অতঃপর গল্পটা তোমার পর্ব-০৯

0
182

#অতঃপর_গল্পটা_তোমার
সমুদ্রিত সুমি

দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম” তখন চাপাস্বরে কথা বলছে লিমা তার মায়ের সাথে। একসময় সে রেগে গিয়ে ফোনটা কেটে দিলো। রাগের বসে ফোনটা আছার মারতে গিয়েও মারে না। মাঝে মাঝেই ইচ্ছে হয় পরিবারের থেকে সকল সম্পর্ক বিচ্ছেদ করে দিতে। আর ভালো লাগে না এই পরিবার নামক প্যারা। সবসময় টাকা টাকা করে মাথা খারাপ করে দেওয়া মায়ের মুখের উপর কিছু কড়া কথা বলতে চেয়েও পারে না। বাবা-র শরীরটা দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে। ভালো ডাক্তার চিকিৎসা চাইলেও করাতে পারছে না। একটা মানুষের কাছে কতো চাওয়া যায়। নিজের বিবেক বলতেও একটা কথা আছে। হঠাৎ পিছন থেকে কারো পায়ের আওয়াজ পেয়ে লিমা নিজেকে সংযত করে নেয়। পিছন ফিরতেই দেখে তৌহিদ তার নিকট এগিয়ে আসছে।

“আজান দিচ্ছে বাড়িতে যাবে না লিমু? আর এখানে কি করছো কোন সমস্যা?”

তৌহিদের কথায় লিমা উত্তর দিলো সে যাবে। এই কথা বলেই সে সিড়ি পথে এগিয়ে গেলো। তৌহিদ অবাক হলো লিমার আচরণে তবে তেমন কোন ভাবান্তর না করে সে-ও এগিয়ে গেলো লিমার পিছন পিছন। সকলেই বাড়িতে চলে গেছে প্রায় শুধু তৌসিফ, ইলা ও তোহফা রয়ে যাবে। একসাথে সকালেই তারা ফিরবে আওয়াদকে নিয়ে। জাহানারা বেগম ও আওয়াদের মা’কে নিয়ে বিয়ে শেষ হতেই ফিরে গেছে তার বাবা। সেলিনা বেগম এমনই অসুস্থ মানুষ, তাকে এখানে রেখে শুধু শুধু ভিড় বারিয়ে লাভ নেই। তৌহিদ তৌসিফকে একটা টেক্সট করেই বেরিয়ে পড়লো বাড়ির উদ্দেশ্য। অপরদিকে আওয়াদের চোখ জোড়া কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে খুঁজে চলেছে সে-ই কখন থেকে, তবে তার দেখা নেই। তখন মেয়েটাকে ওভাবে রাগ করে কেবিন থেকে বের করে দেওয়ার পর আর একবারের জন্যও মেয়েটা কেবিনে প্রবেশ করেনি। নিজের উপর নিজের খুব রাগ হলো আওয়াদের। তখন মেয়েটার পুরো কথা না শুনেই শুধু শুধু কতোগুলো কথা শুনিয়ে দিলো। অথচ মেয়েটা তাকে নিয়ে কতোটা ভাবে। আচ্ছা তোহফা কখন আসবে তার কাছে? সকল অভিমান দূর করে কখন আওয়াদের নিকট এগিয়ে আসবে সে। আওয়াদের মনে যে সুপ্ত অনুভূতিরা খেলা করতে শুরু করেছে। একটা ব্যপার ভাবতেই আওয়াদের কেমন জানি খুশি খুশি লাগছে। ব্যপারটা হলো, তোহফা যখন শেষ এই কেবিন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো তখন সে আওয়াদের না হওয়া প্রেমিকা ছিলো যাকে সে কাজল চোখের মেয়ে নামে ডাকতো! এবার যখন সে কেবিনে ঢুকবে তখন সে তার স্ত্রী রূপে প্রবেশ করবে। আওয়াদ তোহফাকে নতুন নাম দিবে। তোহফা নামের অর্থ ভাগ্যবান বা উপহার। তোহফা তার জীবনে শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে এসেছে তাই আজ থেকে তোহফাকে সে—।

“আপনি কি জেগে আছেন আওয়াদ?”

