অপ্রিয় রঙ্গনা পর্ব-২৬+২৭

0
339

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-২৬

‘নিরিবিলি’ বাড়িটিকে ঘিরে আছে অন্ধকার ঘুটঘুটে আলোহীন রাত। গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা তিনটায়। চারদিকে কান্নার সুর। মানুষটা যে খুব ভালো, সৎ,
মজার ছিলেন। সুস্থসবল, হাসিখুশি লোকটা এক রাতের ব্যবধানে ব্রেন স্ট্রোক করে দুনিয়া ত্যাগ করলেন এটা যেন পরিচিত জনরা মানতেই পারলেন না। এদিকে বিপদের পর বিপদ লেগেই আছে। বড় পুত্রের মৃত্যুর খবরে সাজেদা বেগম হার্ট অ্যাটার্ক করেছেন। তাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি চলছে। বুকে পাথর চেপে শামসুল হক আর সাঈদ হক মা’কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ইয়াসিফ দিশেহারা হয়ে পড়লো। কোনদিক সামলাবে সে? দাদীকে? মৃ’ত চাচার শেষকৃত্যের আয়োজনকে? নাকি ঝুমুরকে? কোথা থেকে খুঁজে আনবে সে তার বড় ভাইটিকে? কি করবে? সে কিছুই বুঝতে পারলো না। মস্তিষ্ক ফাঁকাফাঁকা লাগলো। তাই সে দু’জন ফুফাতো ভাইকে পাঠিয়ে দিলো হাসপাতালে। অন্য ভাই আর বন্ধুদের অনুরোধ করলো বাড়ির দিকটা সামলাতে। সবাই ওকে ‘পাশে আছি’ বলে আশ্বস্ত করলে ইয়াসিফ খানিকটা ভরসা পেলো। নিজের দীর্ঘশ্বাস গোপন করলো। অশ্রু লুকালো। ওর সবকিছু দুঃস্বপ্ন লাগছে। ঝুমুরের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। মা-বোনকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটার চোখমুখ ফুলে গেছে। বারবার যাকে সামনে পাচ্ছে তারই হাতেপায়ে ধরে তাখলিফকে এনে দিতে বলছে। কিন্তু যে নিজের ইচ্ছেয় হারিয়ে যায়, তাকে কি এত সহজে খুঁজে পাওয়া যায়? তুসি আর প্রমিলা ওর কাছে আছে, নিজেদের শোক চেপে বুঝ দিচ্ছে। নিশি-তিথিও তাদের প্রিয় বড়চাচা আর দাদীর শোকে চোখের জল থামাতে পারছে না। কিন্তু তাতে কী? চলে যাওয়া মানুষটা যে কিছুতেই ফিরে আসছে না। ফুফুদের সাথে বসার ঘরে বসে চোখের জল ফেলছে ঝিনুক। পাখি বেগম মেয়ের কাছে গিয়ে ওকে সান্ত্বনা দিলেন। মনে মনে একটু খারাপ লাগলেও বিশেষ একটা পাত্তা দিলেন না। বয়স হয়েছে একদিন না একদিন তো সবাইকেই চলে যেতে হবে এই বলে নিজের মনকে বুঝ দিলেন। অবশ্য সুযোগসন্ধানী তিনি এত শোকের মাঝে তাখলিফকে কটাক্ষ করতেও ভুললেন না। করে বসলেন বিশ্রি এক মন্তব্য। ইয়াসিফ দরজা দিয়ে ঢোকার সময় তা শুনে ফেললো। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকালো মায়ের দিকে। কপালে ভাঁজ পড়লো। বিশ্বাস করতে পারলো না এটা ওর সহজসরল সেই মা? যে ছেলের খাওয়া না হলে কেঁদেকেটে অসুখ বাঁধিয়ে ফেলতেন। এই ক’টা দিন মায়ের আচরণে এতটাই মন বিষিয়ে গেছে ওর যে মায়ের প্রতি যতটুকু শ্রদ্ধাবোধ ছিলো তাতে শক্ত এক আবরণ পড়েছে। চাইলেও যেটা সরানো যাবে না। তাই বিচক্ষণ চিন্তাধারা বারবার শুধু বলে, ‘এ আদৌ তোর মা নয়। হতেই পারে না।’

পাখি বেগম পুত্রের উপস্থিতি টের পেলেন না।
নিজের বাপের বাড়ির মানুষের কাছে অনেক বানোয়াট, ভিত্তিহীন কথাই বলতে লাগলেন। ইয়াসিফ সব শুনলো। এরপর যখন আর নিতে পারলো না তখন মায়ের প্রতি ভীষণ রাগে, অভিমানে গলা ধরে এলো ইয়াসিফের। ততক্ষণে আঙ্গুলের ইশারায় ইয়াসিফের উপস্থিতি জানান দিলেন একজন। পাখি বেগম ঘাড় ফিরিয়ে ছেলেকে দেখে চুপসে গেলো। ছেলেটা কিছু শুনে ফেলেনি তো? ইয়াসিফ রক্তচক্ষু নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। এরপর তাচ্ছিল্য হেসে বলল, “আমার ভাইটার সাথে যা অবিচার করার তা তো করেছেনই, এবার ক্ষান্ত দিন। নিজেকে সামলান আম্মা, নয়তো এমন একদিন আসবে যেদিন আপনার পুত্রকেও পাশে পাবেন না। আই সয়্যার…”

পাখি বেগম ভীতসন্ত্রস্ত হলেও পরক্ষনেই সামলে নিলেন নিজেকে। ছেলের কথা তার মনে দাগ কাটলো না। নিজের পেটের ছেলে, কীভাবে এসব বলে? নিশ্চয়ই অভিমান করে বলেছে। তিনি বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠিক ব্যাপারটা আয়ত্বে নিয়ে আসবেন। আস্তে আস্তে তো সবই আয়ত্বে আসছে। পথের কাঁটা নিজে থেকেই বাড়ি ছেড়েছে। নিজের ছেলে-মেয়েদের জীবন এখন নিজের হাতে সাজাবেন। কে আটকাবে তাকে?

.

ঘড়ির কাঁটা ভোর ছ’টায়। চারদিকে জড়িয়ে আছে ভূতূড়ে কুয়াশা। ঠান্ডা হিমেল হাওয়ায় গায়ে কাঁটা দিচ্ছে সকলের। বাড়ির ভেতরের পরিবেশ মৃ’ত। থেকে থেকে কান্নার সুর ভেসে আসছে একুটু পরপর। সানওয়ার হককে যোহরের আযানের পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। তাখলিফের খোঁজ চলছে এখনো। ওর জন্যই অপেক্ষা করছে সবাই। মানুষটার খোঁজ এখনো পাওয়া গেলো না বলে ঝুমুর ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ও তো জানে, তাখলিফ বাবাকে কত ভালোবাসে! সেই বাবার চির বিদায়ে মানুষটা থাকবে না সেটা ও ভুলেও ভাবতে পারলো না। হঠাৎই একটি কথা মাথায় এলো ওর, আগে কেন আসেনি তা নিয়ে আফসোসও করলো। এরপর সাথে সাথেই ওড়নার কোণ দিয়ে চোখ মুছে কান্নাকাটি বন্ধ করে ইয়াসিফকে ডেকে পাঠালো। বোন ডাকছে শুনে ইয়াসিফ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতেই ঝুমুর ওকে সবটা বললো। ইয়াসিফ দেরি না করে ওর এক বন্ধুকে নিয়ে তখনই বেরিয়ে গেলো। ঝুমুর আশা নিয়ে বসে রইলো বাকিটা সময়। কাঁদলো না একটুও। শুধু প্রার্থনা করলো, মানুষটাকে যাতে সেখানটাতেই পাওয়া যায়!

