#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-১০
তাখলিফের মনে কি যেন একটা অনুভূতি, বুকের ভেতর অন্যরকম দোনা মোনা… কাকে বোঝাবে সে? এমন একটা মানুষ বলতে তো ওর কেউ নেই, গোলগাল চেহারার সদ্য তরুণীতে পা দেওয়া ঝুমুরটার কাছেই দিনশেষে ও ঠেকা!
’
পরদিন খুব সকালে পাখি বেগম রান্নাঘরে এসে চমকে যান। হলুদ পাড়ের কমলা রঙের একটি শাড়ি পরে প্রমিলাকে রান্নায় সাহায্য করছে তুসি। মাথায় ঘোমটা দেওয়া, একটু পরপর সেটা পড়ে যাচ্ছে আর বারবার সেটা টেনে ঠিক করছে। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে হাঁটু অবধি লম্বা ভেজা চুল দেখে বিষম খেলেন পাখি বেগম। মেয়েটার চোখেমুখে স্নিগ্ধ একটা ভাব, ঠোঁটের কোণে হাসি। পাখি বেগম কোণা চোখে তাকিয়ে রইলেন ওর প্রতি। নাহ! গায়ের রঙ চাপা হলেও লম্বায়, চেহারাসুরতে ততোটা পিছিয়ে নেই। এই মেয়ের গায়ের রঙ ফর্সা হলে চোখ ধাঁধানো সুন্দরী হতো তা নিশ্চিত। পাখি বেগম বাস্তবে ফিরে এলেন। এসব কি ভাবছে সে? নাহ! কিছুতেই তিনি এই মেয়েকে মেনে নেবেন না। ফুঁসলিয়ে তার কোটিতে একজন সুন্দর ছেলেকে বিয়ে করেছে এই মেয়ে। এত সহজে ক্ষমা করবেন না তিনি। তুসি আচমকা পেছনে ফিরে তাকে দেখে চমকে ওঠে। মুখের হাসি মিলিয়ে যায় ওর৷ মিনমিন করে বলে, “আসসালামু আলাইকুম আন্টি।”
নাহ! মেয়ের আদব আছে। কিন্তু তাতে কি? পাখি বেগম একমনে প্রশংসা করে অন্যমনে খুঁত খুঁজতে থাকেন। মুখ কালো করে সালামের উত্তর না দিয়ে প্রমিলাকে রাগী সুরে বলেন, “দেখি সর! কি রান্না করিস? মাছ সব তো পুড়িয়ে ফেললি!”
প্রমিলা বলেন, “কই পুড়লো ভাবি! এটা তো ভাজা হচ্ছে।”
পাখি বেগম উত্তর দেন না আর। খুন্তি হাতে মাছ উলটে দিতে থাকেন। তার রাগের উত্তাপ প্রমিলা, তুসি দু’জনেই বুঝতে পারেন। তুসির চোখ ছলছল করতে থাকে। এরপর শাড়ির কোণা দিয়ে চোখ মুছে বলে,
“আপনি আমার সালামের উত্তর দেন নি আন্টি…”
পাখি বেগমের খ্যাঁকিয়ে ওঠেন, “প্রমিলা ওরে ক, আমার সাথে যাতে এমনে কথা না কয়। ছেলের জন্য শুধু ওরে জায়গা দিয়েছি তাই আমার থেকে যাতে দূরে থাকে! বেহায়া মেয়ে…”
প্রমিলা তাকে বুঝাতে গেলে পাখি বেগম আরও রেগে যায়। তুসির গাল বেয়ে পানি ঝরে পড়ে। ও একদৌড়ে ঘরে চলে যায়। কাঁদতে থাকে। কান্নার শব্দ আর হেঁচকি শুনে ইয়াসিফের ঘুম ভেঙে যায়। তুসিকে কাঁদতে দেখে ধরফড়িয়ে ওঠে বসে। ঘড়িতে মাত্র ছ’টা বাজে। এত সকালে ওঠে শাড়ি-চুড়ি পরে নববধূ তার শিয়রে বসে কাঁদছে ব্যাপারটা কেমন আশ্চর্যজনক! ইয়াসিফ ওকে বুকে টেনে নেয়৷ মাথায় হাত বুলিয়ে নরম সুরে কারণ জানতে চায়। তুসি উত্তর না দিয়ে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদতেই থাকে। ইয়াসিফ এবার রেগে জিজ্ঞেস করে, “গ্র্যাজুয়েশন শেষ করবি ক’দিন পর! এত বড় ধেড়ে মেয়ে কিভাবে একটা বাচ্চার মতো সারাদিন কাঁদতে পারে তোকে না দেখলে বুঝতাম না৷ বয়সে বুড়ি, স্বভাবে তিন বছরের শিশু। কি যে করি তোকে নিয়ে! বল তো কি হয়েছে? কে কি বলেছে? কত সাহস! আমার টমেটোকে কাঁদায়, থাপড়ে দাঁত ফেলে দেবো তার!”
