#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২০. (প্রথমাংশ)
বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এলো ওরা, তখন ইশার আজান পড়ছে চারদিকে। কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতি। ঠান্ডায় অন্তূ থরথর কোরে কাঁপছিল, কিন্তু চেহারা উদ্দীপনাহীন। ক্ষত-বিক্ষত আমজাদ সাহেবের অচেতন বিশাল দেহটা বহন করা মানসিকভাবে ক্ষত-বিক্ষত অন্তূর পক্ষে অসম্ভব। আমজাদ সাহেব এখন পুরোপুরি অচেতন।
সিঁড়ি দিয়ে যখন উনাকে নামাচ্ছিল জয় বলল, “এইখানে নিয়ে আসার অল্পক্ষণ আগেই ড্রাগ দেয়া হইছে হয়ত।ʼʼ
অন্তূ তাকাল না। তার ভয় হচ্ছে। জয় এখন তাকে কোথায় নিয়ে যাবে? সে এক কুকুরের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে আরেক নেকড়ের সাথে পথ চলছে না তো! অন্তূর শুধু চোখের সামনে ভাসছে, জয়ের চোখের সেই লোলুপ দৃষ্টি–যখন তার পর্দা হটানো হচ্ছিল, কী বিশ্রী আগ্রহ নিয়ে চেয়ে ছিল জয় আমির!
জয় যখন আমজাদ সাহেবকে তুলে নিয়ে বেরিয়ে আসছিল, পলাশ কিছু বলেনি। হয়ত পিস্তল অথবা জয়ের ক্ষ্যাপা স্বভাবের জন্য বলেনি তৎক্ষণাৎ কিছু। অথবা রহস্য! জয়ের জানা নেই পলাশের শিকার ছিনিয়ে নেয়ার পেক্ষিতে পলাশ কী করতে পারে পরবর্তিতে।
সিঁড়িটা ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল। একবার পা ফসকালে তিনজনই ঘাঁড়ের শিরা ছিঁড়ে মরার চান্স ছিল। জয় আমজাদ সাহেবকে নিজের লম্বাটে শরীরের সাথে ঠেকনা দিয়ে দাঁড় করিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের কোরে ফ্লাশ অন কোরে অন্তূর হাতে দিয়ে বলেছিল, “ধরো এইটা।ʼʼ
অন্তূর বুকের ধরফড়ানি তখনও থামেনি, আর না ঘেন্নার আগুন নিভেছে। তবু সে যান্ত্রিক হাতে ধরল ফোনটা। গোটা ঘটনাটার হিসেব মিলছে না। তার মনে হচ্ছে, এখানে যা দেখা গেছে, তার চেয়ে বেশি অদৃশ্যমান ঘাপলা ঘটনাটিতে ভরপুর।
অন্তূ আব্বুর একটা বাহু আগলে ধরে হাঁটছিল। আমজাদ সাহেব অচেতন, ব্যথা বোধহয় টের পাচ্ছেন না। কিন্তু অন্তূর বুকের ব্যথা উপশমের ওষুধ কোথায়? এই বিদারক ঘা কি জীবনে ভরাট হবে?
জয়ের হুট কোরে তার মাথায় এলো, সে এসব করছে? কেন? ননসেন্স কাজকর্ম সব। সে যুব-সেবক হিসেবে এসব করতেই পারে! তবে সেটা খেয়ালমতো! তাই বলে আরমিণের বাপের সাহায্য? একবার তীব্র ঘৃণার চোখে দেখল আরমিণকে। চোখদুটো আক্রোশে জ্বলজ্বল করে উঠল।
অন্তূ টের পেল ঠান্ডায় অথবা আতঙ্কে তার হাত এবং হাঁটু বিশেষত, খুব বাজেভাবে কাঁপছে। শরীরের চাদরটা ওখানেই ধস্তাধস্তিতে পড়ে গিয়েছিল। এখন এক টুকরো ওড়না আছে বুকে। মাথায় কিছু নেই। সে অল্প একটু ওড়না তুলে মাথায় রাখল। অভ্যাসবশত, যেই মুখটা আবৃত করার জন্য আপনা-আপনিই হাতের ওড়না মুখে উঠে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে হাত নামিয়ে ফিক কোরে হেসে ফেলল, চোখে এসে পানি জমলো এক দলা।
ভেতরের যন্ত্রণারা ধিক্কার দিলো ওকেকে, “বোকা মেয়ে! তুই তো জবাই হয়েই গেছিস! তোর আর কিছু বাকি আছে? মুখ ঢেকে এখন আর নাটক না করলেই নয়? যা সংরক্ষিত রাখতে হয়, তা শতভাগ অক্ষত রাখতে হয়। সেখান থেকে এক রত্তি দানা খসলে পুরো সংরক্ষণের মান হারায়, সেটা অসংরক্ষিত হয়ে ওঠে। এই আবরণ খোলার পর তা দর্শনে কতকগুলো পুরুষ মজা লুটেছে! নাটক না কোরে সামনে হাঁট। বাইশ বছরের এই সংরক্ষণের খোলশে আজ ইঁদুর ঢুকেছে। তাও সেই ইঁদুর তাড়িয়েছে কে জানিস? আরেকটা পশু। যে তোকে ধরলে হয়ত শুধু তোর সম্ভ্রমই নয়, বোধহয় গোটা তোকে খাবলে খেয়ে ফেলবে।ʼʼ
বাঁশের ঝাড়টার দিকে তাকিয়ে লম্বা লম্বা টান দিচ্ছিল মুস্তাকিন সিগারেটে। সামনে চোখ যেতেই মনে হলো, অন্তূ আসছে। একা নয় সে, তার পাশে আরও দুটো পুরুষ অবয়ব চট করে হোলস্টারে হাত গেল। পিস্তলটা বের কোরেই তাক করে ধরল। জয় হেসে উঠল, “আরে! আরে! মুস্তাকিন সাহেব যে!ʼʼ
হাসি থামিয়ে মিছেমিছি গম্ভীর হলো, “ভেতরে যাননি কেন? আর একটু হলেই খানিক পর তিনটা লাশ উদ্ধার করতে হতো আপনার! আমাদের কথা না-ই বা ভাবলেন, অন্তত লেডিস..ʼʼ
এই পরিস্থিতিতেও এমন নোংরা মশকরা…অবশ্য জয়ের কাছে আশা করাই যায়। অন্তূর দিকে তাকিয়ে মুস্তাকিনের মুখ কালো হয়ে এলো। পর মুহুর্তে দ্রুত আমজাদ সাহেবকে আগলে নিলো জয়ের কাছ থেকে। অন্তূর মুখটা মুস্তাকিন প্রথমবার দেখল। ক্ষণকাল চোখ ফেরালো না। জয় সিগারেট ধরিয়ে একপাশে গিয়ে দাঁড়াল।
আমজাদ সাহেবের নড়বড়ে দেহটা দুজন কনস্টেবলের ভারে দিয়ে শরীরে থাকা চাদরটা খুলে অন্তূর দিকে এগিয়ে দিলো। অন্তূ যন্ত্রের মতো হাত বাড়িয়ে চাদরটা নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নেয়। মুস্তাকিন প্রায় রুষ্ট কণ্ঠে বলল, “মুখ ঢেকে নিন, অন্তূ! ওখানে কী হয়েছিল পরে শুনছি।ʼʼ অধিকারবোধ অথবা কর্তব্য! যাই হোক, ছিল মুস্তাকিনের স্বরে।
জয় মুস্তাকিনকে বলল, “তোহ! যান তাইলে আমার গাড়ি আসবে। ভিআইপি লোক তো!ʼʼ চোখ মারল কথা শেষে।
মুস্তাকিন হাসল, “খুব শীঘ্রই দেখা হবে।ʼʼ
জয় মাতালের মতো কাধ দুলালো।
ওরা চলে যেতেই জয় পেছনে তাকায়। পুরোনো দুতলার রুফটপ থেকে পলাশের জ্বলজ্বলে চোখদুটো যেন জয়কেই দেখছিল। পুরো দলসহ দাঁড়িয়ে দেখছে এদিকের কাণ্ড।
—
আমজাদ সাহেবকে একটা প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করালো মুস্তাকিন। সে লোক পাঠিয়েছে রাবেয়াকে আনতে।
রাত দশটা বাজবে। অন্তূ বসেছিল বেঞ্চের ওপর। বেশ কিছুক্ষণ নির্লজ্জের মতো দেখল মুস্তাকিন মেয়েটাকে। আসলেই যা সহজে পাওয়া যায় না, তা হুট কোরে পেলে মানুষের আগ্রহ পেয়ে বসে। মুস্তাকিনও রেহাই পেল না সেই আগ্রহ থেকে। অন্তূকে দেখা যায়না, আজ যাচ্ছে। যদিও বিষয়টা মুস্তাকিনের ভালো লাগছিল না।
ধীরে হেঁটে এসে অন্তূর পাশে বসল।
রক্ত শুষে বেরিয়ে গেলে মানুষের মুখের বর্ণ বোধহয় অন্তূর মতো হয়! প্রাণ নেই মুখে, উদ্দীপনার বড্ড অভাব। হাঁটুর ওপর দুহাত একত্র কোরে থুতনিতে ঠেকিয়ে আনমনে চেয়ে আছে। অন্তূর দেহ সেখানে বসা ছিল, তার নজর ছিল না এই জগতের কোথাও!
প্রথমে কিছু বছর অন্তিকের অস্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। তারপর সেদিন তার নিখোঁজ হওয়া। এরপর আব্বুর। এরপর অন্তূকে ডাকা। বাকিটা আরও ঘোলাটে। জয়ের আচরণ আরও রহস্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। হিসেবটাকে সাধারণভাবে সমাধান করা যাচ্ছে না। কোথাও একটা কিন্তু থেকে যাচ্ছে।
-“স্যারকে ওরা কেন নিয়ে গিয়েছিল?ʼʼ মুস্তাকিন ঝুঁকে বহল মেঝের দিকে।
-“কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।ʼʼ
একরোখার মতো বলে উঠল মুস্তাকিন, “আপনার ইচ্ছেটাকে প্রাধান্য দিতে ইচ্ছে করছে না আমার। বলুন।ʼʼ
অন্তূ সেই নিস্তেজ স্বরেই কিছুক্ষণ পর বলল, “ইচ্ছে দুজনের দুটো। কারটাকে প্রাধান্য দেব?ʼʼ
-“আমারটাকে!ʼʼএ পর্যায়ে জেদি লাগল মুস্তাকিনকে।
-“জোর করছেন?ʼʼ
চোখ তুলে তাকাল অন্তূ। মুস্তাকিন চমকে উঠল। ভয়ানক সেই চোখ। লাল টকটকে। এক ধরণের জেদ ও যন্ত্রণার সংমিশ্রণে ভরপুর।
-“যা ভাববেন তাই। কী হয়েছিল ওখানে?ʼʼ একটু থেমে অপরাধীর মতো বলল, “আমার উচিত হয়নি, সময় এক ঘন্টা দেওয়া। আমি ভাবছিলাম, সাধারণ কিডন্যাপিং কেইস।ʼʼ
-“গিয়ে কী করতেন?ʼʼ
-“কিছুই করার ছিল না বলে মনে হয় আপনার? এইহাতে মার্ডারও করেছি, ম্যাডাম! যখন উপরমহল থেকে ঘুষ খেয়ে আমাকে অর্ডার করা হয়েছে প্রমাণ নষ্ট কোরে আসামী ছেড়ে দিতে, রাতের অন্ধকারে লাশ বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছি আসামীদের। সিনিয়রদের কথা অমান্য করিনি।ʼʼ মুস্তাকিনের কথাবার্তা উগ্র লাগছিল শুনতে, সেই চেনা ভদ্রলোককে ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে এক গোপন বিপ্লবী সত্ত্বা।
অন্তূ কথা বলল না। তার নিজের কথা ভাবার অবকাশই নেই মস্তিষ্কে। সবটুকু জায়গা ভিড়ে আছে আব্বুর কানের সেই সিগারেটে পোঁড়া ক্ষত।
ছুটে পালাতে ইচ্ছে করছিল কোনোদিকে। এই নোংরা দেহ, কুলষিত জীবনকে ফেলে নির্জন জনমানবশূন্যের দিকটা তাকে ডাকছিল। চোখের সম্মুখটা অন্ধকার হয়ে এলো যখন, তখন ওপার থেকে আমজাদ সাহেব ডাকছেন। ওই তো আমজাদ সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। আরে! পরনে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবী! এত্ত অভিজাত লাগছে আব্বুকে দেখতে। অন্তূ ছুটে যায় আব্বুর দিকে। আব্বুর ডান হাতের তর্জনী আঙুলটা চেপে ধরে তারা হেঁটে যাচ্ছে। যাচ্ছে, যাচ্ছে, তারা চলছে.. আর আসছে না দৃশ্যটা। সবটা অন্ধকার। রাত হয়ে গেছে। এই তো সবে বসন্তের বিকেল ছিল। এত্ত তাড়াতাড়ি রাত নামল? সব ফুরিয়ে গেল!