.

নীলচে আকাশ। কিছু কালো-সাদা মেঘ অবলীলায় ওড়াওড়ি করছে। কুয়াশা কাটেনি এখনো। কেমন কচুরিপানা পচা পানির গন্ধ ভাসছে বাতাসে বুড়িগঙ্গা নদীর সেই পাড়ে। যেটা তাখলিফ আর তার মায়ের প্রিয় জায়গা, যেখানে বসে ডুবন্ত সূর্যের সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলো ঝুমুর আর তাখলিফ! ঝুমুরের কথামতো তাখলিফের খোঁজ পাওয়া গেলো ঠিক সেখানটায়। ইয়াসিফরা যখন সেখানের জেলেপাড়ায় তাখলিফের চিরুনি তল্লাশি চালালো তখন বছর দশেকের একটা বাচ্চা ছেলে এসে ওদেরকে তাখলিফের অবস্থান দেখিয়ে দিলো। নদীর পাড়ে কলমি ফুলের ঝাড়। অনেকগুলো ডিঙি নৌকা তীরে বাঁধা। সেখানে খুঁজে খুঁজে তাখলিফকে যখন ওরা বের করলো ইয়াসিফ দেখলো লম্বাচওড়া মানুষটা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে নৌকার পাটাতনে। দু’চোখ বন্ধ। পরণে আগের দিনের অফিসের সেই শার্ট-প্যান্ট। চোখমুখ দেখে চেনা যাচ্ছে না ওকে। সবসময়ের গোছানো চুলগুলো রুক্ষবর্ণ ধারণ করেছে একদিনেই৷ ইয়াসিফের বুক ভেঙে গেলো প্রিয় ভাইয়ের ওমন রুপ দেখে। যে ছেলেটা নিজের পরিচয় জেনে এককাপড়ে বেরিয়ে এসেছে, যে ছেলেটা দোষ না করেও সব দোষ, অপবাদদ নিজের ঘাড়ে নিয়েছে বাবার মৃত্যুর খবরে সে ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেবে তা আন্দাজ করেই বুক ফেটে গেলো ওর। তবুও বহু কষ্টে ইয়াসিফ নিজের আবেগ সামলালো। ডিঙিতে ওঠে ভাইয়ের সামনে গিয়ে বসলো সে। খুব ধীরেসুস্থে, আস্তে ডাকলো সে ভাইকে।

তাখলিফ চোখ খুলে তাকাতেই ইয়াসিফ ভড়কে গেলো। দু-চোখ যেন রক্তাক্ত! ও কিছু বলবে তার আগেই তাখলিফ শান্ত স্বরে বলল, “খোঁজ পেলি কীভাবে?”

ইয়াসিফ ওর গলা শুনে অবাক হলো। তথাপি ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ও ঢোক গিলে বলল,
“বাড়ি চলো ভাইয়া।”

তাখলিফ আশ্চর্য কন্ঠে বলল, “বাড়ি? কার বাড়ি?”

“তোমার বাড়ি ভাইয়া।”

এই কথা শুনে তাখলিফ উচ্চস্বরে হেসে ওঠলো, “বাড়ি? আমার বাড়ি? ভাই? আমি তোর ভাই?”

ইয়াসিফ আচমকা ওর হাতদুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে নিলো। করুণ গলায় বলল, “পৃথিবী মিথ্যে হয়ে গেলেও ধ্রুব সত্য এটাই যে, যেই বাড়িতে তুমি দীর্ঘ আঠাশটা বছর ধরে আছো, সেই ‘নিরিবিলি’ বাড়িটা তোমারও বাড়ি। বড়চাচা-চাচীর একমাত্র সন্তান, আর আমার বড়ভাই। যে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে আমাকে সবসময় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছো। হোক সেটা মানুষের থেকে বা সমুদ্রে ডুবে যাওয়া থেকে। হোক সেটা হাইওয়ের বাস এক্সিডেন্ট বা খারাপ সিজিপি’র ডিপ্রেশন। হোক সেটা আমার জীবন, আমার বোনের জীবন…”

তাখলিফ শোয়া থেকে ওঠে বসলো। এরপর কেমন করে যে হাসলো! ইয়াসিফের কাছে অদ্ভুত সুন্দর অথচ গা ছমছমে বলে গণ্য হলো তাখলিফের হাসিটা। তাখলিফ একপর্যায়ে হাসি থামিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল, “তোদের পরিবারের সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলো আমিই করেছি। এসবের কাছে আমাকে নিয়ে তোর দেওয়া এসব ছোটখাটো ফিরিস্তি তুচ্ছ। এটুকু উপকার নিয়ে আমাকে তোদের বাড়িতে ফিরতে বলছিস? জা’র’জ বলে আমার বুঝি দাম নেই? সম্মান নেই?”

ইয়াসিফ আঁৎকে ওঠে বলল, “কক্ষণো না। আমি এখনো ওতো ছোট মনের হতে পারিনি ভাইয়া। তুমি আমাকে এই ভাবলে?”

তাখলিফ হেসে বলল, “ভাবলাম আর কোথায়?
তুই তো সত্য বলেই দিলি। আচ্ছা, বাদ দে এসব সস্তা টপিক। আমি জানি আমার খোঁজে তোকে ঝুমুরই এখানে পাঠিয়েছে। এই মেয়েটার বাড়াবাড়ি আর গেলো না। বয়সের তুলনায় কাজেকর্মে দশধাপ এগিয়ে। শোন, আমি যে এখানে আছি তুই যেন আবার বাবা আর ঝুমুরকে বলে দিস না। আমি এখানে একলা থাকতে চাই। বারবার জোর করিস না বাড়ি ফিরতে। তুই বরং এখন ফিরে যা…

ইয়াসিফ বুঝে গেলো ওকে বলেকয়ে, অনুরোধ করলে
লাভ হবে না। ও প্রায় অসহায় হয়েই বললো,
“ভাইয়া বাড়ি চলো। ওখানে তোমার প্রয়োজন…”

ইয়াসিফের গলার স্বর, চেহারার ভঙ্গিমা দেখে তাখলিফ একটু থমকালো। ও সন্দেহী চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো। ঠোঁট চেপে ভাবলো, তবে কিছুই বোধগম্য হলো না। ইয়াসিফ ভেবে পেলো না এ সংবাদটা ঠিক কীভাবে দেওয়া উচিৎ। অনেক চেষ্টা করেও নিজের মুখে ছেলের কাছে বাবার মৃ’ত্যু সংবাদটা দিতে পারলো না ইয়াসিফ৷ করুণ গলায় শুধু এটুকু বলতে পারলো, “দাদী, বড় চাচার ভীষণ প্রয়োজন তোমাকে। মানুষগুলো ভালো নেই ভাইয়া, একটুও ভালো নেই। তুমি না গেলে বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। বড়চাচা…”

“কী হয়েছে বাবার?”

