#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২.
পরদিন ক্লাস শেষে ভীষণ ক্লান্ত অন্তূ। ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ডেকেছেন। ডাকার কারণ স্পষ্ট নয়। অন্তূকে পিয়ন থামালো দরজার সামনে, “দাড়ান আপনে। স্যার বিজি আছে। মিটিং চলতেছে ভিতরে।ʼʼ
ভেতর থেকে প্রফেসর ইউসুফ সিরাজীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “ভেতরে আসতে দাও ওকে।ʼʼ
অন্তূর একটু সন্দেহ হলো, কোনো গুরুতর বিষয় নয় তো! ভেতরে প্রবেশ করে সালাম জানাল। ইউসুফ সিরাজী মাথা নাড়লেন, “এসো!ʼʼ
আরও কয়েকজন বড়ো বড়ো শিক্ষক রয়েছেন কক্ষে, এবং টেবিলের সামনে ডানপাশে চেয়ারে বসে আছে এক লম্বামতো পুরুষ, পরনে পাঞ্জাবী, মুখে চাপদাড়ি। এলাকায় একনামে বড়ভাই। যার মুখভঙ্গি একদম স্বাভাবিক, নিচের দিকে তাকিয়ে আছে শীতল দৃষ্টি মেলে। একে অন্তূ চেনে, ভার্সিটির ছাত্র সংসদের মেজর মেম্বার— হামজা পাটোয়ারী। ইউসুফ সিরাজী জিজ্ঞেস করলেন, “গতকাল কী হয়েছিল?ʼʼ
অন্তূ ইতস্তত না করে বলল, “আমাকে র্যাগ দেয়া হয়েছিল, স্যার!ʼʼ
-“সে তো আর নতুন কিছু নয়। তুমি কী করেছ?ʼʼ কড়া শোনাল প্রফেসরের কণ্ঠস্বর।
অন্তূ দমল না, বলল, “আমাকে সিগারেটে টান…ʼʼ
-“আহ!ʼʼ ব্যাপারটা যেন শুনতে আগ্রহী নন স্যার, বিরক্ত হলেন, “তুমি কী করেছ সেটা বলো!ʼʼ
অন্তূ স্যারের সম্মানে বিনয়ের সঙ্গে তবে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমাকে ধূমপান করতে বলা হয়েছিল, স্যার। আর তাতে অভ্যস্ত নই আমি। তাই সিগারেটটা নিয়ে ফেলে পা দিয়ে নষ্ট করে দিয়েছি।ʼʼ
মুখভঙ্গি শক্ত হলো প্রফেসরের। চোখ পাকালেন তিনি, চাপা স্বরে ধমকে উঠলেন, “এই শিখেছ? কার সঙ্গে এই আচরণ করেছ কোনো জ্ঞান আছে সে বিষয়ে? অভদ্র মেয়ে! সিনিয়রদের সঙ্গে এই আচরণ শিখেছ এতদিনে? ভার্সিটিতে আসো বেয়াদবী শিখতে? আদবের বালাই নেই ভেতরে! তুমি জানো, এতে তোমার এডমিশন ক্যানসেল হতে পারে? নাম কী?ʼʼ
অন্তূ অবাক হলো, উল্টো তাকে ব্লেইম করা হচ্ছে! অবশ্য চমকানোর কিছু নেই। দুনিয়ার সংবিধানের নাম যেখানে অরাজকতা ও সুশাসনহীনতা! সেখানে এটা নেহাত স্বাভাবিক ব্যাপার! নাম বলল সে, “মাহেজাবিণ আরমিণ অন্তূ।ʼʼ
-“বাবার নাম?ʼʼ
একটু ভয় হলো অন্তূর, এসব আব্বুর কানে গেলে…আব্বু সম্মানী মানুষ, তামাশা নিতে পারবেন না। জবাব দিলো, “আমজাদ আলী প্রামাণিক।ʼʼ
-“স্কুল মাস্টার আমজাদ নাকি?ʼʼ
-“জি!ʼʼ
-“এখনও মাস্টারি করে?ʼʼ
-“জি না। রিটায়ার করেছেন বছরখানেকের মতো।ʼʼ
ইউসুফ সিরাজী হামজাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হামজা! তুমি কিছু বলবে?ʼʼ
হামজার মুখভঙ্গি দুর্বোধ্য। বোঝার চেষ্টা করল অন্তূ, অথচ বিশেষ অভিব্যক্তি নেই মুখে। অন্তূর দিকে তাকালও না একবার চোখ তুলে, মৃদু একবার ঘাঁড় নেড়ে দাম্ভিকতার সাথে ডানহাতের তর্জনী আঙুল তুলে ইশারা করল অন্তূকে বের হয়ে যেতে। জলদ গম্ভীর প্রতিক্রিয়া তার। যেন নেহাত অনিচ্ছুক সে অন্তূর সাথে কোনোপ্রকার কথা বলতে।
কক্ষ থেকে বেরিয়ে অন্তূ থমকাল। সে কি কোনো অনিশ্চিত ঝামেলায় জড়িয়ে যাচ্ছে! একটা অজানা বিষণ্নতা টের পেল সে ভেতরে, যা যুক্তিহীন বলেও মনে হচ্ছে, আবার কিছু একটা খোঁচাচ্ছে ভেতরটায় খুব। হামজা পাটোয়ারী কেন বসেছিল ওখানে?
আজ প্রথমবার অন্তূ হামজাকে এতো কাছ থেকে দেখল। আগে দেখেছে বিভিন্ন পোস্টার এবং প্রোগ্রামের ব্যানারে, নয়ত ভার্সিটি প্রোগ্রামে বক্তব্য দেওয়া বা নেতৃত্ব প্রদানের সময়।
শহীদ মিনার চত্বর পেরিয়ে যাবার সময় মেয়েলি ডাক কানে এলো। মেয়েটা পরিচিত, নাম তানিয়া। ওর দুই ইয়ার সিনিয়র। এগিয়ে গিয়ে বলল, “জি, আপু!ʼʼ
-“গতদিন আবার কী হয়েছিল ভার্সিটিতে?ʼʼ
অন্তূ বসল সিড়ির ওপর, “গতদিন আবার? কেন, এর আগেও কি কিছু ঘটেছে নাকি ভার্সিটিতে?ʼʼ
তানিয়া জিজ্ঞেস করল, “কোন ইয়ার যেন তুমি?ʼʼ
-“সেকেন্ড ইয়ার।ʼʼ
-“ও আচ্ছা! ছুটিতে ছিলে তোমরা! ভার্সিটিতে হওয়ার কি আর কোনো কমতি আছে? একের পর এক হয়-ই। তোমার কী হয়েছে গতদিন, জয় আমিরের সঙ্গে?ʼʼ
অন্তূ কপাল জড়াল, “জয় আমির?ʼʼ
প্রশ্নটা খুব অপছন্দ হলো তানিয়ার, বিরক্ত হলো, “দুই বছর ভার্সিটিতে পড়ছো, এবার কি বলবে জয় আমিরকেও চেনো না নাকি? ভার্সিটির ছাত্রলীগের সম্পাদককে চেনো না? কাউন্সিলরের ছেলে হামজা পাটোয়ারীকে চেনো?ʼʼ
-“জি, চিনি।ʼʼ
-“আর জয় কে? হামজার ফুফাতো ভাই, জয় আমির।ʼʼ
-“ও আচ্ছা!ʼʼ একটু দ্বিধান্বিত দেখালো অন্তূকে।
তানিয়ার জয়ের হুলিয়া বর্ণনা করতে শুরু করল, “দুই বছর আগে এখান থেকে অনার্স শেষ করেছে। শ্যামলা বর্ণের লম্বা করে, থুতনির কাছে একটা তিল আছে। গলায় চেইন, তাতে J লেটার আছে। ডানহাতে ঘড়ি পরে আর বামহাতে ব্রেসলেট..ʼʼ
অন্তূর সেসব শুনতে ইচ্ছে করছিল না। বুঝল, যে তাকে সিগারেটে টান দিতে বলেছিল, সে-ই জয়! আর শুনতে চাইল না এই বিশদ বর্ণনা, দ্রুত মাথা নাড়ল, “জি, এবার চিনেছি।ʼʼ
-“কী করেছে ওরা তোমার সঙ্গে?ʼʼ এমনভাবে কথাটা বলল তানিয়া যেন কোনো বিশেষ গোপন রহস্যের ব্যাপারে খোঁজ করছে। অন্তূ বলল, “বিশেষ কিছু নয়, র্যাগ দিয়েছিল।ʼʼ
এবার তানিয়া আরও সতর্ক হয়ে উঠল, “আরে! লজ্জা পাচ্ছ কেন? আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না, এসব হতেই থাকে, বলো কী করেছে ওরা তোমার সঙ্গে?ʼʼ
অন্তূ অবাক হলো, “আশ্চর্য! লজ্জা পাওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে? বললাম তো, সাধারণ র্যাগ দিয়েছে। আর কীসব হয়ে থাকে?ʼʼ
তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠল তানিয়াসহ পাশের মেয়েগুলো। তানিয়া মুখ বিকৃত করে বলল, “কেন? তুমি বোধহয় জানো না, র্যাগিংয়ে মেয়েদের সাথে কী কী করা হতে পারে?ʼʼ
-“জি, জানি। তবে আমার সঙ্গে তেমন কিছু হয়নি।ʼʼ
তানিয়া কেমন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায়, “তাই নাকি? যাক, তা যদি সত্যি হয়, তো ভালো। কিন্তু তুমি কী করেছ? তোমাদের নিয়ে কানাঘুষা চলছে ভার্সিটিতে। তোমার সাহস বেশি হয়েছে নাকি?ʼʼ
-“কানাঘুষা? কানাঘুষার মতো কিছু তো হয়নি! আর সাহসের কী আছে এতে! যা আমার পছন্দ নয়, তাতে আমি সাফ মানা করে দিয়েছি।ʼʼ
তানিয়া চোখ উল্টালো, “মেয়ে, তোমার তো মাথায় দোষ আছে মনে হচ্ছে! তুমি সিনিয়রের সাথে বেয়াদবি করে এসে বলছো কানাঘুষার কিছু হয়নি! হয় তুমি পাগল, নয়ত বোকা অথবা দুঃসাহসী বলা যায়! কিন্তু এখানে দুঃসাহস টেকার না। তুমি সিনিয়রদের সাথে এরকম অবাধ্যতা করলে কোন সাহসে! জয়কে তো দেখছি তাহলে আসলেই চেনোই না তুমি? ভার্সিটিতে কি ঘাস কাটতে আসো, খবর বা রুলস কিছুরই জ্ঞান রাখো না নাকি!ʼʼ
অন্তূর খুব বলতে ইচ্ছে করল, ঘাস কাটতে যদি নাও আসি, তবে এসব পঙ্গপালদের খবর রাখতে নিশ্চয়ই আসি না! আসি পড়ালেখার জন্য, তা শেষ করে ফিরে যাই।
চেপে গেল, শঙ্কিত হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যেই ভেতরটা। ভয়টুকু সে চাপল ভেতরে, “কীসের খবর রাখার কথা বলছেন?ʼʼ
মেয়েগুলো একে অপরের দিকে তাকাল, একটু তাচ্ছিল্যে হাসল সকলে। তানিয়া বলল, “এর আগে বহু মেয়ে ভার্সিটি ছেড়েছে জয়ের কারণে, তোমরা তখন এডমিশন নাওনি, তখন জয় সেকেন্ড ইয়ারে ছিল বোধহয়। একটা মেয়ে হলের ছাদ থেকে পড়ে আত্মহত্যা করেছিল। ওরা কী করেছিল মেয়েটার সঙ্গে জানা নেই। কিন্তু একটা কথা পরিস্কার, জয় এক অভিশাপ! আবার ভালোও!ʼʼ
-“আবার ভালোও কেন?ʼʼ
