অপ্রিয় রঙ্গনা পর্ব-১৬+১৭

0
329

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-১৬

ক্যালেন্ডারের হিসেবে পাঁচদিন কেটে গেছে। বিরুপ পরিস্থিতি গুমোট আকার ধারণ করেছে। তবে নিশ্চুপে নিশ্চুপে তা ডালপালা মেলে বড় ঝামেলা বাঁধার আশঙ্কা পায়তারা করছে। সবাই সবার সিদ্ধান্তে অটল, কেউ পিছু হটবার নয়। ইয়াসিফ সম্পূর্ণরুপে বোনের পাশে দাঁড়িয়েছে।
তবে পাখি বেগম ও শামসুল হকের কারণে সাজেদা বেগম বাদে বাকি সবাই মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে। এরমধ্যে তাখলিফের কোনো হেলদোল দেখা গেলো না। সে রুটিনমাফিক খাচ্ছেদাচ্ছে, অফিস যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছে, কাজ শেষে বাড়ি ফিরে বাবার জন্য রান্না করছে। সব ঠিকঠাক। তবে বাইরে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টাটা বিফলে না গেলেও তাখলিফ ভেতরে ভেতরে স্বস্তি পাচ্ছে না। এতদিনের লুকিয়ে রাখা সত্যটা সামনে আসায় ভেতরটা যেরকম শান্তি পেয়েছে, তার সাথে তীব্র বুক জ্বালাপোড়া অনুভূতিও যুক্ত হয়েছে। ঝুমুরের সাথে সেদিনের পর আর কোনো কথা হয়নি, না হয়েছে যোগাযোগ। আগে যে মেয়েটা একটু কিছুতেই ওকে
ম্যাসেজ করে বিরক্ত করতো, এই ক’টা দিন ধরে তাও করছে না। কেমন এক বিরহ যন্ত্রণায় তেঁতো হয়ে আছে ওর মন-মস্তিষ্ক।

রাতে ভালো ঘুম হলো না তাখলিফের। বুকের ভেতরে থাকা ছোট্ট হৃদযন্ত্রটাকে কেউ যেন দু’হাতে দলাইমলাই করে পিষ্ট করছে। অতিষ্ঠ! অতিষ্ঠ! সবকিছু যেমনটা ভেবেছিলো তেমনটা হচ্ছে না বলেই ওর মন কুন্ঠিত বোধ করছে। ভেবেছিলো ঘটনাটা জানাজানি হলে হয়তো এবার এসপার-ওসপার হয়েই যাবে। তাতে ফলাফল যেটাই হোক না কেন কষ্ট হলেও সে মেনে নেবে। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে কোনো কথাই উঠলো না। চাচা-চাচীর ব্যবহারে সে ভীষণ আশ্চর্য! তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য অবশ্য সানওয়ার হকের আচরণে। তিনিও এ বিষয়ে তেমন কিছু বলছেন না। তাখলিফ এ ব্যাপারে বাবার সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন ঝুমুর যদি চলে আসে তাহলে তিনি একচুলও আপত্তি করবেন না। কিন্তু যদি না আসে তাহলেও তিনি নিশ্চুপ ভূমিকাই পালন করবেন। বাবার এমন রুপ দেখে তাখলিফ যারপরনাই অবাক হয়েছে! তবে সেও ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছে কি হয় না হয় দেখার…

.

বাড়ির পরিস্থিতি কোলাহলশূন্য। কোথাও কোনো
শব্দ নেই। যেন হুট করেই সব কোলাহল, সময়
থেমে গেছে। তার মাঝে শুধুমাত্র ঝুমুরের ঘর থেকেই ফোঁপানোর করুণ শব্দ ভেসে আসছে। পাখি বেগম মেয়েকে বোঝাচ্ছেন, যেভাবে পারেন সেভাবেই। তাতেও মেয়ে ‘না’ কথাতেই অটল থাকায় তিনি বেশ বিরক্ত ও শঙ্কিত। তার ছোট মেয়ের জীবন কিছুতেই হেলায় যেতে দেবেন না তিনি। এত সস্তা নাকি তার মেয়ের জীবন? ঝুমুর তখন ভয়ে ভয়েই সাহস করে বলে দিলো, “আমি আমার সংসার ভাঙবো না মা।”

পাখি বেগম মেয়ের কথা তেলেবেগুনে জ্বেলে ওঠলেন,
“সংসারের কি বুঝিস তুই? এখনও চক্ষু খুইলা
পৃথিবী দেখবার সুযোগ হয় নাই। আমাগো থেইকা বেশি বুঝস? আরে হেই পোলা ম’দখোর, গাঁ’জাখোর ছিলো৷ এহন যে না তার কি গ্যারান্টি?”

ঝুমুর চোখ বন্ধ করে কথাগুলো হজম করে নিলো,
“তুমি যে অপবাদগুলো দিচ্ছো সেগুলো ওনার জীবনের ভুল সময় ছিলো, এখন ওনি এমন না। আর ওনি যদি খারাপও হন, তাতেও আমি ওনার কাছেই থাকবো। জোর করে তোমরা আমাকে ওনার থেকে দূরে কর‍তে পারবে না।”

“তুই পাগল হইয়া গেছিস ঝুমু। ওই পোলা তোর মাথা খাইছে। কপালে দুর্গতি আনতে বইয়া আছোস!”

“আমি ঠিক আছি, তোমরাই বরং…. ”

পাখি বেগম শান্ত স্বরে বলার চেষ্টা করলেন,
“শোন, তোর জন্য ভালো পোলার অভাব হইবো না৷ আচ্ছা, ঝিনুকের দেবরের সাথে ক্যান্সেল। তোর জন্য এরচেয়েও ভালো পোলা আইনা দিমু। তুই শুধু একবার রাজি হইয়া যা, আমারে ওই ম’দখোরের কাছে ছোট করিস না।”

ঝুমুর অতিষ্ঠ হয়ে বলল,
“এক কথা বারবার বলে ওনাকে ছোট করবে না বলে দিলাম। ওনি এসব খান না।”

খ্যাঁকিয়ে ওঠলেন পাখি বেগম,
“আগে তো খাইতো! এহন যে খায় না তার কি প্রমাণ আছে তোর কাছে? এইসব নে’শাপানি যারা করে তারা কোনোদিন ভালো হয় না। তোরে রাইখা অন্য মাইয়া নিয়া ফুর্তি করলেও অবাক হমু না…”

উল্টাপাল্টা কথা শুনে ঝুমুর রাগে চেঁচালো এবার,
“আহ, তুমি চুপ করো। আরকিছু শুনতে চাই না।”

পাখি বেগম থামলেন না,
“শুনতে হইবো। ওই পোলারে এহনও চিনস নাই। মা-টারে তো এইগুলার জন্যই খাইছে।”

