অবরুদ্ধ নিশীথ পর্ব-১৭+১৮+১৯

0
21

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

১৭.

বাড়িতে শুধু তিনজন মেয়ে মানুষ। রাত বারোটার দিকে রাবেয়ার চেঁচামেচিতে ছাদ থেকে নেমে এসেছিল অন্তূ। বাড়ির মেইন দরজা আটকাতে গিয়ে আরও কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল আব্বু অপেক্ষায়। আব্বু আসলই না!

জানালার ধারে বই নিয়ে বসে জানালাটা খুলে দিয়েছিল। রাবেয়া ঘরে এসে আরেক দফা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জানালা খোলা নিয়ে। ঠান্ডা হাওয়া আসছে, তা যেন শুষে নিচ্ছিল অন্তূ। একদৃষ্টে চেয়ে ছিল বাইরের অন্ধকার কুয়াশাচ্ছন্নতায়।

চুপচাপ এভাবে বসে থাকায় বুকের ব্যথাগুলোয় যেন আগুনে তুষের ছিটা পড়ছিল। অন্তিক আজ তিনদিন বাড়ি ফেরেনি। আব্বু সকালে বেরিয়েছে, রাত দুটো বাজল, সেও ফিরল না। অন্তূর কান্না পাচ্ছে কি? আবার কখনও শক্ত হয়ে উঠছে চোয়াল। নানাভাবে ভেবেও কোনো রকম ব্যাখ্যা বের করতে পারেনি। অন্তিক কোথায় গেছে, আব্বু আসছে না কেন?

রাবেয়া সেদিন অন্তূর ঘরে ছিলেন। কেন জানি তিনি অনেকটা সময় নিয়ে লম্বা একটা মোনাজাত করলেন নামাজ শেষে। আম্মুর কান্নার গুনগুনানি অন্তূর কানে গলিত লোহা হয়ে ঢুকছিল। বাইরে রাত বাড়ার সাথে সাথে যখন ঝি ঝি পোকার ডাক প্রকট হয়ে এলো, তখন চোখের পানি শুকিয়ে রাবেয়া কাত হয়ে শুয়েছেন কোনোরকমে।

অন্তূ কম্বল তুলে দিলো উনার গায়ে। এরপর তিন-চারবার আব্বুর নম্বরে ডায়াল করল। রিসিভ হলো না। অযু করে এসে তাহাজ্জদের নামাজে বসেছিল, তখন রাত তিনটা ছুঁই-ছুঁই। নামাজে খুব বিঘ্ন ঘটছিল, কেন জানি কান্নারা বাঁধ মানছিল না। কান্নার তোড়ে সিজদা লম্বা হচ্ছিল, নাক টানতে হচ্ছিল বারবার। বুকের ভেতর কয়েকবার দম আটকালো। এসবের কারণ স্পষ্ট নয় অন্তূর কাছে। তবে বুকে তুমুল ঝড় উঠেছে, কঠোর আশঙ্কারা নেচে নেচে কীসব অলুক্ষুনে কথাবার্তা বলতে চাইছে।


জয় এসেছে, তা হামজা জানতে পারল সকাল দশটার দিকে। জয়ের রুমে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। অথচ তার এতক্ষণ চিৎপটাং হয়ে পড়ে থাকার কথা। বেড-সাইড টেবিলের ওপর বিয়ারের ক্যান উল্টে পড়ে আছে। বিছানায় কম্বল ছড়ানো। হাতঘড়ি, ওয়ালেট, পারফিউম—সব নিজেদের জায়গায় পড়ে আছে। তার মানে জয় আশেপাশেই কোথাও আছে, দূরে বের হলে এসব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একাকার হয়ে থাকতো। তরুকে ডাকল হামজা। তরু এলো না, গলা উঁচিয়ে জবাব দিলো।

-“জয় কখন এসেছে কাল রাতে?ʼʼ

তরু চেঁচিয়ে জবাব দিলো, “ভোর রাতে।ʼʼ

-“আবার তাহলে বের হয়েছে কখন?ʼʼ

-“সকাল আটটার দিকে বের হয়ে গেল। বলে গেল, এক্ষুনি আসবে। আপনি কল করুন, বড়ভাইয়া।ʼʼ

হামজা এসে সোফায় বসে রিমিকে ডাকল, “এক কাপ কফি বা চা কিছু একটা দাও।ʼʼ

রিমি আস্তে করে বলল, “আসছি।ʼʼ

হামজার মনে পড়ল, আজ সকালে ছোট্ট একটা মিটিং ছিল ক্লাবে জয়ের। মাঝখানে আর দু’দিন তিনরাত বাকি নির্বাচনের। চারদিকটা এতটা ঠান্ডা থাকার কথা না থাকলেও ঠান্ডা, কারণ আসল প্রতিপক্ষ এখনও হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ির ওপর আছে। লোক মারফতে খবর পাওয়া গিয়েছে খুব শীঘ্রই রিলিজ করা হবে ওকে। হামজা মনে মনে প্রস্তুত যেকোনো কিছু মোকাবেলার জন্য। তবে হাঙ্গামা নির্বাচনের পর হলে সুবিধা হয়। আর সেটার শতভাগ চেষ্টা করতে হবে।

রিমি কফি দিয়ে চলে যেতে অগ্রসর হলে পেছন থেকে ডাকল হামজা, “আজ যাবে ওই বাড়ি?ʼʼ

-“না।ʼʼ

হামজা চোখ তুলে তাকিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “আমি নিয়ে যাব, আমার সঙ্গে চলে আসবে।ʼʼ

কফির গরম ঠোঁটে লেগে নড়েচড়ে উঠল হামজা। দ্রুত কাপ নামিয়ে বলল, “এত গরম কেন? পরের বার কফি বানালে এত গরম পানি ব্যবহার করবে না।ʼʼ

-“আপনারই বা এত তাড়াহুড়ো কীসের? ঠান্ডা হতে তো ঘন্টাখানেক সময় লাগবে না।ʼʼ

গম্ভীর স্বরে কথাটা বললেও তাতে অল্প একটু অভিমানও যেন শুনতে পেল হামজা। অথচ মেয়েটার অভিমান তার ভালো লাগে না। নির্বাচনের মুহুর্তে সকলের মনোনয়নের পাশাপাশি রিমির সম্পূর্ণ মনোযোগ চাই তার, নয়ত বেশ নার্ভাস ফিল হবে।

-“যাও, তৈরি হও।ʼʼ

-“যাব না, আমি। আর এমনিতেও মাজহার ভাই বাড়িতে আসেনি এখনও।ʼʼ

হামজা যেন শুনল না কথাটা, বলল, “এ জন্যই নিয়ে যাব। ও আসলে তুমি এমনিতেও ওই বাড়িতে যাবার অনুমতি পাবে না। তৈরি হয়ে নাও।ʼʼ

-“যাব না আমি। আপনি আমায় আপনার বন্দিনী করে রাখতে চান? ক্ষমতার লোভ আপনাকে অমানুষ করে তুলছে দিনদিন, তা বুঝতে পারছেন না। আপনাকে আমি ভালোবেসেছিলাম কোনোদিন, এটা ভাবতেও নিজের ওপর ঘেন্না লাগে আজকাল। দয়া করছেন আমার ওপর, ও বাড়ি নিয়ে যাবার অফার কোরে?ʼʼ যথাসম্ভব অশিষ্ট ভাষায় কথাগুলো বলল রিমি।

হামজা কফির মগ সেন্টার টেবিলে রেখে হাসল, অসীম ধৈর্য্যশীল এক পুরুষের মতো নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “নিজেকে চেনা যতটা মুশকিল, তার চেয়েও বেশি কঠিন হলো নিজের মানুষদের চিনতে পারাটা। তুমি চিরকাল ওই বাড়ির সকলের হাসি মুখ আর আদুরে আচরণ পেয়ে বড় হয়েছ, ওদের ব্যাপারে তোমার ধারণা ওই অবধিই সীমাবদ্ধ, কিন্তু ওটা শুধুই নিজের পরিবারের জন্য বরাদ্দ। যেমন আমি এই বাড়ির জন্য এক হামজা, গেইট পেরিয়ে রাস্তায় পা রাখলে আরেকটা কেউ। মাজহার আমার কাছে এত এত ছাড় পেয়েও বহুত কিছু করেছে এতদিনে, এবার তাহলে ভাবো এবার সুস্থ হয়ে কী করতে পারে? আর এবার ও ফিরে যা করবে, আশাকরি আমার ওপর দিয়ে যাওয়া সেই চাপ দেখে তোমার ভাইয়ের ওপর ভালোবাসায় একটু চিড় ধরতে পারে।ʼʼ

রিমির হাত চেপে ধরল হামজা। রিমি তা ছিটকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “আমার ভালোবাসায় চিড় ধরাতে খুব চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তাই না? আল্লাহ জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দিক আপনার চেষ্টাকে। দরকার পড়লে এই বাড়িতেই পচে মরবো, যখন আপনার মতো জাহিলের সাথে বিয়ে হয়েই গিয়েছে, তখন আপনার বাড়িতেই মরণ হোক আমার! আপনার মতো অমানুষ শত্রুতা পুষবে, এটা আর এমন অস্বাভাবিক কী? কিন্তু যে মাজহার ভাই আমাকে আপন বোনের মতো বুকে চেপে মানুষ করেছে, তার রক্ত ঝরার কারণকে না আমি ক্ষমা করতে পারি, আর না কোনো বিবেচনা!

