অপ্রিয় রঙ্গনা পর্ব-২৪+২৫

0
323

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-২৪

ঝুমুরের ওপর নিজের আক্রোশের কানাকড়িও
মেটাতে না পেরে ঝিনুকের সবকিছু কেমন ফাঁকাফাঁকা লাগলো। রাগে হাত-পা নিশপিশ করতে লাগলো। যতবার মনে হচ্ছে ওর সাজানো ঘরটা ভেঙে গেছে ততবারই সব সম্পর্ক অর্থহীন মনে হচ্ছে, ইচ্ছে করছে সব ধ্বংস করে দিতে। ওর মতো নিরীহ মানুষের সাথে এমনটা কেন হলো? কি কারণে? ওর কি অপরাধ ছিলো? অন্য কারো জন্য কেন নিজের ঘর ভাঙলো? বিনা দোষে সে কেন শাস্তি পেলো? দুনিয়াটা অন্ধকার ঠেকলো। কষ্টে বুক ফাটছে, চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে। ঝিনুক কষ্ট সইতে না পেরে লাজলজ্জা ভুলে আচমকা চিৎকার করে কেঁদে ওঠলো। ইয়াসিফ ছুটে এসে বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরলো, পাখি বেগম এটাসেটা বলে বিলাপ করে কাঁদলেন। তবে কাজ হলো না। ঝিনুক দ্বিতীয়বারের মতো আবারও জ্ঞান হারালো৷ এবার ওর অবস্থা খারাপ দেখে তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে
যাওয়া হলো।

ঝুমুর নিজের ঘরে বসে আছে। ওর মাথার একপাশ ফুলে গেছে। হাতেও বেশ চোট লেগেছে। প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে হাতে আর মাথায়। মচকে গেছে কি-না কে জানে! তুসি ওর মাথায় বরফ দিয়ে দিচ্ছে। ঝুমুরের এসবে কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। ও এখনো ঘোরে আছে। বোনের আচরণে কিংকর্তব্যবিমুঢ়। ঝিনুক কি পাগল হয়ে গেছে? কেন এমন একটা কান্ড করলো বড় আপু? অহেতুক ওকে দেখে এমন তেড়েমেরে মারতে এলো কেন? ঝুমুর কিছুই বুঝতে পারলো না।

ও গভীর ভাবনায় ডুবে গেলো। ঝিনুক যে তার স্বামীকে ভীষণ ভালোবাসতো এটা ও ভালোভাবেই জানে। আকস্মিক এই বিচ্ছেদটা মেনে নিতে না পেরেই হয়তো তার এই অবস্থা। ঝুমুরের বুক ভেঙে কান্না এলো বোনের কষ্ট দেখে। দুলাভাই ঝিনুকের সাথে কিভাবে এমন একটা কাজ করতে পারলো? ঝুমুরের ভেবেই দমবন্ধ হয়ে এলো। ওর সাথে এমন হলে তো ও বাঁচবেই না৷ ঝুমুর খানিকক্ষণ থম মেরে বসে থাকলো। তুসি এসে ওকে জোর করে দু’টো ভাতের লোকমা খাইয়ে দিলো। ওকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদলো ঝুমুর। তুসি ওকে সান্ত্বনা দিলো, বোঝালো। ঝুমুর
কান্না থামালো। একটু পর দাদী সাজেদা বেগমের ঘরে গেলো। তাঁর শরীর ভালো না। সারাদিন শুয়েবসে কাটায়, হাঁটাচলা বন্ধ। শরীর ভীষণ দুর্বল। একা
দাঁড়াতে পারেন না। ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যেতে হয়। প্রেসার ওঠানামা করতেই থাকে। এককথায় শয্যাশায়ী। ঝুমুর দাদীর ঘরে এসে দেখলো বিছানায় ঠেস দিয়ে বসে বিলাপ করছেন আর চোখ মুছছেন সাজেদা বেগম। ফর্সা চেহারাটা লালবর্ণ ধারণ করেছে তার। বড় নাতনির ঘর ভাঙার সংবাদটা তাকে ভীষণ মর্মাহত করেছে। তিনি গুনগুনিয়ে কাঁদছেন। আচমকা ঝুমুরকে দেখে সাজেদা বেগমের ঠোঁটের কোণটা চওড়া হলো, তবে হাসলো না। ওকে কাছে ডেকে এনে বসালেন তিনি। কতদিন পর কাছে পেয়েছে ঝুমুরটাকে। দোতলায় তো সে আসেই না। সাজেদা বেগম ওকে এটাসেটা জিজ্ঞেস করে পরে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বললেন, “কি হইয়া গেলো রে ঝুমুর! অত
ভালা মাইয়াডার সাথে অমন অবিচার আল্লাহ মানবো না। এর ঠিক বিচার অইবো।”

ঝুমুর চুপচাপ চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছে। সাজেদা বেগম ওর হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বললেন,
“তুই কিন্তু আমার বড় পাগলটার সাথে থাকিস সবসময়। ছাড়বি না, ছাড়তে দিবিও না।”

“দিবো না।”

“তোর মা যা শুরু করছে, তোর সংসার ভাঙতো গিয়া বড় মাইয়াডার সংসারটা ভাঙলো। দেখলি তো?”

ঝুমুর কাঁদছিলো। আচমকা এমন কথা শুনে বোকা
বনে গেলো। ধরা গলায় প্রশ্ন করলো, “মা কি করলো?”

সাজেদা বেগম তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন,
“হুন রে বইন, বিছানাতে পইড়া থাকি বইলা ভাবিস না আমার চোখকান নাই। সবই খোলা আছে। সবই হুনি। তুই তো জানোসই ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ি থেইকা তোর জন্যি প্রস্তাব আইছিলো। ওর দেবরটা তোরে বিয়া করতে চাইছিলো। এরপর তো তোর বিয়া হইয়া গেসে এই খবরে সব বন্ধ হইসছিলো। কিন্তু ইদানীং, তুই বিবাহিত এইডা জানার পরেও এখনো অই ছেড়া তোরে বিয়া করতে চায়। আর ওরে কে উস্কাইছে জানোস? তোর মা।”

ঝুমুর আঁৎকে ওঠলো। ভাষাহীন হলো। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দাদীর দিকে। কোনো প্রশ্ন করতে পারলো না। সাজেদা বেগম নাক টেনে রয়েসয়ে বললেন, “তুই বিয়াইত্তা অইডা জানার পর ঐ বাড়ির মানুষ বিয়ার আলাপসালাপ ক্ষান্ত কইরা দেয়। তয় অনেক কথা শোনায়, অপমানও করে। অরা পিছু হইটা গেছিলো। কিন্তু তোর মা সবার অগোচরে সরাসরি ঝিনুকের দেবরের সাথে যোগাযোগ করে। ওরে বোঝায় তোর বিয়াডা বিয়া না, দুর্ঘটনা। শ্রীঘ্রি তোর ছাড়াছাড়ি করাইবো, এরপরে হের লগে বিয়া দিবো। ওই ছেড়া তো তোর জন্যি আগেই পাগল আছিলো, তোর মায়ের কথা হুইনা অর পরিবার পিছু হাঁটলেও হে তোরে বিয়া করার লাগি পাগল এহনো। মোদ্দাকথা, তোর মা ঝিনুকের দেবরের মাথাডা খাইছে।”

