#অন্তঃপুরে_দহন (পর্ব-১৭)
#আরশিয়া জান্নাত
ওমর কি হয়েছে বাবা তোর বলতো? কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকিস আজকাল! ভাত খেতে বসে কোথায় মন তোর? ডালের বাটিতে পানি ঢেলে দিলি, ভাজি পাতে না নিয়ে টেবিলে রাখলি। এমন অদ্ভুত কার্যক্রম কেন বাবা?
ওমর তাকিয়ে দেখলো সে আসলেই সব এলোমেলো করে ফেলেছে, সে কখনোই সবকিছু প্লেটে নিয়ে একসঙ্গে মেখে খায় না। কিন্তু এখন তার প্লেটে সব খিচুড়ী হয়ে গেছে। ওমর খানিকটা বিব্রতস্বরে বললো, কিছু হয় নি মা, অফিসে প্রেশার তো তাই মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। মনোযোগ দিতে পারছি না।
শামীমা ওমরের প্লেটটা নিয়ে ওকে নতুন করে ভাত বেড়ে দিলো। ওমর বললো, মা খাবো না আর। ভালো লাগছেনা খেতে। তুমি খেয়ে নাও।
তুই জানিস আমি একা খেতে পারিনা। এই ঘরে এখন কেবল তুই আছিস যার সঙ্গে বসে দুটো ভাত খাই। আমার জন্য হলেও একটু মুখে তুল না বাপ?
ওমর চুপচাপ চেয়ারে বসলো। শামীমা দেখছে তার ছেলে কেমন একটু পরপর পানি খেয়ে খাবারটা গলাধঃকরণ করছে। শামীমা ওকে থামিয়ে বললো, থাক তোকে কষ্ট করে খেতে হবেনা এমনিই বসে থাক। অনুর খবর নিয়েছিস? কেমন আছে? ঐখানে সব ঠিকঠাক তো?
হুম। চিন্তা করো না, ঐখানে সব ঠিক আছে।
আগামী সপ্তাহে তো যাবি তাই না?
হু। কেন?
আমার তো শহরের বাইরে যাওয়া হয়নি তেমন। পাহাড় দেখিনি কখনো, কত শখ ছিল সাগর দেখার। সুযোগই হলো না। তোর বাবা তো সব জায়গায় একা ঘুরেছে, আমায় নেয়নি কখনো। তাছাড়া তোদের পড়াশোনা, প্রাইভেট পালাক্রমে এই টেস্ট ঐ টেস্ট,,,, সবমিলিয়ে আর বেড়ানো হলো না। আগে ভাবতাম যখন তোরা বড় হবি পড়াশোনার পাট চুকে যাবে তখন সব জায়গায় ঘুরবো। হাহাহা ভুলেই গেছিলাম তখন আর ঘোরার বয়স থাকবেনা,
মা তুমি যাবে চট্টগ্রাম? ঐখানে সাগর পাহাড় সব আছে। তুমি বললে অফিস ছুটি নিবো,
না রে এখন না, গরমটা একটু কমুক তারপর। মেয়েটার জন্য বুকটা খালি লাগে, মেয়েটা একা দূরে পড়ে আছে। যাওয়ারো সাহস হয় না, বাসায় তো একজন নাকের ডগায় রাগ নিয়ে ঘুরছেন, সুযোগ পেলে বিস্ফোরণ ঘটাবে।
তুমি এখনো তাকে এত ভয় পাও? এতো অপরাধ করেও যার মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই তার রাগ কে মান্যি করছো?