মুস্তাকিন চমকে উঠল। ধপ কোরে পড়ে গেছে অন্তূর শরীরটা বেঞ্চি থেকে উপুড় হয়ে। ওকে ধরে উল্টাতেই মুস্তাকিন থমকাল। অন্তূর নাক বেয়ে রক্তের প্রবাহ নেমেছে। ঠোঁটের কাছে দাঁত আঁটকে আছে! দাঁত ছাড়ালে নিশ্চিত ঠোঁট কেটে রক্ত বেরিয়ে আসবে।
ডাক্তার পার্লস রেট চেইক করতে কব্জি ধরেই বললেন, “কীসের ট্রমায় আছে এইটুকু মেয়ে! পোশাকের এই হাল কেন? আপনার কে হয় মেয়েটা?ʼʼ
মুস্তাকিন জবাব দিলো না। কে হয় অন্তূ ওর? জানেনা ও।
অন্তূকে জানানো হলো না মুস্তাকিনের, আঁখির কেইসটা হাতে নেয়ার পর পলাশই তাকে হুমকি দেয়া চিরকুট পাঠিয়েছিল। ফোনকলে বাজে ভাষায় গালি দিয়েছিল, খুন করার ধমকি দিয়েছিল। আঁখির রেপ এবং মার্ডারের সাথে অতপ্রোভভাবে জড়িত পলাশ! তবে সে একা নয়। আরও কেউ বা কারা আছে।
চলবে…
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২০.(বর্ধিতাংশ)
-“মেয়েটা আপনার স্যারের মেয়ে, তাই তো?ʼʼ
মুস্তাকিন মৃদু মাথা নাড়ল।
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “দেখুন অফিসার! আপনি নিজেই যেখানে উপস্থিত সেখানে পুলিশ কেইসে যাবার আগে আপনার সাথে আলাপ করে নিচ্ছি। মেয়েটার কথায় পরে আসছি। ওর বাবার শরীরে ভালো মাত্রার বুপ্রেনরফিন ড্রাগ ইঞ্জেকশন পুশ করা হয়েছে। সাথে যে চোরাই-আঘাতের চিহ্নগুলো রয়েছে দেহে, পর্ববর্তীতে সেসব স্থানে টিউমার এবং তা থেকে ক্যন্সারের সৃষ্টি অবধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বুঝতে পারছেন, কেমন চোরাই মারের শিকার হয়েছেন লোকটা? কিন্তু এসব কারা করেছে, কেন করেছে? এই প্রশ্ন উঠলেই চিকিৎসকবাদী কেইস ফাইল করা আমাদের কর্তব্য। সেটা আপনার জন্য ঠেকে রইল। এরকম একটা কেইসে আমরা এভাবে চুপ থাকিনা। কিন্তু যেখানে স্বয়ং আপনি.. তবুও থানায় জানাতে..ʼʼ
মুস্তাকিন ব্যস্ত হয়ে উঠল, “বুঝতে পেরেছি। ওসবের আর দরকার নেই। অন্তূ…মানে মেয়েটার কী অবস্থা, সেটা বলুন, ডক্টর!ʼʼ
-“গভীর ক্ষত মানসিকতায়। কোনো ঘটনা তাকে আঘাত করেছে, যা তার জন্য একযোগে নেয়া বোধহয় কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা বোকা নই, অফিসার। ওর কন্ডিশন যেটুকুই দেখেছি, এবং গেট আপ যা ছিল এখানে আসার পর, আই থিংক ওকে রেপ করার চেষ্টা করা হয়েছে। পরনে বোরকা ছিল, তাও অক্ষত নয়, আবার ওর বাবার এই হাল…আপনারা কি কিছু লুকোতে চাচ্ছেন? একটা মেয়ের জন্য ব্যাপারটা মরণসম প্রেশার-ইমপেক্টেড তার মানসিকতার ওপর। আপনারা ব্যাপারটাকে ফ্যান্টাসি হিসেবে নিচ্ছেন যেন! কোনোরকম পদক্ষেপ নেই, আমি বুঝতে পারছি না বিষয়টা। এ নিয়ে কোনো ঝামেলা হবে না তো? ব্যাপারটা ব্যাপক গোলমেলে। মানে…ʼʼ
মুস্তাকিন থামালো, “রিল্যাক্স, ডাক্তার সাহেব। আসলে আমি নিজেও পুরোটা জানিনা। হয়েছে অনেক কিছু তা আমিও জানি, তবে.. অন্তূর এক্সাক্ট অবস্থাটা জানতে চাচ্ছি। আমিও জানিনা কী হয়েছে! ওর কী অবস্থা?ʼʼ
-“মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে বারবার। ম্যান্টালি প্রেশার ফিল করছে অতিরিক্ত। যে কারণে বিভিন্ন ধরণের হ্যালুসিনেশন ক্রিয়েট হচ্ছে ওর সামনে। ইল্যুশন আসছে মস্তিষ্কে। সি নিড’স মেন্টালি সাপোর্ট এন্ড লটস অফ রেস্ট।ʼʼ
—
নির্বাচনের সকালে ঘুম ভাঙল দশটায়। এখনও অবধি বাইরে সব ঠিকঠাক। দলের কাউকে কোনো কেন্দ্রে এজেন্ট হিসেবে রাখেনি হামজা। কারচুপির বদনাম ছাড়া বিপুল ভোটে জিততে চায় সে। শুরুতে ক্যারিয়ারটা সর্বোচ্চ দাগমুক্ত রাখতে হবে। সামনের ধাপগুলো মানুষের আস্থা নিয়ে এগোতে হবে।
ঝন্টু সাহেব নির্বাচনে নেই। মাজহারের শরীর এখন পুরোপুরি ভালো না, তবে টুকটাক চলাচল করতে পারছে। সবকিছুর বদলা হিসেবে আজ ভোটকেন্দ্রগুলোতে খুব খারাপ কিছু ঘটার চান্স রয়েই যায়। আবার সারাদিন না হোক, ভোট গণনা অথবা ঘোষনার পরেও ঝামেলা হতে পারে।
তুলি এসে বসল হামজার পাশে, “ভাই! কোয়েলের দুধ ফুরিয়ে গেছে, একটু কাউকে পাঠা দুধ এনে দিতে।ʼʼ
হামজার সাথে তুলির সম্পর্ক ভালো না। আগে ছিল, এখন নেই। এখন দুজন দুজনের সাথে কথা বলতেও আঁটকে যায়। সীমান্ত মন্ডলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করার পরিণামে দুই ভাই-বোনের এই দূরত্ব। সীমান্তর এত মারধর সহ্য করেও তুলি ও বাড়িতে রয়ে গেছিল, হামজা আনতে যায়নি, আসলেও বলে না চলে যেতে। হামজা তুলির কাছে বাচ্চাদের মতো অনুরোধ করেছিল, সীমান্তকে ভুলে যেতে। এরপরেও তুলির এই পদক্ষেপ হামজাকে বহুদূরে টেনে এনেছে।
জয় উঠে এসে ঝারি মারল একটা, “কাঁদছে কেন মেয়ে? দুধ ফুরিয়ে যাবার পর বলার কারণ কী? সেই সময়টুকু কি দুধের পাতিল গুলিয়ে খাওয়ানোর পরিকল্পনা থাকে? এইসব বালবেটিরা বাচ্চা মানুষ করছে!ʼʼ
তুলি কিছু বলল না। সে ব্যতিক্রম কিছু আশা করে না জয়ের কাছে। সাদা ধবধবে লুঙ্গি পরনে, যেটা দেখলে হামজা প্রায়ই বলে, ‘তুই কি লালন ফকিরের ভক্ত? ওরা এমন কাফনের কাপড়ের মতো লুঙ্গি পরে।ʼ
হামজা তখনও বসেছিল সোফাতে। চিন্তিত মুখ, উদ্বেগে ভ্রু কুঁচকে আছে। সোফাতে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুঁজে কপালে আঙুল নাড়ছিল। জয় কথা বলল না। হামজা সেদিনের পর আজ প্রায় দু’দিন কথা বলে না জয়ের সাথে। এরকম বেহুদা কাজ যে জয় এই প্রথম করেছে, এমন নয়। বন্ধুত্বকে শত্রুতায় পরিণত করার হাত দক্ষ তার। তাও আবার অহেতুক সব কারণে এসব উল্টাপাল্টা কাজ করে বেড়ায়।
রুমে গিয়ে লুঙ্গির ওপর খয়েরীরঙা একটা শার্ট পরে বেরিয়ে গেল বাইরে। গোয়ালার ফার্ম বাড়ি থেকে কিছুদূর হেঁটে। আজও নিচতলার ওয়ার্কশপে কাজ চলছে। রাস্তায় লোকজনের চলাচল দেখল। কেউ ভোট দিয়ে আসছে, কেউ যাচ্ছে। একটা অন্যরকম আমেজ দেখা গেল রাস্তায়, পোস্টারগুলো এখনও সেঁটে রাখা, অথবা ঝুলছে ওপরের তারে।
যাওয়ার সময় সাথে রাহাত ছিল। জয় হাঁটার সময় হাতে লুঙ্গি উঁচিয়ে ধরে হাঁটে। লম্বা ছিপছিপে জোয়ান শরীরে লুঙ্গিতে অন্যরকম অভিজাত্য ফুটে ওঠে তার শরীরে।পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল, বেল্ট খোলা। হাতে একটা রুপোর বালা।
আশপাশের লোকেরা যারা হামজাকে ভোট দিয়ে ফিরছিল, হাত উঁচু কোরে বৃদ্ধা আঙুলের টিকা দেখিয়ে ঘাঁড় নেড়ে হাসল। রাস্তার উঠতি বয়সী ছেলেরা সালাম ঠুকল। দৌঁড়ে এলো কেউ কেউ হ্যান্ডশেক করবার জন্য।
ডেইরি ফার্মের পেছনে মাজহারদের আস্তানা। সেখানে ঢুকতেই নাক কুঁচকে ফেলল রাহাত, “ভাই! কোনে ঢুকতেছেন? বাইরে খাঁড়াইয়া দুধওয়ালা বেডারে ডাইকা আনি। গন্ধ লাগতেছে।ʼʼ
জয় গুন গুন করে গান গাইছিল, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি, জন্ম দিয়েছ তুমি মা, তাই তোমায় ভালোবাসি—
গোয়ালের মাঝ দিয়ে গান গাইতে গাইতে দিব্যি হেঁটে এগিয়ে গেল ভেতরের দিকে। রাহাত বুঝল না, জয় ভেতরে কেন যাচ্ছে!
গোয়ালাকে পাঁচ লিটার দুধ ভরে রাখতে বলে, লুঙ্গিতে কাছা মারতে মারতে এগিয়ে গেল ডেইরিফার্মের চারপাশে দেয়া উঁচু দেয়ালের দিকে। তখনও গান গাইছে, “জয় বাংলা, বাংলার জয়, হবে হবে হবে হবে জয়…
জয় আমির আর বাংলার জয়..ʼʼ থেমে গেল, “আরে শালার!ʼʼ আবার গান ধরল, “জয় বাংলা, বাংলার জয়…ʼʼ
লুঙ্গির কাছা পেছনে গুজে একলাফে চড়ে গেল প্রাচীরের ওপর। অল্প একটু মাথা বের কোরে দেখল, ওপাশের মাঠে এক গোল মিটিং বসেছে। জয়ের ভাবনা ভুল হবার নয়। সেখানে মাজহার শুধু চেয়ারে, স্ক্র্যাচে ভর করে বসে আছে। পলাশকে ওখানে দেখে হাসি পেল জয়ের। এই দুনিয়ায় জাদু বলতে যদি কিছু থেকে থাকে তো সেটা মানুষের রূপ পরিবর্তনের ব্যাপারটা। ম্যাজিকের মতো এক লহমায় নিজের পুরো ধারা বদলে আসল রূপে চলে আসতে মানবজাতি সময় নেয়না।
এতদিন পলাশ স্বীকার করতো না যে তার মাজহারের সাথে সম্পর্ক ভালো, আবার তলে তলে হামজা ও জয়কে হাতে রেখেছিল নিজের শক্তি, কিছু গোপন ব্যাপার ও পার্টনারশিপ বহাল রাখতে। আরও একজন পিঠ এপাশ কোরে ঘাসের ওপর বসে আছে সেই মিটিংয়ে। তাকে দেখে জয়ের হো হো কোরে হাসি এলো। জোকারদের মুখোশ নেহায়েত মুখোশ। অথচ মানুষ যে মুখোশ পরে ভালো মানুষদের ধোকা দিয়ে তাদের সাথ মিশে থাকে, এটা বোধহয় খুব সস্তা তবে শক্ত মুখোশ!
জয়ের এই বিষয়ে গর্ব আছে নিজের ওপর, সে অন্তত নিজের নোংরামিগুলো সারাদিন সদিচ্ছায় স্বীকার কোরে বেড়ানোর বাহাদুরীটুকু আছে। সে কোনোদিন কারো কাছে নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে চায় না, মিথ্যা রূপ প্রকাশ কোরে মানুষকে ধোঁকা দেয়াকে সস্তা, ছোটোলোকি কারবার মনে হয় তার। সে খারাপ, এটা তার বুক উঁচিয়ে বলার যে প্রবণতাটা আছে, নিজের সেই গুণটাকে সে ভালোবাসে।
দুধটা রাহাতের হাতে দিয়ে জয় ভোটকেন্দ্রের দিকে গেল। রাহাতের কাছ থেকে ছোট্ট একটা ড্যাগার নিলো প্রয়োজনে প্রতিরক্ষার জন্য। পেছন থেকে ডাকল, শোন!
-“কন ভাই।ʼʼ
“বড় সাহেবকে গিয়ে বলবি, দ্রুত যেন তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে। আমাদের অনুপস্থিতিতে নাটক জমাতে পারে প্রতিদ্বন্দীরা। সেইগুলা দেখা লাগবে তো। ইট’স এন্টারটেইনমেন্ট।ʼʼ
—
নিঃশব্দ শীতের রাত। দেড়টা পেরিয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটার আওয়াজ কানে লাগছে। রাবেয়া বোধহয় তাহাজ্জুদের নামাজে বসেছেন।নিজের বিছানায় শুয়ে আছেন আমজাদ সাহেব। পিঠে থেতলে মারা হয়েছে, শুতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। অন্তূ পায়ের কাছে বসে রইল চুপচাপ হাটুতে থুতনে ঠেকিয়ে। দুনিয়াটাকে পর মনে হয় তার খুব। মাথাটা শূন্য। জীবন এক নিষ্ঠুর খেলোয়াড় বুঝি!
অন্তিক যেদিন বিয়ে কোরে আনলো, আমজাদ সাহেব ভৎসনা করেছিলেন তাকে। অন্তিক যবর ত্যাড়া ছেলে। বিশেষ কোরে তাকে তুচ্ছজ্ঞান করলে সে সইতে পারতো না ছোট থেকেই। সেদিন উনার তাচ্ছিল্যটুকু গভীরে লেগেছিল, অথচ সে বাপের সেইসকল কথার পেছনের ভালোবাসার শাসনটুকুকে এড়িয়ে গিয়েছিল। জিদের বশে এমন বহু সত্য মানুষ কোরে এড়িয়ে যায়। অন্তিকের মাথায় ভূত চাপলো, সে প্রমাণ করে দেখাবে, সে রোজগার জানে, নিজের বউকে নিজে পালন করতে পারে। কিন্তু গয়নাগুলো মার্জিয়া এনে দিয়েছিল বাপের বাড়ি থেকে। মার্জিয়া অন্তিকের চেয়েও বেশি জেদি। অন্তূ নিশ্চিত, পুরোটা অন্তিকের না, বরং বেশির ভাগ উৎসাহ মার্জিয়ার। কারণ সেদিনের অপমান মার্জিয়াকে ঘিরেই করা হয়েছিল।
সেই গয়না বন্ধক রেখে পলাশের কাছে সুদের চুক্তিতে টাকা নিলো অন্তিক। কিন্তু পলাশ কোনো যেনতেন মহাজন নয়, একেবারে নরক থেকে উঠে আসা এক অভিশাপ। সুদের টাকা দেবার জন্য যে আয়টা দোকানে হওয়ার কথা, তা পলাশের ছেলেরা প্রতিদিন টুকটাক কোরে চাঁদা তুলেই খেয়ে ফেলতো। দোকানে ভাঁটা পড়তে শুরু করল। অন্তিকের নিজের ব্যবসা খাঁড়া করা তো দূর, পুঁজিই ফুরিয়ে যেতে লাগল। বাড়িতে কানাকড়ি আসার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ দোকানের মাল দিনদিন কমে আসল পুঁজি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল। অথচ তখনই পলাশের পুরো আসল টাকা, আর সপ্তাহের হিসাবে নির্দিষ্ট টাকার সুদ জমে জমে পাহাড় হচ্ছিল। অন্তিক লজ্জার মরণে এ কথা বাড়িতে বলার সাহস পায়নি। যতদিনে সে বুঝতে পেরেছিল নিজের ভুল, ততদিনে আব্বুর সামনে এসে দাঁড়ানোর মুখ সে হারিয়ে ফেলেছিল। যে আব্বুকে টক্কর দিতে এতকিছু, সেই টক্করের খেলায় যখন তার ধ্বংস নেমে এলো, সে আর আব্বুর সামনে এসে দাঁড়াতে পারেনি। দিনদিন মৃত হয়ে উঠছিল।
মার্জিয়া জেদি মেয়ে। তাকে সুখ দেয়ার ক্ষমতা ছিল না অন্তিকের। সে ঋণে ডুবে প্রায় মৃত। আবার মার্জিয়ার বাপের বাড়ির গয়নাও সে খেয়ে ফেলেছে, সে চাইলেও বউকে শাসন করতে পারেনি। বা সেই মানসিকতাই হয়ত ছিল না। শিক্ষিত ছেলেটা একটা সন্ত্রাস মহাজনের কাছে এভাবে শোষিত হয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল খুব খারাপভাবে।
মার্জিয়া সব জেনে শুধু গজরাতে পেরেছে। সে এ বাড়ির লোকেদের দায়ী করতো সে এই অবস্থার জন্য। অন্তূ এবং ওর বাবা-মাকে এজন্য সহ্যই করতে পারেনি কোনোদিন।
অন্তূর গাল বেয়ে টসটসে গরম জল গড়িয়ে পড়ল। সেই কান্নায় আওয়াজ অথবা মুখের অঙ্গভঙ্গি নেই। এতকিছু হয়ে গেছে, অথচ কোনোদিন আন্দাজ করার সূযোগ পায়নি। ভালোবাসলে মূল্য চুকাতে হয়। আমজাদ সাহেব বাপ হিসেবে, সন্তানকে ভালোবাসার দায়ে এই মূল্য চুকালেন। কিন্তু সে? সে কীসের দানে বলি হলো পলাশের হাতে? বোন হিসেবে? এরকম তো কথা ছিল না! তাহলে বড়ভাইকে গোপনে ভালোবাসার দায়! ছোটবেলার সেইসব সুন্দর খুনশুটির দায়? কীসের দায় চুকিয়েছে অন্তূ?
দূর থেকে বোমাবাজির আওয়াজ আসছে। অন্তূ বুঝে আলতো কোরে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। নিশ্চয়ই জিতে গেছে হামজা! এই মাঝরাতেও তার উল্লাস যাপিত হচ্ছে! একের পর এক বোমা-আতশবাজি ফুটছে। বিকট আওয়াজে যেন ছাদের ওপর এসে পড়ছিল সেগুলো। কয়েকটা গুলিও ফুটলো। আমজাদ সাহেব নড়েচড়ে উঠলেন, তবে কড়া ওষুধের প্রভাবে ঘুম ভাঙল না পুরো। তার খানিক বাদেই সেই মাঝরাতে বাড়ির সামনে দিয়ে বিশাল রবে মিছিল চলে গেল। এই উল্লাস ত্রাসের রাজত্ব শুরু হবার উল্লাস!
শেষ রাতের দিকে থামলো উল্লাস। তবুও দূর থেকে ধুমধাম গানের আওয়াজ ভেসে আসছিল। পুরো দিনাজপুর মেতে উঠেছিল যেন উৎসবে! ভোজন চলছে, নাচানাচি হচ্ছে, এমন একটা আমেজ ঘরের ভেতর থেকেও টের পাচ্ছিল।
কাঁদার পরে মানুষ খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তার ওপর মানসিক চাপ। রাবেয়া জায়নামাজে শুয়ে পড়লেন। অন্তূ বসেছিল ওভাবেই। এটা চলে আসছে এমনভাবেই। সে অসুস্থ হলে আমজাদ সাহেব ঘরে আসতেন না, বসে থাকতেন অন্তূর ঘরে সারারাত। রাবেয়া পাশে ঘুমিয়ে নিতো। আমজাদ সাহেব অসুস্থ হলে অন্তূকে বসে থাকে সেভাবেই।
একদম নিরব হয়ে গেছে পরিবেশ। তার ওপর ঠান্ডা আবহাওয়া, শীতের রাত। এমন এক ভৌতিক মুহুর্তে দরজায় করাঘাত পড়ল। করাঘাত যেন চাপা হাতে পড়ছে, হাত শব্দ বাঁচাতে চাইছে, সংকোচে জমে গেছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ ও ইতস্তত কোরে খুলতে উঠে গেলেন রাবেয়া। অন্তূর মস্তিষ্ক আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে উঠল।সে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, সাহসগুলো এক বেলায় দুমড়ে রেখে দিয়েছে পলাশ ও জয় মিলে! প্যানিক কাটেনি। এখনও মনে হচ্ছে, এবার তার সাথে আবার কোনো নারকীয় ঘটনা ঘটবে।
ধীর- স্থির পায়ে এক লম্বা পুরুষ ঘরে পা রাখল। তার পায়ে প্রাণ নেই, চোখের দৃষ্টিতে চঞ্চলতা নেই। নজর থেমে আছে বিছানায় শুয়ে থাকা লম্বাটে অসুস্থ শরীরটার দিকে। নিস্তরিৎ পায়ে এগিয়ে এলো বিছানার দিকে। অন্তূ তাকিয়ে দেখল না। শক্ত হয়ে বসল। এতক্ষণের আতঙ্ক দূর হয়ে, এক বুক ঘেন্না তার শিরদার বেয়ে নেমে যাচ্ছিল।
পুরুষ অবয়ব ধপ কোরে বসে পড়ল আমজাদ সাহেবের পায়ের কাছে। আস্তে আস্তে হাত এগিয়ে দিলো উনার পায়ের ওপর। বহুদিন পর এই ঘরে প্রবেশ তার, আমজাদ সাহেবের এত কাছে আসা। ঝুঁকে বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। টপ করে এক ফোঁটা জল পড়ে আমজাদ সাহেবের পায়ের ওপর বিছানো কম্বলে। অন্তূ উঠে বেরিয়ে এলো রুম থেকে।
চলবে…
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২১.
