#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ১৭
রাবেয়া বেগম বেশ বিরক্ত হলেন স্বামীর কথায়। বিরক্তি নিয়েই বললেন,
“আপনি যাবেন কিনা বলেন!”
তাজওয়ার সাহেব আমতা আমতা করে বললেন,
“কিন্তু আমি গেলে অফিস কে দেখবে?”
রাবেয়া বেগম নাকমুখ কুচকে বললেন,
“কেন দুই তিনদিন ম্যানেজার সামলাবে। আর কোনো না আমি শুনবো না।”
“আচ্ছা বাবা যাবো সবাই মিলে।”
তাজওয়ার সাহেবের কথা শুনে নাইমা হাসলো। কারণ সে জানতো রাবেয়া বেগমের কথার পিঠে তাজওয়ার সাহেব না করতে পারবেনা।
——————
সকাল সকাল আমেনা বেগম সবাইকে তাড়া দিচ্ছেন। বাস সাড়ে আটটায় আর এখন সাতটা পঞ্চাশ বাজে। তারা বাসে করে ঢাকা থেকে কুমিল্লা যাবে। কুমিল্লা বন্যাদের দাদার বাড়ি। সেখানেই বন্যার বিয়ে হবে।
আজিজ সাহেব আর অনুভব ব্যাগপত্র দিয়ে নিচে নেমে গেছেন। এখন আমায়রা শুধু বাকি। আমায়রা হালকা গোলাপি রঙের একটা গাউন পড়েছে। একটা বেবি পিং স্কার্ফ মাথা দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। এই ঠান্ডায় গলা ব্যাথা হলেই কাম সারছে। তাই ভালো করে পেঁচিয়ে দিয়েছে সে। চোখমুখ ফুলে আছে ঘুমের কারণে। মুখে কোনোকিছু দেয়নি সে। কাধে ছোট্ট একটা ব্যাগ ঝুলিয়েছে, হাতে সবসময়ের মতো একটা ঘড়ি পড়েছে। সামনের ছোট চুলগুলো ব্যান্ড দিয়ে আটকে রাখায় কোনো অসুবিধা করতে পারছেনা।
আমায়রা তাড়াতাড়ি করে ফোনটা নিয়ে বের হয়ে পরলো।
বাসস্ট্যান্ড আসার কিছুসময় পরেই বাস এসে দাঁড়ালো। অনুভব আর আমায়রা বসবে একপাশের সিটে আর পিছনের দুই সিটে আজিজ সাহেব আর আমেনা বেগম বসবেন। আমায়রা সিটে বসে চোখ বুজলো। অনুভব ব্যাগগুলো জায়গামতো রাখতে গেছে। অনুভব আজ নেভি ব্লু রঙের শার্ট, নীল রঙের জিন্স, শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে সানগ্লাস ঝুলানো।
————————
গ্ৰামের রাস্তা দিয়ে প্রাইভেট কার যাবেনা তাই রাবেয়া বেগমের কথায় বাস ভাড়া করা হয়েছে। সবাই যে যার মতো বাসে উঠে পরেছে। রাবেয়া বেগম, তাজওয়ার সাহেব, শাহানারা বেগম,তারিফ সাহেব (রায়ানের চাচা), নেহা, আবির(নেহার বড় ভাই), তাহসান, নাইমা, নূর সবাই যে যার মতো বসে পরেছে।
রায়ানের একটা কল আসায় সে কিছুসময় কথা বলে গাড়িতে উঠলো। আজ সে সাদা রঙের শার্ট আর জিন্স পড়েছে। বাসে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালো সে। হৃদস্পন্দন যেন দ্রুত চলতে লাগল। অজান্তেই হাত চলে গেল বুকের বা পাশটায়। পিছন থেকে আবির ঠেলছে রায়ান বেশ বিরক্ত হলো। দাঁত পিষে বলল,
“ওই শালা দেখছিস না দাঁড়ায় আছি। ধাক্কাস কেন?”
