#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ১৫
অনুভবের কথা শেষ হতেই পিছন থেকে এক পুরুষালি কন্ঠে ভেসে এলো।
“আমিই গো সেই অভাগা। যে তোমার বান্ধবীরে বিয়ে করছি।”
অনুভব পিছন ঘুরে তাকালো। এতো ফিজিক্সের প্রফেসর পিয়াস ইসলাম। লোকটা অত্যন্ত শান্তশিষ্ট, স্বল্পভাষী। অনুভব তাকালো তর্নির দিকে আবারো পিয়াসের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাই আপনি ফাইসা গেছেন।”
তর্নি কটমটিয়ে তাকালো পিয়াসের দিকে। দাঁত পিষে বলল,
“বাসায় চল আজকে তুই।”
পিয়াস অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো অনুভবের দিকে। অনুভবে বেশ হাসি পেল পিয়াসের সেই চেহারা দেখে।
অনুভব তর্নির দিকে তাকিয়ে বলল,
“থাক বাদ দে আজ আমার আরেকটা ক্লাস আছে ওটা করে আসি। তুই পিয়াস সাহেবের সঙ্গে থাক। ক্লাস শেষে আড্ডা হবে।”
তর্নি পিয়াসের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“যা তুই, আমি আছি।”
অনুভব মুচকি হাসি দিয়ে রুম ত্যাগ করলো। অনুভব রুম ছাড়তেই তর্নি পিরাসের সামনে দাঁড়িয়ে কোমরে দুহাত রেখে বলল,
“কি জানি কইছিলি অনুভবরে! অভাগা আজ তোরে আমি অভাগা বানাইয়াই ছাড়মু।”
অনুভবের কানে তর্নির কথাটা এলো। অনুভব একটা তপ্তনিশ্বাস ছেড়ে বলল,
”বান্দর মাইয়ারও বিয়া হয়ে গেলে শুধু আমার মতো ভালা পোলাডারই বিয়া হইলো না।”
একরাশ হতাশা নিয়ে ক্লাসে গেল অনুভব।
———————
পড়ন্ত বিকালে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলছে ইশরা আর আমায়রা। ইশরাকে চুপ থাকতে দেখে আমায়রা আর ধৈর্য্য না ধরতে পেরে বলল,
“ইশু তুই কি জন্য আমাকে ডেকেছিস বলবিনা?”
ইশরা আমতা আমতা করতে লাগল আমায়রা বেশ বিরক্ত হলো ইশরার আচরণে। বিরক্তিতে চোখমুখ কুচকে সামনে তাকাতেই দেখলো একটা লম্বা বলিষ্ঠ গড়নের পুরুষ তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। সাদা পাঞ্জাবী, চোখে সানগ্লাস ফর্সা গায়ে বেশ মানিয়েছে। আমায়রা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো ছেলেটার দিকে। চেনা চেনা লাগছে, আরে এতো ফারহান। ইশরার কাজিন ব্রো। আমায়রার আর বুঝতে বাকি রইলো আসল ঘটনা। আমায়রা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তোর পেটে পেটে এতো বদ ছেমরি। আমারে তোর প্রেমপ্রীতি পাহারা দিতে আনছিস।”
ইশরা চোখ পিট পিট করে আমতা আমতা করতে লাগল। ফরহান ওদের সামনে হাস্যজ্বল মুখে বলে উঠলো,
“কি অবস্থা তোমাদের?একটু দেড়ি হয়ে গেল পার্টি অফিসের কিছু কাজে আটকে গেছিলাম।”
আমায়রা জোর করে ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“এই তো ভাইয়া ভালোই। তা আপনার কি অবস্থা? ভালোই তো আমার বান্ধবীটারে পটাইয়া ফেলছেন।”
আমায়রার কথায় বাঁকা হাসলো ফারহান। ইশরা চুপ করে আছে। ফারহান ইশরার দিকে তাকিয়ে বলল,
“রাগ করেছেন ম্যাডাম?”
