#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-১৮
অতীতের সেই রগচটা, জেদি ছেলেটা এরপর নিজেকে একটা গন্ডির মধ্যে আটকানোর চেষ্টা করে। নিজের স্বভাবসুলভ স্বকীয়তা ত্যাগ করে নিজেকে পালটে ফেলার চেষ্টা করে। রাগ, জেদ নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। সেইসাথে যোগাযোগ, আত্মিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেয় অতীতে জড়িয়ে থাকা সবার সাথে। এমনকি তমালিকার বাপের বাড়ির লোকেদের সাথেও। সবকিছু বাদ দিয়ে নিজেকে তীব্রভাবে স্বাভাবিকতার বেড়াজালে আটকে ফেলতে চায়। কিন্তু! ওই! ভাগ্য তাকে বারবার একটা গোলকধাঁধার সামনে এনে দাঁড় করায়, যেখান থেকে বেরুনোর কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যায় না, যে গোলকধাঁধায় ঘুরেফিরে বারবার তিক্ততা আর একরাশ দুঃখের গল্প পথ আটকে বসে
থাকে।
একদিন, দু’দিন, এক সপ্তাহ!
দিনগুলো কাটতে থাকে। প্রায় রাতেই, যেদিন ঝুমুরের মুখভার থাকে বা মায়ের সাথে কথা কাটাকাটি হয় সেদিন তাখলিফ ওর মন ভালো করার জন্য ঝুমুরের আবদারেই ওর সাথে দেখা করে। ঝুমুরের শত অভিযোগ, চোখের পানি সে দু’হাতে মুছে নেয়। ললাটে দেওয়া উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়াতে মিলিয়ে যায় ঝুমুরের দুঃখগুলো। তাখলিফ বসে বসে শোনে এই মেয়েটার শতশত গল্প। ওর দু-চোখ ভরা স্বপ্নগুলো মনের আকাশে ডালা মেলে ওড়ে বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছায় তাখলিফের মনের গহব্বরেও। অথচ বোকা প্রণয়িনী তা টেরই পায় না। তাখলিফ কখনো আনমনে হাসে। বাকি রাতটুকু কেটে যায় এভাবেই। ভোরের আলোতে সৌন্দর্যে ডুবা পৃথিবী নামক গ্রহটির প্রথম প্রহরেই সে আবারও ফিরে আসে তিনতলায় নিজের ঘরটিতে। সানওয়ার হক তার সবকিছুই টের পান, তবে কিছুই বলেন না। আজকাল বাবার গাম্ভীর্যতা অবশ্য বড্ড ভাবায় তাখলিফকে। কি এত ভাবে কে জানে! কয়েকবার জিজ্ঞেস করেও লাভ হয়নি, বিষয়টা এড়িয়ে গেছেন তিনি। তাই তাখলিফও বাবাকে আর ঘাটায় না।
______
এমনই এক দিন মেয়ের ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে
পাখি বেগম ক্ষেপে ওঠেন ঝুমুরের প্রতি। আন্দাজ করে ফেলেন তার এই মেয়েটি তাখলিফের সাথে লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখা করে। অথচ তিনি স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়েসুঝিয়ে মেয়েকে এমন করতে ‘না’ করে দিয়েছিলেন। তারপরও মেয়ে তার কথা শোনে নি? এজন্যই এতদিন চুপচাপ ছিলো আর ভেতরে ভেতরে এতদূর? পাখি বেগমের পুরো গা জ্বলে ওঠে। ঝুমুরকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে। মায়ের রাগী মুখ দেখে ভয় পেয়ে ঝুমুর অস্বীকার করে। কিন্তু পাখি বেগম তাতে আরও রেগে যায়। চড়-থাপ্পড় দিতেই ঝুমুর স্বীকার করলেও পাখি বেগম থামেন না। সেদিনের মতো আবারও মারধর করেন। এদিকে মায়ের চেঁচামেচি, হৈচৈ এবং দুশ্চিন্তায় ঝুমুর পুরো চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করে। প্রমিলা আর তুসি এসে আটকায় পাখি বেগমকে। ততক্ষণে অবশ্য জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে ঝুমুর। পাখি বেগম রাগে ফুঁসতে থাকলেও মেয়ের অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে যান। প্রমিলা আর তুসিও ভীতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। মাথায় পানি-টানি ঢেলে, হাত-পায়ের তালু ম্যাসাজ করতে থাকে সবাই মিলে। তবুও জ্ঞান ফেরে না ঝুমুরের। বাড়িতে তখন তেমন কেউ ছিলো না। তুসি ফোন করে ইয়াসিফকে। অফিসের ব্যস্ততার মাঝে বোনের এ খবর পেয়ে সেও ভড়কে যায়। অফিস থেকে তৎক্ষনাৎ ছুটি চাইলেও তা মেলে না। বাধ্য হয়েই সে তাখলিফকে খবরটা জানায়।
অফিসের কাজের চাপের পাশাপাশি এসব কাহিনী
শুনে তাখলিফের মাথা হ্যাং হয়ে যায়। একজন
অভিজ্ঞ ডাক্তারকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। তেমন
কিছু বাড়াবাড়ি দেখলে হসপিটালাইজড করতে হবে ভেবেই রাখে তাখলিফ! বেল বাজাতেই দরজা খুলে দেয় প্রমিলা। তাখলিফ হন্তদন্ত হয়ে ঝুমুরের ঘরে ঢুকে। ওকে দেখেই পাখি বেগম কান্না থামিয়ে গজগজ শুরু করলে সেও জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। ওর এমন দৃষ্টি দেখে পাখি বেগমও আশ্চর্য হয়ে যান৷ এই ছেলের সাথে কোনোদিনও তার বনিবনা না হলেও এমন অসম্মান করেনি। কিন্তু আজ? তিনি মেয়ের অসুস্থতার কথা চিন্তা করে আর কথা বাড়ায়নি। ডাক্তার ঝুমুরকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে জানায়,
তেমন গুরুতর কিছু নয়। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আর খাওয়াদাওয়ার অনিয়মের ফলেই এরকম হয়েছে। এরজন্য হাসপাতালে নিতে হবে না। ডাক্তারের পরিচর্যা পেয়ে ঝুমুরের জ্ঞান ফিরে আসে। সকলেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এদিকে তাখলিফকে দেখে দুর্বল গলায় কিছু বলতে চায় ঝুমুর, কিন্তু তাখলিফ তা হতে দেয় না। ডাক্তার ওকে ঘুমের ইনজেকশন পুশ করে। যার ফলে ঝুমুর গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। এরপর ডাক্তারের পরামর্শগুলো চুপচাপ শুনে তাখলিফ। তাকে বিদায় দিয়ে প্রেসক্রাইব করা ঔষধগুলো নিয়ে বাড়ি চলে আসে। এবার দোতলায় গিয়ে অভাবনীয় এক কান্ড ঘটায় সে। ঝুমুরের ঘরে গিয়ে ঘুমন্ত ঝুমুরকে দু’হাতে পাঁজাকোলা করে তুলে তিনতলায় নিয়ে আসে পাখি বেগমের সামনে দিয়ে। তুসি, প্রমিলা অবাক হলেও কিছু বলার সাহস করে না। কিন্তু পাখি বেগম ঠিকই সাপের মতোন ফুঁসে ওঠেন৷ তাখলিফ তাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে ঝুমুরকে এনে নিজের ঘরে শুইয়ে দেয়। এরপর অফিসের পোশাক ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে ঝুমুরকে জড়িয়ে ধরে ওর পাশে নিজেও ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে। ক্লান্ত বিকেলের মোহমায়া গোধূলির আলোতে ঝুমুরের রক্তিম আভা ছড়ানো মুখ খানি অবলোকন করতে করতে সেও ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়।
________
অবসন্ন, দুর্বল চোখজোড়া বহুকষ্টে মেলতেই নিজেকে অচেনা এক জায়গায় আবিষ্কার করে ঝুমুর। দু’পাশে মাথা নেড়ে চোখ পিটপিট করে কোথায় আছে বোঝার চেষ্টা করতেই গম্ভীর কণ্ঠস্বরটি শুনতে পায়,
“ঘুম কেমন হয়েছে?”