আবির কাচুমাচু হয়ে বলল,
“রায়ান ভাই নিশি আপুর তো বিয়ে হয়ে গেছে।”
আবিরের কথায় আরো বিরক্ত হলো রায়ান। আবিরকে ধাক্কিয়ে জানালার পাশের সিটে বসালো। নিজে ধপ করে বসে আবারো পিছু ঘুরে তাকালো। হাত পা থরথর করে কাঁপছে। রায়ান চোখ বুজে বুকে হাত চেপে বিরবিরালো,
“শেষমেষ ঝগড়ুটে যমরানীকে দেখে তোর হৃদস্পন্দন থমকালো। ছেহ, ছেহ রায়ান এটা কোনো কাজ হলো।”
আবির অবাক নয়নে তাকালো রায়ানের দিকে। রায়ানকে বিরবিরাতে দেখে আবির রায়ানকে ধাক্কিয়ে বলল,
“রায়ান ভাই কি হলো তোমার?”
রায়ান পাত্তা দিলো না আবিরকে। আবারো পিছু ঘুরে তাকাতেই কপাল কুচকে এলো রায়ানের। নিজ মনেই বিরবিরিয়ে বলল,
“যমরানীর পাশে এই খ্যাক শেয়ালটা আবার কে?”
আমায়রা ঘুমের মাঝেই অনুভবের হাত ধরে ওর কাঁধে মাথা রেখে আয়েশ করে ঘুমালো। অনুভব ফোন টিপতে ব্যস্ত।
আমায়রা অনুভবের হাত ধরে কাঁধে মাথা রাখায় চোখ বড় বড় হয়ে গেল রায়ানের। আবির আবারো বলে উঠলো,
“ভাই”
রায়ানের কেন যেন রাগ হচ্ছে ওই ছেলেটার উপর। সেই রাগেই আবিরকে সে ধমকে উঠলো।
আবির বেচারা না পারছে রায়ানের মনের ভাব বুঝতে না পারছে রায়ানের ধমকাধমকি শুনতে। মুখ ফুলিয়ে বসে রইলো সে।
খানিকবাদে রায়ান আনমনেই বলল,
“কেরে আবির কাউকে দেখলে হঠাৎ করে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলে, হাত পা কাঁপতে থাকলে এটাকে কি বলেরে?”
আবির রায়ান কথার উত্তর না দিয়ে জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলো। রায়ান আবিরের এমন ভাব দেখে বিরক্ত হলো। রায়ান ঠাস করে একটা চাটি বসিয়ে দিলো আবিরের হাতে। আবির হাত ঘষতে ঘষতে বলল,
“ধুরু মিয়া, কি সমস্যা তোমার!”
রায়ান আবিরের ঘাড় ধরে পিছনে দেখালো। তারপর বলল,
“কি দেখছিস?”
আবির কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“তাহসান ভাই আর নাইমা ভাবি ঘুমাচ্ছে।”
আবিরের কথায় রায়ানের বিরক্তি যেন তুঙ্গে উঠে গেল। আবারো চাটি দিয়ে বলল,
“হালা অন্যপাশে দেখ।”
রায়ানের কথামতো আবির তাকিয়ে বলল,
“একটা মাইয়া আর পোলা!”
রায়ান তীক্ষ্মচোখে তাকিয়ে বলল,
“পোলাডা মাইয়াডার কে হয় ক তো?”
এবার আবির বিরক্ত হলো। নাকমুখ কুচকে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি কেমনে কইতাম কে কার কি হয় না হয়!”
রায়ান ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,
“তাও কথা”
হুট করেই আবির চোখ বড় বড় করে বলল,
“ভাই তুমি কি ওই মাইয়াকে..!”
আবিরের কথার মাঝেই রায়ান ধমকে উঠে বলল,
“চুপ যা হারাম*দা, যা ভেবেছিস ভাবনার মধ্যেই গলা চিপে মেরে ফেল। মুখ দিয়ে বের করলে আমি তোরে খতম করবো। ওই ঝগড়ুটে যমরানীর উপর নো নেভার!”
আবিরের মাথা ঘুরছে রায়ানের কথায়। কি বলছে, কি করছে, কিছুই বোধগম্য হচ্ছেনা তার।
কারো নাক ডাকার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল আমায়রার। আমায়রা চোখ মুখ কুচকে তাকাতেই দেখলো অনুভব গরুর মতো নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। আমায়রা বিরক্ত হলো। অনুভবকে ধাক্কিয়ে বলল,
“ভাইয়া ও ভাইয়া উঠো জলদি।”
আমায়রার ডাকে ধড়ফড়িয়ে উঠলো অনুভব। এলোমেলো ভাবে বলে উঠলো,
“কি হয়েছে, কি হয়েছে?”
আমায়রা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“এমন গরুর মতো নাক ডাকছিলে কেন?”
