#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রা
#পর্বঃ৩৫
রায়ান দম নিয়ে বলতে লাগলো,
“পরে আমি বেশকিছুদিন যাবত আমি খোঁজ খবর নেওয়ার পর জানতে পারি আরুসা একটা ছেলেকে ভালোবাসতো। ছেলেটা ভালো ছিলোনা। আরুসার ছবি এডিট করে ভিডিও বানিয়ে ওকে ব্ল্যাকমেল করতে লাগে। টাকা দিতে দিতে আরুসা নাজেহাল হয়ে পরেছিলো। পরে আরো চাপের পরে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে সে। পুলিশের সাহায্য চেয়েছিলো। কিন্তু পায়নি। লজ্জায় আমাদেরও কিছু বলেনি। পরে এই সিদ্ধান্ত নেয় সে।”
রায়ানের কথাগুলো শুনে চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমায়রা যে কিছু বলার খুঁজে পেল না। প্রতিটি শব্দ যেন বাতাসের ভারী হয়ে ভেসে এলো। আরুসার এই করুণ পরিণতির পেছনের গল্প শুনে আমায়রা স্তব্ধ হয়ে গেল। রায়ান তার চোখের কোণ মুছতে মুছতে আরও বললো,
“আমি যদি তখন ওর পাশে থাকতে পারতাম, হয়তো আজ এই পরিস্থিতি হতো না। কিন্তু ও এতটাই একা হয়ে পড়েছিল যে কাউকে নিজের কষ্টের কথা বলার সাহসই পায়নি। আমরা যদি একটু আগে বুঝতে পারতাম… একটু আগে তার কথা শুনতাম…”
আমায়রা কাঁপা হাতে রায়ানের কাঁধে হাত রাখলো। রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তারপর থেকে আমি নিজেই নিজেকে প্রমিস করি যে আমি এমন কিছু করবো যাতে এসব জানো*য়ারদের দমাতে পারি। আমি আবিরকে নিয়ে হ্যাকিং এর কাজ শুরু করি।”
আমায়রা অবাক হয়ে বলল,
“আপনি হ্যাকার?”
রায়ান তাকালো আমায়রার অবাক হওয়া মুখটা দেখে। তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বলল,
“হুম আমি হ্যাকার। আমার একটা গ্যাং আছে এখন হ্যাকিং এর। আমরা গোপনে সাইবার ক্রাইম দমন করার চেষ্টা করি।”
আমায়রা চোখ বড়বড় করে তাকালো রায়ানের দিকে। চোখেমুখে বিস্ময়। এমন কিছু শুনবে ভাবতেই পারেনি।
“আপনার গ্যাং! মানে… সাইবার ক্রাইম দমনের জন্য?” আমায়রা অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করলো।
রায়ান একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ। আমি আর আবির শুরু করেছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে আমাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যোগ দেয়। আমরা সাধারণ মানুষের সাহায্য করার চেষ্টা করি, বিশেষ করে যারা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়।”
আমায়রা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“কিন্তু এটা তো ঝুঁকিপূর্ণ। আপনি জানেন না কখন আপনারাই বিপদে পড়বেন।”
রায়ান গভীর চোখে আমায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি জানি। কিন্তু ঝুঁকি তো সব কাজেই থাকে। আর আমি আরুসার মতো আর কারও জীবন নষ্ট হতে দিতে পারি না। এটা আমার নিজের সাথে করা একটা প্রতিশ্রুতি।”
আমায়রা তার কথায় মুগ্ধ হলেও মনে অজানা এক শঙ্কা কাজ করছিল। সে জিজ্ঞেস করলো, “আপনার পরিবার বা কাছের কেউ জানে এ বিষয়ে?”