ইয়াসিফ থেমে যাওয়াতে তাখলিফের ভ্রু কুঁচকে এলো। কি বলছে ইয়াসিফ তার কিছুই বুঝলো না। বুকের ভেতর অশান্তির বীজটা ডালপালা মেলে আবারও নড়চড় করছে। তাখলিফ প্রশ্ন করেও উত্তর না পেয়ে রেগে গেলো। ইয়াসিফ মুখে কুলুপ এঁটে বলল, “বাড়ি গেলেই দেখতে পাবে। তুমি শুধু চলো ভাইয়া…”

তাখলিফ ঝিম ধরা গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“কী হয়েছে বলছিস না কেন? এসব ফালতু ভনিতার মানে কী?”

“প্রশ্ন না করে চলো…”

অসম্পূর্ণ কথা শুনে তাখলিফের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। মনের ভেতর ভয় হলো। কাল রাগারাগি করে বাবাকে সে কত কটু কথাই বলেছে, কষ্ট দিয়েছে। বাড়ি ছেড়ে আসার সময় বাবার মুখ দেখতে চায় না-ও বলেছে। ওর বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠলো। কিছু কি হয়েছে বাবার? বা দাদীর? উত্তর না পেয়ে ও ধৈর্যহারা হয়ে ইয়াসিফের কলার টেনে ধরলো। ইয়াসিফ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নতস্বরে বলল, “প্লিজ আমায় আরকিছু জিজ্ঞেস করো না। আমি ক্লান্ত, সত্যিই বলতে পারবো না কি হয়েছে। তুমি গেলেই দেখতে পাবে। পায়ে ধরছি, চলো…”

তাখলিফ ওর এমন ব্যবহারে যারপরনাই অবাক হলো। যতই রাগ-অভিমান থাকুক ব্যাপারটা যখন বাবার তখন কম্প্রোমাইজ করার প্রশ্নই আসে না। তাখলিফ উৎকুণ্ঠাবোধ করলো। ওর মানসপটে ভেসে ওঠলো দাদীর মুখ, হাসিখুশি চেহারার বাবার মুখ। মানুষটা না হোক জন্মদাতা, তাখলিফের বাবা হয়েছে তো? তার কিছু হয়েছে এটা স্বপ্নেও ভাবে না সে৷ কিন্তু ইয়াসিফটা ওমন লুকোচুরি করছে তাখলিফের ইচ্ছে করছে থাপড়ে ওর দাঁত ফেলে দিতে। এসব হয়তো ওর বাবা আর ঝুমুরের বুদ্ধি, ওকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। তবুও একটা কিন্তু রয়েই
গেলো ওর মনে। তাই ও ইয়াসিফের সাথে ফিরতে
রাজি হলো। বাসের মধ্যে বসা তাখলিফের মনের ভেতরটা শুধু কু ডাকতে লাগলো। একপর্যায়ে উত্তেজনা, উৎকন্ঠা, কৌতূহল দমাতে না পেরে ইয়াসিফ আর ওর বন্ধুকে চেপে ধরলো ঘটনা বলার জন্য। কিন্তু ওরা দু’জনই বোবা-কালার মতো বসে রইলো। তাখলিফ চিন্তায় অস্থির হয়ে দম আটকে গাড়িতে বসে রইলো। বাবার জন্য চিন্তা হলো ওর, ভীষণ! এরকম আগে কখনো হয়নি।

ক্যালেন্ডারের হিসেবে তখন অগ্রহায়ণ মাসের শেষ। পৌষের শীত আসি আসি করছে। এরকম ঠান্ডা হিম ধরা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে চিন্তায় অস্থির তাখলিফ বাড়ি ফিরলো উদ্ভ্রান্তের মতো। এরপর বাড়ির ভেতরে-বাইরে মানুষের আনাগোনা, একটা ভূতূড়ে নিশ্চুপতা, গুনগুন করে কান্নার শব্দ শুনে ও যারপরনাই অবাক হলো। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় সবাইকে ওর দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাতে দেখেও বিস্মিত হলো। ইয়াসিফ ওর পাশেই ছিলো। এরপর! ইয়াসিফ যখন তাখলিফকে সানওয়ার হকের মৃত দেহের কাছে নিয়ে গেলো তাখলিফ স্তব্ধ হয়ে গেলো। কে এটা? বাড়িতে আবার কে মারা গেলো? কে শুয়ে আছে ওখানটায়? ও প্রশ্নোক্ত দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকাতেই অনেকে তারা মুখ লুকালো। তাখলিফের রাগ হলো। কেউ কেন ওকে কিছু বলছে না? অসহ্য! এরপর ও নিজেই লা’শের ওপর থেকে যখন সাদা কাপড়টি সরালো ও হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। বোকার মতো ইয়াসিফের দিকে তাকিয়ে ধমক দিলো, “হোয়াট দ্যা হেল? বাবা এখানে এভাবে শুয়ে আছে কেন?”

ইয়াসিফ এ পর্যায়ে ভাইকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁপা গলায় বলল, “বড়চাচা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে ভাইয়া…”

তাখলিফ এক ঝটকায় ওকে সরিয়ে দিয়ে রক্তবর্ণ চোখে ওর দিকে তাকালো। এরপর ওর মুখে ঘুষি মেরে বলল, “আমি না হয় তোদের কেউ না, কিন্তু আমার বাবা তো তোদের রক্তের মানুষ। তুই এই কথাটা কীভাবে বলতে পারলি? আসলে তুইও খারাপ। খারাপের খারাপ। তোরা আমার বাবাটাকেও ছাড়ছিস না…”

ইয়াসিফের ঠোঁট কেটে রক্ত বেরিয়ে গেলো। বুড়ো আঙুল দিয়ে তা মুছে নিয়ে ও দু’হাতে মুখ ঢেকে মেঝেতে বসে পড়লো। আর্তনাদ করে বলল, “বড় চাচা আমারও চাচা ভাইয়া। বাবার মতো ভালোবাসি তাঁকে। চাচা আমাদের মাঝে নেই এটা তোমাকে মানতে হবে…”

তাখলিফের শিরা, উপশিরায় রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে। ও শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে ইয়াসিফকে মারতে আবারও এগিয়ে গেলো। পাশ থেকে ওর কাজিন আর ইয়াসিফের বন্ধুরা এসে ওকে টেনেটুনে আটকালো। তাখলিফ রাগে তখন কাঁপছে। ইয়াসিফের চোখ থেকে এবার সত্যিই দু-ফোঁটা জল বেরিয়ে গেলো। তাখলিফ সবাইকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে বাবার মাথার কাছে গিয়ে বসলো। এরপর ক্রোধান্বিত গলায় বাবার মুখপানে চেয়ে বলল, “তোমার আপনজনেরা খুব স্বার্থপর বাবা। ওরা কেউ তোমার, আমার ভালো চায় না। ওরা শুধু মানুষকে কষ্ট দিতে জানে। আমাদের ভালো চায় না।”

এটুকু বলে থামলো। আবারও একটুক্ষণ থেমে করুণ গলায় বলল, “আমি তোমাকে কাল কষ্ট দিয়ে কথা বলেছি। আমি সরি। এক পৃথিবী সরি। তুমি এক্ষুনি ওঠে বসে প্রমাণ করে দাও তুমি মজা করছো, কারণ ইয়াসিফ শ’য়’তানটা মিথ্যা বলছে…”

.

