অতঃপর গল্পটা তোমার পর্ব-০২

0
256

#অতঃপর_গল্পটা_তোমার
সমুদ্রিত সুমি

গ্রীষ্মতপ্ত পরিবেশ হুট করেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। শুভ্র নির্মল আকাশে জমতে শুরু করলো কালো মেঘ। গুরুম গুরুম আওয়াজে গর্জন করে উঠলো গগন। গগনবিহারী পাখির দলেরা ছোটাছুটি করে আপন নীড়ে ফেরার তাড়া নিয়ে ছুটে চলেছে। আচমকাই ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলো। তোহফা সাথে ভদ্রমহিলা কেবলমাত্র রিক্সা থেকে নেমেছে। তোহফা চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো জায়গাটা তার চেনা কিনা। কিঞ্চিৎ প্রহর পর সে বুঝলো জায়গাটা সে চেনে। এখানে প্রতিদিন না হলেও মাঝে মাঝেই আসা হয়। তবে জায়গাটায় সব সময় লোকজনের সমাগম বেশি থাকায় গভীর ভাবে দেখা হয়নি। তবে যতোটুকু বুঝলো এখানে তার বড় ভাই তৌসিফ মাঝে মাঝেই নিয়ে আসে তাকে । “মা জননী” নামের একটা রেস্টুরেন্টে তারা খেতে আসে। এখানের ফুটপাতের দোকান থেকে তোহফা নিজের শখের রেশমি চুড়ি, কাজল কিনে নিয়ে ঘরে ফিরে। আজও তার চোখে কাজল আছে যেটা সে এখানের ফুটপাতের দোকান থেকেই কিনে নিয়ে গিয়েছিলো। এই ফুটপাতের দোকানের সামনে এলেই তার প্রয়োজন না হলেও কেন জানি চুড়ি ও কাজল না নিলে মনটা আকুলিবিকুলি করতে থাকে। মনে হয় অনেক বড় কিছু সে নিতে পারেনি। তার এমন স্বভাবের সাথে তার পরিবারের লোকজন পরিচিত। তবে এই ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই পরিচিত নন। তাই তোহফা চেয়েও আজ ফুটপাতের শখের চুড়ি দেখে নিজের পা দুটোকে স্থির করলো না দোকানের সামনে। তার পায়ের গতিবিধি সামনের ভদ্রমহিলার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। ভদ্রমহিলা তোহফার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“সামনেই আমার ছেলে একটা মিটিং করছে। অবশ্য এটাও আমি ভুলে যেতাম। তাই দেখো ফোনের ডায়েরিতে লিখে বারবার সেখানে চোখ বুলাচ্ছি, যেন ভুলে না যাই। ডাক্তার বলেছেন ধীরে ধীরে আমার এই রোগ ঠিক হয়ে যাবে। আমার ধারণা তুমি আমার ঘরের পুত্রবধূ হলেই আমি অর্ধেক সুস্থ হয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ।”

ভদ্রমহিলার কথায় তোহফা জোর করেই নিজের ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করলো। তার কথায় এখন মন খারাপ করলে হয়তো তিনি কষ্ট পাবেন। এটা ভেবেই এমনটা করা। কিছুদূর হাঁটার পর তোহফা খেয়াল করলো সেই মা জননী রেস্টুরেন্টের ভেতরে ভদ্রমহিলা ঢুকছেন। তোহফাও পা মিলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। ততোক্ষণে বাহিরে তুমুল বেগে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভারি বর্ষণের দাপটে শহর পুরো শীতল হয়ে গেছে। গ্রীষ্মের কড়া রোদে শুষ্ক হয়ে থাকা পিচঢালা রাস্তায় বৃষ্টির ঠান্ডা শীতল পরশ পরতেই সেখান থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ধুলোমাখা রাস্তায় বৃষ্টির পানি মিশে যেতেই কেমন একটা ঘ্রাণ নাকে ভেসে এলো। ঘ্রাণটা ভালো না খারাপ এই মুহূর্তে সে অনুভব করতে পারলো না। অবশেষে দু’জনেই একটি টেবিলে বসে থাকা পুরুষের সামনে এসে দাঁড়ালো। ভদ্রমহিলা “আওয়াদ” বলে ডেকে উঠতেই পিছু ফিরে তাকালো লোকটা। তাতেই তোহফার হার্টবিট খুব খারাপ ভাবে নিজস্ব গতি হারালো। ধক ধক করে হার্টবিট নিজের গতিপথ অনুসরণ করা থেকে হঠাৎ করেই যেন থেমে গেছে। দম মেরে বসল, ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পরলো। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে অভিধানের অন্তর্ভুক্ত সকল ভাষা তোহফা হারিয়ে ফেললো। বাকরুদ্ধ হয়ে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলো ছেলেটার মুখপানে। ততোক্ষণে ছেলেটা উঠে দাঁড়িয়েছে। নিজ দায়িত্বে তার মাকে চেয়ার টেনে বসিয়ে দিয়ে সুন্দর একটা হাসি দিয়ে তোহফার উদ্দেশ্য বললো,

