#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২৫.
থুতু ছুঁড়ে দিয়ে মহিলা চুল ধরে টেনে তুলল অন্তূকে। অন্তূর শরীরের এক পাশ থেকে ওড়নাটা পড়ে গেল। চোখদুটো বুজে জোরে করে ডেকে উঠল অন্তূ, “আব্বু!ʼʼ টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু পড়ল মাটিতে।
অন্তূ খারাপ মেয়ে। তার শরীরে ওড়না তুলে দেবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করল না কেউ।
মহিলা বলল, “লাংয়ের সাথে বিছানায় যাইতে মন চায়, বিয়ে কইরা তার বাড়িত যাইতে মন চায় না? এতক্ষণ তাও যা ভাবনায় আছিলাম, তুই তো তার চাইতেও বেশি শয়তান মাইয়া! আমার মাইয়া হইলে জিন্দা কবর দিয়া থুইতাম। মাইয়ারে বয়স চৌদ্দ হইতেই বিয়া দিয়া দিছি। তোর মতোন বে-শ্যা পুষি নাই কলেজে পড়াইয়া।ʼʼ
অন্তূ তার তপ্ত চোখদুটো তুলে তাকাল, “আমি কিচ্ছু করিনি, অপবাদ দিচ্ছেন চাচি আপনি।ʼʼ
ওড়নাটা তুলে বুকে জড়িয়ে নিলো।
“হ, কিছু করোস নাই। খালি লাংয়ের সাথে বিছানায় শুইছিস। তাই তো কই বিয়া করবার চায় না, ভাস্সিটিত পড়বার চায়, হুহহ? সেইদিন মা খাওয়াইছে, আইজ ঘরে স্বয়ং ব্যাটাছেলে ঢুকাই দিয়া বাইরে গেছে গা! এতই যহন রঙ মনে তাইলে আবার বিয়া করবার চাও না ক্যা তারে?ʼʼ
অন্তূর সহ্যক্ষমতা ছড়ালো, চিৎকার করে উঠল ও, “আর একবার কেউ আমার বাপ-মায়ের দিকে নির্দেশ করে কথা বললে পড়ে থাকা ইট তুলে তার মাথাটা দুই খন্ড করতে আমার হাতে বাঁধবে না।ʼʼ
জনতাদের একজন বিরবির করে বকে উঠল, “মা-গীর তেজ এখনও কমেনি? ঘরে বেটাছেলে ঢুকানো মাইয়ার মুখে…ʼʼ
অন্তূর কানে এলো কথাটা, জবাব দিলো, “জি না, তেজ একটুও কমেনি। কী করবেন আপনি? আমার মুখে কী? মেরে ফেলবেন? আপনারা না পরিকল্পনা করছিলেন, বেত মারার? শুরু করুন। আপানদের ভাষ্যমতে পাপ যখন করেছি, শাস্তি আমার পাওয়া উচিত। শরীয়ত অনুযায়ী শাস্তি দেয়া শুরু করুন। কোনো নাটকীয় শাস্তির জন্য প্রস্তুত নই আমি। আপনাদের আন্দাজ করা পাপের শাস্তি কখনও বিয়ে হতে পারে না। বেত্রাঘাত করুন।ʼʼ
মৌলবি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন জয়কে, “তোমার কী মতামত?ʼʼ
জয় অন্তূর ওপর থেকে চোখ ফিরিয়ে বলল, “হুহ? আমার? আমার মত…আমার আর কী মত? আপনারা বললে বিয়ে করব! না করার কিছু নেই।ʼʼ শেষে আস্তে করে চিবিয়ে বলল, “আফটার অল শালী সুন্দরী, আমার বদনাম তার গায়ে আমার নামের।ʼʼ
অন্তূ চোখ দিয়ে অনুরোধ করে ওঠে, “প্লিজ! এমন করবেন না। আমি সত্যি বলছি অনেকদূর চলে যাব। আর কোনোদিন অসম্মান করব না আপনার, আপনি ‘নাʼ বলুন…ʼʼ
জয় অনড় চোখে চেয়ে থাকল। তার কিছুই করার নেই। সে যা চেয়েছে, তাই হয়েছে‐অন্তূর মুখে থুতু পড়েছে। এখন কী হচ্ছে বা হবে তা নিয়ে তার কোনো লাভ-লোকসান নেই।
কাজী আনতে গেল হামজার দুটো ছেলে। অন্তূ বুঝল, বিয়ে না করতে চাওয়ার কারণ হিসেবে তার চরিত্রের সাফাই গাইলে কেউ শুনবে না। তাকে অপরাধ মেনে নিতে হবে বাঁচতে হলে।
সে মৌলবীকে বলল, “হুজুর। আমি পাপ করেছি।ʼʼ জিহ্বায় আটকাচ্ছিল কথাখানা।
একটু থেমে মিনতি করল, “আপনি তার শাস্তি দিন আমায়। বিয়ে পড়ানোটা কি শরীয়তের শাস্তি হবে, বলুন? আমার কথা বুঝতে পারছেন আপনি?ʼʼ অন্তূর শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, বারবার ঝাঁকুনি খাচ্ছে।
-“আমায় বেত্রাঘাত করে মেরে ফেলুন, আমায় ফাঁসি দিয়ে দিন, অথবা আমায় এক বোতল বিষ….হুজুর। আমি যা করেছি, তার শাস্তি আপনি আমায় আশিটা না বরং তার দ্বিগুণ একশো ষাটটা মারুন। আপনি জয় আমিরের আঘাতগুলোও আমাকে দিন। ওই লোকটার ভাগে যে বেত্রাঘাত আছে, সেগুলোও আমায় মারুন। জয় আমিরের কোনো দোষ নেই।ʼʼ
মৌলবির সামনে মিনতি করাটা বেক্কলে কাজ হচ্ছে। অন্তূ হামজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রবল আত্মসম্মানী অন্তূ অনুরোধ করে উঠল, “মেয়র সাহেব! আপনি কি ভাইয়ের শরীরের আঘাতের চিন্তা করছেন? নিতে হবে না। সে কিচ্ছু করেনি। সব পাপ, দোষ আমার। আমি করেছি পাপ, আমার শাস্তি পাওয়া উচিত, দরকার। আমি যদি ওর আঘাতগুলো নিই..? এখানে আমায় শূলে চড়িয়ে পাঁচ খন্ড করা হলেও তা মঞ্জুর। আমায় মেরে ফেলুন। বদনাম ধুয়ে যাবে। আব্বু আসার আগে মেরে ফেলুন।ʼʼ
হামজা স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, “পাগলামী করছো, আরমিণ! বদনাম যখন হয়ে গেছে। সত্য-মিথ্যার ধার সমাজ ধারবে না। তোমার শরীরে ট্যাট্টু ছেপে গেছে।ʼʼ
-“কীসের ট্যাট্টু, মেয়রসাহেব!ʼʼ
-“বদনাম অথবা জয়..ʼʼ
অন্তূ মাথা নাড়ে, “ট্যাট্টু মোছা যায় না, না?ʼʼ
-“যায় না।ʼʼ
-“আমি যদি ত্বক পুড়িয়ে ভস্ম করে দিই, অথবা উপড়ে তুলে ফেলি শরীরের চামড়া?ʼʼ
-“তাতে বাঁচতে পারবে? তোমার শরীরে দশটা আঘাতও সইবে না। দোর্রা আশিটা বেত একসাথে বেঁধে আশিটা আঘাত করে মারা হয়। তুমি দু-চারটাতে প্রাণ হারাবে। কলঙ্ককে সাথে নিয়েই মরবে। এড়িয়ে যাওয়ার পথ নেই।ʼʼ
অন্তূর দিকে ঝুঁকে নিচু আওয়াজে বলল “বেঁচে থাকলে নিজের কাছে সান্ত্বণা থাকবে, তুমি পাপটা করো নি। আমি তোমাকে বুদ্ধিমতি বলেই জানি। কিছুক্ষণ আগেও তোমার শীতলতায় লোকে অবাক হয়েছে, এত ভেঙে পড়ছো কেন?রিল্যাক্স। প্রস্তুত হও! পাটোয়ারী বাড়ি তোমার অপেক্ষায়।ʼʼ
অন্তূ আস্তে কোরে পিছিয়ে এলো কয়েক কদম। কিছু ভাবছে সে। কিছু জবাব মিলছে। হামজাকে তার বড্ড ভয় করছে। পলাশ এবং জয়ের চেয়েও বেশি ভয়। হামজা দেহে বাস করা ক্যান্সার কোষের মতো। নীরব ঘাতক।
চারদিকে গুঞ্জন থামেনি। যেহেতু মেয়ে বিয়ে করতে চাইছে না, তার মানে বিয়ে দেওয়াটাই ওর শাস্তি। চমৎকার যুক্তি সমাজের।
বসে রইল অন্তূ সিঁড়িতে। আজান পড়ছে। স্বভাববশত ওড়না তুলে মাথায় দিলো। আজ আর দৌড়ে গিয়ে ওযু করে নামাজ পড়তে বসল হলো না। চরিত্রহীনদের নামাজ পড়ার দরকার নেই। আব্বুর টুপিটা খুঁজে দেয়া হল না। আব্বু এ সময় আছরের নামাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়, অন্তূ গেটটা আটকে নামাজে বসে। অন্তূ নির্বাক চোখে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
জয় একটা চেয়ারে বসে পড়ল। পরনে এখনও থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। হাঁটুর নিচে ঘন পশম। পা দুলাচ্ছে বসে। দেখতে ক্লান্ত লাগছে। সে এত কিছু ভাবেনি, এখনও ভাবছে না। চিরদিন লাগামহীনের মতো অপরাধ করেছে, কোথাও এমন দ্বিধা-দ্বন্দ ভরা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কেউ প্রতিবাদ করেনি কখনও। সব গুলিয়ে যায় অন্তূর সামনে। সবকিছুর বাজি পাল্টায়, এমনকি তার লাগামছাড়া অপরাধেরও। অন্তূর ওপর রাগটা তরতর বাড়ছে, জেদ উঠছে।
অন্তূ মাটির কাছে অনুরোধ করে, ‘ফাঁক হয়ে যা। আমাকে এই মুহুর্তে জায়গা দে তোর গর্ভে। নাকি তুই-ও ভুল বুঝছিস আমায়? আমাকে কি তোরও বলাৎকার মেয়ে মনে হচ্ছে, মাটি? তুই কথা বলিস না? তোর বুকে দাঁড়িয়ে মানবসন্তান এত কিছু ঘটায়, তোর ধৈর্য্যে কুলায় সবটা? তোর বুকে ভার অনুভূত হয়না?
