অবরুদ্ধ নিশীথ পর্ব-১৪+১৫+১৬

0
20

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

১৪.

সেদিনের ঝামেলা মিটিয়েছে হামজা। জয়কে আর ভার্সিটিমুখো হতে দেয়নি। সে গিয়ে প্রিন্সিপাল এবং সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে ছোট্ট একটা মিটিং করে ঝামেলা মিটিয়ে এসেছে। তা কতটা মিটেছে, জানা নেই।

রাতের গাড়ি জয়ের। সে ঢাকা যাবার সময় কোনোদিন কার ব্যবহার করেনা, বাসে যায়। এতে তার ইন্টারেস্টটা কী, তা জয় জানে ভালো।

রাত দশটার সময় দুজন হোটেলে বসে আরাম করে খেল। এরপর দুটো সিগারেট ধরালো। জয় সিগারেটে টান দিয়ে হামজাকে বলল, “আমি তিন দিনের ভেতর ফেরার চেষ্টা করবো। তুমি ছেলেদের এলার্ট থাকতে বোলো। আর এত চিন্তা কোইরো না, হুদাই। তোমার যে প্রতিদ্বন্দী গুলা ভোট করতেছে, তাদের লোক টাকা নিয়েও ভোট দেবে না। একটাই অপশন তাদের কাছে, তুমি। মাজহার সুস্থ হতে হতে ইলেকশন শেষ হয়ে যাবে। খুব খারাপ কিছু হবেনা।ʼʼ

হামজা কথা না বলে সিগারেট ঠোঁটে নেয়। বের হবার সময় জয় একটা পরনে হাফ-স্লিভ টিশার্ট পরেছে। জ্যাকেট অথবা গরম কাপড় কিছু নেই। ওভাবেই দৌঁড়ে ছাঁদে গেল। কবুতরের ঘরে পানি দেয়া দরকার। সে চলে গেলে তরু কতটুকু যত্ন করবে এদের, তা বলা যায়না। ফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে ভালোভাবে দেখল কবুতরগুলোকে। একা একাই দু-চারটা কথাও বলল কবুতরদের সাথে। নেমে এসে তরুকে শাসালো, “কবুতরদের যেন ঠিকমতো পযিচর্যা করা হয়। নয়ত বাড়ি ফিরে সবগুলোকে লাত্থি মেরে বের করবো বাড়ি থেকে।ʼʼ

ঘড়িতে সাড়ে দশটা বাজে। বের হওয়ার আগ মুহুর্তে রিমির কথা মনে পড়ল। ওকে একটু জ্বালানো দরকার বের হওয়ার আগে। রিমি কাপড় ইস্ত্রী করছিল। জয় লম্বা করে একটা সালাম দিলো। যেন কতদূর থেকে মেহমান এসেছে। রিমি তাকালো, কথা বলল না।

-“রেগে আছেন কার ওপরে, আমার ওপরে?ʼʼ

-“রেগে কেন থাকব?ʼʼ

-“মহিলা মাইনষের রেগে থাকার জন্য বিশেষ কারণ দরকার হয়না।ʼʼ

রিমি ঠ্যাস দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আপনি যখন বলছেন তখন তাই। আফটার অল মেয়েলোকের ব্যাপারে খুব জানাশোনা আছে আপনার।ʼʼ

গায়ে মাখলো না জয় কথাটা, প্যাচপ্যাচে হাসি হাসল, “আছে বলেই তো বলছি। সে যাক গে, পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। আপনার আল্লাহ নামের একটু দোয়া কালাম পড়ে ফুঁ-টু দিয়ে দ্যান। আমার তো মা-টা নাই, দোয়া-টোয়া চাইবো কার কাছে?ʼʼ

-“আপনার আবার দোয়া লাগে নাকি? আপনি দোয়াতে বা আল্লাহতে বিশ্বাস করেন?ʼʼ

জয় কথা বলল না। রিমি বলল, “মা নেই, মামি তো আছে! তার কাছে দোয়া চান গিয়ে।ʼʼ

জয় বসল বিছানার ওপর, “ভাবী! ভাই এমনিতেই খুব টেনশনে আছে। বোঝেন তো, কত দিকের চাপ। ইলেকশনের ঝামেলা তো বোঝার কথা আপনার, তার ওপর চারদিক বহুত ফ্যাসাদ লেগে আছে। এই সময় ভাইয়ের দরকার আপনাকে। অথচ সপ্তাহ হয়ে গেল, আপনি কথা বলেন না, কোনো কিছুতেই আপনার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, তার ওপর দিয়ে কী চলে যাচ্ছে। এখন খুব করে তার আপনাকে দরকার। আপনি তার বউ, তার পেরেশানী দূর করতে আপনার বিকল্প নেই। রাগ করে থাকবেন না এখন আর। আমিও থাকবো না কয়েকদিন ভাইয়ের পাশে। আপনিও মুখ ফিরিয়ে থাকলে…

এবারে গলার নরম স্বর পরিবর্তিত হয়ে জয়ের নিজস্বতা এলো, “সমস্যা বা ঝামেলা যদি আমায় নিয়ে হয়, আমি তো আর ক্ষমা-টমা চাইব না, জানেনই। অথবা আফসোসও করবো না। আপনি কীসের আশায় রেগে থাকবেন তাহলে? অন্তত যতদিন বেঁচে আছি, এভাবেই চলবে হয়ত। তাই বলে তো আর চিরদিন রেগে থাকতে পারবেন না। তো ক’দিন আগ আর পিছ। কেননা, এখনই ঠিক হয়ে যান। আমি জিনিসটাই এমন, ভাবী। যেখানেই আমার অবস্থান, তার আশপাশে কিছু না কিছু ক্ষয় হয়-ই। এটা আমার নিজস্বতা বলা চলে। মেনে নিন। আসি, ভালো থাকবেন।ʼʼ

অকপটে নিজের অশিষ্টতা স্বীকার করে বের হয়ে গেল জয়। হামজা বাইরে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোফার হাতলে ঝোলানো শাল চাদরটা ওড়নার মতো গলায় পেঁচিয়ে নিলো।

বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দুটো টিকেট কাটলো হামজা। পুরো দুটো সিট জুড়ে একা লাগে জয়ের। পাশে চায়ের দোকানে বসে দুজন দু-কাপ চা খেল। এক প্যাকেট সিগারেট কিনে নিলো জয়। ঘাঁড়ে গামছার মতো ইয়ার-ফোন ঝুলছে। বাসে ওঠার আগে হামজা জয়কে অন্ধকারের দিকে নিয়ে গেল। ওদিক-ওদিক তাকাতে তাকতে জয়ের হাতে চাদরের আড়ালে তার সেমি-অটোমেটিক পিস্তলটা তুলে দিলো। জয় বিরক্ত হলো, “এই শালার কী দরকার? ও আমার হাতে থাকলেই একটা পাপ কাজ হয়ে যাবে। তার চেয়েও বড় কথা, আমি বিপদক্ষেত্র থেকে দূরে যাচ্ছি। তুমি থাকবে এখানে, মালটা তোমার দরকার হবে।ʼʼ

হামজা গম্ভীর স্বরে বলল, “চুপচাপ এটা প্যান্টের বেল্টে গুঁজে ফেল। আমার বাপ হওয়ার চেষ্টা করবি না। আর এটা তোকে পাপ করার জন্য নয়, বরং সেল্ফ-ডিফেন্সের জন্য দিচ্ছি। এই বাসেও তোর সাথে মৃত্যুদূত যেতে পারে। বাসে ঘুমিয়ে পড়িস না যেন। ইয়ারফোনের সাউন্ড হাই রাখবি। পরীক্ষা শেষ করে এক ঘন্টাও ওখানে দেরি করবি না। সোজা দিনাজপুরের বাস ধরবি।ʼʼ

কথা শেষ করে একটা ছোট্ট পকেট ছুরি এগিয়ে দিলো হামজা, “এটা পকেটে রাখ। ভালোভাবে পরীক্ষা দিস। এসব কোনো চিন্তা মাথায় রাখার প্রয়োজন নেই। পরীক্ষা খারাপ হলে আমার কাছে জায়গা হবে না, তোর। সুতরাং, সম্পূর্ণ মনোযোগ যেন শুধু পরীক্ষায় থাকে। বাসের জানালা খোলা রাখবি না। আর টি-শার্টটাই বা পরেছিস কেন? ওটা সহ প্যান্টাও খুলে ফেল। খুব গরম পড়ছে তো, পৌষ মাস বলে কথা, চারদিকে খুব গরম।ʼʼ

জয় হেসে ফেলল নির্লজ্জের মতো, “জ্যাকেট আনিনি সাথে। আমার শীত লাগেনা, জানোই তো। কবীরকে বলে দিয়েছি, ও সবসময় সাথে থাকবে তোমার। মামাকে রাত-বিরাত বের হতে দিও না।ʼʼ

হামজা নিজের জ্যাকেটটা খুলে ফেলল। জয় নিষেধ করার সাহস পেল না। এই পাবলিক প্লেসে হামজা ঠাস করে একটা চড় মারলে, মান-ইজ্জত থাকবে না। জ্যাকেটটা কনুইতে বাঁধিয়ে, পিস্তলটা প্যান্টে গুজে চাদর জড়িয়ে নিলো গায়ে। বাসে উঠতে গিয়ে আবার দৌঁড়ে ফিরে এলো, “লাইটার বা দিয়াশলাই কিছুই নাই আমার সাথে। লাইটারটা দাও।ʼʼ

হামজা লাইটার বের করলে তা হাতে না নিয়ে আলতো করে একবার বুকে বুক মেশালো জয়। পরে লাইটার নিয়ে দৌঁড়ে গিয়ে সবে চলতে শুরু করা বাসে উঠল লাফিয়ে।


পরদিন অন্তূর ‘ইন্ডাক্টরি এনথ্রোপলজিʼ পরীক্ষা। অন্তূর মনেহয় নৃবিজ্ঞান হলো সবচেয়ে বাজে সাবজেক্ট সমাজবিজ্ঞা বিভাগের। বাকিগুলোও ভালো না, তবে এটা অসহ্যকর।

অনেকক্ষণ যাবৎ আম্মু ডাকছে খাওয়ার জন্য। অন্তূ ঠিকমতো জবাবও দিতে পারেনি। দরজার বাইরে থেকে অনুমতি চাইলেন আমজাদ সাহেব, “আসবো?ʼʼ

অন্তূ বিরক্ত হলো, “আব্বু, এই স্বভাবটা যাবেনা তোমার? আমার ঘরে ঢুকতে কীসের অনুমতি?ʼʼ

আমজাদ সাহেব বরাবরের মতো জবাব না দিয়ে ভেতরে এসে দাঁড়ালেন, “চল, আমি খেতে বসব।ʼʼ

-“আচ্ছা, তুমি খেয়ে নাও, আমি সময় পেলে খেয়ে বের হবো।ʼʼ

-“আমি খেতে বসবো।ʼʼ

-“আব্বু! আমি পরে খাচ্ছি। ক্ষুধাই লাগেনি, মানে রুচিই পাচ্ছিনা।ʼʼ

ধমকে উঠলেন আমজাদ সাহেব, “কিন্তু আমি এক্ষুনি খেতে বসবো।ʼʼ

অন্তূ হার মানলো। তাকিয়ে থাকলো আব্বুর দিকে। ঘিয়ে রঙা শাল জড়ানো লম্বাটে চেহারা, চাপ দাড়িতে মেহেদী। আমজাদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তাকিয়ে আছিস কেন?ʼʼ