মায়ের নামে এমন একটা খারাপ অভিযোগ শুনে বিস্ময়ের সীমা রইলো না ঝুমুরের। মা তো ওকে বলতো, তাখলিফরে ছাড়, ঝিনুকের দেবরও বাদ। তোর জন্য অন্য একটা ভালো ছেলে আইনা দিমু। যার কোনো কলঙ্ক নাই, পাপ নাই, যার রক্ত, বংশপরিচয় ভালো। যে তোরে সুখে রাখবো। তাহলে? তলে তলে মা এসব করতো? মিথ্যে বলতো? নিজের জেদ বজায় রাখতে মেয়েদের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করতো? ঘৃণায় গা গুলিয়ে ওঠলো ঝুমুরের। সাজেদা বেগমের মেরুদন্ডে ব্যথা হচ্ছে। তার চোখমুখ বেদনায় নীল হয়ে গেলো। প্রেসারটা বোধহয় বেড়েছে। তিনি শুতে চাইলেন। ঝুমুর নিশিকে ডাকলো। নিশি এসে ঔষধ বের করে দিতেই ঝুমুর দাদীকে তা খাইয়ে দিলো। দাদীকে আগে সে নিজেই ঔষধ খাওয়াতো, কিন্তু এ ক’টা মাসে সে সব ঔষধের নাম-ধাম ভুলে গেছে। ঝুমুর আশ্চর্য হলো নিজের কান্ডে। কি করে ভুলে গেলো নিজের আট বছরের অভ্যাস, অভিজ্ঞতা? সাজেদা বেগম ঔষধ খেয়ে শুয়ে পড়তে চাইলেন। নিশি আর ঝুমুর মিলে তাকে শুইয়ে দিলো। এরপর ঝুমুর তার মাথার কাছে বসে চুলে বিলি কাটতে লাগলো আর নিশি দাদীর পা টিপে দিতে লাগলো। এদিকে সাজেদা বেগম নাতনিদের সেবা পেয়ে আলতো হাসলেন। দুর্বল কন্ঠে বললেন, “আমার ঝিনুকডা যেন ওসব অমানুষগুলারে ভুইলা ভালো থাহে দোয়া করি। আমার বড় নাতিডা খুব একলা, ছাড়িস না অরে ঝুমুর। তোরা সব সুখী হ।”

“দোয়া করো দাদী।”

নিশি ভারমুখে ঝুমুরকে বলল, “এসব যে কি হলো আপু! তুমি ঠিক আছো?”

ঝুমুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক আছি।”

“ব্যথা হচ্ছে কোথাও? ভাইয়া তোমাকে না পেয়ে আমাকে ফোন করেছিলো। ঔষধ লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করছিলো। তাহলে ভাইয়া এসে দিয়ে যেতো।”

“নাহ রে, মনব্যথা হচ্ছে। মনব্যথার ঔষধ থাকলে আনতে বলিস তোর ভাইয়াকে।

ব্যাহত গলায় কথাটা বলে ঝুমুর চুপ করে বসে দাদীর মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। আর একটি কথাও বেরুলো না ওর মুখ দিয়ে। নিশি দাদীর পা টিপতে টিপতে দেখতে পেলো চোখের জল লুকানো ঝুমুরকে। তাখলিফ ভাইয়াকে কেমন পাগলের মতো ভালোবাসে ঝুমুর আপু! তবুও মেজোমা কেন যে ওদের আলাদা করতে এত ষড়যন্ত্র করে! নিজের মেয়ের ভালো থাকাটা কেন মেনে নিতে পারছে না মেজোমা এটা বুঝে পায় না নিশি। সাজেদা বেগম ঘুমিয়ে পড়লেন।দাদী ঘুমাতেই ঝুমুর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিশির কাছে ওদিকের পরিস্থিতি জানতে চাইতে ও জানালো, ঝিনুক অতিরিক্ত কান্নাকাটি, দুশ্চিন্তায় দুর্বল হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওকে আজ রাতটা ওরা হাসপাতালেই রাখবে। ইয়াসিফ, মেজোমা, মেজোচাচা ওখানেই থাকবে। সানওয়ার হক আর তাখলিফও ওখানে। ঝুমুর ছোট্ট করে বলল, ‘ওহ।’

“আপু তুমি কথা বলবে ভাইয়ার সাথে?”

“নাহ।”

কিন্তু পরক্ষণেই বলল, “বলবো।”

নিশি নিজের ফোন থেকে তাখলিফকে ফোন করলো। রিসিভ হতেই নিশি ঝুমুরকে ফোনটা এগিয়ে দিলো। ঝুমুর ওখানে বসেই ফোনটা কানে ঠেকিয়ে বলল,
“থাকবেন ওখানে?”

তাখলিফ ব্যস্ত কন্ঠে বলল, “ঝিনুকটা বেশি পাগলামি করছে, কখন কি করে বসে কে জানে। তাই আছি।”

“আপুর জ্ঞান ফিরেছে?”

“হ্যাঁ। তবে এখন ঘুমাচ্ছে, ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে।”

“ওহ।”

“তুই কোথায়? দোতলায় নাকি তিনতলায়?”

“দাদীর কাছে।”

“থাক তাহলে। বাবা তো এখানে। একা ফ্ল্যাটে থাকিস
না বাবু।”

ঝুমুর সেটা মেনে নিয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মা রাগারাগি করেছে? আপনাকে উল্টাপাল্টা কিছু বলেনি তো?”

তাখলিফ হেসে ফেললো, “মেয়ের চিন্তায় সব ভুলে গেছে মেজোআম্মা। কি বলবে? আমার সামনে তো কিছু বলে না, তোকে পেলেই বলে। তাই এসব নিয়ে ভাবিস না। খেয়েছিস? দুপুরে তো কিছু পেটে দিলি না।”

“খেয়েছি। আপনি খেয়েছেন?”

“খাবার মতো পরিস্থিতি রেখেছে তোর বোন?”

ঝুমুর ভার গলায় বলল, “আপু খুব কষ্ট পেয়েছে।”

তাখলিফ হঠাৎ রেগে গেলো,
“ওমন কাপুরুষের জন্য আবার কষ্ট! লাখে একটা মেয়ে পেয়েছিলো, তার সাথে এই অন্যায়! আর ঝিনুকটা তো তোর চেয়েও গাধী, নয়তো এসব করতো? ওর তো লাথি মেরে নিজেরই বেরিয়ে আসা উচিৎ ছিলো। ওর বরটাকে সামনে পেলে শিক্ষা দিয়ে দিতাম। আমি তো কালই যাচ্ছি ইয়াসিফকে নিয়ে, এর একটা বিহিত তো করতেই হবে। আমার বোনকে ও কি ছাড়বে, ওকেই ছেড়ে আসবে ঝিনুক…”

ঝুমুর আঁৎকে ওঠলো। তড়িঘড়ি করে বলল, “থামুন।
যা হবার হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আর বাড়তে দিয়ে লাভ নেই। বাড়ির সবাই এমনিতেই ভেঙে পড়েছে, তার ওপর আবার ওদের রাগিয়ে দিলে ওরা যেমন লোক, আরো অহেতু ঝামেলা করবে। তারচেয়ে যা যেমন চলছে থাকুক। এসব করলে তো ডিভোর্স আটকাবে না, আমার আপু তো আর যাচ্ছে না ও বাড়ি। তাই এসব করবেন না প্লিজ..”

তাখলিফ বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আমার গাধীটা ভালোই পটরপটর শিখেছে দেখছি।”

ঝুমুর বলল, “আপনি কি তাহলে গাধা?”

“আমি ঝুমুরের বর।”

“ওহ তাই?”