“বসুন। আমি খুবই দুঃখিত আমার মায়ের ব্যবহারে। অবশেষে সে আপনাকে জোর করে ধরে নিয়েই এলেন । দয়া করে কিছু মনে করবেন না, মা এমনই। আমি নিজ দায়িত্বে আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিবো। প্লিজ এখানে বসুন।”

আওয়াদের কোনো কথা তোহফার কর্ণকুহুরে পৌঁছায়নি। কারণ তোহফা তখনো আওয়াদকে দেখে গভীর ঘোরের মাঝে ডুবে আছে। আওয়াদের কথা শুনবে কী করে সে তো আওয়াদকে দেখার নেশায় তলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এতো সুন্দর কোনো পুরুষ হলে রোজ প্রতিটি মেয়ে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করে হাসপাতালে ভর্তি হবে। নেহাৎ সে কঠিন হৃদয়ের মেয়ে। নাহলে নিশ্চিত সেও হার্ট অ্যাটাক করতো। জ্ঞান হারিয়ে আওয়াদকে দেখার জন্য ছটফট করতো তার অচেতন হয়ে থাকা শরীর। সে শুনে এসেছে ছেলেরা ফর্সার থেকে কালো ভালো। তবে আজ বলতে ইচ্ছে করছে, “এমন সুপুরুষ সুন্দর হওয়াই ভালো।” এমন সুন্দর দেখতে কোনো ছেলে হলে মেয়েদের সুন্দরী উপাধি উল্টো হয়ে যাবে যে। মেয়েরা অতিরিক্ত সুন্দর হলে তাদের সুন্দরী, পরী আরো অনেক নামে ডাকা হয়। তাহলে ছেলেদের কি নামে ডাকে? আচ্ছা উনার গার্লফেন্ড আছে নিশ্চয়ই। হয়তো আছে। এতো সুন্দর মানুষের গার্লফ্রেন্ড নেই, এটা মিথ্যা কথা। তোহফা যখন নিজের মাঝেই নিজে নেই তখন আওয়াদ তোহফার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হালকা কাশি দিলো। কাশির শব্দ তোহফাকে লজ্জা দিলো। কারণ সে যেভাবে তাকিয়ে ছিলো নিশ্চয়ই আওয়াদ তাকে ভ্যাবলাকান্ত মনে করেছে। ইসস, কী বিচ্ছিরি অবস্থা! আজ তার সাথে সকল বিচ্ছিরি পরিস্থিতি কেন হচ্ছে? তোহফা নিজেকে সংযত করে ফাঁকা চেয়ার টেনে বসলো। মাথা নিচু করে নিজের হাত নিজেই খুঁটতে থাকলো। যুদ্ধ করতে রইলো নিজের মন ও পল্লব জোড়ার সাথে। এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে সে জীবনেও পড়েনি। তোহফাকে আরো লজ্জায় ফেলে দেওয়ার জন্য ভদ্রমহিলা বললেন,

“বলেছি না আমার ছেলে দেখতে মাশাআল্লাহ সুন্দর। দেখলে মেয়ে তুমি চোখ ফেরাতেই পারছিলে না প্রথম দেখায়।”

ভদ্রমহিলার কথায় তোহফার অস্বস্তি দিগুণ বেড়ে গেলো। সে পারছে না এখান থেকে ছুট লাগিয়ে পালিয়ে যেতে। মহিলাটি জোর করে ধরে নিয়ে এসে এখন আবার লজ্জায় ফেলছে। তোহফার এমন অবস্থা দেখে আওয়াদ মুচকি হাসলো। মায়ের উদ্দেশ্য বললো,

” মা চুপ করবে? একে তো তুমি উনাকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছো। তার উপর এভাবে লজ্জা দিচ্ছো কেন? আসলে উনি মুগ্ধ হয়ে আমায় দেখছিলেন না। এটাই দেখছিলেন তুমি ছেলের জন্য যে এভাবে মেয়ে খুঁজতে বের হয়েছো আসলে, তোমার ছেলে পারফেক্ট কিনা। কি তাই তো মিস্?”

আকস্মিক প্রশ্নে থতমত খায় তোহফা। সে তৎক্ষনাৎ কিছু বলতে পারে না। কি বলবে তোহফা? আওয়াদ বুঝতে পারে তোহফার মনের অবস্থা। তাই সে প্রসঙ্গ দীর্ঘ না করে পাল্টে ফেলে। তোহফাকে জিজ্ঞেস করে,

“কি খাবেন বলুন। চা না কফি?”