ঝুমুর চট করে মাথা তুলে। বিছানার হেডবোর্ডে হেলে বসে আছে তাখলিফ। দৃষ্টি হাতের ল্যাপটপে। ঝুমুর আশেপাশে তাকাতেই বুঝে যায় ও এখন কোথায় আছে। কে এনেছে? তাখলিফ? ভয়ে শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বেয়ে যায়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভয় পেয়ে ঢোক গিলে। কে জানে কি অশান্তি হয়েছে! ও ওঠে বসে। ভয়ে ভয়ে নির্লিপ্ত তাখলিফকে জিজ্ঞেস করে, “আমাকে এখানে এনেছেন কেন?”
তাখলিফ ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই উত্তর দেয়,
“আজ থেকে এখানে, আমার সাথে থাকবি।”
ঝুমুর আসন্ন বিপদ আশঙ্কা করে ঢোক গিলে বলে,
“সবাই কি ভাববে? না না, মা-বাবা খুব রাগ করবে। অহেতুক অশান্তি হবে…”
তাখলিফ এবার ল্যাপটপটা ছুঁড়ে মারে বিছানার একপাশে। অগ্নিদৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে। ভয়ে ঝুমুরের আত্মা তখন নাই হয়ে গেছে। ও কাঁপা গলায় কিছু বলতে যাবে তার আগেই তাখলিফ ওর দুবাহু চেপে ধরে। এরপর চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করে ছোট করে জিজ্ঞেস করে, “আবারও মেরেছে?”
ঝুমুর একটু ধাতস্থ হয়। চোখ নিচু করে দুপাশে মাথা নাড়ায়। যার অর্থ ‘না।’ মিথ্যে শুনে হাত-পায়ের তালু নিশপিশ করতে থাকে তাখলিফের। গালে সটান এক ‘চড়’ বসাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তা না করে দাঁতে দাঁত চেপে হুমকি দেওয়া স্বরে মৃদু হেসে ওর গালে হাত রাখে, “আমার সাথে মিথ্যে বলবে না। একদম পছন্দ করি না বাবু…”
ঝুমুর আপ্লূত হয়ে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে বলে,
“মেরেছে।”
“সেটা তো বুঝতেই পেরেছি। এবার ঝটপট কারণটা বলে ফেল।”
ঝুমুর ক্ষোভিত কন্ঠে বলল,
“আপনাকে বাজে বলছিলো। আমার কষ্ট লাগে।”
দু-মিনিট চুপ থেকে রাশভারী কন্ঠে তাখলিফ বলল,
“কেন যেচে পড়ে মার খেতে যাস? ওরা আমাকে যা দেখেছে তাই বলে। তো ঠিক আছে, বলতে দে। আমি তো তাদের মুখ আটকে রাখিনি। আই ডোন্ট কেয়ার। তাহলে তুই কেন কষ্ট পাবি? স্ট্রং হ!”
ঝুমুর ফট করে ওর দিকে চোখ তুলে তাকায়। মিনমিন করে বলে, “আমাকে যদি কেউ বাজে বলে, তাহলে আপনিও চুপ করে থাকতেন? না তো? আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।”
তাখলিফ সূক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। এটাই কি স্বামী-স্ত্রী’র বন্ধন? একে অপরের পরিপূরক?একজনকে পৃথিবীব্যাপী সবাই মিলে আক্রমণ করতে এলে অন্য মানুষটা এসে প্রতিবাদ জানায়? লড়াই করে? হ্যাঁ, তাই! ঝুমুরের নামে কেউ ওর সামনে কেউ অপমানজনক কিছু বললে সে নিজেও হেস্তনেস্ত করে ছাড়ে। যেমন করেছিলো ঝুমুরের পিছু লাগা সব ক’টা বখাটে আর জে’লফেরত গুন্ডা কবিরের! হুহ! ওকে আনমনে ভাবতে দেখে ঝুমুর নাক টেনে
আপ্লুত কন্ঠে বলে, “আপনি কেন ওমন ভুল করেছিলেন? না করলে আজ বাবা-মা নিদ্বিধায় আপনাকে মেনে নিতো। আমাদের খুব সুন্দর, ছোট্ট একটা সংসার হতো। যেখানে মন খারাপের জায়গা নেই, যেখানে— আমরা, আমাদের পরিবার নিয়ে সুখী থাকতাম।”
তাখলিফ বুকের ভেতর মেঘ পাকানো দীর্ঘশ্বাসটা বের করে সময় নিয়ে। আর্ত কন্ঠে শুধায়, “কোনটাকে বড় ভুল বলবো আমি? সতেরো বছরের তাখলিফের করা সেই নিকৃষ্টতম অন্যায়টাকে নাকি ছাব্বিশ বছরের তাখলিফ হাসান তূর্যের সজ্ঞানে করা ‘বিয়ে’ নামক অন্যায়টাকে? দুটোর জন্যই তো প্রতিনিয়ত পস্তাচ্ছি আমি। আমার জীবনটা ভুলেই ভরা রে ঝুমুর। সবকিছু ভুল, সব অন্যায়। তোকে বিয়ে করাটাও ভুল। সেদিন যদি…”
ঝুমুর ওর মুখে হাতচাপা দিয়ে কথা আটকালো। দু’পাশে মাথা নেড়ে ম্লান গলায় বলল, “আমি ভুল ,অন্যায় কিছুই মনে করি না৷ এটা নিয়তি। আপনি আমার হবেন সেটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো।”
তাখলিফ আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু’হাতে ঝুমুরের মুখটা আগলে নিয়ে বলল, “তোর আফসোস হয় না, ওমন একটা খু’নিকে মন দিয়ে বসে আছিস? রাতে লুকিয়ে তার সাথে দেখা করতে হয় চোরের মতো! মনে প্রশ্ন জাগে না? আমার তো অনুশোচনা হয় রে!”