তুসি ওকে ওমন রাগতে দেখে ঘাবড়ে যায়। মাকে থাপড়ে দাঁত ফেলে দেবে নাকি এই ছেলে? ভয়ানক কান্ড হবে তখন। ও কান্না থামিয়ে বলে, “বাসার কথা মনে পড়ছিলো।”
ইয়াসিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“এইজন্য কেঁদে কেঁদে আমার ঘুম নষ্ট করবি তুই? এমনিতেই কাল রাতে একটুও ঘুমাতে পারিনি তোর যন্ত্রণায়।”
তুসি জ্বলে ওঠে, “আমার জন্য? আমি কি করেছি? সব দোষ এখন আমার? তুই নিজেই নির্লজ্জের মতো কাছে…”
“বল বল, থামলি কেন…”
ইয়াসিফ গালে হাত দিয়ে আগ্রহী গলায় জানতে চায়। ঠোঁটে তার বাঁকা হাসি। তুসি থতমত খেয়ে ওর বুকে কিল-ঘুষি মেরে দূরে সরতে গেলেই ইয়াসিফ জাপ্টে ধরে ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলে, “অত
লজ্জা পাস কেন? লজ্জার কি আছে, তুই তো আমার বউ! তোর টমেটো গালটা দেখলেই চুমু চুমু জাগে। কাছে আয় তো, ভোরের আদরটা করে দিই…”
তুসির কান গরম হয়ে গেলো। লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করলো। পালাতে চাইলেও লাভ হলো না। ইয়াসিফ ওকে ধরে ফেললো! তুসি নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও কোনোমতেঅ জয়ী হলো না৷ ততক্ষণে ইয়াসিফের উত্তপ্ত চুমুতে বুকের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ওর! এই ছেলের অনুভূতি জাগ্রত হলে একদম সবকিছু ভুলে যায়। ভালোবাসা আর আদরের সংমিশ্রণে তৈরি এই পবিত্র অনুভূতি অদ্ভুত সুখকর লাগে! কমলা রঙের শাড়িটির আঁচল অবহেলিত ভাবে পরে থাকে বিছানার একপাশে। ইয়াসিফ ওর দু’চোখের পাতায় চুমু খেয়ে বলে, “কাঁদবি না, একদম না।”
_______________
ভার্সিটিতে আজ জাঁকজমক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। সকল কপোত-কপোতী, প্রেমিক-প্রেমিকারা একসাথে ঘুরছে, সময় কাটাচ্ছে। দেখতে খুবই ভালো লাগছে ঝুমুরের। সবাই তাদের পছন্দের মানুষ নিয়ে কি সুখী! আর সে? ইহজীবনে বোধহয় তাখলিফের সাথে এভাবে সময় কাটানো হবে না ওর। ঝুমুর দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তাখলিফকে সে ভীষণ মিস করতে লাগলো। শেষমেশ নিজেকে দমাতে না পেতে ফোন বের করে ম্যাসেজে লিখলো, “কেন যে আমাকে স্বীকার করেন না, আমার খুব আফসোস হয়! একদিন হঠাৎ মরে গেলে দেখবেন আপনিও খুব আফসোস করবেন। হুহ!”
ম্যাসেজটা সেন্ড করে ভাবলেশহীন হয়ে এদিকওদিক হাঁটাহাঁটি করতে লাগলো ঝুমুর। তাখলিফ নিশ্চয়ই ওর ম্যাসেজ দেখবে, কিন্তু তাতে হেলদোল হবে না ওর।
এত পাষাণ! ঝুমুরের মনটা যে কেন ওর মতো শক্ত হতে পারলো না। পরক্ষণেই মনে হলো, ও নিজে এত পাষাণ হলে এই পাষণ্ড লোকটাকে ভালোবাসতো কে তাহলে!
_____________
তাখলিফ ঝুমুরের ম্যাসেজ পেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। এই মেয়ের কি মাথা খারাপ? এসব কি লিখেছে? তাখলিফের ইচ্ছে করলো ঠাটিয়ে এক চড় মেরে ওর ভিমরতি ছাড়িয়ে দিতে। বয়স কত ওর? ১৮/১৯! এখনি মরার কথা বলে, পেয়েছেটা কি এই মেয়ে? মৃত্যু কি এত সহজ? না নয়। এই যে তাখলিফ একটা মৃত মানুষ, তবুও জীবন্ত পুতুল হয়ে বেঁচে আছে সে। কার জন্য? বাবার জন্য! তাহলে এই ঝুমুর এত অবলীলায় মরার কথা কীভাবে বলে? তাখলিফই তো ওর সব নয়, আস্ত একটা পরিবার আছে ওর। সবচেয়ে বড় কথা বাবা-মা আছে৷ তাহলে এই ঠুনকো তাখলিফের বিরহে কেন সে মরে যাওয়ার কথা বলে? ওর বিরক্ত লাগলো সবকিছু। কফির মগটা মেঝেতে ছুঁড়ে মারলো। কাচ ছড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। শব্দ শুনে পিয়ন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। মেঝেতে ভাঙা কফির মগ দেখে বলল, “কি হইসে স্যার? কোনো অসুবিধা?”
তাখলিফ দু’হাতে মাথা চেপে ধরলো। কি করলো এটা সে? ও নিজেকে সামলে এরপর বলল, “না কিছুনা। ফ্লোরটা পরিষ্কার করে ফেলুন।”
পিয়ন মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো ফ্লোর পরিষ্কার করে। তাখলিফ কাজে মনোযোগ দিতে পারলো না। কেন যে ঝুমুরটা এমন করে, ওর সব শূন্য লাগে। লাঞ্চ আওয়ারে কি ভেবে চলে এলো ঝুমুরের ভার্সিটিতে। সকালে দেখেছে এই মেয়ে সেজেগুজে ভার্সিটি এসেছে। ক্যাম্পাসে কি একটা উৎসব চলছে, খাবারের স্টল বসেছে অনেকগুলো। তাখলিফ এদিকওদিক কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করে একসময় ফিরে আসতে যাবে তখনি পেছন থেকে কে ওর শার্ট টেনে ধরলো। বিচলিত হয়ে ফিরতেই ঝুমুরকে দেখতে পায়। রোদে ঘুরাঘুরি করে রক্তিমবর্ণ ধারণ করেছে মুখ! তাখলিফ ধমক দিয়ে বলে, “শার্ট ছাড়! এভাবে ধরবি না।”
“ধরবো। আপনি এখানে এসেছেন কেন?”
তাখলিফ বিব্রত কণ্ঠে বলল,
“তোকে কৈফিয়ত দেবো কেন? আর তুই এখনো বাড়ি ফিরিসনি? ভার্সিটিতে ওঠে বেশ ডানা গজিয়েছে দেখছি। আবার সাজগোজও করেছিস! বাহ!”
