অবরুদ্ধ নিশীথ পর্ব-৮০+৮১

0
28

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

৮০.

রাতের বেলা ঘরে ফিরে ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ল হামজা। ঘুম আসার সম্ভাবনা নেই। রিমি কোনোভাবেই জয়কে আবার দেখতে যেতে দেয়নি। পা দুটো ঝিমঝিম করছিল, যেন রক্ত ও স্নায়ু নেই।

রিমি পা টিপতে টিপতে লাগল। হামজা রিমিকে চোখ ভরে দেখতে লাগল। শাড়ির আঁচলটা প্রায় নেমে আছে বুক থেকে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে খোঁপা থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে আছে মুখ, কপাল ও গলার দিকে। সে কি দিনদিন পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে কিনা জানা নেই। তার বয়সটাও রিমির চেয়ে অনেকটাই বেশি। এই ছোট্ট মেয়েটা আজকাল অবাধ্য হতে লেগেছে। এসব কার করা ক্ষতি? হামজার ভেতরের চাহিদায় অসুস্থতার চাপ পড়ল।

কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি ও দৃষ্টিতে ওঠা কথা রিমি বোঝে। হামজাকে দমাতেই নাকি জানা নেই, রিমি বলে উঠল, “জয় ভাইয়া আর দু’দিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসবে। কোনোরকম উঠে দাঁড়াতে পারলেই তাকে বেঁধেও আর হাসপাতালে রাখা যাবে না। সেই ফাঁকে তাকে এদিকের দেখভালে রেখে আপনি যাবেন ট্রিটমেন্টের জন্য। নিজের ভালো পাগলও বোঝে।ʼʼ

হামজা বড় বাধ্যর মতো মাথা নাড়ল। কিছুক্ষণ চুপচাপ নিষ্পলক রিমিকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “আরমিণ কোথায়? বাড়িতে নেই কেন?ʼʼ

রিমির শরীরটা ঝাঁকি খেল একটা। কিন্তু কী যে তার হলো, সে চট কোরে বলে ফেলল, “সেটা নিয়েই তো হয়রান আমি। সারাদিন ভাবছি সে কোথায় গেছে? আমরা যেদিন আপনার কাছে গেলাম, ওকে তো বাড়িতে রেখে গেছিলাম।ʼʼ

হামজা একটু চুপ থেকে বলল, “সে বাড়িতেই ছিল, যখন তোমরা যাও?ʼʼ

হামজার সামনে মিথ্যা বলা দুঃসাধ্য। রিমির গলা কাঁপছিল, তবু সে বলল, “হ্যাঁ। আর কোথায় থাকবে? কিন্তু আমার মনে হয় আপনি তো এমনিতে ও বাড়িতে যাবার অনুমতি দেন না, ফাঁকা পেয়ে ওখানেই গেছে।ʼʼ

হামজা বিশ্বাস করেছে কিনা তা দেখার জন্য তাকাতেও সংকোচ হলো রিমির। কিন্তু সে কোনভাবেই বলবে না আরমিণ কোথায়। সে হামজাকে দূর্ভাগ্যবশত ভালোবাসতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস করে না। সারাটাদিন তার যে কলিজা পুড়ছে, সেটাও সে এই পুরুষটাকে বুঝতে দেয়নি। সেই জ্বলুনিতে এক পশলা ঠান্ডা পানির মতো সংবাদ—আরমিণ গর্ভবতী। রিমি গোসলে গিয়ে পাগলের মতো কেঁদেছে। সে তার দুটো সন্তানের ভ্রুণকে নিজ হাতে হত্যা করেছে। আরমিণ কেন সামলে রেখেছে তাহলে?

সন্দেহ তো রিমির আগেই হয়েছিল। সেদিনও রান্নাঘরে এই কথাটা বড় ধূর্ততার সাথে এড়িয়ে গেছে আরমিণ। রিমি আরমিণের মতো চালাক হলে সেদিনই ধরে ফেলতো। কিন্তু জেনেশুনে আরমিণ জয় আমির সন্তান গর্ভে ধারণ করেছে কেন? কী উদ্দেশ্যে?

সকালটা হামজার চরম ব্যস্ত কাটল। অসুস্থতা পাত্তাই পেল না। সে সকাল সকাল দল নিয়ে পুলিশফাঁড়ি, ক্লাব ও পার্টিঅফিস ঘুরল। এই কদিনের সব তথ্য পকেটে ভরলো। আরমিণের বাপের বাড়ি থেকে খোঁজ এলো, সেখানে আরমিণ নেই। রিমি বলতেও পারছিল না, এত খোঁজ করছেন কেন? বাড়ির বউ নিখোঁজ, খোঁজ তো করতেই হবে।

হামজা হেসে জিজ্ঞেস করল, “তুমি যখন ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরোলে, তখন আরমিণ সত্যিই বাড়িতে ছিল?ʼʼ

-“কেন জিজ্ঞেস করছেন বারবার একই কথা?ʼʼ

রিমির দুই গালে পরম আবেশে দুই হাত রেখে ঠান্ডা গলায় বলল হামজা, “রিমি, আমার আর জয়ের মাঝে যে-ই আসুক, যা-ই আসুক তাকে আমার তোপে ছাই হতে হবে। মুরসালীন বড়ঘরে থেকে আমার অনেক ক্ষতিই করেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি– জয়কে ভুলভাল অনেককিছু বুঝিয়েছে। জয়ের আমার প্রতি দ্বিধাভরা আচরণের কারণ ছিল সে। আমি কীভাবে সহ্য করেছি কয়টাদিন, আন্দাজ করতে পারো? আমার আন্দাজ সঠিক হলে সে জয়কে এটাও বলে দিয়েছে আমি জিন্নাহকে মেরে ফেলেছি।ʼʼ

রিমি আঁৎকে উঠল। এই জিন্নাহর খোঁজে বছরের পর বছর পাগল হয়ে ছুটতে দেখেছে সে জয়কে।

-“কেন মেরেছি জানো? জিন্নাহ্ থাকলে জয় আমার দেয়া ঠিকানা ও পরিচয় ভুলে যেত। একসময় হয়ত আমার সঙ্গও ছেড়ে দিতো। আমি সহ্য করতে পারতাম না, রিমি। তাই জিন্নাহ্টাকেই সরিয়ে নিয়েছি জগৎ থেকে। জয় শুধু খুঁজবে, আমি সঙ্গ দেব তাকে খুঁজতে, কিন্তু তাতে পাবার সম্ভাবনা থাকবে না। একথা জয় জানলে যদি আমায় ঘেন্না করে আমি ওর পা ধরে ক্ষমা চাইব। ওকে বলব, তুই মেরে ফেল আমায়। তবু তোর চোখ দিয়ে আমায় ঘৃণার নজরে দেখিস না। আমার সয় না। পাগল হয়ে যাব আমি। ওকে আমি এই দেখো, আমার এই দুই হাতে, এই হাতের ওপর মানুষ করেছি। ও আমার জান, আমার ছেলে। আমার এই হাত ও ছাড়তে পারে না কোনো শর্তেই। সেই শর্তকেই আমি দুনিয়ায় রাখব না।ʼʼ

রিমির ভেতরে এক নিগূঢ় ভয় কাজ করতে লাগল হামজার জন্য। হামজার কঠিন স্বভাবের মুখখানায় এখন নিদারুণ আবেগ খেলছে। কিন্তু রিমি দেখল এই আবেগ যেন ধারালো শূলের চাইতেও বর্বর আর ভয়াবহ।

-“সেই একই কাজ আরও সূক্ষ্ণ আর গভীরভাবে আরমিণ করেছে। আমি বলেছিলাম না তোমায় ও আমার বিশাল ক্ষতি করছে! তুমি জানো না রিমি, ও জয়কে চিরতরে নিজের সীমানায় বন্দি করার বন্দোবস্ত করে ফেলেছে। কী ভয়ানক, রিমি। ভাবতে পারো? ওকে আমি ভয় পাই। হ্যাঁ, ঠিক ছিলে তুমি। খুব ভয় পাই আমি। কারণ ও ভয় পায় না। না হারাতে না মরতে।ʼʼ

রিমি দম আঁটকে আসছিল এতক্ষণ, এবার সে কেমন অপ্রকৃতস্থর মতোন প্রতিবাদ কোরে উঠল, “আমি থাকতে আপনি ওর কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না। তার আগে আমাকে মারতে হবে।ʼʼ

হামজা হেসে ফেলল, “খুব নিম্নমানের ভাবনা তোমার, গিন্নি। তুমি আমার সঙ্গে বিরোধ রচনা করছো। তুমি আজও ফেইল। পারলে না আমার অর্ধাঙ্গিনী হতে।ʼʼ

-“এ আমার সৌভাগ্য, গর্বের কথা।ʼʼ

-“খুব বাজে কথা, রিমি।ʼʼ

-“আপনি এত নোংরা কেন? নিজের ভেতরে যে এত এত পাপ পুষছেন, তারা কখনও ধিক্কার দিয়ে ওঠে না আপনাকে?ʼʼ