ঝুমুর হতবিহ্বল, হতভম্ব হয়ে বসে রইলো। এই
ঘটনা সে দাদীর কাছ থেকে কালই শুনেছে৷ তবুও মা যেভাবে এককথা কানের কাছে বারবার বলছে তাতে ওর মেজাজ খারাপ হচ্ছে। ও কেঁপে যাওয়া গলায় সাহস করে বলেই ফেললো, “ওনি যদি খু’নিও হন, আমি তবুও ছাড়বো না। এবার তুমি যা করার করো।”

মুখের ওপর স্পষ্ট করে বলে দিলো ঝুমুর। পাখি
বেগম অবাকের চরম শিখরে পৌঁছালেন। অধৈর্য্য হলেন, পিত্তি জ্বলে গেলো তার। এই ভালো মেয়েটার মাথা যে ভালোভাবেই ওয়াশ করেছে তা তিনি বেশ বুঝলেন। আদরে-আহ্লাদে এতদিন বুঝিয়েও যখন কোনো লাভ হলো না, তিনি দারুণ ক্ষেপে গেলেন এবার। কোথা থেকে বিছানার ঝাড়ু নিয়ে এসে মারতে থাকলেন নিজের ঝাঁঝ মিটিয়ে। মায়ের এই আকস্মিক আচরণে ঝুমুর এতটাই অবাক হয়েছে যে ও চুপচাপ শুধু মারই খেয়ে গেলো, একটা টু শব্দ পর্যন্তও করলো না। এরই মধ্যে তুসি বাঁধা দিতে এলে পাখি বেগম তাকেও এক থাপ্পড় মেরেছেন। যতক্ষণ না নিশি-তিথি, প্রমিলা এসে টেনেটুনে তাকে থামালেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি মেরেই গেলেন। সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এই ঘটনা শুনে ইয়াসিফ বাক্যহীন হলো। তার মায়ের আচরণ অচেনা ঠেকছে। সে বোনের জন্য ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লো। এ ব্যাপারটা নিয়ে যে আরো জলঘোলা হবে তা সে ভালোই বুঝতে পারছে। মা-বাবাকে দু’জনেই যেন পণ করেছে মেয়ে বাঁচুক, মরুক তবুও তাখলিফের কাছে দেবে না। এ কেমন রুপ দেখাচ্ছে তারা? আজ মা কিভাবে পারলো ঝুমুরের ওপর এমন ভয়াবহ অমানবিক আচরণটুকু করতে? সে ভেবে পায় না।

.
চারদিকে নিশুতি রাতের আগমন। চুপচাপ পৃথিবী। কোথাও কোলাহল নেই। ঝুমুরের ছোট মুখখানি লাল হয়ে আছে। চোখের নিচে কালচে দাগ পড়েছে। গত দুই রাত সে চোখের পাতা এক করতে পারেনি। কান্নার চোটে চোখমুখ ফুলে আছে। গত দু’দিন সে চুলও আচড়ায়নি। তুসি একটু আগে জোর করে ওর মুখে ভাত তুলে দিয়েছে, সেটাও বমি করে বের করে দিয়েছে। ঝুমুর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে নিজের
ঘরের দরজা এঁটে দুর্বল পায়ে হেঁটে এসে ড্রয়ার থেকে তাখলিফের দেওয়া সেদিনের চিরকুটটা বের করে। একবার, দু’বার, বহুবার পড়ে, পড়তে পড়তে চুমু খায়। দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তবুও সেই নীরব আর্তচিৎকারের শব্দ ওর বুকের ভেতরেই ঘুরপাক খেতে থাকে। কান্নার শব্দ ওর ঘরের বাইরে অবধি যায় না। এ কেমন নিয়তি ওর? ওর এত ভালো মা-বাবা কেন এরকম করছে? ওরা একটুও কেন বুঝতে চাইছে না ঝুমুরকে? বিছানায় পিঠ লাগাতে গিয়ে মনে হলো জানটা বুঝি ভেতর থেকে কেউ টেনে বের করে নিচ্ছে। কোনো মা কি এত নিষ্ঠুর হয়? ঝুমুর বসে থাকে পিঠের যন্ত্রণা নিয়েই। ও আধশোয়া হয়ে বসতে গেলো, কিন্তু পারলো না। পিঠটা কেমন টান মেরে আছে। জ্বলছে প্রচন্ড। একটু পরপর তীব্র যন্ত্রণায় কেঁপে ওঠছে ও।

ঝুমুর নিজের ফোনটা খুঁজে পায় ড্রয়ারে। এই ক’দিন ওর অবস্থা এমনই ছিলো যে শোকে সে কাতর। বাবার হাতের চড়, মায়ের অবর্ণনীয় মারধর আর নিষ্ঠুরতা ওকে একপ্রকার মূক করে দিয়েছে। এদিকে গোপনে বিয়ের খবর শুনে বড়বোন ঝিনুকও ফোন করে ওকে বেশ কথা শোনায়। সবকিছু ঝুমুরকে এতটাই অবাক করেছে। তাছাড়া তাখলিফের অতীতের ভুলগুলো নিয়ে এতটাই দ্বিধাদ্বন্দে ভুগছিলো যে একবারও ওকে ম্যাসেজ দেওয়ার কথা মনে আসেনি। ফোনে বেশি চার্জ নেই। ঝুমুর তড়িঘড়ি করে ফোনটা চার্জে বসিয়েই ম্যাসেজ লিখার চেষ্টা করে। কিন্তু কি লিখবে ভেবে পায় না। ছোট মস্তিষ্কটা খাটিয়ে অনেক কষ্টে সে লিখলো, ‘আমাকে আপনার কাছে নিয়ে যাবেন? আমি আর এখানে থাকতে পারছি না।’

গভীর রাত। ঘুমহীন একজোড়া চোখ দূরের রাস্তায়। কালো আকাশ, সাদা চাঁদ, নিস্তব্ধ রাতের শহর আর নির্মল বাতাসে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েই নোটিফিকেশনের আকাঙ্ক্ষিত সেই ‘টুংটাং’ শব্দটি বেজে ওঠলো। তাখলিফ একটা সেকেন্ডও বিলম্ব না করে তৎক্ষনাৎ ফোনটা হাতে নিলো। ম্যাসেজটা একবার, দু’বার পড়লো, ভ্রু কুঁচকে এলো। এরপর মিনিট দশেক সময় নিলো। দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অস্বস্তি ভুলে সে এই প্রথম ঝুমুরের ম্যাসেজের রিপ্লাই করলো, ‘কি হয়েছে? খুলে বল।’

অনাকাঙ্খিত রিপ্লাইটা পেয়ে ঝুমুর কিয়ৎক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে রইলো। সংবিৎ ফিরতেই দু’ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো। চোখের পানি মুছে কিছুক্ষণ একা একাই হাসলো। এরপর লিখলো, ‘সবাই যখন জেনেই গেছে আমি আপনার বউ, তাহলে এবার নিয়ে যান।’

তাখলিফ ম্যাসেজ পড়ে চুপ করে বসে রইলো। ঘন্টাখানিক পর লিখলো, ‘নিয়ে যাবো। সবাই রাজি হোক।’

ঝুমুর আঁৎকে ওঠলো, ‘সবাই রাজি না হলে কি আপনি আমাকে নেবেন না?’