ঝুমুর মুখভার করে বলল, “একটুই তো সেজেছি। এভাবে বলার কি আছে? আপনি সবসময় এমন। আমাকে কি ভালো দেখাচ্ছে না?”
তাখলিফ অস্বস্তিবোধ করে। কিভাবে বলবে এই মেয়েকে দেখে বুকের ভেতর সূক্ষ্ম এক অনুভূতি খোঁচা দিচ্ছে৷ ও প্রসঙ্গ পালটে জিজ্ঞেস করে, “কিছু খেয়েছিস?”
ঝুমুর মাথা নাড়ায়। একটু আগেই বান্ধবীদের সাথে সে ফুচকা, ঝালমুড়ি খেয়েছে। তবে এই লোককে তা বলা যাবে না৷ রাস্তাঘাটে তাখলিফের সাথে এভাবে দেখা হলে ভালোবাসুক আর না বাসুক এই লোক ঠিকই ওর খাওয়াদাওয়ার খোঁজ নেয়। মানুষটার সঙ্গ পাওয়া যাবে ভেবে ও মিথ্যে বললো। তাখলিফ ওর হাত শক্ত করে চেপে ধরে হাঁটতে থাকে। ঝুমুর ওর এই আচরণে পুরোপুরি শকড হয়ে যায়৷ তাখলিফ সত্যিই ওর হাত ধরেছে? এ যে অবিশ্বাস্য কান্ড!
তাখলিফ ওকে কাছাকাছি একটা রেস্তোরাঁতে নিয়ে আসে৷ খাবার খেতে খেতে আড়চোখে দু’বার ঝুমুরের দিকে তাকায়। তবে দুর্ভাগ্যবশত দু’বারই সে ধরা পড়ে যায়। চোখাচোখি হতেই ও অস্বস্তিবোধ করে। মাথা নামিয়ে নেয়। তাখলিফ এসবে মাথা না ঘামিয়ে খাওয়া শেষ করলো। বিল পে করে বেরিয়ে করে রেস্তোরাঁ থেকে বেরুতেই ঝুমুর ওকে জিজ্ঞেস করে, “আজ আপনার শরীরটা ঠিক আছে তো?”
তাখলিফ ওর কটুক্তি শুনে কপালে ভাঁজ ফেলে। রুক্ষ গলায় বলে, “আমি একদম ঠিক আছি। দেখ ঝুমু, তুই এত জ্বালাস না আমায়। ইদানীং বেশি বেশি করছিস! আগের চেয়ে বেশি চালাকি করছিস। তখন কেন ওমন একটা ম্যাসেজ করলি? আর কখনো এসব বেয়াদবি দেখলে সোজা ব্লকলিস্টে পাঠাবো। মাইন্ড ইট!”
ঝুমুর অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
“বোকা ঝুমুরকেও ভালো লাগে না আবার চালাক ঝুমুরকেও পছন্দ করেন না। ঠিক কি চানটা আপনি? বলে ফেলুন তো!”
তাখলিফ ওকে বোঝাতে চাইলো,
“আমি চাই তুই আমাকে নিয়ে মাথা না ঘামা। একটা ইন্সিডেন্টকে কেন্দ্র করে তুই তোর লাইফটা ঘেঁটে ‘ঘ’ করে দিস আমি তা চাই না। এভাবে আমার পেছনে লেগে না থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন কর, আমার মতো। আমি সেটাই চাই।”
ঝুমুর কেঁদে ফেললো,
“আপনি চান, সব আপনিই চান৷ আর আমার চাওয়া-পাওয়া নেই? আমি কি মানুষ না? বিয়ে-সম্পর্ক পুরোপুরি বোঝার আগেই আমার সাথে আপনার
বিয়ে হয়ে গেলো। যেভাবেই হোক, হয়েছে তো! আগে আপনাকে আমি অন্যভাইদের মতোই দেখতাম, তখন এত কষ্ট হতো না৷ কিন্তু ওই যে, বিয়ে হয়ে গেলো আমাদের৷ এরপর থেকে আপনাকে ছাড়া কিচ্ছু ভাবতে পারি না আমি। সবকিছু পালটে গেছে, আপনার জন্য আমি খুব কষ্ট পাই। আমার মন পুড়ে সবসময় আপনার জন্য, খুব খুব ভালোবাসি আপনাকে….”
তাখলিফ কতদিন পর দেখলো! মায়ের পর এই রমণীই বোধহয় প্রথম যে ওর জন্য এভাবে হাউমাউ করে কাঁদছে। আবেগের কি অদ্ভুত বহিঃপ্রকাশ! ও পকেট থেকে টিস্যু বের করে কান্নায় হুঁশহারা ঝুমুরের নাক মুছে দিয়ে বলল, “বড় হচ্ছিস না গাধা হচ্ছিস? নাকের সর্দি মুছ! দেখি এদিকে আয় হাঁদারাম…”
ঝুমুর বাধ্য মেয়ের মতো ওর কথা শুনলো। রাস্তার মানুষগুলো হা হয়ে ওদেরকে দেখছে। এতবড় মেয়ের নাকের সর্দি মুছে দিচ্ছে কিনা রাস্তায় দাঁড়িয়ে! ঝুমুরের যখন সম্বিত ফিরে এলো তখন লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেললো। তাখলিফ রিকশা ঠিক করতেই ঝুমুর নম্র স্বরে বলল, “আমার মাথাটা ঘুরছে। আপনি কি যাবেন আমার সাথে?”
তাখলিফ চিন্তিত হয়ে পড়ে,
“সে কি! মাথা ঘুরছে কেন?”