-“মানবজীবনে ক্ষুধা, চাহিদা, প্রবৃত্তি জলন্ত নক্ষত্রের মতো। নক্ষত্র বেশি সক্রিয় হলে তা মারা যায়। আর নক্ষত্রের মৃত্যু মানে বোঝো তো, রিমি? কালগহ্বরের সৃষ্টি। যা এতটাই অসীম যে তার ভেতর আলোকরশ্মি প্রবেশ করলে তাও আর মুক্তি পায় না, বিলীন হয়ে যায়। তাতে তুমি কত কী দেবে? কত ক্ষমতা, কত ঐশ্বর্য, কত শক্তি! সব তলিয়ে যাবে অসীম বিবরে।
আমি সেরকম এক মৃত নক্ষত্র। ন্যায়-নীতিও সব তলিয়ে যায় আমার গর্ভে। পুস্তকগত জ্ঞানে আমি মানুষের সংজ্ঞা জানি। সে হিসেবে আমি মানুষ নই, রিমি। আমি হলাম ধাঙর। আমি এতটাই ক্ষুধার্ত যে দুনিয়ার সমস্ত আবর্জনাসহ পাপ-পূণ্যকেও গ্রাস করে বসে আছি। মেনে নাও, সুখে থাকবে।ʼʼ

-“এটা সুখ নয়, নরকবাস।ʼʼ

-“নারী কোথায় সুখী তা আমার জানা নেই, তাই বলতে পারছি না। তবে যদি এটা নরকবাস হয়, হলো। তবু আমার সঙ্গ ছাড়ার সুযোগ নেই তোমার কাছে। তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী, রিমি।ʼʼ

রিমির চোখদুটো লাল হয়ে ছলছল করতে লাগল। হামজা বলল, “আরমিণ কি আমির নিবাসে, রিমি?ʼʼ

রিমি জবাব দেয় না, কেবল চোখেই ভষ্ম করে দিতে চাইল যেন।

-“আমার বিরোধিতা কোরো না, রিমি। আমি বিরোধীকে জিইয়ে রাখি না। আজ তোমার আচরণে যদি একবারের জন্যও আমার মনে হয় তুমি আমার কাজে বাঁধা হতে চাও, আমি তোমাকে মেরে ফেলব। কেননা এবার আমি যা করব, তা আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন।ʼʼ

রিমি তবু ঠিক হামজার পথ আঁটকে দাঁড়িয়ে বলল, “এতদিন যা করেছেন, আমি কোনোদিন সরাসরি বাঁধা দিতে পারিনি আপনাকে। কিন্তু আজ এমন হবে না যে আমি এখানে বসে থাকব চুপচাপ, আপনি ওদিকে যা নয় তাই করবেন।ʼʼ

হামজা খুব সাবলীলভাবে রিমিকে সরাতে চাইল, কিন্তু সে অবাক হয়ে গেল, রিমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে, “আজ সব সীমা, সম্মান, মনুষত্বের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন, আপনি। আমাকেও যেতে দিন।ʼʼ

হামজার চোখদুটো জ্বলে উঠল যেন। রিমি এরকম হামজার সম্মুখীন হলো প্রথমবার। সত্যিই হামজা রিমির চুলগুলো মুঠো কোরে চেপে ধরে কোনো এক বিড়ালছানার মতো ছুঁড়ে ফেলল মেঝের ওপর রিমিকে। মরমর করে উঠল রিমির হাড়গুলো। কপাল ও থুতনি ফাটল। তবু রিমি উঠে এসে হামজাকে কষে এক ধাক্কা মারে। হামজা টাল সামলে রিমির গলা চেপে ধরে ছেচড়ে রুমের ভেতরে নিয়ে গিয়ে ধপাস করে ফেলে দিলো বিছানার ওপর। প্রায় বুকের চড়ে গলাটা চেপে ধরে রাখল কতক্ষণ। রিমির চোখে রক্ত উঠে এলো, তখন ছেড়ে দিয়ে বলল—

-“তুই নিজে আমার সন্তানের খুন করে ওই খানকি মাগীর বাচ্চা নিয়ে পূণ্যবতীর পরিচয় দিতে চাচ্ছিস? তোর কথা অনুযায়ী আমার মতো পাপীর সন্তান থাকতে নেই, তো জয় কি ফেরেশতা রে? আমার আর জয়ের পথ এখনও অনেক লম্বা। তোদের মতো দুই চারি শ খানেক বেইমান মাগী খুন হতে পারে যদি বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। জয়ের জীবনে আমি কোনো পিছুটান রাখব না। তুই তা বদলাতে পারবি না।ʼʼ

তুলি এসে হামজাকে ধাক্কা মেরে সরালো, “পাগল হয়ে গেছিস তুই? মানুষ মারতে মারতে হাত এত লম্বা হয়ে গেছে, ঘরে যে আদর্শের মুখোশ পড়ে থাকতি, সেটাও খসে গেছে? সরে যা জানোয়ার!ʼʼ

হামজা বেরিয়ে গেল। কাশতে কাশতে দম আঁটকে এলো রিমির। তবু সে কাঁকুতি করে ওঠে তুলির কাছে, “আপু, ওকে থামান। ও আজ সর্বনাশ করতে যাচ্ছে।ʼʼ

হামজা তুলিকে টেনে বের করে দিয়ে রিমিকে বিছানার ওপর ফেলে রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে রেখে বেরোলো। বলে গেল এ বাড়ির সীমানা একটা পাখিও যেন না পেরোতে পারে।

জয় আমির গুলিবিদ্ধ হবার শেষরাত থেকে হাসপাতালের বাইরে মোতায়েন ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেদিন দুপুরের পর পরই রউফ কায়সারের পক্ষ থেকে জয়ের কেবিনের সামনে জড়ো হয়ে পড়ল। ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল জয় আমির আইনের নজরদারীতে বন্দি হয়ে পড়ল। আইনের পক্ষ থেকে তার জন্য এখন কেবল জীবন বাঁচিয়ে নেবার মতো চিকিৎসা গ্রহণের অনুমতি রয়েছে। সামান্য সুস্থ হলেই কারাগারে স্থানান্তর করা হবে, এরপর আদালত।

হাসপাতালে যাবার পর হামজা অবাক হলো পুলিশদের আগ্রাসী ভূমিকা দেখে। সে সকালে উপরমহলে কথা বলে এসেছে, লাখ কয়েক টাকা প্রাথমিক পর্যায়ে গুণে ছড়িয়ে দিয়ে এসেছে। দুজনের আউটডোর ভিসা রি-নিউ হচ্ছে ওদিকে। এর মধ্যে এত দুঃসাহস দেখানোর কারণ কী! থানা পুলিশ হামজাকে দেখে একটু নড়েচড়ে উঠল বটে। একটু গাইগুই করল। কেউ বা বলল, ‘পুলিশফাঁড়ি থেকে ভেগে এসে ঠিক করেনি জয় আমির। নয়ত আমরা সামান্য কনসিডার করতে পারতাম হামজা সাহেব। এখন আর সেই জায়গা নেই।ʼ
তাহলে কি এমপিও তাই চেয়েছিল? যে যদি তার প্রচেষ্টায় জয় আমিরের কৈ মাছের জান না-ও বেরোয়, তো ভয়ানক এক মামলায় তাকে দীর্ঘভাবে ফাঁসতে তো হবেই।

জয় হামজাকে দেখে কেবল তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে অতিরিক্ত প্রশ্ন জমে সে বোবা হয়ে গেছে যেন। এখনও রিজার্ভ ব্যাগের খানিকটা রক্ত খুব ধীরে শরীরে যাচ্ছে তার। সাডেটিভের প্রভাবে চোখ বুজে এলো।

হামজা হাত ধরে বসে রইল। দুপুর পেরিয়ে গেল। তখন দুপুরের ইঞ্জেকশন দেবার পর জয় আবার ঘুমিয়েছে। হামজার ওঠার সময় হলো। সে জয়ের মাথায় হাত নেড়ে উঠে এলো। জয়ের দিকে একবার কোরে তাকালেই সে টের পাচ্ছে আরমিণের কাছে যাওয়া তার জন্য ফরজ হয়ে গেছে। তার এখন আরও অনেক ধ্বংসতান্ডব চালানোর ছিল। কিন্তু তা এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বোকামি হবে। দিন তো ফুরিয়ে গেল না। এখন আপাতত কোনোরকম জয়কে বর্তমানের বিষাক্ত পিছুটানটুকু ছাড়িয়ে দেশের বাইরে পা রাখতে পারলেই ব্যাস।


রাত হলো হামজার আমির নিবাসে পৌঁছাতে। অনেকদিন পর এলো এখানে, বহুদিন পর। তার বুকে একটা ব্যথা কাজ করে এই বাড়ির কথা খেয়ালে এলেও। হুমায়িরা ফুপুর মুখখানা আবছাভাবে মনে পড়লে হামজার মন চায় আরেকবার মৃত্যুর খেলা খেলতে। আজও মনে পড়ল–শীর্ণদেহী লম্বাটে হামজা চাল-সবজি, পকেটে হুমায়িরার দেয়া ক’টা টাকা নিয়ে আমির নিবাসের ফটক পেরিয়ে বেরোচ্ছে। দারোয়ার পিঠ চাপড়ে বলছে, “ফুবুডারে ভালো পাইয়া চুইষা খাইতাছো, মিয়া? বড়লোক দেইখা বিয়া দিয়ার এই তো ফায়দা, অ্যাহ্!ʼʼ

হামজার যে কী লজ্জা করতো! ইচ্ছে করতো দাফন হয়ে যেতে। তবু সে মাথাটা নত কোরে বেরিয়ে যেত। শাহানা বসে আছে, রান্না হবে সে বাজারগুলো নিয়ে গেলে। আজ হামজার বাড়িতে বাজার আসে ভ্যান ভরে। সেই বাজার টেনে দোতলায় তুলতে দুজন লোক হাঁপিয়ে ওঠে। কিন্তু হুমায়িরা ফুপু আর নেই ঋণ ফিরিয়ে নেবার জন্য, অথবা সমাজের বিশিষ্ট মানুষ হয়ে ওঠা হামজাকে দেখার জন্য।