আমজাদ সাহেব চুপচাপ চেয়ে ছিলেন। অন্তিক উনার অসুস্থ হাতদুটো জড়িয়ে ধরে হাতের ওপর কপাল ঠেকিয়ে বসে রইল। ছেলেদের কান্না টের পাওয়া যায় না।
অন্তিক খুব জেদি ছিল, ছোট বেলায় আমজাদ সাহেব শাসন করার জন্য মারলে সে আর ভাত খেত না। কোনোভাবেই কেউ খাওয়াতে পারত না, যতক্ষণ না আমজাদ সাহেব আবার আদর করে খাওয়াবেন। খাওয়ার আগে ঠিক এভাবেই আব্বুকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদ করে কাঁদতো।
কিন্তু সেদিন রাতে আমজাদ সাহেব কিছুই বললেন না। অন্তিকের ভেতরের যন্ত্রণা বাড়ছিল এতে। এরপর পা দুটো জড়িয়ে ধরে বসে রইল। সকাল হলো, সে পা আর ছাড়েনি। কতবার কতভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছে আব্বুর আঘাতগুলো, পাগলের মতো প্রলাপ বকছিল। মার্জিয়াও এসে বসল একটু বেলা বাড়লে। জেদি মেয়েটার মুখেও রা নেই। অপরাধীর মতো মুখ কোরে বসে ছিল।
বেলা এগারোটার দিকে মুস্তাকিন এলো। আমজাদ সাহেবকে সালাম কোরে এসে দাঁড়াল, রাবেয়া চেয়ার এনে দিলেন। বসল না সে চেয়ারে, যে মাদুরটা পাতা ছিল, তাতে সবার সাথে পা গুটিয়ে বসে পড়ল। চেয়ারে বসে আছেন আমজাদ সাহেব। হুট কোরে অন্তূ কেন যেন একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা তুলে বসল, “আঁখির কেইসটা কতদূর এগোলো, অফিসার?ʼʼ
-“কেইস টানার জন্য দড়ি লাগে, সেটার প্রান্ত হারিয়ে ফেলেছি। থেমে আছে, বলা চলে বন্ধ হয়ে গেছে।ʼʼ
-“আপনি বলেছিলেন ওরা নাকি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে?ʼʼ
-“হ্যাঁ। আমি গিয়ে পাইনি। আপনি গিয়েছিলেন না?ʼʼ
-“আমিও পাইনি।ʼʼ
-“তাহলে যে জিজ্ঞেস করছেন?ʼʼ
অন্তূ কথা বলল না। তার মুখে পর্দা নেই, শুধু মাথায় ওড়না দেয়া। অন্তূ যতক্ষণ চুপ রইল আর কেউ কথা বলল না। সে নিজেই সময় নিয়ে বলল, “এর মাঝে তিনদিন অলরেডি কেটে গেছে, আজ চতুর্থ দিন। ওরা এই দু’দিনে কোনো মুভমেন্ট দেখায়নি। ব্যাপারটা জটিল। অন্তিক এখন বাড়িতে। যদিও আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আসলে কীসের জন্য কী হচ্ছে, তা ধারণা করতে গেলে মাথায় প্যাচ লেগে যাচ্ছে। ওরা এবার বাড়ি চলে আসলে পুরো পরিবার শুদ্ধ টুকরো টুকরো কোরে কেটে রেখে যাবে, হয়ত। তাই আমি চাচ্ছিলাম, থানায় একটা ছোট্ট রিপোর্ট কোরে সাধারণ শালিসের মাধ্যমে পলাশের কাছে কিছুদিন সময় চেয়ে নিতে। যাতে কুড়িগ্রামের জমিটা বিক্রির জন্য আর খানিকটা সময় পাই।ʼʼ
মুস্তাকিন একটু ভেবে বলল, “থানায় এ নিয়ে আলাপ করাটা কতটা ঠিক হবে, বলতে পারছি না। পলাশ ব্যাপারটা কেমনভাবে নেবে জানা নেই। আর খবর পেয়েছি, রাজন আজগর দিনাজপুর নেই।ʼʼ
-“ওদের বিরুদ্ধে এমনকি কারও বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগ করব না আমি, শুধু অন্তিকের ঋণের বিষয়টা জানাবো, এবং পলাশ আজগরের সাথে একটা আলোচনার মাধ্যমে আইনতভাবে খানিক সময় আমরা চেয়ে নিতে চাই।ʼʼ
মুস্তাকিন মাথা নাড়ল। কিছুসময় চুপ থেকে বলল, “আপনি কি ভরসা হারিয়েছেন আমার ওপর, অন্তূ?ʼʼ নির্লিপ্ত শোনালো মুস্তাকিনের স্বর।
-“ভরসার প্রশ্ন উঠছে না, অফিসার! তাছাড়াও আপনার ডিপার্টমেন্ট আলাদা। আপনি খুন-খারাবীর প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন। আমাদের ব্যাপারটা তা নয়।ʼʼ
আজ মুস্তাকিন অন্তূর জলদগম্ভীর, শীতল বুদ্ধিমতি রূপটা আরেকবার পর্যবেক্ষণ করল। যার কথার ভার, চোখের শান্ত চাহনির ঝাঁজাল তেজস্ক্রিয়তা এবং মানসিক কাঠিন্য খুব নজরে আসছিল। অথচ এই মেয়েটাও কেমন মরিচা ধরা পাতলা লৌহখণ্ডের ন্যায় ক্ষয় হয়ে গেছিল সেদিন। মানসিকতায় শক্তির ওপর আঘাত ঠিক ইট-বালু-সিমেন্টের কাঁচা গড়নে পানির মতো কাজ করে। যত পানি দেবে, তত মজবুত হবে যেন।
অন্তূর পরীক্ষা আছে আজ। সে বের হবার সময় অন্তিক ডাকল। বহুত দিন পর অন্তিক ডাকল। অন্তূ ভাবান্তরহীন ভাবে ফিরে তাকাল।
-“এই অবস্থায় একা যাবি না। চল আমি সাথে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসি।ʼʼ
অন্তূ হেসে ফেলল, “ধুর! বেঁচা গরুর দাঁত ধরে টানছিস কেন? তাতে কি গরু আর ফিরবে মালিকের কাছে? আমি সোল্ড আউট রে! পণ্যের মতো কম্পানি থেকে শহর-বাজারের শোরুমগুলোর মালিকদের কাছে সেম্পল হিসেবে দেখা হয়ে গেছি, এখন আর প্রোডাক্ট স্টকে নেই। অলরেডি সোল্ড। তুই আরাম কর। আমি চলে আসবো।ʼʼ
অন্তিক মাথা নত করল না, লজ্জাও পেল না। সে তাকিয়ে দেখল অন্তূর দাপুটে পা ফেলে বেরিয়ে যাওয়া। অন্তূর কাছে সে গুরু ছিল, তবে নিচে নেমে গেছে কয়েক বছর আগে। ততদিনে ছোট্ট অন্তূ বড় হয়ে গেছে। সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তার তো আরও বহু ভৎসনা প্রাপ্ত। বাপ-মা-বোন ক্ষমা না করলে তার ক্ষমা নেই। এরকম ছোট-খাটো কটুক্তিতে তার সুখ হচ্ছিল, অন্তূর কাছে মাথা আরও নত হয়ে আসছিল। মানুষ চিরকাল মোটেই নিজের আত্মগৌরব ধরে রাখতে সক্ষম হয় না। নিজের দোষে তা কখনও কখনও খুব জঘন্যভাবে মরা পাতার মতো ঝরে পড়ে। ঠিক যেমন সে, আজ নিতান্তই নর্দমার কীট। অবাঞ্চনীয় জেদের বশবর্তী হয়ে সর্বস্ব ধ্বংস করা এক অভিশাপ।
—
পরীক্ষা শেষ কোরে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে অন্তূ গেল থার্ড ইয়ারের ফর্ম ফিল-আপের জন্য। মনোয়ারা রেহমান ওকে দেখে মৃদু হাসলেন, “ভালো আছো?ʼʼ
মলিন হাসিটা লুকিয়ে সে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, ম্যাম! আপনি ভালো?ʼʼ
মনোয়ারা মাথা নেড়ে বসতে বললেন। এক মুহুর্তের জন্য অন্তূর দিকে তাকিয়ে হুট করে যেন থমকালেন ভদ্রমহিলা। অন্তূর মুখ খোলা, পর্দা নেই তাতে। তবে সংগোপনে এড়িয়ে গেলেন এই ব্যাপারটা। মনোয়ারা কিচু বুঝলেন বোধহয়, “কিছু বলবে, অন্তূ? তোমার সাথে এমন ইতস্ততবোধ যায়না। আমি তোমাকে স্পষ্টভাষী হিসেবে দেখতে চাইবো।ʼʼ
আশ্বস্ত হয়ে বলল অন্তূ, “ম্যাম! আমাদের কমনরুমে যে সালমা খালা কাজ করতেন, উনার সম্বন্ধে কী কী জানা আছে আপনার?ʼʼ
সন্দিহান স্বর মনোয়ারার, “কেন জিজ্ঞেস করছো?ʼʼ
অন্তূ খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। কিছু ভাবলো। একটু রহস্যমণ্ডিত লাগল ব্যাপারটা। এরপর আচমকা সহজ গলায় বলল, “জানিনা। আসলে উনার মেয়ের ওভাবে মৃত্যু…ʼʼ
-“উনার মেয়ে? আঁখি উনার মেয়ে ছিল?ʼʼ
অন্তূ অপ্রস্তুত হলো, “জি ম্যাম! উনার মেয়ে আঁখি।ʼʼ
-“ও আচ্ছা। তো তুমি কেন জিজ্ঞেস করছো সেসব ব্যপারে?ʼʼ
অন্তূ কথা খুঁজে পেল না আর। প্রসঙ্গ এড়াতে বলল, “আমাদের নতুন সাজেশন দেবার কথা ছিল না, ম্যাম?ʼʼ
বেরিয়ে আসার সময় ফের একবার ডাকলেন মনোয়ারা, “শোনো মেয়ে! এতক্ষণ অনধিকার চর্চা হবে বলে জিজ্ঞেস করিনি, তবে না করে পারলাম না। তোমায় দেখে ঠিক লাগছে না। আমার অভিজ্ঞতাকে বোধহয় ফাঁকি দিতে পারেনি তোমার চতুর চোখ।ʼʼ
অন্তূ হাসল, “সুযোগ পেলে পরে কখনও সরল চোখে তাকাবেন, ম্যাম। পড়ে নেবেন সবটা, আজ জোর করবেন না। আমার জন্য দোয়া করবেন।ʼʼ
একটা সরু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। জীবন তার সাথে বেশ গভীর নিষ্ঠুর খেলায় মত্ত হয়েছে। জিতবে কে? জীবনের সাথে নাকি জেতা যায় না, হার নিশ্চিত জেনেও সে কি একবার লড়বে? হারার জন্য লড়াটা বোকামি হবে না? আবার না লড়ে জিতে যাওয়াটাও কি ছোটলোকি হবে না?
ভাবনা শেষ হলো শহীদ মিনারের সম্মুখে এসে। মেরুদণ্ড বেঁয়ে এক শঙ্কিত হাওয়া মস্তিষ্কের নিউরণ কোষে আনদোলন তুলল যেন। জয়…জয়…জয় আমির! এই পথটা তার বহু হেনস্থার সাক্ষী! আজ দেখা হবে? না হবার চান্স বেশি। গতকাল নির্বাচনে জেতার উৎসব করে এখন হয়ত ঘুমাচ্ছে!
অন্তূ হাসল, এরা সুখী, কারণ এরা খারাপ। অন্তূ অবাক হলো, আশ্চর্য! সে নিজেও তো খারাপ, তবুও তার জীবনে এত ঝঞ্ঝাট কীসের? নাকি নিয়তির কাছে তার খারাপ মানসিকতার খবর পৌঁছায়নি? নিয়তি নিজেও জানেনা অন্তূ কতটা স্বার্থপর, হিংস্র আর কূটিল। আবার সময়সাপেক্ষে খুব দূর্বলও, এই বিষয়টাকে অবশ্য ঘৃণা করৈ অন্তূ। দূর্বল কেন সে? পুরোপুরি খারাপ হতে হবে তাকে, গোটাটা আপাদমস্তক, প্রতিটা শিরার প্রবাহধারায় খারাপের তরল ঢুকাতে হবে। পলাশ ভালো আছে, জয় ভালো আছে, এ সমাজে এমন সব জয়-পলাশেরা এক ডাকে সুখী মানুষ। সেও সুখে থাকবে, শুধু একবার খারাপ হয়ে গেলেই তার সুখ আর ঠেকবে না কোথাও। নিজেকে এ পর্যায়ে পাগল মনে হলো অন্তূর।
সেই রাস্তা। জয়-হামজার ক্লাবের রাস্তা। ক্লাবটাকে বেলুন, ফুল বিভিন্ন ধরণের সরঞ্জামে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। একগাদা চেয়ার জড়ো করা পাশের মাঠটায়। বেশ কিছু ডেকচি, প্লেট, শামিয়ানা ইত্যাদিও দেখতে পেল। উৎসব বেশ জমজমাট পালিত হয়েছে। অন্তূর বুকটা আবার একটু কাঁপলো। ক্লাবের সামনে কেউ নেই। দুপুর গড়ানো সময়। সবগুলো নাচানাচি-লাফালাফি কোরে হয়ত বিশ্রাম নিচ্ছে এখন?
ঘরবাড়ি ওভাবেই পড়ে আছে, শুধু মানুষগুলো নেই। চাঁদনীর কথা অন্তূর মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে। মেয়েটাকে একদিনেই কেন জানি মনে ধরে গিয়েছিল। আর সালমা খালা? উনার কান্নাজড়িত মুখটার কথা মনে পড়লে বুক ভার হয় অন্তূর। অন্তূর চাঁদনীকে দরকার। ওর বিশ্বাস মেয়েটা অনেককিছু জানে। অন্তূ এটাও ভেবে বের করেছে এই দু’দিনে, এসব তাদের পরিবারের সাথে শুধুই ঋণের টাকার দায়ে বোধহয় হয়নি। কিছু একটা ঘটছে, ঘটেছে, চলছে পিঠপিছে। যা আন্দাজের বাইরে।
কী হতো, যদি না জয় সেদিন ওকে শেষ মুহূর্তে রক্ষা না করতো! ভাবতেই বিষিয়ে উঠল ভেতরে ভবনাটা। এক জানোয়ারের সাপেক্ষে আরেক জানোয়ারকে শুকরিয়া জ্ঞাপন করছে যেন পাগল মনটা! তবু সে কৃতজ্ঞ ওই নোংরা লোকটার কাছে। অন্তত নিশ্চিত সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষার খাতিরে।
টিনের বেড়া কেটে বানানো দরজাটা চাপানো ছিল। তা চেপে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতেই কেমন ক্যারক্যার শব্দ করে উঠল। অন্তূ সাবধান হলো। কোনোমতো ভেতরে মুখ দিতেই একটা বিশ্রী গন্ধ এসে সুরসুর কোরে নাকের গভীর প্রবেশ করল। বমি এসে গেল অন্তূর। ওড়না তুলে নাকে চেপে ধরল। এই ক’দিনে একটা বসত বাড়িতে এমন দুর্গন্ধের উৎস কী? কিছু মরে পড়ে আছে নাকি?
