অতঃপর গল্পটা তোমার পর্ব-০৭

0
181

#অতঃপর_গল্পটা_তোমার
সমুদ্রিত সুমি

ঘড়ির কাঁটা জানান দিলো এখন সে রাত নয়ের ঘরে যাবে। তোহফা নিজের হুঁশে আসে। সে বুঝতে পারে আজ তার বাড়িতে গেলে খবর আছে। আর কেউ খবর করুক বা না করুক তার মা নিশ্চিত তার খবর করবে। সে চটজলদি নিজেকে সামলে নেয়। আওয়াদ হাঁটছে আপন মনেই। কয়েক মুহূর্ত আগের কথা মনে পড়তেই তোহফার শরীরে বয়ে যায় শীতলতা। কোনোমতে নিজেকে আওয়াদের প্রশ্ন থেকে বাঁচিয়ে নিলেও ছেলেটা কেমন যেনো আনমনা হয়ে আছে। হয়তো ভাবছে তোহফাকে আর কখনো সে এভাবে পাবে না। তোহফা আওয়াদের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য আস্তে করে উহুম করে উঠলো। আওয়াদ পাশ ফিরে তাকিয়ে মাথা তুলে ইশারা করলো কি? তোহফা হাত ঘড়ির দিকে নজর রেখে ইশারা করলো সময় দেখার জন্য। আওয়াদ হাত ঘড়িতে চোখ বোলাতেই মনে মনে বললো,

“কিছু সুন্দর মুহূর্ত এতো দ্রুত কেনো চলে যায়? মনে তো হলো এই একটু আগে মেয়েটা তার কাছে এলো এখনি নাকি চলে যাবে। ইচ্ছে হলো তোহফাকে বলতে থেকে যাও আর কিছুটা সময়। তবে চাইলেও বলা যায় না সব কিছু।”

নিজের মনকে বুঝিয়ে তোহফার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আওয়াদ বললো,

“বিরহের যন্ত্রণা পেতে হবে ভেবেই প্রেম ভালোবাসা আমার কাছে বিরোক্ত ছিলো। আজ মনে হচ্ছে তাদের বিরক্ত ভেবেছি বলেই হয়তো তারা আমাকে এভাবে শাস্তি দিলো।”

তোহফা আওয়াদের কন্ঠে প্রচন্ড পরিমাণের ব্যথা অনুভব করলো। তোহফা কিছু বলতে উদ্যোগ হ’য়েও থেমে যায়। কিছু একটা ভেবে বলে,

“অনেক সময় পেরিয়ে গেছে এবার আমাকে বাড়িতে যেতে হবে। আরো দেরি করলে ভীষণ রকমের দেরি হয়ে যাবে।”

তোহফার কথায় আওয়াদ মাথা দুলায়। চারিদিকে তাকিয়ে একটা রিক্সা দাঁড় করায়। যথারীতি তোহফা রিক্সায় উঠে বসে। ধীরগতিতে রিক্সা চলতে শুরু করতেই তোহফা পিছু ফিরে আওয়াদের উদ্দেশ্য বলে,

“শুনুন অতি ভদ্র ছেলে আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই। আমি একটু মজা করতে চেয়েছিলাম আপনার সাথে। তবে এখন মজার চেয়ে অনুশোচনা হচ্ছে বেশি। আমি কি করে বুঝবো বলুন এই ভদ্র ছেলেটা আমাকে এতো ভালোবাসে। খুব শীগ্রই বর সেজে আমাদের বাড়িতে চলে আসুন, আমি বউ হয়ে অপেক্ষা করবো না-হয় । ও হ্যাঁ, আরো একটি কথা! একটু ভদ্র, একটু অসভ্য সব মিলিয়ে মাশাআল্লাহ আপনি ভিষণ কিউট। আমি রাজি, আপনি চাইলে খুব তাড়াতাড়ি চলে আসুন আমার বাড়িতে সাথে নিয়ে কাজী।”

তোহফার স্পষ্ট ভাষায় বলা প্রতিটা কথা আওয়াদের হৃদয়ের স্পন্দন বারিয়ে দিলো। সে কোনো দিক না তাকিয়ে একছুটে তোহফার রিক্সার নিকট ছুটে আসতে রইলো, আর মুখে বলতে রইলো,

“ওহে কাজল চোখের মেয়ে আরো একটু হলে তো আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। তুমি আমাকে খুন করার ফন্দি আঁটতে এমন নিখুঁত অভিনয় করলে আজ তো তোমার আরো কিছু শাস্তি পাওয়ার আছে। আমি না-হয় আরো কিছু ভুল করে ফেলি।”

আওয়াদের এমন পাগলামিতে তোহফা মুখ চেপে নিজেকে সামলে নিচ্ছে। কোনোমতে রিকশাওয়ালাকে বললো,

“মামা একটু থামুন।”

