#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-৩৪
আঠাশ বছরের একজন যুবক। হাউমাউ করে কাঁদছে দেশের নামকরা সার্জন মাহমুদ তারিকের পা জড়িয়ে ধরে। ডক্টর মাহমুদ হকচকিয়ে গেলেন এমন কান্ড দেখে। তিনি পেশেন্টের যাবতীয় কন্ডিশন স্টাডি করে দেখেছেন, অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল। তিনি ভেবে পেলেন না কি সান্ত্বনা দেবেন, কি আশা দেবেন এই ছেলেটাকে! এত বছরের ডাক্তারি পেশায় এমন অভিজ্ঞতা তার নেহাতই কম না। তবুও আজকের ব্যাপারটা একদম অন্যরকম। তার বুকের ভেতরটা কেমন কাঁপছে! এও সম্ভব? হুবহু একই মুখের
আদল, গায়ের রঙ, চুলের রঙে আবৃত এই ছেলেটি বহুদিন আগে পরিচিত একজনকে মনে করিয়ে দিচ্ছে কেন? মাহমুদ তারিক বিস্ময়ভরে দেখতে থাকলেন তাখলিফকে! কিন্তু এই অপ্রত্যাশিত ব্যাপারটি তিনি গোপনই রাখলেন। সময়, সুযোগ, পরিস্থিতি বুঝে তিনি সবটা খতিয়ে দেখবেন!
.
সেই রাতে খুব বৃষ্টি ছিলো। বাতাস হয়ে ওঠেছিলো ভারী। হিমশীতল হাওয়ায় ঠেকেছিলো ভুতুড়ে ছোঁয়া।
যেন মৃত্যুর দূত ঘুরপাক খাচ্ছিলো অস্পষ্ট কুয়াশায় মুড়িয়ে। বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে তাখলিফ পুরোটা রাতটা ছিলো নিস্তেজ, নিথর হয়ে পড়া থাকা ঝুমুরের কেবিনে। কতশত কথা বলেছিলো ওর সাথে। ঝুমুর শোনে নি, উত্তরও দেয় নি। তাখলিফ তবুও চাইছিলো, মেয়েটা ওঠুক। একবার ওঠুক। অন্তত একটুখানি হাত রাখুক ওর মাথায়। বলুক, আমি আছি! কিন্তু না, ওর এই ছোট্ট চাওয়াটুকু ঝুমুর পূরণ করেনি। তাখলিফ তবুও রাগ করেনি ওর সাথে। ও তো বুঝে, কতখানি কষ্ট পাচ্ছে ওর ঝুমুরটা! তাই ওর কষ্ট আর বাড়াতে চায় নি। শুধু চুপচাপ নিষ্ঠা ভরা প্রার্থনায় ঝুমুরকে চাচ্ছিলো বারবার! বিশ্বাস ছিলো, মেয়েটা জেগে ওঠবে। কিন্তু শেষ রাতে মেয়েটা যখন ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়লো, তাখলিফ নির্বাক চেয়ে চেয়ে দেখছিলো ওকে। কতটুকু যন্ত্রণা সয়ে থেমে থেমে অক্সিজেন নিচ্ছে মেয়েটা! দেখেই ওর বুকে কাঁপন ধরে গেলো। ডাক্তার-নার্সদের ছুটোছুটি, কোলাহল, উত্তেজিত স্বর কিছুই আর ওর কানে আসে নি। এরপর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তাখলিফ দূর থেকে স্পষ্ট দেখলো ঝুমুরের সর্বশেষ চেষ্টাটি, মেয়েটা প্রাণপণে অক্সিজেন নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে একটা সময় স্থির হয়ে গেলো। এতটাই স্থির যে, তাখলিফ বিপ বিপ শব্দ শুনতে পাচ্ছিলো। পরিশেষে! নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পর ডাক্তাররা যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাখলিফের দিকে করুণভাবে চাইলো ও শুধু অনুভব করলো ওর মাথায় হাত রেখে আদুরে গলায় সান্ত্বনা দিতে দিতে ওর সাথে কেঁদে ফেলা গর্দভ ঝুমুরের গল্পটা এই পৃথিবীতে, এই মুহূর্তে ফুরিয়ে গেছে। ওর নামে আর কখনোই কিছু লেখা হবে না, কোনোদিনও না! তাখলিফ স্তম্ভিত দৃষ্টিতে ঝুমুরের মুখপানে চেয়ে থাকতে থাকতে দু-হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠলো, “তুই, আমার বাচ্চা! এভাবে তোরা একা করে গেলি আমায়? নিজে এতটাই আমায় ভালোবাসলি যে, তুই আমার শত অসুখের এক টুকরো সুখ ছিলি, সেটাও বুঝলি না? আমার সুখ কেড়ে নিয়ে একটুও ভালো করিসনি। তোকে তো আমি মাফ করবো না, কিছুতেই না…”
ঝুমুরের মুখখানি ওর চোখের সামনে অস্পষ্ট হয়ে ধরা দিলো। তাখলিফ সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো!