অনুভব বেজায় ক্ষেপে গেল,
“তুই এতক্ষণ ব্যাঙের মতো উল্টো খেয়ে আমার কাঁধে আয়েশ করে ঘুমাচ্ছিলি। আমার কাঁধ একদম ব্যাথা হয়ে গেছে। আমি কি তোর ঘুম নষ্ট করছি।”
“আমি তো তোমার মতো নাক ডেকে অন্যজনকে বিরক্ত করছিনা।”
ওদের ঝগড়ার মাঝেই নূর খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো পাশ থেকে।
আমায়রা আর অনুভব ঝগড়াবাদ দিয়ে তাহসানে কোলে বসে থাকা নূরের দিকে তাকালো। নূর হাসি থামিয়ে বলল,
“তোমরা টম এন্ড জেরির মতো ঝগড়া করছো কেন গো? তোমরা কি দুষ্টু পিপি আর ছোট চাচ্চুর মতো ভাইবোন।”
আমায়রা মেকি হেসে বলল,
“হ্যাঁ গো কিউটি এই বদ গরুমার্কা ছেলের রূপের টমটা আমার একমাত্র ভাই।”
নূর আমায়রার কথায় আবারো হাসলো।
রায়ান পিছু ঘুরে সবটা শুনে আবারো সামনে ঘুরে সস্থির নিশ্বাস ছেড়ে নিজ মনেই বিরবিরালো,
“ছেহ..! রায়ান সব তোর ভাবনার দোষ। ওরা ভাইবোন। আর তুই কি না কি ভাবলি, ছেহ..!”
আমায়রা দুহাত এগিয়ে দিয়ে বলল,
“কিউটি আমার কাছে আসবে?”
নূর তাহসানের দিকে তাকালো। মেয়ের মনের কথা বুঝতে পেরে তাহসান মুচকি হেসে ছেড়ে দিলো মেয়েকে।
নূর ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। আমায়রার ঠোঁটেও হাসি ফুটে উঠলো। নূরকে কোলে নিয়ে বলল,
“তোমার নাম কি কিউটি?”
নূর হাসিমুখেই বলল,
“আরবি নূর চৌধুরী। তোমার নাম কি?”
“আমায়রা রহমান নিশাত”
নূর কিছুটা ভেবে বলল,
“বার্বি ডল পিপি বলে ডাকি তোমায়।”
আমায়রা মুচকি হেসে বলল,
“তোমার যা ইচ্ছে তাই ডাকো কিউটি সোনা।”
আমায়রার কানের কাছে মুখ নিয়ে নূর ফিসফিসিয়ে বলল,
“তোমার ভাই টমের নাম কি?”
আমায়রা আড়চোখে তাকালো অনুভবের দিকে। অনুভব চোখ বুজে আছে। আমায়রা নূরের মতোই ফিসফিসিয়ে বলল,
“গরু অনুভব”
আমায়রার কথায় আবারো খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো নূর।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমায়রা আর নূরের বেশ ভাব হয়ে গেল।
তিনঘন্টার মাঝেই তারা পৌঁছে গেল কুমিল্লায়। নূর আমায়রাকে ছাড়তে নারাজ। আমায়রারও বেশ খারাপ লাগছে নূরকে ছাড়তে।
সবাই বাস থেকে নামতেই রাকিব আর বন্যা এগিয়ে এলো। রাকিব এসে তাহসান, রায়ান আর আবিরের সামনে দাঁড়ালো।
আর বন্যা আমায়রার সামনে। রায়ানকে এখনি দেখলো আমায়রা। রায়ানকে দেখে চক্ষুচড়ক গাছ হলো আমায়রার। রায়ান ভাবলেশহীন।
সবাই একসঙ্গে পরিচিত হতে গিয়েই দেখলো তারা সবাই একই গ্ৰাম বরুড়ায় যাবে। তবে পাশাপাশি দুই বাসায় যাবে। কারণ রাকিব আর বন্যার দাদু বাড়ি পাশাপাশি। রাকিবের ফুপু হন রাবেয়া বেগম। সেই সুবাদে সবাই একসঙ্গে ভ্যানভাড়া করলো।
দুটো ভ্যান ভাড়া করা হয়েছে। একটাতে সব বয়স্ক লোকদের সঙ্গে রাকিব আর অনুভব গেছে। আর অন্য ভ্যানে বাকি সবাই।
নূরকে কাছে টেনে ওর কানে কানে আমায়রা ফিসফিসিয়ে বলল,
“কিউটি ওটা তোমার কে হয়?”