রিক্সা থেমে গেলো আর ঠিক তখনই আওয়াদের ছুটে আসা পা জোড়া থেমে গেলো দুম করেই। আওয়াদ পিচঢালা রাস্তায় হুমরি খেয়ে পড়লো । আওয়াদের গা ঘেঁসে শা শা বেগে ছুটে গেলো এক কালো রঙের বাইক, যেটা মাত্রই আওয়াদকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আওয়াদ যন্ত্রণায় ওখানেই ছটফট করতে রইলো। তোহফা আওয়াদের এমন করুন পরিণতি দেখে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে শুরু করলো রিক্সা থেকে নেমেই। আশেপাশের অনেকেই ছুটে এলো আওয়াদের কাছে। আর আওয়াদ ডান হাত আর পায়ের গোড়ালির ব্যথায় ছটফট করতে রইলো ধুলোপড়া পিচঢালা রাস্তায় গড়াগড়ি করতে করতেই। ধুলোমাখা রাস্তায় টকটকে লাল রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠলো।

বিছানার কোণে পড়ে থাকা ফোনটা অনবরত বেজে চলেছে ইলার। ইলা সেটা দেখে তৌসিফের বাঁধন থেকে ছুটে আসার জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে শুরু করলো সেটা দেখে তৌসিফ বিরোক্ত কন্ঠে বললো,

“দিনকে দিন তুমি আনরোমান্টিক হয়ে যাচ্ছো ইলা। এতো আনরোমান্টিক হলে হয় বলো তো। জড়িয়ে আছি একটু শান্তিতে জড়িয়ে থাকতে দাও। তুমি জানো না বউকে জড়িয়ে রাখলে অর্ধেক কষ্ট দূর হয়ে যায়! বাকি অর্ধেক যায় বউ আদর করলে। করো না একটু আদর। বেশি না একটা লম্বা চুম্বন করলেই হবে।”

নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ইলা নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো তৌসিফের থেকে। মুখ ভেটকে বললো,

“ভাব করো না, তোমার ভাব দেখলে মরে যা-ই। ফোনটা বাজছে যে অনবরত সেটা কি তুমি শুনতে পাচ্ছো না? সময় নেই গোমোয় নেই বাবু এক্কান হাফ টিকিট দিবেন।”

“ফোন বাজছে আর তো কিছু না। আর ব্যাটা ফোনটাও বউকে ভালোবাসার সময় ডিস্টার্ব করে। ধ্যাত্তেরি, ভালো লাগে না।”

“ভালো লাগা দিয়ে কাজ হবে না, গিয়ে দেখো তোহফা এসেছে কি-না আমি ফোনটা আগে রিসিভ করি।”

ইলা ফোনের দিকে এগিয়ে গেলো। ফোনটা হাতে নিয়েই মুচকি হাসলো। কারণ ফোনটা তোহফা করেছে। তৌসিফের দিকে তাকিয়ে ইলা হাসতে হাসতে বললো,

“দেখো ম্যামের নাম নিলাম আর ম্যাম হাজির। আমাদের তোহফা রাজকন্যা ফোন করেছে।”

ইলা কথা বলতে বলতেই ফোনটা রিসিভ করলো, হ্যালো বলার আগেই তোহফার কান্নারত কন্ঠ ভেসে এলো ফোনের ওপাশ থেকে।

“ভাবি আওয়াদ, আওয়াদ এক্সিডেন্ট করেছে। আমি কি করবো ভাবি বুঝতে পারছি না, তোমরা এখনি আসো। আমার ভয় করছে। উনার হাত, মাথা থেকে অনেক রক্ত পড়ছে ভাবি প্লিজ কিছু করো, আমি পারছি না রক্ত সহ্য করতে প্লিজ তোমরা দ্রুত চলে আসো।”

ফোনটা লাউডস্পিকারে ছিলো তাই বোনের এমন করুন কন্ঠ তৌসিফের কান এড়ালো না। সে দ্রুত ইলার হাত থেকে ফোনটা কেঁড়ে নিলো।

“বোন আমার, সোনা বোন কিচ্ছু হবে না। তুই শুধু বল এই মুহূর্তে তোরা কোথায়। সোনা পাখি আমার একটুও ঘাবড়ে যাবি না। আমি এক্ষুনি আসছি। ভাইয়া আসছি তো চিন্তা করিস না। তুই শুধু বল তোরা কোথায়?”

“আমরা নিরালায় ঝিলের পাড়েই আছি ভাইয়া তুমি জলদি চলে আসো। উনি, উনি অনেক কষ্ট পাচ্ছে। কেমন কাতরাচ্ছে উনি আর অনেক রক্তও ঝড়ছে কিছু করো ভাইয়া তুমি। কিছু করো।”

“সোনা পাখি শান্ত হ। তোর পাশে কাউকে ফোনটা দে আমি কথা বলছি। আর একটুও ভয় পাবি না! আমার বোন না অনেক সাহসী। জান আমার একটুও ভয় পাবি না। আমি দ্রুত আসছি। তুই কারো কাছে ফোনটা দে।”

তোহফা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়স্ক লোকের হাতে ফোনটা তুলে দিতেই তিনি বিনাবাক্য ফোনটা কানে তুলে নিলো। কিছুক্ষণ কথা শেষ হতেই তারা সকলে মিলে একটা গাড়ি থামিয়ে আওয়াদকে ধরাধরি করে তুলে দিলো। সাথে সে-ই মধ্যেবয়স্ক লোকটাও উঠলো। অন্য দিকে দ্রুত একটা শার্ট গায়ে দিয়েই তৌসিফ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। বাবাকে চিৎকার করে ডাকতেই তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। আরিফুল ইসলামের পিছুপিছু জাহানারা বেগমও বেরিয়ে এলেন। ছেলেকে বিবর্ণ দেখে আরিফুল ইসলাম জিজ্ঞেস করলেন,

“কি হয়েছে, কোনো সমস্যা?