সদরদরজায় ধাক্কাধাক্কি করে ভেঙে ফেলার জোগাড় হলো, তবু ভেতর থেকে দরজা খুলল না আরমিণ। গালি দিলো হামজা, “শেয়ানা মাগী!ʼʼ

হামজা কথা না বললে দরজা খুলবে না, আর হামজার কণ্ঠ শুনলে তো মোটেই না। যে চালাক চেংরি! জঙ্গলের পার্শ্বে পিছন দিকের আধভাঙা জানালা-দরজা পাওয়া গেল। এত বছর পড়ে আছে বাড়ি, চোর ও নেশাখোরদের কাছে ভূতের কোনো কদর নেই। এ বাড়ির দামি সরঞ্জামগুলো খুলে নিয়ে বিক্রির চেষ্টা থেকে জয়নাল আমিরের ভূতও ঠেকাতে পারেনি তাদেরকে।

তা হামজার কাজে লাগল বাংলা ঘরের পেছনের লোহার দরজা খুলে নিয়ে গিয়ে কে কোথায় বিক্রি কোরে খেয়েছে। সামনের কাঠের দুয়ার ঘুণে ধরা। কয়েকজন জোয়ানের আঘাতে তা ভেঙে পথ তৈরি হলো। সেদিক দিয়ে ঢুকলেই উঠান, তারপর বড় বারান্দা পেরোলেই অন্দরমহল। খুব সহজে সে এসে অন্তূর পেছনে হলরুমের মাঝখানে দাঁড়াল। অন্তূ তখন ভীত-সতন্ত্র চোখে দরজায় কান বাঁধিয়ে বসা।

-“আর শব্দ আসছে না, আরমিণ? লোকগুলো বোধহয় চলে গেছে। জানে তুমি সতর্ক মেয়েলোক, খুলবে না কখনোই।ʼʼ

অন্তূর শরীরটা থরথর কোরে কেঁপে উঠল। হামজা মদের বোতলে চুমুক দিতে দিতে টলতে টলতে এসে দাঁড়াল অন্তূর খুব কাছে। ভয়ংকর দৃশ্য।

অন্তূকে পরখ করে দেখে হামজা চোখ বুজে হাসল। সপ্তাহখানেক আগে দেখেও বোঝার একরত্তি উপায় ছিল না, সে গর্ভবতী। এত শেয়ানা মেয়েলোকের দেখা আগে পায়নি হামজা। কিন্তু আজ এই অন্ধ কুঠিরে একাকি না খাওয়াসহ বিভিন্ন চাপ ঠিক সেই মেয়েলি অসুস্থতা টেনে বের কোরে এনেছে। তবু সুন্দরী! যদিও হামজার কোনো আগ্রহ নেই অন্তূর মেয়েলি শরীরে। জয় আজ অন্তূকে দেখলে এক মুহুর্তে ধরে ফেলতো, তার বীর্য তার ঘরওয়ালির শরীরে বাড়ন্ত।

হামজা অন্তূর কাছ ঘেষে বসে পড়ল। হা কোরে শ্বাস ফেলল কয়েকটা। দুজন বিরোধীতার চূড়ান্ত ঘোষনা জানাল যেন পাশাপাশি বসে। উৎকট গন্ধ হলরুম জুড়ে। শব্দ কোরে মদের বোতল খুলে একটি ছোট্ট শিশি থেকে কী একটা তরল ঢালল তাতে হামজা। ঝাঁঝালো গন্ধ সেই তরলের। অন্তূ জানে না ওটা ফরমালডিহাইড লিক্যুইড। অ্যালকোহলের সাথে মিশলে ফরমালিন জাতীয় বিষ তৈরি হয়। এ অবস্থায় তা অন্তূর জন্য মরণসম ও ভ্রুণের জন্য অবধারিত মরণ।

হামজা অন্তূর মুখের খুব কাছে মুখ নিয়ে ঘাঁড় কাত করে বলল, “তুমি আমার এত ক্ষতি কেন করলে, আরমিণ?ʼʼ

অন্তূ শক্ত ঢোক গিলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এটা উপযুক্ত সময় নয় জবাব দেবার। শান্তভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা করা উচিত।

-“তুমি আমার জয়কে ঠিক কীভাবে ধ্বংস করতে চাও? আর কত ক্ষতি করে থামবে?ʼʼ

অন্তূ হেসেই ফেলল, “জয় আমিরের ক্ষতি? সেটা চাইলেও কেউ আপনার চেয়ে বেশি করতে পারবে? সম্ভব?ʼʼ

-“আমি? আমি ক্ষতি করব জয়ের?ʼʼ

-“আর করার জায়গা নেই। সে ইতোমধ্যে আপনার সহচর্যে পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত।ʼʼ

হামজা অন্তূর মুখের ওপর শ্বাস ফেলে অবাক হবার মতো বলল, “আজও এই পরিস্থিতিতেও তুমি এভাবে কথা বলবে আমার সঙ্গে?ʼʼ

অন্তূ জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করল না। হামজা খুব সুন্দর কোরে হাসল, “আমাকে ধ্বংস করা তোমার স্বপ্ন। তোমার স্বপ্ন দেখার অধিকার তো আমি কেড়ে নিতে পারি না। কিন্তু এছাড়াও আরও অনেক কিছুই রয়েছে যা আমি কেড়ে নিতে পারি। যা তোমার মতো ছলনাময়ী, কুচক্রী সর্পিনীর কাছ থেকে তার বিষদাঁত ভেঙে নেবে।ʼʼ

-“আর নেই কিছু আমার।ʼʼ

গলা আরও শ্লথ করল হামজা, অন্তূর মুখে দৃষ্টি চালিয়ে বলল, “উহুউম! এই ছলনা জয়ের ওপর খাটে। আমি তোমার কাছে তেমন কিছু পাইনি যা আমাকে আচ্ছন্ন করে তুলবে আর তোমার এই খেলায় গুটি হবো আমি।ʼʼ

নোংরা ইঙ্গিতে অন্তূর শরীর ভার হয়ে এলো। খুবই কাছে বসে আছে হামজা। হামজা এবার অন্তূর চুল মুঠো কোরে নরম ঠোঁটের ওপর গ্লাস চেপে ধরল অদ্ভুতভাবে, “নাও পান করো এটা।ʼʼ

অন্তূ মুখ সরিয়ে নিলো। তাকে সর্বোচ্চ ভয় যে তার সম্মান হরণ ও তাকে স্পর্শের মাধ্যমে পাইয়ে দেয়া যায় একথা যেন সবার জানা। অন্তূর মনে হলো–এই দূর্বলতার কাছে সে বারবার হেরেছে। আজও বুক কাঁপছে। শরীর অবশ হচ্ছে।

চুল মুঠ করে ধরে অন্তূ ওপরভাগে চড়ে বসার মতো করে অন্তূর মুখের ওপর মুখ রেখে হামজা বলল, “তুমি গর্ভবতী, হুহ্?ʼʼ

অন্তূ শারীরিক উদ্দীপনা থমকে রইল। বুকে ঢিপঢিপ শব্দ উঠে গেল। তার নীরবতা যেন হামজাকে জবাব দিয়ে দিলো।

-“জয় জানে না!ʼʼ হাসল হামজা।

মাসখানেক আগে অন্তূ টের পেল তার শরীরে গর্ভাবস্থার লক্ষণ স্পষ্ট। ঘৃণ্য পাপী, ও তার এক জীবনের আসামীর রক্ত-বীর্য নিজের শরীরে; তার কেমন লেগেছিল সে নিজেও বোঝেনি। সেই অদ্ভুত অনুভূতি কেবল অদ্ভুত, বর্ণনা করা যায় না, তা ছিল মিশ্র।

কিন্তু অন্তূর কাছে বিবাহিত জীবন বলতে একটা সংসার ও এক পুরুষই বোঝায়। যে পাপী হলেও অন্তূ তার ছোঁয়ায় সিক্ত। তা মোছার উপায় নেই। অন্তূর একটা ভবিষ্যত অবলম্বণ চাই, যা পেচিয়ে ধরে সে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যত পাড়ি দিতে পারে। একটা সন্তান, নিজের গর্ভজাত আপন। এটা কতটা মূখ্য ছিল জানা নেই। মূখ্য বিষয়টা ভয়াবহ বটে। জয় আমিরের একটা পরিবারের নেশা রয়েছে, আমির পরিবারের উত্তধাধিকারী পাবার পাগলামি আছে। এর চেয়ে বড় শাস্তি তার জন্য হতে পারে না যে সে জানল তার সন্তান রয়েছে, কিন্তু তাকে চোখে দেখার বা ছোঁয়ার সাধ্যি ও অধিকার তার রইল না। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামীর এক জীবন ফুরিয়ে যায় বন্দিত্বেই। যে নিজের পরিবারকে হারিয়ে আরও অসংখ্য পরিবার একইভাবে উজাড় করেছে, তার নতুন করে পরিবার ও সন্তান হতে নেই। অন্তূর সন্তানের ওপর কেবল অন্তূর অধিকার থাকবে। অন্তূর জীবনের খুঁটি। তাতে জয় আমিরের ভাগ নেই। শেষ জীবনে জয় আমির মুক্ত হবে মৃত হয়ে। ওই বেঁচে থাকা মৃত্যুর ঊর্ধ্বে।

সে এই খবর ততদিন পর্যন্ত দুনিয়া থেকে গোপন রাখতে চেয়েছিল যতদিন না জয় ও হামজার পাপে কারাবদ্ধতা আসছে। হয়নি তা।

হামজা অন্তূর শরীরের ওপর উবু হয়ে ঝুঁকে তরল ভর্তি গ্লাসটা এগিয়ে দিলো, “নাও, ড্রিংক ইট।ʼʼ