হঠাৎ নিজের ভাবনায় ভাটা পড়ে ইলার প্রশ্নে। আওয়াদ মাথা ঘুরিয়ে ইলার দিকে চাইতেই ইলা হাসিমুখে এগিয়ে আসে। মজা করে জিজ্ঞেস করে,

“কাঙ্ক্ষিত মানুষটার বদলে অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটার কন্ঠে বিরক্ত হলেন না-কি? ”

আওয়াদ মুচকি হাসে ইলার কথায়। তারপর বলে,

“কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে বোধহয় একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছি নিজের অজান্তে, তা-ই হয়তো তার মনের আকাশে মেঘ জমেছে।”

“মেঘ জমেছে সমস্যা নেই সকল মেঘ ভালোবাসা দিয়ে ভ্যানিস করে দিবেন। আর কাঙ্ক্ষিত মানুষটা যে হালাল ভাবে আপনারা হয়ে গেছে। তবে একটু আফসোস চাইলেও হালাল মানুষটাকে ছুঁয়ে দিতে পারবেন না, ইসস কি কষ্ট।”

ইলা কথাটা বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো। ইলার কথায় আওয়াদের লজ্জা পাওয়ার কথা তবে আওয়াদ লজ্জা না পেয়ে ইলার উদ্দেশ্য বললো,

“ফা ইন্না মা’আল ‘ইসরি ইউসরান, ইন্না মা’আল ‘ইসরি ইউসরা”

অর্থ_ অবশ্যই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে, অবশ্যই কষ্টের সাথে স্বস্তি লুকিয়ে আছে ভাবি। ”

ইলা আওয়াদের কথায় মুগ্ধ হলো। কীভাবে তার মজাটাকে ভালোবাসা দিয়ে পরিপূর্ণ করে তাকে বুঝিয়ে দিলো আওয়াদ। ইলা বুঝতে পারলো এই ছেলেটার কাছে তার ননদ ইনশাআল্লাহ অনেক অনেক ভালো থাকবে। তোহফাকে আওয়াদ মাথার তাজ করে রাখবে ইলা নিশ্চিত। তোহফা তার পরিবারের জন্য উপহার হয়ে এসেছিলো। আজ তোহফা আওয়াদকে ভাগ্য উপহার হিসেবে পেয়েছে। ইলার কেনো জানি চোখের কোণে জল জমলো। এতো খুশির মাঝেও চোখে জল কেনো আসে তা ইলার অজানা। তবে ইলার একটু বেশিই আনন্দ লাগছে এমন একজন মানুষের সাথে তার ননদের বিয়ে হয়েছে দেখে। তার সহজ সরল ননদ এমন একজন’ই জীবন সঙ্গী পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করে এটা আবারও প্রমাণিত হলো ইলার কাছে। কিছু সুখ একটু অদ্ভুত, সুন্দর এবং অন্য রকম। তবে এমন ভালোবাসা খুব সহজে তা দীর্ঘায়ু হয়ে থাকে না এটাই শুনে এসেছে তার মা চাচিদের থেকে! তবে কি কোনো অঘটন ঘটবে আওয়াদ ও তোহফার সুখের জীবনে? যা সব কিছুকে তছনছ করে দিবে। কোথাওবা কেউ নেই তো আওয়াদ ও তোহফার সুখে নজর দিতে?

সকালের মিষ্টিরোদ এই মুহূর্তে লোকটার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একরাশ বিরক্ত নিয়েই চায়ের কাপে চুমুক দিলো সে। চুমুক দিতেই গরম চায়ে জিহ্বা পুড়ে গেলো আচমকাই, ছ্যাৎ করে উঠলো জিহ্বা। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চায়ের কাপটা বেঞ্চির উপর রেখে চায়ের দাম পরিশোধ করে ফুটপাতের পথ ধরে এগিয়ে গেলো। আজকের সকাল তার জন্য শুভ নয় সেটা ভালোই বুঝে গেলো। এই মুহূর্তে নিজের উপর নিজেই খুব বিরক্ত। নিজের বিরক্ত কয়েকগুন বাড়িয়ে দিতেই ফোনের মেসেজ টোনটা বেজে উঠলো। লোকটা মেসেজ পেয়েই বুঝতে পারলো মেসেজটা কার হতে পারে। ইচ্ছে হলো না মেসেজটা চেক করার কারণ সে জানে মেসেজে কি লেখা আছে। তবুও উত্তর দিতে হবে ভেবেই মেসেজটা চেক করলো। যা ভেবেছিলে সেটাই হয়েছে। ছোট্ট মেসেজ তবে সে-ই মেসেজে কারো উগ্রতেজ ভরপুর মিশে আছে। মেসেজে লেখা,

