#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ০৭
আমায়রা হতাশ কন্ঠে বলল,
“আর কি বলতাম ভাইয়া। তোমরা টিচাররা বহুত খারাপ। মাসুম বাচ্চাদের পড়িয়ে পড়িয়ে মারো।”
অনুভব আমায়রার মাথায় একটা গাট্টা দিয়ে বলল,
“বেশি কথা না বলে রান্নাঘরে আয় ফোন নিয়ে।”
আমায়রা কপাল কুচকে বলল,
“কেন রান্নাঘরে ফোন নিয়ে এই রাতে কি মহান কাজ করবো আমি!তাছাড়া আর দশদিন বাদে আমার পরীক্ষা। এখন আমার সময় নাই।”
অনুভব একরাশ বিরক্তিতে চোখ নাকমুখ কুচকে আমায়রার হাত ধরে টানতে টানতে বলল,
“চল তো আমি কত বড় মুখ করে আম্মুকে বললাম আজ আমি রান্না করবো।”
আমায়রা চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“তো আমি কি করবো, নিজে বলেছো নিজে করো।”
আমায়রা বই টেনে তাতে চোখ রাখলো। অনুভব অসহায় কন্ঠে বলল,
“চল না বনু,তোকে আলাদা করে ট্রিট দিবো যাহ।”
আমায়রা মুখ ভেংচি দিয়ে বলল,
“প্রয়োজনের সময় বনু ঢঙ।”
“চল না।”
আমায়রা বইটা ঠাস করে বন্ধ করে চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল,
“চলো যাচ্ছি।”
অনুভব বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে বলল,
“দাড়া আগে ফ্রেশ হয়ে আসি।”
আমায়রা বিরক্তি নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা দিয়ে যেতে বলল। অনুভব খুশি মনে চলে গেল আমায়রার রুম ছেড়ে। আমায়রা হাসলো। সেই ও বেশ খুশি। শিস বাজাতে বাজাতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। সন্ধ্যা মালতি গাছের কাছে গিয়ে লম্বা করে সন্ধ্যা মালতির মিষ্টি গন্ধ উপভোগ করলো।
সামনের রাস্তার দিকে তাকালো। গলির সামনে তাকাতেই কপাল কুচকে এলো। একটা কালো কুচকুচকে দামি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমায়রা আরো তীক্ষ্মচোখে তাকালো সেদিকে। একটা ছায়া দেখে কপালের ভাঁজ আরো গাঢ় হলো তার। কেন যেন মনে হচ্ছে ছায়াটা তারদিকেই তাকিয়ে আছে। কিন্তু কেন? কে সে?
আমায়রার ভাবনায় ছেদ ঘটলো অনুভবের ডাকে। সে পিছু ফিরে তাকাতেই দেখলো অনুভব হাটু পর্যন্ত একটা প্যান্ট আর সেন্ডো গেঞ্জি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে তার রুমের সামনে। আমায়রা পিছু ফিরে তাকাতেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে অনুভব বলল,
“চল চল হয়ে গেছে আমার।”
“আসছি তুমি যাও।”
আমায়রা ছোট্ট করে এই কথাটা বলেই পুনরায় আবারো গলির মোড়ের দিকে তাকালো। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে সেখানে কেউ নেই। আমায়রার ভাবনা যেন আরো বেড়ে গেল। এখনি তো ছিলো। এত তাড়াতাড়ি উবু গেল কিভাবে?
