অতঃপর গল্পটা তোমার পর্ব-১৫

0
170

#অতঃপর_গল্পটা_তোমার
সমুদ্রিত সুমি
১৫

সন্ধ্যায় ব্যস্ত নগরী খানিকটা আরো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কারণ সারাদিনের ক্লান্তি শেষ করতেই তখন সবাই বাড়ি ফেরার তাগিদে চলতে থাকে। প্রতিটা ব্যস্ত মানব-মানবীর শান্তির নীড়ের নাম ‘ফেরা’। আপনি সারাদিন এখানে ওখানে বিরাজ করলেও সন্ধ্যা বা রাতে শান্তির নীড়ে ফিরতেই হবে। তাই তো অনেকেই এই শান্তির নীড়ের নাম দেয় নিজেদের পছন্দসই একটা সুন্দর কিছু। যে নামের সাথে সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। সন্ধ্যার আকাশে জ্বলজ্বল করছে তারা। অসংখ্য তারার ভিড়ে একটা থালার আকারে মিষ্টি চাঁদ। চাঁদের আলোয় ধরণী আলোকিত হয়ে আছে। মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে শহরের সকল আলো নিভিয়ে একদিন চাঁদের আলোয় আলোকিত হোক ব্যস্ত নগরীর পথ! ক্ষতি কোথায় তাতে? সেই পথের সূচনা থেকে শুরু করে শেষ অবধি প্রিয় মানুষটা পাশে থাকুক। হাতে থাকুক তার ভরসার হাত, কাঁধে থাকুক তার মাথা এবং বুকে থাকুক তার জন্য অঘাত পরিমাণের ভালোবাসা। এই ব্যস্ত নগরীর পথ ধরেই এগিয়ে চলেছে তৌসিফ এবং তৌহিদ। দুই ভাই পাশাপাশি অফিসে কাজ করায় প্রায় একসাথেই বাড়িতে ফেরে। আজ-ও একসাথেই বাড়িতে ফিরছে এক রিক্সায় করে। বিভিন্ন কথায় দুই ভাই মশগুল। খানিক থেকে থেকে তারা হাসছে কখনো খুব গম্ভীর হয়ে একে-অপরের কথা শুনছে। হঠাৎ তৌসিফ রিক্সা থামিয়ে নেমে যায়। তৌহিদও ভাইয়ের সাথেই নেমে পরে। তৌসিফ একটি বেকারির দোকানে গিয়ে দু’দিন আগে অর্ডার দেওয়া কেকটা নিয়ে বিল পরিশোধ করে। কেকটা তোহফা খাওয়ার বায়না করেছে। আর বোনের বায়না রাখতেই অর্ডার দিয়ে স্পেশাল কেক আজ নিয়ে যাচ্ছে। টুকটাক আরো কিছু খাবার নিয়ে কাঙ্ক্ষিত রিক্সার নিকট এগিয়ে যায়। আচমকা তৌসিফের কাছে ছুটে আসে একটা বাইক। তৌসিফ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে ধাক্কা দেওয়ার তাগিদে ছুটে আসতেই তৌসিফ ভয়ে চোখ বুজে নেয়। পিছন থেকে তৌহিদ দৌড়ে এসে ভাইকে সরিয়ে নিতেই তাদের পাশ বেয়ে শা শা বেগে ছুটে যায় কালো রঙের বাইকটা। তৌসিফকে তৌহিদ আচমকা সরিয়ে নিতেই হাতে থাকা সকল খাবারের প্যাকেট নিচে পড়ে যায়। ধুলোমাখা রাস্তায় কেকটা লেপ্টে পড়ে থাকে।তৌসিফ ভয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। তৌহিদ উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করে,

“ভাইয়া তুমি ঠিক আছো? তোমার লাগেনি তো? এই অন্ধ হয়ে গাড়ি চালাস নাকি জা***য়া*র। তোদের মতো বেয়াদবের জন্য আজকাল রাস্তাঘাটে হাঁটা যায় না। আল্লাহ তোমার নিকট হাজার শুকরিয়া। ”

