#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৫.
ঝিরঝিরে বৃষ্টি নেমেছে বাইরে। হামজা এলো রাত এগারোটার দিকে। দোতলার সিঁড়িতে ছাতা বাঁধিয়ে রেখে ভেতরে ঢুকল। রিমি বসে ছিল স্বামীর অপেক্ষায়।
দোতলার সদর দরজা দিয়ে ঢুকতেই একপাশে ডাইনিং রুম, তার আরেক বিভাজনে বসার ঘর। রিমি উঠে এগিয়ে গেল স্বামীর দিকে, হামজার হাত থেকে ওয়ালেট, ফোন, এবং ভেজা হাতঘড়িটা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এত দেরি হলো কেন? হাতে কী হয়েছে আপনার? ভিজেছেন কেন, ছাতা ছিল না সাথে?ʼʼ
সাদা পাঞ্জাবীতে কাদার ছিটে। হামজা সব কথা এড়িয়ে তা ঝারতে ঝারতে বলল, “একটা গামছা দাও, আগে।ʼʼ
রিমি বুঝল, কোনো কারণে মেজাজ থমকে আছে আপাতত লোকটার। বাকি সময় যে হৈ হৈ করে তাও নয়। গামছায় মাথা মুছতে মুছতে তরুকে ডাকল হামজা, “তরু! এদিকে আয়!ʼʼ
তরু বেরিয়ে এলো, “কী হয়েছে, বড়ভাই?ʼʼ
-“তুলিকে ডাক!ʼʼ
হাত মুখ ধুয়ে পাঞ্জাবীর বোতাম খুলতে খুলতে এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। রিমি রান্নাঘরে ছুটল। তরু ফিরে এসে, আস্তে করে বলল, “ভাই! আপু আসতে চাইছে না। খাবে না।ʼʼ
-“তুই খেতে বস।ʼʼ
শাহানা এসে রিমিকে ভাতের পাত্র আনতে ইশারা করে বসলেন হামজার পাশে। বললেন, “ওই বাদর ফিরবে না? কত রাত হলো, বাড়ি ফেরে কখন সে?ʼʼ
হামজা গামছায় মাথা মুছতে মুছতে বলল, “যখন ফেরে প্রতিদিন, তখনই ফিরবে। আপনি বসুন।ʼʼ
-“তা ক্যান ফিরবে? তুই শাসন করার বদলে আশকারা দিয়েই দিন দিন বেয়ারা বানাইছিস ওরে!ʼʼ
-“নির্বাচনের ঝামেলা এগিয়ে আসছে। এখন একটু ব্যস্তই থাকবে। এই নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করার কী আছে? জয় ছোট বাচ্চা না আম্মা। ওকে নিয়ে টেনশন করতে হবে কেন? আপনি বসুন। শরীর ভালো আপনার?ʼʼ
-“ভালো।ʼʼ
ভাত তুলে দিলেন শাহানা হামজার প্লেটে। একটু নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “নির্বাচন আসতেছে বুঝলাম। তোরা কী করতেছিস কিছুই মাথায় ঢুকতেছে না আমার। তোর বাপটা আবার আসবে কখন?ʼʼ
প্লেটে হাত নাড়তে নাড়তে বলল হামজা, “মাথায় না ঢুকে যদি ভালো থাকা যায়, তাহলে আর ঢুকানোর চেষ্টা করবেন না। লবন দিন। বাবা থানায় গেছে। চলে আসবে।ʼʼ
-“গেছে বুঝলাম। আসবে কখন?ʼʼ
-“আপনাকে খেয়ে নিতে বললাম। ওষুধ খাবেন খেয়ে।ʼʼ
হঠাৎ চমকে উঠলেন শাহানা, “থানায়? আবার থানায়? মাইয়া মরল তো মরল, আমার বাড়ির মানুষগুলারে ফ্যাসাদে ফেলে রেখে গেল!ʼ
হামজা বিরক্ত হয়ে তাকাল, “আহ আম্মা! এই আলাপ কেন? বাবা যদি থানা-কাচারি না ঘুরবে, তো মেম্বার হয়েছে কেন? জনগণের সমস্যায় এগিয়ে যাওয়া বাবার কাজ, কাজ করছে সে। থানায় গেলেই তো আর গ্রেফতার হয়ে যাবেনা! আর গ্রেফতার হবেই বা কেন?ʼʼ
এরপর গলা উঁচিয়ে রিমিকে ডাকল, “রিমি!ʼʼ
রিমি লেবু কেটে এনে দাঁড়াল। হামজার প্লেটে দুটো শশা ও লেবুর টুকরো তুলে দিলো। হামজার ভেজা চুলে আঁচল নেড়ে চুল মুছে দিলো। পাঞ্জাবীর কলারটাও ভেজা। রিমি তা গুটিয়ে দিয়ে গিন্নির মতো চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। অসময়ের বৃষ্টিপাত! শীত চলে আসার পর বৃষ্টি নেমেছে আজ প্রকৃতিতে।
আরও একটা ডিম তুলে দিলেন শাহানা ছেলের পাতে। হামজার ডিম খুব পছন্দ। মাঝেমধ্যেই প্রেশার হাই হয়ে যায় এই বয়সেই, তবু কোনো কিছুতে মান্যি করতে দেখা যায়না তাকে। হামজা খেতে খেতে রিমিকে বলল, “খেয়ে নাও। সবাইকে আলাদা আলাদা করে বলতে হবে?ʼʼ
তরু বারবার পানি খাচ্ছিল। হামজা বলল, “এত ছটফট করছিস কেন? আরাম করে খা।ʼʼ
-“তুলি আপু আসছে না, বড়ভাই।ʼʼ
-“আচ্ছা, তুই খা।ʼʼ
শাহানা বললেন, রিমি, তুমি খাইতে বসো। তুলিকে জয় এসে খাওয়াবেনে।ʼʼ
রিমি খেতে বসল না। এখন খেতে বসলে চলবে না। হামজা গোসল করবে, বিভিন্ন প্রয়োজনে দরকার হবে। বলল, “আপনারা খেয়ে নিন। আপনার ওষুধ খেতে হবে। আমি আর তুলি আপু পরে খেয়ে নেব। জয় ভাইয়া আসুক, সকলে একসাথে খাবো।ʼʼ
খাওয়া শেষ করে গোসলে ঢুকল হামজা। রিমি লুঙ্গি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বাথরুমের আধখোলা দরজার বাইরে। হামজা লুঙ্গি পরে এসে বসল বিছানায়। চুল থেকে পানি পড়ছে এখনও, প্রতিদিন রাতদুপুরে গোসল করার প্রয়োজনীয়তাটা কী? ঠান্ডা লাগে না এই লোকের নাকি? বোঝে না রিমি। তামাটে গায়ের রঙে, পুরু চামড়ার হৃষ্ট-দেহি পুরুষটিকে দেখল চেয়ে ক্ষণকাল রিমি। কোনোদিন ভালোভাবে মাথা মুছে আসেনা। পরে রিমির মুছিয়ে দিতে হয়।
শুকনো তোয়ালে এনে মাথাটা ভালো করে মুছতে মুছতে বলল রিমি, “একটু যত্ন নিলে কী হয় নিজের? এত উদাসীন কেন আপনি?ʼʼ
-“অত যত্ন করার কী? তুমি আছো তো করতে। বিয়ে করাদ একটু ফায়দা হোক।ʼʼ
কডা চোখে তাকাল রিমি। হামজা কপালের ওপর টোকা মারল একটা। রিমি বলল, “হাত কেটেছে কী করে এখনও কিন্তু বলেননি! আবারও বলছি, নিজের খেয়াল রাখবেন।ʼʼ
হাতটা টেনে ধরে কোলে বসাল রিমিকে হামজা। শাড়ির লুটিয়ে পড়ে থাকা আঁচল কাধে তুলে দিয়ে, পেটসহ কোমড় জড়িয়ে ধরল। কপট চিবিয়ে বলল, “আমিই যদি আমার যত্ন নেব, তাহলে তোমাকে তুলে এনেছি কেন?ʼʼ
রিমি মাথাটা নুইয়ে নিলো। গম্ভীর হলো হামজার মুখ, একহাত রিমির কোমড় থেকে সরিয়ে ফোন তুলে কাউকে কল করল। রিমি উঠে দাঁড়াল হামজার হাত ছাড়িয়ে। ভেজা মাথায় আরও দু একবার হাত বুলিয়ে স্যাভলন আর তুলা এনে বসল হামজার পাশে। হামজা ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে দিলো বিরক্ত হয়ে। রিমি তার হাতের ক্ষতটা পরিষ্কার করতে করতে বলল, “দেবর মশাই কল ধরছে না, তাই তো? আশাই বা রাখেন কেন? তার ফোন এখন কোথাও পড়ে আছে, সে হয়ত ফোন থেকে দূরে কোনো বিছানায় পড়ে আছে কারো সাথে!ʼʼ
হামজা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “পুঁচকে মানুষ খুব বুঝতে শিখেছ এ বাড়ির ছেলেকে?ʼʼ
-“এ বাড়ি, ও বাড়ি কী? ছোটো থেকে এসব দেখে বড়ো হয়েছি। না বুঝলেও বুঝতে হয়েছে। কে কী করছে কখন, কার স্বভাব কী! বিশেষ করে রাজনীতিবিদ আর নেতাদের চরিত্র ভালো হতে নেই বলেই জানি।ʼʼ
-“তাই নাকি? তো আমার ব্যপারে কী খেয়াল তোমার? আমি কেমন, তুমি ছাড়াও…ʼʼ
হামজার হাতের ক্ষততে খামচে ধরল রিমি, “জানে মেরে ফেলব একদম! চেনেন তো আমার বাপ-ভাইদের! কেটে ছিঁড়ে খাওয়াব তাদের দিয়ে।ʼʼ
হামজা হেসে ফেলল। হাতের দিকে তাকালো। যেই ক্ষততে মলম লাগাচ্ছিল এতক্ষণ সযত্নে, সেখানে খামচে ধরে আছে, রক্ত বের হচ্ছে নখের আচড়ে। হামজা কিচ্ছু বলল না, তার চোখে দুষ্টু হাসি খেলা করছে, তা খেয়াল করে দাঁত খিঁচে জিদের সাথে বলে উঠল রিমি, “আর জয় ভাইয়ার ব্যাপারে খুব ভালোই জানি।ʼʼ
রিমি জানে, হামজা জয়ের ব্যাপারে খারাপ কথা সহ্য করতে পারেনা। কাজ হলো ওর কথায়। হামজার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, “অন্য কোথাও তো থাকতে পারে, কোনো বিপদও হতে পারে!ʼʼ
-“তার আর কী বিপদ হবে? সে নিজেই একটা আস্ত বিপদ মানুষের জন্য, বিশেষ করে মেয়ে মানুষের জন্য!ʼʼ
জয়ের ব্যাপারে রিমির এসব ত্যাড়ছা উক্তি শুনতে ভালো লাগছিল না হামজার। গম্ভীর হলো, “তোমার ওপর কোনোদিন খারাপ নজর দিয়েছে?ʼʼ
-“না, তা দেয়নি..ʼʼ
-“তাহলে?ʼʼ
রিমি তাকাল হামজার কঠিন হয়ে আসা মুখটার দিকে। হাতে এন্টিসেপটিক লাগানো শেষ করে উঠে দাঁড়াল। হামজা বলল, “জয় দুষ্টু, বেপরোয়া, অসভ্য, সেসব সত্যি। কিন্তু মিথ্যাবাদী বা বিশ্বাসঘাতক নয়। জানো তো!ʼʼ
রিমি কথা বলল না। হামজা হাত ধরে টেনে এনে পাশে বসালো ওকে। এরপর চট করে পা টান করে শুয়ে পড়ল রিমির কোলে মাথা রেখে। চোখ বুজে বলল, “কথা বলছো না কেন?ʼʼ
-“আমার চেয়ে জয় ভাইয়া বেশি ইম্পর্টেন্ট আপনার কাছে, তা জানি। কিন্তু কেন?ʼʼ
হামজা চুপচাপ শুয়ে রয় চোখ বুজে। জবাব না পেয়ে রিমি জিজ্ঞেস করল, “হাত কেটেছে কীভাবে?ʼʼ
-“দেয়ালে ঠেস লেগেছিল।ʼʼ
-“দেয়ালে ঠেস লাগলে এভাবে কাটে না হাত।ʼʼ
ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল হামজা, “হুঁশিয়ারী করছো আমার সঙ্গে? ইন্টারেস্টিং! তো বলো দেয়ালে ঠেস লাগলে কীভাবে কাটে হাত?ʼʼ
-“তা জানিনা। তবে মানুষ অথবা লোহা পেটাতে গিয়ে এভাবে হাত কাটে, সেটা জানি। কী পিটিয়ে এলেন?ʼʼ
-“আমার পেশা দুটোই।ʼʼ
-“পেটানো! হাহ!ʼʼ
-“নতুন কী? আমি তো ভদ্রলোক নই, রিমি।ʼʼ
রিমি খানিক মাথা ঝুঁকালো নিচের দিকে, হামজার চাপ দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে ধীর কণ্ঠে বলল, “ক’দিন বাদে আপনি হবেন মেয়র, এরপর মেম্বার অব পার্লামেন্ট। আমি হব তার ঘরনী। আব্বু বলতো, রাজনীতিবিদের বউদের বড়ো রাজনীতিবিদ হতে হয়, তবেই না চলবে সংসার! জানেন! আপনার মতো এমন রাক্ষুসে লোকের সাথে আব্বু আমার বিয়ে দিতে কোনোভাবেই রাজী ছিল না! আমি বললাম, বিয়ে করলে এই রাবনটাকেই করব।ʼʼ
হামজা খপ করে রিমির হাতটা ধরে ফেলল, আরও শক্ত করে কোল চেপে শুয়ে বলল, “ কেন তোমার মতো পুচকে রাবনকে বিয়ে করতে চাইল? ভয় করল না তোমার, যদি খেয়ে ফেলি?ʼʼ
নিঃশব্দে হাসল রিমি। হামজা একেবারে পেচিয়ে ধরে ফেলার আগেই একলাফে গা ঝেরে উঠে সরে দাঁড়াল। হামজা আধশোয়া হয়ে বসে বলল, “রিমি! দরজা আটকে দিয়ে এসো!ʼʼ
-“পারব না।ʼʼ
হামজা একটা মোটা বই তুলে নিলো হাতে। এখন অভ্যাসবশত চশমা চোখে এঁটে ভারী বইখানা পড়তে বসার কথা। তা না করে ধমক দিলো, “আমি উঠে গিয়ে ধরলে কাল সকালে তোমার খবর ‘আমাদের সময়ʼ পত্রিকায় বের হবে, আমাকে টলারেট করতে পারবেনা কিন্তু! অবাধ্যতা পছন্দ না আমার।ʼʼ
নাক কুঁচকাল রিমি, “ছিহ! কী মুখের ভাষা! আমি আপনার পার্টির মেম্বার না, বউ আপনার! আপনার পছন্দ অপছন্দ আমার কাছে চলবে না।ʼʼ
হামজা বই রেখে ফোন হাতে নিয়ে বালিশ খাঁড়া করে তাতে পিঠ হেলান দিয়ে বসল। ফোন কানে ধরে রিমির উদ্দেশ্যে বলল, “পালাতে পারবে নাকি?ʼʼ
ওপাশ থেকে কল রিসিভ করল জয়, “হ্যাঁ, সাহেব!ʼʼ
-“কোথায় তুই? রাত বাজে কয়টা?ʼʼ
-“দেরি হবে আসতে। ক্লাবে আছি।ʼʼ
-“ক্লাবে কী করছিস?ʼʼ
-“ক্যারাম খেলছি।।ʼʼ
-“ঢকঢক করে গিলছে কে?ʼʼ
-“আমার নাম জয়। ভদ্রনাম–জয় আমির।ʼʼ
-“জেনে আনন্দিত ও উপকৃত হলাম।ʼʼ
-“সাহেব, আপনি বাসায় গেলেন কখন? মামা এসেছে বাসায়?ʼʼ
রিমি এসে কাছে দাঁড়াতেই এক হেচকা টান দিয়ে ফেলে দিলো বিছানায় ওকে। দাড়ি-গোফের মুখটা গলায় ঠেকাল। একহাতে রিমিকে শক্ত করে বিছানার সাথে চেপে ধরে রেখে, অপর হাতে ফোন কানে ধরে বলল, “আসেনি এখনও! তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়। দুপুরের পর পৌরসভায় কাজ ছিল, যাসনি। আমার হাতে থাপ্পড় খাসনি বহুদিন! ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাড়িতে পা পড়ে যেন! নয়ত থাপড়ে ত্যাড়ামি সোজা করে দেব।ʼʼ
কলটা কেটে দিলো জয়। হামজা রিমির দিকে তাকিয়ে বলল, “স্বামীর খেদমতে গাফলতি করতে নেই, জানো না? এই অবাধ্যতা মেনে নেব না আমি।ʼʼ
রিমি হামজার খোলা পিঠ খামচে ধরল, “জয়কে এতো প্রশয় কেন দেন আপনি? ওকে খারাপ করার পেছনে শতভাগ হাত আপনার রয়েছে। এটা কি ওর ভালো চাওয়া, নাকি ওকে ধ্বংস করা?ʼʼ
হামজা রিমির ঠোঁটের এক কিনারে আলতো একটা চুমু খেয়ে বলল, “ধ্বংস আর সৃষ্টির মাঝে যে দেয়ালটা, তা খুব মসৃণ, রিমি! বলতে পারো, মুদ্রার এপিট-ওপিঠ। পদার্থ একই, শুধু পাশ বিপরীত। জয় স্বাধীনচেতা ছেলে, ও জীবনকে যেভাবে ইনজয় করতে চাচ্ছে, আমি ওকে সেভাবে চলতে বলিনি। ও যা করে, শুধু বাঁধা দিতে ইচ্ছে হয়না ওর কোনো কিছুতে। দেখোনা, ও যখন শব্দ করে হাসে, দেখতে আর শুনতে কী চমৎকার লাগে! তার চেয়েও বড়ো কথা, দিনশেষে আমি শুদ্ধ নই।ʼʼ
—
সকাল সাতটা বাজল অন্তূর ঘুম থেকে উঠতে। ফাইনাল এক্সাম কাছে এগিয়ে আসছে, রাত জেগে পড়তে হয়। মাঝেমধ্যেই অন্তূর ইচ্ছে করে, একরাতে যদি অনার্সের এই চার বছর শেষ হয়ে যেত, আর সে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে যেত স্নাতক করতে! তার কিছুদিন পর উকিলের ওই সাদা-কালো পোশাকটা গায়ে চড়াতে পারতো!