ঝুমুর সন্দেহী চোখে তাকায়। অবাক গলায় ফিসফিস করে উত্তর দেয়, “আমি তো কোনো খু’নিকে মন দিইনি। আমার স্বামীকে মন দিয়েছি। আমার তো জীবনে একটা প্রেমিকও ছিলো না…”
তাখলিফ চট করে নিষ্পলক ওর দিকে তাকায়,
“তোর প্রেমিকের অভাব নেই ঝুমুর। এক্ষুনি বললে রাস্তায় লাইন লেগে যাবে ছেলেপেলেদের। সেখানে আমাকেই কেন এত ভালোবাসলি? কি দিয়ে শোধ করবো বলতো?”
ঝুমুর কথা ঘুরানোর জন্য হেসে বলল, “এই আপনাকেই দিয়ে দিন। আর কিছুই লাগবে না আমার। সেদিনের ওই মোটা অঙ্কের চেকটাও না…”
“মারবো চড়। ওটা তোর হকের টাকা। এইযে তোকে ছুঁলাম, এটা এখন পুরোপুরি হালাল।”
ঝুমুর মুগ্ধচোখে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। এরপর আবারও ওর বুকে মুখ গুঁজে দিলো। মিনমিন করে শ্বাস টেনে বলল, “আপনার পারফিউমের স্মেলটা দারুণ।”
তাখলিফ রয়েসয়ে বলে,
“তোর শ্যাম্পুরটাও।”
হেসে ফেললো ঝুমুর। ওর ইচ্ছে করছে এই লোকটার চোখেমুখে অসংখ্য চুমু দিতে৷ কিন্তু লজ্জায় পারছে না। যদি রেগে আবার চড় মেরে দেয়? কেউ শুনে ফেললে সর্বনাশ হবে তখন।
_______________
সাজেদা বেগম আর প্রমিলা ছাড়া দোতলার সব ক’টা মানুষ আজ তিনতলায়। বসার ঘরে আলোচনা বসেছে। ঝুমুরকে না বলে কয়ে এভাবে নিয়ে আসায় শামসুল হক বেজায় ক্ষেপেছেন। আর তাতে আরও ঘি ঢেলেছেন পাখি বেগম। স্বামীকে সত্যমিথ্যা বুঝিয়ে তিনি এনেছেন যাতে করে তাখলিফকে আজ সবার সামনে অপদস্ত অবস্থায় দেখতে পান! কিন্তু তার কিছুই হচ্ছে না। উলটে তাখলিফের কথাগুলো শুনে বসার ঘরে ক্রমে ক্রমে বি’স্ফোর’ণ হচ্ছে। সানওয়ার হক, সাঈদ হক থমথমে মুখে বসে আছে। পাখি বেগম আর শামসুল হক জ্ব’লন্ত চোখে তাকিয়ে আছেন তাখলিফের দিকে। সবার এমন স্তব্ধতা দেখে কোনোরকম হেলদোল হলো না ওর। দ্বিতীয়বারের মতো বলল, “ঝুমুরকে আমি নিয়ে এসেছি। এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে। তাতে আপনাদের আপত্তি থাকুক বা না থাকুক ডা’জেন্ট ম্যাটার। আমি কিন্তু কারোর অনুমতি চাচ্ছি না, নিজের সিদ্ধান্ত জানাচ্ছি। ক্লিয়ার?”
পাখি বেগম গলা উঁচু করে কিছু বলতে চাইলেন। তাকে থামিয়ে দিলেন শামসুল হক। শান্ত গলায় তাখলিফের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু আমার মেয়েকে তো আমি তোমার কাছে দেবো না।”
তাখলিফ নির্দ্বিধায় বলল,
“আপনার কাছে তো আমি ওকে চাইতে আসিনি চাচাজান! তাহলে অহেতুক কথা কেনই বা বাড়াচ্ছেন? সব কথার এক কথা হলো, ওকে এখান থেকে কোথাও যেতে দেবো না।”
শামসুল হক তাখলিফের বেয়াদবিতে মনে মনে ফুঁসে ওঠলেন। বাইরে তা প্রকাশ না করে বললেন,
“তোমার স্পর্ধা দেখে অবাক হইতেসি। আমার সামনে খাড়ায়া বলতাসো আমার মেয়েরে দিবা না?”
“জি চাচাজান। আমি আপনাদের পরোয়া করি না।”
শামসুল হক বিস্ময়ে, ক্রোধে জর্জরিত কন্ঠে বললেন, “বড়ভাই আপনার পোলারে সামলান কইতেছি৷ আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েন না।”
সানওয়ার হক দীর্ঘশ্বাসটুকু গোপন করলেন। চিন্তায় চিন্তায় তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। এক ধাক্কায় বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে তার। বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে যতটা না তার টেনশন তারচেয়ে শতগুণ চিন্তা হচ্ছে ছেলে সত্যি জেনে যাবে এই আশায়। মেজোভাইটার এমন রুপ তাকে ক্রমেই বিচলিত করছে। স্বার্থে আঘাত লাগলে যে বড় ভাইকেও সে মান্য করবে না তা তিনি আগেই বুঝেছেন। তিনি নরম চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে নম্র ভাবে কথা চালানোর অনুরোধ করলেন। কিন্তু তাখলিফ বাবার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলো না। কারণ সেও জানে, বাবা এখানে নীরব ভূমিকা পালন করবে৷ ও নিজেও তাই করবে ভেবেছিলো। ঝুমুরের পিঠের আঘাতগুলো পরোক্ষভাবে ওকে যন্ত্রণা দিচ্ছিলো প্রতিক্ষণে। যা ওর শান্তি, ঘুম বিনষ্ট করেছে। এতেও ধৈর্য্য ধরার চিন্তা করেছিলো সে, কিন্তু পুনরায় ঝুমুরকে বেধড়ক আঘাত করায় ওর পুরুষালি সত্তা, স্বামী সত্তা একবিন্দু পরিমাণ সহ্য করতে পারছে না পাখি বেগম নামক শ্রদ্ধেয় মেজোচাচী তথা নিকৃষ্ট শ্বাশুড়িকে। তাই সব ঝেড়ে কেশে এবার সে নিজেই হেস্তনেস্ত করবে ভেবেছে। ঝুমুরকে নিজের কাছেই রাখবে এটাই শতভাগ সত্যি। তাতে কার কি হলো,
কে কি চাইলো, কে কি ভাবলো সেসব দেখার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই ওর। তাখলিফকে এমন নির্বিকারচিত্তে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শামসুল হক এবার তেজ দীপ্ত কন্ঠে আসল কথাটা বললেন, “তোমাদের বিয়েটা যেভাবে হয়েছে সেটা অনাকাঙ্খিতভাবে। আমি সেটা অস্বীকার করছি না। তবে তোমার কাছে থাকলে আমার মেয়ে কেন কারোর জীবনেই ক্ষতি ছাড়া ভালো কিছু হবে না তা আমি হলফ করে বলতে পারি। আর সেইজন্যই আমি এখন তোমাদের ছাড়াছাড়ির ব্যবস্থা করছি। তুমি এবার আমার মেয়েটাকে রক্ষে দাও…”
তাখলিফ শুনলো। সময় না নিয়ে পরক্ষণেই ভাবুক গলায় বলল, “আমার কাছে থাকলে আমার বউয়ের ক্ষতি হবে, আর আপনাদের কাছে থাকলে সুরক্ষিত থাকবে? তাই বলতে চাচ্ছেন?”