তৌহিদ একাধারে চিৎকার করে বেশি কথা বলে চলেছে বাইকের লোকটাকে। আর তৌসিফ তখনো ঘোরের মাঝে আছে। একটু আগে কী হতে চলেছে ভাবতেই তার সমস্ত শরীর ঠান্ডা বরফে পরিণত হচ্ছে। বুকটা ধক ধক করছে। থরথর করে কাঁপছে শরীর। আশেপাশের অনেকেই এসে ওদের দু’জনকে ঘিরে ধরল। একে একে সবাই তৌসিফ ঠিক আছে কিনা প্রশ্ন করল। তৌহিদ তৌসিফকে ধরে নিয়ে রিক্সায় উঠে। আধঘন্টা পর বাড়ি ফেরে তারা। কলিং বেল চাপতেই লিমা দরজা খুলে দেয়। দুই ভাই ঘরে ঢুকতেই তাদের এলোমেলো চেহারা বাড়ির সকলের নজরে পড়ে। বাড়ির সকলে তখন ড্রইংরুমে বসে চা খাচ্ছে শুধু আওয়াদ বাদে। সে ঘরে বসে উপন্যাস পড়ছে। আরিফুল ইসলাম জিজ্ঞেস করতেই তৌহিদ সব খুলে বলে। তৌহিদের কথায় আরিফুল ইসলাম বললেন,

“বাইকের নাম্বার প্লেটটা খেয়াল করেছো তৌহিদ। ”

“আসলে বাবা আমি তখন খেয়াল করিনি।”

“যাক আল্লাহ রহমত করেছেন এটাই বড় কথা। আমি মসজিদে যাচ্ছি দু’রাকাআত শুকরিয়ার নফল নামাজ আদায় করে একবারে এশার নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরব। তৌসিফের মা তুমিও পড়ো গিয়ে।”

জাহানারা বেগম অতি কঠিন মনের মানুষ, তবুও তিনি একজন মা। সন্তানের এত বড় বিপদ হতে যাচ্ছিল শুনে তার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এই জন্যই হয়তো আজ সারাদিন তার অস্থির লেগেছে। তিনি এগিয়ে এসে তৌসিফকে বুকে জড়িয়ে নেয়। মায়ের চোখের কোণে জল জমেছে দেখে তৌসিফ মাকে বুকে জড়িয়ে বলে,

“এভাবে কাঁদছ কেন আমার কিছু হয়নি এই দেখো। ”

একথা বলে তৌসিফ নিজের শরীরটা দেখায়। তৌসিফের কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে তোহফা। ভাইকে একটা কিল দিয়ে বলে,

“একদম কথা বলবা না, কতবার বলেছি একটু সাবধানে চলাচল করবা কিন্তু কথাই শোন না। কী দরকার ছিল কেক আনতে যাবার। যখন যে আবদার করবো তখন সেই আবদারই কী পূরণ করতে হবে নাকি? আমি কেক আর জীবনেও খাবো না। আজ থেকে আমি আর কোন আবদারও করবো না। আমার এই আবদার আজ আমার ভাইকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল। সব দোষ আমার।”

বোনের আহ্লাদী কথায় তৌসিফ মুচকি হাসে। বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,

“দশ-টা নয় পাঁচটা নয় একটা মাত্র বোন আমার! সে আবদার করবে না তো কে করবে পাড়ার নানিরা? আমার লক্ষী বোন কাঁদে না। আওয়াদ কোথায়?”

তোহফা নাক টানতে টানতে বলে,

“ঘরে।”

“আচ্ছা, যা-ও ঘরে যাও আর একদম কেঁদো না, সব ঠিক আছে।”

তোহফা চোখ মুছতে মুছতে ঘরে চলে যায়। জাহনারা বেগম তৌসিফের শরীরে দোয়া পড়ে ফুঁ দেয়। তারপর ছেলেকে আরো কিছুক্ষণ বুকে জড়িয়ে রাখে। হঠাৎ কি মনে করে বলে,

“ঘরে যা-ও ইলাকে নিয়ে।”