“তোমাকে বলেছিলাম মেয়েটাকে আহত করতে ছেলেটাকে নয়। তুমি আমার সকল কাজে পানি ঢেলে দিলে। তোমার ছোট্ট ভুলের কারণে ওদিকে কি হয়ে গেছে জানো? আমি এই কাজটা আর তোমাকে দিয়ে করাবো না। তুমি তোমার রাস্তা দেখো আমি আমার। তুমি আর ফোন করবে না আমাকে বলে রাখলাম।”

মেসেজটা পড়ে লোকটার রাগ আকাশ ছুঁই ছুঁই। এটা কি মগের মুল্লুক না-কি? ইচ্ছে হলো কাজ দিলো আর ইচ্ছে হলেই তা ফিরিয়ে নিলো। তবে অন্য কাজ হলে সে কাজটা নিজেই করতো না। তবে এই কাজটা যে করেই হোক তাকে করতে হবে তাতে ওই লোকটার হাত-পা ধরে হলে-ও। নিজের মনে মনেই ফোনের মানুষটাকে কতোগুলো গালাগাল করে বিরবির করে বলতে রইলো,

“মেয়েটার প্রতি আমার ভিষণ লোভ হয়েছে। ওই নরম তুলতুলে শরীরকে ছুঁয়ে দেওয়ার আগে ক্ষত-বিক্ষত করা আমার নিয়মের মাঝে পরে না। আমি আমার এই শক্ত হাতের ছোঁয়ায় তাঁকে ভালোবেসে তারপর না-হয় তার শরীরকে একটু একটু করে ক্ষত-বিক্ষত করে দিবো। ভয়ে তার শরীর কাঁপবে, সাথে কাঁপবে ঠোঁট। মিনতি করে ভিক্ষা চাইবে বাঁচাতে চাইবে নিজের ইজ্জত। হা হা হা।”

সময় সকাল এগারোটা। হাসপাতালের সকল ফর্মালিটি পূরণ করে বাড়ি ফিরতেই সময় লেগে যায় সকাল দশ-টা। বাকি সময় এই ব্যস্ত নগরীর যানযট যুক্ত পরিবেশে কেটে গেছে। তোহফা ও ইলা ব্যাগপত্র নিয়ে ভাড়া করা গাড়িতে বসার কিছুক্ষণ পর তৌসিফ আওয়াদকে নিয়ে আসে। অবশেষে আওয়াদকে নিয়ে তারা নিজের বাড়িতেই ফিরে আসে। বাড়িতে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ইলা চলে যায় শাশুড়ীকে রান্নার কাজে সাহায্য করতে। তোহফা ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে আসতেই তার মা বলে,

“এখানে নাস্তা আছে আওয়াদকে দিয়ে আসো, আর সকালের ঔষধ আছে নিশ্চয়ই, যা-ও দিয়ে এসো। দায়িত্ব যখন নিয়েছো সেগুলো নিষ্ঠাবান হয়ে পালন করো।”

মায়ের কথায় তোহফার কাঁদো কাঁদো অবস্থা। পারলে সে এখনই কেঁদে ফেলে। তোহফার এমন অবস্থা জাহানারা বেগমের নজরে না এলে-ও ইলার নজরে এসেছে। সে দুপুরে রান্না করার জন্য তরকারি কাটছিলো। তরকারি কাটা বাদ দিয়ে তোহফাকে ইশারা করলো, “কি হয়েছে? ” তোহফা তার ভাবিকে ইশারায় বললো বাহিরে আসতে। ইলা যথারীতি তরকারি কাটা রেখে তোহফাকে অনুসরণ করে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো।

“কি হয়েছে মুখটা এমন করে রেখেছো কেনো?”