আমায়রা বিরক্তি নিয়ে দুজনের পানে তাকালো। কাবাবে হাড্ডির মতো লাগল নিজেকে। কি করলো এ জীবনে একটা ভালোবাসতে পারলো। আফসোস বহুত বড় আফসোস। কল এসেছে বলে কোনোমতে সেখান থেকে কেটে পরলো আমায়রা। ফারহান আর ইশরা একসঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমায়রা পার্কের বড় বকুল ফুল গাছের নিচে পাকা করা স্থানে বসলো। গাল ফুলিয়ে বসে পা নাড়াতে লাগল সে। আর মনে মনে ইশরার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে লাগল। আমায়রা মনে সুখে বকাবকি করছিলো তখনি তার কানে পুরুষালি ভরাট কন্ঠ ভেসে এলো,
“কি ব্যাপার, যমরানী এখানে কি করছেন?”
আমায়রা কপাল গুটিয়ে তাকালো পাশে। কালো শার্ট পরিহিত ফর্সা মুখের গম্ভীর লোকটা চিনতে বেশি বেগ পেতে হলো না আমায়রার। এতো রায়ান ইশতিয়াক চৌধুরী। রায়ান পরপর বাদাম মুখে দিচ্ছে। দৃষ্টি তার কিছু দূরে ছোট খালটার দিকে। যেখানে স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হচ্ছে কলকলিয়ে।
আমায়রা কথা বলল না। রায়ানের থেকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলো।
রায়ান এবার আমায়রা দিকে অবাক হওয়ার ভাব ধরে বলল,
“একি যমরানী এ আপনার কেমন রূপ দেখাচ্ছেন আমায়? আমি শিহরিত। ও মাই গড আমারে কেউ তুলে আকাশের পরীদের কাছে নিয়ে যা।”
আমায়রা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো রায়ানের দিকে। রায়ান খানিকটা থেমে বলল,
“যমরানী চুপ করে বসে আছে ভাবা যায়। যে টু শব্দ করলেই হাউমাউ করে ঝগড়া করতে আসে আর সে নাকি চুপ করে বসে আছে। মানুষ তো এখন ফেসবুকে স্টাটাস দিবে এটা কিয়ামতের আলামত বলে। দু-তিনদিন ট্রেন্ড থাকবে এটা পোস্ট দেওয়ার। ভাবা যায়!”
আমায়রা বেশ বিরক্ত হলো। কুচকে যাওয়া ভ্রুযুগল আরো কুচকে বলল,
“আপনি এতো ফাউ বকতে পারেন?”
আমায়রা থামলো। হাত উঠিয়ে রায়ানের দিকে চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“ওয়েট,ওয়েট আপনি আমাকে ঝগড়ুটে বললেন!”
রায়ান ভাবলেশহীন ভাবে বাদাম খেতে খেতে বলল,
“কোনো সন্দেহ আছে এতে?”
আমায়রা তেতে উঠলো। ডান হাতের তর্জনী তুলে কটমটিয়ে বলল,
“দেখুন,এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে।”
রায়ান মুখ বাঁকালো। আমায়রা রাগ বাড়াতে এটুকুই যেন যথেষ্ট ছিলো। আমায়রা রায়ানের হাত থেকে বাদামের ঠোঙাটা কেড়ে নিলো। রায়ান সেদিকে আড়চোখে দেখে প্যান্টে হাত ঝেড়ে বলল,
“ভালোই হলো ঠোঙাটা ডাস্টবিনে ফেলে আসো তো। বাদাম খাওয়া শেষে আবার দূরের ডাস্টবিনে ঠোঙা ফেলতে মন চায় না। তুমি যখন নিজে নিজেই নিলে তাহলে আর কি করার।”
আমায়রার রাগের আগুনে ঘী ঢালার কাজ করলো রায়ানের এমন ভাব ভঙ্গি দেখে। আমায়রা দাঁতে দাঁত চেপে ক্রোধের হাসি হেসে বলল,
“ওও তাই নাকি মিস্টার পান্ডা!”
বলেই বাদামের ঠোঙার সব খোসা ঢেলে দিলো রায়ানের মাথায়। রায়ান হতবাক হয়ে গেল আমায়রার আকষ্মিক করা কাজে। আমায়রা দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
“এখন আপনার ভালো লাগছে তো মিস্টার পান্ডা!”
রায়ান হিসহিসিয়ে উঠলো। কটমটিয়ে বলল,
“ওই মেয়ে তোর সাহস তো কম না আমার উপর বাদামের ময়লা ফেলিস!”