একে একে সবাই ঘরে চলে যায়। তোহফা মুখটা অন্ধকার করে ঘরে প্রবেশ করে। তোহফার আলাপ পেয়ে আওয়াদ উপন্যাসের বই থেকে মুখ তুলে তাকায়। তোহফার চোখের কোণে জল দেখে অস্থির হয়ে প্রশ্ন করে,

“তোহফা কী হয়েছে তোমার? কোনো সমস্যা? আমাকে বলো।”

তোহফা আওয়াদের কথার উত্তর দেয় না, সে গুটিগুটি পায়ে আওয়াদের কাছে এগিয়ে যায়। আওয়াদকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আওয়াদকে জড়িয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে। তোহফার আচরণে আওয়াদ উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করে,

“আমার তোহফা রাণীর কি হয়েছে সে কাঁদছে কেন? কেউ তাকে বকেছে?”

তোহফা চুপ কোনো কথা নেই। একাধারে সে কেঁদেই চলছে শুধু। আওয়াদ আবারও প্রশ্ন করে,

“তোহফা রাণী কী হয়েছে না বললে বুঝবো কিভাবে? ”

“তোহফা রাণীর কান্না পাচ্ছে সে এখন কাঁদবে আপনি ডিস্টার্ব করবেন না।”

“বুঝলাম তোহফা রাণীর কান্না পেয়েছে, তবে কান্না পাবার কারণ কি সেটা বলা যাবে?”

“যাবে।”

“তাহলে বলুন।”

“আমি দুদিন আগে ভাইয়ের কাছে

আবদার করেছিলাম কেক খাবো।”

“হ্যাঁ ভাইয়ের কাছে বোন তো আবদার করবেই এখানে কান্নার কী আছে।”

“আমার জন্য সেই কেক আনতে গিয়ে আজ ভাইয়ের এক্সিডেন্ট হতে যাচ্ছিল।”

“মানে কী হয়েছে?”

তোহফা সব খুলে বলতেই আওয়াদ তোহফার চোখের পানি মুছিয়ে দেয় পরম আদরে।

“মানে তোহফা রাণী নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করছে।”

“হ্যাঁ, আমার জন্যই তো এমনটা হয়েছে। সেদিন আমার জন্য আপনার এই অবস্থা হয়েছে! আজ আমার আবদার পূরণ করতে গিয়ে ভাইয়ার সাথে ওমন ঘটনা ঘটতে গেছিলো।”

“তোহফা রাণী অবুঝ নয়! সে সবটা বোঝে। তাহলে এটা বোঝে না কেন? যা হবার তা হবে তাতে তার কেন কখনো কারো হাত থাকে না।”

“তবে আমার বেলাতেই কেন হয়?”

“ওটা ভাগ্য।”

“আপনি আর কথা বলবেন না, আমার কান্না পাচ্ছে বেশি বেশি।”

“জোহুকুম তোহফা রাণী, আপনি কাঁদুন, আপনার সেবায় আমি নিয়োজিত আছি।”

“এ্যা নিজের সেবা কে করে উনি আসছে আমার সেবা করতে উঁহু।”

তোহফার কথায় আওয়াদ স্মিত হাসে। হাতের জোড় আরো একটু বাড়িয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় তোহফাকে। তোহফা আওয়াদের বুকে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো লেপ্টে নিজেকে জড়িয়ে নেয়। মেয়েটা অল্পতেই ভেঙে যায়। এমন তুলতুলে মনটাকে খুব যত্নের সাথে হৃদয়ের মাঝে তুলে রাখতে হবে। কেউ কখনো চাইলেও যেন তাকে আঘাত করতে না পারে। “সকল দুঃখ মেঘের মতন ভেসে যাক, সুখগুলো সব হৃদয়ের কোণে জমা থাক।”

কেঁদে যাচ্ছে ইলা তৌসিফকে জড়িয়ে ধরে। তৌসিফ হাজার বুঝিয়েও ইলাকে শান্ত করতে পারছে না, অবশেষে উপায় না পেয়ে তৌসিফ আচমকা একটা কথা বলে বসে,

“তুমি জানো ইলা, তুমি যখন কাঁদো তখন তোমায় কিছুটা আফিম নেশার মতো মনে হয়! মনে হয় খেলে আমি এখনি মাতাল হয়ে ঘুরে পরে যাব। আবার তোমায় আদর করতেও ইচ্ছে করে তখন খুব।”

