অপ্রিয় রঙ্গনা পর্ব-২২+২৩

0
342

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-২২

হেমন্তের শেষ, শীতের শুরু। পৌষের শুরু হলেও অন্যবারের তুলনায় এবার বেশ ঠান্ডা পড়েছে।
আকাশে ঘন মেঘের আনাগোনা নেই, নেই রোদের তীব্রতা। রুক্ষ এক সৌন্দর্য ভর করেছে প্রকৃতিতে,
সেটা কেমন আশ্চর্য মন খারাপ করে দেওয়া সৌন্দর্য!

ঝুমুর আজকাল সারাক্ষণ ঘরকুনো হয়ে বসে থাকে। নিজের মতো ঘর গুছাচ্ছে, রান্না করছে, বই পড়ছে, স্বামী-শ্বশুরের যত্ন নিচ্ছে। ওদের সাথেই ওর সব কথা। যেন এই ছোট ফ্ল্যাটের মানুষগুলো ছাড়া বাইরের দুনিয়ায় আর কেউ নেই। কোনো চাওয়া-পাওয়া, আবদারও নেই ওর। যেন ওর শরীরটা ‘নিরিবিলি’ বাড়ির তিনতলায় আর মনটা তাখলিফের মাঝেই আটকে গেছে। এমনকি নিজের মায়ের সামনেও পারতপক্ষে পড়তে চায় না ঝুমুর। মাঝেমধ্যে তুসি-ইয়াসিফ, নিশি-তিথি, প্রমিলা আসে। কিন্তু পাখি বেগমের অশান্তির জন্য সেটাও খুব কম। এমনকি সেদিন সাদা গাড়িতে করে ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এসেছিলো, এসে বেশ অপমানও করে গেছে বিয়ে নামক নাটকের জন্য। আর ঝিনুককে আপাতত বেড়াতে দেওয়ার নাম করে রেখে গেছে। নিশির কাছ থেকে এসব শুনেও ঝুমুর ভয়ে বোনকে দেখতে পর্যন্ত যায়নি এই এক মাসে। মোটকথা তিনতলাটাই ওর সব হয়ে গেছে। বাবা ব্যবসার কাজে এদিক-ওদিক থাকে, তাখলিফ নিজেও অফিসে ব্যস্ত থাকে। ইদানীং ঝুমুর নিজের ভার্সিটিও যায় না। জোর করলে রাগ করে, মাঝেমধ্যে কেঁদে বুক ভাসায়। তাখলিফ তাই ওকে আর জোর করে না। কিন্তু সারাক্ষণ কত ঘরে বসে থাকা যায়? নিজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী তাখলিফের মনে হয় এমনভাবে চলতে থাকলে অতি শ্রীঘ্রই এই মেয়ে অসুস্থ হয়ে যাবে; শেষে না আবার পাগলাগারদে রাখতে হয় এই নিয়ে ওর চিন্তা। তাই এক অলস বিকেলে জোর করে ঝুমুরকে নিয়ে বেরিয়েছে তাখলিফ। যদিও ঝুমুর বারবার মানা করছিলো তবুও তাখলিফ শোনে নি। প্রচন্ড বকেছে, মেজাজ দেখিয়েছে ওকে, যারজন্য একপ্রকার ভয়েই বাইরে বেরুনোর জন্য তৈরি হয়েছে ঝুমুর। কালো রঙের সালোয়ার-কামিজের ওপর দিয়ে পাতলা সোয়েটার পরেছে ও। আর তাখলিফের পরণে সী-গ্রীণ কালারের স্ট্রাইপের শার্ট। বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা রিকশা নিলো তাখলিফ। বিকেলের স্নিগ্ধতা তাখলিফকে মুগ্ধ করলেও ঝুমুর ছিলো অন্যমনস্ক। ও বারবার পাশে বসা তাখলিফকে দেখছিলো মুগ্ধ চোখে। কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো মৃদু বাতাসে ওড়ছে, ঝুমুরের ইচ্ছে করলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিতে। সুগঠিত ফর্সা দেহে সী-গ্রীণ শার্টটা কি দারুণ মানিয়েছে একটু পরপর তা-ই দেখছিলো মন ভরে। বারবার ভ্রু কুঁচকে, কপালে ভাঁজ ফেলে বা খানিকটা বিরক্তি নিয়ে যখন ঝুমুরের দিকে তাকায় তখন ওর হৃদপিণ্ডতে কেমন ভূমিকম্প বয়ে যায়। এসব লাল-নীল, ভালোবাসাময় ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতে ওরা পৌঁছে গেল। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে কাছাকাছি একটা পার্কে একটু ঘুরাঘুরি করে তাখলিফ একপর্যায়ে ওকে নিয়ে এলো বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়। ঝুমুর প্রথমে এখানে আসতে না চাইলেও পরবর্তীতে শুনশান নীরবতা, শান্ত নদী, ঠান্ডা হাওয়া, ওড়ে যাওয়া সাদা বক আর নৌকার তালে তৈরি হওয়া ঢেউয়ের অন্যরকম শব্দে বিভোর হয়ে গেলো। তাখলিফ ঠিক করলো নৌকায় করে একটু দূরে ঘুরে আসবে। কিন্তু শুনেই ঝুমুরের আত্মা ওড়ে গেলো। ভয়ে এতটুকুন হয়ে গেলো মুখ। করুণ চাহনিতে বারবার বোঝাতে লাগলো সে কিছুতেই নৌকায় ওঠবে না। কিন্তু তাখলিফও নাছোড়বান্দা। একপ্রকার কোলে তুলে ওকে নিয়ে নৌকায় ওঠলো তাখলিফ। বুড়ো আব্দুল মাঝি তা দেখে হু হা করে হাসতে হাসতে বলল,
‘ডরাইও না গো মা, ডরের কিছুই নাই।’

আব্দুল মাঝির সাথে তার বছর আট-দশ বছরের নাতি আবুল ছিলো। সে অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে হা হয়ে বলল, ‘ইশ, ভাইজান! আফনেগো নজ্জা নাই? আমার ত শরম লাগে। ভাবিজান গো অত ডরের কুনুকিছু নাই।’

নৌকা দুলতে লাগলো। ভয়ে তাখলিফের বুকের শার্ট খামচে ধরে রেখেছে ঝুমুর। ওর মুখটা হয়ে আছে কাঁদোকাঁদো। ইতোপূর্বে কখনো নৌকায় ওঠা হয়নি ঝুমুরের। সাঁতার জানেনা তাই পানিতে ওর ভীষণ ভয়! তাখলিফ ওকে বসিয়ে দিতে গেলে ও দু-চোখ বুজে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমাকে ধরে রাখুন। ছাড়লে আমি পড়ে যাব।”

তাখলিফ ওর অবস্থা দেখে হাসি আটকে বলল,
“ঘুরতে এসেছি, চিপকে থেকে বাসর করতে নয়। নিজে তো হাসির পাত্র হলিই, আমাকেও জোকার বানিয়ে ছাড়লি।”

বলে ওকে বসিয়ে দিয়ে নিজেও পাশে বসে পড়লো। ঝুমুর ওর কথা শুনে লজ্জা আর অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে রইলো। কিন্তু ভয়ের কারণে তাখলিফের শার্ট ছাড়লো না। হেলেদুলে নৌকা চলতে শুরু করলে ঝুমুর আঁৎকে ওঠে বলল, “এখন যদি নৌকা ডুবে যায়? আমি সাঁতার জানিনা, আপনি কিন্তু আমাকে বাঁচাবেন।”

আবুল পাটাতনে বসে ছিলো। ঝুমুরের কথা শুনে হেসে লুটোপুটি খেয়ে বলল, “ভাবিজান আ’ফনে মরবেন না গো। এইটুকু পানিতে পরলে কেউ ম’রে না।”

ঝুমুর রাগত স্বরে বলল, “তুমি বেশি জানো?”