” বাবা আওয়াদ এক্সিডেন্ট করেছে তোহফা কাঁদছে। আমাদের এখনি হাসপাতালে যেতে হবে। আমি একজনের সাথে কথা বলে তাকে বলেছি তিনি যেনো একটু হাসপাতালে নিয়ে যায় ওদের, চলো এখনি আমাদের বেরোতে হবে ।

“এক্সিডেন্ট। তোহফা, তোহফা কেমন আছে?”

অস্থির হয়ে প্রশ্ন করলেন জাহানারা বেগম। তাকে আশ্বাস দিয়ে তৌসিফ বললো,

“তোহফা ঠিক আছে এটাই যথাক্রমে বুঝলাম ওর সাথে কথা বলে। তবে যতোটুকু বুঝলাম আওয়াদ হয়তো ইনজিউর হয়েছে। চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“ঠিক হয়ে যাবে কি বলছিস। তুই কি ভুলে গেছিস আমার মেয়েটা রক্ত দেখতে পারে না। উদ্বেগজনিত সমস্যা আছে ওর। তোহফার স্পেসিফিক ফোবিয়া আছে। রক্ত বা কাটাছেঁড়া দেখলে ওর ভেতরে অতি উদ্বেগ তৈরি হয়, যা ওকে আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, এমনকি ও জ্ঞানও হারাতে পারে।”

“মা আমি ভুলে যায়নি। ওই মধ্যেবয়স্ক লোকের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম এক্সিডেন্টটা হয়েছে না হলেও দশ মিনিট। তোহফা এখনো জ্ঞান হারায়নি, তারমানে আর কিছুক্ষনে কিছুই হবে না বিশ্বাস করো। আমাদের এখন যেতে হবে যেতে দাও কথা বাড়িও না। ইলা মায়ের দিকে খেয়াল রেখো। আর ফোন কাছে রেখো আমি খবর দিবো। ”

তৌসিফ আর আরিফুল ইসলাম বেরিয়ে পড়লেন হাসপাতালের উদ্দেশ্য। আর জাহানারা বেগম নীরবে চোখের জল বিসর্জন দিতে রইলেন। ইলা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে শাশুড়ী মা’কে সামলে নিতে। তার ক্রমশ চিন্তা হচ্ছে তোহফা ঠিক আছে তো? আর আওয়াদ তার বেশি ক্ষতি হয়নি তো? আল্লাহ আপনি শিফা দান করুন। আমিন।

আওয়াদকে হাসপাতালে নিয়ে আসতেই তার চিকিৎসা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে তোহফার অবস্থা শোচনীয়, কেঁদেকেটে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে সে। তোহফাদের সাথে আসা সে-ই ভদ্রলোক তাকে বারবার শান্ত হতে বলছে তবে কে শোনে কার কথা তোহফা নিজের কান্না কন্ট্রোল করতেই পারছে না। অন্যদিকে একরাশ চিন্তা নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকলো আরিফুল ইসলাম ও তৌসিফ। রিসেপশনে খোঁজ করে তারাহুরো করে দ্বিতীয় তলায় এসে দাঁড়ালো তারা। মাথা নিচু করে তোহফা তখনও কাঁদছে। মেয়েকে এভাবে ভেঙে যেতে দেখে আরিফুলের বুকে চিনচিন ব্যথা হলো। তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন মেয়ের নিকট। বাবা-র দেখাদেখি তৌসিফও এগিয়ে গেলো। আরিফুল ইসলাম মেয়ের সামনে যেতেই তোহফা চোখ তুলে তাকালো। বাবা ও ভাইকে দেখে তার কান্না কয়েক গুন বেড়ে গেলো। বাবাকে জড়িয়ে সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। এতো কান্না দেখে তৌসিফ বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো আর বললো,

“এভাবে কাঁদে না সোনা বোন আমার। পাখিটা এভাবে কাঁদলে মানুষ বকবে তো তাকে ?”

