবো। তুমি যাও।
– নাহ। তোমার সাথে যেতে পারছি না দেখে আফসোস হচ্ছে। পৌঁছে না দিয়ে সেই আফসোস আর বাড়াতে চাই না। তুমি একটু কষ্ট করে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নেও, প্লিজ। তোমাকে হসপিটালে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসে যাবো।

দ্রুত রেডি হতে বললেও তা গুলিস্তার পক্ষে তা সম্ভব হলো না। প্রেগন্যান্সির কারনে শরীর ভারী হয়েছে। নড়াচড়া করতেই কষ্ট হয়। তৈরী হতে সাহায্য করলো রেহবার।
গাড়িতে বসেও গুলিস্তার মন উদাসন হলো ভীষণ। জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে লুকিয়ে কাঁদলো পুরোটা রাস্তা। কেনো কাঁদছে নিজেও জানে না।
হসপিটালের সামনে গাড়ি থেমেছে। গাড়ি থেকে নামতে গেলে রেহবার ওর হাত আটকে ধরলো।
– ডাক্তার কি বলে আমাকে জানাবে প্লিজ। এটা তোমার লাস্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট। সাথে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু ভাগ্য বরাবর আমাদের বিরুদ্ধে হাওয়া বওয়ায়।
– ইটস ওকে। আমি ম্যানেজ করে নিতে পারি৷ চিন্তা করো না।
– ম্যানেজ করা শিখলে কেনো বলো তো? কেমন দূরে সরে যাচ্ছো।

রিপোর্ট দেখে আভার কপালে ভাঁজ পরলো। চিন্তিত হয়ে বললেন,
– এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম। প্রেশার লেভেল কোনোভাবেই কন্ট্রোলে আসছে না। ঔষধ খাচ্ছো ঠিকমতো?
– হ্যাঁ।
– প্রেশার অনেক হাই। শেষ মুহুর্তে এসে ডায়াবেটিস বেড়েছে। এমন থাকলে সি সেকশন অসম্ভব। নর্মাল ডেলিভারিও রিস্কি। শোনো, তোমাকে বারবার সাবধান করে দিচ্ছি, ব্যথা অনুভব হলেই হাসপাতালে চলে আসবে। কোনোভাবে বাড়িতে ডেলিভারির ঝুঁকি নিবে না। এতে তোমার সাথে সাথে বেবিও বিপদের মুখে পরে যাবে।
– আচ্ছা। বেবি ঠিক আছে এখন?
– হ্যাঁ। তোমার বেবি একদম ঠিক আছে। প্রোপার গ্রোথ নিয়ে প্রোপার ওয়াটারের মধ্যে শুয়ে দুষ্টামি করছে।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রেহবারকে মেসেজ করলো গুলিস্তা। সব ঠিক আছে।

***

খোলা আকাশে নীলচে মেঘ। হাত বাড়ালেই ছোয়া যাবে। খুব সাবধানে গুলিস্তা হাত বাড়ালো। তুলতুলে নরম মেঘের গায়ে আঙ্গুলের ছোয়া পেতেই তুলোর মতো তলিয়ে যাচ্ছে। কী শীতল! কী নরম? তবুও গুলিস্তা একটু একটু করে ছুঁচ্ছে। কিছু অনুভূতি রয়েসয়ে অনুভব করতে হয়। হটাৎ পেটে ভেতর তীব্র ব্যথা হলো। হকচকিয়ে উঠতেই তাল হারিয়ে ফেললো গুলিস্তা। সাঁই সাঁই করে নিচের দিলকে পরতে লাগলো। কতো উঁচু থেকে পরছে কে জানে! খুঁজে পাচ্ছে না কোনো তল। চোখ মুখ খিঁচে শক্ত কিছুতে দেহটা থেতলে যাওয়ার অপেক্ষায় রইলো৷ কিন্তু পথ শেষই হচ্ছে না। দেহটা পালকের মতো হালকা মনে হচ্ছে।

তীব্র আতংকে দেহ কেঁপে উঠতেই ঘুম ভেঙে গেলো গুলিস্তার। গলায়, কপালে, নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। বেড টেবিলে রাখা ফোনে সময় দেখে নিলো। ভোর চারটা বাজে৷ প্রায় প্রতিদিনই একই স্বপ্ন দেখে ঠিক এই সময় ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। এরপর আর ঘুম আসতে চায় না৷ মুটিয়ে যাওয়া ভারী শরীর, ফোলা পেট নিয়ে অনেক কষ্ট করে সাবধানে বিছানা থেকে নামলো। বিছানার অপরপাশে ঘুমাচ্ছে রেহবার।

শব্দবিহীন দরজা খুললো ব্যালকনির। বাইরে তখন সূর্যের আলো না ফুটলেও চোখ সয়ে যাওয়া অন্ধকার সরে গিয়ে ঘোলাটে সাদা আলো। দোলনায় বসে সেই আলোতে তাকালো গুলিস্তা। সকালের শীতল শুদ্ধ বাতাসে হালকা ঠান্ডা অনুভব হলেও শ্বাস নিতে ভালো লাগছে। বুক ভরে ভেতরে টেনে নিলো সেই বাতাস। মনের অস্থিরতা অনেক খানি কমে গেলো।
খানিকবাদে নিজের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো তিতান। এখন আর ওর খাঁচার দরজা বন্ধ করা হয় না। সারাদিন গুলিস্তা আগেপিছে উড়াউড়ি করে রাতে নিজের ঘরে নিজেই ফিরে যায় তিতান।
এতো সকালে তিতানকে দেখে গুলিস্তা অবাক হলো।
– কীরে ঘুমাসনি?
গুলিস্তার কাধে আরাম করে বসলো তিতান। প্রশ্নের উত্তর দিলো না। খানিকবাদে গুলিস্তা আবার ডাকলো,
– তিতান?

