#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রা
#পর্বঃ৩৭
রায়ানের কথায় বিরক্ত হলো আবির। এই বিটকেলের শুধু এই এক কথা তুই বুঝবিনা। ও বুঝে পায় না তার বুঝতে আর কি করা লাগবে?
তাদের কথার মধ্যেই নিচ থেকে ডাক পরলো। রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। দুইজনই নেমে গেল। সবাই খাবার টেবিলে বসে গেছে। আজ তাহসান অফিস থেকে সোজা শশুরবাড়ি গেছে। তাজওয়ার সাহেব, নেহার বাবা মা, নেহা, আবির, রায়ান সবাই বসে পড়েছে। রাবেয়া বেগম আমায়রাকে নিয়ে একসাথে এসে বসলো। আমায়রা মাথা নামিয়ে রেখেছে। রায়ান বেশ অবাক হলো। আমায়রা এমন মাথা নিচু করে আছে কেন? সে তো কিছুই করেনি।
খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই সবার রুমে চলে গেল। কিন্তু আমায়রা আসছেনা। রায়ান একরাশ বিরক্তি নিয়ে পাইচারি করছে রুমের মাঝে।
আমায়রা রুমে না এসে চুপ করে বসার রুমের সোফায় বসে আছে আর নখ খাচ্ছে। রায়ান আবিরের সামনে তাকে কিভাবে লজ্জায় ফেলল। এর তো একটা প্রতিশোধ নিতেই হবে তাকে। হুম এটাই ফাইনাল। আমায়রা নিজ মনে সবটা ভেবে কুটিল হাসলো। ধীর পায়ে উঠে গেল সিড়ি বেয়ে। রুমের পর্দা সরিয়ে মাথাটা বের করে দেখলো রায়ান গাল ফুলিয়ে বেডের উপর বসে পা দুলাচ্ছে। আমায়রা বাঁকা হেসে মনে মনে বলল,
“চান্দু এবার দেখবে মজা। কত ধানে কত মরিচ আর মরিচে কত ঝাল তোমাকে বুঝিয়েই ছাড়বো। আমারে তো চিনো না ময়না।”
বলেই ঠিকঠাক হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“এই যে বেইবি একা একা গাল ফুলিয়ে বসে কি করছো জানটা আমার?”
রায়ান কপাল কুচকে তাকালো দরজার দিকে। আমায়রা এসব কি বলছে? বেইবি, জান ও মাই আল্লাহ। রায়ান বুকে হাত দিয়ে দুবার জোরে জোরে শ্বাস টানলো। চোখ পিট পিট করে নিজের হাত নিজে চিমটি কাটলো। নাহ লাগছে তো। তার মানে সত্যি। ভেবেই রায়ানের মাথা ঘুরছে। বুকে হাত রেখে ঠাস করে বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে পরলো রায়ান। নিজ মনেই বিরবিরাতে লাগল,
“আমি কি মরে টরে গেছি নাকি। এমন অদ্ভুত কথা বাপের জন্মে শুনবো ভাবতেও পারছিনা। তাও আবার যমরানীর থেকে। আল্লাহ গো তুমি আমারে এতো তাড়াতাড়ি তুলে নিলে গো। আমার ছানাপোনা গুলোরেও দেখা হলো না। হায়রে আমার বউটারে তো অন্য পোলা নিয়ে যাবে। নো নো বউ শুধু আমার। চুমুও খেতে পারিনি আমি এখনো। সেই বউ আমি কাউকে দিবো না। ভুত হয়ে আমার বউয়ের সঙ্গে থাকবো। হুম এটাই ফাইনাল।”
আমায়রা নিজের হাসি চেপে এগিয়ে গেল রায়ান কাছে। রায়ানের পাশে বসে বলল,
“বাবু এমন করলে চলে বলো তো!”
রায়ান খপ করে আমায়রার এক হাত ধরে ফেলল। আমায়রা খানিকটা ভীত হলেও আগের মতোই থাকার চেষ্টা করে ঢং করে বলল,
“কি হয়েছে জান শরীর খারাপ করছে নাকি তোমার?”
