অবরুদ্ধ নিশীথ পর্ব-১১+১২+১৩

0
21

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মর্তুজা

১১.

রাবেয়া বেলা এগারোটার দিকে মায়ের বাড়ি গেলেন। বড়ো ভাইয়ের কাছে কিছু ধার পাওয়া গেলে তাও পাওনাদারদের একটু ঠেকানো যাবে, সময় পাওয়া যাবে চাইলে। আমজাদ সাহেবের অ-রাজী গম্ভীর মুখ দেখেও গেছেন রাবেয়া। অন্তূও চলে এলো। আব্বুর উদ্বিগ্ন মুখ, আর কাতর চোখের চাহনি ভালো লাগেনা।

বছরখানেক আগে রাবেয়ার পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ল। তৎক্ষণাৎ সার্জারি করিয়েছিলেন আমজাদ সাহেব। আব্বু-আম্মু দুজনেরই হাই ব্লাড প্রেশার, ওষুধ পানির খরচা, অন্তূর পড়ালেখা, যাবতীয় দরকার গোটা সংসারের, সবই বইছেন আমজাদ সাহেব। সব করতে ঋণ করতে হয়েছে আমজাদ সাহেবকে।

অন্তিক একটা দোকান করেছে বড়ো বাজারের মধ্যে। অন্যরা তার চেয়ে ছোটো ব্যবসা করে মাসে লাখ টাকা আয় করছে। অন্তিকের দোকান দিনদিন খালি হচ্ছে, পুঁজিসহ নেই হয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে টাকাপয়সা দেয়না অন্তিক, আমজাদ সাহেবও চাননা। এখনও তিনিই যেন বাড়ির একমাত্র কর্তা, অথচ চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন বহুদিন আগে। তার কর্ম বিশেষ উচ্চপদস্থ ছিল না। স্কুলমাস্টার। পুরো পরিবারসহ অন্তিকের বউয়ের ভারটাও নিশ্চুপ বহন করছেন তিনি। অন্তিক নিজের এই লালবাতি জ্বলা ব্যবসার ব্যাপারে কোনো আলাপ আব্বুর সাথে করেনা।

অন্তিক অকালে বউ আনার পর স্বপ্নভাঙা আমজাদ সাহেব মার্জিয়ার সামনে দাঁড় করিয়ে দুটো থাপ্পড় মেরে বলেছিলেন, “খেতে দিবি কোত্থেকে? সেই তো আমার ঘাঁড়েই চড়ে বসবি, অন্য উপায় আছে? আর কতদিকে যাব এই সামান্য কামাই নিয়ে? এই আমিই তোকে জন্ম দিয়েছিলাম, দুই হাতে এতদূর টেনে এনেছিলাম, তোকে নিয়ে রাতভর স্বপ্ন বুনেছি জালের মতো? দেখ, বিশ্বাস করার উপায় রাখিসনি আজ সেসব। ইচ্ছে বহুত ছিল, সেসব এক লহমায় গুড়ো করতে বাঁধেনি তো বিবেকে না? বিবেক থাকলে হয়ত বাঁধতো। বয়স কত হয়েছে, বিয়ে করে এনেছিস? তাও আবার আমার নামের সম্মান ডুবিয়ে? কী কাজ করিস? বউকে খাওয়ানোর মুরোদ আছে? চাকরি-বাকরি করার যোগ্যতা হয়েছে? আমার ছেলে এমন মূর্খ হবে, তা জানলে হয়ত তোকে দুনিয়াতেই আনতাম না!ʼʼ

অন্তূ প্রথমবার সেদিন আব্বুকে নিজের অভিজাত ব্যক্তিত্ব থেকে বেরিয়ে প্রথমবার এমন কমদামী, সাধারণ বাক্যে, মূর্খ-সরল ধরণের কথা বলতে শুনেছিল। এরপরের দিন থেকে আজ অবধি চুপচাপ সব ভার বহন করছেন, কোনো অভিযোগ আর করেননি দ্বিতীয়বার। কিন্তু অন্তিক বোধহয় বাপের সাময়িক ক্ষোভকে ধরে রেখে কিছু বিচ্ছেদমূলক কাজ করে বসেছিল। একই বাড়িতে থাকে, সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করে, মাথা তুলে তাকায়না, আব্বুর সাথে কথা বলেনা, ধার ধারে না কোনোকিছুর। সে যে আছে দুনিয়াতে, তার অস্তিত্বের খোঁজ পাওয়া মুশকিল।

সেসবের পরদিনই বড়ো বাজারে দোকান নিলো সে। সপ্তাহখানেকের মাঝে সেই দোকানে কমপক্ষে লাখ পাঁচেক টাকার মাল তুলল। টাকা কোথায় পেয়েছে, তার হদিস কেউ জানেনা, আর না জানানোর প্রয়োজন মনে করেছে অন্তিক কোনোদিন। আমজাদ সাহেব বহু খোঁজ চালিয়েও বের করতে না পেরে হাল ছেড়েছেন।

মাসখানেকের মধ্যেই দোকানে ক্ষয় শুরু হলো, উন্নতির জায়গায় ক্রমান্বয়ে অবনতি। বেচাকেনা হয় কিনা কে জানে! কিন্তু একটা পয়সা ঘরে আসেনা, কোথায় যায় কেউ জানেনা। প্রথমে সকলে ভেবেছিল, অন্তিক খারাপ পথে গেছে, নেশা করে হয়ত। সেসবও খোঁজ নিয়ে দেখার পর পাওয়া যায়নি।

অন্তিক কেমন যেন হয়ে গেছে। মুখ-চোখ শুকনো, শরীর শুকিয়ে সুদর্শন ছেলেটা একদম ষাট বছরের বুড়ো হয়ে গেছে। খাচ্ছে বাপের ঘাঁড়ে, আছে বাপের পাখার নিচে, অথচ তার আত্মসম্মান নাকি তীব্র অভিমান অথবা অন্যকিছু কে জানে!

দুপুরের রান্নাতে হাত লাগিয়েছে মার্জিয়া। অন্তূ গিয়ে থালাবাসন মাজতে গেলে মার্জিয়া বলল, “অন্তূ! একা ছিলাম, কাজ করতেছিলাম, ভালোই তো ছিলাম। কী দরকার তোমার এখানে আসার? সকাল থেকে রান্না করতে পারতেছি, বাসন মাজতে হাত ক্ষয়ে যাবেনা আমার। রাখো তো, যাও এইখান থেকে।ʼʼ

অন্তূ কথা বলতে চাইল না। তবুও বিনয়ের সাথে বলল, “আপনি চাইলে এখন একটু বিশ্রাম নিতে পারেন, ভাবী। আমিই রান্না করছি।ʼʼ

-“সবচেয়ে বেশি গা জ্বলে কখন জানো?ʼʼ

-“জানি না। আপনার বা কখন সবচেয়ে বেশি গা জ্বলে, আমার জানার কথা তো নয়!ʼʼ

মার্জিয়া দাঁত খিঁচে আবার সামলালো নিজেকে, “তোমার সামলে আসলে। তুমি যতক্ষণ সামনে থাকো, আমার গা তিরতির করে পোড়ে। বিশেষ করে তোমার শান্ত, নরম কথায়।ʼʼ

অন্তূ আস্তে করে বলল, “আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি।ʼʼ

থালাবাসন মাজা হলে রান্নাঘরে ছড়িয়ে থাকা কৌটা, বিভিন্ন জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে লাগল।

মার্জিয়া বলল, “আমার চাচাতো ভাইকে পছন্দ হয়নি তোমার?ʼʼ

-“হয়নি এমন নয়।ʼʼ

-“তাইলে কোনো জবাব তো দিলা না!ʼʼ

-“আসলে ভাবী, এখন বিয়েই করতে চাইনা আমি। বিয়ে করার মতো হলে তো আর ভেগে যাব না! আপনারা যেখানে খুশি, ভালোমন্দ বুঝে দেবেন!ʼʼ

-“ভেগে যাবেনা তার গ্যারান্টি কী?ʼʼ

অন্তূ চুপ রইল। মার্জিয়া আবার বলল, “বিয়ে ক্যান করবা না? বয়স কি পনেরোতে পড়ে আছে তোমার, কচি ভাবো নিজেকে? কমপক্ষে বাইশ-তেইশ বছর বয়স চলতেছে। মেয়ে মানুষ কি আবার ত্রিশ বছরে বিয়ে করে?ʼʼ

-“বয়স একটু বাড়িয়ে বললেন। যাহোক, পড়ালেখা অথবা সংসার, দুটোই এককভাবে করতে হয়। আউটসাইড পিছুটান নিয়ে দুটোর কোনোটাই ভালো হয়না। সংসার করলে শুধু সংসার, পড়ালেখা করলে পড়ালেখা। অনার্সের আর দুটো বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে। এরপর এলএলবি করে বার কাউন্সিলর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে একটা নিম্ন আদালতে চাকুরী পেতে হলেও চাপ কম নয়, ভাবী। এখন বিয়ে নয় আপাতত।ʼʼ

চোখ গরম করে তাকিয়ে ছিল মার্জিয়া। সে নরম সুরে বলল, “আপনি কেন এত আগ্রহী আমাকে বিয়ে দিতে?ʼʼ

-“অনেক কারণ আছে।ʼʼ

-“একটু বলুন, আমি শুনতে আগ্রহী।ʼʼ

মশলা কষানোর ঝাঁজ নাকে লাগতেই অন্তূ কেশে উঠে মুখে ওড়না চেপে ধরল। তরকারীতে পানি দিয়ে মার্জিয়া ফিরলো ওর দিকে, “তুমি খুব জাননেওয়ালার নাটক করলেও বহুত কিছুই জানো না। তার ওপর জোয়ান মেয়ে বাড়িতে থাকলে তোমার বাপ মায়ের চিন্তা না থাকলেও আমার হয়। তার ওপর তোমার যে স্বভাব-চরিত্র আর তেজ, ছেলে পাওয়া গেলে হয়। আমার বোনের সংসার নড়বড়ে হয়ে গেছে তোমার জন্য, তোমাকে পড়ালেখা করাতে গিয়ে আমার শ্বশুরের হাতের অবস্থা খারাপ… অন্তূ যাও তো! আমার কথা বলতে মন চাচ্ছে না তোমার সাথে।ʼʼ

খুব অগোছালো লাগল কথাগুলো। অন্তূর মনে হলো, ভাবী যা বোঝাতে চাচ্ছে, তা আসলে পারছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। খানিক পরে আপন মনেই বলল মার্জিয়া, “একটা টাকা যৌতুক-ফৌতুক কিচ্ছু চায়নি, তোমাকে পছন্দ হয়েছে, আরও পাঁচ-সাত ভরি গহনা দিয়ে নিয়ে যাবে। তাতে অন্তত সংকট কমতো একটু।ʼʼ

অন্তূ হাসল, “বিক্রি করবেন নাকি আমায়? আর গহনা দিলে তো আমার গায়ে অথবা আলমারিতে থাকবে, সংকট কমবে কী করে? কী এমন সংকট লেগেছে বাড়িতে যে আমায় বিক্রি করা গহনা দিয়ে বাড়ির সংকট কমাতে হবে!ʼʼ

দরজায় কেউ এলো। পাওনাদার! দীর্ঘশ্বাস ফেলল অন্তূ।

আমজাদ সাহেব ডাকলেন অন্তূকে, “এদিকে আয় তো, অন্তূ!ʼʼ

অন্তূ মুখ বৃত করে গি দাঁড়িয়ে অবাক হলো। মুস্তাকিন মহান বসে আছে। কেন এসেছে এই লোক? সেদিন সে গিয়েছিল সেই ব্যাপারে কিছু বলতে এসেছে!

আমজাদ সাহেব মৃদু হাসলেন, “এটা আমার মেয়ে।ʼʼ অন্তূকে বললেন, “ও আমার ছাত্র, হাইস্কুলে পড়তো, আমি তখন ওদের ক্লাসটিচার ছিলাম। সৈয়দ মুস্তাকিন মহান, পিবিআই অফিসার! নামটা কি ঠিক বললাম?