মাটি জবাব দেয় না। অন্তূ চেয়ে থাকে মাটির দিকে।
নামাজ শেষে কাজীকে সাথে নিয়ে লোকজন ফিরল। হামজাও সবার সাথে নামাজ পড়ে ফিরল। সকলে যে যার স্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হলো ছোট্ট একটা।
পাড়ার প্রবীণরা হামজাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তো তুমি কী বলো? বিয়ে পড়ানো শুরু করা যাক?ʼʼ
হামজাকে বলার সুযোগ দিলো না অন্তূ। চিৎকার করে উঠল, “বললাম না বিয়ে হবে না? আমাকে এখানে কেটে শত টুকরো করলেও কোনো রকম বিয়ের আয়োজন হবে না এখানে। আমি যা করেছি, তার জন্য বিকল্প যেকোনো শাস্তি দিন আমায়, আমি তৈরি আছি।ʼʼ
-“কিন্তু আমরা চাইতেছি না তোমারে জিন্দা মাটিতে পুঁততে।তারচে..ʼʼ
-“কিন্তু আমি তো চাইছি, আমাকে পোঁতা হোক, বেত্রাঘাতের সাঁজা দেয়া হোক! আপনাদের ব্যথা লাগছে কেন? মার পড়বে আমার শরীরে। তাছাড়াও আমার মতো চরিত্রহীনের জন্য এত মানবিকতা দেখালে বরং আপনারা কিন্তু গুনাহগার হবেন আল্লাহর কাছে। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে আঘাত করা শুরু করুন।ʼʼ
লোকজন ফাঁপড়ে পড়ে গেল। অদ্ভুত চোখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখল। এখনও মেয়েটার কথার যুক্তি, ভাষার বিন্যস্ততা, চোখের প্রতিবাদ এক বিন্দু কমেনি। যুক্তি-তর্কের ঊর্ধ্বে জয়ের অপরাজেয় মস্তিষ্কেও বিস্ময় খেলে গেল। চোখ সরাল না অন্তূর ওপর থেকে। অন্তূর মুখে ঘাম জমেছে, বুকটা ওঠানামা করছে, চোখদুটো কাতর অথচ অগ্ন্যুৎপাতের গলিত লাভা যেন ঠলকে পড়ছে।
সন্ধ্যা হবার অল্প অল্প বাকি। আমজাদ সাহেব হেঁটে এগিয়ে আসছেন। রাবেয়া উনার ডানবাহু ধরে এগিয়ে আসছে বাড়ির দিকে ক্রমশ। অন্তিকের লম্বা মাথাটা দেখতে পাওয়া গেল উনাদের পেছনেই। অন্তূ যেন ফুরিয়ে গেল এক লহমায়, সমস্ত জীবনীশক্তি ত্যাগ করে এক দলা মাটির স্তূপে পরিণত হয় মেয়েটা। এই কথাগুলো এই লোক কীভাবে আব্বুর কানে তুলবে? আব্বুর কেমন লাগবে শুনতে অন্তূর ব্যাপারে এমন সব কথা?
আমজাদ সাহেব অবাক হলেন বাড়ির সামনে ভিড় দেখে। অন্তূর অবস্থা দেখে সৌম্য মুখখানা অস্থির হলো। একে একে লোক আমজাদ সাহেবকে নিজেদের মনমতো করে রসাত্মক কাহিনি জানাতে শুরু করে।
-“মাইয়া তোমার অকাম তো করছে, মাগার সেই লাংয়ের লগে বিয়াত্ বসবার চায় না।ʼʼ কেউ আবার বলে, ‘আমজেদ! মাইয়ারে ব্যবসায় দিছো নাকি? ব্যবসা যারা করে, হেরা বিয়ে করবার চায় না।ʼʼ
কথাগুলো সহ্য করতে পারে না অন্তিক। তেড়ে যায় মারতে ক্ষ্যাপা পাগলের মতো। লোকটাকে দুটো ঘুষি মেরে নাক দিয়ে রক্ত বের করে আনলো। লোকের মেজাজে বিরূপ প্রভাব পড়ল এতে। পাপীর ভাইয়ের এই আস্পর্ধা তারা ভালোভাবে নেবে কেন?
আমজাদ সাহেব থামালেন ছেলেকে। অনেকক্ষণ যাবৎ শুনলেন দাঁড়িয়ে পাড়ার ও সমাজের প্রতিটা স্বাধীন নাগরিকের নিজস্ব মূল্যবান মন্তব্যগুলো। কেউ জয়কে বলছে না। জয় পুরুষ, জয় হামজার ভাই, হুমায়ুন পাটোয়ারীর ভাগ্নে, এই অঞ্চলের অভিজাত পরিবার, আমির পরিবারের একমাত্র উত্তরসূরী। জয়কে বলতে নেই।
মাগরিবের আজান শোনা যায় চারদিকে। মাথা থেকে পড়ে যাওয়া ওড়নাটা আর তুলে মাথা ঢাকে না অন্তূ। দেহ ব্যবসায়ী মেয়েরা তা করে নাকি? তার পর্দা পলাশ নিজের শক্তিশালী হাতে খুলেছে তা আর অন্তিক চাইলেই উঠে পড়বে নাকি?
আমজাদ সাহেব ধীরে হেঁটে এসে বসেন অন্তূর পাশে। বেশ খানিকক্ষণ কেউ কথা বলে না। শ্বাস ফেলে না কেউ-ই। অন্তূর ভেতরে মৃত্যুর নেশা জাগে। আর মৃত্যুর আগে পাশে বসা আব্বুর চেহারাখানা একবার দেখতে চায় সে।
-“বিয়ে দিতে চায় ওরা তোকে, অন্তূ। করে নে বিয়ে।ʼʼ নির্মল কণ্ঠস্বর আমজাদ সাহেবের।
অন্তূ হেসে ওঠে, “মেরে ফেলো আব্বু, আমায়। তোমার হাতে মরণ আমি ধন্যবাদান্তে গ্রহন করব। দাফন করে ফেলো। মিটিয়ে দাও আমার নাম।ʼʼ
-“বিয়ে করে নে, অন্তূ।ʼʼ
-“আমায় তুমি মেরে ফেলো।ʼʼ
-“অন্তূ বিয়েটা ক…ʼʼ
-“আমায় মেরে ফেলো, আব্বু।ʼʼ
-“বিয়ে করে নে, অন্তূ…ʼʼ
অন্তূ চেঁচিয়ে উঠল, “মেরে ফেলো তুমি আমায়। নিজহাতে মারো। এমনিতেও তো বেঁচে নেই, তবুও আমায় মারতে এত দ্বিধা! অথচ যখন বেঁচে ছিলাম, কেউ বাঁচানোর ছিল না এই আসমান-জমিনে। তুমিই বা কেন সহমর্মিতা দেখাচ্ছ, আব্বু? মরা মেয়েকে মুক্তি দাও। তার আত্মাটা আঁটকে আছে, খুব ছটফটাচ্ছে ছাড়া পেতে।ʼʼ
এতক্ষণে অন্তূ তার হৃদয়ের ক্ষরণ টের পেল। অন্তূদের কান্না বিশেষ মানুষেরা ছাড়া কেউ দেখতে পায় না। সে কখনও রাবেয়ার সামনেও কাঁদে না। রাবেয়ার গুনগুনানি তার কানে আসছে। এক ধারে বসে হু হু করে কাঁদছেন।
আমজাদ সাহেব অন্তূর হাতটা নিজের হাতের ওপর রেখে বললেন, “কোন অপরাধে মারি তোকে বলতো, অন্তূ? আমার মতো দূর্বল, হাতকাটা বাপের ঘরে জন্মানোর অপরাধে? তোকে মেরে নিজেকে জবাব কী দেব, আমি? শিখিয়ে দে। যে পাপ তুই করতে পারিস না, সেই না করা পাপের শাস্তি দেবার উপায় বল।ʼʼ
-“পাপ করেছি, আব্বু! চুপ থাকতে না পারার পাপ। ভেতরের ঘেন্নাকে ভেতরে চেপে মিথ্যা তোষামদ না করতে না পারার পাপ। তোমার শেখানো আদর্শ আজ খুব ভারী পড়ছে আব্বু আমার ওপর। এত পাপের পরেও পাপ নেই বলছো?ʼʼ
-“পাপ করলে তোকে আমি মেরে ফেলতাম। করিসনি তুই, তাই বাঁচিয়ে রাখছি, আর তার বদলে এক নিকৃষ্ট মৃত্যু দিচ্ছি তোকে। গ্রহণ কর।ʼʼ
-“কী আশ্চর্য, আব্বু! মৃত্যুটা মৃত্যু হোক, এরকম নরকবাস দিচ্ছ কেন?ʼ
-“এটা নীতি, অন্তূ। অপরাধ না করা মানুষেরা আজকাল কঠোর সাঁজা ভোগ করে। অবশ্য তাদেরও অপরাধ আছে। তাদের অপরাধ—তারা অপরাধ করেনি। তুই নিজে যখন জানবি তুই পবিত্র, এটা ভেবে বেঁচে থাকাটা কি বাহাদুরী না? আর যে অপরাধ করিসনি, তা মেনে নিয়ে ভীরুর মতো মরে যাওয়া কি তোর জন্য ধিক্কারজনক না?ʼʼ
অন্তূ কথা বলে না। আব্বুর কথাগুলো খুব নিষ্ঠুর।
-“বীরেরা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালায় না, অন্তূ। তুই পালাতে চাইছিস। তুই মরে গিয়ে প্রমাণ করতে চাইছিস–তোর ভেতরে জীবনের সম্মুখীন হবার শক্তি নেই। বিয়ে করে নে, অন্তূ।ʼʼ
অন্তূর বাঁধ ভাঙে। কান্নারা ছিটকে আসে, “আমায় তুমি আর এ কথা বোলো না, আব্বু। আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার ব্যথা লাগছে।ʼʼ
-“আমার লাগছে না, অন্তূ। কী করি বলতো?ʼʼ
-“তুমি খুব নিষ্ঠুর, আব্বু!ʼʼ
-“তোকেও হতে হবে, অন্তূ। বানাতে তো তা-ই চেয়েছি ছোট থেকে। সেসব প্রয়োগ কর।ʼʼ
-“তুমি এত কঠোর হয়োনা আব্বু আমার ওপর। আমায় জিবীত পুড়য়ে ভস্ম করে দাও। আচ্ছা, তুমি যা বলছো, তা তুমি সহ্য করতে পারবে?ʼʼ
অন্তূর দিকে এতক্ষণে প্রথমবার তাকান আমজাদ সাহেব, “না পারলেই বা কী?ʼʼ
অন্তূ মাড়ি আঁটকে চোখ বোজে। আব্বুর চোখে তাকানোর ভয়াবহ কাজ সে করতে পারবে না। চোখ বুজে কেমন করে যেন ডেকে ওঠে, “আব্বু!ʼʼ
-“ডাকছিস কেন, অন্তূ? হাতবাঁধা বাপদের তোদের মতো অন্তূরা ডাকবে না।ʼʼ
-“দোষ তো তোমার। জানো না, আমি তোমায় ছাড়া কত নিরুপায়! তবু একা রেখে গেলে? দেখেছ আমি বলতাম তুমি ছাড়া এক মুহুর্ত টিকবো না আমি। প্রমাণ হলো তো! তুমি স্বার্থপর কেন, আব্বু?ʼʼ
-“নিয়তির দোষ দিবি না? প্রকৃতি আর নিয়তি দেখ ঠিক জিতে গেল অপরাধ কোরে। তুই ওদের দোষ দিলি না। দোষ দিচ্ছিস আমার।ʼʼ কেমন করে যেন হাসলেন আমজাদ সাহেব।
-“তুমি আমায় মেরে কেন ফেলছো না?ʼʼ
-“মারছি না তো কী করছি? এইতো বেশ কয়েকবার মরতে বললাম। আবার বলছি—বিয়ে করে নে, অন্তূ।ʼʼ
অন্তূ চেপে ধরে আব্বুর কম্পিত হাত, শক্ত করে মুঠো করে ধরে রাখে, ছাড়ে না। মাথাটা নুইয়ে হু হু করে কাঁদে বাপের কাছে। এতক্ষণ তার সাথে যা যা অন্যায়-অবিচার হয়েছে সবকিছুর নীরব নালিশ জানায়। বাপ একবারও জিজ্ঞেস করে না, তুই কী করেছিস, অন্তূ? সন্দেহ শব্দটা অচল এখানে, এখানে কথা জবানে নয়, চোখে হয়। এই সম্পর্কটা অগাধ আশ্বাসের, ভিত্তিটা নিগূঢ় বিশ্বাসের।
-“অন্তূ, তোকে কাঁদতে দেখতে ভালো লাগে। না আমার। ছোটবেলা থেকে কাঁদতে শেখাইনি তোকে।ʼʼ
অন্তূ চোখ মুছল, “কাঁদছি না। ও কথা আর বলবে না। তুমি শুধু হাতটা ধরে থাকো আমার। ছাড়বেনা কিন্তু।ʼʼ
-“আমি বলব। যতক্ষণ তুই ‘হ্যাঁ’ না বলবি, আমি বলব।ʼʼ
অন্তূ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকায়। ভয় এবং ভরসাহীনতা পেয়ে বসে এই মুহূর্তে অন্তূকে। সে ভুলে যায়, এটা তার আব্বু। আব্বুর হাতে চেপে রাখা হাতটা শিথিল হয় তার, এই অসহায়ত্ব অন্তূর সইতে পারে না। ওমনি আরও শক্ত বন্ধনে চেপে ধরেন আমজাদ সাহেব হাতটা।