মৃ’ত মানুষের ঘুম কখনো ভাঙে না।
অথচ তাখলিফ বাবার ঘুম ভাঙার আশায় একে,একে দু’টি ঘন্টা কাটিয়ে দিলো। কেউ ওকে নড়াতে পারলো না। বাবাকেও কোথাও নিয়ে যেতে দিলো না।
ওর অবোধ বিশ্বাস বাবার ঘুম ভাঙবে। এরপর বলবে, তুই বাড়ি ছেড়ে গেছিস, তাই তোকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যই এই পরিকল্পনা করেছি। কেমন?

মৃ’ত মানুষ কথা বলতে পারে না।
অথচ এই দুটি ঘন্টা তাখলিফ বাবাকে একনাগাড়ে হাজারো প্রশ্ন করেই চলেছে। কিন্তু ওর বাবা উত্তরহীন। সবাই বলাবলি করতে লাগলো এই ছেলে পাগল হয়ে গেছে। তমালিকা মারা যাওয়ার পর ছেলেটা যেমন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গেছিলো, ঠিক সেই লক্ষ্মণ দেখা দিচ্ছে। এদিকে লা’শ এভাবে এতক্ষণ ফেলে রাখা ঠিক নয় এই নিয়ে মুরুব্বিরা হৈচৈ শুরু করলে বাধ্য হয়ে সাঈদ হক আর ইয়াসিফ এসে বোঝাতে লাগলো তাকে। বহু কষ্টে, টেনেহিঁচড়ে ওকে বাবার কাছ থেকে সরাতে সক্ষম হলো। সানওয়ার হককে ব্যাকইয়ার্ডে শেষ গোসলে নিয়ে যাওয়া হলো। তাখলিফ শুধু পাগলের মতো করছিলো।
তাখলিফকে দোতলার বসার ঘরে প্রায় আটকেই
রাখা হলো। বেরুতে না পেরে রাগে, ক্ষোভে ও সব জিনিসপত্র ভাঙচুর করলো। হাতে-পায়ে ঢুকে গেলো কাচ। তাখলিফের তাতে একটুও কষ্ট হলো না। বুকের ভেতরটা শূন্য মনে হলো। মাথা নষ্ট হয়ে গেলো। কি হলো? কেন হলো? ওর তো কিছু নেই, কেউ নেই এ বাবাটা ছাড়া। কেন চলে গেলো ওকে একা ছেড়ে? একটু রাগ করে বাড়ি ছেড়েছে বলে বাবা ওকে হারিয়ে দিয়ে নিজেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো? ওর জন্য? আবারও? তাখলিফ ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া পুরুষের মতো এবার আর্তনাদ করে ওঠলো। শুকনো চোখজোড়া জলে ভিজে গেলো। নিজের মাথার চুল টেনে ধরলো। এসব দেখে পাখি বেগম নিজের বাজে ভাষা সামলাতে পারলেন না। বোন, ভাবিদের কাছে রসিয়ে রসিয়ে বললো সবই এই ছেলের নাটক। ঝুমুর এতক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ওকে কাঁদছিলো। কাছে যাওয়ার সাহস হচ্ছিলো না ওর। কিন্তু এ পর্যায়ে আর নিজেকে আটকাতে পারলো না। বুক ফেটে যাচ্ছে ওর। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে ছুটে গিয়ে তাখলিফের কাছে গেলো। কাচ ঢুকে যাওয়া র’ক্তা’ক্ত হাতটা তুলে নিয়ে ঝুমুর তাতে চুমু বসালো। তাখলিফ ওকে সরিয়ে দিলো। ঝুমুর কাঁদতে কাঁদতে বলল, “এরকম করবেন না। এসব করলে বড়চাচা কষ্ট পাবে। আপনি নিজের বাবাকে এভাবে কষ্ট দিতে পারেন না।”

তাখলিফ র’ক্তবর্ণ চোখে ওর দিকে তাকালো। ওর পরণের শার্ট টানাহেঁচড়ায় ছিঁড়ে গেছে কয়েক জায়গায়। ঝুমুরের কথা শুনে ও ঘর কাঁপিয়ে হেসে বলল, “এ লোকটা আসলে আমার বাবা নয়, আমার বাবা আমাকে ছেড়ে যেতে পারতো না কিছুতেই…”

ঝুমুর ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলো আষ্টেপৃষ্টে। তাখলিফ এবার আর ওকে সরিয়ে দিলো না। হাঁটু ভেঙ্গে মেঝেতে বসে ওর হাতদুটো মুঠোয় নিয়ে চোখভরা অশ্রু নিয়ে ভঙ্গুর গলায় শুধালো, “এতগুলো পাপের বোঝা নিতে পারছি না রে।
আর না, আমি বোধহয় ম’রে যাবো ঝুমুর! এই দেখ, আমার দম আটকে আছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমি মৃ’ত্যু ভয় পাই জেনেও এমন করলো? বাবা? আমার বাবা? শেষ পর্যন্ত আমার বাবা আমায় শা’স্তি দিলো? এই শোন! আমি কি একটু রাগ করতে পারি না বাবার সাথে? বাবার সাথেই তো রাগ করে সন্তানেরা? আমার বাবা আমায় কেন শূন্য করে চলে গেলো? তোর বড়চাচা এত স্বার্থপর! এত স্বার্থপর! শুধু নিজের কথাই ভাবলো, আমার কথা একটুও ভাবলো না রে ঝুমুর, আমি কীভাবে থাকবো একটুও ভাবলো না। আমি এবার পুরোপুরি পিতৃমাতৃহীন হলাম। আমার আর কেউ রইলো না…”

ঝুমুর কি বলবে, কীভাবে সান্ত্বনা দিলে তাখলিফ
শান্ত হবে তা বুঝলো না। শুধু নির্বাক হয়ে চোখের জল বিসর্জন দিতে লাগলো। তাখলিফ ওর হাতের তালুতে কপাল ঠেকিয়ে বসে রইলো উদ্ভ্রান্তের ন্যায়। অপরাধের বোঝা বইতে বইতে সে এবার সত্যিই ক্লান্ত!

__________
চলবে…

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-২৭

তিনটা দিন কেটে গেলো সকলের ঘোরের মাঝেই
বাবাকে চিরস্থায়ী নির্বাসনে পাঠানোর পর আর একবারও বাবার কথা কারো সম্মুখে তুলে নি তাখলিফ। একফোঁটা অশ্রুও গড়াতে দেয় নি। যেন বাবার কথা সে ভুলেই গেছে। কি এক ভাবনায় যেন ডুবে থাকে সারাক্ষণ! পাখি বেগম আড়ালে এটা নিয়েও বোনদের কাছে গসিপ করে। তাখলিফ চাপা স্বভাবের হলেও এই ক’টা দিন ক্ষণে ক্ষণে ওর এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে ঝুমুর উদ্বিগ্নবোধ করে খুব। কান্না পায়। এমন একটা কঠিন সময়ে ভাই আর ছোট দুটো বোন ছাড়া পাশে পায় নি ও কাউকেই। এমনকি ফুফুদেরও নয়। তাখলিফ তাদের খুব আদরের হলেও ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে ওরা তাখলিফের প্রতি অসন্তুষ্ট। মুখ ফুটে কেউ কিছু না বললে আচার-আচরণ দ্বারা সেসব বুঝিয়ে দিচ্ছে তারা। ঝুমুর এজন্য ভেতরে ভেতরে কষ্টে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