-“একটু বসো তো আব্বু।ʼʼ ছিটিয়ে থাকা বই খাতা সরিয়ে দিলো অন্তূ।

আমজাদ সাহেব বসলেন, জিজ্ঞেস করলেন, “এভাবে চেয়ে আছিস কেন? কী হয়েছে? প্রস্তুতি ভালো তো?ʼʼ

অন্তূর খাতা এগিয়ে নিলেন। তাতে চোখ বুলিয়ে বললেন, “লেখার লাইন এখনও ঠিকমতো সোজা হয়নি।ʼʼ

হাসল অন্তূ, “আমি সোজা হয়েছি?ʼʼ

-“আমি বেত হাতে করা বাদ দিয়েছি যে।ʼʼ

অন্তূ হেসে ফেলল, “বেত হাতে করলে, ইশ! খামোখা ভয় পেতাম। তখন যদি বুঝতাম তুমি শুধুই ভয় দেখাতে বেত দেখাচ্ছ, এত ডিসিপ্লিনড, ভালো মেয়ে হতাম না আমি, প্রমিস!ʼʼ

হেসে ফেললেন আমজাদ সাহেব, “এখন বেত হাতে তুললে ঠিক মারবো। চল, তোর আম্মা বসে আছে। দেরি হলে একটা ছোট-খাটো ঘৃর্ণিঝড় বয়ে যাবে।ʼʼ

-“একটা প্রশ্ন করব?ʼʼ

-“না, আগে খেতে চল। ধান্দাবাজি আমার সাথে না। না খেয়ে পরীক্ষা দিতে যায় কেউ?ʼʼ

অন্তূ চেয়ে রইল কিছুক্ষণ আব্বুর দিকে। চোখ দুটো সজল হয়ে উঠল, অল্প পানি ছলছল করে উঠল। হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন, হিমুরা পকেটে টাকা নিয়ে ঘোরে না। অন্তূ সেটাকে নিজের মতো করে বলে, অন্তূরা কান্না করে না। আজও একবার নিজেকে কথাটা বলে গলাটা কড়া করার চেষ্টা করল, “আব্বু! সবার আব্বু তোমার মতো হয় না, তাই না?ʼʼ

হাসলেন আমজাদ সাহেব, “আমি কেমন রে, অন্তূ?ʼʼ

অন্তূ বুঝি বলতে পারে মুখে এ কথা? তার কান্না পাচ্ছে। কিন্তু অন্তূরা কাঁদে না। সে কান্না গিলে বলল, “মোটামুটি ভালো না।ʼʼ

ফের হাসলেন আমজাদ সাহেব, “আমি জীবনে বিশেষ কিছুই দেইনি তোকে, শুধু নিজের কর্তব্য পালন করার চেষ্টা করেছি, শেষ অবধি সেটাও সুষ্ঠুভাবে পারিনি। সেসব ধরে রাখিস না। আমার তো মা নেই, তোকে মাঝেমধ্যেই ‘মা, মা’ বলে ডাকি। এই সুযোগটা কেনার সামর্থ্য আমার নেই। তুই বিনামূল্যে দিয়ে রেখেছিস। তার বদলে কী দিতে পেরেছি তোকে?ʼʼ

অন্তূ সহ্য করতে পারল না। বুকের ভার বাঁধ মানবে না বেশিক্ষণ। চোখ বুজে অনুরোধ করার মতো বলে উঠল, “চুপ করো, আব্বু! চুপ করো, আব্বু। ʼʼ

নিজেকে সামলালো। আব্বুর দিকে তাকিয়ে অন্তিকের কথা মনে পড়ে মুখ মলেন হতে গিয়েও হলোনা। যারা কম হাসে, তাদের হঠাৎ হাসি মিলিয়ে দেয়ার সাহস অন্তূর নেই, বিশেষ করে আব্বুর।

হুট করে আব্বুর উরুতে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। এভাবে ছোটোবেলায় সে আব্বুর উরুতে মাথা রেখে পড়া শিখতো আব্বুর কাছে। ওভাবেই ঘুমিয়ে গেলে, আমজাদ সাহেব আবার ডেকে তুলতেন জোর করে খাওয়ার জন্য। নিষ্ঠুর লাগতো তখন আব্বুকে। কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে ভাত খাইয়ে দেয়া। সকালে টেনে তুলে স্কুলে নিয়ে যাওয়া। অন্তূ রাস্তাটা কোনোদিন আব্বুর হাত জড়িয়ে ধরে পার হয়নি, একটা আঙুলের মাথা ধরতো। পুরো হাত ধরলে সে আব্বুর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। অথচ আব্বুর হাতের আঙুল ধরা ছাড়া পাড় হতে সে জানেনা।

আমজাদ সাহেব অন্তূর উস্কো-খুস্কো চুলে আলতো হাত রেখে বললেন, “চল, খেয়ে নিই। তোর মা আজ বাড়িছাড়া করবে আমাদের।ʼʼ

হঠাৎ-ই নিজের জীবনে আব্বু সত্ত্বাটার সমস্তটুকু উপস্থিতি যেন বুকের ভেতর এক থলে তরল আবেগ হয়ে জমেছে, ভার অনুভূত হচ্ছে বুকের ওপর সেই তরল। চোখ ফিরিয়ে নিলো। বইখাতা গোছাতে গোছাতে আনমনে নিজের স্বভাবসুলভ দৃঢ় গলায় বলল,

-“আব্বু! শোনো, তুমি আবার কোনোদিন আমায় রেখে চলে-চলে যেও না, বুঝলে? আমি কিন্তু রাস্তাটা পার হতে শিখিনি এখনও। তুমি না জোর করলে খেতে যাওয়ার অভ্যাসটাও হয়নি এখনও। আরও অনেক সমস্যা।ʼʼ

আমজাদ সাহেব কেমন করে যেন হাসলেন, “শিখে যাবি সব। মানুষ অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন প্রাণী, অন্তূ। সামাজিক কোনো মানুষকে জঙ্গলে ফেলে আসলে সে চার পায়ে চলতে অবধি শিখে যায় বেঁচে থাকার তাগিদে।ʼʼ

অন্তূ দিশেহারা হয়ে তাকায়, অস্ফূট ডাকে, “আব্বু!ʼʼ

থেমে আবার ডাকে, “তোমার যাওয়ার হলে আমায় সঙ্গে নেবে, প্লিজ? আমি আত্মনির্ভরশীল। কিন্তু তোমার আঙুলের ডগা আঁকড়ে ধরি যে অংশ দিয়ে, ওইটুকু তো ফাঁকা। তোমার আঙুলটাকে সর্বক্ষণ খুব দরকার আমার।ʼʼ

অন্তূর কণ্ঠে শাসনের স্বর, অথচ গলাটা গুলিয়ে আসছে, থরথরিয়ে কাঁপছে ঠোঁটদুটো, একসময় এবার থুতনিটা ভেঙে এলে অন্তূ অন্যদিকে ফেরে।

আমজাদ সাহেব প্রাণভরে মুচকি হাসলেন। হাই স্কুলের প্রবীণ প্রিন্সিপাল একবার বলেছিলেন, “বুঝলে আমজাদ! অন্তূ হলো তোমার ফটোস্ট্যাট কপি। কিন্তু বোধহয় মেশিনের গড়বরে ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়ে গেছে।ʼʼ

অন্তূরা জানেনা বাপেরাও অন্তূর মতোই। মুখ ফোটে না তাদের।
-“কেউ চিরকাল থাকেনা, অন্তূ। যিনি থাকবেন, তিনি তোর রব। আমি কেবল মাধ্যম একটা। আর তুই আমার আমানত। এই ক্ষণস্থায়ী সাক্ষাতে এত মায়া লাগাতে নেই, অন্তূ। মায়া মূর্খদের দেহে পরজীবীর মতো বাস করে। শুষে শুষে খেয়ে ফেলে তাদের জীবন রসকে। তুই তা নিজের ভেতরে রাখবি না।ʼʼ

অন্তূ নিজের ওপর বিরক্ততে নাক-মুখ কুঁচকে, শক্ত গলায় বলল, “আব্বু! হুট করে এত বুকে হাহাকার লাগছে কেন, বলতো!ʼʼ

আমজাদ সাহেব হেসে হাত নেড়ে ইশারা করলেন, “এদিকে আয়।ʼʼ

অন্তূ মেঝেতে বসে আব্বুর উড়ুতে মাথা ঠেকায়। কখনও এভাবে প্রকাশ করা হয়নি এসব, আজ ঠেকানো দায় হচ্ছে।

অন্তূর মাথায় হাত রাখলেন তিনি, “আমি আছি। যতদিন আছি, আমি আছি। আমি না থাকার কালে যা আসবে তোর ওপর, তার দায় আমায় দিস না। সাধারণ এক মানুষ হয়ে এত ওজন বয়ে নিতে পারবো না আমি।ʼʼ

অন্তূর মুখ তুলল।

তিনি হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন অন্তূর, যেন অদম্য এক সাহস তিনি অন্তূর ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালালেন, “আমি থাকব না চিরকাল। কিন্তু তোকে নিজের জীবদ্দশা কাটিয়ে তবে রবের কাছে ফিরতে হবে। জীবন একটা চক্র, জীবন একটা রণক্ষেত্র। সেখানে তোর হাতিয়ার হলো, আত্মবিশ্বাস আর ঢাল তোর ধৈর্য। এই দুটোকে সবসময় শাণ দিয়ে পিঠে সজ্জিত করে রাখবি। মনে রাখবি, ধৈর্য নামক ঢালটা যেন বেশ পুরু হয়। ছোটোখাটো আঘাতে তার কণাগুলো ছিটকে না যায়। যে পথে পা বাড়াতে চলেছিস, এই সমাজ তোকে ভালো রাখবে না, অন্তূ। ভালো থাকাটা ঠিক আমারও পছন্দ নয়, কারণ যেখানে এই জগৎসংসারে ভালো থাকার একমাত্র অপশনটা হলো, অন্যায়ভাবে জীবনযাপন। সেখানে ন্যায়কে অবলম্বন করে ভালো থাকতে চাওয়ার বোকামি আমি করিনি। তাই তোকেও আর বাঁধা দিইনি এই দুর্গম পথে এগিয়ে যাওয়া থেকে।ʼʼ

আমজাদ সাহেব হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “সবসময় মনে রাখবি, যা ঘটছে, তা ভয়ংকর নয়। কারণ তা তোর সামনে রয়েছে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে তা মোকাবেলা করতে পারবি তুই। কিন্তু ভবিষ্যতে যা ঘটবে তা সম্বন্ধে তোর কিঞ্চিৎ ধারণা নেই, সুতরাং সেটা হলো বেখবরে উঠে আসা তাণ্ডবপূর্ণ ঝড়। যার পূর্বাভাস বা সচেতনতা নেই তোর কাছে। আর যা সম্বন্ধে জানিস না, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না, তাই সেটা ভয়ানক। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যা আসছে তার তুলনায় সামনে থাকা বিপদ খুব নগন্য, দূর্বল এক ফাঁড়া মাত্র। ভবিষ্যতের অজানা বিপদের চেয়ে এটা দূর্বল, আর এই দূর্বল বিপদের চেয়ে তুই বহুগুণ শক্তিশালী, বহুগুণ।ʼʼ