-“শত্রুতা আমি শুরু করিনি। শত্রুতা ওরা শুরু করেছে, এবং সেটাও বহুদিন আগে। যেবার প্রথম আমি ছাত্রনেতা নির্বাচিত হয়েছিলাম, মাজহারের ছেলেদের মাঝে কারও বিশ্ববিদ্যালয়ের কন্ট্রোল হাতানোর ছিল, সেটা না পারায় এই শত্রুতার শুরু। এরপর দিনদিন আমার জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়া তোমার চাচা, চাচাতো ভাই, বাপ এদের শত্রুতার আগুনে পেট্রোল ঢেলেছে। তোমাকে বিয়ে করতে চাইলাম। প্রথমে রাজি হলো না, পরে রাজী কেন হলো জানো? আমি বাড়ির জামাই হয়ে গেলে ওদের হাতের লাঠি হয়ে যাব, আমার ক্ষমতা এবং জনপ্রিয়তার ভাগ পাবে ওরা। তা যখন হলো না, তখন একের পর আক্রমণ পেয়েছি এই কয় বছরে ওদের থেকে। কিছুই বলিনি কোনোদিন। কিন্তু আমার পর যখন জয় নেতাকর্মী হলো, তখন আবার নতুন কোরে জ্বলে উঠেছে তোমার বাপ-চাচার। এবার বলো, শত্রুতা কারা পুষছে, আর এর সমাধান কী? কোনো সমাধান নেই, এভাবেই যতদিন চলে। আর এরপরেও তুমি অবুঝ হলে, তোমার ওপর কঠোর হতে বাধ্য হবো বোধহয় আমি ʼʼ

রিমি আর এক মুহুর্ত দাঁড়াল না। তখনই গান গাইতে গাইতে ঢুকল জয়, “হামজা ভাইয়ের হবে জয়, ও ভাবী গো.. হামজা ভাই খারাপ লোক, জয়ের মালা তারই হোক, উড়ছে পাখি দিচ্ছে ডাক, হামজা ভাই জিতে যাক… ও আমার ভাবী গো, ও প্রাণের ভাবী গো..ʼʼ

হামজা হেসে ফেলল। জয়ের পরনে দুধের মতো সাদা ধবধবে একটা লুঙ্গি। তার ওপর ছাইরঙা শার্ট পরেছে। কোলে কোয়েল। কবীর ঢুকেই কপালে হাত ঠুকে সালাম করল। ওকে বসতে ইশারা করল হামজা। তার পেছনে দুজন একটা মস্ত বড় অ্যাকুরিয়াম বয়ে নিয়ে এসে বসার ঘরের মেঝেতে রাখল।

হামজা ভ্রু কুঁচকে বলল, “এসব টেনে এনেছিস কোন দুঃখে? অল্প একটু টেমপার উঠলেই যাতে ওটাকে আগে ভাঙা যায়?ʼʼ

কোয়েল জয়ের কোল থেকে নেমে দৌঁড়ে এসে মামার কোলে চড়ে বসে। জয় লুঙ্গি একহাতে উঁচিয়ে ধরে রুমে গিয়ে কিছু টাকা এনে লোকদুটোকে দিয়ে বিদায় করল। হামজার পাশে বসে কোয়েলকে বলল, “যা, এবার তোর মাকে ডেকে আন। তোর মার কাঁদার পানির চোটে সবগুলো বালিশের তুলো পঁচে গেছে।ʼʼ

তুলি কোথা থেকে দৌঁড়ে এসে কোয়েলকে কোলে তুলে নিয়ে এ-গালে ও-গালে চুমু খেতে লাগল, এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলল। হুট করে কিছু মনে হতেই কোয়েলকে নামিয়ে জয়কে জিজ্ঞেস করল, “তুই কী করেছিস ওই বাড়ি গিয়ে? মেরেছিস সীমান্তকে, তারপর এনেছিস কোয়েলকে?ʼʼ

জয় বিরক্ত হয়ে বলল, “মহিলা মানুষ কোনোদিন ভালো হবে না? তোকে মেরে মুখের নকশা বদলে বাপের বাড়ি পাঠিয়েছে, তারপর…..। মেয়েটাকে রেখে দিয়েছিল জোর করে, তারপরেও কলজে ফাটতেছে সোয়ামীর জন্য? সামনে থেকে যা, ন্যাকা কান্না দেখলে ডায়াবেটিস বাড়ে আমার। সুগার আছে ন্যাকামিতে।ʼʼ

কোয়েল এসে কোলে চড়ে বসে আধভাঙা স্বরে জিজ্ঞেস করল, “জয়! ওই মাতগুলোকে বের করে খেলি আমি? বেল কোলে দাও একটাকে?ʼʼ

জয় মাথা নাড়ল, “তার আগে তোমাকে আমি পানিতে চুবিয়ে খেলবো দশ মিনিট, এরপর মাছকে পানি থেকে বের কোরে তোমার কাছে দেব খেলার জন্য।ʼʼ

হামজা কেড়ে নিলো কোয়েলকে, জয়কে বলল, “তার আগে আমি তোর পেছনে দুটো লাত্থি মেরে খেলি, তারপর বাড়ি থেকে বের করে দেই? শয়তানে লাড়ে তোকে?ʼʼ

-“শয়তানকে আমি লাড়ি। এইটা আমার প্রিয় কাজ, ব্রো!ʼʼ

হামজা গম্ভীর হলো হুট করে, “সীমান্তকে মেরেছিস?ʼʼ

জয় সোফায় পা তুলে বসে বলল, “না, সুন্দরমতো জিজ্ঞেস করেছি কেন মেরেছিস তুলিকে?ʼʼ

-“তো কী বলল?ʼʼ

-“কাম নাই করার মতো, বাল নাই ছেঁড়ার মতো, তো বউ পিটাইছে। আমারও কাম অথবা বাল ছিল না হাতে, আমিও দুই চারটা লাগায়ে আসছি। পরে বাপের মার খাওয়া দেখে এই কোয়েলের ডিম কাঁদা ধরল, তারে নিয়ে যাইয়া অ্যাকুরিয়াম কিনে দিয়ে শান্ত করছি।ʼʼ

-“মিছিল হয়েছে সকালে? ঝামেলা হয়েছে কোনো?ʼʼ

-“না। শুনলাম মাজহার শালার পায়ে নাকি খাঁটি স্টেইনলেস স্টিল ঢুকাইছে! ওই শালা দিনাজপুর ব্যাক না করা অবধি বিশেষ ঝামেলা হবার কথা না। পেছনে যতই বদনাম পাবলিক করুক, জয়ের নামে ডরায় তো সবাই! এইটুকুই যথেষ্ট! মাজহার আসবে নির্বাচনের আগের দিন। রিলিজ করবে কাল-টাইল মনেহয়!ʼʼ

রিমি এসে জয়ের পাশে বসল। তার হাতে খাবারের প্লেট। খাবার তুলে জয়ের মুখের সামনে ধরে বলল, “খাননি সকালে?ʼʼ

-“সেহরীর সময় খাইছিলাম। আসলেই চরম খিদে লাগছে, ধুর, ওই মাছ দিয়েন না, ডিমের টুকরোটুকু দেন।ʼʼ

রিমি কপাল জড়িয়ে বলল, “আপনার এত আহ্লাদ আসে কোত্থেকে?ʼʼ

জয় নির্লজ্জের মতো হাসল, “দয়ালের কাছ থেকে সরাসরি সাপ্লাই হয় আমার কাছে।ʼʼ

হামজা টাউজারের পকেট থেকে ফোন বের করল। রিমি এক আজব চরিত্রের মেয়ে। সব কিছুকে ছাপিয়ে তার জিদ। যে জয়ের ওপর তার অসীম ঘৃণা, আজ তার সাথে মিছেমিছি মিল বজায় রাখছে হামজাকে জ্বালাতে। জয় রিমির নাটক বুঝেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না, বরং হে হে করে হাসবে, এটা তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য!