“ভাবি আমি কীভাবে যাবো উনার সামনে?”

“কীভাবে যাবে মানে কি? যেভাবে যা-ও সেভাবে যাবে। আর শুনো মানুষমাত্র ভুল হয় তার-ও হয়েছে তাই বলে তুমি রাগ বা অভিমান করে কেনো আওয়াদের কাছে যাবে না?”

“ভাবি রাগ বা অভিমান আমি কোনটাই করিনি তার সাথে ।”

“তাহলে যেতে অসুবিধা কোথায়?”

“আমার লজ্জা লাগছে ভাবি। কেমন করে আমি উনার মুখোমুখি হবো! এই কথা ভাবলেই আমার কেমন কেমন লাগছে।”

“বোঝো ঠেলা মেয়ে বলে কী? স্বামীর সামনে যাবে তা-ও না-কি তার কেমন কেমন লাগে আজব তো। হুট করেই তো আয়োজন ছাড়া বিয়ে করে নিলে, সে বেলায় কেমন কেমন লাগেনি। তোহফা প্রথম প্রথম এমন লাগবে তাই অস্বস্তিটা তোমাকেই দূর করতে হবে আগ বাড়িয়ে, কারণ আওয়াদ অসুস্থ। আওয়াদ চাইলেও তোমার অস্বস্তি দূর করতে পারবে না, কারণ বেচারা নিজেই এখন অচল হয়ে পড়েছে। আর শোন, তোহফা তুমি পারবে এটা আমার বিশ্বাস। তাই সকল অস্বস্তি দূরে ঠেলে যা-ও খাবারটা খাইয়ে ঔষধ দিয়ে আসো। এমনি উনি আমাদের বাড়িতে নতুন, তোমার থেকে তার অস্বস্তি দিগুণ। একে শ্বশুর বাড়ি তার উপর এভাবে অচল হয়ে এখানে এসেছে, তাই তোমার উচিত তাকে সাহস দেওয়া। তোমার একমাত্র কাজ আওয়াদের খেয়াল রাখা, তার কখন কি প্রয়োজন সেটা লক্ষ্য রাখা! বাকিসব আমরা দেখে নিবো।”

ইলা চলে গেলো। তোহফা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে রান্নাঘরে প্রবেশ করলো। মায়ের দেওয়া খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে সন্তপর্ণে এগিয়ে গেলো নিজের ঘরে যেখানে এই মুহূর্তে আওয়াদ আছে। তোহফা ঘরে ঢুকতেই দেখলো আওয়াদ বিছানা থেকে উঠার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করছে। আচমকা আওয়াদের ডানহাত স্লিপ করে যেতেই সে মুখ থুবড়ে বিছানার কোণে পড়ে যায়। তোহফা জলদিই দৌড়ে এসে খাবারের ট্রে বিছানার এক কোণে রেখে আওয়াদকে ধরলো। তবে ততোক্ষণে আওয়াদের যা ব্যথা পাওয়ার সেটা পাওয়া হয়ে গেছে। আওয়াদ ইসস বলেই চোখমুখ খিঁচে নিলো ব্যথায়। আওয়াদের এমন অবস্থা দেখে তোহফার খুব খারাপ লাগলো। নিজের অস্বস্তির জন্য মানুষটা এভাবে ব্যথা পেলো।

“অনেক ব্যথা পেয়েছেন? ইসস একবার ডাকবেন তো কাউকে?”

তোহফার কথায় আওয়াদে তেমন ভাবান্তর নেই, সদ্য পাওয়া ব্যথাটা মুখ বুজে সহ্য করে বললো,

“অচেনা বাড়ি, ধরতে গেলে বাড়ির সবাই আমার কাছে অচেনা। এখানে কেমন করে কাউকে ডাকবো আপনি বলেন? আমি নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করি, কারো সাহায্য চাইতে আমার বিবেক বাঁধা দেয়।”

“আরে অন্য সময় আর এখন তো পার্থক্য। আপনি তো অসুস্থ। ”

“কাকে ডাকবো আপনিই বলুন? আর তারা এলে এটা বলবো আমি ওয়াশরুম যাবো আমাকে একটু নিয়ে যান।”

“আপনি এভাবে বলছেন কেনো?”