অন্তূ আজ অবধিও কোনোদিন আব্বুকে ছাড়া কোনো ছোটখাটো পরীক্ষাও দিতে যায়নি। তিনি স্যান্ডেল খুঁজে পেলেন না, পরে দেখলেন অন্তূ তা পরিষ্কার করছে একটা কাপড় ঘষে। গম্ভীর হলেন আমজাদ সাহেব, “তোকে নিষেধ করেছি না, এসব করতে? স্যান্ডেল পায়ের জিনিস, তা আবার ঘষেমেজে পরিষ্কার করার কী আছে? সুফিয়ানা ভালো না। তুই আর কোনোদিন স্যান্ডেল পরিস্কার করবি না।ʼʼ
অন্তূ পাত্তাই দিলো না।

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বরাবরের মতো আব্বুর আঙুলের ডগাটা নিজের তর্জনী আঙুলি দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল অন্তূ। ভার্সিটিতে ঢুকে বুকের কম্পন বাড়ল। না-জানি কোন দিক থেকে জয় আমির এসে দাঁড়ায়।

আমজাদ সাহেব ফাইলটা অন্তূর হাতে ধরিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ উপদেশ দিলেন। যেন অন্তূ কিন্ডার-গার্টেনের শিক্ষার্থী। এবং সে যাচ্ছে পরীক্ষা দিতে, তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিচ্ছেন আমজাদ সাহেব। অন্তূ হাসল। আমজাদ সাহেব পকেট থেকে শ টাকার একটা নোট বের করে বললেন, “আবার নিতে আসতে হবে নাকি? নাকি চলে যেতে পারবি?ʼʼ

অন্তূ ঘাঁড় নাড়ল, “আসতে হবেনা। আমি চলে যাব।ʼʼ

যতক্ষণ অন্তূ বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকে বারান্দা পার হলো, ততক্ষণ অপলক চেয়ে রইলেন আমজাদ সাহেব। অন্তূ আড়াল হলে, অল্প সিক্ত চোখটা ওপরের দিকে তুলে ভেজা ভাবটা শুকানোর চেষ্টা করলেন। আজ অন্তূ দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল দিতে ঢুকছে। ক’দিন পরে এলএলবি চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসবে। তখনও এভাবেই গিয়ে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকবেন তিনি অন্তূ বের হবার অপেক্ষায়। ক’দিন বাদে মাস্টারমশাই থেকে তিনি এডভোকেট মাহেজাবিন আরমিণ অন্তূর বাবা হতে যাচ্ছেন। বুকটা ভরে উঠল, চোখ জ্বালা করতে লাগল খুব। অন্তূটা বড় হয়ে গেল। এই তো ক’দিন আগে হাত ধরে স্কুলড্রেস পরে, মাথায় দুই ঝুঁটি করে স্কুলে যেত অন্তূ। আমজাদ সাহেব চোখ ফেরালেন। আস্তে করে হেঁটে বেরিয়ে এলেন ভার্সিটির ফটক পেরিয়ে।

পরীক্ষা শেষ না-ই করতে পিয়ন এলো হলে। অন্তূ তখন হিমশিম খাচ্ছে লেখা শেষ করতে। অল্প সময় বাকি। লেখা অনেক। তারই মাঝে পিয়ন জানালো, মনোয়ারা রেহমান নিজের কক্ষে ডেকে পাঠিয়েছেন আরমিণকে।

চলবে..

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

১৫.

মনোয়ারা রেহমান চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ছিলেন। অন্তূ অনুমতি চাইলে চোখ মেলে বললেন, “এসো।ʼʼ

অন্তূ চেয়ারে বসল। মনোয়ারা চশমা চোখে আটলেন। অন্তূকে দেখলেন দু’বার। পরে বললেন, “বুঝতে পারছো তো, কেন ডেকেছি?ʼʼ

-“জি, বুঝতে পারছি।ʼʼ

-“জয় আর তোমার সম্পর্ক কতদিনের?ʼʼ

অন্তূর মস্তিষ্ক হুটহাট বিষয়টা ধরতে পারল না। কয়েক সেকেন্ড পর হুট করে কথাটা বোধগম্য হতেই কপাল টান করল। কেন যেন মনে হলো, ম্যাম ওকে ভড়কাতে বলেছেন কথাটা। অন্তূ বলল, “আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, ম্যাম!ʼʼ

-“হু, নেই। ছিল তো! সেটা কতদিনের ছিল?ʼʼ

মনোয়ারা আশা করেছিলেন অন্তূ থতমত খাবে, অবাক হবে, অথবা লজ্জা পাবে নয়ত উত্তেজিত হয়ে উঠবে। অথচ উনাকে অবাক করে অন্তূ শান্ত চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, “এ কথা কোথা থেকে শুনেছেন?ʼʼ

-“সম্পর্ক ছিল কিনা সেটা বলো। থাকলে কতদিনের কতদিনের ছিল?ʼʼ কঠিন হতে চাইলেন মনোয়ারা রেহমান।

অন্তূ নির্বিকার স্বরে বলল, “আমি এবং জয় এই দুটো শব্দের সাথে সম্পর্ক শব্দটা মাত্রাতিরিক্ত বেমানান, ম্যাম। কথাটা আপনি হয় আমাকে ডিস্ট্র্যাক্ট করতে বলছেন, অথবা যদি কারও কাছে শুনে থাকেন, তবে সেটা গুজব ছিল। বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।ʼʼ

মনোয়ারা কপাল জড়ালেন। মেয়ে এতটা নির্লিপ্ত, স্পষ্টভাষী আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধার।

-“কে বলেছে এই কথা, ম্যাম!ʼʼ

মনোয়ারা অন্তূর কথা অগ্রাহ্য করে বললেন, “নিকাবটা খোলো।ʼʼ

অন্তূ খুলল। মনোয়ারা কয়েক সেকেন্ড যাবৎ খুঁটিয়ে দেখলেন। চোখ ফিরিয়ে বললেন, “এসবের মাঝে ফাঁসলে কী করে, মেয়ে?ʼʼ

অন্তূ শ্বাস নিলো একটা, ঠোঁট কাঁমড়ে বলল, “জানিনা, ম্যাম। কীভাবে কোথা থেকে জলের প্রবাহ কোথায় গড়াচ্ছে, বুঝতে পারছি না।ʼʼ

মনোয়ারা এতক্ষণে সম্পূর্ণ মনোযোগ অন্তূর ওপর নিক্ষেপ করলেন, হাত দুটো একত্র করে টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে জানালেন, “জয় পাগল। পাগল না ঠিক, তাণ্ডব। পাগলরা তো মানুষ নিয়ে খেলতে জানে না, মজাও পায় না তা কোরে। কিন্তু জয় ক্ষুধার্ত পশুর মতো, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। কী করেছিলে? ওকে অপমান করেছিলে? এতটা বিদ্রোহী হওয়া শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর, বুঝলে? ভার্সিটিতে র‌্যাগিং খায়নি কে? তবুও মুখ বুজে থাকে কেন? এ ব্যাপারে আগে শোনোনি কোনোদিন?ʼʼ

-“শুনেছি তো অনেককিছুই। তবে তা আমার ভেতরে সহনশীলতা আনেনি, বরং ক্ষিপ্ত করেছে।ʼʼ

মনোয়ারা অস্পষ্ট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “সমাজটা ক্ষমতার, আর ক্ষমতা সব জয়দের। তুমি একটা সাধারণ মেয়ে এত প্রতিরোধ গড়বে? তোমার অতি মূল্যবান সম্মানকে জয় সাবানের মতো পানিতে ভিজিয়ে ঘষে ঘষে একটু একটু করে ক্ষয় করবে। প্রতিদিন পানিতে ভেজাবে, ফেনা উঠবে। তোমার সম্মান ক্ষয়ে ধুয়ে যাবে পানির সাথে। কারণ জয় বাঁধনহারা, বেপরোয়া।ʼʼ

অন্তূর ভেতরটা অস্থির হলো, তবুও অটল বসে রইল।

মনোয়ারা বললেন, “ধৈর্য্যের এত ঘাটতি তোমার মতো বুদ্ধিমতি মেয়ের সাথে সাথে মানাচ্ছে না, মেয়ে। এই যে শীতল, কঠোর, কেয়ারলেস ভাবটা, এটার আসল প্রয়োজন ছিল জয়ের সামনে। এর জন্য ক্ষতিগ্রস্থ হবে তুমি।ʼʼ

দৃঢ় হলো অন্তূর কণ্ঠস্বর, “ম্যাম! নিজের সামনে নিজের আত্মমর্যাদাকে এক-কোপে বলি হতে দেখেও ধৈর্য্য ধারণ করার মতো পুরু ধৈর্য্য নেই আমার। তার ফলে ক্ষতি আমার হবে এ-ও জানি। এবং তা মঞ্জুর। আমার ধৈর্য্যের প্রাচীর এইসব ক্ষেত্রে খুব পাতলা, মসৃণ। নিজের অজান্তেই তা চিরে প্রতিরোধ বেরিয়ে আসে। জানি, এটা বোকামি। তবে এই বোকামিকে এড়ানোর মতো মোটা চামড়া আমার নেই।ʼʼ

মনোয়ারা অদ্ভুত হাসলেন, “আমাদের সমাজে ক্ষমতাবানদের দুটো ধরণ আছে, আরমিণ। কেউ কেউ ক্ষমতার জোরে তৎক্ষণাৎ থাবা দিয়ে ধরে, আর কেউ ছাই হাতে মাখিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে যত্ন করে ধরে। তবে ভয়ানক দ্বিতীয়টা। ছাই দিয়ে মাছ ধরলে আর ছুটতে পারেনা, জানো তো! জয় খুব জেদি। তোমার অপমানগুলো কতটা বাজেভাবে পুষে রেখেছে ভেতরে, তা জানা নেই আমার। ওর চিন্তাধারা আর সবার মতোন না। ও বহু পুরোনো জিনিস পুষে রেখে খুব জঘন্যভাবে তার কর্যা চুকিয়ে নেয়।ʼʼ

-“জয় তা করবে বলছেন?ʼʼ

-“জয় জলন্ত। কিন্তু জানো, আগুনের চেয়ে পানি মারাত্মক। পানির ছিটায় আগুনকে নেভাতে মুহুর্ত সময় লাগে। যেখানে আগুনের পানিকে বাষ্প করে খুব সামান্য পরিমাণ অবস্থার পরিবর্তন করতেও অনেকটা সময় ও একই সঙ্গে বাহ্যিক তাপ প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে।ʼʼ

অন্তূ যেন কিছু বুঝল। ম্যাম বুঝি পানির হদিশ দিলেন। যার থেকে অন্তূর অতি-সাবধানতা দরকার। মনোয়ারা বললেন,

-“জয় যখন অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হলো, এক ছাত্রনেতার সাথে ঝামেলা হয়েছিল। ছেলেটা জয়কে লেজকাটা, বেজন্মা বলেছিল। জয় হেসেছিল সেদিন। দু বছর পর সেই ছাত্রনেতা বেরিয়ে গেল অনার্স শেষ কোরে। ততদিনে জয় একটা পাকাপোক্ত খুঁটি গেড়ে ফেলেছিল ছাত্র সংগঠনে। এরই মাঝে হামজা সাধারণ ছাত্রকর্মী থেকে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি পেল। এরই মাঝে এমন বহুত কর্মকাণ্ড দুজনে করে ফেলেছিল, যাতে কোরে দুজন আলোচনায় এসেছিল, মানুষ ওদের চিনেছিল। ওরা লেগে গেল গণসেবায়। ধীরে ধীরে নেতৃত্ব ছড়ালো দুজনের। লোকজনের মনোযোগ পেয়ে গেল হামজা। ছাত্ররা দিনদিন জয়ের পিছনে স্রোতের বিপরীতে ছুটে আসা পিঁপড়ের মতো ভিড় করতে শুরু করল।

