অতল গহ্বরে নীরবতা পর্ব-০৯

0
304

#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ০৯

আমায়রা এক এক করে সব বলল ইশরাকে। ইশরা হাসতে হাসতে শেষ। হাসতে হাসতেই বলল,
“তোরা দুইজন পারিসও বাবা। রান্না করছিস না যুদ্ধ করেছিস! তা কাচ্চি কি খাওয়া গেল?”

আমায়রা ভেংচি কেটে বলল,
“খাওয়া যাবেনা কেন রে ছেমড়ি। খুব মজা হয়েছে তোর জন্য আনবোনি।”

ইশরা আমায়রার কথা শুনে চটজলদি বলল,
“না থাক বুঝছি ভালো হয়েছে। আমি খাবো না।তোরাই খা।”

আমায়রা আবারো ভেংচি কেটে বলল,
“তোর খাওয়া লাগবে না।”

ইশরা হাই তুলতে তুলতে বলল,
“ঘুমাবো আমি।”

আমায়রা ঠাস করে শুয়ে বলল,
“আমিও ঘুমাবো। গুড নাইট মুরগি ডান্স।”

ইশরা কিছু বলার আগেই কল কেটে দিলো আমায়রা। ইশরা প্রথমে বকাবকি করলেও পরে হাসলো। ফোনটা রেখে চোখ বুজলো।

আমায়রা কল কেটে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে নিজ মনেই বলল,
“আমার আইডি হ্যাকিং, মি. রায়ান ইশতিয়াক চৌধুরী, আপনি কি মনে করেছেন আমি বুঝবোনা। বড্ড ভুল হয়ে গেল মিস্টার। আমাকে তো চিনেন না মশাই। আমায়রা রহমান নিশাত কখনো হারে না। এর বদলাও আমি নিবো।”

ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে আমায়রা কিছুক্ষণ কি যেন ভেবে চোখ বুজলো।

————————

শাহানারা বেগম নেহার রুমে এসে দেখলেন নেহা কার সঙ্গে যেন হেসে হেসে কথা বলছে। তীক্ষ্মচোখে সেদিকে তাকিয়ে বললেন,
“নেহা কি করছিস তুই?”

মায়ের গলা শুনে কেঁপে উঠলো নেহা। তাড়াহুড়ো করে কল কেটে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“কিছু নাতো মা। আমি আমার এক ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছিলাম। কিছু কি বলবে?”

শাহানারা বেগম বেডে বসতে বসতে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“রায়ানের রুমে তুই কি করতে গেছেলি?”

নেহা আমতা আমতা করতে লাগলো। শাহানারা বেগম সন্দিহান দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“সত্যি কথা বল। আমার সামনে মিথ্যা বলে লাভ নেই।”

নেহা নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
“বললাম তো কিছু না। এমনি গেছিলাম। তুমি এখন যাও তো আমি ঘুমাবো।”

নেহা তাড়াতাড়ি করে কম্বল গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো। শাহানারা বেগমের বেশ সন্দেহ হলো নেহার এমন আচরণে। তবু বাধ্য হয়ে তিনি লাইট অফ করে বের হয়ে গেলেন নেহার রুম থেকে। নেহা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো শাহানারা বেগম চলে যাওয়াতে।

অন্যদিকে রায়ান আধপোড়া সিগারেটটা ফেলে দিয়ে রুমের যাওয়ার জন্য পিছু ঘুরতেই একটা পাথরে পেঁচানো কাগজ উড়ে এলো তার বারান্দায়। রায়ান বাঁকা হাসলো। পাথরটা তুলে তার থেকে কাগজটা খুলে দেখলো তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,
“যেই খেলায় নেমেছিস সেই খেলার পরিণাম মৃত্যু। তাই ভালোই ভালোই খেলা বাদ দিয়ে বাচ্চা বাচ্চার মতো থাক।”

রায়ানের বাঁকা হাসি যেন আরো প্রসারিত হলো। এটার অপেক্ষাই তো সে এতক্ষণ করছিলো। রায়ান নিজ মনেই বলে উঠলো,
“বাচ্চা নাকি বাপ সে না হয় সময় বলে দিবে।”

