#অতঃপর_গল্পটা_তোমার
সমুদ্রিত সুমি
৮
“দেখুন আমার পুরো কথাটা আগে শুনুন।”
“কিছু শোনার নেই তোহফা। আমি জানি আপনি এরপর কি বলবেন, কি কথা থাকতে পারে সেটাও জানি। আপনি আপনার পরিবারের সুখ! তারা নিশ্চয়ই আমার অনিশ্চিত জীবনের সাথে আপনাকে জড়াতে চাইছে না। যদি আমি আগের মতো স্বাভাবিক ভাবে হাঁটাচলা করতে না পারি এটা ভেবেই তারা পিছুপা হচ্ছে তাই তো।”
“আপনি তো আমার পুরো কথা শুনলেন না তার আগেই নিজের মতো করে কথা বলে যাচ্ছেন।”
“কিছু শোনার নেই আমার, যা বোঝার আমি বুঝে গেছি।“
“আরে আগে পুরো কথা’টাতো শুনুন।”
“আপনি কেবিন থেকে বেরিয়ে যান তোহফা, আমাকে কিছুক্ষণ একা থাকতে দিন! নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য সময় দিন দয়া করুন! এতোটুকু দয়া আপনার থেকে আমি আশা করছি। ”
অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ইলা আবারও দরজা নক করলো। তবে ভেতর থেকে এবার কেউ দরজা খুললো না। এভাবেই কয়েক সেকেন্ড, মিনিট পার হতেই বিরক্ত হয়ে তৌহিদ বললো,
“ভাবি দরজা ভেঙে দেই।”
“পাগল হয়েছো, এটা তোমার বোনের হবু শ্বশুর বাড়ি ভুলে যাচ্ছো দেখছি।”
“কি করবো বলো এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খাওয়ার থেকে দরজা ভাঙা সহজ মনে হচ্ছে। বোনটা যে কীভাবে মানাবে এদের সাথে এটা ভেবেই তো আমি দিশেহারা। ”
“তোমার বোন ঠিক মানিয়ে নিতে পারবে।”
“হ্যাঁ, আমরা ভাইয়েরা যা সহ্য করছি তার তুলোনায় তো এটা কিছুই না! বোনও পারবে কোনো ব্যপার না ।”
দেওয়রের এমন খোঁচা মা-রা কথায় ইলা চোখ মোটা করে তাকালো। ইলার চোখ গরম দেখে তৌহিদ বলদমার্কা হাসি দিয়ে বললো,
“ওভাবে তাকিয়েও না ভয় পাচ্ছি। আমি দরজা নক করছি তুমি তোমার রাগ সামলাও।”
তৌহিদ তাড়াতাড়ি ইলার থেকে সরে এসে দরজায় নক করলো। একটু গায়ের জোরে আঘাত করলো যেন শব্দ হয় বেশি। একাধিক আঘাত করতেই সেলিনা বেগম দরজা খুলে রাগী মুডে তাকালেন,
“কি হচ্ছে এসব? আপনারা কারা আমায় একটু বলবেন? ভদ্রতা বজায় রাখুন। একদিকে আপনারা বিরক্ত করছেন
অন্যদিকে আমার ছেলেও ফোন ধরছে না কি করবো বুঝতে পারছি না।”
সেলিনা বেগমের অস্থিরতা দেখে ইলার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো তৎক্ষনাৎ। সে চটজলদি তৌহিদকে সরিয়ে নিজে সেলিনা বেগমের সামনে এসে দাঁড়ালো।
“আন্টি আমরা চোর বা খুনি কোনটাই নই। আমরা আপনাকে নিতে এসেছি! আপনার ছেলে আওয়াদ এক্সিডেন্ট করেছে, তাকে আমার স্বামী ও ননদ মিলে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। আমরা আপনাকে সেই খবর দিতেই এখানে ছুটে এসেছি। আপনি না-কি সব ভুলে যান এটা বললো আমাদের আপনার ছেলে তাইতো আমরা আপনায় সঙ্গে করে নিয়ে যেতেই এতদূর কষ্ট করে এলাম।”
ইলার বলে যাওয়া সব কথাগুলো সেলিনা বেগম শুনলো কি-না বোঝা গেলো না তার মুখ দেখে, তিনি কিছুক্ষণ পলকহীনভাবে ইলার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো,
“আমি আমার ছেলের কাছে যাবো, দয়া করে তোমরা আমায় নিয়ে চলো। ওর কি অবস্থা এখন? ভালো আছে, বেশি ক্ষতি হয়নি তো?”