রায়ানের মুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“না, কেউ জানে না। জানলে হয়তো তারা কখনোই আমাকে অনুমতি দিত না। আমি এমনটাই চাই যে আমার কাজটা গোপনে চলুক। কারণ আমাদের কাজ প্রকাশ পেলে, আমরা শুধু বিপদে পড়ব না, যারা আমাদের সাহায্যের জন্য আসে তারাও বিপদে পড়বে।”
আমায়রা চুপচাপ তার কথাগুলো শুনছিল। এত দৃঢ় সংকল্প আর আবেগ রায়ানের চোখে দেখে তার নিজেরও ভেতরে কোথাও যেন একটা নাড়া লাগলো। তবে সে বলল,
“আপনার সাহস প্রশংসনীয়। কিন্তু নিজের নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রাখবেন, প্লিজ।”
রায়ান একটা ছোট হাসি দিয়ে বলল,
“আমার জন্য তোমার এই ভাবনা দেখে ভালো লাগলো। তবে আমি নিজে যতটা সম্ভব সাবধান থাকার চেষ্টা করি। আমাদের মূল লক্ষ্য মানুষকে রক্ষা করা, আর সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।”
আমায়রা কিছু বলল না। চারপাশের নিরবতা যেন গিলে খাচ্ছে। ঠান্ডার প্রকোপ অনুভব হচ্ছে। আমায়রা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলো। রায়ান নিজের গায়ের চাদরের এক অংশ নিয়ে আমায়রাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো। আমায়রা তাকালো রায়ানের শক্ত হাতের দিকে। যেই হাত সযত্নে তার বাহু আঁকড়ে আছে। অজান্তেই ঠোঁট প্রসারিত হলো আমায়রার। মনে মনে ভাবলো,
“মানুষটা রাগী, বদমেজাজি, জেদী, ঝগড়ুটে যাইহোক মানুষ হিসেবে ভালো।”
হুট করে আমায়রার মাথায় কি যে খেলল। সে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“আমার ফেক আইডি আপনিই হ্যাক করেছিলেন তাইনা।”
রায়ান মুচকি হাসলো। মৃদু সুরে বলল,
“আমি তো শুধুমাত্র তোমার ফেক আইডিই হ্যাক করেছি আর তো কিছু হ্যাক করিনি।”
রায়ানের কথায় আমায়রা বিরবিরিয়ে বলল,
“পুরো আমিটাকে হ্যাক করে এখন বলছে আর কিছু তো হ্যাক করিনি, ঢং।”
আমায়রার বিরবিরানো সব কথাই রায়ানের কানে গেল। তার ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। আমায়রার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে রায়ান বলল,
“প্রেমে পড়ে যাচ্ছো নাকি যমরানী?”
আমায়রা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“এহ, ঠ্যাকা পরছে আমার আপনার মতো পান্ডার প্রেমে পড়ার।”
আমায়রা কথায় হুট করেই হো হো করে হেসে উঠলো রায়ান। তার হাসি যেন চারপাশে ঝংকার তুলছে। আমায়রা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রায়ানের দিকে।
আমায়রা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলো। রায়ানের হাসিটা যেন তার কানে রিনঝিন ধ্বনি তুলছিলো। কিন্তু তাও সে নিজের মধ্যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি টের পাচ্ছিলো। হয়তো এটাকে আড়াল করতেই বলল,
“আপনার হাসিটা খুব বিরক্তিকর, জানেন?”
রায়ান হাসি থামিয়ে একটু ঝুঁকে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার বিরক্তির কারণ হওয়া যদি আমার কাজ হয়, তাহলে তো বেশ ভালোই পারফর্ম করছি।”
আমায়রা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“আপনি এতো ফালতু কথা বলেন কেন বলুন তো?”
রায়ান হাসলো কিছু বললো না। হুট করে আমায়রাকে কোলে তুলে নিলো। আচমকা এমন হওয়ায় চোখ বড় বড় হয়ে গেল আমায়রার। অবাক হয়ে সে বলল,
“এটা কি হলো?”