ভাইয়ের কথায় এবার বাবাকে ছেড়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরলো তোহফা। তোহফা আরিফুল ইসলামকে ছেড়ে দিতেই তিনি সে-ই ভদ্রলোকের সাথে কথা বলতে এগিয়ে গেলেন। অন্যদিকে বোনকে সামলাতে ভালোই বেগ পেতে হচ্ছে তৌসিফের। তৌসিফ আবারও বললো,

“এমন কান্নাকাটি করলে কিন্তু বাড়িতে নিয়ে যাবো বলে রাখলাম।”

ভাইয়ের কথায় তোহফা চোখ তুলে তাকালো। তৌসিফ চোখের ইশারায় বোঝালে সত্যি বলছে সে। তোহফা মাথা নাড়িয়ে বোঝালো সে যাবে না। তৌসিফ বললো,

“তাহলে কান্না থামা।”

তোহফা নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলো তবে তার চোখের জল পড়া থামাতে পারেনি। ভাইকে কিছু বলতে চেয়েও সে বলতে পারলো না। তৌসিফ বোনের মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে বললো,

“চিন্তা করেনা সোনা বোন আমার সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন আগে শান্ত হয়ে বলো কি হয়েছিলো।”

তোহফা শান্ত হয়ে কিছুক্ষণ নিজের মাঝে কথা সাজিয়ে নিলো। তারপর বলতে শুরু করলো,

“আ-আমি রিক্সায় ছিলাম, উনি রিক্সার দিকে দৌড়ে আসছিলেন ঠিক তখনই হঠাৎ একটা বাইক উনাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। ভাইয়া উনার মাথা অনেক খানি ফেটে গেছে পায়ে হাতে ব্যথা পেয়েছে। ভাইয়া উনার কিছু হবে না তো উনি ঠিক হয়ে যাবে তো?”

কথা শেষ করেই আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লো তোহফা। বোনকে বুকে টেনে নিয়ে তৌফিক বললো,

“ইনশাআল্লাহ কিছু হবে না, আল্লাহ ভরসা। বাইকের লোকটাকে কেউ ধরতে পেরেছে? ”

“না, পালিয়ে গেছে ধরার আগেই। ”

“শোন আওয়াদের কিছু হবে না, হয়তো আঘাত পেয়েছে! কিছুদিন রেস্ট আর ভালো সেবাযত্ন পেলে ও সুস্থ হয়ে যাবে দেখিস।”

” মিস্টার আওয়াদের বাড়ির লোক কে আছেন এখানে?”

হঠাৎ ভাই বোনের কথার মাঝে একজন নার্স চিৎকার করে কথাগুলো বলে উঠলেন। তোহফা ও তৌসিফ ছুটে তার সামনে দাঁড়ালো।

“আমরা, আমরা আছি কি হয়েছে? উনি সুস্থ হয়ে যাবে তো?”

তোহফার পরপর প্রশ্নে বিরক্তবোধ করলেন নার্স। তিনি কপালে সরু ভাজ ফেলে বললেন,

“উনার মাথায় বেশি আঘাত না হলে-ও ডান পায়ে উনি বেশ আঘাত পেয়েছে। বাম হাতের হাড় ফেটে গেছে সাথে ডান পা মোচকে গেছে। সুস্থ হতে কম হলে-ও মাসখানেক সময় লাগবে। আমাদের যা চিকিৎসা দেওয়ার দরকার আমরা দিয়েছি সকালে হয়তো উনাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন! কারণ এসব রোগী হাসপাতালে বেশিদিন না রেখে বাড়িতে ভালো করে সেবাযত্ন করলেই দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন। আর হ্যাঁ, মনে রাখবেন হাতে বা মাথায় যেনো একটুও পানি না লাগে। দেখা করতে চাইলে করতে পারেন উনার সেন্স ফিরে এসেছে।”

কথা শেষ হতেই তোহফা বলে উঠলো,

” আ-আমি যাবো, আমি দেখা করতে চাই।

“ঠিক আছে, তবে খেয়াল রাখবেন সে যেনো হাত-পা বেশি নাড়াচাড়া না করে।”

“আচ্ছা। ”

আচ্ছা বলেই তোহফা ছুটে চলে গেলো কেবিনের ভেতরে। তৌসিফ বাকি কথা সেরে নিতেই নার্সের মুখোমুখি দাঁড়ালো। তোহফা সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছে আওয়াদের নিকট। এদিকে আওয়াদ চোখ বুজে আছে। কপালে সাদা রঙের বেন্ডেজ দিয়ে ক্ষতস্থান বেঁধে দেওয়া। ডান হাত প্লাস্টার লাগানো হয়েছে। অতি সৌন্দর্যে ঘেরা মুখে ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। খোঁচা খোঁচা চাপ দাড়িতে লোকটাকে একটু বেশিই আকর্ষণীয় লাগে তোহফার কাছে। ছটফট করা লোকটা কেমন নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে হাসপাতালের এই ছোট্ট বেডে। মানুষটার অনেক কষ্ট হচ্ছে ভেবেই আবারও কান্না পেলো তোহফার। কান্না পেতেই সে হু হু করে কেঁদে উঠলো। কারো ফুঁপিয়ে ওঠার আওয়াজ পেয়ে আওয়াদ চোখ খুলে তাকালো। তোহফাকে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে দেখে এই ব্যথাময় শরীর নিয়েও আওয়াদ না হেসে পারলো না। মেয়েটা তার এক্সিডেন্ট হয়েছে থেকে শুরু করে এখনো কিভাবে কেঁদে যাচ্ছে। আচ্ছা মেয়েরা কথায় কথায় এতো কাঁদে কেনো? এতো চোখের পানি তাঁদের কোথাথেকে আসে। না আছে সাগর, না আছে নদী তবুও এতো চোখের জলের হয় কোথা থেকে আমদানি। এই অসুস্থ শরীর নিয়েও আওয়াদ তোহফাকে নিয়ে মজা করার সুযোগ ছাড়লো না। তাই তো সে বললো,

“কাঁদছেন কেনো? পঙ্গু ছেলেকে বিয়ে করতে হবে ভেবে কাঁদছেন বুঝি?”