-“রাজনীতির চাল বোঝো না? সমাজসেবার কাজবাজ করে দুই ভাই মিলে। পুরো ছাত্র সংগঠনের বেশ ভালোই যোগান দেয় দুজন। ত্রাণ, চিকিৎসা, স্বাস্থ, দুর্যোগ—এসবে বহুত অবদান আছে ওদের। এরিয়ার লোকের মনোযোগ কেড়েছে নিজের নেতৃত্বের জেরে অথচ বখাটেপনা ছাড়তে পারেনি, তবে সেটার কোনো প্রমাণ থাকে না, বুঝলে!ʼʼ
অন্তূ একটা ছোট্ট শ্বাস ছেড়ে জিজ্ঞেস করল, “আমাদের ছুটির মধ্যে কী হয়েছিল ভার্সিটিতে?ʼʼ
তানিয়া চারদিকে ভালোভাবে তাকাল কয়েকবার, বেশ কিছুক্ষণ চুপ রইল। এরপর নিচু আওয়াজে বলল, “শোনো, তুমি এখনও ছোট। এত বোকার মতো চলবে না। পরিস্থিতি বুঝে চলতে হয়। নয়ত মারা পড়বে।ʼʼ
একটু থেমে বলল, “হামজার বাপ কাউন্সিলর এলাকার, তা তো জানো! আর হামজা রাজনৈতিক নেতাকর্মী। আমাদের কমনরুমের আয়া সালমা খালাকে তো চেনো।
-“জি, চিনি।ʼʼ
-“ওনার বাড়ি হামজাদের ক্লাবের পাশে। ওনার ছোটো ছেলেটার হঠাৎ-ই কী থেকে যেন আঘাত পেয়ে কী হলো! পায়ে ক্যান্সার হলো। এরপর নাকি খালা বাড়ির জায়গা অর্ধেক দাম নিয়ে পাওয়ার-দলিল করে এক হিন্দুর কাছে বন্ধক রেখেছিল, বলা চলে বিক্রিই করেছিল। তবে শর্ত ছিল খালা নির্দিষ্ট সময়ে টাকা পরিশোধ করলে জায়গা ফেরত পাবে, যেহেতু বসত বাড়ি। কিন্তু চিকিৎসা করেও সেই ছেলে বাঁচেনি আর। একবছরের সময় ছিল, খালা সেই সময়ে টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। তার ওপর প্রতি মাসের কড়া সুদের টাকা জমে পুরো জমির দাম উসুল হয়ে গেছিল ওই লোকের। ওই লোক এরপর জায়গাটা খালাকে না জানিয়ে অন্য কারও কাছে বেঁচে দিয়েছিল। তারা এসে তাগাদা দিতে থাকল বাড়ি খালি করার। খালা সময় চেয়ে নিয়েছিল। কিন্তু পরে বিচার শালিশ বোর্ডের কাছে চলে গেল। মানে মেয়র, কাউন্সিলর, এলাকার মাতব্বর, সমাজসেবকেরা সব ছিল। সব শেষে নাকি বিশাল ঝামেলা হয়েছিল। পরে হামজা আর জয় মিলে সালমা খালাকে সময় দিয়েছিল আরও কিছুদিন। তখন খালার বড়ো ছেলের বউ বাপের বাড়ি জায়গা বিক্রি করে এনে টাকা দিয়েছিলেন কাউন্সিলর হুমায়ুন পাটোয়ারীর কাছে। পরে আর খালা টাকা নিয়ে আসেনি। এরপর বেশ কয়েকবার হামজা ভাই বাড়ি খালি করতে বলেছিল খালাকে। তারা যায়নি, তাদের যাওয়ার জায়গা নেই। কয়েকদিন হলো খালার মেয়ে আঁখিকে পাওয়া যাচ্ছে না। লোকে বলছে এদের মধ্যেই কেউ হয়ত আঁখিকে তুলে নিয়ে গেছে। জানা নেই মেয়েটার সঙ্গে কী হয়েছে, কী হালে আছে..ʼʼ
ভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়েও বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ আন্দোলন চলছে, আওয়াজটা খুব কানে বাজছে, নিকাবের নিচে মুখটা ঘেমে উঠেছে। পানি পিপাসা বোধ করল অন্তূ। সে কি কোনো ভয়ানক পরিণতির আভাস পেল আজ! আঁখি! দেখেনি কখনও মেয়েটাকে, তবু হৃদযন্ত্রটা খুব লাফাচ্ছে! আচ্ছা! আঁখি কোথায়? পাওয়া যাচ্ছে না কেন ওকে?
—
এরপর দু’দিন আর ভার্সিটিতে যায়নি অন্তূ। তার সাহসে জুটছে না। সেদিন জয়ের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ভয় হয়নি, অথচ আজ দু’দিন বুকে ভারী শঙ্কা চেপে আছে। আঁখি মেয়েটাকে সে দেখেনি কখনও, নাম ছাড়া কিছু জানা নেই। তবুও আজ দুটো দিন ঘরে বন্দি হয়ে ওই অপরিচিতা মেয়েটার জন্য পরাণ দাপায়। নিজের পরিণতি সম্বন্ধে মাথায় চেপে বসে অকল্পিত এক ভয়!
বাড়ির দরজায় ধাক্কা পড়ল। অলস ভঙ্গিতে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো সে। মার্জিয়া ভেতরে ঢুকে হাতের ব্যাগটা ধপ করে মেঝেতে রাখল। অন্তূ বলল, “কী হয়েছে, ভাবী! ভাই আনতে যায়নি?ʼʼ
মার্জিয়া জবাব দিলো না। অন্তূ আবার বলল, “আপনি বোরকা খুলে আসুন, আমি খাবার আনছি, একসাথে খাই।ʼʼ
মার্জিয়া খ্যাকখ্যাক করে উঠল, “অ্যাই, নাটক করবা না তো, অন্তূ! সহ্য হচ্ছে না গায়ে।ʼʼ
অন্তূ স্বাভাবিকভাবে বলল, “ঠিক আছে। গায়ে একটু ঠান্ডা পানি ঢেলে আসুন। ভালো লাগবে।ʼʼ
ছ্যাঁত করে উঠল মার্জিয়া, “তোমার মতো ডাইনির মুখে এর চেয়ে ভালো পরামর্শ শোনার আশা রাখিই বা কই আমি? কথাই বলো গা জ্বালানো সব।ʼʼ
-“কী হয়েছে? ক্ষেপে আছেন কেন? কার রাগ আমার ওপর দেখাচ্ছেন?ʼʼ
-“তোমার মতো মা তা রী ননদ থাকতে রাগ আর কার ওপর হবে?ʼʼ
অন্তূর কণ্ঠস্বর দৃঢ় হয়ে উঠল, “মুখ সংযত করুন আপনার। আপনি জানেন, বেশিক্ষণ আমি আপনার অহেতুক কথাবার্তা নিতে পারব না।ʼʼ
-“কী করবা তুমি? আমার বোনের সংসার যেভাবে খাইতে লাগছো তোমরা, আমারেও তাড়াবা এইখান থেকে?ʼʼ
অন্তূ কপাল জড়িয়ে তাকাল ভাবীর দিকে, “তেমন কোনো কথা ওঠেনি, সেটা জানেন আপনিও। আপনি সাধারণ বিষয়কে নিজের ভেতরের জটিলতা দিয়ে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন।ʼʼ
রাবেয়া যোহরের নামাজে বসেছিলেন, দ্রুত সালাম ফিরিয়ে উঠে এলেন, “কী হইছে, মার্জিয়া। কীসব কথা এইসব?ʼʼ
মুখ ঝামটি মারল মার্জিয়া, “শখ আমার খুব যে, তাই।ʼʼ
অন্তূ বলল, “ভনিতা না করুন বলুন, আমি কী করেছি? আপনার শখ পরেও মেটাতে পারবেন।ʼʼ
মুখ বিকৃত করল মার্জিয়া, “জানো না তুমি, না? আমার বোনের সংসার তোমাদের জন্যে যদি ভেঙেই যায়, তখন দেখবা আমি তোমারেও এই বাড়িতে শান্তিতে থাকতে নআ দিয়ে কেমন হিরহির করে টেনে বের করে দিয়ে আসি।
রাবেয়া গর্জে উঠলেন এবার মৃদু স্বরে, “আমার মেয়েকে বের করার বা রাখার তুমি কে? আমার মেয়ের বাপ-মা মরে যায় নাই এখনও যে, তুমি আমার মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করবা! এখনও বেঁচে আছে আমার মেয়ের বাপ। কী হইছে, তা বলবা না? না তা তো জানাই নাই তোমার। এত রহস্য করা ক্যান, হ্যাঁ?ʼʼ
মার্জিয়া চিটপিট করে উঠল, বলতে পারলে তো হতোই। বলতে পারিনা তো আম্মা। আর না সইতে পারি। আমার বোনের ঘর ভাঙলে আপনার মেয়েকে দেখি এই বাড়িতে রাখে কে?ʼʼ
অন্তিক বাড়িতে ঢুকল, “কী ব্যাপার! কীসের চেঁচামেচি চলতেছে?ʼʼ
রাবেয়া বললেন, রাবেয়া গর্জে উঠলেন এবার মৃদু স্বরে, “আমার মেয়েকে বের করার বা রাখার তুমি কে? আমার মেয়ের বাপ-মা মরে যায়নি এখনও, যে তুমি আমার মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করবা! আমার মেয়েকে তাড়াবা, তার আগে আমি বের করতে পারব না তোমায়? এখনও বেঁচে আছে আমার মেয়ের বাপ।ʼʼমার্জিয়া কী কয়, কিছুই বুঝিনা। এমন অশান্তি কয়দিন দেখা যায় ক তো! কী হয়, কীসের কথা কয়, কিছুর কথাই বুঝিনা। তোর বাপের কানে গেলে ভালো হইতো বিষয়টা?ʼʼ
মার্জিয়া স্বামীর দিকে তাকাল। অন্তিক চোখ ফিরিয়ে চুপচাপ রুমে চলে যায়। বোন, স্ত্রী অথবা মা—কাউকেই একটা শব্দও বলল না।
অন্তূ ঘৃণিত চোখে চেয়ে রইল বড়ো ভাইয়ের চলে যাওয়ার পানে। একরাশ ভাঙাচোরা যন্ত্রণা আর ঘেন্না বোধহয় জড়িয়ে এলো বুকটায়। তরতরে যুবক অন্তিকের এক অ-পুরুষ হয়ে ওঠার গল্পটা অস্পষ্ট তার কাছে।
এভাবেই কতগুলো বছর কাটছে এ বাড়িতে। অন্তিক শুধু একটা দেহ মাত্র, যে গোটাটাই মানসিক অস্তিত্ব ও বিবেকবোধমুক্ত।
সে বহুদিন ভাইয়ের সাথে প্রয়োজনীয় ছাড়া অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না, হাসে না, একসাথে খায় না। এক অপরিকল্পিত অনীহা এবং বিতৃষ্ণা জেগেছে সবকিছু বুঝে নির্বিকার থাকা অন্তিকের ওপর। মার্জিয়া অকারণেই চিৎকার চেঁচামেচি করে, কেন করে, কীসব বলে, কিছুই বোধগম্য হয়না। আর না অন্তিক কিছু বলে।
শিক্ষিত, তরতরে যুবক অন্তিক। যার পড়ালেখা, সামাজিক সক্রিয়তা, মেধা, কথাবার্তা, হাসি—একসময় সমাজে আলোচিত বিষয় ছিল। আমজাদ মাস্টারের যোগ্য ছেলে থেকে অযোগ্য বিবেকহীন মূর্খ কাপুরুষের জন্মটা কবে যেন! গোটাটাই রহস্য, ঠিক তেমনই মার্জিয়ার আচরণও!
সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, একটু আগে যে অল্প খিদে পেয়েছিল, তা এখন আর অনুভব হচ্ছে না অন্তূর। আস্তে করে নিজের ঘরে চলে গেল। পেছনে রাবেয়া বেগমের ফুঁপানোর আওয়াজ পেল, ফিরে তাকাল না। অবলা মা তার, আব্বু বাসায় নেই।
কুড়িগ্রাম গেছেন। আজ ফেরার কথা ছিল, হয়ত ফিরবেন না। অন্তূ পড়ার টেবিলে বসল। অথচ মাথায় আব্বু আর অন্তিকের কথা ঘুরছিল। বই বন্ধ করে টেবিলে মাথা এলিয়ে দিলো। অস্থির লাগছে ভেতরটায়।
চলবে…
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৩.
লোকে বলে অন্তিক অন্তূর চেয়েও সুন্দর, যুবক হিসেবে। ভীষণ মেধাবি ছিল কলেজ জীবনে। আমজাদ সাহেবের সাথে বাবা-ছেলের সম্পর্ক চমৎকার সুন্দর ছিল। রাবেয়া বেগম বরাবরই সরলা ও অল্প শিক্ষিতা এক বাঙালি সংসারী নারী।
উনার বিপরীতেই আমজাদ সাহেবের গুণগুলোতেই দুটো সন্তান গড়ে উঠেছিল। অন্তূ তখনও ছোট, যখন অন্তিক কৈশোর পেরিয়ে যুবক হচ্ছিল। খুনশুটি, মারামারি, ঝামেলার শেষে আবারও বেহায়ার মতো গিয়ে অন্তূর ঝুঁটি টানার মতো দুষ্টুমির জন্য আমজাদ সাহেবের কাছে শাস্তি কম পেতে হয়নি তাকে।
ভীষণ ডানপিটে আর চঞ্চল, আর সবচেয়ে বেশি জেদি ছিল অন্তিক। তার প্রবল আত্মসম্মানবোধের জন্য মাঝেমধ্যেই এখানে-ওখানে ঝামেলা বাঁধিয়ে এসে মার খেত আব্বুর হাতে।
কলেজ শেষ করে ভার্সিটি ভর্তি হবার পালা এলে অন্তিকের সুযোগ হলো কুষ্টিয়ার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। বাড়ি ছাড়তে হলো শিক্ষার সুবাদে। এরপর যা অঘটন ঘটে গেল।
মার্জিয়া কুষ্টিয়ার মেয়ে। তাকে ভাগিয়ে নিয়ে চলে এসেছিল অন্তিক। তখন সে থার্ড ইয়ারের ছাত্র, বেকার শিক্ষার্থী।
সেই নিয়ে মাস্টারমশাই আমজাদ সাহেবের নামও খারাপ হয়েছিল বিশেষ। আমজাদ সাহেব হাই স্কুলের এক সামান্য শিক্ষক। উনার আদর্শের চূড়াকে মাটিতে মিশিয়ে যে কাজটা অন্তিক করেছিল, তাতে সবচেয়ে ক্ষতি সে নিজের এবং সবচেয়ে বড় কষ্টটা আব্বুকে দিয়েছিল। অথচ এটা বুঝে অনুতপ্ত ও ব্যথিত হবার বদলে সে বিগড়ে গেল।
দুটো থাপ্পর মেরেছিলেন আমজাদ সাহেব ছেলের গালে। কয়েকটা কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে অন্তিকের আত্মসম্মানে লাগা কথাটা ছিল, “বউ তো নিয়ি এসেছিস, খাওয়ানোর মুরোদ আছে?ʼʼ
আর বিশেষ কিছু বলেননি। এরপর থেকে অন্তিক বদলেছে, মার্জিয়া নিজেকে প্রকাশ করেছে। শিক্ষিত মেয়ে হওয়া সত্বেও আচরণ খুব উগ্র তার। অন্তূ বলেছিল, “ভাইয়া, তুই যে আত্মসম্মানের বড়াই এখনও করছিস, তা কিন্তু খুঁইয়েই তোর মতো মেধাবি এক ছাত্র প্রেমের মতো ছোট কাজ করেছে, আর তা করেছিস ভালো, এই ভরা ক্যারিয়ারকে গাঙে ভাসিয়ে বাপ-মায়ের মন ভেঙে বউ ঘরে আনাটা কোনো আত্মসম্মানবোধ জ্ঞানের পরিচয় ছিল না।ʼʼ
ব্যাস, আর না প্রাণের আব্বু না অন্তূ। কারও সঙ্গে কথা নেই। কী করছে, কী হচ্ছে সবটাতে নির্লিপ্ত, নিঃশব্দ। অথচ মার্জিয়ার উগ্রতা ও খিটখিটে মেজাজ দিনদিন লাই পাচ্ছে।
অন্তূদের এলাকায় একবার ব্রাক ব্রাঞ্চ পরিচালিত গণশিক্ষার কার্যক্রম এসেছিল। সেখানে বয়স্কদের শিক্ষা দেয়া হয়। সে তখন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে দিনাজপুরেই টুকটাক কোচিং করছে। শখের বিষয়, বড়ো নিরক্ষর মানুষদের শিক্ষা দেয়া। সেও শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেছিল সেখানে। সেখানেই পরিচয় হয়েছিল তাসিনের সাথে ওর। তাসিন ওর প্রেমে পড়ল। বাড়ির লোকদের সাথে, বিশেষ করে রাবেয়ার সাথে খুব সখ্যতা গড়ে উঠেছিল তার। রাবেয়া মানুষটা যুবকদের সাথে খুব তাড়াতাড়ি মিশে যান। ভোলাভালা, সরল নারী যাকে বলে। এক পর্যায়ে তাসিন যখন প্রস্তাব দিলো বিয়ের, সাফ মানা করেছিল অন্তূ। সে বিয়ে করবেনা, এমনকি সে কখনও তাসিনকে প্রমিকের মতো নজরে দেখেনি। তাসিন নিজে থেকেই উতলা হয়ে পড়েছিল। এরপর কিছুদিন কেটে গেল। তাসিন হাল ছাড়ল, মার্জিয়া নিজের বোন বীথির সাথে তাসিনের বিয়ে দিলো। অথচ এখন কেন তাদের সংসারে অশান্তি তা জানার কথা নয় অন্তূর। তাসিনের সাথে কোনোকালেই তার বিশেষ যোগাযোগ ছিল না।
অন্তূর ধারণা, বীথির সংসারে কোনো ঝামেলা চলছে।আর এটাকেই কেন্দ্র করে মার্জিয়া ভাবছে, পুরোনো এই ব্যাপারটার জের ধরে তাসিন বীথিকে অত্যাচার করছে।
ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেইটের কাছে যেতেই আব্বুর সাথে দেখা হলো। সারারাতের যাত্রায় সকালে বাড়ি ফিরলেন আমজাদ সাহেব।
অন্তূর চোখে-মুখ খেলনা পাওয়া বাচ্চার মতো উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, “এই অসময়ে ফিরলে যে!ʼʼ
-“কাজ শেষ হয়ে গেল, ফিরে এলাম। অন্তূ, খেয়ে বের হচ্ছিস নাকি না খেয়ে?ʼʼ
অন্তূ চোরের মতো মাথা নোয়ায়। আমজাদ সাহেব ধমকে ওঠার আগেই অন্তূ বলল, “আব্বু! তোমার গ্রামের জমি বিক্রি করার এমন কী বিশেষ দরকার পড়ল, বলোনি কিন্তু এখনও আমায়!ʼʼ
গম্ভীর মুখে বললেন আমজাদ সাহেব, “সব কথাই শুনতে হবে কেন? পড়ালেখায় মনোযোগ নষ্ট হবে এসব সাংসারিক বিষয় মাথায় আনলে, মন দিয়ে পড়।ʼʼ
অন্তূ অসন্তুষ্ট চিত্তে তাকায় আব্বুর দিকে। তিনি বললেন, “ভাড়া আছে কাছে?ʼʼ
অন্তূ মাথা নাড়ল, “আছে।ʼʼ
আমজাদ সাহেব শার্টের বুকপকেট থেকে পঞ্চাশ টাকা বের করে অন্তূর হাতে দিলেন, “সাবধানে যাবি। ক্লাসশেষে দেরি করবি না, তাড়াতাড়ি ফিরে আসবি।ʼʼ
অন্তূ একটু সপ্রতিভ হলো, “এ কথা বলছ কেন, আব্বু?ʼʼ
-“ক্লাস শেষে কোথাও কাজ আছে কোনো?ʼʼ
-“না, নেই।ʼʼ
-“তাহলে আর দেরি করার কী আছে? এমনিতেও ভার্সিটি চত্বর আজকাল ভালো চলছে না।ʼʼ
রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে অন্তূ এগিয়ে গেল গেইট দিয়ে। অন্যরকম লাগছে কিছু একটা। জটলা পাকানো লোকজন ক্যাম্পাসে! একস্থানে চেয়ার, ও বেঞ্চি পাতা। জয় বসে আছে পায়ে পা তুলে। পাশেই হামজা। দুজনের পরনেই সাদা পাঞ্জাবী। বসে বসে ঠ্যাং দুলাচ্ছে দুজন।
নভেম্বরের মাঝের সময়টা। শাল জড়ানো গায়ে। দুজনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ছাত্র সংগঠনের ছেলেরা। মহান দুই ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে ব্যাপক ধন্য তারা। হামজা স্বভাবসুলভ গম্ভীর মুখে বসে আছে। জয় এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। স্থির থাকার স্বভাব নেই।
শঙ্কিত বুক নিয়ে ভিড় ঠেলেঠুলে একটু ভেতরে ঢুকল অন্তূ। জীর্ণ একটা ময়লা কাপড়ে ঢাকা কোনো মেয়ের শোয়ানো দেহ মাঠের ঘাসের ওপর পড়ে আছে। সেই মুহুর্তে কারও ধাক্কায় একটু পিছিয়ে এলো অন্তূ।
মেয়েটা কি আঁখি!? বুকের রক্ত ছলকে উঠল অন্তূর!