ঘরগুলো ফাঁকা। জিনিসপত্র কিছুই নেই। যত এগিয়ে যাচ্ছিল, গন্ধটা আরও প্রকট হয়ে নাকে আসছিল। মাটির রান্নাঘরে ইঁদুর মাটি তুলে ছোট ছোট পাহাড় বানিয়েছে। চাঁদনী যে ঘরে তাকে বসিয়েছিল সেখানেও উঁকি দিলো একবার। ফাঁকা সেসব। অথচ গন্ধের উৎসটা আসছে আসলে ওই বিল্ডিং থেকে। যেটা অন্তূ এর আগের বার এসেও দেখেছিল। ওভাবেই পড়ে আছে। শুধু ছাদ হয়েছে, নিচে মাটি, জানালা-দরজা কিছুই নেই।
কৌতূহল দমাতে না পেরে সেখানে উঠে গেল অন্তূ। ইটের ওপর ইট রেখে সিঁড়ি তৈরি করা। যেটা আগে ছিল বলে মনে পড়ল না। বালু বিছানো মেঝে। দুটো পাশাপাশি ঘর। একঘরে উঁকি দিয়ে ফাঁকা পেল। ওপর ঘরে যেতেই একদম পেট গুলিয়ে এলো অন্তূর। শক্ত করে ওড়না চাপল নাকে। অবাক হয়ে দেখল ঘরটা।
একটা মাদুর, দু-তিনটা চটের বস্তা, চাটাই, পিড়ি ইত্যাদি বিছানো। তার ওপর ছিটিয়ে পড়ে আছে অনেকগুলো কাঁচের বোতল, ক্যান। বোতলগুলো অ্যালকোহলের। মোড়কের মতো কাগজ ছড়িয়ে আছে পুরো ঘর জুড়ে। তাতে নিশ্চয়ই নেশাদ্রব্য ছিল? একটা জিনিস, যা অনেকগুলো এখানে-ওখানে পড়ে আছে, তা দেখে প্রথমে বুঝতে পারছিল না অন্তূ, এগোলো আসলে কী? একটু পরেই মাথায় এলো, এ তো কলকি। গাঁজার কলকি বা স্টিক তৈরির তিনকোণা আকৃতির মোড়ক। এসবের গন্ধও আসছে, তবে এমন বিশ্রী আর তীব্র যেন নয়, যা নাকে আসছিল। এই ঘরের ফাঁকা জানালায় চাটাই বেঁধে দেয়ায় ঘরের ভেতরে দিকটা অন্ধকার প্রায়। অন্তূ আরও কিছুটা এগিয়ে গেল।
গা গুলিয়ে এলো ওর। মাংস পঁচার গন্ধ নাকি খুব বিশ্রী হয়, অন্তূর মনে হচ্ছিল এরকম নোংরা দুর্গন্ধ তার নাকে আগে প্রবেশ করেনি কখনও। সে আরেকটু ঝুঁকল। বেকারীগুলোতে যে পাতার ওপরে কোরে বিস্কুট, রুটি সেঁকতে দেয়া হয় তুন্ডুরীতে, সেই পাতা। তার ওপর ঘন, শুকনো সাদা-লালচের মিশ্রণে কেমন ক্রিম জাতীয় পদার্থ লেপ্টে আছে। সাদা পদার্থগুলো আলাদা হয়ে আছে জায়গায় জায়গায়। অন্তূ বুঝতে পারছিল না জিনিসটা কী আসলে? কী লেগে আছে লোহার পাতাগুলোর ওপর। খানিকক্ষণ চেয়ে রইল। কী ধরণের পদার্থ? কোনো ক্রিম অথবা রাসায়নিক দ্রব্য? হুট কোরে জট খুলল যেন। ঘন অফ-হোয়াইট রঙা ক্রিম জাতীয় পদার্থ কী তা বুঝতে পেরে ঘেন্নায় গা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। পায়ের পাতা শিরশির কোরে উঠল। পুরুষের বীর্য! অন্তূ কয়েক কদম পিছিয়ে এসে কেঁপে উঠল। একটু ধাতস্ত হতেই ভাবনায় এলো, তাহলে এই পদার্থটির সাথে রক্ত কেন? পরে বুঝতে পারল, ওখানে পড়ে শুকিয়ে আছে রক্ত-পুঁজ এবং বীর্য—মানবদেহের বর্জ্য পদার্থের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও নোংরা তিনটি পদার্থই এখানে পড়ে আছে। অন্তূর শরীরের পশমগুলো তখনও দাঁড়িয়ে আছে, লোভকূপগুলো শিউরে আছে। পেটে মোচড় দিয়ে আসছিল। এখানে কী হয়? মদ-জুয়ার আসর বসে, তা তো বোঝা গেল নাহয়! তবে এগুলো কী? কেন? কী ঘটে এখানে? নাকি সে-ই বেশি ভাবছে?
হতে পারে, কারও ক্ষত ড্রেসিং করা হয়েছে এখানে? বদরক্ত ও পুঁজ ফেলা হয়েছে! তাহলে বীর্যর মতো এমন একটা অবাঞ্ছিত পদার্থ এমন একটা জায়গায় খোলাভাবে? এই পদার্থ কি এভাবে পড়ে থাকার মতো কিছু? কী ধরণের নোংরামি হয় এই পরিত্যক্ত ঘরখানায়?
সে যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো, আছরের আজান পড়ছিল। হাত-ঠান্ডা হয়ে এসেছে, কেমন ঘোর লেগে গেছিল। সাধারণ স্বাভাবিক জীবনটা কবে থেকে যেন এমন উদ্ভট সব পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার অভ্যাস গড়ে নিলো!
এই ভয়টাও ভেতরে কাজ করছিল না, যে পাশেই ক্লাবঘর, কেউ দেখে ফেলবে তাকে। খানিক হেঁটে তবে রাস্তায় উঠতে হয়। বাড়িটার চারপাশে কোনো বসতি নেই। অন্তূ ভেবে পাচ্ছিল না, এখানে আসলে হয় কী? আর বাড়ির লোকগুলোই বা গেল কোথায়? কেউ জোর কোরে উঠিয়ে দিয়েছে? কারা উঠিয়ে দিয়েছে? ক্লাবের মালিকেরা?
পাশের বাড়িতেই ঢুকল সে, দ্বিধা-সংকোচ ঠেলে। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করল, “ওই বাড়ির লোকেরা কোথায় গেছে?ʼʼ
বাড়ির মহিলা বললেন, “হুট কোরে একদিন আইছিল, পরে আবার চলে গেছে হয়ত। কারও সাথে তেমন সম্বন্ধ ছিল না ওদের, যতদিন ছিল এখানে।ʼʼ
অন্তূর চোখ-মুখ কুঁচকে উঠল, “মানে? হুট কোরে এসেছিল মানে? সালমা খালা এখানকার বাসিন্দা না?ʼʼ
-“ও মা! তা হবে কেন? কয়েকমাস আগেই তো আইছিল এইখানে।ʼʼ
অন্তূ বূঝতে পারছিল না কিছুই। সালমা খালাকে কমনরুমের আয়া হিসেবে সে এডমিশন নেয়ার পর থেকে দেখছে, অর্থাৎ সে-ই দেখছে প্রায় দুবছর যাবৎ। এসেছে তারও আগে। আর জায়গা বিক্রি, ওসব ঝামেলা…অন্তূর অসহ্য লাগছিল ভাবতে।
সামলালো নিজেকে, “আচ্ছা, বুঝেছি। ওরা কবে গেছে এখান থেকে বলতে পারবেন? আর সোহেল ভাইয়া কি বিদেশ চলে যাবার পরে ওরা গেছে এখান থেকে?ʼʼ
মহিলা বিরক্ত হলেন, “বললাম তো, ওরা কারও সাথে মিশতো না এইদিকের। কেডা বিদেশ গেছে, কি দেশে আছে তা কেমনে বলব? খালি ওই বাড়িতে থাকতো ওরা, এই জানি!ʼʼ
-“আর আঁখির লাশ? মানে লাশ মাটি হবার পরপরই চলে গেছে ওরা? নাকি তার আগে?ʼʼ
-“সেসব অত জানি না। খালি জানি এখন আর থাকে না ওরা।ʼʼ মহিলা ক্যাটক্যাট করে উঠল।
অন্তূর ইচ্ছে করছিল নিজের মাথার ওপর রাস্তার একটা ভাঙা ইট তুলে ধারাম কোরে বাড়ি মারতে। মাথাটা জং ধরে আসছে। তার মানে কি আঁখির লাশ আসেইনি বাড়িতে? মুস্তাকিন বলেছিল, এসেছে, তাহলে নিশ্চয়ই এসেছে। হয়ত পরিবারের কাছেও পৌঁছেছে, তবে পরিবারটা এখান থেকে যেখানে উঠে গেছে সেখানে। তাহলে নিশ্চয় পুলিশ ফোর্স জানে চাঁদনীর ঠিকানা?
অন্তূর মাথায় আরেকটা প্যাঁচ খুলে গেল, নিশ্চয়ই জমিজমার ক্যাচাল মিটমাট হয়ে গেছে? আর চাঁদনী বলেছিল, ওরা এখানে আর থাকবে না। জমি ফেরত পেলেও তারা অন্যত্র চলে যাবে এই এলাকা ছেড়ে। আর এমন অবস্থায় যে কেউ-ই তাই করতো। এত বড় দাম চুকানোর পর কে এই জাহান্নামে পড়ে থাকে? অন্তূর খেয়াল এলো, সালমা খালাকেও আর ভার্সটিতে দেখা যায় না, কিন্তু কবে থেকে তা ঠিক মনে আসছিল না।
অর্থাৎ, সে ভেতরে যেসব দেখল, সব এই জায়গার নতুন মালিকের কারসাজি? তার কি জানানো উচিত এ ব্যাপারে পুলিশকে? নিশ্চয়ই জানাবে? অন্তূর হুট কোরে একটা বিষয় মাথায় এলো, সে যে অসহ্য গন্ধটা পাচ্ছিল, সেটা কি ওই রক্ত-পুঁজ থেকে আসছিল? রক্ত-পুঁজ অথবা বীর্য—কোনোটা থেকেই ওমন নাড়ি-ভুঁড়ি উগড়ে আসা দুর্গন্ধ আসে না। আর এইরকম একটা রহস্যমণ্ডিত বাড়ি এমন বিনা কোনো নিরাপত্তায় হেলায় ফেলে রাখা হয়েছে।
জমিটা এক হিন্দু লোক কিনেছে। সেই লোক এখানে কোনো অনৈতিক কাজ করছে না তো? কিন্তু এখন চাঁদনীরা কোথায় আছে? সোহেল কি আবার বউ-মাকে ফেলে বিদেশ চলে গেছে? আর আঁখির ছোট ভাই সোহান ক্যান্সারে মরেছিল। সেটাও এক রহস্য। চাঁদনীকে জিজ্ঞেস করেও সেদিন উত্তর পায়নি। খুব সংনমিতভাবে এড়িতে গেছিল চাঁদনী বিষয়টা। সে দারুণ চাপা এবং অদ্ভুত। অন্তূর অনেক, অনেককিছু জানার ছিল চাদনীর কাছে। কিন্তু কোথায় পাবে ওদের? কোনো খোঁজ জানা নেই।
চলবে…
(সতর্কতা: কিছু ভায়োলেন্স এবং অপ্রীতিকর ভাষা আছে)
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২২.
থানার গোলঘরে পলাশ যখন ঢুকছিল, অস্বাভাবিকভাবে অন্তূর গা’টা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছিল। শীতের মৌসুম, তব গা ঘেমে উঠছিল। পলাশের ঠোঁটের ওই মিচকে হাসি, জ্বলজ্বলে চোখদুটো, তীরের ফলার মতো নাকের পাটা—ধারালো অস্ত্রের মতো বিদীর্ণকারী। এসব সময় নারীমনকে অন্তূ ঘেন্না করে। ভয়ে জড়িয়ে যাওয়া মানসিকতা! বারবার পলাশের সেই ছোঁয়াগুলো শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল। অন্তূ মনে মনে কৃতজ্ঞ জয় আমিরের ওপর।
পলাশ খুব শান্ত এবং ঠান্ডা একটা মানুষ। একটুও উত্তেজিত হয় না থানায় কথাবার্তা বলছিল খাঁটি শুদ্ধ ভাষায়। শিক্ষার প্রয়োগ করছিল। খুব গুছিয়ে আইনকে বিভ্রান্ত করার চাল। কিছুদিন সময় পাওয়া গেল পলাশের কাছে। ব্যাপারটা এমন প্রমাণিত হলো–অন্তূদের পরিবার ঋণ-খেলাপি করেছে, আর পলাশ নিতান্তই উদার। সে লিখিত সময় পেরিয়ে যাবার পরেও সময় দিচ্ছে।
বেরিয়ে যাওয়ার সময় চট করে এক পলক অন্তূর দিকে তাকিয়েছিল পলাশ। ওই সময়টুকুর মাঝে পলাশের ঠোঁট হেসেছে, খুব সূক্ষ্ম হাসি। এই হাসিটাই জয়ের ঠোঁটের কোণে বহুবার লক্ষ্য করেছে সে। পলাশের চোখ যেন বহুদিন ধরে খুঁজছে অন্তূকে।
অন্তিক পাশে পাশেই ছিল। মুস্তাকিন আগে আগে হাঁটছিল। থানার সদরঘরে বসে অন্তিক বলল, “আব্বু এখন মোটামুটি সুস্থ, মুস্তাকিন। তোমার সময় থাকলে আমরা কালই রওনা হব কুড়িগ্রাম। দেরি করার সাহস পাচ্ছি না।ʼʼ
-“আমার সময় হবে। কালই যাই একদফা। এমন নয় যে একদিন, একবেলা গেলেই কাজ হাসিল হয়ে যাবে। দু- একদিন ঘোরাঘুরি করা লাগতে পারে।ʼʼ
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করতে আজ আর ইতস্তত বোধ করল না সে। অন্তূর দিকে প্যাকেট ইশারা করে বলল, “ক্যান আই?ʼʼ
অন্তূ সামান্য মাথা নাড়িয়ে অন্যদিকে ফিরল। সিগারেটে টান দিয়ে মুস্তাকিন বলল, “অন্তূকে একা রেখে যাবেন?ʼʼ
-“হ্যাঁ, একাই থাকতে হবে। ওর ভাবীকে গতকাল ওই বাড়িতে রেখে এসেছি। এখানে যেসব চলছে, এর মধ্যে অসুস্থ শরীরে আরও কষ্ট পেত।ʼʼ
অন্তূ অনেকক্ষণ ধরেই কিছু বলতে চাচ্ছিল। মুস্তাকিন তা বুঝে বলল, “কিছু বলবেন?ʼʼ
আঁখিদের ওই বাড়িতে যা দেখেছে, অন্তূ তা আপাতত চেপে গেল। শুধু বলল, “চাঁদনীর মানে ওই ভিক্টিম মেয়েটার ভাবী এবং মা এখন কোথায় থাকে, সেটা জানেন নিশ্চয়ই! বডি পাঠিয়েছিলেন! আমি দেখা করতে চাই ওদের সাথে।ʼʼ
মুস্তাকিন কিছুক্ষণ চেয়ে রইল অন্তূর দিকে, পরে বলল, “আমি পাঠাইনি বডি। থানা থেকে পাঠানো হয়েছিল। আমাদের ডিপার্টমেন্ট ভিক্টিম-বডি নিয়ে বিশেষ কাজ করে না। আমি জেনে আপনাকে জানাবো। তাছাড়া জরুরী নয় এই সময় ওদের সাথে দেখা করা।ʼʼ
মুস্তাকিন চলে গেল, থানার সদরঘর ফাঁকা তখন। অন্তূ উঠে এগিয়ে যেতেই অন্তিক ডাকল, “অন্তূ! মুখে ওড়না চেপে বাইরে বের হ।ʼʼ
অন্তিকের কণ্ঠস্বর রুষ্ঠ। মুস্তাকিনের ওভাবে তাকিয়ে থাকা সহ্য করতে পারেনি, তবুও খুব কষ্টে চুপ ছিল।
অন্তূ পেছন ফিরল না। সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “যাওয়ার সময় যেভাবে এসেছি, ওভাবেই যাব।ʼʼ
-“একটা ভুল করেছি জীবনে, তার জন্য তুই মূল্য চুকিয়েছিস, মানছি। কিন্তু তাই বলে এতটাও বোধহয় অপদার্থ পুরুষ হয়ে যাইনি, যে বোনকে রাস্তায় প্রদর্শন করাতে করাতে নিয়ে যাব। আসার সময় সাথে ছিলাম না আমি, তখনকারটা মাফ। এখন আছি। মুখ ঢেকে ফেল নয়ত তোকে থাপ্পড় মারার অধিকার হারাইনি আমি আমার এক ভুলের মাধ্যমে। আমার ভুলের জন্য তোকে যা পোহাতে হয়েছে, তার বদলে যেকোনৌ সাঁজা দে, চলবে। তাই বলেআমি তোকে তোর বেপর্দার ব্যাপারে শাসন করতে পারব না, এমনটা মোটেই নয়।।ʼʼ
বহুদিন পর অন্তিক পূরোনো অন্তিকের মতো কথা বলল। অন্তূ তাতে ফিরে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে হাসে, “অনিচ্ছাকৃত পাপেরই যদি এত বড় মৃল্য চুকাতে হয়, তাহলে না জানি ইচ্ছাকৃত পাপ করলে কতটা মূল্য দিতে হবে।
-“ইচ্ছাকৃত পাপ করব না আমি কখনও।ʼʼ
-“করলেই বা কী? আর কিছু হারানোর নেই। এখন যা হারাবে, তা আর গায়ে লাগবে না। করতে পারিস।ʼʼ
অন্তিক কেমন করে হেসে উঠল, “তোর কথায় এত ধার কেন রে?ʼʼ
-“এই ধার কাজে লাগে না সময়মতো। অযথা!ʼʼ
-“মুখ ঢেকে ফেল, অন্তূ। তুই আমাকে ঘেন্না করতেই পারিস, তাতে আমি আমার কর্তব্য পালনে দ্বিধাবোধ করতে পারি না।ʼʼ
-“তুই জুয়ারুদের চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট, তা স্বীকার করতে তুই ভয় পেতেই পারিস, তাতে আমি তোকে ঘেন্না করতে একটুও দ্বিধাবোধ করব না।ʼʼ
অন্তূ বেপরোয়া পায়ে হেঁটে এগিয়ে যায়। অন্তিক দ্রুত এগিয়ে গিয়ে পা মেলালো। তখন অন্তূর মুখটা ওড়নায় আবৃত।
অন্তিক প্রশান্তিতে মুচকি হাসল। ছোটবেলা থেকে অন্তূ কঠোর এক ব্যক্তিত্বের মুখোশে নিজেকে আবৃত রেখে বেড়ে উঠেছে। বয়সের চেয়ে ব্যক্তিত্বের ওজন ভারী লাগে।
অনুশোচনাটুকু গিলে ফেলল অন্তিক। অন্তূ রাস্তা পার হতে শেখেনি। আব্বুর হাত ধরে পার হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না সে। অন্তিক সেদিন আলতো করে বোনের হাতটা চেপে ধরল। রাস্তা পার হতে হতে ধীর আওয়াজে বলল, “আমাকে ক্ষমা করার ইচ্ছে আছে তোর, অন্তূ? আমি পুরো জীবন অপেক্ষা করব, মাসুলও দেব সব রকমের। তোকে ঘেন্না কাটাতেও বলব না আমার ওপর থেকে, শুধু মুখ ফিরিয়ে থাকিস না।ʼʼ
—
ক্লাবঘরে একটা আয়োজন করা হয়েছে। হামজা খুব শীঘ্রই পৌরসভায় মেয়র পদে অধিষ্ঠিত হবে। জয় আর কবীর মিলে বিরিয়ানী রান্না করেছে। জয় ভালো বিরিয়ানী রাঁধতে জানে। ছেলেদের খাওয়াতে হয় প্রায়ই!