৩০বছরের আনুগত্য, ভয়ডরের অভ্যাস এতো সহজে ছুটবে? এখন তো তাও একটু এড়িয়ে চলছি, এই সাহসও বুকে ছিল না। আমি তার করা সকল পাপ রবের জন্য জমা রেখেছি। আমি তার বিচারের অপেক্ষা করেছি। কিন্তু বুঝিনি তার পাপের শাস্তি আমার সন্তানের উপর পড়বে। যদি জানতাম আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতাম এই পাপীর থেকে আমার সন্তানদের রক্ষা করতে। আসলে আমারো দোষ আছে। তুই ছোটবেলায় ঠিক বলতি, অন্যায় করা এবং সহ্য করা সমান অপরাধ।।। আমার সহন করাটাও পাপ ছিল।
শামীমার চোখ ভিজে গেল। ওমর কিছু বললো না, এই প্রথম তার মা নিজের স্বামীর সম্পর্কে বলে কাঁদছে, হালকা হয়ে নিক না বেচারি। ওমর তার মায়ের কোলঘেষে হাত ধরে বসে রইলো। মনে মনে বললো, তোমার অপূর্ণ সব ইচ্ছা আমি পূরণ করবো মা, তুমি দেখো। আল্লাহ যেন আমায় সেই তৌফিক দান করেন।
।
।
অনীল বেশ আয়েশ করেই কোচে বসে আছে, তার সামনেই পারভীন বসা। দেখে বোঝা যাচ্ছে গত কয়েক রাত তার ঘুম হয় নি। খাওয়াও হয় নি বোধহয়। এই করুণ মুখটা দেখতে বেশ আরাম লাগছে তার। নিরবতা ভেঙে পারভীন বললো, রাফিকে কি করেছ তুমি? কোথায় ও?
অনীল রহস্যময়ী হাসি দিয়ে বললো, তোমার ভাইটা নিজেকে কি ভেবেছিল বলোতো? পাতিগুন্ডা ? নেতাজী? এই শহরে আমি কত বছর আছি জানো? ওর মতো জলজ্যান্ত ছেলে গুম করা আমার বা হাতের খেল। তোমাদেরকে আমি সর্বোচ্চ সুখ দিয়েছি, বিনিময়ে তোমরা কৃতজ্ঞ তো হলেই না বরং পিঠে ছোড়া বসালে। এখন ভুগো,,,,
পারভীন দৃঢ় কন্ঠে বললো, তুমি কি ভাবছো আমি কিছুই করতে পারবো না? তোমার নামে আমি কেইস করবো, যা যা করা লাগে সব করবো। আমার ভাইয়ের যদি কিছু হয় তোমার রক্ষা নেই,,
হাহাহা তা টাকা কড়ি আছে তো হাতে? এতো বড় লড়াই লড়বে খালি হাতে নেমো না যেন। আর শুনো কাল কিছু লোক তোমার ফ্ল্যাটে যাবে, উনারাই ওটার নিউ ঔনার। আর তোমার কার্ডটা আমি ডিজ্যাবল করে দিয়েছি। কোথায় যাবে কি করবে তা তোমার ইচ্ছা। পারলে আজ রাতের মধ্যেই বেরিয়ে যাবে।
পারভীন হতবিহ্বল চোখে চেয়ে বললো, তুমি কি ভাবছো এসব করলে আমি নেতিয়ে পড়বো? কিছু করতে পারবো না?
পারভীন রে পারভীন, বহুতদিন পর হাসাইলি, আমার মেয়েটার দিকে হাত বাড়ানোর আগে তোদের উচিত ছিল বোঝার সূর্যের দিকে তাকালে চোখ জ্বলসে যায়। এর শাস্তি তোদেরকে আমি এমনভাবে দিবো তোরা কল্পনাও করতে পারবি না। এই তো সবে শুরু। পুরনো অনীলকে ফিরিয়ে এনেছিস যখন ভোগ কর,,, আর শোন তোর ভাইয়ের প্রেমিকা আছে না কি যেন নাম? ও হ্যাঁ ফাহমিদা। মেয়েটার জন্য তোর ভাইয়ের জান যায় তাই না? তুই ও তো ওরে কত কি কিনে পাঠাইছোস, আহারে আমার টাকায় ফকিন্নির কত লীলাই না দেখলাম।
কি করেছ তুমি ফাহমিদাকে? ওর কি দোষ ওকে কেন টানছো?