তৌসিফের কথায় ইলার কান্না থেমে যায়, সে রসগোল্লার মতো চোখ দু’টো বড় বড় করে বলে,

“সব সময় ফাজলামো তাই না? মুখে কিছু আঁটকায় না।”

“কীভাবে আঁটকাবে বলবে ? নিজ ইচ্ছায় যদি কোনো নেশা ধরা দেয় কার সাধ্যি তাকে দূরে ঠেলে দেবার।”

“খুব মজা করা হচ্ছে আমাকে নিয়ে তাই না, তবে ভেবে দেখেছো যদি তোমার কিছু হয়ে যেত।”

“হয়ে যেত যদি, হয়নি তো আলহামদুলিল্লাহ সেজন্য। ”

“যদি…”

“যদির কথা নদীতে ফেলে দাও, কারণ হয়নি।”

“আমার তো ভয়ে এখনো কলিজায় পানি নেই।”

“কাছে আসো প্রেম ফলের রসে তৃষ্ণা মিটিয়ে দেই।”

এই কথা বলেই তৌসিফ ইলাকে জড়িয়ে নিতে চাইলে ইলা ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ায়,

“অসভ্য লোক একটা।”

“এই তুমি অসভ্য বলছো কাকে তোমার সাহস তো কম নয়।”

“উঁহু, আসছে আমার সাহস নিয়ে কথা বলতে। তুমি জানো আমার কত সাহস।”

“জানি, তার নমুনা স্বরূপ দেখালে তো মাত্র।”

“ধুত্তেরি, তোমার সাথে কথা বলাই আমার ঘাট হয়েছে। ”

রাগ করে ইলা ঘরে থেকে বেরিয়ে যায়। ইলা চলে যেতেই তৌসিফ মুচকি হাসল। যাক মেয়েটার কান্না একটু দেরিতে হলেও কমানো গেছে। তৌসিফ ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। হঠাৎ তার ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠলে সে ফোনটা হাতে নেয়। মেসেজ দেখতেই তার মুখের ভাবভঙ্গি বদলে যায়। কারণ মেসেজে এমন কিছুই লেখা যা দেখলে সবার মনের ভাবটা একটু হলে-ও বদলে যাবে। মেসেজে লেখা,

“ইসস আপনার ভয়াতুর চেহারারাটা ভিষণ ভালো লেগেছে আমার! তবে আমি আপনার চেহারায় আরো ভয় দেখতে চাই। দেখতে চাই আপনি হাউমাউ করে কাঁদছেন। কারণ আমাদের কান্নার কারণ যে আপনি মিস্টার ‘তৌসিফ’।”

আপনা-আপনি হাত থেকে ফোনটা পরে যায় বিছানায়। তাহলে এটা এক্সিডেন্ট হতে যাচ্ছিল না! কেউ ইচ্ছে করে এমনটা করাচ্ছে। আচমকা কী ভেবে তৌসিফ মেসেজ আসা নাম্বার ডায়াল করে, তবে ফোন বন্ধ। আশ্চর্য এই না কিছুক্ষণ আগেই মেসেজটা এলো ওই নাম্বার থেকে। তৌসিফ ভারি চিন্তায় পরে যায় কী করবে ভেবে। বাড়ির লোকদের কী বিষয়টা জানাবে? তাদের কী জানানো উচিত? না, না থাক। এমনিতেই পরিবারের সবাই এই ছোট্ট এক্সিডেন্ট হতে যাচ্ছিল শুনেই আৎকে উঠেছে! এখন মেসেজের কথা জানালে হয়ত আরো টেনশনে সবার মাথা খারাপ হতে পারে। এমন হাজারো কথা ভেবে একটু আগে আসা মেসেজটার কথা গোপন রেখে দিবে পরিবারের থেকে এটাই সিদ্ধান্ত নেয় তৌসিফ। তৌসিফ গভীর চিন্তায় কিছুক্ষণ মগ্ন থাকে। ভাবে সে কার কান্নার কারণ ছিল যে এভাবে প্রতিশোধ নিতে এমন ভয়ংকর খেলা শুরু করেছে। কোথাও বা ওই…,