“জে। আমার মাথায় বুদ্ধি বেশি, আফনের মাথায় বুদ্ধি কম।”

“আসছে বুদ্ধির রাজা।”

“আইছে বুদ্ধির ঢেঁকি।”

“চ’ড় দেব।”

আবুল মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“আমিও সালাম দিমু। আসসালামু আলাইকুম ভাবিজান।”

“পাগল।”

দু’জনের কথা কাটাকাটি দেখে তাখলিফ মজা পেলো। ও বলল, “বয়েই গেছে তোকে বাঁচাতে। আপনি বাঁচলে বাপের নাম, প্রবাদ শুনিস নি?”

ঝুমুরের রাগের পারদ এবার তাখলিফের প্রতি তড়তড় করে বেড়ে ওঠলো। রেগে বলল, “তাহলে জোর করে ওঠালেন কেন আমাকে?”

“আমার ইচ্ছে।”

“আপনার ইচ্ছে হলেই যা খুশি করবেন?”

“আমার বউ, আমার ইচ্ছে।”

আবুল বলল, “ঠিক কইসেন ভাইজান।”

ঝুমুরের মনে ক্ষোভ জন্মালো। বলল,
“তাহলে আমার অকাল মৃ’ত্যুর জন্য আপনি দায়ী থাকবেন।”

তাখলিফের হাসি পেলেও ও মুখ গম্ভীর করে বলল,
“ম’রবি তুই, দায়ী থাকবো আমি? কক্ষণো না।”

“হুহ! আপনিই।”

“নো, নেভার।”

ঝুমুর অবাক হয়ে কর্কশ গলায় প্রশ্ন করলো,
“তাহলে কি আমার মৃ’ত্যুর জন্য আমিই দায়ী থাকবো?”

তাখলিফ ভ্রুকুটি করে বলল,
“আত্মরক্ষা না জানলে দায়ী তো তুই নিজেই থাকবি। শোন ঝুমুর, বিপদ যেকোনো সময় আসে। আমি পাশে না থাকলেও নিজের আত্মরক্ষা তোকে নিজেকেই করতে হবে। এই নিয়ম যেকারো জন্য। সেটা আমি, তুই, আবুল বা অন্য যেকারো ক্ষেত্রে!”

ঝুমুর আর কথা বললো না। অভিমানে গাল ফুলিয়ে রইলো। তাখলিফ অবশ্য ওর রাগ এত পাত্তা দিলো না। সে হাত নেড়ে নদীর সৌন্দর্য, আকাশের সৌন্দর্য দেখাতে লাগলো ঝুমুরকে। ও সেটাই দেখতে লাগলো বসে বসে। আবুলের বকবক শুনতে শুনতে মাথা ধরে গেলো ওর। তবে ভালোও লাগছিলো। নদীর দু’পাড়ে, ছোট ছোট চরগুলোতে ছোট ছোট কাশফুলেরও দেখা মিললো। দূর থেকে গাছাপালা, গ্রামগুলোকে ভীষণ ছোট দেখাচ্ছিলো। অনেক জায়গায় জেলেরা দলবেঁধে মাছ ধরছে, গরু-মহিষ গোসল স্নানে নেমেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাঁশের তৈরি সরু ব্রিজের ওপর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে পানিতে নেমে গোসল করছিলো। যেন এক মজার খেলায় মেতেছে তারা। ঝুমুর একপর্যায়ে অসংখ্য গোলাপি রঙের শাপলা দেখতে পেলো। আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাখলিফকে বিগলিত কন্ঠে বলল, “দেখুন, কী সুন্দর!”

তাখলিফ ওর ছটফটে, হাসিমাখা মুখখানি দেখে মনে মনে বলল, “তোর থেকে বেশি না।”

কিন্তু মুখে বলল, “এলি বলেই দেখতে পেলি।”

ঝুমুর খুশি গলায় বলল,
“আমি এ জায়গাটা ফেসবুকে দেখেছিলাম। কত মানুষ এখানে এসে ফটোসেশান করে। দারুণ আসে ছবিগুলো।”

তাখলিফ ভ্রু কুঁচকালো, “তো, তুইও তুলবি নাকি? তোর তো আবার এসবে অনেক আগ্রহ!”

ঝুমুর ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “নাহ!”

মুখে বললো ঠিকই, অথচ মনে মনে প্রচন্ড ইচ্ছে করছিলো ওর। কিন্তু তাখলিফ এসব খুব একটা পছন্দ করে না বলেই ইচ্ছেকে মাটিচাপা দিলো ও। তাখলিফ তা বুঝতেও পারলো। তাই নিজেই ওর ছবি তুলতে উদ্যত হলো। ঝুমুর আনমনে বসে ছিলো, হঠাৎ ‘ক্লিক’ শব্দ হতেই সাথে সাথে চমকে ফিরে তাকাতেই দেখলো তাখলিফ ক্যামেরা হাতে বসে। কপাল কুঁচকে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। ঝুমুর হতভম্ব হয়ে বলল, “ক্যামেরা এলো কোথা থেকে?”

আবুল তৎক্ষনাৎ উত্তেজিত গলায় বলল,
“সব তো ভাইজানেরই প্যালেন। আফনেরে সেরপ্রাইজ দিবার জন্যি ভাইজানে আগেই সব টিক কইরা রাখছিলো।”

ঝুমুর অবাক হলো। আরো প্রশ্ন করতে উদ্যত হতেই তাখলিফ ওকে বলল, “চুপচাপ পোজ দে। কথা পরে।”

ঝুমুর ওর কথা শুনলো। তবে মনে হলো তাখলিফের কন্ঠস্বর লজ্জাবনত। ও মনে মনে হাসলো, তবে কিছু বললো না। তাখলিফ ওর দারুণ কিছু ছবি তুলে দিলো। বনিবনা না হলেও আবুলের সাথেও ছবি তুললো। এরপর আবুলও ওদের দুজনের কিছু ছবি তুলে দিলো। নৌকা করে ওরা অনেকদূর গেলো। যেখানের নীল আকাশ পানি ছুঁয়েছে সেখান পর্যন্তও! নৌকায় বসে ওরা সিঙারা, বাদাম, ঝালমুড়ি খেলো।সন্ধ্যার আঁধারে ডুবে যাওয়া গোটা আস্ত কমলা আকাশ দেখলো। এরপর রাতের আকাশভরা তারা, পূর্ণিমার চাঁদের সৌন্দর্য উপভোগ করলো। নদী থেকে তুলে আনা তাজা মাছ, মোরগের ঝোল আর মোটা চালের ভাত রান্না হলো নৌকায়। বুড়ো মাঝি, আবুলসহ আরো দু’য়েকজনকে নিয়ে ওরা চাঁদের আলোয় বসে ভাত-মাছ খেলো। এরপর আরেকটু সময় কাটিয়ে ওখান থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথ ধরলো ওরা। রিকশায় বসে ঝুমুর তাখলিফের কপাল থেকে চুল সরিয়ে ওড়না দিয়ে ঘর্মাক্ত মুখ মুছে দিলো। বাড়ি পৌঁছে রাতে আর খাওয়া হলো না ওদের। ঝুমুর ফ্রেশ হয়ে টুকটাক হাতের কাজ গুছাতে লাগলো। কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে দেখলো তাখলিফ বারান্দায় চুপচাপ বসে আছে। হাতে কফির মগ। মুখটা শুকনো। দৃষ্টি বহুদূরে, আনমনা। ঝুমুরের খুব মায়া হলো ওর জন্য। ওর মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে বলল, “ওসব আপনার প্ল্যান ছিলো! আমার জন্য? তাই না?”

