অতুলনীয়া পর্ব-০৮

0
411

#অতুলনীয়া
#পর্বঃ৮
#লেখিকাঃদিশা_মনি

ফাতেমা আজ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। অঅনেকদিন পর তাকে আজ খুব খুশি খুশি লাগছে। খুশিতে আজ সে আত্মহারা। তার খুশির বহিঃপ্রকাশ তার আচরণে, কথায়-বার্তায় সবসময় উপলব্ধি করা যাচ্ছে। শ্রেয়াও অনেকটা খুশি হয়েছে এটা শুনে যে ঐ সোহেল নামক অমানুষটার সাথে ফাতেমার সব সম্পর্ক শেষ হয়েছে। তবে তার মনে একটাই খুতখুতানি রয়ে গেছে আর সেটা হলো ফাতেমা কেন এত সহজে সোহেলকে যেতে দিলো। কেন সে সোহেলকে কোন শাস্তি দিল না। তবে ফাতেমা এটাও বলেছে সে সোহেলকে অনেক ভয়ানক শাস্তি দেবে। তবে সেটা কখন এবং কিভাবে সেটা বলে নি।

ফাতেমা আজ মিষ্টি এনে দেয় শ্রেয়াকে। শ্রেয়ার মা শাবানা বেগম বলেন,
‘হঠাৎ আজ মিষ্টি কোন খুশিতে মা?’

ফাতেমা মৃদু হেসে বলে,
‘মিষ্টি এইজন্য এনেছি যে আমার ডিভোর্স হয়েছে। এটা শুনে অনেকের মনে হতেই পারে ব্যাপারটা অদ্ভুত। কারণ এখনো অনেক মেয়ের কাছেই ডিভোর্সি ট্যাগ লাগা একটা অসম্মানের মতো ব্যাপার। তবে আমার কাছে এটা এখন অনেক বড় সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আমি একটা ভুল মানুষের থেকে, একটা ভুল সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেয়েছি।’

ফাতেমার কথা শুনে শাবানা বেগম বলেন,
‘তোমাকে এভাবে দেখে আমার অনেক ভালো লাগছে মা। এত কঠিন পরিস্থিতিতেও তুমি ভেঙে না পড়ে যেভাবে নিজেকে সামলেছ, যেভাবে নিজের আর নিজের মেয়ের জন্য লড়াই করে যাচ্ছ সেটা অনেক মেয়েকেই অনুপ্রেরণা যোগাবে। আমি আল্লাহর কাছে তোমার জন্য প্রার্থনা করব যেন তুমি সুখী হও। তোমার জীবন যেন উনি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভড়িয়ে দেন।’

অতঃপর তিনি কিছু একটা ভেবে শ্রেয়াকে বলেন,
‘শ্রেয়া, তোর তো কম বয়স হয়নি। এবার তো তোর বিয়ে নিয়ে ভাবা উচিৎ। আমি আর ক’দিন বাঁচবো বল?’

শ্রেয়া বিয়ের কথা শুনে মুখটা বিকৃত করে বলে,
‘বিয়ে! আমার তো বিয়ের উপর ফোবিয়া আগে থেকেই ছিল এখন তা আরো জোরালো হয়েছ। ফাতেমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর আমার তো আর কোন পুরুষ মানুষের উপর বিশ্বাস নেই। তার থেকে আমি একা আছি এটাই ভালো।’