মুস্তাকিন ইতস্তত হেসে মাথা নাড়ল।

শুদ্ধতম হাসি, পরিপাটি এক সৌম্য চেহারার পুরুষ মানুষ। পরনে পাঞ্জাবী থাকায় আরও ভালো লাগছে দেখতে। শাল চাদর জড়ানো। সেদিন কার্যালয়ে এমন বিশেষ লাগেনি। হালকা রঙা পাঞ্জাবীতে ফর্সামতো শরীর, পেটানো হাতের ত্বকে কালো বেল্টের হাতঘড়ি নজরে এলো। সুপুরুষের আখ্যা পাবার মতো সবকিছু আছে মুস্তাকিনের মাঝে। ভ্রুটা চটা পড়া, জোড় ভ্রুতে পুরুষ মানুষ এমনিতেই একটু বেশি নেশা ধরানো হয়। হাসিটা চমৎকার সুন্দর! বসে আছে বিনয়ী ভাবে নিজের প্রাক্তন শিক্ষকের সম্মুখে, মুচকি হাসি ঠোঁটে ঝুলছে। এভাবে কোনোদিন আগে পরখ করেনি কাউকে অন্তূ।

মুস্তাকিন বলল, “আমি জানতামই না স্যার, এটা আপনার মেয়ে। ছোটোবেলায় স্কুলে দেখেছি বোধহয়, এরপর সেদিন ভার্সিটিতে একবার দেখা হয়েছিল। কিন্তু হিজাবের আড়ালে, তার ওপর বড়ো হয়ে গেছে, চিনতে পারার কথা না।ʼʼ সৌহার্দপূর্ণ কণ্ঠস্বর।

-“ভার্সিটিতে? তুমি কী করছিলে ওখানে?ʼʼ

-“সামাজিক খোঁজখবর থেকে বেশ দূরে চলে এসেছেন, স্যার! একটা ভয়ানক রেপ-কেইস ঘটে গেল আপনাদের এরিয়াতে। জানেন না? সেটার তদন্তে আছি।ʼʼ

-“স্যার স্যার করছিস কেন, বাপ! তোরা কত বড়ো মানুষ হয়ে গেছিস, এসব ডাক শোনার যোগ্যতা পেরিয়ে গেছিস, আমার থেকে বহুত বড়ো হয়ে গেছিস! আগে মনে হতো তুই লম্বা হবি না বেশি, আজ তো দেখছি নকশাই বদলে গেছে দেহের গড়নের!ʼʼ

মুস্তাকিন মাথা নিচু করে হেসে ফেলল, “স্যার, আমি আপনার কাছে চিরদিন নিয়মিত বেতের বাড়ি খাওয়া ছাত্র। আপনারা কোনোদিন ছোটো হবেন না, আর না আমি বড়ো। এসব কথা বলে আজও সেই একইভাবে লজ্জায় ফেলছেন, যেভাবে স্কুলে পড়া না করে গেলে অপমান করতেন। আজও নাম ধরে একবার ডাকুন, আমি নস্টালজিক হয়ে যাব নির্ঘাত! কিন্তু আপনার দীপ্তির সাথে সাথে অভিজাত্য কমে এসেছে, স্যার! কোনো ট্রমাতে আছেন, মনে হচ্ছে!ʼʼ

আমজাদ সাহেব হাসলেন, “কবে শিফ্ট হয়েছিস দিনাজপুর?ʼʼ
-“মাসছয়েক হলো।ʼʼ

আমজাদ সাহেব অন্তূকে ইশারা করলেন, “যা..ʼʼ

তার ধারণা ছিল, পুলিশ বা সরকারী চাকরিজীবীরা সব আঙ্কেল টাইপের, তেলের ড্রাম মার্কা ভুড়িওয়ালা, টাকলু আর বয়স্ক, দেখতে বিকট ধরণের হয়।

আমজাদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “মামার বাড়িতেই থাকছিস?ʼʼ

-“না, ফ্লাট ভাড়া করে থাকছি।ʼʼ

-“বউমাকে আনলি না? ছেলে মেয়ে কয়টা হয়েছে? কবে মরে-টরে যাব, দেখা করতে এলো না ওরা বাপের বুড়ো স্যারের সাথে?ʼʼ

গম্ভীর মানুষটার এই সহজ দিকটা অনেকের অজানা, অথচ মুস্তাকিন খুব জানে স্যারের এই মুক্তমনা, হাস্যজ্জ্বল রূপকে। হেসে ফেলল ও, “স্যার, আগে এটা তো জিজ্ঞেস করতেন, বিয়ে করেছি কিনা!ʼʼ

আমজাদ সাহেব গম্ভীর হলেন, “বয়স কত তোর?ʼʼ

-“কত বলে মনে হয়, স্যার আপনার?ʼʼ

আমজাদ সাহেব আপাদমস্তক দেখে বললেন, “আন্দাজ করে কথা বলার অভ্যাস নেই আমার। তবে দেখতে বেশ ফিটফাট হয়েছ! আগে তো মুটু ছিলে, শরীরের মেদ নেই হয়ে গেছে, শুধু বড়ো বড়ো চোখ দুটো আছে..ʼʼ

মুস্তাকিন কপালে আঙুল ঘষতে ঘষতে ধীরে ধীরে হেসে ফেলল , “লজ্জা পাচ্ছি, স্যার!ʼʼ

আমজাদ সাহেব বললেন, “কন্যারাশি তোর?ʼʼ

মুস্তাকিন এবার শব্দ করে হেসে উঠল। নিঃশব্দে হাসলেন আমজাদ সাহেবও। মুস্তাকিন মুগ্ধের মতো চেয়ে রইল গৌরাঙ্গ মানুষটির সুলভ হাসির দিকে। তরতরে তেজী হাসি, স্যারের! মুস্তাকিনের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক সর্বকালের সব শিক্ষকদের মাঝে। হালকা মেহেদীর রঙে রাঙানো দাড়িতে, সাদা লুঙ্গির সাথে ফতোয়া পড়া লম্বা, আত্মবিশ্বাসী পুরুষটি মুস্তাকিনকে বরাবর মুগ্ধ করে। মুস্তাকিন হাসি সামলালো, “কেন, স্যার? ছেলেদের লজ্জা পাওয়ার অধিকার নেই?ʼʼ

অন্তূ ট্রে ভর্তি নাশতা আনলো। মুস্তাকিন বলে উঠল, “স্যার! এটা ঠিক হলো না..ʼʼ

আমজাদ সাহেব গম্ভীর হলেন, “হু! এখন তুই আমায় ঠিক-ভুল শেখা।ʼʼ

-“স্যার, তা বলিনি আমি..ʼʼ

-“আপাতত আর কিছু বলতে হবেনা এ ব্যাপারে। তুলে নে এক এক কোরে। আম্মা, পানি দিলি না?ʼʼ

অন্তূ পানি আনতে গেল। আমজাদ সাহেব বললেন, “একসাথে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময়টুকু হবে?ʼʼ ভারী শোনালো কথাটা।

মুস্তাকিন ভ্রু চুলকে হাসল, “এভাবে বললে সময়ের সাহস নেই না হওয়ার!ʼʼ

কেকের একটা পিস উঠিয়ে নিয়ে হাতে রেখে বলল, “অন্তিকের কী খবর?ʼʼ

-“আমি ভেবেছিলাম না তুমি প্রসাশনে ঢুকবে।ʼʼ

মুস্তাকিন বুঝল, স্যার কথা এড়াতে চাইছেন। সেও আর গেল না ওদিকে, “আমি নিজেও ভেবেছিলাম না, অথচ ছোটো চাচার বদৌলতে হয়ে গেল, আর অমত করিনি।ʼʼ

-“বিয়ে-শাদী করবি না?ʼʼ

স্যার একবার তুমি বলছে, একবার তুই। বেশ উপভোগ্য লাগল বিষয়টা। কেকের টুকরো চিবিয়ে জবাব দিলো, “ভাবিনি এখনও।ʼʼ

-“ভাবার সময় আসছে, না যাচ্ছে?ʼʼ

-“সময় কোথায় সংসারকে সময় দেবার মতো? সারাদিন দৌড়ের ওপর আছি। আম্মা তো জিনের মতোওপর ঘাঁড়ে ভর করে আছে, তিনবেলা ফোন করে কান চিবোচ্ছে। ʼʼ

দুপুরের খাবার বেড়ে দিতে মার্জিয়া এলো না। অগত্যা অন্তূকে তদারকি করতে হলো। আব্বুই তুলে তুলে খাওয়াচ্ছিল, সে হাতে হাতে সাহায্য করল। মাঝেমধ্যেই আব্বুর পুরোনো ছাত্ররা আসে আব্বুর কাছে। এরকম সচরাচর দেখা যায় না, ছাত্ররা সচরাচর শিক্ষকদের ভুলে বসে। অথচ আমজাদ সাহেব শিক্ষকের চেয়েও বড়ো কিছু তার ছাত্রদের কাছে।

অন্তূ গরুর মাংস তুলে দিলো তার প্লেটে। সঙ্গে সঙ্গে মুস্তাকিন মুখ তুলল, “গরুর মাংসে সমস্যা আছে আমার। খাইনা..ʼʼ

আমজাদ সাহেব বললেন, “শুনে দিবি তো! আচ্ছা, আরেকটা পরিষ্কার প্লেটে নতুন কোরে ভাত তুলে দে।ʼʼ

মুস্তাকিন বাঁধা দিলো, “ব্যাপার না, তার প্রয়োজন হবেনা। আপনি শুধু মাংস তুলে নিন।ʼʼ

অন্তূ একটু অপ্রস্তুত হলো, মাংস কী করে তুলবে? চামচ দিয়ে তুলতে গেল, মুস্তাকিন হাসল, “হাত দিয়ে তুলুন না! পাত থেকে চামচ দিয়ে মাংস তোলা যায়?ʼʼ

প্লেট থেকে হাত দিয়ে মাংস তুলে নেয়ার পর অন্তূর শরীরে অস্বস্তি জেঁকে বসল। খাওয়া শেষ করে হাত মোছার জন্য গামছা চাইল মুস্তাকিন। অন্তূর মনে হলো, আগে যে দু’দিন মুস্তাকিনকে দেখেছে, খুব পেশাগত, শক্ত লেগেছিল। আজ একদম তা লাগছে না, সহজ, মিশুক ও ব্যক্তিসুলভ লাগছে।

তোয়ালেতে হাত মুছে সেটা আবার অন্তূকে ফেরত দেবার সময় অন্তূর দিকে তাকিয়ে ছিল মুস্তাকিন। বেশ বেলেহাজ দৃষ্টি। অন্তূর মুখ দেখতে পাওয়া যাচ্ছেনা, এই বিষয়টাই যেন মুস্তাকিনের কৌতূহল ও অনুরাগ বাড়িয়ে তুলল অন্তূর দিকে মনোযোগী হতে। অন্তূর চেয়ে বেশ খানিকটা লম্বা মুস্তাকিন। প্রসাশনের লোকদের একটা নির্দিষ্ট লম্বা উচ্চতা থাকে। একটা ঢোক গিলল মুস্তাকিন, ওড়নায় আড়াল করা মুখের ওপর দেখতে পাওয়া চোখদুটোকে গিলে নিলো বোধহয়। বেশ অস্বস্তিতে পড়ল অন্তূ। আমজাদ সাহেব হাত ধুতে রান্নাঘরে উঠে গেছেন, ভিমবার লাগিয়ে হাত ধোয়ার উদ্দেশ্যে।

মুস্তাকিন অন্তূকে জিজ্ঞেস করল, “কোনো ইয়ারে পড়ছেন?ʼʼ

-“সেকেন্ড ইয়ারের ইয়ার ফাইনাল দেব।ʼʼ

-“কোন অনুষদে?ʼʼ

-“এলএলবি।ʼʼ

-“বাপরে, হবু উকিল ম্যাডাম!ʼʼ

অন্তূর কী হলো জানা নেই, কেমন আড়ষ্ঠতা ভর করল। মাথাটা নত করে মৃদু হেসেও ফেলল। এই প্রথম বোধহয় সে আর পাঁচটা মেয়ের মতো কারও সামনে বেশ অপ্রস্তুত আর সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মুস্তাকিন নিচু আওয়াজে বলল, “এজন্য সমাজের কুকীর্তি নিয়ে বেশ ক্ষোভ আছে আপনার মাঝে।ʼʼ

অন্তূ কথা ঘোরালো, “আমি আপনার অনেক ছোটো বোধহয়। আপনি বলছেন, শুনতে ভালো লাগছে না।ʼʼ

ঘাঁড় চুলকালো মুস্তাকিন, “খুব বড়োও না। মানে অতটা অন্তত বড়ো না, যে চোখে লাগবে। আমি যখন এইটে পড়তাম, আপনি থ্রি অথবা ফোরে ছিলেন বোধহয়।ʼʼ

-“মনে নেই।ʼʼ

-“আমি মেয়েদের তুমি বলতে পারিনা, নিজের কাছে খুব লেইম লাগে ব্যাপারটা। এরা মায়ের জাত, এদের সামনে খুব কুঁকড়ে যায় আমার তেজ, আর শক্তি। বলা চলে মেয়ে জাতিকে ভয় পাই আমি, মানে ধরুন, কী থেকে কী হয়ে যাবে, কোথাও অসম্মান বা তাদের মনঃকষ্টের কারণ হবে আমার কোনো কথা বা আচরণ। অভ্যাগত কারণে হলেও আপনি থেকে তুমিতে আসা খাটুনির কাজ হবে।ʼʼ

মুস্তাকিনের বলার ধরণটা অবলীল ও সরল ছিল, অন্তূর ভালোই লাগল শুনতে। হাসি পেল অল্প। আব্বুর ছাত্রের মুখে আব্বুর আদর্শের কথা শোনাটা চমৎকার একটা অনুভূতি বলে মনে হলো অন্তূর। এই আদর্শই তো সে ছোটোবেলা থেকে দেখেছে আব্বুর মাঝে! পাঞ্জাবীর হাতা গুটাতে গুটাতে আমজাদ সাহেবের পেছনে গেল মুস্তাকিন।