“উহু! আমার ইচ্ছে ছিলো।”

“আপনার এমন ইচ্ছেও হয়?”

“হয় তো!”

“কেন?”

তাখলিফ দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
“কারণ ওটা আমার আর মায়ের সিক্রেট ঘুরাঘুরির জায়গা ওটা। মা ছাড়া এই প্রথম তোকে নিয়ে গেলাম।”

ঝুমুর আবেগে আপ্লুত হলো। সেইসাথে ভয়ও হলো। মায়ের কথা সচরাচর বলেই না তাখলিফ। এখন কেন বলছে? ওর ভাবনার মাঝেই তাখলিফ নিজের প্রতি বিদ্রুপাত্মক হেসে কফির মগটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে বলল, “আমি নাকি মা’কে ভালোবাসতাম! সত্যি ভালোবাসলে মা’কে মারতে পারতাম? সবাই কেন বলে!”

ঝুমুর চমকে ওঠে ওর হাতদুটো আঁকড়ে ধরলো। তাখলিফ নিজে নিজেই বলল, “ছোটচাচীর সেই ছোট্ট সোনাটা, আমি যাকে পৃথিবীর মুখ দেখতে দিলাম না। যদি দুটো মাস অপেক্ষা করতো, ও তাহলে পৃথিবীটাকে দু-চোখ মেলে দেখতে পেতো। জানিস ওকে আমি স্বপ্নে দেখি, কেমন করে যে তাকায়! আমার ভয় লাগে।”

ঝুমুর ঢোক গিলে বলল,
“ওসব কিছুনা, আপনি সবসময় এসব নিয়ে ভাবেন তাই হয়তো ওমন হয়েছে। আমরা যেটা নিয়ে বেশি ভাবি, স্বপ্নে সেটাই আবছায়া হয়ে ধরা দেয়।”

তাখলিফ অস্ফুটস্বরে বলল,
“মায়ের প্রিয় জায়গায় গেলাম এত বছর পর, অথচ মা পাশে নেই।”

“খুব ভালোবাসেন?”

তাখলিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর দিকে তাকালো,
“সত্যি বলি?”

“জি।”

তাখলিফ অকপটে বলল,
“আমি তোর থেকেও কয়েকগুণ বেশি ভালোবাসি মা’কে।”

ঝুমুরের একটুও রাগ হলো না। তাখলিফ আনমনা হয়ে রইলো। আব্দুল মাঝি তাখলিফের ভীষণ পরিচিত। যখন তমালিকার সাথে নদীর পাড় যেতো তখন তার নৌকায় করেই মা-ছেলে ঘুরে বেড়াতো। দিনগুলো কি সুন্দর ছিলো। সেই স্মৃতিচারণ করে আজ চোখ ভিজিয়েছে আব্দুল মাঝি। সেইসাথে বুকের ভেতর চেপে বসা তাখলিফের অপরাধবোধটাও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। তাখলিফ আনমনে আবারও বলল, “মাকে বাঁচতে দিলাম না, বাবাকে একাকিত্ব দিলাম, ছোট চাচীকে মাতৃসুখ থেকে বঞ্চিত করলাম, একটা বাচ্চাকে পৃথিবীর মুখ দেখতে দিলাম না। এগুলো কোনোটাই ইচ্ছেকৃত নয়। অথচ এগুলোর জন্য আমার কখনো শাস্তি হবে না? হবে! কিন্তু আমি চাই না এই শাস্তির ছিঁটেফোটাও তোর ওপর পড়ুক। তাহলে পাপের আর শেষ থাকবে না আমার…”

মানুষটার মনে এত দুঃখ, এত অপরাধবোধ! ঝুমুর ওকে আরকিছু বলতে দিলো না। নিজের বুকে আগলে নিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “চুপ, সব ঠিক আছে।”

তাখলিফ ছোট্ট করে বলল, “এখনো পর্যন্ত!”

“সামনেও।”

“নিশ্চয়তা নেই।”

“বেশি ভাবেন।”

তাখলিফ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“আমি না, তুই। সারাক্ষণ ঘরকুনো হয়ে বসে থাকিস। আমি তো নিজের বাপকেও ব্যবসা ছাড়তে বলিনি শুধুমাত্র ঘরকুনো হয়ে যাবে এই ভেবে। সেখানে তুই…”

ঝুমুর ওর দুশ্চিন্তা বুঝতে পারলো। পরিস্থিতি সহজ করতে বলল, “ধুর, ওসব তো এমনি। বাইরে যেতে ভালো লাগে না। কিন্তু এখন ভাবছি নিয়মিত ভার্সিটি যাবো।”

“নয়তো চ’ড়িয়ে নিয়ে যাবো।”

ঝুমুর হেসে বলল, “জীবনেও পারবেন না। আমাকে ধমক দিলেই তো আপনার বুক কাঁপে।”

তাখলিফ থতমত খেয়ে বলল,
“মোটেও না।”

ঝুমুর ওর গাল বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“দিন একটা চ’ড়। প্রমাণ করুন আমার কিছু হলে যায়-আসে না আপনার।”

তাখলিফ ধরা গলায় বলল, “যা তো, ভালো লাগছে না এখন।”

“আরে এ এমন কী ব্যাপার? দু’সেকেন্ড লাগবে না।”

“সময় হলে দিব। এখন না।”

“আপনি একটা বিরক্তিকর লোক।”

“জানি।”

“এমনি বললাম। এত মাইন্ড খাওয়ার কি আছে?”

তাখলিফ বিষন্ন চিত্তে বলল,
“মাইন্ড খেলাম তোকে কে বললো?”

“মানলাম খান নি। তাহলে দিন তো চ’ড়।”

তাখলিফ ওর সাথে তর্কে না পেরে ফট করে ওর গালে চুমু খেয়ে বসলো। এরপর ওকে টেনে কোমড় জড়িয়ে ধরলো। উরুতে বসিয়ে ওর কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বললো, “তোকে দেখলেই তো আমি না-ই হয়ে যাই বাবু…”

ঝুমুর লজ্জা পেয়ে নিজেকে ছাড়াতে উদ্যত হলো। কেঁপে ওঠা গলায় বলল, “ছাড়ুন!”

তাখলিফ ছাড়লো না। বরংচ গভীর গলায় বলল,
“তোর সঙ্গে রেসে আমি কখনোই জিতি না, জিততে চাইও না৷ তোর জন্য শুধু আমার বুক নয়, পুরো আমিটাই কাঁপি। তোর কাছে হেরেও সুখ!”

যু’দ্ধে জিতে ঝুমুর এবার শিহরিত হলো।

.