“আমি বাড়ি যাবো।”

সহজ সরল স্বীকারোক্তিমূলক উত্তরে আওয়াদ মাথা চুলকায়। ভাবে সে তো জিজ্ঞেস করেছে কি খাবেন? আর উনি উত্তর দিচ্ছেন বাড়ি যাবেন। তার কথায় কি এটাই বুঝেছে মেয়েটা? থুতনির গোড়ায় চাপ দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে বললো,

“এভাবে চলে যাবেন! একটা কফি অন্তত খেয়ে যান।”

” না আমি বাড়ি যাবো। আমার মা কান্না করছে নাকি আমার ভাইয়া টেনশন করছে! আমি বাড়ি যাবো। আমি বাড়ি যাবো।”

বাড়ি যাবো বলেই তোহফা উঠে দাঁড়ালো। সাথে সাথেই তার বসে থাকা চেয়ারটি উল্টে পরে গেলো। চেয়ার পরে যেতেই আশেপাশের মানুষেরা তোহফার দিকে তাকালো। তোহফা আবারও লজ্জা পায়। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জোর পায়ে হাঁটা দিলো। আওয়াদ এর সাথে ওর মা অবাক হয়ে যায় তোহফার আচরণে। পাশে থাকা নীল ছাতাটা হাতে নিয়ে তোহফার পিছন পিছন ছুটে আওয়াদ। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছাতাটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

“বাহিরে তুমুল বৃষ্টি। ভিজে যাবেন যে। অন্তত ছাতাটা নিয়ে যান।”

এখুনি পালাতে হবে তোহফার। তাই কোনো রকম কথা না বাড়িয়ে সে আওয়াদের হাত থেকে ছাতাটা নিলো। হাতের সাথে কিঞ্চিৎ স্পর্শ পেতেই দুজনার হার্টবিট মাত্রাধিক বেড়ে যায়। দ্রুত ছাতাটা নিয়ে তোহফা বেরিয়ে এলো রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে। আওয়াদ চিৎকার করে বললো,

“নামটা প্লিজ বলে যান। এভাবে পালিয়ে গেলেন যে নামটা জানারও সুযোগ হলো না। ”

আওয়াদের স্পষ্ট ভাষায় নাম জানতে চাওয়ায় তোহফা না চাইতেও নিজের পা স্থির করলো। তবে সে পিছু না ফিরেই বললো,

“তোহফা।”

তোহফা সামনে এগিয়ে চলে গেলো। আওয়াদ সেখানে দাঁড়িয়ে বার কয়েক বিরবির করলো “তোহফা”। ওদিকে ঝুম বৃষ্টির গতির সাথে পা মিলিয়ে তোহফা হেঁটে চলেছে। মেলে রাখা ছাতাটায় একবার চোখ বুলাতে ভুললো না। একটা নীল রঙের ছাতা তাকে ছেলেটা উপকার হিসেবে দিয়েছে। তবে এটা স্বস্তিদায়ক নাকি বেদনাদায়ক তা বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে। নীল রঙ নাকি বেদনার রঙ? তাহলে ছেলেটা কি তাকে ব্যথা হিসেবে নীল রঙের ছাতা উপহার দিলো? এই ছাতাই কি তবে তার ব্যথা পাবার প্রথম ধাপ। না না, সে কি ভাবছে এসব আগডুম বাগডুম। তাঁকে স্থির হতে হবে। হতে হবে শান্ত। এই মুহূর্তে শান্ত হতে হলে তাকে বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। ছাতাটা বন্ধ করে তোহফা ভিজতে ভিজতেই বাড়ির পথে রওনা হলো। তবে সে খেয়াল করলো না একজোড়া চোখ তাকে গিলে খাচ্ছে। খুব গভীর ভাবে তার প্রতিটা শিরা-উপশিরার পরিমাণ মেপে নিচ্ছে আড়াল থেকেই। ভিজে জুবুথুবু হয়ে লেপ্টে যাওয়া বোরকাকে সে হাজারটা গালি দিচ্ছে কারণ তার চোখের ক্ষিদেটা পুরোপুরি মিটলো না যে।

ওদিকে আওয়াদকে ফিরে আসতে দেখে তার মা রেগে গেলেন। ছেলের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

” নিজের তো মুরোদ নেই মেয়ে পটানোর। আমি একটা পছন্দ করে নিয়ে এলাম তাও এমন অফার করলো যে পালিয়ে গেছে। তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।”

মুখ কালো করে কথাগুলো বললেন আওয়াদের মা সেলিনা বেগম। মায়ের কথায় আওয়াদ স্মিত হাসলো। সামনাসামনি বসে বললো,

“কি অফার করেছি? সামান্য চা আর কফিই তো? তোমার পছন্দ করা মেয়ে যে কফি আর চা-কে ভয় পায় আমি কীভাবে জানবো? তিনি যে ওভাবে চলে যাবে সেটাও বা কি করে জানবো বলো? আমি কী গুনি?”

“একদম বাজে বকবি না। মেয়েটা অনেক সুন্দর।”

“আমি কখন বললাম মেয়েটা অসুন্দর?”