জয় খাবার চিবোচ্ছিল, হামজা বলল, “ভোট কেন্দ্রগুলোতে এক্সট্রা নিরাপত্তার জন্য কিছু পলাশ ভাইয়ের লোকের দরকার পড়বে। আমি চাচ্ছিনা অন্তত সেদিন কোনো তামাশা হোক। বদনামসহ ভোট লাগবে না আমার। হামজা পাটোয়ারী নিখিল ভোটে, মানুষের মনোনয়নে জিতেছে, এই রব যেন লোকের মুখে মুখে থাকে। দুপুরের পর পলাশ ভাই ডেকেছে তোকে, ত্যাড়ামি না করে গিয়ে দেখা করে আসিস। তার হেরফের হলে কিন্তু অবস্থা খারাপ হবে তোর!ʼʼ

জয় উঠে অ্যাকুরিয়ামের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে মাছগুলোকে পর্যবেক্ষণ করল। আঙুল দিয়ে কাঁচের ওপর খুঁচিয়ে বেশ জ্বালালো মাছগুলোকে। ভেতরে একটা গোল্ডফিশ, দুটো অ্যাঞ্জেল ফিশ, আর এক জোড়া কালশিটে রঙের অস্কার ফিশ এনেছে। গোল্ড ফিস সে একটা কিনেছে কেন, সে-ই ভালো জানে। বহুবার ছোটো-বড় বহু ধরণের অ্যাকুরিয়াম কিনেছে, আবার রাগের সময় ওগুলোকে আগে ভাঙে। কবুতর, মাছ, খরগোশ—যেকোনো একটা কিছু পোষা প্রাণী হিসেবে থাকে সবসময় তার সংগ্রহে।

মাছের সামনে থেকে উঠে বলল, “দুপুরে যেতে পারবো না, ঘুমাবো আমি। বিকেলে গোসল করবো, খাবো। যাবো ঠিক সন্ধ্যার আগে। দু এক কলকি টেনেও আসবো তাহলে!ʼʼ

হামজা বকে উঠল, “কলকি টানার খবর পেলে এক কোপে বলি দিয়ে দেব, শুয়োরের বাচ্চা। যে কাজে পাঠাচ্ছি, তা কোরে ফিরে আসবি।ʼʼ


সকাল থেকে বাড়িতে রান্না হয়নি। সকালে একবার বমি করেছে মার্জিয়া।

অন্তূর ফোনটা বেজেছিল দুপুরের দিকে। অন্তূ দিন-দুনিয়া ভুলে ঘরে ছুটলো, নিশ্চয়ই আব্বু ফোন করেছে। কিন্তু স্ক্রিনে অপরিচিত একটা আনসেভড নম্বর। তবুও অন্তূর চোখ ভিজে উঠল, কণ্ঠনালি থেকে কান্না ছিটকে এলো এক মুহুর্তে। তার ধারণা, আব্বুর ফোনে চার্জ নেই, অন্য কারও নম্বর দিয়ে কল করেছে।

কল রিসিভ করেই কঠিন বোকার মতো ঝারি মারল একটা, “বয়স বাড়ার সাথে সাথে আক্কেল জ্ঞান কি গুলিয়ে খেয়ে ফেলেছ? একটা কল করে জানিয়ে দেয়া যেত না, যে কোনো কাজে আটকে গেছ? বাড়ির প্রতি তোমার না হয় টান নেই… আমারও তোমার ওপর টান নেই, তবে জলজ্যান্ত একটা মানুষ উধাও হয়ে গেলে একটু ভাবনা হয় তো নাকি?ʼʼ

রাবেয়া দোড়ে এসে দাঁড়ালেন মেয়ের পাশে। অন্তূ ফোনে বলে চলল, “তো কখন আসবে বাড়িতে? আর…ʼʼ

-“হ্যালো!ʼʼ ভরাট এক ধাতব কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ফোনের ওপাশ থেকে। অন্তূ থমকালো। আব্বুর কণ্ঠস্বর গম্ভীর, তবে তা চির-পরিচিত, এটা নয়। পিপাসার্ত মুখে চুপ রইল অন্তূ, তার ঠোঁট ফাটফাট করছে।

-“বেশি প্যাঁচাল না পেরে যে ঠিকানাটা বলছি, সেখানে চলে আসিস। আর..আর একটা পাখিও যেন সাথে না আসে বা জানতে না পারে কিছু।ʼʼ সংক্ষিপ্ত হুমকি-বাণীটি কর্কশ এবং হিংস্র ছিল।

কল কেটে গেল। সাথে সাথে একটা মেসেজ এলো। সেখানে একটা ঠিকানা লেখা—কাহারোল থানার নয়াবাদ মসজিদ।

রাবেয়া ঝাঁকাচ্ছেন ওকে অনবরত, বাবরার প্রশ্ন করেছেন। অন্তূ নিশ্চুপ চেয়ে থাকল ফোনের স্ক্রিনে। অন্তূর মাথায় এলো, ঠিকানায় উল্লিখিত জায়গাটা ঢেপা নদীর তীরে নির্জন এলাকার দিকেই নির্দেশ করছে। অন্তূর মাথা কাজ কথা বন্ধ করে দিয়েছে ইতোমধ্যেই।

রাবেয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেয়ে ছটফট করছেন। অন্তূ চট করে মুস্তাকিনকে কল করে বসল। কেন করল, সে জানেনা। ফোনে পরিস্কার জানিয়ে দেয়া হয়েছে, একটা পাখিও যেন টের না পায়। তবুও ফোন করেছে অন্তূ। সতন্ত্র এক এফবিআই অফিসারকে ডাকছে সে।

মুস্তাকিন এলো ঠিক বিশ মিনিটের মাথায়। ততক্ষণ অন্তূ ঠিক একই জায়গায়, একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল। মুস্তাকিন এসেছে টের পেয়ে নিস্তেজ হাতে মুখটা ওড়নার প্রান্তে আড়াল করে দাঁড়াল। মুস্তাকিন ঘটনা জানতে চেয়ে প্রশ্ন করল, অন্তূ জবাব দিলো গা ছাড়া ভাবে। তার চোখের কাতরতা মুস্তাকিনের দৃষ্টি এড়ানোর নয়, তবুও যথাসম্ভব শান্ত সে।

অন্তূকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি ভয়েসটাকে চেনেন অথবা আগে শুনেছেন?ʼʼ

অন্তূ অবচেতনের মতো মাথা নাড়ল, “না।ʼʼ

চলবে..

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

১৮.

রাবেয়া চেয়ার এনে দিলে মুস্তাকিন বসে বলেছিল, “বাহাদুরী করে একা যাবেন ঠিক আছে। এরপর আপনার সাথে কী হবে, তা দেখার জন্য ওখানে কে থাকবে? প্রথমে অন্তিক, পরে স্যার, এরপর আপনি, এরপর এ বাড়ির কার পালা?ʼʼ

অন্তূ নিশ্চুপ। মুস্তাকিন বলেছিল, “আমি ফোর্স ডাকি, তারা গোপনেই আপনাকে প্রোটেক্ট করবে, ওরা জানতে পারবে না কেউ গিয়েছে আপনার সঙ্গে। এবং তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমার।ʼʼ

অন্তূ রাজি হয়নি, “প্রয়োজন নেই, অফিসার! আমি কোনো ধরণের ছোট্ট একটা রিস্কও নিতে প্রস্তুত নই। আমার মন বলছে, ওরা ভয়ংকর। কথার খেলাপি হলে খারাপ কিছু হতেই পারে!ʼʼ

রাবেয়া কান্না লুকালেন শাড়ির আঁচলে। অন্তূ নিস্তেজ পায়ে এগিয়ে গিয়ে আলতো কোরে একবার আম্মুকে জড়িয়ে ধরেছিল। বেরিয়ে যাবার সময় মুস্তাকিন সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “এক ঘন্টা সময়। এর মাঝে না ফিরলে আপনি না ফিরলে আমি ইচ্ছেমতো পদক্ষেপ নিতে পারি।ʼʼ

মুস্তাকিন কেমন কোরে যেন চেয়ে ছিল মিনিটখানেক অন্তূর চোখের দিকে। সেই চোখের রহস্য বোঝার উপায় নেই। এরপর আশ্বাস দেবার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বিদায় জানিয়েছিল, “গড ব্লেস, ইউ।ʼʼ

বাঁশের হাঁটের ওপর থেকে গাড়িতে কোরে নয়াবাগ যেতে কমবেশি আধঘন্টা সময় লাগে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

নয়াবাগ মসজিদের অদূরে দাঁড়িয়ে থেকে তার ভেতরে এক প্রকার ছটফটানি কাজ করছিল। অন্তূ জানে না, এই অনিশ্চিত প্রবাহধারা তাকে ধাওয়া কোরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।

মিনিট দুয়েক বাদে দুটো লোক এসে নিয়ে গেল অন্তূকে। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল, অন্তূকে মেহমানদারীর উদ্দেশ্যে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। চারপাশের লোক আসল ঘটনা আন্দাজ করতে পারবে না এদের আচরণ দেখে, হয়ত বুঝলেও কিছুই বলবে না। রাজত্ব এদের, শাসন এদের। সমাজটা এদের নোংরা পায়ের তালুর তলে পদদলিত।

রাস্তাটা ক্রমশ ঢালু হয়ে এগিয়ে গেছে। দুপাশে বন, জঙলি এলাকার মতো। এককথায় নির্জন একটি জায়গা। অন্তূ হাসল। তার হাসি পাচ্ছে, নিজের জীবনের ঘটনাপ্রবাহের ওপর, এবং অনিশ্চিত আগামী কালের ওপর। আবার হাত-পা শিরশির করছে। সেটাকে পাত্তা দিলে মানসিকতা মেরুদণ্ডহীন এক কেঁচোর মাফিক হয়ে পড়বে। যাকে আলতো পায়ের চাপে পিষে মারা যায়। অন্তূ চাইল শক্ত হতে। কিন্তু পারা যাচ্ছে না। নারীমন মচকে যাচ্ছে।

একদম নির্জন জায়গাটির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে একটি বাংলো অথবা কোয়ার্টারের মতো বিল্ডিং। রঙচটা দেয়াল, মরিচা ধরা লোহার জানালাগুলো। ওর পেছনে হাঁটছিল লোকদুটো। এত কাছে, গা লাগিয়ে হাঁটছে, এতক্ষণে বেশ কয়েকবার প্রায় ছোঁয়া লেগেছে।