আমজদ সাহেব আবার বসলেন নিজের জমিজমার সমস্যার কথা তুলে। সব খুলে বলেছেন, আবারও একবার মনে করালেন। চলে যাবার সময় দরজা অবধি গেলেন আমজাদ সাহেব, “আবার আসবি কিন্তু। অবসর সময়টা কাটতে চায়না, আজকাল।ʼʼ

মুস্তাকিন বাড়ির ভেতরে চোখ ঘুরালো। কিছু খুঁজে চলল তার চোখদুটো। অকারণেই বোধহয় এই অযাচিত, অপ্রাসঙ্গিক চোখের চাহিদা! ব্যতিক্রমে মস্তিষ্ক মনোযোগী হয়।

সেদিন অন্তূ কার্যালয় থেকে আসার পর বেশ কয়েকবার খেয়ালে এসেছিল অবশ্য এই আলাদা ধাঁচের অপরিচিতার কথা।

দেখা পেল। টিবিলের ওপর ছিটিয়ে থাকা থালাবাসন গোছাচ্ছে। স্যারকে বিদায় বলে সামান্য গলা উঁচিয়ে অন্তূকে বলল, “আসি, উকিল ম্যাডাম! মন দিয়ে পড়ুন, আউটসাইডের চিন্তা না করলে বোধহয় আপনার জন্য ভালো। সমাজ দেখার জন্য আমরা আছি, আপনার পুরো ফোকাস এখন বইয়ের পাতায় হতে হবে।ʼʼ

আমজাদ সাহেব মৃদু হাসলেন, “দোয়া করিস, বাপ! একই জেলায় আছিস, তোদের জুনিয়র, দেখেশুনে রাখিস রাস্তাঘাটে। যেসব কিছু ঘটছে ভার্সিটিতে, চিন্তা হয় ওকে নিয়ে। খুব বেপরোয়া হয়েছে, বেপরোয়াপনা সাধারণত আজাব বয়ে আনে।ʼʼ

মুস্তাকিন আবার একবার তাকালো অন্তূর দিকে, “আপনার মতোই হয়েছে, স্যার! আসি। ফ্লাটে যাবেন সময় কোরে, এককাপ চা খেয়ে আসবেন ছাত্রর হাতের।ʼʼ

অন্তূ এবার তাকিয়ে দেখল বাইরের দিকটা। শালটা কাধের ওপর তুলে, রোদচশমাটা পরে নিলো মুস্তাকিন। অন্তূর চোখের সামনে জয় এসে দাঁড়াল। ঘৃণায় মুখে বিরক্তির রেখা ভাঁজ আকারে পড়ল। এই শাল, রোদচশমা, পাঞ্জাবী সব বেশেই জয়কে দেখেছে অন্তূ, অথচ এমন সুপুরুষ লাগেনি। পুরুষত্ব একটু হলেও আছে মুস্তাকিনের মাঝে, অন্তত নারীকে সম্মান করার মনুষত্বটুকু আছে। হুট করে দুজনের তুলনা করে ফেলল কেন অন্তূ, জানে না। কিন্তু আজকাল জয়ের নোংরামিগুলো মাথায় এঁটে থাকা অবস্থায় ব্যতিক্রম এক পুরুষ চরিত্রে উপস্থাপন, একটু ভাবতে বাধ্য করল ওকে।

অন্তূর একা খেতে বসে খাবারে অনীহা এসে যাচ্ছিল।

ভাবীর ঘরে গিয়ে দেখল, ভাবী উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। ডাকল, “ভাবী! আসুন খেয়ে নিই, দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছে।ʼʼ

-“আমি খাব না, মাথা ধরেছে খুব। ডেকো না আমায়।ʼʼ

-“শরীর খারাপ নাকি আপনার? জ্বরটর আসবে হয়ত। চা বানিয়ে দেব, খাবেন?ʼʼ

মার্জিয়া জবাব দিলো না। অন্তূ আর খেলো না। চা খাওয়া যায়।

আপনমনেই একটা পরিচিত কল্পিত দৃশ্য ভেসে উঠল চোখের সামনে, তার পরনে সাদা শাড়ি, তার ওপর এডভোকেটের বিশেষ কালো পোশাকটা। সে কয়েকটা ফাইল হাতে নিয়ে রিক্সা থেকে নেমে সুপ্রিম কোর্টের ফটক পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ভেতরে।

ভাবনা ভঙ্গ হলো, পানি ফুটে গেছে। চা পাতি ঢেলে দিয়ে আরেক ভাবনায় মন গেল। চোখের সামনে চিরাচরিত কল্পিত একটা দৃশ্য এসে দাঁড় হওয়া, আর বাস্তবে তার সুপ্রিম কোর্টের উকিল হিসেবে ভেতরে হেঁটে এগিয়ে চলার মাঝে দূরত্ব কতটুকু? আর সেই দূরত্বের রাস্তাটা সহজ কতটা? ঝঞ্ঝাট আর ঝড়ো হাওয়ার বেগ কেমন? কম না বেশি? রাস্তায় বিছিয়ে আছে রক্তগোলাপের কাঁটা নাকি রক্তরঙা কৃষ্ণচূড়ারা? তবে রাস্তার রঙটা লালচে, এটা কল্পনায় এলো অন্তূর।

চলবে..

[ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন]

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

১২.

একটা বোরকা পরা মেয়ে পাগল করেছে…ও একটা বোরকা পরা চেংরি…

জয়ের গান শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল অন্তূ। জয় ডাকে।

-“আরমেইণ!ʼʼ

অন্তূ পেছন ফিরল। জয় হাসল তার নিজস্ব ভঙ্গিতে, “তোমায় একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে খুব।ʼʼ

অন্তূ চোখ বুজে গাঢ় শ্বাস ফেলে। কথা বলে না।

-“চ্যাহ! রাগছো কেন? মামা একটা বিয়ে করায়ে দেয় না। তার কোনো মেয়েই পছন্দ হয় না। কিন্তু আমার তো বয়স হয়েছে!ʼʼ চট করে হেসে ফেলল কথার মাঝেই, “আচ্ছা! যাও এখন চুমু-টুমু বাদ! বিয়ের পর মন ভরে চুমু খাব, ঠিক আছে?ʼʼ

অন্তূ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। জয়ের ভয়ে পেছনের ছেলেরা জোরে হাসতে না পেরে সবগুলো মুখে রুমাল চেপে ধরেছে। জয় ঘাঁড় ঘুরিয়ে তাকাল, “হাসতেছিস ক্যান? আমার প্রেমিকাকে আমি চুমু খাই অথবা এখানেই… উপভোগ কর শালা, উপভোগ কর। হাসবি না। নো হাসাহাসি।ʼʼ

অন্তূ চলে গেল। জয় হাতের তালু উঁচিয়ে ধরল, “আরে.. কথা তো শুনে যাও..ʼʼ কথা অসম্পূর্ণ রেখে জোরে শব্দ করে গা কাঁপিয়ে হেসে লুটিয়ে পড়ল জয়। প্রানখোলা হাসি হাসছে সে। পা বাঁকিয়ে কুঁজো হয়ে দুই হাঁটুতে হাত রাখল। হাসি থামছে না ওর। ছেলেরা দেখল জয়ের মনখোলা অট্টহাসি। ওরাও হেসে ফেলল। কোনো মানুষই একক রূপী হয়না, সবারই ক্ষেত্রবিশেষ একাধিক রূপ থাকে। জয়েরও আছে, একের অধিক ভিন্ন ভিন্ন রূপ। অন্তূকে জ্বালাতে পেরে যে সে পরিতৃপ্ত, অন্তূর বিরক্তি তাকে আনন্দ দিচ্ছে, এই হাসি তারই বহিঃপ্রকাশ। অন্তূর কানে অবধি পৌঁছালো সেই হাসির আওয়াজ।

জয় ঠোঁটে সিগারেট চেপে লাইটার চাইল কবীরের কাছে।

-“ভাই! আপনে কি মেয়েটারে সত্যিই..ʼʼ

গম্ভীর মুখে চোখ নামিয়ে তাকাল জয়, “নিজের কাজে কাজ রাখ, যাহ!ʼʼ

আলিম ঠোঙা ভরে গাছের পেয়ারা এনেছে জয়ের জন্য। জয়ের পছন্দ পেয়ারা। পথে হাঁটতে হাঁটতে পেয়ারা বণ্টন করল সবাকে। পথে যেসব জুনিয়রদের সাথে দেখা হলো, ওরা সালাম দিয়ে হাত মেলাতে এলো, সকলকে দিলো একটা একটা কোরে।

এক মেয়ের ওড়না গলার সাথে ফাঁসির দড়ির মতো পেঁচানো। জয় একবার আপাদমস্তক দেখে বলল, “গলার দড়িটা হয় খুলে ফেলো, অথবা গায়ে রাখো। ফাঁস-টাস লেগে মরে গেলে সেই দোষও আমার হবে। লোকের ভেতরে আমাকে দোষারোপ করার বীজাণু ছড়িয়ে গেছে।আদারওয়াইজ আমার আবার মুখ ভালো না, সাথে চোখ তো আরও খারাপ! আজুবাজু কিছু বললেই নেতাগিরির নাম বদনাম হবে। ধরো, পেয়ারা খাও।ʼʼ

শহীদ মিনার চত্বরের সিঁড়িতে বসল। আশপাশে মেয়ে-ছেলেরা বসে হাসাহাসি করছিল। একে অপরের গায়ে ঢলে পড়া হাসি। জয় ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে চোখ উঠিয়ে তাকাল একবার সেদিকে। থমথমে হয়ে উঠল আশপাশ। মাথা নিঁচু করে সালাম দিয়ে উঠে চলে গেল সবগুলো সেখান থেকে।

শেষ অবধি জয়ের ভাগে পেয়ারা জুটল না। রোজ হয় তার সাথে এমন। বিলাতে বিলাতে নিজের পাত খালি। সবাই একজোটে নিজেদের পেয়ারা এগিয়ে দিলো জয়ের দিকে। জয় স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘাঁড় নাড়ল, “খা তোরা, খাব না আমি।ʼʼ

-“ভাই!ʼʼ কতর স্বরে একযোগে ডেকে উঠল সবাই।

জয় বিরক্ত হলো, “একেকটা তো দেখতেছি সুপার ড্রামা কুইনের মেল ভার্সন! পেয়ারার বদলে ওমন করে কলজে কেটে দাও দেখি সম্বন্ধির চেংরারা। চার-আনা পিস পেয়ারা খা তোরা, আমার লাগবেনা। পারলে একটা মিষ্টি স্বাদের বেশি করে জর্দা মেরে পান কিনে দে। চিবোই।ʼʼ

কবীর একটা দারুণ কাজ করল। নিজের হাতের পেয়ারাটা জয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে দৌঁড়ে ডানদিকে গেল। যে মেয়েটাকে জয় পেয়ারা দিয়েছিল সে তখনও দাঁড়িয়ে ছিল, তার কাছে গিয়ে বলল, “পেয়ারা দাও।ʼʼ

মেয়েটা অবাক হলো। বুঝল না, বলল, “হু?ʼʼ

কবীর পেয়ারাটা কেঁড়ে নিলো। দৌঁড়ে এলো দলের কাছে। কিছুক্ষণ কেউ মুখ বন্ধ করল না, কথা বলল না। খানিক সময় যেতেই সবগুলো হু হা করে হেসে উঠল। রাহাত কাঁধ থাপড়ায় কবীরের, “মামা! কী কামডা করলি? কেঁড়ে নিয়ে চলে এলি? ভাই, তোকে আমি এ বছরের সেরা পেয়ারা ফেরত এওয়ার্ড দেব। সাথে থাকবে দুই বালতি পেয়ারা ভাজি, এবং পেয়ারার হালুয়া।ʼʼ

কবীর গম্ভীর মুখে বলল, “ভাই! একটা ডাউট, আপনে আসলেই যদি মেয়েটাকে ভালো না বাসেন, তাইলে..ʼʼ

জয় চোখ তুলল, “আমি যা বলি, করি–তা যেকোনো মেয়ে ভয় পেয়ে হোক আর ভালো লেগে, সায় দিতো, মিঠা কথা বলতো, আড়চোখে তাকাতো, দেখতো আমায়, লজ্জা পেত–যে লজ্জায় লজ্জা না, থাকে আসলে নির্লজ্জতা। দু একদিন গেলে গা ঘেঁষতো, এরপর আমার মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করতো। এসব যেকোনো মেয়েই করতো। ভয়েই হোক অথবা ইচ্ছে করে। ওদেরকে জ্বালানোর কিছু নেই। সুঁতো না টানতেই গায়ে আঁছড়ে পড়া খানকি সব। ওদের জ্বালালে বিরক্ত হতো ওরা? বা সেটা কি জ্বালানো হতো না নিজের ব্যক্তিত্ব আর পদের নাম বিসর্জন দেয়া হতো?ʼʼ

-“ঠিক কথা, ভাই।ʼʼ

ভার্সিটি ক্যাম্পাস ফাঁকা প্রায়। জয় সিগারেটে টান দিলো আরেকটা, “আরমিণ সেরকম?ʼʼ

-“না, ভাই!ʼʼ

-“আমার আচরণ, কাছে যাওয়া, কথা বলা সবেতে ওর গা চিটমিট করে ওঠে। ঠিক যেমন ধর, ফুটন্ত বালুতে মুড়ির চাউল যেরকম। আর এখানেই মজাটা। তুই জানিস না, আমি ওর সামনে গেলে ও ঠিক কতটা অস্বস্তি আর ঘৃণা নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ধরে নে একটা আজাব আমি ওর কাছে। আসলে ওকে বিরক্ত করার ইন্টারেস্টটা এখানেই।ʼʼ

-“কিন্তু, ভাই..ʼʼ

জয় হাসল, “রাহাত! ছাড় দেয়া আর ছেড়ে দেয়াকে গুলিয়ে ফেলিস না, বাপ। ছাড় দিয়ে রেখেছি, সুঁতো আমার হাতে। সুঁতো জড়াতে শুরু করলে হুড়মুড়িয়ে এসে আমার খপ্পরে পড়বে। ও আমাকে চ্যালেঞ্জও করেছে, জানিস?ʼʼ

আর কাউকে কিছু বলতে দিলো না। কবীরের দিকে তাকাল, “এ অমলেট! গিটার দে আমার!