‘নিরিবিলি’ বাড়ির বড়কন্যা ঝিনুক।
শামসুল হক ও পাখি বেগমের বড় মেয়ে, ইয়াসিফের ছোট আর ঝুমুরের বড় বোন। বরাবরই সে মা-বাবার বাধ্য মেয়ে। সেজন্য পড়াশোনা শেষ করে চাকুরি করার আশা ছেড়ে বাবা-মায়ের কথামতো বিয়ে করে নিয়েছে। চাকুরির আগে বিয়ে কর‍তে আপত্তি থাকলেও মা-বাবার চাওয়াটাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। তবে তাদের বাধ্য মেয়ে হিসেবে গ্রামের প্রভাবশালী ও রক্ষণশীল পরিবারে বউ হয়ে যাবার পর তেমন সাংসারিক সুখ পায়নি কখনো। শারীরিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে একটুও স্বস্তি দেয়নি রক্ষণশীল পরিবারের মানুষগুলো। শহুরে মেয়ে হয়ে কেন সব কাজে পটু নয় এসব নিয়ে সকলের কাছে কটুক্তির শিকার হয়েছে প্রতিনিয়ত, কথা শুনেছে। কোনোকিছুর অভাব না থাকলেও নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েও শ্বশুর বাড়ির কারো ভালোবাসা অর্জন করতে পারেনি। একমাত্র অবলম্বন স্বামীও বোধহয় ভালোবাসেনি, নয়তো ওর ব্যথিত হৃদয়টাকে আদিক্ষেতা বলে পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তো না। দেড় বছরের সংসারে সবার কটুক্তি, খোঁটা, মুখ ঝামটা সহ্য করে গোপনে কতশত কষ্ট লুকিয়ে কেঁদেছে অথচ কেউ সান্ত্বনা দেয়নি, পাশে পায়নি কাউকে। সন্তান না হওয়ায় এখনো সকলের লাঞ্চনা, গঞ্জনা মুখবুজে সহ্য করছে সে। এসবের মাঝে আবার ছোটবোন ঝুমুরের জন্য সংসারে অশান্তি বেঁধেছে ওর। ঝিনুকের স্বামী সজীব তো কথা কাটাকাটির সময় মুখের ওপর বলেই দিয়েছে, ‘যে মেয়ের ছোটবোন দু-বছর আগে বিয়ে করে লুকিয়ে রেখেছে, অবশ্য আরও কি কি করেছে কে জানে! তাই বলছি এরকম ক্যারেক্টরলেস মেয়ে যে, তার বড়বোনও নিশ্চয়ই সতীসাধ্বী নয়। বড়কে দেখেই তো ছোটরা শেখে। শহুরে আধুনিকতায় বড় হয়েছো বলে কথা, তাই তুমিও যে আমাকে ঠকাওনি, কারো সাথে বেলাল্লাপনা করোনি, তার কি গ্যারান্টি?’

ঝিনুক স্বামীর কথা শুনে বাকরুদ্ধ বনে গেছিলো।
সারাজীবন প্রেম-ভালোবাসায় জড়ায়নি সবটুকু উজাড় করে স্বামীকে ভালোবাসবে বলে। আর সেই স্বামী কি-না ওকে সন্দেহ করছে তাও নিজের ছোট বোনের চরিত্র বিবেচনা করে? ঝিনুক আহত হলো ভীষণ! সে কখনোই আশা করেনি সজীব এরকম
কিছু বলবে। সব সহ্য করে এখানে পড়ে আছে এই মানুষটাকে ভালোবেসেই। ভালোবাসার মানুষটা কি করে এমন অপবাদ দিচ্ছে ওকে? ও হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘তাহলে বিয়ে কেন করেছিলেন শহুরে মেয়েকে?’

‘মতিভ্রম হয়েছিলো।’

তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলো ঝিনুক। কেন যেন সহ্য হয়নি কথাগুলো। বলল, ‘সুন্দরী দেখে লোভ সামলাতে পারেন নি, তাই না? আপনার ছোট ভাইয়েরও তা-ই হয়েছে। আমার বোন বিবাহিত এটা জানার পরও এখনো কেন ওকে বিয়ে করতে লেগে আছে তাহলে? এখানে শহুরে আর গ্রামের মানুষে তাহলে কীসের পার্থক্য?’

ক্ষেপে গেলো সজীব,
‘তোমার এতবড় স্পর্ধা? তোমার জঘন্য পরিবারের মানুষের সাথে আমার বাড়ির পুতপবিত্র মানুষের তুলনা দাও? আরে তোমার বোন তো তোমার চাচাতো ভাইয়ের ঘাড়ে ঝুলে পড়ছে। এক বাড়িতে থাকে, দুবছর আগে লুকিয়ে বিয়ে করেছে, এর আগে না জানি আরো কি কি করেছে! ওসব নষ্টামি নিয়ে তুমি আমার সাথে তর্ক করো? এত সাহস?’

স্বামীর ক্রোধ দেখে ভয় হলেও দমে গেলো না ঝিনুক। রাগ হলো তারও। কথার পিঠে অকপটে জবাব দিলো, ‘একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না। আমার পরিবার মোটেও জঘন্য না। কিন্তু আপনি বলুন, আপনার ভাই কেন এখনো আমার বিবাহিত বোনের জন্য পাগল হয়ে গেছে? ওর এসব কি নষ্টামি না? নাকি নিজের ভাই বলে তার চাওয়ার কোনো দোষ দেখবেন না, অথচ আমার বোন বলে ঝুমুরেরই সব দোষ?’

ঝিনুকের কথা শুনে রাগে জ্ঞানহারা হলো সজীব। ইতোপূর্বে কখনো বউয়ের গালে হাত না তুললেও এবার ধৈর্য বাঁধ মানলো না। তার পরিবার নিয়ে কথা? কতবড় সাহস! না চাইতেও সজীব এই প্রথম বউয়ের গায়ে হাত ওঠালো। ঠাস করে থাপ্পড় মেরে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেছিলো। ঝিনুক স্বামীর ব্যবহারে কষ্টে জর্জরিত হয়ে সেদিন ভীষণ কাঁদলো।

বলা বাহুল্য, অনেক আগে থেকেই ওর ছোট
দেবরের খুব মনে ধরেছিলো ঝুমুরকে। মাস কয়েক আগে বেড়াতে আসায় সেটা আরো প্রকট হয়। যারজন্য ব্যাপারটা বিয়ের প্রস্তাব অবধি গড়ায়। ছোট দেবরের জেদের কাছে পরাজিত হয়ে শ্বশুরবাড়ির সকলে মিলে ঠিক করেছিলো ভদ্র, সভ্য, সুন্দরী ঝুমুরকেই করবেন এ বাড়ির ছোট পুত্রবধূ। ছোট পুত্র এ বাড়ির সকলের আদরের, তার বউও হবে আদরের। যেহেতু বড় বউ ঝিনুকের ছোট বোনই হতে যাচ্ছিলো ছোট পুত্রবধূ সেজন্য কিছুদিন তারা ঝিনুককেও মাথায় করে রেখেছিলো। ঝিনুকও ভাবলো এবার বুঝি সকলে ওকে একটু মাথায় করে রাখবে। কিন্তু দিনশেষে সবকিছু জানাজানি হওয়ার পর যেই কি সেই — আগের চেয়েও বেশি মানসিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে লাগলো ঝিনুককে। উঠতে-বসতে কথা শোনায়। তার দেবর বিবাহিত জানার পরেও এখনো চায় ঝুমুরকে। এ নিয়েও বাড়িতে চলছে অশান্তি। স্বামীর প্রতি ভালোবাসায় অন্ধ ঝিনুক অবশ্য এরজন্য ঝুমুরকেই দায়ী করে মনে মনে। সকলের খোঁচা শুনলেও এ সংসারটা তো তারই! তাই এতদিন সব মেনে নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলো, অথচ নিজের বোনের জন্যই এখন উঠতে-বসতে সবার কথা শুনতে হচ্ছে, কটাক্ষের শিকার হতে হচ্ছে! অবশ্য সবাই তো বলবেই, কুকীর্তি করলে কেন বলবে না? ঝিনুক তাই রাগ বোনের ওপর। বাপের বাড়িতে বছরে কয়েক বার আসা হয়। এবার বাড়ি এসেছে, কিন্তু বোনের সাথে দেখা নেই। ও নিজেও যায় না স্বেচ্ছায় দেখা করতে। কিন্তু ইদানীং মায়ের পিড়াপীড়ি, বাড়াবাড়ি অসহ্য ঠেকছে ওর। অবস্থা এমন যে ঝুমুরকে সামনে পেলে আগে কষিয়ে দুটো চ’ড় দেবে ঝিনুক। ওর সংসারে অশান্তি লাগিয়ে নিজে সুখে সংসার করছে। একটা সুস্থ, স্বাভাবিক, সুন্দর জীবনযাপন সবারই কাম্য। তবে সভ্যতা যতই এগিয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মনুষ্যজাতি অসভ্য মনমানসিকতার সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। এমনও হচ্ছে যে নিজের আপনজনের ভালো তেও কারো সহ্য হচ্ছে না। এখন সে হোক নিজের প্রিয় বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোন বা যে-কেউ! স্বভাবে অনেকটা মায়ের মতো ঝিনুকের অবস্থাও এখন ঠিক সেরকম।