সালমা খালার মেয়েটা এত্ত সুন্দর! অভিশাপে ঝরে পড়া চাঁদের টুকরো বুঝি! ঘন চোখের পাপড়ি যেন এখনই ঝাপটে উঠবে! সেই সুন্দর মুখখানা বিবর্ণ, খামছির দাগে ভরতি, ঠোঁটের কোণে রক্ত জমাট বেধে শক্ত হয়ে গেছে, কালশিটে রং ধারণ করেছে। গাছি গাছি চুল ছিড়ে উঠিয়ে ফেলা হয়েছে! বাকি দেহটা এক টুকরো কাপড়ে ঢাকা। সেই কাপড়টুকুর নিচে এতোগুলো মানুষের ভিড়ে কোনো এক মেয়ের নগ্ন দেহ পড়ে আছে। অন্তূর মনে হলো, সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে, যার ফলে শরীরটা ভার ছেড়ে দিতে চাইছে।
তখন কেউ ধমকে উঠল অন্তূকে, “পিছনে সরে দাঁড়ান, এত কাছে এসে দাঁড়াবেন না। সরুন, পিছিয়ে যান।ʼʼ
স্পষ্ট, বিন্যস্ত ভাষা, ভরাট আদেশমূলক কণ্ঠস্বর। কালচে খয়েরী ইন-শার্টে একটা ফর্সা মতো পুরুষ! অন্তূকে উপেক্ষা করে হাতা গোটাতে গোটাতে গিয়ে লাশের মাথার কাছে বসল। ইন্সপেক্টর রশিদ ডাকল তাকে, “মুস্তাকিন! আপনার ফোন বাজছে।ʼʼ
মুস্তাকিন ভিক্টিমের দেহ থেকে চোখ না তুলেই বলল, “পরে এটেন্ড করছি, রেখে দিন।ʼʼ
অন্তূ ভিড় ছেড়ে বেরিয়ে এলো। আব্বু রোজ পত্রিকা পড়ে রেখে দেয়, সেখানে এমন ঘটনাগুলো চোখে পড়ে। আজ সেই পত্রিকা ভেদ করে প্রথমবার কোনো খুবলে খাওয়া মেয়ের মরদেহ সম্মুখে এসে পড়েছে! এগুলো আসলেই হয়!
অন্তূ কাঁদে না। আমজাদ সাহেব কাঁদতে শেখাননি। কিন্তু আজ সেইসব শিক্ষা কাজে লাগল না। অন্তূ নেকাবের নিচ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়াচ্ছে। আরেকটু দূরে এসে মুখের নেকাবটা খুলে ফেলল। ব্যাগের সাইড থেকে পানির বোতল বের করে পানির ছিটা দিলো মুখে-চোখে। টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছে, দুটো শ্বাস নিলো জোরে জোরে।
ধমকাল নিজেকে, আশ্চর্য! এতো ভঙ্গুর হয়ে পড়ছ কেন তুমি, অন্তূ? তুমি তো এমন নও!
কোথা থেকে যেন সালমা খালা বুক চাপড়ে আহাজারি করতে করতে ছুটে এসে ধপ করে বসে পড়লেন মেয়ের লাশের পাশে মাটিতে। অন্তূর চোখ বোধহয় আবার ভরে উঠেছে। নিজের ওপর রেগে উঠল অন্তূ! কী মুসিবত! এভাবে ভেঙে পড়লে জীবনকে মোকাবেলা করবে কী করে? কীসের মোকাবেলা? ওই তো একটা মেয়ের ছিন্নভিন্ন লাশ পড়ে আছে মাঠের ওপর। অন্তূও তো মেয়ে! জঙ্গলের জানোয়ারেরা কবে যে মানুষের মতো রূপ ধরে মানুষের সমাজে বাস করতে লেগে পড়েছে, তাদের মোকাবেলা করতে ভঙ্গুর হলে চলবে কেন?
সামলা খালাকে সামলাতে যে নারীটি ছুটে এলো, অন্তূর চোখ আটকালো তার ওপর। পরনে বিবর্ণ শাড়ি, মুখটাও মলিন। অথচ সেই মুখের সৌন্দর্য অসামান্য! এদের চেহারার আভিজাত্য মিলছে না পরিস্থিতির সঙ্গে।
কে করেছে এসব? জয়, হামজা? তাদের কথাই প্রথমে মাথায় এলো অন্তূর। কিন্তু তা উচিত নয়। অন্তূ টের পেল, এমনটা হবার একটা কারণ আছে—সে আজ ক’দিন যাবৎ ওই দুটো নামে আতঙ্কিত বলেই এমন হয়েছে।
শাড়ি পরা নারীটি চাঁদনী। আঁখির ভাবী। মুস্তাকিন তাকে বলল, “আপনারা ওনাকে ভিক্টিমের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যান। আমাদের কাজ করতে দিন, এই স্পটে আপনারা না ঢুকলে সুবিধা হয়।ʼʼ
চাঁদনীর চোখে কেমন অদ্ভুত রহস্য! যেই রহস্যটাও এক প্রকার রহস্য যেন! সে কাঁদছে না, একটুও না। অথচ অপলক চেয়ে আছে নিথর চোখে আঁখির মুখের দিকে। সেই চোখের ভাষা অবর্ণনীয়।
অন্তূর মনে হলো, মুস্তাকিন লোকটা কসাই টাইপের। এমনিতেও সরকারী কর্মকর্তারা তা-ই হয়। মুস্তাকিন একটু আঁখির ভাই সোহেলকে ডাকল। সোহেল একদৃষ্টে বোনের লা শে র দিকে চেয়ে আছে, তার চোখে পানি নেই। সেও শুধু তাকিয়ে আছে। মুস্তাকিনের ডাকে এগিয়ে গেল। মুস্তাকিন কোনোরকম শিরোনাম ছাড়া প্রশ্ন করল, “কবে ফিরেছেন দেশে?ʼʼ
সোহেল আনমনে ছিল, একটু ঝারা মারল যেন নিজেকে, “হ্যাঁ! এইতো চারদিন হলো।ʼʼ
-“কোন দেশে থাকতেন?ʼʼ
-“দুবাই।ʼʼ
-“কী কাজ করতেন সেখানে?ʼʼ
-“রাজমিস্ত্রি আর সাটারিংয়ের কাজ করতাম।ʼʼ
-“আঁখিকে লাস্ট কবে দেখা গেছিল বাড়িতে?ʼʼ
খানিকক্ষণ চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “চাদনী বলে, সপ্তাহখানেক আগে।ʼʼ
-“নিজেদের সামলান। এবং আমাদের সাহায্য করুন তদন্তের কাজে। এভাবে কান্নাকাটি করে কোনোরকম বিচার পাবেন বলে মনে হয়। শক্ত করুন নিজেদের।ʼʼ
এক প্রকার ভয় খেলে গেল সোহেলের চেহারায়, “না স্যার! কোনো বিচার লাগবে না তো। আমরা কোনো বিচার চাইনা, আপনে খালি আমার বোনের লাশ দেন, বাড়ি নিয়ে যাই। কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ নাই আমাদের।ʼʼ
মুস্তাকিন ঠোঁটে ঠোঁট গুজে নিচে তাকাল, “কেউ হুমকি দিয়েছে আপনাদের?ʼʼ
সোহেল মাথা নাড়ল, “না, না হুমকি দিবে কে?ʼʼ
তাদের কথোপকথন ছাত্র-ছাত্রীরা শুনছিল।
মুস্তাকিন দূর থেকে জয় ও হামজার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাউকে সন্দেহ করছেন?ʼʼ
সোহেল আবারও দ্রুত মাথা নাড়ল, “না।ʼʼ কণ্ঠস্বরে প্রাণ নেই, নিষ্প্রভ গলার স্বর।
মুস্তাকিন বামহাত পকেটে গুজে বলল, “এসে থেকে শুনছি, সকলের ধারণা কাজটা পাটোয়ারী পরিবারের দুই ছেলে করেছে! আপনাদের কী ধারণা?ʼʼ
সোহেল দ্রুত জবাব দিলো, “না না, স্যার! উনারা ক্যান করবেন এইসব? উনারা তো সব ঠিক করে দিতে চাইছিলেন! আমরাই উঠি নাই বাড়ি থেকে। এখন চলে যাব, ঝামেলা মিটে যাবে।ʼʼ
অগোছালো, অযাচিত কথা সোহেলের। বোনের মরদেহ পড়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। তারা বাড়ি খালি করার স্বীকারক্তি দিচ্ছে! চরম ঘাপলা বিষয়টায়! আবার সহজও বলা চলে। খুব বেশিই ভয় পেয়েছে হয়ত, অথবা কিছু লুকোনোর চেষ্টা, গা বাঁচানোর চেষ্টা!