ওর কোলে গিটার তুলে দিলো কবীর। তাতে টুংটাং সুর তুলে বজ্র কণ্ঠে গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে গেয়ে উঠল,

ধরো কলকি মারো টান, গাঞ্জা বাবার আশেকান
মইরা গেলে সঙ্গে কিছুই যাবে না…

গা দুলিয়ে হেসে ফেলল নিজেই। ছেলেদের অবস্থাও বেকায়দা। জয় গিটার নামিয়ে রেখে সিঁড়ির দিকে ঝুকে বসল। গা কাঁপিয়ে হাসছে, হাসির দমকে শরীর দুলছে তার। ছেলেরা ভীষণ ভক্ত জয়ের। নেতা নেতা ভাব, সভ্যতার বড় অভাব।

সামনে দিয়ে একটা ছেলে হেঁটে যাচ্ছিল। জয় ডাকল, “এই! শোন! এদিকে আয়!ʼʼ

ছেলেটা এসে দাঁড়াল। জয় আগাগোড়া চোখ উপর-নিচ করে দেখল একবার। প্রশ্ন করল, “নাচতে পারিস?ʼʼ

ছেলেটা বোকার মতো চেয়ে আছে। জয় বিরক্ত হলো, “নাচতে পারিস নাকি?ʼʼ

ছেলেটা না বুঝেই বোধহয় ঘাঁড় নাড়ল। জয় জিজ্ঞেস করল, “কী কী নাচ পারিস?ʼʼ কথা শেষ করে কবীরের দিকে কাধ ঝুঁকিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল, “আজকাল খুব সুরসুরি টের পাচ্ছি ভেতরে! আগুন বেড়ে গেছে।ʼʼ

কবীর উদ্ভট হাসল, “ভাই! কী কন না কন! দিনের বেলায় কেমনে কী? রাতে একটা ব্যবস্থা হবে না-হয়!ʼʼ

ভ্রু জড়াল জয়, “দিনের বেলা সুরসুরি ওঠা যাবে না, নাকি? এখন বুঝতেছি মানুষ বিয়ে ক্যান করে? দিন হোক বা রাত, যখন তখন.. ফুলটাইম..ʼʼ

-“ভাই, আপনেও জীবনে বিয়েশাদী করবেন? মানে আপনার হাবভাব দেখে কিন্তু কোনোদিন মনে হয়না যে আপনি বিয়ে করবেন।ʼʼ

-“কথা খারাপ বলিস নি, তুই। আমিও ভাবছি কয়দিন ধরে, তোকে একটা বিয়ে দেব, এরপর বউটাকে আমি আর তুই ভাগ করে নেব। ভাগাভাগি এক মহৎ মানসিকতার পরিচয়। সবে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। সপ্তাহে তিনদিন তোর, তিনদিন আমার। বাকি শুক্রবারটা আমার বোনাস।ʼʼ

রাহাত হেসে গড়াগড়ি খায়, “ভাই! বউ ওর, কিন্তু বোনাস আপনি কেন পাবেন?ʼʼ

-“বিয়ে কে দেবে হে, শালা? যেই ফকিরের সিরনি খাও, সেই ফকির চেনো না? তোর মনে হয় কবীরের জীবনে বিয়ে হবে আমি না সুপারিশ করলে?ʼʼ

-“ভাই কিন্তু আপনি বিয়ে করবেন না কেন?ʼʼ

জয় পেয়ারাতে কামড় দিলো, “পুরুষ দুই প্রকারের। এক–বিবাহিত, দুই–জীবিত। তবে বেশিদিন বেঁচে থাকা ঠিক না। বেঁচে থাকার কোনো টেস্ট নেই। থুহ। ʼʼ

-“ভাই! তার মানে পুরুষ বিয়ে করলে বেঁচে থাকে না?ʼʼ

জয় মাথা নাড়ল, “চান্সই নেই।ʼʼ নজর ঘুরিয়ে সামনে দাঁড়ানো ছেলেটাকে বলল, “একটা জম্পেশ বেলী ডান্স দে তো! নাচ!ʼʼ

কবীর ফিসফিস করল, “ভাই! ও তো ব্যাটা মানুষ! ওর বেলী ডান্সে আপনার আগুন কেমনে নিভবো?ʼʼ

ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে জয় ছেলেটার দিকে অতিষ্ট নজরে তাকিয়ে, আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে তীব্র বিরক্তি নিয়ে সামনের রাস্তার দিকে আঙুল ইশারা করল, “এ যা, ভাগ এখান থেকে! যা, সামনে থেকে সর! শোন, আবার যাইয়া উপর মহলে কমপ্লেইন করবি না, এটা র‌্যাগ না রে পাগলা। আমার ভালোবাসা। আমি আছিই কিছুদিন। আর বদনাম ভাল্লাগে না আজকাল, বয়স হচ্ছে তো!ʼʼ

প্রফেসর এদিকেই এগিয়ে আসছেন! জয় উঠে দাঁড়িয়ে আরেকটা লম্বা টান দিলো সিগারেটে। স্যার যখন একদম সামনে এসে দাঁড়াল, তার মুখের সামনে একবার ধোঁয়া ছেড়ে তারপর তা মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে চেপে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো, “সালাম, স্যার! কী অবস্থা?ʼʼ

-“তোমার কী অবস্থা?ʼʼ

হাতদুটো মাথার ওপর তুলে অলস ভঙ্গিতে বলল জয়, “বিন্দাস চলছে!

নাক কুঁচকালেন প্রফেসর, “কী করছো আজকাল?ʼʼ

-“যা করছি, আপনি স্যার মানুষ, বলা ঠিক হবে না। আপনাদের একটা ইজ্জত আছে না!ʼʼ

-“এতো রঙ-তামাশা আর ভালো থাকাথাকি আসে কোত্থেকে?ʼʼ

মাথার ওপর থেকে হাত নামাল জয়, “ভালো থাকা একটা পেশা, স্যার!ʼʼ

-“পেশা?ʼʼ প্রফেসর স্যার কপাল কুঁচকালেন।

মাথা নাড়ল জয়, “জি স্যার, পেশা।ʼʼ

-“তাই নাকি?ʼʼ

স্যার রেগে যাচ্ছেন। জয় তাতে লম্বা হাসল, “হ, স্যার। এই পেশায় দরকার— যা ইচ্ছে তা করার ক্ষমতা, আর মন-মানসিকতা। যখন যা ভালো লাগবে, যাতে আনন্দ এবং মজা পাওয়া যাবে, তা করার সাহস এবং পাওয়ারটুকু থাকলে অলওয়েজ ভালো থাকা যায়। সেটা খারাপ অথবা ভালো, এই চিন্তা করলে আপনি এই পেশার যোগ্য না। তাইলে আপনাকে ওই মাল গিলে ডিপ্রেশন কাটাতে হবে।ʼʼ

-“তোমার কাছে এই পেশা আছে বলে তুমি মাল গেলো না? সিগারেট টানো না!ʼʼ

-“ওটা তো ইশটাকিল, স্যার। জোয়ান ছেলেপেলে আমরা। রাত হলে দু-এক প্যাগ মাল পেটে না ফেললে চলে?ʼʼ

এবার চূড়ান্ত রাগলেন স্যার, “বজ্জাত ছেলে, তোমার সাথে কথা বলাই তো উচিত হয়নি আমার!ʼʼ

-“এমন ভাব করছেন যেন, আজকেই প্রথম অনুচিত কোনো কাজ এবং শব্দের সাথে পরিচয় হলো আপনার? দিনে কয়টা উচিত কাজ করেন? যেসব কাজ করেন আপনি, আমিও অত খারাপও না। মুখ খুলায়েন না, স্যার। বদনাম করছেন মুখের ওপর।ʼʼ

এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে আর কথা বলছে জয়। এটা তার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। কোনো সময় চোখের চাহনি এবং ঘাঁড় স্থির থাকেনা। পাখির মতো তাকিতুকি চলতে থাকে।

প্রফেসর জিজ্ঞেস করলেন, “কবে এসেছ ঢাকা থেকে?ʼʼ

-“আবার ঢাকা ফেরার সময় হয়ে এলো, আপনি আসার কথা বলছেন!ʼʼ

-“পরীক্ষা কবে?ʼʼ

-“পরশুদিন যাব।ʼʼ

পাখিদের মতো চোখের চাহনি এবং ঘাঁড়টা সবর্ক্ষণ ছটফটে, চঞ্চল, বেপরোয়া জয়ের। প্রফেসর বললেন, “ভালো হও, বখাটে হচ্ছ দিনদিন!ʼʼ

-“একটা বিয়ে দিয়ে দেন তাইলে! ভালো হয়ে যাই!ʼʼ

-“তোমাকে মেয়ে দেবে কে? এমন বাপ নেই দেশে আমার জানামতে! দিনকে দিন যা হাভাতে হচ্ছ! এক নম্বরের ম্যানার্সলেস তুমি!ʼʼ

জয় সোজা হয়ে দাঁড়াল, নাক শিউরালো, “দিলেন তো মুডটার আব্বা-আম্মা করে? ম্যানার্স কী জিনিস? হোয়াট ইজ ম্যানার্স! সেতা খায় না গায়ে মাখে? ম্যানার্স আর আমি একসাথে! এই অসম্ভব বাক্যটারে উচ্চারণ করার খুব দরকার ছিল আপনার এই মুহুর্তে? যান, যান! কোথায় যাচ্ছিলেন, যান। আপনার উদ্দেশ্যে সম্মান দেখিয়ে আবার সিগারেটটা ফেলে দিলাম! আঠারো টাকা একটা সিগারেটের দাম!ʼʼ

গম্ভীর মুখে তাকালেন স্যার, “শুধরাবে না।ʼʼ এগিয়ে গেলেন প্রফেসর।

জয় আনমনেই বলল, “শুধরালে কি আপনার মেয়ে বিয়ে দেবেন আমার সাথে?ʼʼ

স্যার পেছন ফিরলেন, “কচু দেব।ʼʼ

জয় স্যান্ডেলের ফিতা লাগাতে লাগাতে মুখ না তুলেই বলল, “লাগবেনা, ওটা আপনিই জুস করে খাইয়েন, পেট কমবে। আমার এলার্জি আছে, গা চুলকায়।ʼʼ

স্যার কপালে হাত ঠুকলেন! কবীর জিজ্ঞেস করল, “কী করবেন ভাই এখন?ʼʼ

-“তুলির শ্বশুরবাড়ি যাব। কোয়েলকে আনতে যাব, সীমান্ত শালার চুলকানি বাড়ছে। ভালো একটা মলম কিনে নিয়ে গিয়ে একটু লাগিয়ে দিয়ে আসি। জনসেবা করাই তো কাম আমার।ʼʼ

-“ভাই, মাইরেন না ওরে। সামনে কিন্তু নির্বাচন। হামজা ভাই জানলে আমি শেষ।ʼʼ


নতুন একটা বাছাই অনুষ্ঠিত হবে আবার। কিন্তু জয় তাতে অংশগ্রহন করবেনা। হামজা জয়কে বলেছিল, “আমার পদটা তুই নে। নমিনেশন পাইয়ে দেব আমি।ʼʼ

জয় জানিয়েছে, “শখ নেই। এই পদই ভারী পড়তেছে আমার ওপর। এইটাই কখন জানি অন্য কারও ঘাঁড়ে চাপায়ে দেবোনে।ʼʼ

-“মাল-টাল খেয়েছিস? মাথা ঠিক আছে? পদ কি মুড়ির মোয়া তোর কাছে?ʼʼ

-“ভাই! ভালো হওয়া সহজ কাম, ঠিক ততটাই কঠিন হলো ভালো হওয়ার নাটক করাটা। যেটা আমাকে ছাত্রনেতা হিসেবে প্রতিমুহূর্তে করতে হচ্ছে। কোনোরকম অসভ্যতা, অশালীনতা, উশৃঙ্খলতা চলবে না। শালা মার্কা কথা একখান। ক্যান, বাল! আমি যদি আসলে ভালো না হই, তাইলে আমি নাটক করব ক্যা? তাও আবার বিনা পয়সায়। আমি ভালো না, তবুও মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য নাটক করতে হবে? যাত্রাপালার জোকার আমি? এসব ভারী নাম, ভালো মানুষের পদক, কর্তব্যপরায়নতা–এসবে গা চুলকানি আছে আমার। তবুও শুধু রয়ে গেছি ক্ষমতা হাতে রাখার জন্যে। নয়ত এই বালের পদ আমার সাথে যায়না, তুমিও জানো।ʼʼ