রায়ান ঝট করে চোখ খুলে আমায়রাকে ধাক্কা দিয়ে ওর উপর ঝুঁকে পরলো। আমায়রা চোখমুখ খিচে বন্ধ করে ফেলল। রায়ান আমায়রা কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমার সঙ্গে পাঙ্গা লাগতে এসোনা বউ। আমাকে বোকা মনে করোনা একদম।”
রায়ানের উষ্ণ নিশ্বাস আমায়রার কানে বারি খাচ্ছে। আমায়রা চোখ মুখ খিচে বন্ধ করেই আসে। রায়ান বাঁকা হেসে আমায়রার ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো। আমায়রা দম করে চোখ খুললো। চোখগুলো তার বড় বড় হয়ে গেল। রায়ান হুট করে যে এমন কাজ করবে কল্পনাও করেনি সে।
আমায়রার হৃদস্পন্দন যেন মুহূর্তেই দ্বিগুণ হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে রায়ানের দিকে তাকিয়েই রইল সে। কয়েক সেকেন্ডের স্তব্ধতার পর, রায়ান ধীরে ধীরে মাথা সরিয়ে আনমনে বলে উঠল, “এখন বুঝেছো, কার সঙ্গে পাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছো?”
আমায়রা কিছুক্ষণ চুপ থেকে রায়ানের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। তারপর এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে বলল,
“আপনি…আপনি এটা কী করলেন?”
গলাটা কাঁপছে, তবে চোখে মিশে আছে বিস্ময়ের সঙ্গে লুকানো রাগ।
রায়ান মৃদু হেসে বসল। আমায়রা দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার মতো দুষ্টু মেয়েকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল। এখন যদি আরও কিছু করতে যাও,পরের বার আরও বড় শিক্ষা পাবে।”
আমায়রা দাঁত চেপে বলল,
“শিক্ষা আমিও দিতে পারি, মিস্টার রায়ান!”
রায়ান উঠে লাইট অফ করে দিলো। আমায়রার পাশে এসে ধপ করে শুয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে বলল,
“পরে শিক্ষা দিও তো। এখন রাত হয়েছে ঘুমাও।”
রায়ানের কথায় আমায়রা মুখ বাঁকালো। রায়ান আবারো বলে উঠলো,
“মুখ বাঁকিয়ে লাভ নেই।”
আমায়রা গাল ফুলিয়ে বলল,
“আমি ঘুম ধরছে না।”
রায়ান চোখ খুলে বলল,
“কেন?”
আমায়রা ছোট্ট করে বলল,
“জানিনা।”
রায়ান কিছুক্ষন চুপ থেকে শোয়া থেকে উঠে বসলো। আমায়রাও উঠে বসলো। একটা কম্বল আমায়রার হাতে দিয়ে ঝট করে ওকে কোলে তুলে নিলো। আমায়রা অবাক হয়ে বলল,
“একি কি করছেন আপনি?”
রায়ান কিছু বলল না। চুপচাপ পা ফেলে বারান্দায় গেল। কুয়াশায় চারিদিকে ঢেকে আছে। শীতল হাওয়ায় কম্পিত হচ্ছে দুই মানব মানবী। আমায়রা কাঁপা গলায় বলল,
“ঠান্ডা তো। এই ঠান্ডায় বারান্দায় রেখে আমাকে মেরে ফেলবেন নাকি। দয়া করে এই কাজ করবেন না। আমি আর কখনো কিছু করবো না।”
রায়ান কিছু বলল না। হুট করে আমায়রার সেই কোলবালিশ ফেলে দেওয়ার কথা মনে হলো। তাকে এখান থেকে ফেলে দিবে নাতো। ভয়ে আমায়রা রায়ানের বুকের কাছের টিশার্টের কিছু অংশ খামচে ধরলো। শক্ত করে ধরায় হয়তো নখ বসে গেছে। সেদিকে আমায়রার খেয়াল নেই রায়ানে বুকে মুখ গুজে আমায়রা ভীতু কন্ঠে বলতে লাগলো,
“প্লীজ আমাকে ফেলে দিবেনা। এখান থেকে ফেলে দিলে আমার হাত পা ভেঙে সব গুড়া গুড়া হয়ে যাবে। এমন করবেন না। আমি আর কোনো শিক্ষাই দিবো না আপনাকে।”
রায়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আমায়রার কাঁপা কণ্ঠ আর ভীত চেহারা দেখে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। আমায়রার এমন ভয় পাওয়া দেখে সে আস্তে করে বলল,
“তোমাকে ফেলে দিলে তো আমারও শান্তি নষ্ট হবে। এত ভয় পেতে হবে না, আমি তো শুধু একটু ঠান্ডা হাওয়া খাওয়াতে এনেছি।”
এই কথা শুনে আমায়রা ধীরে ধীরে রায়ানের বুক থেকে মুখ তুলে তাকাল। চোখে বিস্ময় আর সন্দেহ মিশিয়ে সে বলল,
“আপনি এমন সব নাটক করে কেন? আমার তো হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল!”