অবশেষে সেলিনা বেগম কন্ট্রোলে এসেছে দেখে স্বস্তির শ্বাস নিলো ইলা ও তৌহিদ। ইলা বললো,
“আন্টি আপনার ছেলে ভালো আছে তবে আপনাকে এখন আমাদের সাথে যেতে হবে।”
“হ্যাঁ যাবো। তোমরা একটু অপেক্ষা করো আমি আসছি।”
আসছি বলেই সেলিনা বেগম ভেতরে চলে গেলেন। ওদিকে সেলিনা বেগমকে ভেতরে যেতে দেখে তৌহিদ বললো,
“অবশেষে উনি বিশ্বাস করলেন আমরা খুনি না। কি ডেঞ্জারাস মহিলা দেখলে ভাবি! রাতারাতি দু’টো নির্দষ মানুষকে খুনি বানিয়ে দিলো।”
“তুমি একটু থামবে তৌহিদ, এতো ঘনো কথা বলো কেনো? তুমি যানো না এতো বেশি কথা বলা ভালো নয়।”
“হুম!”
মিনিট দু’য়েক পরেই সেলিনা বেগম চলে এলেন। উনাকে সঙ্গে করে ওরা রওনা হলো হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশ্য।
হাসপাতালে ছোটখাটো একটা বৈঠকখানা তৈরি করেছে তোহফা। একটা খালি কেবিনে নার্সের অনুমতি নিয়ে সকলকে নিয়ে সেখানেই বসেছে সে। সবাই থাকলে-ও এখনো আসল মানুষটা এসে পৌঁছায়নি, মানে আওয়াদের মা সেলিনা বেগম এখনো এসে পৌছায়নি। কিছুক্ষণ পার হতেই তারা-ও এসে উপস্থিত হলো। সেলিনা বেগমকে দেখে তোহফা তার কাছে এগিয়ে গেলো। সেলিনা বেগমের হাত আঁকড়ে ধরে বললো,
“আন্টি আপনি মোবাইল ফোনটা বের করুন তো? তারপর নোটপ্যাডে ওপেন করুন যেখানে ভুলে যেতে পারেন ভেবে আপনি অনেক কিছু লিখে রেখেছেন সেগুলো বের করুন তো?”
সবাই তোহফার কথা শুনে হতভম্ব। কি বলে তোহফা। ইলার পাশে দাঁড়িয়ে তৌহিদ ফিসফিস করে বললো,
“এবার এই মহিলা আমার বোনের মাথা নষ্ট করে দিবে নির্ঘাত। আল্লাহ এই আন্টিটা এক–”
বাকি কথা শেষ করার আগেই ইলা চোখ গরম করে তাকালো। আর তৌহিদ ঠোঁটে আঙুল চেপে বললো,
“এই যে আমি চুপ, আর কিছু বলবো না প্রমিজ।”
ইলা মনোযোগ দিলো তোহফার কথায়। সেলিনা বেগম তোহফার কথায় নিজের ফোন বের করলো এবং নোটপ্যাড ওপেন করলো। তোহফা সেলিনা বেগমের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নোটপ্যাডের প্রতিটা লেখা চেক করলো। সেলিনা বেগম বুদ্ধিমান তাই প্রতিটা মানুষের নাম দিয়ে সেভ করে রেখেছে উপরে যেনো চটজলদি মানুষটার সম্পর্কে সে মনে করতে পারে। তোহফা নিজের নাম লেখা যেখানে সেখানে ক্লিক করে সেলিনা বেগমকে ইশারা করলো চোখ বোলাতে। সেলিনা বেগম চোখ বোলাতেই তার ধীর গতিতে সব মনে পড়লো। সেলিনা বেগমের সবটা মনে পড়তেই তোহফা বললো,
“আন্টি এবার আমার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে নিন। বাকি কথা তারা বলবে আপনাকে।”
একথা বলেই তোহফা ইলাকে ইশারা করে বাহিরে ডেকে নিয়ে এলো। আর মুরুব্বীরা মিলে বাকি কথা সেরে নিলো ওখানেই। ইলা কেবিন থেকে বাহিরে আসতেই তোহফা বললো,
“উনি তো ভুল বুঝে আমাকে কেবিন থেকে বের করে দিয়েছে। তুমি যা-ও গিয়ে একটু বোঝাও। যদি তোমার কথা বোঝে।”
ননদের কথায় মুখ টিপে হাসলো ইলা। হাসতে হাসতেই বললো,