__________

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-২৩

ছাদে একসময় বাহারি ফুল-ফলের গাছ লাগানো ছিলো। বহুদিন তাদের যত্ন নেওয়া হয়না বলে অপুষ্টিতে ভুগে অনেক গাছই ম’রে গেছে। এরমধ্যে ঝুমুরের পছন্দের পার্পেল হার্টটাও সেই লিস্টে নিজের নাম লিখিয়েছে। পছন্দের গাছটি অযত্নে এভাবে ম’রে যাওয়ায় ঝুমুর খুব দুঃখ পেয়েছিলো৷ তাই এখন প্রতিদিন বিকেলে সময় করে সে গাছগুলোর যত্ন নেয়। পানি দেয়, মাটি নিংড়ে দেয়, আগাছা পরিষ্কার করে ফুরফুরে হাওয়ায় কিছুক্ষণ ব্যস্ত সময় কাটায়। মন ভালো করা এ সময়টা ঝুমুরের খুব প্রিয়! তবে ও মাকে ফাঁকি দিয়ে ছাদে আসার চেষ্টা করে। মায়ের অস্তিত্ব পেলে ও আর সেখানে আর পা মাড়ায় না৷ এমনও কতদিন হয়েছে ঝুমুর তিনতলায় একা, তাখলিফ-সানওয়ার হক বাড়িতে নেই। পাখি বেগম তাখলিফের নামে খারাপ কথা বলতো, ওকে কানপড়া দেওয়ার জন্য কত কৌশলই না অবলম্বন করতো। বাধ্য হয়ে ঝুমুর দরজা আটকে বসে থাকতো। কিছুতেই খুলতো না। মায়ের সাথে এরকম আচরণ করতে ওর কষ্ট হতো, তবুও না করে উপায় ছিলো না। এসব অবশ্য তাখলিফ জানে না। জানলে নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পাবে ভেবেই বলতো না ঝুমুর।

এমনি এক বিকেলে ঝুমুর ছাদে পানি দেওয়ারত অবস্থায় হঠাৎ দেখলো মা ছাদে এসেছে। ঝুমুর তাকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হলো। পাখি বেগম মেয়েকে দেখে সূক্ষ্ম নজরে তাকিয়ে রইলেন। এরপর কাছে এসে বললেন, “যেই মা দশমাস, দশদিন পেটে ধরলো, সেই মা-রে এমনে পর কইরা দিলি?”

ঝুমুর চলে যেতে পা বাড়িয়েছিলো। মায়ের কথা শুনে হুট করে দাঁড়িয়ে ব্যথিত গলায় বলল, “আমি তো পর করে দিইনি মা। তোমরা আমায় বাধ্য করেছো।”

পাখি বেগম এসে মেয়ের হাত টেনে ধরলেন, “কেন করছি? তোর ভালোর জন্যিই তো। আমি কি তোর খারাপ চাই? তোর বাপে খারাপ চায়?”

“না চাও না। কিন্তু আমি যেটা চাই সেটাও তোমরা চাও না।”

“মারে তুই এহনো দিনদুনিয়া বুঝিস না। তুই তো জানোস ওই পোলার কাহিনী। এর রক্ত ভালো না। তোর সাথেও খারাপই করবো। মা’র কথা শোন ঝুমুর। আমি তো তোরে সবই কইছি, এরপরেও তুই হের লগে কেমনে থাকোস? তোর… ”

ঝুমুরের মাথার তালু জ্বলতে শুরু করলো। একটা বাজে কথাও শুনতে চায় না সে। আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে মায়ের অহেতুক বাজে কথা শুনতে হবে সেজন্য ও ছাদ থেকে নেমে যেতে চায়। পাখি বেগম ওকে আটকাতে নিজেও ওর পেছন পেছন নামতে থাকে, বোঝাতে থাকে, বাজে বকতে থাকে। ঝুমুর একপর্যায়ে বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। শুধু বলে “মা, আমি ভালো আছি, আমাকে ভালো থাকতে দাও। ওনি যে-ই হোক, আমার সবকিছু। তুমি চাইলেও পারবে না আলাদা করতে।”

এটুকু বলে নেমে আসতেই দেখে তাখলিফ দরজার সামনে দাঁড়ানো। সবেমাত্র অফিস থেকে ফিরেছে। ঝুমুর আর পাখি বেগমের কথার একাংশ একটু ওর কানেও এসেছে। তবে বেশিকিছুই বুঝতে পারেনি। ঝুমুর একটু ভয়ই পেয়ে যায়। তড়িঘড়ি করে নেমে আসে। তাখলিফকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। এতে একটু অবাক হয় তাখলিফ। সে পায়ের জুতা খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করে, “কি নিয়ে তর্ক চলছিলো?”

“কিছু না।”

“আমি তো শুনলাম। ফিসফাস চলছিলো তোদের মধ্যে। যেন খুব গোপন কিছু…”

ঝুমুর ভড়কে গেলো। তবে পরক্ষণেই তা লুকিয়ে হাসার প্রচেষ্টা করে বলল, “আপনি মাকে জানেন না? ওই এক কথা বলতে বলতে আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। সেটা নিয়ে মা চেঁচাচ্ছিলো। এটা তো গোপন কিছু না…”

তাখলিফের কাছে বিশ্বাসযোগ্য না মেনে হলেও সে মেনে নিলো, “ওহ!”

“হু!”

.

তাখলিফ বাবার সাথে বসে টিভি দেখতে দেখতে কফি খাচ্ছিলো। সেইসাথে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনাও চলছিলো। তখনি হঠাৎ লোডশেডিং হলো। সানওয়ার হক বিরক্ত গলায় বললেন, “এই নিয়ে আজ সারাদিনে চারবার গেলো। দেশের যে কি উন্নয়ন হচ্ছে, সেটাই বুঝছি না। মেয়েটা সন্ধ্যা থেকে বসে লিখছে, এখন কীভাবে এসাইনমেন্ট শেষ করবে?”

তাখলিফও বিরক্তি নিয়ে বলল, “করুক। এতদিন করেনি কেন? এর একটা শাস্তি হওয়া দরকার।”

সানওয়ার হক খ্যাঁকিয়ে ওঠে বললেন, “তুই কেন
করে দিলি না ওকে? আবার বড়বড় কথা বলছিস…”

“আমি কেন করে দেব? পড়ায় তো তোমার ভাতিজির একদম মনোযোগ থাকে না।”

“থাকবে কি করে? সব মনোযোগ তুই নিয়েই তো বসে আছিস!”