অন্তরার যে দোষ ওরো সেই একই দোষ,,, ভালো হয়ছ গেছিলাম তোর সহ্য হয় নাই? এখন আর ভয় নাই আমার, সন্তানেরা তো জেনেই গেছে তাদের বাপ খারাপ। তো খারাপই। এখন আমি আমার খারাপের সর্বোচ্চটা দেখাবো।
নক্ষত্রেরো পতন হয়। এত অন্যায়ের ফল পাবে না ভাবছো? নিশ্চয়ই পাবে। এই কালে না হলেও পরকালে পাবে,,
মা*গী তোর বিষ এখনো কমেনাই তাই না? তোরে তো আমি এতো সহজে মারমুনা, তোর প্রতিটা প্রিয় মানুষের জীবন বরবাদ করমু। তোর চোখের সামনে সব হবে। এনজয়,,,,
পারভীন দৌড়ে বেড়িয়ে গেল। কোথায় যাবে সে কাকে বলবে তার ভাইকে খুঁজে দিতে? আর ফাহমিদাকে কি করেছে? ও বেঁচে আছে তো?
অনীল চোখের কোণ মুছে বলল, আমার মেয়েটা না জানি কোথায় আছে কেমন আছে, আমার আদরের মা টা এখন আমায় ঘৃণা করে, আমার মুখ পর্যন্ত দেখতে চায় না। কতদিন ওর মুখ দেখিনা, বাবা বলে ডাকে না,,,,, এই যন্ত্রণা কি জাহান্নামের চেয়ে কোনো অংশে কম? আমার জন্যই যখন এসব হয়েছে শেষটাও আমিই করবো। সবকয়টাকে কু*পিয়ে মারবো। একটাকেও ছাড়বো না,,,এতে আমার ফাঁসি হলেও দুঃখ থাকবে না।
অন্তরার ছবির দিকে তাকাতেই বুকটা ভার হয়ে যায় তার। আমার কলিজাটারে ভালো রাখিও মাবুদ। ওর জীবনটায় আমার প্রভাব আর দিও না। আমার পাপের শাস্তি আমারেই দিও। ওরে সুখী করিও।
।
তাইয়্যেবা স্কুল শেষে বেশ কিছুক্ষণ মাঠে বসে থাকে। ধীরে ধীরে হৈ হুল্লোড় থেমে পিনপতন নিরবতায় ছেয়ে যায় ক্যাম্পাস। একটু আগে যেখানে শান্তিতে বসা যায় নি সেখানেই এখন জনমানব নেই। তাইয়্যেবা উঠে দাঁড়ায়, এখান থেকে বের হয়ে সে ঘুরে বেড়ায় নীলক্ষেত, টিএসসি কিংবা এয়ারপোর্টের ওদিকের লেকটায়। জীবনটা তার কাছে এমনই এখন। একা একা উড়তে থাকা গাঙচিল। আশেপাশে কেউ রাখেনি যাকে, অপয়া বোঝা ভেবে সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাও ভেবেছিল সংসার হলে হয়তো সবটা বদলাবে, ওমর নিশ্চয়ই তাকে অনাদর করতো না? তারো একটা সুখী পরিবার হতো। কিন্তু উপরওয়ালার অন্য পরিকল্পনা ছিল। অনার্সে ভর্তি হবার পরপরই তার টেলিফোনে বিয়ে হয় জাবের নামক প্রবাসী ব্যবসায়ীর সাথে। কথা ছিল বছরের শেষে সে দেশে ফিরবে, তারপর তাইয়্যেবাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে রিয়াদে। মামার মুখের দিকে চেয়ে ওমরকে বিসর্জন দিয়েছিল বটে কিন্তু মন থেকে মুছতে পারেনি। তাছাড়া ওমর তখন মহাব্যস্ত তার ক্যারিয়ার নিয়ে। তাইয়্যেবার সাথে যোগাযোগ রাখেনি। তাছাড়া সেই মানুষটাকে কোন অধিকারে সে বলতো বিয়ে করে নাও আমায়। আমি তোমায় মন দিয়েছি, এই মন যে এখন অন্য কাউকে মেনে নিবে না। তবুও শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে তাইয়্যেবা গিয়েছিল কিন্তু ওমর তখন ঢাকার বাইরে ট্রেনিং নিচ্ছিল।
ভাগ্যে নেই ভেবে বুকে পাথর বেঁধে কবুল বলেছিল ঠিকই কিন্তু সংসার আর করতে পারেনি। কি জানি কি ঘটেছিল জাবেবের মনে। সংসারটা তাসের ঘরের মতোই ভেঙে গেল, কারণটা পর্যন্ত জানা গেল না। দেশে ফিরে জাবের দেখা করার আগেই ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিলো। তারপর সারা এলাকায় কত কলঙ্ক রটলো, মামী তাকে কত হেনস্থাই না করেছিল। আশেপাশের লোকের কথা বাদ ঘরের লোকের টিপ্পনীতেই আর বাঁচা যাচ্ছিল না।
তাই তো মামার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। এই পৃথিবীতে তার কেউ নেই, কেউ না। যাদের বাবা-মা থাকে না তাদের আর কেউ থাকে না।
মাঝেমধ্যে তার জিজ্ঞাসা করতে মন চায়, কেন এই নাটক হলো? কেন বহু মাইল দূরে বসে টেলিফোনে বিয়ে হলো? কেনই বা বিয়ে ভাঙলো? মাঝে ডিভোর্সী খেতাব জুড়ে দিলো মাথায়। কেন হলো এমন? কোন অপরাধের শাস্তি এটা? এই অলিখিত দন্ড কতদিন পাবে সে?