“এতো বড় কবে হলে তোহফা। নিজের জন্য আওয়াদের এমন হয়েছে ভেবে তার সুস্থতার জন্য তাকে বিয়ে করে নিচ্ছো এভাবেই। সত্যি আমি অনেক খুশি তোমার মতামতে।”
“ভাবি আমি বুঝেছি আমার উনার সাথে ওভাবে মজা করা উচিৎ হয়নি। আমি মজা না করলে উনি ওভাবে ছুটেও আসতো না আর এমন একটা ঘটনাও ঘটতো না। আমার জন্য যেহেতু এমন হয়েছে এর দায় তো আমাকেই নিতে হবে তাই না।”
“আচ্ছা থাকো আমি যাচ্ছি। ”
ইলা এগিয়ে গেলো আওয়াদের কেবিনে সময় তখন রাত ১’ পয়তাল্লিশ। আওয়াদের পাশে গিয়ে ইলা আওয়াদ বলে ডাকতেই সে চোখ খুলে তাকালো। আওয়াদের চোখ অসম্ভব লাল হয়ে আছে। একরাশ ক্লান্তি আর কষ্ট স্পষ্ট চেহারায়। ইলা বুঝলো আওয়াদ ভুল বুঝে নিজেই নিজের অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে। ইলা সিওর আওয়াদ মেয়ে হলে এতোক্ষণে কেঁদেকেটে কাহিনী পুরোই উল্টে দিতো। ইলা গলা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করলো,
“সময়-সীমা অল্প তাই আমার ননদকে আপনি এখনো চিনতে পারেননি। ভালো হয়তো একটু বেশিই বেসে ফেলেছেন সময় অল্প হলে-ও, তবে সত্যি এটাই ওকে চিনতে এখনো আপনার অনেক সময়ের দরকার। একটা কথা কি জানেন, একজন পুরুষ সহজে একজন নারীকে চিনতে পারে না! আর যদি একবার চিনে যায় তাহলে ওই মেয়ের কোন হাসিটা সুখের আর কোনটা বিষাদের সেটা সে কয়েক সেকেন্ডে বুঝে যায়। কোন কন্ঠে ঠান্ডা আর কোন কন্ঠে কান্না মিশে আছে তা বুঝতে শুধু প্রয়োজন মেয়েটার কন্ঠ তার কর্ণকুহরে পৌঁছানোর। যা-ইহোক আমি বেশি কথা বারাবো না যেটা বলতে এসেছি সেটা বলে ফেলি। আপনি যখন তোহফাকে বলেছেন আপনি পঙ্গু বলে হয়তো আমরা আপনার সাথে বিয়ে দিতে রাজি হবো না, ঠিক তখনই ও বাবাকে মানে আমার শ্বশুরকে কেঁদেকেটে রাজি করিয়েছে আজ এই মুহূর্তে সে আপনায় বিয়ে করবে। এখানেই বাবা যেনো সবটা ব্যবস্থা করে। আর তোহফা আমাদের পরিবারে কি সেটা হয়তো কিছুটা হলে-ও আন্দাজ করতে পেরেছেন, তাই বাবা বিনাবাক্য হ্যাঁ বলে দিয়েছে। তাই বিয়েটা এখানে মানে হাসপাতালেই হবে। তাই আপনার কাছের মানুষ আপনার মা’কে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে। এবং আপনি সুস্থ না হওয়া অবধি তোহফা আপনার সেবাযত্ন করে সুস্থ করার দায়িত্ব নিবে। আপনি তার জন্য এখন একজন পরপুরুষ, চাইলেও আপনার সাথে সেভাবে মিশতে পারবে না তাই আপনাকে এখনি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।। আপনার মায়ের সাথেও কথা বলা শেষে তিনিও রাজি। তিনি অসুস্থ মানুষ আপনাকে কে দেখবে তাই তিনি তোহফার সিদ্ধান্তকে বাহবা দিয়েছে। তৌসিফ গেছে কাজি ডাকতে আর আপনি কিনা ভুল বুঝে আমার ননদকে কেবিন থেকে বের করে দিলেন এটা কিন্তু ভারি অন্যায়। মেয়েটা সেই থেকে মুখটা বাংলার পাঁচের মতে করে রেখেছে। যার জন্য আমার ননদ করলো চুরি, সে-ই বলে কি-না চোর।”