“তাহলে খোঁজ নে মেয়েটা কোথায় থাকে? বাবা-মা, ভাই-বোন সকলের।”

“তুমি তো চিরুনী তল্লাশি চালাতে বলছো।”

“হ্যাঁ সেটাই।”

“এভাবে কারো অগোচরে খোঁজ নিলে গণধোলাই পরবে পিঠে।”

“পরলে খাবি ধোলাই। এই পর্যন্ত তো আমার হাতে একটা ম’রও খাসনি। এবার না হয় বউ খুঁজতে গিয়ে খাবি।”

“তুমি মা হয়ে ছেলেকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছো!তোমার ভয় করছে না?”

“ওমা! ছেলে বলে কী? বিপদ কোথায়? আমি রাজকন্যার কাছে পাঠাচ্ছি। রাজ্য আর রাজকন্যা জয় করতে হলে তো তোমায় যুদ্ধ করতেই হবে।”

“তোমার ওই রাজকন্যা আমার জন্য ভয়াবহ যুদ্ধ।”

” এটা ভালোবাসার যুদ্ধ। নরম হাতে তলোয়ার তুললে অসুবিধা হবে না, যদি তুমি তলোয়ার চালাতে পারো। ”

“তুমি আমার মা না বান্ধবী যে এভাবে ভালোবাসার সাজেশন দিচ্ছো? ”

“এস এস সি পরীক্ষার সময় আমি কীভাবে তোমায় হেল্প করেছিলাম এখন বলবো ওদের? সেদিন তো বড় মুখ করে বলেছিলে আজ থেকে তুমি আমার বান্ধবী হয়ে যাও। বান্ধবী হয়ে সাজেশন দিবে, মা হয়ে শাসন করবে। আজ সেসব ভুলে গেছো?”

“ভুল হয়েছে আর বলবো না। আচ্ছা মা তোমার না ভুলে যাওয়ার রোগ আছে তাহলে তুমি ওটা এখনো মনে রেখেছো কীভাবে ?”

“ওটা তোমার দুর্বলতা, যেটা আমি ভুলিনি। কি জানি কেনো।”

কথাটা বলেই সেলিনা বেগম মুখটা অন্য দিকে ফেরালেন। আর আওয়াদ সরল মুখ করে ভাবুক হয়ে ভাবতে রইলো, এতবড় শহরে তোহফা নামের মেয়েকে সে কীভাবে খুঁজবে। কাজল চোখের মায়াবী চেহারাখানা যে অদৃশ্য হয়ে গেছে চোখের পলকে। এবার উপায়?

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই তোহফা তার বাড়িতে পৌঁছায়। ভেজা শরীর নিয়ে সদর দরজার সামনে এসে কলিং বেল বাজাতেই তার বড় ভাবি ইলা দরজা খুলে দেয়। তোহফার এমন অবস্থা দেখে সে অবাক হয় না। কারণ অসময়ে বৃষ্টি বলে কথা। আগে থেকে জানা থাকলে নিশ্চয়ই ছাতা নিয়ে বের হতো। এমনিতেই আজ তার ভার্সিটির প্রথম দিন ছিলো। আনন্দ উচ্ছ্বাসে ভাসতে ভাসতে বের হয়েছিলো ঘর থেকে। কোনো দিক খেয়াল না করেই। কিন্তু অবাক হলো ননদের হাতে নীল রঙের ছাতা দেখে। হাতে ছাতা অথচ ননদী ভিজে জবুথবু হয়ে বাড়ি ফিরেছে। অবাক কান্ড! এবার ইলা খুব গভীর ভাবে তোহফাকে পরখ করলো। কিছুক্ষণ পরখ করে যা আবিষ্কার করলো সেটা হলো, তার ননদ ভীষণ রকমের অস্বস্তির মাঝে আছে। আর অস্বস্তির কারণ খুঁজতেই তিনি প্রশ্ন করলেন,

“ব্যাপারটা কি খুব সিরিয়াস ননদী? নদীর পানি বুঝি পুরোপুরি ঘোলাটে হয়ে গেছে?”

ভাবির রহস্যময় কথায় বেজায় বিরক্ত হলো তোহফা। হতাশ কন্ঠে বললো,

“দয়া করে মজা নিও না ভাবি। একেই ওমন একটা ঘটনা, তার উপর এভাবে বাড়িতে ফিরেছি। মা দেখলে নির্ঘাত আমায় সস বানিয়ে নুডলসের সাথে আজ খাবার টেবিলে পরিবেশেন করবে।”

তোহফার কথায় ইলা ভাবুক হয়ে বললো,

“কেমন ঘটনা ননদী? কেউ কি হার্টব্রেক করেছে নাকি গাড়ি ব্রেকফেল করেছে?”

“আবারও মজা করছো?”