‘তোর মা-বাবা না চাইলে নিতে পারবো না।’

রাগে, দুঃখে, কষ্টে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠলো ঝুমুর। এবার আর ম্যাসেজ লিখলো না সে। সরাসরি ফোন করলো। রিং হওয়ার অনেকক্ষণ পর এই প্রথম রিসিভ হল ফোনটা। ঝুমুর কান্না চেপে ঢোক গিলে অনেক কষ্টে বলল, ”আমার মতো একটা ঝামেলা পৃথিবীতে না থাকলে কারো কিছু আসে যাবে না। কেউ আর আপনাকে বিরক্ত করবে না, চাপ দেবে না, মাথা খাবে না। আমি মরে গেলে আপনি তো খুশি হবেন…”

তাখলিফ বসা ছিলো, এবার ওঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো ওর। সেইসাথে ঝুমুরের গলার স্বর শুনেও ভীষণ আশ্চর্যান্বিত হয়েছে। সে বলল,
”মাঝরাতে কি হয়েছে তোর? আবারও উল্টাপাল্টা বকছিস।”

”আমি ম’রে যেতে চাই।”

তাখলিফ বুক চিড়ে সবটুকু দীর্ঘশ্বাস বের করে বলে ওঠলো, “কেন ঝুমুর? আমি কি এমন করেছি যে বারবার একটা কথাই বলিস? আমার কোন পাপের শাস্তি এগুলো?”

ঝুমুর মৃদু হাসলো, “পাপ তো আমি করেছি। আপনার মতো মানুষকে মনেপ্রাণে ভালোবেসে, তার বউ হতে চেয়ে আমিই নিজের কপাল পুড়িয়েছি। এখন তার শাস্তি পাচ্ছি। আরও কত শাস্তি বাকি আছে কে জানে! আমি দুর্বল মনের মেয়ে, আপনার মতো এত শক্ত মন নিয়ে চলতে পারি না, প্যাঁচগোচ বুঝি না। মাঝেমাঝে মনে হয় আপনিই ঠিক, আমি খুব বোকা। বোকা না হলে কি আপনার সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখি? তবে বোকা হলেও আমি কিন্তু ভালোবাসা বুঝি। আপনিই আমার জীবনের প্রথম পুরুষ, প্রথম ভালোবাসা। আপনার সাথে যদি আমার দূরত্ব তৈরি করতে হয়, সেটা একমাত্র মৃত্যুর মাধ্যমেই সম্ভব। আপনি তো আমাকে চান না, তাই আমি ম’রে যেতে চাই…”

তাখলিফ ওসব কথা শুনে হট করে এবার বিচলিত হয়ে পড়লো। করুণ শোনালো ওর গলা,
“এসব কি বলছিস তুই? দেখ, এসব কিন্তু ঠিক না বাবু। তুই ছোট, এখনো সবকিছু বুঝিস না৷ তোকে নিয়ে আসা আমার জন্য দু’সেকেন্ডেরও ব্যাপার না। চাইলে এক্ষুনি পারি। কিন্তু আমি তোর বাবা-মায়ের চোখে ছোট হতে চাই না। তুই তো আমাকে বুঝিস, তাহলে কেন এমন জেদ করছিস? একটু ধৈর্য্য ধর বাবু। আমি তো আছি…”

“আপনি ছোট হতে চান না৷ আমিও আপনাকে ছোট করতে চাই না। কিন্তু আপনি কি জানেন, মা-বাবা কখনোই আমাকে আপনার কাছে দেবে না…”

“আন্দাজ করেছি, কিন্তু এরপরেও সময়ের ওপর একবার ছেড়ে দিতে চাইছি।”

ঝুমুরের গলা কঠোর শোনালো এবার,
“সময় সবসময় সবকিছু ঠিক করে দেয় না।
মা আজকে কি করেছে জানেন? আমাকে বিছানার ঝাড়ু দিয়ে মেরেছে। আ আমার পিঠ দিয়ে যতক্ষণ না রক্ত ঝরেছে ততক্ষণ থামেনি…”

বলতে বলতে কেঁদে ফেললো ঝুমুর। তাখলিফ হতভম্ব হয়ে গেলো। ওর বুকের ভেতরটা কেমন কামড়ে ধরলো। কথা বেরুচ্ছে না গলা দিয়ে। এত বিকারগ্রস্ত আচরণ কেন করছে ওরা? ঝুমুর তো ওদেরই মেয়ে। তাদের রাগ তো তাখলিফের ওপর। তাই বলে রাগটা তারা নিজেদের মেয়ের ওপর মেটাবে? এতদিন সব ঠান্ডা দেখে ভাবছে কিছুই হয়নি, অথচ কতকিছু ঘটে যাচ্ছে তার একবিন্দু পরিমাণ খবরও সে টের পায়নি? ওদিকে ঝুমুরটা একা…..

তাখলিফ আরকিছুই ভাবতে পারলো না। তখনো ঝুমুরের ফোঁপানোর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ফোনের ওপাশ থেকে। ও দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করল,
“খুব বেশি ব্যথা হচ্ছে ওখানটায়?”

“খুব!”

“ঔষধ নিয়েছিস?”

ঝুমুর চুপ থেকে শুধু বলল,
“হু।”

তাতেই সবটা বুঝে ফেললো তাখলিফ,
“মিথ্যে বললে এক চড়ে সব দাঁত ফেলে দেবো বেয়াদব। আমি ইয়াসিফকে এক্ষুনি ফোন করছি।”

ঝুমুর তড়িঘড়ি করে বলল,
“ভাইয়া ঔষধ এনে দিয়েছিলো। আমি নিইনি…”

তাখলিফ আশ্চর্য হয়ে গেলো। ধমকে বলল,
“কেন নিস নি?”

“মায়ের ওপর রাগ হচ্ছিলো তখন।”

তাখলিফ শান্ত হলো। বোঝানোর সুরে বলল,
“এখন খেয়ে নে বাবু।”

ঝুমুর আকস্মিক হেসে ফেললো,
“ওটা তো মলম, খাওয়া যায় না।”

“তাহলে দ্রুত লাগিয়ে নে।”

“একা একা লাগানো যায় না।”

“আমি ইয়াসিফকে ফোন দিয়ে বলে দিচ্ছি।”

ঝুমুর জিভ কেটে বলল,
“ছি ছি। এমন আহাম্মকের মতো কাজ করবেন না। আমি ছোট নেই এখন।”

তাখলিফ বিরক্ত হলো। এটার মাথায় ঘিলু আছে কি-না কে জানে? ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“গর্দভই থেকে গেলি। ও কাউকে একটা বলে দেবে, নয়তো তুই ডেকে নে। নিশি-তিথি, ছোটচাচী তো আছেই।”

ঝুমুর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“না। সবাই ঘুমাচ্ছে। খবরদার আপনি এখন ভাইয়াকে ফোন করে কিছু বলেছেন তো খুব খারাপ হবে। আমি সকালে লাগিয়ে নেব।”

তাখলিফ ওর জেদ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ফোন রেখে দিতে চাইলে ঝুমুর আটকালো। অগত্যা বাধ্য হয়ে ফোন কানে ধরে ওর বকবক শুনতে লাগলো। তবে ওর এবার খারাপ লাগছে না। গত দু’দিনের অস্থিরতা যেন শুষে নিচ্ছে এই প্রাণবন্ত ঝুমুরটা।
.