মাজহারের হাতে গুলি খাওয়ার, লতিফকে হামজা লম্বা এক ছুটি দিয়েছিল। অসুস্থ শরীর, তার ওপর পরিবার থেকে এ অবস্থায় সায় থাকে না আবারও সেই প্রাণঘাতী কাজে পুনরায় যোগ দেয়াতে। হামজা তার পরিবারের খরচা বহুদিন চালিয়েছে, সম্পূর্ণ চিকিৎসা নিজের টাকায় করিয়েছে। এখন বেশ সুস্থ সে, বলা চলে পুরোপুরি ঠিকঠাক। দলের ছেলেদের ওপর হামজার অবদান অপরিসীম।
লতিফ খেতে খেতে বলল, “এত ভালো রান্না কই থেইকা শিখছো, জয়? মনে হচ্ছে বাড়ির মহিলাদের হাতের বিরিয়ানী খাচ্ছি।ʼʼ
হামজা বসেছে সোফায়। জয় শুয়েছে টান হয়ে হামজার কোলে মাথা রেখে। পা দুটো তুলে রেখেছে সেন্টার টেবিলের ওপর। ভিডিও গেইম খেলছে ফোনে।
জয় খুব দুঃখিত স্বরে বলল, “জীবনে বেশি বেশি চিল মারতে যাইয়া আর এসব বান্দরের পাল খাওয়াইতে পিকনিক এত করছি, রান্নার হাত গ্রীষ্মকালীন আমের মতো পাকা, ভাই! খান খান, খালি একটু দোয়া কইরেন আমার জন্য, যাতে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যায় একটা। একা রাত কাটতে চায় না। খুব দুক্কে আছি। আর্জেন্ট বউ দরকার।ʼʼ
সকলে হেসে উঠল। জয় ফোনে চোখ রেখেই হঠাৎ-ই আনমনা হয়ে বলল, “আরমিণ আবার আসছিল এই বাড়িত্। আচ্ছা ওই ছেঁড়ির জীবনে দুঃখের কি খুব অভাব? দড়ি ছিঁড়ে মারা খেতে চারদিক যেচে পড়ে ঘুরে বেড়ায় দুঃখ জোগাড় করতে।ʼʼ
হামজা জিজ্ঞেস করল, “ওখানে কেন গেছিল?ʼʼ
জয় হাসল, “হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসে পড়ছিলাম, সোন্দরী চেংরিরা বোকা হয়। আসলে ওই শালী একটু বেশি সোন্দরী তো! মাথায় মাল কম! ছেঁড়ির ধান পোঁড়ে চুলায়, ওই শালি পানি ঢালে পা-ছা-য়। তাইলে কি হইলো? না জানি কীসব দৃশ্য দেইখা আসছে! কইলজের ওজন কতখানি হইলে এত কিছুর পরেও থামেনি? এ তোরা কেউ ওই ছেঁড়িরে যাইয়া কইয়া আসবি, ওর সাথে সামনে কী কী হইতে পারে।ʼʼ
-“তুই নিজে দেখেছিস ওকে?ʼʼ
-“হ। দুপুরে এইখানেই ঘুমাইছিলাম। বিকেলে উঠে পেছনের বারান্দায় দাঁড়াইতেই একনজর দেখা হয়ে গেল!ʼʼ
হামজা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসল, “হতে পারে দেখেনি কিছু! দেখলেও বিশেষ কিছু দেখার কথা না। ওই বাড়ির মহিলাদের খুঁজতে গেছিল। এখনও কি সেসব পড়েই আছে ওখানে?ʼʼ
-“তাই তো থাকার কথা! ওসব দেখছে আমি নিশ্চিত, আর দেখলে শশুরবাড়িতে জানাবে এইটা ডাবল নিশ্চিত। তুমি খালি ভাবো, কতখানি সাহসের দরকার ওসব দেখেও চুপচাপ বেরিয়ে আসা।ʼʼ
লতিফ হেসে উঠল, “সাহসই যদি না থাকবো, তাইলে কি আর তোমার মুখে খাবলা ধইরা থুতু ছোঁড়ে! ওইডাতই তো বুঝা যায় মাইয়ার কলজে বারো হাত।ʼʼ
সকলের মাথায় বাজ পড়ল কথাটা শুনে। কিন্তু জয়ের মুখে অপমান নেই। সে খুব দুঃখের সাথে বলল, “হ। কামডা ভালো করে নাই। মাগার…ʼʼ জয় হেসে ফেলল।
হামজা জয়ের সেই হাসিটাই কেড়ে নিয়ে চট কোরে হেসে ফেলল লতিফের দিকে তাকিয়ে, “আপনি কী করে জানলেন এসব, লতিফ ভাই? আপনার তো জানার কথা না!ʼʼ
আধখাওয়া সিগারেটটা দু আঙুলে চেপে ধরে নেভালো, তাতে বোধহয় হাতের পুরু চামড়াতে অল্প খানিক সেঁক লাগলো। আবার তাকালো লতিফের দিকে, “ভাবছিলাম খাওয়া শেষ হলে আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করব। আপনি নিজে থেকেই খুব ফাস্ট দেখছি!ʼʼ
সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে ফেলে বলল, “এসব লাইনে বাটপারি করতে গেলে সতর্কতা খুব জরুরী। এখানে সবাই খেলোয়ার, সবার মাথাই ফুল স্পিডে ঘোরা কাটার মেশিনের মতো চলে। অল্প একটু ভুল হলেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবেন। আপনার আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।ʼʼ
হাস্যজ্জ্বল চোখে কথাগুলো বলে আরাম করে উঠে দাঁড়াল হামজা।
উঠে বসল জয়। ফোনটা পাশে রেখে হাতদুটো হাঁটুতে গেঁড়ে পিঠ বাঁকিয়ে বসল। চোখ হাসছে তার, শার্টের কলারের ওপর দিয়ে শিকল আকৃতির চেইনটা ঝুলে আছে নিচের দিকে। তাতে ইংরেজি হরফ ‘Jʼ এর লকেট। বাঁ হাতের রিস্টলেটটা কব্জি থেকে কনুইয়ের একটু ওপরে পড়ে রইল। পরনে সাদা ধবধবে লুঙ্গি, তার ওপর কালো জ্যাকেট পরেছে। পাড়া, ক্লাব এমনি চলাচলে তাকে কোনোসময় ফরমাল পোশাকে দেখা যায় না। লুঙ্গি, শার্ট, চামড়ার জুতোই চলে। গ্রাম্য মোড়লের মতো দেখতে লাগছে ওকে। পাশেই হামজা দাঁড়িয়ে আছে। সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত, কালো শাল জড়ানো।
ঠোটের কোণে হাসি জমে থাকা অবস্থায় কেমন করে যেন তাকিয়ে রইল জয় লতিফের দিকে। হামজা মিটিমিটি হাসছে। এই হাসি লতিফের ওপর ওর করা সবটুকু ন্যায়পরায়নতার হিসেব শুষছে। কোনোদিকে ফাঁক রেখেছিল না হামজা লতিফের ভরন-পোষনে। তার দাম সে আস্তে কোরে আদায় তো করে নেবে, এই হাসি দ্বারা সে লতিফের দ্বারা প্রতারিত হবার দুঃখটুকু ঢাকতে চাইল!
লতিফের আর খাওয়া উঠছে না। সে বুঝতে পারছে, আজ তাকে কেন আপ্যায়ন করে এখানে আনা হয়েছে।
জয় হায় হায় কোরে উঠল, “আরে আরে করতেছেন কী, লতিফ ভাই? আমি কি জানোয়ার নাকি যে খাওয়া অবস্থায় মারবো কাউকে, হোক সে যতবড় জোচ্চর আর বিশ্বাসঘাতক। খাওয়া শেষ করুন, আরামসে কথা বলি। এ কবীর…আমার জন্যও এক প্লেট আন তো, লতিফ ভাইয়ের সাথে বসে খাবো। যা।ʼʼ
লতিফ ছটফটিয়ে উঠল। হামজা শালটা ডান কাধে তুলে নিয়ে বলল, “আমি বাড়ি যাচ্ছি। এখানে এখন থাকা ঠিক হবে না। আফটাল অল নতুন মেয়র আমি। আমার কিছু নৈতিক দায়িত্ব আছে। আমার সামনে কোনো অকাম ঘটবে, আর আমি তাকিয়ে দেখব, কিছু তো করব না, এটা ঠিক না। দু’দিন আগে অনেক বিশ্বাস কোরে জনগণ ভোটে তুলেছে আমায়। কাজ ফুরোলে তুই দেরি করিস না ফিরতে। আজ রাতে দাবা খেলব আমি আর তুই। অনেকদিন খেলি না।ʼʼ
হামজা হেলেদুলে হেঁটে বেরিয়ে যায়।
জয় আরাম কোরে বসে গপাগপ বিরিয়ানী খেতে বসল। বিশাল বিশাল হাতে বিশাল বিশাল লোকমা। তার খাওয়ার ধরণ ভালো না। ভদ্রলোকেরা দেখলে এক শব্দে বলবে, অসভ্য, জঙলিদের মতো করে খায় জয়। গপগপ করে এক প্লেট বিরিয়ানী খুব রুচির সাথে মনোযোগ দিয়ে খেয়ে ঠান্ডার রাতে ঠান্ডা ঠান্ডা বোতল নিয়ে বসল। লতিফ কাকুতিভরা চোখে বসে আছে। হাত ধুয়ে জয় লতিফের প্লেটটাকে ইশারা করে বলল, “যাহ রেখে আয়। লতিফ ভাই আর খাবে না। ভাই, হাত ধুয়ে নেন, আমার প্লেটেই ধুয়ে ফেলেন, আমরা আমরাই তো! যা করেছেন করেছেন, আর তো এরপর করার সুযোগ পাবেন না! তাহলে আর কীসের কী? তখন আমরা ভাই ভাই! আসেন মদ খাই।ʼʼ
জোর করে মদ পান করালো লতিফকে। নাক-মুখ দিয়ে উঠে এলো তা। বিরিয়ানী উগরে এসে বুক জ্বলে ছারখার লতিফের। জয় গিলে যাচ্ছে ঢকঢক করে।
-“বিশ্বাস করো জয়..ʼʼ মিনতি করে ওঠে লতিফ। ওর চোখে-মুখের আকুলতা বোধহয় জয়কে খুব আনন্দিত করল।
সে মাথা নাড়ল দু’পাশে, “আমি অবিশ্বাস করি না কাউকে। আপনাকেও করার কিছু নেই। আপনি সত্যি বলবেন, আমি শুনব, বিশ্বাস করব। আপনি বলুন, লতিফ ভাই! আপনি কী কোরে জানলেন ওই মেয়েটা সেদিন পলাশের রুফটপে দাঁড়িয়ে আমার মুখে থুতু ছুঁড়েছিল? আর ওই মেয়েটাই কাল ওই পরিত্যক্ত বাড়িতে এসেছিল। এসব আপনি কীভাবে জানলেন?ʼʼ
আর বলার কিছু নেই লতিফের। তার রুহু কাঁপছে। জয় হাসল, “আপনারে হামজা ভাই আজ মাসের বেশি ছুটিতে রাখছে দলের যেকোনো কাম থেকে। ক্যান? কারণ আপনে নাকি আমারে বাঁচাইতে নিজে গুলি খাইছেন। বদলে হামজা আপনার চিকিৎসা করাইছে, সবধরণের এক্সট্রা নিরাপত্তা দিছে। আপনার জন্য মাজহারকে মেরে শত্রুতা বাড়াইযছে। আর আপনে সেই মাজহারের সাথে হাত মেলাইলেন? ছিঃ!
অবশ্য এর কারণ আছে।
সে আপনাকে ডেকে বোঝাইলো, হামজার পার্টিতে থাকলে এভাবেই জখম হত হবে আপনাকে।
অথচ আপনার জন্য যে মাজহারকে মেরে আমি আর হামজা সোসাইটির সকল সাইটে বদনামী এবং শত্রুতা কামিয়েছি এটুকু দেখলেন না আপনি? শ্যাহ! ইজ্জতই রইল না, শালা। মাজহারের সাথে আপনি মিলছেন গুলি খেয়ে, ওদিকে পলাশ খা-ন-কির বাচ্চা দ্বিমুখী পাগল শালা, শালার ছাওয়াল টাল, সাইকো! ভাবে যে আমরা কিছু বুঝিইনা, গু খাই। ও আমাদের হাতে রেখে আসলে মাজহারের সাথে কাজ করতেছে। সেদিন আবার ওই শালীর জন্য একদম সরাসরি একটা বিরোধীতা লেগে গেল। আর এই সংকটময় সময়ে আপনি দলের সাথে ঘাতকতা করতেছেন। কন এইডা কি ঠিক?ʼʼ
একটু থেমে ঘন ঘন মাথা নাড়ল জয়, “নট গুড, লতিফ ভাই! তার ওপর আবার থুতুর ব্যাপারটা আমার ছেলেদের সামনে বলে আমার ইজ্জতের এগারোটা বাজালেন!ʼʼ
লতিফ আহাজারী করল, “জয়! বিশ্বাস করো আমি যাইনি। মাজহার এসেছিল। আমি কিচ্ছু করিনি ওদের সাথে মিশে। খালি এইটুকু শুনেছি তুমি সেদিন ছিলা ওইখানে।ʼʼ
-“তা জানি আমি। কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু ছোটবেলায় পড়ছিলাম, ছোট বালুকনা আর বিন্দু জল মহাদেশ আর মহাসাগর গড়ে। আজ ও আপনাকে জানাইছে, কাল আপনি ওকে জানাবেন, এই ধারাবাহিকতা চলতে দেয়া মূর্খতা হয়ে যাবে না? এজন্য কষ্ট করে এতদিন ধরে মাস্টার্স কমপ্লিট করলাম? তাছাড়া এসবও ইস্যু না। ইস্যু হলো, বিশ্বাসঘাতকদের নাকি আপনাদের সৃষ্টিকর্তাও ঘেন্না করে।ʼʼ
ব্যস্ততার সাথে কবীরকে বলল, “এইহ! শশুরবাড়িতে কল কর তো! বল, ক্লাবের পাশে এক পরিত্যক্ত বাড়িতে কিছু অপ্রীতিকর মাল-মশলা পাইছি, ষাঁড়। তাড়াতাড়ি পোলিশ পাঠান।ʼʼ
ওসি সাহেব বোধহয় থানায় বসেই ঘুমাচ্ছিলেন। কল রিসিভ করলেন দেরি করে। জয় নিজেই ধরে লম্বা একটা সালাম দিয়ে খাঁটি শুদ্ধ ভাষায় বলল, “স্যার! আমাদের ক্লাবের পাশে একটা বাড়িতে কিছু অপ্রীতিকর জিনিস পেয়েছি। ড্রাগ, অ্যালকোহল জাতীয় জিনিস পড়ে আছে, আর সাথে একটা লাশও আছে মনেহয়, স্যার। ঘরের কার্নিশে কাফনে মুড়ানোর মতো কিছু একটা আছে, স্যার। বিশ্রী গন্ধ আসছে মানুষ পঁচার মতো। থাকা যাচ্ছে না এই ঘরে। আমার ধারণা, ওটা লা-শ-ই হবে।ʼʼ
ঘরের এক কোণে কিছু ব্যাটিং স্টিক ও হকিস্টিক, চাপ্পর-চাপাতি, লাঠি, ছুরি ইত্যাদি গাদা করা আছে। জয় হেলেদুলে হেঁটে গিয়ে রডের মাঝ থেকে একটা কালো কুচকুচে রড তুলে আনলো। দুই চুমুক মদ গিলে সোফার ওপর বসে পড়ল ধপ করে।
তখন ক্লাবঘরে চারজন ছেলে আছে। বাকিরা খেয়ে বিদেয় হয়েছে। লতিফকে ওরা শক্ত করে ধরল।
টেবিলের ওপর রাখা টিস্যুবক্স থেকে অনেকটা টিস্যু তুলে মুড়িয়ে যতটা যাবে না তার চেয়ে বেশিটা টিস্যু লতিফের মুখে গুজে দিলো জয়। লতিফের চোখে পানি, চোখদুটো বারবার অনুরোধ করছে ক্ষমা করে দিতে। জয়ের খুব সুখ লাগছে। ভিক্টিমের চোখে ভয় না দেখলে অত্যাচার করে মজা নেই।
শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে হাতের রডটা দিয়ে লতিফের হাঁটুর ঠিক অস্থি-সন্ধির ওপর আঘাত করল। গুঙরে উঠল লতিফ, অথচ আওয়াজ এলো না বাইরে। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। ছটফট করে উঠল মেঝেতে পড়ে। জয় লতিফের অপর পায়ে ঠিক একই স্থানে হাঁটুর জোড়সন্ধির ওপর কষে একটা রডের আঘাত লাগালো।
লতিফ অজ্ঞান হবার আগে জয় মুচকি হেসে আশ্বাস দিলো , “চিন্তা করবেন না, লতিফ ভাই। আমি আপনার ভালোর জন্যই এসব করতেছি। আপনার এই পা আর পৃথিবীর কোনো ডাক্তার জোড়া লাগাতে পারবে না। আপনি হেঁটে হেঁটে এর কাছ থেকে ওর কাছে বিশ্বাসঘাতকতা এবং অকৃতজ্ঞতার মতো পাপ করতে যেতে পারবেন না আর। আমরা তো নষ্ট মানুষ, পাপ নিয়েই বেঁচে আছি। কিন্তু এই যে আপনে আর পাপ করার সুযোগ পাবেন না, এই ব্যবস্থা করে আমি আজ একটা ভালো কাজ করলাম। তাছাড়াও আপনার পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমি বহন করব, কথা দিচ্ছি।ʼʼ
কবীরকে বলল, “পুলিশ আব্বারা খুব তাড়াতাড়ি এসে পৌঁছাবে। তোরা লতিফ ভাইকে আব্দুর রহিম মেডিকেলে এডমিট করিয়ে আয়। জ্ঞান ফেরার পর সরিস না ওর কাছ থেকে, আবার জবানবন্দি দিলে ফেঁসে যাব। এত তাড়াতাড়ি মরা যাবে না আমার।ʼʼ
রাহাতের সাথে ছেলেগুলো লতিফকে গাড়িতে বসিয়ে চলে যায় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। রয়ে গেল কবীর।
জয় রড রেখে এসে সোফাতে বসল আরাম করে। শরীর ঘেমে উঠেছে। টিস্যু দিয়ে ঘাম মুছল। কবীর আস্তে কোরে জিজ্ঞেস করে, “ভাই, পলাশ কী করেছিল মেয়েটার সাথে? মানে…ʼʼ
-“আরেহ! জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ ক্যাডার জসিমউদ্দীন মানিক একশোটা ছাত্রীকে রে-প কোরে সেঞ্চুরি পার্টি করেছিল, সেই ইতিহাস ভুলে গেছিস? ওই হিসেবে পলাশ কিছুই করে নাই।ʼʼ
ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি গিলে ফের বলল, “ব্রাশ আর পেস্ট নিয়ে আয় আমার জন্য একটা। শশুর আব্বাদের সামনে মদের গন্ধ নিয়ে যাওয়া ঠিক না।ʼʼ
জয় ঘষে ঘষে দাঁত মাজলো। একটু পারফিউম মারল শরীরে। কবীর জিজ্ঞেস করল, “ভাই, আপনে যে পুলিশ ডাকলেন, পলাশ ভাই জানলে কী হবে? মানে আপনে ছাড়া আর কেডা খবর দিতে পারে পুলিশরে? আসলেই তো লাশ এখনও ওই ঘরেই আছে।ʼʼ
-“আরমিণের দোষ দিয়ে দেব? কী কস? পলাশ পাগল কিন্তু জানে আরমিণ ওর বাড়িত গেছিল, ওসহ দেখছে। বলে দেই যে পুলিশরে ওই শালী খবর দিছে। যে বলিটা আগের বার দেয় নাই শালীরে, এবার দিয়ে দেবে। আমি এইচ-ডি ছায়াছবি দেখব এবার।ʼʼ
কবীর জানে, জয়ের কোনো কথাই আন্তরিক না আবার যেকোনো কথাই আন্তরিক। সে কখন সত্যি আর মিথ্যা বলে বোঝা যায় না। হাসতে হাসতে সত্যি আর আন্তরিক স্বরে মিথ্যা বলে। সে জিজ্ঞেস করল, “সত্যিই, ভাই?ʼʼ
-“না, মিথ্যা।ʼʼ
বিশ্বাস করল কবীর। কারণ জয় যেকোনো পরিস্থিতিতে রসিকতা করে ঠিকই, তবে মিথ্যা কথা বলেনা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হুট করে কিছূ মনে পড়েছে, এমন ব্যস্ত হয়ে বলল, “ভাই! ওই বাড়ির জমিন তো আপনাদের নামে এখন, তাই না? তাইলে পুলিশ যদি জিগায় যে আপনাদের বাড়িতে এরকম একটা ঘটনা কী করে ঘটল, মানে ফেঁসে যাবেন না?ʼʼ
জয় উঠে দাঁড়াল, “তোকে কে বলেছে জমি আমাদের?ʼʼ
-“না মানে…ওই যে শুনছিলাম, আপনারা নাকি বিচার-টিচার করলেন। আমি ভাবছি জমি আপনারা দখল করছেন শেষমেষ!ʼʼ
জয় গা দুলিয়ে বাচ্চাদের মতো হাসল, “রাজনীতি বুঝিস না রে পাগলা… জমি পলাশের। আজীবন ওই জমি পলাশের। কে জানি টাকা ধার নিছিল। শোধ করতে পারে নাই। তার বউ আর জমিডা ওর হয়ে গেছে।ʼʼ
-“তাইলে ওই মহিলারা থাকতো যে।ʼʼ
-“হ। ওসব গল্প বানানো হইছিল। এইখানে বেনিফিট পলাশ এবং আমাদের সমান। পলাশ তার জমি ফাঁকা করে ফেলল সামাজিক উপায়ে, খুব যুক্তিগতভাবে, আবার কেউ জানলোও না জমিটা পলাশের। আর আমি আর হামজা ভাই হিরো হয়ে গেলাম সেই সুবিচারগুলোর মাধ্যমে। লোকে ভালোবেসে ভোট দিলো সাহেবকে। এভাবে চলতে থাকলে সামনের সংসদ নির্বাচনে একটা আসন আমাদের। তবে জমির আসল মালিক পলাশ, এটা আর গোপন থাকবে না। হিন্দু-ফিন্দু বলে কিচ্ছু নেই, পুলিশ আসলেই এটা ক্লিয়ার হয়ে যাবে। বুজিচিস?ʼʼ
কবীর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। এসব যখন ঘটেছে সে তখনও দলের বিশিষ্ট কোনো মেম্বার ছিলনা, সে এসবের কিছুই জানতো না। বেশ কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল, আপনি যে হুট করে এসব করতেছেন, “পলাশ ভাই জানলে বা বুঝতে পারলে কী হবে, কিছু ভাবছেন?ʼʼ
বাইরে পুলিশের গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। জয় একহাতে লুঙ্গি উঁচিয়ে ধরে অপর হাতে টেবিলের ওপর থাকা ফোনটা তুলে নিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যেতে যেতে জবাব দিলো, “না ভাবিনি। পরে ভাববো। তবে এখন থেকে নতুন করে খেলতে হবে আবার, অনেকদিন খেলি না। লোক আমাকে হালকা ভাবে নিচ্ছে রে আজকাল!ʼʼ
চলবে..
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২৩.
পুলিশ এলো। স্থানীয় মানুষজন অভ্যস্ত এতে। মানুষজন গাজিপুরকে যখন শিল্প এলাকা বলা হয়, এটাও তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এলাকা বটে। পুলিশের আনাগোনা চলতে থাকে।
জয়কে নিয়ে থানা পুলিশের ওসি বেলাল আহমেদ ঢুকলেন পরিত্যক্ত বাড়িটাতে। এখানে নাকি কিছুদিন আগেও লোক বাস করতো। তাদের ব্যপারে বিশেষ জানাশোনা নেই কারও। এখন আর তারা থাকেনা, কবে গেছে সেটাও জানা নেই কারও।
অসহ্য দুর্গন্ধ ঘরটাতে। লাশপঁচা গন্ধ। এখনও সেই সকল নেশাদ্রব্যের অবশিষ্টাংশ পড়ে আছে চটের বস্তা এবং মাদুরের ওপর। সকলে নাকে চেপে ধরে ভেতরে ঢুকল শুধু জয় বাদে।
কনস্টেবলেরা ঘরের এক কোণে ছাঁদের নিচে ভেতরের কার্নিশের ওপর থেকে মোড়ানো মানবদেহের মতো বস্তুটা নামাতে শুরু করল। বেলাল সাহেব গেলেন বেকারী কারখানার সেই পাতাগুলোর কাছে। তিনি দেখে যতটুকু বুঝলেন, রক্ত-পুঁজ পড়ে আছে। মনে হচ্ছে, কারও দেহের পুরোনো ক্ষত ড্রেসিং করা হয়েছে। কিন্তু যে জিনিসটা বেলাল সাহেবকে হয়রান করে তুলল, সেটা হলো ইষৎ আঠালো ধরণের অফ-হোয়াইট পদার্থটি। হুট করে উনার মাথায় জিনিসটা দেখে যা এলো, তার কোনো ব্যখ্যা খুঁজে পেলেন না।
কবীর কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে অবাক হয়ে জয়কে জিজ্ঞেস করে, “ভাই, ওটা কী? না মানে আমি যা দেখছি, আপনিও কি তাই দেখছেন?ʼʼ
-“তুই কী দেখছিস? আমি তো একটা সুন্দর মেয়ে দেখতে পাচ্ছি, যাকে আমার এই মুহুর্তে বিয়ে করে ফেলা উচিত।ʼʼ
এই মুহুর্তে রসিকতা জয়ের কাছে আশা করা যায়। কবীর কিছুক্ষণ চুপ রইল। ফরেনসিকের কেউ আসবে বোধহয়। বেলাল সাহেব বাইরে অপেক্ষা করছেন। জয়, কবীর এবং কনস্টেবল ঘরের ভেতরে। কবীর কৌতূহল দমাতে না পেরে ফের জিজ্ঞেস করে, “ভাই, এই মার্ডারটা কে করছে? আপনি? আপনি কী করে জানলেন এখানে লা-শ আছে? না মানে আপনি… ভাই, খু-নটা আপনি করছেন?ʼʼ
-“না। প্রশ্ন একটা একটা করে কর। সব জমাট বেঁধে যাচ্চে মাতার ভেতরে।ʼʼ
কবীর চুপ রইল। কিন্তু বেশিক্ষণ পারল না, পুনরায় জিজ্ঞেস করল, “তাইলে কে করছে, তা জানেন?ʼʼ
-“এতক্ষণ জানতাম না, এখন জানতে পারলাম।ʼʼ
আমার মনে হয় আপনে আগেও জানতেন।
জয় হাসল, তাই নাকি?
-“মানে?ʼʼ বেশ জোরে বলে ফেলেছিল, দ্রুত গলা নামিয়ে বলল কবীর, “মানে, বুঝিনি। আপনি আবার কী করতেছেন, ভাই? হামজা ভাই আপনারে দেখে রাখতে বলছে, এবার কিছু হইলে আমায় ছাড়বে না।ʼʼ
-“কানের গোড়ায় প্যানপ্যান না করে ওই জিনিসটা অল্প একটু আঙুলের আগায় তুলে আন। প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। সাইন্সে মাস্টার্স কমপ্লিট করার কিছু তো ফায়দা হোক!ʼʼ
কবীর হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। জয় বিরক্ত হলো, “ওমনে ভ্যাবলার মতো চাইয়া আছো ক্যান, বাল! নিজের ঢোল নিজে নাই পিটাইলে ও ঢোলে মরচে ধরে যাবে, তাও কোনো দুলাভাই বাজাবে না। আজকাল মানুষ প্রশংসা করতে চায় না মাইনষের। আর….ওয়েট! আমি মাস্টার্স পাশ করি নাই? করছি তো! যা অল্প একটু তুলে আন।ʼʼ
-“ওয়াক থুহ! ছিহ! এসব ছোট কাজ করাবেন আমায় দিয়ে?ʼʼ
-“বিনা তেলের অমলেট! পজিটিভ ভাবতে শেখ, যে বালডা ভাবছিস, তা না ওইটা, আমি নিশ্চিত। আরেকটু নিশ্চিত হই, আন যা।ʼʼ
কবীর চোখ বুজে পদার্থটি তুলে এনে সামনে ধরল।সর্বপ্রথম কবীরের হাতটা টেনে জয় নাকের কাছে নেয়। কবীর নাক কুঁচকে চোখ বুজে ফেলল। জয় হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে বলল, “ওসি মারাইছে! একটা সাধারণ বিষয়কে ঘুরায়ে-পেঁচায়ে ভেবে সমাধান বের কইরবার পারে না, সেই শালাও থানার ওসি হয়ে বসে আছে। তো আমরা ভালো হব কোন দুঃখে? এই হাবুলদের জন্যেই তো ভালো হওয়া হয় নাই আমার। তুই নাহয় ঘাস খাওয়া গরু, ও তো ওসি। ও ক্যান উল্টাপাল্টা ভেবে বাইরে যাইয়া দাঁড়ায়ে রইল?ʼʼ
আশ্বাস পেয়ে স্বাভাবিক হলো কবীর, “ভাই, কী এইটা? মানে দেখতে তো আজেবাজে জিনিসের মতোনই লাগতেছে অনেকটা!ʼʼ
পদার্থটি দু আঙুলে ঘষে চেয়ে থেকে বলল, “মেলাটোনিন লিক্যুইড।ʼʼ
-“কী কাম এইডার? এইডা এইখানে কী করতেছে?ʼʼ
-“লুডু খেলতেছিল বসে, খেলবি তুই?ʼʼ বিরক্ত মুখে চেয়ে থেকে আবার বলল, “এক ধরণের হরমোন লিক্যুইড। ওই শালা পাগল পলাশ! ওরে কি আমি শখ কইরা পাগল কই? শালার ভিত্রে যতগুলা মানসিক রোগ আছে, অতগুলা দুনিয়াত আবিষ্কারও হয়নাই। শালার ঘুমের সমস্যা আছে। ব্রেইন থেইকা ঠিকমতো হরমোন বয়না। পার্টিকুলারলি যহন অকাম করে, তারপর একেবারে চাট্টি-বাট্টি গোল হইয়ে যায়। খু-ন কইরা আলোর সামনে গেলে পাগল হইয়া যায় পুরা। এই লোকটারে মারার পর, নিশ্চিত এইখানে বইসা এই হরমোন লিক্যুইড পুশ করছে। কয়েক বোতল গিলছে, এরপর যাইয়া মরার মতো ঘুম পাড়ছে।ʼʼ
-“পলাশ মারছে এই লোকটাকে?ʼʼ
বাইরে বেরিয়ে আসতে আসতে বলল জয়, “হ, এইবার সিওর আমি। ওই পাগল ছাড়া কারও এরম ধরণের মেন্টাল কেইস নাই। আমার শালটা আন, জ্বর-ঠান্ডা লাগলে তরু ঘ্যানঘ্যান করে। এবার একটু সমাজ সেবার নাটক করি, কী আর করার!ʼʼ
কবীরের কেন জানি বিশ্বাস হলো না জয়ের কথাগুলো। সে পুরুষ মানুষ। পলাশ যদি মেলাটোনিন হরমোন লিক্যুইড ব্যবহারই করে তো ওখানে পড়ে থাকার তো কথা না। কিন্তু জয়কে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
শাল এনে দিলে জয় তা পেঁচিয়ে নিলো শরীরে। দাঁড়িয়ে রইল বাইরে। সমাজের অনৈতিকতার বিচারে সে খুব তৎপর, তাকে দেখতে এমনই লাগছিল। একজন নীতিবান, বিপ্লবী ছাত্রনেতার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল পুরোটা সময়, অথচ একটুও আগ্রহ পাচ্ছিল না পুলিশদের বোকামি দেখতে।
ইনক্যুয়েরি শেষ হতে মাঝরাত হলো। ফরেনসিক স্পেশালিষ্ট জিনিসটাকে মেলাটোনিন হরমোন লিক্যুইড বলে শনাক্ত করলেন। বেলাল সাহেব জিহ্বা কামড়ালেন। তিনি সিমেন ভেবেছিলেন, তা জয়ের কাছে বলে হাসলেনও একদফা। তার বদলে জয় মুখে হেসে, মনে মনে দুটো খাঁটি বাংলা গালি দিলো ওসি সাহেবকে।
বাড়ির মালিক সেই হিন্দুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। কেউ জানেনা এই বেওয়ারিশ জমিটা আসলেই কার, সবার জানামতে কোনো সনাতনধর্মী লোকের। যে এখানে বসবাস করে না, কিনেছে সালমা বেগমের কাছে, পরে আর ফেরত দেয়নি। সালমা বেগম উঠে চলে গেছেন এখান থেকে। এই কাহিনিই জানানো হয়েছে মানুষকে। অর্থাৎ একেক স্থানের লোক এই কাহিনিটাকে একেক রকমভাবে জানে। আসল কাহিনি কোনটা, অথবা তাদের জানাগুলোর মাঝে আদতেও আসল কাহিনি আছে কিনা, সে ব্যাপারেও ধারণা নেই কারও। এলাকার লোক জানে পড়ে ছিল এই জমি বছরের পর বছর। এরপর একদিন সালমা বেগম কিনেছেন, থাকতে শুরু করেছিলেন কিছুদিন আগে। অন্য এলাকা বিশেষ করে ভার্সিটি এলাকার লোক আরও অন্যরকম কিছু জানে। কারণ, তাদের ভার্সিটিতে সালমা বেগম আয়া হিসেবে বহু আগে থেকে কাজ করতেন, ভার্সিটি এরিয়ার ধারণা তিনি হয়ত এখানেই থাকেন শুরু থেকে। এবং এই জমির প্যাঁচাকলে মেয়েটিকে খুব নৃশংসভাবে হারিয়েছেন।
খুনটা কমপক্ষে চারদিন আগে হয়েছে। ওভাবেই সাদা বস্তায় মুড়িয়ে কার্নিশে তুলে রাখা হয়েছে। এখানে শুধু হিন্দু লোকটাকে পাওয়া গেলেই কেইসটা সলভ হয়ে যাবে না। হতে পারে উনি বহুদিন আসেননি এখানে, তার এই পরিত্যক্ত জমিতে কোনো বদমাইশদের আড্ডা জমে বসেছিল। ওসির নজর ক্লাবের ছেলেদের ওপর পড়ল, তবে চেপে গেলেন তিনি। করলেও গোপনে তদন্ত করতে হবে এদের সন্দেহ করে। প্রকাশ্যে করা যাবে না। হামজা-জয় চতুরতার লেভেল ছাড়িয়ে এতদূর গেছে, তারা প্রকাশ্যে অনৈতিকতা করে বেড়াবে, অথচ ধরার ফাঁক থাকবে না।
ক্লু একটাই, রক্ত-পুঁজ। এগুলো কার? কাকে ড্রেসিং করা হয়েছিল? মৃতদেহের নয়। কারণ, মৃতদেহে কোনো ক্ষত নেই। তাকে ড্রাগ দিয়ে মারা হয়েছে।
নতুন মেয়র হামজা পাটোয়ারী। মাঝ দিয়ে হামজা বাবা হুমায়ুন পাটোয়ারীকে ঘরে বসিয়ে ওয়ার্কশপের কাজের ভার দিয়েছেন। নতুন একজনকে পৌরসভার কাউন্সিলর বানিয়ে নিজের হাতে রেখেছে। পুলিশরা আজকাল পুলিশ নয়, তারা কাঠের আসবাব। তাদেরকে ঘরের যেকোনো স্থানে, যেকোনোভাবে, যেকোনো ভূমিকায় সাজিয়ে রাখতে পারে রাজনীতিবিদ এবং সন্ত্রাসশ্রেণীরা।
—
অন্তূর পরীক্ষা ছিল আরেকটা। ভার্সিটি চত্বরে গুঞ্জন।।পরে জানতে পারল, তার দেখা লাশটি ছিল সোহেলের। অর্থাৎ আঁখির বড় ভাইয়ের। অন্তূ নিশ্চিত, পলাশ সোহেলকে মেরে ফেলেছে। ওরা তো বাড়ি ছেড়ে উঠেই গেছে, তবু কেন মেরেছে? ঙ
অন্তূর দেখা পদার্থটি নাকি হরমোন লিক্যুইড। এ ব্যাপারেও অন্তূর সংশয় রয়ে গেল।
আজকাল নিজেকে সাধারণ মেয়ে মনে হয় না তার, সে বহুত অযাচিত বিষয়ের সাক্ষী, সহজ বাংলায় সে এক রহস্যবিদ হয়ে উঠেছে। এই ভাবনাতেও হাসি পেল অন্তূর। হুট করে জীবনের ধারাবাহিকতা বদলে গেছে। এর শুরু কোথায়? যেদিন জয়ের সাথে দেখা হলো, সেখান থেকে বোধহয়।
—
পাড়ার লোকে জানে, আমজাদ সাহেবের জমি নিয়ে ভাইয়ের সাথে ঝামেলার চলছে। আজ তিনি যাবেন তার একটা সমাধান করতে। কথাটা রাবেয়া বলে এসেছেন প্রতিবেশিদের। তারা যেহেতু এই ভয়াবহ সংকটাপণ্ন অবস্থায় পুরো একটা দিন থাকবেন না বাড়িতে, প্রতিবেশি সকলকে একটু নজর রাখতে বলে এসেছেন, বাড়ির ওপর। মেয়েটা একা থাকবে, কোথা থেকে কী মুসিবত এসে হামলে পড়বে, আল্লাহ ছাড়া কেউ থাকবে না রক্ষা করার!