“না, না এই যে মুখে কুলুপ এঁটেছি আর কিচ্ছুটি বলবো না। তবে আমার হাতটা আজ সকাল থেকেই কেনো জানি চুলকাচ্ছে। মনে হচ্ছে কিছু পাবো।”

ইলার কথার মানে ভালোই বুঝলো তোহফা। ভুল করে বাড়িতে ফিরলে তাকে তার মায়ের থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব থাকে ইলার। আজও সে ভুল করেই বাড়িতে ফিরেছে। সেই ভুল হলো বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা। আর এই ভুল থেকে বাঁচানোর জন্য ঘুষ হিসেবে ইলা তার পছন্দের আইসক্রিম অথবা চকলেট নেয়। তবে আজকে ওই মাত্রাধিক সুন্দর দেখতে সুপুরুষের কথা চিন্তা করতে করতে বাড়িতে ফেরায় আনতে ভুলে গেছে। এখন উপায়? কিছু একটা ভেবে বললো,

“ভুলে গেছি তোমার পাওনা আনতে। বিকালে একসাথে দুটো চকলেট কিনে দিবো। এখন ঘরে যাই প্লিজ। মা এভাবে দেখলে আমাকে যে আস্ত রাখবে না ভাবি।”

“ওকে। রাজি তবে একটা শর্ত আছে।”

“শর্ত! আবার কি শর্ত?”

“আজ হঠাৎ বৃষ্টিতে ভেজার আসল কারণ কি? সেটা বলতে হবে।”

“কোনো কারণ নেই ভাবি।”

“উঁহু মানছি না। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। আর সেটা গুরুতর কোনো কারণ। ”

“আচ্ছা ভাবি, একটা কথা বলবে?”

“কি কথা।”

“ভাইয়ার সাথে বিয়ে হওয়ার আগে তুমি কি গোয়েন্দা দপ্তরে তদন্তের কাজ করতে? ”

“করতাম মনে হয়। এখন এই মুহূর্তে মনে পরছে না। তুমি চিন্তা করো না। আজ রাতে বালিশে মাথা দিয়ে মনে করার চেষ্টা করবো। আর যদি মনে পড়ে যায় আমি কথা দিচ্ছি রাত যতোই গভীর হোক না কেন আমি তোমাকে ডেকে জানাবো।”

“উফ! তুমি আমার জ্বর বাঁধিয়েই ছাড়বে দেখছি।”

“ও ভুলেই গেছি। যাও, যাও ঘরে গিয়ে পোশাক পাল্টে গোসল করে নাও। মা নামাজে দাঁড়িয়েছে। একটু পরই সবাইকে খাবারের জন্য ডাকবে। তোমার দেরি হলে নিশ্চিত আজ তোমার গর্দান নিয়ে নিবে।”

“কিছু জিজ্ঞেস করেছিলো?”

“না”

“বাঁচলাম। ”

“আজ্ঞে জি না। পুরোপুরি বাঁচোনি। ঘর থেকে যাবার আগে মায়ের পার্স থেকে যে দুইশো ছাপ্পান্ন টাকা গায়েব করেছো, সেটার জন্য মা বাড়িতে তুলকালাম করেছে। বাবাকে পই পই করে বলেছে তোমার জন্য পাত্র দেখতে। তোমার মতো মেয়ে বেশিদিন এ বাড়িতে তিনি রাখতে চায় না।”

“এইরে! সেরেছে। মা টের পেয়ে গেছে?”

“পাবে না বলছো! সকালে সবজিওয়ালা এসেছিলো তাজা সবজি নিয়ে। মা বেছে বেছে সবজি কিনে টাকা নিতে গিয়ে দেখে পার্সে মাত্র দু টাকার একটা নোট ছাড়া কিছু নেই। ব্যাস তারপর? তারপরের সবটা ইতিহাস। ”

“সবর্নাশ করেছে! বলছো কী? নিশ্চয়ই মাকে হালিমা কাকি টাকা ধার দিয়েছে অবশেষে?”

“হুম।”

“নিশ্চয়ই বলেছেন, আমার মতো মেয়ে ঘরে রেখে লাভ নেই। পরের আমানত পরের হাতে তুলে দিয়ে যেনো তারা হাত-পা ঝাড়া হয়ে যায়। তার জানা মতে একটা ভালো ছেলে আছে, মা চাইলেই তাদের আসতে বলবেন। এমনকি তাঁহাদের পছন্দ না হলে তিনি তার আপন একমাত্র ভাইপোর সাথে আমার বিয়ে দিবেন। মেয়ে যতোই খারাপ হোক এটা তো আর লোক জানাজানি করা যায় না।”

“সেটা আর বলতে! এগুলো তো তার পুরাতন ডায়লগ যা রোজ মাকে দেন তিনি।”

“এবার উপায়, ভাবি?”

ভাবি বলেই ড্রইংরুম কাঁপিয়ে তোহফা হাঁচি দিলো। হাঁচির আওয়াজ পেয়ে ঘর থেকে জাহানারা বেগম চিৎকার করে বললেন,

“কে হাঁচি দিলো ইলা? তোহফা নাকি? নিশ্চয়ই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়িতে ফিরেছে?”