#চলবে
#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ১৮
নূর আমায়রার দিকে তাকাতেই আমায়রা বলল,
“ঐই যে সাদা শার্ট পড়া চশমা চোখে।”
নূর সামনে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“ওটা তো চাচ্চু হয় আমার।”
আমায়রা ছোট্ট করে বলল,
“ওও”
আমায়রা মনে মনে বলল,
“কিউটি যদি জানতো তার এই পান্ডামার্কা চাচ্চু কত খারাপ। তাহলে সারাদিন ব্যাটারে দেখলেই থাপ্পড়াইতো।”
আমায়রা কথাগুলো বলেই সবার আড়ালে ভেংচি কাটলো।
আবির শক্ত করে ধরে আছে রায়ানের হাত। একে তো সে কোনোদিন ভ্যানে উঠেনি, তার উপর গ্ৰামের আঁকা বাঁকা রাস্তা। রায়ান বিরক্তি নিয়ে বলল,
“হাত ধরে বসে আছিস কেন? হাত ছাড় আমার।”
আবির রায়ানের হাত আরো শক্ত করে ধরে বলল,
“রায়ান ভাই এমন করোনা। আমি যদি পড়ে যাই তাহলে কি হবে বলো তো!”
আমায়রা, বন্যা, নাইমা সবাই মুখ টিপে হাসছে আবিরের এমন কান্ড দেখে। তাহসান ভ্রুকুচকে বলল,
“কি আর হবে কিছুই হবেনা।”
আবির তাহসানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এমন করে বলোনা দাভাই একবার পড়ে গেলে আমার কোমর আর কোমর থাকবেনা।”
রায়ান ঠাট্টা করে বলল,
“কোমর কি তাহলে বুক হয়ে যাবে?”
আবির আর কথা বাড়ালো না। রায়ানের হাত ধরেই বসে রইলো। রায়ান আমায়রার দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুইজনের। সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিলো আমায়রা। রায়ান সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসো।
যা সবার চোখের অগোচরে হলেও নেহার অগোচরে হলোনা। সে তীক্ষ্মচোখে তাকিয়ে রইলো রায়ান আর আমায়রার দিকে।
রায়ান আমায়রার থেকে চোখ সরিয়ে প্রকৃতি উপভোগ করতে লাগলো। গ্ৰামের পরিবেশ তার কাছে ভালোই লাগছে। মৃদু বাতাস যাতে নেই যানবাহনের কালো ধোঁয়া, নেই যানজটের ঝামেলা।
খানিকবাদেই তারা পৌঁছে গেল তাদের গন্তব্যে। দুটো পাঁকা বাড়ির সামনে দাঁড়ালো সবাই। রাকিব আর বন্যার দাদু বন্ধু ছিলো। দুইজন একেবারে লাগালাগি করে বাড়ি বানিয়েছে।
অনুভব ফোন কানে নিয়ে কার সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত ছিলো তখনি তার পিঠে কিল পরলো। কপাল কুচকে এলো তার। অনুভব পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখলো ষোল কি সতেরো বছরের এক মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসছে। সাহস কত বড় চেনা না জানে তাকে কিল মারলো এখন আবার দাঁত বের করে হাসছে ভাবা যায়।
মেয়েটা দাঁত কেলিয়েই বলল,
“আরে আবির ভাই কেমন আছেন? প্রথম গ্ৰামে এসে কেমন লাগছে? এর আগে কত বললাম ঘুরে যান আপনি তো আইলেনই না।”
অনুভব ভ্রুকুচকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে।”
মেয়েটা অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে কোমরে দুহাত দিয়ে বলল,
“আরে চান্দু, এখন আমার সঙ্গে ঢং দেখাও। চিনোনা আমারে। আবার তুমি তুমি করে কইতাছো। ছোটকাল থেকে তুই তুই করে কইয়া এখন ঢং মারাও মিয়া।”
আবির কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো সে একটু এগিয়ে এসে মেয়েটার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“আরে গাধা,ওইটা বন্যা আপুর মামাতো ভাই হয়। তুই আমারে চিনলি না সুরাইয়া।”
সুরাইয়া মাথা ঘষতে ঘষতে তাকালো আবিরের দিকে। রাগে কটমটিয়ে দুই কিল বসিয়ে দিলো আবিরের বাহুতে। আবির নাকমুখ কুচকে বলল,
“এতো হাত চলে কেন তোর ছেমরি।”
সুরাইয়া পাত্তা না দিয়ে অনুভবের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“সরি বেয়াইন, আমি আপনাকে খারুশ আবির ভাই মনে করছিলাম।”
আবির কিছু বলতে নিবে তার আগেই রাকিব এসে বলল,
“সুরাইয়া তোর চাচিআম্মা ডাকে।”
সুরাইয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আম্মার এখনি ডাকা লাগবে।”
সুরাইয়ার কথা শুনে অনুভব বুঝতে পারলো মেয়েটা রাকিবের চাচাতো ভাই। সুরাইয়া ধপধপ পায়ে ভিতরে চলে গেল।
রায়ান আমায়রার পাশে এসে দাঁড়িয়ে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কি যমরানী বিয়ে বাড়িতে ঝগড়া করবে নাকি?”