আমায়রা ভাবলেশহীনভাবে বলল,
“আপনার খাওয়া বাদামের ময়লা আপনিই মাথায় রাখেন।”
রায়ান দিক বেদিক না পেয়ে আবারো বাদামের ঠোঙাটা তুলে নিলো। কিছু ময়লা ঠোঙাতে রয়েই গেছে। রায়ান ফিচেল হেসে অবশিষ্ট ময়লাটুকু আমায়রার মাথায় ঢেলে দিলো।
দুইজনের মধ্যে তুমুল ঝামেলা লেগে গেল। ফারহান আর ইশরা দৌড়ে আসলো। ইশরা আমায়রাকে ধরলো আর ফারহান রায়ানকে। রায়ান চেঁচিয়ে বলল,
“ফারহান ভাই ছেড়ে দেও আমাকে। আজকে এই মাইয়াকে যমদরবারে পাঠাবোই।”
আমায়রাও তেতে উঠে বলল,
“আমি কি ছেড়ে দিবো নাকি একদন পচা নর্দমার তিন চুবানি দিমু ব্যাটা বদমাস।”
ফারহান রায়ানকে টেনে নিয়ে গেল। একটা রিক্সা ডেকে উঠে পরলো তাতে। ইশরায় ইশরাকে আমায়রাকে নিয়ে যেতে বলল।
রিক্সায় বসেও ফুসফুস করে ফুসছে রায়ান। ফারহান সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ফারহান রায়ানকে নিয়ে চলে যেতেই ইশরা আমায়রাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“কি শুরু করেছিস বল তো? রায়ান ভাইয়ের সাথেই কেন তোর এত ঝামেলা লাগে বল তো আমায়।”
আমায়রা চটে গেল।
“নেমক হারাম বদমাইশ ছেমরি। আমার সঙ্গে ঘুরিয়ে, আমারে প্রেমপ্রীতি পাহারা দিতে আনিস আমার সাপোর্টে না থেকে ওই ইবলিশের সাপোর্টে কথা বলিস।”
ইশরার এবার নাজের মাথা নিজে ফাটাতে মন চাচ্ছে। ইশরা আরো কিছু বলতে নিবে তার আগেই আমায়রা গটগট পায়ে চলে যেতে লাগল।
ইশরা আহাম্মকের মতো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো আমায়রার যাওয়ার দিকে। বিরবিরিয়ে বলল,
“রাগে তার কেটে গেছে পাগলের।”
ইশরার হুশ হতেই আমায়রার পিছনে ছুটলো সে।
আমায়রা ধুপধাপ পা ফেলে যাচ্ছে আর হিসহিসিয়ে বলছে,
“আর আমি নাকি ওই মুলার বংশধরকে ধন্যবাদ দিলাম। শয়তান কখনোই ভালো হয় না। এটা আমার আগেই মনে রাখা উচিত ছিলো । শালা ইবলিশ আমার সঙ্গে লাগতে আসা। আমি তোরে ছাইড়া দিমুনা। কখনোই না তোরে আমি শিক্ষা দিয়াই ছাড়মু। এটা আমায়রার প্রমিস।”
ইশরা ছুটতে ছুটতে আময়ারার সামনে এসে হাঁটুতে হাত রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“এবারের মতো থাম বইন। আর কথা না হয় নাই ভাবলি। তোর না হওয়া দুলাভাইয়ের কথাটা তো ভাববি। অকালে বউ হারালে তো সে আবারো বিয়া করবে অন্য মাইয়ারে। বুঝার চেষ্টা কর বইন আমার।”
আমায়রা জোর জোরে কয়কটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
“এই মুহূর্তে তুই যদি আমার রাস্তা না ছাড়িয়ে তাহলে তোরে এখানে মেরেই বালিচাপা দিয়ে দিমু বলে দিলাম।”
ইশরা কিছু বলার আগেই আমায়রা আবারো হাঁটা শুরু করলো। ইশরা অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমায়রার যাওয়ার দিকে।
————————
ফারহান রায়ানকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে আসলো। রায়ানের চুলে এখনো বাদামের লাল অংশে কুট দৃশ্যায়ন। ফারহান রায়ানের মাথা ঠান্ডা করার জন্য ঠান্ডা জুস আর নিজের জন্য কফি আনতে বলল। ফারহান হাত তুলে রায়ানের চুলের ময়লাগুলো ফেলে দিতে লাগল। রাগের কারণে রায়ান ফর্সা মুখশ্রী রক্তলাল বর্ণ ধারণ করেছে।
খানিকবাদেই জুস আর কফি চলে এলো। ফারহান জুস এগিয়ে দিতেই রায়ান এক ঢোকে সবটুকু জুস খেয়ে নিলো। চশমা খুলে টেবিলে রেখে চোখ বুজে গা এলিয়ে দিলো চেয়ারে। দুইহাত দিয়ে নিজের কপালে পড়ে থাকা কালো কুচকুচে ঘন চুলগুলো পিছনে ঠেলে নিজ মনেই বলল,
“ওহে মেয়ে বড় ভুল করে ফেললে যে। এই রায়ান ইশতিয়াক চৌধুরীকে যতটা সহজ ভাবছো ততটা সহজ কিন্তু সে না। জাস্ট সময়ের অপেক্ষা।”
ফারহান রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার শালিকাকে তুই আগে থেকেই চিনিস?”