হামজা গম্ভীর চোখে তাকালো। হামজার চোখের মণি আলকাতরার মতো কালো রঙা। তাতে যেন চোখের দৃষ্টি আরও সূঁচালো লাগে দেখতে।

জয় বোঝানোর মতো করে বলল, “চ্যাহ! আমার কথা বোঝার চেষ্টা করেন না ক্যা বাল? আমি আমার স্বাধীনতা হারায়ে ফেলছি এই দায়িত্ব পালনে। নেতার মেলা গুণ থাকা লাগে, আমার নাই। প্রতিদিন আরমিণ আমার সাথে যা করে যাচ্ছে, তুমিই কও, ক্যান সহ্য করতে হইতেছে? আমি চাইলেও কষে চারটা থাপ্পড় লাগায়ে কানে ঝিঝি ডাকাতে পারিনা, মন ভরে বকতে পারিনা শালিরে। কারণ, আমি ছাত্রদলের লিডার। চ্যাটের বাল আমার।ʼʼ

হামজা এ ব্যাপারে কিছু বলল না। সতর্ক করল, “বাড়ি থেকে বের হবি না।ʼʼ

-“হলে কী?ʼʼ

হামজা শীতল চোখে তাকাল, “এ কথার খেলাপি হলে নিজের হাতে হাঁটুর হাড় ভাঙবো আমি, তোর। মাজহারের ছেলেরা তিনবেলা নজর রাখছে বাড়ির ওপর। তোর ভাবী ওই বাড়ি যাবে বলে জিদ ধরে বসে আছে। বিকেলে সম্মেলন আছে, একটা হাঙ্গামা হবেই হবে। সাবধান করলাম, বাইরে যাস না।ʼʼ

জয় ঘড়ি দেখল, দশটা বাজছে বেলা। ছাদে গিয়ে কবুতরের খাবার দিয়ে, দুটো কবুতর ধরে আনলো কচি দেখে। তরুকে ডেকে বলল, “পাতলা ঝোল রান্না করতে বলবি। মামি আর আমি খাবো। মামির শরীর ভালো?ʼʼ

-“এখন ব্যথা কম। আপনি কোথায় যাবেন? হামজা ভাই কিন্তু বের হতে নিষেধ করেছে। আমি গিয়ে বলে দেব আপনি বের হচ্ছেন।ʼʼ

জয় চোখ বুলালো তরুর ওপর, “ভাড়ায় চালিত? হামজা ভাই ভাড়া দেয় তোরে আমার পেছনে লেগে থাকতে? কানটা দুই চড়ে গরম করে দেব, সম্বন্ধির চেংরি।ʼʼ

হামজা রুমে এলো। রিমি বিছানার ওপর বসে আছে। গায়ের ওড়নাটা পরিত্যক্ত হালে বিছানায় পড়ে আছে। খেয়ালহীন, উদ্ভ্রান্তের মতো বসে আছে। হামজা গিয়ে বসল সামনে, “সকাল থেকে খাওনি কেন কিছু?ʼʼ

-“আপনার পয়সায় কেনা কিছু খাওয়ার রুচি আসছে না।ʼʼ

হামজা চরম ধৈর্য্যশীল পুরুষ। তবুও যেন ধপ করে আগুন লেগে গেল ভেতরে। তা গিলেও ফেলল মুহুর্তে। হাসল অল্প, “তাহলে কার পয়সায় খাবে? স্বামীর পয়সায়ই তো খেতে হবে তোমাকে।ʼʼ

-“আপনি স্বামী?ʼʼ

-“হিসাবে তো তাই আসে।ʼʼ

-“ওই হিসেব ভুল ছিল।ʼʼ

-“তাই নাকি? তো এখনকার নতুন সঠিক হিসেবটা কী?ʼʼ

-“আপনি জানোয়ার, জংলি পশু, অত্যাচারী, ক্ষমতলোভী কুকুর। আমি আব্বুর কাছে যাব যখন বলেছি, তখন যাবোই। আপনি জানেন আমার জিদকে। আপনাকে চেনাতে ভুল ছিল অনেক।ʼʼ

হামজা নিজে উঠে গিয়ে খাবার আনলো। তা রিমির সামনে রাখতেই প্লেট ধরে গায়ের জোর দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল রিমি। হামজা তাকিয়ে দেখল একবার প্লেটটা। রশিদা খালা দৌঁড়ে এলেন, প্লেট উঠাতে গেলে হামজা বলল, “উহু!ʼʼ

রশিদা তাকালেন। হামজা দু’ধারে মাথা নাড়ল, “আপনি যান। যে হাত থেকে পড়েছে, ওই হাতেই উঠবে। সমস্যা নেই, যান আপনি।ʼʼ

রিমিকে জিজ্ঞেস করল, “কী করবে ওই বাড়ি গিয়ে?ʼʼ

-“দেখবো নিজের চোখে, আপনার মতো জানোয়ারের হাত কোনো বাড়িতে পড়লে সেই বাড়ির হাল কী হয়?ʼʼ

-“চুরমার হয়ে যায়। তা দেখে কী হবে?ʼʼ

ফুঁসে উঠল রিমি, “আপনার একটুও আফসোস নেই এসব নিয়ে?ʼʼ

-“অভ্যাস নেই আফসোস করার। আমি নিজের কাজে কোনোদিন আফসোস করিনি, রিমি। সেটা যতই নিকৃষ্ট কাজ হোক না! আমাদের কাজই বিতর্কিত। এটা পলিটিক্সের পলিসি।ʼʼ

রিমি ডুকরে উঠল। হামজার বুকে কঠিন দুটো ঘুষি মারল, “চোখের সামনে থেকে যান। আপনাকে সহ্য হচ্ছে না আমার।ʼʼ

-“যা করছি দলের প্রয়োজনে। তোমার চাচা আমাকে মারতে চাইলে ভালোভাবে মিটিয়ে নিতাম। কিন্তু সে আমার দূর্বলতা খুঁজে বের করে সেখানে আঘাত করছে বারবার। এটা ভয়ংকর, রিমি। যে তোমাকে নয় বরং তোমার দূর্বলতাকে টার্গেট করে, সে তোমার জন্য জাহান্নামের মতো ভয়ানক। আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে গোপনে, অথচ প্রকাশ্যে আর খারাপভাবে জয়ের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। একবার ট্রাক চাপা দিয়ে, পরের বার ছুরির আঘাত করে। মাজহারের প্রাপ্য ছিল যা, তা পেয়েছে ও। এ নিয়ে তুমি বেশি বেশি করছো। পছন্দ হচ্ছে না ব্যাপারটা।ʼʼ

ঝরঝর করে কেঁদে উঠল রিমি, “আপনি বন্দুক চালাতে জানেন, জানা ছিল না আমার।ʼʼ

-“হাস্যকর।ʼʼ হামজা ঠোঁট বাঁকিয়ে অদ্ভুত ভয়ানকভাবে হাসল, আমি বন্দুক চালাতে পারিনা? এটা তোমার ফ্যান্টাসি, রিম। তুমি আমাকে এক ভদ্রলোক হিসেবে ভাবতে চাও, বাস্তবে যা আমি নই।ʼʼ

-“আপনাকে নিয়ে আমার ধারণাগুলো কাঁচের মতো খানখান হয়ে গেছে। আপনার পিস্তল এই দুই বছর বাদে সেদিন দেখলাম কাবার্ডের গোপন সিন্দুকে তোলা। কেন, হামজা! এইসব লুকোনো রূপ কেন রেখেছেন নিজের মাঝে?ʼʼ

হামজা শক্ত হাতটা রিমির কোমল গালে রাখল, “আরও আছে। যেসব ধারণ করতে তোমাকে কঠিন বেগ পেতে হবে। এখন থেকে প্রস্তুত হও। নয়ত সেসব সহ্য করতে পারবে না।ʼʼ

রিমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, “আমার ভাই ছিল না, মাজহার ভাইয়া আমাকে কোলে-পিঠে চড়িয়ে মানুষ করেছে। আপনি তার পেট ছিদ্র করে রেখে এসেছেন? আপনি মানুষ?

হামজা হাসল, “মানুষই তো। রাজনীতির মানুষ।ʼʼ

-“রাজনীতিতে মানুষ ক্ষমতার জন্য এত নিচে নামতে পারে? আব্বু বা চাচ্চুকে তো নামতে হয়নি এমন! আপনি একটা ধোঁকা, একটা যন্ত্রণা। যা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে, আমি সইতে পারছি না। আপনার মুখ দেখেও বুক ভেঙে আসছে।ʼʼ

হামজা হাসল, “তুমি বোকা, আর সরল, রিমি। তোমার বাপ-চাচা কী করেছে তা তো আর তোমার সাথে আলোচনা সভা ডেকে করেনি! নিজের বাপ-চাচা তোমার কাছে খারাপ হবে না, এটাই স্বাভাবিক। আর রইল কথা, মাজহারের। তো ও তোমাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে বলে তোমার এত মায়া, আর আমি আমার এই হাতে জয়কে মানুষ করেছি, আমার কী? তোমার এই জিদ কোথায় গিয়ে থামবে, কোন কোন মোড় পাড়ি দেবে জানা নেই। তবে এসব ঝেরে ফেলো মাথা থেকে। ওই বাড়ি থেকে যেদিন তোমায় নিয়ে এসেছি আমার নামের কবুল পড়িয়ে, তুমি আমার হয়েছ। অতএব আমাকে ঘিরে চিন্তাধারা থাকা উচিত তোমার। বাপের বাড়ি পর হয়েছে, আমি তোমার জাত-পরিচয় এখন।ʼʼ

রিমিকে কান্নারত রেখেই বেরিয়ে পড়ল হামজা। সাদা ধবধবে পাঞ্জাবীর ওপর ঘিয়ে রঙের মুজিব কোট, বেশ মানিয়েছে শ্যামবর্ণের লম্বা শরীরটাতে। গাড়িতে ওঠার আগে কবীর দ্রুত গিয়ে গাড়ির দরজা খুলতে গেল। হামজা রোদচশমা খুলে বলল, “এসব ফর্মালিটি দেখাবি না আমার সঙ্গে। পছন্দ না আমার।ʼʼ

চারদিকে পোস্টারে ছেয়ে গেছে পথঘাট। মাইকিং চলছে রাস্তায় রাস্তায়। সেসব পেরিয়ে এগিয়ে চলল হামজার গাড়ি পলাশের ডেরার দিকে।

দিনাজপুর শহরের সন্ত্রাস বিস্তারের কর্মসূচি যার হাতে নিয়ন্ত্রিত। রাজন ও তাঁর ভাতিজা পলাশ। হামজার মোটেও ইচ্ছে ছিল না রিমিকে কাঁদিয়ে এসব করার। কিন্তু চাচাশ্বশুর মশাই খুব লাফাচ্ছেন। পাত্তাই দিচ্ছেন না হামজাকে। আজও ক্লাবঘরের জানালার কাঁচ ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে গেছে। গোপন সূত্রে খবর পেয়েছে, জয়কে কেইসে ফাঁসানোর জন্য খুব শক্ত পরিকল্পনায় নেমেছে ঝন্টু সাহেব। সুতরাং পলাশের সাহায্য একান্তই দরকার এসময়। ভোটের আমেজে এলাকা রমরমা হয়ে উঠেছে। আজ বিকেলের সম্মেলনে কিছু লোক লাগবে হামজার। পলাশ দিতে পারবে সেই লোক।


হামজা বেরিয়ে যেতেই জয় বেরিয়ে পড়ল ভার্সিটির ক্লাবের উদ্দেশ্যে। সেখানে ঝামেলা হয়েছে ছাত্র হোস্টেলে কিছু একটা। সাদা লুঙ্গি ও শার্ট পরে তরুকে ডাকল। তরু এলে বলল, “তোর বড় শালটা নিয়ে আয়, এসে আবার দিয়ে দেব। নাকি সমস্যা হবে?ʼʼ

তরু কথা না বলে বেরিয়ে এলো। তার জানটা যেখানে হাজির, সেখানে শালের কথা বলছে। শালটা জয়ই আগের বছর কাশ্মির থেকে কিনে এনে দিয়েছিল।

ভার্সিটিতে ঢুকতেই ছেলেরা ভিড় করে ফেলল জয়কে ঘিরে। এজন্য সাধারণত জয় ভার্সিটিতে ঢোকে মুখে রুমাল বেঁধে, ক্যাপ পরে, পেছনের ঝোপঝাড়ের রাস্তা দিয়ে। সামনে দিয়ে ঢুকলেই সালামের জবাব দিতে আর ছেলেদের ভিড়ে বিরক্তি ধরে যায়। অনেকে হ্যান্ডশেক করতে এগিয়ে এলো। ভালো আছে কিনা, জিজ্ঞেস করল। ছেলেরা পেছনে, সামনে জয় হেঁটে এগিয়ে গেল ক্লাবের পথে। পথে হিন্দু ম্যাডাম শ্যামলী দাসের সঙ্গে দেখা হলো, জয় লম্বা করে একটা সালাম দিলো, “আসসালামুআলাইকুম, ম্যাম।ʼʼ

ম্যাম অল্প হাসলেন। এই কাজটা জয় ইচ্ছে কোরে করে। হামজা থাকলে ধমক দিতো, সালাম নিয়ে ইয়ার্কি ঠিক না। কিন্তু জয়ের কাছে যুক্তি আছে। শান্তি সবার ওপরই বর্ষন করা যায়। তার ওপর জয়ের তো কোনো ধর্ম নেই!