দ্রুত অযু করে এসে ফজরের নামাজে বসল। আম্মা উঠেছে, রান্নাঘর থেকে ঠুকঠাক আওয়াজ আসছে।
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বড়ো বড়ো কচুরিপানা জন্মেছে পুকুরে। আজ আর ডাহুক পাখির দেখা পেল না। গ্রিল ধরে দাঁড়াল। মাথায় সারাটা প্যাচ কাটে আজকাল। সকাল থেকে শুরু হয়, গভীর রাতেও শেষ হবার নাম নেয় না। আব্বুর কাছে গতরাতে জিজ্ঞেস করেছিল অন্তূ, হামজা পাটোয়ারীর ব্যাপারে।
হামজা ভার্সিটির ছাত্রলীগ সংগঠনের নেতাকর্মী। তার অনেক উন্নয়নমূলক কাজের নজির আছে জেলায়! বাপের কাউন্সিলর হবার পেছনে তার বিশেষত্ব রয়েছে। তার বাপকে কেউ ভোট দিতো না কোনোকালে, তার বদৌলতে ভোট পেয়ে কাউন্সিলর হয়েছেন হুমায়ুন পাটোয়ারী।
হামজা চতুর এবং বাহ্যিক নিখুঁত চলনের এক তরুণ রাজনীতিবিদ। সমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষের কাছে তার নাম ভগবানের মতোই, তারা জপে বেলায় বেলায়! আবার তরুণদের কাছেও বেশ সমাদৃত! তবুও কোথাও যেন ঘাপলা রয়ে গেছে তার মাঝে! ক্ষমতার নেশা নেশার পিছনে খুব ক্ষিপ্রগতিতে ছুটছে হামজা। এবার বাবাকে কাউন্সিলর পদ থেকে সরিয়েছে। চাইলে হুমায়ুন পাটোয়ারী আবারও কাউন্সিলর এবং নিজে মেয়র হতে পারতো। জেলার দুই সমাজসেবক নেতাকর্মী পাটোয়ারী পরিবারেই থাকতো। তা করেনি হামজা। এখানেই হামজাকে চতুর এবং ক্ষুরধার এক রাজনীতিবিদ বলার সুযোগটা আসে।
সে যা নাম কামিয়েছে জনসাধারণের কাছে, তা থেকে অনায়াসে বাপ-ছেলে পদপ্রার্থী হলে জিতে যেত দুজনেই।কিন্তু সে এখানে মানুষের মাঝে একটা কৃতজ্ঞতাবোধের জায়গা রেখেছে যে, হামজা সুযোগ এবং ক্ষমতা থাকতেও তা কাজে লাগিয়ে পদ নেয়নি। বরং সে শুধুই সমাজসেবকের ভূমিকায় অধিষ্ঠিত হতে চায়।
কথাগুলো শুনে অন্তূর মনে হলো, নিঃসন্দেহে হামজা রাজনীতিবিদ হিসেবে চরম ধূর্ত চাল-চলনসম্পন্ন। তাহলে মানুষ হিসেবে কেমন? এটাও নিশ্চিত প্রায়, হামজা জিতে যাবে এবার। অন্তূকে আব্বুকে জিজ্ঞেস করল, “এরপর সরাসরি সংসদ নির্বাচন করবে তাই তো?ʼʼ
আমজাদ সাহেব হাসলেন, “তাই তো করার কথা। মশারী টাঙিয়ে দিয়ে আয় তো আমার ঘরে। প্রেশারের ওষুধ খেয়েছি, ঘুম আসছে।ʼʼ
সে এতদিন যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে, সেখানে মনে হয়েছিল ওই পরিবারকে তার মতোই সবাই ঘৃণা করে। এখন মনে হচ্ছে, শুধু মাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ ওই পরিবারকে দোষারোপ অবধি করবেনা। অর্থাৎ, আঁখির পরিবার দ্বিধায় রয়েছে, সাথে সেও। সে ঝুলে আছে জয়ের পক্ষ থেকে আসা সম্ভাব্য একশনের জন্য। আবার মনে হচ্ছে, জয় কিছুই করবেনা। করলে করতো তো!
হামজা বিয়ে করল, মেয়র সাহেবের ছোটো ভাইয়ের মেয়ে রিমি আহসানকে। মেয়রের ভাই ফারুক আহসানের সঙ্গে কীসের এক আলোচনা বেঠকে গিয়ে প্রথম দেখেই রিমিকে পছন্দ হয়েছিল। তরুণ নেতাকর্মী হিসেবে ভালো নাম এবং প্রতিপত্তি তো কামিয়েছে হামজা এই বয়সেই।
তার নাম খারাপ করার জন্য আছে একজন, যাকে সে খুব যত্নে পালছে— জয় আমির। হামজার ফুফাতো ভাই। জয়ের বেপরোয়া কার্যক্রম সকলের কমবেশি জানা। তবুও সে ভার্সিটির ছাত্রদলের লিডার। কেন, কীভাবে এটাও ভাবার বিষয়! তা যদি ছাত্রদের কাছে জিজ্ঞেস করা যায়, তারা সমস্বরে স্বীকার করবে, তাদের নেতাকর্মীকে খুব পছন্দ তাদের! জয় ভালো লিডার তাদের। তার চঞ্চলতা এবং দুষ্টুমি ছাড়া আর কিছু একটা অবর্ণনীয় রয়েছে, যেটা আকর্ষণীয়। দায়িত্বজ্ঞানহীন বলা চলে না। রাজনৈতিক কাজকর্মে যেমন ষোলো আনা, দুষ্টু কাজেও সে ব্যাপক পারদর্শী।
সামনেই পৌরসভা নির্বাচন আসছে। বাপের বদলে হামজা নির্বাচনে অংশ নেবে, এই রব মুখে মুখে উঠে গেছে। সরাসরি ছাত্রনেতা থেকে সাংসদ নির্বাচনের বিষয়ে বিভিন্ন জনরব ছড়িয়েছিল তার নামে। চতুর হামজা এতো তাড়াতাড়ি এতদূর উড়ার মতো বোকামি করবে না। সংসদ নির্বাচনকে হাতে রেখে আপাতত সে এবারের মেয়র পদপ্রার্থী।
অন্তূর রাজনৈতিক বিষয়াদিতে আগ্রহ ও বিদ্বেষ দুটোই সমান। সাথে রয়েছে সমাজ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা। নিজের নামের সামনে যেকোনো মূল্যে অ্যাডভোকেট যুক্ত করার প্রয়াসে দৌঁড়ে চলেছে সে। তার জন্য তার সমাজ, রাষ্ট্র, অপরাধ, কূটনীতি, রাজনীতি, সুনীতি, দূর্নীতি—সব জানা চাই, সব।
কাউন্সিলর সাহেব চাঁদনীকে বলেছিলেন, টাকা নেবেন। সেদিন রাতেই সেই টাকা কেউ বা কারা এসে লুটে নিয়ে গেল। এর মধ্যে কাউন্সিলর এবং তার ছেলে হামজার হাত থাকাটা অসম্ভব নয়। তবে, কেউ যদি নিজের আবাস ছেড়ে উঠতে না চায়, টাকা দিয়ে বিক্রিত বাসভূমি ফেরত নিতে চায়, তাহলে তার বিনিময়ে এত জঘন্য প্রতিদান কোনো সুস্থ মানুষ দেবে না। হুমকি দিতে পারতো, তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখে শর্ত দিতে পারতো! অথচ অমানুষিক বর্বরতা একটা মেয়ের সাথে! আসলে ঘটনা কী?