.
একটা সুস্থসবল, সরল মেয়ে, যে কি-না কোনোদিন কাউকে মুখ ফুটে ধমক অবধি দিতে পারতো না, সর্বদা ঝামেলাহীন থাকার চেষ্টা করতো সে কি-না জীবন হারালো সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে? এমনকি নিজের পেটে যে আস্ত একটা পৃথিবী বেড়ে ওঠছিলো তার অস্তিত্ব বোঝার আগেই চিরবিদায় নিলো? অকল্পনীয়, অপ্রত্যাশিত ছিলো ঝুমুরের মৃত্যুটা। কেউ ভাবেনি এমন কিছু হতে পারে। কেউ মানতে পারে নি ওর মৃত্যু। আর ঝিনুকের চিন্তার বাইরে থাকা ঘটনাটা ঘটার পর ও ভেবেই পাচ্ছিলো না আসলে ও কি চেয়েছিলো? আর কি হয়ে গেলো? পাখি বেগম তো অস্বাভাবিক বিপি লো করে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। শামসুল সাহেব এই খবর শোনার পর আরো অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সাজেদা বেগমকে তো কেউ সত্যটা বলার সাহসই করেনি, তার কাছ থেকে গোপন রাখা হলো এই খবরটা। সবার কান্নাকাটি, কোলাহলে ক্রমাগতই পরিবেশ হয়ে ওঠছিলো ভারী।
সেসময় যে মানুষটিকে সামলানোর কথা নিয়ে সবাই ভাবছিলো, জ্ঞান ফেরার পর সেই তাখলিফই ছিলো সবচেয়ে বেশি শান্ত আর স্থির! আদরের ছোট বোনকে হারিয়ে ইয়াসিফ যখন অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলো, তখন ওকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে তাখলিফ গিয়ে ওকে আচমকা থাপ্পড় মেরে দেয়। এরপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে শক্ত গলায় বলে বসলো, “স্বার্থপরটার জন্য এত কাঁদার কি আছে? এই আমাকে দেখ, সব হারিয়েছি, শূন্য আমি। তাই বলে কি কাঁদছি? না তো! তাহলে তুইও কাঁদবি না, কেউ কাঁদবে না। যে যাবার সেতো যাবেই৷ এত তো চেষ্টা করলি, কই? রইলো তোর বোন? আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে চলে গেলো। একদম একা করে।”
ইয়াসিফ দেয়াল ধরে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বড্ড অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে। এরপর ভাইয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে এগিয়ে গিয়ে হাতদুটো মুঠোয় ধরে ভেজা গলায় বলল,
“না ভাইয়া৷ আমার বোনকে তুমি স্বার্থপর বলো না৷ বলতে পারো না প্লিজ…।”
তাখলিফ বসা ছিলো। সটান ওঠে দাঁড়িয়ে রক্তচক্ষু নিয়ে বলল, “একশো বার পারি। স্বার্থপর বলেই তোর বোন আমার আঘাতটা নিজের ওপর নিয়ে নিলো। নয়তো আমার বউ-বাচ্চা সবই ঠিক থাকতো। কিন্তু তোর বোন দেয়নি। কেননা, আমার কিছু হলে
ও বাঁচতো না। সেজন্যই স্বার্থপরটা এমন করলো।
কি পেলো বলতো? সে-ই তো ও মরেই গেলো।”
“ভাইয়া তুমি কীভাবে এসব বলছো? তোমার কষ্ট হচ্ছে না?”