রায়ান আচমকা এমন করায় চমকে উঠলো আমায়রা। পাশে তাকাতেই দেখলো রায়ান বাঁকা হেসে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আমায়রা কপাল গুটিয়ে তাকালো রায়ানের দিকে। রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“মিস. যমরানী এভাবে তাকিয়েন না। অন্যরকম লাগে যে।”
আমায়রা রায়ানের কথার অর্থ বুঝতে না পেরে বলল,
“মানে!”
রায়ান মাথা চুলকে বলল,
“তোমার বোঝার বয়স হয়নি।”
বলেই রাকিবদের বাসায় ঢুকে পরলো রায়ান। আর আমায়রা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো রায়ানের যাওয়ার দিকে। আমেনা বেগমের ডাকে সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বাড়িতে ঢুকলো আমায়রা।
অনুভব ভিতরে যেতেই মুখোমুখি হলো ইসহাক সাহেবের। অনুভব ঠোঁটে হাসি নিয়ে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম,ভালো আছেন?”
ইসহাক সাহেব গম্ভীর কন্ঠে সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
“হুম ভালো। তা চাকরি পেয়েছো শুনলাম।”
অনুভব মুচকি হেসে বলল,
“জি পেয়েছি। কারো সাহায্য ছাড়াই।”
অনুভব যে ইসহাক সাহেবকে খোঁচা দিয়ে কথাটা বলল তা আর বুঝতে বাকি নেই তার। অনুভবকে ভেতরে যেতে বলে উনি চলে গেলেন।
অনুভব ভিতরে যেতেই দেখলো অনেক মানুষ অলরেডি বাসায় আছে। বন্যার বাবারা চারভাই দুই বোন। তারা তাদের বাচ্চাকাচ্চা এসে গমগমে পরিবেশ। আয়েশা বেগম অনুভব আর আমায়রাকে ফ্রেশ হয়ে নিতে বললেন।
আমায়রা একেবারে গোসল করে নিলো। লম্বা চুলগুলো বড় গামছা দিয়ে পেচিয়ে ভেজা কাপড়গুলো নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই বন্যা সেগুলো ছাদের দিয়ে আসতে চাইলো। আমায়রা পারবে বলে ছাদের দিকে রওনা হলো।
রায়ান কেবলি শাওয়ার নিয়ে ছাদে উঠছে। সামনের ছাদে তাকাতেই সে দেখলো আমায়রা তার লম্বা চুলগুলো সযত্নে মুছতে ব্যাস্ত। চুলগুলো বেয়ে টুপটাপ পানি পরছে যার দরুন বাদামি রঙের জামাটার পিঠের দিকটা কিছু অংশ ভিজে গেছে। চোখমুখে এক অন্য রকম স্নিগ্ধতা বিরাজ করছে। রায়ানের যেন চোখ আটকে গেছে।
পরমুহুর্তেই রায়ান নিজের চোখ টেনে অন্যদিকে নিয়ে নিজেই নিজেকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিলো। কিন্তু তারপরেও তার অবাধ্য চোখ জোড়া ঘুরে ফিরে আবারো আমায়রার দিকে গেল। তখনি তার কপাল কুচকে এলো। একটা ছেলে আমায়রার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
রায়ান তীক্ষ্মচোখে তাকালো সেদিকে। না ছেলেটাকে চেনা বলে মনে হচ্ছে না। কান পাতলো রায়ান। ছেলেটা আমায়রাকে বলছে,
“হাই, আমি সিফাত। বন্যার বড় চাচার ছোট ছেলে। তুমি তো বন্যার মামাতো বোন তাই না। কি যেন নাম?”