বাবার কথা শুনে হকচকিয়ে গেলো তাখলিফ। অপ্রস্তুতও হলো। সে নিজেও জানে ঝুমুর ওর জন্য ঠিক কতটা পাগল, তাই বাবার সামনে এবার যেন একটু লজ্জায় পড়ে গেলো। সানওয়ার হক ওর মনোভাব বুঝতে পেরে হালকা হাসলেন। এরপর ওঠে দরজার দিকে চলে গেলেন। পেছন থেকে তাখলিফ ডাকলো বাবাকে, “এখন আবার কোথায় বেরুচ্ছো?”

সানওয়ার সাহেব ব্যস্ত গলায় জবাব দিলেন,
“এইতো নিচে যাই।”

তাখলিফ ভ্রু কুঁচকালো,
“অন্ধকারে নিচে কি কাজ? ঘরেই থাকো।”

সানওয়ার সাহেব পায়ে জুতা পরতে পরতে হেসে বললেন, “কারেন্ট গিয়ে আজ ভালোই করেছে, কাজে লাগাবো ভাবছি। লোডশেডিংয়ে চায়ের আড্ডা ভালোই জমে। ছোটবেলায় কারেন্ট গেলে সেই মজা হতো। পড়ায় ফাঁকি দেওয়া যেতো। মা-চাচীদের বকাঝকা, মারধর তোয়াক্কা না করে পাড়ার ছেলেরা সবাই বেরিয়ে পড়তাম। হৈহল্লা করে রাস্তায় নেমে ক্রিকেট খেলতাম, টং থেকে চা খেতাম। আহা সেই কি দিন! কতদিন এমন সময় কাটানো হয় না! তাই সাঈদ আর শামসুলকে নিয়ে মতি চাচার দোকানে চা খেয়ে আসি। অবশ্য শামসু যাবে কিনা জানি না। রাগ আমার ওপর! তাও বলে দেখি। সবসময় এমন সুযোগ আসে না। তাছাড়া পরে যদি আর সুযোগ না পাই? শোন, তোকে নিলাম না বলে মন খারাপ করিস না, তুই তোর বউকে সময় দে। এটা আমাদের ভাই-ব্রাদারদের আড্ডা। যাচ্ছি।”

তাখলিফ কিছু বলার সুযোগ পেলো না। অল্প আলোয় বাবার চলে যাওয়া দেখলো। আরর বাবা যেতেই খেয়াল করলো চারপাশটা যেন আগের চেয়ে আরো বেশি অন্ধকার হয়ে গেছে৷ আচমকাই যেন শব্দহীন হয়ে গেছে। অদ্ভুত নীরব, বুকে কাঁপন ধরে। যেন কোথাও মানুষের অস্তিত্ব নেই, কেউ নেই। তাখলিফ কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে রইলো। এরপর মেইন ডোরটা আঁটকে ঘরে গেলো। গিয়ে দেখলো ঝুমুর এসাইনমেন্ট করায় ব্যস্ত। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে ভ্রু কুঁচকে এই বই, সেই বই ঘাঁটাঘাঁটি করছে ঝুমুর। বিছানায় সবকিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এমনভাবে বসেছে যেন কত ব্যস্ত। এদিকওদিক তাকানো যেন মহাপাপ। এতদিন আলসেমি করে করেনি, পরশু লাস্ট ডেট। এখন ওর মতি হয়েছে। তাখলিফ ওর এই কান্ডে বেশ বিরক্ত হলেও বউয়ের অসহায় অবস্থা তার সহ্য হলো না। গিয়ে বিছানায় বসে ঝুমুরের হাত থেকে বইগুলো কেড়ে নিলো। ও হকচকিয়ে ওঠলেও ভয়ে কিছুই বললো না। তাখলিফ সময় নিয়ে টপিকগুলো বের করে, বুঝিয়ে দিয়ে ওকে সাহায্যও করলো। যেন ঝুমুরের থেকে বেশি চিন্তা ওরই। দু’জনের বোঝাপড়াটা খুব ভালো। কীভাবে তা হয়েছে দুজনের কেউ-ই জানে না। শুধু জানে একজনের কিছু হলে অন্যজনেরও বুকটা খা খা করে। তাখলিফ বেশ বোঝে ঝুমুর ওকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। আবার দুশ্চিন্তা থেকে যে বেশি ভয় পায় ওকে নিয়ে সেটাও বোঝে। টপিক বের করায় ব্যস্ত তাখলিফের জন্য খুব মায়া হলো ঝুমুরের। নিজের কাজেও লজ্জিত হলো সে। ওর জন্য লোকটা বেগাড় খাটছে। অফিস থেকে ফিরেও স্বস্তি পেলো না। ঝুমুর একপর্যায়ে ওর চুলগুলো হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দিলো। তাখলিফ বউয়ের থেকে একটুখানি আদর পেয়ে গলে গেলো যেন। কলমটা ফেলে দু-হাত ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কপালের ওপর থেকে চুলগুলো দু’হাতে ঠেলে সরিয়ে ক্লান্ত গলায় বললো, “এখানে দে।”

ঝুমুর একটু এগিয়ে গেলো। সেখানটায় হাত বুলিয়ে দিতেই তাখলিফ খপ করে ওর হাত ধরে ফেললো। বিরক্তি নিয়ে বলল, “দিতে বলেছি।”

ঝুমুরের কোটর থেকে চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো, “দিলাম তো। আর কী?”

তাখলিফ ধমক দিলো,
“বুঝিস না? দেখিয়ে দেব?”

ঝুমুর এবার বুঝে গেলো। কিন্তু খানিকটা লজ্জা আর একটু সংকোচের জন্য না বোঝার ভান করে বলল, “কী?”

তাখলিফ এবার দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “নষ্ট ভাষায় বলবো? তোর ঠোঁটের ছোঁয়া, যাকে চু’মু বলে জানিস সেটা। এখানে দে। কুইক।”

ঝুমুর ওড়না দিয়ে হাতচাপা দিলো মুখে। অন্ধকারেও যেন সেটা বুঝতে পারলো তাখলিফ। তাই হ্যাঁচকা টান দিতেই টাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে এসে পড়লো ওর বুকে। ঝুমুর লজ্জায় মিশে গিয়ে বলল, “দিচ্ছি তো। এত ব্যস্ত হলে হয়?”

“হয়।”

“পাগল লোক।”

“এই পাগল লোক এখন তোকে কামড়ে দেবে।”

ঝুমুর ভয় পেয়ে আঁৎকে ওঠে বলল, “এই ছাড়ুন। এসব কি বলছেন অসভ্যের মতো? মাথাটাথা গেলো নাকি?”

“দিবি কিনা বল?”

“দিবো না।”

“দ্যাটস ফাইন। তবে আমি আমার কাজটা ঠিকই করবো।”

“কি করবেন?”

“কামড়ে দেবো।”

বলেই ঝুমুরকে চেপে ধরলো। ও নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতেই তাখলিফ ওর গলায় কামড় বসিয়ে দিলো। ঝুমুর ওকে আঁকড়ে ধরে ক্রন্দনরত সুরে বলল, “এটা কি করলেন?”

তাখলিফ হতভম্ব হয়ে গেলো ওর কান্না দেখে। ওকে ছেড়ে দিয়ে ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে দেখতে দেখতে বলল, “বেশি লেগেছে? আমি তো এত জোরেও দিইনি!”