তোহফা আওয়াদের মজা না বুঝেই উত্তর দিলো,

“একদম বাজে বকবেন না, কে বললো আপনি পঙ্গু?”

“কে বলবে এই যে হাত-পা পঙ্গু হয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি।”

কথাটা বলেই মচকে যাওয়া পা একটু নাড়ানোর চেষ্টা করলো আওয়াদ, তৎক্ষনাৎ আহহ বলে গুঙিয়ে উঠতেই তোহফা ছুটে এসে বললো,

“ব্যথা করছে নিশ্চয়ই, কে বলেছে পা নাড়াতে সব কিছুতেই পাকনামি না করলে হয় না বুঝি। পা নাড়াবেন না একদম। ইসস অনেক ব্যথা করে তাই না?”

“হুম, তবে পায়ে না এখানে।”

এখানে বলে আওয়াদ তার ডানহাতের অনামিকা আঙুলের দিকে ইশারা করলো, যেখানে তোহফা নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে। তোহফা খেয়াল করতেই চিংড়ি মাছের মতো ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো আল্লাহ বলে। তোহফার এমন বাচ্চামো দেখে আওয়াদ আবারও হাসলো। আওয়াদকে হাসতে দেখে তোহফা এগিয়ে এসে বললো,

“কথায় কথায় এতো হাসেন কেনো? এতো ব্যথার শরীর নিয়ে মানুষ হাসে কি করে?”

“কি করবো বলুন কেউ তো নিজ দায়িত্বে আমাকে হাসাবে না তাই একা একাই হাসি। তবে কষ্ট হচ্ছে খুব।”

“কষ্ট হচ্ছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে? ডাক্তার ডাকবো? আল্লাহ আমি এখন কি করবো।”

“না, এখন কাউকে ডাকতে হবে না আপনি আগে এদিকে শুনুন তারপর বলছি কোথায় কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্ট ডাক্তার সারাতে পারবে না।”

“ডাক্তার পারবে না তাহলে কি নার্স ডাকবো? দেখুন ব্যথা নিয়ে হেলাফেলা করা একদম উচিৎ না, কোথায় কষ্ট হচ্ছে বলুন আমি ডাক্তার ডেকে আনছি।”

একথা ব’লে তোহফা বাহিরের দিকে যেতে নিলেই আওয়াদ ‘তোহফা’ বলে ডেকে উঠলো। আওয়াদের এই ডাকে কিছু একটা মিশে ছিলো তাইতো তোহফার ছুটন্ত পা জোড়া আপনা-আপনি থেমে যায়। সে পিছন ফিরে চাইতেই আওয়াদ বললো,

“এই পঙ্গু ছেলের সাথে আপনার পরিবার আপনায় বিয়ে দেবে তো তোহফা? বিশ্বাস করেন তোহফা আমি আপনাকে ছাড়া এক সেকেন্ডের জন্য হলে-ও ভালো থাকবো না! প্লিজ আমায় ছেড়ে যাবেন না তো?”

আওয়াদের কন্ঠে আকুতি মিশে আছে। সে হারিয়ে ফেলার ভয় পাচ্ছে। মানুষটা কি অতিরিক্ত ব্যথায় পাগল হয়ে যাচ্ছে না-কি ! সে পঙ্গু কোথায়? কিছুদিনের জন্য হয়তো চলাফেরা করতে একটু অসুবিধা হবে সেখানে সে এভাবে বলছে কেনো? তোহফা তটস্থ ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলো আওয়াদের নিকট। হঠাৎ তোহফার কি হলো কে জানে সে সরাসরি আওয়াদের চোখে চোখ রেখে বললো,

“আমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় এতো পাচ্ছেন কেনো? পাবেন না, বলা তো যায় না হুট করেই মরে গেলাম! তখন আমায় হারিয়ে ফেলার শোক সইতে না পেরে হয়তো পাগল হয়ে গেলেন।”

“প্লিজ তোহফা ওভাবে বলবেন না। আমি সত্যি পাগল হয়ে যাবো। আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন এ-ই একটা কথা আমাকে কতোটা ব্যথা দিয়েছে তা যদি আপনাকে যদি বোঝাতে পারতাম তাহলে হয়তো মজার ছলেও এই কথাগুলো বলতেন না। কিছু ব্যথা যদি দেখানো যেতো হয়তো বুঝতেন এই ক’দিন আপনি ঠিক আমার কোথায় বসবাস করতে শুরু করেছেন। শরীরের আঘাত হয়তো আমায় এতো ব্যথা দেয়নি, যতোটা ব্যথা দিলো আপনার ঐ একটি কথা । তা-ই ভয় হচ্ছে যদি তারা আমার সাথে আপনার বিয়ে দিবে না বলে জানায় ? সুন্দর ফুলের শুভাকাঙ্ক্ষী অনেক! বলা তো যায় না কে কোথা থেকে এসে আমার আড়ালে তাঁকে চুরি করে নিয়ে যায়। বিক্রি হলে ভয় ছিলো না নিজের রক্তের বিনিময়ে হলেও বায়না দিয়ে রাখতাম। তবে এটা যে চুরি বা ডাকাতি হওয়ার ভয় বেশি।”