“শোন ইয়াসিফ! সবাই শুধু আমাকে কষ্ট দিতে চায়, চেয়েছেও আজীবন। এখন বুঝলাম, আসলে এভাবে কষ্ট পেয়ে লাভ নেই। কেউ ফিরে আসবে না। আমি তো ঠিক করে ফেলেছি, এবার থেকে আমি আর কষ্ট পাবো না আমি। মরে গেলেও না। সো কন্ট্রোল ইওরসেলফ।”
তাখলিফ বললো ঠান্ডা গলায়। ইয়াসিফ বিস্মিত হয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই সাঈদ হক এসে ওর হাত চেপে ধরে ওকে আটকালেন। ইশারায় থামতে বললেন। ইয়াসিফ থামলো। তাখলিফ জানালার পাশে ঘেঁষে বসে রইলো। বাইরে দৃষ্টি মেললো। সকালে এমন গুরুগম্ভীর, কালো মেঘে ঢাকা আকাশ দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো ওর। ঝুমুরটার বিরহে প্রকৃতিও কি কাঁদবার আয়োজন করছে নাকি? এত কাঁদার কি আছে? কই! ও তো কাঁদছে না, একদম না।
★
লোক লাগিয়ে তাখলিফকে সরিয়ে দেওয়ার
ষড়যন্ত্রটি ঝিনুকের কাছ থেকে পাখি বেগম জানতে পেরেছিলেন হামলার দিন রাতে। তখনো অবশ্য
ওদের আহত হওয়ার খবরটা বাড়িতে পৌঁছায়নি।
বড় মেয়ের মুখ থেকে সব শুনে পাখি বেগম প্রথমে
কিছু ভেবে ওঠতে পারেন নি। পরবর্তীতে অবশ্য কলুষিত মস্তিষ্ক তাকে ভাবিয়েছে, এতে আর কি এমন ক্ষতি হবে? তাখলিফ ম’রে যাবে আর নিজের মেয়েরা ভালো থাকবে। পরিকল্পনা যদি ঠিকঠাক মতো হয়ে যায় তাহলে বড় মেয়ে তার সংসার ফিরে পাবে, ঝুমুরকেও আর বে’জন্মা তাখলিফের বউ হয়ে থাকতে হবে না। ওর ভালো ঘর হবে, বর হবে। আর ইয়াসিফেরও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না৷ কোটি টাকার সম্পদের ভাগিদার একমাত্র তার ছেলেই হবে। এমনকি তার সব চাওয়াও পূরণ হবে। সর্বোপরি পাখি বেগমের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এতসব চাওয়া পূরণের জন্য শুধু তাখলিফকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই এই আক্রমণ, কিন্তু সেখানে যে তার ছোট মেয়েও থাকতে পারে সেটা তিনি কস্মিনকালেও ভাবেন নি! আর এর দাম যে ঝুমুরের জীবনের বিনিময়ে দিতে হবে তাও কল্পনা করেন নি। পাখি বেগম আফসোস, অপরাধবোধে মৃতপ্রায় হয়ে গেলেন মেয়েকে হারিয়ে। শামসুল সাহেবকে সামলাচ্ছিলো সাঈদ হক! সকলের আহাজারিতে নিরিবিলি বাড়িটা হয়ে ওঠেছিলো এক মৃত্যুপুরী। তাখলিফ ছিলো নিশ্চল, পুরোটা ক্ষণ ঝুমুরের কাছে ছিলো। কিছু বলেনি, হাত ধরে বসে ওর ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়েছিলো। ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়েছিলো ওর পেটে, কপালে, চোখেমুখে। আর কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে রাগ নিয়েই উত্তর দিচ্ছিলো। ইয়াসিফ, সাঈদ হক কেউই কথা বাড়ানোর সাহস করেনি আর!