কার্যালয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসল। প্রথমেই এলো একদল সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা শেষে ফাইনাল ইয়ারের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন বিষয় নিয়ে। জয় হিসেব দেখে কাগজটা টেবিলে রেখে বলল, “এতোসব বড়োলোকি আয়োজন করার মানে নেই কোনো। জিলাপি অথবা বাতাসা ছিটিয়ে হরিরলুট দিয়ে দে।ʼʼ

-“ভাই এই একটা কথা?ʼʼ

-“কথা না? কথা কাকে বলে, বলতো? মনের ভাব প্রকাশ করতে যে ধ্বনি বা আওয়াজ গলা দিয়ে বের হয়, সেটাই ভাষা বা কথা। সেই হিসেবে আমারটা কথা ছিল না?ʼʼ

কপাল চাপড়ালো ওরা সব। বোঝা গেল, জয় এ ব্যাপারে আর কথা বলতে আগ্রহী নয়। তার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। মজার ছলে আন্তরিক কথা, আর আন্তরিক স্বরে বানোয়াট ভন্ডামি করা লোক সে।

পেপার ওয়েট নিয়ে খেলতে খেলতে বলল, “হোস্টেলে কী হয়েছে?ʼʼ

একজন বলল, “ভাই.. ভার্সিটিতে গতদিন বিকেলে আপনাকে নিয়ে বিতর্ক লেগেছিল। আপনি নাকি সেকেন্ড ইয়ারের একটা মেয়েকে হ্যারাস করছেন। মেয়েটা কমপ্লেইন করেছে সাধারণ সম্পাদক মুকুলের কাছে। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, আপনি ওকে বাজেভাবে ডিস্টার্ব করেন ভার্সিটিতে আসলে। সাথে..ʼʼ থেমে গেল ছেলেটা। বাকিটা বলতে ভয়।

জয় হেসে ফেলল নিঃশব্দে। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজল ছাদের দিকে মুখ তুলে বিরবির করল, “আরমিণ, আরমিণ, আরমিণ! কী যে করো তুমি? এই তো খেয়াল থেকে বের হয়ে যাচ্ছ, আবার ঠিক কোনো না কোনো বেয়াদবী করে আগুন জ্বালাচ্ছ ভেতরে।

চোখ খুলল, “সাথে? কী রে? থামলি কেন? শুনছি, বলে যা।থামিস না।ʼʼ

ছেলেটার মুখ শুকনো। জয় সোজা হয়ে বসল, “বিক্ষোভ চলছে এই নিয়ে, তাই তো? তোমাদের কী মনে হয়, এতে আমার পদত্যাগ করাতে পারবে তো? এরকম এই নীরব বিক্ষোভ করছে সবগুলো মহিলা মানুষের মতো পেছনে লুকিয়ে? ছ্যাঃ! শালারা হিজড়ার বংশ সব। এদের দিয়ে আদৌ সমাজে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা হবে? এই যে গেইট দিয়ে ঢুকলাম, একটা খোয়া পর্যন্ত ছুঁড়ল না কেউ! বিদ্রোহ-সংগ্রাম পারেনা এরা! অথচ ছাত্র-রাজনীতিতে আছে। লজ্জাজনক! সামনে এসে একটা বকা পর্যন্ত দিলো না কোনো শালা! এই নাকি এরা ছাত্রলীগ, এরা যুবসেবক! শালারা, বালের আন্দোলন শিখেছে। আমি হামজা ভাইকে মানাতে পারছি না পদত্যাগের জন্য। কত দুঃখে আছি। অজান্তে হলেও আমার পদত্যাগ করিয়ে একটা উপকার করতে পারতো ব্যাটাশশালারা, খাস মনে দোয়া দিতাম।ʼʼ

সবার মুখে আতঙ্ক ছেয়ে গেল। জয় আমির পদত্যাগ করতে চায়! এই লোক মজার ছলে কঠিন সত্যি কথা বলে।

জয় ডাকল, “সেজান, কাল সকালে ওদের কার্যালয়ে আনবি। আন্দোলন শেখাবো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো শেখাবো। যাহ।ʼʼ

সকলে হাহাকার করল, “ভাই! আপনি কি পদত্যাগ করতে চান? মানে..ʼʼ

পেপার ওয়েট হাতে তুলে উঠে দাঁড়াল জয়। রাহাতকে বলল, “আগামীকাল একটা সম্মেলন ডাক, সকলে যেন উপস্থিত থাকে। কাল না হলে পরে কিন্তু দেরি হবে। কাল রাতে গাড়ি আমার, ঢাকা থেকে ফিরতে দেরি হবে কয়েকদিন।ʼʼ

বহুদিন, বেশ বহুদিন পর জয়কে কার্যালয়ে পাওয়া গেল সেদিন। রাজনৈতিক কর্মীর মতো সাদা ভদ্র পাঞ্জাবীতে নয়, জয় আমিরকে দেখা যায় তার চিরচেনা ভূষনে। লম্বা শরীরে সাদা ধবধবে থানের লুঙ্গি, একটা শার্ট। তার ওপর শাল জড়ানো। পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল, তার বেল্ট খোলা।

প্রয়োজনমতো ক্ষেত্রবিশেষ বদমাশ, রসিক জয় আমিরের চেহারায় ফুটে ওঠে গম্ভীর এক নেতৃত্ববোধ। অনেকদিন পর কার্যালয় থেকে সে দলবলসহ ক্যাম্পাসে নেমে চক্কর দিলো চারদিকে।

এলএলবি বিভাগের ছাত্রী অন্তূ। সেখানকার হেড হলেন শিক্ষিকা মনোয়ারা রেহমান। জয় অনুমতি চাইল দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে, “আসবো, ম্যাম?ʼʼ

-“এসো।ʼʼ

ম্যাম কিছু লিখছেন। জয় সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত, পরে বলল, “বসতে বলবেন না, ম্যাম?ʼʼ

চশমার ফাঁক দিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে ইশারা করলেন ম্যাম। বসল জয়, “কেন ডেকেছেন? নাস্তা এনেছেন ভালো কিছু? আপনার হাতের পাটিসাপটা খাই না কতদিন, ভেবেই খিদে লাগছে। পানি আছে, ম্যাম? দুটো ঘুমের ওষুধ খাবো। আমার আবার ঘুমের ওষুধ পেটে পড়ার পর কাজ শুরু হতে দেরি হয়। এখন খেলে তবে বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারব।ʼʼ

মনোয়ারা ধমক দিলেন, “সাট-আপ! চুপ করে বোসো।ʼʼ

জয় ঠোঁটে আঙুল ঠেকালো, “ওকে। কিন্তু শুধু চুপ করতে বললেই হতো। বসে তো আমি আছিই।ʼʼ

মনোয়ারা কটমটিয়ে তাকালেন। জয় হাতের পেপার ওয়েটটা টেবিলে ঘুরিয়ে খেলছে। ঠোঁটে বাচ্চাদের মতো দুষ্টু হাসি। মনোয়ারা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

চলবে..

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

১৩.

-“কতটা নিচে নেমেছ তুমি, ভাবো না সে নিয়ে তাই না?ʼʼ

-“ম্যাম! ভাবিনা, তার একটা কারণ আছে। ভাবলে নিচে নামতে কষ্ট হয় অথবা নিচে নামার ইচ্ছেটা আর থাকে না, এইজন্য ভাবিনা।ʼʼ

মনোয়ারা কপালে হাত চাপলেন, “ফাজলামি পেয়েছ? আর একটা বাজে কথা বললে থাপ্পড় মারবো একটা।ʼʼ

-“রেগে যাচ্ছেন কেন?ʼʼ

-“খুশি হবো তোমার বাদরামিতে?ʼʼ

-“খুশি হওয়াই তো উচিত। দুঃখিত হবার কিছু দেখছি না।ʼʼ

-“মানুষ বড় হবার সাথে সাথে বদলায়, তোমার আরও অবনতি হচ্ছে। যখন অনার্সে ভর্তি হলে, ভাবলাম ছোটো মানুষ, শুধরে যাবে। আজ অবধি একটুও শুধরেছো?ʼʼ

-“আপনি খামোখা রেগে যাচ্ছেন, ম্যাম! করেছি টা কী?ʼʼ

-“তুমি জানো না, তাইনা?ʼʼ

-“আমার মাথায় তো জট নেই। ধ্যান-ট্যান করিনা। জানব কীভাবে?ʼʼ

-“তর্ক করছো?ʼʼ

জয় মুখে আঙুল দিলো।

-“তুমি নিজেই বলো তো, একজন ছাত্রনেতার সাথে এরকম অসভ্য কর্মকাণ্ড যায়? ভার্সিটিতে মেয়েরা যদি তোমার কাছেই নিরাপদ না হয়, তাহলে জুনিয়ররা তোমার কাছে কী শিখবে? তোমার শাসন মানবে তারা?ʼʼ

জয় মাথা নাড়ল, “জি না, মানবে না। আমি হলেও মানতাম না।ʼʼ

ধমকে উঠলেন ম্যাম, “চুপ্প, ফাজিল। তোমায় আমি কী করব, জয়? এত দায়সারাভাবে জীবনযাপন কোরো না, কোথায় গিয়ে আঁটকে যাবে, তখন কিন্তু ছটফটানিতে লাভ হবে না বিশেষ!ʼʼ

জয় হাসলো, “ম্যাম, আমি জানি, আমার পরিণতি খুব একটা ভালো না। কিন্তু আমার সেই পরিণতিকে ভয় লাগেনা। এই রোগের ওষুধ নেই?ʼʼ

-“তুমি পাগল, জয়।ʼʼ

-“বেশি না। অল্প।ʼʼ

-“একসময় আসবে আমার কাছে সময় করে, কথা বলব। জীবনে পাপ তো কম করলে না, এখন থামা উচিত নয়?ʼʼ

-“না। থামবো কোন সুখে? ট্যাকা-পয়সা দেবেন থামলে?ʼʼ

মনোয়ারা চুপচাপ চেয়ে রইলেন। জয় আলগোছে হাসল ম্যামের চোখের দিকে তাকিয়ে, “পাপ করতে করতে থামলে মানুষ আর বাঁচে না, ম্যাম। আমি আর কিছুদিন বাঁচবো, ভাবছি। বিয়েশাদী না করে মরা ঠিক না।ʼʼ

মনোয়ারা জয় আমিরের এক হাসিতে ঝলসে গলে গেলেন যেন। জয়ের চোখের দিকে তাকাতে নেই। এটা তিনি মানতেন আগেও। যখন ভার্সিটিতে ছিল, এত্ত সব কুকর্ম করে বেড়াতো। অথচ গালি ঝারলে বা মারলে যে ছেলে রাগেনা, কখনও যে সিরিয়াস হয়না, ঠোঁটের দুষ্টু হাসি অথবা রসিক কথাবার্তা থামেনা, তাকে শাস্তি দেবার উপায় কী?