মেয়েটা গণধর্ষণের শিকার। এবং ধর্ষণটা অপ্রকৃতিতস্থ কারও দ্বারা সংঘটিত হয়েছে! আঁখির দেহ তা-ই বলছে।
মুস্তাকিন গিয়ে হাঁটু ভাজ করে উবু হয়ে বসল চাঁদনীর পাশে। জিজ্ঞেস করল, “আঁখি কবে থেকে নিখোঁজ ছিল?ʼʼ
চাঁদনী ঘর্মাক্ত মুখটা মুছল মলিন শাড়ির আচল দিয়ে, “সপ্তাহখানেক আগে দুপুরে স্কুল থেকে বাড়ি আসছে, টেস্ট পরীক্ষা চলতেছিল এসএসসির, বিকালে বাইর হয়ে গেল কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য, এই তো ফিরে আসছে, স্যার!ʼʼ
অন্তূর কলিজায় মনে হলো সজোরে এসে একটা তীর তীব্র বেগে গেঁথে গেল। ‘এই তো ফিরে আসছে, স্যার!ʼ
মুস্তাকিন উঠে দাঁড়িয়ে রশিদকে ডাকল, “এদিকে আসুন!ʼʼ
-“জি, স্যার!ʼʼ রশিদ এগিয়ে এলো।
মুস্তাকিন তার হাত থেকে ফোনটা নিতে নিতে বলল, “যত দ্রুত সম্ভব তদন্তের কাজ শুরু করুন। বডিটাকে ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন, এজ সুন এজ পসিবল!ʼʼ
রশিদ মাথা নাড়ল, আবার বলল, “কিন্তু স্যার! গার্জিয়ানরা তো লাশ বাড়ি নিতে চাচ্ছে। খুব জিদ ধরে আছে। কোনোভাবেই তারা লা শ কাটাছেঁড়া করতে দেয়া রাজী না। আপনি একটু কথা বলুন ওদের সঙ্গে।ʼʼ
মুস্তাকিন মাথা নাড়ল, “আচ্ছা, কথা বলছি। দ্রুত করুন। ক্যাম্পাসে লোক জড়ো হচ্ছে, একাট হাঙ্গামা হবার চান্স আছে। তার আগেই বডি ট্রান্সফার করুন মর্গে। কখন কে জানে জনতার মাঝে বিক্ষোভ জেগে ওঠে!ʼʼ
প্রফেসর এগিয়ে এলেন মুস্তাকিনের দিকে। হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন মুস্তাকিনের সঙ্গে, “আমি প্রিন্সিপাল ইউসুফ সিরাজীʼʼ
মুস্তাকিন মাথা নাড়ল সামান্য, “সৈয়দ মুস্তাকিন মহান। ইনভেস্টিগেটর— পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ডিপার্টমেন্ট।ʼʼ
প্রফেসর রশিদের সঙ্গে হাত মেলালেন। রশিদ নিজের পরিচয় দিলো, “রশিদ আলম। ইন্সপেক্টর অব থানা পুলিশ।ʼʼ
প্রফেসর দুঃখ প্রকাশ করলেন, “কী যে হচ্ছে ভার্সিটিতে আজকাল! ছেলেমেয়েরা আতঙ্কিত, কারা এসব করেছে কে জানে..ʼʼ
মুস্তাকিন কথার মাঝখানেই ফোন কানে ধরে অন্যদিকে চলে গেল। রশিদ প্রফেসর কথায় অনিচ্ছাকৃত ‘হুʼ, ‘হ্যাঁʼ ঘাঁড় নাড়াতে থাকল।
মুস্তাকিনকে দেখে হামজা উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল। জয় কোনোমতো ফোন থেকে মাথা তুলল, “গুড জব, অফিসার!ʼʼ
মুস্তাকিন সামান্য হাসল অদ্ভুত ভঙ্গিতে, “থ্যাংক ইউ!ʼʼ এরপর হুট করেই বলল, “লোকে আপনাদের দিকে আঙুল তুলছে, আপনাদের কী খেয়াল!ʼʼ
হামজা হাসল, “আপনি তুলছেন না আঙুল?ʼʼ
-“আমি আম জনতার থেকে খানিক আলাদা, বলা চলে নিজের পেশার খাতিরেই! প্রমাণ ছাড়া আঙুল তুললে চাকরি থাকবে না।ʼʼ চোখ মারল হামজাকে মুস্তাকিন।
হামজা ছেলেদের চলে যেতে ইশারা করে। সালমা কাঁদছেন, জোরে জোরে কাঁদছেন বুক চাপড়ে, লোকের চাপা গুঞ্জন, আর পরিবেশে অভিশাপের কালশিটে ধোঁয়া ছড়িয়েছে যেন।
জয় জবাব দিলো মুস্তাকিনের, “আপনার চাকরি ধরেন আমি রক্ষা করব, তাইলে আঙুল তুলে জেলে ভরবেন তো?ʼʼ
মুস্তাকিন বসল দুজনের সামনে একটা চেয়ারে। সূর্যের তেজ ও আলো কমে উত্তরে হাওয়া এসে গায়ে লাগছে। কাধে ঝুলিয়ে রাখা ডেনিম জ্যাকেটটা গায়ে চড়িয়ে বলল, “আপনার শখ অথবা শাস্তি সহ্য করার কনফিডেন্স– কোনটা ধরব?ʼʼ
হামজা প্রসঙ্গ বদলালো, “কিছু জিজ্ঞেস করতে চান, অফিসার?ʼʼ
প্রফেসর সিরাজী এসে দাঁড়ালেন পাশে। মুস্তাকিন এবার সরাসরি কথায় এলো, “আপনারা আমাদের ডেকেছেন সকাল আটটার দিকে। তাহলে এখানে লাশ ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল ঠিক কখন, সে ব্যাপারে কোনো ধারণা আছে?ʼʼ
হামজা মাথা নাড়ল, “তা জানে না কেউ-ই। আমাকে কল করা হয়েছে, তখনও আমি ঘুমে ছিলাম। ছেলেরা কল করে জানালো।ʼʼ
জয়ের দিকে ফিরল মুস্তাকিন। জয় মাথা ঝাঁকালো, “ভাই আমারে জাগায়ে নিয়ে আসছে। আমি ঘুমাচ্ছিলাম।ʼʼ
মুস্তাকিন জিজ্ঞেস করল, “আপনারা একসঙ্গে থাকেন?ʼʼ
জয় মাথা নাড়ল, “উহু! এক বাড়িতে। এক ঘরে থাকতাম, লোক বদনাম করবে জন্য থাকা হয় না। বদনাম তো আর কম নাই এমনিতেইʼʼ
হেসে ফেলল মুস্তাকিন। পরে নিজেকে সামলে বলল, “লাশ এক্সাক্টলি কোথায় ফেলা হয়েছিল সেই জায়গাটি দেখান আমাদের। সেটা তো দেখেছেন?ʼʼ
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন প্রাঙ্গনের পেছন দিকটা নির্জন, এবং গাছগাছালিতে ছাওয়া। সেখানে সচরাচর লোকের যাতায়াত অতটাও নেই। দিনের বেলা ছেলে-মেয়েরা আড্ডা দিতে নির্জন জায়গাটি বেছে নেয়। রাতে একদম সুনশান। ক্যাম্পাসের অফ-সাইড বলা চলে। সর্ব প্রথম লাশ দেখেছে ঝাড়ুদার। সে প্রথমে বুঝতে পেরেছিল না, ওটা লা শ। কোনোমতো ওড়নাটা জড়ানো ছিল লাশের দেহে। পরে কে বা কারা যেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এনেছে। এটা সকালে এসে থানা পুলিশের কাছ থেকেই শুনেছে সে।
মুস্তাকিন দেখল পুরো আশপাশটা। জয়কে বলল, “আপনার চোখে প্রচুর ঘুম, দেখছি! লালচে হয়ে আছে, রাতে ঘুমাননি মনে হচ্ছে! এখন একটু বিশ্রাম প্রয়োজন!ʼʼ
মুস্তাকিন কথাটা দ্বারা কিছু নির্দেশ করল। জয় চাদরটা গা থেকে খুলে গলায় পেঁচালো ওড়নার মতো করে। হেসে বলল,, “রাতে ঘুমানোর অভ্যাস এমনিতেও নাই আমার, ঘুম আসলে সকালে হয়নি বললে ঠিক হইতো আমার জন্য! সকালে টেনে তুলে আনা হইছে। আসলে আমাদের মতো নেতাকর্মীদের দুঃখ আর পরিশ্রম আপনারা কোনোদিন বুঝবেন না। জনতার মন রাখতে কত যে লোক দেখানো ঢং করতে হয়! যেমন ধরেন, আমার আসতে ইচ্ছে করতেছিল না, কষ্ট হচ্ছেনা বিশেষ মেয়েটা বা তার পরিবারের জন্য। তবুও আসতে হলো, ইভেন ধর্না ধরে বসে থাকতে হচ্ছে হুদাই এইখানে নিরস মুখে। কার বাল লাড়তেছি বসে? মানুষ তো মরবেই, এই অবধারিত বিষয়ে এইসব ঢং কি মনে-ধোনে কোথাও সয়? তবু সওয়া লাগে, কারণ, তথাকথিত সমাজসেবক আমি। ফাক অফ দিজ ইনট্রোডাকশন!ʼʼ
-“আপনি মানছেন আপনি তথাকথিত সমাজসেবক?ʼʼ
জয় চাদরটা গলা থেকে হাতে কব্জিতে জড়াতে জড়াতে বলল, “না মানার কী আছে? আমি ভালো না, তা লোক জানে, আর তা কি আমি জানার আগেই? আমি জানছি, এরপর লোকরে জানাইছি, তখন নৃ লোক জানছে।ʼʼ
মুস্তাকিন কিছুক্ষণ চুপচাপ চেয়ে থেকে জয়কে জিজ্ঞেস করে মুস্তাকিন, “তাহলে আপনাকে সন্দেহের তালিকায় রাখব?ʼʼ
-“উহু! এই কেইসে সাসপেক্ট হিসেবে থাকতে থাকতে উল্টাপাল্টা কিছু প্রমাণ হয়ে গেলে, ফাঁসি হয়ে যাবে, যেহেতু মেয়েটা মরে গেছে। এতো তাড়াতাড়ি মরে কী লাভ? মরব এইরকম কোনো কেইসের দায়েই, তবে একটু বয়সকালে। এখনও বিয়েশাদীই করি নাই, বিশেষত বাসরটা…. এখন মরাটা ঠিক না। এটা থেকে বাদ রাখেন আমায়।ʼʼ
মুস্তাকিন হামজাকে বলল, “কাউন্সিলর সাহেবকে একবার থানায় আসতে বলবেন বিকেলে। আপনি আসলেও পারেন।ʼʼ
হামজা পাঞ্জাবীর হাতার বোতাম খুলে তা কনুইয়ে গোটাতে গোটাতে বলল, “আমি আসতে পারব না, আব্বা যাবে। আমার ব্যস্ত সময় কাটছে— নির্বাচন এগিয়ে আসছে সামনে।ʼʼ
মুস্তাকিন হাঁটতে হাঁটতে আবার পেছন ফিরে দেখল হামজাকে। পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে চেয়ারটায়। মুখে চাপ-দাড়ি, পুরু ঠোঁটের ওপর ঘন গোফ, গায়ে জড়ানো চাদরের প্রান্ত ঝুলছে একপাশে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছে জয়।
জয় তাকিয়ে আছে একটা বোরকা পরা মেয়ের দিকে। মেয়েটির সাথে মুস্তাকিন ধাক্কা খেয়েছিল। মেয়েটা অপলক চেয়ে আছে আঁখির লা”শের দিকে।
লা”শকে ফ্রিজিং গাড়িতে তোলার ব্যবস্থা চলছে, মর্গ থেকে লোক এসেছে।
চলবে…
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৪.