—
গেইট দিয়ে সরাসরি ঢুকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগটা পড়ে একপাশে একটু ভেতরে। গাছপালায় ছেয়ে আছে বিল্ডিংয়ের আশপাশের চত্বরটা। কেউ একজন পেছনে এসে খুব কাছে দাঁড়িয়ে তার নাম ধরে এমনভাবে ডাকল, যেন বহুদূর থেকে গলা উঁচিয়ে ডাকছে। ম্যান পারফিউমের কড়া গন্ধটা! চমকে উঠে ছিটকে দূরে সরিয়ে দাঁড়াল অন্তূ, “আরমিণ!ʼʼ
ডাকটা শুনতে এমন লাগছে যেন বহুকালের পরিচিত, এবং ডেকে অভ্যস্ত জয়! অন্তূ নির্বাক চোখে চেয়ে দেখল। খুব কাছে এসে দাঁড়াল জয়, “কুত্তা দেখে ভয় পাও দেখছি, সিস্টার! চ্যাহ! আমি কাহিনি ঠিক বুঝলাম না। একদিন কুকুরকে সিনিয়রের সংজ্ঞা শেখাও, আরেকদিন ভয়ে কুঁকড়ে যাও, ব্যাপার কী?ʼʼ
অন্তূ জবাব দিলো না। জয় ঘাঁড় বাঁকা করে দেখল অন্তূকে। যেন ওর মুখে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু খুঁজছে।
-“জবাব দিচ্ছ না কেন?ʼʼ
-“ইচ্ছে করছে না।ʼʼ
জয় বুকের ডান পাশে হাত চাপলো, “ঠুকছো ডিয়ার। উফফফ, পেইন!ʼʼ
কবীর কানে কানে বলল, “ভাই, হৃদপিণ্ড বামে থাকে।ʼʼ
-“আমরাটা বিশাল বড় হে শালা। ডান-বামে ছড়ায়ে-ছিটায়ে একাকার। চুপ থাক।ʼʼ
কবীর কপাল ঠুকলো।
অন্তূর মুখের ওপর নজর আটকে হেসে ফেলল চট করে জয়, “জানো! আমি সিংহ বা বাঘ নই! খপ করে থাবা দিয়ে শিকার ধরি না, কারণ আমি বাহাদুর না! তোমার ভাষ্যমতে কুকুর আমি। কুকুরের অনেকগুলো স্পেসিফিক স্বভাব থাকে! তার মধ্যে একটা হলো, ছ্যাঁচড়ামি। আমি কুকুরের সেই স্বভাবের অনুসারী। কৌশলে ধীরে সুস্থে নির্লজ্জতার সাথে ধরব তোমায়, তুমি ঝরঝর করে ঝরে পড়বে। বুঝতে পারিচো?ʼʼ
অন্তূর বুকটা কাঁপল। জয়ের মুখের নির্বিকার ওই হাসি গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। শান্ত, স্বাভাবিক স্বরে বলছে কথাগুলো! লোকে জয়কে পাশ কাটাচ্ছে, সালাম ঠুকছে, কেউ হাত মেলাচ্ছে।
-“আমার এলাকায় গেছিলে কেন সেদিন?ʼʼ
যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়। এবারেও জবাব দিলো না অন্তূ। জয় অন্তূর দিকে ফিরল, “কেন গেছিলে?ʼʼ
অন্তূ কথা বলল না। সুন্দর দৃষ্টি মেলে তাকাল জয়। সুন্দর করে বলল, “ইচ্ছে করছে একটানে তোর নেকাবটা খুলে ছিঁড়ে ফেলি, শালী। ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে খুব কাঁচা আমি। কেন গেছিলি ওইদিকে?ʼʼ
ধৈর্যতে মানল না জয়ের কথাটা। এত আত্মমর্যাদাহীন হওয়ার সাহস নেই অন্তূর। নিজের ধিক্কারে মরে যাবে সে।
-“গেছিলাম। কী করবেন? ফাঁসি দেবেন? অথবা রেস্ট্রিকশন দেবেন, আমি কী কী করতে পারব, না পারব?ʼʼ
কেমন করে যেন হেসে ফেলল জয়, “ছিহ! তা দেব কেন? জিজ্ঞেস করছি কেন গিছিলে? রেগে যাচ্ছ কেন?ʼʼ
জয়ের হাসিতে গা শিউরে উঠল অন্তূর। ক্যাম্পাস ভর্তি লোক, বেইজ্জতমূলক কিছু না ঘটুক, তা সামলাতে এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার আর হলো না। অন্তূ বলল, “ঘুরে দেখতে গেছিলাম।ʼʼ
-“ভিক্টিমের বাড়ি?ʼʼ
অন্তূ হাসল, “এবার সন্দেহ গাঢ় হচ্ছে আপনাদের ওপর।ʼʼ
হতাশাজনক শ্বাস ফেলল জয়, “হাহ! ইনভেস্টিগেশনে নেমেছ তাহলে! তাতে তোমার প্রোফিট কী? আর আমাকেই বা দোষী করতে চাইছ কোন সুখে? আচ্ছা বাদ দাও সেসব। বলো, সন্দেহ সত্য হলে কী করবে?ʼʼ
-“কিছুই করার নেই?ʼʼ
-“নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু কী করার আছে?ʼʼ
অন্তূ দৃঢ় চোখে চেয়ে বলল, “সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করুন, তিনি ছেড়ে দেন না।ʼʼ
জয় মাথার উপরে হাত তুলে আলস্য ভঙ্গিতে বলল, “ধরেও তো না! আছে তো সৃষ্টিকর্তা, না!ʼʼ
অন্তূর মুখটা কুঁচকে এলো ঘৃণায়, “তিনি ধরলে আর পালানোর পথ পাবেন না।ʼʼ
জয় হাসল, “আচ্ছা আচ্ছা! সেরকম সৃষ্টিকর্তা টাইপের কিছু থাকলে তাকে বলো দ্রুত আমায় ধরতে। পুলিশই ধরুক অন্তত। বেশিদিন পুলিশের সাথে রেষারেষি না থাকলে নিজেকে খুব দূর্বল লাগে! তুমি প্লিজ কিছু একটা করো, যাতে আমাকে পুলিশ ধরে। আর তুমি নিজের চেয়ে বেশি আমার চিন্তা করছো, প্রেমে পড়েছ আমার?ʼʼ
অন্তূ কিছুক্ষণ চুপচাপ চেয়ে রইল জয়ের চেহারার দিকে। গোল বা লম্বা আখ্যা দেয়া যায়না চেহারাকে। ফর্সা বা কালোও নয়, শ্যামলাও নয়! তামাটে ইট রঙা চেহারা। নাকটা সরু, হাসিটা অদ্ভুত, জড়ানো। পরনে সাদা ধবধবে লুঙ্গি। পায়ে চাড়ার বেল্টওয়ালা স্যান্ডেল। তার বেল্ট আটকায়না কখনও জয়। গলায় চেইন ঝুলছে, তাতে ইংরেজি ‘Jʼ লেটার লকেট হিসেবে রয়েছে। বাম হাতে আজ রিস্টলেটের বদলে একটা রূপালি বালা, ডানহাতে ঘড়ি পরেছে। কী বিশ্রী অদ্ভুত! চুলগুলো ফেঞ্চকাট, সুবিন্যস্ত।
অথচ জয়ের আজব মুগ্ধ হবার মতো চেহারা এবং গড়নে অন্তূর ঘেন্না উতলে এলো। বলল, “কী করবেন আপনি আমার? কী করেছি আমি? কীসের নোংরা খেলায় মত্ত হবার পরিকল্পনা নিয়ে বসে আছেন?ʼʼ
জয় হেসে ফেলল, “ভয় পাচ্ছ, আরমিণ?ʼʼ
-“জি পাচ্ছি।ʼʼ
-“কেন কেন?ʼʼ
-“ভয় পাওয়া উচিত। আপনার মতো নোংরা মানসিকতার মানুষের কাছে একটা মেয়ে ভয় না পেলে চলবে কেন?ʼʼ
জয় শান্ত স্বরে বলল, “তুমি এসেছ আমায় খুলতে, আমি গেছিলাম না আমার রঙ দেখাতে তোমার কাছে। সেদিন আমার দেয়া সিগারেট তুমি পায়ে পিষে চলে গেলে? যাক, ধরো নির্বাচনের ঝামেলায় সেটা নাহয় ভুলে যেতাম। তুমি কাল গেছিলে ওই বাড়িতে। কেন? আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করতে?ʼʼ
-“শিক্ষিত মানুষ মূর্খের মতো অযৌক্তিক কথা বলবেন না, বেমানান লাগে। খারাপ লেগেছিল পরিবারটার জন্য, দেখতে গেছিলাম মাত্র।ʼʼ
-“এইজন্যই কয়, মাগী মাইনষের নাই বারো হাত কাপড়ের কাছা। বোঝেনা বাল, ছিঁড়তে যায় ডাব গাছের ছাল।ʼʼ
অন্তূ অস্বস্তিতে একটু চেঁচিয়ে উঠল, “রহস্য করবেন না। সোজা করে বলুন, কাহিনী কী?ʼʼ
জয় আশপাশে তাকিয়ে বলল, “গলার আওয়াজ উচু যেন না হয়, খেয়াল রেখো।ʼʼ
পা দিয়ে মাটিতে থাবা দিয়ে ইশারা করল, “এই মাঠে কবর দিয়ে দেব একদম! আরমিণ, তুমি বলো, তুমি কী চাও? আমার বিপরীতে খেলে পারবে, তুমি?ʼʼ
—
রাতে সবাই শুয়ে পড়লে অন্তূ পড়ার টেবিলে বসল। পড়ায় মনোযোগ পাচ্ছিল না। নানান চিন্তা।
দরজায় ধাক্কা পড়ল। ধাক্কাটা কার বুঝল অন্তূ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার খুলল। মার্জিয়া ভেতরে এসে অন্তূকে জিজ্ঞেস করল, “পড়ালেখার কী খবর তোমার?ʼʼ
-“ভালোই। বসুন আপনি।ʼʼ
বসল মার্জিয়া, খুব আন্তরিক স্বরে বলল, “শোনো, তুমিও তো আমার বোনের মতোই! তুমি আমায় যতটা পর ভাবো, আমি কি আসলেই অতটা খারাপ?ʼʼ
-“জি না, অতটা খারাপ না।ʼʼ
-“তার মানে একটু খারাপ?ʼʼ একটু হাসল মার্জিয়া।
অন্তূ বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইপত্র তুলে নিয়ে গিয়ে টেবিলে সাজাতে সাজাতে বলল, “কী বলতে এসেছেন?ʼʼ
-“এমনি আসতে পারি না?ʼʼ
-“অবশ্যই পারেন। তবে এমনি আসেননি।ʼʼ
-“তোমার তো অনার্স সেকেন্ড ইয়ার শেষের দিক। তোমার প্রতি একটা দায়িত্ব আছে তো নাকি?
-“আছে তো।ʼʼ
-“তোমাকে এসে আমার ছোটো বোনের মতো পেয়েছি, সেই হিসেবে তোমার ভবিষ্যত নিয়ে ভাবার অধিকার আছে না?
-“জি, আছে।ʼʼ
-“তুমি নিজে এখন তো একটু ভাবতে পারো..ʼʼ
-“জি ভাবছি। ভাবছি আমি বিয়েশাদীর কথা। মনের মতো পেলে বিয়ে করে নেব। আপনি এতো টেনশন করবেন না, ভাবী।ʼʼ
মার্জিয়া এক পলকের ব্যবধানে চেতে উঠল, “তোমার মনের মতোন ছেলে ফ্যাক্টরিতে অর্ডার দিয়ে বানায়ে আনি, কী বলো? তোমার মনের মতো কোনো ছেলেও আছে এই আল্লাহর দুনিয়ায়?ʼʼ
অন্তূ একটাও কথা বলল না। বই গোছাতে থাকল।
-“কীরকম চাও তুমি? যে তোমার এইসব কটকটে শক্ত কথা মেনে, বিলাইয়ের মতোন তোমার পিছপিছ চলবে এইরকম চাও তো তুমি! তোমার মতো মেয়েকে কোনোদিন কেউ বিয়ে করে নিয়ে বাড়ি তুলবে না। ছেলে মানুষ কি গোলাম? কামাই রোজগার করে খাওয়াবে, আবার তোমার আলগা ভাব দেখবে? ভাব দেখে বাঁচি না আমি তোমার।ʼʼ
অন্তূ স্বাভাবিক স্বরে বিনয়ের সাথে বলল, “মরেও তো আর যাচ্ছেন না, তাই না! আপনি আপনার ঘরে থাকেন, আমি আমার ঘরে। এমন নয় সবসময় আমার ভাব আপনার চোখের সামনে থাকে। সামনে আসলেও চেষ্টা করবেন, চোখ বুজে অথবা দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাখতে। দেখবেন, আর আমার ভাব আপনার চোখে পড়ছে না। আর এমন তো মোটেই নয়, যে আপনার অথবা আপনার স্বামীর কামাই খাচ্ছি এ বাড়িতে। তাহলে আপনার আসলে ব্যথাটা কোথায়?ʼʼ
নাক শিউরে উঠল মার্জিয়ার। সর্বোচ্চ রাগটা মার্জিয়ার ওঠেই অন্তূর সুবিন্যস্ত ভঙ্গিমায় শান্ত স্বরে বলা দায়সারা কথাগুলোতে।
রি রি করে উঠল সে, “মরিনি এই নিয়ে আফসোস তোমার! আবার ব্যথা!ʼʼ
-“জি, না। আফসোস নেই। ভুল বুঝছেন আপনি। কথার পেক্ষিতে বলেছি। শান্ত হোন। রাত অনেক, চেঁচালে লোকে খারাপ বলবে।ʼʼ
-“এই ব্যথা কী, হ্যাঁ? তোমার মুখে জুতা মারা উচিত! আজ কয়দিন আমার শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না, আবার কিছু করে আসছো কবিরাজের কাছে আমার জন্য নিশ্চয়ই! যাতে তাড়াতাড়ি মরি, এইটাই তো বুঝাইলা তোমার কথার মাধ্যমে!ʼʼ
-“আপনার আমাকে সমস্যাটা কী?ʼʼ
দাঁত খিঁচিয়ে উঠল মার্জিয়া, “তোমাকে নিয়ে সমস্যা যে কোথায়, সেটা তো আমি নিজেও বুঝি না! আসলে তোমার ভাব আমার সহ্য হয়না, অন্তূ! ওইটাই আমার সমস্যা। তোমার কথাবার্তা সহ্য হয়না আমার। বাড়ির যে অবস্থা, তার ভেতরে জান দিয়ে পড়ালেখা করা। এইটাও সহ্য হয়না।ʼʼ
অন্তূ ঘাঁড় নাড়ল। সে বুঝেছে।
-“শোনো, কাল আমার চাচাতো ভাইয়ের বাড়ির লোক আসতেছে তোমায় দেখতে। যদি কোনো উল্টাপাল্টা করো, আর আমি বাপের বাড়ি চলে যাই, তোমার ভাই যে তোমাদের শান্তি রাখবে না, তা জেনে রাখো।ʼʼ
-“ভাই আমাদের কিছু বলবে না, ভাবী। আপনাকে গিয়ে নিয়ে আসবে ও বাড়ি থেকে।ʼʼ
দিনকাল ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে। চারদিক সংকটময়, সংকীর্ণ হয়ে উঠছে। ভাবীর আচরণ দিনদিন রহস্যময় আর আরও উগ্র হয়ে উঠছে।
আমজাদ সাহেব খুব গম্ভীর আর শীতল মানুষ, শিক্ষিত মানুষটার ব্যক্তিত্ব প্রখর। তাতে দাগ না লাগাতে তিনি সব করবেন। অন্তূ কথা বলে, অথচ আমজাদ সাহেবের নীরবতার মাঝেই যেন যত তেজ নিহত।
কাল আব্বুর কাছে একজন পাওনাদার এসে বসে থেকে গেছে ঘন্টাখানেক। আব্বু লোকটাকে বেশ তোষামোদ করছিল, যেটা আব্বুর আত্মমর্যাদার খেলাপি অনেকটাই! লোকটার মুখে সন্তুষ্টি নেই, অথচ আব্বু ক্রমাগত চেষ্টা করছিল লোকটাকে একটু খুশি করার, দুটো দিন সময় চেয়ে নেবার। ভালো লাগেনি অন্তূর। আঁখির কথা মাথায় এলো আবার, এভাবেই সময় চেয়েছিল নিশ্চয়ই আঁখির পরিবার! আচ্ছা, আঁখির এই বিভৎস অবস্থার পেছনে এ ছাড়াও কি আরও কিছু আছে?
ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তার পাগল পাগল লাগে আজকাল। না! এভাবে এটুকুতেই হয়রান হলে তার নামের পাশে অ্যাডভোকেট উপাধি মানাবে না আগামী কালে! তাকে সবকিছুতে স্বাভাবিক থাকার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সে চেষ্টা করছে তা-ই। আঁখির ডেডবডির কথা মাথায় আসলেই ভেতরে ভেঙেচুড়ে আসে, মাথায় ভয়াবহ চাপ পড়ে, প্যানিক এসে জড়ো হয়! আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে ভেতরের নারীসত্তাটা। মানসিক ভারসাম্য হারানোর জোগাড় হয়, তবুও শান্ত রেখেছে নিজেকে। এই দুনিয়ায় ভঙ্গুর হওয়া যাবে না, একুটুও না।
চলবে..
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৬.
অন্তূদের বাড়ির দু’পাশে পুকুর। কচুরি পানা ভরা। পুকুরটা মেজো চাচা আফজাল আর ছোটো চাচা আফতাবের। মেজো চাচা কুড়িগ্রাম অন্তূর দাদার আসল পৈতৃক বাড়িতে থাকেন আর ছোটো চাচা চুকরির সুবাদে ঢাকা থাকেন।
আছরের নামার আদায় করে বারান্দায় এসে বসাটা ওর অভ্যাস। প্রতিদিন এ সময় কচুরিপানার স্তূপের ওপর ডাহুক পাখরা হাটে। দেখতে ভালো লাগে। আজ দেখা যাচ্ছে না।
তরতর করে ঘুরে বেড়ায় ডাহুকগুলো। আগে অন্তিক এসে ফাঁদ পাতার পরিকল্পনা আটতো পাখিগুলো ধরার জন্য। মারামারি লেগে যেত অন্তূর সাথে। অন্তূর কথা–প্রাণি হত্যা মহাপাপ। আর প্রাণি যদি পাখি হয় তা শিকার করা ডাবল মহাপাপ। সে কোনোদিন অন্তিককে পাখি ধরতে দেয়নি।
আজ ভাবীর চাচাতো ভাইয়ের বাড়ি থেকে দেখতে আসার কথা ছিল। আসেনি। আমজাদ সাহেব দু’দিন পর আসতে বলেছেন। আঁখির কথা মনে পড়ল। আজ দু’দিন হলো খুব জানতে ইচ্ছে করে, জয় আগে ভার্সিটির মেয়েগুলোর সাথে কী করেছে?