“হুম। আচ্ছা রাখি, ঘুমিয়ে পড়তে বল আমার গাধীকে।”

“ঝুমুর তার বরকে ছাড়া ঘুমায়?”

তাখলিফ মৃদু হেসে বলল, “আজ ঘুমাতে বল।”

“আজই?”

“কেন?”

“এরপরের রাতগুলো?”

“এরপরের রাতগুলো হবে তোর ছোট্ট ঘর, বারন্দা, আলোহীন আকাশ, মহাকাশের সব নক্ষত্রদের সাথে নিয়ে। ওকে? ঘুমাতে যা এবার।”

ঝুমুর আপ্লূত কন্ঠে বলল, “শুভরাত্রি।”

.

হসপিটাল থেকে বাড়িতে ফেরার পর থেকে ঝিনুক ঝুমুরকে সে দুচোখে সহ্য করতে পারছে না। দেখলেই তেড়ে আসে, অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করে। বাড়ির সবাই ওর আচরণ দেখে অবাক। ঝিনুক কোনোদিন কারো সাথে উঁচু গলায় যেখানে কথা বলে নি, সেখানে ওর এই রুপ মেনে নেওয়া কঠিন। মেয়ের এ অবস্থা শামসুল হক মেনে নিতে পারছেন না। ঐ বাড়িতে বিয়ে দিয়ে কতটা ভুল করেছেন তা হাড়ে হাড়ে বুঝছেন। পাখি বেগম মেয়ের সাথে তাল মিলিয়ে দু’বেলা বিলাপ করে কাঁদে। শামসুল সাহেবের অসহ্য লাগে। কতবার না করেছেন স্ত্রীকে। ঝিনুকের সামনে এসব কথা না তুলতে, কিন্তু পাখি বেগম সেকথা কানেই তুলেন না। মেয়ের এতো ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছেন, সেটা ভেঙে গেছে এ নিয়ে তার দুঃখের শেষ নেই। তিনি এখন পুরোদস্তুর ঝিনুককে নিয়ে ব্যস্ত, সেজন্য ঝুমুরের মাথা খাওয়ার সময় পান না। দাদীর অসুস্থতা, বোনের এ পরিণতিতে মন খুব কাঁদে বলেই ঝুমুর আজকাল দোতলায় যাওয়া-আসা করে। তাখলিফও মাঝেমধ্যে দাদীর কাছে সময় কাটিয়ে যায়। তাখলিফ-ঝুমুরের সুখী মুখ, সুখী জীবনযাপন। একে-অপরকে দূরে সরতে না দেওয়া, চোখের আড়াল না করা সবকিছুই ঝিনুকের চোখের বি’ষে পরিণত হয়েছে। একইবাড়িতে সে কাটায় স্বামীহীন দুর্বিষহ জীবন, আর যারজন্য তার এ অবস্থা সেই ঝুমুর সুখে সংসার করছে তারই চোখের সামনে? ঝিনুকের মন ভরে যায় আক্রোশে। একদিন সন্ধ্যায় বসার ঘরে চায়ের আড্ডায় ঝুমুর নিশি-তিথির সাথে কি একটা কথা বলে হাসছিলো। সেটা ঝিনুক পাশের ঘর থেকে শুনতে পায়। ঝুমুরের খুশি থাকাটা অসহ্য ঠেকে ওর কাছে। সহ্য করতে না পেরে পাশের ঘর থেকে তেড়েমেরে আসে। চিল্লিয়ে বলে, “লজ্জা করে না তোর? বোনের সংসার ভেঙে আনন্দ করিস? আমি হলে তো ম’রে যেতাম রে। নির্লজ্জ, বেহায়া।”

ঝুমুরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। চোখ ছলছল করে ওঠলো৷ বেদনার্ত কন্ঠে বলল, “আপু তুমি এটা বলতে পারলে?”

“পারলাম। তোর জন্য, তোর মতো বেহায়া মেয়ের জন্য আমার ঘর ভেঙছে। তোর ম’রে যাওয়া উচিৎ।”

ঝুমুরের বুক ফেটে গেলো, “আপু…”

“কিসের আপু? তুই আমার বোন নোস। লুকিয়ে ফষ্টিনষ্টি করে বিয়ে করে সবার মাথা কাটিয়েছিস আবার বড় গলা করিস? আপু ডাকিস? শোন, কোনো ন’ষ্টা মেয়ে আমার বোন হতে পারে না…”

এরপরের কথাটা বলার আগেই ঝিনুকের গালে চড় পড়ে। ক্রোধান্বিত গলা শোনা যায়, “তোর মেরুদণ্ডহীন, কাপুরুষ স্বামীর জন্য তুই নিজের বোনকে ন’ষ্টা বলিস? এত স্পর্ধা তোর?”

তাখলিফ অফিস থেকে ফিরছিলো। দোতলার সিড়িকোঠা অতিক্রম করার সময় চেঁচামেচি শুনেই সে এসেছিলো। ঝুমুরকে বলা খারাপ কথাগুলো শুনে সে আশ্চর্য হয়েছে। ঝিনুকের এত সাহস হয় কি করে ওকে এসব বলার? রাগ তাই সামলাতে পারেনি। ঘরের সকলে বাকবিতন্ডা টের পেয়ে ততক্ষণে বসার ঘরে ছুটে এসেছে। সানওয়ার সাহেবও তিনতলা থেকে এসে পড়েছেন ততক্ষণে। এদিকে ঝিনুকের কোনো হেলদোল নেই। ও গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁসছে তখন। তাখলিফকে দেখে আর ওর মুখ থেকে এসব কথা শুনে ও নিজেকে আর আটকে রাখতে পারে না। ক্রোধে, রাগে জর্জরিত হয়ে বলে, “কোন সাহসে তুমি আমার স্বামীকে কাপুরুষ বলো? আমার গায়ে হাত তুলো? কে তুমি? হু আর ইউ? একটা অবৈধ, ন’ষ্ট সন্তান হয়ে তুমি কোন অধিকারে আমাদের মাঝে ঢুকো? এই তুমি আর তোমার সতীসাধ্বী ঝুমুরের জন্য আমার ঘর ভেঙেছে, বুঝেছো? তাই তোমাদের কোনো রাইটই নেই… ”

ঝুমুরের পুরো পৃথিবী যেন দুলে ওঠলো বোনের কান্ডে। ও কোনোমতে ছুটে গিয়ে বোনের পায়ে ধরে বলল, “আপু প্লিজ থামো, চুপ করো। তুমি নিজের মধ্যে নেই, এসব বলো না। দোহাই লাগে।”

ওদিকে তাখলিফ ঝিনুকের কথা কিছুই বুঝতে পারে না। শুধু দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে ঝুমুরের কান্ড। এমন করার মানে কি? তাখলিফ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বলে, “এসব কি ঝুমুর?”

“কিছু ন…”

বলে ঝুমুর মেঝে থেকে ওঠে ওর কাছে চলে আসে। হাত টেনে চলে যেতে চায়। জোর করাতে তাখলিফ রেগে যায়। ঝুমুর ওকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকলে পেছন থেকে ঝিনুক যেন মজা পেয়েছে সেভাবেই বলল, “তোর স্বামী যে দু’জন নর-নারীর অবৈধ লা’লসার ফল, তা কেন লুকাচ্ছিস? ভাইয়ার তো জানার অধিকার আছে। তুই তো ওর স্ত্রী। সব জেনেও ওমন চুপ থাকবি? ঠকাবি তোর প্রাণের প্রিয় পুরুষকে?”