এরপর রাত হতেই হঠাৎই তাখলিফ উধাও হয়ে গেলো। সবাই যখন ভয় পেয়ে হন্যে হয়ে চারদিকে ওকে খোঁজায় ব্যস্ত তখন ইয়াসিফ ওকে পেলো কবর স্থানে। সদ্য হওয়া ঝুমুরের কবরের পাশে বসে তাখলিফ কাঁদছিলো। জোর করে ওকে সেখান থেকে আনতে গেলে ইয়াসিফকে প্রকান্ড এক ঘুসি মেরে বসলো। এরপর কেউ আর ওকে সরাতে পারেনি। ভোরের আলো ফোটার পর ইয়াসিফ চাচাকে সঙ্গে নিয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ঘুমের ইনজেকশন পুশ করে ওকে সেখান থেকে নিয়ে আসে। সন্ধ্যার দিকে ওর ঘুম ভাঙে। আর ঘুম থেকে ওঠার পর নিজেকে সে আবিষ্কার করে দোতলায়, হাতে স্যালাইন লাগানো অবস্থায়! তাখলিফ চুপচাপ শুয়ে থাকে ঝুমুরের ঘরটিতে৷ খুব চেনা নিজস্ব মানবীটির ঘ্রাণ টেনে নেয় সে বুক ভরে! এতদূরে চলে যাবে জানলে কোনোদিন তো কাছেই আসতে দিতো না সে এই ছলনাময়ীকে!
★
ছোটবোনের মৃত্যুর পর থেকে ঝিনুক হয়ে গেলো চুপচাপ। একদম আগের মতো। কারো সাথে উচ্চগলায় কথা বলতো না। বিয়ের আগের সেই বাধ্য, ভদ্র ঝিনুক হয়ে গেলো একদম। একদিন সুযোগ বুঝে ঝিনুক নিজের ফোন এবং সবুজের সাথে যোগাযোগ, তাখলিফকে সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনার যতসব প্রমাণ ছিলো সব নষ্ট করে ফেলে দিলো। আর শোকের মাঝেও ঝিনুকের এমন পরিবর্তন বাড়ির সকলেরই নজর কাড়লো। সবার তাতে স্বস্তি হলেও পাখি বেগম মনে মনে ক্ষুদ্ধ হয়ে রইলেন ওর ওপর। কিন্তু মাতৃসত্তার জেরেই মেয়েকে তিনি কিছু বলতে পারলেন না। সবাই সব জেনে গেলে ঝিনুককে হারিয়ে ফেলবেন তিনি, সেইসাথে নিজেও হারাবেন স্বামী-সন্তান-সংসার এমনকি সবকিছু!
সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপারটা নিয়ে খুব লেখালেখি হচ্ছিলো। সেইসাথে তদন্তও চলছিলো জোরালোভাবে। হামলার সিসিটিভি ফুটেজটি কালেক্ট করতে বেশিদিন সময় লাগেনি তদন্তকারীদের। মোটর বাইকে করে আসা আটজন মুখোশধারীদের চিরুনি তল্লাশি চালানোর পর ঢাকার বাইরে তাদের খোঁজ পাওয়া যায়। এরপর তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী পলাতক সবুজকে ধরতে সক্ষম হয় পুলিশ। আর সবুজ নিজে ফেঁসে যাওয়ার পর ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে। সব ষড়যন্ত্র সামনে চলে আসে। পুলিশের বেধড়ক প্রহার সহ্য করতে না পেরে সবুজ সব স্বীকার করতে বাধ্য হয়। এমনকি ঝিনুকের সম্পৃক্ত থাকার কথাও বলে দেয়। ওকে নিজের সঙ্গী বানিয়ে তাখলিফকে মেরে ফেলার নিকৃষ্ট পরিকল্পনার কথা, ওদের দেখা করা থেকে শুরু করে সব প্রমাণাদি, ফোন কলরেকর্ড ফাঁস করে দেয়। ঝিনুকের নাম সামনে আসাটা নিরিবিলিতে হঠাৎ বাজ পড়ার মতোন ছিলো। কেউ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি। কিন্তু