ইলার সকল কথা শুনে আওয়াদ অবাক না হয়ে পারলো না। মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই তৌসিফ কাজী সাহেব নিয়ে কেবিনে ঢুকলো। এরপর একে একে সবাই কেবিনে ঢুকে পড়লো তোহফা বাদে। আওয়াদ কোন কথাই মুখ থেকে বের করতে পারছে না সবার কান্ড দেখে। কাজি সাহেবকে টুলটা এগিয়ে দিতেই তিনি বিয়ে পড়ানোর কাজ শুরু করলেন। কিছু লেখালেখির কাজ সেরেই বিয়ের কাজ সম্পূর্ণ করে নিলেন। কাজি সাহেব বললো,
“কবুল বলার আগে তো সই করতে হবে উনার যা অবস্থা পারবে তো?”
কাজি সাহেবের কথায় সবাই একটু চিন্তিত হলো। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আওয়াদ বললো,
“আমি পারবো, আমাকে দিন আমি সই করতে পারবো। কোথায় করবো একটু দেখিয়ে দিন।”
আওয়াদের স্পষ্ট ভাষায় বলা কথা শুনে কেবিনে থাকা প্রতিটা মানুষ হা হা করে হেসে উঠলো। সকল মুরুব্বি হেসে দিতেই আওয়াদ লজ্জায় মাথা নিচু করে নিলো। কোনো-বাক বিবেচনা না করেই ওভাবে কথাটা বলা উচিত হয়নি এটা বুঝতে পারলো সে। তবে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি দেখে আওয়াদের মন আকুপাকু করছিলো তাই তো লাজলজ্জা ভুলে এভাবে কথাটা বলে উঠলো। আওয়াদ মনে মনে ভাবলো, “ভাবে ভাবুক লোকে লজ্জাহীন পুরুষ, ভালোবাসার মানুষটা আপন হচ্ছে এর থেকে আর কি আছে খুশির বড়ো কারণ।” কাজী সাহেব হাসতে হাসতেই আওয়াদের নিকট কাগজটা এগিয়ে দিলো, খুব কষ্টে আওয়াদ সই করতে সক্ষম হলো। কিছু কষ্টে স্বস্তি লুকিয়ে আছে। সব শেষে তোহফার সই আনতে ইলা ও লিমা চলে গেলো পাশের কেবিনে যেখানে তোহফা অপেক্ষা করছে। ইলা ও লিমা তোহফার কাছে এসে একটু আগে আওয়াদের করা পাগলামির কথা বলে মুখ টিপে হাসলো, তোহফার লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। লিমা টিটকারি মেরে বললো,
“তোমার প্রেমে শুধু পড়েনি আওয়াদ, রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছে বেচারা। দেখো ডুবে না যায়। ”
লিমা কথাটা বলেই হাসতে হাসতে ইলার গায়ে ঢলে পড়লো। লিমাকে সরিয়ে ইলা বললো,
“তা ননদী বাসরটা কি হাসপাতালেই সারবে না-কি?”
আবারও দুই জা খিলখিল করে হাসতে শুরু করলো। আর এদের হাসি-তামাশায় তোহফার অবস্থা নাজেহাল। তার লজ্জায় মুখটা লালবর্ণ ধারণ করেছে। তোহফাকে এমন ভাবে লজ্জা পেতে দেখে ইলা বললো,
“থাক আমাদের সামনে আর লজ্জা পেতে হবে না, কিছু লজ্জা বাসর রাতের জন্য তুলে রাখো বরকে দেখাইবার জন্য। ”
আবারও কেবিনে হাসির রোল পড়ে গেলো। সব শেষে তোহফাকে তাড়া দিলো সই করার জন্য। তোহফার হাতে কলমটা তুলে দিতেই এক অদৃশ্য দ্বিধা তাকে বাঁধা দিতে রইলো বারংবার। তোহফার হাতটা অসম্ভব কাঁপতে রইলো। ঝরঝর করে চোখের কানিশ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তেই ইলা জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে তোহফা? কোন সমস্যা?”