আমায়রার আবারো ডাক পড়াতে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দা ছেড়ে রুমে আসলো। কি যেন ভেবে আবারো পিছু ঘুরে বারান্দার দরজাটা আটকে দিলো। সকল ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো।
——————
রায়ান রাত আটটায় বাসায় ফিরে সোজা নিজের রুমে গেল। বাইকের চাবি, ফোন,ওয়ালেট আর চোখের চশমাটা ড্রেসিংটেবিলের উপর রেখে ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হতে।
চোখে মুখে পানি দিয়ে বের হলো ওয়াশরুম থেকে। তখনি তার ফোনটা বেজে উঠলো। রায়ান ফোনটা হাতে নিয়ে বেশ বিরক্ত হলো ২৪০০ কল করেছে। নাকমুখ খিচে কল কেটে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। বিশাল বড় বারান্দায় একপাশে বসার জন্য বেঁতের সোফা রাখা। যার সামনেই একটা ছোট গোল টেবিলে কাঁচের পাত্রের পানিতে মানিপ্লান্ট রাখা। রায়ান লাইটের সুইচ দিতেই হালকা নীল রঙের আলোতে বারান্দার সৌন্দর্য বেড়ে গেল। বারান্দার উপরের অংশ ফাঁকা। নিচের অংশে কাঁচ দিয়ে আটকানো।
রায়ান বারান্দার ফাঁকা অংশ দিয়ে উন্মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। হুট করেই অদ্ভুতভাবে হাসতে লাগলো সে। তার হাসি যেন ঝংকার তুলছে চারপাশে। বাড়ির পিছনের সুইমিংপুলের একাংশ আর বাগানের একাংশ দেখা যায় বারান্দা থেকে। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদর পেঁচানো লোকটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রায়ান বলে উঠলো,
“রায়ান ইশতিয়াক চৌধুরীর সঙ্গে খেলায় নেমেছো তো জান নিয়ে ফিরতে পারবে তো।”
বলে আবারো অদ্ভুতভাবে হাসলো। টাউজারের পকেটে দুহাত রেখে তীক্ষ্মচোখে তাকিয়ে রইলো নিচে ঝোঁপের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে। রায়ান হাত বাড়িয়ে সুইচ টিচে বারান্দার লাইট বন্ধ করে গুনগুন করতে গাইতে লাগল।
ঠাস করে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ ভ্রু কুচকে এলো রায়ানের। বড় বড় পা ফেলে রুমে এলো। রূমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো কেউ নেই। হঠাৎ করেই বাঁকা হাসলো সে। ফোন নিয়ে টিপতে টিপতে রূম থেকে বের হয়ে সোজা বসার ঘরে গেল। বসার ঘরে রাবেয়া বেগম আর রোদেলা বসে টিভি দেখছিলো। রোদেলা রাবেয়া বেগমের ভাইয়ের মেয়ে। তাহসান ভালোবেসেই বিয়ে করেছে রোদেলাকে। তাজওয়ার সাহেব প্রথমে আপত্তি করলেও মেনে নিয়েছে। তাছাড়া রোদেলা বেশ ভালো মেয়ে। নম্র, ভদ্র, রুচিশীল মেয়ে। নূরকে দেখতে না পেয়ে রায়ান নরম গলায় বলল,
“ভাবি নূর কোথায়?”
রোদেলা টিভির দিক থেকে চোখ সরিয়ে বলল,
“তোমার ভাইয়া এসেছে তো। ওর সঙ্গে রুমেই আছে।”
রায়ান ছোট্ট করে বলল,
“ওও”
রাবেয়া বেগম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন রাত নয়টা বিশ বেজে গেছে। রোদেলাকে তাড়া দিলেন সবাইকে খাবারের জন্য ডাকতে। আর তিনি গেলেন রান্নাঘরে খাবার টেবিলে সাজাতে। রাতের বেলায় এই বাড়িতে সবাই একসঙ্গে খাবার খায়। তাজওয়ার সাহেবের এককথা সকালে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ থাকে কিন্তু রাতে যেন সবাই একসঙ্গে খাবার খায়।
রায়ান ভাইয়ের রুমের সামনে এসে দেখলো তাহসান শুয়ে আছে। আর নূর তার পাশে শুয়ে হাজারো কথার মেলা বসিয়েছে। রায়ান মুচকি হেসে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“মামনি দেখি বাবাকে পেয়ে চাচ্চুকে ভুলেই বসে আছে।”
তাহসান আর নূর দুইজনই রায়ানের দিকে তাকালো। নূর মুচকি হেসে বলল,
“তুমিই তো ভুলে গেছো।”
“এখন সব দোষ আমার তাই না।”
“তোমারই তো।”
রায়ান ফুস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ভাইয়া খেতে আসো।”
বলেই রায়ান চলে যেতে নিবে তখনই নূর বিছানা থেকে দৌড়ে রায়ানের কাছে গিয়ে ওর পা চেপে ধরলো। রায়ান নূরকে কোলে নিতেই নূর রায়ানের কানে কানে বলল,
“চাচ্চু তোমার সাথে আমার কিছু গোপন কথা আছে।”
রায়ানও ফিসফিসিয়ে বলল,
“কি গোপন কথা?”