ঝুমুর ঘৃণাভরা চোখে বোনের দিকে তাকায়। তাখলিফ যেন কিছু শুনতে পাচ্ছে না। আচমকা কানে কি হলো ও বুঝলো না। ছোট বোনের কথাগুলো এমন শোনাচ্ছে কেন? ও এসব ভুলভাল কি বকছে? তাখলিফ কপালে ভাঁজ ফেলে ঝিনুককে জিজ্ঞেস করল, “কি বলছিস!”

ঝিনুক শক্ত গলা। তাচ্ছিল্য মিশে আছে যেন,
“তুমি যাকে মা জানো সে তোমার জন্মদাত্রী নয়, তুমি যাকে বাবা জানো সে তোমার জন্মদাতা নয়। তুমি একটা অবৈধ সন্তান, যাকে দিনের পর দিন মাথায় তুলে রেখেছে ‘নিরিবিলি’ বাড়ির মানুষগুলো। পরোক্ষভাবে যার জন্য আমার সংসার ভেঙেছে। অথচ সে নামক তুমিটা আমাদের কেউ না, এ বাড়ির কেউ না…”

তাখলিফ বাবার দিকে তাকায়। সানওয়ার হক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছেন ঝিনুকের দিকে। ও একথা কীভাবে জানলো? কে বললো ওকে এসব?
পাখি বেগম মনে মনে হাসলেন। তার শান্তি লাগলো। এমন সময় শামসুল হক অভাবনীয় এক কাজ করে বসলেন। আচমকা ঝিনুকের দুইগালে ঠাটিয়ে চড় মারলেন। ও লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। শামসুল হক পাখি বেগমকে হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “আমার কথার অমান্য করলে তুমি? এত সাহস তোমার?”

পাখি বেগম স্বামীর এমন রুপ দেখে বাকহারা হয়ে গেলেন। কথা ছিলো এটাই যে, এই গোপন কথাটি ওরা বাদে আর কেউ জানবে না। তাখলিফ যে এ বাড়ির কেউ না সেটা শুধুমাত্র এ বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা আর সে জানবে। এমনকি ছোট বউ প্রমিলা পর্যন্ত তাখলিফের পরিচয় জানবে না। অথচ, অথচ আজ সবাই জেনে গেলো। শামসুল হক তো আর জানেন না, তার স্ত্রী এই কথাটি ঝুমুরকে বলেছেন। আর ওর সংসার ভাঙার জন্য ঝিনুককেও বলেছেন। পাখি বেগম ভীত হয়ে পড়লেন!

তাখলিফ শুধু তার বাবার দিকে চেয়ে আছে। এই দোতলায়, এই বসার ঘরে, যেন এই পৃথিবীতে যেন আর কারো অস্তিত্ব এই মুহূর্তে নেই। তাখলিফ নিজের পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেলো না, মাটি কি কাঁপছে? তার এই আঠাশ বছরের দীর্ঘ এই জীবনটার পুরো অস্তিত্ব কী মিথ্যে? না হলে বাবার চোখের ভাষা এমন অচেনা কেন? তাখলিফ অস্ফুটস্বরে প্রশ্ন করলো, “আমি যাকে বাবা বলে জানি সে আমার বাবা নয়?”

সানওয়ার হক উত্তর দিতে পারলেন না। তার বুকের ভেতরটা কেমন কাঁপছে। তিনি মেঝেতে বসে পড়লেন গা ছেড়ে। ইয়াসিফ আর সাঈদ হক এসে তাঁকে ধরলেন। এদিকে বাড়ির সকলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বোবা বনে গেলেন। এদিকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাখলিফের রক্তচক্ষু দেখে ঝুমুরের হাত-পা শীতল হয়ে এলো। ভয়ে গলা দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে না। একঘর মানুষকে তোয়াক্কা না করেই সে তাখলিফকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। তাখলিফ ওকে না ছাড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “আমার অস্তিত্ব লুকানোর শাস্তি পাবি ঝুমুর…”

ঝুমুরের চোখ টলমল করে ওঠলো। মানুষটা কতটা আঘাত পেয়েছে তা ঠাহর করতে পেরেই ওর দু-চোখ অন্ধকার হয়ে এলো। বুকের ভেতরটা ধড়াস ধড়াস করতে লাগলো। আচ্ছা, তাখলিফের কী কষ্ট হচ্ছে? ও কেন বুঝতে পারছে না? মন পড়তে পারছে না? এত কেন ভয় হচ্ছে?

___________

চলবে…

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-২৫

কিছু মানুষের জন্ম ভুল। এই ভুল মানুষগুলোকে পৃথিবীর মুখ দেখতে হয় কারো কারো ক্ষণিকের মোহ বা লালসা মেটানোর মাশুল দিতে। জন্মের পর তাদেরকে দেখতে হয় পৃথিবীর এক নিষ্ঠুর রুপ। তারা পাশে পায় না কাউকে। এমনকি জন্মদাতা-দাত্রীও নয়। তারা নিজের সন্তানকে সমাজের সামনে আনতে ভয় পায়, স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। নিজেদের নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ প্রমাণ করতে তারা নিজের অস্তিত্বে বেড়ে ওঠা ছোট্ট একদলা মাংসপিন্ডকে হ’ত্যা করতে পিছু হটে না। আবার কখনোসখনো ভ্রুণটির আগমনী খবরে বিলম্ব হলে তারা নিরুপায় হয়ে বেছে নেয় অন্য কোনো ঘৃণিত পথ। সবটাই নিজেদের স্বার্থে, সমাজ, পরিবারের কাছে নিজেদের পাপমুক্ত প্রমাণ করার চরিতার্থে। অথচ আদৌ কি তারা পাপমুক্ত হয়? মনের ভেতরটা কি কখনো তাদের কাঁপে না, বিবেকের দংশন হয় না? কে জানে! কারো হয়তো হয়, কারো না। যাদের হয় না তারাই নিজেদের অস্তিত্বের অংশকে জন্ম দিয়ে মে’রে ফেলতে চায় বা পলিথিনে মুড়িয়ে ডাস্টবিনে রেখে যায়। কেউবা আবার অন্যকে দান করে, কেউবা বিক্রি করে। সবশেষে পাপীগুলোর নিষ্পাপ, পবিত্র সন্তানগুলোকে
বেড়ে ওঠতে হয় অনাদরে, অবহেলায় এতিমখানায় বা
অন্য কারো আঁচলের ছায়ায়, আগাগোড়া মিথ্যে পরিচয়ে!