গাঢ় চোখে চেয়ে বলেন, “লোকেরা কী বলেছে, ভুলে যাচ্ছিস? ব্যবসা যারা করে, তারা বিয়ে করতে চায়না।ʼʼ
অন্তূর চোখের পাতা ও থুতনি থরথর করে কেঁপে ওঠে। আমজাদ সাহেবের ভেতরের আগুন জ্বলছে। সেই আগুন স্পর্শ করে অন্তূকে। সে সজল চোখে চেয়ে থাকে মেহেদীরঙা চাপদাঁড়ি ভূষিত এক মহাপুরুষের দিকে। তার চোখে মহাপুরুষই বটে! সে জীবনে এমনই এক মহাপুরুষ চেয়েছিল। তবে চাওয়া আর পাওয়ার একটা জটিল শত্রুতা আছে। অতএব এ দুটো একত্রে মেলে না কভু। বরাবর পিছলে যায় দুটো পরস্পর থেকে।
আমজাদ সাহেব যত্ন করে ওড়নাটা তুলে অন্তূর মাথায় দিলেন। আলতো হেসে বললেন, “হুমায়ুন আহমেদ কী বলেছিলেন জানিস,
~ কখনও তোমার মুখটা বন্ধ রাখতে হবে, গর্বিত মাথাটা নত করতে হবে, স্বীকার করে নিতে হবে যে তুমি ভুল। এর অর্থ এই নয় যে, তুমি পরাজিত। এর অর্থ তুমি পরিণত এবং শেষবেলা বিজয়ের হাসিটা হাসার জন্য ত্যাগ স্বীকারে তুমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।ʼʼ
কাজী সাহেব কাবিননামা লিখলেন,
‘জাভেদ আমিরের একমাত্র পুত্র জয় আমিরের সঙ্গে—
থামলেন কাজী সাহবে। জয়কে জিজ্ঞেস করলেন, “দেনমোহর কত বাঁধবো, বাপ?ʼʼ
-“কোটিখানেক বাঁধেন, আমি কি কোনোদিন ছেড়ে দেব নাকি?ʼʼ
কাজী সাহেব বললেন, “ছেড়ে দেয়ার সময় দেনমোহর আদায়ের হুকুম নেই। নিয়ম হলো, দেনমোহর পুরো মিটিয়ে তবে স্ত্রীর কাছে যেতে পারবে, বাবা।ʼʼ
-“তাইলে এক টাকাও বাঁধার দরকার নাই।ʼʼ
দ্রুত ঘাঁড় নাডে জয়। কবীর আর রাহাত ফিক করে হেসে ফেলল। হামজা বলে, “বাঁধেন লাক্ষ দশেক। পরিশোধ করেই কাছে যাবে।ʼʼ
উপস্থিত জনতা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। কত উদার পাটোয়ারী পরিবার! এত উদার কেন এরা? একটা মেয়ের জীবনে আর কী চাই? সবই তো দিচ্ছে পাটোয়ারী পরিবার! অথচ ঘরে তুলছে চরিত্রহীন এক মেয়েকে!
কবুল বলার আগ মুহুর্তে অন্তূ আব্বুর দিকে তাকায় আমজাদ সাহেব মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রাবেয়া, চোখের পানি ছলছল করছে, কিন্তু পড়ছে না। পাশে অন্তিক। তার দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব ছাড়াও আরও কিছু। অপলক অন্তূকে দেখছে।
জয়কে কবুল বলতে বলা হলে সে বেহায়ার মতো ঘোষনা করে কবুল পড়ল। যেভাবে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষন দেয়। ছেলেরা একসাথে ধ্বনি দিয়ে উঠল, “জয় বাংলা! জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু!ʼʼ
মুখে মিষ্টি তুলে দিলো হামজা। মানুষ খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ পড়ে, জয় মুখে মিষ্টি নেবার আগে ‘বিসমিল্লাহʼ বলার বদলে স্লোগান দিলো—’জয় বাংলা।ʼ এরপর গালে মিষ্টি ঢুকালো। ছেলেরা তার সাথে সমস্বরে স্লোগান দিলো, “জয় বাংলা!ʼʼ
বিয়ের আসর নয়, রাজনীতির মঞ্চ এটা। বিশাল এক সম্মেলন চলছে যেন।
কাজী সাহেব কয়েক বার ‘কবুলʼ বলতে বললেও অন্তূ শুনতে পায় না। আব্বুর দিক থেকে চোখ ফেরে না তার। আব্বু কিছু বলুক, কিছু করুক, একবার চোখ তুলে দেখুক অন্তূকে বলি হবার আগে! তাকালেন না আমজাদ সাহেব।
কবুল বলতে ঠোঁট নাড়াতে গিয়ে আবার থামে। আমজাদ সাহেব ধীর পায়ে ভেতরে পা বাড়ালেন। তিনি বসে থাকলে ওই অন্তূ জীবনেও কবুল পড়বে না। পাগলিটাকে কীভাবে বোঝাবেন–উনার কিছু করার নেই! স্বয়ং নিজহাতে বোধহয় খু-ন করে এলেন অন্তূকে। সেই লাশ দেখতে ভালো লাগছিল না। হাতটা মেলে ধরলেন চোখের সামনে। উনার মনে হলো, র-ক্ত লেগে আছে তাতে। অন্তূর কলিজা চুইয়ে পড়া র-ক্ত।
আস্তে করে শুনতে পেলেন, পেছনে অন্তূ প্রাণহীন স্বরে বলছে, ‘কবুল।ʼ কাজী সাহেব আলহামদুলিল্লাহ বললেও অন্তূ বলেনি।
হুড়মুড়িয়ে বসে পড়লেন আমজাদ সাহেব মেঝের ওপর দরজার কপাট আঁকড়ে ধরে। অন্তূ আজ ফুরিয়ে গেছে, বাপের মান রাখতে, নিজেকে একবার গজিয়ে তোলার প্রয়াসে অন্তূ আত্মহত্যা করেছে। অন্তূ জয় আমিরকে ‘কবুলʼ করেছে।
চলবে…
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২৬.
রাত দশটা আটত্রিশ মিনিট। হামজা জয়কে নিয়ে অন্তূদের বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ইশার আজানের পর। জয়ের আজ পলাশের হোটেলে যাবার কথা ছিল। পলাশ অপেক্ষা করছে। কিন্ত হামজার সাথে সে এলো আব্দুর রহিম মেডিকেল হাসপাতালে। বহিঃবিভাগ দিয়ে ঢুকে এগোতেই জরুরী বিভাগ। কেচিগেইটের ওপাশে বেঞ্চিতে বসে আছেন লোকজন। কেউ কেউ বারান্দার গ্রিল ধরে আছে। উঁকি-ঝুঁকি মারছে ওয়ার্ডের ভেতরে। পাঁচশো শয্যার এই বিশাল হাসপাতালে লতিফকে খুঁজে পাওয়া সহজ কাজ নয়। কিন্তু আজ বিকেলে কেবিনে শিফ্ট করা হয়েছে লতিফকে। হামজার নির্দেশ।
কেবিনের দরজা চাপানো ছিল। স্পেশাল কেবিন রুম। হামজা ঢুকতেই লতিফের স্ত্রী আসমা উঠে দাঁড়াল এককোণে। হামজা বাঁধা দিলো, “আপনি বসুন, ভাবী। লতিফ ভাইয়ের পাশে বসুন আপনি। জয়..ʼʼ
জয় বারান্দায়। সামনে দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, সে মনোযোগ দিয়ে দেখল যতদূর দেখা যায়। দেখতে ভালো লাগল। তবু দুটো বাজে গালি দিলো মনে মনে। হাসপাতালে কেউ এভাবে পটের বিবি সেজে আসে? যখন সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, কোমড়টা ন্যাকামিতে বেশিই দুলছিল। জয়ের ইচ্ছে করল, ধপ করে একটা কোমড়ের ওপর লাত্থি মেরে কোমড়টা সোজা করে দিতে। আবার ভালোও লাগছিল দেখতে।
লতিফ ঘুমাচ্ছে। তার এক পায়ে রড-রিং গেঁথে দেয়া হয়েছে, অপর পায়ে অস্ত্রোপচারের দরকার পড়েনি, হাঁটু অবধি ব্যান্ডেজ। জয়ের হাতের চর্চা কমে যাওয়ার ফল। ডানপায়ে রিংটা গেঁথে আছে যেখানে, দেখলে কেমন গা শিরশির করে ওঠার মতো। এক পা ফুলে চার পায়ের সমান হয়েছে। অচেতন পড়ে আছে লতিফ। জয় জানে, ডানপায়ে যখন সে প্রথম আঘাতটা করে, দশ মিলির মোটা রডের আঘাতে জয়ের সমস্ত শক্তি ক্ষয় হয়েছিল। হাঁটুর নিচে ফিমারের হাড্ডিগুলো চূর্ণ হয়ে গেঁথে যাবার কথা ভেতরে মাংসপেশির ভেতরে। তা-ই হয়েছে। এই রিং এই পা ঠিক করতে পারবে বলে মনে হয় না। পরের আঘাতটা করার সময় দয়া করেছে জয়।
হামজা লতিফের ছোট্ট মেয়েটাকে কোলের ওপর বসিয়ে আদর করছিল। হামজার কাছে বেশকিছু চকলেট পেয়ে বাচ্চাটি খুব খুশি। হামজা আসমাকে সান্ত্বণা দিলো, ভাবী, আপনি কাঁদবেন না। যারা লতিফ ভাইয়ের এই হাল করেছের প্রত্যেকে তাদের ন্যায্য শাস্তি পাবে।
আসমা কেঁদে ফেলল, “কে করছে এই কাজ বলেন তো? এইবারও কি..ʼʼ
-“এবারও মাজহার। আগেরবার গুলি করেছে, এবার পায়ে রডের আঘাত। কেন করেছে জানেন? যাতে লতিফ ভাই আর আমাদের কাজে না লাগতে পারে। আচ্ছা ভাবী, পুলিশ আসলে আপনি কি মাজহারের বিরুদ্ধে বয়ান দিতে পারবেন?ʼʼ
মহিলার চোখে-মুখে দ্বিধা। মহিলাকে চুপ থাকতে দেখে হামজা হতাশ হয়, “তাহলে আর কী? এভাবেই আমার লোকগুলো আহত হতে থাকবে ওদের হাতে। যেহেতু আপনিও বয়ান দিতে পারবেন না।ʼʼ
মহিলার ওপর হামজার চাল খাটলো। মহিলা বলল, “আমি দেব বয়ান। আপনের কথা চিন্তা করতেছি না। আমার স্বামীরে ওই হারামজাদা দুইবার এমনভাবে জখম করছে, তারে পুলিশে ক্যান, আমি তারে ফাঁসিতে ঝোলাবো।ʼʼ
দুই ভাই প্রসন্ন হাসল। জয়ের তো কান্না পেয়ে যাচ্ছিল মহিলার এই বাহাদুরীতে। এখানে মূলত তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর কথা চলছে। মহিলা জানলে তার সামনে বলতো না এভাবে।
হামজা বলল, “এমনও হতে পারে, দেখবেন মাজহার আসবে দেখতে লতিফ ভাইকে। ও কিন্তু স্বীকার করবে না, কাজটা ও করেছে। নিশ্চিত দোষ দেবে আমার অথবা জয়ের। আমার কথা মিলিয়ে নেবেন।ʼʼ
অপারেশনের বিল মেটানো হয়নি। হামজা কল করে দেয়ার পর বকেয়াতে অস্ত্রপচার সম্পন্ন হয়েছে। আসমার সামনে হামজা কয়েকটা বড় বড় বান্ডেল তুলে দিলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হাতে। কমপক্ষে ওখানে লাখ পাঁচেক টাকা তো হবে। অথবা হতে পারে তারও বেশি। আসমা কৃতজ্ঞতায় সজল চোখে চেয়ে থাকে সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত টগবগে পুরুষটির কর্তব্যপরায়ন শক্ত দেহের পানে। চলে আসার সময় মেয়েটার কপালে গাঢ় একটা চুমু খেয়ে আসমার হাতে হাজার দশেক টাকা ধরিয়ে দিলো হামজা। প্রয়োজনীয় ওষুধ-পত্র, অন্যান্য দরকারে খরচ বাবদে। তাছাড়া সকালে তো আবার আসছে সে!