রায়ান লাইটার দিয়ে কাগজটা পুড়িয়ে ফেলল। পাথরটা রেখে দিলো নিজের কাছে। রুমে এসে চোখের চশমাটা খুলে শুয়ে পড়লো বেডে। বড় লাইটা আগে থেকেই বন্ধ করে রেখেছিলো সে। বেড সাইড লাইটটাও বন্ধ করে দিলো। চোখ বুজে পরপর কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো রাত একটা বিশ মিনিট। না এখন ঘুমাতে হবে কাল সকালে কিছু কাজ আছে তার।

রায়ান চোখ বুজতেই রাজ্যের ঘুম এসে ভর করলো তার চোখে।

———————

ঘড়িতে সকাল আটটা। তাজওয়ার সাহেব সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন এমন সময় মেইন গেইট দিয়ে রায়ানকে আসতে দেখে উনি ভ্রুকুচকালেন। গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
“এতো সকালে কোথায় থেকে আসলে?”

রায়ান নিরেট গলায় জবাব দিলো,
“একটু হাঁটতে গেছিলাম।”

তাজওয়ার সাহেব তীক্ষ্মচোখে তাকিয়ে আছেন রায়ানের দিকে। কিন্তু রায়ান ভাবলেশহীন ভাবে সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের রুমে চলে গেল। ফোন কানে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। বেশকিছুক্ষণ ফোনে কথা বলে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে,রেডি হয়ে বের হলো একেবারে।

আয়নায় নিজেকে আবারো ঠিক করে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়লো। রায়াধ হাতের ঘড়ি ঠিক করছিলো আর সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো। অন্যদিকে নেহা হা হয়ে তাকিয়ে আছে রায়ানের দিকে। কালো শার্ট, নেভি ব্লু রঙের জিন্স, চুলগুলো সেট করা, সব মিলিয়ে বেশ সুদর্শণ লাগছে রায়ানকে।

রায়ান হুট করেই খাবার টেবিলের দিকে তাকাতেই চোখমুখ কুচকে এলো। খাবার খাওয়ার ইচ্ছা যেন মরে গেল নেহাকে দেখে। রায়ান খাবার টেবিলের দিকে না গিয়ে বাইরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই রাবেয়া বেগম রায়ানকে ডেকে বললেন,
“নাস্তা করে যা রায়ান।”

রায়ান তাড়া দিয়ে বলল,
“না মা সময় নেই কাজ আছে।”

বলেই চলে গেল রাবেয়া বেগমকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে।

————————

অনুভবের কাল থেকে কলেজে যাওয়া লাগবে তাই সে টুকিটাকি শপিং করতে এসেছে। কিছু শার্ট আর প্যান্ট কিনে নিলো সে। শপিং শেষে বের হতে নিবে তখনি পিছন থেকে ইশরা ডেকে উঠলো,
“অনুভব ভাই”

অনুভব ইশরার ডাক শুনে পিছনে ফিরে তাকালো। ইশরাকে দেখে মুচকি হেসে বলল,
“ইশরা যে, কেমন আছো?”

ইশরাও মুচকি হেসে বলল,
“এই আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আসছেন?”

“আমিও ভালো আছি। তা এখানে কি করছো?”

“কিছু কেনাকাটা করার ছিলো। ও ভাইয়া আপনাকে অভিনন্দন নতুন চাকরির জন্য।”

অনুভব মুচকি হেসে বলল,
“ধন্যবাদ। বাসায় এসো একদিন। এখন কোথায় যাবে?”

“এই তো বাসার দিকেই যাচ্ছিলাম আপানাকে দেখতে পেয়েই তো আসলাম।”

“ওও আচ্ছা তাহলে রিক্সা ঠিক করে দিই।”

“না না দরকার নেই আমি পারবো।”

অনুভব ইশরার কথায় পাত্তা না দিয়ে একটা রিক্সা ডেকে ইশরাকে তুলে দিলো। সাবধানে যেতে বলে নিজেও বাইকে উঠে পড়লো।

—————————

ভার্সিটিতে এসে আহাদকে একা বসে থাকতে দেখে কপাল কুচকে এলো রায়ানের। রায়ান আহাদের কাছে এগিয়ে গিয়ে জিঙ্গাসা করলো,
“কিরে ইয়াসিন কোথায়? তুই একা কেন?”