ঢাকাতে আঁখির লাশ পাঠানো হলো ফরেন্সিক টেস্টের জন্য। তা মুস্তাকিন চেয়েছিল না। সে দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেলে পাঠাতে চাইছিল। ব্যবস্থাও করেছিল। সিনিয়র ইনচার্জ রাজী হননি।
আঁখির মা হাত মুস্তাকিনের হাত ধরে কান্নাকাটি করেছিলেন, “আমার মেয়েটার শরীলটারে আর কোনো শুয়োরের হাতে দিসনা, বাপ! আমারে মা মনে কইরা, আমার কথা রাখ! আমার বিচার লাগবো না। আমার আঁখির দেহডারে দে, বাড়ি নিয়া যাই!ʼʼ
এ কথা ফেলার মতো নয়। অথচ উপরমহল হুট করে সিদ্ধান্ত বদলেছে। এসব নতুন নয় এই লাইনে, তবে এর শেষ অবধি যেতে হলে তাকে সজাগ থাকতে হবে প্রতি পদে।
রাত আটটায় ডিআইজি স্যারের সাথে কথা বলে কার্যালয় থেকে বের হলো। টিমের সকলেরই খুব খাটুনি হবে এই মামলায়। এখানে কোথাও না কোথাও অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক বিষয়াদী আর সমাজের উচু পর্যায়ের পদ্ধতিগত বলপ্রয়োগ! যার ঘাপলা খুলতে বেশ বেগ পেতে হবে তাদের।
রাস্তা পার হবার জন্য দাঁড়াল। ফোন বাজছে। ফোন জিনিসটা নেহাত বিরক্তিকর, বিশেষ করে যখন রিং হয়।
মায়ের কল! এখন পুরো দিনের ফিরিস্তি চাইবে। খাওয়া, গোসল, শরীরের যত্ন, বাড়ি ফেরার তারিখ! কল রিসিভ করল না। ক্লান্ত শরীর, ফ্লাটে ফিরে গোসল দিয়ে এরপর নিজেই একবার কল করে নেবে।
বিকেলে থানায় কাউন্সিলর হুমায়ুন পাটোয়ারী এসেছিলেন। মুস্তাকিন গিয়েছিল সেখানে। সে প্রশ্ন করল হুমায়ুন সাহেবকে, “আপনি ভিক্টিমের পরিবারকে জায়গা থেকে উচ্ছেদ করতে চাইলেন, এরপর তারা গেল না, তার মেয়ের সঙ্গে এমন কিছু ঘটল। সন্দেহ যদি আপনার ওপর যায়, তা নিয়ে বক্তব্য কী আপনার?ʼʼ
হুমায়ুন পাটোয়ারী হাস্যজ্জল কণ্ঠে জবাব দিয়েছেন, “উচ্ছেদ করা কোনো কঠিন কাজ না, মুস্তাকিন। আর এমনও নয় তা আমি পারতাম না। তাই এরকম একটা সহজ ব্যাপারে তার সঙ্গে এমন খারাপ কিছু করার প্রশ্নও ওঠে না। তারা সময় চাইছে, আমি দিছি। না উঠলে উঠায়ে দিতাম, যেহেতু এইটা আমার কাজ। কিন্তু তাই বলে এমন কিছু..ʼʼ
মুস্তাকিন ঠোঁট উল্টে ধীরে ঘাঁড় ঝাঁকাল, “আপনার প্রতিপক্ষ দল কে?ʼʼ
হুমায়ুন পাটোয়ারী পান খাওয়া দাঁত বের করে চমৎকার হাসলেন, “সহজ হিসাব। আগের বার যে মেম্বার ছিল এই এলাকার সে, আর এইবার যেহেতু আমি বা হামজা মেয়র পদপ্রার্থী হয়ে নির্বাচনে দাঁড়াব, তাইলে বর্তমান মেয়র সাহেবও বলা চলে আমার বিরোধী। সে কিন্তু আবার আমার বেয়াইয়ের ভাই লাগে!ʼʼ
মুস্তাকিন আসলে বুঝতে পারছে না, এই কথার ওপর ভিত্তি করে তার এই দুটো লোককে সন্দেহের তালিকায় রাখা উচিত কি-না! হুমায়ুন পাটোয়ারী যা বোঝাতে চেয়েছে তা হলো, তারা হুমায়ুন পাটোয়ারীকে বদনাম করার জন্য আঁখির সাথে এই বিভৎস খেলায় মত্ত হতে পারে। আর কি কোনো সাসপেক্ট থাকতে পারেনা এই খু নের দায়ে! আঁখির পরিবারের সাথে একটা বিশদ আলোচনা দরকার। হতে পারে আরও কেউ কোনো সাহায্য করতে পারবে। কোমড় বেঁধে নামতে হবে। তার আগে ল্যাবটেস্টের রিপোর্ট চাই।
আরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে তথ্য প্রয়োজন, যেটা ফরেন্সিক টেস্টের পর আসবে। দু’বার দুপাশে মাথাটা ঝাঁকি দিলো। গাড়ি চালাচ্ছে সহকারী মাহমুদ। হোটেল দেখে তাকে বলল, “গাড়ি থামান।ʼʼ
মাহমুদ গাড়ি থামাল। মুস্তাকিন নেমে গিয়ে হালকা পাতলা কিছু খাবার কিনে নিলো। ফ্লাটে রান্না করার চাচিটা দু’দিন হলো আসে না। এখন মুস্তাকিনের রান্না করার এনার্জি নেই।
এপার্টমেন্টের গেইটে দেলোয়ার বলল, “স্যার, তোমার তো চিঠি আইছে গো।ʼʼ
দেলোয়ারের দুষ্টু হাসছে। মুস্তাকিনও হেসে ফেলল, “চিঠি শুধু প্রেমিকার কাছ থেকে আসে না। আজকাল আর প্রেম চিঠিতে হয় না। উন্নত দুনিয়ার প্রেম হয় উন্নত উপায়ে, উন্নত ডিভাইসের মাধ্যমে হয়। হতে পারে দেখ, এটা আমার মৃত্যুর পরওয়ানা পাঠিয়েছে কোনো এক শুভাকাঙ্ক্ষী ভালোবেসে!ʼʼ
দেলোয়ার দাঁত বের করে হাসল, “তোমারে আর কেডা মারার সাহস করবো? যত বড়ো একখান পিস্তল প্যান্টের ভিত্রে নিয়া ঘোরো!ʼʼ
-“প্যান্টের ভেতরে পিস্তল? তাও আবার ওত বড়ো? তুই রাইফেল আর পিস্তলকে গুলিয়ে ফেলছিস মনে হচ্ছে! আর প্যান্টের ভেতরে পিস্তল রাখে কেমনে? কোথায় রাখে?ʼʼ
মুস্তাকিনের বলার ভঙ্গি দেখে হো হো করে হেসে উঠল এবার দেলোয়ার।
মুস্তাকিন ঢুকে গেল ফ্লাটে। দরজা লাগিয়ে খাবার টেবিলের ওপর রেখে, চিঠি নিয়ে বসল। চিঠিটা রেখে দিলো পরিত্যক্ত হালে। বিশেষ আগ্রহ আসছে না তা নিয়ে। সে জানে কার চিঠি। ফ্রেস হয়ে এসে খোলার কথা ভেবে আবার কী মনে করে দায়সারা হাতে চিঠিটা খুলল। বেনামী চিঠি —
‘কী জানি পরিচয় দাও তুমি নিজের? ও হ্যাঁ!
সৈয়দ মুস্তাকিন মহান, ইনভেস্টিগেটর অব পিবিআই ডিপার্টমেন্ট, না ?
কেইস থেকে সরে যাও, অফিসার! তুমিও ভালো থাকো, আর আমরাও! নয়ত তোমার এক পিস্তল কতক্ষণ কতভাবে রক্ষা করতে পারবে তোমার জান? যা করতেছ, তা জানের সওদা। হাতে তো পড়বাই। আর যদি সেরকম ইচ্ছা থাকে, তাইলে তোমার রুহুর জন্য মঙ্গল আর মরার পরে বেহশত কামনা করি।ʼ
মুস্তাকিন চিরকুটটা হাতে মুড়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলল। শার্ট খুলে সোফাতে ছুঁড়ল। আরও মাথায় চেপে বসাচ্ছে এরা কেইসটা। এতক্ষণ তাও ঘুম ঘুম পাচ্ছিল একটু ক্লান্তিতে।
—
মোড়ের ওপর রিক্সা থামিয়ে দিলো রিক্সাওয়ালা। অন্তূ বলল, “আর একটু এগিয়ে যাবেন না?ʼʼ
-“না, আপা। রাস্তা খারাপ। চাকা আইঁটকে যায়। এইটুকুন পায়ে যান।ʼʼ
রাস্তাটা ভাঙা। ক’দিন আগের বৃষ্টিতে পিচ ক্ষয়ে নিচু হয়ে যাওয়া স্থানগুলোতে পানি জমেছে। সামনেই ক্লাব ঘর। বাইরের দেয়ালে সেঁটে রাখা বিভিন্ন রাজনৈতিক পোস্টার, রঙ-বেরঙের কালিতে রাজনৈতিক সংগঠনের নাম-ধাম লেখা সব। সামনে রাস্তার ওপারে চায়ের দোকান-পাট। ক্লাব ঘরের সামনে লাল চেয়ার পাতা অনেকগুলো। বাঁশের স্ট্যান্ডের ওপর ক্যারাম বোর্ড রাখা। চেয়ারে দুয়েকজন বসে পা দোলাচ্ছে, সিগারেট টানছে, কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে।
রাস্তার করুণ দশা। কাউন্সিলরের ক্লাবঘরের সামনের রাস্তার এই হাল! অথচ সেই কাউন্সিলর আগামীতে মেয়র পদের প্রার্থী হয়ে বিভিন্ন সম্মেলনে কত কী করে দেবার অঙ্গীকার দিচ্ছেন জনতাদের! আজকালের মাঝে একটা বিশাল সম্মেলন আছে প্রাইমারী স্কুলের মাঠে। সেখানে নিশ্চয়ই হামজা, জয় জম্পেশ একটা করে বক্তব্য রাখবে! এদের জিহ্বা কয়টা? আর বিবেক এবং লজ্জাই বা কোন ফেরিওয়ালার কাছে বিক্রি করে বাদাম কিনে খেয়েছে! ভাবতে ভাবতে কাঁদায় এক পা গেড়ে গেল অন্তূর।
ক্লাবঘরের দিকে তাকাল না। থুতনি বুকে ঠেকিয়ে হেঁটে পার হলো। কালো বোরকা ও কালো ওড়নার নেকাবে মুখ ঢাকা তার। ক্লাবঘরের পাশেই সালমা খালার ছোটো বাড়িটা।
টিনের গেইটে আঙুলের টোকায় দু-তিনবার শব্দ করল। কিছুটা দেরি করে চাঁদনী গেইট খুলে দিলো। অন্তূ বলল, “ভয় পাবেন না, ভাবী। আমি খালার ভার্সিটির এক ছাত্রী।ʼʼ