হামজা সরদার পরিবারের কাছে অনেক আগে শিখেছিল—বিশ্বাসঘাতকেরা এই জগতে সবচেয়ে নৃশংস শাস্তির দাবিদার। এদের ওপর দয়া করা এক প্রকার পাপ। প্রাণের হত্যায় যতটা না লোকসান আছে তার চেয়ে কঠোর হত্যাকান্ড হলো বিশ্বাসের হত্যা। প্রাণের হত্যাকারীর শাস্তি যদি মৃত্যু হয়, বিশ্বাসের হত্যাকারীর শাস্তি আরও শোচনীয় হওয়া উচিত। যেটা জয় করেছে। লতিফ মরলে মুক্তি পেয়ে যেত, অথচ এই অবস্থায় সে প্রতিক্ষণে মরবে। এটা ওর শাস্তি। সাথে হামজার কার্য হাসিল।
গাড়িতে ওঠার সময় জয় দাঁড়িয়ে রইল ফুটপাতে।
হামজা জিজ্ঞেস করল, “তুই বাড়ি ফিরবি কখন?ʼʼ
-“ভালো লাগতেছে না। তুমি যাও। আমি হোটেলে যাব।ʼʼ
জয়ের শরীরে পাতলা একটা ডেনিম জ্যাকেট। সাদা লুঙ্গি পরনে। হামজা শরীরের চাদটা খুলে ছুঁড়ে মারে জয়ের শরীরে, “এটা পেঁচিয়ে নে। ঠান্ডা লাগলে গালে-মুখে থাবরাবো ধরে।ʼʼ
জয় চুপচাপ চাদর গায়ে জড়ায়। গাড়ি ছাড়ার আগ মুহুর্তে গাড়ির জানালায় হাত রাখে, “কিছু টাকা দাও। পকেট খালি আমার।ʼʼ
হামজা পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে জয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “হোটেলে যাচ্ছিস, থামাচ্ছি না। তবে শুতে একা যাস বিছানায়। আজ কিন্তু বিয়ে হয়েছে তোর! তোর বউয়ের সামনে ছোট যেন না হতে হয় আমাকে তোর কুকীর্তির জন্য।ʼʼ
কবীর কথাটা বুঝে ফিক করে হেসে উঠে জয়কে খোঁচায়, “বিছানায় একা যাইয়েন, ভাই। এখন কিন্তু ভাবী আছে আমাগো।ʼʼ
অথচ জয় নিশ্চুপ। স্থির চোখে বিদায় জানায় হামজাকে। আজ তার রসিকতার ছুটি।
গাড়ি যখন আড়াল হলো, তখনও জয় দাঁড়িয়ে রাস্তার পাশে। সে কোথাও যাবে বলে মনে হলো না। কবীরের কাছে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে লাইটার জ্বালায়। কবীর চেয়ে দেখে তা। জয় সচরাচর সিগারেট টানে না। তার সিগারেটে টান দেয়ারও কিছু বিশেষ পরিস্থিতি আছে। কোনো ব্যাপারে হয়রানী বোধ হলে অথবা মন অশান্ত এবং দুষ্ট সত্ত্বা শান্ত থাকলে আনমনে সিগারেটে ঠোঁট লাগাতে দেখা যায় তাকে।
উদাস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ব্রিজের দিকে এগিয়ে যায় জয়। কবীর জিজ্ঞেস করল, “ভাই? আজকে মেয়েটার সাথে যা করলেন, তা কি ঠিক….ʼʼ
জয় রক্তখেঁকো পশুর মতো দাঁত খিঁচে ওঠে, “চুপ! একদম চুপ। ওই বিষয়ে কোনো কথা কইবি না। তোর খুব মায়া হইতেছে ওই শালীর জন্য, হ্যাঁ? তোরও হাল ওর মতো করি? তারপর দুজন একসাথে গলাগলি ধরে কাঁদবি?ʼʼ
কবীর বুঝল না, জয়ের কী হয়েছে। চুপচাপ সাথে চলল। সঙ্গ ছাড়া যাবে না। জয় গিয়ে ব্রিজের কার্নিশ ধরে দাঁড়ায়। সিগারেটের ধোঁয়াগুলো মিশে যায় অন্ধকারে। সোঁ সোঁ করে গাড়ি চলে যাচ্ছে পেছন দিয়ে। কবীর দাঁড়িয়ে আছে পাশে।
জয় বিরক্ত হলো, “আমার সাথে কী তোর? যা, বাড়ি যা। ক্লাবঘর তালা মেরে চাবি হামজা ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি গিয়ে ঘুমা। আমার সাথে থাকার কিছু নাই।ʼʼ
কবীর কোনো জবাব দেয় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে জয়ের পাশে। তার সন্দেহ, জয় হোটেলে যাবে না। কিন্ত কেন? হোটেলটা পলাশের তাই? এরকম ভয় যে জয়ের মাঝে নেই তা সে জানে। পলাশ চরম বেহায়া। হাজার হলেও আবার জয়কে ডাকবে। জয়কে ছাড়া তার আসর জমে না।
জয় চেয়ে থাকে অন্ধকারের দিকে। ব্রিজের নিচের ছোট ছোট খুঁপরিগলোতে হলদেটে লাইট জ্বলছে। অথচ জয়ের চোখে ভেসে ওঠে, অন্তূ আর আমজাদ সাহেবের বসে থাকার দৃশ্যটুকু। হিংসায় রক্ত টগবগিয়ে ওঠে ওর। ও শেষ কবে জাভেদ আমিরের কোলে চড়েছিল? তখন এতটাই ছোট ছিল যে সেসব উপভোগ করার মতো মানসিক বিকাশ ওর হয়নি। অন্তূর সাথে ওর বাপের সাথে যা ভাব! সব ন্যাকামি যত! কী থেকে কী হয়ে গেল!
শুধু ইচ্ছে করছিল, পাড়ার লোকগুলোর একেকটাকে কেটে টুকরো করতে। ওদের ন্যাকামি আর হামজার সম্মান বাঁচাতে আজ বিয়ে করে আসতে হয়েছে।
তরুর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোটা অস্বস্তিকর হবে। এটাই মূল কারণ রাতটা বাড়ি না ফেরার। যত রাতেই ফিরুক, দেখা যাবে মেয়েটা সোফার ওপর বসে ঝিমোচ্ছে। রাতের খাবারটা খায়নি, জয়ের সাথে খাবে বলে। জয়কে খেতে দিতে হবে বলে ঘুম আসলেও ঘরে গিয়ে শোয়নি। জিজ্ঞেস করবে, “কোথা থেকে আসছেন? এত রাত করে ফিরতে হবে কেন? কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?ʼʼ
জয় তরুকে মিথ্যা বলতে পারে না। কোনোদিন বলেনি। মেয়েটার কাছে জয় খুব যত্নের, ওর সাথে জয় কোনোদিন বিরূপ হয়নি। আজ সত্যি বলে নিজের নোংরা জীবনের একমাত্র প্রতিক্ষিণীর মন ভেঙে গুঁড়ো করতে তার ভালো লাগবে না। মেয়েটা ওর একাকীত্ব সইছে, কিন্তু নিজে না, অথচ অন্য কাউকে জয়ের পাশে মানতে পারবে না।
জয় হেঁটে ব্রিজের নিচের খুঁপরিগুলোর দিকে এগোয়। এখন ওই খুপরিতে বসবাস করা ভূমিহীন লোকগুলোর বাড়িতে যাবে, ওদের ঘুম কামাই করিয়ে আবোল-তাবোল কথা বলবে রাতভর। কারও বাড়িতে ছোট্ট পিকনিকের আয়োজনও করতে পারে। কবীরকে বলবে, এই এই জিনিস কিনে আন। মাটির চুলোর পাশে বসে নিজে রাঁধবে, শেষ রাতে সবাইকে সাথে নিয়ে খাবে। সারারাত গলা ভেঙে গান গাইবে। ফজরের আজানের সময় বাড়ি ফিরবে। লোকগুলোও সায় দেয়। বরং চরম খুশি হয় এই পাগল লোকের হুটহাট উপস্থিতিতে।
এসব ভেবে কবীর বিরক্তিতে মাথা ঝারা দেয়। হতাশ শ্বাস ফেলে জয়ের পেছনে যায়। পিছু সে ছাড়তে পারবে না, কেন পারবে না জানে না। শুধু জানে জয়ের পেছনে যেতে হবে তাকে, সাথে থাকতে হবে।
—
রাত বারোটা পার। কুয়াশায় বারান্দার গ্রিল অবধি দেখা যায় না। অন্তূ বসে থাকে বারান্দার মেঝের ওপর ঘরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। সারারাত হু হু করে উত্তুরে হাওয়া নাকে-মুখে ঢুকেছে। ঠান্ডার চোটে পিঠ বেঁকে এসেছে, সেসব কিছুই গায়ে লাগেনি অন্তূর। সন্ধ্যারাতে বিয়ে পড়িয়ে রেখে কাজী সাহেব বেরিয়ে গেলেন। একে একে লোকজন নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করে তৃপ্ত মনে নিজ নিজ ঘরে ফিরল।
বেরিয়ে যাবার সময় হামজা বলে গেছিল, “এখানে থেকে পরীক্ষাটা শেষ করো। আমি জানি তুমি আজ যেতে চাইবে না। যেতেও বলছিও না আপাতত। তবে আমাদের বাড়ির বউয়েরা বাপের বাড়িতে থাকে না, রেওয়াজ নেই। পরীক্ষা শেষ হওয়া অবধি থাকো, এবং নিজেকে শান্ত করো। লোকে যা-ই জানুক, তুমি জানো কিছুই হয়নি। সো ডোন্ট বি আপসেট! হু!?ʼʼ
লোকটা দেখতে অতিকায় শুদ্ধ-বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ। এই ছদ্মরূপ তার আসল প্রকৃতিকে আড়াল করেছে। তবে আসল হামজাটা কে? কী? কেমন?