বাড়ির গেইটের ভেতর দিয়ে ঢুকতেই চোখে অন্ধকার দেখল। ঘুপছির মতো ভেতরটা, বিশ্রী গন্ধ আসছে চারপাশ থেকে। অন্তূর মাথা চক্কর কেটে উঠল অসহ্য দুর্গন্ধে। মদ এবং ড্রাগসের গন্ধ মিশে একাকার হয়ে একটা ভ্যাপসা পেট গুলানো দুর্গন্ধের সৃষ্টি করেছে। সিঁড়িতে ওঠার সময় বেশ কয়েকবার লোকদুটো যেন ওকে ইচ্ছে কোরেই ছোঁয়ার চেষ্টা করল।

অন্তূর কিছুই করার নেই। তার মনে হতো, সে প্রতিবাদী, অল্প হলেও। তার সামনে কোনো অন্যায় টিকার নয়। কিন্তু আজ ওসব কাজ করছে না। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। কলেজের ছোকড়াদের, অথবা পাড়ার মহিলাদের সম্মুখে প্রতিবাদী আওয়াজ উঠানোটাই জীবনের জিত এবং নিরাপত্তা নয়। আজ মনে হচ্ছে, তার প্রতিবাদ বোধহয় শুধুই মহিলা এবং সাধারণ অসভ্যদের সামনে সীমাবদ্ধ। নয়ত এখানে কেন সে একটা চলন্ত পুতুলের মতো হেঁটে চলেছে এভাবে? কোনোই প্রতিবাদের ভাষা মুখে আসছে না, হাতে উঠছে না। শরীরে কম্পন ধরেছে, মনে নারীসুলভ দূর্বলতা বিরাজ করছে। অসহায়ত্বের চাদরে পুরো অন্তূ-সত্ত্বাটা বাজেভাবে ঢাকা পড়েছে।

অর্থাৎ এই সমাজের খারাপদের সম্মুখে টিকে থাকার মতো প্রতিবাদ রপ্ত করা সাধ্যের বাইরে? সে নাহয় পারেনি, আচ্ছা না-ই বা পারল! কিন্তু মুস্তাকিন? সে একজন এফবিআই অফিসার। তার কাছে নাকি হুমকি-চিরকুট আসে, শাসানো ফোনকল আসে। মাঝপথে কেইস দাবিয়ে দেয়া হয়! সমাজে আসলে কাদের বিচার এবং রাজ চলছে? কারা ভালো আছে? চিৎকার কোরে কেউ যেন কানের তালা ফাটালো এটা বলে—খারাপদের! খারাপরা, খারাপরা ভালো আছে। একমাত্র খারাপেরা তুলনামূলক ভালো আছে।

দোতলায় নিয়ে যাবার পর অন্তূর মনে হয়েছিল তাকে কোনো কক্ষে বন্দি কোরে দেয়া হবে। নারী-মন আতঙ্কে গুঙরে উঠছিল। কিন্তু তাকে বদ্ধ রুমগুলো পার করে রুফটপের সামনে নিয়ে যাওয়া হলো। চারপাশ ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে এসেছে।

রুফটপটাও পুরোনো, সবুজাভ শেওলা পড়েছে, পুরোনো বিল্ডিং। মাগরিবের আজান শোনা গেল এবার।

রুফটপে পা রেখে মাথা তুলে আশপাশ দেখল। লোকদুটো গা ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েজন পুরুষের সম্মিলিত হাসির আওয়াজ পেয়ে তাকাল। সোফাতে গা এলিয়ে বসে আছে একজন পুরুষ। জ্বলজ্বলে বিড়ালের মতো চোখ, খাঁড়া নাক অনেকটা খিলানের মতো, পাটাগুলো যেন ফনা তুলে আছে। ঠোঁটে প্যাচপ্যাচে হাসি ঝুলছে। তার সম্মুখে পিঠ ফিরিয়ে বসে আছে আরেকটি লোক। এক মুহুর্তের জন্য অন্তূর মনে হলো, এই পিঠ ফেরানো পেছনটাকে সে চেনে।

চারদিকে কুয়াশা ঘন হয়ে আসছে, দিনের আলো ফুরিয়েছে। রুফটপটাকে বাইরে থেকে পুরোনো পরিত্যক্ত জায়গা বলে মনে হলেও এখন বুঝল, এক অভিজাত বৈঠকখানার চেয়ে কম নয় এটা। গোলাকার সারি কোরে সাজানো সোফার সেট, সেন্টার টেবিল। টেবিলের ওপর সারি ধরা মদের বোতল, ড্রিংকিং গ্লাস, সোডার কৌটা, মেডিসিনের পাতা, মোড়ানো কাগজ, বিটলবন, স্ন্যাক্স, ছুরি ইত্যাদি পড়ে আছে।

অন্তূ চোখ বুজে শ্বাস ফেলল। আলো জ্বললো। অন্তূ চূড়ান্ত মরণের জন্য প্রস্তুত। সামনে বসা লোকটি হাতের গ্লাসটি নামিয়ে রেখে মনোযোগী দৃষ্টি মেলল অন্তূর গোটা শরীরে। যেন আকর্ষণীয় কিছু পেয়েছে হুট কোরে। কিন্তু এবার পেছন ফিরে বসে থাকা লোকটা অনীহার দৃষ্টি মেলে পেছনে ফিরল একবার। তার দৃষ্টি কেঁপে উঠে বিদ্যুতের মতো ধাক্কা খেল যেন অন্তূর ওপর।

জয়! অন্তূ হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে দেখল জয়কে। ধীরে ধীরে বিস্ময়ভাবটা কেটে মন-মস্তিষ্ক ও গোটা শরীর জুড়ে এক বিদ্বেষী ঘৃণারা লাফিয়ে উঠল যেন। এরা এত নিচে নামতে পারে? জয় সেদিন ভার্সিটি প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল, সেসবের জেরে এসব করছে? অথবা অন্তূকে দমাতে। প্রশ্ন অনেক, উত্তর নেই যথাযথ।

পেছন থেকে একজন ধাক্কা মারল অন্তূকে। ভেতরে ধপ কোরে আগুন জ্বলে উঠল যেন। আরও দুটো ঠেলা তাকে সহ্য করতে হলো।

জয় চট কোরে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখদুটো হাসছে। সেখানে এখন বিস্ময় থাকার কথা, কিন্তু তা ছাপিয়ে দুষ্টু হাসি প্রকট। হাতের ধোঁয়া ওঠা কলকিটা টেবিলে ফেলে বলল, “ও কে? ওরে এইখানে নিয়ে আইছেন ক্যান? কী সমস্যা?ʼʼ

সোফায় বসা লোকটা চার হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে, তার নজর এখনও অন্তূর শরীরে। অন্তূ একদৃষ্টে চেয়ে ছিল জয়ের দিকে। জয় এবার কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ওরে এইখানে আনছেন ক্যান, পলাশ ভাই?ʼʼ

প্যাচপ্যাচে হাসি শোনা গেল। বিড়ালের মতো জ্বলজ্বলে চোখগুলো কীসের নেশায় যেন জ্বলছিল পলাশের। সরু নাকের খিলানের মতো পাটাটা কাঁপে, যখন পলাশ হাসে। অন্তূর ঘেন্না এলো সেদিকে তাকিয়ে। জয় খেঁকিয়ে উঠল, “হের বাল! ওরে ক্যান নিয়ে আসছেন এইখানে? এইডা জিগাইছি। ওর কী কাম এইখানে?ʼʼ

পলাশ তখনও অন্তূর দিকে চেয়ে। জয় দুই-ভ্রুর মাঝে আঙুল ঘষে দাঁত খিঁচল, “পলাশ ভাই, কিছু জিজ্ঞেস করতেছি। হাসি অফ করে জবাব দিয়ে এরপর হাসেন।ʼʼ

অন্তূ চমকে উঠল। পলাশ? দিনাজপুরের শীর্ষ সন্ত্রাস? বাজারের প্রতিটা দোকানে কসাইয়ের মতো চাঁদাবাজি থেকে শুরু কোরে নতুন নতুন পাপের সৃষ্টিকর্তা পলাশ ও রাজন। দেখেছিল না কোনোদিন লোকটাকে। আন্ডারওয়ার্ল্ড বলে একটা কথা আছে, আর সেখানকার জানোয়ারেরা আন্ডারগ্রাউন্ডেই বিচরণ করে সাধারণত। অন্তূর মাথায় এলো না, তাকে কেন এই নরকে আনা হয়েছে? মহাজন পলাশ। মানুষকে টাকা ধার দেয় সুদের চুক্তিতে। সময় এতটা কম দেয়, যে একজন ঋণী লোকের পক্ষে অত দ্রুত সুদসহ টাকা জোগাড় সম্ভব হয়না। পলাশ তার বদলে বউ-বাচ্চা, জমির দলিল, বাড়িঘর, ব্যবসা, সবশেষে জান নিয়েও নিজের সুদসহ টাকা আদায় কোরে নেয়। এমন বহু কথা শুনেছে অন্তূ পলাশের ব্যাপারে। এটাই কি সেই পলাশ? জয় এখানে কেন? অন্তূর খুব দূর্বলতা বোধ হচ্ছিল।

চারপাশে দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে আছে পলাশের লোকগুলো। দেখতে নর্দমার পাশে ক্ষুধার্ত অবস্থায় শুয়ে থাকা কুকুরের মাফিক রূপ সবগুলোর।