চাঁদনী নির্লিপ্ত মুখে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে ভেতরে আসার ইশারা করল। টিনের চাল, টিনের বেড়া। তার সামনে একটা ইটের গাথুনিতে তোলা ঘর। মেঝে হয়নি, উপরে শুধু টিনের ছাঁদ লাগানো হয়েছে, নিচের মেঝে কাঁচা, জানালা-দরজাও লাগানো হয়নি।
চাঁদনী অন্তূকে নিয়ে গিয়ে ঘরে বসাল। পাশের ঘরে সালমা খালা নামাজে বসে কাঁদছেন। করুণ কান্না। অন্তূর বুক ভার হয়ে এলো। চাঁদনী নাস্তা আনতে উদ্যত হলে অন্তূ চাঁদনীর হাতটা চেপে ধরে বলল, “ভাবী প্লিজ! কোনো আনুষ্ঠানিকতা দেখিয়ে আমায় ছোটো করবেন না। আপনি বসুন, দু মিনিটি কথা বলি! সব মিটলে একদিন এসে নাস্তা করে যাব।ʼʼ
চাঁদনী মানতে চায়না, অন্তূ জোর করে বসাল। জীর্ণ একটা সেলোয়ার-কামিজ পরনে চাঁদনীর। চুলের বেণী উলকো-খুশকো। মুখে মলিনতার ছাপ! দেখতে চরম সুন্দরী চাঁদনী। কালি পড়া ডাগর ডাগর চোখ, আর তা যেন রহস্যময়।
-“নাম কী তোমার?ʼʼ
-“অন্তূ বলে ডাকে সকলে।ʼʼ
-“আমিও তাহলে তাই বলে ডাকব!ʼʼ একটু হাসল চাঁদনী। হাসিটা অদ্ভুত, আর সুন্দর।
-“যদি আগেই চলে যেতেন এখান থেকে, তাহলে হয়ত আঁখির এই হাল হতো না বোধহয়।ʼʼ
মলিন হাসল চাঁদনী প্রত্যুত্তরে, “বহুতদিন থেকেই ক্লাবের ছেলেদের নজরে পড়ছিল আঁখি, আঁখিরে খুব জ্বালাতো ওরা। যাওয়া, আসার সময় আজেবাজে কথা বলতো। একবার ক্লাবের একজন বাড়িতে আসছিল তার কোনো বড়ো ভাইয়ের সাথে আঁখির কুপ্রস্তাব নিয়ে। আম্মা তারে একটা খাপ্পড়ও দিছিল।ʼʼ
অন্তূর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল, সেই বড়ো ভাইটা কি জয় আমির? আপনার কি সন্দেহ হয়না জয়ের ওপর? করল না প্রশ্নটা।
-“আপনি যে টাকা ফেরত দিতে গেছিলেন মেম্বার সাহেবকে, তা দিয়ে অন্য কোথাও তো জায়গা কিনে চলে যেতে পারতেন!ʼʼ
চাঁদনী হাসল আবার, কেমন যেন দেখাচ্ছিল চাঁদনীর হাসি, “তুমি ঘটনা লোকমুখে শুনছো তাই না?ʼʼ
অন্তূ জবাব দিলো না। চাঁদনী বলল, “পুরাটা আর আসলটা শোনো নাই।ʼʼ
-“এখন শুনি, আপনি বলুন।ʼʼ
চাঁদনী তাকায় অন্তূর দিকে, “হু? আমি বলব?ʼʼ
অন্তূর চাঁদনীকে ভীষণ অন্যরকম লাগছিল।
চাঁদনী বিছানার ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাপড়গুলো ভাজ করতে করতে বলল, “আমি বাপের বাড়ির পাওনা জায়গা আর বিয়ের গয়না বেঁচে আমার ভাইরে সাথে নিয়ে মেম্বারের কাছে গেছিলাম টাকা ফেরত দিতে।
-“তারা নিলো না?ʼʼ
-“টাকাগুলা দেখল আর মেম্বার সাহেব বলল, ‘আচ্ছা! টাকা যখন যোগাড় করছো, নেয়া যাবে। আমি ওই হিন্দু লোকটার সাথে কথা বলে দেখি।ʼ
-“এরপর?ʼʼ
অন্যমনস্ক হলো চাঁদনী, “যেভাবে বলছিল, আমরা নিশ্চিত ছিলাম, টাকা নিবে, জায়গা ফেরত পাব।ʼʼ
-“নিলো কি সেই টাকা?ʼʼ
চাঁদনী খুব মনোযোগ দিয়ে কাপড় ভাঁজ করতে করতে বলল, “সেই রাতে বাড়িতে লুট হলো।ʼʼ বলেই হাসল। কী যে অদ্ভুত নির্লিপ্ত শুনতে লাগল চাঁদনীর কথাটা!
কপাল জড়িয়ে ফেলল অন্তূ, “চেনেননি তাদের?ʼʼ
চাঁদনী হাসিমুখে কাপড়গুলো একপাশে রেখে বলল, “তুমি কখনও ডাকাতি দেখোনি, না?ʼʼ
-“না, দেখিনি।ʼʼ
-“ওরা মুখোশ পরে ছিল। আর চিনলেই বা কী? যাবার সময় অস্ত্র দেখায়ে খুব ভালো করে সাবধান করে গেল। আর আমরা সাবধান হয়ে গেলাম। একবার সাবধান না হয়ে হারাই গেছে একটা।ʼʼ
অন্তূর বুঝল না শেষ কথাটা। চাঁদনী কি আঁখির মেজো ভাইয়ের কথা বলছে? যে ক্যান্সারে মারা গেছে? এখানেও এক রহস্য রইল। চেয়ে রইল ক্ষণকাল চাঁদনীর নির্বিকার মুখটার দিকে। অসীম ধৈর্য্য আর বুঝ মেয়েটির। এমন নিম্নবিত্ত পরিবারে এতো শীতল মস্তিষ্কের একটা বউ! তার চোখের চাহনি, কথা বলার ধরণ, মুখের ভঙ্গিমা –সবই যেন অ-সাধারণ, একটুও সাধারণ নয়! সেদিন শাশুরিকে যেভাবে বুকে জড়িয়ে থামাচ্ছিল, সে এক বিরল দৃশ্য! আজও কেমন অনড় শক্তিময়ী লাগছে এই মেয়েটাকে! প্রথম সাক্ষাতে কেমন নির্দিধায় কথা বলছে ওর সঙ্গে! একটুও ইতস্তত বা অপ্রস্তুত নয় যেন! মার্জিয়া কি এমন হতে পারতো না? অন্তূ জিজ্ঞেস করল, “আপনি পড়ালেখা জানেন!ʼʼ
চোখ তুলে তাকায় চাঁদনী, “এসএসসি পাশ করছিলাম। মুখ খুললে না তুমি? দেখলাম না তো তোমায়!ʼʼ
অন্তূ নেকাবটা খুলল অল্প একটু। বেজায় মায়াবতী দেখতে অন্তূ! সবচেয়ে বেশি মায়া লেপ্টে আছে ঘন পাপড়িওয়ালা চোখে, চোখের মণি কুচকুচে কালো, তাতে মুক্ত দানার ন্যায় ভাসছে আলোর প্রতিসরিত বিন্দুরেখা। এক দেখায় আটকে যাবার মতো, সুন্দর মেয়েটা। কালো নেকাবের প্রান্ত এসে ঠেকেছে ফর্সা কপালটার ওপর, থুতনিটুকুও বের হয়নি। কালো পর্দার আবরণের ভেদে ঝিরঝিরে মোহময়ী চেহারা! চাঁদনী কিছুক্ষণ অন্তূর নত মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, “খুব সুন্দর তুমি।ʼʼ
-“আপনার কাছে হেরে যাব!ʼʼ
দুজনেই হাসল।
গেইটে শব্দ হলো। অন্তূ দ্রুত মুখে নেকাব পরে নিলো। সোহেল ঘরের দরজায় এসে থেমে গেল, তার চোখে-মুখে কৌতূহল। অন্তূ সোহেলের অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে নিজেই বলল, “ভাই, আমি অন্তূ! ভার্সিটিতে পড়ি। ভাবীর সঙ্গে এমনিই দেখা করতে এসেছিলাম। আপনি ভেতরে আসুন।ʼʼ
সোহেল ঢুকল না, দু কদম পিছিয়ে হাত দিয়ে বাঁধা দেবার মতো করে বলল, “বসো তুমি। কথা কও, আমি পরে আসব। বসো, বসো!ʼʼ
অন্তূর ভালো লাগছিল এই বাড়িতে! সে বলল, “আপনি আসুন, আমি বেরিয়েই যাচ্ছিলাম।ʼʼ
অন্তূ গিয়ে কান্নারত অভাগী মায়ের পাশে মেঝেতে বসে পড়ল। হাতটা চেপে ধরে বলল, “চেনেন আমায়?ʼʼ
চিনলেন সালমা অন্তূকে। ভার্সিটিতে কমনরুমে দেখেছেন বহুবার।
“আপনি এভাবে কাঁদছেন কেন? ক্লাবঘরেও পৌঁছাচ্ছে নিশ্চয়ই আপনার কান্নার স্বর! পৈশাচিক আনন্দ দিচ্ছে ওদের আপনার এই আর্তনাদ! নিজের দূর্বলতা অন্তত শত্রুর কাছে প্রকাশ করতে নেই।ʼʼ
মুখে হাত চেপে কেঁদে উঠলেন সালমা।
অন্তূ বলল, “যখন কেউ কষ্ট দেবার লক্ষ্যে কষ্ট দেয়, তখন একদম উচিত নয়, কষ্ট পাওয়াটা তাদের দেখানো। হয় সেই পরিমাণ সেইভাবে ফিরিয়ে দিতে হয়, অথবা চুপ থাকতে হয়। অন্তত তাদের সামনে।ʼʼ
সালমা খালা অন্তূর এই ভারী কথা বুঝলেন কিনা কে জানে! বললেন, “কিন্তু ওরা তো করে নাই কিছু!ʼʼ
অন্তূ জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “নিজেকে সান্ত্বণা দিচ্ছেন?ʼʼ
সালমা কান্না সামলালেন, এরপর বললেন, “ওরা কিচ্ছু করে নাই, অন্তূ! কেডা করছে, আল্লাহ মাবুদ জানে! ওই পুলিশরা আমার বেটির লাশ দিতেছে না ক্যান! আবার কই নিয়া গেছে আমার বেটিরে! আমার বিচার লাগবো না। ওরা রাজনীতি করে, শক্তিশালী সব। আমার বিচার লাগবো না, কিচ্ছু লাগব না আমার। আমি চলে যাব এইখান থেইকা, বহুত দূরে যাব। আমার মেয়েটারে ওই পুলিশ আবার জানি কই নিয়া গেছে!ʼʼ
কথা ধরল অন্তূ, “কারা রাজনীতি করে? এই তো বললেন, ওরা কিছু করেনি!ʼʼ
তার মনে হলো, সে বোধহয় টেনে হিঁচড়েই জয়কে এসবের পেছনে দাঁড় করাতে চাইছে! তার সঙ্গে সেদিন খারাপ আচরণ করেছিল বলে জয় বারবার অপরাধীর জায়গায় নজর আসছে। কিন্তু এটা ঠিক না। ভেতরের উকিল মস্তিষ্কটা ধমকালো অন্তূকে।