ঝুমুরও আচমকা ওকে অবাক করে দিয়ে ওর ঠোঁটের পাশে কামড় বসিয়ে দিলো এবং তা বেশ জোরেই। তাখলিফের খুব ব্যথা লাগলেও সে ‘টু’ শব্দটিও করলো না। ঝুমুর সরে আসার পর দেখলো জায়গাটা কেমন লাল হয়ে গেছে। ফর্সা মুখ খানিতে এটা কি করে করতে পারলো সে? কেউ দেখলে কি ভাববে তার চেয়ে বেশি খারাপ লাগলো তাখলিফের কতটা কষ্ট হয়েছে সেটা ভেবে। ও অনুতপ্ত হয়ে ক্রন্দনরত অবস্থায় মাফ চাইতে চাইতে তাখলিফের মুখে অসংখ্য চুমু খেলো৷ তাখলিফ ব্যথা ভুলে গেলো বউয়ের কান্ড দেখে৷ হু হা করে হেসে বলল, “ম’রিনি তো। এমন করছিস কেন?”

ঝুমুর ধমক দিলো ওকে, “চুপ। বেশি করেন। এখানে ম’রার কথা আসছে কেন? আরেকবার বললে এক্ষুনি সেলাই করে দেব মুখ।”

“ফটরফটর চলছে? আমার তো নাক কেটে দিলিই। তা ব্যাপার না। কিন্তু তোর কি হবে? মুখ দেখাবি কি করে সবাইকে?”

ঝুমুর বোকা বনে গেলো, “কি হবে তাহলে?”

“মানসম্মান যাবে। আর কিছু না।”

“আমার লজ্জা লাগবে।”

“লাগুক। পরবর্তীতে এমন করার আগে মনে থাকবে।”

“সরি।”

তাখলিফ হেসে প্রসঙ্গ পালটে ফেললো,
“এই ঝুমুর, চা খাবি?”

“করে আনছি।”

“তোকে বলেছি যেতে? বোস এখানে।”

“আপনি কেন? আমি যাচ্ছি।”

“না তুই বাকি লেখাটা শেষ কর। আমার জাস্ট পাঁচ মিনিট লাগবে। তোর ততক্ষণে হয়ে যাবে।”

বলে তাখলিফ রান্নাঘরে চলে গেলো চা বানাতে। ঝুমুরও নিজের বাকি লেখাটুকই শেষ করে ফেললো এই সময়ের মধ্যেই। তাখলিফ চা নিয়ে ঘরে এলো। এরপর ব্যলকনিতে বসলো ওরা। পুরো শহর অন্ধকারে ঢেকে আছে। আকাশের চাঁদ আজ বেশ গোলাকার। হিমশীতল ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ঝিঁঝি পোকার কর্কশ ডাকে প্রকৃতির নিস্তব্ধতা কেটেছে। বাইরে ঝোপের কাছে জোনাকির আলো। এক নিঃস্তব্ধ, মায়াবী, জাদুকরী সৌন্দর্যে প্রকৃতি কেমন ডুবে আছে। অন্ধকারের নিজস্ব কেমন এক ভাষা আছে। সেই ভাষায় চায়ের কাপে আচমকা তাখলিফ খুঁজে পেলো অদ্ভুত মন খারাপের আকুলতা। বুকের ভেতরটা হয়ে গেলো গুমোট। এত সুন্দর রাত কেমন যেন আরেকবার পাওয়া ওর কাছে দুর্বিষহ মনে হলো। অন্ধকারে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো পাশে শান্ত হয়ে বসে চায়ের কাপে যত্ন নিয়ে চুমুক দেওয়া রমণীটির পানে। যাকে ভালোবেসে প্রতিনিয়ত সে অনুভব করছে বুকভরা ব্যথা। অথচ রমণীটি ওর হৃদয়ের খুব কাছে থাকলেও সেই ব্যথার কোনো উপশম হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না কে জানে! তাখলিফ দীর্ঘশ্বাস বের করে একসময় বলল,
“আমার কাছ থেকে কখনো লুকিয়ে-চুরিয়ে কিছু করিস না। আমি নিতে পারবো না। সবকিছুতে ক্ষমা পেলেও এক্ষেত্রে ক্ষমা পাবি না ঝুমুর।”

ঝুমুর এমনই চমকে ওঠলো যে ওর হাতে যে গরম চা ছলকে পড়েছে তা টেরই পেলো না। কম্পিত, সচকিত গলায় ও বলল, “কীসের কথা বলছেন?”

“জানি না। মনে হলো কথাটা তোকে বলা উচিৎ তাই বললাম।”

ঝুমুর স্বস্তি পেলেও ভেতরে ভেতরে একরাশ ভয় ওর বুকের ভেতরটা কামড়ে ধরলো। ঢোক গিলে ছোট্ট করে বলল, “হু।”

“আমাকে নিয়ে খুব ভয়ে থাকিস। এর কারণ কী ঝুমুর?”

অনেকক্ষণ পর আবারও প্রশ্ন এলো ঝুমুরের কাছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে লাগলো ঝুমুরের। মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেলো। মিথ্যে বলতে কষ্ট হলো ওর। তবুও কোনোমতে বলল,
“কিছু না তো।”

“সত্যি?”

“মিথ্যে বলি আমি?”

অনেকক্ষণ পর উত্তর দিলো ঝুমুর। ঘেমেনেয়ে একাকার হলো। তবে অন্ধকারে তা দেখতে পেলো না তাখলিফ। চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা বসিয়ে বলল,
“ওকে।”

ঝুমুর অন্ধকারে ঠাঁই বসে দুশ্চিন্তায় ডুবে গেলো। তাখলিফ কেন ওমন কথা জিজ্ঞেস করলো? সে কি টের পেয়েছে কিছু? ঝুমুর ঢোক গিলে উৎকন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি এরকম বলছেন কেন?”

তাখলিফ চোখ ফেরালো ওর দিকে। অন্ধকারে মুখ দেখা না গেলেও সে মৃদু হেসে জবাব দিলো,
“বললাম আরকি! তুই সবসময় সব সিরিয়াস হয়ে যাস, এটা তো ভালো লক্ষ্মণ না।”

ঝুমুর হাফ ছাড়লো। কড়া গলায় বলল,
“আপনি ভয় পাইয়ে দিলে আমি কি করবো? কোন ভুলের কেমন শোধ নেবেন তা তো আমি জানি না।”

“তাও ঠিক। আচ্ছা আর ভয় পাইয়ে দেওয়া কথা
বলবো না।”

“মনে থাকে যেন।”

“থাকবে।”

এরপর দু’জনের মধ্যে আর কথা হলো না। কৃত্রিম আলোহীন একটা রাত কেটে গেলো সন্তপর্ণে।

.