সে বছর সেই ছাত্রনেতার বোন ভর্তি হলো ভার্সিটিতে। রাতের বেলা গার্লস হোস্টেলের দেয়াল টপকে রুমে গিয়ে জয়ের পার্টির দুটো ছেলে মেয়েটাকে নোংরা স্পর্শ করেছিল। ভিডিও বানিয়েছিল সেটার। সেটা পরেরদিন পুরো ভার্সিটি দেখল। ছেলেদুটোর মুখ চেনা গেল না। সেই ছাত্রনেতা এলো।

জয় সামান্য হেসে বলেছিল, ‘ভাই, আপনি যে কারণে আমাকে বেজন্মা, জারজ, লেজকাটা বলেছেন, সেই কারণটা যথেষ্ট ছিল না এই নামগুলো ধারণ করার জন্য। এজন্য ওই গালিগুলো আমার ওপর জায়েজ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়ে দিলাম। আমি যা না, তা বলে গালি দিয়ে আপনি মিথ্যাবাদী আর পাপী হবেন কেন? আমার বাপ-মা নেই, কিন্তু জন্ম তো আমায় অবৈধভাবে দেয়নি। কিন্তু আপনি বকলেন তা বলে। তাতে হয় আমার নিজেকে প্রমাণ করতে হতো যে আমি অবৈধ না, অথবা অবৈধদের মতো কাজ করে প্রমাণ করতে হতো যে আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনি যা বলেছেন তা-ই কায়েম হোক, আমিই আপনার গালাগালির জন্য নিজেকে উপযুক্ত করে নিলাম।ʼ
তার পরের দিন সেই মেয়ে আত্মহত্যা করল।ʼʼ

মনোয়ারা অদ্ভুতভাবে হাসলেন এ পর্যায়ে, “আমরা যে বিষয়টাকে সিম্পলি চিন্তা করি, ও সেটাকে জটিলভাবে, কঠিনভাবে সাজায়। ও রাজনীতিতে এসে বহুবার বহুভাবে জখম হয়েছে, এই জয় আমির একটা ছেলে নয়, একটা ধ্বংসাত্মক সত্ত্বা। সে মার খেয়েছে, শরীরে সেসবের গর্ত রয়ে গেছে। আর কী কী হয়েছে ওর সঙ্গে, তা জানার উপায় নেই। ও নিজেকে প্রকাশ করে না। ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু কেউ ওকে এড়াতে পারেনি।ʼʼ

অন্তূ কেমন করে যেন হাসল, “আমার মনে হচ্ছে, আপনিও এড়াতে পারেননি। খুব আগ্রহভরে ব্যাখ্যা করছেন লোকটার নোংরামি।ʼʼ

-“তোমাকে জানাচ্ছি—সবশেষে জয়ের কর্মকান্ড আসলেই জারজ সন্তানদের মতোই। ওর জিদ ওকে এই পদ দিয়েছে,পাওয়ার দিয়েছে। আবার দিনশেষে দুই ভাইয়ের নিখুঁত চতুরতা জনগণের কাছে ওদের সব কুকর্মকে ছাপিয়ে নেতা কোরে তুলেছে। আমাদের দেশের লোকজন খুব ভুক্তভোগী। তারা অল্প একটু সুবিধা পেলেই যে কারও যেকোনো রকম নোংরামি ভুলে তাকে সালাম ঠুকতে শুরু করে। সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে সমাজ সম্বন্ধে এই ধারণাটুকু স্পষ্ট।ʼʼ

অন্তূ যেন চেয়ারের সাথে মিশে যাচ্ছিল। জয়কে এতদিন বখাটে মনে হয়েছে, হামবড়া লেগেছে। কিন্তু এরকম নিকৃষ্ট, কলুষিত জিদের অধিকারী মনে হয়নি।

আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ-ই একটা ডাক শুনে থামল। আব্বুকে দেখে বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। যদি কখনও খারাপ সম্মানহানিকর কিছু হয় ওর সাথে, এই মানুষটা সহ্য করতে পারবে? পারবে না। তখন অন্তূ কী করবে? শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল অন্তূর।

আমজাদ সাহেব ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলেন, “এ জগতে আছিস তুই?ʼʼ

অন্তূ হাসার চেষ্টা করল, “তুমি এসেছ নিতে? চলে যেতাম আমিই।ʼʼ

হাঁটতে হাঁটতে গম্ভীর হলেন আমজাদ সাহেব, “সেই কখন থেকে এসে দাঁড়িয়ে আছি। পিয়ন যদি না জানাতো প্রফেসর ডেকেছেন তোকে, আমি চলেই যেতাম।ʼʼ

অন্তূ খেয়াল করল, আব্বু খুব ঘামছে। শীতের দুপুরের রোদ কড়া নয় মোটেই, তার মাঝেও মুখটা সিক্ত লাগছে। অন্তূ বলল, “আব্বু, সোয়েটারটা খোলো।ʼʼ

-“কেন? দরকার নেই..ʼʼ

-“খুলতে বললাম, খোলো। আমি দাঁড়াই, খোলো ওটা তুমি ওটা। কাল রাতে বোধহয় প্রেশারের ওষুধ খাওনি তাই না? কোথায় গেছিলে এখন?ʼʼ কড়া অন্তূর কণ্ঠস্বর।

আমজাদ সাহেব সোয়েটার খুললেন, অন্তূ তা নিয়ে নিজের কনুইতে বাঁধিয়ে রেখে বলল, “কোথায় গেছিলে, বলোনি কিন্তু এখনও!ʼʼ

আস্তে কোরে বললেন আমজাদ সাহেব, “মুস্তাকিনের সাথে দেখা করে এলাম।ʼʼ

-“তুমি তোমার পেরেশানী থেকে আমায় দূরে রাখতে চেয়ে কী প্রমাণ করতে চাও? যে আমি তোমার বাড়ির ক’দিনের অতিথি, তোমার দুঃখ-কষ্টের কথা জানানো উচিত নয় আমায়। কোনোমতো উপর-উপর হাসিমুখে ফর্মালিটি দেখিয়ে বিদায় দিলে মিটে যাবে, এমন কিছু?ʼʼ

পাগলি ক্ষেপে গেছে। আমজাদ সাহেব হাসলেন।

রিক্সায় উঠেও অন্তূ আর কথা বলছিল না। অথচ যতক্ষণ উনার সাথে অন্তূ বাহিরে থাকে, দু’বছরের শিশু হয়ে যায়। এটা কী, আব্বু? ওটা কী, ওখানে কী হয়েছে, এটা কেন হয়েছে? দেখো কী হচ্ছে, এই-সেই—সব প্রশ্নের ভিড়ে টিকে থাকা মুশকিল হয় আমজাদ সাহেবের।

রিক্সার হুড তুলে দিলেন, রোদ মুখে লাগছিল। আনমনেই বললেন, “পেরেশানী ছাড়া জীবন চলার উপায় নেই। এ তো লেগেই আছে। সেই সব যদি পিড়ি পেতে তোর কাছে বলতে বসি, তারপর নিজের ঝামেলায় তোকেও জড়িয়ে ফেলি—বাপ হিসেবে যে ছোটোলোকিটা প্রকাশ পাবে আমার মধ্যে তার দায় তুই নিবি? এসব কথা তোর কানে কেন দেব আমি? এমনিই তো সারাদিন নিজের চেয়ে বেশি সংসারের চিন্তায় লেগে আছিস। বলেছি, তোর কাজ শুধু পড়ালেখা করা। সংসারের চিন্তা করার ইচ্ছে থাকলে পরের বাড়ি পাঠিয়ে দিই, সংসারের টানপোড়েন ঘাঁড়ে তুলে দেবার হলে বাড়িতে রাখবো কেন তোকে?ʼʼ

গম্ভীর স্বরে বলা কথাগুলোকে উপেক্ষা কোরে বলল অন্তূ, “তুমি তোমার লেকচার থামাও, আব্বু। এটা তোমার ক্লাসরুম অথবা আমি তোমার ছাত্রী নই। বলবে না, বলবে না। আমিও জানার জন্য মরে যাচ্ছি না।ʼʼ

কথা শেষ কোরে দুজন দুজনের দিকে শক্ত চোখে তাকালো একবার।


অন্তূর মতে বিকেল হলো দিনের সুন্দরতম সময়। সিঁড়ির নিচে পাটি বিছিয়ে পড়তে বসেছিল সে। রাবেয়া পাশেই বসে চাউল খুঁটছিলেন। মার্জিয়া ধীর পায়ে এসে একবার কাপড়-চোপড় নিয়ে গেছে। রাবেয়া বলতে চেয়েও চুপ রইলেন, ‘এই অসময়ে গোসল কোরো না।ʼ পাছে আবার খিটখিট করে উঠবে মার্জিয়া।

রাবেয়া অন্তূকে পেলে কোনোসময় চুপ থাকেন না। বোকা বোকা কথা বলে অন্তূর কাছে কড়া কথা শোনা, অথবা নিজের অতীতের গল্প শোনানো, নয়ত হাসি-মজা করেন। আজ চুপচাপ আনমনে চাউল খুঁটছেন। অন্তূ বই রেখে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? চিন্তায় আছো নাকি?ʼʼ

কেমন কোরে যেন একবার তাকিয়ে আবার চোখ নামালেন রাবেয়া। অন্তূ ভ্রু কুঁচকাল, “কাহিনি কী? চুপ কোরে আছো কেন? কী হয়েছে, আম্মা?ʼʼ

রাবেয়া নিচুস্বরে বললেন, “ওই হারামী কাল রাতে বাড়ি আসেনি। কী যে করতেছে কোথায়, আল্লাহ মাবুদ জানে। আমার আর ভাল্লাগেনা এসব।ʼʼ

-“বাড়ি আসেনি রাতে? আব্বু জানে?ʼʼ

-“চুপ কর। আস্তে কথা কইতে পারিস না, মেয়েমানুষ!ʼʼ এদিক-ওদিক তাকালেন রাবেয়া আতঙ্কিত চোখে।

-“না, পারিনা। কোনো পাপ তো করিনি যে, তা লুকাতে বিরবির করতে হবে। গতরাতে বাড়ি আসেনি, আবার রাত আসতে যাচ্ছে, তুমি আব্বু বা আমায় জানানোর প্রয়োজন করোনি?ʼʼ

মার্জিয়ার ঘরে ঢুকে দম আঁটকে এলো অন্তূর। জানালা-দরজা কিছুই খোলেনি। শরীর ভালো যাচ্ছে না মার্জিয়ার। মার্জিয়া খুব সুফি মেয়ে। ঘরবাড়ি সবসময় ঝকঝক করে তার বদৌলতে। আজ পুরো ঘর একটা পরিত্যক্ত গুদামের চেয়ে কম লাগছে না। বাথরুম থেকে আওয়াজ পেল মার্জিয়ার। দৌঁড়ে গেল। বেসিনের ওপর ঝুঁকে হরহর করে বমি করছে মার্জিয়া। অন্তূ দ্রুত বাহু চেপে ধরল মার্জিয়ার। কোনোমতো ধরে এনে বিছানায় শোয়ালো ওকে অন্তূ।