সব প্রমাণাদি দেখার পর অবিশ্বাস করার রাস্তাও কেউ খুঁজে পায়নি। ঝিনুকও চমকে যায়। প্রচন্ড ভয় পেয়ে ঘাবড়ে যায়৷ ও কখনোই ভাবেনি সবুজ ওকে ফাঁসিয়ে দেবে। আর সবাই সব জেনে গেলে পাখি বেগম নিজের মেয়ের কান্ড কীর্তি জানার পরেও সব মিথ্যা বলে ওড়িয়ে দিতে চান। বড় মেয়েকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে স্বার্থপরের মতো তিনি মেয়েকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। কিন্তু তার কোনো যুক্তিতর্কই ধোপে টেকেনি। তাখলিফ এসব সহ্য করতে না পেরে মাথা চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়ে। এরপর আচমকা ওঠে সবার সামনে দু’হাতে ঝিনুকের গলা চেপে ধরে চিৎকার করে বলতে থাকে, “আমার ক্ষতি করতি, মেরে ফেলতি কিচ্ছু বলতাম না আমি। কিচ্ছু না। তুই কেন আমার ঝুমুরকে আঘাত করলি রে ঝিনুক? আমার বাচ্চাটা? এতটুকুন ছোট্ট! শরীরের গঠনই যার হয়নি, তাঁকে কেন মারলি? দু’জন নিষ্পাপকে কেন মারলি তুই? কি দোষ ছিলো ওদের? ট্রাস্ট মি, আজ মে’রেই ফেলব তোকে আমি…”
সবাই গিয়ে ধরাধরি করে ওকে আটকালো। একটুর জন্য ঝিনুক বেঁচে গেলেও তাখলিফের ওমন রুদ্রমূর্তি দেখে ভয়ে ওর মুখ দিয়ে সব বের হয়ে যায়। গড়গড় করে বলে দেয় সবকিছু, এমনকি পাখি বেগমের সত্যিটাও। আর সব শোনার পর সকলে আরো একবার হতভম্ব হয়। তাখলিফ নির্বিকারভাবে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে হুংকার ছেড়ে বলে, “নিজের মেয়ের খু’নিদের বাঁচাতে এত মিথ্যের আশ্রয় মেজোআম্মা? আমি না হয় পালিত মা-বাবার মৃত্যুর কারণ ছিলাম মেজোআম্মা। কিন্তু তুমি তো নিজের মেয়ের। যে তোমার গর্ভে ছিলো দশমাস, দশদিন। যে তোমার হাত ধরে এতবছর বেড়ে ওঠেছিলো। আমার মতো ছেলের ওপর ক্ষেপে গিয়ে ওকে কীভাবে মারতে পারলে বলো তো? মেয়েটা কত কষ্ট নিয়ে পৃথিবী ত্যাগ করলো একটুও বোঝার চেষ্টা করোনি? এত নিকৃষ্ট তুমি! ছিহ! তোমার সাথে আমার তুলনা কখনোই হয় না। পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে, কলঙ্কিত মা তুমি…”
পাখি বেগম থম মেরে ছিলেন। যে মেয়েকে বাঁচাতে এতক্ষণ সবার সঙ্গে বিবাদ করছিলেন সেই মেয়েই তাকে ফাঁসিয়ে দেবে তা ভাবেন নি তিনি। তবে তিনি কল্পনা করেন নি সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা অন্যরকম হবে। শামসুল হক তো অসুস্থ অবস্থাতেই পাখি বেগমকে তালাক দিয়ে বসলেন। রাগে, দুঃখে ইয়াসিফ নিজে পুলিশ ডেকে মা-বোনকে ধরিয়ে দিলো। মা-মেয়ে দু’জনেই তখনো বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। ঝিনুক ঘোরে ছিলো। ও ভাবেনি নিজের বোনকে হত্যার দায় মাথায় নিয়ে জেলে যেতে হবে।
কিন্তু এরপর!