বিরক্ত হয়ে উঠল অন্তূ নিজের ভাবনার ওপর। ঘুরে ফিরেই এই ঘেচালে মন চলে যায়! বাড়িতে নীরব অশান্তি চলছে। সরকারী প্রাইমারী স্কুলের মাস্টার ছিলেন আমজাদ সাহেব। দিনকাল চলেছে কোনোমতো। কিন্তু অন্তূ বড় হয়েছে, অন্তিক বড় হয়েছে, সেই অবস্থায় বাড়ি না করলে নয়।
বাবা হিসেবে শিক্ষা ও সাধ্যমত যোগ্যতা ছাড়া বিশেষ কিছু দিতে পারেননি। অন্তিক যদিও বা জিদ ও ঝামেলা করতো, অন্তূ সেটুকুও করেনি কোনোদিন ছোটোবেলা থেকে
আব্বু শখ করে কষ্ট করে কিছু দিতে চাইলে হাসিমুখে অভ্যাস –’লাগবেনা আব্বু, এই জিনিস আমার পছন্দ বা প্রয়োজন না।ʼ সেক্ষেত্রে বাপ হিসেবে আমজাদ সাহেবের কর্তব্য নয় কি সন্তানকে অন্তত একটা উপযুক্ত বাসস্থান দেয়া? শেষ পর্যন্ত এই তো বছর দুয়েক আগে ধার-দেনা করে, এবং কিছু গুছানো টাকা দিয়ে দোতলার কাঠামো তুললেন। একতলার ছাদ হতে হতে টাকার সংকট পড়ল। পুরোনো বাড়ি ভাঙার ফলে থাকার জায়গার সংকট হলো। সেই অবস্থায় বাড়ির একতলা অন্তত ঠিক করা ফরজ হয়ে দাঁড়াল। এতে আরও অনেকটা ঋণ হয়ে গেল। অন্তূ জানতো না আব্বু শেষ পর্যন্ত বাড়ির কাজ দ্রুত সারতে সুদসহ টাকা ধার নিয়েছেন। যার সুদ-আসল মিলে এখন জানের ওপর উঠেছে।
অন্তূর দাদার বাড়ি কুড়িগ্রাম। তবে কোনো এক সূত্রে তিনি বেশ অনেকটা জমির মালিকানা পেয়েছিলেন এই দিনাজপুরেও। আমজাদ সাহেব এখানে বসতি গেঁড়েছেন
দেনার দায় থেকে মুক্ত হতে আমজাদ সাহেব কুড়িগ্রামের জায়গা বিক্রির বায়নামানার টাকা নিয়েছেন। এছাড়া আর উপায় ছিল না, পাওনাদারেরা ঘাঁড়ের ওপর উঠে আছে, সাথে দিন যত যাচ্ছে, সুদের পরিমাণ সমান্তরাল হারে বাড়ছে। বিপত্তি বেঁধেছে মেজো চাচাকে নিয়ে। ভদ্রলোক বিশাল খামারের মালিক। খামার আমজাদ সাহেবের জায়গার অর্ধেকটাতে চলে এসেছে। ক্রেতা লোকটা ততদিন রেজিস্ট্রিতে যাবেন না, যতদিন জমি পরিস্কার, ঝামেলামুক্ত না হয়। এটাই স্বাভাবিক, কোনো ক্রেতাই টাকা-পয়সা খরচা করে ভেজাল জমি কিনতে আসবেন না।
মেজো চাচা আমজাদ সাহেবকে জমিই দিতে রাজী নন। তিনি বলেছেন, “আমজাদ এখানে থাকে না, জমির দেখভাল করে না, তাছাড়া ও তো দিনাজপুর একটা জমি পেয়ে সেখানে বাড়ি করে বসবাস করছে। তাহলে এখানে আবার কীসের জমি পাওনা? কোনো জমি পাবে না ও এখানে!ʼʼ
সেদিন যখন আমজাদ সাহেব গেলেন সেখানে, শালিস বিচার করে অবশেষে রায় এলো, খামার হবার পরেও আমজাদ সাহেবের জমির যে অর্ধেক খালি পড়ে আছে, সেটুকু তিনি পাবেন, বাকিটার আশা ছাড়তে হবে। তাতে যে অর্ধেক বাকি আছে, সেটুকু দিতে রাজী হয়েছেন আফজাল সাহেব। বাকি যেটুকুতে উনার খামার রয়েছে, সেটুকু উনি দেবেন না। এ নিয়ে বেশি ঝামেলা করলে বাকিটুকুও না দেবেন না।
আমজাদ সাহেব কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। তার শুধু একটা কথা মাথায় এসেছে, “জোর যার, মুল্লুক তার।”
প্রতিদিন পাওনাদারেরা আসছে বাড়িতে। আব্বুর শুকনো মুখটা অন্তূর কলিজা ছিদ্র করে বিঁধছে। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষটা কেমন মিইয়ে যান পাওনাদারদের সম্মুখে। মেজো চাচার দাবী, আমজাদ যেহেতু এখানে থাকেনা, ওর এখানকার জমিতে কোনো অধিকার নেই। তিনি নেহাত ভালো মানুষ বলে অর্ধেকটা তাও দিচ্ছেন!
এসব শুনে অন্তূর রক্ত টগবগিয়েছে। নিম্ন মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রার মান এমনই হয়–এসব বুঝিয়ে সান্ত্বণা দিয়েছে নিজেকে।
জীবনটা জটিলতা আর ধ্বংস-ত্রাসে ভরপুর হয়ে উঠছে। সে এই জীবনে এমন পাপ তো করেনি, যার প্রতিদান সরূপ এত কঠোরতা প্রাপ্য!
আম্মু চেঁচিয়ে ডাকছে। অন্তূ অতিরিক্ত অন্যমনষ্ক! বারবার ডেকে তার হুশ ফেরাতে হয়। আম্মুর কাছে গিয়ে বলল, “কী হয়েছে?ʼʼ
রাবেয়া বেগম রোদে কুমড়ো বড়ি শুকাতে দিয়েছিলেন। তা তুলছেন বসে।
-“তোর বাপ ডাকতেছে, যা শুনে আয়। তোরে ছাড়া বেহুশ হয় ওই লোক, দূরে থাকিস ক্যান?ʼʼ
ঘরে ঢুকতেই সুরমা-আতর মিশ্রিত একটা সুগন্ধ এসে নাকে ঠেকল। আব্বু আছরের নামাজ শেষে জায়নামাজেই তসবীহ গুনছেন। অন্তূ এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে বসতে অগ্রসর হয়। আমজাদ সাহেব বাঁধা দিলেন, “তুই বিছানায় বস। আমি এই বসাতেই মাগরিব পড়ে উঠব, আজ আর মসজিদে যাব না, শরীর খারাপ।ʼʼ
অন্তূ কথা শুনল না। আব্বু নিচে বসে থাকলে সে কীভাবে পা তুলে বা ঝুলিয়ে বিছানায় বসতে পারে? আব্বুর পাশে পা গুটিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। আমজাদ সাহেব কিছু বললেন না। অন্তূ জিজ্ঞেস করল, “শরীর ভালো তোমার?ʼʼ
-“আছে ভালোই। আলহামদুলিল্লাহ।ʼʼ
কী শুদ্ধতম চেহারা। এক থুতনি চাপ দাড়িতে হালকা পাক ধরেছে, মেহেদির রঙ উঁকি দিচ্ছে। গভীর চোখ, পুরু ঠোঁটের বিশালদেহী মানুষটা! ভারী, গম্ভীর কণ্ঠস্বর! এক পা গুটিয়ে বসেছেন, সেই পায়ের নখে কালো দাগ। অন্তূ তাতে হাত বুলিয়ে বলল, “কোথাও ব্যথা পেয়েছিলে? রক্ত জমেছে নাকি নখে?ʼʼ
আমজাদ সাহেব বললেন, “ব্যথা পাওয়ার কথা মনে পড়ছে না, তবে ওখানে একটু ব্যথা আছে।ʼʼ
অন্তূ আব্বুর নখে আঙুল বোলালো।
-“বাড়িতে কী হয়েছে রে অন্তূ?ʼʼ
অন্তূ বাচ্চাদের মতো হাসল, “সব ঠিকঠাক। কী হবার কথা ভাবছো? প্রেশার হা হলে সুখ লাগে তোমার?ʼʼ
আমজাদ সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন, “তুই আমার মা না, আমি তোর বাপ! হুঁশিয়ারী করছিস আমার সঙ্গে?ʼʼ
অন্তূ হেসে ফেলল আরও খানিকটা, “করতেই পারি। তুমি অল্ড জেনারেশনের লোক, তোমাকে ঘোল খাওয়ানো কোনো ব্যাপার নাকি আমার কাছে?ʼʼ
আমজাদ সাহেব বললেন, “বিয়ে-শাদি করবিনা তাই বলে?ʼʼ
অসহায় মুখে তাকাল অন্তূ, “তুমিও আব্বু? কাকে বিয়ে করব? ভাবীর আনা ছেলেকে, নাকি আম্মার কাছে আসা ঘটকের পাত্রদের মাঝে কাউকে?ʼʼ
আমজাদ সাহেব কিছু বললেন না। অন্তূ আনমনে বলল, “আব্বু! সামনের দিনগুলো খুব খারাপ যাবে, তাই না?ʼʼ
আমজাদ সাহেব চোখ মেলে তাকালেন, “তোকে বলেছি কোনোকিছুকে পাত্তা দেয়া যাবেনা। জীবন একটা চক্র রে অন্তূ। সোজা ভাষায় বললে–বৃত্ত। কোনো এক বিন্দু থেকে একই রেখা বরাবর যতটা আগে এগোবি, রেখাতে চক্রাকারে ঘুরে সেই প্রথম বিন্দুটা ঠিক তত নিকটে আসতে থাকবে। ঠিক যেমন, রাত যতটা গভীর হয়, সকাল তত নিকটে আসে। কষ্টের যত গভীরে ঢুকবি, সুখ ঠিক ততটুকু কাছে আসবে। সুখের ক্ষেত্রেও তাই। সুখের মাঝে যতটা মজে যাবার সুযোগ পাওয়া যাবে, দুঃখকে ঠিক ততটা কাছে কল্পনা করে প্রস্তুত থাকতে হবে। কিছুই চিরস্থায়ী নয়, অন্তূ।ʼʼ
অন্তূ অভিভূতের মতো চেয়ে রয় আব্বুর দিকে। পঞ্চাশোর্ধ মানুষটা অন্তূকে প্রতিক্ষণে মুগ্ধ করতে তৎপর। চোখের শীতল, অভিজাত চাহনি, মুখের শুদ্ধতম গাম্ভীর্যতা!
-“সুখ কী আব্বু?ʼʼ
আমজাদ সাহেব বললেন, “সুখ কেবল এক কল্পিত তত্ত্ব। দুঃখের সাপেক্ষে আপেক্ষিক বৈপরীত্বের কল্পিত তত্ত্বকে সুখ বলে। অর্থাৎ, শতভাগ দুঃখের মাঝ থেকে যতটুকু দুঃখ বিয়োগ হবে, ওই বিয়োগফলটাই সুখ। আর কেউ দুনিয়ায় শতভাগ দুঃখী নয়।ʼʼ
মাথা নত করে হাসে অন্তূ। তার সৌভাগ্য কি তার বাপ নয়?
“আব্বু মেজো কাকার সাথে ঝামেলায় না জড়িয়ে, আম্মুর বাপের বাড়ির জমিটা বিক্রি করে পাওনাদারদের দিতে পারতে না? জানা নেই কী হবে ওখানে? কাকা ভালো মানুষ না, উনি যেকোনো রকমের বিশ্রী তামাশা করতে দু’বার ভাববেন না। প্রতিদিন পাওনাদারের এই ঘুরাঘুরি আমার চোখে লাগছে খুব!ʼʼ
আমজাদ সাহেব স্মিত হাসলেন, “আমার লাগছে না?ʼʼ
অন্তূ সপ্রতিভ স্বরে বলল, “আমার চেয়ে বেশি লাগছে, আর সেটাই পীড়া দিচ্ছে আমাকে। তুমি কেন সহ্য করছো এসব? আম্মুর দত্তরের জমিটা ..
আমজাদ সাহেব ডেকে উঠলেন, “অন্তূ! তোর মাকে যেদিন বিয়ে করে আমার ঘরে নিয়ে এসেছিলাম, সেদিন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলাম, তোর মায়ের বাকি জীবনের সমস্ত ভার আমি বইবো। তার খাবার, কাপড়, থাকার জায়গা, চিকিৎসা–সবের দায়িত্ব আমার না? তাহলে সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি ঋণ করি, সেই ঋণ পরিশোধের দায় কার? তার বাপের বাড়ি থেকে সে কী পেয়েছে না পেয়েছে সেটা দেখার আমি কে? কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা? যতদিন বেঁচে আছি অন্তত ততদিন তো না। এমনকি মরার পরেও তার একটা ব্যবস্থা করে যাওয়া আমার কর্তব্য! তা পারব কি-না জানা নেই। তাহলে তার ভরনপোষনে খরচা করা টাকার ঋণ তার বাপের কাছে পাওয়া জমির পয়সায় কী করে পরিশোধ করি? এমনিতেই তাকে জীবনে ভালো তো রাখতে পারিনি আমি। এমন কিছু রেখেও যেতে পারব না, যা দিয়ে আমার অবর্তমানে তার খুব চলবে। তখন ঠিক ওই জায়গা বিক্রি করেই চলতে হবে হয়ত তাকে। এটা আমার কর্তব্যে খেলাপি না? মরার পরেও কর্তব্যের হেরফের হবে, বেঁচে থাকতেও যদি তাই করি..ʼʼ
আমজাদ সাহেব একটু থেমে আবার বললেন, “আমি তোর মায়ের কাছে এমনিতেও ঋণী, খুব ভার এই ঋণের। আমার ছেলের ওপর সেই শখ আমি রাখতে পারিনা, যে সে তার মা আর তোকে দেখবে।ʼʼ
অন্তূ হাসল। ছেলের ওপর ন্যায্য ভরসা রাখাকে শখ বলছেন এই লোক! মানুষটা ব্যাপক-অদ্ভুত-আত্মসম্মানী।
-“আগামীদিন বিচার আছে। আশা রাখা যায়, ভালো কিছুই হবে। গ্রামের মাতব্বররা আবার শালিস ডেকেছে। জমি পেয়ে যাব, বিক্রি হয়ে যাবে। পাওনাদার আর আসবে না, তুই চিন্তা করিস না।ʼʼ
আর কথা বাড়ায় না অন্তূ, ভাবনায় ডুবে যায়। রাবেয়ার ভাগ্য, নাকি কোনো নেকির ফল? মূর্খ-সরল, সহজ নারীটা হুটহাট তার আব্বুকে কোন কপালে পেয়ে গিয়েছিল? কী করলে এমন কাউকে এই শেষ বেলায় এমন শক্তিমান ছায়ার মতো পাওয়া যায়? হুট করে অন্তূর ভেতরে অদম্য এক শখ অথবা আকাঙ্ক্ষা জাগল—তার জীবনে এমন কেউ কি আসতে পারে না? ভাবী জিজ্ঞেস করে, তোমার কেমন সঙ্গী চাই? ভাবী বা আম্মা বোঝেনা, তার একজন এমন কর্তব্যপরায়ন পুরুষ চাই, যে একরাশ প্রশান্তি এবং এক বুক আত্মমর্যাদার চাদরে মুড়ানো, এক মুঠো নিঃস্ব সুখ হবে। সম্পদ ছাড়া তার কাছে সব থাকবে। একটু অবাক হলো নিজের ভাবনায়, সম্পদ ছাড়া? উত্তর এলো, হ্যাঁ! সম্পদ ছাড়া যে পুরুষেরা কর্তব্যপরায়ন, তারা স্বর্গীয়। এই তো আব্বু! সংকটেও যে এমন সব কাব্যিক কর্তব্যের বর্ণনা দেয় নিজের অর্ধাঙ্গীনিকে নিয়ে মেয়ের কাছে!