-“আমি অ্যালকোহলে অভ্যস্ত নই।ʼʼ

-“কোনো ব্যাপার না। ট্রাই করে দেখো।ʼʼ

তীব্র ঝাঁঝাল ও বিষাক্ত গন্ধে অন্তূর বুক অবধি জ্বলে উঠল।

-“কী মিশিয়ে পান করতে দিচ্ছেন আমায়?ʼʼ

-“টেস্ট করে দেখো।ʼʼ

-“মরে গেলেও না।ʼʼ

হামজা মাথা দোলায়, “মরবে না তুমি। মারব না আমি তোমায়। আমি সহজে মারি না কাউকে।ʼʼ

-“আপনি কী চাইছেন বুঝতে পারছি না।ʼʼ

-“বুঝতে পারছো। তুমি বোকা নও। তুমি কুচক্রী, ঘাতকিনী।ʼʼ

-“আমার বাচ্চা আপনার কোনো ক্ষতি করেনি।ʼʼ

-“করবে। জয়কে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে, ওকে পথভ্রষ্ট করবে, মায়ায় বাঁধবে, পিছুটান তৈরি হবে। তা হতে দিতে নেই।ʼʼ

খানিক চুপ থেকে তাচ্ছিল্যে স্বগোতোক্তি করল, “যেভাবে তুমি ছোট্ট এক দানা বালুকণা থেকে আমার জন্য মহাদেশ হয়ে উঠেছ!ʼʼ

অন্তূ দেখল ঘৃণাভরে হামজাকে। হামজা কিছু বলবে, গুরুত্বর কিছু। জানা নেই আর কী শোনার আছে—

২০১১ এর মাঝামাঝিতে একদিন হামজার কাছে কুষ্টিয়া থেকে বার্তা এলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জঙ্গির অনুসারী পাওয়া গেছে। সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো সে হামজার অঞ্চলের ছেলে। অন্তিক প্রামাণিক। স্কুল মাস্টার আমজাদ আলী প্রামাণিকের ছেলে।

সমস্যাটা অন্তিকের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই। সে যখন হলে উঠবে, লীগের বড় ভাইয়েরা বলল, গণরুমে থাকবি। কিন্তু গণরুমে থাকার একটা সুবিধা হলো—বড়ভাইয়েরা যখন-তখন মিছিলসহ রাজনৈতিক কর্মে যোগদান, দলে নাম দেয়া, মদ পান, আড্ডা, নারীবাজি, চাঁদাবাজি ইত্যাদির ডাক দেন। তার ফলে পড়ালেখা ছেড়ে উঠে যাবার সুযোগ রয়েছে, পড়ার খাটুনি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

কিন্তু অন্তিক এসবে আগ্রহী না। সে আপত্তি জানিয়েছে বেশ কয়েকবার। তারপর তাকে নজরে রাখা হচ্ছিল, সে জানেই না। ২০১১ এর শেষের দিকে দেশের পরিস্থিতি গরম। মুক্তিযুদ্ধে কে বিরুদ্ধাচারণ করেছে, কে পাকিস্তানের চর ছিল এই নিয়ে দুই প্রধান দল কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করছে। বছরের শেষের দিকে একটা অভ্যুত্থান হতে হতে হলো না। অভ্যুত্থানটা ছিল ইসলামপন্থি কিছু সংগঠনের পক্ষ থেকে। ভারত এর পুতুল হয়ে থাকা চলবে না, এই উদ্দেশ্যে। কিছু গ্রেফতার-ট্রেফতার চলার পর তা থামল।

এর মাঝে অন্তিক একজন মোটামুটি পর্যায়ের সভ্য পুরুষ। সে ইসলামী অনুষদের দাওয়াহ্ বিভাগে অনার্স করছিল। সর্বনাশের মূল-অংশ এখান থেকেই এলো বোধহয়। দাওয়াহ্কে ইসলামি অনুশাসনমূলক রাজনৈতিক ক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

পরে অন্তিক আসন পেয়েছিল বঙ্গবন্ধু হলে। একদিন রাতে সে পড়ছে। হঠাৎ-ই তার ডাক পড়ল। সে বের হতেই একদল তাড়া করল তাকে। তাদের হাতে চাপাতি, ছুরি, স্টিক। অন্তিক না বুঝেই দৌঁড়াতে শুরু করল। হল চত্বর পেরিয়ে রাস্তায় প্রাণপনে অনেকটা ছুটে সে মণ্ডলপাড়া মসজিদ অবধি পেরিয়ে এলো। তখনও পেছনে কমপক্ষে আট-দশজন ধাওয়া করছে তাকে। সে মসজিদের অদূরে ভাঙা টিনের এক গেইট প্রায় আরেকটু চ্যাপ্টা করে ভেঙে মাঝরাতে ঢুকে পড়ল অচেনা কারও বাড়িতে।

শব্দে বাড়ির কর্তার আগে টিনের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো যুবতী মেয়ে। অন্তিক অনুরোধ করে, “আমাকে একটু লুকোনোর জায়গা দিন।ʼʼ

ঝাঁঝাল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে যুবতী, “কে আপনি? কেন লুকানোর জায়গা দেব?ʼʼ

-“আমি অন্তিক। ভার্সিটির ছাত্র।ʼʼ

গলা শুকিয়ে কাঠ, শরীর থরথর কাঁপছে তখন অন্তিকের। আর কিছু বলতে পারল না সে। মেয়েটা অন্তিককে ঘরের ভেতর দিয়ে নিয়ে গিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে আমবাগানের ওদিকে বের করে দিলো। বলল, “ওই ঝোঁপের ওদিকে যদ্দূর পারেন পালান।ʼʼ

কণ্ঠটা তখনও ঝাঁঝাল। মেয়েটার নাম মার্জিয়া। বয়স কত হবে? ঊনিশ-বিশ?

তার বিশ মিনিটের মাঝে মার্জিয়াদের বাড়ির টিনের প্রাচীরে ঘেরা উঠোন ভরে গেল ছাত্র দ্বারা। ওরা কাউকে খুঁজতে এসেছে। এদিকেই পালিয়েছে কোথাও। এ বাড়িতেই বোধহয় ঢুকেছে। এবার বাড়ির সবাই বেরোলো। তারা কেউ কিচ্ছু জানে না–কে এসেছে, পালিয়েছে। পুরো বাড়িতে ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব চলল। ঘরের একেকটা কাপড়চোপড় রাখার র‌্যাক অবধি ছাড় পেল না। যেন অন্তিক কাপড়ের ভাজে বসে আছে মার্জিয়াদের ঘরে। মার্জিয়ার মা কাঁদতে লাগলেন।

পুরো পাড়াই কমবেশি জেগে উঠল। কিন্তু কেউ বাড়ির ভেতরে এলো না, যতক্ষণ না ওরা বেরিয়ে গেল। এদের সামনে আসতে নেই। তারা সচেতন জনগণ। কিন্তু ওরা দেখেছে অন্তিক এদিকেই ঢুকেছে। তবু না পেয়ে ক্ষিপ্রতা বাড়াই তো স্বাভাবিক। মার্জিয়ার দাদির ঘরের দরজা দুই লাত্থিতে চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ল। মাঝরাতে বাড়িটা এক টুকরো পাগলা ঝড়ো হাওয়ায় বাড়ি খেলো। মার্জিয়ার আব্বা মাঝবয়সী মানুষ। তাতে কী? তিনি মার খেলেন। হুমকিও পেলেন, যদি ওই ছেলেকে লুকিয়েছে বলে জানা যায় জ^বাই করে রেখে যাওয়া হবে।

কিন্তু ঘটনার মূল কালপ্রিট মার্জিয়া যথাসম্ভব চুপচাপ আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল। যুবতী মেয়েদের এদের সামনে আসতে নেই। সেদিন সারারাত বাড়ির সামনে একগাদা ভারী পায়ের বিচরণ শোনা গেল। অথচ মার্জিয়া সকালে বাড়ির পেছনের ডোবার ধারে ঝোঁপে অন্তিককে খুঁজতে গেল। কাহিনি শোনার চেষ্টা করল। বাড়ির সাথে বাড়ি লাগানো। পাশের বাড়ির মহিলারা না দেখবে কেন?

মার্জিয়ার বদনাম হলো। বাড়িতে মার্জিয়া মার খেল। ছোটচাচা ও মা মিলে মারল মার্জিয়াকে। আব্বা ঘেন্নায় কথা বন্ধ করে দিলো। বাড়িতে মার্জিয়া ভুল বোঝাবুঝিতে ঘৃণিত হয়ে উঠল। সবাই নিশ্চিত অন্তিকের সাথে বহুদিনের সম্পর্ক। তাই তো তাড়া খেয়ে এসে প্রেমিকাকে জাগিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ছ্যাঁড়া। আবার এতকিছু হলো তবু লাংয়ের খোঁজ দিলো না মেয়ে।

দু’দিন ওভাবেই পলাতক থাকার পর অন্তিক জানতে পারল সে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত। বঙ্গমাতা হলের এক ছাত্রীর সাথে কয়জন কী করেছে, সেটার দায় অন্তিকের। এবার ছাত্র উপষদসহ হলের প্রধানরাও অন্তিকের বিরুদ্ধে। এবং এটার কারণ হিসেবে বলা যায়–অন্তিক কোন সাহসে বড়ভাইদের আহ্বান ঠুকরায়। তার পথ কোনটা? অন্তিকের এই পরিণতি জুনিয়রদের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে। পরে জানা গেল, এটার চেয়ে বড় কারণ অন্তিক যে গোপনে টুকটুক করে ইসলামী সংগঠন ও দাওয়াহ্ সম্বলিত কার্যক্রমে সমর্থন ও অনুসরণ রাখে, এটা জানাজানি হয়েছে।