প্রাণহীন বাড়িটিতে আপনজন, আত্মীয়দের আনাগোনা কমেছে। শুধু রয়েছে সানওয়ার সাহেবের বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নী। আছে পাখি বেগমের টক্সিক বোন-ভাবিরাও। যারা সামনে পেলেই ওর মাথা খাওয়া শুরু করে দেয়। এসবের মাঝেও দাঁতে দাঁত চেপে ঝুমুর তাখলিফকে নিয়ে দোতলাতেই আছে। শোকে আচ্ছন্ন তাখলিফকে নিয়ে তিনতলায় একা থাকার ভরসা পায়নি। তাই বাবা-চাচা আর ইয়াসিফের পরামর্শে সে এখানেই থাকছে। তাখলিফ অবশ্য থাকতে চায়নি, ঝুমুর অনেক কষ্টে জোর করে রেখেছে ওকে। যেটা পাখি বেগম ভালো চোখে দেখেন নি। তিনি শুধু সুযোগ খুঁজছেন কীভাবে তাখলিফকে মেয়ের জীবন আর এ বাড়ি থেকে তাড়ানো যায়! সানওয়ার হকের মৃত্যু সবার মনে ছাপ ফেলে গেলেও যে একজনের মনে ছাপ ফেলতে পারেনি তিনি হলেন পাখি বেগম। ভাসুরের মৃত্যু, শ্বাশুড়ির অসুস্থতা সবকিছুর জন্য তিনি দোষারোপ করেন তাখলিফকে। তবে সেটা সবার অগোচরে, শুধুমাত্র তাখলিফেরই সামনে। কুৎসিত মানসিকতার অধিকারিণী পাখি বেগম সুযোগ পেলেই তার সদ্ব্যবহার করেন।
তেমনি সেদিন ভঙ্গুর তাখলিফকে আরো ভেঙে দেওয়ার জন্য তিনি এ সমস্ত ঘটনার জন্য দায়ী করলেন। চোখেরজল ফেলে ইনিয়েবিনিয়ে পাপীর খাতায় বেশ ভালোভাবে ওর নাম লিখে দিলেন। আর কোনো পাপিষ্ঠের কাছে থাকলে তার মেয়েটারও কোনোদিনও ভালো হতে পারে না বলে নিজের মনের ক্ষোভ মিশিয়ে বানানো নানা অবান্তর, অশুভ কথা তাখলিফের মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন। নিজের মেয়ে হওয়া স্বত্তেও এসব বলতে পাখি বেগমের একটুও বুক কাঁপলো না। এধরণের অশুভ কথা বলে তাখলিফকে ভেঙে দেওয়ার জন্য পাখি বেগমের সাথে যুক্ত হলেন তার ছোট বোন, ভাইয়ের বউ। তারাও বেশ ভালোভাবেই তাখলিফের ব্রেন ওয়াশ করলেন। সদ্য বাবা হারানো তাখলিফ যেখানে নাওয়াখাওয়া ভুলে বিপর্যস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করছিলো সেখানে ওদের বিষাক্ত কথাবার্তা ওর মনে গভীর দাগ কেটে যেতে লাগলো। সময়ে-অসময়ে চোখের সামনে সব ঘোলাটে হয়ে যেতে লাগলো। এসব ভেবে ভেতরে ভেতরে দংশনের যন্ত্রণা অনুভব করতে না পেরে হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখা কাচের গ্লাসটা ভেঙে টুকরো করলো। হাত কা’টলো। পুনরায় ক্ষততে আঘাত লাগায় রক্ত ঝরলো। শব্দ শুনে ঝুমুর রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো নিজের ঘরে। ঢোকার মুহূর্তে খালা আর মা’কে নিজের ঘর থেকে বেরুতে দেখে অবাক হলো। তবে পরক্ষণেই তাখলিফকে মূর্তিমান রুপ দেখে, হাত থেকে রক্ত ঝরতে দেখে ওর মাথা চক্কর দিয়ে ওঠলো। ছুটে গিয়ে ওড়নায় চেপে ধরে কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল, “হাতটা কে’টে ফেললেন? একটুও ব্যথা লাগে না আপনার?”

তাখলিফ অন্যমনস্ক স্বরে বলল,
“ব্যথা পাওয়া ভুলে গেছি।”

“কিন্তু আমার তো লাগে…”

তাখলিফ এবার চোখ তুলে চাইলো ওর দিকে। এরপর ধীর গলায় বলল, “তোর ব্যথা লাগে?”

“হুম। কিন্তু আপনি তা বোঝেন না।”

তাখলিফ ভারী নিঃশ্বাস ফেললো, “আমি সত্যিই বুঝি না রে।”

ঝুমুর একটু থেমে এরপর জিজ্ঞেস করলো, “বুঝতে হবে না। মা এসেছিলো, কিছু বলেছে?”

“বলেনি।”

ঝুমুর স্বস্তির শ্বাস ফেলে এরপর ব্যস্ত গলায় বলল, “একটু ওড়নাটা চেপে ধরে বসুন। আমি ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি…”

এরপর গা থেকে ওড়নাটা খুলে তাখলিফের হাতে ভালো করে প্যাঁচিয়ে দিয়ে ওঠে গেলো ঝুমুর। ড্রয়ার খুঁজে তুলা, অ্যান্টিস্যাপটিক নিয়ে এসে দেখলো তাখলিফ হাত থেকে ওড়নাটা খুলে মেঝেতে ফেলে দিয়েছে। আর কাটা হাতটা নিয়ে বসে আছে চুপচাপ। ফোঁটা ফোঁটা র’ক্তে লাল হয়ে গেছে ওর সাদা রঙের ওড়নাটা। ঝুমুর স্তব্ধ হয়ে গেলো। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে তাখলিফের সামনে গিয়ে মেঝেতে বসলো। এরপর হাতটা তুলে নিয়ে চু’মু খেলো। তাখলিফ ঝট করে সেটা সরিয়ে নিতেই ঝুমুর খপ করে ধরে ফেললো। এরপর সময় নিয়ে তুলা দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিলো। তাখলিফ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেটা দেখলো। এরপর বলল, “তোর র’ক্তের ভয় কেটে গেছে?”

“গেছে।”

“ব’মি আসছে না?”

“না।”

“আমাকে দেখেও না?”

ঝুমুর এবার একটু রাগ চোখেই তাকালো, “আপনাকে দেখে আমার প্রেম আসে, ভালোবাসা আসে। উল্টাপাল্টা কিছু আসে না।”

তাখলিফ বিরক্ত কন্ঠে বলল,
“তুই নির্বোধ তাই আসে না।”

ঝুমুর কাটাকাটা স্বরে বলল, “নির্বোধই থাকতে চাই, তবুও আপনার সঙ্গে।”

তাখলিফ এবার খানিকটা নড়েচড়ে বসলো। বিছানার ওপর পা তুলে হেডবোর্ডে মাথা দিয়ে বসলো। জিজ্ঞেস করল, “দাদী কেমন আছে জানিস কিছু?”

সাজেদা বেগম বাকশক্তি হারিয়েছেন, শরীরের একপাশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে। অবস্থা মোটামুটি। আরও সপ্তাহখানিক হাসপাতালে থাকতে হবে। এসব জানা স্বত্তেও ঝুমুর তাখলিফকে মিথ্যে বলল, “ভালো।”

“দাদীর কাছে যাবো।”

ঝুমুর মিনমিন করে বলল, “যাবেন। আমিও যাবো।”

“তুই যাবি না, আমি একা যাবো।”

ঝুমুর কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। এরপর ওঠে খপ করে ওর শার্ট টেনে ধরলো। ওর শরীরের সাথে একদম মিশে গিয়ে বলল, “আমাকে রেখে পালাতে চান? বুঝি না ভেবেছেন?”