“এই চিন্তা করেই শরীরে ব্যথায় মলম লাগান সার্ভিস ভালো দিবে হয়তো।”

একথা ব’লেই তোহফা বেরিয়ে গেলো। তোহফার চলে যাওয়ায় আওয়াদ মনে ক্ষুদ্র ব্যথা অনুভব করলো। মেয়েটা এমন খামখেয়ালি কেনো? সব কিছুতেই কেমন দায়সারাভাবে কথা বলে। উত্তর চাইলে নতুন করে আরো অনেকগুলো প্রশ্ন তার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যায়। নিজের উপর এই মূহুর্তে খুব রাগ হচ্ছে, ইচ্ছে করছে ব্যথা জায়গায় আরো ব্যথা দিতে। এই বে-খেয়ালি মেয়েটাকে আওয়াদ এতো কেনো ভালোবেসে ফেললো অল্প সময়ের মাঝে। আচ্ছা অল্প সময়েও কি ভালোবাসা এতো গভীর হয় সাগরের গভীরতার মতো যে তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে আওয়াদ সিঁটিয়ে যায় বারংবার।

এ’ঘর থেকে ও’ঘর করে পায়চারি করছে জাহানারা বেগম। আর তাকে অনুসরণ করে পিছু পিছু হাঁটছে ইলা। ইলাকে এভাবে হাঁটতে দেখে জাহানারা বেগম বিরক্ত চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,

“এভাবে আমাকে অনুসরণ করার কি মানে?”

ইলা বুঝলো শাশুড়ী মা বেজায় টেনশনে অবস্থা খারাপ করে ফেলছে নিজের। তাই তাকে কিছুটা হাসানোর জন্য বললো,

“ব্যয়াম করছি, কি যেনো বলে ও হ্যাঁ ইয়োগা করছি শরীরকে ফিট্ রাখার জন্য ।”

ইলার কথায় চোখ মোটা করে তাকালেন জাহানারা বেগম। তিনি বোঝার চেষ্টা করছে ইয়োগা বলতে ইলা কি বোঝাতে চেয়েছে। কিছুক্ষণ ভাবার পর যখন সে ইয়োগা মানে কি বুঝলো তখন তিনি রাগের চোটে মুখ থেকে ‘চ’ শব্দ করে উঠলো। শাশুড়ীকে রেগে যেতে দেখে ইলা দৌড়ে জগ থেকে একগ্লাস ঠান্ডা পানি এনে জাহানারা বেগমের মুখের সামনে তুলে ধরলো। ইলার এমন আজগুবি কাজে জাহানারা বেগম বললেন,

“তুমি কি পাগল হলে না-কি? কি করছো কি বলছো নিজেও জানো না দেখছি।”

” মা, মা ঠান্ডা হন তারপর পানি খেয়ে গলা পরিষ্কার করে আমাকে বকুনিঝকুনি করুন, তাহলে বকতে সুবিধা হবে আপনার। শুকনো গলায় চিৎকার করলে অসুবিধা হতে পারে।”

ইলা কথা শেষ করেই গ্লাসটা কিঞ্চিৎ এগিয়ে দিলো শাশুড়ী মায়ের সামনে। ইলার কাজে তিনি হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছেন না। রাগের বশেই গ্লাসটা টেনে নিয়ে ঢকঢক করে পানি পান করতে রইলো। পানি অর্ধেক হওয়ার আগেই ইলা মা বলে চিৎকার করে উঠলো। ইলার চিৎকারে জাহানারা বেগম বিষম খেলো। ইলা দ্রুত জাহানারা বেগমের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

“কে অসময়ে মনে করে রে, একদম দু’ঘা দিবো।”

জাহানারা বেগম ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন করলো,

“চিৎকার করে উঠলে কেনো আগে সেটা বলো?”

“মা আপনি দাঁড়িয়ে পানি পান করছিলেন সাথে টেনশনে পানি খাওয়ার দোয়া পড়তে ভুলে গেছেন।”

জাহানারা বেগম ইলার কথায় অবাক না হয়ে পারলো না, মেয়ে বলে কী? এই মেয়েটা সব সময় তার টেনশনে এমন আজগুবি কথা বলবে হয় তার টেনশনে উবে যাবে, না-হয় সে হেসে ফেলবে। তবে জাহানারা বেগম নিজের গাম্ভীর্য ধরে রেখে হাসি বহুকষ্টে সামলে নিলো। তাড়াতাড়ি সোফায় গিয়ে বসে বাকি পানিটুকু পান করলো। তার পানি শেষ হতেই ইলা গ্লাসটা নিয়ে নিলো। জায়গা মতো গ্লাসটা রাখতেই বা-হাতে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। ইলার ফোন বাজাতেই জাহানারা বেগম বসা থেকে ছুটে এলেন,

“দেখো তো তৌসিফ ফোন করেছে কি-না? এরা একটাও কাজের না, তৌসিফও আজকাল কাজে খামখেয়ালি করছে। সে-ই কখন বাড়ি থেকে বের হয়েছে এখনোও বাড়িতে একটা ফোন দেওয়ার নাম নেই। বাড়ির সবাই যে চিন্তা করছে এটা এরা ভুলেই গেছে। আল্লাহ, আমি কোথায় যাবো!”