ঝুমুর অসুস্থতার ভান করে শুকনো মুখে বলল,
“জানি না, তখন রোদে ঘুরলাম না? মাথাটা কেমন
চক্কর দিচ্ছে। আচ্ছা থাক, আপনি অফিসে যান। আমি একাই যেতে পারবো।”
তাখলিফ এক মুহূর্ত সময় নিয়ে বিরক্তি হয়ে বলল, “চল। কোথায় আবার অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে যাবি। পরে আরেক ঝামেলা। আমার কাছে এলেই একটা না একটা ঝামেলা নিয়ে আসিস…”
বিড়বিড় করে বলে ঝুমুরকে নিয়ে রিকশায় ওঠে বসলো। রিকশা চলতে শুরু করলে ঝুমুর হঠাৎ ওর কাঁধে মাথা রেখে চোখদুটো নিভু নিভু করে বলল, “আমাকে একটু ধরে বসুন তো, কেমন যে লাগছে! মনে হচ্ছে পড়ে যাবো…”
তাখলিফ বুঝতে পারে না কোথায় হাত রেখে ধরে বসবে। ঝুমুরই টেনে নিয়ে ওর কোমড়ে হাত রাখলো। তাখলিফ চমকে ওঠে বিব্রত হয়, গলা শুকিয়ে আসে। ঝুমুরের গা থেকে মিষ্টি একটা সুগন্ধে তাখলিফের ঘ্রাণেন্দ্রিয় ঝাঁঝিয়ে ওঠে। উফ, গরম লাগছে কেন এত! ও নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে। আড়ষ্টতা জেঁকে ধরেছে ওকে। ঝুমুর ওর কাঁধে মাথা রেখে নিঃশব্দে হেসে ফেলে। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ঝুমুর রিকশা থামিয়ে নেমে পড়ে। তাখলিফ হতভম্ব!
“তোর না শরীর খারাপ? এখানে নেমে পড়েছিস কেন? আরেকটু সামনে গেলেই তো বাড়ি…”
ঝুমুর কৃতজ্ঞতাসূচক হেসে বলল,
“এখন সুস্থবোধ করছি। আপনি যেভাবে সামলালেন আমায়! থ্যাংক্স ফর ইউ’র ট্রিটমেন্ট। বাই… ”
বলে ঝুমুর সেখান থেকে চলে আসে। তাখলিফ
বিষয়টা বুঝতে পেরে হতবিহ্বল হয়ে যায়। অফিসে
ফিরে পুরো কক্ষে শুধু পায়চারি করতে থাকে। এই যে ঝুমুরটা এতসব করছে ওর কাছে আসার জন্য, নিজেকে সামলাতে এত কেন কষ্ট হচ্ছে?
শেষ বিকেলে ঝুমুর যখন শুকনো কাপড় আনতে যখন ছাদে যায় তখন কে যেন ওকে হাত ধরে টেনে দরজাবিহীন স্টোর রুমে নিয়ে যায়। ঝুমুর খানিকটা ভয় পেয়ে যায়। তবে যখন বুঝতে পারে এটা তাখলিফ তখন ওর বিস্ময়ের সীমা রইলো না। ওকে দেয়ালে ঠেসে দাঁড় করিয়ে তাখলিফ ওর সাজগোজ হীন মুখপানে দৃষ্টি দেয়। গোধূলির রঙিন আলোতে ঝুমুরও দেখে ওকে, অফিস ফেরত লোকটির মুখপানে ক্লান্তি! তবুও কি স্নিগ্ধ লাগছে, কপালের কাছে ছোট্ট কাটা দাগটাকে ছুঁয়ে দিতো ইচ্ছে করলো ওর। তাখলিফ কিছুক্ষণ ওভাবে থেকে এরপর বিদ্রুপাত্মক কন্ঠে বলে, “আগের সেই বোকা ঝুমুর তুই একদম নেই।
এত এ্যাডভান্স? কার জন্য হয়েছিস? আমার জন্য?”
ঝুমুর অবাক হয়ে বলল, “আমি আবার কি করলাম? অফিস থেকে ফিরে আজ হঠাৎ আমার পেছনে লাগলেন কেন?”
তাখলিফ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“তখনকার নাটকের স্ক্রিপ্ট দুর্বল ছিলো।”
জঝুমুর থতমত খায়। উফ, মাথা ঘোরার ব্যাপারটা
এই লোক বুঝে গেছে। ও তাও বলে, “আমি তো তেমন কিছুই করিনি।”
তাখলিফ তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে, “এসব কাজ নাটক ফাটক
আমি বরদাস্ত করবো না। তবুও প্রথমবার বলে ক্ষমা করে দিলাম।”
ঝুমুর ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে বলে,
“ক্ষমা লাগবেনা। কি শাস্তি দিতে চান সেটাই বলুন। ভুল যখন করেছি, শাস্তি কেন মওকুফ করে দিবেন? দিন, শাস্তি দিন।”
ঝুমুরকে এগিয়ে আসতে দেখে তাখলিফ পিছু সরে যায়। উফ! এই আবেগে জর্জরিত মেয়েটাকে ধমকাতে এনে নিজেই ফেঁসে গেছে। কেন যে এমন ভুল হয়!
“বলুন কি শাস্তি…”
বলে ঝুমুর ওর চোখের দিকে তাকায়। তাখলিফ অস্বস্তি নিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলে। এই বাচ্চা মেয়েকে ভয় পাচ্ছে কেন সে? ও দৃঢ় গলায় বলে, “দূরে থাকবি আমার থেকে।”
“আপনার কি ছোঁয়াছে রোগ হয়েছে যে দূরে থাকতে বলছেন?”
তাখলিফ বিরক্তি নিয়ে বলে,
“বুঝেও না বোঝার ভান করিস না। দূরে মানে দূরে।
আমার মনের থেকে যোজন মেইল দূরে থাকবি।”
“কেন? আপনি ভয় পাচ্ছেন নাকি?”