পাশে বসে বালিশ ঠিক করে দিয়ে লাইট জ্বালালো ঘরের। চারদিকে বন-জঙ্গলের মতো হয়ে আছে। অন্তূ মাসেও একবার এ ঘরে ঢোকেনা। চারদিকের হাল দেখে অবাক হলো।

মার্জিয়ার কপালে হাত চেপে বলল, “কী হয়েছে আপনার? এত শরীর খারাপ কিছু বলেননি তো! নিজেকে কী ভাবেন আপনি, আর আমাদেরই বা কী ভাবেন? আমরা কি আপনাকে খেয়ে ফেলার ওঁত পেতে আছি, এমন মনে হয়? আপনার সাথে শত্রুতা কোরে দু-চার পয়সা পেলে তাও নাহয় ভেবে দেখতাম আপনার সাথে শত্রুতা বজায় রাখার।ʼʼ

মার্জিয়া চুপচাপ চেয়ে রইল। মার্জিয়ার কাছে এমন নমনীয়তা আশা করা যায়না। আস্তে আস্তে তার চোখ ভিজে গলা ভেঙে এলো, “ও গতকাল সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো খবর নেই, ফোন বন্ধ।ʼʼ

অন্তূর চোয়াল শক্ত হলো, “তা কাকে বলছেন? চেনেন আমাকে? আমার বাপ-মা আমি এই বাড়িতেই পাশের ঘরেই থাকি, তা জানেন আপনি? এসব পার্সোনাল কথা আমাদের অচেনাদের কাছে বলবেন না, ভাবী। ক্ষতি কোরে বসলে তো আর উঠে আসবে না! গোপন কথা গোপন রাখুন।ʼʼ

ভারী পা ফেলে বেরিয়ে এলো অন্তূ ঘর থেকে।

বোরকা পরে বেরিয়ে যাবার সময় রাবেয়া হায়হায় করে উঠলেন, “কোথায় যাচ্ছিস তুই? অন্তূ? এই…ʼʼ

অন্তূ সোজা হেঁটে দরজার কাছে গিয়ে বলল, “ডাকাতি করতে। যাবে সঙ্গে? সাহস নেই অত তোমার, আমিই বরং যাই।ʼʼ

রাবেয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অন্তূটা ভীষণ গম্ভীর, রাগ ও মেজাজ ভীষণ তিরিক্ষ। তিনি ভেবছিলেন, অন্তিক আজকের মধ্যে ফিরে আসবে, জানানোর দরকার নেই কাউকে। অন্তূকে বললে তা তৎক্ষণাৎ আমজাদ সাহেবের কানে যাবে, একটা তামাশা হবে।

খানিক বাদেই অন্তূ কঠিন মুখে একইভাবে ফিরে এলো। রাবেয়ার কোনো কথার জবাব দিলো না। সোজা মার্জিয়ার রুমে গেল। পেছন পেছন দৌঁড়ে এলেন রাবেয়া। অন্তূ মার্জিয়ার হাতে প্রেগনেন্সি কিট ধরিয়ে দিয়ে বাথরুম অবধি এগিয়ে দিয়ে বলল, “যান, টেস্ট কোরে আসুন। মুখের দিকে চেয়ে থেকে সময় নষ্ট করবেন না, দ্রুত যান।ʼʼ

রাবেয়া অবাক হলেন। অন্তূ প্রেগনেন্সি কিট কিনতে গিয়েছিল! বললেন, “আমি তো কিছুই বুঝিনি..মার্জিয়া?ʼʼ

-“তা শিওর হলে তো আর আবার পরীক্ষা করার মতো উদ্ভট শখ জাগতো না আমার, আম্মু?ʼʼ

রাবেয়া চুপ রইলেন। একটু পর আবার নিজেই বিরবির করলেন, “অন্তিক কোনদিনও রাত বাইরে কাটায় না, অন্তূ।আমার ভাল্লাগতেছে না। কই গেছে, সন্ধ্যা লাগতে যাচ্ছে, এখনও আসলো না।ʼʼ

অন্তূ একবার তাকাল তার সরলা মায়ের মুখপানে। তাকে ভীষণ ভয় পান রাবেয়া। অন্তূ চোখে আশ্বস্ত করল, “কিছু হয়নি। শান্ত হও!ʼʼ

চলবে..

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

১৬.

সন্ধ্যার পর আরও দু’বার বমি করেছিল মার্জিয়া। অন্তূ সোফার ওপর ছিটিয়ে থাকা কাপড়গুলো ভাঁজ করে ঘরটা ঝাড়ু দিয়েছে। অন্তিক খুব খিটখিটে মানুষ, বিছানার বসার সময় চাদরে হাত বুলিয়ে বসার অভ্যাস আছে।

কিটে প্রেগনেন্সি পজিটিভ এসেছে। তারপর বেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কেঁদেছে মার্জিয়া। রাবেয়া প্লেটে কোরে ভাত আনলেন। মার্জিয়া খেতে অস্বীকার করল, রুচি নেই তার। অন্তূ জিজ্ঞেস করেছিল, “নিজে টের পাননি শরীরের এই অবনতি দেখেও?ʼʼ

মার্জিয়া সে-সব এড়িয়ে কাতর স্বরে বলে, “তোমার ভাই আসছে না কেন, অন্তূ? আমার ভালো লাগছে না এমনিতেই শরীরটা, তার ওপর এই টেনশন!ʼʼ

অন্তূ মার্জিয়ার কাতর মুখ থেকে নজর ফেরায়, গম্ভীর স্বরে বলে, “টেনশন না করুন। আব্বু মসজিদ থেকে আসলে বলছি, কিছু একটা করা যাবে। আপনি চুপচাপ শুয়ে থাকুন, পারলে কিছু খেয়ে নিন। এই সময় নিজের সাথে সাথে আরেকটা প্রাণের যত্নে থাকতে হবে আপনাকে।ʼʼ

রাবেয়া খুব জোর কয়েক লোকমা খাবার তুলে দিতে পারলেন মার্জিয়ার গালে। কেঁদে কেঁদে মুখ-চোখ বসিয়ে ফেলেছে। দিনশেষে মেয়েটা অন্তিককে ভীষণ ভালোবাসে, এ চিরন্তন সত্য।

অন্তূ চলে এলো বাইরে। তার মাথায় বহু নেতিবাচক ভাবনা আসছিল। সেদিন একটা গুণ্ডা ধরণের নোংরা লোকের সাথে কোথাও যাচ্ছিল অন্তিক।

অন্তূর মাথা ভার হয়ে এলো। কী অধঃপতন অন্তিকের! আমজাদ সাহেবকে তার ছেলের ব্যাপারে এমন কথা কীভাবে বলা যায়? দিনদিন পারিবারিক পরিস্থিতি এত সংকটাপণ্ন হয়ে উঠছে কেন?

আমজাদ সাহেব জামায়াত শেষে ফিরলেন। দু’বার ‘আব্বুʼ বলে ডেকেও কিছু বলতে পারছিল না অন্তূ। আমজাদ সাহেব গম্ভীর হলেন, “কথা কেন এমন গলায় আঁটকাবে? স্পষ্ট কথা বলতে শেখাইনি আমি? চোর বা অপরাধীরা কথা সাজাতে গিয়ে হুমড়ি খায়। তুই কি সেরকম কিছু বলতে যাচ্ছিস?ʼʼ

অন্তূ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমার ছেলে কাল সকালে বেরিয়েছে, এখন অবধি বাড়ি ফেরেনি। মানে প্রায় দেড় দিন হলো তার পাত্তা নেই বাড়িতে। আব্বু, তুমি চিন্তিত না হও। সে বাচ্চা নয়, চলে আসবে। তবুও তোমাকে জানানো প্রয়োজন বলে মনে করলাম।ʼʼ

শেষের দিকে অন্তূ সামাল দেয়ার দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। আমজাদ সাহেব তসবীহ রেখে উঠে গিয়ে পুকুরের পাশের জানালাটা আঁটকে দিয়ে বললেন, “বাচ্চা বোঝাচ্ছিস? আসলেই কি আমি এত দূর্বল আর অপদার্থ হয়ে উঠেছি যে, ছোট ছোট বিষয়গুলোও নিতে পারছি না আজকাল?ʼʼ

-“তেমনটা নয়। কিন্তু একের পর এক যা হচ্ছে…ʼʼ

-“এটাকেই তবে জীবন বলে, অন্তূ। যখন দেখবি জীবন সমতল রাস্তায় বেশ আরামে গড়িয়ে গড়িয়ে দুলদুলিয়ে চলছে, তখন বুঝবি তুই স্বপ্নে আছিস, অল্পক্ষণের মাঝে ঘুম থেকে জেগে উঠবি। কারণ, বাস্তবতা হলো পাহাড় কেটে বানানো সরু রাস্তা। যার পদে পদে বাঁক, উঁচু-নিচু খাদ আর যেকোনো সময় জীবন নামক গাড়িটা উল্টে পড়ার সম্ভাবনা দিয়ে ভর্তি। এসবে যেদিন ভয় পাবো, তার আগে আমি মাটির তলায় শায়িত হয়ে যাবো।ʼʼ

অন্তূ চেপে চোখজোড়া বন্ধ করে ফেলল। বিরবির করল, “প্লিজ আব্বু, প্লিজ চুপ করো। কিচ্ছু হয়নি, হবেও না।ʼʼ

আমজাদ সাহেব বের হবার মুহুর্তে অন্তূ কোত্থেকে দৌঁড়ে এসে হাত চেপে ধরল হুড়মুড়িয়ে। আমজাদ সাহেব গোমরা মুখে বললেন, “পাগলামী না কোরে ঘরে গিয়ে পড়তে বোস। সেদিন পরীক্ষা দিয়ে এসে দুইদিন বেশ ফাঁকিবাজি করেছিস। আমি এখনই ফিরে আসবো।ʼʼ

-“আমিও।ʼʼ

-“আমিও কী?ʼʼ

-“এখনই ফিরে আসবো। একটু ঘুরে আসি চলো।ʼʼ

ধমক দিলেন আমজাদ সাহেব, “বড় হসনি? আর কবে বড় হবি? আমি কি শখে যাচ্ছি যে, পিছু নিতে হবে?ʼʼ

-“আব্বু, তুমিই বলতে–সন্তান বাপ-মায়ের কাছে কোনোকালে বড় হয়না। সে আমি যত বড়ই হই, আমার বয়স যতটুকু বাড়ছে, তোমারও বাড়ছে, সুতরাং তোমার তুলনায় আমি যা তাই রয়ে গেছি কিন্তু। ঠিক বলেছি না?ʼʼ

অন্তূ চাইল রসিকতার মাধ্যমে আব্বুর টেনশন কম করতে।
আমজাদ সাহেব হার মানলেন, মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, “চাদর নিয়ে আয়, যা। ঠান্ডা লাগেনা গায়ে?ʼʼ

অন্তিকের দোকান বন্ধ পাওয়া গেল। পাশের দোকানদার জানাল, কাল থেকে দোকানই খোলেনি। এরপর বেশ কিছুক্ষণ নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দু’জন রাস্তার পাশে।