“দরজা খোল ঝুমুর।”

ঝুমুর ভীষণ আশ্চর্য হলো,
“দরজা খুলবো কেন?”

“আমি। দরজার বাইরে।”

ঝুমুর উত্তেজনায় মুখে হাত চাপা দিলো। বলল,
“মাথা ঠিক আছে আপনার? কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ।”

“তুই কি খুলবি?”

তেজদীপ্ত কন্ঠস্বর। শক্তপোক্ত আচরণ। ঝুমুর উত্তর না দিয়ে ফোনের ওপাশে দু’বার মাথা নাড়লো। নিচু স্বরে বলল, “আসছি।”

ঝুমুর নিজের ঘরের দরজাটা আস্তেধীরে খুললো। এরপর বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলো সবার ঘরের দরজা আঁটকানো কি-না! সে পা টিপে টিপে সবক’টা ঘরের সামনে ঘুরঘুর করে আন্দাজ করে এলো তারা সবাই ঘুমিয়েছে নাকি? যখন বুঝলো সবাই গভীর ঘুমে তখন সদর দরজার কাছে এলো। খুব সাবধানে, যাতে একটুও শব্দ না হয় সেজন্য সূরা পড়তে পড়তে দরজা খুললো সে। এরপর মুখটা বাইরে নিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলো, সিঁড়িকোঠায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোথাও কেউ নেই। ঝুমুরের মুখভার হয়ে এলো। তাখলিফ মিথ্যে বললো ওকে? নাকি ওর আসতে দেরি হওয়ায় চলে গেছে রাগ করে? তা-ই হবে। তাখলিফ কোনোদিন মিথ্যা বলেনি ওর সাথে। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে যখন দরজা আটকাতে গেলো তখনই হাতে হ্যাঁচকা টান অনুভব করলো। অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠলো ওর। এই অন্ধকারে কি ওটা? ভয়ে ওর শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে এলো। তখনই কানের কাছে ফিসফিস করে কেউ বলল,
“আমার বাচ্চা বউ! রাত তিনটে’য় লুকিয়ে লুকিয়ে দরজা খুলতে লজ্জা করে না?”

ঝুমুর এই বিরুপ পরিস্থিতিতেও হেসে ফেললো। তাখলিফের হাতে নখ বসিয়ে দিয়ে বলল,
“করে না।”

তাখলিফ ওর মাথাটা নিজের বুকের ওপর চেপে ধরলো। দু’হাতে জড়িয়ে ধরতে গেলেই ঝুমুর ছোটখাটো আর্তনাদ করে চোখ বন্ধ করে ফেললো। তাখলিফ কপালে ভাঁজ ফেলে একটুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “বেশি লেগেছে?”

“উহু।”

“চল…”

“কোথায়?”

“তোর ঘরে।”

“কেন?”

“গেলেই দেখতে পাবি।”

ঝুমুর ভয় পেয়ে গেলো,
“না না৷ বাবা-মা টের পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আপনি চলে যান। আমিও যাই।”

তাখলিফ ওর গাল চেপে ধমক দিলো। এরপর ওকে সরিয়ে নিজেই ভেতরে চলে গেলো। একদম ঝুমুরের ঘরে ঢুকে হাতের ইশারায় ওকেও আসতে বলে দাঁড়িয়ে রইলো। এদিকে ভয়ে হাত-পা কাঁপতে থাকলো ঝুমুরের। ও সদর দরজা বন্ধ করে আবারও মা-বাবার ঘর চেক করে এলো। এরপর তড়িঘড়ি করে নিজের ঘরে গিয়ে দরজার সিঁটকিনি আটকালো। ঘর অন্ধকার। ঝুমুর চাঁদের একফালি আলোতে দেখলো তাখলিফ দেয়ালে ঠেস দিয়ে ভাবুক চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। ও কাছে গিয়ে ওর গালে হাত রেখে বলল,
“কেন এসেছেন? এমন পাগলামি করার মানে হয়? আমার কিন্তু ভয় করছে। চলে যান…”

তাখলিফ ম্লান গলায় বলল,
“এত দূরছাই করছিস কেন? এখন আমি যেই কাছে আসছি তোর সব ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলো?”

“ভুল বুঝছেন। আমি তো ভয় থেকে বলছি।”

“কিন্তু আমি তো ভয় পাচ্ছি না।”

“আপনি তো ছেলেমানুষ তাই।”

তাখলিফ উত্তর দিলো না। অনেকক্ষণ পর বলল, “কাছে আয়!”

ঝুমুর বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকালো,
“কেন?”

তাখলিফ নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
“পিঠে কতটুকু লেগেছে দেখবো।”

কানটান লাল হয়ে ধোঁয়া ছুটলো ঝুমুরের।
“আপনি পাগল হয়েছেন? অনেক হয়েছে, যান তো।”

তাখলিফ এসব শুনে ক্ষেপে গেলো,
“আমি কি এতরাতে তাহলে তামাশা দেখতে এসেছি? চুপচাপ যা বলছি কর, মলম কোথায় দে। আছে নাকি আমার আনতে হবে? বেশি মুখ চালালে গলা টি’পে মে’রে দে’ব।”

ভয়ে, লজ্জায় মিইয়ে গেলো ঝুমুর। অস্ফুটস্বরে বলল, “আমি সকালেই লাগিয়ে নেবো। দোহাই আপনি এবার যান।”

তাখলিফ শক্ত গলায় বলল, “আমি চলে গেলে কিন্তু আর আসবো না। ফোন, ম্যাসেজে কাজ হবে না।”

