অতল গহ্বরে নীরবতা পর্ব-১১+১২

0
271

#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ১১

ইশরাকে হাসতে দেখে কপাল কুচকে এলো আমায়রার। আমায়রা কর্কশ কন্ঠে বলল,
“পাগলের মতো হাসছি কেন!রাস্তায় আসার সময় কি পাগলা কুত্তা কামড় দিছে।”

ইশরা নিজের হাসি চেপে বলল,
“যমরানী নামটা কিন্তু সেই দোস্ত।”

আমায়রা রাগী চোখে তাকালো ইশরার দিকে। ইশরা এবার নিজেকে দমিয়ে বলল,
“যে ছেলেটাকে থাপ্পড় মারলি তাকে চিনিস!”

আমায়রা একটা তপ্তশ্বাস ছেড়ে বলল,
“না চিনিনা আর চিনতেও চাইনা। অসভ্য হাত ধরে টানাটানি করে।”

ইশরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা চল ক্লাসে যাই এখন।”

“হুম চল”

আমায়রা আর ইশরা দেড়ি না করে চলে গেল ক্লাসে।

অন্যদিকে রায়ান এসে ক্লাসে আহাদের পাশে বসলো। বসার পর থেকে আহাদ ওকে খোঁচাচ্ছে। রায়ান একরাশ বিরক্তি নিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“কি হয়েছে এমন করে খোঁচাচ্ছিস কেন?”

আহাদ রায়ানের কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ভিসির ছেলে তোর ক্ষতি করার প্লান করছে। তোর ক্ষতি করে হলেও এবার নাকি ঐ টপার হবে। সবাই কানাঘুষা করছে।”

রায়ান বাঁকা হেসে বলল,
“তুই হয় তো ভুলে গেছিস আমি রায়ান ইশতিয়াক চৌধুরী সব পরীক্ষায় টপ করেছি এই পরীক্ষায়ও করবো ইনশাআল্লাহ।”

আহাদ চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“আরে সেটা তো আমিও জানি যে তুই টপ করবি। কিন্তু..!”

রায়ান আহাদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“চিন্তা করিস না। ওই শিহাব আমার কিছুই বাঁকাতে পারবেনা। বিশ্বাস করিস তো আমায়।”

আহাদ মুচকি হেসে বলল,
“নিজের থেকেও বেশি।”

আহাদের কথায় আলতো হাসলো রায়ান।

————————

অনুভবকে ইন্টার ফাস্ট ইয়ারের ক্লাস নিতে বলা হয়েছে। অনুভব কিছুটা নার্ভাস। অনুভব চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে করতে ক্লাসে গেল। ক্লাসে যেতেই সবাই দাঁড়িয়ে পরলো। অনুভব সবাইকে বসতে বলে নিজের পরিচয় বলল। অনুভব ইংলিশের টিচার হিসেবে জয়েন করেছে। স্টুডেন্ট এর থেকে টুকিটাকি কথাবার্তা শুনে অনুভব ক্লাস নেওয়া শুরু করলো।

অনুভব বোর্ডে একটা করে টপিক লেখছে আর এক এক করে সব বুঝিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে স্টুডেন্টদের করা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। ক্লাস শেষের ঘন্টা বাজতেই অনুভব স্টুডেন্টদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ক্লাস রুম থেকে বের হতে নিবে তখনি একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এলো,
“স্যার!”

অনুভব পিছনে ঘুরে তাকালো। পাতলা করে শ্যামবর্ণের একটা মেয়ে তাকে ডাকছে। অনুভব নিরেট গলায় মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিছু কি বলবে?”