মনোয়ারা কপট কঠিন স্বরে বললেন, “এখন বলো, কী হয়েছে মেয়েটার সঙ্গে তোমার?ʼʼ

জয় হাঁ করে শ্বাস নিলো। কিছু বলতে প্রস্তুতি নিলো সে। এরপর সুন্দর করে বলল, “রাগারাগি হয়েছে।ʼʼ

-“রাগারাগি হয়েছে? জুনিয়রের সাথে রাগারাগি?ʼʼ

-“আরমিণ আমার প্রেমিকা, ম্যাম! কিন্তু ও এখন আর আমাকে চায়না। কথা বলতে গেলেই, ছ্যাঁত করে ওঠে শালি, এড়িয়ে চলে, এরপর গতকাল আবার অভিযোগ করেছে।ʼʼ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল জয়, “এখন আপনি যদি গিয়ে ওকে এই কথা জিজ্ঞেস করেন, ও এটাও স্বীকার করবে না যে ও আমার প্রেমিকা।ʼʼ

তাজ্জব বনে গেলেন মনোয়ারা, “তোমার প্রেমিকা? তোমার মতো ক্যাঙ্গারুর প্রেমিকা? এসবও বিশ্বাসও করে মরতে হবে?ʼʼ

-“কেন বিশ্বাস করতে পারছেন না?ʼʼ

মনোয়ারা চুপচাপ জয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এরপর না চাইতেও আচমকা হেসে ফেললেন, “তুমি কী ভাবো আমায়? আমি জানিনা তোমায়?ʼʼ

জয় হাসল, “কী জানেন?ʼʼ

মনোয়ারা গম্ভীর হবার চেষ্টা করলেন। অথচ লাভ নেই। তাই তিনি কৌশলে বোঝানোরচেষ্টা করলেন বেপরোয়া ষাঁড়টাকে, “আর জ্বালাবে না মেয়েটাকে। তোমার নিজের রেপুটেশন খারাপ হয়, এই খাতিরেও তো বদমাশি ছাড়তে পারো!ʼʼ

জয় বোঝানোর চেষ্টা করল, “সত্যিই ও আমার গার্লফ্রেন্ড, ম্যাম।ʼʼ

মনোয়ারা কঠিন হতে গিয়েও হাসলেন, “গেটা আউট। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখব এবার। বের হও আমার রুম থেকে।ʼʼ

জয় বাইরে বেরিয়ে এলো হাসতে হাসতে ম্যামের কক্ষ থেকে। আপন মনেই বলল, “আরমিণ! কেন যে এত সহজভাবে নাও আমায় তুমি? কেন? হোয়াই?ʼʼ


পলাশের ডেরা উপজেলার শেষ প্রান্তে। চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ, তার পাশে একটা পুকুর আছে। পুকুরের পেছনে দোতলা বাড়ি, ওপরে শ্যাওলা পড়া রুফটপ টাইপের।

হামজা বসল। পলাশ এলো গায়ে শার্ট জড়াতে জড়াতে। পরনে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট, নেমে আছে কোমড়ের নিচ অবধি।

-“এমন সব সময়ে আসো, এই তো কেবলই গেলাম রুমে। এসব সময় মাঝপথে চলে আসা যায় নাকি?ʼʼ

হামজা বলল, “দরকার বলেই এসেছি। রঙ-তামাশার জন্য রাত আছে, কাজের জন্যই দিন। রাতে তো আমি আসব না, অন্তত কাজের কথা বলতে! তখন এসব কাজ সারবেন।ʼʼ

-“মন বা শরীর তো আর দিন-রাত বোঝেনা। হোটেলে গেছিলি?ʼʼ

-“ওখানে পাইনি বলেই এখানে এসেছি।ʼʼ দু’হাত একত্র করে ঝুঁকে বসল হামজা, “মাজহারের খবর পেয়েছেন?ʼʼ

-“হুম! কাজটা ঠিক করো নাই। বহুত হাঙ্গামা সইতে হবে এর বদলে। অলরেডি কিছু একটা হইছে বলেই আসছো! ঠিক বলছি না?ʼʼ

-“না, ঠিক বলেন নি। তেমন কিছুই হয়নি। তবে হবে বলে আশঙ্কা করছি। আপনি আবার মাজহারকে সাহায্য করছেন না তো?ʼʼ

-“আরে নাহ! আমার কাছে আসে, বসে, দু একটা ফুঁক মারে, চলে যায়।ʼʼ

-“অবাস্তব, পেট বানানো কথা শুনতে এখানে আসিনি, পলাশ ভাই। বাজে কথা রেখে সোজা কথায় আসুন!ʼʼ

-“তো তুই কী চাস আমার কাছে? তোর শত্রুগুলোরে আমার শত্রু বানায়ে ফেলি? এখানে বসে ব্যবসা-কারবার চালাতে গেলে দিনাজপুরের সব রাজনীতিবিদকেই দরকার আমার। আমার কারবারের কাছে আমি আপোস করিনা, জানিস তো তুই।ʼʼ

হামজার জন্য নাশতা এলো। পলাশ খেতে ইশারা করল। হামজা তা উপেক্ষা করে বলল, “আজ যদি মাজহারের লোক কোনো হাঙ্গামা করে, আপনার কারবারেও ভাটা পড়বে। এখানে বসে কলকাঠি নাড়ার সুযোগ আমি দেবোনা বোধহয় আর।ʼʼ

-“ইশ! কথা কোন দিক থেকে কোন দিক নিয়ে যাচ্ছ? আমি শুধু কারও সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাই না। আর এইটাও চাই, তুমি আর মাজহার এক হও। যেহেতু আমারও তোমাদের প্রয়োজন, তোমাদেরও আমাকে। অথচ দুজন এক হইতে পারো না, মাঝে পিষে মরতেছি আমি।ʼʼ

-“অথচ মেয়র হচ্ছি আমি। মাজহারের গোষ্ঠীশুদ্ধ রাজনীতি থেকে উপড়ে ফেলবো। তাহলে ওদের সাথে আপনার সম্পর্ক রাখার বিশেষ দরকার হবে বলে মনে হয় না!ʼʼ

পলাশ সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটে চেপে বলল, “চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।ʼʼ সোফার ওপর শরীরের ভার ছেড়ে বসল।

হামজা শুনলো না বোধহয় সেই কথা, সোজা সাপটা বলল, “আজ সম্মেলনে যদি একটা আওয়াজও আসে ওদের, সামান্য পরিবেশ নষ্ট হলেও আপনার ধান্দার শিকড় একটানে উপড়ে তুলে ফেলে দেব আমি। মাজহার ঢাকায় চিকিৎসারত। ওর ছেলেরা আতঙকগ্রস্থ। অথচ আমি জানি, আপনার লোকজন মাজহারের হয়ে ক্লাবে প্রতিদিন গণ্ডোগোল করতে যাচ্ছে। আপনি ওদের নিষেধ করবেন।ʼʼ

পলাশ চুপচাপ তাকিয়ে রইল একটু হামজার দিকে, পরে গম্ভীর হলো, “আমি ওদের যেতে বলিনি।ʼʼ

-“আমিও আমার ছেলেদের যেতে বলব না। ওরা নিজেরাই দড়ি ছিঁড়তে খুব ওস্তাদ। আর জয়কে তো চেনেন!ʼʼ

-“এত হাইপার হয়ে এই লাইনে টিকবি কেমনে? তুই শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করেই এত তাড়াতাড়ি এইখানে আসছো। এখন আমি যা বলি মন দিয়ে শোনো।ʼʼ

-“সংক্ষেপে শেষ করুন, সময় কম হাতে।ʼʼ

-“জয় কোথায় এখন?ʼʼ

-“বাড়িতে।ʼʼ কথাটা মুখে বললেও মনের ভেতরে খট করে উঠল হামজার। যে ডানপিটে ছেলে, আসলেই বাড়িতে আছে তো? রাগে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল হামজার। সবকিছু অসহ্য লাগছে কেন জানি।

পলাশ বলল, “জয় তোর সাধের গোয়ালের পাগলা ষাঁড়। ওরে তুই ভালো শক্ত দড়িতে আটকাস নাই কোনোদিন। এইজন্য ভুগবি খুব। যতই গুছায়ে রাখতে চাও আব্বা
গোয়ালটারে, পাগলা ষাঁড়টা যতদিন খোলা আছে, তোমার দূর্ভোগের শেষ থাকার কথা না। নির্বাচনের আগে যে কামডা করছিস তুমি, আমি খালি ভাবতেছি ওরা এখনও কেইস ফাইল করে নাই ক্যান তোর নামে? সাবধান থাক, ঝড়ের আগের নীরবতা বলেও একটা কথা আছে। ঝন্টু সাহেব ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত, চিন্তিত। কিন্তু মাজহার সুস্থ হোক, ফিরে আসুক, খেলার দিন গেল না, আসতেছে। নির্বাচন ক্যান্সেল করছিস, ছেলেটারে আধমরা করছিস মেরে। এই সময় ঠিক না এসব।ʼʼ

হামজা চুপচাপ শুনলো। পরে জিজ্ঞেস করল, “রাজন মামা আসবে কবে?ʼʼ

সিগারেট ফেলে দিয়ে বলল পলাশ, রাজধানীর ব্যস্ততা মেলা। ঠিক নেই কবে আসে এক ঝলক।ʼʼ

-“আর কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। মুখের ভেতরে না রেখে বলে ফেলুন।ʼʼ

হামজার কথায় হেসে ফেলল পলাশ, “তোরে আমার খুব ভাল্লাগে, হামজা! একদম সফল গ্যাংস্টার, তুই। তবে আমারে যে পদে পদে দরকার তোর, এইটা ভুলবি না।ʼʼ

পলাশের চোখের রঙ ধূসর, ঠিক বিড়ালের মতো জ্বলজ্বল করে। হাসলে কেমন এক গা ছমছমে ভাব ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে। চেহারাটা অন্যরকম দেখতে। ভ্রুর মাঝখানে ফাঁকা নেই, জোড় ভ্রু, খাঁড়া নাকের ডগায় সূক্ষ্ণ বিভাজনের কারণে নাকটা অদ্ভুত লাগে দেখতে। কথা বলার সময় ঠোঁটে একটা প্যাচপ্যাচে হাসি লেপ্টে থাকে। এই হাসি দিয়েই দিনাজপুরের কালোবাজার জমজমাট চলছে পলাশের হাতে।

হামজা বেরিয়ে এলো। তার মন অশান্ত হয়ে আছে। অস্থির হাতে ফোন করল বেশ কয়েকবার জয়কে। জয় প্রতিটা কল গুণে গুণে কেটে দিলো। ফোন ভাইব্রেট হলো হামজার। রিপন কল করেছে। মিনিট চারেকের মতো শুধু বলল ওপাশ থেকে, হামজা শুনল। মাথায় রক্ত উঠে গেল। সোজা গাড়িতে উঠল বাড়ির উদ্দেশ্যে।

তরু অসময়ে হামজাকে দেখে চমকালো। হামজা রাগে না, খুব শান্ত মানুষ। রাগলে মানুষ থাকেনা, এটাও সত্য।

-“জয়! জয় কই?ʼʼ

তরু কথা বলল না। মাথা নত তার, হাত-পা শিরশির করছে। তরুর নীরবতা হামজাকে ক্ষুব্ধ করে তুলল। হাতের ফোনটা এক আঁছাড়ে চার খণ্ড করল। বকে ওঠে, “জানোয়ারের বাচ্চা! বের হয়ে গেছে? বললাম, বাইরে পরিস্থিতি খারাপ, বের হোস না। বের হইছে আবার ভার্সিটিতে গিয়ে অকামও করা সারা। তোরা কেউ দেখিসনি যখন বের হইছে? দেখিস নি?ʼʼ

তরু ঠকঠক করে কেঁপে উঠল। দৌঁড়ে এলো সকলে।

-“সবগুলা ভ্যাড়াচ্চুদা একেকটা নাকে তেল মেরে ঘুমাও? ওই শুয়োরের বাচ্চা, আজ বাড়ি আসলে… ʼʼ ডাইনিং টেবিলের ওপরে থাকা জগটা এক বাড়িতে মেঝেতে ফেলল। ঝনঝন করে গুড়ো হয়ে গেল সেটা।

হুমায়ুন পাটোয়ারী এগিয়ে এলেন, “কী হইছে? ক্ষেপছিস ক্যান? জয় বাচ্চা ছেলে? ওরে নিয়ে এত ভয় পাওয়া লাগবে? কি শুরু করছিস?ʼʼ

তুলি বের হয়ে এলো, “তোমার ছেলে কি মানুষ, আব্বু? কোয়েলকে আনতে যাওয়ার কথা ছিল, জয় সেখানে গেছে হয়ত!ʼʼ

হামজা তাকালো তুলির দিকে। তুলি চুপ করে গেল। হামজার চোখ দিয়ে রক্ত ছুটে বের হচ্ছে। চোখ বুজে ক্ষেপে যাওয়া গোখরা সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস নিলো নিজেকে শান্ত করতে। সোফার পাশে হাতের ডান সাইডে কাউচের ওপর জয়ের হেডফোন পড়ে আছে। সেটা তুলে ছুঁড়ে মারল শূন্যে। সেটা গিয়ে দেয়ালে লেগে ভেঙে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

হুমায়ুন পাটোয়ারী বললেন, “তুই শান্ত হ। ওর কিচ্ছু হবে না..ʼʼ

দাঁত আঁটকে বলল হামজা, “আব্বু কথা কম বলেন, আপনি। তুলি ভেতরে উঠে যা, যা..ʼʼ গর্জে উঠল হামজা। তুলি চোখ বুজে ফেলল সেই বজ্রকণ্ঠে। তবে নড়ল না।তরুর গা কেঁপে উঠল অজান্তেই। হাতের লোম দাঁড়িয়ে গেছে, শিউরে উঠল শরীরটা।

-“বাইরের পরিস্থিতি সম্বন্ধে ধারণা আছে আপনার কোনো? ফোন লাগান, ফোন লাগান কুত্তার বাচ্চারে। জলদি, জলদি করেন! ফোন কই আপনার, ফোন কই?ʼʼ

হুমায়ুন পাটোয়ারী দৌঁড়ে গিয়ে ফোন আনলেন। ফোন করলেন জয়কে। জয় দুবার কেটে তিনবারের বার রিসিভ করে। হামজা ফোন কানে ধরতে ধরতেই মাড়ি পিষল, “বান্দির বাচ্চা! কই মরতে গেছিস? আজ আমার সামনে আসলে তোর রুহু না বের করে নিই আমি। হারামির বাচ্চা, শালা শুয়োর! কতবার নিষেধ করে গেছি আমি তোরে? পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাড়ি না আসলে খু ন হয়ে যাবি আমার হাতে। জীবিত পুঁতে রাখবো একদম! কথা কানেও যায়না, মাথায়ও ঢোকেনা?ʼʼ