জাহানারা বেগমের কড়া সুরের বাক শুনে তোহফা ঠকঠক করে কাঁপতে রইলো। মুখে হেজাবের কোণা কামড়াতে কামড়াতে বললো,

“আমি আজ শেষ ভাবি। আমাকে বিয়ে নামক বলি থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।”

“চুপচাপ ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হও। আমি দেখছি।”

তোহফা দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেলো। অন্য দিকে ইলা শাশুড়ী মায়ের উদ্দেশ্য গলা ছেড়ে বললো,

“মা আমি হাঁচি দিয়েছি। নাকের ভেতরে সুরসুর করছে, তাই হাঁচি দিলাম। ”

ছেলের বউয়ের গলা পেয়ে জাহানারা বেগম আবারও বললেন,

“তোমার সহজ সরল ননদী কি বাড়িতে ফিরেছে?”

“হ্যাঁ মা ফিরেছে তো। অনেক আগেই ফিরেছে। আপনি নামাজ পড়তে ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই ফিরেছে।”

ইলা কথা বলতে বলতেই শাশুড়ী মায়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ওকে দেখে জাহানারা বেগম বললেন,

“খাবার দাও টেবিলে। এখুনি সবাই খেতে চলে আসবে। সময় তো কম হলো না।”

“জি মা দিচ্ছি।”

“আর শোনো।”

“জি মা।”

“তোমার সহজ সরল ননদীকে বলো খাবার খেয়ে যেনো একটা নাপা এক্সট্রা খেয়ে নেয়। না হলে জ্বর আসতে পারে।”

“কেনো মা?”

“তুমি ভুলে যাও, আমরা তোমাদের পেটে নিয়েছি। তোমরা আমাদের নাওনি। এই ভারি বর্ষণে ছাতা ছাড়া মানুষ ভিজতে ভিজতে বাড়িতে ফেরে। তোমার ননদ কি আগে থেকে জানতো নাকি দুপুর নাগাদ বৃষ্টি হবে। জানতো না তো? এই জন্যই ছাতা নিয়েও যায়নি। অবশেষে কি হয়েছে? বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই বাড়ি ফিরেছে। অবশ্য এটা তুমি না জানালেও আমি জানি। তোমার মতো আমি তো তাকে মাথায় নিয়ে নাচি না।”

শাশুড়ী মায়ের কথায় আর কোন টু শব্দ করলো না ইলা। তার শাশুড়ী মা বেজায় একজন গম্ভীর মানুষ। সব সময় গম্ভীরতা মুখে বজায় রাখে। অন্য দিকে তার শ্বশুর মশাই একজন দিলখোলা মানুষ। হাসিঠাট্টা, গল্প করেই মানুষের সাথে অল্পতেই মিশে যেতে পারে। শাশুড়ী মায়ের মতো হয়েছে তার স্বামী তৌসিফ। একদম মায়ের কার্বনকপি। পুরুষ লিঙ্গ বাদ দিলে মায়ের সব কিছুই সে পেয়েছে। সে ভেবে পায় না এই দুই গম্ভীর মানুষের সাথে কি করে ওমন মিশুক শ্বশুর, দেওর আর ননদ ছিলো এতোদিন। তবে ইলা শুনেছে তৌসিফ গম্ভীর হলেও বোনের বেলায় তার সব কিছু কিছুটা ভিন্ন। এই যে এখনো এতো বড়ো বোনকে নিয়ে মাঝে মধ্যে বাহিরে বের হয়। বোনের শখের খাবার থেকে শুরু করে শপিংটা পর্যন্ত করে দেয়। সত্যি বলতে তার বর যতোই গম্ভীর হোক না কেন দায়িত্ব পালনের বেলায় একশো ভাগ নিশ্চিত। এই যে তার পিরিয়ডের ডেট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো একদিন বা দু’দিন আগেই এনে রাখে। তার বাবা-মায়ের একটু অসুস্থার খবর শুনতেই বিনাবাক্যে তাকে বাপের বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দেয়। কখনো কোনো ভুল হলে পরিবারের থেকে ঠিক তার স্ত্রীকে বাঁচিয়ে নেয়। বউয়ের সাথে কখনোই মাকে গুলিয়ে ফেলে না। যখন যার যেটা দরকার তখনই তাকে সেটা দিয়ে দেয়। একজন বড় সন্তান হিসেবে সে উৎকৃষ্ট। একজন বড়ো ভাই, ভাসুর, স্বামী সব দিক থেকে সে মাশাআল্লাহ। শুধু স্বামী কেনো, এই পরিবারের প্রতিটা সদস্য যেনো নিজ নিজ জায়গায় নিখুঁত মানুষ। ননদ,শাশুড়ী, দেওর, জা সবাই নিজের জায়গা থেকে ভালো মনের মানুষ। ইলা মাঝে মাঝেই আফসোস করে শুধু নিজের অক্ষমতার জন্য। তবে এই পরিবারের একটা মানুষও তাকে তার অক্ষমতার জন্য চোখ তুলেও কখনো কথা বলেনি। প্রতিদিন সে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে এমন একটা পরিবার তাকে উপহার দেওয়ার জন্য। নিজের ভাবনায় মশগুল থাকায় সে খেয়াল করেনি তার শাশুড়ী জায়নামাজ তুলে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। জাহানারা বেগম ইলার কাঁধে হাত রাখতেই ইলা লাফিয়ে উঠে। জাহানারা বেগম কিঞ্চিৎ হাসে। প্রশ্ন করে,

“আবারও সবাইকে নাম্বার দেওয়া শুরু করছো ইলা?”