“তো কীভাবে বলবো আপনিই বলে দেন।”

“আমাকে ডাক দিতেন, বা টেক্সট করতেন।”

“আপনাকে ডাকবো কি জন্য। আমাকে এই ঘরে দিয়ে যাওয়ার পর একবারের জন্য হলে-ও এসেছেন আমার কোনো প্রয়োজন আছে কি-না সেটা জিজ্ঞেস করতে।”

“সরি, আসলে আম—

“থাক হয়েছে কোনকিছুর বিশ্লেষণ দিতে হবে না। যদি পারেন আমাকে একটু ধরুন আমি ওয়াশরুমে যাবো। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে এক চাপিয়ে রেখেছি আর পারছি না।”

তোহফা তাড়াতাড়ি আওয়াদের ডান হাত নিজের ঘাড়ের উপর রেখে নিজের বাঁহাত দিয়ে আওয়াদের কোমর পেঁচিয়ে ধরে আস্তে আস্তে ওকে বিছানা থেকে তুললো। ধীরগতিতে আওয়াদকে ওয়াশরুমে নিয়ে গেলো অবশেষে। কিছুক্ষণ পর আওয়াদ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই আগের মতোই তাকে ধরে নিয়ে বিছানায় শোয়ালো। আওয়াদ শুয়ে পড়তেই তোহফা নিজের হাত পরিষ্কার করতে চলে যায়। ফিরে এসে আওয়াদকে খাবার পরিবেশন করতে গেলেই আওয়াদ গম্ভীর কন্ঠে বলে,

“ডান হাতটা এখনো ঠিক আছে, হয়তো একটু ছিলে গেছে তবে অসুবিধা নেই খেতে পারবো। কারো দয়া লাগবে না।”

আওয়াদের কথায় তোহফা কষ্ট পেলো। আবারও এটাও বুঝলো আওয়াদ অভিমান করেছে হয়তো তার উপর। আর সে আওয়াদকে দয়া কেনো করবে? ভালোবেসেই এগুলো করছে। হয়তো সে ভালোবাসার কথা মুখে বলতে পারছে না, তাই বলে লোকটা দয়া বলে উঠলো। তোহফা খেয়াল করেছে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে আওয়াদ বারবার তার দিকে তাকিয়েছে। চোখের ইশারায় তোহফার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছে! তবে তোহফা কেনো জানি একবারের জন্যও তাকাতে পারেনি। তারপর ঘরে দিয়ে এসে যে সে হাওয়া হয়েছে আর এই ঘরে আসেনি তা-ই হয়তো আওয়াদ অভিমান করেছে। তোহফা আওয়াদের কথা তোয়াক্কা না করে বললো,

“আমার ভুলগুলো ভুল, আর আপনার করা ভুলগুলো কি সাধু?”

তোহফার ইংগিত বুঝতে পেরে আওয়াদ বললো,

“ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা চাওয়ার যে একটা সুযোগ সেটাও তো দিচ্ছেন না, তাহলে দোষ কি আমার?”

“দোষ কোথায় দিলাম?”

“দোষ দিবেন কেন, অভিযোগ করছেন তো।”

“যেটাই ভাবুন অসুবিধা নেই। এখন চুপচাপ খাবার খেয়ে একটা লম্বা ঘুম দিন, সারারাত জেগে ছিলেন।”

“গোটা একটা রাত কি আমি একাই জেগেছিলাম না-কি? আপনিও ছিলেন। আপনি ঘুমাবেন না?”

“ঘুমাবো, আমি আগে গোসল করবো তারপর, না-হয় আমার ঘুম আসবে না।”

“আমরাও খারাপ লাগছে, গোসল করতে পারলে ভালোই লাগতো।”

“এই না, আপনার পানি লাগানো নিষেধ। একটা কাজ করছি কুসুম গরম পানি দিয়ে আপনার শরীর মুছিয়ে দেই তাহলে ভালো লাগবে।”

“কে মুছিয়ে দিবে আপনি?”