“ভাইয়া।”

হঠাৎ তোহফার কন্ঠে নিজের চিন্তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে তৌসিফ। চোখ তুলে দরজার নিকট তাকালে দেখে তোহফা ও আওয়াদ দাঁড়িয়ে আছে। আওয়াদ তোহফার কাঁধে ভার দিয়ে দাঁড়িয়ে। চটজলদি তৌসিফ দরজার কাছে এগিয়ে যায়,

“অসুস্থ শরীর নিয়ে এখানে ওকে নিয়ে আসার কী দরকার ছিল তোহফা। আমাকে বললে আমি নিজেই যেতাম।”

কথাগুলো বলেই তোহফার কাছ থেকে আওয়াদকে তৌসিফ নিজেই ধরে নিয়ে তার ঘরের মধ্যে নিয়ে আসে। বিছানার কোণে বসিয়ে দিতেই তোহফা বলে,

“তোমার কী মনে হয় ভাইয়া আমি কথাটা বলিনি, তবে তিনি তো শুনতে রাজি না। তাই বাধ্য হয়ে নিয়ে এলাম।”

তোহফার কথায় আওয়াদ শুধু মুচকি হাসল। তারপর বলে,

“ভাইয়া এখন কী অবস্থা আপনার?”

“এই তো ভাই আলহামদুলিল্লাহ।”

“তোহফার কান্না দেখে আমি সত্যি খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।”

“আমি মোটেও কান্না করিনি ভাইয়া উনি মিথ্যা বলছেন।”

তোহফার কথায় তৌসিফ আর আওয়াদ দু’জনেই স্মিত হাসল। তৌসিফ বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

“কেঁদেছ কিনা সেটা তোমার চোখ বলে দিচ্ছে।”

“মোটেও না, আমি কেন কাঁদব।”

“ভাগ্যিস কোন কারণ নেই, থাকলে নিশ্চিত সাগরের জল ধার করে এনে তোমায় দিতে হত কান্না করার জন্য। ”

“ভাইয়া তুমি কিন্তু আমাকে…”

“আচ্ছা ঠিক আছে সরি।”

“থাকো তুমি, আমি গেলাম।”

তোহফা চলে যেতেই আওয়াদ নিজের গলা পরিষ্কার করে নেয়। কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে বলে,

“ভাইয়া কেউ আপনাকে ভয় দেখাতেই এমন একটা কাজ করেছে এটা কী আপনি বুঝতে পারছেন।”

আচমকা আওয়াদের কথায় তৌসিফ ঘাবড়ে যায়। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারে না, তাই নীরবে আওয়াদের কথা শুনে যায়।

“আমার ধারণা আমার এক্সিডেন্টের সাথে আপনার এই এক্সিডেন্টের হুবহু মিল আছে। কেউ চাইছে আমাদের ক্ষতি করার জন্য। এবং সে জেনে গেছে আপনাদের সাথে আমার সম্পর্ক হয়েছে বা হতে পারে। আর আমি যদি ভুল না করে থাকি তাহলে যে বাইকটা আমাকে ধাক্কা দিয়েছে সেই বাইকটাই আপনাকে ভয় দেখিয়েছে। সে শুধু আপনায় ভয় দেখাতে চেয়েছে নামমাত্র। তার ক্ষতি করার ইচ্ছে থাকলে সে করতেই পারত। তোহফার মুখের কথায় আমি এটাই বুঝেছি।”

আওয়াদের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে তৌসিফ। তারপর সে বিছানা থেকে ফোনটা তুলে একটু আগের আসা মেসেজটা বের করে আওয়াদের পল্লব জোড়ার সামনে তুলে ধরে। আওয়াদ মেসেজে চোখ বুলিয়ে বলে,

“আমাদের ইমিডিয়েট থানায় গিয়ে একটা জিডি করা উচিৎ। ”

“কিন্তু আওয়াদ বাড়ির সকলে জানলে একটা হুলুস্থুল কান্ড হবে।”