সেই মুহুর্তে ভেতরে ঢুকল জয়। তার কানে ফোন ধরা তখনও। হামজা ফোন নামিয়ে রেখে এগিয়ে গেল জয়ের দিকে। জয় একলাফে সোফা টপকে ওপাশে গিয়ে দাঁড়াল, “ভাই, থামেন বাল। আমি কিন্তু ছোটো বাচ্চা না। কাজ ছিল, বের হইছিলাম। সবার সামনে মারলে বেইজ্জতি হবে আমার।ʼʼ

হামজা তেড়ে ধরতে গেলে জয় ছিটকে দাঁড়াল, “আমারে কি তোমার ভুদাই মনে হয়? ওরা আসবে, আমার ক্ষতি করে চলে যাবে, আর আমি পেছন মারা খেয়ে চেগায়ে পড়ে থাকব ওইখানে?ʼʼ

হামজা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েও পারলো না। বিশ্রী ভাষায় বকলো, “আর একটা কেইস যদি ভরে দেয় তোর পেছন দিয়ে, তারপর? এমনিতে কি চারদিকে প্যারার অভাব? কীসের সম্মেলন ডেকে এসেছিস কালকে? আর মাত্র পনেরো দিনও নেই নির্বাচনের। এই সময় তোকে টলারেট করবো নাকি যা যা ঝামেলা বেঁধে আছে চারদিকে, আরও ঝেপে ঝেপে আসছে, সেগুলো টেকেল দেবো? তোর ঝন্টু আব্বা তোর নামে কয়টা কতরকমের কেইস ফাইল করবে, তোরে ফাঁসি দড়িতে না ওড়নায় ঝুলাবে, আমার নির্বাচন চাঙে না মাচায় তুলবে সেই পরিকল্পনা আঁটছে। ভার্সিটিতে তোর বিপক্ষে আন্দোলন চলছে, নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসছে। শুয়োরের বাচ্চা, এবার ভালো হ। চাপ নিতে নিতে আমার ধৈর্য্যে টান লাগলে সব গুলারে একসাথে কুচি কুচি করে কেটে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেব। একেরকম কর্ম করে রাখো, তা সামাল দেয়ার জন্য একা আমি?ʼʼ

হুট করে হামজা রুখে গেল জয়ের দিকে। গায়ে হাত লাগার আগেই মাঝখানে তুলি এসে দাঁড়াল, “থাম! রাগ উঠলে পাগল হয়ে যাস? মানুষের চামড়া আছে তোর মাঝে? এই জন্যই তো ভাবী তোকে ঘেন্না করে।ʼʼ

হামজা চোখ বুজল, “তুলি সরে যা সামনে থেকে। তোর গায়ে হাত দিতে চাচ্ছি না, আমি। বেশিক্ষণ মনে রাখতে পারবো না, তুই মেয়ে মানুষ।ʼʼ

-“ভুলে যা। পারলে ভুলে গিয়ে মার আমায়। ওর শরীর ভালো? তুই ওকে মারতে যাচ্ছিস, তার আগে নিজের দিকে দেখ। সব ভুল ও-ই করে, তোর কোনো ভুল নেই? তুই তোর চাচাশ্বশুরকে নির্বাচন থেকে বাদ করেছিস কেন? এখন ওরা ক্ষেপে গেলে সামাল দেয়া কষ্ট হচ্ছে, তার ভাগ জয় কেন নেবে? তুই ক্ষমতার লোভে বহু আগে জানোয়ার হয়ে গেছিস, জয়কেও বানিয়েছিস। শোধ। এ বাড়ির কোনো পুরুষ বা মেয়েলোকটা ভালো? কেউ কাউকে কাঁদা ছোঁড়ার নেই।ʼʼ

হামজা সরে এলো। জয়ে সোফা টপকে হামজার সামনে এসে দাঁড়ায়, “ভাই!ʼʼ

হামজার কাধের দুপাশে নিজের দু হাত জড়িয়ে পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসিয়ে দিলো হামজাকে। এরকম নির্লজ্জের সামনে চেয়েও হামজা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনা আর। মুখ কঠিন করে ভারী শ্বাস ফেলতে লাগল।

জয় পা ফাঁক করে বসল সোফাতে পাশেই, “ঠান্ডা হও, তুমি। সব ঠিক আছে। যা হয় দেখা যাবে। কিছু না হতেই তা হবে আশংকা করে যদি অশান্তি করো, তাইলে না হওয়া অবধি যে শান্তিটুকু পাওয়ার ছিল, সেটা থেকেও তো বঞ্চিত হচ্ছি আমরা।ʼʼ

হামজা দাঁত খিঁচল, “ফাক ইওর প্লেসান্ট্রি!

জয় হামজার কোলে মাথা রেখে শুয়ে বলল, “ফাক ইউ টু ব্রো।ʼʼ

হামজা মাথা এলিয়ে বসল, “তুই কী করেছিস আরমিণের সাথে?ʼʼ

-“খবরদার ভাই, একদম এসব মেয়েঘটিত বিষয়ে জড়াবে না আমায়। আমি ভার্জিন ছেলে, ভালো ছেলে। তুমি আরমিণকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করো, ও আমার সাথে কী করেছে?ʼʼ

সকলের কানে বোমা ফাটলো যেন। তরু ভ্রু কুঁচকাল, আরমিণ আবার কে? কোন মেয়ে জয়ের সাথে কী করেছে? হামজা বলল, “কীসব বাজে কথা বলছিস? ও কী করবে তোর সাথে?ʼʼ

-“আমি কিছু না করে ভুল করছি। শালী, আমার নামে অভিযোগ করছে, আমি নাকি ইভটিজিং করি ওকে। কসম, এখন অবধি ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখিনি। মুখটাই দেখছি ভুলেভালে একবার। পাগল-ছাগল চেংরি, ইভটিজিংও বোঝেনা।ʼʼ


চাঁদনীর সাথে আবার দেখা করতে গিয়ে সেদিন ওদের পায়নি অন্তূ। ঘর-বাড়ি আছে, মানুষ নেই। আজব ব্যাপার। আঁখির লাশ মাটি হয়েছে দুই সপ্তাহও হয়নি। হতে পারে হামজারা উচ্ছেদ করে দিয়েছে ওদের।

আশেপাশের বাড়িতে খোঁজ করতে যেতে পারেনি সংকোচে। পাশেই হামজার ক্লাব। পুরো এলাকা পোস্টারময়। গাড়িতে গাড়িতে মাইকিং চলছিল। বিশ্রী অবস্থা।

শহরের ভেতর ঢুকে ভীষণ অস্বস্তি হলো অন্তূর। আব্বু ছাড়া একা চলার অভ্যাস নেই।

চার মাস আগে দুটো ছাত্র পড়াতো। নিজের ব্যস্ততায় এবং আমজাদ সাহেবের নিষেধে বাদ দিয়েছিল। একজনের কাছে দুই মাসের বেতন পাওনা ছিল। তা কোনোদিন চাইতে যায়নি অন্তূ। সেদিন ফেরার পথেই তাদের বাড়ি পড়েছিল। মহিলা দেখতে পেয়ে খুব খাতির করে ভেতরে বসিয়ে নাশতা করিয়ে সেই টাকা জোর করে হাতে ধরিয়ে দিলেন।

অন্তূর ফুরফুরে লাগছে মনটা! পুরুষেরা ভাবে, তারাই বোধহয় শুধু বেকারত্বে পিষে মরে, শখ-আহ্লাদ পূরণের ব্যর্থতায়। তারা বুঝবে না, মেয়েরাও স্বপ্ন দেখে নিজের যোগ্যতার জোরে হালাল উপার্জনের টাকায় দুটো মানুষের হাতে কিছু তুলে দিয়ে তাদের কপট রাগের স্বীকার হতে।

এখন অন্তূ পুরো টাকাটা দিয়ে একটা দামী রোলেক্স ব্রান্ডের ঘড়ি কিনে নিয়ে যাবে আব্বুর জন্য। আব্বু হাসবেন না, একটুও না, বরং গম্ভীর হয়ে বলবেন, “বেশি বড় হয়ে গেছিস? এসব আনতে কে বলেছে? তোর এটা নেই, সেটা নেই। এটা দিয়ে কিনে নেয়া যেত না? যা নিয়ে যা তোর ঘড়ি, লাগবে না আমার। আমি ঘড়ি পরি না এখন আর।ʼʼ

অন্তূ চুপচাপ রেখে চলে আসবে। তৎক্ষণাৎ ঘড়িটা হাতে তুলে নেবেন আমজাদ সাহেব। উল্টে-পাল্টে দেখবেন, অল্প-বিস্তর হাসবেন। সেই হাসিও যেন গম্ভীর দেখাবে। এরপর হাতে পরবেন ঘড়িটা। আবার খুলে রেখে দেবেন পুরোনো আলমারির ডান পাশের ড্রয়ারে।

ঘড়ি কেনা শেষে ফেরার গাড়ি থামালো অন্তূ। চালক বলল, “আপা, ওঠেন। তাড়াতাড়ি ওছেন, ট্রাফিক শালারা বেশিক্ষণ দাঁড়াইতে দেয়না এইখানে।ʼʼ

গাড়ির ভেতরে ঠেসেঠুসে বসার মতো কোনোমতো জায়গা রয়েছে। সব যাত্রী পুরুষ।

অন্তূ বলল, “পরের গাড়িতে চলে যাব, যান আপনি।ʼʼ

-“আরে আপা! সমস্যা কী? সবার ঘরেই মা-বোন আছে। এরা কেউ আপনার ভাই, কেউ বাপের মতোন। বসেন, তাড়াতাড়ি চলে যাই।ʼʼ

অন্তূ হাসল, “জি একদম সঠিক কথা বলেছেন। বেগানা বলে শুধু একটা শব্দ রয়েছে, এর কোনো যুক্তি নেই। হুদাই এই শব্দটার উৎপত্তি। কারণ, যেহেতু বাড়িতে মা বোন সবার রয়েছে, সুতরাং বাইরের সবাই সবার মা-বোন। এতে সন্দেহের অবকাশ নেই–পৃথিবীতে সবাই সবার মা-বোন। তো ভাই, আপনি আপনার কোন মা বা বোনকে বিয়ে করেছেন? জায়েজ হয়েছে তো বিয়ে?ʼʼ

-“ফাজলামি করার জায়গা পান না। নাটক? এইসব ঘোমটার তলে যে খেমটা চলে, তা তো লোক জানেনা? রাস্তাঘাটে বের হন ক্যান তাইলে? এত যখন দেমাগ, তখন উড়োজাহাজে চড়ে পথঘাটে চললেই পারেন।ʼʼ

অন্তূ মাথা নাড়ল, “আপনার পরামর্শ আমি মনে রাখবো, ভাই। এরপর যতদিন উড়োজাহাজ কিনতে অথবা যার তার পাশে গা লাগিয়ে চট করে বসে যেতে না শিখি, ততদিন আর বের হবো না।ʼʼ

লোকটা কিছু বলতে উদ্যত হতেই অন্তূর কণ্ঠস্বরের শীতলতা পিল্টে কঠিন, দৃঢ় হয়ে উঠল, “যান, দাঁড়িয়ে থাকবেন না আর।ʼʼ লোকটা আবার কিছু বলতে নিতেই অন্তূর কথার বিচ্ছুরণ তীব্রতর হলো, “আমি আপনাকে নিমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়ে আসিনি, আমার কথাগুলো শোনার জন্য। আপনি এসে দাঁড়িয়েছেন, কথা তুলেছেন। যান…যান।ʼʼ নাকের পাটা শিউরে উঠল অন্তূর, চোখ তির্যক হলো।

গাড়িওয়ালা চলে গেল, অন্তূকে বাজে ভাষায় গালি দিতে দিতে। অন্তূর কানে এলো, গায়ে লাগল না। সে এদিক-ওদিক তাকাল। দৃষ্টি থামলো। অন্তিক রাস্তা পার হচ্ছে। সাথে একটা কালো কুচকুচে লোক। ভয়ংকর চেহারা-সুরৎ। গলায় কমপক্ষে বিশ-পঁচিশ রকমের চেইন। হাতে বালা, ঘাঁড়ে ট্যাট্টু। অন্তিকের মুখ-চোখ শুকনো। যে ছেলে কোনোদিন আম্মা অল্প ধমকে কথা বললে, সাতদিন হোটেলে খেত। তাকে লোকটা শাসিয়ে কথা বলছে বোধহয়, অন্তিক বাধ্যগতের মতো মাথা নাড়ছে, খুশি করার চেষ্টা করছে লোকটাকে। অন্তূ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। অন্তিক আর অন্তিক নেই, জীর্ণ-শীর্ণ এক ভিখীরি দেহে পরিণত হয়েছে। চোখের নিচটা কালো, মুখে মলিনতা।

চলবে..

[ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।]