তাখলিফের ক্ষেত্রে অবশ্য তা হয় নি৷ তার কুমারী মা আলিফা স্বেচ্ছায় তাকে জন্ম দিয়েছিলো। তমালিকা ছিলো নিঃসন্তান, বিয়ের দু-বছরের মাথায় এক দুর্ঘটনায় সে তার মাতৃত্বের ক্ষমতা হারায়। জীবনের মানে ভুলে যাওয়া সেই তমালিকাকে স্বেচ্ছায়ই নিজের সন্তানকে তুলে দিয়েছিলো আলিফা। ভরিয়ে দিয়েছিলো তার কোল, দিয়েছিলো মাতৃত্বের সুখ। এরপর! এরপর নিজ সন্তানকে প্রিয় বান্ধবীর হাতে তুলে দিয়ে এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলো ইন্টার্নরত ডাঃ আলিফা খানম। শত চেষ্টা করে ও আটকাতে পারেনি তমালিকা তাকে। সেসময় আলিফাকে পতিতার সাথে তুলনা করে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তার পরিবার। সমাজও তাকে ত্যাগ করেছিলো। সেই অপমান, লাঞ্চনা সহ্য হয়নি আলিফার, তাই মৃ’ত্যুকেই বেছে নিয়েছিলো স্বেচ্ছায়। তমালিকা অবশ্য কখনো জানতে পারেনি আলিফাকে স্বপ্ন দেখিয়ে, শতশত আকাঙ্ক্ষায় ভাসিয়ে, তাকে সর্বসান্ত করে, ভুল বুঝিয়ে, কলঙ্কিত করে মৃত্যুবরণে বাধ্য করা ডাক্তার মাহমুদ এখন কেমন আছে! আমেরিকায় পাড়ি জমানো সেই বিশ্বাসঘাতক লোকটা কি নিজে কখনো সুখী হতে পেরেছিলো একটা নিষ্পাপ মেয়ের মৃত্যুর কারণ হয়ে? এত কেয়ারিং, ভালোবাসা কি শুধুমাত্র নিছকই ছলনা ছিলো? ভেবে পান নি তমালিকা। ডাক্তার মাহমুদ ছিলো তমালিকা আর আলিফার সিনিয়র ব্যক্তিত্ব। সেইসাথে প্রভাবশালী, রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। আঠাশ বছর আগে মধ্যবিত্ত ঘরের আলিফার কখনো সাহস হয়নি তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু করতে। তাই জীবনের কাছে হেরে গিয়েছে সে, তবে নিজের সত্যি ভালোবাসার ফলটিকে রেখে গেছে এই পৃথিবীতে। কিন্তু তাতে কি? নিজের জন্মদাতা-দাত্রীর ব্যাভিচারের পাপের অভিশাপেই কি-না কে জানে, অজান্তেই তাখলিফের দ্বারা অনেকগুলো পাপ ঘটে গেলো! যেই তমালিকা বুকে ধরে সতেরোটা বছর লালনপালন করলো তারই মৃত্যুর কারণ হলো তাখলিফ!

অতীতের সেই পুরোনো ঘটনার বিবৃতি দিয়ে পাখি বেগম থামলেন। বাড়ির সবাই থমকে গেলো। ইয়াসিফ ভারাক্রান্ত নয়নে মায়ের দিকে চাইলো। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। শামসুল হক স্ত্রীর ধৃষ্টতা সহ্য করতে না পেরে স্ত্রীকে থাপ্পড় মেরে, তার ওপর চোটপাট চালিয়ে রেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন। তিনি বেরিয়ে যাওয়ায় পাখি বেগম অবশ্য স্বস্তিই পেলেন। কতক্ষণ আর রেগে থাকবে? ঠিকই ফিরে আসবে। পাখি বেগম তাকে বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই আর রেগে থাকবে না তাদের মা-মেয়ের উপর। উফ! আরো আগে জানলে তো ঝিনুককেই ব্যবহার করতেন তিনি। সবকিছু এবার তার ইশারা মতোই হচ্ছে।

.

বারংবার মনে হয় এসব কোনো দুঃস্বপ্ন! ঘুম ভাঙলেই দেখবে সব মিথ্যা, ঝিনুকের বলা সব কথা মিথ্যা। কিন্তু তা হয় না। বাবাকে তাখলিফ আহত স্বরে আবারও প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে, “তুমি কেন কিছু বলছো না? চুপ করে আছো কেন? তাহলে কি সবকিছু সত্যি ধরে নেবো? সাত বছরের সেই তাখলিফ ভুল ছিলো না? মেজোআম্মা তখনো এবং আজকেও ভুল বলেনি আমায়? উল্টো তোমরাই আমাকে ভুল বুঝিয়েছিলে? এতবছর তাহলে আমি মিথ্যে সম্পর্কে থেকেছি? কেন করলে এরকম? কে বলেছিলো আমাকে এত দয়া কর‍তে? আমি তো চাইনি…”

সানওয়ার সাহেবের মনে পড়ে তাখলিফের ছোটবেলার একটি ঘটনা। সেবার ঈদুল ফিতরের পরদিন বাড়িতে অনেক মেহমান এসেছিলো। সঙ্গে এসেছিলো তাদের বাচ্চাকাচ্চাও। তাখলিফ সবার সঙ্গেই মিশেছে ভালোভাবে। সবার থেকে বেশি সালামিও পেয়েছিলো। এ নিয়ে ছেলেটা অনেক খুশি ছিলো। কিন্তু হঠাৎই ও নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো, কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। তমালিকা বারবার ছেলের শোকে জ্ঞান হারান, সানওয়ার সাহেবও দিশেহারা। সবাই মিলে খুঁজাখুঁজি করেও যখন পাওয়া গেলো না তখন থানায় জিডি করা হলো। এরমধ্যে একবাচ্চা জানলো পাখি বেগম তাখলিফকে বলেছে ওকে ব্রিজের নিচ থেকে কুড়িয়ে এনেছে, তমালিকা ওর মা নয়। সেজন্যই বাবা-মায়ে’র সাথে তাখলিফের চেহারার কোনো মিল নেই।’

এসব জেনে শামসুল হক স্ত্রীকে প্রচন্ড বকাঝকা করলে পাখি বেগম মজা করে বলেছেন বলে ব্যাপারটি ধামাচাপা দিয়ে দেন। কেউ আর কিছু বলে না তাকে।
পরে রাত বারোটার দিকে তাখলিফকে পাওয়া গেলো পাশের এলাকার রেলস্টেশনে। এ নিয়ে কত হইচই। তাখলিফ রাগে, অভিমানে কিছুতেই বাড়ি ফিরতে চাইছিলো না। পরে তমালিকা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কান্নাকাটি করে ছেলেকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। তাখলিফ শুধু শক্ত গলায় মাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘তোমরাই আমার আসল বাবা-মা? তাহলে তোমাদের সঙ্গে আমার চেহারার কোনো মিল নেই কেন?’

তমালিকা সেদিন বুঝ দিয়ে সাত বছরের তাখলিফকে সামলিয়েছিলো। সেদিনের ছোট্ট তাখলিফের চোখে সানওয়ার হক দেখেছিলেন অনুরাগ, অবিশ্বাস এবং ছেড়ে যাবার প্রবণতা। মনে পড়তেই সানওয়ার সাহেব দুর্বল বোধ করলেন। তিনি তো হাসিখুশি বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন এ ছেলেটির জন্যই। তাহলে? কেন এতদিন পর এসব সামনে এলো? কেন একজন বাবাকে ছেলের কাছে মিথ্যেবাদী প্রমাণিত করলো? সানওয়ার সাহেবের মুখ পান্ডুরবর্ণ ধারণ করলো। ছেলের অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেও তা গলা দিয়ে কিছুতেই বেরুচ্ছে না তার। কিভাবে বলবে? কি বলবে? নাড়ি কাটা ধন নয়, তবুও হৃদয়ের ধন তো! তাখলিফ বুঝবে তো? বললে বিশ্বাস করবে? এবার বোধহয় করবে না।

তাখলিফ শুধু রক্তবর্ণ দুটো চোখ নিয়ে ভাবুক বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। দৃঢ় স্বরে বাবাকে সে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি আমাকে এখনি বলবে, এসব সত্যি কি মিথ্যে?”

পুত্রের হুমকিতে চমকে ওঠলেন সানওয়ার হক।
হাত-পা কাঁপতে লাগলো তার। বললেন, “তুই আমার ছেলেই…”

“এসব জানতে চাইনি। ঝিনুকের কথার সত্যতা জানতে চাইছি। কি এটা?”