অন্তিক বুঝল–তার ভার্সিটি জীবনের অবসান এখানেই। সকল স্বপ্ন, ক্যারিয়ার, আব্বুর সম্মান সব গেছে। ভার্সিটিতে পড়তে গেলে মেধা ও সুযোগ নয় লাগে বড়ভাইদের অনুমোদন, তা অন্তিক হারিয়ে ফেলেছে। এবার কোনো একদিন টুকুস করে তাকে মেরে ফেলা হতেই পারে। অন্তিক একরাতে এক জীবন বদলকারী সিদ্ধান্ত নিলো। মার্জিয়ার বাবার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা ও মার্জিয়ার হাত চাইল। দিলেন উনারা। বদনাম যার নামে হয়েছে, তার কাছেই দিয়ে দিলেন। অন্তিকের বাবার খোঁজ করলে অন্তিক বলল, আব্বু এসব জানলে হার্ট ফেইলিউর হয়ে যাবে উনার। আমি কুষ্টিয়া আর থাকতে পারব না। আমার জানের ঝুঁকি রয়েছে।

মার্জিয়ার বাড়ির লোক অদ্ভুতভাবে এই এক রাতে মুসিবত হয়ে আসা অন্তিকের জন্য একের পর খুব বেশিই ত্যাগ তারা করেছেন। এই এক ত্যাগ, যা আজব। তারপর অন্তিকের ব্যবসার জন্য একগাদা গহনা মার্জিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তারপর সেই অন্তিক যখন মরল, মার্জিয়াসহ অন্তিকের সন্তান ও জন্মদাত্রীর পালনটাও তাদেরই করতে হলো। কিন্তু এসব দুই গোঁয়ার কোনোদিন কারও কাছে বলেনি।

অন্তিক একটু পাগল হয়ে গেছিল। সে এত কঠিন এক মানসিক আঘাতের পর দিনাজপুর ফিরে আব্বুর কাছে ভুল বোঝার শিকার হলো। যেখানে তার নিজেরই বেশি পাগলামি ছিল আব্বুর আদর্শ ধরে রাখার। মার্জিয়া ও অন্তিক তারপর বোধহয় দুজন একসাথে পাগল হলো। এই এত বড় ঘটনাটা দুজন রোজ গিলতে গিলতে বাড়ির বাকি তিনটে মানুষ থেকে তারা আলোকবর্ষ দূরে চলে গেল। মার্জিয়া অন্তিককে পাগলের মতো ভালোবেসে ফেলেছে হঠাৎ-ই, এটা সত্যি। কিন্তু অন্তিক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

কিন্তু সে কখনও জানেনি কুষ্টিয়া থেকে ফিরে সে নজরমুক্ত হয়নি। হামজার লোক তার অবস্থা বহুদিন ধরে পর্যবেক্ষণ ও জানাশোনায় রেখে লোক মারফতে তাকে নিয়ে ফেলল পলাশের ডেরায়। এটাকে বলে ধান্দা ও এক ঢিলে দুই পাখি। অন্তিককে দমন ও পলাশের ধান্দায় বাড়তি মুনাফার ব্যবস্থা হয়ে গেল।

২০১২ তে অন্তূ হাজি মোহাম্মদ দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন নিলো সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। সেও জানল না ভার্সিটির ছাত্র পরিষদ তাকে খুব চেনে, অন্তিকের বোন হিসেবে চেনে। জয় তখন ঢাকাতে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স করছে। সে ফিরল বছর দুই কাটিয়ে ২০১৪ তে, হামজার নির্বাচনের আগ আগ দিয়ে। এছাড়া তখন মুমতাহিণাকে অপহরণ করা হয়েছে, মুরসালীন হাতের মুঠোয় আসবে আসবে ভাব।

সেরকম একদিন অন্তিকের বোনের সামনে হাজির হবার শখ জাগল জয়ের। সে কখনও দেখেছিল না। কিন্তু সে দেখল অন্তিকের বোন অন্তিকের মতো মনোবল খুব সহজে হারায় না। সিগারেটের সাথে সাথে গোটা জয়কেই পায়ে পিষে চলে যাবার দূর্বার সাহস জয়কে খুব ডিস্টার্বড করে তুলল।

এরপর মুমতাহিণাকে নিয়ে কৌতূহলবশে সে গভীরে হাঁটাহাঁটি শুরু করল। পরাগও এক প্রকার দূর্বল হলো মেয়েটার জন্য। কথা ছিল অন্তূর মতো একটা সামান্য মেয়েকে দমাতে একরাত ক্লাব অথবা কোনো হলের রুমে একটু খাতির করলেই ব্যাস। কিন্তু এর মাঝে জয় একটা অঘটন ঘটালো। সেটাও ভালোই। কমের ওপর দিয়ে বেইজ্জত ঠিকঠাকই হয়েছিল অন্তূর। কিন্তু শেষক্ষণে সেই অন্তূটা যে বাড়ির বউ হয়ে যাবে, এটা সব ঘেঁটে দিলো। যদিও ঘাঁটার কথা ছিল না, যদি না মেয়েটা অন্তূর মতো বিচক্ষণ, জেদি আর কূশলী আগুন হতো।

অন্তূ দম আঁটকে হামজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তার জীবনে কোনো ঘটনাই তাহলে কাঁকতালীয় ঘটেনি। আর না ঘটেছে সেদিন সিগারেট পায়ে পিষার ফলে। এসবের সূত্রপাত তখন যখন অন্তূ কলেজ পড়ুয়া বেখবর কিশোরী। এসব হবার ছিল বলেই হয়েছে। অন্তূর চোখ দিয়ে টসটস করে কয়েক দানা জল নিথর মুখখানা বেয়ে পড়ল। অন্তিক আজ নেই। জয় আমির ও হামজারা অবশেষে তাকে গাড়ির তলে থেতলে ঠিকই মেরে দিয়েছে।

-“নাও এটা পান করো।ʼʼ

অন্তূ অদ্ভুত স্বরে বলে, “বিশ্বাস করুন, জয় আমির আপনাকে জীবিত দাফন করবে….ও জানলে…ʼʼ

হামজা হতবাক হবে নাকি ক্ষুব্ধ; সে ভুলে গেল। তার জয়ের ওপর ঘাতকিনী এই নারীর এতটা অধিকারবোধ ও ভরসা জেগেছে! হামজার পাগল পাগল লাগল নিজেকে। কিন্তু পরমুহুর্তে সে হেসে ফেলল অসীম শীতলতার সাথে। অন্তূর গলার কাছে থুতনি ঘেষে বলল—

-“কে বলবে জয়কে? তুমি? উহু। তুমি তো আর থাকবে না জয়ের সামনে উপস্থিত হবার জন্য! তাহলে কে বলবে? এই দেয়াল, আসবাবপত্র?ʼʼ

অন্তূ একবার দেখল এই নিথর দেয়াল ও আসবাবপত্র। শিকারী একেকটা ইট এই বাড়ির! অবরুদ্ধ নিশীথ আবারও নেমেছে প্রকৃতিতে। আজ কি অন্তূর গ্রাস হবার পালা?

অন্তূর পেটের ওপর হাইবুট দিয়ে এক লাত্থি মারল হামজা, চেপে ধরে রইল পা’টা। অন্তূ নিদারুণ আর্তনাদ করে ওঠে, “আব্বু!ʼʼ ঠোঁট কামড়ে ধরে কেঁদে উঠল মেয়েটা।

হামজা আরেক পা দিয়ে অন্তূর বাঁ পায়ের উরু চেপে ধরে হাত দিয়ে অন্তূর হাতজোড়া বন্দি করে প্রায় গোটা শরীরটা নিয়েই ঝুঁকে পড়ল অন্তূর ওপর। ঠোঁটে চেপে ধরল তরল, “ড্রিংক ইট, মাই ডেভিয়াস লেডি ! আই ওন্ট সাজেস্ট এনিমোর।ʼʼ

অন্তূ ছলছল চোখে অসহায় বদনে চায় হামজার দিকে। হামজা চোখ বুজে প্রশান্তির শ্বাস ফেলল। এই কাতরতা এই নারীটির চোখে দেখবার জন্য হামজা অস্থির হয়ে পড়েছিল। কিন্তু হতাশা একটু রইল, তবু অন্তূর চোখে দ্রোহের আগুন ছলকাচ্ছে, “আপনাকে আজ শত্রু হিসেবে একটা পরামর্শ দেই–যা করতে চাইছেন না করুন। আমও যাবে ছালাও যাবে। যে আফসোসে পড়বেন আপনি তার কোনো অন্ত থাকবে না ইহকালে।ʼʼ

হামজা এক টুকরো হাসল, “এভাবে হামজা ভড়কে না।ʼʼ

অন্তূ কাতর স্বরে কেমন পাগলের মতো করে বলে, “আমায় ছেড়ে দিন। আমার কিচ্ছু নেই। আমার বাপ নেই, মা থেকেও কাছে নেই। সব নিয়েছেন। এইটুকু আমার থাকুক। এইটুকু আমার দাবী, আমার নিজের। আমার সন্তান…আমি ওকে নিয়ে বহুদূর চলে যাব। কোনোদিন আর আসব না এ পথে। আপনার জয়কে আমার কখনোই চাই না। আপনি রাখুন তাকে। সে আমার কাম্য নয়। না পেল কখনোই সে তার সন্তানের ভাগ। আমার থাকুক এটুকু। সে আমায় এইটুকু দিয়ে দেবে আমি চাইলে অনায়াসে। আপনি তাকে বলবেন, তার প্রাণভোমরা নিয়ে আমি চলে গেছি। এটা তার জানা দরকার। আমি দূরে গেলেই তার জানা দরকার।ʼʼ