তোহফা ইলার কথায় চোখ তুলে তাকালো। ইলা কি বুঝলো কে জানে সে চটজলদি বাহিরে গিয়ে তার শাশুড়ী ও শ্বশুরকে ডেকে আনলো। জাহানারা বেগম ও আরিফুল ইসলাম দু’জনেই মেয়ের দুই পাশে বসলো। জাহানারা বেগম অতি আদরে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তোহফা মা’কে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো। আরিফুল ইসলাম তোহফার মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
“এভাবে কাঁদিস না মা! তোর মায়ের কষ্ট হবে।”
বাবা-র কথায় তোহফা একহাতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“তোমার হবে না বাবা?”
মেয়ের কথায় আরিফুল ইসলাম অন্যদিকে ফিরে নিজের চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করলো। ছেলেরা চাইলেও যে কাঁদতে পারে না। আর তাছাড়া সন্তানদের সামনে তো তাদের কান্না করা ঘোর নিষেধ। তিনি চোখের মনি এদিক ওদিক ঘুরিয়ে তোহফার আদলে নিষ্পলকে তাকালো। বললেন,
“মা হও বুঝবে কষ্ট হয় কি-না? চলো সই করে ফেলো সবাই অপেক্ষা করছে।”
আরিফুল ইসলাম মেয়ের হাতে কলমটা তুলে দিলেন। তোহফা বা’হাতে বাবা-র ও মায়ের হাত আগলে নিয়ে ডান হাত দিয়ে সই করলো। সই শেষ হতেই কেবিনের ওপাশ থেকে কাজি সাহেব কবুল বলতে বললে তোহফা খানিকটা সময় নিয়ে কবুল বললো। তোহফা কবুল বলতেই সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো। তারপর ছোটখাটো একটা মোনাজাতে তাদের দাম্পত্য জীবনের সুখ, শান্তির জন্য প্রার্থণা করলো সবাই। মোনাজাত শেষ হতেই তৌহিদ সবাইকে খুরমা খেজুর দিয়ে মিষ্টিমুখ করালো। সবাই খুশি। দু’দিকে থাকা দু’জন মানুষ খুশি, দুই পরিবারের প্রতিটা সদস্য খুশি। এভাবে বিয়ে হওয়ায় কেউ অখুশি মনের মাঝে পোষণ করলো না। তৌসিফ হাসপাতালের সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে জোর এক নিশ্বাস ছাড়লো ভেতর থেকে। তার ছোট্ট বোনটা আজ আরো বড়ো হয়ে গেছে। বোন থেকে আজ কারো বউ হয়ে গেছে তার সেই ছোট্ট বোনটা, একথা ভাবতেই বুকটা ভারি হয়ে আসছে। চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠলো, তবে তা গড়িয়ে পড়ার আগেই যত্নসহকারে লুকিয়ে ফেললো। তৌসিফ নিজেকে সামলে পিছু ফিরতেই ইলার মুখোমুখি হয়ে গেলো। ইলাকে দেখে তৌসিফ নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলো। ইলা তৌসিফের কাঁধে হাত রেখে বললো,
“তুমি কাঁদছো তৌসিফ?”
তৌসিফ ইলার কথায় এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো,
“কই না তো, আমি কাঁদছি না।”
“আমি স্পষ্ট তোমার চোখে পানি দেখলাম যে।”
“ও, চোখে কি যেনো একটা পড়লো।”
“বোন আজ থেকে অন্যকারো সম্পদ হয়ে গেছে সেই কষ্ট চোখে পড়েছে তাই-না।”
“বোনটা আমার দ্রুতই বড়ো হ’য়ে গেছে তাই-না ইলা?”