তাখলিফ আজ নিদ্বির্ধায় ঝুমুরকে ‘ঝুমুর’ না বলে সরাসরি ‘বউ’ বলছে। শামসুল হক কিঞ্চিৎ থতমত খেলেন, এরপর মাথা দোলালেন। তাখলিফ তা দেখে শ্লেষের হাসি হাসলো। এরপর আচমকাই চোখমুখ র-ক্তবর্ণ হয়ে এলো ওর। দরজার পাশে থাকা ফুলের টবে লাথি মেরে ক্রোধিত কন্ঠে বললো, “আপনার মেয়ে আইনত, শরীয়ত আমার বউ। গুণে গুণে আড়াই বছর হতে চললো আমাদের বৈবাহিক সম্পর্কের। এখন অবধি একটা চড় ছাড়া কোনোদিন ওকে তেমনভাবে ছুঁয়েও দেখলাম না, সেখানে আপনার স্ত্রীর সাহস কি করে হয় অমানুষের মতো আমার বউয়ের গায়ে হাত তোলার?”
সবাই চমকে ওঠলো তাখলিফের আকস্মিক ক্রোধ বর্ষণে। সকলেই স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো কিয়ৎক্ষণ। বাড়ির ছোট সদস্যরা সবাই ভেতর ঘরের পর্দার আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে কাহিনী দেখছে, আর ঝুমুর তাখলিফের ঘরে বসে বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। তুসি তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, কিন্তু তাতে কান্না না থেমে ক্রমশই বাড়ছে। ইয়াসিফ চুপচাপ তাখলিফের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মা-বাবার বাড়াবাড়িতে ওর নিজেরই মনে ক্ষোভ জন্মাচ্ছে। এমন প্যাঁচালো মানুষ তো তারা নন, কেন এমন করছে! জিজ্ঞেস করেও উত্তর পায়নি কোনো। এদিকে তাখলিফের কাটকাট কথাগুলো শুনে ক্রোধে ভেতরটা পুড়তে লাগলো পাখি বেগমের। এতগুলো মুরুব্বি মানুষের সামনে ছেলেটা যেভাবে কথা বলছে দেখেই তার লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। স্বামীর আদেশে তবুও তাকে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু মনে মনে তিনি এবার ঠিক করে ফেলেছেন, উল্টাপাল্টা কিছু হলে তিনি আর কোনো রাখঢাক করবেন না। আগুন লাগিয়ে দেবেন একদম। কি ভেবেছে তাকে? তার আদরের মেয়েকে দিয়ে দেবে ওমন একটা ছেলের হাতে? কক্ষণো নাহ! ভাবনার মাঝেই মুখ ফসকে বিচার দেন তিনি, “দেখছেন বড়ভাই আপনের পোলার ব্যবহার? ওদের তো দেখাশোনা করতে বারণ আছিলো৷ কিন্তু ও-য় রাতে দোতলায় যায়, ওর কি
ওইখানে? রাইতে একঘরে ঝুমুরের লগে…”
বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে গেলো তাখলিফের মন-মস্তিষ্ক। এই মহিলা নিজের মধ্যে নেই নাকি? পাখি বেগমকে তার কথার মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে চোয়াল শক্ত করে ও বলে ওঠলো, “আমি তো আমার বউয়ের কাছে যাই মেজোচাচী। এখন ঘরের ভেতর কি করি না করি সেটাও সবাইকে বলতে হবে? তাহলে তুমি কেন বলছো? তুমি তো তখন ঘরের ভেতর থাকো না, থাকি আমি। আমাকেই জিজ্ঞেস করো ওখানে গিয়ে কি করি! তোমরা আগ্রহী হলে আমি রচনা বলা শুরু করবো…”
সকলেই অপ্রস্তুত হলো। ইয়াসিফ কেশে ওঠলো।
লজ্জায় মাথা কাটা গেলো পাখি বেগমের। সকলেই একপলক তাখলিফকে লক্ষ্য করলো। এই ছেলের মুখ রাগে থমথম করছে। বেফাঁস কিছু বলে ফেলবে এটা নিশ্চিত। তাই আলোচনা সভা ভেঙে গেলো। যে যার মতো এদিকওদিক সটকে পড়লো। পাখি বেগম আহাম্মকের মতো চলে যেতে নিলে তাখলিফ তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রাগত স্বরে বলল, “মেয়ের মা হয়ে মেয়েকে অসম্মান করছো, কেমন
মা তুমি? রাতে কি আড়িও পাতছিলে আমাদের ঘরে? প্রচন্ড লেইম ব্যাপার এটা চাচী, প্রচন্ড লেইম।”
তাখলিফের দেওয়া জ্ঞান শুনে পাখি বেগমের মুখটা
দেখার মতো হলো একদম!
’
___________________
চলবে…
#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-১৯
সেদিন রাতটা ঝুমুর তিনতলায়ই রইলো। তাছাড়া ওকে কোথাও যেতে দিতে রাজি হয়নি তাখলিফ নিজেও। তবে সবাই চলে যাওয়ার পর যখন ঘরে এসে দেখলো ঝুমুর কেঁদেকেটে চোখমুখের বেহাল দশা করে রেখেছে তখন ও খুব মনক্ষুন্ন হলো। এমন তো নয় ও জোর করে আটকে রেখেছে। তাহলে এভাবে কাঁদার কি আছে? তাহলে কি ঝুমুর ওর ঘরে, আপন মানুষদের কাছে ফিরতে চাচ্ছে? তাখলিফের কাছে নিজেকে সেইফ ফিল করছে না? এটুকু চিন্তা মনে আসতেই ওর চোখমুখ অন্যরকম হয়ে চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। এখানে থাকলে এখন মাথা গরম করে কিছু বলে ফেলবে সে, তাই এখান থেকে সরে পড়াই ভালো। রাগ সামলানোর জন্য ফ্রেশ হতে তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢোকার আগে বিমর্ষ গলায় ও ঝুমুরকে বলল, “চলে যেতে চাইলে চলে যা। আমি তোকে জোর করে রেখে দেবো না।”
তাখলিফের সেই হতাশ গলায় বলা কথাটুকু শুনে তখনি কান্নাকাটি বন্ধ করে একদম চুপ করে গেলো ঝুমুর। নাহ! লোকটাকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না। ওর জন্য সবার সাথে এত ঝামেলা করলো এখন ও-ই যদি প্যারা দেয় তাহলে মানুষটা যাবে কোথায়? ঝুমুর দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এরপর কিছুটা সময় ব্যয় করে তাখলিফের ফ্রেশ হওয়ার সময়টুকুতেই ওর ঘরটা গুছিয়ে দিলো, ঘর ঝাড়ু দিলো৷ এরপর ঘরের মাঝে কিছুক্ষণ পায়চারি করে মাথায় ওড়না টেনে গিয়ে দাঁড়ালো সানওয়াক হকের ঘরের দরজায়। ভেতর থেকে আটকানো থাকায় ঝুমুর ভয়ে ভয়ে দু’বার টোকা দিয়ে মিনমিনে কন্ঠস্বরে বলল, “বড়চাচ্চু, অনেক রাত হয়েছে। আপনারা কি খাবেন? আমি কি কিছু রান্না করবো?”