আহাদ চোখ ছোট ছোট করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেন চান্দু তুমি জানোনা?”

রায়ান বসতে বসতে বলল,
“আরে ব্যাটা আমি জানলে কি তোরে জিঙ্গাইতাম।”

আহাদ বেশ বিরক্ত হলো রায়ানের কথায়। বিরক্তি নিয়েই বলল,
“কালকের কফি খেয়ে ওর পেটের সমস্যা হয়েছে। অনেক ওয়াশরুম যাওয়া আসা করে অবস্থা খারাপ। তোর জন্যই আজ ওর এই অবস্থা।”

রায়ান ভ্রুকুচকে বলল,
“আমি আবার কি করলাম!”

“না তুমি তো ধোঁয়া তুলসি পাতা। কে বলেছিলো ওই মাইয়ারে থাপ্পড় দিতে।”

রায়ান ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
“কেন তুই”

আহাদ অবাক হয়ে বলল,
“আমি আবার কখন বললাম!”

“তুইই তো বললি যে সাদা জামা পড়া মেয়েটাই তোর এক্স। যে তোকে মুরগি বানিয়ে চলে গেছে।”

আহাদ কটমটিয়ে বলল,
“রায়া…ননন”

রায়ান হেসে শিস বাজাতে বাজাতে উঠে লাইব্রেরির দিকে পা বাড়ালো। আহাদ ধুপধাপ পায়ে রায়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভুল কার ক আগে?”

রায়ান ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
“তোর”

আহাদ কি বলবে বুঝতে পারলো না। রায়ান মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছে আহাদকে রাগিয়ে। আহাদ রেগে চলে যেতে নিবে তখনি রায়ান ওর হাত ধরে টেনে বলল,
“হয়েছে আর রাগ দেখাতে হবেনা। চল লাইব্রেরিতে যাই।”

আহাদ গাল ফুলিয়ে বলল,
“যাবোনা”

রায়ান বিরক্তিতে নাকমুখ কুচকে বলল,
“এমন ভাব করছিস যেন আমি তোর জামাই লাগি। চল শালা।”

আহাদ ভেংচি কেটে বলল,
“এমনি এমনি শালা কবি না আমারে। আগে তোর বোনরে আমার সঙ্গে বিয়া দে। তারপর শালা কবি। আইসে শালা কইতে, বোন নাই আবার শালা কয় আমারে। ঢঙ দেখে বাঁচি না।”

রায়ান বাঁকা হেসে বলল,
“ওমা তাই নাকি আগে বলবি না। নেহার সঙ্গে তাহলে তোর বিয়াটা ঠিক করি।”

আহাদ বিস্ফরিত দৃষ্টিতে তাকালো রায়ানের দিকে। তড়িঘড়ি করে বলল,
“না ভাই থাক। এতো সিরিয়াস হতে হবেনা। পারলে আমি সারাজীবন আমি বিয়া না কইরা কাটায় দিমু। কিন্তু নেহারে বিয়া করমু না। ভাই তুই না লাইব্রেরিতে যেতে চাইছিলি। চল চল।”

বলেই আহাদ তাড়াতাড়ি করে লাইব্রেরির দিকে যেতে লাগল। রায়ান ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।

———————

পড়ন্ত বিকেলে ছাদের কাণিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে আমায়রা। মৃদু বাতাসে তার কোমর পর্যন্ত লম্বা চুলগুলো তাল মিলিয়ে নাচছে। আমায়রা ফুরফুরে মনে গুনগুনিয়ে গান গাইছে। তখনি তার চোখ আবারো গলির মাথায় গেল। দিনের আলো এখনো পুরোপুরি চলে যায়নি। সেই আলোতেই আমায়রা স্পষ্ট বুঝতে পারলো এটা কাল রাতেরই গাড়ি। আমায়রা কপাল কুচকে তাকিয়ে রইলো। মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যার উত্তর নেই আমায়রার কাছে। আমায়রা তীক্ষ্মচোখে বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো গাড়িটা। তার পর্যবেক্ষণের মাঝেই গাড়িটি সাই করে চলে গেল। আমায়রার কুচকে যাওয়া কপাল যেন আরো বেশি কুচকে গেল।

#চলবে
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)