“তাহলে কী শত্রু ক্ষতি করতে পারে জেনেও চুপ থাকবেন।”

“আমার পরিবারকে আমি ভালো করেই চিনি আওয়াদ। আশংকা বিপদের কথা জানলে বিশেষ করে আমার বোনটা ভেঙে পড়বে। ও যদি কোনভাবে জানতে পারে কেউ আমাদের ক্ষতি করতে চায়! তাহলে ও একদম শেষ হয়ে যাবে ভাই। খাওয়া দাওয়া সব বন্ধ করে দিন-রাত শুধু কাঁদবে। আমার বিপদ হতে গেছে সেটা শুনেই ওর অবস্থা কী দেখলে না। আজ রাতে ও খাবারও খাবে না। ও ছোট থাকতে ফুটবল খেলতে গিয়ে আমি পড়ে ব্যথা পেয়েছিলাম! পুরো দু’টো দিন ও ভাত খায়নি। দিনের পুরো সময়টা আমার আঘাতে ফুঁ দিয়েছে আর কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, ” তুমি ব্যথা পেয়েছো ভাই, আর খেলতে যাবে না ঠিক আছে।” আমি যতক্ষণ বলিনি, যে হ্যাঁ আর যাবো না ততক্ষণ এই এক কথাই আমার কানের কাছে বলে গেছে। আর আজ যদি ও জানতে পারে কেউ আমাকে খুন করতে চাইছে, তাহলে কী করবে আমি নিজেও জানি না। আর সব থেকে বড় কথা তোমার ক্ষতি যে করেছে সে নিজে আমার ক্ষতিও করতে চাইছে এটা জানলে ও আরো ভেঙে পড়বে। তাই আমি কোনভাবে চাইছি না…”

“বাড়ির কেউ এই ব্যপারটা জানুক তাই তো?”

“হুম।”

“ঠিক আছে, তবে কালকেই আমার সাথে গিয়ে একটা জিডি করে আসবেন।”

“তোমার পায়ে ব্যথা।”

“আমি ঠিক আছি। আল্লাহর রহমতে আমি এখন অনেকটাই সুস্থ ভাইয়া। হয়ত একজনকে প্রয়োজন আমার হাত ধরার জন্য তবে আপনিও তো আমার সাথে যাবেন। আপনি পারবেন না আমার হাতটা শক্ত করে ধরতে?”

“পারবো আওয়াদ অবশ্যই পারব। তুমি শুধু আমার বোনের ভালো থাকার দায়িত্ব নিও। আমি এবং আমার পরিবার তোমার গোলাম হয়ে যাব।”

“ছিহ ভাইয়া! এভাবে বলবেন না! আমরা সবাই একমাত্র আল্লাহর গোলাম, তওবা করুন। এমন কথা আর বলবেন না কখনো।”

তৌসিফ আওয়াদকে বুকে জড়িয়ে নেয়। দু’জনে আসছে বিপদের কথা চিন্তায় বিভোর হয়ে যায়। কে এমন করছে, কার কান্নার কারণ ছিল তৌসিফ? কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই। আচমকা ওদের চিন্তায় মগ্ন থাকার মাঝেই মেসেজ টোন বেজে উঠে। তৌসিফের হাতের মাঝেই ফোনটা ছিলো তাই সে কিঞ্চিৎ ফোনটা উপরে তুলে চোখ বোলাতেই তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল।

“তো মিস্টার তৌসিফ এবং মিস্টার আওয়াদ আপনারা মনে করছেন, কেউ আপনাদের হুকমি দিচ্ছে? ”

ডিউটি অফিসারের কথায় সায় দিয়ে আওয়াদ বলে,

“জি।”

“পরিচিত কেউ হতে পারে বা আপনাদের কাউকে সন্দেহ হচ্ছে। ”

“দেখুন স্যার, শত্রু পরিচিত নাকি অপরিচিত ব্যপারটা সেটা নয়! শত্রু আমাদের ক্ষতি করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।”

“সেটা বুঝলাম মিস্টার আওয়াদ, তবে আমাকে এটা বলুন আপনার আর মিস্টার তৌসিফের সাথে ঘটনাটা একজনই ঘটিয়েছে এটা কীভাবে বুঝলেন? মেসেজ তো মিস্টার তৌসিফকে দিয়েছে আপনাকে নয়।”

“দেখুন স্যার, এক দেখতে বাইক তো ভুল করে এক পরিবারের দু’জনকে এক্সিডেন্ট করবে না।”

“আপনি এত সিওর হয়ে বলছেন কীভাবে দু’টো বাইক এক ছিলো?”

“আমার মনে হয়েছে। ”

“আপনার মনে হওয়া দিয়ে তো আর আমরা চলবো না মিস্টার আওয়াদ। ”

“তাহলে তদন্ত করুন।”

“যথারীতি কোনো প্রমাণ না পেলে আমরা নিশ্চয়ই ডাইরেক্ট একশান নিতে পারি না।”

“আমার ব্যপারটা না-হয় বাদ দিলাম, তবে ভাইয়ার ব্যপারে কিছু বলুন।”

“হ্যাঁ সে ব্যপারে দেখবো, তবে মাসের শেষ বুঝতেই পারছেন বাইকে তেল ভরার মতো পয়সা নেই। ভাবছি বেতন পেলে না-হয় দেখা যাবে।”

অফিসারের ঘুরিয়ে পেচিয়ে অযথা কথা বলার ভঙ্গিতে আওয়াদের রাগ হলে-ও সে তা প্রকাশ করলো না। সে পকেট হাতরে দু’টো হাজার টাকার নোট টেবিলে রাখতেই লোকটা ছো মেরে নিয়ে নিলো। দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে বলল,

“এভাবে কেউ চা খেতে সরাসরি গিফট দেয় নাকি? একটু আড়ালে আবডালে দিতে হয়। বোঝেনই তো দেয়ালের কান এবং চোখ দুটোই আছে।”

অফিসারের কথায় আওয়াদ বিদ্রুপের হাসি হাসে। কপাল চুলকাতে চুলকাতে বলে,

“আমি জানতাম না, দুঃখিত। তাহলে আজ উঠি।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। তবে চিন্তা করবেন না আমি ব্যপারটা নিজ দায়িত্বে দেখব।”

আওয়াদ আবারও বিদ্রুপের হাসি হাসতে হাসতে বলে,

“চা খেতে আরো কিছু লাগলে বলবেন, দিব। তবে আমাদের ব্যপরটা একটু খতিয়ে দেখবেন আশা করছি।”

আওয়াদের কথায় অফিসারের মুখটা চকচক করে উঠল। মনে মনে ভাবল, ‘জব্বর একটা মালকড়ি ওয়ালা টোপ পেয়েছি।’ আর মুখে বলে,

“হ্যাঁ অবশ্যই। ”

থানার কাজ শেষ করে তৌফিক ও আওয়াদ রিক্সা নেয় বাড়ি ফেরার জন্য। ঘড়িতে সময় এখন দুপুর এগারোটা পঁয়তাল্লিশ। তৌসিফ চিন্তিত হয়ে বলে,

“দেশটা পুরো রসাতলে যাচ্ছে।”

তৌসিফের কথার উত্তরে আওয়াদ বলে,

“যাচ্ছে না ভাই, গেছে। সময় বদলে যাওয়ার সাথে সাথেই মানুষও বদলে গেছে।“

“বাড়িতে কী বলবে ভেবেছো?”

“বলবো অফিসের একটা কাজ ছিলো সেটাই সারতে গিয়েছি।”

“কাল ওমন একটা ঘটনা ঘটেছে, সকালে দু’জনের একসাথে বেরিয়া যাওয়া! তোমার কী মনে হয় ওরা বিশ্বাস করবে?”

“না করলেও করাতে হবে ভাইয়া। এই মুহূর্তে এসব কিছুই ওদের বলা যাবে না তাই চুপচাপ থাকুন। ও হ্যাঁ আরো একটা কথা, আমরা যা বলবো তা যেন একরকম হয়। দু’জনে দু’রকম বললে ঝামেলা হবে। তাই সাবধান। ”

“ঠিক আছে।”

ইন শা আল্লাহ চলবে…….