তাখলিফ কাঠ গলায় বলল, “ছাড়…”

ঝুমুর হুমকি দেওয়া গলায় বলল,
“খুব খারাপ হবে যদি এরকম কিছু করেন।”

“ব্যথা পাচ্ছি হাতে, সর…”

ঝুমুর অভিমান করে সরে গেলো। এরপর বিছানার অন্যদিকে শুয়ে মুখ ফিরিয়ে চোখের জল বিসর্জন দিতে লাগলো। এই পাষাণ লোকটার জন্য একদিন সে ম’রেই যাবে। ও ধরে আসা কান্নাভেজা গলায় বলল, “আপনি পালটে গেছেন আবারও, আগের চেয়েও বেশি।”

তাখলিফ তাকালো না ওর দিকে। শুনলোও না ঝুমুরের কথাগুলো। ওর মানসপটে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে বাবার শতশত স্মৃতি। কী আশ্চর্য! হঠাৎই ওর চোখ দিয়ে জল বেরুচ্ছে না, সব যেন শুকিয়ে গেছে। যাক, সেইসাথে সে নিজেও মিথ্যে হয়ে যাক। শুধুমাত্র এই পৃথিবীর যা কিছু সত্য তা নক্ষত্রের ন্যায় অম্লান থাকুক চিরকাল, যেমনটা ঝুমুরের প্রতি ওর ভালোবাসার ন্যায় সত্য।

.

পরদিন দুপুরের দিকে এক কান্ড হলো। তাখলিফ এ ক’টা দিনে তেমন কিছুই মুখে তুলেনি বিধায় ঝুমুর নিজের হাতে ওর প্রিয় খিচুড়ি তৈরি করে নিয়ে এলো। তাখলিফ খেতে চাইলো না। কিন্তু ঝুমুর একপ্রকার জোর করেই সেগুলো ওকে খাইয়ে দিতে গেলো। ঝুমুরকে রান্নাঘরে দেখে সুযোগ বুঝে একটু আগে পাখি বেগম এসে তাখলিফকে ভয়ংকর রকম অপমান, আপবাদ আর কষ্ট দিয়ে কথা বলে গেছেন। ও তখন বিষন্ন ভঙ্গিতে বসে বসে পাখি বেগমের কথাগুলো ভাবছিলো আর রাগে কিলবিল করছিলো ওর হাত-পা। তার মাঝেই ঝুমুরের খাওয়ানোর জন্য জোরাজুরি করাটা ওকে আরো রাগিয়ে দিলো। একপর্যায়ে রাগ সামলাতে না পেরে হাতের ধাক্কায় সরিয়ে দিতে গেলে আচমকা এক কান্ড হলো৷ ঝুমুর টাল সামলাতে না পেরে টেবিলের কোণায় পড়ে মাথায় ব্যথা পেলো। দাঁতে দাঁত চেপে তা সহ্য করলেও ওর মাথা ঝিমিঝিম করে ওঠলো যখন দেখলো কপালের চামড়া কেটে র’ক্ত ঝরছে। ঝুমুর সব ভুলে র’ক্ত দেখে চাপা আর্তনাদ করে ওঠলো। তাখলিফও তখন হতভম্ব! একছুটে গেলো ঝুমুরের কাছে! গালে হাত রেখে উদ্বিগ্ন গলায় বলতে লাগলো, “বিলিভ মি, আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমি তোর ক্ষতি চাইনা, কেন করলাম এটা… কেন ধাক্কা দিলাম, ঝুমু শোন আমি কিন্তু তোকে কষ্ট দেবার জন্য এমন করিনি….”

ওর বলা শেষ হওয়ার আগেই পাখি বেগম মেয়ের আর্তনাদ শুনে কোথা থেকে ছুটে এসে কান্ড দেখে চিৎকার করে বললেন, “হায় হায় রে! রক্তে ভাইসা গেলো আমার মাইয়ার কপাল। কি হইলো রে এইডা…কেমনে অতবড় ব্যথা পাইলি রে ঝুমুর?”

ইয়াসিফ বাড়িতে নেই। পাখি বেগমের বোন ছুটে এলেন তার চিৎকার শুনে। ঝুমুর বিপদ এড়াতে ব্যথিত গলা লুকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল, “এমনি পড়ে গেছি। কিছু হয়নি তেমন।”

ঝুমুরকে মিথ্যে বলতে দেখে তাখলিফ মন্ত্র জপার ন্যায় বিড়বিড় করে যেন নিজেকেই বলছে, “আমার জন্য এতবড় ব্যথা গেলি? আমি তোকে ফেলে দিলাম? এত জোরে ধাক্কা দিতে চাইনি রে! কীভাবে কী হয়ে গেলো আ আমি কিন্তু ইচ্ছে করে দিতে চাইনি…”

ঝুমুর অসন্তুষ্ট চোখে ওর দিকে তাকালো। পাখি বেগম সঙ্গে সঙ্গেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠলেন। তার মেয়েটাকে এই আপদটা ধাক্কা মেরছে? যে মেয়ে বাপ-মা ভুলে এর কাছে পড়ে আছে, জীবন নষ্ট করছে সেই মেয়ের কপাল থেকে এই কুলা’ঙ্গারটা র’ক্ত ঝরিয়েছে? পাখি বেগম তারস্বরে চিৎকার করে ফেললেন, “কতবড় সাহস তোমার? তুমি আমার মাইয়ারে ধাক্কা দিছো? ব্যথা দিছো?”

তাখলিফ তার দিকে চোখ তুলে চাইলো। অন্য হাতে ধরে ঝুমুরকে ওঠালো। পাখি বেগম রেগে এগিয়ে গিয়ে ওর হাত ছাড়িয়ে মেয়েকে ধরলেন। এরপর বললেন,
“দেখ ঝুমুর, এই হইলো এর আসল রুপ। এর র’ক্তের মূল দোষ। যে তারজন্য জীবন ন’ষ্ট করতেছে তার কোনো মূল্যই দিতেছে না।”

ঝুমুর বিছানায় বসতে বসতে কঠোর গলায় বলল,
“আহ! থামো তুমি। আমার কিছু হয়নি৷ ওনার কোনো দোষ নেই, আমিই জবরদস্তি করছিলাম ওনার সাথে। পিছলে পড়ে গেছি।”

পাখি বেগমের বোন খোঁচা মেরে বললেন, “আমাগো আদরের টুকরা তুই৷ ওমন দিনও আমাগো আয়ে নাই যে আমাগো বোনজি পইড়া পইড়া জামাইয়ের মাইর খাইব…”

পাখি বেগম জ্বলন্ত চোখে তাকালেন তাখলিফের দিকে। ও তখন দিশেহারা চোখে ঝুমুরের ক্ষতের দিকে তাকিয়ে ফার্স্ট এইড বক্সটা খুঁজছে। পাখি বেগম কিড়মিড় করে বললেন, “সবার জীবনই খাইছে ওয়, এখন তুই রয়ছিস বাকি। তোর জীবনডা শেষ না কইরা ওয় ক্ষান্ত হইবো না। দেখিস, একদিন ওয় তোরেও খাইবো…মিলাই নিস…”

ফার্স্ট এইড বক্সটা স্টাডি টেবিলের ওপরই ছিলো। তাখলিফ নিজেই ঝুমুরকে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছিলো। কিন্তু আচমকা এমন একটা কথা শুনে তাখলিফ চমকে তাকালো পাখি বেগমের দিকে,
“আমি?”