মেয়েটা খানিকটা ইতস্তত করতে করতে একটা কলমএগিয়ে দিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“স্যার আপনার কলমটা ক্লাসে ফেলে এসেছিলেন।”

“ওও ধন্যবাদ তোমাকে”

বলেই অনুভব চলে গেল সেখান থেকে।
মেয়েটা তাকিয়ে রইলো অনুভবের যাওয়ার দিকে।

———————

নূর গুটিগুটি পায়ে বসার রুমে গেল। রাবেয়া বেগম সোফায় বসে টিভি দেখছিলেন। সদ্য ঘুম থেকে ওঠায় চোখমুখ ফুলে আছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। দেখতে বেশ কিউট লাগছে নূরকে । নূর রাবেয়া বেগমের কাছে আসতেই রাবেয়া বেগম ওকে কোলে তুলে নিলেন। নূর রাবেয়া বেগমের গলা ধরে আদুরে গলায় বলল,
“আপু চল না ঘুরতে যাই।”

“বিকালে তোমাকে পার্কে নিয়ে যাবোনি আপু।”

রাবেয়া বেগমের কথায় নূর গাল ফুলিয়ে বলল,
“না আমি পার্কে যাবো না। আমরা সবাই একসঙ্গে দূরে কোথাও ঘুরতে যাবো।”

রাবেয়া বেগম মুচকি হেসে নূরে এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে বললেন,
“তোমার চাচ্চুর পরীক্ষা শেষ হলে আমরা গ্ৰামে ঘুরতে যাবো।”

রাবেয়া বেগমের এই কথা মনে ধরলো নূরের। মিষ্টি হেসে বলল,
“দাঁড়াও আমি আম্মুকে বলে আসি।”

বলেই কোল থেকে নেমে ছুটতে লাগল নূর। রাবেয়া বেগম হেসে বললেন,
“আস্তে দৌড়াও আপু পড়ে যাবে তো।”

তাহসিন অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। তাজওয়ার সাহেব আজকে আগে আগেই চলে গেছেন। লাঞ্চ ব্রেকের আগে একটা মিটিং আছে সেখানে যেতে বলে গেছেন তাহসিনকে। তাহসিন ব্লেজার পড়তে নিবে তখনি আয়নায় দেখলো নাইমা বেড সাইট টেবিলে তার জন্য কফি রাখছে।

তাহসিন মুচকি হেসে পিছু ঘরে নাইমাকে ডাকলো। নাইমা তাহসিনের দিকে তাকিয়ে ইশরায় কি হয়েছে তা জিজ্ঞাসা করলো। তাহসিন হাতের ব্লেজার দেখালো। নাইমা বুঝতে পেরে মুচকি হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো তাহসিনের দিকে।

ব্লেজারটা পড়িয়ে দিতেই তাহসান পিছনে ঘুরে নাইমার কোমর জড়িয়ে ধরলো। কপালে কপাল ঠেকিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“আমি খুব খারাপ স্বামী তাইনা। তোমাকে একদম সময় দিতে পারিনা। সারাদিন কাজ নিয়েই পড়ে থাকি।”

নাইমা মুচকি হেসে ডান হাতটা আলতো করে তাহসানের গালে রেখে বলল,
“কে বলেছে তুমি খারাপ!তুমিই আমার কাছে সব থেকে ভালো। ভালোবাসার মানুষ কখনো খারাপ হয় বুঝি।”

তাহসানের ঠোঁটে একটা প্রাপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। নাইমার কপালে একটা চুমু বসিয়ে বলল,
“বউ আজকে না আমার অফিস যেতে মন চাইছে না।”

তাহসানের কথায় ভ্রুকুচকালো নাইমা।

“কেন যেতে ইচ্ছা করছেনা?”

নাইমার কথায় বাঁকা হাসলো তাহসান। তাহসানের বাঁকা হাসি দেখে রোদেলা তাহসানের টাই ঠিক করতে করতে বলল,
“এই যে মিস্টার আপনার যে জরুরি মিটিং আছে। সেদিকে খেয়াল আছে কি?”

তখনি নূর আম্মু আম্মু বলে রুমে আসতে লাগল। নূরের গলা শুনে ছিটকে দূরে সরে গেল তাহসান। নাইমা তাহসানের কান্ড দেখে হেসে দিলো। নূর নাইমার কাছে এসে জামা ধরে বলল,
“আম্মু আপু বলেছে আমরা সবাই ঘুরতে যাবো।”

তাহসান এসে মেয়েকে কোলে নিয়ে বলল,
“তা নূরপাখি কোথায় যাবো আমরা সবাই?”