“হ্যাঁ কেনো আমি তো পার—।”

তোহফা জিহ্বায় কামড় দিলো কি বলে ফেলেছে নিজের অজান্তেই এটা ভেবে। তোহফাকে আচমকা চুপ হতে দেখে আওয়াদ মুচকি হাসলো। তোহফা আড় নজরে আওয়াদকে হাসতে দেখে লজ্জায় পড়ে গেলো। তোহফার লজ্জা আরো বাড়িয়ে দিতে আওয়াদ বললো,

“যে মেয়ে আমার সামনে আসতেই ভয় পাচ্ছিলো, সে কীভাবে আমার শরীর মুছিয়ে দিবে? তার বুঝি লজ্জা করবে না।”

তোহফা আওয়াদের কথায় পল্লব জোড়া এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে রইলো। লজ্জায় তার মাথা কাটা যাচ্ছে। কথা বলতে বলতেই অপ্রয়োজনীয় কথা বলাটা তাকে কেমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেললো ভেবেই কেমন একটা লাগছে। তোহফা পারছে না এখান থেকে ছুট লাগিয়ে পালিয়ে যেতে। এখন চলে গেলে হয়তো মানুষটা আবারও অভিমান করবে। সে-ই অভিমান থেকে নাস্তাটাই আর করবে না। তাই সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে তোহফা আওয়াদের মুখে খাবার তুলে দিলো। আওয়াদ তোহফার এমন কান্ডে হা হা হা করে হেসে উঠলো। তার হাসি তোহফার লজ্জা আরো কয়েক গুন বাড়িয়ে দিলো। এভাবেই পথচলা শুরু তাদের নতুন জীবনের বুঝি।

নিমগ্নতা ঘিরে আছে ইলাকে। কি করছে কে ডাকছে সেদিকে তার খেয়াল নেই। হঠাৎ জাহানারা বেগম ইলার কাঁধে ঝাঁকি দিতেই ইলা নিজের হুঁশে আসে। জাহানারা বেগম ইলার কান্ডে অবাক হয়। ইলা কখনোই কাজের সময় অন্যমনস্ক থাকে না হঠাৎ কি হলো ভেবে সে প্রশ্ন করলো,

“কোনো বিষয় নিয়ে তুমি কি চিন্তিত ইলা?”

শাশুড়ী মায়ের সরাসরি প্রশ্নে ইলা ইতঃস্তত বোধ করলো। তৎক্ষনাৎ কিছু বলতে পারলো না। কিছু সময় নিয়ে বললো,

“আমার মনে হয় লিমার পরিবারে কোনো একটা সমস্যা চলছে মা। আপনি একবার কথা বলে দেখবেন লিমার সাথে। মেয়েটা আজকাল একটু বেশিই ওর মায়ের সাথে রাগারাগি করে। আন্টি ফোন দিলেই লিমা একথা ওকথা বলেই ফোন কেটে দেয়। আপনি তো জানেন লিমা চাপা স্বভাবের মেয়ে সব কিছু চাইলেও সবাইকে বলতে পারে না, তাই আপনি যদি একটু কথা বলে দেখতেন।”

“তুমি কি লিমাকে নিয়েই এতক্ষণ ভাবছিলে?”

“আসলে মা–”

“কি হয়েছে বলো আমায়, কেউ কিছু বলেছে তোমায়?”

“নিচতলার চাচি এসেছিলো একটু আগে।”

“কে নিঝুমের মা?”

“হ্যাঁ।”

“কি বললো?”

“আগামীকাল তার মেয়ের গায়ে হলুদ, পরশু বিয়ে সেই দাওয়াত দিয়ে গেলো।”

“হ্যাঁ, তো সেটার সাথে তোমার চিন্তিত হওয়ার কারণ কী?”

“মা তিনি দাওয়াত দিয়েছে, আর বাবা দাওয়াত কবুল করেছে।”

“দাওয়াত তো কবুল করার কথাই ছিলো, তোমার শ্বশুর আমাকে জিজ্ঞেস করেই তাদের দাওয়াত কবুল করেছে। কথা না ঘুরিয়ে সরাসরি বলো কি হয়েছে?”