রায়ান চোখে চোখ রেখে বলল,
“তুমি যে প্রতিদিন এমন নাটক করো, তার প্রতিশোধ তো একদিন নিতে হবে।”
আমায়রা এবার রাগে মুখ ঘুরিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনার এই ঠান্ডা হাওয়ার শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে।”
রায়ান হাসলো। পাশের দোলনায় আমায়রাকে কোলে নিয়েই বসলো। আমায়রা অবাক চোখে শুধু রায়ানের কাজ কারবার দেখছে। আমায়রার হাতের কম্বল নিয়ে খুব ভালোভাবে দুইজনের গায়ে জড়িয়ে নিয়ে আমায়রার মাথা তার বুকে রেখে কম্বল দিয়ে মাথা কানও ঢেকে দিলো। আমায়রা পলকহীন তাকিয়ে আছে রায়ানের দিকে। রায়ান আলতো হাতে আমায়রার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“এবার চোখ বন্ধ করো। দেখবে ঘুম চলে আসবে।”
আমায়রার আজকে আর ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে মন চাইছে না। মন চাইছে সময় থমকে যাক। মানুষটার বুকে যেন তার প্রশান্তি নিবদ্ধ। রায়ানের বুকে মাথা রেখে আমায়রা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ, রায়ানের উষ্ণতা আর রাতের সেই নিস্তব্ধতা সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল তার মনে। তবে প্রশান্তির মাঝেও রায়ানের মুখের কথাগুলো তাকে খোঁচা দিতে লাগল। কীভাবে সে এতটা নির্লজ্জ হয়ে গেল, যে সরাসরি তার ঠোঁটে চুমু খেতে পারল!
রায়ানের দিকে তাকানোর সাহস পায়নি আমায়রা, কিন্তু মনে মনে ঠিক করল যে তাকে শাস্তি দিতেই হবে। কয়েক মুহূর্ত পর রায়ান আমায়রার ভারী নিশ্বাস অনুভব করে বুঝতে পারলো আমায়রা ঘুমিয়ে পরেছে। রায়ান আলতো হাসলো। আমায়রাকে সতর্কতার সাথে কোলে নিয়ে রুমে এসে ওকে বিছানায় শুয়ে দিলো। গলা অব্দি কম্বল টেনে দিয়ে তাকালো আমায়রার ঘুমন্ত মুখপানে। ড্রিম লাইটের মৃদু আলোতে মেয়েটা বেশ মায়াবী লাগছে। রায়ান পলকহীন তাকিয়ে রইলো আমায়রার মুখের দিকে। বুকের হৃদস্পন্দন ক্রমাগত বাড়তে লাগলো তার। আলতো হাতে আমায়রার কপালে পড়ে থাকা ছোট চুলগুলো সরিয়ে কানের পিঠে গুজে দিলো। না আর বেশি সময় এভাবে থাকতে পারবেনা সে। সে চায় না আমায়রার বিশ্বাস নষ্ট করে।
ঝট করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরলো সে। ঘুম উড়ে গেছে তার। নির্ঘুম রাত কাটবে আজ তার।
রায়ান বারান্দার দিকে পা বাড়ালো। গায়ে একটা টিশার্ট ছাড়া গরম কাপড় নেই। বারান্দায় গিয়ে থাইগ্লাস আটকে দিলো। যাতে ঠান্ডা বাতাস ঘরে না যায়। রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো সে। গভীর দৃষ্টি রাখলো আকাশপানে।