রায়ান ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“বউ আমার না খুব চুমু খেতে মন চাচ্ছে।”
আমায়রা চোখ আরো বড় বড় হয়ে গেল। যেন এখনি কোটর থেকে বেড়িয়ে আসবে। আমায়রা ঢোক গিলে বলল,
“নামান আমাকে।”
রায়ান ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
“একেবারে নিচে গিয়ে নামাবো। আর বেশি ছোটাছুটি করলে ছাদ থেকে ফেলে দিবো।”
আমায়রা নিচু গলায় বলল,
“নিচে সবাই আছে।”
রায়ান মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“সবার তো খেয়েদেয়ে কাজ নাই তোমার ত্যাড়ামি দেখার জন্য মাঝরাত অব্দি জেগে থাকবে।”
আমায়রা চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“আমি শুধু ত্যাড়ামি করি।”
“তা নয় তো কি?”
“হ আর আপনি তো কিছুই জানেন না অবলা…!”
রায়ান ভ্রুকুচকে আমায়রার দিকে তাকাতেই আমায়রার থেমে গেল। রায়ান বলে উঠলো,
“কি থেমে গেলে কেন? পরেরটুকু বলো। তোমার তো দেখি বেশি সাহস বেড়ে গেছে। সাইজ করতে হবে তোমাকে।”
আমায়রা আমতা আমতা করে বলল,
“মানে কি করবেন?”
রায়ান দুষ্টু হেসে তাকালো আমায়রার দিকে। আমায়রা খানিকটা ভয় পেলো রায়ানের দিকে। রায়ান নিচের ঠোঁট কামরে হাসছে।
রায়ান আমায়রা নিজের রুমে এসে নামিয়ে দিলো। আমায়রা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত দেড়টা বাজে প্রায়। আমায়রা ধপ করে বেডের একপাশে শুয়ে পরলো। রায়ান মুচকি হেসে লাইট বন্ধ করে আমায়রার পাশে এসে শুয়ে পরলো। আমায়রাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজলো রায়ান। আমায়রা কিছু বলল না আর। ঘুম ধরেছে তার। আর বলেও লাভ নেই সে জানে।
★★
কেটে গেছে বেশ কিছুদিন আমায়রাকে ভার্সিটিতে কেউ আর কিছু বলেনা। তবে কেউ কেউ হুট করে বিয়ে করার কারণ জানতে চাইলে আমায়রা এড়িয়ে যায়। কারণ সে নিজেই তো জানেনা কেন রায়ান হুট করে তাকে বিয়ে করেই দম নিয়েছে। শিহাবের বাজির কথাটা ঝেড়ে ফেলে দিতে চাইলেও কেন যেন মনের কোণে হাজার বার উঁকি দিচ্ছে কথাটা। রায়ানকে বললেও সে এড়িয়ে যায়। আমায়রা এগুলো ভাবছিলো আর রুম গোছাচ্ছিলো তখনি রুমে রাবেয়া বেগম এলেন। আমায়রাকে এমন অন্যমনস্ক দেখে চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
“কি হয়েছে আমায়রা তোকে এমন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে কেন?”
রাবেয়া বেগম কথায় আমায়রার ভাবনার জগতের সুতায় টান পরলো। রাবেয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আমায়রা বলল,
“তেমন কিছু না আম্মু। কিছু বলবে?”
রাবেয়া বেগম আলতো হেসে চায়ের কাপ আমায়রার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নাইমাও নেই তাই ভাবলাম তোর সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প করি।”
আমায়রা চায়ের কাপ ধরে বলল,
“তুমি কষ্ট করতে গেলে কেন বলো তো, আমাকে বলতে আমি চা করে আনতাম।”
রাবেয়া বেগম হাসি মুখ নিয়ে সোফায় আমায়রাকে বসিয়ে নিজেও বসে বলল,
“ধুর এখানে কষ্টের কি আছে? তা পড়াশোনা কেমন চলছে?”