অবশেষে জেল হলো ওদের তিনজনের। সাথে হামলাকারীদেরও। একেক জনের একেক শাস্তি, একেক মেয়াদের শাস্তি! এরপরই ঘটতে থাকে বাকি ঘটনাগুলো। যেগুলো ওর চিন্তাধারা বাইরে ছিলো একে একে সেগুলোই সত্যি হতে লাগলো। যেমন, ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা প্রথমে সবুজের এমন কর্মকান্ডে থমকে গেলেও ছোটপুত্র এমন কাজ করতে পারে তারা বিশ্বাস করেনি। তাই ওরা শামসুল হকদের একের পর এক চাপ দিতে থাকে সবুজের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে। তবে কেউই মামলা তুলবে না বলে জোর গলায় জানিয়ে দেয়। তারা সবুজকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ারও বন্দোবস্ত করছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে যখনই ঝিনুকের জড়িতো থাকার বিষয়টা ওঠে আসে তখন তারাও ক্ষেপে যায়। ওঠেপড়ে লাগে সবুজের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে। নিজেদের ছেলেকে ভুলিয়েভালিয়ে ফাঁসিয়ে ঝিনুক কার্যসিদ্ধি করেছে এটা বলতেও দ্বিধাবোধ করে না তারা। এমনকি একটা সময় সজীব টাকা খাইয়ে পাখি বেগম আর ঝিনুকের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ আরো কিছু মামলা ঠুকে দেয়। এমনকি জেলে গিয়ে দেখা করে ঝিনুককে হুমকিধামকি দিয়ে আসে তাদের সম্মান নিয়ে খেলা করায়। এমনও বলে স্বার্থপর, খু’নি ঝিনুক যদি ওর সামনে তড়পাতে, তড়পাতে মরেও যায় তাহলেও সজীব কখনোই ফিরে দেখবে না ওকে। এমনকি ওর লা’শের মুখও দেখবে না সজীব। জানিয়ে দেয় ওর কাছে সবার আগে ও পরে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটিই ওর পরিবার, আর বংশমর্যাদার সম্মান। ও কখনোই ভালোবাসেনি ঝিনুককে। ভালোবাসবেও না। সজীবের মুখ থেকে এসমস্ত তিক্ত বাক্যগুলো জানা থাকলেও নতুন করে আবারও ঝিনুককে একদম ভেতর থেকে ভেঙে দিলো। বুকভরা ব্যথা ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে গেলো সজীবের ভালোবাসায় ডুবে থাকা ঝিনুককে। আর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকা ঝিনুক কস্মিনকালেও ভাবেনি এসব। মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে কি সে তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছিলো? যে এতবড় পাপ কাজে সায় দিতে ওর বিন্দুমাত্র কুন্ঠা বোধ হয়নি? মস্তিষ্কও কি বোধবুদ্ধিহীন হয়ে পড়েছিলো? নাকি অন্ধ ভালোবাসাই ওর কাল হলো? আদৌ কি এটা ভালোবাসা ছিলো? নিজে ভালোবাসলে অন্যের ভালোবাসা ছিনিয়ে নিজের সুখ খোঁজার চেষ্টা করতো কি? উত্তরটা বোধহয়, না। আদৌ কি ঝিনুক কখনো সজীবকে ভালোইবাসেনি? তাহলে সজীবের কাছ থেকে কেন ভালোবাসা আশা করতো? ছিহ!
ও-তো চিরকালই ছিলো সবার বাধ্যগত। চেয়েছিলো বাবা-মায়ের মতে হওয়া বিয়েটা টিকাতে, নিজের সংসার বাঁচাতে। আর তারজন্যই তো এতকিছু! মানুষ মা’রা পর্যন্ত যাওয়া। অথচ সজীব তার চোখের ভাষা দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছে ঝিনুক তার আপন কেউ নয়। কোনোদিন ছিলোই না, হতেই পারেনি। মুখের হিংস্র আর তিক্ত বাণী দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে ঝিনুক বাঁচুক, মরুক তাতে তার কিছু আসে যায় না। জাস্ট কিচ্ছু না!