সেদিনই শিহাবকে তারা তুলে তাদের আস্তানায় রেখেছে। এ নিয়ে সে কম মেয়ের জীবন নষ্ট করেনি। কিন্তু তাকে কিছুতেই দমানো যায়নি। এবার কিছু একটা করতেই হবে। আমায়রাকে শুধু এমনি ভার্চুয়াল কাজের কথা বলেছে। কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করলে সে যে নিজেই কাজ সেরে ফেলে এটা বলেনি। আচ্ছা এটা যদি জানতে পারে তাহলে কি আমায়রা তাকে ছেড়ে যাবে। এসব ভাবনা মনের মাঝে গিজগিজ করতে লাগলো রায়ানের।
একটা সিগারেট ধরে টানতে লাগলো সে। কুয়াশার সাথে সিগারেটের কালো ধোঁয়া উড়ে যেতে লাগলো আকাশপানে। মনটা বেশ অস্থির হয়ে আছে তার। না অস্থিরতা কাটাতে হবে। রায়ান হাতের সিগারেট শেষ করে আরেকটা ধরলো। সেটাও শেষ হলো তবুও শান্তি মিলছেনা। রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো রুমে ফিরে এলো। আমায়রা গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। রায়ান আলতো হেসে এগিয়ে গেল বিছানায়। একপাশে শুয়ে আমায়রাকে বুকে নিয়ে চোখ বুজলো সে। কখন যে ঘুমিয়ে গেছে বুঝতে পারেনি সে।
——————
সুরাইয়া গালে হাত বসে আছে টেবিলে। সামনে একটা পরীক্ষা আছে তার। পড়া কিছুতেই হচ্ছেনা। অনুভব যে কোচিং এ পড়ায় সেখানেও তাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিগত দুই ক্লাস সে যায়নি। বন্যা যেতে বললে কোনো একটা কিছু বলে কাটিয়ে দেয় সে।
জীবনটা পিথাগোরাসে উপপাদ্য হয়ে গেছে তার। যতই হাবিজাবি করে মেলাতে চাচ্ছে ততই যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। মেজাজ খারাপ হচ্ছে তার অনুভবের উপর। মন তো চাচ্ছে ঠাস করে একটা উষ্টা দিয়ে অনুভবকে তার ভালোবাসায় উপুড় খেয়ে ফেলতে। ব্যাটায় কি খারাপের খারাপ। তার আবেগ অনুভূতি গুলোকে শুধু গলা টিপে হত্যা করে মুহূর্তে মুহূর্তে।
সুরাইয়ার ভাবনার মাঝেই চায়ের কাপ নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো বন্যা। সুরাইয়াকে গালে হাত দিয়ে কিছু ভাবতে দেখে বন্যা ভ্রুকুচকে তাকিয়ে বলল,
“কিরে কি এতো ভাবছিস?”
বন্যার কথায় সুরাইয়া ভাবনার সুতো ছিড়লো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো বন্যার দিকে। বন্যাকে ভ্রুকুচকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুরাইয়া হাসার চেষ্টা করে বলল,
“তেমন কিছু না আপু। কিছু কি বলবে?”
বন্যা এগিয়ে এসে টেবিলে চায়ের কাপ রেখে বলল,
“চা খেয়ে নে। ভালো লাগবে। আর বেশি রাত জাগিস না ঠান্ডা পরেছে।”
#চলবে
#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রা
#পর্বঃ৩৮
বন্যার কথায় সম্মতি দিয়ে মাথা নাড়ালো সুরাইয়া। বন্যা তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে সুরাইয়াকে নিজের দিকে ফিরিয়ে দুগালে হাত রেখে বলল,
“অনুভব ভাইকে ভালোবাসিস?”