তাখলিফ ভ্রু কুঁচকে বলে,
“তোকে আমি ভয় পাবো?”
“পাচ্ছেনই তো। আমাকে ভালোবেসে ফেলার ভয়।”
তাখলিফ ভেতরে চমকে গেলেও ওপরে স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে। এই মেয়েকে এখানে নিয়ে আসাটা ভুল হয়েছে, তার চেয়ে বড় ভুল এসব অবান্তর কথা নিয়ে আলোচনা করা! ঝুমুরের ওর চোখের দৃষ্টিতে ওর চোখ আটকে গেলো। কি মোহনীয়! তাখলিফ অদ্ভুত ঘোরে পড়ে যায়! ঝুমুরের একদম কাছে গিয়ে ওর কোমড় টেনে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়। ফিসফিস করে বলে, “সময় থেমে গেলে
কি খুব ক্ষতি হবে রে ঝুমুর?”
আচমকা এমন কান্ডে ঝুমুর যেন নিজের চিন্তা,
বোধশক্তি যেন হারিয়ে ফেলে। আজকের দিনটা এত
অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য কেন? সবকিছু কেমন ঘোর লাগা, স্বপ্নের মতো! ও নিচু গলায় শুধু বলে,
“একদম না।”
________________
চলবে…
#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-১১
আচমকা এমন কান্ডে ঝুমুর পুরোপুরি চিন্তাশক্তি
যেন হারিয়ে ফেলে। আজকের দিনটা এত অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য কেন? সবকিছু কেমন ঘোর লাগা, স্বপ্নের মতো! ও নিচু গলায় শুধু বলে, “একদম না।”
সময়টা কতক্ষণ থমকে ছিলো জানে না দু’জন!
শান্ত বাতাসে লুটোপুটি করা ঝুমুরের চুলগুলো তাখলিফ কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে ওর নাকে নাক ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। তপ্ত নিঃশ্বাস পুড়িয়ে দিচ্ছিলো ঝুমুরের ভেতরকার অনুভূতি। এরপর আচমকাই ওষ্ঠাধরে সামান্য ছোঁয়া! ঝুমুর তখন যেন এই পৃথিবীতেই নেই। এতটা ঘনিষ্ঠতা আশা করেনি সে। হতবিহ্বলতা কাটতেই দেখতে পায় তাখলিফ ওকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে চলে গেছে। ঝুমুর এমন কান্ডে
দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। কি হলো এটা? মানুষটার আচানক আবার মন পালটে গেলো কেন? ও কাপড় নেয়ার কথা বেমালুম ভুলে দোতলায় নেমে আসে। একটা ঘোরের ভেতর আছে সে!
______
সানওয়ার সাহেব আজ বাড়িতেই আছেন। দরজায়
নক হতেই খুলে দেখলেন তাখলিফ দাঁড়িয়ে আছে। চোখমুখ কেমন গম্ভীর, উদাসীন। অফিসের পোশাকে ভীষণ ক্লান্তিকর দেখাচ্ছিলো। বাবাকে দেখে মৃদু হাসলো। চুলগুলো ফ্লিপ করে পেছনে ঠেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “অনেকদিন পর, এইসময় তো বাসায় থাকো না। আজ কি হলো?”
সানওয়ার হক হেসে বললেন, “এইতো সবসময়
ব্যস্তই থাকি। তাই আজ কাজ থেকে ছুটি নিলাম।”
“মন একটু বেশিই ভালো নাকি?”
সানওয়ার হক বললেন,
“যে ডিলটার জন্য খাটাখাটুনি করছিলাম, তা পেয়ে গেছি। সেজন্যই মনটা ভালো। যাইহোক, তুই ফ্রেশ হো গিয়ে, আমি চা করছি।”
তাখলিফ হেসে বাবার কাঁধের ওপর হাত রেখে বলল, “কংগ্রাচুলেশনস। ট্রিট হিসেবে আজ তোমাকেই আমি চা করে খাওয়াবো। তুমি বসো।”
সানওয়ার সাহেবও হাসলেন প্রতিত্তোরে। তাখলিফ অফিসের পোশাক ছাড়ার জন্য নিজের ঘরের দিকে গেলো। তাখলিফের যাওয়ার পানে তাকিয়ে সানওয়ার হকের চোখ ভিজে ওঠে। এ কেমন টান অনুভব করেন এই ছেলের প্রতি? ইচ্ছে করে পুরো পৃথিবীর সবকিছু এই ছেলের নামে লিখে দিতে! স্ত্রীর ছবির দিকে তাকিয়ে তিনি শুধু বিড়বিড় করে বলেন, “আমাদের ছেলেটা ভালো থাকুক তমালিকা। ওর একটা গতি করে দিতে না পারলে তোমার কাছে গিয়েও শান্তি পাবো না৷ তোমাকে দেওয়া এই কথা তো আমাকে রাখতেই হবে।”
তাখলিফ ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে গিয়ে চা বানাতে থাকে। তার বাবা কফি খেতে পারে না। চা’য়ে বেশি চিনি আর দুধ মিশিয়ে খায়। বাবার এই বাচ্চাদের মতো স্বভাব অবশ্য তাখলিফ পায়নি। সে তেতো, মিষ্টি যেটাই হোক না কেন খেতে পারে। বলা যায় বাবার কোনোকিছুই সে পায়নি। না চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রঙ! তবুও বাবাকে সে ভালোবাসে। দু-কাপ চা বানিয়ে বসার ঘরে এসে দেখে সানওয়ার হক স্ত্রীর ছবির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছেন। বাবার অবস্থা দেখে ওর ভাবনাগুলো কেমন থমকে যায়। মায়ের ছবির দিকে তাকালেই ওর চোখ জ্বলে যায়, সেজন্য ছবিতে কখনো তাকায় না সে। আস্তে করে শুধু ডাকে,
“বাবা?”