ফারহানের কথায় কোনো রকম ভাবান্তর দেখা গেল না রায়ানের মাঝে। সে আগের ন্যায় বসে রইলো। ফারহান কফির মগে চুমুক দিয়ে আবারো জিজ্ঞাসা করলো,
“কিরে বললি না যে?”
রায়ান এখনো ঠিক আগের মতোই চোখ বুজে গা এলিয়ে বসে আছে। ফারহান বেশ বিরক্ত হলো। কফিটা কোনোমতে শেষ করে কফির মগটা টেবিলে রাখতে চোখ খুললো রায়ান। নিজের চশমাটা চোখে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“আমি বাসায় যাচ্ছি ইচ্ছে হলে এসো।”
বলেই গটগট পায়ে চলে গেল রায়ান। ফারহান সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
#চলবে
#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ১৬
ঘড়িতে রাত বারোটা আমায়রা পড়াশোনা শেষ করে বইখাতা গুছিয়ে রাখলো। বিকালে পার্ক থেকে আসার পর মাথা ঠান্ডা করতে মাথায় পানি ঢেলেছে মেয়েটা। সবকিছু গোছানো শেষে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো সে। নভেম্বরের শুরু হওয়া রাতে খানিকটা ঠান্ডা বাতাস বইছে। আমায়রা নিজের গায়ের ওড়ানাটাই চাদরের মতো গায়ে জড়িয়ে নিলো। চারপাশে নিরব হয়ে গিয়েছে। সবাই হয়তো যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেকক্ষণ বাদে বাদে কুকুরের ডাক শোনা ব্যতিত আর কিছু শোনা যাচ্ছেনা। গলির মোড়ে ল্যাম্পপোস্টে আলোতে দু চারটা কুকুর নজরে আসছে শুধু। হালকা ঠান্ডা বাতাসে হীম হয়ে আসছে আমায়রার শরীর। বেশি সময় আর দাঁড়িয়ে থাকা হলো না তার। এমনি সময় হলে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতো সে। কিন্তু পরীক্ষা চলছে এইমুহূর্তে ঠান্ডা লাগলে সমস্যায় পরতে হবে তাকে। আমায়রা রুমে এসে বারান্দার দরজা লাগিয়ে ঠাস করে বিছানায় শুয়ে পরলো। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ক্লান্তিতে চোখ বুজে এলো আমায়রার।
—————————
উদাম গায়ে বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে একমনে সিগারেট ফুকছে রায়ান। ঠান্ডা হিমেল বাতাস উড়ে এসে জানান দিচ্ছে শীত পরছে ধীরে ধীরে। রায়ানে দৃষ্টি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো লোকের দিকে। যারা বর্তমানে একজন আরেকজনের সঙ্গে তরকা তরকি করছে। রায়ান টাউজারের পকেট হাতরে একটা ছোট ফোন বের করলো। উপরের অংশের দাঁত দিয়ে নিচে ঠোঁট চেপে ধরে কল লিস্ট ঘাটতে লাগল। কিছুক্ষণ বাদেই নিজের কাঙ্ক্ষিত নাম্বার পেয়ে কল দিলো তাতে। দুবার রিং হতেই কল রিসিভ হলো। রায়ান গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“শুন আমি একটা ঠিকানা তোকে দিচ্ছি। এখনি সেখানে গিয়ে লোকটাকে তুলে আস্তানায় নিয়ে আসবি।”
অপরপাশ থেকে কিছু বলার আগেই খট করে কল কেটে দিলো রায়ান।
হাই দিতে দিতে রুমে আসলো সে। উল্টো হয়ে ধপ করে শুয়ে পরলো বিছানায়।
★★
মাঝে কেটে গেছে আরো কয়েকটা দিন। আমায়রার পরীক্ষা প্রায় শেষের পথে। আজকেই শেষ পরীক্ষা। সকাল সকাল ব্যস্ত হয়ে পরেছে সে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য।
আমেনা বেগম আমায়রার রুমে এসে বললেন,
“আজকেই তোর পরীক্ষা শেষ না?”