ইলা সামান্য চমকায়। এই মানুষটা কীভাবে যেন তার মনের খবর ধরে ফেলে। একজন মা যেমন সন্তানের মনের খবর পড়তে পারে তিনি ঠিক তেমনই। ইলা মাথা ঝাঁকিয়ে না বলতেই জাহানারা বেগম বললেন,

“আচ্ছা তোমার হিসেবের খাতায় আমায় রোজ কতো নম্বর দাও, বলো তো শুনি?”

ইলা সামান্য হেসে জবাব দেয়

“১০০।”

জাহানারা বেগম আবারও হাসেন। তাঁকে হাসতে দেখে ইলা বলে,

“আপনি হাসলে খুব সুন্দর দেখায়, সেটা কি আপনি জানেন মা?”

“জানি।”

“তাহলে সব সময় হাসেন না কেনো?”

“সবাই হেসে উড়িয়ে দিলে সংসারের কঠিন সময়ে কে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে খুঁটির মতো। শুনে রাখো, তোমরা সবাই এতো হাসিখুশি থাকো বলেই আমাকে সব সময় গম্ভীরতা নিয়ে চলতে হয়। কারণ কখনো শুভ্র নির্মল আকাশে ঝড় উঠলে তোমরা ভেঙে পরলে যেনো আমি সামলাতে পারি।”

“আপনি অনেক সুন্দর কথা বলেন মা।”

“ননদের পক্ষ নেওয়া এবার একটু কমাও। আমাকে ইমপ্রেস করে ইমোশনাল বানিয়ে তার অন্যায় ঢাকতে পারবে না। যাও সবাইকে ডাকো আমি খাবার বাড়ছি।”

ইলা মাথা চুলকায়। সত্যি বলতে তার শাশুড়ীকে একটু ইমোশনাল করতে চেয়েছিলো, যেনো ননদকে না বকে। তবে তার বলা কথাগুলো সত্যি কিন্তু৷ মানুষটা তার মায়ের থেকেও একটু বেশিই ভালো। ইলা খাবার টেবিলে গিয়ে খাবার সাজাতে থাকে। এর মধ্যেই একে একে খাবার টেবিলে সবাই উপস্থিত হয়। প্রথম সারিতে চেয়ার টেনে তৌসিফ বসে। পাশেই তার ভাই তৌহিদ এবং তার স্ত্রী লিমা। জাহানারা বেগম এবং ইলা খাবার পরিবেশেন করছে। তোহফা এখনো খাবার টেবিলে এসে বসেনি। তৌসিফ গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে ইলাকে প্রশ্ন করে,

“তোহফা কই ইলা?”

“গোসল করছে। এখনি চলে আসবে। তোমরা শুরু করো।”

ইলার ঝটপট উত্তর। তৌসিফ আবারও ইলাকে বলে,

“তোমার ফোন অনবরত বেজে যাচ্ছে। গিয়ে রিসিভ করো, না হলে কলব্যাক করো। মনে হচ্ছে অনেক জরুরি কল।”

“তুমি রিসিভ করতে।”

“না। তুমি গিয়ে দেখো কে কল করেছে।”

“আচ্ছা।”

ইলা কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। ঘরে ঢুকেই দেখে ফোনটা বাজতে বাজতেই কেটে গেছে। হাতে ফোনটা নিয়ে দেখলো একটা অচেনা নাম্বার থেকে বত্রিশবার কল এসেছিলো। ইলা ভারি অবাক হলো এমন কান্ড দেখে। তার জানামতে এটা পরিচিত কারো নাম্বার নয়, তাহলে? কলব্যাক করার আগে আবারও ফোনটা বেজে উঠে হাতের মধ্যেই। ইলা রিসিভ করে।

“আসসালামু আলাইকুম। ”

“ওয়ালাইকুমুস সালাম। ”

“জি কাকে চাই?”