তাহসান উঠে এসে বলল,
“কি এতো ফিসফিস করে কথা হচ্ছে, আমিও শুনি একটু।”
নূর বেশ বিরক্ত হলো তাহসানের মাঝখানে কথা বলায়। একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকালো বাবার দিকে।
তাহসানের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে মেয়ে তার উপর বিরক্ত হচ্ছে। তাহসান তাই কথা না বাড়িয়ে চলে গেল।
তাহসান যেতেই নূর ধীরে ধীরে বলল,
“চাচ্চু দুষ্টু পিপি তুমি যাওয়ার পর তোমার রুমে গেছিলো।”
নূরের কথায় কপাল কুচকালো রায়ান। নেহা তার রুমে কি করছিলো। নাহ এটার কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
নূরকে নিয়ে রায়ান খাবার টেবিলের দিকে আগালো।
খাবার টেবিলে সবাই একে একে এসে বসছে। শাহানারা বেগম নেহা আর রেজওয়ান সাহেবও এসে বসেছেন। একটুপরে তাজওয়ার সাহেব আসতেই সবাই খাওয়াদাওয়া শুরু করলো।
——————————
আজিজ সাহেব কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিলেন আমেনা বেগম। আজিজ সাহেব ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন,
“অনুভব কোথায় ও কি যেন বলবে আমাকে?”
আমেনা বেগম স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“ছেলের কথা না হয় ছেলের থেকে শুনে নিয়ো।”
আমেনা বেগমের কথায় আজিজ সাহেব কপাল কুচকে ফেললেন। সামনে এগিয়ে যেতেই চক্ষু বের হওয়ার মতো অবস্থা হলো। অনুভব সারা গায়ে হলুদ মরিচের গুঁড়ো লাগিয়ে মনোযোগ দিয়ে রান্না করছে। ওর সামনেই চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে আমায়রা। এক হাতে ফোন ধরে রেখেছে আর অপর হাতে শশা নিয়ে কিছুক্ষণ পরপর খাচ্ছে। রান্নাঘরের বেহাল দশা চামুচ বাটি মাখামাখি হয়ে এদিকসেদিক পড়ে আছে। পেঁয়াজ রসুনের খোসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আজিজ সাহেব অবাক হয়ে আমেনা বেগমের দিকে তাকালো। আমেনা বেগম স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।
আজিজ সাহেব অবাক হওয়া কন্ঠেই বলে উঠলেন,
“এগুলো কি হচ্ছে আমেনা? তোমার সাজানো রান্নাঘরের এমন বেহাল দশা করছে আর তুমি চুপচাপ!”
আমেনা বেগম ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করতে করতে বললেন,
“তারা দুইজন মিলে কাচ্চি রান্না করছে। আর পরিষ্কার তারাই করবে।”
আজিজ সাহেব অবাকের চরম পর্যায়ে চলে গেলেন। যে ছেলে মেয়ে পানি পর্যন্ত ঢেলে খায়না তারা নাকি রান্না করছে। আবার তারাই নাকি পরিষ্কার করবে ভাবতেই আজিজ সাহেবের মাথা ভনভন করছে। উনি ঠাস করে সোফায় বসে পড়লেন।
আজিজ সাহেবের এমন অবস্থা দেখে আমেনা বেগম মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছেন। তবে মুখে তা প্রকাশ করছেন না। পানির গ্লাস এগিয়ে দিতেই উনি ঢকঢক করে সবটুকু পানি খেয়ে নিলেন।
পানিটুকু কোনোমতে শেষ করে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। অনুভব বেশ মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে আর আমায়রা বেশ বিরক্ত অনুভবের উপর একে তো কিছু পারেনা ভুল ধড়িয়ে দিলেও ধমকায়। আমায়রা মনে মনে প্রমিস করলো অনুভবকে আর কিছু বলবেনা। যা মন চায় করুক।
আজিজ সাহেব চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
“বাবা তোমরা ঠিক আছো তো?”
বাবার কথা শুনে দুইজনই বাবার দিকে তাকালো।অনুভব কপাল কুচকে বলল,
“হ্যাঁ বাবা আমরা তো ঠিক আছি ৷ কেন কি হয়েছে?”
“না মানে তোমরা হঠাৎ দুইজন মিলে রান্নাঘরে রান্না করছো তো তাই বললাম।তা বাবা কি হয়েছে যে তোমরা রান্নাঘরে?”
বাবার কথায় দুইজন দুইজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। আমায়রা বলল,
“সে না হয় কাচ্চি খেতে খেতেই বলবো।”
#চলবে
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)