আমায়রা চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে বলল,
“পড়াশোনা মোটামুটি চলছে, তবে পরীক্ষার আগে চাপটা একটু বেশি থাকে।”
রাবেয়া বেগমও চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
“জানিস তো রায়ান ছোট থেকেই বেশ চাপা স্বভাবের। জেদী, বদমেজাজি হলেও মনটা কিন্তু ভালো। চোখ বুজে তু্ই ওকে বিশ্বাস করতে পারিস। আমি মনে করি তুই ওর জন্য একদম ঠিক একজন মানুষ। মায়ের মন কখনোই ভুল বলে না।”
আমায়রা মনোযোগ দিয়ে শুনলো রাবেয়া বেগমের কথা। মনে মনে বিরবিরালো,
“হ কত যে ভালো আমি ছাড়া আর কে জানে। খালি সুযোগ পেলেই হলো বউ চুমু খাবো চুমু খাবো শুরু হয়ে যায়। অসভ্য, নিলজ্জ লোক একটা।”
রাবেয়া বেগম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
“কিছু কি বলল?”
আমায়রা হাসার চেষ্টা করে বলল,
“না না কিছু না আম্মু।”
আমায়রা প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,
“নূর নাইমা আপু ওরা কবে আসবে আম্মু।”
রাবেয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“জানিসই তো তোর মামি শাশুড়ির শরীরটা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ভাইয়ের আর ছেলে মেয়েও নেই। থাক কয়েকদিন।”
——————
অনুভব কলেজের বারান্দা দিয়ে ক্লাস নিয়ে অফিস রুমের দিকে যাচ্ছিলো। হুট করে মাঠের দিকে চোখ যেতেই কপাল কুচকে এলো অনুভবের। তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দেখলো না এতো সে ভুল দেখছেনা। এতো সুরাইয়া।
মাঠের মাঝে ঘাসের উপর বসে হেসে একটা ছেলের সঙ্গে কথা বলছে সুরাইয়া। এই দুদিন হবে সুরাইয়া ট্রান্সফার হয়ে অনুভবের কলেজে এসেছে। সব ব্যবস্থা অনুভবই করে দিয়েছে।
#চলবে
#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রা
#পর্বঃ৩৬
অনুভব ভ্রুকুচকে তাকালো সুরাইয়ার দিকে। সাদা হিজাবের মাঝে ফর্সা গোল মুখটা রোদের তীব্রতায় লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। পাশে ছেলেটা তার ক্লাসেই পড়ে। নাম আবরার। অনুভব হনহন পায়ে এগিয়ে গেল মাঠের সামনে। সুরাইয়ার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ক্লাস বাদ দিয়ে এখানে কি করছো?”
সুরাইয়া চোখ তুলে তাকালো অনুভবের গম্ভীর মুখের দিকে। পাশ থেকে আবরার কিছু বলতে নিবে তার আগেই অনুভব হাত দিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“ক্লাসে যাও।”
আবরার আর কিছু বলার সাহস পেল না। সুরাইয়ার দিকে একপলক তাকিয়ে চলে গেল সে। অনুভব সেদিকে একপলক তাকিয়ে তীক্ষ্ণচোখে আবারো সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ক্লাস বাদ দিয়ে আড্ডা দিতে কলেজে আসো।”
সুরাইয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“আড্ডা দেই বা বিয়ে করি আপনার তো কিছু আসে যায় না।”
অনুভবের বেশ রাগ হলো। তপ্তশ্বাস ফেলে চোখ বুজে আবারো বলে উঠলো,
“ক্লাসে যেতে বলছি তোমাকে।”
সুরাইয়া উঠে দাঁড়ালো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বলল,
“যাবোনা কি করবেন মারবেন?”