মাগরিবের আজান হলো। রাবেয়া ঘরে ঢুকলেন। আমজাদ সাহেব জায়নামাজের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে হাত বেঁধেছেন। রাবেয়া এসে পাশে দাঁড়াল। অন্তূ এই সুখময় সুযোগ ছাড়তে চাইল না। আব্বুর বাথরুমে অযু করে এলো। আজ সে এই দুই অদ্ভুত সঙ্গীদের মাঝে দাঁড়িয়ে মালিকের সামনে মাথা নোয়াবে।
আম্মু আব্বুর তুলনায় বেশ খাটো। লম্বা, চওড়া, অভিজাত নব্বই দশকের নায়কদের মতো আব্বুর পাশে আম্মুকে কি বেমানান লাগছে? আবার হাসল অন্তূ! উহু! এই দুজনকে বেমানান লাগতে পারেনা, এরা রবের সৃষ্ট জুটিদের মাঝে একজোড়া। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে রবের সম্মুখে ঝুঁকতে। কাধে কাধ মেলেনি উচ্চতায়, অথচ মনের মিল অসীম! অন্তূ সব ভুলে বুক ফুলিয়ে একটা ফুরফুরে শ্বাস ফেলে আব্বুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আব্বু নীরবে তার জন্য নিজের একপাশে পাশটায় জায়গা রেখে নামাজে দাঁড়িয়েছে। অপর পাশে রাবেয়া বেগম।
—
ইলেকশন এগিয়ে আসছে। প্রতীক বের হবে দিন দুয়েকের মাঝে। গতকাল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। ব্যস্ত সময় কাটছে হামজার, জয়ের দৌঁড়াদৌঁড়ি বেড়েছে।
সকাল দশটা। বাড়ির মেয়েরা রান্না শেষ করল, পুরুষগুলো জাগেনি তখনও। শাহানা বললেন, “এই যাও তো রিমি, দেখো তোমার শশুর উঠলো নাকি?ʼʼ
রিমি দুটো নোংরা প্লেট সিংকে রেখে বলল, “শশুরআব্বা এমনিতেও এখন উঠবে না, আম্মা! আমি উনাকে ডেকে আসি, সকাল সকাল ডাকতে বলেছিল, দশটা বেজে গেছে।ʼʼ
রিমি বের হবার সময় তরু ঢুকল রান্নাঘরে। শাহানা তরুকে জিজ্ঞেস করলেন, “জয় উঠছে?ʼʼ
তরু মাথা নেড়ে ‘নাʼ জানিয়ে ভাতের গামলাটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে গেল।
রিমি রুমে ঢুকে জানালার পর্দা ঠেলে কাঁচ সরিয়ে দিলো। হামজা উপুড় হয়ে শুয়েছিল। মুখ কুঁচকে নড়েচড়ে উঠল, “উমমহ! কী করছো, রিমি! পর্দা টেনে দাও!ʼʼ
ঘুম জড়ানো পুরুষের কণ্ঠস্বর এতোটা মোহনীয় হয়! তা কি জানে এরা? নিজের মনেই আওড়ালো রিমি। তার চেয়ে বয়সের পার্থক্য একটু বেশিই লোকটার। অথচ রিমির লোকটাকে একটুও ভয় করেনা, সংকোচ হয়না, খারাপ লাগেনা। দাড়ি-গোফ বেড়েছে লোকটার। নিজের যত্নে গাফলতি করছে ব্যস্ততায়। থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরনে শুয়ে থাকা এই লোককে তার পার্টির ছেলেরা এভাবে দেখলে কি নেতা মানবে? ছোটো যুবকের মতো লাগছে।
-“নেতাবাবু! আপনার নির্বাচন তো ফুরিয়ে গেল! উঠুন জলদি, আমার আর মেয়রের বউ হওয়া হলো না!ʼʼ
চোখ খুলে তাকাল হামজা। চোখের কোণে লালচে হয়ে আছে।
-“তুমি খুব ক্ষমতালোভী, বউ! আমার লোভ নেই তোমার, আছে আমার নেতাগিরির লোভ! আর এর ফলে আমার হাতে তোমার গর্দান যেতে পারে যেকোনো সময়!ʼʼ
রিমি বসল হামজার উরুর ওপর। অহংকারী ভঙ্গিতে গলা জড়িয়ে ধরল হামজার, এরপর কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে বলল, “ঠিক ধরেছেন। ক্ষমতাহীন পুরুষ আমার কাছে মৃত খরগোশের সমান। বাপ-ভাইদের দাপট করে বেড়াতে দেখে বড়ো হয়েছি আমি। পৌরসভার সাবেক মেয়রের ভাইয়ের মেয়ে আমি, আব্বু উপজেলা চেয়ারম্যান। তাদের এক কথায় জেলা কাঁপতে দেখেছি। বউ হয়ে এলাম যার ঘরে, তার কথায় যদি এরিয়া না কাঁপে, ভেতরটা সন্তুষ্ট হবে কী দিয়ে! যখন এসেছি আপনার হয়ে, তখন আপনি কেবল ছিলেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। ধীরে ধীরে আপনার উন্নতি দেখব, সাথে আমার পদবীরও, এই আশায়ই তো প্রতিটা বেলা গুণছি। নয়ত সেদিন আপনিই কেন? কারণ, সম্ভাবনা আছে আপনার মাঝে। আব্বুর বয়স যাচ্ছে, চাচা রিটায়ার নিয়েছে নিজে থেকেই। কার ক্ষমতায় বুক ফুলাবো আমি? আপনার, নেতাবাবু!ʼʼ
-“তোমাকে সব সময় শাড়ি পরতে বলেছি না?ʼʼ
রিমি উঠে দাঁড়িয়ে বিছানা থেকে হামজার টিশার্ট কুড়িয়ে নিলো। হামজা বলল, “আমার একটা পাঞ্জাবী বের করে দাও, তাড়াতাড়ি বের হতে হবে। জয় উঠেছে নাকি?ʼʼ
জয় কোনোসময় ঘরের দরজা আটকে ঘুমায় না। রাতে তার টাল হয়ে পড়ে থাকার অভ্যাস আছে যেহেতু, ওই অবস্থায় কবীর বা লিমন ওকে ধরে কোনোমতো রুমের সামনে পৌঁছে দিয়ে চলে যায়। হামজার চোখে পড়া পড়া যাবেনা।
তরু রুমে ঢুকল। রুমটা অন্ধকার হয়ে আছে। না ডেকে আগেই আলো জ্বালালে এক্ষুনি উঠে থাপ্পড় মারতে পারে একটা। লুঙ্গি পরনে, আর শার্টটা পড়ে আছে দরজার ডানপাশে ঝুরির ওপর, সেখানে ঝুলছে সেটা। হাতঘড়ি এখনও হাতেই। ওয়ালেট নিশ্চয়ই পকেটে!
তরু বিছানার পাশে গিয়ে ঝুঁকে বসল। আলগোছে হাতঘড়িটা খুলল, পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল। নাকে দুর্গন্ধ এসে ঠেকছে জয়ের মুখ থেকে। পুরো ঘরেও একটা ভ্যাপসা গন্ধ ছড়িয়েছে। উঠে দাঁড়িয়ে বোতল খুঁজল, পেল বেড সাইড টেবিলের একপাশে, বাঁকা হয়ে পড়ে আছে।
-“জয় ভাইয়া! শুনছেন? সকাল হয়েছে, ডাকছে আপনাকে হামজা ভাই! জয়!ʼʼ
জয় চোখ বুজেই উঠে বসল, “এককাপ কড়া করে চা বা ব্লাক কফি আন। শালার হ্যাংঅভার কাটছেই না।ʼʼ
জয় তরুকে কী চোখে দেখে, জানা নেই তরুর। সব সময় আদেশ, ধমক, ভয়ের ওপর রাখে। জয়ের আচরণ খিটখিটে। তরু বেশ ছোটো জয়ের। হামজার খালার মেয়ে তরু। জয় সে হিসেবে তরুর খালার ননদের ছেলে।
জয়ের যে দায়িত্বশীল একটা লুকানো আচরণ প্রকাশ পায় তরুর ওপর, সেটা তরু দেখেছে খালি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরে আসার সময় তরুর জন্য যা চোখে লাগে কিনে আনে, ডেকে হাতে দেয়। মন খারাপ থাকলে কাছে ডাকলে ধমকে জিজ্ঞেস করে, “মুখ থুবরে আছিস কেন? জামাই মরছে?ʼʼ
এবার ঢাকা থেকে ফেরার পথে দুটো তাতের শাড়ি এনেছিল সাথে করে। একটা রিমিকে দিয়েছে, আরেকটা তরুর। তরুর ঝুমকো দুল খুব পছন্দের। সাথে দু-জোড়া কালচে রঙা দুলও ছিল।
মাথা ব্যথা করলে মাথা টিপে দেয়া থেকে শুরু করে মাঝেমধ্যেই অসুস্থ জয়ের পাশে সারারাত জেগে সেবা করার দায়িত্বটুকুও তার। কোনোদিন ভুল করে বসেনি জয়। ভুল হবার আগেই ছিটকে সরিয়ে দিয়েছে তরুকে। অসুখের ঘোরেই কখনও কখনও রুম ছেড়ে বের হয়ে গিয়েছে হোটেলে নিজেকে শান্ত করতে। তরু জানে না, নিজের শারীরিক চাহিদার খাতিরে জয় তাকে কাছে টানলে সে জয়কে ঠেলতে পারতো কিনা! ভাবলেই একটা শিহরণ ছড়িয়ে যায় দেহ-মনে।
জয় ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে ফোন টিপতে টিপতে তুলির রুমে ঢুকল। বালিশে হেলান দিয়ে পা টান করে বসে আছে তুলি। জয়কে দেখেও দেখল না। বিছানায় বসে কম্বলটা ফেলে দিলো মেঝেতে। না ফেলেই দিব্যি বসা যেত।
-“রাতে খেয়েছিস?ʼʼ
-“তা জেনে তোর কী? এখন যা, কথা বলতে ইচ্ছে করছে নাʼʼ
তুলির গম্ভীর চেহারা।
-“কী আশ্চর্য আশা তোর! তুই বললি আর জয় তা মেনে চলে গেল! ইচ্ছে থাকলেও যাব না, কারণ তুই যাইতে বলতেছিস।ʼʼ
-“এখন ত্যাড়ামি না করে যা তো জয় রুম থেকে। ভালো লাগছে না।ʼʼ
-“আর তো কারও ভাতারের সাথে ঝামেলা হয় না, রাইট! তোর মতোন এমনে ড্যাং ড্যাং করে বাপের বাড়ি এসে ছ্যাঁচড়ার মতো পড়ে থাকে না তারা!ʼʼ
বিছানার ওপর থেকে একটা কুশন তুলে ছুঁড়ে মারল তুলি, “আমার বাপের বাড়ি আমি এসেছি, তোর কী? তুইও তো বাপের সম্পত্তি ফেলে এসে মামার বাড়ি পড়ে আছিস ছ্যাঁচড়ার মতো!ʼʼ
-হাসল জয়, “আমি কি তোর মতো স্বামীর সাথে কামড়াকামড়ি করে অসহায় হয়ে এসে উঠছি? বাপের অগাধ সম্পত্তি পড়ে আছে, তার পরেও তোর বাপের এই ছোটোলোক মার্কা ভএঙরি বাড়িতে এসে পড়ে আছি। তোমাদ বাপ মা এমনি পীর ভুজে ক্যান, সিস্টার? আমি মরলে কৌন বানেগা কোরপতি?ʼʼ
-“একটা লাত্থি মারি তোর ঘাঁড়ের ওপর, তার আগে বের হ আমার রুম থেকে। মন মেজাজ ভালো নেই এমনিই।ʼʼ
-“তোর রুম? এটা তোর রুম কেমনে! সেই কবেই তো তোরে কাল্টি করছে, মামা!ʼʼ
তুলি করুণ দৃষ্টিতে তাকাল জয়ের দিকে, “আমার ভালো লাগছে না, জয়!ʼʼ
-“তো আমি কী করব?ʼʼ
ক্ষণকাল বাদে তুলির কণ্ঠস্বর কাঁপল, “আমার মেয়েকে কোল থেকে কেড়ে রেখে বলে, তুই যেখানে যাবি যা, মারা খা গিয়ে। আমার মেয়ে যাবে না তোর মতো খা*** সাথে। আমি সেই বাড়িতে কীভাবে আবার যাব, জয়!ʼʼ
জয়ের অভিব্যক্তির পরিবর্তন হলো না। এদিক-ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “মামাকে বলেছিস?ʼʼ
-“আব্বুকে কী বলব? আরও চিন্তা করবে। সামনে ইলেকশন। এখন আমার ঝামেলা কী করে চাপাই তার ওপর?ʼʼ
-“সাহেব জানে?ʼʼ
-“হামজা ভাই? অল্প জানে।ʼʼ
-“কী চাইতেছিস তুই এখন?ʼʼ
মাথা নিচু করল তুলি, “আমি কী চাইব? আমার ছোট্ট মেয়েটাকে দেখি না কতদিন হলো। কীভাবে আছে কিচ্ছু জানি না..ʼʼ কান্নায় ভেঙে পড়ল তুলি।