সানওয়ার হক পেছন ফিরে ছেলেকে দেখে স্থির হয়ে যান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য হাসার প্রচেষ্টা করেন। তাখলিফ তাকে চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়। সোফায় বসে চায়ে চুমুক দিয়েই তার মুখটা জ্বলজ্বল করে ওঠে, “বুঝলি তাখলিফ! তুই চা-টা ভালোই বানাস। কয়েকদিন ধরেই একটা কথা ভাবছি… ”
তাখলিফ চা খেতে খেতে বলে,
“কী কথা?”
সানওয়ার হক বিজ্ঞের ন্যায় বলেন,
“ভাবছি বয়স তো অনেক হলো। তুইও চাকরি-বাকরি করছিস, না করলেও সমস্যা নেই৷ আমার অঢেল টাকার মালিক তো তুই-ই হবি, ব্যবসার ভাগ পাবি। আম্মার সাথে সেদিন কথা হলো, ভাবছি এবার তোকে একটা বিয়ে করাবো, ঘরে মেয়েমানুষ না থাকলে ঘরই মনে হয় না।”
বাবার কথায় মুখের রঙ পালটে যায় ওর। পরক্ষণেই ঝুমুরের মুখটা ভেসে ওঠে মানসপটে। গম্ভীর গলায় বলে, “আমি বিয়েটিয়ে করতে পারবো না। এসব বাদ দাও।”
সানওয়ার হক খ্যাঁকিয়ে ওঠেন এবার, “কেন পারবি না? তোর ছোটটা বাড়িতে বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে আর তুই কুমার থাকার প্রতিজ্ঞা করছিস? এই যে আমার এতবড় একটা ফ্ল্যাট! এটা আদতে একটা বয়েজ হোস্টেল। যেখানে বাপ-ছেলে দু’জনেই সকালে রান্না করে খেয়ে এরপর কাজে বেরুয় আর কাজ থেকে ফিরে রান্না করে আবার খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এখানে কোনো প্রাণ নেই, উচ্ছলতা নেই, জীবনের মানে নেই। এটাকে এবারে আমি সংসারে রুপান্তরিত করবো…”
“সংসারে রুপান্তরিত করবে মানে?”
“তোর মতো এলোমেলো ছেলেকে ঠিক করার জন্য একটা বউ আনবো। যে তোকে পুরো সংসারী বানিয়ে দেবে। আমার আর ক’দিন? এই আছি, এই নেই। যাওয়ার আগে তোকেই তো সব গুছিয়ে নিতে হবে…”
তাখলিফ রাগে এবার চেঁচিয়ে ওঠে, “এসব কি বলছো? তুমি নেই মানে কি?”
সানওয়ার হক নিজের ভুলটা ধরতে পারলেন। দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বললেন, “আরে ঐটা কথার কথা…”
তাখলিফ বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলে,
“কথার কথা মাই ফুট। আর কখনো এসব বলবে না।”
সানওয়াক হক বলেন,
“ওকে ওকে। কিন্তু যাই হোক না কেন তোকে আমি এবার বিয়ে করাবোই। সংসারী বানাবো। না করতে পারবি না। বউয়ের যত্ন, আদর, ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার তো তোরও আছে…”
তাখলিফ বুঝলো বাবার সাথে তর্ক করা আর নিজের পায়ে কুড়োল মারা একই কথা। সেজন্য ও চুপ করে গেলো। হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে সোফায় গা এলিয়ে দিতেই সন্ধ্যার ঘটনাটি মস্তিষ্কে হানা দিলো। সেই মোহ ছন্নতা, ঘোর লাগা, গোধূলির আলোয় কি মিষ্টি লাগছিলো ঝুমুরটাকে! তাখলিফ নিজেকে সামলাতে পারেনি। উফ, কীভাবে এতোটা দুর্বল হয়ে পড়লো সে? ঝুমুরটা তো আরও আস্কারা পেয়ে যাবে। একবার ওর মন টের পেয়ে গেলে এই মেয়ে ওর পিছু ছাড়বে না। তখন এটা কি করে ফেললো সে? একদম উচিৎ হয়নি, একদম না। তবে বাবার বকবকানি শুনে এটাও মনে হলো, এই ঝুমুরটাও মন্দ নয়। একদম পাকা, পতিভক্ত, সংসারী নারী হওয়ার সকল গুণ বিদ্যমান আছে ওর মধ্যে। কিন্তু তাখলিফের কপাল খুব খারাপ বলেই এই একটা ঘটনা ওর জীবনে মারাত্মক কাল হয়ে দাঁড়াবে এটা সে বুঝতে পারছে। অবশ্য ফুলের দিকে হাত বাড়ালে কাঁটার আঘাত তো পেতেই হবে। আচ্ছা, কাঁটার আঘাতে সে সহ্য করে নেবে। কিন্তু কোনোদিন এই ঝুমুর রাণীকে কি ও সত্যিই পাবে? কে জানে!
______________
সন্ধ্যার চায়ের আড্ডায় সকলেই অংশ নিয়েছে। তবে তুসিকে দেখে পাখি বেগম মুখ কালো করে চলে গেছেন। শ্বাশুড়ির এরকম আচরণ কষ্ট দেয় তুসিকে৷ তবুও ইয়াসিফের কথা ভেবেই সে চোখের জল আড়ালে মুছে নেয়। ওর জন্য কতকিছু করছে ছেলেটা! চাকুরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুসির মন খারাপ লাগে ভীষণ! ছেলেটাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে সে। কিন্তু ও কি আর করতো? ইয়াসিফকে ছেড়ে অন্যের গলায় সে ঝুলে পড়তে চায় নি একদম। ছেলেটা কত কেয়ার করে ওর, বড্ড ভালোবাসে! কেমন পাগলামো করে হুট করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলো ভেবেই হাসি ফুটে ওঠে। ইয়াসিফের জন্য হলেও সব কষ্ট সয়ে নিতে রাজি সে!