আজ অন্তূর এই মরণক্ষণে আমজাদ সাহেব এলেন না অন্তূর কাছে। আসতে নেই। রাবেয়া এসে পাশে বসলেন। অন্তূ একটুও তাড়াহুড়ো করল না চোখের পানি মুছতে। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না তা। কিন্তু কথা বলতে তার ভয়। কণ্ঠস্বর ও নাক আটকে আছে। আম্মুর সামনে কাঁদতে নেই।
-“ঘরে যা, অন্তূ।ʼʼ
অন্তূর আস্তে কোরে শুয়ে পড়ল শীতল মেঝের ওপর। মাথাটা মায়ের কোলে রেখে বলল, আজ তোমার বোঝা হালকা হলো, “আম্মা। তোমার অন্তূ বিয়ে করবে না করবে না, দেখো হয়ে গেছে।ʼʼ
চুলে হাত বুলালেন রাবেয়া, “চুপ কর, অন্তূ। ওঠ, ঘরে চল। জ্বর বাঁধাবি?ʼʼ
-“আম্মা! কাঁদছো কেন? কাঁদার মতো কথা বললাম?ʼʼ
-“কাঁদতেছি না। ওঠ তো অন্তূ। থাপ্পর মারব কিন্তু একটা। এইখানে ঠান্ডা।ʼʼ
-“তাতে কী? ভালোই লাগতেছে। তুমি ঘরে যাও। তুমি বুঝবা না ঠান্ডার হাওয়ায় বসে থাকার আরাম। যাও যাও! আব্বু একা।ʼʼ
-“মরে যাইতে চাস? তাইলে আমারে আগে মার।ʼʼ কণ্ঠটা আবার ভেঙে এলো রাবেয়ার, “আমিই তো তোরে জন্ম দিয়ে পাপ করছি রে মা! তোরে জন্ম না দিলে এই দিন তোর জীবনে আসতোই না। আমার গর্ভের দোষ। ওঠ অন্তূ। কার কী হচ্ছে, জানি না। আমার কিন্তু সহ্য হইতেছে না শোন। ওঠ্!ʼʼ
অন্তূ উঠে বসে, “ধুরু! ভাবলাম একটু শীত বিলাস করব, এখানে ইমোশোনাল সিন চলছে। ওঠো, চলো। শুয়ে পড়ি।ʼʼ
অন্তূ মুখ-চোখ ধুয়ে এলো। পানি বরফের মতো ঠান্ডা। এসে বাচ্চা মেয়ের মতো বিছানায় শুয়ে কম্বল পেঁচিয়ে হু হু করে কেঁপে বলল, “ওরে ঠান্ডা রে! আম্মা লাইট বন্ধ করে দিয়ে যাও। সেই শীত, বাপরে!ʼʼ
রাবেয়া অন্তূকে কেমন করে যেন তাকিয়ে দেখলেন। অন্তূ ঠিক ছোটবেলার মতো কম্বল মুড়ি দিয়ে অল্প একটু মুখ বের করে ঠকঠক করে গা কাঁপাচ্ছে। যন্ত্রণা লুকোনোর ব্যর্থ চেষ্টা।
রাবেয়া চলে গেলে অন্তূ স্থির হয়ে গেল। কতক্ষণ অন্ধকারে ছাদের দিকে চেয়ে রইল। এই শীতের রাতে বুকে জ্বলা আগুনের সাহস খুব বেশি। এত ঠান্ডা, এত কুয়াশা তবু বুকের উত্তাপ গমগম করছে।
অন্তূ উঠে গিয়ে বারান্দার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। নিশ্চুপ এক মাঝরাত। ঝুপঝুপ করে বৃষ্টির মতো চোখের দুই কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। কান্না জমে বুকটা কাঁপছে। অন্তূ মাথাটা দেয়ালে ঠেকিয়ে বাইরের অন্ধকার কুয়াশার দিকে তাকিয়ে রইল নিথর চোখে।
তার জীবন, সম্মান, স্বপ্ন, আব্বুর মান-মর্যাদা সব শেষ। শেষটা সে করেছে। কেন সে গেছিল সেদিন জয় আমিরের সঙ্গে বেয়াদবী করতে গেছিল? এত বোকা হলে চলে? তা কিছুই রইল না। নাহ নিজেকে ক্ষমা করা যাচ্ছে না। অন্তূ আস্তে কোরে হাতের তর্জনী আঙুল তুলে বুকের মাঝখানটায় চেপে ধরল। সেখানে ভেঙেচুড়ে আসছে। শীত বাড়ছে। পা দুটো ঠান্ডায় অবশ হয়ে আসছে। অন্তূ একটা খেলা খেলার চেষ্টা করল। এই শরীরের যন্ত্রণা, এটা কি তার বুকের ব্যথার চেয়ে বেশি তীব্র নাকি কম?
জিতল বুকের ব্যথা। শরীরের ব্যথা অনুভূত হচ্ছে না। সে অনড় বসে রইল মাথা ঠেকিয়ে। ফজরের আজান হলো। উঠল না নামাজ পড়তে। বসে রইল ওভাবেই।
রাত দুটোর দিকে রোজকার মতো অন্তূকে দেখতে এলেন আমজাদ সাহেব। তিনি আজ লুকিয়ে দেখতে এসেছিলেন। অন্তূ ঘুমালে দেখে চলে যাবেন। কিন্তু অন্তূকে ওভাবে ঠান্ডার মাঝে বারান্দার মেঝেতে বসে থাকতে দেখে বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠল। অসুস্থ শরীর নিয়ে বসলেন অন্তূর পাশে।
অন্তূ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল না। ওভাবেই বলল, “ঠান্ডা লাগবে, আব্বু। ঘরে যাও।ʼʼ
-“তোর লাগছে না?ʼʼ
-“বুঝতে পারছি না। তুমি অসুস্থ, এখানে বসে থেকো না, যাও।ʼʼ
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমজাদ সাহেব জিজ্ঞেস করেন, “আমার বাপ হবার চেষ্টা করিস না, অন্তূ?ʼʼ
-“তা করব, আমার সাধ্যি? বাপ তো তুমি, আব্বু। স্বার্থপর বাপ। বাপ হিসেবে তুমিই ঠিক আছো। আমি তোমার বাপ হলে এমন করতাম না। ভুলভাল কিছু করতাম। তুমি ঠিক কাজ করেছ।ʼʼ
আমজাদ সাহেব কী অদ্ভুত এক হাসি যে দিলেন! হেসে বললেন, “কী করতি তুই, বল।ʼʼ
-“মেরে ফেলতাম।ʼʼ
-“তাই তো করেছি। বাঁচিয়ে রেখেছি?ʼʼ
অন্তূ এবার তাকায় আব্বুর দিকে। আমজাদ সাহেব থমকে গেলেন। চোখদুটো কালিতে ঢাকা। ত্বক তীব্র ঠান্ডায় বিদীর্ণ হয়ে সাদা রক্তশূন্য হয়ে উঠেছে। চোখদুটো ফোলা, চোয়ালের ওপর শুকনো জলরাশির ধারা। বাপের ভেতরটা কেমন করে উঠল!
-“এত কঠোর মৃত্যু বাপ হয়ে দিলে মেয়েকে? আব্বু, তোমার একটুও দয়া হলো না আমার ওপর?ʼʼ
এই যে অন্তূ! আবারও ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। তার একমাত্র দূর্বলতার জায়গা!
অন্তূ একটা আবদার করে, “আব্বু!ʼʼ
-“হু?ʼʼ
-“চলো, আমরা কোথাও চলে যাই, আব্বু। এখনও আকাশ ফর্সা হয়নি ভালোমতো। চলো আমরা দূরে কোথাও চলে যাই। যাবে আব্বু?ʼʼ
-“না, অন্তূ। আজ আমার খুশির দিন। আজ যা করেছি, এরপর আর কোনোদিন খারাপ থাকব না আমি। আমি এক কন্যাদায়গ্রস্থ বাপ ছিলাম। আজ সেই বোঝা ঝেরে ফেলেছি, বিয়ের বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি আজ। ঋণমুক্ত, দায়মুক্ত আজ থেকে আমি। চলে যাব কেন?ʼʼ
আমজাদ সাহেবের মেহেদী রাঙা দাড়ি বেয়ে একফোঁটা পানি বড় নিঠুরভাবে বয়ে গেল। অন্তূ খিঁচে চোখদুটো বুজে ফেলে। বাপের চোখের পানি সন্তানদের দেখতে নেই। অন্তূর চোখের উচিত এই মুহুর্ত থেকে নিজেদেরকে অন্ধ ঘোষনা করা।
অন্তূ আলতো করে মাথা ঠেকাল আব্বুর কাধে, “তোমাকে অভিনন্দন, আব্বু। তোমার অন্তূর বিয়ে হয়ে গেছে। জয় আমিরের সাথে। তোমার আর চিন্তা নেই।ʼʼ
আমজাদ সাহেব নিজের শরীর থেকে চাদরটা খুলে অন্তূর পা দুটো গুটিয়ে চাদরটা জড়িয়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে আবার আচমকা অন্তূর পায়ে হাত ছোঁয়ালেন, “আমাকে ক্ষমা করতে পারবি মা? মা রে! ও মা!ʼʼ
অন্তূ ছিটকে উঠল। দু’হাত দিয়ে আব্বুর পা জড়িয়ে ধরে আকুতি করে উঠল, “আব্বু, প্লিজ না। এত বড় পাপী কোরো না আমায়। আব্বু দয়া করো।
-“মা! আমার মা!ʼʼ
আমজাদ সাহেব কেমন করে ডেকে উঠলেন। অন্তূর হাত পা অনড় হয়ে উঠল। আমজাদ সাহেব অন্তূর হাতদুটো মুঠো করে ধরে বললেন, “মা! তুই আমার মা। আজ তোর ছেলেকে ক্ষমা কর মা। আজ তোর সাথে এই অধম বাপ যা করেছে, তুই আমায় বাঁধাস না না অন্তূ!ʼʼ
অন্তূ আর নিজেকে সামলায় কী করে? আব্বুর হাতের মুঠোর ওপর কপাল ঠেকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল, “পাগল হলে, আব্বু! এমন করছো কেন? বাঁচতে দেবে না আমায়? তুমি এমন করলে আমি কিন্তু কিছু করে ফেলব আব্বু! একদম আমাকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করবে না খবরদার!ʼʼ
ফস ফস করে কয়েকটা নিঃশ্বাস ফেলেন আমজাদ সাহেব। বুকের ওঠানামা বাড়ল। অন্তূ আৎকে উঠল, “কী হয়েছে আব্বু? প্রেশারের ওষুধ খাওনি?ʼʼ
আমজাদ সাহেব অস্থিরভাবে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে বললেন, “আমার কিচ্ছু হয়নি। মার খাবি এবার আমার হাতে কিন্তু! চাদর গায়ে জড়িয়ে বস।ʼʼ
-“আব্বু ওঠো! চলো ঘরে যাই। এখানে ঠান্ডা। ওঠো তো, তাড়াতাড়ি!ʼʼ
আমজাদ সাহেব আবদার করার মতো বললেন “এত ব্যস্ত হোস না তো, অন্তূ। বস, দুটো কথা বলি। আমি তোর সাথে কথা বলতে এসেছি, অন্তূ। অন্তূ? শোন, শান্ত হ। আমার কিচ্ছু হয়নি।ʼʼ
অন্তূ গলা উঁচিয়ে রাবেয়া বেগম ও অন্তিককে ডাকে। আমজাদ সাহেব তখনও আস্তে করে বলেন, “আমি আর কিছুক্ষণ তোর সাথে কথা বলি, অন্তূ?ʼʼ
অন্তূ ডুকরে ওঠে, “ওমন কেন করছো, আব্বু? এভাবে কেন কথা বলছো? কীসব বলছো তুমি? আব্বু, তুমি এমন করলে কিন্তু…ʼʼ
অন্তিক এলো। রাবেয়া দৌঁড়ে এলেন। আমজাদ সাহেব আবার বলেন, “অন্তূ, তোর সাথে আমার বোঝাপড়া আছে অনেক। একটু সময় দে আমায়, এত অস্থির হোস না। আমি কিছুক্ষণ বসি তোর কাছে? কথা বলি কিছুসময় তোর সাথে বসে?ʼʼ
—
ভোররাতে কলিং বাজছে পাটোয়ারী বাড়ির দোতলায়। -বালায়ে মেহেরবানী, দারওয়াজা খুলিয়ে…টিংটিংটুংটাং-
তরু চট করে চোখ খুলে উঠে দরজা খুলে দেয়। জয় ভেতরে এসে চাদরটা গা থেকে খুলে হাতে রাখে। তরু ভ্রু কুঁচকায়, এটা এখন তার ওপর ছুঁড়ে মারার কথা। অথচ জয় তাকাচ্ছেও না। তরু জিজ্ঞেস করে, “কোথায় ছিলেন এতক্ষণ? এই শেষরাত মানুষের বাড়ি ফেরার সময়?ʼʼ
জয় নিগূঢ় চোখে তাকায় মেয়েটার দিকে। তরু আবার জিজ্ঞেস করে, “এত দেরি কেন?ʼʼ
জয় চোখ সরায় তরুর চোখ থেকে, “খেয়েছিস রাতে?ʼʼ
-“খেয়েছি।ʼʼ
জয় হাসে, “এত খাস তবু মিথ্যা বলতে শিখিস না।ʼʼ
-“খেলে মিথ্যা বলা শেখা যায়?ʼʼ
জয় হাসে।
আস্তে কোরে বলল তরু, “আপনি খাবেন না?ʼʼ
জয় বলল না খেয়ে এসেছি। কেবল নিশ্চুপ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। জয় ভয় পায় তরুর অভিমানকে, ভয় পায় ওই মেয়ের চোখের কাতরতাকে। এই নিঃস্ব জীবনের একমাত্র যত্নকারী, আগলে রাখার মানুষ তরু জয়ের। সেই মেয়েকে দুঃখ দিতে জয়ের মতো পাষাণ্ডের কলিজা কাঁপে খুব।
খেতে বসে তরু আবার জিজ্ঞেস করে, “কোথায় ছিলেন? এত দেরি তো করেননা ফিরতে?ʼʼ
জয় হেঁটে ঘুরে এসে তরুর পাশে দাঁড়িয়ে জগ উঠিয়ে নিতে নিতে ফিসফিস করে বলে, “তোকে খু-ন করে এসেছি আজ।ʼʼ
তরু আৎকে ওঠে অজান্তে। জয় মিথ্যা বলে না। হাসতে হাসতে কঠিন সত্য বলে। তবুও হাসে, “আপনার হাতে আমার খু-ন, মঞ্জুর।ʼʼ
জয় মাথা নাড়ে, “উহু! যে উপায়ে আজ তোরে খু-ন করে আসলাম, তুই সইতে পারবি না।ʼʼ
তরু কথা বলেনা, চেয়ে থাকে জয়ের দিকে। জয় ঘুরে ওপারে গিয়ে টেবিলে বসে খাবারে হাত রেখে বলে, “বুঝলি তরু! তোরে ভালোবাসতে না পারাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এমন হইলেও হইতো, আমি তোরে তোর মতো করে ভালোবেসে, বিয়ে করে এক জীবন পাড়ি দিতাম।ʼʼ
তরু ছটফটিয়ে ওঠে, “এসব কথা কেন উঠছে?