শাশুড়ী মায়ের কথা শুনতে শুনতেই ফোনটা রিসিভ করে কানে তুললো ইলা। ফোন রিসিভ করতেই তৌসিফ বললো,

“শোন ইলা মা’কে আর লিমাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দাও। আর তুমি তৌহিদকে সাথে নিয়ে একটা ঠিকানা দিচ্ছি সেখানে গিয়ে আওয়াদের মা’কে নিয়ে এসো ইমারজেন্সি। আমি ঠিকানা টেক্সট করে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

“কেনো কি হয়েছে, আওয়াদ ভাইয়ের অবস্থা কি অনেক খারাপ?”

“আসো তারপর বলছি, আর হ্যাঁ তৌহিদকে বলো আমাকে যেনো আগে কল করে।”

ইলা নতুন করে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই টুথটুথ করে ফোনটা কেটে গেলো। ইলা টেনশনে পড়ে গেলো স্বামীর কথায়। অন্যদিকে ইলার টেনশনে চেহারা দেখে জাহানারা বেগম বললেন,

“কি বললো তৌসিফ, আমার মেয়েটা ঠিক আছে তো? এই জন্যই বলি মেয়েটাকে একটু সামলে রাখতে, শাসনে রাখতে। কেউ আমার কোনো কথা শোনার প্রয়োজন মনে করে না এখন আমি কি করবো?”

শাশুড়ীকে অস্থির হতে দেখে ইলা বললো,

“মা আপনি আর লিমা হাসপাতালে চলে যান, আমি আর তৌহিদ যাচ্ছি আওয়াদের মা’কে আনতে, নিশ্চয়ই ছেলেটার অবস্থা ভালো নয়।”

কথা শেষ করেই ইলা ছুটে গেলো লিমাকে ডাকতে। লিমাকে সব বুঝিয়ে শাশুড়ীকে দিয়ে ওদের হাসপাতালের উদ্দেশ্য পাঠিয়ে দিলো। ইলা আর তৌহিদ ছুটলো আওয়াদের মা’কে আনতে ।

ঘড়ির কাঁটা রাত পৌঁনে বারোটার ঘরে। কলিং বেল বেজে উঠতেই সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো সেলিনা বেগম। ছেলেটা এখনো বাড়িতে ফেরেনি বলে তার চোখে এখনো ঘুম নামেনি। সন্তান বাড়ি ফেরেনি অথচ মা কীভাবে ঘুমায়। এতোক্ষণ বসার রুমে ছেলের অপেক্ষা করছিলো সেলিনা বেগম। কলিং বেল বেজে উঠতেই বুঝে গেলেন ছেলে হয়তো ফিরে এসেছে। জোর পায়ে তিনি দরজার নিকট এগিয়ে গেলেন। দরজা খুলতেই দু’জন অচেনা মানুষকে দেখে তিনি প্রশ্ন করলেন,

“কে আপনারা? কাকে চাই?”

ইলা ও তৌহিদ অবাক হলো সেলিনা বেগমের কথায়। এই না সেদিন উনি তাদের বাড়িতে গিয়েছিলো। দেখা করে কতো কথাও তো বলে এলেন এখন কি-না চিন্তে পারছে না। ইলা নিজের চিন্তা দূরে সরিয়ে বললো,

“আন্টি আমি ইলা।”

“ইলা, কোন ইলা কোথাকার ইলা চিনলাম না তো?”

“বুঝো ঠেলা এখন উনাকে কীভাবে বোঝাবে ভাবি, তুমি কোন ইলা।”

সেলিনা বেগমের কথা শুনে তৌহিদ ইলার কানে-কানে ফিসফিস করে কথাগুলো বললো। ইলা তৌহিদকে চোখের ইশারায় চুপ করতে বললো,

“আন্টি ওই যে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন আপনি আর আপনার ছেলে আওয়াদ। আমার ননদ তোহফাকে পছন্দ করে এলেন মনে নেই।”

“আশ্চর্যজনক কথাবার্তা, কোথাকার কোন তোহফা তাকে নাকি আমি আমার ছেলের জন্য পছন্দ করেছি। কেনো পৃথিবীতে কি মেয়ের অভাব পড়েছে আপনার ননদকে পছন্দ করে এসেছি বলছেন তা-ও আবার এতো রাতে এসে। এই আপনারা বিদায় হন তো এখান থেকে। এই আপনারা চুরিটুরি করার মতলব নিয়ে আসেননি তো? আল্লাহ আমি বাড়িতে একা আছি এটা নিশ্চয়ই কেউ আপনাদের বলে দিয়েছে। আমার ফোন কোথায়? ”