“হুম”
“বন্যা কল দিছিলো পরশু গায়ে হলুদ কালকেই যেতে হবে আমাদের।”
আমায়রা হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বলল,
“ভাইয়া যাবে না?”
অনুভব আমায়রার রুমের দরজা দাঁড়িয়ে বলল,
“যাবোনা কেন? বিয়ার দাওয়াত তাও আবার বন্যার যাবোনা কেন?”
আমায়রা কপাল কুচকে তাকালো অনুভবের দিকে। অনুভব পাত্তা না দিয়ে আমেনা বেগমের হাতের প্লেটে থাকা চিকেন ফ্রাই নিয়ে চেবাতে চেবাতে বলল,
“একমাত্র ফুফাতো বইনের বিয়া আর আমি যাবো না। এটা তো হতেই পারেনা।”
আমায়রা বেশ অবাক হলো অনুভবের এমন আচরণে। তবুও আমায়রা কথা না বাড়িয়ে রুটিতে চিকেন ফ্রাই নিয়ে রুটি পেচিয়ে খেতে খেতে বলল,
“চলো দেড়ি হয়ে গেল।”
বলেই আমায়রা চলে গেল। অনুভবও শিস বাজাতে বাজাতে যেতে লাগল। আমায়রা যেন অবাকের উপর অবাক হচ্ছে। আমেনা বেগম সদর দরজায় এসে বললেন,
“সাবধানে যাস”
বাইক চালাতে লাগল অনুভব। আমায়রা তীক্ষ্ম চোখে লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে বলল,
“তোমার কি হয়েছে বলো তো?”
অনুভব ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
“আমার আবার কি হবে?”
“বন্যা আপুর বিয়েতে যাবে তুমি!”
“তো কি বাড়িতে একা একা মুলা সিদ্ধ খেয়ে দিন কাটাবো। আর তোরা গ্ৰামে গিয়ে ভালো মন্দ খাবি।”
আমায়রা মাথা ভনভন করছে অনুভবের কথায়। কোথায় ভাবলো তার ভাই ছ্যাকা হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াবে তা না নাচতে নাচতে এক্সের বিয়া খাইতে যাবে। আমায়রা চোখ বড় বড় করে বলল,
“এক্সের বিয়ে খেতে যাবে তুমি!”
অনুভব ভ্রুকুচকে বলল,
“রিলেশনে ছিলাম কবে যে, এক্স হলো।”
আমায়রার নিজের মাথায় নিজের বারি দিতে মন চাইলো। আবারো জিজ্ঞাসা করলো,
“ভাইয়া তোমার মাথার সব তার ঠিক আছে তো!”
আমায়রার কথায় অনুভব ফুস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ভাবছি কি বিয়া আমি করবোনা?”