জয় বিরক্ত হয়ে ধমক উঠল, “এই থামা! প্যানপ্যান না করে ক কাহিনি কী? সকাল সকাল তোর ক্যাউ ক্যাউ শুনতে আসি নাই ঘুম কামাই করে।ʼʼ
তুলি সুন্দরী। শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালশিটে দাগ বোঝা যাচ্ছে, দেহের রঙ ফর্সা হবার ফলে আরও বেশি বোঝা যাচ্ছে। ফর্সা মুখের ওপর চোখের নিচের কালি খুব চোখে বিঁধছে।
জয় গম্ভীর হলো, “কী হয়েছে?ʼʼ
কিছুক্ষণ সময় নিলো তুলি। কাঁদছে না ও। জয় তার দুঃখ শুনে সমবেদনা জানাবে না, না সান্ত্বণা দেবে, নরম সুরে আদুরে কণ্ঠে বোঝাবে না। তবু সকল দুঃখ শোনার দাবিদার সে! বাসি পেটে ঘরের মধ্যে সিগারেট জ্বালিয়ে মন ভরে টানছে, আর হাঁটু দোলাচ্ছে।
তুলি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, যা এখান থেকে।
-“সীমান্তর নম্বরটা দে।ʼʼ
-“না! দরকার নেই। আমি কথা বলে নেব, তুই শান্ত হ। মিটিয়ে নেব আমি। আচ্ছা আর কাঁদছি না। জয়..ʼʼ
জয় তাকাল তুলির দিকে। এখন ঠাটিয়ে দুটো চড় মারতে দ্বিধাবোধ করবে না জয়। সেই সভ্যতা বা আদব নেই ওর মাঝে। হোক বড়ো বা ছোটো, হাত উঠে যায় খুব সহজে। তুলি নম্বর বলল। ফোনে তুলল নম্বরটা জয়। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “খেতে আয়।ʼʼ
-“আমার এখন খিদে পায়নি। পরে খেয়ে নেব, তুই খেয়ে বের হ।ʼʼ
জয় বের হয়ে যেতে যেতে বলল, “দ্বিতীয়বার আর কেউ ডাকতে আসবে না, আর না আমি রিপিট করব। ব্রাশ করে এসে যেন টেবিলে পাই তোকে।ʼʼ
হামজা আর জয় বাড়ি থেকে বের হলো দুপুর বারোটার দিকে। কবীর গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোড়ের ওপর। এই পথটুকু হেঁটে যেতে হবে। রাস্তার হাঁটার সময় এক মহিলা এগিয়ে এলো ওদের দিকে। দুজনে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছেন, চাচি?ʼʼ
চাচি বললেন, “ভালা আছি, বাপ। তোমার আব্বায় যে কইছিল একখান বিধবাভাতার কাড কইরা দিবো। সগ্গলে পাইছে, আমি খালি পাই নাই।ʼʼ
জয়ের দিকে তাকাল হামজা। জয় রোদচশমাটা খুলে বলল, “আপনি কাল সকালে আসবেন আমাদের বাড়িতে। ওগুলো আমার কাছে দিয়েছে হামজা ভাই, আমি দিয়েছি সকলকে, কয়েকজনেরটা রয়ে গেছে, ওর মধ্যে আপনারটাও আছে।ʼʼ
মহিলা সন্তুষ্ট মনে চলে গেলেন। এগোতে এগোতে ছোটো দুটো ছেলে সালাম হাত কপালে ঠেকিয়ে সালাম ঠুকল দুজনকে। এলাকার ফার্মেসির দোকানদার হামজাকে ডেকে বলল, “এই রাস্তায় তো আর হাঁটা যায় না, বাজান। একটু বৃষ্টি হইলেই কাদাপানি প্যাক-প্যাক করে। রাস্তার কাজ কবে ধরবা, হামজা!ʼʼ
হামজা হাসল, “এই তো, কাকা! নির্বাচনের ঝামেলাটা মিটলে আর কষ্ট করতে হবে না আপনাদের। রাস্তার কাজ এই রাস্তা দিয়েই শুরু করব, ইনশা-আল্লাহ! এলাকার মানুষ আগে আমার। আর এমনিতেও শীত নামানোর বৃষ্টি এসব, শীত এসে গেছে অলরেডি। এখন আর বৃষ্টি বা কাদা হবে না কয়েকমাস।ʼʼ
গাড়িতে উঠে বসল দুজন। হামজা সামনের সিটে উঠতে গেলে জয় এসে হানা দিলো, “তুমি পেছনে যাও, আমি এখানে বসব।ʼʼ
হামজা বিরক্ত হয়ে বলল, “আমাকে বিরক্ত করতে জন্মেছিস তুই এই জনমটা। তুই বড়ো হবি না এ জীবনে?ʼʼ
-“চান্স নাই, ব্রো। কথা না বলে পেছনে যাও তো! রোদে গা পুড়তেছে আমার।ʼʼ
গাড়ি চলছে মেইনরোড ঘেঁষে। হামজা জিজ্ঞেস করল, “সেদিন তোদের গাড়ির কী হয়েছিল শুনলাম!ʼʼ
জয় গম্ভীর হলো, “কার জানি চুলকানি উঠছে মনেহয় আমায় নিয়ে। একটু মলম লাগানো দরকার, তবে তার আগে হারামির বাচ্চাটার ঘা খুঁজে পাওয়া দরকার!ʼʼ
হামজা গাড়ির কাঁচ টেনে দিয়ে বলল, “বাবাকে আবার ডেকেছিল থানায়। এরপর থানায় ডাকা হলে, তুই সঙ্গে যাবি।ʼʼ
মাথা ঝাঁকাল জয়, “অসম্ভব। ওই পুলিশ শালাদের একেকটা মশার কয়েল টাইপ প্রশ্নে আমার মাথা সাড়ে পাঁচশো ডিগ্রি সেন্ট্রিগেড গরম হয়। হাঙ্গামা হবে আমি গেলে।ʼʼ
হামজা মুখ শক্ত করল, “শুয়োরের বাচ্চা। মাইর খাবি। বলি, সবসময় ঠান্ডা মাথা নিয়ে চলবি, রাজনীতি একটা কৌশলগত চক্র। সেখানে তোর এই অভার-টেমপার মাথার জন্য জীবনে তোর উন্নতি হবে না, সাথে আমি তো রোজ ডুবছিই।ʼʼ
-“আমার..ʼʼ থেমে গিয়ে দাঁত খিঁচল, “আমার সামনে আমার বদনাম করতেছ তুমি?ʼʼ
হামজা চট করে হেসে ফেলল, “আমি তোর পেছনে!ʼʼ
কবীর হেসে উঠল। সিটে মাথা ঠেকাল জয়, চোখ বুজে জিজ্ঞেস করল, “গন্তব্য কোথায়, সাহেব?ʼʼ
-“মেয়র সাহেবের বাড়ি যাচ্ছি।ʼʼ
জয় দেহটা এলিয়ে দিলো সিটে। মাড়ির দাঁতের আগায় জিহ্বা ঘুরিয়ে হেসে মাথা ফেরালো পেছনে, “ছেলে বড়ো হয়েছে, ভাই! রাত হলেই ক্ষুধা লেগে যায় শরীরে। তোমরা একটা ব্যবস্থা করছো না..ʼʼ
কবীর জিহ্বা কামড়ালো, “লজ্জা শরম কোন হকারের কাছে বেঁচে বাদাম খাইছেন, ভাই? আপনার কী ব্যবস্থা করবে, হামজা ভাই? বারো থালায় খাওয়া লোককে একটা বিয়ে দিলে পোষাবে? বিয়ে করবি তুমি?ʼʼ
-“উহু! লাইফটাকে এখনও চেস করার আছে। এতো সকালে বলি হওয়া ঠিক না।ʼʼ
হামজা সিগারেট ধরালো, “তুই আসলেই মেয়েবাজী শুরু করেছিস, জয়? আমার বিশ্বাস হয় না।ʼʼ
কবীর হো হো করে হাসল হামজার নাটকে। খপ করে হামজার ঠোঁটের ভাঁজ থেকে সিগারেটটা কেঁড়ে নিজের ঠোঁটের গুজে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “গুজব ওসব। আমি একজন ভালো লোক!ʼʼ
-“তরুর ব্যাপারে ভেবেছিস কখনও?ʼʼ
হুট করে গাড়ির কাচ তুলে এসি অন করে দিলো জয়। হামজা তৎক্ষনাৎ একটা থাবরা মারল জয়ের কাধে, “মারার আরও বহু প্লান আছে, এভাবে মারলে পাপ বেশি হবে তোর..ʼʼ কেশে উঠল হালকা।
জয় বলল, “তাই বলে তরুর দিকে নজর গেল তোমার?ʼʼ
-“তুই আগে জানালার কাঁচ নামা। শ্বাস আটকে মরে যাব, ধোঁয়া জমে গেছে ভেতরে, ঠান্ডাও লাগছে।ʼʼ
সিটে মাথা এলিয়ে দিলো জয়, “মরলে লাভ সবচেয়ে বেশি আমার, এবার মেয়র পদ আমার, কনফার্ম! তোমার পাশের জানালা খোলো, বাল!ʼʼ কবীরকে বলল, “এসি অফ কর।ʼʼ
কবীর আচমকা ব্রেক কষল। জয় নেমে দাঁড়াল। লম্বা শরীরে সাদা লুঙ্গি জয়ের। হামজা নেমে শাল চাদরটা গায়ে পেচিয়ে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সৈয়দ মুস্তাকিন মহান দাঁড়িয়ে আছে পকেটে হাত গুজে।
চলবে..
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৭.
“শীত ভালোই পড়ে গেল, হবু মেয়র সাহেব! কী বলেন!ʼʼ
মুস্তাকিনের পাশে কয়েকজন আইন কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে।
হামজা হাসল, “মেয়র সম্বোধন করে কি অপমান করতে চাইছেন, নাকি আগাম শুভেচ্ছাবার্তা জানাচ্ছেন, আসলেই বুঝতে চাপ পাচ্ছি!ʼʼ
মুস্তাকিন হাসল, “হাসিমুখে যখন বলেছি, শুভেচ্ছাবার্তাই ধরে নিন। রাস্তায় রাস্তায় পোস্টার সাঁটার কাজ শুরু হয়ে গেছে। শুভকামনা আপনার জন্য!ʼʼ
হাত মেলালো দুজনে। হামজা হাতটা ছাড়িয়ে বুকে রাখল হাসিমুখে।
মুস্তাকিন মহান বিনা কাজে শুভেচ্ছা জানাতে তো আর মাঝপথে বয়ে আসেনি!
-“হামজা সাহেব, দেখুন! লোকের মুখে যা রটে, তাই নাকি ঘটে। যদিও এসব কথার কথা। তবুও, লোকের এত জোরালো সন্দেহ কেন আপনাদের ওপর? এ ব্যাপারে আগেও কথা হয়েছে, তবুও বারবার আসলে বিষয়টা এসে এখানেই ঠেকে যাচ্ছে।ʼʼ
হামজা সোজা হয়ে দাঁড়াল, “দেখুন অফিসার! আপনি কতটা ঠিক বলছেন, বা একটু বাড়িয়ে জানি না। লোকের কতটা সন্দেহ আমাদের ওপর, তা আসলে মেপে দেখার সময় পাইনি ইলেকশনের ঝামেলায়। তবে ততটাও হবে না জানি, যতটা বোঝাতে চেষ্টা করছেন আপনি। লোক টুকটাক ভালোই বাসে আমাকে। রাজনৈতিক দলে যেহেতু আছি। প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নই! মূলত, যে জমিজমা সংক্রান্ত ব্যপার ওই পরিবারে ঘটেছিল, তার বিচার আমি আর জয় করেছিলাম। সর্বশেষে সময় দিয়েছিলাম কিছুদিন। মানুষ জমি সমস্যায় পড়ে বিক্রি করতেই পারে, ওরা আবার তা ফেরত নিতে চেয়েছিল, কিন্তু সময় পার হয়ে গেছিল, তবুও আমি আরও কিছুদিন সময় দিয়েছিলাম। এর মানে এটা কীভাবে হয় যে একটা ছোট্ট পনেরো বছর বয়সী মেয়ে, যে হয়ত আমার বোনের সমান! তাকে এমন নৃশংসভাবে..ʼʼ মাথা নাড়ল হামজা, “যুক্তিতে মেলে আসলে?ʼʼ
-“কিন্তু এখন একটা বড়ো কাজে হাত লাগিয়েছি, লোকের চোখে এমনিই পড়ে গেছি। যেমন বিপক্ষ দলগুলোর চোখে, তেমন সাধারণ মানুষ একটা ছুঁতো পেলে ছাড়ছে না। বোঝেন তো, রাজনৈতিক নেতাদের সাধারণ মানুষ কোনোকালেই ভালো চোখে দেখেনি। কারণ তাদের চাহিদা অপূর্ণ রয়ে যায় বহু।ʼʼ
মুস্তাকিন রোদ চশমাটা চোখে আটলো। দারুণ সুদর্শন একজন পুরুষের খেতাব পাওয়ার মতো সবই আছে তার মাঝে। হামজা কথার মাথ-প্যাচে দারুণ দক্ষ, এবং সুবিন্যস্ত কথার কৌশল। এতো কম সময়ে এত জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতি নিয়ে রাজনীতি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে!