নূর খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
“গ্ৰামে যাবো আমরা সবাই মিলে।”

তাহসান মুচকি হেসে মেয়ের গালে চুমু খেয়ে বলল,
“আচ্ছা যাবোনি। তা আজকে তোমার জন্য কি আনবো নূরপাখি।”

নূর কিছু সময় ভেবে বলল,
“চিপস”

নাইমা এগিয়ে এসে কাটকাট গলায় বলল,
“না কোনো চিপস চকলেট খাওয়া নেই। এগুলো আজেবাজে খাবার খেয়ে দাঁতের কি অবস্থা হচ্ছে দিন দিন।”

নূর মায়ের কথা শুনে গাল ফোলালো। তাহসান সেদিকে একবার তাকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে নাইমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কে যেন এখনো আইসক্রিম আর চকলেট খাওয়ার জন্য বায়না করে!”

বাবার কথায় মুখ টিপে হাসলো নূর। নাইমা মুখ ভেংচালো তাহসানকে। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ওটা আলাদা ব্যাপার।”

নাইমার কথায় হো হো করে হেসে দিলো তাহসান। তাহসানের দেখাদেখি নূরও হেসে দিলো।

দুইজনকে হাসতে দেখে নাইমা গাল ফুলিয়ে ধপধপ পা ফেলে বেডে গিয়ে বসলো।

তাহসান নূরের কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
“মাম্মাম তো দেখি রেখে গেছে নূরপাখি।”

নূরও তাহসানের দেখাদেখি ফিসফিসিয়ে বলল,
“বাবাই আম্মুর রাগ ভাঙাতে হবে।”

তাদের ফিসফিস করা সব কথাই কানে যাচ্ছে তার। ভিতরে ভিতরে ওদের কাজে হাসলেও উপরে রাগ নিয়েই থাকলো নাইমা।

তাহসান আর নূর দুইজনই নাইমার কাছে গেল। নূর নাইমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আম্মু রাগ করেনা। আমার চকলেট তোমাকে দিবোনি।”

তাহসানও সায় দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ আমারটাও তোমাকে দিবোনি। তাও রাগ করোনা আম্মু থুক্কু বউ।”

তাহসানের কথায় ফিক করে হেসে দিলো নাইমা। ওরা দুইজনও হাসলো।

—————————

ক্লাসের মাঝেই ফোনটা বেজে উঠলো রায়ানের। রায়ান সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ক্লাসে মনোযোগ দিলো।

টানা দুটো ক্লাস করে রায়ান আর আহাদ বের হলো ক্লাস থেকে। রায়ান ফোন চেক করে দেখলো নেহা কল করেছিলো দশবার। একরাশ বিরক্তি নিয়ে সে তাকালো ফোনের দিকে। এরমধ্যে আবারো ফোন বাজতে লাগল। রায়ান কল রিসিভ করে ঝাঁঝালো গলায় বলতে লাগল,
“দেখছিস যখন কল রিসিভ হচ্ছেনা। তার মানে অপরপাশের ব্যক্তি তোর কল রিসিভ করতে চায়না। তারপরেও দিতেই আছিস বেহায়ার মতো। আর কি বলবো তোকে। নূন্যতম কমনসেন্স নেই তোর। এরপর আর একবার বিরক্ত করলে তুই আমার সব থেকে ভয়ংকর রূপ দেখবি বলে দিলাম।”

কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলেই খট করে কল কেটে নেহার নাম্বার আবারো ব্লক লিস্টে ফেলল রায়ান।

#চলবে

#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ১২

রায়ান ফোন কেটে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো এরপর যত যাই হয়ে যাক না কেন ব্লক সে খুলবেনা। আহাদ রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আবার ব্লক করলি?”

“হুম”

“ঠাটিয়ে একটা দিতে পারিস না। অচেনা মাইয়ারে থাপ্পড়াইলি আর নেহাকে দিতে পারিস না।”

রায়ান একটা তপ্তশ্বাস ফেলে বলল,
“বাসায় ঝামেলা করবে। পরীক্ষাটা খালি শেষ হতে দে ওর ব্যবস্থা আমি করবো।”

আহাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—————————

দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কয়েকদিন। এর মাঝে আর দেখা হয়নি আমায়রা আর রায়ানের। দুইজনই ব্যস্ত দুইজনের পড়ালেখা নিয়ে।