আমায়রা চোখ বড় বড় করে ফেলল। অনুভব থেমে বলল,
“তর্নি বিয়ে করছে, তো ওর একটা শান্তশিষ্ট জামাই আছে । কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তর্নির মন মতো কোনা কথা না হলেই সে তার জামাইরে ধুমধাম কিল বসিয়ে দেয়। বেচারা খালি অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। পিয়াস ভাইয়ের সে চেহারা দেখে আমার বিয়ে করার শখ ফুরিয়ে গেছে। পারলে সারাজীবন একা থাকবো তাও কোনো মেয়ের হাতে ধুপধাপ কিল খেতে পারবো না। তাই বন্যার বিয়ে হোক আর যাইহোক আমি কিছু জানিনা বাবা।”
একনিশ্বাসে কথাগুলো বলেই থামলো অনুভব। আমায়রা হতভম্ভ হয়ে গেল। তার ভাই এগুলো কি বলছে? বউ এর হাতে মার খাওয়ার ভয়ে তার ভাই নাকি বিয়ে করবে না ভাবা যায়।
আমায়রার ভাবনায় ছেদ ঘটলো অনুভবের ডাকে। তারা ভার্সিটি পৌঁছে গেছে। আমায়রা নেমে দাঁড়ালো বাইক থেকে। আমায়রা কিছু বলতে নিবে তার আগেই বাইক টান দিলো অনুভব। আমায়রার এখন মন চাচ্ছে অনুভবকে ধরে নর্দমায় কয়েকবার চুবানি দিতে।
আমায়রা এসব ভাবতে ভাবতেই চলে গেল ক্লাসে। যথাযথ ভাবে পরীক্ষা দিয়ে দুই বান্ধবী এসে বসলো ফুচকার দোকানে। বেশ কিছুদিন যাবত ফুচকা খাওয়া হয়না। আমায়রা ফুচকা খাচ্ছিলো তখনি একটা বাচ্চা মেয়ে তাকে ডাক দেয়। আমায়রা পিছু ফিরে তাকাতেই মেয়েটা তার হাতে একটা বেলী ফুলের মালা দিয়ে বলল,
“আফা এইডা আপনার লিগে।”
আমায়রা কপাল কুচকালো। পরমুহূর্তেই মুচকি হেসে বলল,
“তোমার হয়তো ভুল হচ্ছে। এটা আমার জন্য না অন্য কারো জন্য হতে পারে।”
মেয়েটা আমায়রার হাতে মালাটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“না আফা এইডা আপনারই।”
আমায়রার কুচকে যাওয়া ভ্রু আরো কুচকে গেল। আমায়রা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এইটা কে দিলো!”
মেয়েটা দূরে ইশরা করে বলল,
“ওই যে দূরে কালো গাড়িটা দেখছেন, ওখানকার একটা ভাইয়া।”
আমায়রা সেদিকে তাকিয়ে থমকালো। এটা তো সেই গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটা। আমায়রা উঠে দাঁড়ালো। আজ সে দেখবেই গাড়ির ভিতর কোন আহাম্মক আছে, যে তাকে ফুলে মালা দেয়।
আমায়রা উঠে দাঁড়াতেই গাড়িটা সাঁই সাঁই করে চলে গেল। আমায়রা হতাশ হলো। এতক্ষণ মেয়েটাও চলে গেছে। আমায়রা দ্বিধায় ভুগছে মালাটা ফেলেও দিতে মন চাচ্ছে না। আবার কে দিয়েছে না দিয়েছে এই ভেবে নিতেও মন চাচ্ছেনা।
ইশরা ফুসকা মুখে পুরে চেবাতে চেবাতে বলল,
“রেখে দে। কিছু হবে না।”
আমায়রা ভ্রুকুচকে তাকালো ইশরার দিকে। ইশরা ভাবলেশহীন ভাবে ফুচকা খাচ্ছে। আমায়রা সেদিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে আবারো মালাটার দিকে তাকালো। তার খুব ইচ্ছে করছে মালাটাকে হাতে পরতে। ইচ্ছে দমাতে না পেরে কাজটা করেই ফেলল। হাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। পরমুহূর্তেই কে দিয়েছে না দিয়েছে এই ভেবে মুখ থেকে উবে গেল। কপালে দেখা গেল চিন্তা সূক্ষ্ম বলিরেখা।
—————————
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতেই আমায়রা বন্যার বিয়েতে যাওয়ার জন্যে সব কিছু গুছিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। মনটা ফুরফুরে লাগছে তার। আর লাগবেই না কেন। পরীক্ষা শেষ হয়েছে তার। আমায়রা গুনগুনিয়ে গাইতে লাগল,