বলে পা বাড়ালো দরজার দিকে। ঝুমুর পেছন থেকে গিয়ে টেনেটুনে থামালো ওকে। তাখলিফ শান্ত হলো। ভয়, লজ্জা, আড়ষ্টতা দূরে ঠেলে পিঠ থেকে কাপড়ের অংশটুকু সরাতেই হতভম্ব হয়ে গেলো তাখলিফ। চোখজোড়া জ্বলে ওঠলো অবর্ণনীয় রাগে। ঝুমুরের ফর্সা পিঠজুড়ে লম্বা দাগ পড়ে গেছে, রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে, ফুলেফেঁপে লাল হয়ে আছে কাঁটাছেড়া জায়গাগুলো। এত নির্দয় ওই মহিলা? আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ঝুমুরকে নয়, ওকেই মেরেছে। রাগে তাখলিফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। ও আলতো ঠোঁট ছোঁয়ালো ঝুমুরের ফর্সা কাঁধে। ঝুমুর শিউরে ওঠে চোখ বন্ধ করে ফেললো। ক্ষতস্থানে হাত দিয়ে ছুঁতেই ব্যথায় চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো ঝুমুরের। তাখলিফ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তুলো দিয়ে ক্ষতগুলো ড্রেসিং করিয়ে ঔষধ লাগিয়ে দিলো ঝুমুরকে। চিরুনি এনে চুল বেঁধে দিলো আনাড়ি হাতে। এরপর অনেকক্ষণ বুকে জাপ্টে ধরে বসে রইলো চুপচাপ। ঝুমুর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেই থাকলো। তাখলিফ যা সিদ্ধান্ত নেবার তখনই নিয়ে ফেললো।

_______________
চলবে…

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-১৭

ছোটবেলার সব স্মৃতি মনে নেই ঝুমুরের। আবছাভাবে কিছু মনে আছে বাড়ির সেই দুর্বিষহ দিনগুলো। তখন ও বুঝতো না কিছুই। শুধু বড়মায়ের মৃত্যুতে ভয় পেয়ে কেঁদেছিলো সেদিন এটুকুই মনে আছে ওর। ঝুমুর তাখলিফের বুকে মুখ গুঁজে ম্লান গলায় বলল, “বড়মা থাকলে আমাকে ঠিকই মেনে নিতো, তাই না?”

তাখলিফ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। এরপর ভ্রু কুঁচকালো, “তুই তখন ছোট ছিলি। এতকিছু মনে আছে?”

ঝুমুর ভীতু গলা,
“একটু একটু মনে আছে। তাছাড়া দাদীর কাছে সব শুনেছি, মাও বলেছে।”

তাখলিফ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অতীত মনে পড়তেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠলো। কেন? কেন সে এরকম হয়ে গেছিল? সুন্দর একটা জীবনকে সে নিজের হাতেই নষ্ট করে দিলো। নয়তো আজ তার সব থাকতো, মা থাকতো। আচ্ছা মাকে আবার ফিরিয়ে আনার কি কোনো উপায় নেই? কেন নেই? নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সে তাহলে মা’কে ফিরিয়ে আনতো না ফেরার দেশ থেকে। ঝুমুরের থেকে বিদায় নিয়ে সে তিনতলায় চলে এলো। চোখ থেকে ঘুম পালিয়েছে মায়ের কথা মনে পড়তেই। কত কত অপরাধ আর ভুল তার! ছোটচাচীর সাথে, মা’য়ের সাথে, এখন আবার মেজো চাচীর আদরের কন্যার সাথে! সবথেকে বড় কথা নিজের সাথেই! তাখলিফ কিছুক্ষণের জন্য আনমনা হলো এগারো বছর
আগের দিনগুলোতে!

★★★

বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান তাখলিফ। ছোটবেলা থেকেই সে খুব মা ভক্ত ছেলে। একমাত্র সন্তান বলে সানওয়ার হক আর তমালিকা ছেলেকে চোখে হারাতেন। তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে আগলে রাখতেন ছেলেকে। সানওয়ার হক তখন চাকরি করতেন একটা বড় কোম্পানির বিশিষ্ট পদে। তমালিকা ছিলেন গাইনোলজিস্ট। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ক্যারিয়ারে ব্যস্ত থাকলেও তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা কর‍তেন ছেলেকে সময় দেওয়ার, ভালো রাখার। বাবা হিসেবে সানওয়ার হক তেমন সময় দিতে পারতো না তবে সবটাই পুষিয়ে দিতেন তমালিকা। এরজন্য নিজের স্বপ্নের পেশাও ছেড়ে দেন। সেই থেকে তাখলিফের দিন-দুনিয়া হয়ে যায় তার মা তমালিকা। অসম্ভব ভালোবাসতো সে তার মা’কে। মা হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধু, সর্বোচ্চ প্রায়োরিটির জায়গা। যাকে নিদ্বির্ধায় সবকিছু খুলে বলা যেতো, যার হাতের ছোঁয়ায় নিমিষেই মন উদ্বেলিত হয়ে ওঠতো। যার জাদুকরী সত্তায় চোখের পলকেই তাখলিফের সব কষ্ট দূর হয়ে যেতো। তেমনি সম্পর্ক ছিলো তমালিকার সাথে তার। এভাবেই দিন কাটতে থাকে। তাছাড়া বাড়ির
সকলেই প্রথম নাতি হিসেবে তাখলিফকে ভালোবাসতো, মাথায় করে রাখতো ছোট থেকেই। এভাবেই বড় হতে লাগলো সকলের ভালোবাসার ছায়াতলে। যা চাইতো তা-ই পেতো। কেউ ওকে কিছু করতে বাঁধা দিতো না। একমাত্র সন্তান বলে সানওয়ার হক আর তমালিকাও ছেলেকে চোখে হারাতেন। দিয়েছিলেন অবাধ স্বাধীনতা। সন্তানকে ভালোবাসার সে এক অন্য রুপ। তবে এই ভালোবাসাই পরবর্তীতে তাখলিফের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। সবকিছুতে আস্কারা পেয়ে দিনদিন জেদি আর বেপরোয়া হয়ে গেছিলো সে। তবুও কেউ ওকে কিছু বলতো না, যা করতে চাইতো তা-ই করতে দিতো। ক্যারিয়ারে ব্যস্ত বাবা-মায়ের তখন ছেলেকে শাসন বারণের বালাই
নেই। গ্রাম থেকে ওঠে আসা পাখি বেগমই একমাত্র এই বিষয়টি ভালো চোখে দেখতেন না। তার মতে এই ছেলে নিয়ে এত আহ্লাদ করার কোনো প্রয়োজন নেই, কেননা সে….বাকিটুকু অবশ্য মুখ দিয়ে বের করার অধিকার ছিলো না এ বাড়ির কারোরই। পাখি বেগমও বলতো না বড় জা কষ্ট পাবে ভেবে। শত হোক! বড় জা তার অন্যতম শ্রদ্ধার মানুষ!