সানওয়ার হক ব্যস্ত ছিলেন ব্যবসায়িক ফোন কলে। আচমকা ঝুমুরের এমন জিজ্ঞাসায় তিনি অনেকটা অবাকই হলেন। ঝুমুর এখন শুধু তার ভাইয়ের মেয়েই নয় তার একমাত্র ছেলের পুত্রবধূ ভাবতেই খানিকটা আড়ষ্ট বোধ করলেন তিনি। পরক্ষণেই হালকা কেশে উত্তর দিলেন,
“রান্না করাই আছে মা। আমার খাওয়া হয়ে গেছে, তুমি তাখলিফকে নিয়ে খেয়ে নাও। সারাদিন তো ধকলেই কাটলো। আমার জন্য ব্যস্ত হয়ো না।”
ঝুমুর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। চাচা তার সাথে সহজ স্বাভাবিক ব্যবহারই করছে। যদিও ভাবেনি, তবে একটু আশা করেছিলো। আশাটা পূর্ণ হওয়ায় ওর ঠোঁটের কোণে হাসির ছোঁয়া দেখা গেলো। ও নিজমনে হেসে রান্নাঘরে গেলো। প্লেটে সুন্দর করে খাবার বাড়লো। এরপর ডাইনিংয়ে রাখতে গিয়ে মনে হলো অন্য একটা কথা। ধীরপায়ে হেঁটে তাখলিফের ঘরে চলে এলো প্লেট নিয়ে। খাবার নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো ওর জন্য। এতক্ষণ সময় নিয়ে কোনো ছেলে গোসল দেয়, সেটা আজই প্রথম দেখলো ঝুমুর। সেইসাথে অবাক এবং বিরক্ত দুটোই অনুভব করলো। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল সেরে তাখলিফ যখন বেরুলো তখন দেখলো ওর জন্য অপেক্ষা করতে করতে বালিশে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেছে ঝুমুর। এলোমেলো চুল ওর মুখে আছড়ে পড়ছে, গাল দুটো গোলাপি আভা ছড়াচ্ছে যেন। চোখের নিচে দুশ্চিন্তার কালি জমেছে, তবুও কি ভীষণ মোহময় লাগছিলো ঝুমুরকে! তাখলিফ একদৃষ্টে অনেকক্ষণ ওর স্নিগ্ধরুপ উপভোগ করলো। একটা সময় ওর অস্তিত্ব টের পেয়ে ধড়ফড় করে ওঠে বসলো ঝুমুর। তাখলিফকে দেখে হাফ ছেড়ে বাঁচলো এমন ভঙ্গিতে হাসার প্রচেষ্টা চালালো। এরপর বেড সাইড টেবিল থেকে খাবারের প্লেটটা এনে ভাত মাখালো যত্ন করে। তাখলিফ বসে বসে সূচালো চাহনিতে ওর কর্মকান্ড দেখছিলো। মুখের সামনে ভাতের লোকমা ধরে ঝুমুর আদেশের সুরে বলল, “খেয়ে নিন।”
তাখলিফ ভাত নিলো না। আগের মতোই বসে রইলো। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তখন এত কান্নাকাটি করলি, গেলি না যে?”
ঝুমুর নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল, “ইচ্ছে করেনি।”
“কেন?”
“বাপের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি পাইনি যে!”
“আমি তো দিলাম।”
“খুশিমনে তো নয়।”
তাখলিফ এ পর্যায়ে মৃদু হাসলো। বলল,
“এতো বেশি মানিস কেন আমাকে? আমি কিন্তু ডিসেন্ট, পার্ফেক্ট ম্যান নই। আমার ভুল, খুঁত এত বেশি যে তুই এসবের নিচে চাপা পড়লে একদম হারিয়ে যাবি। তাই এতো মানিস না আমাকে।”
ঝুমুর এই প্রথম খানিকটা চোখ রাঙালো ওকে। ভাতের লোকমাটা জোর করে মুখের সামনে ধরে চোখের চাহনি দিয়ে বোঝালো তা খেয়ে নিতে। তাখলিফ চুপচাপ মেনে নিলো সেটা। ঝুমুর দ্বিতীয় লোকমাটা তৈরি করতে করতে বলল, “আপনার কি মনে হয় আমি খুব পার্ফেক্ট? খুঁত নেই?”
“অভিয়েসলি।”
ঝুমুর শ্লেষাত্মক হাসলো। আরকোনো কথা না বলে সময় নিয়ে খাওয়ানো শেষ করে সব গুছিয়ে রাখলো। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত সাড়ে বারোটার আশেপাশে। তাখলিফ বাবার খোঁজ নিয়ে এসে বিছানা তৈরি করে ঘরের আলো নিভিয়ে দিলো। হলদে, নীল মিটমিটে একটা মায়াবী আলোয় এরপর পুরো ঘরটা ভেসে গেলো। তাখলিফ ঝুমুরকে নিয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়। এরপর বুকে টেনে নিলো। এই প্রথম, বাড়ির সব মানুষ জানে ওদের দুজনের একসাথে থাকার ব্যাপারটা। মনে মনে শিহরিত, রোমাঞ্চিত হলো ঝুমুর। সেইসাথে ভয় ভয়ও করলো পরবর্তী ঝামেলা আশঙ্কা করে। এরপর আচমকা বলল, “শ্রীমঙ্গলে যা ঘটেছিলো সেটাই আপনার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে তা আপনিও জানেন। সেদিন খারাপ ছেলেগুলো আমাকে কিছু না করলেও অনেকের কাছেই কিন্তু আমি কলঙ্কিনী।”
ওর উল্টাপাল্টা কথা শুনে তাখলিফের রাগ হলো। ঝুমুর ওকে শান্ত হবার জন্য মুখে হাতচাপা দিতেই ওর দৃষ্টি নরম হলো। তারপর হাতটা সরিয়ে গমগমে স্বরে বলল, “তুই একটা পবিত্র, শুদ্ধ মেয়ে ঝুমুর। তাই এসব বলে আমাকে রাগাবি না।”
“সেটা তো আপনি ভাবেন।”
“আমি ভাবলেই চলবে। অন্য কেউ কি ভাবলো না ভাবলো আই ডোন্ট কেয়ার৷ তাছাড়া পুরো গ্রামের মানুষের সামনে আমি প্রুফও করে এসেছি খারাপ ওরা ছিলো, তুই না…”
ঝুমুর মনে মনে পুলকিত হলো। স্বামীকে নিয়ে গর্ববোধ করলো মনে মনে। এরপর সেই রেশ ধরেই মুখ ফসকে বলল, “আপনি আসলেই একটু বেশি ভালো।”
একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৃঢ় স্বরে তাখলিফ বলল,
“আমি খুব খারাপ ঝুমুর। তুই যদি আমার ভেতরটা দেখতি, আমার মন পড়তে পারতি তাহলে বুঝতি এই আমার ঘাড়ে মাতৃহত্যার মতো পাপ জেঁকে বসে আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য পাপের বোঝা যার মাথায় আছে, সে কি করে ভালোমানুষ হয় বলতো আমাকে?”