আজ আমায়রা বেশ টেনশনে আছে। আজ তার প্রথম পরীক্ষা। সকাল বেশ অস্থির অস্থির করছে। অনুভব আমায়রাকে ভার্সিটির সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল,
“রিলাক্স তুই পারবি। মাথা ঠান্ডা রেখে ভালো মতো পরীক্ষা দিস। তাড়াহুড়ো করিস না।”

আমায়রা মুচকি হেসে অনুভবের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। অনুভবও চলে গেল কলেজের উদ্দেশ্যে। কলেজের দিনকাল ভালোই চলছে তার। সবাই তার উপর সন্তুষ্ট। অনুভব খুব দায়িত্বশীল ছেলে। খুব সুন্দরভাবে সে তার ক্লাস মেইনটেইন করছে। কলেজের কতৃপক্ষ ও বেশ খুশি তার উপর।

আমায়রা ক্লাস রুমে ঢুকতেই দেখলো ইশরা এক কোণে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। আমায়রা ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“কিরে কি অবস্থা?”

ইশরা একপলক আমায়রার দিকে তাকিয়ে আবারো একিভাবেই বসে রইলো। আমায়রা ভ্রুকুচকে তাকালো ইশরার দিকে। ইশরার পিছনেই তার সিট পড়েছে। সিটে বসে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে ঢকঢক করে খেতে লাগল। এক নিশ্বাসে অর্ধেক বোতলে পানি পান করে পানির বোতল রেখে দিলো। চারপাশে তাকিয়ে দেখলো একবার স্টুডেন্ট প্রায় অনেকাংশই এসে পড়েছে। আমায়রা এবার ঠিকঠাক হয়ে বসে পিছন থেকে ইশরাকে খোঁচাতে লাগল। ইশরা পিছু ঘুরে তাকালো আমায়রার দিকে।

“কি হয়েছে তোর মন খারাপ?”

ইশরা ভাবুক কন্ঠে বলে উঠলো,
“মন খারাপ কি না জানিনা।”

ইশরার এমন কথায় আমায়রা কপালে ভাঁজ পরলো। এর মাঝেই টিচার চলে আসায় ওদের আর কথা হলো না।

————————

পরীক্ষার হলে আগে পিছে সিট পড়েছে রায়ান আর শিহাবের। রায়ান বরাবরই পড়াশোনায় বেশ ভালো। টপ করে প্রতিবছর। কিন্তু শিহাব রায়ানের জন্যই প্রথম হতে পারে না। সে ভিসির ছেলে হয়েও প্রথম হতে পারেনা এ নিয়ে যেন মনের মাঝে এক বিশাল ক্ষোভ শিহাবের। শিহাব পিছন থেকে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
“এবার আমিই সেরা হবো। সবার সেরা।”

রায়ান নিলিপ্ত ভঙ্গিতে বসে রইলো।

শিহাব আবারো কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলো,
“কিরে কথা বলছিস না যে ভয় পেলি নাকি।”

রায়ান বাঁকা হাসলো। তবুও কিছু বলল না। এরমধ্যেই টিচার চলে আসায় শিহাব চুপ করে গেল।

দীর্ঘক্ষণের পরীক্ষা শেষ করে আমায়রার ক্ষুধা পেয়ে গেছে। পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে ইশরাকে নিয়ে ক্যান্টিনে গেল। ইশরা এখনো দম ধরে আছে।

আমায়রা কিছু নাস্তা খেতে লাগল। কিন্তু ইশরা কিছুই খাচ্ছে না। এর মাঝেই কানাঘুষা শোনা গেল বটতলায় ঝামেলা হচ্ছে। ইশরা চুপ করে বসে আছে। আমায়রা পাউরুটিতে কামড় দিতে দিতে বলল,
“কিসের এতো ঝামেলা বল তো!”

ইশরা ভাবলেশহীন ভাবে ফোন টিপতে টিপতে বলল,
“তুই যেখানে আমিও সেখানে। আমি কেমনে বলবো কি হচ্ছে না হচ্ছে?”