বাড়িতে তখন ঝামেলা চলছিলো। জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিলো আত্মীয়দের সাথে। শামসুল হকের ব্যবসা ভালো যাচ্ছিলো না। সাঈদ হক জড়িয়ে গেছিলেন রাজনীতিতে, সেইসূত্রে কোনো এক গন্ডগোলে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় তাকে। স্বামীর শোকে সাতমাসের অন্ত:সত্তা প্রমিলা তখন কাতর৷ এরমধ্যেই একদিন তাখলিফ কারো সাথে রাগারাগি করে একজগ পানি উলটে ফেলে দিয়েছিলো মেঝেতে। আর অসাবধানতা বশত তাতে পড়ে গিয়ে মিসক্যারেজ হয়ে যায় প্রমিলার, সেইসাথে হারান মা হওয়ার ক্ষমতাও। এই দুরবস্থার পর প্রমিলা অনেকটা মানসিক রোগী হয়ে গেছিলেন। দুই জমজ মেয়ের পর বেবি প্ল্যান করেছিলেন তারা, একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্যই। কিন্তু তা আর হলো না। এদিকে তাখলিফ নিজের কান্ডে এমনই আহত হয়েছিলো যে ছোটচাচীর পা পর্যন্ত ধরে মাফ চেয়েছিলো। প্রমিলা তাখলিফকে ভীষণ ভালোবাসতো, নিজের ছেলের মতো৷ নিজের সাথে হওয়া দুর্ঘটনার পর প্রথম প্রথম তাখলিফকে সে সহ্য করতে পারতো না। এই অবস্থার জন্য দায়ী করতো ওকে। কিন্তু পরবর্তীতে তাখলিফের অনুশোচনা, অপরাধবোধের তীক্ষ্ণতা দেখে প্রমিলা নিজের ছেলে ভেবেই ওকে মাফ করে দেয় এবং পরবর্তীতে আর কখনো দোষারোপ করেনি ওকে। কিন্তু ঘটনাটি তাখলিফকে মনে মনে খুব আঘাত করেছিলো। এছাড়া পাখি বেগম সুযোগ পেলেই এটা নিয়ে কথা শোনাতো ওকে, যার দরুন অনেকটা বিষন্নতায় ভুগতে থাকে ও। ফলসরুপ নবম শ্রেণির ইয়ারলি এক্সামে আশানুরূপ ফল আসেনি ওর। তুখোড় মেধাবী ছাত্রের এই দুরবস্থা স্কুল কর্তৃপক্ষ মানতে পারলেন না। তারা তমালিকার সাথে আলাদা করে কথা বললেন। ছেলের মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থা লক্ষ্য করেছিলেন স্বামী-স্ত্রী। ফলে তমালিকা আর সানওয়ার হক ছেলের ভালোর কথা ভেবেই তাখলিফকে তখন হোস্টেলে তুলে দেয়। জীবনে মাকে ছাড়া একটি রাতও অন্য কোথাও না থাকা তাখলিফ আকস্মিক এই দূরত্বটা মেনে নিতে পারেনি। তাছাড়া স্বাধীনতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে কোনোক্রমেই হোস্টেলে থাকতে চাইছিলো না৷ রাগ, জেদ করছিলো ভীষণ। ছেলেকে অনেক বুঝিয়েও যখন লাভ হলো না তখন ওর অবাধ্যতায় রেগে গিয়ে গায়ে হাত তুলেছিলেন তমালিকা। সেই! জেদ করেই আর হোস্টেল থেকে বাড়ি যাবার নাম করেনি সে। এমনকি ঈদ বা অন্যান্য ছুটিতেও ও হোস্টেলই থেকে যেতো, নয়তো কোনো বন্ধুর বাড়িতে চলে যেতো। জোর করেও কয়েকবার বাড়িতে নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তারা। এভাবেই দিন ফুরোতে থাকে। তমালিকা বা সানওয়ার হক এসে নিয়ম করে ছেলেকে দেখে যেতেন। কিছুদিনের ব্যবধানে দু’জনের চোখেই ছেলের কিছু অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে। তবে গুরুতর অবস্থাটা তখনো ধরতে পারেনি। ভেবেছে তাদের ওপর রাগ করে এমন অবস্থা। ছেলেকে দূরে রেখে কষ্ট হলেও তারা মানিয়ে নিচ্ছিলো ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই। সামনে এসএসসি। রেজাল্ট তো ভালো করতে হবে! বাড়ি থেকে তো তা হচ্ছে না।

তবে একটা সময় ছেলের ওমন অস্বাভাবিকতা বেশ চোখে লাগে তমালিকার। তার জহুরি চোখ অনেককিছুই ধরে ফেলে। তিনি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন৷
ব্যাপারটা বুঝতে না দিয়ে প্রথমে ছেলের সাথে খোলাখুলি কথা বলে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন।
মায়ের কাছে সেদিন অবশ্য তাখলিফ মিথ্যে বলেনি।
অসৎ সঙ্গে পড়ে সে মাদক সেবনে তীব্রভাবে জড়িয়ে গেছে। ছেলের মুখে এই স্বীকারোক্তি শুনে তমালিকার পায়ের নিচে মাটি সরে যায়। স্বামীকে সব জানান।হোস্টেলে থেকেও কীভাবে এই নেশায় জড়ালো তার খোঁজ করতে গিয়ে জানা গেল, হোস্টেলের কিছু অসাধু রক্ষকই তলে তলে এ ব্যবসা চালায় আর ছাত্রদের নেশার আসক্তি গড়ে তুলে। এখানে সব পয়সাওয়ালার ছেলে, পটিয়েপাটিয়ে একবার ফাঁদে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতে। তমালিকা আর সানওয়ার হক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট এই ঘটনার বিচার চেয়ে ছেলেকে আর এক মুহূর্তও হোস্টেলে রাখলেন না, বাড়িতে নিয়ে আসেন। অবশ্য ততদিনে বেশ দেরি হয়ে যায়। তাখলিফ পুরোপুরি আসক্ত হয়ে পড়ে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে ছেলেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করতে থাকেন। ছেলেকে অঢেল টাকা, স্বাধীনতা দেওয়া বন্ধ করে দেন, যা যা করার তার সবকিছুই করতে থাকেন। তাখলিফের মিডটার্মের রেজাল্ট খুব খারাপ আসে, এদিকে আসক্ত তাখলিফ বাবা-মা’কে বেশ জ্বালাতন শুরু করে দেয়। একমাত্র ছেলের এই পরিণতি মেনে নিতে না পেরে তমালিকা মুষড়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে তাখলিফকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রেখে আসতে বাধ্য হন তারা। বুকে পাথর চেপে কাটতে
থাকে দিন!