“সত্যি।

ছেলের গলার স্বরে কিছু একটা ছিলো। সানওয়ার সাহেব মিথ্যে বলতে পারেন নি। বুকে পাথরচাপা দিয়ে সত্যটা স্বীকার করলেন। তাখলিফ দু-চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বাবা! ছোটবেলা থেকে যে মানুষটা সবচেয়ে বেশি তার জন্য সাফার করেছে অথচ কোনোদিন কোনো অভিযোগ তুলেনি সেই লোকটা, পরাজিতের মতো সামনে বসে থাকা মানুষটা নাকি আদৌ ওর নিজের বাবা নয়। বাবার মুখের ভাষা মনেপ্রাণে অবিশ্বাস করতে চাইলেও চোখের ভাষা সে পড়তে পারলো। সেখানে স্পষ্ট লেখা, ‘আমি তোমার জন্মদাতা না।’ তাখলিফের বুকের ভেতরটা আচমকা দুমড়েমুচড়ে গেলো।

ঝিনুক বসা ছিলো। ওর মুখে নেই কোনো চিন্তা, ক্লেশের একফোঁটা চিহ্ন। একটুও অনুতাপ নেই ওর। কষ্ট হচ্ছে না। বরংচ ঝুমুর আর তাখলিফের কষ্ট দেখে অদ্ভুত শান্তি কাজ করছে। আচমকা ও হেসে ফেললো। তাচ্ছিল্যের হাসি। পাখি বেগম গিয়ে মেয়েকে ধরলেন। ইশারায় চুপ হতে বললেন। কিন্তু ঝিনুক তা শুনলোই না। তাখলিফ বোনের এরকম আচরণে অপমানজনক আচরণে শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। ইয়াসিফের মাথা খারাপ হয়ে গেলো। রেগে গিয়ে ঝিনুককে থাপ্পড় দিলো। পাখি বেগমকে বললো ওকে ভেতরে নিয়ে যেতে কিন্তু ঝিনুক দ্বিগুণ রেগে গিয়ে নিজের ভাইকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে চেঁচিয়ে ওঠলো, “ডোন্ট টাচ মি ভাইয়া। আমার ওপর হাত তোলার সাহস কই পাও? এতদিন চুপচাপ তোমাদের কথা মেনে নিতাম বলে আমাকে দুর্বল ভেবেছো সবাই। ভেবেছো আমার মুখ নেই, কথা বলতে পারি না? সেজন্য যা খুশি তাই করা যাবে আমার সাথে তাইনা? তোমরা তবে ভুল….”

“পাগল হয়ে গেছিস তুই?”

“হ্যাঁ, আমি পাগল হয়ে গেছি। তোমার আদরের ছোট বোন আর অবৈধ, নিকৃষ্ট ভাইয়ের জন্য আমি পাগল হয়ে গেছি…”

ইয়াসিফ রেগে আরেকটা থাপ্পড় মারলো বোনকে। তুসি এসে টেনেটুনে ওকে সরানোর চেষ্টা করলো। ইয়াসিফ ক্রোধান্বিত গলায় ঝিনুককে বলল, “যাকে তুই কষ্ট দিয়ে এসব বাজে বকছিস, যাকে তুই নিকৃষ্ট বলছিস সে আমার ভাই। রক্তের না হলেও সে আজীবন আমার বড়ভাই থাকবে। অথচ তুই আমার রক্তের বোন হয়েও আজ থেকে আমার কাছে মৃ’ত।”

ঝিনুকও কম যায় না। সে ইয়াসিফের কথা শুনে আশ্চর্য কন্ঠে বলল, “নিজের বোনের সংসারটা ওই লোকের ফষ্টিনষ্টির জন্য ভেঙে গেলো সেজন্য কোনোদিন তো কথা বলতে শুনলাম না, অথচ সত্য বলায় আমিই পর হয়ে গেলাম? মৃত হয়ে গেলাম? ওই লোকটা আর ন’ষ্ট ঝুমুরই তোমার সব? বাহ!”

“হ্যাঁ। সব, সব, সব। আর কখনো ভাই ডাকবি না তুই আমাকে।”

এরপর ঝিনুক যা করলো তা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। মেঝে থেকে ওঠে গিয়ে ঝুমুরকে আক্রমণ করে বসলো। ওর মাথা দেয়ালে ঠুকে দিয়ে চুল টেনে ধরে অশ্রাব্য ব্যবহার করতে লাগলো। পাখি বেগম, প্রমিলা সবাই ছুটে গিয়ে ওকে ধরলো কিন্তু ঝিনুক যেন নিজের মধ্যে নেই এমন করেই আঘাত করতে লাগলো। ইয়াসিফ হতভম্ব হয়ে গেলো। তাখলিফ এতক্ষণ সব চুপ করে শুনছিলো, দেখছিলো। এপর্যায়ে আর শান্ত থাকতে পারলো না। ওঠে দাঁড়ালো। সবাইকে সরিয়ে সে নিজেই ঝিনুকের কাছে গেলো। ওকে শান্ত হতে বললো। সবাই সরে গেলো শুধু গালভেজা কান্না নিয়ে ঝুমুর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কেউ ওকে নড়াতে পারলো না। ক্লান্ত ঝিনুক ধপ করে আবারও বসে পড়লো। তাখলিফকে দেখে মুখ ফিরিয়ে বসলো, যেন ওর চেহারা দেখাটাও পাপ। ঝুমুর ভীতগ্রস্থ, উৎকন্ঠিত চেহারা নিয়ে গুটিগুটি পায়ে তাখলিফের পেছনে এসে দাঁড়ালো। চুপচাপ টেনে ধরে রাখলো তাখলিফের শার্টের পেছনের অংশ। তাখলিফ অবশ্য এসব কান্ডে এতটাই হতবিহ্বল অবস্থায় রয়েছে যে ও সেটা টেরই পেলো না। একটু সময় নিয়ে ঝিনুককে ও গম্ভীর কন্ঠে বলল, “আমি মেনে নিচ্ছি, এসবের দায়ভার আমার। ঝুমুরের কোনো দোষ নেই। ও তো তখন ছোট ছিলো, বারবার অপরাধী করিস না ওকে। ওর বাস্তব জ্ঞান খুব কম জানিসই তো। ভুল যা সব আমারই। আমার জন্য তোর সংসার ভাঙলো, এত কষ্ট পেলি। বিশ্বাস কর, আমি জেনেবুঝে করিনি এসব। জানলে আমি তোদের জীবনেই থাকতাম না…”

“তাহলে চলে যাও এখন আমাদের জীবন থেকে…”

ঝিনুকের ধৃষ্টতায় ইয়াসিফের রাগে হাত-পা নিশপিশ করে ওঠলো। তুসি ওকে সামলালো। কি অবলীলায় কথাটা বলে দিলো ঝিনুক! তাখলিফ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। এরপর বলল, “আমি তোদের জীবন থেকে চলে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে?”

