#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ০৮
আজিজ সাহেব কৌতুহল নিয়ে বললেন,
“এখন বলা যায় না মা?”
আজিজ সাহেবের কথায় আমায়রা সোজাসাপটা জবাব দিলো,
“না বলা যায় না। তুমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো। আমাদের রান্না শেষ।”
আজিজ সাহেব ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল। আমায়রা আর অনুভব বাবাকে যেতে দেখে হাসলো।
———————
রায়ান খেতে খেতে সবার সামনেই নেহার দিকে না তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“নেহা আমার অবর্তমানে আমার রুমে তুই কি করছিলি?”
রায়ানের আচমকা বলা কথায় চমকিত হলো নেহা। হাত পা কাঁপছে তার। সে যে রায়ানের রুমে গিয়েছিলো রায়ান কিভাবে জানলো। কপাল বেয়ে একবিন্দু ঘাম চুয়ে পড়লো তার।
তাজওয়ার সাহেব বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“তোমার রুমে যেতেই পারে। এখানে এমন করার কি আছে ইশতিয়াক?”
রায়ান বাঁকা হাসলো। কিছু বলল না আর। রায়ানকে চুপ করে যেতে দেখে নেহা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো।
রায়ান খাওয়া শেষ করে চলে যাওয়ার সময় একপলক শুধু নেহার দিকে তাকালো। নেহা তাতেই ভয়ে অবস্থা খারাপ। রায়ানের সেই চাহনি বেশ ভয়ংকর ছিলো।
রায়ান সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের রুমে চলে গেল। রুমে প্রবেশ করে চারপাশটা আগে একবার পর্যবেক্ষণ করে দরজা লক করে দিয়ে। সোফায় আয়েশি ভঙ্গিতে বসে ল্যাপটপে কাজ করতে লাগল।
—————————
অনুভব রান্না শেষে ফ্রেশ হতে গেল। আমায়রা ও ক্লান্ত চিত্তে নিজের রুমে গেল। আমেনা বেগম সেই ফাঁকে রান্নাঘরে ঢুকলের। সতর্কতার সাথে ঢাকনা তুলে কিছুটা কাচ্চি নিয়ে মুখে দিলেন। মুখে দিতেই নাকমুখ কুচকে ফেললেন। অতিরিক্ত লবণ আর ঝালে কাচ্চির নাজেহাল অবস্থা। তার উপরে চালগুলোও আর একটু তাপে রাখতে হবে।
আমেনা বেগম আবারো চারপাশে চোখ বুলিয়ে
ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে কিছুটা দুধ কাচ্চিতে দিয়ে চুলা অন করে দিলেন।
আজিজ সাহেব সবটাই আড়াল থেকে দেখে মুচকি হাসলেন। তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন আমেনা বেগম কিছু একটাই করবেন।
আমায়রা ফ্রেশ হয়ে টেবিলে এসে বসলো। অনুভব জামা কাপড় পাল্টে একটা নীল রঙের টিশার্ট আর কালো টাউজার পড়ে এলো। আমেনা বেগমকে চেয়ারে বসিয়ে নিজেই প্লেটে খাবার বাড়তে লাগল। আমায়রা অসহায় দৃষ্টিতে তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কাচ্চি খেয়ে যদি সমস্যা হয় তখন কি হবে? আমার সামনে পরীক্ষা কিন্তু!”