এই ছোট্ট জীবনে সুখপাখি কি আর আসবে না??
চলবে,,,
#অন্তঃপুরে_দহন (পর্ব-১৮)
#আরশিয়া_জান্নাত
অফিসার মিজান ওমরকে বললো, জানি না এটাকে কি নিউজ বলবো। গুড নাকি ব্যাড!
ওমর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মিজান নিজেই বললো, অন্তরার রেইপ কেইসের ছয়জন আসামীর মধ্যে চারজন, সাজু,পাপ্পু,কাদের ও বশির নৃ*শং*স*ভাবে হত্যা হয়েছে। তাদের বডি এতোটাই জঘন্যভাবে জখম করা হয়েছে যে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি। বিশেষ করে তাদের হাত দুটো,,,,,,
ওমর খানিকটা অবাক হয়ে বললো, এর পেছনে কারণ হিসেবে কিছু কি পেলেন?
— আসলে ওরা হচ্ছে এলাকার বখাটে শ্রেণীর। মাঝে মধ্যে চুরি ছিনতাই করে। তবে গুরুতর অপরাধ বলতে এই কেইসটাই। জানি না এটা কি বড় কারো চাল নাকী কেবলই কাকতালীয়। তবে ব্যাপারটা খুবই সন্দেহজনক।
— বাকী ২আসামীর কোনো খোঁজ পেলেন?
— ওরা তো পলায়িত। আমাদের সব থানায় এদের ছবি পাঠানো হয়েছে। খবর পেলে জানাবে নিশ্চয়ই। তা মিস অন্তরা ভালো আছে তো?
— জ্বী ভালো আছে।
— একটা কথা না বললেই নয় সে খুব লাকী আপনার মতো ভাই পেয়ে। আমাদের অনেক সহযোগীতা করেছেন আপনি। আর আমি খুবই দুঃখিত প্রথমদিনের জন্য।
— আমারও একটু সংযত হওয়া উচিত ছিল। তবে অফিসার ঐ রাফি আর আজমকে ফাঁসির দড়িতে না ঝুলানো পর্যন্ত আমার মন শান্ত হবেনা।
— We’re trying our best.. Don’t worry..
ওমর কিছুক্ষণ পায়চারি করলো। অফিসারের কথা শুনে তার মনে একটা তীব্র সন্দেহ দানা বেঁধেছি। রাফি আর অন্যান্য আসামীদের শনাক্ত করার পর কত ঝড়টাই না উঠেছিল। রাফির পরিচয় পাওয়া আর উদ্দেশ্য জানতে পারাটা ছিল তার পরিবারের সবার সামনে উন্মোচিত হওয়া এক কঠিন বাস্তবতা। সেই ঝড়ে অনেক কিছু বদলে গেছে। গত কয়েকমাসে এত বড় বড় ঝড় সয়ে তারা বড়ই ক্লান্ত। এখন আবার নতুন ঝড় আসছে না তো?