চায়ের আড্ডায় গল্পগুজব শেষে যে যার মতো ঘরে চলে গেলো। ইয়াসিফ বাইরে থেকে ফিরেছে বিধায় তুসিও গেলো। পাখি বেগম ছেলের জন্য পানি নিয়ে আসতেই দেখে তুসি ওর জন্য শরবত নিয়ে গেছে আর ইয়াসিফ তৃপ্তি নিয়ে সেটা খাচ্ছে। পাখি বেগম জ্বলে ওঠলেন একদম। রাগে, দুঃখে তার চোখ ফেটে জল বেরুতে চাইলো। ছেলেকে বুঝি কেড়েই নিলো তার থেকে এই কাল-নাগিনী। কি ছলা-কলা দিয়ে বশ করছে কে জানে! ছেলেকে হারিয়েই ফেললেন বোধহয়! এসব চিন্তা করে রাগে ফুঁসতে লাগলেন পাখি বেগম। ইয়াসিফ অবশ্য মা’কে আগেই লক্ষ্য করেছে। শরবত খাওয়া শেষ করে সে মায়ের কাছে গেলো। তার হাতে থাকা পানির গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে গ্লাস খালি করে দিয়ে বলল, “পানিটা না খেলে যেন হচ্ছিলোই না৷ আজকের পানিটা এত সুস্বাদু কেন বলেন তো আম্মা।”
পাখি বেগম হেসে ফেললেন আচমকা। পরক্ষণেই
মুখ কঠিন করে বললেন, “সারাদিন কাজ খুঁজে হয়রান যে হয়ে আছিস, কেউ তোকে খেতে দিয়েছে? খালি পেটে আমার পোলাডারে শরবত খাওয়ায়, কত্তবড় সাহস!”
ইয়াসিফ হাসতে হাসতে নিচু স্বরে বলল, “আরে
একদিন খেলে কিছু হবে না। আর নতুন বউ কেন আনলাম? আমার সেবা-যত্ন করার জন্যই তো। তার কাজই তো আমার জন্য হাতে করে শরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, পানি তো আমার আম্মা আনবে। তাই না?”
পাখি বেগম বললেন, “আয়, তোকে খেতে দিই। ছোট মাছের চচ্চড়ি করেছি নিজ হাতে। তোর তো পছন্দ।”
ইয়াসিফ ক্ষুধা পেয়েছে এমন ভান করে বলল,
“তাই নাকি? তাড়াতাড়ি ভাত বাড়েন। আমি হাতমুখ ধুয়েই আসছি।”
পাখি বেগম রান্নাঘরে চলে গেলেন। ইয়াসিফ তুসির দিকে তাকিয়ে ঘরে যাওয়ার ইশারা দিয়ে চলে গেলো। তুসি এবার হেসে ফেললো। ঝুমুর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো। ও বলল, “ভাইয়ার কি বুদ্ধি! দু’দিকেই
ব্যালেন্স রাখার চেষ্টা করছে।”
তুসি হেসে বলল, “ও আজীবনই এমন ফাজিল।”
“তবে বড্ড কাজের, অকাজের না।”
“ভুল বলো নি।”
_____________
এরপরের দু’দিন তাখলিফকে কোথাও দেখতে পেলো না ঝুমুর। পরে অনেক খোঁজটোজ নিয়ে জানলো অফিসের কাজেই সপ্তাহ খানিকের জন্য শহরের বাইরে পাঠানো হয়েছে ওকে টিমের লিডার করে। ঝুমুরের ভীষণ কান্না পেলো। একবার বলে গেলে কি হতো ওকে? অবশ্য কার কাছে আশা করে এসব? মানুষটা সেদিন ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে চলে গেছে। যাওয়ার পর একটা খোঁজ অবধি নেয়নি। এই যে ওর ধাক্কায় পড়ে গিয়ে হাত কেটে গিয়েছিলো ঝুমুরের, জানেও না তাখলিফ! ওর বড় অভিমান হলো। তাখলিফ বিহীন একেকটা দিন ওর কাছে মাসের ন্যায় বড় মনে হলো। এরমধ্যে একদিন ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ির পরিবারকে দাওয়াত করা হয়েছিলো ইয়াসিফের বিয়ে কেন্দ্র করে। সারাদিন গাধার খাটুনি খেটে ঝুমুরও তাদের আপ্যায়ন করেছে। অথচ পরে শুনে সেই বাড়ির ছোট ছেলের সাথে আবারও বিয়ের ব্যাপারটা তুলেছে তারা। শুনে ঝুমুরের কি রাগ, কান্নাকাটি! ইয়াসিফ রাগারাগি করে বাবা-মাকে বুঝিয়ে সাময়িক শান্ত করলেও ব্যাপারটার পুরোপুরি নিষ্পত্তি ঘটাতে পারলো না। তাছাড়া ছেলেকে মনমতো বিয়ে দিতে পারেন নি। তাই এবার ইয়াসিফের রাগ-জেদ কাজ হলো না। ছোট মেয়েকে নিজেদের পছন্দে বিয়ে দেবে এটা পাখি বেগমের একটা শপথ। শামসুল হক আর তার দু’জনেরই ভীষণ পছন্দ ঝিনুকের ছোট দেবরকে। তাদেরও একশো শতাংশ মত আছে। এছাড়া বিষয়, প্রতিপত্তি, শিক্ষা সবই আছে। এছাড়া ঝুমুরকে ওরা পড়তে দিবে বলেছে। কিন্তু চাকরি করতে দেবে না৷ এটা তেমন বড় কোনো সমস্যা না। সবদিকে যখন ব্যাটে-বলে মিলেই গেছে তবে কেন নয়?