পলাশ হেসে জয়ের দিকে তাকায়, “এত ক্যান ব্যস্ত হইতেছিস, বাপ! এমন টসটসে মাল ঘরে রেখে এসে কীসব আউল-ফাউল জিনিস বন্ধক রেখে মানুষ ট্যাকা ধার নেয়, বোকার দল সবগুলা!ʼʼ

জয় নাক-মুখ জড়িয়ে বিরক্ত হয়ে মদের বোতল তুলে নিয়ে তাকে দুটো চুমুক দিলো। আস্তে কোরে অনাগ্রহী স্বরে জিজ্ঞেস করল, “অন্তূর বাড়ির লোকও কি সুদের টাকা নিয়েছে নাকি আপনার কাছে?ʼʼ

-“হ।ʼʼ

-“এই শালীর বাপরে তো এমন লোক মনে হয়না!ʼʼ

পলাশ হাসছে। চোখদুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। সেই হাসিতে রহস্য মেশানো। কিন্তু তাতে জয়ের কোনো আগ্রহ নেই। তার গলা জ্বলছে আজ। মদে অল্প সোডা এবং পানি না মেশালো।

পলাশ এগিয়ে গিয়ে অন্তূর খুব কাছে দাঁড়ায়। অন্তূ চেয়েও পেছাতে পারল না। পিছনে আরও দুটো লোক দাঁড়িয়ে। পলাশের শরীর থেকে দুর্গন্ধ আসছে। অন্তূর মনে হলো সে যখন তখন গলগল করে বমি করে ফেলবে। এতটা কাছে কোনো পুরুষ কোনোদিন আসেনি তার। বিরবির কোরে সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে ওঠে অন্তূ। পলাশ জিব বের করা কুকুরের মতো গন্ধ শুঁকছে ওর শরীরের। বোরকা এবং নেকাবের ওপর দিয়েই যেন কীসের পৈশাচিক স্বাদ পাচ্ছে পলাশ।

অন্তূ চোখ বুজে ডুকরে উঠল নীরবে, ‘আল্লাহ পাক! পানাহ চাই এসব থেকে, তুলে নিন আমাকে, রক্ষা করুন।ʼ

পলাশ স্থির হয়ে দাঁড়াল। প্যাচপ্যাচে হাসি দিয়ে বলল, “তোমারে ক্যান নিয়াসছি এইখানে?ʼʼ

-“বলেননি এখনও।ʼʼ অন্তূর গলাটা কেঁপে উঠেছিল। ইজ্জতের ভয় তাকে কাহিল করে তুলেছিল।

-“তুমি চেনো আমারে?ʼʼ

অন্তূ নিজেকে গোছাতে গিয়েও এলোমেলো হয়ে গেল, “কেন এনেছেন আমাকে এখানে? আমি কি কোনো অপরাধ করেছি?ʼʼ

পলাশ হাসছে। সেই হাসিতে পশম দাঁড়িয়ে যায়। পলাশ বলল, “তোমারে মনেহয় কিছুই কয় নাই অন্তিক, হ্যাঁ?ʼʼ

অন্তূ চোখ নামালো। চোখ বুজে শ্বাস ফেলল।

-“তোমার ভাই যখন বউয়ের গয়না নিয়ে এসে টাকা চাইছিল আমার কাছে, আমি অবশ্য ওরে কইছিলাম, ‘বউয়ের গয়না দরকার নাই, বউডারে আনলেই পারতি!ʼʼ
ট্যাকা আর পরিশোধ করা লাগতো না। ছেঁমড়া দেখলাম জ্বলে উঠছিল, অথচ ট্যাকারও প্রয়োজন, কিছু বলবার পারেনাই, হাহাহা!ʼʼ

অন্তূ অবাক হলো। বুকে ভার অনুভূত হলো।

-“পরে কইল, ‘না, আমি গয়নাই রাখতে চাই, ভাই। দোকানে যা কামাই হবে, তা দিয়ে মাসে মাসে আপনার টাকা দিয়ে সময় ফুরানোর আগেই শোধ করে দেব।ʼ শালার ছাওয়াল পারল তো না। সেই হয়রানি পেরেশানী হইলো, দোকানডাও গেল, রাখতে পারল না। শেষ পর্যন্ত দুইদিন আগে নাকি নিজেও পালাইছে। অথচ তোমারে আনলে খুশি হয়ে দেখা যাচ্ছে ওর ব্যবসাডারে নিজহাতে চিরদিন প্রোটেক্ট করতাম! তোমারে আনে নাই ক্যান আগে?ʼʼ

এবার ঝুঁকে পড়ল পলাশ অন্তূর ওপর, “জানতাম না যে তুমি এত সুন্দরী! জানলে অন্তিক ছেমড়াডার সুদ, আসল, চাঁদা, দোকানের কামাইয়ের ভাগ সবডা মাফ করে দিতাম। মেয়েলোকের ওপর কিচ্ছু নাই, কারবারও না। আমি মেয়েলোকের খাতিরে বহুত ত্যাগ করবার পারি।ʼʼ

অন্তূর শরীর কাঁপছে থরথর করে। নিজের ওপর রাগ হলো তার। এত অস্থির হয়ে পড়ছে কেন সে? কোনোভাবেই শান্ত হতে পারছে না। কোনোমতো জিজ্ঞেস করল, “আমার আব্বু কোথায়?ʼʼ

-“আহহ! কথা তো শ্যাষ হয় নাই। শোনো, অন্তিক ছেড়াডা আমার থেকে লুকায়ে, না পালায়ে যদি তোমারে আনতো আমার কাছে, তোমার বাপডারও এত ভোগান্তি হইতো নাহ! ষেহ! আমি জানতামই না তুমি এরম..ʼʼ

অন্তূর কলিজাটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। অনিয়ন্ত্রিতভাবে এক চরম ভুল হয়ে গেল তার দ্বারা। থাবা দিয়ে পলাশের শার্ট খামছে ধরে বলল, “এই জানোয়ারের বাচ্চা, কী বললি তুই? আব্বু কোথায়? আব্বু তোর কাছে? কী করেছিস তুই আব্বুর সাথে? আব্বু কই, কোথায় আব্বু?….ʼʼ

এতক্ষণের জমে থাকা পানি ঝরঝর কোরে গড়িয়ে পড়ল নেকাবের নিচে। হুংকারটা কান্নার সাথে মিশে নির্মম আর্তনাদের মতো শোনালো।

জয় বিরক্ত হয়ে একটা সিগারেট ধরাল। বকে উঠল বিরবির করে, “শালীর ধার কমবে না তবু।ʼʼ

পলাশকে দেখে মনে হচ্ছে, তার প্রিয় খাবারটা খেয়ে তৃপ্তির হাসি হাসছে, এতটা পৈশাচিক তার মুখের ভঙ্গি। অন্তূ শুনেছিল, মহাজন আর সন্ত্রাসরা পিশাচদের আরেক বংশধর। অন্তূর বুকে কাঁপন ধরেছে। পলাশ শার্ট থেকে অন্তূর হাতটা ছড়ানোর নাম কোরে বাজেভাবে জড়িয়ে ধরে ছুঁয়ে দিলো হাতটা। অন্তূ ঝটকা মেরে হাত ছড়িয়ে পিছিয়ে যায়। ধাক্কা খায় পুরো দেহটা দুটো পুরুষের সাথে। ঘেন্না আসল নিজের শরীরের ওপর। কোথাও পুরুষের ছোঁয়া লাগা বাকি রইল না গোটা দেহে। ছটফট করতে করতে দূরে সরে দাঁড়াল।

ফুঁপানো কান্নায় নেকাব ভিজে উঠল। জয় সোফা ঘুরিয়ে নিয়ে বসেছে। সে খুব আরামে আছে। যাত্রাপালা দেখতে এসেছে। সামনে খেলা হচ্ছে, সে দেখছে। তার হাতে স্বল্প মাত্রার বিয়ারের ক্যান। এবার অন্তূর দৃঢ় বিশ্বাস জাগল, জয় সব জানে, সব। তবুও কেন নাটক করল প্রথমদিকে?