ফাতেমা মৃদু হেসে বলে,
‘দেখ শ্রেয়া, হাতের পাঁচটা আঙুল যেমন সমান হয়না তেমন পুরুষ মানুষের মধ্যেও অনেক পার্থক্য আছে। তুই শুধু সোহেলের জন্য সব ছেলেদের কাঠগড়ায় তুলতে পারিস না। সমাজে যেমন সোহেলের মতো খারাপ ছেলে আছে তেমন অনেক ভালো ছেলেও তো আছে। এই যেমন আমার ভাই, আমার ভাবি কোনদিন সন্তান জন্ম দিতে পারবে না, ভাবি মিথ্যা বলে তাকে ঠকিয়েছে এসব জানার পরেও কিন্তু সে ভাবির হাত ছেড়ে দেয়নি। বরং ভাবিকে আরো বেশি করে আগলে রেখেছে। সমাজে তুই এমন আরো অনেক ভালো ছেলে পাবি। যেমন দেখ, সোহেল তো একা নয়, নয়নাও অন্যায় করেছে। কিন্তু এইজন্য কি তুই সব মেয়েদের খারাপ বলবি? তুই আর আমিও কি নয়নার মতো? নিশ্চয়ই না। তেমনি খুঁজলে অনেক ভালো ছেলে পাওয়া যাবে। যাদের কাছে ভালোবাসা, স্ত্রী-সন্তানের মর্যাদা সবার থেকে বেশি।’

শাবানা বেগমও ফাতেমাকে সমর্থন জানিয়ে বলেন,
‘একদম ঠিক বলেছ তুমি। শ্রেয়ার বাবাও এমনই একজন যত্নবান পুরুষ ছিল। আমি তো আমার মেয়ের জন্যেও এমন কাউকে চাই।’

শ্রেয়া বলে,
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। এমন কোন ভালো পুরুষকে পাওয়া গেলে তারপর আমি ভেবে দেখবো। আপাতত ফাতেমা চল আমরা কফিশপে যাই। আজকে অনেক কাজ আছে। আর কাল তো তোকে আবার মাস্টার্স কমপ্লিট করার জন্য এপ্লাই করতে হবে।’

‘হুম, চল।’

১৫.
ফাতেমা আজ তার মাস্টার্স কমপ্লিট করার জন্য একটা স্বনামধন্য ভার্সিটিতে ইমেইল পাঠিয়েছে। সাথে নিজের অনার্সের সার্টিফিকেটও। এমনিতে ফাতেমার সিজিপিএ অনেক ভালো। তবে সমস্যা হচ্ছে এত বছরের গ্যাপ। তবে ভার্সিটির তরফ থেকে জানানো হয়েছে ব্যাপারটা বিবেচনা করে দেখা হবে। এই কথা শুনে ফাতেমা কিছুটা স্বস্তি পায়।

অতঃপর ফারিয়াকে স্কুল থেকে আনার জন্য বেরিয়ে যায়। ফারিয়াকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে দ্বিতীয় দফা অবাক হয়ে যায়। কারণ আজও সোহেল বাইরে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোহেলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফাতেমাকে ভীষণ রেগে যায়। সরাসরি তার সামনে গিয়ে বলে,
‘তুমি কি করছ এখানে? তোমাকে না আমি স্পষ্ট করে বলেছিলাম আমার বা আমার মেয়ের সাথে কোন যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। তাহলে কেন এসেছ তুমি এখানে?’

‘তোমার কথা শুনতে আমি বাধ্য নই। কারণ ফারিয়া শুধু তোমার একার মেয়ে নয়, ও আমারও মেয়ে। তাই ওর উপরে আমারও সমান অধিকার আছে।’

‘অধিকার! কোন অধিকারের কথা বলছ তুমি? নিজের মেয়েকে মাঝ রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দিয়ে এখন তুমি অধিকার দেখাতে এসেছ! যাও বলছি আমার সামনে থেকে।’

এমন সময় গাড়ি থেকে নেমে আসে নয়না। সে এসেই বলে,
‘ফারিয়া তোর একার মেয়ে নয়। ফারিয়া সোহেলেরও মেয়ে। আর তাই সোহেল এবার নিজের মেয়ের জন্য লড়াই করবে। সোহেল তো ঠিক করেছে এবার কোর্টে লড়াই হবে।’

‘কোর্টে লড়াই হবে মানে?’