মুস্তাকিন প্রশ্ন করল, “আপনি বিপক্ষ দল বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন, সেই বিষয়টা ক্লিয়ার করুন। এখানে আপনাদের এভাবে বেশিক্ষণ ধরে রাখা ঠিক হবে না, সাথে আমার নিজেরই গা জ্বলছে। দ্রুত কথা সেরে নিই।ʼʼ
হামজা বলল, “আমার চাচাশশুর। মানে সাবেক মেয়র সাহেব। এবার তাকে হারিয়েই আমাকে জিততে হবে। সে কোনোকালেই আমাকে ভালো চোখে দেখেনি, দেখছে না।ʼʼ
মুস্তাকিন প্রশ্ন করল, “তা কীসের ভিত্তিতে বলছেন?ʼʼ
হামজা হাসল, “সেদিন জয়কে ডেকেছিলেন তিনি নিজেই। এরপর হঠাৎ-ই জয়ের গাড়ির সামনে বিপদজনকভাবে একটা বোঝাই ট্রাক চলে এসে মেরে দিতে দিতে বাঁচিয়ে চলে গেছে। এটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? এসব আমাদের সাথে হতেই থাকে, তবে এটা কাকতালীয় ছিল না, অফিসার!ʼʼ
-“আপনাদের গন্তব্য এখন কোথায়?ʼʼ
-“মেয়র সাহেবের সাথেই দেখা করতে যাচ্ছি।ʼʼ
মুস্তাকিন হাসল, “সেদিনের ঘটতে যাওয়া এক্সিডেন্টের দায় মেয়র সাহেবকে দিয়েছেন নাকি? সেই হিসেব চুকাতে যাচ্ছেন?ʼʼ
হামজা হাসল নিঃশব্দে। তার তলোয়ারের মতো রাজকীয় অভিজাত গোফের সরু প্রান্ত পাক খেয়ে গেল হাসির দমকে। মুস্তাকিন আবার বলল, “আচ্ছা, পরে-টরে একবার কার্যালয়ে আসুন। এখানে এই রোদে গা পুড়িয়ে কথা জমছে না। অনেক তথ্যের প্রয়োজন। মানছি এখন ব্যস্ত আপনারা, তবে তবুও একটু আসুন সময় করে। চলি!ʼʼ
হাত মিলিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় জয়কে বলল মুস্তাকিন, “গিয়ে আবার মেয়র সাহেবকে খুন-টুন করে আসবেন না যেন!ʼʼ
জয় নিজস্ব ভঙ্গিমায় ঠোঁট একপেশে হাসি হাসল, “আমাদের আগে আপনিই দেখছি সিওর, সেদিনের কাজটা মেয়র করেছে!ʼʼ
খাঁড়া দুপুর। বাংলায় অগ্রহায়ন মাস পড়ে গেছে। ঠান্ডা-গরমের কাটাকাটি চলছে। জয় গাড়ি থেকে নামল পরে, হামজা বেরিয়ে গেছে ফোন কানে ধরে। সামনে দোতলা বাড়ি। কবীর জয়কে জিজ্ঞেস করল, “আমি কি যাব ভেতরে?ʼʼ
জয় ঘাঁড় ঘুরিয়ে তাকালো, “আমার বিয়ের বরযাত্রী হয়ে এসেছ, শালা! আমার সাথে গিয়ে আস্ত মুরগীর প্লেটের সামনে বসবি তাড়াহুড়ো করে?ʼʼ
হামজা ফোনে কথা সেড়ে এসে দাঁড়াল। জয় খ্যাকখ্যাক করে উঠল, “তোমার ফোন না ঘণ্টা? বালডা সারাদিন খালি বাজতেই থাকে!ʼʼ
ঝন্টু সাহেবের বাড়িতে আলাদা বৈঠকখানা নেই। চাচাশশুরের বাড়ি ছাড়াও মেয়রের বাড়িতে দুই ঘাঘুর যাতায়াত আগে-পরেই আছে। বসার রুমে বসেই রাজনৈতিক আলোচনা সারেন মেয়র কামরুজ্জামান ঝন্টু। এখন আর ওনার সাথে ওনার সহকারী নেই। ওরা এসেছেই ভর দুপুরে, অসময়ে।
বাজার করার লোক জানিয়ে গেল, “বসুন আপনেরা। বাবু আসতেছে।ʼʼ
জয় বলল, “যা পারেনা তা মারাতে হবে কেন? ভদ্র বাংলার পেছন মারছে।ʼʼ
হামজা শক্ত মুখে তাকিয়ে বলল, “তোর খাপছাড়া মুখে লাগাম দে, জয়। নয়ত একটা থাপ্পড় মারব, দুটো দাঁত পড়ে যাবে সামনের পাটি থেকে।ʼʼ
-“ব্যাপার না। তবে তাতে তোমার হাজারখানেক ভোট কমবে এবার।ʼʼ
-“তুই একাই হাজার ভোট মারবি?ʼʼ
-“আমার বাচ্চারা মারবে। এখন আবার জিজ্ঞেস করোনা, এতো ছোটো বয়সে এতোগুলা কেমনে জন্মাইছি। আসলে সবই ক্যাপাসিটির ব্যাপার!ʼʼ
-“বড় ভাই আমি তোর।ʼʼ
জয় অবাক হলো, “আঃ! জানতামই না! আগে বলেননি কেন, সাহেব! আপনি আমার ভাই, অথচ পরিচয়ই ছিলনা! এই সুখ আমি সইব কেমনে?ʼʼ
ঝন্টু সাহেব নিচে নামলেন। মেয়র সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “কী খাবে তোমরা?ʼʼ
জয় ফোন থেকে চোখ না তুলে বলল, “চা-পানি খাওয়ার হলে দুপুরে আসতাম না, মেয়র কাকা। দুপুরের ভোজে কী কী আছে সেটা বলুন।ʼʼ
মেয়র সাহেব হাসলেন, “খারাপ নেই, পছন্দ হবে তোমাদের। খেলে তো ভালোই, এরকম আন্তরিকভাবে খেতে কয়জন চায়!ʼʼ
-“আলোচনার ক্লাইম্যাক্স ভালো হলে খেয়েই যাব। এখন চা-কফি মার্কা সস্তা খাবার রাখুন।ʼʼ
মেয়র বললেন, “হু, শুরু করো।ʼʼ
-“আপনি বসে যান। আমাদের পরিবার থেকে কেউ মেয়র পদপ্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছে এবার, জানেন তো।ʼʼ
মেয়র হেসে ফেললেন, “কেন, ভয় পাচ্ছ নাকি? আমি বিরোধী দলে থাকলে তোমাদের পরিবারে ভোট পড়বে না!ʼʼ
হামজা হাসল, “ভয়? ভয় নয়। আমার ছেলেরা আপনার সাথে হাঙ্গামা করবে, কাকা। আমি সুষ্ঠু নির্বাচন চাইছি, তাই আপনি বসে গেলে ঝামেলা থেকে বেঁচে গেলেন। প্রোফিট আপনার, এডভাইস আমার।ʼʼ
মেয়র বললেন, “রাজনীতিতে এতোগুলো বছর কাটিয়েছি, হাঙ্গামার সাথে পরিচিত না হয়েই? বেশিদিন বরং ঝামেলা না হলেই খুব মিস করি ঝয়-ঝামেলাকে। তো এভাবে কি সব প্রার্থীকে হাঙ্গামা থেকে রক্ষা করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুরোধ করে আসবে? তোমার মতো এমন শুভাকাঙ্ক্ষী বিরোধী কয়জনের কপালে জুটেছে রাজনৈতিক জীবনে?ʼʼ
-“অনুরোধ করছি?ʼʼ হাসল হামজা, “কাকা! আমি শুধু ছাত্রলীগ করে যে জনতা আর ফেম জুটিয়েছি, আপনি পাঁচ বছর মেয়র থেকে কেন, আরও দশ বছর সময় নিলেও তার একাংশ নিজের করতে পারবেন না।ʼʼ
-“আচ্ছা! ক্ষমতাধারী হয়ে গেছ তাহলে! তো সেই হিসেবে এখন তুমি ক্ষমতার জোরে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নির্বাচন করতে চাও?ʼʼ
-“উহু! তাহলে সেই জিতকে জেতা বলা চলবে নাকি? আমি শুধু আপনাকে বসতে বলছি।ʼʼ
-“তুমি বললে আমি বসে গেলাম। ভয় পেয়েছি খুব তোমাকে, জামাই আব্বা!ʼʼ নাটকীয়তার সুরে বললেন মেয়র।
স্বাভাবিক স্বরে জবাব দিলো হামজা, “কিন্তু আমি তো আপনাকে ভয় পেয়ে বসতে বলিনি। ভালোভাবে বুঝেশুনে বসে পড়ুন। বুঝলে আপনি আপনা থেকেই বসে যাবেন অবশ্য!ʼʼ
-“কী বুঝব আমি?ʼʼ
-“কত কিছুই তো রয়ে গেছে বোঝার!ʼʼ
মেয়র সাহেব শান্ত স্বরে বললেন, “এমন কী বোঝার রয়েছে, যার জন্য নির্দিষ্ট করে শুধু আমাকেই বসে যেতে হবে? এবং সেটা তোমার বলাতে! আমাকে দূর্বল আর নিজেকে বেশি পাওয়ারফুল ভেবো না। ঝড় কিন্তু আগে পাওয়ার হাউজকেই ড্যামেজ করে, বাপ!ʼʼ হাসলেন মেয়র সাহেব কথাটা বলে।
হামজা হাসিমুখে বলল, “আপনি বসে না গেলে বিশাল তামাশা খাঁড়া হবে, কাকা! যেটা এমনিতেও আপনার নির্বাচন ডাউন করবে।ʼʼ
মেয়র সাহেব প্রত্যুত্তর করলেন, “তামাশা আমরা না করতে শিখেই রাজনীতিতে আটাশ বছর কাটাইনি, এটা ভুলে যাচ্ছ কেন, পাগল ছেলে! তুমি তো সেদিনের ছেলে! যাহোক, বলো কেন বসতে হবে আমাকে?ʼʼ
-“আমি চাইছি, তাই! এটুকুই যথেষ্ট। আপনি আমার প্রতিপক্ষ বলে বলছি— এমনটা ভাবাটা কেমন উদ্ভট হয়ে যাবে না? নির্বাচন কেমন হওয়া চাই জানেন! হাজার কয়েক প্রার্থীর ভিড়ে আমি জিতে বসে থাকব, এমন। ইনফেক্ট, আমি আপনাকে আর নির্বাচন করতে দেব না, ব্যাস! এজন্য আপনি বসে যাবেন। এর চেয়ে বড়ো কারণ দরকার নেই আর।ʼʼ
স্বাভাবিক ভাবে জানতে চাইলেন মেয়র সাহেব, “না চাওয়ার কারণ?ʼʼ
হামজা চুপচাপ কিছুক্ষণ মেঝের দিকে চেয়ে থেকে ঠোঁট কামড়াল। এরপর বলল, “এই যেমন সেদিন আপনি জয়কে ডাকলেন কথা বলার জন্য। এরপর নিজেই আবার বোঝাই করা ট্রাক পাঠালেন জয়ের গাড়ি পিষতে। এতে উদ্দেশ্যটা কী? আপনি ডেকে আপনিই কেন জয়কে মারবেন? এই প্রশ্ন উঠবে মার্ডারের পেছনে! আপনি সন্দেহের তালিকা থেকে মুক্ত হবেন, জয় টপকে যাবে। চ্যাহ! হাজার বছর পুরোনো টেকনিক। এজন্য আমি বলি, রাজনীতি তরুণ জনতাদের জন্য। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের এসব মারপ্যাচের জগৎ থেকে অবসর নেয়া উচিত। এরকম মুর্খ খেলায় মজতে আমি লজ্জা পেয়েছি, জানেন! আমার প্রতিপক্ষ এতো কাঁচা হলে কী করে চলবে?ʼʼ
মেয়র সাহেব শুধু চেয়ে রইলেন হামজার দিকে সূচাল চোখে। হামজা জিজ্ঞেস করল, “কেন মারতে চেয়েছেন জয়কে?ʼʼ
মেয়র সাহেব চাপা স্বরে বললেন, “জয় নিঃসন্দেহে ছাত্রনেতা হিসেবে খুব দায়িত্বশীল ভাইস প্রেসিডেন্ট। অথচ তলে তলে কুকীর্তির অভাব রাখে না সে। তা তো আর অজানা না আমার! তবুও কোনোদিন তোমার গিট্টু খুলতে যাইনি সোসাইটিতে, বাচ্চা মানুষ তুমি। দাপট করে বেড়াচ্ছ, বেড়াও। একাই ঝরে যাবে দিন গেলে। কিন্তু এবার জয় কী করল! একটা মেয়েকে খেয়েদেয়ে ভোগে পাঠিয়ে দিয়েছে! তা করেছে, তাতেও দোষ দিচ্ছি না, পুরুষ মানুষ করতেই পারে। কিন্তু আমার ডাক পড়ল দু’দিন পিবিআই ডিপার্টমেন্টে। বাড়িতে তল্লাশি চলল উল্টে-পাল্টে।ʼʼ এপর্যায়ে মেয়র সাহেব বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলেন, “আমার রেপুটেশন খেতে উঠেপড়ে লেগেছ দুই ভাই। আমি তোমাদের জান হজম না করে ছেড়ে দিই কী করে? এখন আবার এসেছ হুমকি দিয়ে লাঠি কেঁড়ে নিতে! বাচ্চাদের খেলাঘরের মতো বিবেচনাবোধ তোমার। তোমার নিজেকে কাঁচা খেলোয়ার মনে হয় না, হামজা?ʼʼ
আজও ঝন্টু সাহেবের যে চিন্তাধারা এবং শীতল দাপুটে আচরণ, তাতে হামজা খুব মজা পায় বরাবরই এই লোকের বিরুদ্ধে পলিটিক্যাল ট্রিক্স চালিয়ে। মনের মতো বিরোধী মনে হয় এনাকে। হামজা চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। পরে বলল, “জয় এসব করেছে, তা কোন ভিত্তিতে বলছেন আপনি?ʼʼ
মেয়র পান খাওয়া লালচে দাঁত বের করে ক্যাটক্যাটে হেসে উঠলেন “আবার ভিত্তি খুঁজছে, ছেলে! দেখো কাণ্ড!ʼʼ
হামজা জানালো, “জয় এসব করেনি।ʼʼ
-“তা নাহয় প্রসাশন জানে, আমি তুমি তো জানি জয় করেছে।ʼʼ
হামজা জোর দিয়ে বলল এবার, “প্রসাশন যা জানে, আপনার আমারও তা-ই জানার। কারণ, সত্যিটা তা-ই। দুনিয়ার সব অপরাধ তো আর জয় একা করতে পারে না! ওরও তো একটা ক্লান্তি আছে অপরাধ করে! কালুও করতে পারে কাজটা! রাজনের লোকেরা করতে পারে! দিনাজপুরে যে একটা শীর্ষসন্ত্রাস ত্রাসের সাম্রাজ্য গড়ে তাতে বাদশাহী করছে, তা ভুলে যাচ্ছেন আপনি, কাকা!ʼʼ
মেয়র সাহেব চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ হামজার দিকে। শান্ত শীতল, ধূর্ত নেতাকর্মী হামজা। কোনো কিছুতে বিচলিত হবার প্রবণতা দেখা যায়না তার চেহারায়। মেয়র সাহেব বললেন, “রাজন নাও করতে পারে। তুমিও করতে পারো! ব্যাটাছেলে মানুষ বলে কথা! তুমি ভিত্তি খুঁজছিলে না! ভিত্তি দেই তোমাকে। ধরো, যে ঘটনাটা ঘটেছে মেয়েটার সাথে, তা তোমরা করেছ কোনো কারণে, আর এখন তার দায় আমার ওপর চাপিয়ে আমাকে বদনাম করে ডাউন করতে চাইছ। দুটো নিশানা, একটা তীর! হতে পারে না কি এরকম? আমাকে বসিয়ে মেয়র হবে পাটোয়ারী পরিবারের কেউ। এটাই তো বলতে এসেছ। যখন দেখলে নির্বাচন খুব কাছে এসে গেছে, প্রতীক বের হয়ে গেছে। আমাকে জেলে পুরা হলো না, তীর লাগল না আমার গায়ে, তোমরা তিন বাপ-ব্যাটাই জন্মের ফাঁসা ফেঁসে গেছ, আর বাড়ি চলে এসেছে বাড়ির ছেলে দুটো!ʼʼ কথা শেষ করে সোফায় গা এলিয়ে বসলেন ঝন্টু সাহেব।
হামজা ডানে-বাঁয়ে ঘাঁড় ঘুরিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “বেশি বুঝছেন আপনি, কাকা! জয় কিছুই করেনি। আমি যা কামিয়েছে এই লাইনে, এবার চাইলে সংসদ নির্বাচন করলে সংসদের একটা সিট আমার ঘাঁড়ে পড়ে যেত নির্ভেজাল ভাবে। তবে এতো তাড়াতাড়ি লাফ দিয়ে কলা খাওয়ার নয় আমার। মোরঅভার, এবার নির্বাচন করছেন না আপনি, সোজা কথা। ধরে নিন এটা আপনার পাওনা শাস্তি অথবা আমার জোর, হতে পারে সেই জোরের জেরে শুধুই আমার ইচ্ছে। আপনার শাস্তি এই যে, প্রতীক বের হবার পরে আপনি নিজে গিয়ে নির্বাচন অফিসে নিজের নামটা কেটে আসবেন লাল কালিতে। ভোট কেন্দ্রে আপনার নাম এবং প্রতীকের কোনোরকম ব্যালট পেপার থাকবে না। আপনি যা করেছেন তা তো ভারী পড়বেই আপনার ওপর।ʼʼ