ক্লাবঘর পার হওয়ার সময় আড়চোখে তাকাল সেদিকে। বুকে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। তাকে চিনে ফেলার মতো কেউ যদি এখন ক্লাবে থাকে, কোনো তামাশা না হয়ে যায় এখন। যদি জয়ই দেখে ফেলে! ক্লাবঘরের সামনে বড়ো পোস্টারে কাউন্সিলর হুমায়ুন পাটোয়ারীর ছবি টাঙানো। পাশেই আরেক পোস্টারে তার ছেলে হামজার ছবি। এবার ক্যারাম বোর্ডের সামনে ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে, এটা আড়চোখে নজরে এলো। আর ভুলেও তাকালো না সেদিকে।
—
সন্ধ্যার বেশি বাকি নেই। দুনিয়াতে সর্বোচ্চ জঘন্য শব্দের মধ্যে সেরা জঘন্য শব্দ হলো, এলার্মের শব্দ। ঘুম ভাঙল জয়ের। ফোনের এলার্ম তখনও বাজছে। উপুড় হয়ে ছিল। চিৎ হয়ে বকলো, “স্যাঁটাভাঙা এলার্মঘড়ি। বালডা বাজতেই আছে। সম্বন্ধির ছেলে ঘড়ি আমার, আমি উঠছি হে। এইবার অফ যা।ʼʼ
ঘড়িটাকে ভাঙতে পারলে ভালো লাগতো। ভাঙল না। টাকার ঘা কলিজায়।
মুখে-চোখে পানি দিয়ে আসার পরেও ঝিমুনিটা ছাড়ছিল না। প্রথমে ঝুড়িতে, পরে একে একে সম্ভাব্য সকল আসবাবে কাঙ্ক্ষিত শার্টটা খুঁজল, পেল না। চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে, “মামি! ওও সতালো নানির মেয়ে…ʼʼ কাজের মহিলাকে জিজ্ঞেস করল, “সেই শালির চেংরি কই?ʼʼ
বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন শাহানা, “কী সমস্যা? ষাঁড়ের মতো গলা ফাঁড়তেছিস ক্যান? এই বাড়ির ব্যাটাছেলেদের জন্মগত বদরোগ এই!ʼʼ
জয় দাঁত খিঁচে উঠল, “আমার শার্ট ধোয়া হয়নি কোন সুখে? কার বালডা পরব আমি এখন?ʼʼ
-“তোর শার্টের খুব আকাল হয়েছে? আলমারী খুললে ছোটোখাটো একটা শার্টের গোডাউনের খোঁজ পাওয়া যাবে, বাদর! সবসময় তোমার শার্টের পেছনেই তো দৌড়াই আমি, আর কোনো কাজ নেই বাড়িতে। অন্যটা পরে বের হওয়া যেত না?ʼʼ
জয় মুখ খুলতে গিয়েও নিয়ন্ত্রণ করল নিজেকে। তার মুখ খুললে বকা ছাড়া কিছু আসার সম্ভাবনা নেই। মামিকে সামনাসামনি বকা ঠিক না। এরপর কথা বলতে গিয়ে ওই ক্ষ্যাপা স্বরই এলো, “তো একটা বের করে দাও সেই গোডাউন থেকে, পরে বের হই। তোমাদের মতো তো হুদাই ঘরে বসে থাকি না আমি। কাজ আছে, উঠতেই দেরি হয়ে গেছে, আবার শার্টের বাঁড়া নিয়ে রঙ্গ করতেছি আর আধঘন্টা!ʼʼ
তরু বেরিয়ে এসে দাঁড়াল সেন্টার রুমের একপাশে। জয় ওর দিকে ফিরল, কঠিন স্বরে আদেশ করল, “তরু! আরেহ সিস্টার, ইউ আর স্টিল জীবিত নাও? ভালোই হলো। আমার একটা শার্ট বের করে দে। যা! কুইক!ʼʼ
জয়ের ঘরে ঢুকলেই পুরুষালি একটা গন্ধ পাওয়া যায়। মাতাল মাতাল লাগে তরুর! ঘরে বাস করা পুরুষটাই যখন সর্বক্ষণ ওর মাতাল হয়ে থাকার কারণ, এই ঘরটাও ওর কাছে বড়ো কাঙ্ক্ষিত। প্রতিদিন জয় উঠে বেরিয়ে যাবার পর সে পুরো ঘরটাকে পারলে নতুন করে উলোট-পালোট করে, আবার শুরু থেকে গোছায়, বেশিক্ষণ এই ঘরে অবস্থান করার লোভে। যতক্ষণ এখানে থাকবে, বুকের ভেতর কী যে এক শিরশিরানি নেচে বেড়ায়।
আলমারিটা খুলে খুঁজে খুঁজে একটা কালো-লালচে রঙা শার্ট বের করল। আবার দ্রুত ঢুকিয়ে হ্যাঙ্গারে বাঁধিয়ে রাখল। এই ঘরের প্রতিটা বিন্দু তার গোছানো।
অবশেষে একটা চেক শার্ট বের করল । সেটাতেও মন লাগল না। ভুলভাল শার্ট নিয়ে গেলে, পছন্দ না হলে নিশ্চিত একটা জঘন্য ভাষায় গালি দিয়ে ছুঁড়ে ফেলবে শার্টটা জানালা দিয়ে।
একবার শার্ট ধোয়া হয়েছিল না, সবগুলো শার্ট বাথরুমে চুবিয়েছিল। পরে ক্লিনার এনে সেসব তুলে বাথরুম বাঁচানো হয়েছে। আবার নতুন শার্ট কিনতে হয়েছিল। না কেনা অবধি হামজার শার্ট পরতো।
একটা মিশ্র ছাই রঙা শার্ট দিলো জয়কে। জয়ের সব শার্ট বেনামী রঙের। নাম না জানা সব কালারের শার্ট বেছে বেছে কিনে আনে। এমনকি শার্ট যেটা কেনে সেটা দোকানে দাঁড়িয়েই গায়ে চড়িয়ে পরনেরটা ব্যাগে করে বাড়ি ফেরা লোক সে। পরেরদিন নতুন সেই শার্ট ধুয়ে, আয়রন করে আলমারিতে তোলা হয়। এরকম হাজারো পাগলাটে স্বভাবসমপন্ন, বদরাগী পুরুষটিকে কেন যে এতো ভালো লাগে মনে মনে তরুর? লোকে শুনলে নিশ্চয়ই বলবের রুচির দোষ আছে তরুর, নয়ত জয়ের মতো নোংরা স্বভাবের ছেলের প্রমে পড়া যায়না।
জয় কিছু বলল না, চুপচাপ শার্টটা পরল গায়ে। তরুকে দিয়েই পারফিউম আনিয়ে নিলো। এই ব্যাপারটা তরু কতটা উপভোগ করে, তা জানে না জয়! তার মন নেচে ওঠে যখন জয় ধমক দিয়ে এটা ওটা ঘর থেকে আনতে বলে তাকে। মনে হয় যেন সে ঘরনী জয়ের!
আজ পৌরসভা অফিসে বৈঠক ছিল। নির্বাচন কাছে। হামজা বলেছিল, ঠিক দুপুরের পর পৌরসভায় পৌঁছে যেতে। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই বিশাল এক সম্মেলন নির্বাচন নিয়ে। সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা চলবে। জয় পৌরসভায় না গিয়ে গিয়েছিল পলাশের গাঙের পাড়ের বাড়িতে। সেখানে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে, ক্লাবে গিয়ে ক্যারাম খেলেছে আধঘন্টার মতো, এরপর বাড়ি ফিরে ঘুম দিয়েছে সন্ধ্যা অবধি।
কবীর ড্রাইভিং করতে করতে জিজ্ঞেস করল, “ভাই, আমরা যাচ্ছি কই এখন?ʼʼ
-“চেয়ারম্যান কাকা ডেকেছে।ʼʼ
কবীর দ্রুত ঘাঁড় ঘুরাল, “চেয়ারম্যান কাকা, আপনাকে ডাকছে? ক্যান?ʼʼ
-“সম্পত্তির ভাগ লিখে দেবে। তোর কিছু চাই সেখান থেকে?ʼʼ
বোকা হাসল কবীর, “না মানে! আপনারে ক্যান ডাকছে? উল্টাপাল্টা কিছু করবে না তো?ʼʼ
-“উল্টাপাল্টা কিছু? বউ নাই নাকি চেয়ারম্যানের? আমায় কেন টার্গেট করবে?ʼʼ
হাসল কবীর। জয় বলল, “আয় তোর এই গেছো বাদরের মতো হাসির একটা ছবি তুলি। বাই এনি চান্স অকালে টপকে গেলে ছবিতে মালা চড়াবো।ʼʼ
ব্যাক ক্যামেরা অন করে কবীরের দিকে ধরল। হঠাৎ-ই একটা বোঝাই ট্রাক সামনে এসে পড়ল ওদের গাড়ির! গাড়ি চালানোর সময় এই মজা বোধহয় কাল হয়ে উঠল ওদের। কবীর প্রথমত নিয়ন্ত্রণ হারাল, দ্রুত স্টিটিয়ারিং ঘুরাল গাড়ি এক সাইডে নেবার জন্য। ততক্ষণে ডান পাশে আরেকটা গাড়ি এসে পড়েছে। ওদিকে সরার জায়গা নেই। ওদের গাড়ি যে পজিশনে রয়েছে তাতে ট্রাক ওদের গাড়িকে পিষে সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। ওপাশে চাপার জায়গা নেই। কয়েক সেকেণ্ড পাশের গাড়িটা আরও স্লো হয়ে ওদের পাশ আটকে চলল মনে হলো। জয় সবসময় খারাপ কিছুর জন্য প্রস্তুত। কবীরও হলো।
কিচ্ছু করার নেই আর, ট্রাক ওদের সামনে খুব কাছে প্রায়। আচমকা পাশের গাড়িটা পাশ থেকে দ্রুত এগিয়ে গেল ওদের গাড়ি পার করে। সেদিক দিয়ে ট্রাকটা চলে গেল ওদের বাঁচিয়ে। ট্রাক চলে গেল নাকি কবীর নিপুন হাতে নিয়ন্ত্রণ করে নিলো, বলা যায়না! সেকেণ্ড বিশেকের মধ্যে ঘটে গেছে পুরো ঘটনাটা।
জয় গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল ট্রাকটাকে একবার। এখনও হৃদপিণ্ড ধরাস ধরাস করছে। জয় তাকে বকলো, “শালা, এত লাফাও ক্যান?ʼʼ
বেশ কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে সমনে ঘাঁড় ফেরালো। কবীরকে প্রশ্ন করল, “ট্রাকটা কার জানিস, কবীর?ʼʼ
চলবে..