হুট করেই সুরাইয়া বন্যার কোমর জড়িয়ে ধরলো। বন্যা হাসলো। সুরাইয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বন্যা শান্ত সুরে বলল,
“চিন্তা করিস নি আমি দেখছি ব্যাপারটা।”
সুরাইয়া মুখ তুলে তাকালো বন্যার দিকে। বন্যা আলতো হেসে আরো কিছু কথা বলে চলে গেল সে। কথার মাঝে চা ও খেয়ে নিয়েছে সুরাইয়া। সুরাইয়া কিছুসময় পড়ে বিছানায় চলে গেছে।
★★
দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরো কয়েকটা দিন। অনুভব বসে আছে নিজের রুমে। তার প্রচুর ঠান্ডা লেগেছে তাই কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছে সে। সহজে তার ঠান্ডা লাগে না। তবে একবার লাগলে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমেনা বেগম আদার চা কেবলি রেখে গেছে। অনুভব চা খাচ্ছিলো তখনি তার ফোন বেজে উঠে। অনুভব ফোন হাতে নিয়ে দেখলো অপরিচিত নাম্বার। কপালে ভাঁজ পরলো তার। কল রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে ভেসে এলো সুরাইয়া গম্ভীর কন্ঠ।
“আমার নাকি আবেগের বয়স। আবেগের বয়সেই পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে আমাকে। আপনি না হয় আপনার অতীত নিয়ে থাকুন।”
বলেই খট করে কল কেটে দিলো সুরাইয়া। অনুভব অবাক হলো। মেয়েটা কি পাগল টাগল হয়ে গেল নাকি। অনুভব ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। সুরাইয়ার গম্ভীর কিন্তু তীক্ষ্ণ কথাগুলো যেন তার কানে বারবার প্রতিধ্বনি তুলছিল। মেয়েটা এমন কথা বললো কেন? তার আবেগের বয়স? পাত্রপক্ষ? এসব হঠাৎ কীসের ইঙ্গিত? অনুভব চা-এর কাপটা টেবিলের ওপর রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো।
তারপর গভীরভাবে শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো। তার ঠান্ডার জন্য শরীর দুর্বল, আর সুরাইয়ার এই আচরণ যেন তার চিন্তাভাবনাকে আরো জটিল করে তুললো। তার মনে হলো, সুরাইয়া ইচ্ছে করেই এই কথা বলেছে, যেন কোনো অদৃশ্য যুদ্ধের আহ্বান করছে।
অনুভবের স্মৃতিতে ভেসে উঠলো সুরাইয়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখ। যে মেয়েটা সবসময় সবার মাঝে প্রাণসঞ্চার করতো, তার মধ্যে এতো গম্ভীরতা এল কোথা থেকে?
অনুভব নিজের ফোনে সুরাইয়ার নাম্বারটি ডায়াল করতে করতে থেমে গেল। চিন্তায় পড়লো সে,সত্যি কি তাকে ফোন করা উচিত? সুরাইয়া কি সাহায্য চেয়েছে, না স্রেফ তার ওপর রাগ ঝেড়েছে?
অনুভব কল করলো রাকিবকে। দুইবার কল করার পরেও কল রিসিভ করছে না রাকিব। এবার সে বন্যাকে কল দিলো কিন্তু ওরও একি অবস্থা কল রিসিভ করছেনা। অনুভব এবার আরো বিচলিত হয়ে পরলো। সুরাইয়ার নাম্বারে কল করলো সে। কিন্তু ফোন বন্ধ বলছে। অনুভব নিজের অজান্তেই ঘামতে লাগল। বসা থেকে উঠে গিয়ে ফ্যান চালিয়ে দিলো। ঠান্ডার মাঝেও ফুল স্পিরিটে ফ্যান চালালো অনুভব। তবুও যেন অস্থিরতা কমছে না তার। অনুভব আর থাকতে না পেরে ড্রিসিংটেবিলের উপর থেকে বাইকের চাবি নিয়ে বের হয়ে পরলো। আমেনা বেগম কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করলেও অনুভব কোনো উত্তর দেয়নি।
অনুভব বাইক চালিয়ে রওনা হলো রাকিবের বাসার দিকে।
মেইন গেটের সামনে পৌঁছে একটা গাড়ি দেখে বুকটা ধক করে উঠলো অনুভবের। দেড়ি না করে এগিয়ে গেল অনুভব। রাকিবদের বাসার সামনে গিয়ে পরপর কলিং বেল বাজাতে লাগল সে।
খানিকবাদেই বন্যা এসে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই বন্যার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, কিছু একটা ঘটেছে। বন্যা একটু অবাক হয়েই বলল,
“অনুভব ভাই, আপনি এখানে? কী হয়েছে?”
অনুভব উত্তেজিত গলায় বলল,
“সুরাইয়া কোথায়? ওর ফোন বন্ধ, আর তুমি বা রাকিব কারো ফোনই ধরছিলে না। কী চলছে, বন্যা?”