“হুম, এ-ই তো সেদিন আমাকে মা বরণ করে ঘরে তুলতেই আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো, ” আমি তোমার ননদ, একমাত্র ননদ আমাকে তুমি ভালোবাসবে তো ভাইয়ার মতো?” তোহফা অনেকটা আমার সন্তানের মতো। ওর পাগলামি, ভাবি ভাবি করে মাথা খারাপ করে দেওয়া, কথায় কথায় আমাকে জড়িয়ে ধরা সবকিছুই আমার অভ্যাস। মেয়েটার পাগলামি গুলো সত্যি আমার আনন্দের একটা অংশ হয়ে আছে।”
“জানো ইলা তোহফা যেদিন জন্ম নেয় ওর কোনো রেসপন্স ছিলো না। এটা দেখে বাবা-র অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। কারণ আমাদের বাবা, চাচা, খালা, ফুপি কারো কোন মেয়ে নেই! তোহফা আমাদের জীবনে সুখের বন্যা হয়ে এলো। মেয়ে হয়েছে শুনে আব্বু আলহামদুলিল্লাহ বললেন, আর ঠিক তখন ভেতর থেকে খবর এলো বাচ্চা কাঁদছে না, কারণ সে মৃত। আব্বু এই কথাটা শুনে দাঁড়ানো থেকে বসে পড়লেন। হঠাৎ কি হলো কে জানে কারো তোয়াক্কা না করেই ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। মা তখন সেন্সলেন্স হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। বাবা তোহফাকে কোলে তুলে নিলো। ডানকানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেওয়ার কয়েক মুহূর্ত পর-ই তোহফা কেঁদে উঠলো। ইলা জানো না সেদিনের কথা মনে পড়লে আমার এখনো কান্না আসে। সবাই যখন ভেবেছিলো বোন হয়তো মৃত জন্ম নিয়েছে একমাত্র আব্বু আল্লাহর উপর ভরসা করে সেদিন সাহস করে ওমন একটা কাজ করেছিলো। তখন ছোট ছিলাম অতো বুঝতাম না, ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম সব কিছু। ছোটবোনটা এই হাতের উপর বড়ো হয়েছে! আজ সেই হাতেই ওর বিয়ের খুশির খুর্মা খেজুর দিয়ে মিষ্টিমুখ করাচ্ছি সবাইকে, অথচ বুকে বোনকে পর করে দেওয়ার সুর বাজছে। আচ্ছা ইলা আমরা থাকবো কীভাবে বোনকে ছাড়া। আজ না-হয় বোন আমাদের বাড়িতে থাকবে! তবে বোন আজ থেকে অন্য কারো এটা ভাবতেই তো কষ্ট হচ্ছে। আজ থেকে চাইলেও তো আগের মতো বোনকে নিয়ে কোথাও যেতে পারবো না, বোনের শখ আহ্লাদ গুলো পূরণ করতে পারবো না। আমি জানি আওয়াদ আমার বোনকে খুব ভালো রাখবে। তবুও একটা প্রশ্ন, ও আমার বোনকে বুঝবে তো?”