অন্তূ চেঁচিয়ে উঠল, “আব্বু কই?ʼʼ চেঁচানোও নিদারুণ আহাজারির মতো ন্যায় শুনতে লাগল, “আমার আব্বু কই? ও আব্বু! আমার আব্বুকে কোথায় রেখেছেন? কোথায় আমার আব্বু? আব্বু..ʼʼ সবে কথা বলতে শেখা ছোট্ট শিশুটির মতো অবুঝ স্বরে ডেকে ওঠে অন্তূ আবার।

“আব্বু? ও আব্বু? আব্বু?ʼʼ—পাগলের মতো এদিক ওদিক খুঁজল আব্বুকে। অবুঝ শিশু যেমন অচেনা জায়গায় কাতর হয়ে ওঠে, অন্তূ তার চেয়েও সহায়হীন এতিমের মত কাতরাচ্ছে রুফটপের এক পাশে দাঁড়িয়ে।

পলাশ বারবার দেখছে অন্তূর চোখদুটো। পলাশের মনে হলো, ভিজে ওঠা পাপড়ির জন্য মেয়েটার চোখদুটো তাকে বেশি মাতাল করছে। নোংরা চাহিদায় উতলা হয়ে উঠছে তার পুরুষ দেহ। অন্তূর আর্তনাদ একেকবার কানে যাচ্ছে আর কামনা-তাড়নার আগুনে কেরোসিনের ছিটা পড়ছে। এগিয়ে গেল অন্তূর দিকে। ক্ষুধার্ত পিশাচ যেমন রক্ত পেলে জ্বলজ্বলে হেসে ওঠে, ওরকম হেসে বলল, “আব্বুকে দেখতে চাও, সুন্দরী? তার মানে তুমি আমার কাছে কিছু চাও?ʼʼ

অন্তূ থেমে যায়। অবুঝের মতো তাকিয়ে থাকে পলাশের দিকে। পলাশ কোমল স্বরে বলল, “লেনদেন বোঝো? নেয়া-দেয়া। তুমি কিছু চাচ্ছ আমার কাছে। এর বদলে আমারও তো কিছু চাওয়া থাকতে পারে। পারে না?ʼʼ

অন্তূ হাল ছেড়ে দিয়ে আস্তে কোরে বলে, “পারে।ʼʼ তারপর একটু সপ্রতিভ হলো, “আমি বুঝতে পারছি। অন্তিকের টাকাটা পরিশোধ করতে হবে। সে তো জানি। কিন্তু এখন তো কিছু বলেননি, আমি সাথেও আনিনি। কথা দিচ্ছি, আগামী….ʼʼ

পলাশ আঙুল তুলে অন্তূর ঠোঁটে নেকাবের ওপর দিয়ে চেপে ধরল, “হশশ! এত কথা না। আমি চেয়ে নিই, তুমি দাও।ʼʼ

অন্তূ তাকিয়ে রইল। তার সরলতা ব্যর্থ গেল বোধহয়।

পলাশ খুব সাবলীলভাবে বলদ, “নেকাবটা খোলো, দেখি মুখটা।ʼʼ

অন্তূ থমকে দাঁড়াল। পলাশ বোঝালো, “উমহ! লেন-দেন।আমি তোমার মুখ দেখবো, তুমি তোমার আব্বুর মুখ!ʼʼ

পাথরে পরিণত হলো অন্তূ। নির্বাক চোখে দেখল পলাশকে। পলাশ এগিয়ে যায় আরেকটু ওর দিকে। বে-খবর আক্রমণ করে বসে অন্তূর ওপর। খপ করে অন্তূর মেয়েলি হাতদুটো নিজের থাবায় পুড়ে অন্তূর পেছনে আটকে ধরে। তাতে পলাশের শরীরের সামনের অংশের সিংহভাগ ছুঁয়ে যায় অন্তূর নারীদেহ। অপর হাত দিয়ে অন্তূর বুকের ওপরে গলার নিচে লেহন করার মতো হাত বুলায়, যেমন কোরে কুকুর তার খাবার চাটে জিহ্বা দিয়ে। অন্তূ হাত মুচড়ানোর বৃথা চেষ্টাটা করল না। চোখদুটো বুজে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেদিনের পাথরের চোখ বেয়েটপ টপ করে কয়েক ফোটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল।

বিরবির করে ডেকে ওঠে অন্তূ, “আল্লাহ!ʼʼ

অন্তূ হার মানলো, “আমি খুলছি নেকাব। আমি খুলছি…ʼʼ

পলাশ পারতো নিজে খুলতে। খুলল না। সে অন্তূকেই বাধ্য করল। এতে তার চোখে-মুখে জিতে যাওয়ার চমক। অন্তূর কাছ থেকে সরতে ইচ্ছে করছিল না। তবুও নিজেকে টেনে নিয়ে অল্প সরে দাঁড়াল যেন।

অন্তূ হাত কাপছে। নেকাব অবধি উঠছে না। এতগুলো বছরে কোনোদিন কেউ মুখ দেখেনি তার। আজ দেখবে। শরীরের ওপর ঘেন্না লাগছে। এই শরীরের বিভিন্ন জায়গা আজ নষ্ট হাতের ছোঁয়া পেয়েছে। নিজেকে একপেশে নষ্টা বলেই মনে হচ্ছিল তার। তবুও কেন যে নেকাব খুলতে হাত উঠছিল না মুখের ওপর। ছোঁয়ার চেয়ে নজর বেশি ভয়ানক?

চলবে..

—পর্বটিতে বেশ কিছু অশালীন ভাষা থাকবে। সুতরাং আপনারা সেই মানসিকতা নিয়েই পড়বেন।

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

১৯.

সন্ধ্যার আকাশে কুয়াশার আবরণ পরিবেশকে আরও গুমোট কোরে তুলেছিল। পলাশের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটল। আবার এগিয়ে এলো অন্তূর দিকে, “খুলবা নাকি টেনে খুলে ফেলব? আমি একটা কথা বলতেছি, ওইডার পিছনে সাহস দেখায়ে আবার চুপ কইরা আছো? ঠিক না।ʼʼ

হাত বাড়ায় পলাশ। অন্তূ সেদিন এই মুহুর্তে কেন যেন জয়ের দিকে তাকিয়েছিল একবার। তবে খেয়াল কোরে দেখলে তার চোখে অল্প আশা দেখতে পাওয়া যেত বোধহয়, যা সে জয়ের কাছে করেছে। কোনো যুক্তি নেই সেই আশার, তবুও অন্তূর বোধহয় সেই ভয়টা লাগেনা জয়কে, যেটা পলাশের জন্য তৈরি হয়েছে এই কিছুক্ষণে।

জয় আরাম কোরে বসে বিয়ারের ক্যানে চুমুক দিচ্ছে। তার সামনে কিছু ঘটছে, তেমন খেয়াল নেই তার মাঝে। নিজের এমন বোকা আশার কথা ভেবে তাচ্ছিল্য এলো অন্তূর নিজের ওপর।

জয়ের চোখে-মুখে তখন স্পষ্ট লালসা। তাকে একনজর নগ্ন অবস্থায় দেখার লালসা। তার অবশ্য রাগ হচ্ছে, অন্তূকে এত লোক দেখবে, যে চেহারাটা তার নিজের পছন্দ! কিন্তু বাঁধা দিলো না। এখন নেকাবটা খুলে ফেললে অন্তূর চেহারা দেখতে পাবে সে। দু’চোখে তার অধীর অপেক্ষা। চেহারা দেখার চাহিদাকে ছাপিয়ে পলাশকে ঠেকানোর ইচ্ছে বা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল না সে।

পলাশ অন্তূর বাহুটা জড়িয়ে ধরার সময় অন্তূর বুকের ওপরের ওড়নার প্রান্তটুকু পলাশের হাতের থাবায় এলো। অন্তূ হাত দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করলে পলাশ অন্তূর হাতটা খামচে ছুঁড়ে ফেলে পেছনের দিকে। সজোরে আঘাত হানে হাতটা গিয়ে পেছেনর খচখচে দেয়ালে। নিশ্চিত চামড়া ছিলে র-ক্ত বেরিয়ে এসেছে।

পলাশ অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে বলে, “খোল শালি! ন্যাকামি মারাস?ʼʼ

একটানে খুলে নয় বরং ছিঁড়ে ফেলে অন্তূর চেহারার আবরণটা। অন্তূর গলা থেকে একটা সরু আহাজারী বেরিয়ে আসে। যেই আহাজারিতে চোখ তুলে তাকায় জয়। আর নজর ফেরায় না।

পলাশ ঝটকা খেয়ে অল্প সরে দাঁড়াল অন্তূকে ভালোভাবে দেখার জন্য। মেয়টার কান্না থেমে গেছে, চোখের পাপড়ি ভেজা, অথচ পানি গড়াচ্ছে না। মুখটা লাল হয়ে আছে। চিকন ঠোঁটের কিনারা মাঝেমাঝে উত্তেজনায় কেঁপে উঠছে। জয় ও অন্তূর এক দুর্বোধ্য দৃষ্টিবিনিময় হলো সেই মুহুর্তে।

পলাশ হাসছে। তার হাসি কথা বলছে, বলছে—জীবনে প্রথম হয়ত বহুল আকাঙ্ক্ষার বস্তু সামনে দেখতে পেয়েছে চোখদুটো। সে অভিভূত, সে আসক্ত। নিঃশ্বাস জোরে জোরে পড়ছে পলাশের। আশপাশে কমপক্ষে দশ-পনেরোজন পুরুষ অন্তূকে গিলছিল। অন্তূ তাকিয়ে ছিল জয়ের দিকে।

কিন্তু জয় হুট কোরে নজর ফিরিয়ে বিয়ারে ক্যানটার পাশে রেখে ঘাঁড় ঘুরিয়ে হাঁ কোরে শ্বাস ফেলল। অন্তূর আর কান্না পাচ্ছে না। আব্বু বলতো, ছাগল যদি জবাই-ই হয়ে গেল, সেটাকে কাবাব করা হোক, ঝোল রেঁধে খাওয়া হোক, অথবা কিমা করা হোক ছাগলের কি আর কিছু যায় আসে?

পলাশ হেসে উঠল এবার শব্দ কোরে, “আরিব্বাস! তোমার বাপের ঘরে যে এরম একখান আইটেম আছে, জানলে কি আর বেঁচারা…ʼʼ

অন্তূর ভেতরে একটা তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। সে আজ প্রদর্শনীর পণ্যের মতো এতগুলো পুরুষের মাঝে প্রদর্শিত হচ্ছে। আব্বু বিষয়টা সহ্য করতে পারবে?