অন্তূ ঠিক বুঝতে পারছিল না আব্বুর অভিব্যক্তি। গম্ভীর মানুষদের এই এক সমস্যা, তাদের উত্তেজনা বা শান্তভাব সবই একরকম, চুপচাপ। সে বুঝতে পারছিল না, কী কোরে পরিস্থিতি সামলে নেয়া যায়? অন্তিক গতকাল বাড়ি থেকে দোকানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে দোকানেই আসেনি, তাহলে কোথায় গিয়েছে? এখন কোথায় খুঁজবে ওকে, কোথায় যেতে পারে? অবচেতন মস্তিষ্কে থেকে থেকেই নেতিবাচক ভাবনা উঁকি মারছে, অন্তূ ধমকে তাদের ভেতরে পাঠালো।

আমজাদ সাহেব আচমকা শক্ত কোরে চেপে ধরলেন অন্তূর বামহাত খানা। অন্তূর মনে হলো, সে এবার এই গোটা মহাবিশ্ব-ব্রক্ষ্মাণ্ড জয় করে ফেলতে পারবে নিমেষেই, তাতে তার গায়ে একটুও আচড় লাগার সম্ভাবনা নেই আর। চোখ বুজে দুটো শ্বাস ফেলে বলল, আব্বু, “তোমার ছেলের দুটো কলেজ লাইফের বন্ধুকে চিনি আমি। তুমিও তো চেনো।ʼʼ

আব্বুর হাত ধরে রাস্তা পার হলো অন্তূ। চাদরের এক প্রান্ত কাধ থেকে পড়ে গেছে। আমজাদ সাহেব অন্তূর হাত ছাড়লেন না, বরং বাম হাত দ্বারা চাদর কাধে তুলে দিয়ে একটা ধমক দিলেন, “সর্দি লাগলে এক পয়সার ওষুধ কিনে দেব না, মনে রাখিস। ভালোভাবে চাদর জড়িয়ে নে গায়ে, ঠান্ডা কিন্তু কম নয় বাইরে।ʼʼ

বন্ধুরাও এখন সংসারী হয়ে গেছে। পুরনো শিক্ষককে দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমজাদ সাহেব সকলের অনুরোধ নাকচ করে কেবল অন্তিকের খোঁজ করে বিদায় হলেন। সম্ভাব্য সকল জায়গায় খোঁজ করেও বিশেষ ফায়দা হলো না। এখনও অন্তিকের নম্বর দুটোই বন্ধ।

দুজন রাস্তার পাশে উঁচু ফুটপাতের ধারে বসল। অন্তূর বুক কাঁপছে। চুপচুপ বসে থাকা আব্বুর মনে কী বয়ে যাচ্ছে, তা আন্দাজ করতে চাইল। খুব কোরে মনে হলো, যদি সে ম্যাজিক জানতো, এখনই অন্তিককে এনে সামনে দাঁড় করাতো, এরপর এক লহমায় ভেঙে দিতো বাপ-ছেলের মাঝের কঠোর দেয়ালখানা। বুকের ভার সহ্য হচ্ছিল না ওর। অসহায় লাগছিল খুব। সে কেন পারে না, আব্বুর পেরেশানীর সহজ সমাধান হতে? সমস্যাগুলো তার নাগালের মাঝের হয়না কেন?

বেশ কিছুক্ষণ দুজন চুপচাপ পাশাপাশি বসে রইল। রাস্তার ওপাশে ফুটপাতে ভাপা পিঠা বিক্রি হচ্ছে। আমজাদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “পিঠা খাবি?ʼʼ

অন্তূ তাকাল আব্বুর দিকে। অল্প হাসল। মানুষটা বরাবর নিজেকে পাথর প্রমাণ করতে চেষ্টা করে, যেন এই জগতের কোনো ব্যথা বা উদ্বেগ তাকে কাবু করতে পারেনা। দিনশেষে পরিবারের কর্তব্য পালন করতে গিয়ে এত এত জটিলতা এবং দেনা-পাওনা ঘাঁড়ে কোরে বসে আছে, তবুও যেন মনে হয় না তার কর্তব্য সে ঠিকঠাক পালন করছে। অন্তূ মাথা নেড়ে বলল, “উহু….আব্বু?ʼʼ

-“হু।ʼʼ আনমনে বললেন আমজাদ সাহেব।

-“থানায় একটা জিডি করলে হয়না?ʼʼ

-“আমিও ভাবছি।ʼʼ

থানায় একটা সাধারণ বিবরণে ডায়েরি করে দুজনে বেরিয়ে এসে থানার বাইরে দাঁড়াল। আমজাদ সাহেব ফোন করলেন কাউকে। অন্তূ ইশারায় জিজ্ঞেস করলে বললেন, “মুস্তাকিনকে জানিয়ে রাখি।ʼʼ

অন্তূ আর কিছু বলল না। তার মনে হলো, খুব শীঘ্রই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করার কারণ নেই, সে শুধু শুধুই এত বেশি ভাবছে।


টিকিট কাউন্টারে টুকটাক ভিড়। রাজধানী শহর বলে কথা। হাতঘড়িতে সময় দেখল জয়। ১১:৫৩ বাজে। সে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়েছে সোয়া এগারোটার দিকে। এরপর বিয়ার কিনতে গিয়ে দেরি হয়েছে। দৌঁড়ে বাসে উঠল। এত রাতেও সবগুলো সিট বুক। তার জন্য একটা সিট রয়েছে একটা মেয়ের পাশে। মেয়েটা জানালার ধারে বসে আছে।

জয় গিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁধ থেকে ব্যাগ খুলতেই মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়ে খ্যাকখ্যাক কোরে উঠল, “একদম এখানে বসবেন না। আমি আপনার পাশে বসে যেতে পারব না। এখানে বসবেন না, আপনি। আমি বসতে দেব না।ʼʼ

বাস ছাড়বে এক্ষুনি। জয় রাগ সামলে বলল, “আর কোনো সিট-টিট ফাঁকা নাই, দুজনের বসার জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে দুইটা সিটে। আপনি বসেন, অসুবিধা হবে না।ʼʼ

মেয়েটা কর্কশ সুরে জোরে কোরে চেঁচিয়ে উঠল, “বললাম না আমি আপনার পাশে বসে যাবো না। যেতে পারব না কোনো ছেলেমানুষের পাশে বসে আমি.. অন্তত রাতের জার্নি…ʼʼ

-“চুপ কর, শালি! চুপ!ʼʼ জয় চট কোরে নিয়ন্ত্রণ হারালো, “গলার ভেতরে এক খাবলা টিস্যু গুজে দেব আর এক ফোঁটা আওয়াজ গলা দিয়ে বের হলে, চুপ থাক…শালির মেয়ে!ʼʼ

সকলে উঠে দাঁড়াল। হেল্পার এগিয়ে এলো। জয় দাঁত খিঁচে বলল, “ওই চেংরি, নাম তুই, নাম। নেমে যা বাস থেকে..ʼʼ

মেয়েটা কেঁপে উঠল। জয় আঙুল নাচিয়ে ইশারা করল, “বের হ, সিট থেকে বের হ, বের হর বের হ। নাম, যাহ! তোর সিটের মায়রে চুদি… তুই আমার পাশে ও দূর, তোরে আমি এই বাসেই যাইতে দেব না।ʼʼ

মেয়েটা কিছু বলতে নিলে জয় ঠোঁটে আঙুল চাপল, “চুপচাপ নেমে দাঁড়া, নয়ত একটা লাত্থি মেরে নামিয়ে দেব, পড়ে যাবি, মাজা-টাজার নকশা পাল্টে যাবে।।ʼʼ

হেল্পার কিছু বলতে আসলে জয় থামাল, “তুই চুপ থাক। ওইদিক সরে দাঁড়া। উকালতি করতে আসলে বাসটা পেছন দিয়ে ভরে দেব একদম, শালা!ʼʼ

মেয়েটার দিকে ফিরে বলল, “শালি! ভদ্রতা মারাও? ভদ্রতা শিখাস আমারে? যে মাগী কোনো ছেলের পাশে বসে যেতে পারবে না, সে রাত বারোটার সময় একা যাতায়াত করে হে? পাগলে থাপায় আমারে? ভাতের বদলে কি খড় খাই? ভদ্রতাকে কোনোমতো সম্মান দিতে ইচ্ছে করলেও ভদ্র সাজা বিষয়টা হজম হয় না আমার। তোরে দেইখা লাগতেছে না, তুই বিপদে পড়ছোস কোনো। তার মানে সেচ্ছায় রাত-দুপুরে একা সফর করবার পারো, আর ছেলে মাইনষের পাশে বসতে পারো না? তোর মতো বালডারে লাড়ে কোন শালা? আমারে দেইখা কি বালব্যাটা মনে হয় যে তোর পাশে বসলেই সুরসুরি উঠে যাবে! সুশীলা নারী তুমি? শালি আমার! নাটক? তোরে আমি সিনেমা দেখাই, দাঁড়া।ʼʼ

পকেট থেকে মানিব্যাগ বের কোরে বলল, “দে, টিকেট দে। দে… টিকেট দে, তোর!ʼʼ

জয় টিকেটের দাম মেয়েটার হাতে শক্ত কোরে গুজে দিয়ে টিকেট কেড়ে নিয়ে সিটে ফিরে এসে বসল। হেল্পার তখনও দাঁড়িয়ে। জয় সিটে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে বলল, “আপনার আবার কী সমস্যা? মাথা কাজ না করলে বাসের দরজার সাথে জোরে কোরে মাথাটা ঠুকে দেন, ক্লিয়ার হয়ে যাবে। দুইটা সিটই এখন আমার। এবার গাড়ি ছাড়েন, এমনিই পৌঁছাতে সকাল হবে।ʼʼ

হেল্পার ভয়ে বলতে পারল না, গাড়িতে অ্যালকোহল অ্যালাউড না।

বাসের লাইট অফ হলে জয় শব্দ কোরে বিয়ারের ক্যান খুলে তাতে দুটো চুমুক দিয়ে গলা ছেড়ে গান ধরল।

ফজরের আজানের সময় বাস দিনাজপুরে প্রবেশ করল। অন্ধকার ভালো কোরে কাটেনি। তার ওপর ঘন কুয়াশার আচ্ছাদনে এক হাত দূরের পরিবেশ স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হবার জো নেই। জয়ের শরীরে শীত নেই। কনকনে শীতেও দরকার পড়লে ডাবল ব্লাঙ্কেল গায়ে দিয়ে ফ্যান চালিয়ে ঘুমায়। ফ্যানের শব্দ না কানে এলে ঘুম ভালো হয় নি।

পুরো ক্যানে কোনোমতো নেশা হয়। এখনও বেশ খানিকটা তরল বাকি ক্যানে। মাথা ঝিমঝিম টের করছে। নেশা পুরো না হলে কঠিন হ্যাংঅভার চড়ে। হাঁটতে গিয়ে পা টলছে।

নিচের তলার পুরোটা জুড়েই হামজার স্টিল-ওয়ার্কশপ। সেটা পেরিয়ে দোতলার সিড়ি ভেঙে দরজায় টোকা দিলো। কলিং বেল চাপার আগেই যেন হুট করে দরজাটা খুলে যায়। জয় চমকে গিয়ে আবার সামলালো নিজেকে। তরু দাঁড়িয়ে আছে দরজা খুলে। ভেতরে ঢুকে কাধের ব্যাগ নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ঘুমাসনি তুই?ʼʼ

জবাব দিলো না তরু। জয় জানে, সারারাত এভাবেই বসার ঘরে দরজার কাছে বসে ছিল তরু। জয় জেলার বাইরে গেলে যেদিন ফেরার কথা থাকে, দরজার কাছে থাকে, জয় আসলে যাতে দরজা খুলতে দেরি না হয়ে যায়!