অনুভব কটমটিয়ে তাকালো আমায়রার দিকে। আমায়রা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“না মানে ভাইয়া আগে আব্বু টেস্ট করে দেখুক তারপর আমরা।”
অনুভব মুখ ভেংচালো আমায়রাকে। আমায়রা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আজিজ সাহেবের দিকে তাকালো।
আজিজ সাহেব স্বাভাবিক ভাবেই খেতে লাগলেন। আমেনা বেগমও খেতে লাগলেন। আমায়রা আর অনুভব দুইজন দুইজনের দিকে তাকালো। নিজেরাও বেশ ভয়ে আছে না জানি কি পাঁকিয়েছে। অনুভব ধীরে ধীরে মুখে তুলল। আমায়রাও খেল। দুইজনেরই চোখমুখ চিকচিক করে উঠলো।
কাচ্চি খেতে ভালোই হয়েছে দেখে ওরা দুইজনই মহা খুশি। ওদের খুশি দেখে আমেনা বেগম আর আজিজ সাহেবও হাসলেন।
আজিজ সাহেব খাওয়া শেষ করতেই অনুভব এসে ওনার মুখে মিষ্টি তুলে দিয়ে বলল,
“বাবা আমি একটা বেসরকারি কলেজে চাকরি পেয়েছি।”
আজিজ সাহেব আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। কি বলবেন বুঝতে পারছেননা। অনুভব আবারো বলল,
“কিন্তু বাবা কথা হচ্ছে কি আমাকে আগে গেস্ট টিচার হিসেবে দেখবেন ওনারা কিছুদিন।”
আজিজ সাহেব মুচকি হেসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“দেখো তোমার চাকরি স্থায়ী হবে। তোমার উপর তোমার বাবা মায়ের দোয়া।”
অনুভব ঝট করে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। আজিজ সাহেবও ছেলেকে আগলে নিলেন।
———————
রায়ান ল্যাপটপে নিজের কাজ শেষ করে বাঁকা হাসলো। থুতনির নিচের বৃদ্ধা আঙুল ঘষে বলল,
“মানুষকে চিন্তায় ফেলাও একটা আর্ট। চান্দু ঘুঘু দেখেছো, ঘুঘুর ফাঁদ তো দেখ নি।”
রায়ান নিজে মনে হেসে ল্যাপটপ ছেড়ে উঠে গিয়ে আবারো বারান্দায় গেল। চারপাশ নিরব হয়ে আছে। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে সবাই যেন ঘুমিয়ে কাতর। সকালে আবারো শুরু হবে ব্যস্ততা। রায়ান টাউজারের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে আকাশের দিকে তাকালো। বেশ কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজ মনে বিরবিরাতে লাগল,
“আকাশের রঙও পাল্টায় তবে মানুষের রঙ পাল্টানোর ব্যপারটা আসলেই অদ্ভুত। ভালো মানুষের মুখোশ ফেলে যখন আসল রূপ বের হয় তখন সকলেই ধাক্কা খায়।”
রায়ান একটা তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে একটা সিগারেট ধড়ালো। মনের সুখে আকাশের দিকে মুখ করে ধোঁয়া ছাড়তে লাগলো সে। যেন মনে হচ্ছে বাতাসের সঙ্গে নিজের মনের ক্লান্তি, চিন্তা সব উড়িয়ে দিচ্ছে ধোঁয়ার মাধ্যমে।
———————
আমায়রা রুমে এসে ধপ করে শুয়ে পড়লো বিছানায়। ক্লান্ত লাগছে খুব পরীক্ষার পরপরই বন্যার বিয়ে। বন্যা অনেক রিকুয়েস্ট করে গেছে বিয়েতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমায়রা চিন্তা হচ্ছে অনুভবের জন্য। অনুভব কি যাবে বিয়েতে। তার মতে না যাওয়াই ভালো। অন্য ছেলের সঙ্গে বন্যাকে দেখে হয়তো অনুভবের খারাপ লাগবে।
আমায়রার ভাবনায় ছেদ ঘটলো ফোনের আওয়াজে। আমায়রা ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো ইশরা কল করেছে।
আমায়রা কল রিসিভ করে কানে নিতেই আমায়রাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ইশরা বলল,
“তোর যম আইডি থেকে তোর আইডিতে বিভিন্ন কমেন্ট করছে দেখ।”
আমায়রা ঠাস করে উঠে বসলো। চমকিত হয়ে বলল,
“কিহ!”