চটজলদি সেলিনা বেগম ভেতরে চলে গেলেন নিজের ফোন আনতে। হঠাৎ কি মনে করে ফিরে এসে ইলা ও তৌহিদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করতে করতে বললো,

“দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছি, যদি এরা আমায় পিছন থেকে ছুড়ি মারে কি সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে যাবে, আল্লাহ আজকাল নিজের বাড়িতেও শান্তি নেই। ”

সেলিনা বেগম ওদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলেন। অন্যদিকে তৌহিদ ও ইলা একেঅপরের মুখোপানে দৃষ্টি নিবেদন করলো। তৌহিদ রেগে গিয়ে বললো,

“আমি গেলাম ভাবি, ভাইয়া এ কোথায় পাঠালো আমাদের। আজ কি-না চোর, এমন কি খুনি অপবাদ থেকে-ও রেহাই পেলান না।”

“আহ রেগে যাচ্ছো কেনো? আমার মনে হয় উনি সত্যিই আমাদের চিনতে পারেনি। দাঁড়াও তোমার ভাইয়াকে একটা ফোন করি।”

ইলা তৌসিফের নাম্বারে ডায়াল করলো। রিং বাজতেই তৌসিফ ফোনটা রিসিভ করলো,

“হ্যাঁ বলো, তোমরা কি পৌঁছে গেছো আওয়াদের বাড়িতে?”

“পৌঁছে তো গেছি, কিন্তু উনি তো আমাদের চিনতে পারছেন না। চোর, খুনি বলে সম্মোধন করছে।”

“চিনতে পারছে না কি বলছো এসব?”

“সত্যি বলছি উনি আমাদের চিনতে পারছে না।”

“আশ্চর্যজনক কথা বলছো ইলা, উনি চিনতে পারবে না কেনো তুমি কি মুখে মেকাপ করে গেছো? না চেনার কি আছে! ভালো করে পরিচয় দাও।”

“একমদ ফালতু কথা বলবা না মেকাপ করে আসবো কেনো? তুমি কি মনে করেছো আমি ভালো করে পরিচয়টা দেইনি ।”

“সেটাই মনে হচ্ছে।”

“তুমি—।”

“কি হয়েছে ভাইয়া? ভাবি কি বলছে?”

তৌসিফের পাশেই তোহফা দাঁড়িয়ে থাকায় ভাইয়ের কিছু কথা তার কর্ণকুহরে এসেছে। তাই সে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো। তৌসিফ বোনের কথার প্রতিত্তোরে বললো,

“আওয়াদের মা তোর ভাবি আর তৌহিদকে চিনতে পারছে না। ”

ভাইয়ের কথায় তোহফা জিহ্বায় কামড় দিলো কতোবড় ভুল হয়ে গেছে ভেবে।

“ভাইয়া ভাবিকে বলো আন্টি ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত। তার ভুলে যাওয়ার রোগ আছে।”

“কি বলছিস এসব?”

“হ্যাঁ, এটা তখন আমি যে তোমায় বলবো ভুলে গেছিলাম।”

“আচ্ছা। ”

তারপর তৌসিফ ইলাকে খুলে বলতেই ইলা বললো,

“ঠিক আছে।”

ইলা ফোন রেখে দিতেই তৌসিফ বোনের নিকট এগিয়ে এলো,

“আরো একবার ভাবলে হতো না তোহফা। মানুষ কি বলবে শুনলে?”

“তুমি বোনের থেকেও মানুষের কথা কবে থেকে ভাবতে শুরু করলে।“

“না আসলে এভাবে আওয়াদের মা’কে ডেকে এনে কথাগুলো বললে হয়তো উনি না-ও মানতে পারে।”

“আমি যতোটুকু উনাকে চিনেছি উনি না করবে না আমি হান্ড্রেড পার্সন সিউর।”

“আওয়াদকে কিছু বলেছিস।”

“না।”

“গিয়ে বল।”

“হুম।”

তোহফা আবারও এগিয়ে গেলো আওয়াদের কেবিনে। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই আওয়াদ চোখ ফিরিয়ে তোহফার নিকট তাকালো। তোহফা পাশের টুলটা টেনে পাশাপাশি বসে আওয়াদের ডানহাতটা নিজের মুষ্টিবদ্ধ করে বললো,

“কষ্ট পাবেন না একটা কথা বলি।”

“কি কথা?”

“আগে বলুন কষ্ট পাবেন না।”

“না বললে বুঝবো কি করে কষ্ট পাবো না ব্যথা পাবো।”

“শুনুন পরিস্থিতি মানুষকে অনেক কিছু চিনতে, বুঝতে শেখায়। আপনার সাথে আজ প্রথম দেখা করতে গিয়ে যে পরিস্থিতিতে পড়তে হলো এটা আমার মা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছে—

“আমার সাথে আপনার বিয়েটা দিবে না তা-ই তো?”

ইন শা আল্লাহ চলবে….

অনুমতি ছাড়া গল্প কপি করা নিষেধ।