জয় বলল, “খাবার কী আছে রে? ক্ষুধা লাগছে, ভাত দে! তার আগে একটু গরম কালা কফি দে, গা গুলায়ে আসতেছে, আবার খিদেও লাগতেছে।ʼʼ

তরু ঠোঁট উল্টালো, “ছোটমাছ রান্না আছে।ʼʼ

জয় দাঁত খিঁচে আবার চুপ করল। জুতোটা খুলে পা ঝেরে উড়িয়ে দিয়ে বলল, “বাঙালি জাতিডা যেরকম বালের জাত, খাওয়া-দাওয়াও বাল মার্কা। ওই জিনিস খাই আমি?ʼʼ

-“তাহলে ডিম ভেজে দেই? নরমাল ফ্রিজে অল্প একটু মাংস রান্না আছে, গরম করে দেই ওটা। সকালে ভালো খাবার দেব। এখন এটুকু দিয়ে চালান।ʼʼ

কমন বাথরুমে ঢুকল জয়। পা ফসকে যেতে চাইল একবার। তরু খেঁকিয়ে উঠল, “এসব কচু না গিললে কী খুব অসুবিধা হয়? ধরব আমি?ʼʼ

-“নাহ তো! মাতাল হই নাই আমি, একদম ফিট আছি। তুই তাড়াতাড়ি কফি বানা, তার আগে আমার গামছা দিয়ে যা।ʼʼ

-“এটা গোসল করার সময় হলো? আজেবাজে জিনিস গিলবেন, আর বেখাপ্পা সময়ে গোসল কোরে সর্দি বাঁধাবেন !ʼʼ
জয় মাতালের মতো নাটকীয়ভাবে কাঁধ দুলিয়ে হাসল, “সভ্য হয়ে, নিয়ম মেনে কোন শালা বড়লোক হইছে? আমি এত অসভ্য হয়েও বড়লোক!ʼʼ

কফি পড়ে রইল ওভাবেই। জয় গোসল কোরে বেরিয়ে সোজা এসে খাবার টেবিলে বসল। এই পৌষের শীতে ভোর পাঁচটার দিকে গোসল করে কেউ এত নির্লিপ্ত থাকতে পারে? তরু নাক কুঁচকালো।

খাবার দিয়ে চলে যাবার সময় জয় ডাকল, “এএ চেয়ারে বস।ʼʼ

-“আপনি খান, আমি ঘুমাবো।ʼʼ

জয় শুনল না। বলল, “তুই তো রাতে খাসনি।ʼʼ

তরু থতমত খায়, “খাইনি মানে?ʼʼ

-“বাংলা কথা বুঝিস না? আমি আসলে খাবি, তাই খাসনি।ʼʼ

পুরোপুরি নিশ্চিত জয়। তরু লজ্জা পেল, “আপনি খান।ʼʼ

জয় মৃদু ধমক দিলো, “তুই না বললেও খাবো আমি। বসে পড়, প্লেটে খাবার নে। একা একা খাইতে ভাল্লাগেনা আমার।ʼʼ
খেতে খেতে একবার তাকালো জয় তরুর দিকে। নির্দিধায় সুন্দরী, মায়াবতী উপাধি পাওয়ার যোগ্য তরু। আজ এই নির্ঘুম রাতের শেষে জয়ের ক্লান্ত-আধমাতাল চোখে আরও সুন্দর দেখতে লাগছে। তার যত্নের কেউ নেই কোথাও, তরু ছাড়া। হুট কোরেই চোখে ধরে গেল জয়ের। সে চোখ নামালে তরু তাকাল। ভেজা চুল, পরনে সাদা লুঙ্গি, ঘাঁড়ে গামছা। মাথা নিচু কোরে খাচ্ছে আর পা দোলাচ্ছে জয়।

তরুর দেখার মাঝেই হুট করে বলল জয়, “এভাবে তাকায়ে থাকিস না। তোর নজরের প্রেমে-টেমে পড়ে গেলে শেষে জাত যাবে।ʼʼ

তরু হেসে ফেলল, মাথা নুইয়ে নিলো। জয় দেখল, স্নিগ্ধ হাসি তরুর। মেয়েটা চঞ্চল, তবে তার সামনে আসলে খুব গুছিয়ে নেয় নিজেকে, একজন কর্তব্যপরায়ন নারী হয়ে ওঠে। শেষরাতে তাদের এই নৈশভোজের অভ্যাস খুব পুরনো।

তরু হাসি সামলে বলল, “প্রেমে পড়ার হলে কবে পড়তেন।ʼʼ একটু থেমে আবার বলল, “আপনার আসলেই ভালোবাসা আসেনি কোনোদিন আমার প্রতি?ʼʼ

জয় বাচ্চাদের মতো মাথা নাড়ল, “উহু! ভালোবাসা জিনিসটা আমার সিস্টেমের বাইরে, ওসব বুঝি না আমি। তোর ওপর কোনোদিন ভালোবাসা আসেনি। তবে মায়া আছে একটা।ʼʼ

তরু ভ্রু কুচকায়, অবাক হয় “মায়া? তা কেন?ʼʼ সে আশা করেনি জয়ের মুখে এমন কথা শোনার।

-“সেবাযত্ন করিস, তার ভাড়া।ʼʼ রসিক হাসি হাসে জয়।

তরু স্মিত হাসে। চোখ ফেরায় না।

খানিক পর জয় আনমনে বলে, “কারণ আমারে কেউ কোনোদিন নিঃস্বার্থ ভালোবাসে নাই, ভালোই বাসে নাই। আমার মনে হয়, তুই একমাত্র একটা পাগল, যে আমাকে বিনা স্বার্থে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া মনোযোগ ও ভালোবাসা দিয়েছিস। চালাক হ, তরু। প্রতিরোধ গড়ে তোল আমার বিরুদ্ধে। বিদ্রোহ কর, বিদ্রোহ। জয়দের ভালোবাসতে নেই।ʼʼ

তরূ চমকে উঠল, “খালা, খালু আপনাকে…ʼʼ

জয় হেসে ফেলল কেমন করে যেন। অর্ধেকটা খাবার ভর্তি প্লেটের মাঝে পানি ঢেলে হাত ধুয়ে ফেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল, “আমি বিশাল বড়লোকের চেংরা।ʼʼ

কথাটা বলেই চোখ মারল জয়, “বাপের সমস্ত সম্পত্তির একমাত্র মালিক আমি। এমনিতেও আমি বেশিদিন দুনিয়ায় থাকব না, তাতে আমার পর সবকিছু অটোমেটিক্যালি আমার পালনকারীদের হয়ে যাবে। যেটাকে তুই তাদের ভালোবাসা বলতে চাইছিস, সেই তথাকথিত যত্ন আমি রাস্তার কারও কাছেও পেতাম। আমার নামে আমার ধোঁকাবাজ বাপ-মা মোটা টাকার গুদাম রেখে গেছে।ʼʼ

তরু অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু হামজা ভাই..ʼʼ

জয়ের হাসিটা এবার রহস্যজনক দেখতে লাগল, ঘাঁড়ে হাতের তালু ঘষে বলল, “ভালোবাসা আর প্রশ্রয়ের মাঝের পার্থক্য তুই বুঝিস না, না? আমিও বুঝতাম না।ʼʼ

মাঝখানে একটু থেমে দু’বার মাথা ঝাঁকি দিলো জোরে করে। ঝিঝিম করছে মাথাটা। সামলে বলল, “ভালোবাসায় প্রশ্রয় কম থাকে, খুব কম। সেখানে কঠোর শাসন থাকে, আবার ক্ষেত্রবিশেষ প্রবল ছাড়। রাস্তার অপরিচিতকে ধরে তুই শাসন করতে যাবি না। যার ওপর টান লাগে, মায়ার টান… যেইটারে তোরা ভালোবাসা বলিস, তারে মানুষ শাসন করে। আমারে কেউ কোনোদিন শাসন করে নাই!ʼʼ

তরু কেঁপে উঠল নিজের অজান্তেই। জয় কখনোই নিজেকে নিয়ে বলে না। কোনোভাবেই না। জয়ের উদ্ভট হাসির সাথে এমন সব কথাগুলো খুব বিঁধছে।

-“আমি যখন একের পর সিগারেট ফুঁকে যাই, হামজা ভাই কোনোদিন ধমক দিয়ে বলে নাই, সিগারেট ফেল, আর ছুঁবি না। ক্লাস এইটে প্রথমবার সিগারেট ঠোঁটে রেখে আগুন জ্বালাইছি, হা হা হা! তখন গলা জ্বলতো খুব। একেকবার ধোঁয়া গেলার সময় গলা দিয়ে পুড়তে পুড়তে যেত নিকোটিন। কেউ সেদিন চটাং করে একটা থাপ্পড় মেরে কেড়ে নেয় নাই সিগারেটটা। গলা পুড়েছে, আমি ধোঁয়া টেনে গেছি। এক সময় সঁয়ে গেল, আর ছাড়তে পারলাম না। হামজা ভাই জানল, কিন্তু কিছু বলল না। কলেজে উঠার পর দেখতাম বন্ধুরা ইচ্ছামতো চুল কাটতে পারে না, বাপ নাকি মারবে। আমি যেমন খুশি, যেভাবে খুশি, যা খুশি করে বেড়াতাম। সবাই আমায় এজন্য লিডার মানতে শুরু করল, আমি ওদের কাছে স্বাধীনচেতা, ভাবের গুরু হয়ে উঠলাম। তখন মনে হতো, শালার আমারই তো জীবন! আর কী লাগে? সবগুলা শালা দুর্ভাগা, কী জীবন ওদের? ইচ্ছেমতো কিছু করতে পারেনা, বাপের গোলাম সবগুলা, সবগুলা খবিশ! হা হা হা! ʼʼ

টেবিলে ঝুঁকে পড়ে ঘাঁড় মুচড়ালো এদিক-ওদিক। পর পর চোখের পাতা ঝাপটালো কয়েকবার। চোখ বুজে হাসল আবার, “পরে বুঝলাম, ওদের মতো দুর্ভাগা আমি চাইলেও হইতে পারব না। ওরা দুর্ভাগা কারণ ওদের বাপ-মা আছে। চুল কেটে বাড়ি গেলে বাপ মারে, মা গালি দেয়। সিগারেট টানলে বাপ জানলে খবর খারাপ হবে। আমার এসব হওয়ার চান্স নাই, কারণ আমার তো বাপ-মা-ই নাই! হে হে! কে মারবে, গালি দেবে? আমাকে শাসন করার তো কেউ নাই? আমিই সিকান্দার, আমি বাদশা!ʼʼ