সানওয়ার হক অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকে সারাদিন, একমাত্র ছেলেটারও এই দশা। মানসিকভাবে ভাঙতে শুরু করেছে তমালিকা। বাড়িতে সারাদিন মনমরা হয়ে থাকে বলে পাখি বেগমের ভালো লাগে না। বড় জা’কে তিনি খুব শ্রদ্ধা, ভালোবাসার চোখে দেখেন৷ তমালিকাই তাকে পছন্দ করে এ বাড়ির মেজোবউ করে এনেছিলো। কোনোদিন জা’য়ের মতো ব্যবহার করেনি। শহুরের শিক্ষিত মেয়ে হয়েও গ্রাম থেকে ওঠে আসা মূর্খ পাখি বেগমকে সবসময় নিজের বোনের ন্যায় আগলে রেখেছেন। ছেলের শোকে আজ তার এই দশা! তাও, এই ছেলের? পাখি বেগম অবশ্য মনে মনে একবিন্দুও পছন্দ করতেন না তাখলিফকে। তার অবশ্য গুরুতর একটা কারণও আছে।

১৩ই সেপ্টেম্বর। দিনটা ছিলো অন্যরকম। বৃষ্টির এক ক্লান্ত দুপুর। প্রায় এক সপ্তাহ পর কড়া রোদ ওঠেছিলো। তাখলিফকে পুর্নবাসন কেন্দ্রে পাঠানোর পর এরমধ্যে দিন পনেরো পেরিয়ে গেছে। জা’য়ের মন ভালো করার জন্য পাখি বেগম সেদিন দুপুরের খাওয়া সেরে হাতের কাজ রেখে অনেকক্ষণ গল্পগুজব করলেন তমালিকার সাথে। সুখ-দুঃখের গল্প করলেন। তাতে খানিকটা সময় ছেলের চিন্তা থেকে প্রশমিত হয় তমালিকার মন। একটা সময় দিনের রঙ পালটায়। মেঘের আড়ালে রোদ ডুবে চারদিক আঁধার নামতে শুরু করে। এতদিন পর রোদের দেখা পেয়ে পাখি বেগম কাপড়চোপড়, আচারের বৈয়াম দিয়েছিলেন রোদে শুকাতে। তমালিকার সাথে কথা বলার একপর্যায়ে তার মনে পড়ে এসব। গল্পে ইস্তফা দিয়ে তমালিকাকে বলে ছাদে যেতে চাইলে বাধ সাধেন তমালিকা। নিজেই যেতে চান৷ পাখি বেগমও না করতে পারেন না। তিনি হাতের কাজ গোছানোর জন্য রান্নাঘরে চলে যান। তমালিকাপ ছাদে চলে আসেন। বৃষ্টিতে ভিজে ছাদে শ্যাওলা জমে রয়েছে। পুরোনো বাড়ি বলে রেলিঙের পলেস্তারা খসে পড়েছে। বিপদজনক বলে সেগুলো ভেঙে একপাশে ফেলে রাখা হয়েছিলো। নতুন করে রেলিঙ দেওয়ার কাজ শুরু করা যাচ্ছে না এই টানা বৃষ্টির দিনে। তমালিকা শাড়ি খানিকটা উঁচু করে সাবধানে পা ফেলে ছাদের অন্যপাশে বেদির ওপর রাখা বৈয়ামগুলোর কাছে চলে যান। গিয়েই ভূত দেখার মতো চমকে ওঠেন। পানির ট্যাংকের সামনে হাত-পা ছড়িয়ে ছন্নছাড়া ভঙ্গিতে বসে ঢুলছিলো তখন তাখলিফ। তমালিকা ছেলেকে দেখে একছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন। এরপর হু হু করে কেঁদে ওঠেন। তাখলিফ বিরক্তিতে বিড়বিড় করে কিছু বলে ওঠে। তমালিকা ছেলের মুখ মুছে দিয়ে জিজ্ঞেস করে সে কীভাবে এখানে এসেছে? উত্তরে তাখলিফ ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলে সে পুর্নবাসন কেন্দ্রে দু’জনকে মেরে এখানে পালিয়ে এসেছে।

তমালিকার সন্দেহ হতেই তিনি ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন নেশার এসব জিনিসপত্র সে কোথায় পেয়েছে তাহলে? তাখলিফ ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলে ওখানকারই একজন ওকে এসব দিয়েছে। বিনিময়ে তাখলিফ তাকে টাকা দেবে বলেছিলো। আর সে টাকা নিতেই ও পালিয়ে এসেছে। নামে পুর্নবাসন কেন্দ্র হলেও মূলত সব ধান্ধাবাজি। সব শুনে তমালিকা হতবিহবল হয়ে পড়েন৷ আবারও ধোঁকা? এবার আর ছেলেকে কোথাও পাঠাবেন না তিনি। যত যাই হোক, কষ্ট হলেও নিজের কাছেই রাখবেন আর ফিরিয়ে আনবেন সুস্থ জীবনে। তাখলিফ মাকে সরিয়ে দিয়ে নেশার জিনিসপত্রগুলো পকেটে ভরতে থাকে। তমালিকা সেগুলো নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও পারেন না। তাখলিফের তখন অত হুঁশজ্ঞান ছিলো না। তিনি ছেলের অবস্থা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারেন না। পুরোপুরি ভেঙে পড়েন ভেতর থেকে, কেঁদে ফেলেন। ইচ্ছেমতো ছেলেকে মারতে থাকেন। তাখলিফ সেই অবস্থায়ই নিজেকে রক্ষা করতে এদিকওদিক সরতে থাকে। তমালিকা ক্ষুদ্ধ হয়ে নেশার জিনিসগুলো ওর থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়, কিন্তু মা’কে সেগুলো দিতে চায় না তাখলিফ। সে টলমল পায়ে এদিকওদিক ছুটতে থাকে। তমালিকাও ধস্তাধস্তি করতে থাকে ছেলের সাথে।
বোঝনোর সুরে বলতে থাকেন, “তুই এসব করে নিজের জীবন ধ্বংস করছিস। এসব বাদ দে বাপ, সুস্থ জীবনে ফিরে আয়, তোকে নিয়ে আমার কত স্বপ্ন! তুই ভালো না থাকলে কবরে গিয়েও শান্তি পাবো না আমি, মায়ের কথা শোন বাবা। আমি তো…”

ধস্তাধস্তির এ পর্যায়ে মায়ের থেকে জিনিসগুলো বাঁচাতে নিজের অজান্তেই মা’কে দূরে সরানোর চেষ্টা করে, ধাক্কা দেয় তাখলিফ৷ এরপরের শব্দগুলো সেখানেই থেমে যায়। শুধু একটা অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। তাখলিফ বিচলিত হয়ে দেয়াল ধরে সামলে দাঁড়ায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছাদ থেকে মা’কে পড়ে যেতে দেখে তাখলিফ। মুহূর্তেই হতভম্ব হয়ে যায় সে। প্রথমে ব্যাপারটা চোখের ভুল ভেবে নিলেও পরবর্তীতে বাস্তব বুঝে ওর সারা শরীর কেঁপে ওঠে। পা মাটিতে শক্ত হয়ে আটকে যায় যেন। নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে। হাতে থাকা নেশাদ্রব্যের জিনিসগুলো মাটিতে পড়ে যায়। আচমকা পাখি বেগমকে সিঁড়ি দিয়ে আসতে দেখে টলমল পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলে, “মা পড়ে গেছে মেজোআম্মা। একটু দেখো না…”

তমালিকার ফিরতে দেরি হচ্ছে বলে পাখি বেগম দেখতে এসেছিলো ব্যাপার কি! কিন্তু এই অসময়ে তাখলিফকে ছাদে দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে গেছেন।তার ওপর ওর মুখে এসব শুনে ঘাবড়ে যায়। বিস্মিত কন্ঠে শুধায়, “কি কও এসব? ভাবি কই? তুমি এইহানে কেমনে আসলা?”