তিতানও ডেকে উঠে,
– ফুল?

গুলিস্তা আলতো হাসে। ওকে যতোবারই নাম ধরে ডাকা হয়, প্রতিউত্তরে সেও গুলিস্তাকে ফুল বলে ডেকে উঠে৷ ওর কন্ঠে ফুল ডাক শুনতে গুলিস্তা ভীষণ ভালো লাগে। তাই তো কারনে অকারণে সারাদিন বারংবার তিতান, তিতান বলে ডাক পারে। তবে এই ভোরের আগমনকালে গুলিস্তা ওকে মন থেকেই ডেকে উঠলো।
– আজকে আবার সেই স্বপ্নটা দেখেছি। আকাশ থেকে নিচে পরে যাচ্ছি। রোজ একই স্বপ্ন কেনো দেখছি বল তো। আমি ইন্টারনেটে খুঁজে দেখেছি। আকাশ থেকে নিচে পরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখার অর্থ হচ্ছে, মৃত্যু সন্নিকটে। আচ্ছা, আমি না থাকলে তোর কি খুব কষ্ট হবে?

গুলিস্তার গলা ধরে এলো। কান্না আটকাতে গিয়ে গলার ভেতর ব্যথা করছে। তিতান উড়ে এলো একদম মুখের সামনে। গালের উপর হালকা আচড় কেটে নাকে তার লম্বা ঠোঁট ঘষতে ঘষতে বললো,
– ফুল আছে। ফুল থাকবে।

তিতানকে দু হাতে জড়িয়ে হু হু করে কেঁদে ফেললো গুলিস্তা।

আযানের শব্দে রেহবারের ঘুম ভাঙ্গলো। কাছে একটা মসজিদ রয়েছে৷ সকালের শান্ত পরিবেশে চারদিক গমগম করে উঠে আযানের প্রতিধ্বনিতে। নামাজ পরার উদ্দেশ্যে গুলিস্তাকে ডেকে দিতে দেখা গেলো বিছানা ফাঁকা। সেই দৃশ্য দেখে রেহবারের ঘুম ছুটে গেছে। দ্রুত পায়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখলো দোলনায় বসে এই ভোরবেলা চোখের জল ফেলছে। কাছে গিয়ে দু হাতের মাঝে কান্নাস্নাত মুখটা তুলে ধরে কন্ঠে আদর মেখে প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে? খারাপ লাগছে?

ঠোঁট উল্টে তাকালো গুলিস্তা। ছোট বাচ্চাদের মতো অভিযোগ করে বললো,
– মন খারাপ লাগছে।
– কেনো মন খারাপ?
– জানি না।

হালকা হাসলো রেহবার। গাল ছেড়ে দিয়ে গুলিস্তার পায়ের কাছে ফ্লোরে বসে পরলো। পা দুটো কোলের উপর রেখে ধীরে ধীরে ম্যাসাজ করতে লাগলো।
– বাড়ির কথা মনে পরছে। মায়ের কথা মনে পরছে। আমার ঘরটা, সেখানে আমার টেবিল, চেয়ার, আলমারি। আমার শৈশব, আমার কৈশোর। সব ওখানে, ওই শহরে।

রেহবার শুনলো মনোযোগ দিয়ে। ওকে বলতে দিলো। বাধা দিলো না। গর্ভকালীন সময়ে মেয়েরা ভীষণ আবেগী হয়ে উঠে। ফিরে যায় নিজের শৈশবে। মায়ের সান্নিধ্যে খুঁজে, মমতা খুঁজে। যা হাজার চেষ্টা করেও রেহবার দিতে পারবে না। নিজের অপারগতা স্বীকার করে বললো,
– মায়ের কমতি আমি পূরণ করতে অক্ষম, ফুল। ওই শহরে তোমাকে রেখে আমি শান্তিতে থাকতে পারবো না। তোমার মা নিজেও এখানে আসবেন না। সেটা তুমিও জানো। উনি তো আজকাল খোঁজখবরও নেয় না। তুমি চাইলে নিজে ফোন দিয়ে কথা বলতে পারো।
– উহু। একটু মনে পরছে শুধু। ওতোটাও না।
– নামাজ আদায় করে বাগানে হাঁটতে যাবো। মন ভালো হয়ে যাবে দেখো।

নামাজ আদায় করা শেষ হতেই গুলিস্তাকে কোলে তুলে নিলো রেহবার। নিজের ভারী শরীর হাওয়ায় ভাসতেই গুলিস্তা আঁতকে উঠলো। ভয়ে চোখ বন্ধ করে বললো,
– একি করছো! আমি হাঁ টতে পারবো। নামিয়ে দেও।
– বাগানে গিয়ে নামিয়ে দিবো। সিড়ি ভাঙতে হবে না।
– কতো ভারী হয়েছি আমি। তোমার কষ্ট হবে।
– এ আর এমন কি ওজন!

রেহবারের পাগলামি খিলখিল করে হেসে উঠলো গুলিস্তা। মন খারাপ উড়ে গেলো সেই হাসিতে।

চলবে..