অথচ ওকে ফিরে পাবার আশায়, ওর বিরহে ঝিনুক সব ভুলেছে। এমনকি নিজের পরিবারের মানুষ, একসাথে ছোট থেকে বড় হওয়া ভাইবোনগুলোকেও করেছে তুচ্ছতাচ্ছিল্য। দিয়েছে অবর্ণনীয় কষ্ট, যন্ত্রণা। শারীরিক, মানসিক দুভাবেই চরম আঘাত করেছে। ওর কথার আঘাতেই বড় চাচা দুনিয়া ছেড়েছে। পরিবার ভেঙেছে। হিংসার বশবর্তী হয়ে আদরের বোনের সংসার নষ্ট করতে চেয়েছে। শেষপর্যন্ত ছোট থেকে মেনে আসা বড়ভাইকে, তাখলিফ নামক নির্দোষ মানুষটিকে করেছে ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন। এমনকি আস্পর্ধার জোরে, কোনোদিন বিবেচনা না করেই স্বার্থের জেরে সরিয়ে ফেলতে চেয়েছে এই পৃথিবী থেকে। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! ওর সান্নিধ্যে, আদরে বেড়ে ওঠা ছোটবোনটা এই তাখলিফকেই দিয়েছেই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসা।
এমনকি ওদের মা-মেয়ের সব ষড়যন্ত্রে কালিমা লেপন করে; ভালোবাসার পবিত্রতা, বিশুদ্ধতা প্রমাণ করে তাখলিফকে বাঁচিয়েছে। বিনিময়ে দিয়েছে নিজেকে বিসর্জন! এই বিসর্জনের প্রখরতা, গভীরতা খুঁজতে গিয়ে ঝিনুক অতল সমুদ্রের তলে নিজেকে হারিয়ে ফেললো! একসময় সবদিক থেকে কোণ ঠাসা হয়ে পড়া ঝিনুক আচমকা একদিন সেলের ভেতর নিজের আঁচল প্যাঁচিয়ে গলায় ফাঁ’স দিয়ে আ’ত্ম’হ’ত্যা করে বসলো। আর পাখি বেগম সবদিক থেকে সব হারিয়ে উত্তাল সমুদ্রে পড়লেন। ঝিনুকের আ’ত্ম’হ’ত্যার খবরে তিনি পাগলপ্রায় হয়ে গেলেন। অথচ সর্বহারা পাখি বেগমকে কেউ দেখতে এলো না, সান্ত্বনাসূচক কিছু বললোও না। এমনকি তার বাপের বাড়ির মানুষও নয়। মানসিক অবসাদে, অনুশোচনায় জর্জরিত পাখি বেগম একটা সময় সত্যিই অনুভব করলো তার পাশে আর কেউ নেই, সত্যিই কেউ নেই। ইয়াসিফের কথামতো তিনি একা, একটি বিন্দুর মতো! এরপর দিন কাটলো, মাস ফুরালো! ধীরেধীরে অসুখে বাসা বাঁধলো তার শরীরে। পচন ধরতে লাগলো হাতেপায়ে। শরীর ব্যথা, মন ব্যথায় সবদিক থেকে শূন্য পাখি বেগম মৃত্যুর দিন গুণতে থাকলো। কিন্তু এতসব অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে মৃত্যু তাকে ধরা দেয় না। একটা নিষ্পাপ, নির্দোষ ছেলেকে এতকাল তিনি যেভাবে কষ্টে দেখতে চাইতেন, সেখানে আজ নিজেকে দেখে পাখি বেগমের নিজের প্রতিই খুব করুণা হয়! নিজ দোষে স্বামী-সন্তান-সংসার হারিয়ে শূন্য তিনি। প্রায় রাতেই তিনি স্বপ্ন দেখেন ঝিনুককে, যে তাকে ঘৃণাভরে দেখে। তার মৃ’ত্যু কামনা করে। ছোট মেয়েকে তার খুব মনে পড়ে। কখনোসখনো ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তার মানসপটে মেয়েটার চোখমুখ, হাসি-কান্না ভাসে না। পাখি বেগমের যন্ত্রণা হয়। বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে, চিৎকার করে কাঁদেন তিনি। কিন্তু তার আর্ত্মচিৎকার সকলের কাছেই মেকি মনে হয়,
কেউ ছুটে আসে না!