“এইযে, এগারোটা বছর ধরে আপনার মনে অনুশোচনা, অপরাধবোধ আপনাকে জ্বালাচ্ছে, কষ্ট দিচ্ছে এতেই তো আপনি ভালো একটা মন পেলেন তাইনা? সোনা পুড়িয়েই তো তা খাঁটি বানানো হয়!”
তাখলিফ ওর বোকা বোকা যুক্তিতে হেসে ফেললো। ঝুমুর কপট রাগ নিয়ে বলল, “হাসার মতো কি হলো? আমি এত গুছিয়ে বলতে পারি না কিন্তু তবুও আমার কথাটা সত্যি।”
তাখলিফ হাসলো। ওকে টেনে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বলল, “আমাকে কিন্তু আর পাপ করতে দিস না ঝুমুর৷ আমি তোকে খুব যত্নে রাখতে চাই। যতটা যত্নে, আদরে রাখলে ভালোবাসাও ফিকে মনে হয় ততটা!”
“ভালোবাসার উপরে কিছু আছে? আমার তো মনে হয় না…”
তাখলিফ তাচ্ছিল্যের সাথে হাসলো,
“এইযে, তোকে আমার বুকে জড়িয়ে রেখেছি এতে কিন্তু আমার খুব শান্তি লাগছে, ভালো লাগছে। এইযে, আমার নিজের শান্তির জন্য তোকে নিজের সাথে জড়িয়ে ফেলেছি এটাতে তো আমার স্বার্থও জড়িয়ে আছে তাইনা? ভালোবাসার ওপরেও স্বার্থ কাজ করে বেশি।”
ঝুমুর শুনেও তেমন গা করলো না। বলল,
“থাকুক। নিজেকে ভালো রাখার জন্য একটু স্বার্থপর হলেও ক্ষতি নেই। নিঃস্বার্থ ভালোবাসাতে আবার এতো সুখও পাওয়া যায় না…”
“তুই খুব কথা শিখেছিস ঝুমুর।”
ঝুমুর বিজ্ঞের মতো বলল,
“বয়স হয়েছে, বিয়ে হয়েছে, স্বামী আছে, সংসার আছে কথা তো শিখতেই হবে। এখন একটা বাচ্চা হলে আমাদের সব পরিপূর্ণ হয়ে যাবে৷ তাই এটুকু কথা না জানলে…”
“ঝুমুর!”
তীক্ষ্ণ ডাকে কেঁপে ওঠলো ঝুমুর। কথার মাঝে বাঁধা পড়ায় মুখ উঁচিয়ে তাখলিফের পলক না ফেলা চোখজোড়া দেখতেই সংবিৎ ফিরে এল ওর। মুখ ফসকে একি বলে ফেললো ঝুমুর? সাথে সাথে কথার লাগাম টেনে চুপ হয়ে গুটিশুটি মেরে চাদরের নিচে মুখ লুকিয়ে শুয়ে পড়ে জিভ কাটলো। নিজের প্রতি রাগে মন বিষিয়ে গেলো ওর। কিভাবে মুখ দেখাবে এখন তাখলিফকে? রাগিয়ে দিলো না তো মানুষটাকে?
“তুই কি বাচ্চা চাস ঝুমুর?”
প্রশ্নটি শুনে ভীমড়ি খেলো ঝুমুর। হাত-পা কাঁপতে লাগলো। একি মুসিবত হলো? অপ্রস্তুত ঝুমুরকে দ্বিতীয়বার আবারও একই প্রশ্ন করলো তাখলিফ। এবারও জবাব না পেয়ে সে নিজেও চাদরের নিচে এলো। কাঁপতে থাকা ঝুমুরকে দেখে ঠোঁট টিপে হাসি আটকে নিচু স্বরে বলল, “আমি খুব ভালো বাবা হতে পারবো? তোর কি মনে হয়?”
ঝুমুর চোখজোড়া না খুলেই কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“খুব ভালো, খুব ভালো বাবা হবেন আপনি।”
“মা হতে ইচ্ছে করে?”
আকাঙ্ক্ষিত অথচ সুপ্ত একটা গোপন ইচ্ছে যা ঝুমুর ছাড়া আর কেউ ভাবে না, সেই প্রশ্ন পেয়ে ও অনেকক্ষণ উত্তরহীন রইলো। এরপর লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো। যার অর্থ “হ্যাঁ।” তাখলিফ একটু চমকালেও বোধবুদ্ধি হারালো না। দধীরেসুস্থে ওকে ওঠিয়ে বসিয়ে দু’হাতে মুখ আগলে ধরে নম্র স্বরে বলল, “এখন ভুলেও এসব ভাবিস না। সবকিছুর আগে এদিকটা সামলে নিই, তুইও গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট কর, ক্যারিয়ারটা গোছা। আমরা তারপর বেবি প্ল্যান করবো। আমাদের খুব ভালো বাবা-মা হতে হবে তো নাকি?”
ঝুমুর আচমকা ঠোঁট উলটে কেঁদে ফেললো। তাখলিফকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বলল, “সবসময় প্ল্যানমাফিক কিছু হয়না। এদিকটা সামলে নেওয়ার জন্য হলেও একটা বেবি আসা দরকার৷ তাহলে মা-বাবা এমনিতেই মেনে নিতে বাধ্য।”
তাখলিফ ওকে দূরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। রাগান্বিত কন্ঠে বলল, “আমাদের বেবিকে তুই ইউজ করবি? আমি তোর এতটা অধ:পতন সহ্য করবো না।”
ঝুমুর ওর হুঙ্কার শুনে আমতাআমতা করে বলল,
“না মানে আমার বান্ধবীরও প্রেমের বিয়ে। প্রথমে দুজনের ফ্যামিলিই মেনে নিচ্ছিলো না। এখন বাচ্চা হওয়ার কথা শুনে সবাই রাগ মাটি দিয়ে ওদের মেনে নিয়েছে। এখন ওরা খুব হ্যাপি।”
“আমাকে রাগাস না ঝুমুর।”
তাখলিফ ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। ওর রাগের মাত্রা অত্যাধিক বুঝে ঝুমুর অকপটে বলল, “সরি।”
তাখলিফ গম্ভীর স্বরে বলল,
“কি বললাম মনে নেই? খুব ভালো মা-বাবা হতে হবে আমাদের? কখনো আমাদের কষ্টের আঁচও আঘাত করতে না পারে, সেরকম পরিবেশ পেলেই বেবির কথা ভাববো৷ ওকে?”
ঝুমুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সায় জানালেও ওর মনে তখন অন্য চিন্তা। সবসময় অন্যদের বুদ্ধিতে চলতে গিয়েই তো আজ এই দশা। ঝুমুরের নিজের কি কোনো ইচ্ছে পরিপূর্ণতা পেতে পারে না? বয়স কম, বয়স কম যারা বলে তারা কি জানে না ঊনিশ বছরের একটা মেয়েও নির্দ্বিধায় মা হতে পারে? তাতে কোনো সমস্যাই হয় না!
সবার আদরের বলে এমন তো নয় ঝুমুর অবোধ, সে এসব খুব ভালোই বোঝে। বরং অন্যরা ওকে বুঝতে পারে না। এমনকি তাখলিফও ঠিকঠাক নয়। নয়তো ওর চোখ দেখে ঠিকই এক লহমায় বুঝে যেতো ঝুমুর কত করে একটা বাচ্চা আশা করছে তাদের ভালোবাসার পূর্ণতা হিসেবে! ঝুমুরকে ওমন নির্বিকার, চুপচাপ দেখে তাখলিফ কপালে ভাঁজ ফেললো।
ভ্রু কুঁচকে বলল, “বোকা ঝুমুর! একদম চালাকি করবি না…”
ঝুমুর ওর সন্দেহপ্রবন দৃষ্টি দেখে থতমত খেয়ে বলল,
“আমি আবার কি করলাম?”
তাখলিফ গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলল,
“মনে মনে যে ফন্দিটা করছিস তা শ্রীঘ্রই ঝেড়ে ফেল। যা বলেছি তার অন্যথা হলে আস্ত রাখবো না। কথাটা ভালোভাবে মাথায় ঢুকিয়ে নে। এখন ঘুমা…”
ঝুমুরকে এসব বলে শাসালো তাখলিফ। এরপর বিছানার মাঝখানে বালিশ রেখে অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়লো। ঝুমুর ত্বরিত চমকে ওঠলো এটুকু দূরত্ব দেখে। তাখলিফ বুঝে গেলো ওর মতলব? ধরে ফেললো? আর ও কি-না! ঝুমুর দু’হাতে মুখ ঢেকে শক্ত হয়ে বসে রইলো। ভয়ের সাথে সাথে লজ্জাও পেলো ভীষণ! তখনি তাখলিফের ধমকের সুর শোনা গেলো, “আমি সাধু পুরুষ নই। পরবর্তীতে উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেললে দোষ কিন্তু তোরই হবে, সেইসাথে কঠিন শাস্তিও পাবি। আমি তার ভাগিদার হবো না। একটু বোঝ ঝুমুর, ঘুমিয়ে পড়।”
ঝুমুর রেগে মাঝখানে রাখা বালিশটা ফেলে দিলো মেঝেতে। এরপর ওর পিঠের ওপর শুয়ে বলল,
“শাস্তি দিলে মাথা পেতে নেবো, কিন্তু দূরত্ব মানবো না।”
তাখলিফ ওর কান্ড দেখে হতচকিত হলো। ত্বরিৎ ধমকের সুরে বলল, “গাধী তুই এখনো অনেক ছোট। মেয়ে হোস তুই। একটুও লাজলজ্জা নেই। ছি ছি।”
ঝুমুর ওর কথা গায়ে মাখলো না। বরংচ অভিমানী গলায় বলল, “ওদিকে মুখ ফিরিয়েছেন কেন? নিজের ঘরে এনে অন্যদিকে মুখ ফেরানোর মানে কি? আমার দিকে ঘুরুন।”
“জেদ করবি না। উফ সর, খাওয়া দাওয়া করিস না একটুও। এত ভারী লাগছে কেন তোকে?”
“লাগুক। এটুকু ভার সহ্য করতেই হবে৷”
তাখলিফ হাল ছেড়ে দিলো। এই মেয়ের জেদের কাছে সে কিছুই পারবে না। মাঝেমধ্যে মনে হয় এই ঝুমুর অনেক বড়, অনেক বুঝদার। আবার কখনো একে গর্দভ, হাঁদারাম আর ভীষণ বোকা মনে হয়। তাখলিফ ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে নিঃশব্দে হাসতে হাসতে ঝুমুরের চুলে মুখ ডুবিয়ে দিলো। দুটো হাত বিচরণ করালো ঝুমুরের কামিজের কাটা অংশ দিয়ে ফর্সা উদরে। সেখানটায় হাতের মৃদু চাপ দিতেই লজ্জায় ঝুমুরের জারিজুরি ফুঁস করে উবে গেলো। তৎক্ষনাৎ পালাতে গেলেই তাখলিফ ওকে ধরে ফেললো। ওকে জোর করে বালিশে শুইয়ে দিয়ে কড়া গলায় বলল,
“এখন ঘুমাবি। আর কোনো নড়চড় টের পেলে কি যে করবো তোকে নিজেও কিছু জানিনা। তাই একদম ভালো, বাধ্য বউয়ের মতো থাক!”
ঝুমুর শুধু মাথা নেড়ে সায় জানালো। শান্ত হয়ে আঁকিবুঁকি শুরু করলো তাখলিফের কালো রঙের টি-শার্টের বুকে!
.
পরদিন আবারও সেই কর্মব্যস্ততার ভিড়ে ন’টা-ছ’টা অফিস করতে হলো তাখলিফকে। বাড়ি ফিরলো একটু দেরি করেই। হাতে কিছু ব্যাগপত্র নিয়ে দরজায় বেল বাজাতেই ঝুমুর এসে খুলে দিলো। তাখলিফ হুট করেই যেন বাড়িতে মেয়েমানুষ দেখে খানিকটা চমকে গেলো। পরক্ষণেই মনে পড়লো বর্তমান পরিস্থিতি। সবটা ভেবে ওর নিজেরই কেমন হাসি পেলো। ওকে মিটিমিটি হেসে ঘরে ঢুকতে দেখে ঝুমুর বিচলিত হলো। দরজা লক করে তাখলিফের পিছু পিছু ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এমন হাসছেন কেন? কি হয়েছে? খুশির মতো কিছু?”
তাখলিফ শার্টের বোতাম খুলছিলো। ওর প্রশ্ন শুনে সাথে সাথেই হাসিটা মিলিয়ে গেলো ওর। অপ্রস্তুত হেসে বলল, “কিছু না। বাবা কোথায়?”
“কাজে বেরিয়েছে। আজ ফিরবে না। আচ্ছা, বড়চাচ্চুর এত বয়স হয়েছে, আপনিও চাকুরি করেন। তাহলে চাচ্চুকে এখনো কাজ করতে দেন কেন?”
তাখলিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “একাকিত্ব জেঁকে ধরলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। আমি বাবাকে সবসময় এমন ছটফটে দেখতে চাই। নয়তো আমার হাসিখুশি বাবা ঘরকুনো হয়ে পড়বে, যা আমি নিজেই নিতে পারবো না। এরচেয়ে থাকুক নিজের মতো ব্যস্ত। লাইফটা ভালো এঞ্জয় করুক, ভালো থাকুক এতেই আমার চলবে।”
ঝুমুর ওর কথার আগামাথা না বুঝলেও এটা বুঝলো তাখলিফ বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে। এটা ভেবেই ওর ভালো লাগলো। তাখলিফ চেঞ্জ করার জন্য ক্লজেট থেকে কাপড় বের করতে নিলে ঝুমুর বলল,
“বিছানায় দেখুন…”
“কী দেখবো?”