-“ওঠার কথা বলে উঠতেছে।ʼʼ
-“আমি কি কোনোদিন চেয়েছি ওভাবে? আপনি পারেননি, আমিও তো আর বলিনি। এভাবে তো চলছে বেশ! আমি আপনাকে চরম নির্লজ্জতার সাথে ভালোবাসি। আপনাকে ভালোবাসার সময় আমার আত্মসম্মান থাকেনা। এবার আবার জিজ্ঞেস করবেন না যেন কেন ভালোবাসি আপনাকে। আমি কিন্তু বলব না।ʼʼ
জয় হাসে, “আমি জিজ্ঞেস করলেই তুই বলবি।ʼʼ
-“জিজ্ঞেস করবেন আপনি?ʼʼ
-“করব। বল, কেন ভালবাসিস আমায়?ʼʼ
তরু মসৃণ হাসে, “তিনবোনের পর যখন আমি মায়ের গর্ভে, তখন বাপ ভেবেছিল এবার একটা ছেলে হবে। হলাম আমি। বাপ আমায় মানলো না। মায়ের পক্ষে সম্ভব হলো না আমাকে মানুষ করা। চলে এলাম খালার কাছে। চারবেলা খেটেছি, দুবেলা খেয়ে আশ্রিতার জীবনে মানুষ হয়েছি। হামজা ভাই পড়ালেন টুকটাক, তুলি আপার কাছে শুয়ে থেকেছি। আমারও শখ থাকতে পারে, একথা কারও স্বরণে আসেনি। তবে এক নোংরা মানুষের কাছে আমি দুটু চুলের ক্লিপ, একজোড়া হাতের চুড়ি, চোখের কাজলের স্টিক, চুলে গোঁজার ফুলের খোঁপা, ভারত থেকে আনা শাল চাদরখানা, নবীরবরণের শাড়ি, রাস্তার মোড়ের মামার দোকানের ঝালমুড়ি, বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া চালতার আচার—পেয়ে এসেছি কাল ধরে তার হাত থেকে। আমি যখন ছোট্ট ছিলাম, এ বাড়িতে এক ত্যাড়া ছেলের বাস ছিল। যার কাজের ঠিক নেই, কথায় রস নেই, লোকে বলে নিকৃষ্ট লোক সে। সেও বলে, আমি নাকি তার থেকে এসব আদায় করে নিয়েছি নিজের যত্ন দিয়ে। অথচ আমি ছোট ছিলাম। যত্ন করা বুঝতাম না। তুলি আপা একবার চুল ধরে মারতে এলো, সে গিয়ে তুলি আপাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে বলল, ‘ছোট মানুষ, ওকে মারবি না আর। নয়ত আমি তোর কান ফাটিয়ে হাসপাতাল করব।ʼ এবার বলুন, আমি তাকে যত্নে ভালোবেসেছি, নাকি ভালোবাসতে বাধ্য করেছে?ʼʼ
তরুর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। অথচ কথা আটকাচ্ছে না মেয়েটার। জয় তা দেখে হাসল। আজ সে এক মহাপাপ করে এসেছে। তার খুব আনন্দ লাগছে। কীসের যেন বিষাদ-আনন্দ আন্দোলনে নেমেছে জয়ের বুকে। ধীরে ধীরে তা সংক্রামক ব্যধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ভেতরে।
জয় জিজ্ঞেস করল, “আর কোনো কারণ নেই?ʼʼ
তরু চোখ মুছে হাসে, “আছে তো। মেয়ে মানুষ রহস্যমণ্ডিত, জানেন না? তারা কী থেকে যে কীসে আটকে যায়? কেউ কেউ কোনো পুরুষের গোপন নিঃসঙ্গতায় আটকে যায়। বাপ-মাহীন বেপরোয়া জীবনে আঁটকে যায়। যদিও তার পাপগুলোকে ক্ষমা করে নয়। আপনি পাপী, জঘন্য পাপী। আর আমি সেই পাপীর নির্লজ্জ প্রেমপিপাসী। সাহিত্যিক কথাবার্তা না?ʼʼ
দুইজন হো হো করে হেসে ফেলে। তরুর চোখে পানি, জয়ের চোখ জ্বলছে, লাল হয়ে উঠেছে চোখদুটো। কিন্তু জয় কাঁদতে পারে না, কারণ সে কাঁদতে শেখেনি, কাঁদা ব্যাপারটা কেমন হয় সে জানে না। অনেকক্ষণ দু’জন হাসল মাথা নিচু করে।
জয় যখন খাওয়া শেষ করে ঘরে যায়, তখন ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে মসজিদগুলোতে। সে গিটারটা নিয়ে বারান্দায় বসে। কুয়াশা যেন মোটা চাদরের মতো প্রকৃতিতে বিছিয়ে আছে।
তরু ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে আস্তে করে কোয়েলের পাশে। তার ওপাশে তুলি ঘুমাচ্ছে। টুংটাং গিটারের শব্দের সাথে ভেসে আসছে জয়ের ভাঙা গলার আওয়াজ,
–আমি বা কে, আমার মনটা বা কে….
আজও পারলাম না, আমার মনরে চিনিতে..
ও পাগল মনরে! মন কেন এত কথা বলে….
আমি যত চাই আমার মনরে বোঝাইতে,
মন আমার চায় রঙের ঘোড়া দৌড়াইতে..
ও পাগল মনরে..
চলবে…
[ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন]
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২৭.
বিপদের সময় দীর্ঘায়িত হয়। সেদিন সকাল হতে বোধহয় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লেগেছিল।
অন্তূর বারান্দাতেই আমজাদ সাহেব হরহর করে বমি করে ফেললেন। খাওয়া নেই সারাদিন, বমিতে শুধু পিচ্ছিল মিউকাস জাতীয় পদার্থ উঠে আসছিল। বেশ কয়েকবার বমির উপক্রম হলো, দু’বার বমি করলেন।
উনাকে তুলে এনে অন্তূর বিছানায় শুইয়ে দেয়া হলো, তখন রাত সাড়ে তিনটার মতো বাজে। উনি চোখে ঝাপসা দেখছিলেন, চোখের সামনে দুনিয়াটা ঘুরছিল চরকীর মতো। চোখের শিরায় রক্ত জমে উঠল। চোখের মণি হলুদাভ-লালচে হয়ে উঠল। প্রেশারেরওষুধ খাওয়ানোর পরেও রাতের বেকায়দা সময়ে কোনো রকমের উন্নতি দেখা গেল না উনার শরীরে।
অন্তিক বেশ কয়েকবার গিয়ে ঘুরেও গাড়ি পেল না। সময়ের সাথে সাথে আমজাদ সাহেবের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠছিল। অন্তূ এবং রাবেয়া বেগম উনার হাতে-পায়ে তেল মালিশ করে দিলেন। প্রচুর ঘামছিলেন আমজাদ সাহেব। শীতের রাতে উনার গলা ঘেমে ভিজে উঠেছিল। অন্তূ আন্দাজ করল, ব্লাড-প্রেশার ১৮০/১২০ পেরিয়ে গেছে। ওষুধ খাওয়ানোর পরেও তা ডাউন করছিল না।
সকাল ছয়টায় যখন উনাকে হাসপাতালে ভর্তি করা গেল, তখন উনার ভেতরে যেসব উপসর্গ প্রকাশ পাচ্ছিল, অন্তূর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল তাতে। আমজাদ সাহেব মাথার ব্যথায় ছোট বাচ্চার মতো ছটফট করছিলেন। চোখে দেখছিলেন না। অন্তূকে একবার রাবেয়া বলে ডেকে উঠলেন। অন্তূ অনিয়ন্ত্রিতভাবে অন্তূ ডুকরে ওঠে তখন।
খানিক বাদে বোঝা গেল উনার একপাশ অকেজো হয়ে এসেছে বোধহয়। নিথর লাগছে ডানপাশটা। ডাক্তার দৌঁড়ে এসে উনার ব্লাড প্রেশার মাপলেন, মুখটা ছোট হলো ডাক্তারের। কথা বললেন না। দ্রুত নার্সকে আদেশ করা হলো উনাকে সিটিস্ক্যান রুমে শিফ্ট করার জন্য। চলে যাবার সময় শুধু এটুকু বলে গেলেন, “রোগীর উচ্চ রক্ত-চাপ অনিয়ন্ত্রণে। গড সেইভ হিম।ʼʼ
অন্তূ চুপচাপ বসে রইল বেডের ওপর। এখন বড় ডাক্তার নেই। হাসপাতালে বড় ডাক্তার রাউন্ডে আসবে কমপক্ষে সকাল দশটায়। অন্তূ বাচ্চাদের মতো অন্তিককে জিজ্ঞেস করে, “ওরা কী বলছে? কী বোঝাতে চাইছে? আব্বুর ব্রেইনে স্ট্রোক হয়েছে? কী বলতে চাচ্ছে রে ওরা?ʼʼ
অন্তিক জবাব দেয় না। চুপচাপ পাশে বসে হাত চেপে ধরে অন্তূর। থরথরিয়ে কাঁপছে অন্তূর দেহ। চোখদুটো অশান্ত, চঞ্চল। কাঁদছে না। আমজাদ সাহেব বলতেন, ‘ব্যথার ওপর ব্যথা লাগলে নাকি মানুষ ব্যথাহীন হয়ে পড়ে। আঘাতের ওপর আঘাত মানুষের সহনশীলতা বাড়িয়ে দেয়।ʼ
ডাক্তার জানালেন, “রোগীর উচ্চ রক্তচাপ বেড়েছে কোনো জটিল উত্তেজনা এবং দুশ্চিন্তার ফলে। আর তা অনিয়ন্ত্রণে যাবার ফলে..ʼʼ
আপাতত উনাকে সাধারণ ওয়ার্ডেই রাখা হলো। ডাক্তাররা কী বুঝছেন, বলছেন না কিছুই। বেড পাওয়া গেল না। মেঝেতে মাদুরের ওপর কাঁথা বিছিয়ে শোয়ানো হয়েছিল আমজাদ সাহেবকে।
—
আধাঘন্টাও হয়নি ঘুমিয়েছে জয়। দরজায় ধুমধাম আওয়াজ। জয় গায়ের কম্বল মাথায় তুলে তার ওপর বালিশ তুলে কান ঢাকে। কাচের দরজায় যে ধাক্কাধাক্কি চলছে, ভেঙেও যেতে পারে আর কিছুক্ষণ এমন চললে।
হামজা আবারও কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল, “জয়! এই শুয়োরের বাচ্চা, উঠবি তুই? ওঠ হারামজাদা।ʼʼ
মাথার ব্যথায় মাথাটা খন্ড-বিখন্ড হয়ে আসছিল জয়ের। চোখের নিচে দাগ পড়ে গেছে, চোখ লাল হয়ে আছে ঘুমের অভাবে। হামজা ভেতরে ঢুকে বলল, “আরমিণের বাপ হাসপাতালে। যা ওখানে, দ্রুত বের হ।ʼʼ