চান্দের বাত্তির কসম দিয়া ভালোবাসিলি
সূর্যের আলোয় ঝলমলাইয়া আমায় পোড়াইলি
চান্দের বাত্তির কসম দিয়া ভালোবাসিলি
সূর্যের আলোয় ঝলমলাইয়া আমায় পোড়াইলি
এখন তো চান্দেও চিনে না
আমারে সূর্যেও চিনে না
চিনবো কেমনে যে চিনাইবো সে-ও তো চিনে না
এখন তো চান্দেও চিনে না
আমারে সূর্যেও চিনে না
চিনবো কেমনে যে চিনাইবো সে-ও তো চিনে না।
গান গেয়ে নিজে নিজেই হাসলো। তখনি তার ফোনের মেসেজ এলো। আমায়রা প্রথমে পাত্তা দিলো না হয় তো কম্পানি থেকে মেসেজ এসেছে। কিন্তু পর পর আসতে দেখে ভ্রুকুচকালো ফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজ চেক করতেই মুখটা হা হয়ে গেল আমায়রার। আপনাআপনি মুখে হাত চলে গেল তার। মেসেজে লেখা ছিলো,
“শীতের এই হাওয়ায় তোমার হাতে বেলি ফুলের মালার ঘ্রাণ যেন আমাকে অজানা এক টান দিয়ে তোমার কাছে নিয়ে আসে। জানি না, তুমি কেমন আছো, কোন স্বপ্নে ডুবে আছো, বা কোন চিন্তা তোমায় ভাবিয়ে তুলেছে। কিন্তু এতটুকু জানি, আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি নিস্তব্ধ রাতে, আমার ভাবনার প্রতিটি কোণায় তুমি আছো—তোমার সেই মায়াবী হাসি আর কোমল চাহনিতে যেন প্রতিবার আমি নতুন করে হারিয়ে যাই। আমার এই অনুভূতিতে তুমি আছো, যেমন চাঁদের আলো থাকে রাতের আকাশে, নিঃশব্দে, অথচ গভীরভাবে।”
আমায়রা থমকালো, চমকালো। আমায়রার মনের মনে প্রশ্ন ঘুর ঘুর করতে লাগল। কে এই চিঠি প্রেরক? যা বোঝা যাচ্ছে এই সেই কালো গাড়ির আহাম্মক। আমায়রা দেড়ি না করে লেখলো,
“সাহস থাকলে সামনে এসে কথা বল আহাম্মক কাহিকা। কি গোপনে লুতুপুতু প্রেমিক পুরুষ সাজতে আসছিস। চিনিস আমাকে?”
সঙ্গে সঙ্গে রিপলে এলো,
“চিনবোনা কেন তুমিই তো আমার একমাত্র বউজান।”
আমায়রা চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে রইলো ফোনের দিকে। শালায় কয় কি? আমায়রা আবারো কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে লেখলো,
“কে আপনি?”
অপরপাশ থেকে উত্তর আসলো,
“তোমার একমাত্র নান্নামুন্না বর।”
আমায়রার তেতে উঠলো,
“আমার লগে ঢং করতে আসিস। নে ব্লক খা।”
মেসেজটা পাঠিয়েই ব্লক করে দিলো নাম্বারটা। হনহনিয়ে রুমে গিয়ে ঠাস করে বারান্দার দরজাটা আটকে দিলো। বড় বড় কয়েকটা নিশ্বাস ছাড়লো সে। নিজেকেই নিজে বুঝ দিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো। না ঘুমাতে হবে তার। কাল আবার সকাল সকাল গ্ৰামে যেতে হবে।
———————
তাজওয়ার সাহেব খেতে আসতেই রাবেয়া বেগম বললেন,
“কাল গ্ৰামের বাড়ি যেতে চাচ্ছি। নূর সবার সঙ্গে ঘুরতে যেতে চাইছিলো। রায়ানের পরীক্ষার জন্য আমি তখন না করেছিলাম। এখন তো যাওয়াই যায়।”
তাজওয়ার সাহেব গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“দেখ সবাই যাবে কি না?”
“সবাই যাবে আপনিও যাবেন।”
“আমি গেলে অফিস কে দেখবে তার চেয়ে বরং তুমি তাহসান আর ইশতিয়াককে নিয়ে যাও।”
#চলবে
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। বেশি বেশি রেসপন্স করবেন।)