মেঘহীন আকাশে আচমকা বজ্রপাত হলে যেমন হয়, ‘নিরিবিলি’ বাড়ির দোতলায়ও এখন সেরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঝিনুকের স্বামী তাকে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছে। বাড়ির সকলে তা দেখে সবাই স্তব্ধ। কি হয়েছে, কেন হয়েছে এসব কেউ জানে না। তবে আন্দাজ করতে পারছে সবাই। অহেতুক একটা কারণের জন্য একটা সংসার ভেঙে দেওয়া ঠিক কতটা যুক্তিযুক্ত তা বুঝতে পারছে না কেউ। শামসুল হক এসব কান্ড দেখে যখন মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেদের কাছে কারণ জানতে চাইলেন তারা একবাক্যে জানিয়ে দিলো, ‘ঝিনুককে তাদের ছেলে আর চায় না। আর ছেলের চাওয়াটাই ওদের সব। তাই এখানে ওদেরও কিছু করার নেই।’

দায়সারা, যুক্তিহীন একটা কথা বলে তারা যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। তবে সবার অবশ্য বুঝতে বাকি রইলো না কিছু। মূলত ঝুমুরের সাথে ঝিনুকের দেবরের বিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করেই এ কাহিনী রচিত। ঐ ছেলে এখনো অশান্তি করছে বিয়ের জন্য। তাই নিজেদের মানসম্মান বাঁচাতে আর সাথে বড় ছেলেকে নতুন করে বিয়ে দিতেই এসবের শুরু। সবাই ক্রুদ্ধ, হতাশ, রাগান্বিত হয়ে পড়লো। বুঝতে পারলো না তাদের কি করা উচিৎ। পাখি বেগম তো মেয়ের সংসার ভেঙে যাওয়ায় ম’রাকান্না জুড়ে দিয়েছেন। শামসুল হক হতবাক নয়নে নিজের মেয়ের সংসার ভাঙার পেপারটার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না তার ভদ্র সভ্য মেয়েটার সাথে রক্ষণশীল পরিবারের মানুষগুলো এরকম কিছু করেছে! এদিকে স্বামীর থেকে ডিভোর্স পেপার দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি ঝিনুক। বিশ্বাসই হয়নি। ওর এতদিনের সংসার! নিজের হাতে সাজানো সবকিছু। স্বামীর বাড়ির কেউ হয়তো সাপোর্টিভ ছিলো না, তবুও তো সে ভালোবেসেছিলো। সবাইকে মান্য করে চলতো, আবদার পূরণ করতো। মুখফুটে কোনোদিন তর্কে জড়ায়নি শুধু একটু সুখের আশায়। সেখানে কীভাবে ওরা ওকে দূরছাই করে দিলো? সেজন্যই বুঝি সজীব ওকে এতদিন বাপের বাড়িতে থাকতে দিয়েছে? নিয়ে যেতে বললেও এড়িয়ে যেতো, বাহানা দিতো, বিরক্তি দেখাতো? ফোন করলে ধরতো না, কথা বলতে চাইতো না এজন্যই? সে-তো পাগলের মতো ভালোবেসেছিলো ওকে। তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অপমান কম সহ্য করেনি। তাহলে? কেন সজীব এরকম কাজ করতে পারলো ওর সাথে? ও কি কোনোদিনও ভালোবাসেনি ওকে? ভালোবাসেনি? তিক্ত হলেও সত্যি ব্যাপারটা বিশ্বাস হলো না ওর।

ঝিনুক দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ফোন করলো সজীবকে। ধরলো না সে। উল্টো ব্লক করে দিলো। ঝিনুক দ্বিগবিদিক হারা হয়ে নিজের ফোন, নিশি-তিথির ফোন থেকে একের পর এক ম্যাসেজ করলো, ভয়েজ করলো পাগলের মতো। তবুও কাজ হলো না৷ সবক’টা নাম্বার ব্লক করে দিলো। পরে বাবার ফোন থেকে সে একবার কল করলো। অনেকবার রিং হওয়ার পর সজীব ধরলো। রিসিভ হতেই ঝিনুক পাগলের মতো বলতে লাগল, ‘আমি সারাজীবন আপনার পায়ের কাছে পড়ে থাকবো, তবুও বলেন এসব মিথ্যা। আমাকে একফোঁটা শান্তি ভিক্ষা দেন।’

সজীব বলল, ‘এসব সত্যি।’

ঝিনুকের মাথা কাজ করছে না। কেমন ভনভন করে ঘুরছে। ও কান্না আটকে বলল, ‘আমি খুব খারাপ মেয়ে?’

‘তুমি খুবই ভালো মেয়ে ঝিনুক।’

‘তাহলে?’

‘আমি আর সংসার করতে চাইনা তোমার সাথে।’

‘কেন?’

‘তোমার বোন ঝুমুর। সে-ই অশান্তির মূল কারণ। তাই ভবিষ্যতে তোমার পরিবার বা বোনের জন্য আমার পরিবারের মানসম্মান যাতে খোয়া না যায় তারজন্য তোমার পরিবার থেকে দূরে থাকাটাই আমাদের জন্য মঙ্গল।’

ঝিনুক ক্রন্দনরত স্বরে বলল,
‘আপনি আমাকে বাড়ি নিয়ে যান দয়া করে। কথা দিচ্ছি, আমি আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবো না। আপনার পরিবারের সম্মান নষ্ট হতে দেব না। এককোণে পড়ে থাকবো, সবার সব কথা সহ্য করে নেব, আপনাকে কোনো অভিযোগ করবো না, একটু দয়া করুন। আমি আপনাকে ছাড়া কীভাবে থাকবো? খুব ভালোবাসি আপনাকে। যার কোনো সত্যতা নেই আদৌ, সেই কারণের জন্য আপনি আমাদের সংসারটা ভেঙে দিবেন? আমার দোষটা কী? একটু বুঝুন…’

‘সম্ভব না। ক্ষমা করো। ভালো থেকো ঝিনুক।’

বলে ঝিনুককে আরকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিলো সজীব। ঝিনুক কল ব্যাক করতে গিয়ে দেখলো এই নাম্বারটাও ব্লক করে দিয়েছে সজীব। ঝিনুক ভাষাহীন হয়ে গেলো। ওর অসংখ্য অনুরোধ, এত আকুত-মিনতি, কাতরতা, চোখের জল কোনোকিছুই সজীবকে টলাতে পারলো না। সজীব এত নিষ্ঠুর? একটু দয়া করলে কি হতো ওর? তাহলে বুঝি সত্যিই ওর প্রতি মায়া জন্মায়নি কোনোদিন? ভালোওবাসেনি? উত্তর পেলো না ঝিনুক। ওর এতদিনের ভালোবাসার এই প্রতিদান দিলো সবাই? ব্যাপারটা সহ্য করতে না পেরে একটা সময় মূর্ছা গেলো সে৷ বাড়িতে শুরু হলো চেঁচামেচি, কান্নাকাটি। তাখলিফ এসব কথা শুনে আচানক বনে গেলো। সামান্য কারণে ডিভোর্স? তবুও বাড়ির এ দুঃসময়ে না এসে পারা যায় না। ঝুমুরকে সঙ্গে নিয়ে তাখলিফ এলো। পাখি বেগম ওদের দেখে আরো হৈ হৈ রব জুড়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন। কেউই তাকে থামাতে পারলো না। তাখলিফ এসব পাত্তা না দিয়ে ইয়াসিফকে নিয়ে ডাক্তার-ঔষধের ব্যবস্থা করলো। সন্ধ্যার দিকে জ্ঞান ফিরলো ঝিনুকের। এরপরই শুরু করলো পাগলামি৷ কাছে বসে ওর হাত-পা ম্যাসাজ করে দিচ্ছিলো ঝুমুর। আর ওকে দেখেই ক্রোধে, আক্রোশে ফেটে পড়লো ঝিনুক। আচমকা ওঠে বসেই এলোপাথাড়ি মা’রতে লাগলো ঝুমুরকে। এমন ধাক্কা দিলো যে খাটের কোণায় পড়ে গিয়ে কপালে প্রচন্ড ব্যথা পেলো ঝুমুর। সকলে হতভম্ব হয়ে গেলো। প্রমিলা, তুসি-নিশি এসে ওকে ধরে অন্য রুমে নিয়ে গেলো।

_______________
চলবে…