আমায়রা একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকালো ইশরার দিকে। ইশরা সেদিকে পাত্তা না দিয়েই ফোন টিপতে লাগল। আমায়রা কোনোমতে খাবার শেষ করে উঠতে উঠতে বলল,
”চল দেখে আসি।”

ইশরা ভ্রুগুটিয়ে আমায়রা দিকে তাকিয়ে বলল,
“কোনো দরকার নেই ঝামেলায় জড়ানোর।”

আমায়রা কি আর শোনে। আমায়রা ইশরাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল। যদিও ক্যান্টিন থেকে বের হওয়ার পরেই তাদের বটতলার সামনে দিয়েই যেতে হতো।

ভীড় ঠেলে আমায়রা সেখানে যেতেই দেখলো একটা কালো পাঞ্জাবী পড়া ছেলে একটা পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। চোখে সানগ্লাস, চুলগুলো এলোমেলো,হাতে দামি ঘড়ি, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। শ্যামবর্ণের ছেলেটাকে দেখতে খারাপ না তবে কেমন যেন গুন্ডা গুন্ডা ভাব। তার পাশে অনেকগুলো ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে দাঁড়ানো একটা ছেলেকে চেনে আমায়রা। ওই ছেলেটাই তার হাত ধরে বিরক্ত করেছিলো। আমায়রা বুঝতে পারলো ওই গুন্ডার চামচা হবে সেইদিনের ওই ছেলেটা।

সামনে বরাবর সাদা শার্ট পড়া একটা ছেলে দাঁড়িয়। ছেলেটা পিছু ঘুরে থাকায় দেখা যাচ্ছে না।

গুন্ডামার্কা ছেলেটা পা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,
“এখনো সময় আছে ছেড়ে দে সব।”

আমায়রা চোখ ছোট ছোট করে সব দেখছে। হুট করেই সাদাশার্ট পড়া ছেলেটা একটা ইশরা করলো। সাথে সাথে দুটো চেয়ার নিয়ে আসা হলো। ছেলেটা একটা চেয়ারে বসে আরেকটা চেয়ারে পা রেখে গা এলিয়ে দিলো । ছেলেটার মুখ দেখে কপাল কুচকে এলো আমায়রার। আমায়রা নিজে মনেই বলল,
“রায়ান ইশতিয়াক চৌধুরী”

রায়ান চোখবুজে ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
“শিহাব এতো ফাউ বকিস না তো। এক কথা একশবার শুনতে ভালো না। এমনিতেই চার ঘন্টা পরীক্ষা দিয়ে আমি বেশ ক্লান্ত। তার মধ্যে তোর এইসব নাটক আমার সহ্য হচ্ছে না বিশ্বাস কর।”

শিহাব যেন ক্ষেপে উঠলো। চেয়ার ছেড়ে উঠে রায়ানকে মারতে যাবে তখনি চোখ বন্ধ রেখেই শক্ত হাতে শিহাবের হাত চেপে ধরলো। শিহাব ক্ষেপা ষাঁড়ের মতো চিল্লিয়ে বলল,
“রায়ান”

রায়ান বাঁকা হেসে আরো জোরে মুচড়ে ধরলো শিহাবের হাত। শিহাবের চামচাগুলো এগিয়ে আসতে নিবে। কিন্তু রায়ান তাদের হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলো। চোখ খুলল সে। চোখ গুলো টকটকে লাল হয়ে আছে তার। ফর্সা মুখটাও খানিকটা লাল হয়ে আছে। রায়ান উঠে দাঁড়ালো শিহাবের কানের কাছে হিসহিসিয়ে বলল,
“আমাকে খারাপ হতে বাধ্য করিস না। এক মুদ্রার দুই পিঠ থাকে কিন্তু ভুলে যাস না।”

হুট করেই একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এলো,
“ওনার চামচাদের ও মারেন।”

শিহাব আর রায়ান সহ সবাই মেয়েটার দিকে তাকালো।

আমায়রাকে দেখে বাঁকা হাসলো রায়ান। শিহাব ভ্রুকুচকে আমায়রার দিকে তাকালো। তখনি পাশ থেকে ওই ছেলেটা বলে উঠলো,
“ভাই এই সেই মাইয়া যে আমারে থাপ্পড় দিছিলো।”

শিহাবের হাত ছেড়ে দিয়ে রায়ান ঘুরে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো সেই ছেলেটার গালে। কর্কশ গলায় বলে উঠলো,
“মেয়ে মানুষের হাত ধরার সময় মনে হুশ থাকে না। আবার থাপ্পড় দিছে বলে অভিযোগ।”