★
রংচটা নিরিবিলি বাড়িটি তার জৌলুস হারিয়েছে বহুদিন হলো। গেইটের কাছের বাগানিবিলাসটি শুকিয়ে তার সৌন্দর্য হারিয়েছে। ম’রে গেছে ছাদের ফল, ফুলের গাছগুলোও! বাড়িটিতে এখন আর সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডা জমে না, হাসিঠাট্টা হয় না।
শামসুল হক আজকাল মায়ের ঘরে বসেই পুরোটা
সময় কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কখনো মাঝরাতে তারও বুকব্যথা হয়। মনে পড়ে মেয়েদের। এত আদরে যাদের লালন করলো, জন্ম দেওয়া মা’ই নাকি তাদের জীবনটা নিঃশেষ করে দিলো। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আরকিছু বের হয় না তার। এখন আর নিশি-তিথির মন খারাপে ঝুমুর ওদের চা বানিয়ে খাওয়ায় না। দাদীর ঔষধ খাওয়াতে কেউ ভুলে যায় না। তুসিকে কেউ বকে না। ইয়াসিফ সকাল-সন্ধ্যা অফিস করে এলে মা’কে গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে না। বোনদের সঙ্গে কতদিন ঝগড়া হয় না ওর! ও হাঁপিয়ে ওঠে মাঝেমধ্যে৷ ঝুমুরের ছোট্ট ঘরটার দিকে যতবারই চোখ যায় ততবারই সূক্ষ্ম বুকব্যথা হয় ওর! ইয়াসিফ বোনের পাঠানো শেষ ম্যাসেজটি এখনো ওর ফোনে আছে। ম্যাসেজটি দেখে মাঝেমধ্যে চোখ থেকে টুপ করে দু-ফোঁটা জল পড়ে। শেষদিনের রান্নাটা আর খাওয়া হলো না। কে জানে, ঝুমুরের রান্নাগুলো সেদিন সুস্বাদু হয়েছিলো কি-না! হাত-টাত কেটে ফেলেছিলো কি সালাদ বানাতে গিয়ে? ওর যা অভ্যেস ছিলো! তাখলিফকে ছাড়া ঝুমুর কেমন আছে ইয়াসিফের বড্ড জানতে ইচ্ছে হয়!
যেই প্রাণ বাঁচাতে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিলো ঝুমুর, সেই প্রাণ নিতে হাত না কাঁপলেও মন কাঁপে তাখলিফের। নয়তো এই পৃথিবীতে নিঃস্ব হয়ে বেঁচে থাকাটা ওর কাছে বিভীষিকাময় যন্ত্রণার। মাঝরাতে তাখলিফের প্রায়ই ঘুম ভেঙে যায়। শূন্য, খাঁ খাঁ করা ফ্ল্যাটটিতে ওর খুব ভয় করতে থাকে। ঝুমুরকে মনে পড়ে খুব করে। মনে পড়লেই চোখে ভাসে ছোট্ট একটি সাদা ফুল। ফুলটা কখনোসখনো একটা ছোট্ট বাচ্চার অবয়ব ধারণ করে। হাত-পা নেড়ে শূন্য ফ্ল্যাটে ঘুরাফেরা করে। একা তাখলিফের তখন খুব অসহ্য লাগে। প্রিয় ঝুমুরটা তখনই হয়ে ওঠে প্রচন্ড অপ্রিয়! মেঝেতে শুয়ে ভেজা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক ফাটা হাহাকার করে বলে, “আরেকটু স্বার্থপর হতে পারলি না তোর মা-বোনের মতো? তাহলে আমাদের বাচ্চাটা বেঁচে যেতো রে। শুনিস তুই? কোথায় তুই ঝুমুর? আমাকে ছাড়া কীভাবে থাকিস? এত অপ্রিয় করে দিলি নিজেকে?”
তাখলিফের এত এত প্রশ্নের উত্তর আসে না কখনোই!
’
___________________
[সমাপ্ত]