জয় ভ্রু কুঁচকে হাই তুলে বলল, “শালীর বাপের আবার কী হইলো দুম করে? ডায়রিয়া না কলেরা?ʼʼ
-“দুম করে হয়নি? তোকে ধরে বলি দিলেও গায়ের আগুন নিভবে না। যা বলছি, সেটা কর। জনগণ জানে গতকাল কী হয়েছিল। এর দায় আমার রেপুটেশনের ওপর এসে পড়লে তোকে জীবিত দাফনাবো আমি।ʼʼ
-“আমার জন্যে হইছে নাকি? সেদিন পলাশ মারছে, সেজন্যেও অসুস্থ হতে পারে। আর আমি ওইখানে যায়ে কী করব? ওই শালীর মেয়ে এমনিই সহ্য করবার পারে না আমারে।ʼʼ
-“কথা বাড়াচ্ছিস কেন? বাথরুমে যা, ফ্রেশ হ। কোনো প্রয়োজন হলে তার ব্যবস্থা করবি, আশেপাশেই থাকবি ওদের। যা বুঝলাম শুনে, স্ট্রোক হয়েছে হয়ত। পাপ করেছিস, তার মাশুল হিসেবে অথবা তোর বিয়ে করা বউয়ের খাতিরে। যাহ।ʼʼ
জয় বিরক্ত হয়ে ঝারি মারল, “আমার ঘুমে মাথা ভেঙে আসতেছে। ধোনের অসুখ হইছে এক ঠাপ দিয়া!ʼʼ
হামজা নরম হলো, “যা। মাঝেমধ্যে সেক্রিফাইজ করা স্বাস্থের জন্য ভালো, আর রেপুটেশনের জন্যও। ফিরে এসে ঘুম দিবি।ʼʼ
-“ভাই, আমি না তোমারে বুঝি না। মাঝেমধ্যে মন চায় মাথার খুলিডা উড়াই দিই।ʼʼ জয় দাঁত খিঁচে ওঠে।
-“আমিও বুঝিনা আমাকে। তুইও বোঝার চেষ্টা করিস না। আমি পরে যাব। পাশের এলাকায় রাস্তার কাজের কন্ট্রাক্ট সাইন করা হয়েছে, তা দেখতে যেতে হবে। তুই যা এখন, আমি পর আসছি।ʼʼ
জয় অলসভাবে হেঁটে বিছানার দিকে যেতেই ধমকে ওঠে হামজা, “আবার গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লে বিছানাটা আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেব আমি।ʼʼ
জয়কে ধরে ঠেলে নিয়ে বাথরুমে ঢুকিয়ে ব্রাশে টুথপেষ্ট লাগিয়ে হাতে ধরিয়ে দেয় হামজা।
-“কখন কী হয় ওখানে, জানাস আমায়। তোর কাজকর্মে কতদিন ধৈর্য্য বজায় রাখতে পারব, আমি বুঝতে পারছি না। তবে আশা থাকবে, রাজনৈতিক কাজের বাইরে তোর নোংরামি যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমি যেমন প্রশ্রয় আর আদর দিয়ে মাথায় তুলতে পেরেছি তোকে, পাপ বেশি হয়ে গেলে, একবার ধৈর্য্যে টান লাগলে এক আছাড়ে তোর রুহুটা বের করে নিতে হাত কাঁপবে না, জানিস তুই। তাই পাপও সেই অবধি করবি, যে অবধি আমার ধৈর্য্যচ্যূতি না ঘটে।ʼʼ
কথাগুলো বলতে বলতে রুম থেকে বেরিয়ে আসে হামজা।
জয় গলা উঁচিয়ে নির্লজ্জের মতো বলে, “আমি কিছুই করি নাই, বাল। ভালো মানুষ বলে যে পারে দোষ দিয়ে যায়। তোমার তো খালি অভিযোগ আমার ওপর। যাই করি সহ্য হয় না।ʼʼ
-“জিহ্বাটা টেনে ছিঁড়ে ফেলি, এগিয়ে আয় এদিকে আমার কাছে। গলার আওয়াজ উঁচু হচ্ছে কেন?ʼʼ
জয় ব্রাশ মুখের মধ্যে রেখে একহাতে লুঙ্গি উঁচিয়ে ধরে বলল, “জিহ্বা ছেঁড়ার ইচ্ছা তোমার হইছে, আমি ক্যান আগায়ে আসব? তুমি আসো..ʼʼ
লুঙ্গি ঘেঁষে যাচ্ছিল বাথরুমের ভেজা মেঝেতে। টেনে শক্ত করে বাঁধল সেটা। হাত দিয়ে মুঠো করে লুঙ্গি ধরে দুই ঠ্যাঙের মাঝে গুঁজে আয়নার দিকে তাকায়। দেখতে কালো লাগছে চেহারাটা। আয়নার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “ও দয়াল! জান নিবা নাও, দম ক্যান বাইর হইয়া যায়?ʼʼ
চোখ লাল হয়ে আছে ঘুমের অভাবে। হামজার কণ্ঠ শোনা গেল, “দেরি করিস না, জয়। তাড়াতাড়ি বের হ।ʼʼ
—
সিটিস্ক্যান রুম থেকে বের করে ওয়ার্ডে আনার পর আমজাদ সাহেবের একপাশ পুরোপুরি অবশ পাওয়া গেল। উনাকে পাঁজাকোলা করে ধরে মাদুরে শোয়ানো হলো। পড়ে রইলেন ওভাবেই। অপলক তাকিয়ে আছে তার চোখদুটো অন্তূর দিকে। জোরে জোরে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। অন্তূর থেকে চোখ ফিরিয়ে রাবেয়ার দিকে তাকালেন। কম্পিত বাঁম হাতটা এগোতে চাইলে কাঁদতে কাঁদতে তা চেপে ধরেন রাবেয়া। কথা বলতে গিয়ে ঠোঁট বেঁকে আসে আমজাদ সাহেবের। অন্তূ ছটফটিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এই দৃশ্য দেখতে নেই। অন্তূ পারছে না।
যে মানুষটার ভরাট কণ্ঠস্বর ও স্পষ্ট ভাষায় বলা দামী কথা আর ধমক শুনে অভ্যস্ত অন্তূ, সে মানুষের অর্ধঙ্গ অসুস্থতা দেখা যায় না।
অন্তূর চোখ বাঁধা মানতে চায় না। কিন্তু স্বার্থপর আব্বুর জন্য সে কাঁদবে না। যে তাকে এই পরিস্থিতির সামনে, এই অবস্থার মধ্যে ফেলে এভাবে অসুস্থতার ভয় দেখায় তার জন্য অন্তূ কাঁদবে না।
রাবেয়া উনার মুখের কাছে কান এগিয়ে নিয়ে গেলেন অস্পষ্ট কণ্ঠে একপেশে ধরণের স্বরে শোনা যায়, “আমায় তুমি ক্ষমা কোরো, রাবেয়া। তোমাকে কিছুই দিতে পারিনি এই জীবনে। আমায় বাঁধিয়ে রেখো না, তুমি। মাফ কোরে দিও আমায়। অন্তূকে দেখে রেখো।ʼʼ আরও অনেক কিছুই বলার ছিল, পারলেন না বোধহয়।
রাবেয়া উনার হাতের ওপর কপাল ঠেকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। অন্তূ বসে আব্বুর শিওরে, “তুমি কীসের ক্ষমা চাইছো? আম্মু বোকা, আম্মু তোমায় ক্ষমা করতে পারে, আমি অন্তূ তোমাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না, আব্বু। আচ্ছা, কী ভেবে এসব বলছো তুমি? কিচ্ছু হবে না তোমার। এখনও রিপোর্টই আসেনি। চুপচাপ শুয়ে থাকো।ʼʼ
পাগলের মতো বলে চলে অন্তূ। অন্তিকের চোখে পানি চিকচিক করে ওঠে। আজ কতগুলো বছর সে এই দেবতাতূল্য মানুষটার সাথে কথা বলেনি। তার সাথে কথা না বলেই আব্বু কোথায় যাচ্ছে? এই ক’দিনে সুযোগ বা সাহস পায়নি কথা বলার। সেদিন যখন ক্ষমা চাইল, আমজাদ সাহেব চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন কেবল। অন্তিক পুরুষ মানুষ, পুরুষদের কাঁদতে নেই। চোখদুটো রক্তলাল হয়ে ওঠে অশ্রু জমে। আমজাদ সাহেব হাসার চেষ্টা করলেন বোধহয়, অথচ ঠোঁট বেঁকে গেল। অন্তূ সহ্য করতে না পেরে উঠে দৌঁড়ে বারান্দায় যায়। আবার ফিরে আসে ছুটতে ছুটতে। অন্তিকের ঠোঁটদুটো কাঁপছে, অথচ কিছুই বলতে পারল না ছেলেটা।
ছেলেরা বাপের সামনে বোবাপ্রাণী, এরা জান দেয়া স্বীকার তবে মুখ ফুটে বাপের কাছে ক্ষমা বা ভালোবাসা প্রকাশে চরম ব্যর্থ। চোখের ভাষায় আব্বুর কাছে কাঁদলো ছেলেটা, ক্ষমা চাইল, কত কথা বলল, সব দুজনের চোখের ভাষায় সীমাবদ্ধ। অভিমান, অভিযোগ, আড়ষ্টতা ও বহুদিনের বাকহীনতা জমে জমে যে শক্ত দেয়ালটা বাপ-ছেলের মাঝে খাঁড়া হয়েছিল, তা ভাঙে দুজনের নীরব দৃষ্টি বিনিময়ে।
অন্তিক বেরিয়ে যায় রাবেয়াকে নিয়ে। অন্তূকে আব্বুর কাছে বসার সুযোগ দেয়। সে অপদার্থ ছেলে, ছেলে হবার যোগ্যই না। অন্তূ ছিল আব্বুর একমাত্র অবলম্বন।
অন্তূ বসে আব্বুর সামনে। কান্না থামানোর উপায় নেই তার কাছে আজ। হাতটা চেপে ধরে অঝোরে কিছুক্ষণ কাঁদল অন্তূ। আমজাদ সাহেবের চোখ ছলছল করে। তবে পানি গড়ায় না।
অন্তূ ডেকে ওঠে, “আব্বু? তুমি কী বোঝাচ্ছ? তুমি আমায় রেখে চলে যাচ্ছ, এটা বোঝাচ্ছ? তুমি পাষাণ্ড জানতাম। তবে এত্ত পাষাণ্ড আব্বু তুমি? আব্বু! আমি কী করে কী করব একা? আব্বু…..আব্বু? আমি তো এক পা-ও চলতে পারি না তোমায় ছাড়া। তুমি আমায় এসব ভয় দেখিও না! আমি জানি, কিচ্ছু হবে না তোমার। এসব মিছেমিছি ভয় অন্তূ পায় না। বুঝলে!ʼʼ