বন্যা কিছুটা থতমত খেয়ে বলল,
“ভেতরে আসুন, বলছি।”
অনুভব দ্রুত ভেতরে ঢুকলো। বসার রুমে তিনজন মানুষ বসে আছে। রাকিব তাদের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। অনুভবকে আসতে দেখে রাকিব হেসে বলল,
“আরে অনুভব ভাই যে, ভালো দিনেই এসেছেন। আসুন পরিচয় করিয়ে দিই সবার সাথে।”
অনুভব কপাল গুটিয়ে বলল,
“ওনারা কি করছে এখানে?”
রাকিব হাসি মুখেই বলল,
“আসলে অনুভব ভাই সুরাইয়াকে একজন সঠিক মানুষের হাতে তুলে দিতে চাচ্ছি। যে তাকে যত্নে রাখবে সবসময়ের জন্য।”
রাকিব আরেকটু দমে বন্যাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সুরাইয়াকে নিয়ে আসো তো বন্যা।”
বন্যা যেতে নিবে তার আগেই অনুভব বলে উঠলো, “তোমরা কি পাগল হয়ে গেছো?”
রাকিব কপাল গুটিয়ে বলল,
“কেন অনুভব ভাই কি হয়েছে আবার?”
অনুভব গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“দেখ রাকিব সুরাইয়া তো এখনো এইসএসসি পরীক্ষা দেয়নি। আর সামনে এডমিশন টেস্ট ওর। আর এই সময় কোথায় ওকে ভালো করে পড়তে বসাবে তা না ওকে তোমরা বিয়ে দিতে চাইছো!”
তখনি পাত্রপক্ষ থেকে আসা আধ বয়স্ক লোকটা খুক খুক করে কেশে বলল,
“তুমি এমন করতেছো কেন বাবা? আর আমার পোলা কি ছোট নাকি যে বউকে পড়াশোনায় বিরক্ত করবে। যত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবে ততই তো ভালো। তাই না বউ।”
শেষের কথাটা তার পাশে বসা আধ বয়স্ক মহিলাকে বলল। মহিলাটা লোকটার পেটে কুনই দিয়ে গুতো দিয়ে অনুভবের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
অনুভব চোখ বুজে পরপর কয়েকটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
“সংসার আর পড়াশোনা একসাথে চালানো কঠিন। আর অধিকাংশ মেয়েরাই বিয়ের পর পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কিন্তু এটা একদমই ঠিক না।”
বয়স্ক লোকটি একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
“তুমি কি বলতে চাইছো বাবা? আমরা মেয়েটার ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেব?”
অনুভব শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তা বলিনি। তবে এভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া সুরাইয়ার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হবে। ওর এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নিজের পড়াশোনা শেষ করা।”
পাশ থেকে বন্যা হেসে বলল,
“আপনারা একটু ধৈর্য ধরুন। সুরাইয়া তো ভেতরে আছে। ওকেই জিজ্ঞাসা করা হোক, ও কী চায়।”
এই কথা শুনে পাত্রপক্ষের লোকজন একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। রাকিবও বিষয়টা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“ঠিক আছে, সুরাইয়ার মতামত নেওয়া দরকার। বন্যা, নিয়ে আসো ওকে।”
বন্যা চলে গেল সুরাইয়ার রুমে। এবার পাত্র নিজের দাড়িতে হাত রেখে গভীর চোখে তাকালো অনুভবের দিকে। গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আপনি পাত্রীর কে?”
অনুভব ভ্রুকুচকে পাত্রের দিকে তাকালো এবার। লম্বা দাড়ি গোফের আড়ালে মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। দেখেই মেজাজ খারাপ হচ্ছে অনুভবের। মনে মনে বিরবিরালো,
“এই নাকি মিস ঝাটা ধরাকে দেখতে এসেছে। ওই বিচ্ছু মেয়ের কথা তো আর এরা জানেনা। দাড়ি একটা একটা করে টেনে ছিড়বে ওই মাইয়া।”
পাত্র আবারো বলে উঠলো,
“কি হলো বললেন না যে?”