আমায়রা মনে মনে বেশ খুশি হলো। শিহাব এখনো ভ্রুকুচকে তাকিয়ে আছে আমায়রার দিকে। আমায়রা জোরে বলে উঠলো,
“ধন্যবাদ রায়ান ভাই। তবে আমি কিন্তু এখনো সবকিছুর হিসাব নেইনি।”

আমায়রার কথায় বাঁকা হাসলো রায়ান। শিহাবের দিকে ঘুরে ওর কানে কানে কিছু একটা বলল রায়ান। শিহান অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো রায়ানের দিকে। রায়ান ভাবলেশহীন ভাবে চোখের চশমা নাক থেকে উপরে ঠেলে দিয়ে আহাদ আর ইয়াসিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“খেলা শেষ চলে আয় তোরা।”

বলেই বাইকের চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে রায়ান চলে গেল। ইয়াসিন আর আহাদও গেল ওর পিছু পিছু। আমায়রাও ইশরার হাত ধরে রওনা হলো। বেশ দেড়ি হয়ে গেছে এসব কাহিনী দেখতে দেখতে।

শিহাব এখনো হাত ঘষছে আর অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রায়ানের যাওয়ার দিকে।

ভার্সিটির থেকে পেরিয়ে একটা রিক্সা ডেকে তাতে উঠে পড়লো আমায়রা আর ইশরা। ইশরা কপাল কুচকে আমায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই ধন্যবাদ দিলি তাও আবার রায়ান ভাইকে!”

আমায়রা চোখ ছোট ছোট করে ইশরার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তো?”

“না মানে”

ইশরার কথার মাঝেই আমায়রা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“সহজ কথা আমার কথায় ওই অসভ্য ব্যাটারে থাপ্পড়াইছে তাই ধন্যবাদ দিছি। মনে কর আমাকে থাপ্পড় দিছে সেই ব্যাটা একজন আর আজকের ব্যাটা আরেকজন।”

“তার মানে কি তোদের মধ্যে ঝামেলা শেষ হয়ে গেল। ”

“নো নেভার কখনোই না উনি আমার আজীবনের শত্রু। আমার এই নরম সুইট গালটাতে থাপ্পড়িয়ে উনি পচা মুলার মতো করে দিছিলো। আর তাকে আমি ক্ষমা করে দিবো।”

আমায়রার কথায় তপ্তশ্বাস ফেলল ইশরা। আমায়রা মুখ বাঁকিয়েই বসে রইলো।

কিছুক্ষণ বাদে ইশরা নিজের বাসার সামনে নেমে গেল। আমায়রা ও খানিকক্ষণ পর বাসায় পৌঁছে গেল। মেয়েকে দরজা খুলে দিয়ে আমেনা বেগম চলে গেলেন শরবত বানাতে।

আমায়রা ব্যাগটা সোফায় রেখে ধপ করে বসে পড়লো সোফায়। এখন এক অদ্ভুত আবহাওয়া হয়েছে। সারাদিন প্রচন্ড গরম থাকার পর রাতে কুয়াশা পড়ে। আমেনা বেগম লেবুর শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“পরীক্ষা কেমন হলো? আর দেড়ি হলো যে?”

আমায়রা মুচকি হেসে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালোই হয়েছে পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে ভিশন ক্ষুধা লেগেছিলো তাই খেতে গিয়ে দেড়ি হয়ে গেল।”

আমেনা বেগম মেয়ের কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো আলতো হাতে গুছিয়ে দিয়ে বলল,
“শরবতটা খেয়ে গোসলে যা। আমি খাবার দিচ্ছি। আবার কবে পরীক্ষা?”

আমায়রা শরবতটা খেয়ে গ্লাসটা মায়ের হাতে দিয়ে বলল,
“কাল নেই পরশু আছে আবার।”

আমেনা বেগম “ওও” বলে আবারো আমায়রাকে ফ্রেশ হতে বলে চলে গেলেন।

আমায়রা আরো কিছুসময় ফ্যানের নিচে বসে থেকে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ক্লান্ত পায়ে রুমে চলে গেল।

#চলবে