আমজাদ সাহেব মানসিকভাবে কেমন আছেন, তা তার গাম্ভীর্য ছেঁদ করে বুঝে ওঠার উপায় নেই। শারীরিকভাবে চলার মতো। শরীরে বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমাট বাঁধা। কড়া ডোজের ব্যথার ওষুধ এবং অ্যান্টিবায়োটিক উনার শরীরের সমস্ত জীবনীশক্তি শুষে শুধু খোসাটা ছেড়ে দিয়েছে যেন। ডাক্তার রিলিজ করার সময় বলেছিলেন, এইসব স্থানে একসময় জমাট বাঁধা রক্তের দানাগুলো টিউমারে পরিণত হতে পারে। রক্ত-চাপ অতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছে উনার। রোজ দুবেলা ‘ওমলেসি ৪০ মি.গ্রা’ এর টেবলেট খেতে হচ্ছে। সাথে ঘুমের ওষুধ। অর্থাৎ, অল্প খানিক আর বাড়লে ব্রেইনে স্ট্রাক এট্যাক হতে সময় নেবে না। অন্তূ নিজহাতে ওষুধ খাইয়ে, বেশ কিছুক্ষণ আব্বুর সাথে কথা বলে রুমে এসেছিল সুই নিতে। উনার পাঞ্জাবীর কলারে একটা বোতাম ছিঁড়ে গেছে।
তখন অন্তিক এলো রুমে। বহুবছর পর এলো। অন্তূ সহজভাবে নিতে পারল না ব্যাপারটাকে। বিছানায় বসতেই প্রশ্ন ছুঁড়ল, “অন্তিক! মানুষ দেনার দায়ে পড়লে কুকুর হয়ে যায়?ʼʼ
অন্তিক নির্লজ্জের মতো হাসল, “বউ যদি বাপের বাড়ি থেকে এক পোটলা গয়না এনে দিয়ে বলে, নাও, এগুলো দিয়ে ব্যবসা করবে। যাতে তোমার বাপ না বলতে পারে, তুমি অপয়া, বউ খেতে দেবার মুরোদ নেই। তাহলে বোধহয় হয়।ʼʼ
-“তাতে ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলে পুরুষ? আমি বুঝতে পারছি না, আজই বা কী এমন বদলেছে যে তুই বদলে গেছিস? এই তো দুদিন আগেও কথা বলতি না, হুট করে কী নতুন নাটক শুরু করেছিস? অবশ্য লাইফে বিনোদনের দরকার আছে, দে তুই একটু বিনোদন দে।ʼʼ
-“আব্বু, তোমার মেয়ের মূখের ভাষা এত কঠোর কেন?ʼʼ
আমজাদ সাহেব কথা বললেন না।
অন্তিক বালিশ টেনে নিয়ে অস্থায়ীভাবে শুয়ে পড়ল। পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে বলল, “ওই যে একটা কথা আছে না? মেহনত করো চুপচাপ, এরপর আওয়াজ করে লোককে জানাও নিজের সফলতার কথা।ʼʼ
হো হো করে হেসে উঠল অন্তিক, “আমি সেটাই এপ্লাই করতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, একবার সফল হলে আব্বুর কাছে যে অপরাধ করেছি, সফল হয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে বলব, আব্বু আমি ততটাও অপদার্থ না, যতটা তুমি ভেবেছিলে।
কিন্তু শালা কপালের পাল্টিবাজী দেখেছিস? পলাশের ছেলেদের চাঁদা দিতে আরও ঘর থেকে নিয়ে যেতে হয়েছে। পুঁজি খেয়েছে, আমাকে খেয়েছে, মার্জিয়া আরও কত কী এনে দিয়েছে সেসব বিক্রি করে নিয়ে গিয়ে দিয়েছি, অথচ ওদের ক্ষুধা মেটেনি। আমার এইসব ব্যর্থতা, হতাশা তোরা কেউ না জানলেও মেয়েটা জানতো সব, সহ্যও করতো। আর এই কৃতজ্ঞতায় ওর সব অসভ্যতামি সহ্য করে গেছি। এই পরিণতি নিয়ে আব্বুর সামনে দাঁড়াতে পারিনি। লজ্জায় দু’বার মরার চেষ্টা করলাম, তাতে তোদের ওপর মার্জিয়ার ক্ষোভ আরও বাড়ল। মেয়েটা বহুত ত্যাগ করেছে এই সংসারে এসে। আমার অবস্থা দেখে, সেসব একসাথে সইতে সইতে কবে যে এমন জাহিল নারী হয়ে উঠেছিল! মাঝেমধ্যে মনে হতো, ওর মানসিক অবস্থা বিগড়ে গেছে আবার ওই হাল দেখে। আমার ওই অবস্থার জন্য আব্বুকে দায়ী করতো ও। আব্বু নাকি কঠোর, গম্ভীর। তাই ওনার সামনে দাঁড়িয়ে আমি সত্যি বলতে পারি না। বোনের গহনা এনে দিয়েছিল ব্যবসা করার জন্য। ওর বোনের শশুরবাড়ি থেকে তালাক দেবার কথা বলছিল গহনা ফেরত দিতে না পারলে।ʼʼ
অন্তূ এতক্ষণে নির্লিপ্ততা ভেঙে তাকালো অন্তিকের দিকে। এই নিয়ে একদিন উল্টা-পাল্টা ঝামেলা হয়েছিল মার্জিয়ার সাথে। মার্জিয়া কথা শুনিয়েছিল অন্তূকে। অন্তিক কিচ্ছু বলেনি সেদিন।
বেশ কিছুক্ষণ আপন মনে প্যাঁচাল পেরে উঠে বসল অন্তিক। ঝুঁকে বসে বলল, “আমি বোধহয় পাগল হয়ে গেছি রে, অন্তূ! আমার কোনো কিছুতেই কোনো রিয়েক্শন আসেনা, না লজ্জা, না সম্মান, না কোনো হেলদোল। যা হচ্ছে, সব কেমন তুচ্ছ লাগে আমার জীবনের খেলার কাছে। বোনকে পুরুষ দিয়ে ছুঁইয়ে দিয়েছি, বাপের মন ভেঙেছি, পড়ালেখা ছেড়েছি, সব ছেড়েছুঁড়ে যে মেয়েটাকে ঘরে আনলাম, তাকে অবধি ধ্বংস করে ছেড়েছি। আমি আত্মহত্যা করলেও কি পাপ হতো, মহাপাপ? হতো রে অন্তূ?ʼʼ
-“না হতো না। আত্মহত্যাতে কোনো পাপ নেই, ওটা একটা সাহসের বিষয়। কঠিন সাহস না থাকলে কেউ এই দুঃসাহসিক কাজ করতে পারে না। তুই আর আমি একসাথে সুইসাইড করব, কেমন? একা মরলে মজা পাব না, তুই সঙ্গে থাকলে মরতে ভালো লাগবে।ʼʼ
অন্তূকে দেখল অন্তিক। কেউ কেউ অতিরিক্ত যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে আর কেউ বা অন্তূর মতো নিষ্ঠুরতায় ঢেকে ফেলে নিজেকে।
সকাল আটটার পর বেরিয়ে গেল সকলে। আমজাদ সাহেব অন্তূকে বললেন, “দরজা আঁটকে পড়তে বস। বিকেলেই ফিরে আসব আমরা।ʼʼ
যতদূর দেখা গেল, গলির মাথা অবধি চেয়ে দেখল অন্তূ আব্বুর ধীর পায়ে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য।
পড়ায় মনোযোগ পেল না। কেমন এক অস্থিরতা ঘিরে ধরছে। ঘুরে ফিরেই পলাশের রুফটপ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নফল নামাজে বসতে ইচ্ছে করল অন্তূর।
গোসলের পানি শরীরে ঢালার সময় প্রতিটা পানির ফোঁটা তাকে সতর্ক করতে চাইছিল যেন। অদ্ভুত এক আশঙ্কাজনক আতঙ্কে ছটফট করছিল ভেতরটা। কোনোকিছুতেই মন টিকছে না। আশপাশটা ঠিক তেমন গুমোট হয়ে আছে, কালবৈশাখী ধেয়ে আগে পরিবেশে যেমন থমথমে অসহ্য তপ্ত নিস্তব্ধতা বিরাজ করে।
ধুপ করে একটা শব্দ হলো কোথাও। ট্যাপের পানির আওয়াজে তা প্রকট হলো না কানে, তবে কানে এলো ঠিকই। শরীরে এক প্রকার কম্পন টের পেল অন্তূ। গোসলটাকে তার বিষাক্ত লাগছে। কীসের গোসল করছে আল্লাহ জানে! গোসলের পানি শরীরে এমন জ্বালা ধরায়?
গেইটে ধুমধাম আওয়াজ হচ্ছে। করাঘাতগুলো ধীরে ধীরে শক্ত ও ভারী হয়ে উঠছিল। অন্তূ সম্বিত পেয়ে দ্রুত শরীর মুছে শুকনো কাপড় পরতে লাগল। কারা এসেছে? ওদিকে গেইট ধাক্কানোর মাত্রা ক্রমশ বিকট হয়ে উঠছে। অন্তূ কোনোরকম মাথায় গামছা পেঁচিয়ে তার ওপরই ওড়নাটা দেহে পেঁচিয়ে নেয় ব্যস্ত হাতে।
চলবে…
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২৪.
অন্তূর ধারণা পলাশের ছেলেরা এসেছে। সে দরজায় কান বাধালো। বেশ লোক জমেছে। আজকাল তাদের বাড়িটা মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কিনা। একটু কিছু হলেই মানূষ আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসে।
দুটো শ্বাস ফেলে গেইট খুলল সে। হাতটা থরথর করে কাঁপছে। কী আশ্চর্য! অন্তূ বুকভরে দম নিলো।
জয়ের ক্লাবের ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে। কবীরকে অন্তূ চেনে, সে চুপচাপ এককোণে দাঁড়িয়ে কেমন করে যেন তাকিয়ে ছিল অন্তূর দিকে। অন্তূ বেশ বিনয়ের সাথে বলল, “কেন এসেছেন আপনারা? কিছু হয়েছে?ʼʼ
-“জয় ভাইকে ডাকতে এসেছি। একটু ডেকে দেন।ʼʼ রাহাত বলল। তার অভিব্যক্তি একদম সরল-বাস্তব।
অন্তূ নিজেকে যথাযথ শান্ত রেখে বলল, “জি? বুঝতে পারছি না!ʼʼ
জয় ভাইকে ডেকে দেন। কাজ আছে ক্লাবে। কতক্ষণ হইলো ভেতরে ঢুকছে। বলেন আমরা আসছি।
অন্তূর হাতের আঙুলের ডগা লাফাচ্ছে। হাতের তালু ঘেমে উঠেছে। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে। সে মুঠো করে তার কামিজ চেপে ধরে বলল, “মশকরা করার মতো মেজাজ নেই আপাতত আমার। আপনারা কী বলছেন, বুঝতে পারছি না অথবা এরকম কোনো ইঙ্গিত বুঝতে চাইছি না।ʼʼ
রাহাত জয়কে ডাকতে ডাকতে ভেতরে এগিয়ে যেতে যেতেঞ বলল, “এই যে, ছোটআপু। আপনার সাথে আমাদের মশকরার সম্পর্ক না। জয় ভাই ঢোকার আগে বলছিল, একটু পর যেন ডাকি তারে। ক্লাবে ঝামেলা হইছে। উনাকে দরকার। একটু ডাকেন উনাকে। চলে যাইতে বললে চলে যাচ্ছি, কিন্তু উনাকে জানানো খুব দরকার। খবরটা জানিয়ে চলে যাব, কিন্তু তবুও ডাকেন একটু। ঘুমাচ্ছে নাকি?ʼʼ রাহাত পারফমেন্স ভালো ছিল। সন্দেহের অবকাশ নেই তার অভিব্যক্তিতে।
অন্তূর মাথায় যেন টগবগিয়ে আগুন জ্বলে ওঠে। ততক্ষণে পাড়ার লোক ঘটনায় বেশ আগ্রহ পেয়ে বসেছে। কেউ কেউ নিজেদের মাঝে আলোচনা শুরু করেছে, তো কেউ অপেক্ষা করছে আগামী দৃশ্য দেখার। অন্তূ অনেক কষ্টে সামাল দেয় নিজেকে, “তো আপনার ভাষ্যমতে, আপনাদের জয় আমিরের বাড়ির ভেতরে থাকার কথা?ʼʼ
রাহাত আর কথা বলল না। আত্মবিশ্বাসী গলায় ডাকা শুরু করল, “জয় ভাই? জয় ভাই? ঘুমায়ে গেছেন নাকি?ʼʼ
অন্তূর নাক শিউরে ওঠে, “বাড়াবাড়ি করবেন না যেন। ধৈর্য্যও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে বহন করি আমি। এখান থেকে জুতো দিয়ে পিটিয়ে বের করবে লোকে আপনাকে। নাটক না করে বেরিয়ে যান। অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঢুকছেন কোন সাহসে?ʼʼ
রাহাতের কান অবধি পৌঁছালই না সেসব। তার মুখে-চোখে আত্মবিশ্বাস ভর্তি গাম্ভীর্য এবং দৃঢ়তা। সে আবার ডাকে, “জয় ভাই? ঘুমাই গেছেন নাকি? জয় ভাই…ʼʼ
অন্তূ মাথা ফাঁকা লাগছিল। সে জানে, ভেতরে কেউ নেই। তবুও বুকের ভেতরে ধুপধুপ আওয়াজ হচ্ছে, রাহাতের চোখে মুখের আত্মবিশ্বাস তাকে ভঙ্গুর করে তূলছিল। সামনের আগ্রহী জনতার মুখের দিকে তাকিয়ে তার শরীরে কম্পন উঠে যাচ্ছিল।
জয় বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। সবে ঘুম ভেঙেছে তার। হাই তুলল একটা। অন্তূ দেখল সেটা কৃত্রিম। জনগণ তা বুঝল না কেবল। জয় ঘুম ঘুম গলায় বলল, “কী সমস্যা? এত ডাকাডাকি কীসের?ʼʼ
অন্তূ জমে গেল। তার মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিণ্ড একত্রে কার্যক্ষমতা হারাল। জয়ের পরনে শুধু একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট, সেই প্যান্টের ওপর দিয়ে নিচের আন্ডারওয়ারের অল্প কিছুটা দৃশ্যমান হয়ে আছে। নীলচে-কালো শার্টটা হাতে ছিল, গায়ে কিছু নেই, তা কাধে রাখতে রাখতে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে গেইটের কাছে দাঁড়ায় জয়। দেখতে বিশ্রী লাগছিল ব্যাপারটা। এবং তা সপষ্ট নোংরা ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্তূর মনে হচ্ছিল, সে মরে যাচ্ছে। আঁটকে থাকা নিঃশ্বাসটুকু কম্পিত তরঙ্গ মতো বাতাসে আঁছড়ে পড়ে। জয় অন্তূকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার আরমিণ! এত লোকের ভিড় ক্যান? কী হইছে?ʼʼ
অন্তূ নির্জীব হয়ে উঠল। লোকেরা এবার একে একে নিজেদের মূল্যবান মন্তব্য পেশ করল। সর্বপ্রথম অবাক চোখে এগিয়ে এলেন পাশের বাড়ির দুজন মহিলা, “আরে? এইডা ওই যে মেম্বারের ভাগনি না? জয়! ওওও! ঘোমটার তলে খেমটা চলে মাইনষে কি আর এমনি কয়? এই যে শোনো সগ্গলে, আইজকা যা দেখতেছ নতুন কিচ্ছু না। আমরা একদিন হেরে বাড়িত যাইয়াও ওই পোলারে দেখছি। ছেঁড়ির মা কত আদর কইরা খাওয়াইতেছিল, ছি ছি ছি! থুহ! মাস্টারের মাইয়া! হুহ! আবার মুকুশ পইরে বেড়ায়। কাউরে মুখ দেহায় না। ভণ্ডামি দেখছো? ঘরের ভিত্রেই যদি প্রতিদিন এমনে বেটাছেলে পাওয়া যায় হেই আবার বাইরে কারে মুখ দেহাইবো? দরকারই তো নাই। নষ্টামি তো ঘরের ভিত্রেই চলতাছে।ʼʼ
একজন লোক জিজ্ঞেস করে মহিলাকে, “আগেও দেখছেন নাকি ওই চেংরারে… মাইনে জয়রে?ʼʼ
মহিলা তাচ্ছিল্য করে একদলা থুতু মাটিতে ফেলে, আড়চোখে উদ্দেশ্য তার অন্তূর ওপর, “হ দেখছি মানে? ওর মায় তো আব্বা আব্বা কইরা খাওয়াতেছিল। আমরা ঢুকতেই তাত্তারি বাইর হইয়া গেল। ওর বাপ আইলো, হেইও ভিত্রে চইলে গেল, কিস্যু কইল না। ওইদিনই সন্দে হইছিল। আবার এই ছেঁড়ি সেদিন দেখলাম মুকুশ না পইরাই বাইরেত্তে ঘুইরা আইলো।ʼʼ
অন্তূ চোখ বুজে সজোরে শ্বাস টেনে নেয়। জয়ের ভবিষ্যতবাণী মিথ্যা হয় না! এক রত্তিও ভুল বলে না জয়।ওর তো গণক হওয়া উচিত! সেদিন পলাশের ছাদে হাসতে হাসতে কী চমৎকার করে বলেছিল, “তুমি আমায় থুতু দিলে, আরমিণ? লোকেও তোমায় থুতু দেবে, সত্যি বলছি!ʼʼ
জয়ের প্রতি মুগ্ধতায় অন্তূর দুচোখ ভিজে ওঠে অন্তূর। একটা লোকের এত জেদ? নিজের অপরাজেয়, অনৈতিক শক্তির ওপর এত দম্ভ? এত তার কূটিলতা? আর শক্তিও তো অগাধ! বাঁচাতেও পারে, মারতেও! সেদিন বাঁচিয়ে এনেছে আজ মারার জন্য! ঠোঁটের কিনারায় হাসি ছলকায় অন্তূর। বহুবার সতর্ক করেছে জয় ওকে, অথচ খুব হালকাভাবে নিয়েছে সে। ভার্সিটিতে প্রতিবার জয়ের চোখে তাকিয়ে রুহু কেঁপে উঠলেও পরে ভুলে যেত জয়ের নির্লিপ্ততা দেখে। অথচ জয় বলেছিল, “সে সে থাবা দিয়ে ধরেবে না, কুকুরের ছ্যাঁচড়ামির মতো ধীরে সুস্থে নির্লজ্জতার সাথে ধরবে, ঝরঝর করে ঝরে পড়বে অন্তূ।ʼʼ
অন্তূ অবাক হলো সবচেয়ে বেশি, সবার অভিনয়ে।বাস্তবের চেয়েও বেশি বাস্তব তাদের অভিব্যক্তি। সাজানো, পরিকল্পিত ঘটনাকে জীবন্ত করে তুলেছে ওদের অভিনয়।
এক বৃদ্ধা এগিয়ে আসে, “এই ছেঁড়িরে একঘরে করো বাপু সকল। এইসব পাড়াডার বদনাম করবো। ও ছেঁড়ি, এত দেহি পদ্দা করো, তুমার পদ্দার উপ্রে থুহ। ঘরে বেডা শুয়াইয়া রাখতে দিয়া বাপ-মায় গেছে কোনে? ছি ছি ছি ছি? বাপের জর্মে এইসব দেহিনাই।ʼʼ
অন্তূ চুপচাপ দাঁড়িয়ে শোনে সবার মূল্যবান মন্তব্য। কেউ কেউ বলছে, ‘এইজন্যিই তো কই, দজ্জা খুলতে এত দেরি লাগাইতেছ ক্যা? সেই কখন থেকে আইসা এই ছেঁড়াগুলান ডাকতেছিল, খোলে না তে খোলেই না।’
অন্তূর বিয়ে নিয়ে এসেছে বহুলোকে বহুবার। অন্তূ অপমান করতো অথবা প্রত্যাখান। তারা আজ তাকে ছাড়বে কেন?