হামজা অবাক হবার ভান করে, “হু? সন্তানটা কার? তোমার? নাহ। মেয়েলোকের কোনো সন্তান থাকে না। ও তো কেবল পুরুষের দান। আচ্ছা! এটা কার সন্তান? জয়ের? তো ব্যাস এতে আমার ষোলো আনা হক আছে। আমার চাওয়া মোতাবেক তার ভাগ্য নির্ধারণ হবে। তবে যদি এটা জয়ের সন্তান না হয় তো বলো, ছেড়ে দেব। জয়কে বলে দেব, ও এমনিতেও আর তাকাবে না। কিন্তু ওর হলে ছাড়া যাচ্ছে না যে!ʼʼ

অন্তূ চোখ বুজে ফেলল। বুকটা থরথর করে কাঁপছে। তলপেটে মরণের ব্যথা। বুকের ব্যথা নেই। অন্তূর ব্যথারা অসাড় আজ।

তবু অন্তূ আকুতি করে, “আমাকে যেতে দিন। আজ আমি আমার ঘাড়ে নিলাম সমস্ত দায়। আপনাদের বিরুদ্ধাচারণ, অন্তিকের বোন হওয়া, এক অসহায় স্কুল মাস্টারের মেয়ে হওয়া, সমাজের সাধারণ শক্তিহীন মানুষ হবার এই সব পাপ আমার। এর বিনিময়ে আমি আজ পথান্তরী হবো। তার শাস্তি এক নিষ্প্রাণ শিশুর পেতে আছে, বলুন তো? ও আমায় কত ভরসা করে। ও জানে আমার গর্ভ ওর জন্য নিরাপদ। বাইরে যা-ই হোক, আমি ওর গায়ে তার এক টুকরো আঁচড় লাগতে দেব না। এমনটাই চুক্তি আমার ওর সাথে, যেদিন ও আমার কাছে এসেছে। ওর কাছে আমি দোষী হয়ে যাব আজ। এই লাঞ্ছনা মা হয়ে সওয়া যায় না। আপনি বুঝতে পারছেন? ও আমার আমানত। আমার নারীত্বে দাগ পড়ে যাবে। আপনার দেয়া সব কলঙ্ক কবুল, কিন্তু মাতৃত্বের কলঙ্ক….আমি পায়ে পড়ছি আপনার..জয় আমির…ও… ওর বাপ…সে..ওকে মারবেন না। আর জায়গা নেই আমার ভেতরে। আমি আর পারব না। মেয়ে হয়ে বাপ হারিয়েছি, সয়েছি। ভাই ও পরিবার হারিয়েও মেনে নিয়েছি। ইজ্জতের দাবী ছেড়েছি। মাতৃত্বে সেই সুযোগ নেই বোধহয়।আমি পারবোই না, আমি বুঝেছি…আমায় যেতে দিন।ʼʼ

অন্তূর কান্নায় ভিজে ছিটকে আসা আকুতি অবরুদ্ধ হলরুমের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। কিন্তু এই হলরুম এ ধরণের আর্তনাদে বরাবর অভ্যস্ত। এখানে একটুও অস্বাভাবিক নয় এই অসহায়ত্ব ও আঁকুতির স্বর।

হামজা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হলো। নারীত্ব ও মাতৃত্ব যে নারীটির মাঝে এত তীব্র সে কী করে এতটা ধ্বংসাত্বক হতে পারে? অন্তূ তাকে হতবিহ্বল করে তুলল। হামজা ভাবতে পারছিল না, বুঝতে পারছিল না নারীটিকে। এত রূপ ও অনুভূতির স্বত্ত্বাধিকারিণী! রিমি পারেনি। তার ভেতরে অন্তৃর তুলনায় একরত্তি বিদ্রোহ না থাকার পরেও সে কী করেছে! হামজার মনে হলো আরমিণের ওপর জয়ের পতন জায়েজ।

সে শুধু বলল, “কোথায় যেতে দেব? জয় যে প্রশ্ন করবে আমায়! কী জবাব দেব, কোথায় গেছে তার সর্পিনী? মাথা নাড়ল হামজা, লাশ দেখিয়ে বলতে হবে এমপির ছেলেটা ঘ্যাচাং করে দিয়েছে।ʼʼ

হামজা ক্ষ্রান্তি দিলো। গ্লাস সরিয়ে নিয়ে বোতল ধরে নিজে পান করতে করতে ডাকল, “ওরে আছিস রে তোরা? সিস্টারদেরকে পাঠা রে!ʼʼ

চারজন সহকারী নার্স ও ডাক্তার এলো, হাতে কীসব সরঞ্জামের বাক্স। অন্তূ মেঝের ওপর ছেচড়ে কিছুটা পিছিয়ে যায়। অনবরত মাথা নাড়ে, “নাহ্, না না না। হামজা, হামজা সাহেব, না।ʼʼ

হামজা বলল, “কাজ শুরু করুন। রাত অনেক হলো।ʼʼ

রোগীকে দেখে ডাক্তারের নারী ও মানবীমনে দোলা দেয়া স্বাভাবিক। ইতস্তত করে তারা ডাকে, “স্যার!ʼʼ

হামজা জবাব দেয়, “উঁহ্! কী? আবেগে টান পড়ছে?ʼʼ

পিস্তল বের করে হাতে ঘুরালো দু-চারবার। এভাবেই নিয়েও আসা হয়েছে তাদেরকে। একজন গর্ভবতীর এবোর্শন করাতে হবে। তার শরীরের কন্ডিশন খারাপ। আনা হলো এখানে। শুকনো ফুলের মতো বিদ্ধস্ত সুন্দরী, চোখের দিকে তাকালে আর অস্ত্র চালানো সম্ভব হতে চাইবে না। কী করবে তারা?

অন্তূ উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক পা দ্রুত সরে যেতে নেয়। হামজা বলল, “ছেলেদেরকে ডাকব তোমায় ধরার জন্য? তোমার পর্দার খেলাপি হবে না তো? ওরা ছোঁবেও, দেখবেও। তোমার আপত্তি না থাকলে ডাকব।ʼʼ

অন্তূর শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। মাটিতে বসে পড়ল মেয়েটা। হামজার সামনে হাটু গেড়ে বসে হু হু করে কেঁদে উঠল। জীবন তাকে কোথায় এনে ফেলেছে! সে আজ প্রথমবার জীবনকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার অপরাধ কী? বল আমার অপরাধ কী? আমি কেন এত অসহায়, একা? এত দূর্গতি কোন পাপের বিনিময় হিসেবে দেয়া হলো আমায়?ʼ

অন্তূ টের পায় পাশে আব্বু বসে অন্তূর কান্না দেখছে। অন্তূ আত্মহারা স্বরে ডাকে, “আব্বু? কোথায় তুমি?ʼʼ

-“সামনে রেখে কেউ এই প্রশ্ন করে, অন্তূ?ʼʼ

-“আজ আমায় রক্ষা করতে পারো, আব্বু?ʼʼ

-“না, অন্তূ। সেদিনই পারিনি যেদিন তোকে এই জীবন দিয়েছি আমি, আজ কেন আশা করছিস বোকার মতো?ʼʼ

চট কোরে অন্তূর বিচক্ষণ মস্তিষ্কে হিসেব খেলে যায়। আব্বু কি সেদিন চলতি পথে অতটা সময় অন্তিকের সাথে কাটিয়ে এই ঘটনাগুলো শুনেছিল? সেজন্যই কি জেনেবুঝে চুপচাপ অন্তূকে বিয়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে? নয়ত কেন সেদিন কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মানুষটা কেবল অন্তূকে মেনে নিতে বলেছিলেন? কেন সেদিন বলেছিলেন, অন্তূকে তিনি মেরে ফেললেন? আর তারপর ব্রেইন স্ট্রোক। এসব কতটা চাপে হয়েছিল?

অন্তূ দেখে আব্বু আর নেই। সে ছটফটিয়ে ওঠে। হামজা হলরুমের কেন্দ্রিয় আসনটিতে বসেছে পায়ে পা তুলে। অন্তূর চোখের সামনে জয় আমির ভেসে ওঠে। কোথায় সেই লোক? তার সন্তানকে রক্ষা করার কর্তব্য নেই তার? আসবে না সে? অন্তূর জন্য না, নিজের সন্তানের জন্য আসা দরকার তার। অন্তূ এদিক-সেদিক তাকায়। কোথাও নেই জয় আমির। কোথাও কেউ নেই অন্তূর। সে এতিম, সে একেলা।

অন্তূর চার হাত-পা বাঁধা হলো মোটা নাইলনের দড়ি দিয়ে। আজ আকাশে চাঁদ নেই। অমাবস্যার নিশীথ। আমির নিবাসের অভিশপ্ত অবরুদ্ধতা। হামজার নির্দেশ সম্পূর্ণ চেতন অবস্থায় অস্ত্রপচারের মাধ্যমে গর্ভপাত হবে আরমিণের। যদি অসহনীয় ব্যথা ও রক্তপাতে এখানেই মরে যায় তো গেল, নয়ত মানুষ মারা কঠিন ঘটনা নয়।

অন্তূর গর্ভাবস্থা তিন মাসের। সুতরাং তার স্যাকশন অ্যাসপিরেশন করা হলো। সহকারী তিনজন ও যে নারী ডাক্তারটি এসেছেন, উনারা অবধি কেঁপে উঠলেন। একবার তাদের মনে হলো হামজার গুলিতে মরে যাওয়াই ভালো তবু এমন নৃশংস ধরণের পাপ ও পাগলামি তারা করতে পারে না।

অন্তূর দেহের নিম্নাংশ যখন অনাবৃত করা হচ্ছিল, হামজা এক সময় চোখ ফিরিয়ে নিলো। সে শুদ্ধ পুরুষ নয়। কিন্তু তার মোটেই আগ্রহ নেই এই নারীটির শরীরের ওপর। সে সুন্দরী হলেও কেবল ঘৃণ্য। চাইলে সে আজ অনেককিছুই করতে পারতো। কিন্তু রুচি নেই। অথবা কীসের এক দ্বিধা ও আড়ষ্ঠতা! ভাইয়ের স্ত্রী যে!