“আসলে আমি একটা ফোন পেয়েছি, যেটা এই মুহূর্তে আমার কাছে। ফোনের ইমারজেন্সি বাটনে ক্লিক করতেই আপনার নাম্বারটি পেলাম। কিন্তু ফোনটা কার এটা আমি জানি না। সন্দেহ হচ্ছে একজনের হতে পারে। তবে তার হলেও আমি তার ঠিকানা বা অন্য কিছু জানি না। আর সন্দেহ থেকে তো সব সময় কিছু করা যায় না। তবে ফোনের রঙ হচ্ছে কালো এবং কভারে পুতুলের ছবি আছে। আর কিছু জানতে পারিনি কারণ ফোন লক করা।”

ইলা চিন্তিত হয়ে ভাবে ফোনটা কার? সে বুঝতে পারলো না। তাই সে নিজের কললিস্ট চেক করলো, আজ সকাল থেকে কাদের সাথে কথা বলেছে। অবশেষে তার মনে পরলো ফোনটা আর কারো নয়, তোহফার। ইলা ফোনের লাইনটা না কেটেই ছুটলো তোহফার রুমে। রুমের সামনে এসে টোকা দিতেই তোহফা ভেতর থেকে আওয়াজ দিলো,

“আমি আসছি ভাবি দু’মিনিট। ”

“দু’মিনিট সেটা পরে হবে, আগে বলো তোমার ফোন কোথায়?”

ফোনের কথা শুনতেই তোহফা নিজের হ্যান্ডব্যাগ, পার্স, টেবিল, বিছানা সব জায়গায় খুঁজতে থাকে। অবশেষে না পেয়ে চটজলদি দরজা খুলে বেরিয়ে এসে ইলার মুখোমুখি হয়ে বলে,

“তুমি পেয়েছো ফোন? ঘরের কোথাও দেখছি না তো।”

“আমি না এই ভদ্রলোক পেয়েছেন। তিনি ইমারজেন্সি বাটনে চাপ দিয়ে আমার নাম্বার পেয়েছে তাই আমাকেই কল কর—

” ইলা কোথায় তুমি এদিকে এসো। মা ডাকছে।”

ইলা কথা শেষ করার আগেই তৌসিফ ডেকে উঠলো। ইলা কোনোমতে তোহফার হাতে ফোনটা গুঁজে দিয়েই ভৌ দৌড়। তোহফা ধীরে ধীরে কানে ফোন তুলে বললো,

“আসসালামু আলাইকুম। ”

“ওয়ালাইকুমুস সালাম। আমার ধারণা ভুল না হলে আপনি তোহফা?”

তোহফা ভদ্রলোকের কথায় চমকে উঠলো। মনে মনে অনেক কিছু ভেবেই তার মন শিউরে উঠলো। ফোনকলে যদি সত্যি সত্যি ওই আওয়াদ নামের সুপুরুষটি থেকে থাকে তবে এবার নিশ্চিত তোহফা হার্টঅ্যাটাক করবে। এবার তাকে আর কেউ রক্ষা করতে পারবে না হার্টঅ্যাটাক করা থেকে। কাঁপা কাঁপা গলায় তোহফা বললো,

“আপনি আওয়াদ?”

“হুম।”

“হুম” শব্দটা তোহফার কর্নকুহুরে যেতেই তোহফা বরফের মতো জমে গেলো। ঢিপঢিপ করে ঢোল পেটাতে শুরু করলো হৃৎপিন্ড। বারকয়েক বিরবির করে আওয়াদ নামটা উচ্চারণ করলো শুকনো ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নির্লিপ্ত দৃষ্টি মেলে ফোন নাম্বারে চোখ বুলিয়ে নিলো। হঠাৎ করেই তোহফা উপলব্ধি করলো তার চারিপাশ অন্ধকারে আবৃত হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আওয়াদ বলিষ্ঠ কন্ঠে আবারও বললো,

“তোহফা কথা বলুন।”

ব্যাস, আর কিছু শুনতে পেলো না। তার আগেই তোহফা নিস্তেজ হয়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পরলো। হাত থেকে ফোনটা ছিটকে নিচে পরে তোহফার মাথার কিঞ্চিৎ দূরেই ফোনটা পরে রইলো অবহেলায়। ফোনকলের ওপাশ থেকে আওয়াদ বলতে রইলো,

“তোহফা শুনছেন, তোহফা শুনতে পাচ্ছেন? তোহফা কথা বলুন।”

তবে তোহফার কোনো উত্তর ওপাশ থেকে পেলো না। আওয়াদ চুপ করেনা থেকে অনবরত বলতে রইলো রইলো “তোহফা আপনি কি আমায় শুনতে পাচ্ছেন না? তোহফা কিছু বলুন।” কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা পালন করলো। অবশেষে আবারও কিছু বলতে চাইতেই শুনতে পেলো কেউ বলছে,

“তোহফা কি হয়েছে তোমার?”

তবে তোহফার কোন উত্তর পেলো না ইলা। চিৎকার করে তার শাশুড়ীকে ডাকলো।

“আম্মা, তোহফা সেন্সলেন্স হয়ে পরে আছে। শরীরে অসম্ভব জ্বর শীঘ্রই আসুন।”

ইন শা আল্লাহ চলবে…..