ঝিনুক তিক্ত গলায় অকপটে বলে ফেললো,
“হ্যাঁ হবে। তুমি আমার বোনের জীবন থেকে চলে যাও। তুমি এ বাড়ির কেউ না। তার ওপর জা’র’জ। অহেতুক তোমার কারণে আমাদের জীবনে সমস্যা হচ্ছে। মা তোমাকে মানবে না, আমার মায়ের কোনো ইচ্ছে পূরণ হচ্ছে না তোমার জন্য। তুমি বড়চাচার পালিত সন্তান হলেও এমনিতে তুমি আমাদের কেউ না…”

সানওয়ার হক ব্যথিত চোখে ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি চেয়েও থামাতে পারছেন না ওকে। তাখলিফ দিচ্ছে না ওকে থামতে। তিনি দু’হাতে নিজের কান চেপে ধরলেন৷ সহ্য হচ্ছে না হৃদয়ের টুকরোকে নিয়ে এত কথা শুনতে। ঝিনুকের কঠোর গলায় বলা কথাগুলো শুনে তাখলিফের বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠলো। সারাজীবন যাদেরকে আপন বলে জানলো তারা ওর কেউ না, আসলেই না। ও দম আটকে গাঢ় কন্ঠে বলল, “ভাই বলে ডেকেছিলি কোনো না কোনো সময়…”

“তখন তো তুমি যে জা’র’জ সেটা জানা ছিলো না। তাহলে কক্ষণো ডাকতাম না…”

‘জা’র’জ?’ ছিহ! নিজের প্রতি ঘৃণা হলো তাখলিফের।
ঝুমুর আঁৎকে ওঠলো। বড় আপু এসব কি বলছে? আদৌ এটা ওর বড় বোন? ঝুমুরকে না ঝিনুক খুব ভালোবাসে? তাহলে ছোটবোনকে এভাবে শেষ করে দিতে চাচ্ছে কেন? এটা বোনের প্রতি ওর কেমন ভালোবাসা? ও পেছন থেকে শক্ত করে খামচে ধরে রইলো তাখলিফের শার্ট। তাখলিফ সেটা ছাড়িয়ে নিলো। একপলক সবার দিকে তাকালো। বাবা মাথা নিচু করে বসে আছেন। ইয়াসিফ আর ঝুমুর করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। নিশি-তিথি কি কান্না করছে? ছোটচাচীর মুখটা সে দেখলো না। ছিহ! বাইরের একজন হয়ে যাকে তারা আশ্রয় দিয়েছে তাদেরই সন্তান মে’রেছে সে। এর কোনো ক্ষমা নেই। তাখলিফ সেখানে আর দাঁড়ালো না। কোনোমতে চলে এলো তিনতলায়, নিজের ঘরে। ঘৃণায় ওর গা গুলাচ্ছিলো। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন বিষাক্ত কাঁটা ফুটছিলো ওর৷ শরীরের অপবিত্র কোষগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছিলো ওর। দহনে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিলো ওর ভেতরটা। কিছুতেই যেন নিভছে না বুকের ভেতরের আগুনটা। পা দুটো যেন হাওয়ায় ভাসছে, পায়ের তলায় শক্ত মাটির খুব অভাব বোধ করলো তাখলিফ। ধপ করে আচমকা বসে পড়লো মেঝেতে। ঝুমুর ওকে ছুটে এসে ধরতে এলে ওকে দূরে সরিয়ে দিয়ে কঠিন গলায় বলল, “ধরবি না আমাকে।”

ঝুমুর ওর কথা তোয়াক্কা না করেই ওকে ধরতে গেলো। তাখলিফ দু’হাতে ওকে ঠেলে সরালো। চিল্লিয়ে ওঠে বলল, “বললাম না, ছুঁবি না আমাকে? ছুঁবি না মানে না, না, না…”

ঝুমুর ওর কন্ঠস্বর শুনে ভীতিগ্রস্ত হয়ে ছিটকে দূরে সরে গেলো। দু-চোখ বেয়ে পড়া নোনাজলে ভেসে যাচ্ছে ওর মুখ। ওড়নার দিয়ে মুখ চেপে ধরে নিজের কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা করলো। তাখলিফ হতাশ হয়ে মেঝেতে বসে রইলো দীর্ঘক্ষণ। ঘরটাতে কোনো সাড়াশব্দ নেই। শুধু তাখলিফের দীর্ঘশ্বাসের জোরালো শব্দ শোনা যাচ্ছে একটু পরপর। তাতে বারবার কেঁপে ওঠছে ঝুমুর। মানুষটা এতটা কষ্ট পেলো? ঝিনুক ওকে এত কষ্টে ফেললো? বড় আপু কি করে পারলো? ঝুমুর ওকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না। অনেকক্ষণ পর, মেঘহীন আকাশ যখন মেঘলা হয়ে গেলো তাখলিফ করুণ গলায় বলল, “কি দিয়ে কলঙ্ক মোছা যায়? আমাকে একটু এনে দিবি ঝুমুর?”

ঝুমুর ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে। মিয়ম্রাণ কন্ঠে বলল, “আপনি তো কিছু করেন নি, কীসের কলঙ্ক আপনার? কেন এসব বলছেন?”

“তুই পবিত্র, তোর বাবা-মা পবিত্র, তাদের সম্পর্ক পবিত্র। আর আমার জন্মদাতা-দাত্রী অপবিত্র, আমিও অপবিত্র। তাদের অবৈধ সন্তান, ন’ষ্ট ভাষায় যাকে বলে জা’র’জ। তাই তুই আমাকে বুঝবি না ঝুমুর, কোনোভাবেই তুই বুঝবি না জা’র’জ সন্তান তকমা পাবার যন্ত্রণা…”

ঝুমুর স্তব্ধ হয়ে দু-হাত দূরেই বসে রইলো। ওর সবকিছু ফাঁকাফাঁকা লাগছে। অনেক কষ্টে ঢোক গিলে বলল, “চুপ। কিসব বলছেন? বড়চাচা, বড়মা আপনার মা-বাবা। তারা অপবিত্র না। আপনি তাদের হাতে বেড়ে ওঠেছেন। তাই আপনি অপবিত্র না।

তাখলিফ ওর প্রতি ক্রোধান্বিত গলায় বলল,
“বেড়ে ওঠলেই খারাপ ভালো হয় না। আমি তো সবকিছু অথেন্টিক চেয়েছিলাম। মা-বাবা, সম্পর্ক, সবকিছু। কিন্তু আমি জন্ম থেকেই সব দু-নাম্বার পেয়ে এসেছি। আর এরজন্য দায়ী আমার জন্মদাতা-দাত্রী। কখনো ক্ষমা করবো না… ”

“এসব পুরোনো কথা, দয়া করে এসব নিয়ে পড়ে থাকবেন না।”

তাখলিফ জ্বলন্ত চোখে ওর দিকে তাকালো, “তোর কাছে সব স্বাভাবিক লাগছে? আর ইউ সিরিয়াস? তুই সব জানতি, এরপরেও লুকালি? আমি তোকে মাফ করবো না…

ঝুমুর কান্না আটকে মিনমিন করে বলল, “আমি কিভাবে এসব বলতাম আপনাকে? এত কষ্ট দিতে পারতাম না কখনো। আমাদের বিয়েটা জানাজানি হওয়ার পর এসব জেনেছি আমি। মা আমাকে এসব বলেছিলো যাতে আপনাকে আমি ছেড়ে দিই। আমার এসব বিশ্বাস হয়নি…”

তাখলিফ রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিজের হাতটা দেয়ালে ঘু’ষি মেরে বলল, “আমি ম’রে যাচ্ছি ঝুমুর,
কেউ তা দেখতে পাচ্ছিস না। বেরু এখান থেকে…”

“আমি আপনাকে একা রেখে যাবো না।”

“সবাই গেছে, তুইও যা। আমি ম’রে যাবো না…”