নেকাবের একাংশ ছিঁড়ে পলাশের হাতে গেছিল, সেটা পলাশ ছুঁড়ে ফেলেছে। যে অংশটুকু অন্তূর গলায় পেঁচিয়ে ছিল, তা সে নিস্তেজ হাতে আস্তে কোরে খুলে ফেলে দিলো অন্তৃ। এখন শরীরে বোরকা, বুকের ওপর এক টুকরো ওড়না আছে। সকলে দেখছে তাকে।

অন্তূ প্রস্তুত হয় আমজাদ সাহেবকে যেকোনো হালে দেখতে। বুকে মুচড়ামুচড়ি শুরু করেছে, অন্তূ বাঁ হাতের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল সজোরে চেপে ধরে বুকের মাঝখানটায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে কিছু অভিযোগ করল।

দু’জন দু’পাশে ধরে আমজাদ সাহেবকে নিয়ে ছাদের ঘরে প্রবেশ করল। সে জায়গাটি আলোকিত। তার পাশের অন্ধকারের ভেতর বসে আছে জয়।

অন্তূ কয়েক কদম পিছিয়ে ছাদের দেয়ালের সাথে ঠেকে দাঁড়াল। শরীরটা থরথর করে কাঁপছে আবার। অন্তূ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মুখে হাত চেপে ধরে, কিন্তু আওয়াজ হলো না।

আমজাদ সাহেব থরথরে কাঁপা হাতটা বাড়াতে চায়, চোখে-মুখে আতঙ্ক, ডেকে ওঠেন অস্পষ্টস্বরে, “অন্তূ!ʼʼ

অন্তূ চোখ বুজে ফেলে। আমজাদ সাহেবের মুখটা থেতলানো প্রায়। শার্টের অধিকাংশ ছেঁড়া। হাতে কাচাকাচা দাগ। টলছেন উনি, চোখ খুলে রাখতে পারছিলেন না। ড্রাগ দেয়া হয়েছে বোধহয়। মেহেদি রঙানো দাড়িওয়ালা থুতনিতে গভীর থেতলানো ক্ষত। কী দিয়ে মেরেছে এরা?

অন্তূ দৌঁড়ে গেল আব্বুর দিকে। পলাশ মাঝে এসে দাঁড়াল। অন্তূর পুরো শরীরটা আন্দোলিত হয় একবার পলাশের দেহের দেহের ধাক্কায়, মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে গেল যেন একদম আগুনের তাপে পলিথিন যেমন কুঁচকে ঝলসে যায়, ঠিক তেমন। আমজাদ সাহেব কিছু বুঝলেন কিনা কে জানে? যতদূর সম্ভব কড়া ড্রাগ উনার শরীরে।

আমজাদ সাহেবের কোনোদিকে খেয়াল ছিল না। সে কেবল অবচেতন অথবা প্রায় অচেতন চোখে মেয়েকে দেখছিলেন। পলাশের হাতের বেষ্টনিতে গ-লা-কা-টা মুরগীর মতো ছটফট করছে অন্তূ। তার মাথা আলগা, বুকের ওড়না ঠিক নেই, মুখে পর্দা নেই।

সহ্য করতে না পেরে টলমলে মাথাটা নামিয়ে নিলেন। ভিখিরির মতো ভিক্ষা চেয়ে উঠলেন, “ও পলাশ! আব্বা আমার! আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দাও, আব্বা। ও বাচ্চা মানুষ। পাপ আমার ছেলে করেছে, আমি করেছি জন্ম দিয়ে। ও তো কিছু করে নাই আব্বা। তুমি কী করছো ওর সাথে? আমার মেয়ের পর্দা কই? ও ছোট মানুষ বাপ! ওরে ছাড়ো। তুমি আমাকে মারো, ও পলাশ! আমাকে মারো, দেখবে ঠিক অন্তিক আসবে। তুমি আমাকে আরও মারো, পলাশ। পলাশ শোনো, আমি আমার সব দিয়ে দেব। তুমি কত টাকা পাও, তার ডাবল ডাবল দেব। পলাশ..ʼʼ তার বলা কিছু শব্দ বোঝা গেল, কিছু আর্তনাদ অস্পষ্ট জমা হলো কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতির হাওয়ায় বোধহয়।

জয় একদৃষ্টে চেয়ে ছিল আমজাদ সাহেবের দিকে। ওর ভেতরটা রাগে নাকি হিংসায় অথবা জিদে জ্বলে উঠল। ও-ও মার খেয়েছে। কতবার কতভাবে মার খেয়েছে! শরীরে বিভিন্ন স্থানে বাঁশসুই গাঁথা হয়েছিল, তার ওপর লবন না দিয়ে পার্টির ছেলেরা বিট-লবনের গুড়ো ছিটাতো। খুব চিৎকার করেছে জয় বন্ধ ঘরে। কই কেউ তো বলেনি সেদিন, ‘বাপ! ছেলেটাকে ছেড়ে দাও? আর কষ্ট দিও না আমার জয়কে!ʼ ন্যাকামি যত্তসব! জয় কি বেঁচে নেই? সেসব আঘাতের দাগ এখনও আছে শরীরে। এখন ওর রাজ চলে পুরো দিনাজপুরসহ এই বাঁশের হাটে। ওর পিঠ বাঁকিয়ে হিপবোনের ওপরে কোমড় সংলগ্ন কশেরুকাতে টান ফেলা হতো, তা চিকিৎসা করতে পিঠে স্টেইনলেস রড ঢুকিয়ে কতদিন হাসপাতালের বেডে মরার মতো ফেলে রাখা হয়েছিল ওকে। ওর তো বাপ-মা কেউ আসেনি! বেশি পরিমাণ ড্রাগ দেয়ার ফলে কান-নাক এমনকি চোখের পানির সাথে রক্ত উঠে আসতো। তার জন্য এভাবে কেউ কাঁদেনি। শুধু হামজা প্রতিবেলা ঢাকা মেডিকেল কলেজ যাতায়াত করতো। তরু তখন ছোট প্রায়, সে থাকতো জয়ের পাশে।

এই অবস্থায় মেয়ের জন্য এত ছটফটানি বাপের? বাপেরা কি এমনই হয়? সব বাপ? তাইলে তার বাপ কেন তাকে ফেলে রেখে ওপারে চলে গেছে? ফেলে গেছে তাকে এই দুনিয়ায় নষ্টামি কোরে বেড়ানোর জন্য? ঢোক গিলল জয়। দুই ঢোক মদ গিললো। হিংসা হচ্ছে অন্তূর ওপর, ঘেন্না আসছে। ওই মেয়ে বহুতবার অপমান করেছে ওকে ভার্সিটিতে। আজ অন্তূও অপমান হয়েছে, বাঁচাতে যায়নি জয়। শোধ।

পলাশ অন্তূর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে হাসল, “কাকা! ডাক্তার, কসাই আর আমরা যদি মানুষের অনুরোধে গলি, তাইলে এসব পেশা ছেড়ে ট্রাস্ট এনজিও খুলতে হবে। যেখানে মানুষ-গরু সব ধরণের প্রাণির জান বাঁচানো হবে, তাদের সব ইচ্ছা পূরণ করা হবে। ডাক্তার প্রতিদিন হাজার রোগীর মৃত্যুর ঘোষনা দেয় হাতের পার্লস চেইক করে, তাদের মাঝে সব রোগীর আত্মীয়রাই চেঁচায়ে কাঁদে, সেখানে কোনো একজনের কাঁদা বিশেষ লাগার চান্স আছে? কসাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই। সব গরুই ছটফটায়, উঠে পালাতে চায়, তাই বলে কি সে জবাই করে না? আমাদের কাহিনিও সেম। আপনার মাইয়াডারে ভাল্লাগছে। সুন্দরের কাছে সকলে কাবু, আমিও। মাইয়াডারে দেন, সব মাফ।ʼʼ

আমজাদ সাহেবের বোধশক্তি ড্রাগের প্রভাবে বিলুপ্ত প্রায়। পলাশ একটা চমৎকার প্রস্তাব দিলো, “কাকা! আমার অনেকগুলো হোটেল আছে, জানেন তো। অনেক মেয়েরা কাজ করে সেইখানে। মানে বুঝতে পারতেছেন, আমি কী বলছি? আপনাদের এত অভাব। আপনার মেয়ে ভালো আয় করবে।ʼʼ

আমজাদ সাহেব ঢলে পড়লেন মেঝের ওপর। ঢিপ করে আওয়াজ হলো, যখন তার মাথা ছাদের ওপর পড়ল।

পলাশ অন্তূর কাধে নিজের মাথাটা রাখে জোর কোরেই। কুকুর যেমন গন্ধ শোঁকে, ওভাবে নাক টেনে বিশ্রী আওয়াজ করে মুখ দিয়ে।