আওয়াদ নিসন্দেহে একজন ভালো মনের মানুষ। ওর ভেতরে এক বাহিরে আরেক এই ব্যপারটা নেই। তুমি দেখো আমাদের তোহফা খুব ভালো থাকবে ওর কাছে। আমার সাথে তোহফার আট বছরের সম্পর্ক! অথচ আজ ওর বিয়ের খুশিতে কোথাও বা আমরাও কষ্ট হচ্ছে সেখানে তুমি ওর বড়ো ভাই খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক। তবে আমি বলবো সব মেয়েকেই বাবা-র বাড়ি ছেড়ে একদিন শ্বশুর বাড়ি যেতে হয় এটাই যে নিয়ম। জানো তৌসিফ আমার সমাজের এই রীতিনীতি সংস্কৃতি মানতে খুব কষ্ট হয়। একটা বাড়িতে প্রায় অনেকগুলো বছর কাটিয়ে হুট করেই অন্য এক বাড়িকে আপন করতে হয়। এতো চেনা মানুষের ভিড়ে কিছু অচেনা মানুষকে ভালোবাসতে হয়। কাছের মানুষদের ছেড়ে একদিন অনেক দূরে যেতে হয়। নিজের বাবা-মাকে মেয়েকে পর করে দিতে হয়। সত্যি বলতে এটা মানতে খুব কষ্ট হয়। কি আর করার এটাই তো হয়ে আসছে যুগযুগান্তর। তবে তুমি যা-ই বলো তোহফার পাগলামিতে সবাই এভাবে সায় দেবে আমি ভাবতেও পারিনি। সব শেষে এটাই বলবো যা হয়েছে খুব ভালো হয়েছে। ”
ইলার কথায় স্মিত হাসলো তৌসিফ। কি ভেবে তৌসিফ ইলার গালে হাত ছোঁয়ালো। ইলার গালে হাত ছোঁয়াতেই ইলা শিউরে উঠলো। ইলাকে শিউরে উঠতে দেখে তৌসিফ আবারও হাসলো। মেয়েটা আজ-ও তার ছোঁয়ায় প্রথম দিনের মতোই শিউরে ওঠে। জীবন সঙ্গী হিসেবে এমন একটা মানুষ মহান আল্লাহ তার জন্য লিখে রেখেছিলো ভাবতেই ভালো লাগে তৌসিফের। মেয়েটাকে যেদিন তারা প্রথম দেখতে গিয়েছিলো সে কি রাগ মেয়েটার। বাবা-মা জোর করেই তাদের সামনে এনে বসিয়েছিলো ইলাকে। ইলা মাথা নিচু করে যে রেখেছিলো সেই মাথা উঁচু করেছিলো ফিরে যাবার সময়, অবশ্য সাথে তৌসিফও ছিলো তখন। কারণ তাদের আলাদাভাবে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিলো। তৌসিফের সেদিনের ঘটনাটা আজ-ও স্পষ্ট মনে আছে যেদিন ইলার পাগলামিতে সে এবং তার পরিবার বিপাকে পড়েছিলো। তৌসিফের পরিবার গিয়েছিলো শুধুমাত্র মেয়ে দেখার আয়োজন করে তবে সেদিনই ইলার জেদের জন্য তাকে বিয়ে করে বউ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিলো। পরিবারের বড়ো ছেলের বিয়ে এভাবে কাউকে না জানিয়ে দিতে তার বাবা-মায়েরও খুব খারাপ লাগছিলো। এমন কি সেদিন তোহফাও তাদের সাথে ছিলো না। সেদিনের সে-ই ঘটনা মনে পড়তেই তৌসিফ আপন মনে হেসে উঠলো। তৌসিফকে হাসতে দেখে ইলা প্রশ্ন করলো,
“এভাবে কি ভেবে হাসছো?”
ইলার প্রশ্নে তৌসিফ নিজের হাসি বজায় রেখেই বললো,
“দেখতে হবে না তোহফা কার ননদ। ভাবির পাগলামি যে-মন মানতে গিয়ে আমাদের অবস্থা নাজেহাল হয়েছিলো, তেমনি ননদের পাগলামিতে তো অবস্থা এখনো ঠিকঠাক আছে। পাগলের সাথে পাগলামি বেশি মানায়। আর আমার বোনটা তোমার সঙ্গদোষে পাগলামি গুলো একটু বেশিই শিখেছে।”