দরজায় এসে দাঁড়ালেন সানওয়ার হক। তিনি দিশেহারা বোধ করছেন। বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি অসহায় ভঙ্গিতে ছেলের সাথে কথা বলতে চাইলেন। তাখলিফের ভীষণ অভিমানে আর রাগে তখন গা কাঁপছে। ও ঠাস করে ওঠে দাঁড়ালো। ঝুমুরকে টেনেটুনে দরজার বাইরে বের করে দিলো। সানওয়ার হক ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলেন। নড়লেন না একটুও।

“ঝুমুর এই লোকটাকে চলে যেতে বল, তুইও চলে যা। তোরা আর আসবি না আমার মতো জা’র’জের কাছে…”

কথা শেষ হওয়ার আগেই সানওয়ার হক ছেলের গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিলো। তাখলিফ সেটা হজম করে নিয়ে জোরালো কন্ঠে বলল, “আমার জন্মদাতা বাবা নেই। আমি কাউকে দেখতে চাই না…”

ঝুমুর দেয়ালে মাথা ঠুকে কাঁদতে লাগলো। তাখলিফ বাবা আর ঝুমুরের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো। সানওয়ার হক বুকে তীব্র চাপ অনুভব করলেন। তিনি ডাইনিংয়ে গিয়ে নিজে নিজে পানি খেতে চাইলেন,
কিন্তু গ্লাসটা হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেলো। ঝুমুর ছুটে এলো। তাকে পানি খাওয়ালো। ধরে এনে ঘরে বসিয়ে দিলো, চিন্তা না করতে বললো। দরজার বাইরে বসে এত কাঁদলো, অনুরোধ করলো ঝুমুর তাও তাখলিফের মন গললো না। সে পুরো রাত নিজের ঘরে কাটিয়ে দিলো। মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে একটু শান্তি খোঁজার চেষ্টায় রত তাখলিফের বুকের দহন ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকলো। ভাবলো, কলঙ্কিত, চিহ্নিত এই জীবন সে চায়নি। আরো দু, দুটো অপবাদ৷ শাস্তি। নিজের জন্মদাত্রীর মৃত্যুর কারণ, ঝিনুকের সো কল্ড সংসার ভাঙার কারণ! এই অপবাদগুলো নিয়ে সে কখনোই বেঁচে থাকতে পারবে না। সে শক্ত মনের মানুষ নয় কখনোই, তবুও শক্ত থাকার চেষ্টা করেছে সবসময়। কিন্তু এই সত্যিটা? এই সত্যিটা ওকে ভেতর থেকে দংশন করছে। যতক্ষণ বেঁচে থাকবে ততক্ষণ দংশনের যন্ত্রণা অনুভব করবে, সেই সাথে কাছের মানুষগুলোকেও তার শিকার বানাবে। যা ও কোনোভাবেই চায় না। কিছুতেই না। ওর কি তবে দূরে সরে যাওয়া প্রয়োজন? সবার থেকে? সবকিছু থেকে? হ্যাঁ, তা-ই প্রয়োজন। ঝিনুক ঠিকই বলেছে। এই ‘নিরিবিলি’ বাড়ির মানুষগুলো ওরজন্য আর কত ভুগবে? কত কষ্ট পাবে? আর না, কিছুতেই না…

.

এরপরের দিনটা সত্যিই দুঃস্বপ্নের মতো ছিলো…
রাতটুকু কেটে যাওয়ার পর বাইরে ভোরের আলো ফুটতেই নির্ঘুম রাত কাটানো ঝুমুরের চোখ দুটো ক্লান্তিতে বুজে এসেছিলো। তখনি তাখলিফের ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো। ঝুমুর শব্দ পেয়ে ধরফড়িয়ে ওঠলো, সানওয়ার হকও ছুটে এলেন। তাখলিফ দরজা খুলে কোথাও না তাকিয়ে উস্কুখুস্ক চুলে, বিমর্ষ চেহারায় এককাপড়ে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। দোতলার কেউ অবশ্য তা টের পেলো না। কিন্তু যখন ঝুমুর হন্তদন্ত হয়ে এসে হাউমাউ করে জানালো তখন সকলেই চমকে গেলো। কেউ ভাবেনি এটা। ইয়াসিফ, সাঈদ হকের সাথে শামসুল সাহেবও তাখলিফকে খোঁজাখুঁজি শুরু করলো। ওর অফিস-কলিগ, চেনাপরিচিত সব জায়গায় খোঁজ করেও সারাদিনে ওর কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না। সানওয়ার হক এসব নিতে পারলেন না। দ্বিগবিদ্বিক হারা হয়ে গেলেন। রাতের দিকে তার শুরু হলো বুকব্যথা, তীব্র চাপ অনুভব করলেন। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো তার। সবসময় হাসিখুশি থাকা মানুষটির এ অবস্থায় বাড়ির সবাই ঘাবড়ে গেলো। প্রচন্ড অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরপরই চিকিৎসা শুরু করার মুহূর্তে এই পৃথিবীকে চিরজনমের মতো বিদায় জানিয়ে ফেললেন সানওয়ার হক। আকস্মিক বড় ভাইজানের এমন মৃ’ত্যুতে সবাই হতভম্ব, হতবাক হলো। বাক্যহীন হয়ে পড়লো বাড়ির প্রতিটি মানুষ। হসপিটাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসার পর চাচাকে মৃ’ত অবস্থায় দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে গেলো। ভালো একটা মানুষ হাসপাতাল থেকে কীভাবে লা’শ হয়ে ফিরতে পারে? চোখের সামনে দেখেও ঝুমুরের ব্যাপারটা বিশ্বাস হলো না। তবে বোধগম্য হতেই ও গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো। জ্ঞান ফেরার পর শুধু পাগলের মতো তাখলিফের খোঁজই চাইলো। অথচ ওর খোঁজ কেউ এনে দিতে পারলো না। ঝুমুরের হাসফাস লাগলো। বুঝে পেলো
না মানুষটাকে কোথায় খুঁজবে সে? বাবার কথা একবারও ভাবলো না তাখলিফ? বাবাটা যে ম’রে গেলো ওর! এভাবে কেউ ছেড়ে যায়? কীভাবে পারলো স্বার্থপর লোকটা? ঝুমুর নিজের মাথার ওপর কারো হাত পড়েছে অনুভব করতেই মুখ তুলে চাইলো।। মাথার কাছে বিলাপ করে কান্নারত পাখি বেগমকে দেখে ফুঁসে ওঠলো। ওর ছোট্ট, সুখী সংসারটা সহ্য হলো না এদের? এভাবে ন’ষ্ট করে দিলো মা আর বড় আপু? হাসিখুশি চাচাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে মৃ’ত্যু’র মুখে ঠেলে দিলো? পাখি বেগম আর ঝিনুককে দেখেই ও হাতের সামনে যা পেলো তাই ছুঁড়ে মারলো। ভয়ে ওরা এগোনোর সাহস পেলো না। ঝুমুর রাগে, কষ্টে, দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হলো, নিজের মাথার চুল টেনে ছিঁড়তে লাগলো। কেউ থামাতে পারছিলো না। বুকের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া ইয়াসিফ এসে বোনকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করলো। ঝুমুর ক্রন্দনরত হয়ে একনাগাড়ে বলতে লাগলো, “এসব কি হয়ে গেলো দাদাভাই? আমি কি করবো এখন? ওনি কোথায়? ওনি না এলে বড়চাচা যে ভীষণ কষ্ট পাবে। পাষাণ লোকটাকে একটু আসতে বলো। বড়চাচাকে একটু দেখুক, আমি আর কিচ্ছু চাইবো না তোমার থেকে। নয়তো বড়চাচার আত্মা কখনো শান্তি
পাবে না…”

_____

চলবে…