আমায়রা কিছু বলতে নিবে তার আগেই রায়ান পাশের ছাদ থেকে লাফিয়ে এই ছাদে এসে সিফাতের কাঁধে এসে হাত রেখে বলল,
“আমি বলি ওর নাম কি?”
আমায়রা ভ্রুকুচকে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি এখানে কি করছেন?”
রায়ান দাঁত কেলিয়ে হেসে আমায়রার নাকে টোকা দিয়ে বলল,
“আরে আমি তো তোমাকে সাহায্য করতে আসলাম।”
“মানে!”
রায়ান মুচকি হেসে সিফাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওর নাম যমরানী।”
সিফাত অবাক হয়ে বলল,
“যমরানী? এই আবার কারো নাম হয় নাকি?”
রায়ান চোখ টিপে বলল,
“আমাদের বিশেষ কিছু নাম আছে, তুমি বুঝবে না।”
আমায়রা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“কী বলছেন আপনি! সিফাত ভাই, এইসব কথায় কান দেবেন না।”
রায়ান হেসে বলল,
“ওহ্, মিস যমরানী, এত রেগে যাচ্ছেন কেন? সাহায্য তো করলাম শুধু!”
এই কথায় আমায়রার মুখ আরও রাগে লাল হয়ে গেল। তখনি দরজা থেকে বন্যা আওয়াজ দিল,
“আমায়রা, সিফাত ভাই! চলো, নিচে সবাই অপেক্ষা করছে।”
সিফাত চলে গেল। যাওয়ার আগে রায়ানের দিকে কিভাবে যেন তাকালো। রায়ান সেদিকে পাত্তা দিলো না।
আমায়রা চলে যেতে নিয়ে আবারো পিছু ফিরে রায়ানের দিকে তাকাতেই রায়ান আমায়রার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল।
আমায়রার চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল। কিছু বলতে নিবে তার আগেই আবারো ডাক পরলো তার। আমায়রা আর কথা না বলে তাড়াতাড়ি ছাদ থেকে নেমে পরলো।
সবাই দুপুরের খাওয়া শেষ করে কিছুসময়ের জন্য বিশ্রাম করতে যে যার মতো বরাদ্দকৃত রুমে চলে গেল।
আমায়রা বিছানায় শুয়ে ফোন টিপছিলো। তখনি বন্যা ধপ করে ওর পাশ ঘেষে শুয়ে পরলো। সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই কি রায়ান ভাইকে আগে থেকে চিনিস।”
আমায়রা ভ্রুকুচকে বন্যার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটা কেন মনে হলো তোমার বন্যা আপু?”
বন্যা একপলক আমায়রার দিকে তাকিয়ে আবারো সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তেমন কিছু না। মনে হলো তাই বললাম। এখন একটু ঘুম দে বিকালে সবাই মিলে ঘুরতে বের হবোনি।”
আমায়রা খুশি মনে ফোনটা রেখে বন্যার গায়ে হাত পা তুলে দিয়ে ওর গলার জড়িয়ে চোখ বুজলো। বন্যা মুচকি হেসে জড়িয়ে নিলো আমায়রাকে।
অনুভব চোখবুজে শুয়ে রইলো বেশ কিছু সময়। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে তার। কেন করছে জানা নেই তার। জার্নি করলে কখনোই তার এমন হয় না। তবুও আজ কেন করছে এই প্রশ্নের উত্তরটা তার অজানা। বন্যা আর রাকিবকে দেখে পুরনো ব্যাথাটা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। জীবনটা তো অন্যরকম ও হতে পারতো। ভিতর থেকে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো তার।
বন্ধ চোখজোড়া খুলে সিলিং এ ঘুরতে থাকা সাদা ফ্যানটার দিকে তাকালো অনুভব। সাদা ফ্যানটা বেশ ময়লা জমেছে কালো কালো। তার মনের মাঝেও যে জমেছে একরাশ কালো ময়লা। ভালোবাসার মানুষটাকে অন্য কারো পাশে দেখলেই খারাপ লাগে। সেখানে ভালোবাসার মানুষটা অন্যজনের হয়ে যাবে আর দুদিন পর।
#চলবে
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।রিয়েক্ট কমেন্ট করবেন।)