“হুম বেটি ফেসবুকে আয়।”
“কিন্তু তোর যম তো আমারই ফেক আইডি। ওখান থেকে কমেন্ট করছে?”
“হুম রে ওখান থেকেই করছে।”
আমায়রা তড়িঘড়ি করে ইশরা কল কেটে নেট অন করে ফেসবুকে ঢুকলো।
ফেসবুকে ঢুকতেই তার চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে গেল। তার প্রতিটা ছবিতে একটা করে কমেন্ট। কমেন্ট গুলো ঠিক এমন,
“দেখে মনে হচ্ছে জমাটা কারো কাছ থেকে চুরি করে পড়েছেন। তা কার থেকে চুরি করলেন বলুন তো?”
আরেকটা পিকে কমেন্ট করেছে,
“চোখে কাজল দিয়ে আপনাকে একদম ভূতের মতো লাগছে।”
“দুইটা বেণী না দুইটা সাপ ঝুলছে মনে হচ্ছে।”
“কটকটির মতো বড় বড় দাঁত দিয়ে হাসি দিলে মানুষ ভয় পাবে তো।”
আমায়রা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। মাথা ভনভন করে ঘুরছে। চোখের সামনে সব অন্ধকার লাগছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।
আমায়রা আবারো আইডিটা চেক করলো। না এটা তো তারই আইডি। কিন্তু এমন হচ্ছে কেন? আমায়রা মনে করার চেষ্টা করলো যে এই আইডির পাসওয়ার্ড কাউকে বলেছিলো নাকি। কিন্তু না সে তো কাউকে বলেনি। এমনি ইশরাকেও তাহলে এমন হলো কেন?
চিন্তায় আমায়রার মাথা দপদপ করছে। মাথায় কিছুই ঢুকছেনা। সে আবারো ফোনটা হাতে নিয়ে ওই আইডিতে ঢোকার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই ঢুকতে পারছেনা। পাসওয়ার্ড ভুল দেখাচ্ছে । অতিরিক্ত রাগে দুঃখে কান্না পাচ্ছে আমায়রার।
আবারো ফোনটা বেজে উঠলো তার। ইশরা কল করেছে আবারো। আমায়রা কল রিসিভ করে কানে ধরে বলল,
“আমি কিছু বুঝতে পারছিনারে। আমি ওই আইডিতেও ঢুকতে পারছিনা। পাসওয়ার্ড ভুল বলছে। আমি তো কাউকে আইডির পাসওয়ার্ডও বলিনি।”
ইশরা কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলল,
“পাসওয়ার্ড কি সহজ কিছু দিছিলি?”
আমায়রা অস্থির কন্ঠে বলল,
“না না আমি তো সহজ পাসওয়ার্ড দেই নি। আমি পাসওয়ার্ড দিয়েছিলাম ইশরা মুরগী ডান্স।”
ইশরা আমায়রার কথায় বেশ বিরক্ত হলো। নাকমুখ কুচকে বলল,
“আর কিছু ছিলো না দুনিয়ায়?”
আমায়রা দাঁত বের করে বলল,
“আসলে তুই তো জানিস আমি সবসময় ইউনিক কিছু ভাবি তাই আর কি?”
আমায়রার কথায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইশরা। ক্লান্ত গলায় বলল,
“ব্লক করে ঘুমিয়ে যা। কাল আবার ক্লাস আছে।”
আমায়রা তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
“না না কালকে যাবোনা।”
ইশরা ভ্রুকুচকে বলল,
“কেন যাবিনা?”
আমায়রা ফুস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
“পরীক্ষা কিছুই পারিনা। তার থেকে বাসায় পড়ি। এমনিতেই ভাইয়ার জন্য আজকে পড়তে পারলাম না।”
“কেন অনুভব ভাই আবার কি করলো?”
#চলবে
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)