প্রকৃতিতে মাঝরাত। চারদিকে পাথরের প্রাচীর, তার মাঝে দাঁড়ানো আমির নিবাসের অন্তঃপুরীতে অভিশাপ রচিত হলো সে রাতে। অন্তূর হৃদৎবিদারী চিৎকার ও নারীত্বের হাহাকারে আমির নিবাসের দেয়ালেও বুঝি থরথরিয়েছিল। অন্তূর যোনীদ্বার ফুঁড়ে ধাতব-ডাইলেটর প্রবেশ করল গর্ভাশয় অবধি। আমির নিবাসেই আমির নিবাসের শেষ ভ্রুণ-পিণ্ডটুকু গর্ভথলি থেকে অপসারিত হলো।

পনেরো মিনিটের ব্যবধানে অন্তূর শরীর ও মেঝে রক্তে স্নাত হলো। অন্তূ লুটিয়ে পড়ল অন্ধকারের কোলে। রক্তপিণ্ডের মতো দেখতে রক্তে ভেজা এক দলা ভ্রুণ পড়ে রইল মেঝের ওপর। জয় আমিরের রক্ত ও বীর্য শরীর থেকে বয়ে যাবার পর অন্তূর শরীরটা হালকা হয়ে এলো। কোথাও একটুও ব্যথা নেই, মায়া নেই। শুধু কলকল ধ্বনি তুলে অন্তূর নারীত্ব রক্তের সাথে বয়ে যাচ্ছে নিম্নদেশ বেয়ে। তা একটু একটু গড়িয়ে গিয়ে হামজার পায়ের তলায়ও তো ঠেকল।

হামজা বুকটা মুচড়ে ওঠে। জয়ের রক্ত মিশে আছে এতে? হামজা রক্ত তুলে হাতে মাখে। লাল টকটকে গরম তরল, একটু গন্ধ। হামজার ভেতরে ঘৃণার উদ্রেক হলো। এটা জয়ের রক্ত নয়। এটা নোংরা নারীটির বদ-দেহরস।

চলবে…

#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা

৮১.

অন্তূর একটু গা গরম। আমজাদ সাহেব সারারাত বাড়ি মাথায় করে রাখেন। রাবেয়া বিরক্ত হয়ে বলেন, “উফফ, অন্তিকের আব্বা, রাতভর চেঁচাবা না। কানের গোড়ে বসে চেঁচালে শরীর আরও খারাপ লাগে। তুমি ঘরে যাও, আমি দেখি।ʼ

কিন্তু আমজাদ সাহেব রাবেয়াকে এসব কাজে একটুও ভরসা করেন না। অন্তূ এক নম্বরের বোবা, জ্বরে ফিট খেয়ে গেলেও বলবে না, আর রাবেয়া ঘুমিয়ে পড়বেন। সুতরাং তিনি রাবেয়ার ধমক খেয়েও সারারাত মাথার কাছে বসে অজিফা পাঠ করেন, আর একটু পর পর কপালে হাত রাখেন। অন্তূ বিরক্ত হয়ে বলে, ‘আব্বু, আমি কিন্তু সুস্থ, এবং ঘুমাচ্ছি। কিন্তু তোমার এই একটু পর পর কপালে হাত রাখায় আমার ঘুম ভাঙছে। যাও তো, রুমে যাও।ʼ

আজ অন্তূ আছে। না, অন্তূও নেই। অন্তূ ফুরিয়ে গেছে, আর আমজাদ সাহেব নেই। আজ রক্তাক্ত অন্তূ দুর্গন্ধে ভরপুর, এক ধুলোমাখা মেঝেতে পড়ে রইল। অন্তূর মাতৃত্ব ধুয়ে কলকল করে রক্ত ছুটে যাচ্ছে দেহ ছেড়ে। তার ব্যথায় ছটফট করার মতো আপন কেউ নেই কোথাও। এ সময় অন্তূর মাকে খুব দরকার। রাবেয়া জানেন না তার গর্ভের ধন গর্ভ হারিয়ে মৃত্যুপথে।

রক্তপাত থামানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। অ্যানেস্থেসিয়া ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ অনুভূতিসম্পন্ন অবস্থায় অন্তূর গর্ভজাত বস্তু ছিঁড়ে আনা হয়েছে গর্ভাশয় থেকে। সুতরাং জরায়ুপথে ডায়ালেটর ও ভ্যাকুয়াম যখন ব্যবহার করা হয়েছে, অন্তূর শরীর অসহ্য ব্যথায় নিদারুণ কাতরেছে, এ অবস্থায় অস্ত্র চালনায় ক্ষত তৈরি হয়েছে। অন্তূর সাথে যা হলো তা জীবিত কোনো নারীর সাথে হতে নেই।

অন্তূ এরপর মানসিকভাবে ভারসাম্য হারাতে পারে, গর্ভধারণ ক্ষমতা আর থাকবে না, ক্যান্সার হলে অবাক হবার কিছু নেই, এছাড়া যে অস্বাভাবিক পরিবেশে এই সংবেদনশীল কাজটি সম্পন্ন হলো যেকোনো ধরণের ইনফ্রাকশন না হলে সেটা অবাককর বিষয় হবে। কিন্তু ডাক্তারের কিছু করার নেই। গোপনে দুটো ন্যাপকিন অন্তূর নিম্নদেশে পরিয়ে ওভাবেই ফেলে তাদের চলে যেতে হলো, হামজার নির্দেশ। যদি অন্তূ না মরে তবে আবার নাহয় আসবে তারা। তবে এখন আর কোনো তদবীর নয়। ডাক্তার ও নার্সগুলো এক প্রকার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় ফিরে গেল।

অন্তূর দেহটা নাড়িছেঁড়া ভ্রুণের পাশে পড়ে রইল অবরুদ্ধ হলরুমে। সেখানে অন্তূর পিঠের নিচে একখানা বিছানা নেই, নেই মাথার নিচে বালিশ, নেই পরিচ্ছন্নতা, ওষুধ বা দেখার মানুষ, স্নেহের হাত, খাবার-পানি, যত্ন, আলো…। নিশুতি রাতে একটি ছিন্নভিন্ন, অচেতন, নাপাক রক্তে গড়াগড়ি খাওয়া নারীদেহ আমির নিবাসের মেঝেতে ফেলে কতকগুলো মানুষ বহুদূর চলে গেল নিজেদের গন্তব্যে। হয়ত আমজাদ সাহেব এসে বসলেন অন্তূর শিয়রে। অন্তূ চোখ মেলে দেখল না। হয়ত রাবেয়া সুদূর কুষ্টিয়ার এক কুঠুরির মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে বসে তাহাজ্জুদে কাঁদলেন অঝোরে, অন্তূর কানে পৌঁছাল না সেই সুর। অন্তূ আরামে শুয়ে রইল। তার শরীর থেকে সদ্য বিচ্ছিন্ন ভ্রুণটা কি চেয়ে দেখল তার অভাগিনী মাকে? একটু ব্যথা পেল ভ্রুণটা? পেল না। তিনমাস বয়স তার, সে সবে জয় আমিরের শৌর্য-রক্তপিণ্ড থেকে মায়ের রক্তের ভাগ পেয়ে সেজে উঠতে শুরু করেছিল। সে নিজেই বোধহয় অভিমান করেছে—তাকে পরিণত হতে বাঁধা দেয়ায়; মায়ের ওপর, বাপের ওপরে একটু বেশি।


রউফ কায়সারের একটি তিন বছরের ছেলে আছে ও স্ত্রীকে নিয়ে পরিবার তার। এটা একটা ভালো খবর হামজার জন্য। এরকম কিছু সে ভাবতে চায়নি, সে একজন সমাজসেবক। প্রথমে রউফকে ভালো অঙ্কের পয়সা দিয়ে ব্যাংক-ব্যালেন্সে উন্নতি করতে চেয়েছিল সে। কিন্তু রউফ নিজের অবস্থার উন্নতি চায় না। হামজার কিছু করার নেই।

কবীরকে কোনোভাবেই এর মাঝে ঘোড়াহাঁট যাবার সুযোগ দেয়া হবে না। সে কবীরকে বলবে সে অন্য ছেলেদেরকে সব ব্যবস্থা করিয়ে দিয়েছে, সে যেন শুধু জয়ের সাথে থাকে।
হামজা ঠিক করেছে আরমিণকে সে মারবে না। তুলে দেবে এমপির হাতে। জয়ের কাছে নিজেকে সাফ রাখার এর চেয়ে ভালো উপায় নেই। সে খুব দুঃখের সাথে জয়কে বলবে, ‘আমি আরমিণকে বাঁচাতে পারিনি। এবং সেটাও তোর জন্যই। তুই যদি সেদিন বউকে আমির নিবাসে না রেখে আসতি…এতদিন ও আমার সীমানায় ছিল, কেউ ওকে ছুঁতে পর্যন্ত পারেনি। আর তোর কী মনে হয়েছিল এমপির লোকেরা খোঁজ পাবে না তোর বউ কোথায়?ʼ