পাখি বেগম গলা চড়িয়ে বললেন,
“হ তুমি। নিজেরে সাধু দেখানোর চেষ্টা করবা না একদম। আমাগো কথা না শুইনা তোমার কাছে মাইয়া গেছে। আমরা তো বাপ-মা। ওর চিন্তায় চিন্তায় শেষ হইতেছি আর তুমি ওরে মারধর করো! এরপরেও আমার বেয়াদ্দব মাইয়া তোমারে ছাড়তে চায় না। কি দিয়া বশ করছো ওরে? আমাগো বাপ-মা’র কষ্ট তোমাগো মতো বে’জন্মারা বুঝবা না। কারণ তোমার বাপ-মা তো জন্ম দিয়াই খালাস, সঠিক শিক্ষা তো পাও নাই। তোমাগো কাজই হইলো মানুষের জীবন খাওন…”

তাখলিফ স্তব্ধ হয়ে গেলো এসব শুনে। কান দিয়ে ঝাঁ ঝাঁ শব্দ বেরুতে লাগলো। বাবা থাকলে মেজোআম্মা এসব বলার সাহস পেতো? ওকে বে’জ’ন্মা বলতে পারতো? বাবা-মায়ের শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারতো? পারতো না। এই তিনদিনে এসব শুনতে শুনতে ও ক্লান্ত। তবুও প্রতিবার ওর বুকের ভেতরের দাবানলটা আগের চেয়েও বেশি দ্রাবদাহে জ্বলতে থাকে যা ওর নিঃশ্বাস বন্ধ করে কষ্ট দেয়। এবার ঝুমুরের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো। ঘৃণাভরা কন্ঠে প্রতিবাদ করে বললো, “তুমি যদি আর একটা বাজে কথা বলছো খুব খারাপ হবে মা। আমি কিন্তু চুপ থাকবো না।”

“কি কবি তুই? যের লাগি কবি সে-ই তো তোর দুঃখের কারণ… ”

ঝুমুর তাখলিফের অন্ধকার চেহারাটা সহ্য করতে না পেরে এবার ওঠে এসে মা-খালাকে হাত ধরে টেনে ঘর থেকে বের করে দরজা আটকে দিলো। এরপর তাখলিফের কাছে এসে ঋজু হয়ে বসলো মেঝেতে। ওর ঘোলাটে, প্রশ্নোক্ত, বেদনার্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বিপন্নবোধ করলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কয়েক মুহূর্ত পর বলল, “আমার মা, খালা সবসময় বাজে বলে। ওদের কথা ধরবেন না। আমার জীবনের সবচেয়ে বিপদের সময়টাতে যে আমাকে রক্ষা করেছে সে কোনোদিনই আমার জীবন নষ্টের কারণ হতে পারে না। মা কি আর জানে আপনি আমার সবচেয়ে সুখের কারণ? জানে না। তাই দয়া করে এসব মনে জায়গা দেবেন না। ভালোবাসি তো আপনাকে, সবার থেকে বেশি…”

তাখলিফ কিছু বললো না। ঝুমুরের কপালের দিকে আচমকা সবকিছু হাসফাস লাগলো। অশান্তি শুরু হলো বুকের ভেতর। মা’কে মনে পড়লো। ঐযে, ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তটা! সে নিজেই তো ধাক্কা দিয়েছিলো! বাবার নির্জীব মুখখানি মনে পড়লো। কতটুকু খারাপ ব্যবহার আর বিষাক্ত ব্যথায় জর্জরিত করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিলো তা মনে পড়লো। এত কষ্ট! এত যন্ত্রণা! হারানোর ব্যথা! দম বন্ধ হয়ে এলো ওর। সবকিছু থেকে পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচতো সে। তাখলিফ ঝুমুরকে সরিয়ে দরজা খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো দোতলার ফ্ল্যাট থেকে। ওর যাওয়া প্রয়োজন এখান থেকে। এখানে থাকলে মেজোআম্মার বিষাক্ত কথাবার্তায় ও শেষ হয়ে যাবে। তাখলিফ তিনতলায় নিজেদের ফ্ল্যাটের দিকে পা বাড়ালো। এদিকে তাখলিফ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারে এই ভয় নিয়ে ঝুমুরও ওর পেছনে ছুটে এলো। ঝিনুক বসার ঘর থেকে এদের নাটক দেখে বিরক্ত হলো। পাখি বেগম অন্ধকার মুখ করে তাকিয়ে রইলেন শুধু। এই তাখলিফের যন্ত্রণায় তিনি শেষ, তার আদরের মেয়েদের জীবন শেষ। ইয়াসিফটাও তার সঙ্গে রেগে আছে, শামসুল সাহেবও কেমন মনমরা হয়ে থাকেন। পাখি বেগমের সব অসহ্য লাগে। কবে যে আপদটার একটা ব্যবস্থা করতে পারবেন কে জানে!