অনুভবের হাত মুঠি হয়ে এলো। গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“ক্লাসে যেতে বলেছি তোমায়।”
সুরাইয়া গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“আমি তো চাইছি আপনার থেকে দূরে সরে যেতে তাহলে কেন এলেন এখন আমার সামনে। আমি আছি তো আমার মতো। মন চাইলেও আবেগ প্রকাশ না করে দমিয়ে রাখছি।”
অনুভব অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে বলল,
“দেখো রাকিব বন্যা তোমার উপর অনেক ভরসা করে তার মর্যাদা দিও।”
সুরাইয়া তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“আপনাকে আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। আপনি বরং আপনার অতীত নিয়েই ভাবুন।”
বলেই সুরাইয়া উল্টো ঘুরে চলে গেল। অনুভব তাকিয়ে রইলো সুরাইয়ার যাওয়ার দিকে।
—————
রোজা বসে বসে টিভি দেখছিলো আর চিপস খাচ্ছিলো। কাল তার হায়ার ম্যাথ পরীক্ষা আছে। সে জানে সে ফেল করবে। কারণ সে এখনো সিলেবাস শেষ করতেই পারেনি। তাই টেনশন না করে চিল মুডে আছে। আর কলেজে উঠে ফেল তো করতেই হবে। এ আর এমন কি?
রোজার চিলকে কেড়ে তান্দুরি বানাতে সেই মুহুর্তে কলিং বেল বেজে উঠলো। কাবিল সাহেব এসেছে। হয়ে গেল, এখন জোর করে হলেও পড়তে বসাবে। মনের কথা মনেই রয়ে গেল কাবিল সাহেব ধপ করে সোফায় বসে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“কাল না তোমার পরীক্ষা টিভির সামনে কি? ম্যাথ পরীক্ষার সময় তোমার যতসব অবহেলা। যাও গিয়ে পড়তে বসো।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও রোজা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে টিভি অফ করে ধুপধাপ পায়ে চলে গেল রুমে।
রোজা রুমে গিয়ে বই খুলে বসলেও মনোযোগ পড়ায় নেই। মাথার মধ্যে শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে, “এখন পড়ে আর কী হবে! ফেল করবোই।”
বিছানায় গড়াগড়ি করতে করতে সে বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে। এদিকে দরজার বাইরে কাবিল সাহেব দাঁড়িয়ে বেশকিছুক্ষণ যাবত পর্যবেক্ষণ করছেন রোজার মতিগতি। শেষমেষ বিরক্ত হয়ে উনি রুমের ভিতরে ঢুকলেন। রোজা চটজলদি ভাব ধরে বসলো যে সে অংক গুলোতে চোখ বুলাচ্ছে।
কাবিল সাহেব বিরক্তি নিয়ে তার স্ত্রী রোকেয়া বেগমকে ডাকলেন। স্বামীর ডাক শুনে রোকেয়া বেগম হাতের কাজ ফেলে দৌড়ে এলেন। রোকেয়া বেগম আসছেই কাবিল সাহেব থমথমে গলায় বললেন,
“আমি একটা বড় কলেজের ম্যাথের টিচার। আর আমার মেয়ে হয়ে ও যদি ফেল করে তাহলে কিন্তু খবর হয়ে যাবে দিলাম।”
রোকেয়া বেগম একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“তোমার মেয়ে তুমি দেখো আমি কি জানি? আমার অনেক কাজ আছে। গেলাম আমি।”
বলেই রোকেয়া বেগম চলে গেলেন। কাবিল সাহেব নিজ মনেই বকবক করতে করতে চলে গেলেন।
কাবিল সাহেব যেতেই রোজা বই অফ করে বিছানায় শুয়ে পরলো। দুপা জানালার গ্ৰিলে রেখে গুনগুনিয়ে গাইতে লাগলো।
——————
রায়ান অফিস থেকে এসে সোজা নিজের রুমে গেল। রুমে আমায়রাকে না দেখতে পেয়ে কপাল কুচকে এলো তার। বেডে পা ঝুলিয়ে বসে গলা উচিয়ে ডাকতে লাগলো,
“বউ, ও বউ, কোথায় গেলে তুমি?”