।
।
আজকাল গরম এমনভাবে দগ্ধ করছে বোঝার সাধ্যি নেই এটা কোন কাল! বৃষ্টি হবে হবে করেও হয়না। তাপও কমে না। আবার আকাশে সাদা মেঘ চকচকে নীল আকাশ! এ যেনো একাধিক ঋতুর মিশ্রণ।
তাইয়্যেবা ছাতা মাথায় করে সবজি দরদাম করছে। দ্রব্যমূল্যের যে আগুন লেগেছে তা তো এই রোদের চেয়ে ঢের বেশি। ৫০০ টাকা দিয়ে আগে তার অনায়াসে সপ্তাহ চলে যেতো আর এখন ২ দিন যাওয়াও বেশ শক্ত। তাইয়্যেবা একলা একটি প্রাণ তাও হিমশিম খায় না জানি অন্যদের কী হাল। দর কষাকষি শেষে কয়েক পদের কাঁচা সবজি আর লাল শাক নিয়ে হাঁটা ধরলো বাসার উদ্দেশ্যে।
পথিমধ্যে ইরার সাথে তার দেখা, ইরা তার কলেজের ব্যাচম্যাট ছিল। অন্য সবার মতো সেও জানতো তাইয়্যেবার প্রবাসীর সাথে বিয়ে হয়ে গেছে। তাই হাস্সৌজ্জ্বল মুখে বললো, এই তাইয়্যেবা বিদেশীর বৌ এতো বাজারসদাই একাই বয়ে নিচ্ছিস যে? দুলাভাই কী এখনো বিদেশেই? এমন হাড়কিপ্টে,বৌকে দিয়ে বাজার করায়?
তাইয়্যেবা হেসে বললো, ঢাকা শহরে বাস করে এমন অদ্ভুত কথা বলছিস কী করে? দেশী বর হলেও তো বাজার তো বউদেরই করতে হয়!
ইরা টিপ্পনী কেটে বললো, কী জানি ভাই আমার উনি তো বাজার করতে দেয় না। ঐসব কাজ শ্বশুরই করে। তা বাচ্চা নিস নি? কয় জন হলো?
তাইয়্যেবা ভদ্রতার হাসি দিয়ে বললো, সংসারই তো হলো না বাচ্চা আসবে কোত্থেকে। হলে অবশ্যই তোকে জানাবো।
ইরা চমকে বললো, এই দাঁড়া দাঁড়া। সংসার হয়নি মানে? তোর না টেলিফোনে,,,,,
তাইয়্যেবা তাকে থামিয়ে বললো, হ্যাঁ হয়েছিলো কিন্তু দেশে ফেরার পর সে ডিভোর্স দিয়েছে।
— কেনো?
— জানি না। দেখা হয়নি, জিজ্ঞাসাও করতে পারিনি।
ইরা লজ্জিত হয়ে বললো, দোস্ত সরি। বিশ্বাস কর আমি এসব কিছুই জানতাম না। তুই একই শহরে থেকেও ভুলেও যোগাযোগ করিস নি, আমি যতবার তোকে নক করেছি এড়িয়ে গেছিস। তাই অনেক রাগ ছিল তোর প্রতি। সেটারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। মাফ করে দে বোন।
— আরে ধুর কী যে বলিস। আমি কিছু মনে করি নি।
— সত্যি?
— হুম সত্যি।
— বিশ্বাস করবো যদি তুই এখন আমার সাথে ফুচকা খেতে রাজী হোস।
— এসব হাতে নিয়ে ফুচকা?
— এটা কোনো ব্যাপার হলো? চল তো।
বহুদিন পর পুরোনো সাথীকে পেয়ে ইরাও দুনিয়ার গল্প খুলে বসলো। তাইয়্যেবাও সুখদুঃখ বলার একজনকে পেয়ে বুক হালকা করলো। কেউকে তো অন্তত পেয়েছে এসব বলার। এই পৃথিবীতে তার কাছের মানুষের যে বড্ড অভাব। যারা ছিল তাদের সে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখেনি। কী যেনো এক চাপা অভিমান কিংবা গুটিয়ে রাখার প্রয়াস! তবে আজ কেনো বলে ফেললো ইরাকে? সে তো কাউকে জানাতে চায় না কত নিঃসঙ্গ যন্ত্রণাময় জীবন বয়ে চলছে….