টেবিলের এক কোণে কফির মগ রাখা ছিল। কফি ঠান্ডা শরবত হয়ে গেছে, তাতে চুমুক দিয়ে বলল, “রাত করে বাড়ি ফিরলে হামজা ভাই জানলে দু চারটা গালি দেয় মুখে, কিন্তু তা ভয় পাওয়ার মতো না। মাল গিলে ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি ঢুকলে মামি যত্ন করে ঘরে তুলে শুইয়ে দিয়ে যায়। আমার বন্ধুরা বলতো, রাত এগারোটার সময় বাড়ি ঢুকলে মা নাকি বাপের কানে অভিযোগ লাগায়, পরে বাপ পেদানি দেয় ইচ্ছেমতো। মা জাতের ওপর চরম রাগ হতো আমার! আমার মামি তো রাগ করে না, আমি শেষ রাতে বাড়ি ফিরলেও দিব্যি হাসিমুখে দরজা খুলে চুপি চুপি ঘরে তোলে আমায়! আমার মাও নাই, ভয়ও নাই। কেন এত সুখ পেয়েছি বলতো আমি? কারণ আমার অপরাধ আর বখাটেপনা দেখে দুই গালে কষে দুটো থাপ্পড় মারার মতো বাপ নামক বিপদটা ছিল না আমার, চুল বড় করে কাটলে তা ছোট করে কেটে আসতে ফের আবার সেলুনে পাঠানোর জন্য মা নামক ঘ্যানঘ্যানে রেডিও ছিল না আমার। দিনদিন পাওয়ার আর জিদ সমান্তরাল হারে বাড়ছে খালি।ʼʼ

দাঁত বের করল হাসল জয়, “মামার সাথে চাকরের মতো ব্যবহার করেও কোনোদিন একটা ধমক খাইনি।ʼʼ ডান কানে তর্জনী আঙুল ঢুকিয়ে ঝাঁকালো, দুবার চোখ ঝাপটে মুচকি হাসল আবার, “প্রতিমাসে ব্যাংক থেকে আমি যে পরিমাণ টাকা উঠাই, তার একভাগও লাগেনি আমার কোনোদিন এত আয়েস করে চলার পরেও। বাকিটা এই বাড়ি খেয়েছে। আমায় কোনোদিন শাসন করা হয় নাই, আমারে ভালোবাসা হয় নাই!ʼʼ

একটু থেমে বলল, “অর্থাৎ একজন মানুষের জন্য তার আশেপাশের মানুষের ভালোবাসার প্রকার ভিন্ন। হামজা ভাই আমার প্রশ্রয়দাতা। কিন্তু, ওই যে আর পাঁচজনের মতো ধমক-ধামক টাইপের ভালোবাসা পাই নাই আমি।ʼʼ

তরুর মনে হলো, জয়কে দেখে যতই মনে হোক সে মাতাল হয়নি, সে বেশ ভালো রকমের ভিনটেজ কনডিশনে আছে। নয়ত তার ওপর বোমা মেরেও একটা দুঃখের বা ব্যক্তিগত আলাপ বের করার উপায় নেই। সে বিরবির কোরে বলল, “সব বুঝেও কেন খারাপ হলেন আপনি?ʼʼ

জয় উঠে দাঁড়াল, পরে আবার চেয়ার কনুই রেখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে বলল, “খারাপ হয় না তরু, খারাপ জন্মায়।

তরু প্রতিবাদ করল, “উল্টো বললেন। খারাপ হয়ে কেউ জন্মায় না, পরে জীবনের ধারায় তারা খারাপ হয়।ʼʼ

মাতালের মতো মাথা দুলায় জয়, “অহ, ভুল বলেছি? তাইলে হবে হয়ত তাই। কিন্তু আমার খারাপ হবার পেছনে কোনো কারণ নাই। আমি খারাপ তাই আমি খারাপ। কারণ আমি খারাপ।ʼʼ

মাথা ঝুঁকিয়ে খানিক চুপ থেকে আবার অন্য স্বরে বলল,
“যখন খারাপ হয়েছি, তখন বুঝি নাই। আমায় কেউ ভালো হতে বলে নাই। অথবা খারাপ হওয়া থেকে আটকায়নি। তা বুঝলাম তো এই তো সেদিন। মানুষ আঠারো বছরে ম্যাচিউর হয়, আমি পঁচিশের কোঠা পেরিয়েও ঠিকমতো কিছুই বুঝিনি। যা বুঝছি তা বোঝা ঠিক হয়নি।ʼʼ

হুটহাট জিজ্ঞেস করল তরু, “আপনি বিয়ে করবেন না?ʼʼ

জয় ভাবুক হবার নাটক করল, “করলে তোকে করতাম। যত্ন তো কম করিস না আমার! কিন্তু বাইরের থালায় স্বাদ চেখে বেড়ানো পাবলিক আমি, শুধু শুধু কাউকে ঘরে তুলব ঘর পাহারা দিতে? তাছাড়া ভালো না বেসে বিয়ে করা ঠিক না, আমি কারও প্রেমে পড়ি নাই কোনোদিন। তুই মায়ায় বাঁধিস, কিন্তু আমি জানি ওইটারে ভালোবাসা বলে না। তোর যত্ন-মনোযোগ আমার ওপর অপরিহার্য তরু, তুই ছাড়া দিন চলে না। কিন্তু কেন যে তোকেও ভালোবাসতে পারলাম না! ভালোবাসলে সত্যি বিয়ে কোরে বাড়ি নিয়ে যেতাম! শালা আমার আর উন্নতি হবে না রে!ʼʼ

তরুর চোখদুটো সজল হয়ে উঠেছিল। ভাঙা কণ্ঠে ক্ষোভের সাথে বলল, “মায়া কেন লাগে? দয়া হয় আমার ওপর, তাই না?ʼʼ

-“উহু! দয়া না, মায়া।ʼʼ

-“মায়া কেন আছে?ʼʼ

জয় এবার প্যাচপ্যাচে হাসল, “আমিও অনাথ, তুই বাপ-মা থেকেও অনাথ। চোরে চোরে খালাতো ভাই।ʼʼ

আকাশ পুরোপুরি আলোকিত প্রায়। জয় রুমে যেতে যেতে বলল, “খাওয়া শেষ করে একবার রুমে আয়।ʼʼ

তরু জয়ের রুমে ঢুকল মিনিট পাঁচেক পরে। জয় জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছিল। বোঝার উপায় নেই জয়কে। মাতাল নাকি স্বাভাবিক, কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।

তরুর উপস্থিতি টের পেয়ে বিছানার ওপর থেকে একটা ব্যাগ তুলে তরুর দিকে এগিয়ে দিলো, “এবার চুপচাপ আমার রুম থেকে বের হয়ে যাবি উইদাউট এনি প্যানপ্যান।ʼʼ

তরু দেখল, ভেতরে একটা নীল শাড়ি। ডুকরে কান্না পেল। মাঝেমধ্যে এত নিষ্ঠুর আর রহস্যজনক লাগে জয়কে। কী বলে, কী করে বোঝার উপায় থাকেনা। জয় বারবার জিজ্ঞেস করে, কেন তরু ভালোবাসে জয়কে? তরু জানে না তা ভালোবাসা কিনা। তবে জয়ের কথায় আজ সে নিজের অনুভূতির নতুন নাম পেয়েছে। মায়া। হ্যাঁ, মায়াই বটে। নয়ত কী? ছেলেটার জন্য অসীম মায়া লাগে তরুর। তরু জানে, জয় নোংরা। আবার সে এটাও মানে, সে নিজেও নোংরা তাই জয়ের প্রতি এই মায়া। হোক, সে নোংরাই তবে। এখন যেমন মন চাইছে, শক্ত ওই বুকে উত্তাল ঢেউয়ের মতো আঁছড়ে পড়তে। অথচ অনুমতি নেই প্রকৃতির, সায় নেই উদ্দীপনাবাহী সংবেদনশীল কাঠামোর।


শুক্রবারের সকাল। রাতে জিডি করে আসা হয়েছে। কিন্তু কোনো খবর নেই। তবু কেন যেন অন্তূ আশাহত হতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল সব ঠিক হবে, কিছুই হয়নি।

আমজাদ সাহেব বাজারে গেলেন, তখন সকাল দশটা। অন্তূ বসে পড়ছিল শীতের সকালের তপ্তহীন রোদে। যাওয়ার সময় আমজাদ সাহেব অন্তূর পাশে বসে ছোট্ট একটা লিস্ট তৈরি করে নিয়েছিলেন।

রাবেয়া রসুন-পেয়াজ কেটে রাখলেন সেই রোদেই। মার্জিয়াকে আর ডাকা হয়নি। সারারাত নিশ্চয়ই না ঘুমিয়ে সকালের দিকে ঘুমিয়েছে এই শরীরে!

ঘড়ির কাটা যখন দুপুর সাড়ে বারোতে, আমজাদ সাহেব এলেন না। অথচ উনার ফেরার কথা বড়োজোর সাড়ে এগারোটা। চারদিকে জুময়ার আজান ফুরিয়ে এলো, তিনি ফিরলেন না। অন্তূ বারবার কোরে গেইটে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে এসেছে। আব্বুর দেখা না পেয়ে ফিরে এসেছে। রাবেয়া অতিষ্ট হয়ে বসে ছিলেন।

সময় পেরিয়ে দুপুর দুটো বাজল, আমজাদ সাহেব এলেন না। অন্তূর ভাবনার টনক নড়ল। সে কমপক্ষে বিশ-পঁচিশটা কল এতক্ষণে করেছে আব্বুর নম্বরে, বারবার বন্ধ বলার পরেও। ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে এলো, দূর রাস্তার মোড় অবধি চেয়ে রইল কতক্ষণ। আমজাদ সাহেবের পাত্তা নেই। রোদ গায়ে লাগছিল না অন্তূর। সে দাঁড়িয়ে রইল ছাদের রেলিং ঘেষে ঘোলা চোখে। মনটাকে কেটে ভেতর থেকে আলাদা করে ফেলতে ইচ্ছে করলো। আজেবাজে চিন্তারা ভিড় করছে সেখানে। খুব জ্বালাতন করছে।

দুপুরে রান্না হয়নি, খাওয়াটাও হয়নি। সকালে আব্বুর সাথে বসে ঘি-আলুভর্তা দিয়ে আম্মুর হাতের খিচুড়ি খেয়েছিল।

ছটফটানি বাড়ল যখন সন্ধ্যা হলো। সময়ের আবর্তন রাত দশটার কাঁটা অতিক্রম করল। আমজাদ সাহেব বাজার থেকে ফেরেননি তখনও। খুব লম্বা বাজার করছেন।

অন্ধকার চারপাশ। পূর্ণচাঁদ আকাশে। ছাদে দাঁড়িয়ে থেকে অন্তূর খুব হিংসে হলো ওই আলোকিত চাঁদকে। আব্বু বাড়ি ফিরল না এখনও, তার খোঁজ তো চাঁদ রাখেনি। বরঞ্চ জ্বলজ্বল করছে আকাশ পানে। স্বার্থপর খুব চাঁদটাও। অন্তূর দুঃখে সে একটুও দুঃখী নয়।

অন্তূ চেয়ে রইল পাড়ার সরু গলির মোড়ে চেয়ে। বারবার চোখে ভেসে উঠছে আমজাদ সাহেব বাজারের থলে হাতে সরু রাস্তাটাতে ঢুকছেন। হ্যালুসিনেশন হতে থাকল অন্তূর।
আমজাদ সাহেব ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে বাজারের ব্যাগ অন্তূর হাতে ধরিয়ে গম্ভীর স্বরে বলছেন, “আরে! একটা জরুরী কাজ পড়ে গেছিল। আমি কি বাচ্চা ছেলে? এত চিন্তা করতে হবে কেন তোর? ফোনে চার্জ ছিল না, বন্ধ হয়ে আছে।ʼʼ

চলবে…

[ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। রিচেইক করিনি]