তাখলিফ শুধু ধীর স্বরে বলে, “আমি মাকে সরালাম আর দেখালাম মা পড়ে গেছে।”

বলে ধপ করে সিঁড়িতে বসে পড়ে। পাখি বেগম ঘাবড়ে যায়। ছুটে গিয়ে তমালিকার অবস্থা দেখে জোরে চিৎকার দিয়ে ওঠে। মুহূর্তেই শোরগোল পড়ে যায়। পরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তমালিকাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কিছু সময় বেঁচে থাকেন তমালিকা। তীব্র শ্বাসটানেও শেষ মুহূর্তে নিজের ছেলের জন্যই যতচিন্তা করেন তিনি, স্বামীকে দিয়ে যান প্রাণপ্রিয় পুত্রের সব দায়িত্ব! এরপরই সব শেষ! একটা সময় কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তমালিকাকে মৃত ঘোষণা করেন। সকলে এই ঘটনায় মূক বনে যান। সানওয়ার হক স্ত্রীকে হারিয়ে ভেঙ্গে পড়েন। তাখলিফ হাসপাতালের প্যাসেজের মেঝেতে শুধুমাত্র নির্বাক হয়ে বসে ছিলো।দুঃস্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিলো খুব করে। পাখি বেগম বড় জায়ের মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছিলো না৷ মানুষটা কি সুন্দর আগ্রহ নিয়ে ছাদে আচার আনতে গেলো, ফিরলো লাশ হয়ে! তিনি তাখলিফের দিকে ঘৃণাভরে তাকান। ওর ধৃষ্টতা সহ্য করতে না পেরে কাছে এসে থাপ্পড় মেরে বলেন, “মানুষটা তো মা ছিলো তোর…কেমনে পারলি? একটুও বুক কাঁপলো না তোর? তোর জন্য যে মানুষটা দিনদিন শেষ হয়ে যাচ্ছিলো তাকে ছাদ থেকে ফেলতে হাত কাঁপলো না? শুধু ওই নেশা করার জন্য? ছিঃ! পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট সন্তান তুই। কোনোদিনও তোকে ক্ষমা করবো না, খু’নি…”

সকলেই তার চিৎকার শুনে বাকরুদ্ধ বনে যান। পাখি বেগম কেঁদে কেঁদে সব খুলে বলে সবাইকে। তমালিকার বাপের বাড়ির লোকেরা খুব ক্ষেপে যায়। ভাগ্নের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে মামলা করে দেন তমালিকার বড়ভাই। মামলা হয়, পরবর্তীতে পুলিশ আসে। আত্ম’হত্যা নাকি হত্যা তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। পাখি বেগমের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কিশোর অপরাধী হিসেবে তাখলিফকে সন্দেহ করা হয়। কিন্তু বাড়ির সকলেই এর বিরোধিতা করে, কারোর বিশ্বাস হয় না পাখি বেগমে এই অভিযোগের কথা৷ তাখলিফ নিজের মাকে খুব ভালোবাসতো! যতই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকুক, যত ভালো কাজ বা অন্যায় করুক মাকে সে মারতে পারে না। সানওয়াক হক স্ত্রীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন। ছেলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুনে তিনি পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েন।

তাখলিফ অবশ্য নিজের পক্ষে কোনো সাফাই গায়
নি সেদিন। সে মাকে হারিয়ে বিমূঢ় হয়ে গেছিলো একেবারে। শূন্য মনে হচ্ছিলো সবকিছু। তীব্র অপরাধবোধ ওর হৃদপিন্ড, মন-মস্তিষ্ক রক্তাক্ত করে ফেলছিলো। পৃথিবীটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেলো, থমকে গেলো এক নিমিষেই! ওর তখন মনে হলো, সত্যিই তো! সে নিজেই তো মাকে মেরে ফেলেছে। ওর জন্যই তো সব, সে দায়ী। ওর উচিৎ শাস্তি পাওয়া, পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাস্তি, মাকে মেরে ফেলার মতো জঘন্য অপরাধের শাস্তি!

______________

বেশ কয়েকমাস তীব্র চেষ্টার পর আইনি ঝামেলা সেরে তাখলিফকে মুক্ত করা হয়। কেননা, পুলিশের হাতে শক্ত কোনো প্রমাণ ছিলো না ওর বিরুদ্ধে। তাখলিফ তখন মানসিকভাবে পুরোপুরি বিধস্ত। ওর দিনটা আটকে ছিলো সেই ১৩ই সেপ্টেম্বরের ট্র‍্যাজেডিতে, মায়ের মৃত্যু দিনে। ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে থাকেন সানওয়ার হক, কিন্তু যৌথ পরিবারে থেকে তা সম্ভব হচ্ছিলো না৷ রাত-বিরেতে তাখলিফের চিৎকার, মায়ের জন্য পাগলামি, আর নিজের ব্যর্থতা তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো৷ ভেতরে সে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিলো। এদিকে সবাই মানসিকভাবে তাখলিফকে সাহায্য করলেও ঠিক ওর মতো খু’নিকে বাড়িতে সহ্য করতে পারছিলেন না পাখি বেগম।

সানওয়ার হক বিচক্ষণ মানুষ। পাখি বেগমের মনের অবস্থা ধরতে বেগ পেতে হলো না তার৷ তাছাড়া ছেলের মানসিক অসুস্থতার জন্য পুরো পরিবারকে তিনি ভুগাতে চান নি। তাই সিদ্ধান্ত নেয় তাখলিফকে নিয়ে আলাদা থাকার। সবার আপত্তি স্বত্তেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। সানওয়ার হক ছেলেকে সামলাতে নিজের চাকরি ছাড়লেন। ব্যবসায় ইনভেস্ট করলেন। সাইকোলজিস্টের পরামর্শ মতো ছেলের ট্রিটমেন্ট, থেরাপি চালাতে থাকেন। পড়াশোনাটা আবারও চালু করেন তাখলিফের। ওকে সুস্থ একটা জীবনে ফিরিয়ে আনতে কয়েকটা বছর লেগে যায় সানওয়ার হকের। শুধুমাত্র বাবার কারণেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বাধ্য হয় তাখলিফ! তার অভিশপ্ত জীবনে বাবা ছাড়া তাই আর কাউকে জায়গা দিতে চায়নি সে! অথচ প্রকৃতির অদ্ভুত নিয়মে তাকে খু’নি বলে মেনে আসা নারীর অতি আদরের ছোট মেয়েটিই তার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। কি আশ্চর্য প্রকৃতির খেলা…


__

[ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি। ]

চলবে…