.
শূন্য ফ্ল্যাট!
কোথাও বাবার অস্তিত্ব নেই।
জন্মের পর যার হাত ধরে বেড়ে ওঠলো সেই মানুষটার চিরবিদায় তাখলিফের জীবনটা উলটপালট করে দিয়েছে। তিনতলার যে ফ্ল্যাটটিতে দীর্ঘ এগারো বছর বাবার ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠলো এতদিন পর সেই ফ্ল্যাটটিতে পা দিতেই সবকিছু অচেনা মনে হলো তাখলিফের। কিয়ৎক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে সে বাতাসে খোঁজার চেষ্টা করলো বাবার ঘ্রাণ। মনে করলো বাবার সাথে কাটানো সুখ-দুঃখের সময়গুলো। তমালিকার মৃত্যুর পর প্রতিটা রাত বাবা কীভাবে মায়ের মতো আগলে রাখতো ওকে, তা ভাবলো। তাখলিফ ধীরপায়ে পুরো ফ্ল্যাটটা ধীর পায়ে ঘুরে বেড়ালো।
শূন্য ফ্ল্যাটের কোণায় কোণায় মিশে আছে সানওয়ার হকের স্মৃতি। নিজের ঘর, বসার ঘর, খাবার ঘর, পড়ার ঘর, রান্নাঘর সবশেষে বাবার ঘরে এসে থামলো তাখলিফ। আশ্চর্য! চারটা দিনের ব্যবধানে বাবা নেই। হারিয়ে গেছে। যেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো রাস্তা খোলা রেখে যায়নি। তাখলিফ ঘোলা চোখে পুরো ঘরটায় একবার চোখ বুলালো। বাবার সবকিছু কত গোছানো। বিছানায় এখনো তার গায়ে দেওয়ার কাঁথাটা এলোমেলোভাবে পরে আছে। বালিশ দুটোও একটু এদিক-সেদিক। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ঘরটা যেমন আধগোছালো থাকে ঠিক সেইরকম। দখিনের জানালাটাও অর্ধেকটা খোলা। ফরফর করে বাতাস ঢুকছে কেমন! দখিনা বাতাস গায়ে মেখে চা খেতে ভালোবাসতো ভীষণ ওর বাবাটা। স্টাডি টেবিলে কিছু বইপত্র আর ব্যবসায়িক কাগজপত্র। তাকে রাখা পরিবারের ছবি। যে ছবিতে হাসিখুশি তমালিকা আর সানওয়ার সাহেবের সাথে তিন দিনের ছোট্ট তাখলিফ! তাখলিফ মনোযোগ দিয়ে দেখলো ছবিটা। খুব সুখী, সুন্দর দেখাচ্ছে তাঁদের। ও আনমনে হাসলো। ছবিটা নিয়ে বাবার বিছানায় গিয়ে শুলো। আর শুতেই বাবার গায়ের গন্ধ নাকে এলো ওর। কি সুন্দর! এত শান্তি! তাখলিফ নাক টেনে আবারও ছবিটার দিকে দৃষ্টি দিলো। তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করলো ওর। ওদের তিনজনের দু-জনই ছবিতে জায়গা নিয়েছে। আচ্ছা, মা যাওয়ার পর তো বাবা ছিলো। এখন তো বাবাও নেই। ঝুমুর আছে। ওকে নিয়েও তাখলিফের ভীষণ ভয় হচ্ছে। অবচেতন মন বলছে মেজোআম্মার কথাই ঠিক। ওর কাছে তো কেউ ভালো থাকে না, কেউ না। যেখানে ওর জন্মদাতা-দাত্রী, ওর বাবা-মা’র ক্ষতি হয়েছে তার মানে ঝুমুরও এ তালিকা থেকে বাদ যাবে না। ওরও ক্ষতি হবে, শুধুমাত্র তাখলিফের কাছে আছে বলে, ভালোবেসেছে বলে। তাখলিফ অভিশ’প্ত, পাপী! নয়তো সৃষ্টিকর্তা কেন ওর কাছ থেকে সবকিছু নিয়ে নিলো? পাপী বলেই তো? মেজোআম্মা কেন নিজের মেয়েকে পাপীর হাতে তুলে দেবেন? এটা ঠিক নয়। এই ঝুমুরটা পৃথিবীতে ওর শেষ আশ্রয়স্থল, আপনজন। ওর অর্ধাঙ্গিনী। ওর জীবনের অংশ। বয়সই বা কত ওর? আঠারো-কুড়ি। জীবনের শুরুই এখনো হয়নি। ছোট্ট, ফুলের মতো সুন্দর মেয়েটি। ভীষণ অভিমানী। যে তাখলিফকে ছাড়া কিছুই বোঝে না, চায় না। এমনকি নিজের মা-বাবাকেও নয়। নিজের জন্য এই মেয়েটার ক্ষতি সে কীভাবে হতে দেখবে?

.

সন্ধ্যা পার হয়েছে সেই কখন! ঝুমুর এখনো তিনতলার সিঁড়ি কোঠায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাল বেয়ে পড়া অশ্রু মুছছে একনাগাড়ে। কিন্তু তা কিছুতেই থামছে না। তাখলিফের কষ্ট নিতে পারছে না সে। মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। ঝুমুরকে ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেয় নি। নিজে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। ঝুমুরকে এবার ভয় ঘিরে ধরলো। শুধু মনে হচ্ছে, লোকটা আবার কিছু করে বসবে না তো? ও ঢোক গিললো। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইতে লাগলো শুধু। কম্পিত হাতটা বাড়িয়ে দরজায় টোকা দিলো। এরপর দিতেই থাকলো। কিন্তু খুললো না। বেল বাজাতে থাকলো। ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেলো না ঝুমুর। ওর গলা শুকিয়ে এবার কাঠ হয়ে গেলো। এরপর কাঁদতে কাঁদতে যখনি একেবারে মূর্ছা যাবার জোগাড় হলো তখনি আচমকা দরজাটা খুলে গেলো। ঝুমুর চোখ মুছে দেখলো তাখলিফ কেমন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। ঝুমুর তাকাতেই ওকে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালো। ঝুমুর ভেতরে ঢুকে দরজা লক করে দাঁড়াতেই তাখলিফ থমথমে চেহারা নিয়ে ওর দিকে তাকালো। ভার গলায় বলল, “বাবা এখানে নেই, কোত্থাও নেই…”

কথাটায় কি ছিলো জানে না ঝুমুর। ওর বুক ভেঙ্গে কান্না এলো। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো তাখলিফকে। এরপর নিঃশব্দে চোখের জল বিসর্জন দিতে লাগলো। বড় চাচাকে তো সেও মিস করছে। এত স্মৃতি! সে নিজেই তো ভুলতে পারছে না। তাখলিফ কীভাবে ভুলবে? ঝুমুর নাক ঘষে দিলো ওর শার্টের বুকে। তাখলিফ ওর মাথায় হাত রেখে বলল,”এটা আমার বাবার শার্ট, আমাকে বাবার মতো দেখাচ্ছে না?”

ঝুমুর এতক্ষণ খেয়াল করেনি। এ কথা কথা শুনে ওর বুক থেকে মাথা সরিয়ে লক্ষ্য করতেই দেখলো তাখলিফ ওর বাবার সাদা রঙের একটা শার্ট পরে আছে। ঝুমুর জলভরা চোখে ওর মুখের দিকে তাকাতেই তাখলিফ আগ্রহী কন্ঠে আবারও জানতে চাইলো, “লুক লাইক আ সানওয়ার হক? হি ইজ মাই ফাদার। আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। কোনোরকম কষ্ট হয়নি তাঁর…”

ঝুমুর ওর গালে হাত রেখে ব্যথিত গলায় বলল,
“কী হয়েছে আপনার? উদ্ভট, পাগলামো আচরণ কেন করছেন?”

তাখলিফ শুনেই ক্রোধান্বিত হলো। গাল থেকে ওর হাতটা সরিয়ে মুচড়ে ধরে বললো, “আমি? আমি উদ্ভট আচরণ করছি? আমাকে পাগল বলিস তুই?”

ওর এই আচরণ সম্পূর্ণ অচেনা ঝুমুরের কাছে। ঝুমুর অবাক হলো। ব্যথায় ‘উফ’ করে উঠতেই যেন তাখলিফের টনক নড়লো। নিজের ব্যবহারে নিজেই বিস্মিত হলো। ঝুমুরের কব্জিতে লালচে দাগটাতে হাত বুলিয়ে অসহায় চোখে তাকালো। বুকে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেলো। মুখফুটে শুধু বলল, “একটু ঘুমাবো…”

ঝুমুর মাথা নেড়ে ওর কথায় সায় দিতেই তাখলিফ ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে বাবার ঘরে গিয়ে তার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো ঝুমুরকে নিয়ে। এরপর ওর বুকে মাথা রেখে চোখ বুজলো। ঝুমুর ওর চুলে বিলি কাটতে লাগলো। অনেকক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পর আচমকা তাখলিফ ম্লান গলায় বলল, “ঘুমিয়েছিস?”

ঝুমুর ভেবেছিলো তাখলিফ ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু আচমকা ওর গলা ভেসে আসায় ও অবাক হলো। ও সাড়া দিলো না। তাখলিফও আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। ঝুমুর ঘুমিয়েছে ভেবেই ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। অথচ তখনো ওর চুলে বিলি কাটছিলো ঝুমুরের হাত!

________

[ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি। মন্তব্য জানাবেন।]

চলবে…গল্পের