-“ও তুমি চিন্তা কোরো না, বাপ! আমি ভার বয়ে নেব।ʼʼ
জয় এতক্ষণে হেসে ফেলল, “একটু বেশিই ভার, কাকা! আপনার শক্তিতে নাও কুলাতে পারে! এই বয়সে ঘাঁড় বেঁকে গেলে মুশকিল, মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গুড়ো হবার চান্সও আছে।ʼʼ
-“তাই নাকি?ʼʼ
জয় ফোনটা হাতের মধ্যেই ঘুরাতে ঘুরাতে বলল, “আপনার ইট-বালুর বিশাল ব্যবসা আছে না? কার নামে যেন চলে! আপনার বউ থুক্কু চাচির নামে, নাকি মেয়ে! ঝিরি এন্টারপ্রাইজ। ঝিরি কার নাম, কাকা?ʼʼ
মেয়র সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন। জয় ফোনের স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে ধরল। সেখানে দেখা যাচ্ছে– লণ্ডভণ্ড অবস্থায় সন্ধ্যার আকাশের নিচে গাড়ির ফ্রন্ট গ্লাস ভেদ করে খুব কাঁপাকাঁপির সাথে তোলা এক ভিডিও। কয়েক সেকেন্ড পর তার এঙ্গেল চলে গেল
গাড়ির ভেতর থেকে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে পেছন দিকের দৃশ্যকে শ্যুট করা কোনো ভিডিও ফুটেজ। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে ট্রাকটা এতক্ষণে এইগাড়ির সামনে ছিল, তা গাড়িটাকে পাশ কাটিয়ে এখন পেছনে চলে গেছে। ট্রাকের পেছনে বেশ বড়ো করে রঙ দিয়ে লেখা ‘ঝিরি এন্টারপ্রাইজʼ।
ভিডিওটা তৈরী হয়ে গেছিল জয়ের ফোনের ব্যাক ক্যামেরাতে, সেদিন যখন সে কবীরের ভেটকানো ছবি তুলতে ক্যামেরা অন করেছিল। ঝন্টু সাহেবের মুখভঙ্গিমা দেখে বোঝা গেল না, তিনি কী করবেন! খুব খাঁটি রাজনীতিবিদ, বহুবছরের চলাচল এই পথে তার।
দুজনে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। পাশেরটাই হামজার শশুরবাড়ি। জয় খোঁচা মারল, “যাও শশুর বাড়ি, মধুর হাড়ি ভেঙে পেট ফুলিয়ে এসো। মানে আমি আবার গেলে প্রেগনেন্ট হয়ে পেট ফুলবে, তা বলছি না। গিলবে, গিলে পেট ফুলাবে। তোমাদেরই তো দিন, আমরা বাল সিঙ্গেল মানুষ। না আছে বউ, না শশুরবাড়ি!ʼʼ
হামজা কনুই দিয়ে গলা আকড়ে ধরল জয়ের। রাস্তার মাঝেই দুজনের কুস্তি বেধে গেল এক চোট। কবীর একটু দূরে দাঁড়িয়ে খালি হাসে। জয় একসময় নিজেকে ছাড়িয়ে হাঁপায়, “তোমার ওই পাণ্ডবের মতো হাত দিয়ে আমার গলা চাপলে, রুহু ব্যথায় না হোক, বিরক্তিতেই বেরিয়ে আসবে। এই গায়ে ডিও-মিও কিছু মারো না? ছেহ! কী গন্ধ! ভাবী কাছে আসে তো?ʼʼ
হামজা আবার তেড়ে গেল রাস্তার ওপরেই। জয় ঝেরে দৌড়, সাথে গালাগাল দিচ্ছে। একটু দূরে গিয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে হাঁটুতে হাত রেখে দম ফেলে বলল, তুমি থানায় না কোথায় যাবে যাও, আমাকে এখন আর পাবে না। কবীর চলে আয়, আমরা আজ পিকনিক করব। রাতে ব্যাডমিন্টন ম্যাচ আছে আমার।ʼʼ
-“ভালো হ।ʼʼ
-“আলগা জ্ঞান দিতে আসবে না। কানে ব্যথা হয় আমার।ʼʼ
—
সকাল সাতটার বাস। আমজাদ সাহেব রাবেয়া এবং অন্তূর সিট খুঁজে ওদের বসিয়ে দিয়ে পাশের দোকান থেকে একটা পানির বোতল কিনতে নামলেন। অন্তূ আর রাবেয়া পাশাপাশি সিটে বসেছেন। আমজাদ সাহেবের সিটটা আলাদা। কিন্তু দেখা গেল সেখানে এক সিটে একটি মহিলার জায়গা। অন্তূ উঠে দাঁড়াল, “আব্বু, তুমি আম্মার পাশে বসো। আমি ওই আন্টির কাছে বসছি।ʼʼ
আমজাদ সাহেব একটু ভাবলেন, পরে গিয়ে বসলেন রাবেয়ার পাশে। অন্তূকে বললেন, অসুবিধা হলে ডাকতে।
অন্তিকের আসার ছিল আজ বাপের সাথে। এসেছে অন্তূ। জোয়ান চাচাতো ভাইয়েরা এসে নিজেদের বাপের পাশে দাঁড়াবে, আমজাদ সাহেবের সেই কপাল নেই। ছেলে বলছে, বউকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।
অন্তূর একটা বড়ো ভাই আছে, এ কথা স্বীকার করতেও বাঁধে তার আজকাল। সে জানেনা, অন্তিক কেন এমন হলো।
অন্তূকে নিতে চাইছিলেন না আমজাদ সাহেব। মেয়ে মানুষ শালিসে গিয়ে অত লোকের মাঝে দাঁড়াবে, লোকে ভালো চোখে দেখবে না ব্যাপারটা। অন্তূ দৃঢ় গলায় বলেছে, “আব্বু, আমি কোনোদিন যেন তোমার দূর্বলতা না হয়ে উঠি! আর তার কারণ যদি শুধু হয়–আমি মেয়ে। তবে আমার মেয়ে হওয়ার প্রতি আজ ধিক্কার। আমি যাব তোমার সঙ্গে। আর কিছু না হোক, তোমার সন্তান হিসেবে তোমার পাশে গিয়ে তোমার অবলম্বন হিসেবে দাঁড়ানো আমার কর্তব্য। আর তোমার কাছে আমি এমন চিন্তা-ধারা আশা করিনা–সমাজ কী বলবে? সমাজকে এড়িয়ে, পায়ে পিষে, আগে পা বাড়াতে তোমার কাছেই শিখেছি। তুমিই বলো– সমাজের মুখ আছে বলবে, খারাপও বলবে, ভালো খুব কমই বলবে। এই সমাজকে তোয়াক্কা করা মূর্খতা এবং আত্মনির্ভরশীলতাহীন কাজ। এই সমাজ প্রতিবাদী চেতনাধারীদের নিকট চিরদিন পদদলিত। সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে যারা কিছু করে মরেছে, তারাই কেবল অমর হয়ে রয়ে গেছে যুগে যুগে।ʼʼ
আমজাদ সাহেব স্নেহভরে তাকালেন মেয়ের দিকে। বাসের সিটের সাথে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে আছে। নেকাবের আড়ালে মুখটা দেখা যাচ্ছে না। অথচ চোখদুটো বুজে থাকার পরেও হালকা কুঁচকে আছে। তিনি গম্ভীর স্বভাবে মানুষ, সামনে ভালোবাসা দেখাতে অক্ষম, তাই হয়ত অন্তূ কোনোদিন বুঝতে পারবে না–বাবার কলিজার এক টুকরো মাংসপিণ্ডের নাম অন্তূ।
কুড়িগ্রাম পৌঁছাতে প্রায় বেলা খাঁড়া হলো। গ্রামের রাস্তাঘাট পেরিয়ে হেঁটে আসার সময় অন্তূর খুব ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছিল। আব্বুর হাত ধরে অন্তিক আর সে আসতো দাদুর বাড়িতে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আব্বুকে পাশ কাটিয়ে ওর চুলের ঝুটিতে টান মেরে আবার অপরপাশে হাঁটা শুরু করতো। অন্তূ চিৎকার করলে অন্তিক আব্বুকে বলতো, “এই প্যাপুকে কোথা থেকে তুলে এনেছ আব্বু? খালি সারাদিন ম্যা ম্যা করে। কিছু হয়েছে ওর, কোনো সমস্যাই নেই, তবুও ক্যা ক্যা করে উঠছে। যেখান থেকে এনেছিলে, সেখানেই ফেলে দিয়ে আসবে। আমার এসব প্যাপু লাগবেনা। শুধু শুধু ভাগ বসাতে এসেছে।ʼʼ
অন্তূ আরও জোরে চেঁচাতে থাকলে অন্তিক হেসে লুটোলুটি খেতো রাস্তার মাঝে। সেসব দিন ফুরিয়েছে, কিন্ত ফুরোনোটা কি খুব জরুরী ছিল? সম্পর্কে যখন এতো মায়া, তবে সেই সম্পর্কের সমীকরণের মান ধ্রুব নয় কেন, জীবনের মোড়ে মোড়ে বদলে কেন যায়?
আজ অন্তূ একা একপাশে আব্বুর কাধে কাধ মিলিয়ে হাঁটছে, অপর পাশে অন্তিকের থাকার কথা ছিল। নেই! সেই রাস্তা আছে, আব্বু আছে, অন্তূ আছে, অন্তিক কেন বদলেছে?
অন্তূর মেজো ফুপুর বাড়ি দাদা বাড়ির পাশে। এই ফুপুকে দাদাভাই নাকি বেশি ভালোবাসতেন। এজন্য নিজের ভাতিজার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে কাছেই রেখেছিলেন। তার বাড়িতেই দুপুরে খাবার খেল তিনজন। বোনকে ডাকলেন আমজাদ সাহেব, “মাজেদা! তোর কী মনে হয়, ওই জায়গা আমার প্রাপ্য না? এটা আসলেই কোনো যুক্তি–যে আমি এখানে থাকিনা বলে জায়গা পাব না? জায়গা পরিস্কার না হলে ক্রেতা জায়গা কিনবে না, ঋণে ভরে আছি। লোকজন দুবেলা বাড়ি বয়ে আসছে। মেজো ভাই এতো মূর্খ আর স্বার্থপর হলো কবে?ʼʼ
মাজেদা দুঃখ প্রকাশ করলেন, “ছিল নাই বা কবে? আমি আর কী কইতাম, ভাই! আমার মেয়েডারে খোজার সাথে বিয়ে দিছে, পুকুরটায় মাছ চাষ করে খায়, আমার কোনো অধিকার নাই সেইখানে। আমি নিজে মরতেছি এই দুঃখে, তোরে আর কী কই!মেজো ভাইয়ের ধর্ম-ঈমান নাই!ʼʼ
অন্তূ শুনল। কিছু বলল না। তার মাথায় আব্বুর শুকনো, অস্থির মুখখানা চক্রাকারে আবর্তন করছে।
শালিস বসল আছরের নামাজের পর। সেখানে আফজাল সাহেব পুঁথি তুলে আনলেন সেই মোঘল আমলের। কবে আমজাদ এখান থেকে চলে গিয়েছিল, আর আসেনি, তার জমি চাষবাস করে সে ঠিকঠাক রেখেছেন, দিনাজপুরে জমি পেয়েছে, সেখানে থাকছে, আবার এখানে ভাগ নিতে আসবে কেন?
অন্তূ বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারল না অন্তূ রুখে দাঁড়াল। মাতব্বর মশাইকে বলল, “চাচাজান! আমার দুটো কথা আছে। এখন এটা বলবেন না, আমি ছোটো মানুষ, মেয়ে মানুষ। বড়ো এবং পুরুষ যখন সস্তা আলাপ জুড়েছে এখানে, তখন ছোটো এবং মেয়েলোককে তো দাঁড়াতেই হবে সঠিক কথা বলতে! ʼʼ
এরপর আর কেউ অবশ্য কিছু বললেন না। অথচ বিরূপ দৃষ্টি আটকে রইল কিছু কিছু ভাইরাস টাইপের মানুষগুলোর।
অন্তূ চাচাকে বলল, “আপনি খুব যুক্তিসঙ্গত কথা বলেছেন, কাকা! আব্বু এখানে থাকেনা সুতরাং এখানকার জায়গা তার প্রাপ্য নয়। সেই সূত্রানুসারে, আপনিও দিনাজপুর থাকেন না। ওখানে আপনার যে পুকুর হিসেবে জায়গা পড়ে আছে, ওটা আপনার পাওনা নয়। উত্তম বিচার। এক কাজ করুন, আগামীকাল কোর্টে চলুন, আপনার ওই জায়গা আব্বুর নামে, এবং আব্বুর এই জায়গা আপনার নামে রেজিস্টার করার দুটো দলিলে দুজন সই করবেন। এবং তা স্বয়ং আমি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে করাবো। কোনো গড়মিল হবেনা, আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। তো ওই কথাই রইল, কাকা! কাল কোর্টে আসুন!ʼʼ
সকলে একদম থ মেরে গেল। ক্ষেপে উঠে দাঁড়ালেন আফজাল সাহেব, “চড়ায়া দাঁত ফালায়া দিমু, বেয়াদ্দপ মেয়েলোক! তোর মতোন কুলাঙ্গার মাইয়া জন্ম দিয়া আবার এই পাড়ায় জমি নিতে আইছে তোর বাপ! একঘরে করতো এই সমাজ তো মতো মাইয়ারে এই পাড়ায়!ʼʼ
অন্তূ হেসে ফেলল, “জি জি! কেন নয়! এই পাড়ার এই সুবিচারের ভয়েই তো এই পাড়ায় আসিনা জীবনে! অতি উত্তম বিচার হয় এই এলাকাতে। আর এমন সুসমাজে আমার মতো মেয়ে থাকলে প্রতিক্ষণে তামাশা হবে। এজন্যই দূরে আছি, লেখাপড়া করছি, ভালোই চলছে। আজ আব্বুর বাপের ওয়ারিস সূত্রে পাওনা জায়গা বিনা নোটিশে আপনার হয়ে গেছে! এত চমৎকার বিচার যে এলাকায় হয়, সে এলাকার পা রাখার যোগ্যতা আমার নেই। সেই যোগ্যতা অর্জন করতে অনেক নিচে নামতে হবে, কাকা! অত নিচে আমি নামতে পারব না। এই বিচার দেখতে আসব এই পাড়ায়, সাহস আছে নাকি আমার!ʼʼ
অন্তূর মুখে নেকাবের আড়ালে শুধু গাঢ় চোখদুটো স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, সেই চোখে প্রতিবাদ, সেই চোখের তারায় তারায় সাম্যবাদ! আফজাল সাহেব অনেক রকমের বাহানা করলেন, এটা-ওটা তুলে নিজের কীর্তন গাইতে লাগলেন। কিন্তু কাটিয়ে দিলো অন্তূ।
এক বুড়ো মাতব্বর গোষ্ঠির লোক আমজাদ সাহেবকে বললেন, “ও আমজাদ মাইয়ারে উকিল বানাইলেও তো পারো গো! মাইয়া তো সোন্দর, ভালা কতা কইতে পারে দেখতিছি। মাইয়াডারে পড়াইও, বহুদূর যাইব হে।ʼʼ
আমজাদ সাহেব হাসলেন, “দোয়া করবেন, চাচা। সেই আশাই আছে।ʼʼ
শেষ অবধি মুখে মুখে একটা ফয়সালা এলো, আফজাল সাহেবের গোয়ালের যে অংশ আমজাদ সাহেবের জায়গায় চড়ে গিয়েছে, সেটুকু ভেঙে জায়গা বের করে দিতে হবে। এবং যেহেতু গোয়াল ইট-পাথরে গড়াও নয় ওই অংশ! সুতরাং যথাসম্ভব জলদি ভেঙে ঝামেলা মিটিয়ে দিতে হবে, যাতে আমজাদ সাহেব দ্রুত বিক্রি অথবা যা খুশি করতে পারেন।
অন্তূ সন্তুষ্ট হতে পারল না। মুখের এই কথা ঘুরে যেতে চোখের পলকও ঠিকমতো ফেলতে হবেনা। কোনো ডকুমেন্ট- স্ট্যাম্প পেপার ছাড়া এই কথাগুলো কত আনা সুষ্ঠুভাবে মানবে তার কাকা, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেল।
চলবে..
[ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।]