“বাবা দাওয়াত কবুল করে ঘরে আসতেই তিনি আমায় বলেছেন।”

ইলা এতোটুকু বলে থামলো। বাকি কথা বলতে পারলো না। ইলা কখনোই মিথ্যা কথা বলতে পারে না! আর সে-ই মিথ্যা কথা যদি তার শাশুড়ীকে বলতে হয় তাহলে তো মোটেও পারে না। ইলাকে এমন ভাবনায় মশগুল দেখে জাহানারা বেগম বললেন,

“কি বলেছে ইলা বলো।”

“মা, উনি আমায় তার মেয়ের বিয়েতে যেতে বারণ করেছে। বলেছে আপনারা সবাই গেলেও আমি যেনো না যা-ই এটা তার অনুরোধ।”

“কখন বলেছে কথাটা? সকালেই?”

“হুম।”

“তুমি কিছু বলোনি।”

“না মা আসলে হয়েছে কি…”

“লিমা, লিমা রান্নাঘরে একটু আসো তো।”

ইলা কথা শেষ করার আগেই জাহানারা বেগম চিৎকার করে লিমাকে ডাকতে রইলো। অন্যদিকে শাশুড়ী মায়ের চিৎকার শুনে ছুটে রান্নাঘরে প্রবেশ করলো লিমা। লিমার পিছন পিছন তোহফাও ছুটে এসেছে। কারণ তার মা অতি শান্ত মানুষ। খুব রেগে গেলেও তাকে চিৎকার করতে দেখা যায় না সহজে। তবে যখন তার মা খুব কষ্ট বা ব্যথা পায় কারো কথায় তখন তিনি নিজেকে সামলে রাখতে পারেন না। হঠাৎ তার মায়ের চিৎকারে তা-ই হয়তো সবাই ভয় পেয়ে ছুটে এসেছে। তোহফা মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে মা? এভাবে চিৎকার করে ভাবিকে ডাকলে কেনো, কোন সমস্যা?”

মেয়ের কথায় চোখ মোটা করে তাকালেন জাহানারা বেগম। মায়ের দৃষ্টিতে কিছু একটা ছিলো তোহফা কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো। জাহানারা বেগম গম্ভীর কন্ঠে বললেন,

“তোমাকে ডেকেছি এখানে?”

“না মা আসলে তুমি চিৎকার করে উঠলে তাই।”

“তাহলে তুমি এলে কেনো? এখনি

আওয়াদের কাছে যা-ও, এক সেকেন্ডের জন্যও তুমি এখানে থাকবে না। সব কিছুতেই তোমার মাতব্বরি করা বন্ধ করো। যা-ও এখান থেকে।”

শেষের কথাটা একটু জোরেই বললো জাহানারা বেগম। তোহফা সহ লিমা ও ইলা তিন’জনেই কেঁপে উঠলো সে চিৎকারে। তোহফা ভয় পেয়ে ছুটে বাবা-র কাছে চলে গেলো। তোহফা আন্দাজ করলো নিশ্চয়ই আজ কিছু হতে চলেছে। ওদিকে লিমাকে কিছু কাজ বুঝিয়ে দিয়ে ইলার হাতটা শক্ত করে ধরলো জাহানারা বেগম। জাহানারা বেগমের এমন রূপের সাথে ইলা বা লিমা খুব কমই পরিচিত, তাই তাদের অন্তরআত্না কেঁপে উঠলো শাশুড়ীর এমন রূপে। ওদিকে তোহফা ছুটে তার বাবা-র কাছে গেলো। আরিফুল ইসলাম তখন সবে খবরের কাগজটা হাতে নিয়েছেন পড়বে বলে। মেয়েকে এমন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে আরিফুল ইসলাম বিচলিত হলো। খবরের কাগজটা টি-টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালো।

“কি হয়েছে তোহফা? আওয়াদ ঠিক আছে?”

“উনি ঠিক আছে আব্বু তবে মা রেগে গেছে। মা বড়ো ভাবিকে নিয়ে হয়তো কোথাও যাচ্ছে, মায়ের অবস্থা কিন্তু আমার ভালো ঠেকলো না।”

ইন শা আল্লাহ চলবে…..