আমায়রা রাবেয়া বেগমের সাথে রান্নাঘরে টুকিটাকি কাজ করছিলো। সাথে হেলপিং হ্যান্ড রহিমা খালাও ছিলো। তাদের সামনে রায়ানের এমন করে ডাকায় আমায়রা বেশ লজ্জা পেলো। রাবেয়া বেগম হাসলেন। আমায়রাকে একটা কফির মগ ধরিয়ে বললেন,
“যাও গিয়ে দিয়ে আসো।”
আমায়রা মাথা নিচু করে চলে গেল। রাবেয়া বেগম আর রহিমা খালা মুখ টিপে হাসলো।
রায়ান ডাকতেই আছে। থামাথামির নাম নেই যেন। আমায়রা গটগট পায়ে রুমে এসে ঝাঝালো কন্ঠে বলল,
“কি সমস্যা আপনার? নিলজ্জের মতো জোরে বউ বউ করছেন কেন?”
রায়ান চোখ ঘুরিয়ে তাকালো আমায়রা দিকে। আমায়রা আজ হালকা নীল রঙের একটা সালোয়ার কামিজ পরেছে। যদিও রাবেয়া বেগমের কাছে রায়ান একবার শুনেছিলো নীল নাকি কষ্টে রঙ। কিন্তু কষ্টের আবার কোনো রঙ হয় নাকি। বুঝে উঠতে পারেনা রায়ান। এই যে নীল রঙে মেয়েটাকে কি সুন্দর লাগছে। চোখ নামানো দায় হয়ে পরেছে। হৃদয়ে প্রশান্তির দোলা বয়ে যাচ্ছে।
রায়ান খানিকক্ষণ আমায়রার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। আমায়রা তার অস্বস্তি ঢাকতে কফির মগটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এই নিন আপনার কফি। আর পরের বার এমন ডাকাডাকি করলে আম্মুর কাছে নালিশ করব।”
রায়ান কফির মগটা আমায়রার হাত থেকে নিয়ে সাইড টেবিলে রেখে ভ্রুকুচকে বলল,
“কি নালিশ করবে শুনি?”
আমায়রা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আপনাকে কেন বলবো?”
বলেই আমায়রা ঘুরে চলে যেতে নিবে তখনি রায়ান ওর হাত ধরে হেচকা টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসে। আচমকা এমন হওয়ার আমায়রা চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে ফেলে। রায়ান মুচকি হেসে আমায়রার কপালে পড়ে থাকা ছোট চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে কানের পিঠে গুজে দেয়। রায়ানের শীতল স্পর্শে কেঁপে উঠে আমায়রা। আমায়রাকে কাঁপতে দেখে রায়ান বাঁকা হেসে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
“বিয়ের দুই সপ্তাহ হতে চলল এখনো যদি হালকা স্পর্শে কাঁপাকাঁপি করো। তাহলে তো….!”
রায়ানের কথার মাঝেই আমায়রা ধপ করে চোখ খুলে রায়ানে মুখ চেপে ধরলো। তেতে উঠে বলল,
“চুপ আপনি একটা অসভ্য পুরুষ।”
রায়ান আমায়রার হাত নিজের হাত দিয়ে মুখ থেকে সরিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠলো,
“সারাদিন যখন অসভ্য অসভ্য করো। আজ না হয় একটু অসভ্যতামি করি।”
বলেই রায়ান আমায়রাকে আরো কাছে টেনে নিতেই হুট করে আবির রুমে আসতে আসতে বলে উঠলো,
“ভাই একটা কা…..!”
আবিরের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তার বুঝতে আর বাকি রইলো না সে ভুল সময়ে এসে পরেছে। এরজন্য নির্ঘাত সে শাস্তি পাবে। আবিরের কন্ঠ শুনে আমায়রা রায়ানকে এক ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে দৌড়ে রুম ছেড়ে চলে গেল। কি লজ্জা! কি লজ্জা! লজ্জায় আমায়রার মুখ লাল হয়ে গেল। রায়ানকে সে হাজারটা গালি দিতে লাগল।
রায়ান অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো আবিরের দিকে। আবির ভয়ে ঢোক গিলছে। রায়ান দাঁত পিষে বলল,
“হারাম*জাদা আসার আর সময় পেলি না। আমি এর প্রতিশোধ নিবো। তোর বাসর ঘরে গিয়ে আমি বসে থাকবো। তখন দেখি তুই কি করিস?”
আবির করুন দৃষ্টিতে তাকালো রায়ানের দিকে। রায়ান ঠোঁট উল্টে বলল,
“বউকে একটা চুমুও খেতে দিলো না। সব শত্রু আমার।”
বলেই ধুপধাপ পায়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ঠাস করে আবিরের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলো।রায়ান ওয়াশরুমে ঢুকে কিছুক্ষণ নিজের মনে ক্ষোভ ঝাড়তে লাগল।
অন্যদিকে আমায়রা রান্নাঘরে ঢুকে লজ্জা ঢাকতে ব্যস্ত। রাবেয়া বেগম অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
“কি হলো? এভাবে লাল হয়ে আছিস কেন?”
আমায়রা কিছু বলল না, শুধু বলল,
“কিছু না আম্মু।”
রাবেয়া বেগম মুচকি হেসে রহিমা খালার দিকে চোখ টিপলেন। আমায়রার এ লজ্জার রহস্য তাদের কাছে পরিষ্কার।
এদিকে আবির সে তোএটাই বুঝতে পারছেনা এখানে তার কি দোষ? এতই যদি বউকে চুমু খাওয়ার হতো তাহলে দরজা বন্ধ করে নিলেই হতো।
রায়ান ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখলো আবির সেই আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই কি যেন ভাবছে। রায়ানের মেজাজ খারাপ হলো। ঝাঝালো কন্ঠে বলল,
“আহাম্মকের মতো এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি করছিস?আমার চুমু খাওয়ার বারোটা বাজিয়েছিস। এখন আর কি করার জন্য বসে আছিস।”
আবিরের ভাবনার সুতো ছিড়লো। রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাই তুমি তো দরজা বন্ধ করেই সব করতে পারতে। তাহলেই তো..!”
আবিরের কথার মাঝেই রায়ান বলে উঠলো,
“আমার রুম আমি বুঝবো। তোর কিরে?”
রায়ানের কথায় বেশ বিরক্ত হলো আবির। মনে মনে অশ্রাব্য ভাষায় কয়েকটা গালিও দিয়ে দিলো আবির রায়ানকে। রায়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে মুছতে বলল,
“কি বলতে এসেছিলি বল এখন?”
আবির তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ভাই শিহাবকে আর কতদিন রাখবো?”
রায়ান ভাবলেশহীনভাবে বলল,
“যতদিন না জানো*য়ারটা সোজা হয়। ততদিন রাখ ওকে।”
“কিন্তু ভাই ওর বাবা তো তুলকালাম বাজাবে।”
রায়ান চুল ঠিক করে আবির দিকে ফিরে বলল,
“আচ্ছা আমি সবটা একটু ভেবে দেখছি। তুই একটু সতর্ক থাক। শালা খুব চালাক। আমায়রাকে ওইদিন উল্টাপাল্টা অনেক কথাই বলেছে।”
আবির চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“ভাবি কি কিছু বলেছে তোমায়?”
রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“না ও কিছু বলেনি।”
আবির প্রশ্নবোধক কন্ঠে বলল,
“তাহলে”
রায়ান আবিরের কাঁধে হাত রেখে আলতো হেসে বলল,
“ও তুই বুঝবিনা।”
#চলবে
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। বেশি বেশি রিয়েক্ট কমেন্ট করে রেসপন্স করবেন।)