_________________
একটা নিস্তব্ধ রাত, চারদিকে ঝি ঝি পোকার শব্দ। দূরে কোথাও দু একটা কুকুরের ডাক ব্যতিত কোনো অস্থিরতা নেই। সবকিছুই শান্ত, সবাই হয়তো আরামের ঘুম ঘুমাচ্ছে। কিছু মানুষ এই আধারেই বিষন্ন মন খারাপের প্রহর গুনছে, কেউবা প্রিয়জনের সাথে বাক্যালাপে ব্যস্ত। অনলাইনের যুগে শহুরে কেউই রাত ১২টায় ঘুমোয় না। অন্তরা নিজেও কত রাত জেগে গ্রুপের আড্ডায় বিজি ছিল। কখনো বা কেডিতে ডুবেছে। এখনো সে ঘুমাতে পারে না, দিনে তাও বাচ্চাদের মাঝে থাকে, অফিশিয়াল নানান কাজে ব্যস্ত সময় কাটে, কিন্তু রাত তার কাছে বিভীষিকাময়। আজকাল স্লিপিং পিলেও কাজ দেয় না। সাইক্রিয়ার্টিস্টের পরামর্শে অন্তরা মেডিটেশন করছে, একটা সেশনও শুরু করেছে সপ্তাহখানেক হলো। জীবনটায় তবুও যেন এতোটুকু শান্তি নেই। চার পাঁচজন ছেলে একত্রিত হতে দেখলেই আত্মা কেঁপে উঠে, সিএনজিতে ওঠা তো অসম্ভব। সিএনজি দেখলেও সেদিনের কথা তীব্রভাবে নাড়া দেয়। এইসব বিস্মৃতি হয় না কেন? কেন ভুলে না এটি মুহূর্তও? পাখি আরোহী তাকে মোটিভেট করতে এই রিলেটেড কত মুভি সাজেস্ট করে। কত মেয়েই তো সব হারিয়ে ফের শুরু করেছে, জীবনের যুদ্ধ একা লড়েছে। তবে সে কেন পারে না? সে কেন এমন ধুমড়ে মুচড়ে যায়? সে এতো দূর্বল কেন?
অন্তরার চাপা কান্নার শব্দে মনসুরার ঘুম ভেঙে যায়। সে ঠিকই টের পায় মেয়েটা বালিশে মুখ চেপে কান্নার শব্দ লুকায় পাছে তার ঘুম না ভাঙুক। মনসুরা এই পরিবারের সঙ্গে ১৭বছর আছে। এক প্রকার মায়াই বসে গেছে ছেলেমেয়ে দুটোর প্রতি। তাই এদের কষ্ট তার বুকে নিজ সন্তানের কষ্টের মতোই বিঁধে। মনসুরা জানেনা কিভাবে এই অভাগীর দুঃখমোচন হবে, অন্ধকারে শুয়েই হাত তুলে ফরিয়াদ করে, হে পরওয়ারদিগার, অন্তরা মার দুঃখ দূর কইরা দাও। তুমি পারো না এমন কোনো কাজ নাই। ওর মন থেইকা ঐ দিনটা মুইছা দাও মাবূদ। ওর দুচোখে শান্তির ঘুম দাও, মন শক্ত করো, গরীবের দোআ কবুল করো আল্লাহ,,,,
বলতে বলতেই দুচোখ ভিজে আসে তার।
পরদিন সকালে অন্তরার নামে একটা চিঠি আসে। অন্তরা প্রথমে অবাক হলেও প্রেরকের নাম দেখে চিঠিটা গ্রহণ করে। তারপর বেলকনীর ইজি চেয়ারে বসে চিঠিটা পাশের ছোট্ট টুলে রেখে চোখবন্ধ করে দুলতে থাকে।
চিঠির খামে চিরচেনা হাতের লেখায় তার বাবার নাম লেখা। অন্তরা মনের মাঝে মিশ্র অনুভূতি নিয়ে দ্বিধায় ভুগে চিঠি খুলে পড়বে কি পড়বে না। কেন সে হঠাৎ চিঠি পাঠালো? কি লেখা এই চিঠিতে?
চলবে,,,,,