প্রশ্ন করারত অবস্থায়ই ভ্রু কুঁচকে পেছনে ফিরে বিছানায় তাকাতেই দেখলো ঝুমুর ওর জামাকাপড় আগেই বের করে রেখেছে। তাখলিফ ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে ঝুমুরের কাছে এলো। ও লাজুক ভঙ্গিতে তখন মেঝেতে তাকিয়ে আছে। তাখলিফ ওকে অবাক করে মাথায় গাট্টা মেরে কাপড় গুলো নিয় ফ্রেশ হতে চলে গেলো। হতভম্ব ঝুমুর মাথায় হাত দিয়ে গাল ফুলিয়ে আনমনে বলল, “নির্দয় লোক।”
ঝুমুর রান্নাঘরে গিয়ে এরপর খাবার-দাবার এনে টেবিলে এনে রাখলো। সব আজ নিজে রান্না করেছে। তাখলিফ ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার নিয়ে বসলো। ঝুমুর ভেবেছিলো তাখলিফের খাওয়া শেষ হলে সে নিজে খাবে। কিন্তু সেটা হলো না। ওকে ধমকে জোর করে খাইয়ে দিলো তাখলিফ। সেইসঙ্গে কঠিন কঠিন কিছু কথাও শুনালো। যাতে করে না চাইতেও চোখ বেয়ে দরদর করে পানি বেরিয়ে গেলো ঝুমুরের। মনে মনে ভাবলো তাখলিফ নামক মানুষটার চেয়ে বেশি নির্দয় অন্য কেউ হতেই পারে না। খাওয়াদাওয়া সেরে ওকে বকাঝকা করে ঘরে পাঠিয়ে নিজেই সবকিছু গুছিয়ে রাখলো তাখলিফ। ঝুমুর গাল ফুলিয়ে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লো। তবে ঘুম এলো না একটুও। বরংচ রাগে, অভিমানে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিলো ওর।তাখলিফ এলো আরও কিছু ঘন্টা বাদে। এসেই আলো নিভিয়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়তে যাবে তখনি চাদর প্যাঁচিয়ে হুড়মুড় করে ওঠে বসলো ঝুমুর! আচমকা এমন কান্ডে বোকা বনে গেলো তাখলিফ। অবাক হয়ে বলল, “তুই এখনো ঘুমাসনি?”
“আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?”
ঝুমুরের গলার স্বর ভীষণ কড়া শোনালো তাখলিফের কাছে। ও থতমত খেয়ে বলল, “ও ঘরেই তো ছিলাম।”
“কি করছিলেন?”
“টিভি দেখছিলাম। গুরুত্বপূর্ণ নিউজ। আজ হয়েছে কি শোন। মতিঝিলের এক ব্যাংকে ডাকা….”
ঝুমুর ওর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকালো,
“আমার চেয়ে দেশের নিউজ চ্যানেল আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো? এই আপনি আমাকে ভালোবাসেন?”
“তখনকার জন্য সরি ঝুমুর।”
“আপনার সরি আমি চাই না।”
ঝুমুর এখন ভীষণ রেগে আছে। একে ঘাঁটানো ঠিক হবে না বুঝতে পেরে হাই তুলতে তুলতে তাখলিফ বলল,
“আচ্ছা, সকালে আমরা কথা বলি, কেমন? আমি অনেক টায়ার্ড। একটু ঘুমাই? তুইও শুয়ে পড়।”
“না ঘুমাতে দেবো না। আপনি এখন আমাকে দেখবেন।”
বলে নিজের চাদরটা সরাতেই ‘হা’ হয়ে গেলো তাখলিফ। সাদা রঙের আকাশি পাড়ের ফুলেল শাড়িতে অপ্সরার চেয়ে কিছু কম লাগছে না এই ঝুমুরকে। অফিস থেকে ফেরার পথে এটাই তো কিনে এনেছে সে। কিন্তু ঝুমুরকে তো দেয় নি, ক্লজেটে তুলে রেখেছিলো। তাহলে এই মেয়ে এটা পরলো কখন? বাকিটুকু ভাবার অবশ্য অবকাশ পেলো না তাখলিফ। ঝুমুরের স্নিগ্ধতায় চোখ ধাঁধিয়ে গেলো ওর। বুকের ভেতর দ্রিমদ্রিম শব্দটা জোরালো শোনাচ্ছে। এক্ষুনি বুঝি বেরিয়ে যাবে। তাখলিফ ডানহাতে বুকের বা-পাশটা আনমনে চেপে ধরলো। ওকে ওমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঝুমুর নিজের দৃষ্টি আরো কড়া করলো। তাখলিফের সরিয়ে ফেলা দৃষ্টিটা জোর করে নিজের দিকে তুলে ধরে জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগছে?”
তাখলিফ হতবুদ্ধি হয়ে গেলো, “গরম লাগছে। ফ্যানটা অফ করে এসিটা অন করে এক্ষুণি আসছি তুই বোস।”
ওকে ওঠতে না দিয়ে ঝুমুর আচমকা ওর টি-শার্টের কলার টেনে ধরে বলল, “পালানো হচ্ছে? আমাকে ভয় পান? কোথাও যাওয়া চলবে না।”
তাখলিফ ছোট ছোট চোখ করে দু’পাশে মাথা নেড়ে বলল, “তোকে কঠিন শাস্তি দেবো। আমাকে তুই কষ্ট দিচ্ছিস। প্রতিশোধ নিচ্ছিস তাইনা?”
ঝুমুর নিচুকন্ঠে বলল,
“উহু! আমি তো ভালোবাসতে চাই আপনাকে।”
“প্লিজ ঝুমুর। এমন জেদ করিস না। আমাকে কন্ট্রোললেস করলে তোরই ক্ষতি।”
“আমার ক্ষতি আমি বুঝে নেবো। শাড়ি এনে লুকিয়ে রেখেছেন কেন? আমাকে নিজের হাতে দেন নি তাই এখন এটা আপনার শাস্তি…”
এই ঝুমুর সম্পূর্ণ অচেনা তাখলিফের কাছে। এ যেন ওর ভাবনায় থাকা ঝুমুর নয়। যেন অনেক বেশি বুঝদার, ম্যাচিওর এক অন্যরকম ঝুমুর। তাখলিফ ছোট্ট ঢোক গিলে ওর হাতদুটো সরিয়ে দিয়ে বলল,
“ঘুমিয়ে পড়, আমি আসছি…”
বাকি কথাটুকু শেষ হওয়ার আগেই নিজের ঠোঁটে নরম ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব করলো তাখলিফ। চেয়েও আটকাতে পারছে না ও। মন-মস্তিষ্কের যুদ্ধে নিজেকে হারিয়ে ফেললো সে ঝুমুরের কাছে। এরপর! এরপর বাকি রাতটুকু কেটে গেলো এক অবর্ণনীয় সুখে, অনিমেষ আকাঙ্খা আর মুগ্ধ করা ভালোবাসাতে!
’
___________
চলবে…