মহিলা এসে এক থাবায় অন্তূর মুখ থেকে ওড়নাটা টেনে খুলে ফেলে। বেরিয়ে আসে সদ্য গোসল করা গামছাটা মোড়ানো ভেজা মাথাটা। সকলে কয়েক সেকেন্ড হাঁ করে হিসেব মেলায়! এবার তারা দৃঢ় বিশ্বাসে ফেটে পড়ে। চমৎকারভাবে প্রমাণ হয়ে গেল তাদের কাছে অন্তূর নোংরামি। এতক্ষণ সন্দেহ ছিল তাদের। এবার আর রইল না। ‘নষ্টামি করে লাং শুইয়ে রেখে আবার গোসল করে বের হয়েছে!ʼ—গুঞ্জন উঠল।
‘ওহ! তাইলে কুকাম করে লাংরে বিছানায় শুয়াইয়া রাইখা ফরজ গোসলে ঢুকছে মা-গী? হেরপর সেইখান থেকে বাইর হইয়া আইছো? ওরেছিঃ ছি ছিই!ʼ রব উঠল মন্তব্যের।
অন্তূ অন্তত মোড়ানো গামছাটা মাথায় রাখতে চেয়ে তাও পারল না। মহিলা টেনে হিচড়ে খুলে ফেলে গামছাটা। পিঠ বেয়ে ছিটকে পড়ল ভেজা লম্বা চুলগুলো। কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয় অন্তূ। সে অবাক হচ্ছে, তার কোনো প্রতিক্রিয়া আসছে না, কান্না পাচ্ছে না।
জয় একটা সিগারেট ধরিয়েছে। ধোঁয়া গিলছে। অন্তূ না তাকিয়েও টের পায়, জয়ের চোখদুটো হাসছে। খিলানের মতো নাকের পাটা’দুটো ফুলে ফুলে উঠছে, আবার ভ্রু জোড়া অহংকারে পুরু হয়ে উঠছে। জয় খারাপ কিছু করার পর খুব সজল হয়ে ওঠে, যেন সে খানিক জীবনীশক্তি পায়। তার খারাপ হওয়ার পিছনে কোনো কারণ নেই, সে খারাপ তাই সে খারাপ।
অনেক লোক জমেছে খেলা দেখতে। এক বৃদ্ধা এবার হই হই করে উঠলেন, “ওই ওই ওই, তুমরা কি এমনেই দাঁড়াইয়া ওই মা-গীর ঢং দেখবা? চুল-নাক কাইটা বাইর করো ওসব বালাই দ্যাশ থেকা।ʼʼ
কেউ কেউ পরামর্শ দিলো, শরীয়তের বিধান অনুযায়ী ব্যাভিচারের শাস্তি মাটিতে গলা অবধি পুঁতে আশিটা বেত্রাঘাত। অন্তূ তাদের আলোচনা খুব মনোযোগ সহকারে দেখছিল এবং শুনছিল।
অন্তূর দিকে তাকাল জয়। চোখাচোখি হলো দুজনের। অন্তূর ঠোঁট দুটো হেসে উঠল। যে কেউ দেখতে পাবে না সেই হাসি। তরল রক্তের মতো চিকচিক করছিল সেই হাসি অন্তূর চোখের তারায়।
পুরুষ এবং কলঙ্ক এ দুটো শব্দ একসাথে হয় না কখনও। কলঙ্ক শব্দটি নারীসত্ত্বার জন্য প্রযোজ্য কেবল। পুরুষ কলঙ্ক বইতে জন্মায় না জগতে। তারা স্বাধীন, তারা আমরণ কলঙ্ক-বিচ্ছিন্ন। একই পাপের মাশুল পুরুষ ও নারীর জন্য ভিন্ন হয় এ সমাজে। নারীর মসৃণ চামড়ায় বরং কলঙ্কের জন্য অনুকূল পদার্থ লেগে থাকে, নারী কলঙ্কের জন্য এবং কলঙ্ক নারীর জন্য চুম্বকের মতো আকর্ষিক। একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে দুটোকে আনলে দুটো ছিটকে এসে পরস্পরের দেহে লেপ্টে যায়; চিরতরে।
জয়ের ক্ষমতা অসীম। তার দিকে আঙুল তোলার সাধ্যি কারও নেই। তারা অন্তূর দোষের কলঙ্কও অন্তূর গায়ে এবং জয়েরটুকুও একসঙ্গে অন্তূর গায়েই ছিটিয়ে দিচ্ছিল।
মৌলবী সাহেব এলেন। সব শুনলেন। বেশ কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। হামজা এসে বসেছে। তাকে চেয়ার দেয়া হয়েছে মৌলবি সাহেবের পাশে।
অন্তূর খোলা চুলগুলো শুকিয়ে গেছে। আজ সবাই পরাণভরে অন্তূকে দেখেছে। মাস্টারের মেয়েকে সেই ছোট বেলায় দেখেছিল সবাই, এরপর বহুবছর আর দেখেনি কেউ। অথচ মাস্টারের মেয়ে যে ঘোমটার তলে তলে নষ্টামি করতো তা কি কেউ আন্দাজ করতে পারেনি? কতবার তারা মাস্টারকে বলেছিল, ভার্সিটিতে না পড়িয়ে বিয়ে করিয়ে দিতে। মেয়েটার দেমাগ ছিল বেশি। আজ পণ্ড হয়েছে তো! পাড়ার পুরুষেরা মন ভরে দেখল অন্তূকে। ফর্সা শরীরে খয়েরী রঙা ঢিলেঢালি সেলোয়ার কামিজ, ওড়নাটা গায়ে আছে কোনোমতো। উস্কো-খুস্কো লম্বা লম্বা চুল পিঠে অবহেলিতভাবে ছড়ানো।
হামজার পরনে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবী। মেয়র সে। তার মুখটা কঠিন মৌলবি সাহেব বললেন, “যেহেতু অবিবাহিত নারী-পুরুষ ব্যাভিচারে লিপ্ত হইছে, সেই হিসাবে শরীয়তের বিধান হইল, দুইজনকে দোর্রা মারা। মরে গেলে গেল, বেঁচে থাকলে পাপ মুক্ত।ʼʼ
একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে লোকেরা। এইসব আগের কালে দেখা যেত। এখন এসব উঠে গেছে। মানুষ প্রকাশ্যে অকাম করে বেড়াচ্ছে। তবুও পাড়াটা তো আর বোডিং বা হোটেল না!—সবার আলোচনা একই রকম। তারা এর একটা বিহিত চায়। আর তাছাড়াও সকলের মাঝে একটা চাপা ক্ষোভ বোধহয় জয়ের জন্যও কাজ করছিল। জয় খারাপ তা সবাই জানে, সবাই। অথচ ভয়ে কেউ মুখে আনলো না, বোঝাতে চাইল না কিছুই।
অন্তূ আকাশের দিকে তাকায়। কয়েকবার প্রাণভরে আব্বুকে ডাকল। কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ প্রয়োজন হয়নি তাকে ব্যৃভিচারিণী বলার জন্য। জয়ের ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা আর অন্তূর ভেজা চুল যথেষ্ট।
আব্বু আসবে বিকেল বা সন্ধ্যায়। অন্তূ চায়, তার আগে তাকে মেরে ফেলা হোক। এতক্ষণে তার একটা শব্দও শোনেনি কেউ বা বলার সুযোগ দেয়নি। সে আর বলতেও চাইল না। কলঙ্ক এখন অ-প্রমাণিত হলেও মুখে মুখে একটা দাগ এবং রটনা থেকে যাবে। সবচেয়ে ভালো হয় মরে গেলে। অন্তূর খুশি লাগছিল খুব।
বেশ কিছুক্ষণ নিরবতা পুরো জনতার মাঝে। তা ভাঙল হামজা। মৌলবিকে বলল, “আর কোনো বিকল্প নেই এর? আপনাদের ভাষ্যমতে যা হবার হয়ে গেছে। আর কোনো গ্রহনযোগ্য শাস্তি বা মীমাংসা আছে?ʼʼ
কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। এরপর একজন বৃদ্ধলোক এগিয়ে আসে হামজার দিকে। বৃদ্ধদের সাথে সামাজিক কর্মের মাধ্যেমে হামজার বেশ খাতির আছে। লোকটা হাইকোর্টের সাবেক উকিল। তিনি যেন রাগত স্বরে তাচ্ছিল্য করে চট করেই বললেন, “আর কী করবে? যা ঘটনার বিবৃতি আসছে, বিয়ে দিয়ে বাড়ি নিয়ে যাবে?ʼʼ
সকলে সপ্রতিভ হয়ে উঠল। এই পদ্ধতিই তো চলমান এখন। দোর্রা মারার প্রচলন এবং কাল চলে গিয়েছে। এখন কেউ অকাম করলে ধরে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। হামজা নিজস্ব গাম্ভীর্য বজায় রেখে অথচ চট করে বলে ওঠে, “ধরুন যদি দিয়ে দিই? আপনারা তা গ্রহণ করবেন, সম্মতি দেবেন? সিদ্ধান্ত আপনাদের হাতে।ʼʼ
অন্তূ হৃদযন্ত্রটা লাফিয়ে উঠল। হামজা অতিরিক্ত চতুর। তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে এত চমৎকারভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছে, মানুষ এতক্ষণে তাকে মহান ধরে নিয়েছে।
বৃদ্ধ বললেন, “বিয়ে দিতে চাও, তুমি?ʼʼ
-“আমার যদি আপত্তি না থাকে মেয়েকে জয়ের বউ করে ঘরে তুলতে! যা করেছে জয়ের সাথেই তো করেছে! আপনাদের মতামত কী?ʼʼ
অন্তূ মাথাটা ঝিনঝিন করে ওঠে। সকলের মাঝে গুঞ্জন উঠল। মনে হলো বেশ পছন্দ হয়েছে বিষয়টা সবার।
জয় গর্জে উঠল হামজার কানে, “পাগল হইছো তুমি? ওই শালীর মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মরবে, তবুও দেখা যাচ্ছে আমায় কবুল করবে না। আমিও ওরে বিয়ে করতে পারব না। ওর সাথে আমার পোষায় না, আমার ওর মাঝে বিশাল ঘাপলা আছে… মাঝে কাহিনি জটিল। এসব বাদ দাও। অন্যকিছু করো।ʼʼ
হামজার কানে গেল না সেসব।
অন্তূ হুড়মুড়িয়ে মৌলবির সামনে যায়, “হুজুর? আমার কিছু কথা বলার আছে। আমার কথাটা একবার শুনুন। আমি…ʼʼ উদ্ভ্রান্তের মতো ঢোক গিলল মেয়েটা, “….আমি কিছু কথা বলতে চাই।ʼʼ
মৌলবি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। অন্তূ অনুমতির অপেক্ষা করে না, “বিশ্বাস করুন এমন কিছুই হয়নি। যা দেখেছেন আপনারা সব চোখের ধাঁধা। মানে আমি বোঝাতে পারছি না ব্যাপারটা। আপনাদের যা দেখাতে চাওয়া হয়েছে, আপনারা তাই দেখছেন। আসলে এমন কিছুই হয়নি। কৌশলের কাছে হেরে গেছেন আপনারা। এখানে নিখুঁত একটা ট্রিক্স খাটানো হয়েছে।ʼʼ
কারও কানেই যেন গেল না অন্তূর ভারী শব্দের কথাগুলো। অন্তূর শিক্ষিত, মার্জিত, যুক্তি-তর্কের কথা হিতে বিপরীত কাজ করতে শুরু করল। অন্তূ থামে না। বলে চলে, “জয় আমির আমাদের বাড়িতে কী করে ঢুকেছে সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই আমার। আমি গোসলে ছিলাম, তাই গেইট খুলতে দেরি হয়েছে। জয় আমির ভেতরে কী করে এলো সেটাই অস্পষ্ট আমার কাছে..ʼʼ
উপস্থিত জনতা বিরক্ত হয়ে গেল, “তো কী চাইতেছ? মানে এইসব নাটক দিয়া কী বুঝাইতেছ, ওইডা কও! এই ছেঁড়িরে কেউ ধরেন তো।ʼʼ
অন্তূ গর্জে উঠল, “আমি কোনো পাপ করিনি, আমি বিয়ে করব না। আপনারা জুলুম করছেন আমার ওপর…ʼʼ
থপ করে একদলা থুতু এসে মুখে পড়ে অন্তূর গলার কাছে। জয় অসন্তুষ্টিতে চোখ বুজে ফেলে—ইশ! অল্পের জন্য থুতু মুখে লাগেনি। আর একটু উপরে ফেললেই মুখে পড়ত থুতুটুকু। অন্তূর ছোঁড়া থুতু জয়ের চোয়ালের ওপর দিয়ে চোখের কিনারা ঘেষে লেগেছিল। মহিলাটা ঠিকমতো থুতুও দিতে জানেনা! মহিলাকেও কিছু অশ্রাব্য গালিগালাজ করল জয়।
চলবে…