এরপর দীর্ঘ অফিসের কাজকর্ম গুছিয়ে যেদিন তাখলিফ বাড়ি ফিরলো, জানতে পেরেই ঝুমুর ঘরে বসে উসখুস করতে লাগলো। সুযোগ খুঁজতে লাগলো কি করে ওর সাথে দেখা করবে। বিকেলে যখন পাখি বেগম প্রমিলাকে নিয়ে বোনের বাড়ি গেলো, তখন সুযোগ পেয়ে ও চলে এলো তিন তলায়। বড় চাচা বাড়িতে নেই জানে ঝুমুর। কলিংবেল চেপে কান্না আটকে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো ও। দরজা খোলামাত্রই তাখলিফের বুকে আছড়ে পড়ে ফুঁপিয়ে ওঠলো ঝুমুর। ঘুম থেকে ওঠে আকস্মিক এমন একটা অবস্থা দেখে হতভম্ব তাখলিফ হন্তদন্ত হয়ে দরজা লাগিয়ে ওকে সরানোর চেষ্টা করতে থাকলে ঝুমুর আরো শক্ত করে ধরে বলে ওঠে, “আপনি বাড়িতে বলে দিন, নয়তো আমাকে ওরা বিয়ে দিয়ে ফেলনে। দূরে করে দিবে আপনার থেকে। প্লিজ প্লিজ বলে দিন। আমি নাহলে ম’রে যাবো।”
তাখলিফ ওর কথা শুনে শান্ত হয়ে যায়। ইচ্ছে করে মেরে ওর গাল লাল করে দিতে। কিন্তু নিজেকে সংযত করে ওর মাথায় চিবুক রেখে এরপর বলে, “একটা বিয়েই তো করবি, এমন নাটকের কি আছে? ষোলো বছরে একবার করেছিস, আঠারোতে আবার করবি!”
ঝুমুর ভার গলায় বলল,
“আমার বয়স ঊনিশ। আমার একটাই বিয়ে আর একটাই বর। আরকিছু লাগবে না। গাছতলায় থাকবো দরকার হলে।”
তাখলিফ ঠোঁট টিপে হাসি আটকায়, “সে তো আবেগের কথা। দেখলাম তো ছেলেটাকে। ভালো-ভদ্র, শিক্ষিত, সরকারি চাকুরীজীবি। তোকে খুব ভালো রাখবে।”
“আমি আপনাকে ছাড়া একটুও ভালো থাকবো না। আপনি সবাইকে বলে দিন। না মানলে আমরা চলে যাবো।”
“কোথায় যাবি?”
ঝুমুর এবার ওর বুক থেকে মুখ তুলে। চোখের জলে পুরো মুখ ভিজে লাল হয়ে আছে। মাথায় ওড়না টেনে দেওয়া নেই পর্যন্ত। রুক্ষ, রুগ্ন দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। তাখলিফের বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠলো। ওর মানসিক যন্ত্রণাটা যে অত্যাধিক বুঝতে পারলো। ঝুমুর আবারও ওর বুকে মুখ লুকিয়ে বলল, “আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন।”
তাখলিফ মূর্তিমান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এখন কি করা উচিৎ ওর? এই যে এতদূর পর্যন্ত ভেবে মেয়েটা ওর কাছে এসেছে, ফিরিয়ে দিতে পারবে না ও। কিন্তু কি করবে? মাথা কাজ করছে না ওর। বাবার সাথে কথা বলবে কি একবার? সব শুনে বাবা কি রিয়েকশন দেবে, কে জানে? ওকে আবার ভুল বুঝবে না তো?
ঝুমুর ওকে কিছু বলতে না দেখে পিঠে চিমটি দেয়। ভাবনার মাঝে এমন আঘাত পেয়ে মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে তাখলিফ। ধমকে বলে, “একটুও ভয় পাস না আমাকে, তাই না? মেরে যেদিন গাল ফাটিয়ে দেবো তখন কেঁদেও কূল পাবি না।”
ঝুমুর করুণ স্বরে বলে, “বলবেন কি-না বলুন না? মা-বাবা খুব জোরে এবার আমাকে বিয়ে দিতে চাইছে। আপনি কি আটকাবেন না? আপনার বউ তো আমি, একজনের বউ হয়ে অন্য আরেকজনকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আমি চাই না এমন কোনো কলঙ্ক মাথায় নিতে। তাই ব্যাপারটা যাতে আর না এগোয় আপনি দয়া করে দেখুন। এমনিতেই অনেক কথা হয়ে গেছে। ওটা তো আপুর শ্বশুরবাড়ি। কিছু হলে আপুকে ওরা কথা শোনাবে।”
তাখলিফকে কিছু বলতে না দেখে ঝুমুর আবারও উদগ্রীব কন্ঠে বলে, “আপনি এমন নির্লিপ্ত কেন? দেখুন আ আমি কিন্তু কিছু একটা করে ফেলবো।
ম’রে যা….”
আরকিছু বলার আগেই তাখলিফ ওর ঠোঁট দখল করে কথা আটকে দেয়। খানিকক্ষণ পর শান্ত হয়ে এলে ঝুমুরকে ছেড়ে দিয়ে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ফিরে এরপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে, “তুই কিছুই করবি না, আমাকে কথা দিতে হবে। এরপর বাকিটা আমি দেখবো…”
কথাটা বলার সময় তাখলিফের গলা কেঁপে যায়। ঝুমুরের চোখ থেকে দু-ফোঁটা জল গাল বেয়ে টুপ করে কার্পেটের ওপর পড়ে যায়। পেছন থেকে তাখলিফকে
জড়িয়ে ধরে বলে, “ভালোবাসি।”
’
____________
[ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।]
চলবে…..