অন্তূর হাতের যেখানটায় পলাশ চেনে ধরেছিল, সেখানকার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। অন্তূর এরই মাঝে নিজের ওপর তাচ্ছিল্য হয়। সিনেমায় এমন দৃশ্য দেখে মানুষ, বাস্তবে তো আড়ালে ঘটে এসব, তাই মানুষ প্রাক্টিক্যালি দেখতে পায়না। আচ্ছা! আঁখির সাথে কী হয়েছিল? এরাই কি করেছিল সেসব? যারা এদের শিকার হয় তারা আর বেঁচে থাকে না মানুষকে তাদের ওপর হওয়া অত্যাচারের বর্ণনা করার জন্য! তাই মানুষ কঠিন সত্যিগুলোকে আজ সিনেমার দৃশ্যের নাম দেয়।

পলাশ হাত ছেড়ে একহাতে অন্তূর চুলগুলো মুঠো কোরে ধরে অপর হাতে অন্তূর কোমড়টা পেঁচিয়ে ধরল। নাকটা অন্তূর গলার সাথে ঘঁষল একবার খুব আরাম করে।

জয় উঠে দাঁড়ায় চট করে, “ছাড়েন, ভাই!ʼʼ

পলাশ শুনলো না। জয় মনোযোগ দিয়ে হাতের নখের কোণা কাঁমড়ে নখ কেটে বলল, “ছাড়েন, ছাড়েন। ছেড়ে দেন ওকে।ʼʼ

কথা শেষ কোরে চোখ তুলে তাকাল এবার। অন্তূ চোখ বুজে আছে। ঝরঝর কোরে পানি পড়ছে চোখ বেয়ে। ঘেন্নায় চেহারাটা কুঁচকে আছে। জয় ডেকে উঠল, “পলাশ ভাই!

পলাশ পেছন ফেরে, “হু!ʼʼ

-“ছাড়েন ওরে। আর দরকার নাই। এ-ই যথেষ্ট। আর না। ও বিরক্ত হচ্ছে মনে হয়।ʼʼ

পলাশ খুব তৃপ্তি কোরে হাসল, “চুপচাপ গিলে যা আপাতত, পরে ভাগ দেব।ʼʼ

জয় উঠে এগিয়ে গিয়ে শান্ত হাতটা পলাশের হাতের ওপর রাখে, “ভাই! ছাড়েন ওরে। ছাড়তে বলতেছি আমি।ʼʼ

উহ্য-লুকানো জিদ জয়ের স্বরে। পলাশও জিদ কোরে শক্ত কোরে চেপে ধরতে যায় জয়কে। ওর ছেলেরা পজিশন নিচ্ছে নিজেদের।

আচমকা জয় জানোয়ারের মতো গর্জে উঠল, “ছাড়! ছাড়তে বলতেছিনা? ছাড়!ʼʼ

পুরো রুফটপ কম্পিত হয় সেই স্বরে। একদম গুমোট হয়ে উঠল পরিবেশটা। ক্ষেঁপা মহিষের মতো শ্বাস ফেলল জয়।পলাশের হাতটা খামছে ধরে অন্তূর কোমড় থেকে সরিয়ে দেয় জয়। তার চেহারা দেখতে তখন মানুষের মতো লাগছিল না। জেদে বেসামাল। অন্তূর হাতটা তখনও পলাশের থাবায়। জয় পলাশের হাতের ওপর নখ গেঁথে দিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল যেন, “ছেড়ে দেন পলাশ ভাই, জিদ উঠতেছে আমার।ʼʼ

পলাশ হেসে উঠল, “জয়, আমি জানি তুই ক্ষ্যাপা। তবে পাগল বা বোকা না। ও এখন আমার জিনিস। আমি কী তুই জানিস। কিন্তু এখন এইরকম বোকামি করতেছিস ক্যান ভাই? কার সাথে কী করতেছিস, হুশ আছে? একটা মা*গীরে ছাড়াইতে তুই …কেমনে কী জয়? আমার সাথে ..ʼʼ

জয় পলাশের হাত মুচড়াতে মুচড়াতে বলল, “ব্যাপার সেইটা না, পলাশ ভাই। আপনি ওরে ধরেন, সমস্যা তো নাই। আপনার ইচ্ছে হইছে, আপনি ধরবেন । ধরবেন, এরপর যা মনে চায় করবেন। পারলে টেনে-টুনে ছিঁড়ে ফেলবেন। অ্যাবসিউলুটলি আই জাস্ট ফা-কিং ডোন্ট কেয়ার এবাউট দ্যাট। বাট, আপনি আমার কথা শুনবেন না? ভিত্রে কেমন জানি শুয়োর নাচতেছে, ভাই। মন চাচ্ছে সবগুলারে একদম ছেঁচে ফেলি! আপনার ইচ্ছে হইছে, আপনি ওরে ধরবেন। কিন্তু আমি যে বললাম, ছাড়েন। এই কথা মানার জন্য আপনার ওকে ছেড়ে দেয়ার ছিল। ওকে ধরাটা সমস্যা না। আমি যে বললাম, ছাড়েন, এইটা আপনি শুনতেছেন না, এইটা সমস্যা! একবার না, কয়েকবার কইছি ছাড়তে!ʼʼ

পলাশের লোকেরা ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে আসে জয়ের দিকে। চারপাশে তখন ঘন অন্ধকারের কুয়াশারা ভিড় জমিয়েছে। জয় খিঁচে এক টান মেরে অন্তূকে ছাড়িয়ে নেয় পলাশের হাত থেকে। পলাশ অল্প ছিটকে পড়ল। জয় পেছনের শার্ট উঁচিয়ে হোলস্টার থেকে পিস্তল বের কোরে হাতে রাখতেই সকলে একটু পিছিয়ে গেল।

অন্তূ দৌঁড়ে গিয়ে বসে পড়ে আব্বুর পাশে। অল্প আলোতে দেখতে পায় আব্বুর কানসহ বিভিন্ন স্থানে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে সিগারেট ঠেকিয়ে। ত্বক ঝলসে গেছে সেসব স্থানের। অন্তূর চোখের সামনে ভাসছে, যখন আব্বুর কানে জলন্ত সিগারেটের হল্কা চামড়া বিদীর্ণ করে ক্ষত তৈরি করছিল, তখন কেমন লেগেছিল আব্বুর! আর্তনাদ কোরে থামতে বলেছিল ওদের?

জয় পিস্তলের ব্যারেল টেনে বুলেট লোড কোরে নিলো। পলাশের চোখ মৃদু আলোতে জ্বলজ্বল কোরে উঠল। মুখে সেই প্যাচপ্যাচে হাসি। যা দেখতে ভীষণ ভয়ংকর লাগে। যেন সূর্যগ্রহণের রাত, তার ওপর পলাশের মৃদু আওয়াজের অমানুষিক হাসি রাতটাকে কলুষিত নাম দিচ্ছিল। পলাশ বলল, “জয়! আমি কিন্তু, পলাশ আজগর! আমার মাথা সব সময় ঠান্ডা, বাপ! একদম বরফের মতোন ঠান্ডা। আমার ইশারায় মানুষও ঠিক ওইভাবেই রক্ত জমাট বেঁধে মরে।ʼʼ

জয় হেসে ফেলল, পিস্তলের মুজেল দিয়ে গলা চুলকে বলল, “পরশুদিনের ভোটকেন্দ্রে আপনার মতো পলাশ আর মাজহারের মতো খা-ন-কির ছাওয়াল যদি দুই-হাজারও উপস্থিত থাকে। আমি জয়, আমি জয় আমির এক এক হাজারের মাঝে একেকশো কোরে লাশ বিছাবো। তাই দেখবেন বাকি নয়শোরা ওদের জানাজায় উপস্থিত হবে, গন্ডোগোল করার কেউ থাকবে না। সুষ্ঠু, স্বাভাবিক ভোটে হামজা পাটোয়ারী পরশুদিন মেয়র নির্বাচিত হবে।ʼʼ

জয় পিছিয়ে এসে অন্তূর কাছে ঝুঁকলো, “আরমিণ! দ্রুত ওঠাও তোমার বাপকে। আমরা বের হবো জলদি। দ্রুত..ʼʼ

কথা শেষ হলো না। এক খাবলি থুতু এসে মুখে পড়ল জয়ের। অন্তূ বলে উঠল, “তোদের মতো জানোয়ারের বাচ্চাদের মাঝে কারও সাহায্য লাগব না আমার। তোর মতো জারজদের কারও বাপকে বা মেয়েকে বাঁচাতে হবে না।ʼʼ

পলাশের সরু হাসির আওয়াজ পাওয়া গেল। সাথে লোকগুলোও হাসছে জয়ের অবস্থা দেখে। জয় আরও চমৎকার কোরে হাসল। অন্তূর ওড়না তুলে মুখের থুতুটুকু মুছে আরও সুন্দর কোরে হাসল, “তুমি আমায় থুতু দিলে, তোমাকেও লোকে থুতু দেবে, সত্যি বলছি। তবে সেসব ঋণ মিটমাট পরে হবে।ʼʼ এবার একটু আওয়াজ নিচু করল জয়, “কিন্তু এখন ওঠো, জলদি। হাজার হোক, আমি একা। পিস্তলেও যদ্দূর সম্ভব বড়জোর দুইটা বুলেট আছে। আমি ফাইটিং পারি না অত ভালো। ওঠো, দ্রুত ওঠো। আমি সাহায্য করবো তোমার বাপরে উঠাইতে?ʼʼ

চলবে…

[রিচেইক করিনি, ভুলত্রুটি ক্ষ্যামা করবেন।]