থামে অন্তূ। কান্নাটুকু গিলে ফের বলে, “তুমি এত তাড়াতাড়ি যেতে পারবে না। আমি যেতেই দেব না তোমাকে। মগের মুলুক নাকি? তুমি বললে আর চলে গেলে? আমায় কী মনে হয় তোমার? যেতে দেব আমায় ফেলে? সে তুমি যাবে ভালো কথা। চলো, আমায় নিয়ে চলো। সেদিন যখন তোমার কাছে মরণ চেয়েছি তুমি মারোনি আমায়, অথচ আজ নিজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। আচ্ছা, আব্বু! পৃথিবীর সব বাপেরাই কি তোমার মতো কঠোর স্বার্থপর হয়? আজ আমার উত্তর চাই। তুমি চুপ করে থেকো না। তোমার গলার ভারী আওয়াজ শুনতে চাই আমি। বলো যে, ‘না সব বাবা এমন হয় না, শুধু তুমিই এমন নিষ্ঠুর, পাষাণ্ড, মায়াহীন, কঠিন স্বার্থপর বাপ।ʼ বলো। আমি একজন স্বার্থপর বাপকে ভালোবেসেছি, বলো আব্বু, স্বীকার করো। আম্মা কাঁদছে কেন? তুমি কী বলেছ? চলে যাচ্ছ, তাই বলেছ? কথা বলো, কথা বলো…ʼʼ
টপটপ করে পানি পড়ে অন্তূর চোখ দিয়ে। মেয়েটা নাক টানে, আর আব্বুকে ঝাঁকায়। একেকটা করে অভিযোগী প্রশ্ন করে, “শোনো আব্বু। আমার একটা কথা রাখো, রাখবে? আব্বু, রাখবে? আমি চলো তোমার সাথে যাই। একা একা থাকতে ভালো লাগবে না আমার, বুঝেছ! আমি তোমার সাথে যাব। তুমি না চাইলেও যাব। তোমার তো আমার প্রতি মায়া নেই। তুমি পারবে চলে যেতে আমায় ফেলে। কিন্তু আমি তো থাকতে পারব না তোমায় ছেড়ে। সকালে ফজরের নামাজের অযুটা তোমার সাথে করি, তখন তোমায় লাগবে আমার। ঘুম থেকে উঠতে দেরি করলে দরজায় এসে ধাক্কাধাক্কি করার জন্য তোমাকে লাগবে আমার। কোথায় পাব বলো? জবাব দাও। আমাকে নিতে হবে সাথে, আমি যাব তোমার সাথে। একা যেতে দেব না স্বার্থপরের মতো আমায় ফেলে। আমার পরীক্ষা দিতে যাবার সময় তোমাকে লাগে আমার, বুঝতে পারছো তুমি? আমি পরীক্ষা দিতে একা যেতে পারি না। কে নিয়ে যাবে আমায়? বিকেলে চা আর টোস্ট খাবার সময় পাশের চেয়ারে তুমি না বসলে আমার চলে না। তখন কোথায় পাব তোমায়?ʼʼ
আমজাদ সাহেব কথা বলছেন না। অন্তূ অধৈর্য হয়ে উঠল, “ইশ রে! কিছুই কি বলবে না তুমি? শোনো, আমায় এই ব্যবস্থাগুলো করে দাও, তারপর ভাববো তোমায় যেতে দেয়া যায় কিনা! ওহ, আমি একা রাস্তাও পার হতে পারি না। আমায় রাস্তা পার হওয়াও শেখাতে হবে। নয়ত তো তুমি যেতে পারবে না। এতই সহজ নাকি তোমার জন্য অন্তূকে ফেলে চলে যাওয়া? শোনো আব্বু! রাতের খাবারটা তোমার পাশের চেয়ারে বসে খাই আমি, ভুলে যাচ্ছ? তুমি না ডাকলে রাতে খেতে যাই আমি? পড়তে পড়তে তোমার ধমকানো ডাক কানে না এলে তো উঠতেই মন চায় না আমার। আম্মার কথা কানেও লাগে না আমার। কে ডাকবে আমায় খেতে, সেই জবাব দাও আগে। বেশি রাত জেগে পড়লে কে আমায় রাতে এসে দেখে যাবে, বিস্কুটের কৌটোটা এগিয়ে দিয়ে একটা ধমক দেবে, ‘দুটো বিস্কুট খেয়ে পানি খেয়ে ফের পড়তে বস। একাধারে পড়লে শরীর খারাপ হবে, মনোযোগ পাবি না। নে, খা। একটু হাঁটতে যাবি? চল বাড়ির সামনে দুই পাক মেরে আসি দুজন।ʼ কে বলবে, এই ব্যবস্থা আগে করো তুমি। আমায় কে ডেকে ধমকে বলবে, মশারিটা টাঙিয়ে দে তো অন্তূ। আজ মশা খুব বেশি।ʼ তুমি বুঝতে পারছো আমার সমস্যাগুলো? আমার পদে পদে সমস্যা তোমাকে ছাড়া। একটা দিন কাটাতে পারব না। দেখলে তো কাল, তুমি ছিলে না, আর কী হয়ে গেল আমার সাথে!ʼʼ
আমজাদ সাহেবের চোখের কোণা বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল কানের গোড়া দিয়ে চুইয়ে পড়ে। অন্তূ চোখদুটো মুছে নড়েচড়ে বসে। নাক টেনে শান্ত স্বরে বলার চেষ্টা করে, “আব্বু? বুঝলে, আমার বুকের ভেতর খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। তোমারও হচ্ছে? হচ্ছে না, জানি। কারণ তুমি খুব স্বার্থপর, আব্বু। খুব স্বার্থপর।ʼʼ
গা কাঁপিয়ে কেঁদে ফেলল অন্তূ, “তুমি একাটাও কথা বলছো না, আব্বু? কী করেছি আমি? কীসের অপরাধে এই যন্ত্রণা দিচ্ছ? তুমি বুঝতে পারছো না, আমি সহ্য করতে পারছি না? আব্বুউউ? তুমি জবাব দিচ্ছ না কেন? আমায় কষ্ট দিয়ে কী পাচ্ছ? আমার সহ্য হচ্ছে না তো। আমি সইতেই পারছি না। কী করব, বলো তো!ʼʼ
বুকের মাঝখানটায় আঙুল গেড়ে বলল অন্তূ, “এই এই এখানে কেমন যে লাগছে, তুমি বুঝলে ঠিক কথা বলতে। তুমি টেরই পাচ্ছ না। তুমি খুব কঠোর আব্বু, খুব নিষ্ঠুর।ʼʼ
অন্তূর বিলাপে আশপাশের লোকজন থমকে যায়। কারও কারও চোখে ছলছলে পানি নেমেছে। আমজাদ সাহেবের চোখের কোণা বেয়ে একফোঁটা পানি সরু হয়ে গড়িয়ে পড়ে। অন্তূ তা সযত্নে মুছে দিয়ে বলে, “কাদছো কেন তুমি? কিচ্ছু হয়নি তো। আচ্ছা, আমি আর কাঁদছি না। তুমিও কাঁদবে না কেমন?ʼʼ
আমজাদ সাহেব নিশ্চুপ। বাচ্চারা যেমন ঘুমন্ত মানুষকে ঝাঁকায়, অন্তূ ওইভাবে আমজাদ সাহেবকে ঝাঁকালো, “আব্বু!ʼʼ
অন্তূ ঝেরে উঠে দাঁড়ায়। চিৎকার করে ডাক্তার ডাকে। নার্স আসে, ডাক্তার আসে। অন্তূকে অন্তিক সরিয়ে নিয়ে যায় টেনে। ধরে রাখা যায় না অন্তূকে। পাগলের মতো লাফালাফি করছে মেয়েটা। অন্তিক শক্ত হাতে টেনে ওকে বারান্দায় নিয়ে যায়।
রিপোর্ট হাতে নার্স আসে। মহিলা ডাক্তার তা দেখেন চোখ বুলিয়ে। হেমোরেজিক স্ট্রোক। অর্থাৎ মস্তিষ্কের ধমণিগাত্র বিদীর্ণ হয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে রক্ত বেরিয়ে তা জমাট বেঁধে গেছে। রোগী বাঁচানোর সুযোগ এই স্ট্রোক দেয় না। উন্নত চিকিৎসা প্রাপ্তি অবধি যাবার সুযোগ থাকেনা এই ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশনে। ডাক্তার রিপোর্ট রেখে বেরিয়ে গেলেন চুপচাপ।
মেঝের ওপর পড়ে আছে আমজাদ সাহেবের নিথর দেহটা। নাক দিয়ে রক্ত আসছে। কান দিয়েও বেরোবে বোধহয় রক্ত। এই লাশ বেশিক্ষণ না রাখার পরামর্শ দিলেন ডাক্তারেরা। যেদিক দিয়ে সম্ভব এখন গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্তূ চুপ করে বসে রইল হাসপাতালের নোংরা মেঝের ওপর। জলন্ত আগুনে পানি ঢালার পর ঠিক আগুন যেমন ধপ করে নিভে যায়, ওভাবে নিভে গেছে অন্তূটা। একদৃষ্টে চেয়ে আছে অন্তূ ওই তো দূরে পড়ে থাকা লম্বাটে দেহাবয়বের দিকে।
জয় হাসপাতালের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে গেইটের সামনে দাঁড়ায়। অস্থির লাগছে ভেতরটায়। দ্রুত একটা সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটের ভাঁজে রাখে। অন্তূর কান্না খুব জ্বালাতন করছে। তখন ইচ্ছে করছিল, গিয়ে মেয়েটাকে ঠাটিয়ে দুটো চড় মেরে আসতে। ওভাবে আহাজারি করে কাঁদার কিছু তো নেই। বাপ কি আর মানুষের মরে না? জাভেদ আমির মরেনি? জয়ের সামনে মরণের প্রক্রিয়া চলেছে উনার, জয় কি বেঁচে নেই? এত ন্যাকামির কী আছে?
বারবার চোখের সামনে অন্তূর কান্নাজড়ানো পাগলের বিলাপ ভেসে উঠছে। বিরক্তিতে দু চারটা গালিও বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে। এসব আবেগ বোধ করার মতো বোধশক্তি তার মাঝে নেই। সে স্বাধীনচেতা মানুষ। আবেগ ভালো মানুষকে খারাপ কাজ করতে বাধ্য করে, উল্টো খারাপ মানুষদের নিজের কাজ থেকে দূরে আনে। জয় ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তার খারাপের কোনো চিকিৎসা নেই, কারণ খারাপ হওয়াটা তার রোগ নয়, তার সত্ত্বাগত বৈশিষ্ট্য। আধখাওয়া সিগারেটা দূরে ছুঁড়ে মারল।
চলবে..
[ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন]