#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রা
#পর্বঃ০৬
আমায়রা ডাকতেই বাচ্চাটা কফির ট্রেটা নিয়েই হাসলো। আমায়রা ফিচেল হাসি দিয়ে একটা কফির মগ তুলে নিয়ে বাচ্চাটার কানে কানে কি যে বলল। বাচ্চাটা ভীত কন্ঠে বলল,
“আফা ভাইয়া আমারে মারবো।”
আমায়রা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আরে কিছু বলবে না। তুই বলবি জানিস না।”
বাচ্চাটা আবারো ভীত কন্ঠে বলল,
“কিন্তু আফা!”
আমায়রা ব্যাগ থেকে একটা ছোট বোতল বের করলো যাতে মরিচ গুড়া রেখেছে সে নিজের সেফটির জন্য। ফিচেল হাসি দিয়ে বোতলে একটা চুমু দিয়ে বলল,
“আব আয়েগা মজা।”
আমায়রা বোতলের মুখটা খুলে একটু মরিচ গুড়া কফির মগে ঢেলে দিলো। কফির মগটা ট্রেতে রেখে বলল,
“ওইযে দেখছিস চশমা পড়া সাদা কাইলা পান্ডা তাকে এই কফি দিবি ঠিক আছে।”
বাচ্চাটা কম্পিত কন্ঠে বলল,
“রায়ান ভাইরে দিলে রায়ান ভাই আমারে ঝুলাবে আফা। আমি পারতাম না আফা।”
আমায়রা একরাশ বিরক্তি নিয়ে ব্যাগ থেকে অনেকগুলো চকলেট বের করে দিলো। তবুও বাচ্চাটা রাজি হচ্ছেনা দেখে আমায়রা বাচ্চাটাকে বলল,
“যা বেটা জিঙ্গাসা করলে বলবি তার চরম শত্রু এটা করেছে। তুই এটা না করলে তার শত্রু তোরে মারতো।”
আমায়রা বেশকিছুক্ষণ ধরে মানালো বাচ্চাটাকে। অনেক কাঠ খড় পোড়ানোর পর বাচ্চাটা রাজি হলো। আমায়রার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো।
বাচ্চাটা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে আর আমায়রা পিলারের পাশে লুকিয়ে পড়লো।
বাচ্চাটা কফি দিতেই আহাদ একটা কফির মগ তুলে নিলো। ইয়াসিন বিরক্তি নিয়ে বলল,
“বই রেখে কফি নে বেটা।”
রায়ান বইয়ের দিকে চোখ রেখে বলল,
“তুই নে আমি নিচ্ছি।”
ইয়াসিন বেশ বিরক্তি নিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে একটা কফির মগ তুলে নিতে মাথায় হাত পড়লো আমায়রার। কিছু করা বা বলার আগেই ইয়াসিন কফির মগে চুমুক দিলো। কফি মুখে নিতেই চোখমুখের রঙ পাল্টে গেল ইয়াসিনে।
বাচ্চাটা কিছু না বলে দৌড় দিলো। ইয়াসিন কুলি করে দিলো। রায়ান আর আহাদ ইয়াসিনের দিকে তাকাতেই ইয়াসিন চিল্লিয়ে বলল,
“পানি..,পানি দে,ওমা গো,মরে গেলাম গো। কি ঝাল!”
রায়ান পানি এগিয়ে দিলো। আহাদ বাচ্চাটাকে ডাক দিলো। অন্যদিকে কপাল চাপড়াচ্ছে আমায়রা। কি চেয়েছিলো আর কি হলো।
ইশরা ওয়াশরুম থেকে এসে আমায়রাকে কপাল চাপড়াতে দেখে ভ্রুকুচকে ওর দিকে গেল।
অন্যদিকে ইয়াসিনের চোখ নাক দিয়ে পানি পড়ছে। বাচ্চাটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রায়ান বাচ্চাটা দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“কে তোকে এই কাজ করতে বলেছে?”
বাচ্চাটা কাঁপা কন্ঠে বলল,
“একটা আফা কইলো সে আফনার শত্রু। আফনার জন্য কফি পাঠাইছিলো। কিন্তু ইয়াসিন ভাই ভুলে খাইয়া ফালাইসে।”
ইয়াসিনের কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছিলো। আহাদ বই দিয়ে বাতাস করছে। রায়ান হুট করে সামনে তাকাতেই কপাল কুচকে এলো তার। এ তো সেই কালকের মেয়েটা। রায়ানের আর বুঝতে বাকি রইলো না কি হয়েছে। রায়ান একরহস্যময় হাসি দিয়ে চোখের চশমা আঙুল দিয়ে নাকের উপর থেকে চোখে তুলে নিজ মনেই বলল,
“মেয়ে বড় ভুল করে ফেললে। এর পরিণাম সহ্য করার জন্য প্রস্তুত থাকো।”
রায়ানের চোখে চোখ পরতেই ইশরার হাত ধরে আমায়রা বলল,
“ছুট ইশু সাদা কালা পান্ডা দেখে ফেলছে।”
ইশরা বুঝে উঠার আগেই আমায়রা ওর হাত ধরে ছুটলো। রায়ান সেদিকে তাকিয়ে কুটিল হাসি দিলো। টেবিলের উপর থেকে বইগুলো ব্যাগে তুল বাইকের চাবি হাতে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,
“আহাদ ইয়াসিনরে ঠিক কর। আমি আসছি।”
আহাদ রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই এখন আবার কোথায় যাবি?”
রায়ান একটা মুচকি হাসি দিয়ে বের হয়ে গেল। আহাদ সেদিকে তাকিয়ে রইলো। এতবছর যাবত ছেলেটার সঙ্গে আছে তাও বুঝতে পারেনা ছেলেটার মতিগতি। ইয়াসিন আহাদকে একটা থাপ্পড়া দিয়ে বলল,
“আইসক্রিম এনে দে আমাকে। নাকমুখ জ্বলছে আমার। হুদাই আমি রায়ানের জন্য আনা কফি খেয়ে মুরগি হলাম।”
আহাদ চোখ ছোট ছোট করে ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মুরগি হবেনা মোরগ হবে বেটা।”
ইয়াসিন চোখ গরম করে আহাদের দিকে তাকাতেই আহাদ ছুটলো আইসক্রিম আনতে।
———————————
ঘুটঘুটে অন্ধকার রুমের এককোণ বসে আছে এক আধ বয়সী মহিলা। চোখমুখ কুচকে বয়সের তুলনায় আরো বেশি বয়স্ক লাগছে তাকে। চারপাশের এক অন্যরকম নিরবতা যেন জেঁকে বসেছে। মহিলাটির পড়নের সাদা শাড়ির রঙ পরিবর্তন হয়েছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে।
হঠাৎ করেই অন্ধকার রুমের দরজাটা খুলে গেল। বাহিরের আলোগুলো যেন হুড়মুড়িয়ে রুমে আসছে। মহিলাটি দুহাতে চোখ ঢেকে ফেলল। আলো সহ্য হয় না তার। আলোর পথ দিয়ে এক সুঠাম দেহের যুবক এগিয়ে এলো তার দিকে। মহিলাটা নাকমুখ খিচে চোখ বুজে রয়েছে।
যুবকটি হুংকার দিয়ে বলে উঠলো,
“মুখ খুলছেন না। আর কতো মানুষের জীবন নষ্ট করবেন আপনি?”
যুবকটির হুংকারে চারপাশে ঝনঝন করছে।বারবার যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার কথাগুলো।মহিলাটি নিশ্চুপ।
যুবকটি পুনরায় বলে উঠলো,
“আপনি কেমন মানুষ বলুন তো। ওহ সরি আপনি তো মানুষ নামের কলঙ্গ।”
বলেই হনহনিয়ে রুমের থেকে বেড়িয়ে গেল। যাওয়ার আগে দরজাটা বন্ধ করে যেতে ভুলেনি সে। মহিলাটি সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো হাঁটুতে মুখগুজে বসে রইলো।
যুবকটি রুম থেকে বের হয়ে তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে গিয়ে জোরে একটা লাথি বসিয়ে দিলো চেয়ারে। চেয়ারটা সজোরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। দলের বাকি মেম্বারদের মধ্যে একজন বলে উঠলো,
“আজকেও কিছু বলেনি স্যার?”
যুবকটি নিজের চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দিলো। চোখবুজে কলম নাচাতে নাচাতে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“বি কেয়ারফুল, ওনাকে খুঁজতে ওনার দলের লোক আসবে। ঝড় তো তুলবেই। কিন্তু আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।”
————————
অনুভব বাড়ি ফিরেছে বিকালের দিকে। আমেনা বেগম বেশ করে ঝাড়ছেন ছেলেকে। সকালের পর থেকে বাড়ি ফেরার নাম নেই। নাস্তা নিয়ে তিনি ছেলের জন্য কতক্ষণ বসে ছিলেন। ফোন করেছেন ফোনও রিসিভ করেনি। অনুভব মায়ের সবকথা শুনে ভাঙা গলায় বলল,
“মা কলেজের চাকরিটা আমার হয়ে গেছে। আজ তার লেটার এসেছে।”
আমেনা বেগম থমকালেন। কি বলবেন কিছু বুঝতে পারলেননা। চোখের কোণায় চিকচিক করছে নোনাজল। অনুভব পিছন থেকে মিষ্টির প্যাকেট বের করে তা থেকে মিষ্টি নিয়ে মায়ের মুখের সামনে ধরলো। আমেনা বেগম মিষ্টি খেয়ে কান্নাভেজা চোখে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
অনুভবও মাকে জড়িয়ে ধরলো। ঠোঁটের কোণে আনন্দের হাসি। সে আশাও করেনি চাকরিটা তার হয়ে যাবে। আমেনা বেগম ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
“তোর বাবাকে বলেছিস?”
অনুভব মুচকি হেসে বলল,
“বাবাকে বলেছি তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে। বাসায় সারপ্রাইজ আছে।”
আমেনা বেগম চোখ মুছে বললেন,
“আমুকে বলে আয় আমি রান্না করতে যাই। আজ তোর পছন্দের কাচ্চি রান্না করবো।”
অনুভব মায়ের হাত ধরে আটকে বলল,
“আম্মু আজ আমি রান্না করবো। আমুকে বলে আসছি।”
আমেনা বেগম চোখ বড়বড় করে বললেন,
“তুই রান্না করবি?”
অনুভব মুচকি হেসে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে আমায়রার রুমে গেল। আমায়রা পড়তে বসেছিলো। আগে থেকে কিছু পড়েনি। সামনেই পরীক্ষা। বেশ পড়া জমে গেছে তার।
অনুভব রুমে প্রবেশ করতে করতে বলল,
“আমু মুখ খোল।”
আমায়রা ভ্রুকুচকে তাকালো অনুভবের দিকে। অনুভবের হাসোজ্বল মুখ দেখে মনে মনে খুশি হলো সে। মুখে বলল,
“ভাইয়া এতো খুশি কেন তুমি? বিয়ে টিয়ে করে ফেলছো নাকি না জানিয়ে!”
অনুভব দ্রুত আমায়রার মুখে মিষ্টি ঢুকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,
“তুই বড্ড ফাউল বকিস আমু। আমি চাকরি পেয়ে গেছি কলেজে প্রফেসরের।”
আমায়রা চোখ বড় বড় করে ফেলল। মিষ্টিটা কোনোমতে গিলে কপাল চাপড়ে বলল,
“শেষমেশ তুমি মানুষের অভিশাপ পাবারে পদে নিয়োগ দিবে।”
অনুভব কপাল কুচকে বলল,
“কি বলছিস এগুলো?”
#চলবে