কথাগুলো শেষ করেই তৌসিফ হাসতে হাসতে চলে গেলো। অন্যদিকে তৌসিফ কি বলে গেলো মনে করতেই ইলার মাঝে একরাশ লজ্জা হানা দিলো। সেদিনের কথাগুলো আজ-ও স্পষ্ট ইলার কাছে। ইলা তখন সবে ইন্টার পাশ করেছে এরমধ্যেই তার বাবা বললো ছেলে পক্ষ তাঁকে দেখতে আসছে। এই কথা শুনে ইলার রাগ তরতর করে বেড়ে যায়। ঘরের মধ্যে জড়বস্তুর মতো করে বসে থাকে। মা-বাবা একপ্রকার জোর করেই তাঁকে তৌসিফদের সামনে নিয়ে যায়। তবে ইলা মনে মনে ফন্দি আঁটে বিশাল এক ঘটনা ঘটানোর জন্য। তৌসিফ এবং তাকে যখন কথা বলার জন্য আলাদাভাবে ঘরে পাঠানো হয় তখন ইলা সর্বপ্রথম যে কথা বলে সেটা ছিলো,
“আমাকে এই মুহূর্তে বিয়ে করতে হবে, না হলে বিয়ে ক্যান্সেল। আরো একটা কথা এরপরেও যদি তাকে তার বাবা-মা জোর করে বিয়ে দেওয়ার জন্য তাহলে হয় পালিয়ে যাবে না-হয় সুইসাইড করবে।”
বেচারা তৌসিফ ইলার কথায় অনবরত ঘামতে শুরু করে। তার অবস্থা নাজেহাল দেখে ইলা মুখটিপে হাসে। সে ভাবে তার কাজ হয়ে গেছে। হয় তৌসিফের পরিবার আমাকে পছন্দ হয়নি বলে চলে যাবে, না-হয় মেয়ের চরিত্র ভালো না বলে প্রস্তাব নাকচ করে দিবে। কিন্তু ইলার এতো আনন্দ মাটি করে দিয়ে তৌসিফ জিজ্ঞেস করলো,
“সে কাউকে ভালোবাসে কি-না? ”
ইলা জানায় এমন কোন ব্যপার নেই! তার ইচ্ছে হয় এখনই বিয়ে না-হয় পাত্র রিজেক্ট। তবে আমাদের তৌসিফের ইলাকে বেশ পছন্দ হয় তাই সে তৎক্ষনাৎ বাবা-মায়ের সাথে ঘটনাটা খুলে বলে। তৌসিফের বাবা-মা অন্য বাবা-মায়ের থেকে আলাদা তাই তারা তক্ষুনি রাজি হয়ে যায়। অন্যদিকে ছেলেপক্ষ রাজি থাকায় ইলার বাবা-মাও কোনো দ্বিধাবোধ রাখেনা বিয়ে না দেওয়ার জন্য। কারণ তারা তৌসিফ ও তার পরিবারের খোঁজ খবর আগে থেকেই নিয়ে রেখেছিলো। এমন পরিবারে মেয়ে বিয়ে দিতে পারলে তারা-ও খুব খুশি হবে। ব্যাস তারপর, তারপর আর কি হুট করেই কাজী ডেকে বিয়ে কমপ্লিট করে ইলাকে নিয়ে তৌসিফ ও তার পরিবার বাড়ি ফেরে। বেচারি ইলা তৌসিফকে নাকানিচুবানি খাওয়াতে গিয়ে সেদিন নিজেই নাকানিচুবানি খেয়ে ওঠে তৌসিফ নামক মানুষটার সাথে জীবন জড়িয়ে। অবশ্য পরে ইলা বুঝতে পারে সব পরিবার ছেলে বিয়ে করিয়ে বাড়িতে কাজের লোক আনে না, কেউ কেউ ছেলে বিয়ে দিয়ে বাড়িতে মেয়ে আনে। ইলার বিয়ে না করার প্রথম কারণ ছিলো লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে এটা ভেবে। তবে তার ভাবনা ভুল প্রমাণ করে দিয়ে জাহানারা বেগম বিয়ের তিনদিনের মাথায় গিয়ে ইলার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলে,
“শুনলাম তুমি ইন্টার পাশ করেছো। এখন কি করবে কিছু ভেবেছো? এ-ই না-ও কিছু টাকা এটা আমার তরফ থেকে তোমার জন্য সামান্য ভালোবাসা। তবে ভর্তি যেখানেই হও আমাদের এখান থেকেই পড়াশোনা করবে। সংসার না-হয় আমি এখন সামলাই পরে তুমি সামলে নিও। আমার ছেলে, তোমার পড়ালেখা আর পাগলী ননদটার দায়িত্ব না-হয় আজ থেকে তুমি নাও, বাকিসব আমি সামলে নিবো।”
সেদিন ইলা আনন্দে কেঁদে দিয়েছিলো। নিজের জানা সকল মিথ্যা চিন্তাধারা পরিবর্তন করেছিলো মুহূর্তেই ৷ পুরাতন কথা মনে করতেই চোখের কোণায় জল জমলো। ইসস জীবনটা এতো সুন্দর কেনো? তার সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোও এতো ভালো কেনো?
ইন শা আল্লাহ চলবে…….
অনুমতি বিহীন কপি করা নিষেধ।