অনুভব গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“আমি ওর অভিভাবকের পর্যায়ে পড়ি।”
পাত্র বিরক্তি নিয়ে বলল,
“তা না হয় বুঝলাম কিন্তু কি হন?”
অনুভব নিজের মনেই প্রশ্ন করলো তাই তো কি হয় সে সুরাইয়া? কেউ তো হয় না। ধীর গলায় সে বলে উঠলো,
“আমি ওর টিচার হই।”
বয়স্ক লোকটা চোখের চশমা নাকে নামিয়ে বলল,
“তা বাবা টিচার হয়ে ছাত্রীর পারিবারিক ব্যাপারে কি করছো বলো তো?”
লোকটার কথায় খানিকটা অপমানিত হলো অনুভব। তাই তো এটা তো সু্রাইয়ার পারিবারিক ব্যাপার। অনুভব থম মেরে গেল। রাকিব এবার বলে উঠলো,
“অনুভব ভাই আমাদের আত্মীয়। সুরাইয়ার ব্যাপারে ওনার কাছ থেকেই সিদ্ধান্ত নেই।”
ওদের কথার মাঝেই সুরাইয়াকে নিয়ে আসা হলো। অনুভব ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সেদিকে। হালকা গোলাপি রঙের একটা শাড়ি পড়ানো হয়েছে তাকে। হালকা মেকআপ, গলায় একটা মালা, কানে মাঝারি ধরনের ঝুমকো, মাথা ঘোমটা দেওয়াতে বেশ লাগছে মেয়েটাকে। এমনিতে গোলগাল মুখটাতে মায়ায় ভরা তার উপরে এমন সাজে আরো আকর্ষণীয় লাগছে। অনুভব পলকহীন তাকিয়ে রইলো সুরাইয়ার দিকে।
সুরাইয়াকে এনে বসানো হলো সবার সামনে। অনুভব কি যেন মনে করে পাত্রের দিকে তাকালো। পাত্র হা হয়ে তাকিয়ে আছে সুরাইয়ার দিকে। অনুভব বিরক্তিতে চোখ মুখ খিচালো। এভাবে হা হয়ে তাকিয়ে থাকার কি আছে?
সুরাইয়া বসতেই বয়স্ক লোকটা আর মহিলাটা বিভিন্ন প্রশ্ন করছে। যা অনুভবের মেজাজ খারাপ করছে। অনুভব আর থাকতে না পেরে বলল,
“সুরাইয়া তুমি কি এখন বিয়ে করতে রাজি?”
সবাই মিলে তাকালো অনুভবের দিকে। সুরাইয়া তাকালো না কিছু বললও না। রাকিব এবার সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই কি এখন বিয়ে করতে রাজি?”
সুরাইয়া দৃঢ় কন্ঠে রাকিবকে বলে উঠল,
“আমার কোনো আপত্তি নেই। তোমরা যা চাইবে তাই হবে।”
রাকিব সুরাইয়ার কথায় প্রশান্তি পেলেও অনুভব স্তম্ভিত হয়ে গেল। সুরাইয়ার কণ্ঠে এমন নিশ্চল ও নিরাসক্ত সুর আগে কখনো শোনেনি সে। অনুভব এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
পাত্রপক্ষ খুশি হয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, রাকিব হাসিমুখে সবার সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল। অনুভবের মাথার মধ্যে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করতে লাগলো। পাত্র তাকে ভ্রু নাচালো। অনুভব হুট করেই সুরাইয়ার হাত ধরে বলল,
“তোমার সাথে আমার কথা আছে, ভিতরে আসো।”
সুরাইয়া অনুভবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছুক নই।”
অনুভব বিরক্ত হলো। আবারো বলে উঠলো,
“আসতে বললাম না তোমাকে।”
সুরাইয়া হাত ঝাটকা দিয়ে অনুভবের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো। এবার বয়স্ক লোকটা বলে উঠলো,
“তাহলে কথা এগোনো যাক কি বলো রাকিব।”
রাকিব হাসি মুখে বলল,
“হুম যেহেতু সুরাইয়া রাজি তাহলে তো এগোনোই যায় আঙ্কেল।”
অনুভব ধপ করে বসে পরলো সোফায় পাত্রের পাশে। বন্যা আর রাকিব একে অপরেরদিকে তাকাতাকি করলো।
#চলবে
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। )