‘মানেটা খুবই পরিস্কার। তোদের ডিভোর্সের কেসে ফারিয়ার কাস্টডি কে পাবে সেটা নিয়েও তো লড়াই হবে নাকি।’

ফাতেমা হতবাক হয়ে যায়। সে ভাবতেও পারে নি এমন কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে নয়না তো বলেইছিল যে, সে ফারিয়াকে নিজের চোখের সামনে দেখতে চায় না। তাহলে হঠাৎ করে এত বদলে গেল কেন সে?

ফাতেমা স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়,
‘আমার মেয়ে আমার কাছেই থাকবে। তোদের মতো জানোয়ারের কাছে আমি আমার মেয়েকে যেতে দেব না।’

নয়না কপট হেসে বলে,
‘ফারিয়া কার কাছে থাকবে সেই ফয়সালা তো কোর্ট করবে তুই না।’

ফাতেমা নয়নার দিকে আঙুল তুলে বলে,
‘তুই আমার স্বামীকে তো কেড়ে নিয়েছিস কিন্তু আমার সন্তানকে তুই আমার থেকে আলাদা করতে পারবি না। একজন মায়ের শক্তি কতোটা তুই জানিস না। একজন মা তার সন্তানের জন্য জীবনও দিতে পারে, এমনকি কারো জীবন নিতেও দুইবার ভাবে না। তাই বলছি আমার মেয়ের দিকে চোখ তুলে চাকাস না। নাহলে তোর চোখ আমি উপড়ে ফেলব।’

এই বলে ফাতেমা চলে যায়। কারণ ফারিয়ার স্কুলে ছুটির ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছে। এখনই তাকে আনতে যেতে হবে নাহলে দেরি হয়ে যাবে। ফাতেমা যাওয়ার পরই নয়না হিংস্র ভাবে তাকিয়ে বলে,
‘তোর যা যা প্রিয় সব আমি তোর থেকে আলাদা করে দেব ফাতেমা। তোর খুশি যে আমার সহ্য হয়না। ভেবেছিলাম সোহেলকে কেড়ে নিয়ে তোকে আমি ভেঙে গুড়িয়ে দেব কিন্তু তুই তো এখনো আগের মতোই আছিস। তাই এবার আমি এমন যায়গায় হাত দিয়েছি যেটা তোর কাছে সবথেকে দূর্বল। আমি জানি ফারিয়াকে তুই নিজের প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসিস। তাই এবার তোর মেয়ে ফারিয়াকে আমি তোর থেকে আলাদা করে দেব।’

১৬.
ফারিয়া স্কুল থেকে বেরিয়ে ফাতেমার কাছে দৌড়ে আসে। ফাতেমাও পরম মমতার সহিল আগলে নেয় নিজের মেয়েকে। ফারিয়াকে জড়িয়ে ধরে আবেগপ্রবণ হয়ে বলে,
‘আমার মেয়ে! আমার কলিজার টুকরা তুই। আমি তোকে কিছুতেই নিজের থেকে আলাদা হতে দেব না।’

ফাতেমার চোখে জল চলে আসে। এই মেয়ের জন্যই তো এখন সে বেঁচে আছে। অথচ ঐ শকুনিরা এখন তার মেয়ের দিকেও নজর দিয়েছে। ফারিয়া নিজের মায়ের চোখের জল বুঝতে পেরে বলে,
‘তুমি কাঁদছ কেন আম্মু?’

ফাতেমা মেয়ের কাছে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করতে চায় না। তাই তো চোখের জল মুছে বলে,
‘কই কাঁদছি? আচ্ছা ফারিয়া, তুমি তো আমার মেয়ে। তুমি তো সবসময় নিজের মায়ের কাছে থাকবে তাইনা?’

‘হ্যাঁ, মা। আমি সবসময় তোমার কাছেই থাকব।’

‘কেউ তোমাকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না কেউ না। ওরা কোর্টে যাবে তো যাক। দেখি কিভাবে আমার কাছ থেকে তোমাকে কেড়ে নেয়। এবার গোটা জগৎ দেখবে একজন মায়ের শক্তি।’

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