এতে আরেকটা চমৎকার কাজ হবে। সে এর মাধ্যমে এমপির কাছে নিজেকে নিয়ে সাময়িক একটা ভরসা তৈরি করবে। এবং এটাও বলবে, ‘সে ইলেকশন করবে না। সিনিয়র এমপি সাহেবই এই আসনের এমপি হবার একমাত্র যোগ্যব্যক্তি।ʼ

এমপি খুশি হয়ে হামজাকে বুকে জড়াবে। হামজা তারপর এমপিকে খুন করবে। এমনভাবে খুন করবে যেন সাধারণ মানুষ লাশ দেখার সাহস না পায়। টিভি চ্যানেল এবং নিউজপেপারে লাশের ছবি ঝাপসা করে ছাপতেও সংকোচ হবে। জয়কে মারতে চাওয়া মানুষকে খুব বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখা হামজার পক্ষে সম্ভব না। এবং রউফ কায়সারের বাচ্চা ছেলেটাকে কয়টাদিন বড়ঘরে ঘুরতে আনা হবে।

বিকেলের দিকে দোলন সাহেব এলেন। সুস্থির, দায়সারা গোছের সুখী সুখী মানুষটা আজ একটু অস্থির বোধহয়। উড়ো খবর পেয়েছেন তিনি। হামজার বড়ঘরে কিছু ঘটেছে। তিনি ভাবটা এমন করলেন যেন তিনি হামজাকে দেখতে এসেছেন। এক ঝুরি ফল ও মিষ্টি এনেছেন। হামজা বৈঠক-কক্ষের সোফায় বসা। চোখে সাদা চশমা। হাতে মোটা একখানা দর্শন ও রাজনীতির বই। যেমন শরীর ও চেহারাখানা শৌর্যে ভরপুর, তেমন তার শোভন ভঙ্গিমা। গভীর মনোযোগ বইয়ে।

-“কেমন আছো, তুমি? শরীরের কী হাল হয়েছে?ʼʼ

হামজা বই বন্ধ করে হাসল, “আপনি ভালো আছেন? কী খবর? তুলি, নাশতা-পানি নিয়ে আয়।ʼʼ

-“ওসব লাগবে না। তোমাকে দেখতে এলাম। কী করেছ শরীরের?ʼʼ

-“ওদিকের কী হাল?ʼʼ

-“এদিকের হাল বলো। জয়ের এসব কী করে হলো?ʼʼ

-“জানি না, স্যার। শত্রুরা পাখা লাগিয়েছে পিঠে। পাখা কাটাকাটিতে দিন ব্যস্ত যাচ্ছে, তার ওপর দুজনেরই দেহ জখম।ʼʼ

দোলন সাহেব কথা বের করার জন্য নিজের উকালতির মার খাটালেন, “সব শত্রু তো বন্দি তোমার খাঁচায়, আবার নতুন জুটিয়েছ?ʼʼ

হামজা হাসল, “পাখিগুলো উড়িয়ে দিয়ে খাঁচা খালি করে ফেলেছি। এগুলো বাইরেরই।ʼʼ

দোলন সাহেব এক ধাক্কা খেলেন, আন্দাজ সত্যি তাঁর।অস্থিরতা এবার বাইরে বেরিয়ে আসার পর্যায়ে। তবু তিনি হাসলেন, “কাউকে বাঁচিয়ে রাখোনি? মানে সওয়াল-জওয়াবের জন্য আর আমাকে লাগবে না, সেই জনকেও উড়িয়ে দিয়েছ?ʼʼ

হামজা সম্মতিসূচক হাসল। দোলন সাহেব ঘেমে উঠলেন। মুরসালীনের মুখটা সামনে এসে বড্ড জ্বালাতন করছে। হাতের আঙুলের ডগা শিরশির করতে লাগল উনার। তিনি হাসপাতালে জয়কে দেখতে গিয়ে অন্তূকে ওখানে পাননি।

জোর করে হাসলেন, “সব কই? বাড়ি এত শ্মশান। ও আচ্ছা, জয়ের কাছে কে রয়েছে, ওর বউ নাকি?ʼʼ

হামজা বলল, “না।ʼʼ

ব্যাস এটুকুই। আর কিছু না বলে হামজা তুলিকে তাড়া দিলো নাশতা আনতে। দোলন সাহেব টের পেলেন হামজা ব্যাপারটা গিলে খাচ্ছে। উনার বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। বড্ড অবাক হলেন। মুরসালীনের নীতি ও মতাদর্শে তিনি কি একমত? না নাকি হ্যাঁ তাঁর জানা নেই। অন্তূকে তিনি স্বল্প পরিচিতা এক মেয়ের বয়সী মেয়ে হিসেবে চেনেন মাত্র। তাহলে এই দুটো সত্ত্বার জন্য উনার মতো দায়সারা মানুষের ভেতরে এ ধরণের উদ্বেগের কী কারণ!?

তুলি চা দেবার সময় কেমন করে একবার দোলন সাহেবের দিকে তাকাল। তিনি হামজার সামনে বসে চা পান করতে করতে পণ করলেন হামজার বিরুদ্ধে কেইসটা তিনি নিজে লড়বেন। রউফ কায়সারের উনাকে প্রয়োজন এখন, তিনি যাবেন রউফের কাছে।

রিমি গোসল-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। বিছানার সাথে মিশে শুয়ে ছিল। রাত তখন বারোটা পার। কয়েক প্যাগ মদ পান করে রুমে যায় হামজা। ওষুধ খাওয়া হয়নি রাতের।

হামজা ডাকল, “রিমি! ওঠো, গোসল করোনি। খাওনি। আমাকে শাস্তি দিচ্ছ দাও, আমি নাহয় পাপ করেছি। তুমি করোনি। তাহলে নিজের ওপর এই অবহেলা কেন? ওঠো, বলো আর কী শাস্তি বাকি আছে আমাকে দেবার!ʼʼ

রিমি নড়লও না।

-“তুমি কি চাও আমি জবরদস্তি করি? মেজাজ ভালো থাকে না আজকাল। আর কত ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে, যেখানে এখন তোমাকে আমার অনিবার্য প্রয়োজন।ʼʼ

রিমিকে ধরে পাশ ফিরিয়ে মুখটা দেখল হামজা, চেনা যাচ্ছে না। সেখানে আজ অভিমান নেই। পাথরের মতো নিষ্প্রাণ, আবেগহীন। উশকো-খুশকো চুল। ঠোঁটদুটো শুকনো। রিমির চোখের এই অভিমানহীনতা হামজাকে দিশেহারা করে তুলতে চাইল। তার কি একাধারে সবার কাছে ঘৃণিত হবার পর্যায় চলছে? হামজার ভেতরটা দমে এলো। সে তো খুব বেশি কিছু চাইছে না। সে শুধু তার আগের সেই পরিবার, ক্ষমতা আর তার পিছুটানহীন জয়কে চাইছে। এসব তো তারই। নিজের জিনিস হারিয়ে যাবার পথে থাকলে সেসব রক্ষা চেষ্টা করাটা কি অপরাধ? এরা বুঝছে না কেন?

রিমিকে বসিয়ে মুখটা আজলায় ধরল, “আমার দিকে তাকাও। কী করেছি আমি? যখন ঘেন্নাই করবে তো ভালোবেসেছিলে কেন? তখন আর এখনকার আমি তো একই, তাহলে তোমার অনুভূতি কেন দু’রকম হবে রিমি?ʼʼ

রিমি চোখ বেয়ে পানি পড়ল। মনে হলো কোনো পাথরের মাথায় পানি ঢালা হয়েছে, সেই নিথর পাথরের গা বেয়ে পানি চুইয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। তাতে পাথরের কোনো যায় আসে না।

অনেকক্ষণ পর রিমি শুধু জিজ্ঞেস করল, “কী করেছেন আপনি আরমিণের সাথে?ʼʼ

-“কী করেছি? কী করতে পারি আমি? কী বোঝাতে চাইছ?ʼʼ

-“কোনোকিছুই অসম্ভব নয়। তাই আন্দাজে সব ধরণের নোংরামিই রেখেছি, যাতে জানার পর অবাক না হতে হয়।ʼʼ

হামজা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রিমির দিকে।

-“আমি কী করেছি সেটা শুধু দেখবে, ও আমার সাথে কী কী করেছে তাতে যায় আসে না তোমার? আমাকে ফাঁসির দড়ির সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। তুমি সেটাতে সম্মত, খুশি? আমি সব ছেড়েছুড়ে কয়েদী হিসেবে পৌঁছে যাই আইনের দণ্ডের সামনে? চাও সেটাই?ʼʼ

-“আমি আজ কিছুই চাই না। তবু একটা কিছু চাই আপনার কাছে, যা শুধু আপনিই দিতে পারেন।ʼʼ

হামজার চোখ লাল হয়ে উঠল। রিমির শরীর ধরে থাকা হাত দানবের মতো কঠোর হলো, “মুখে উচ্চারণ কোরো না। সহ্য করতে পারব না, উল্টাপাল্টা কিছু করে বসব। আরও ব্যথা পাবে।ʼʼ

রিমি তাতে আরও দ্বিগুন উৎসাহ পেয়ে বলল, “আমাকে তালাক দিন। আপনার উল্টাপাল্টা কিছু করা হিসেবেও আমি আমার মুক্তিই চাই।ʼʼ

হামজার যেন অবাক হবার কাল চলছে। রিমির স্বর বলে মনে হলো না এটা। চোখ বুজে ভারী শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে হামজা রিমির শাড়ি খুলল। শাড়ি খোলার সময় নগ্ন পেটে বেশ কয়েকটা চুমু খেলো। কোমড়টা জড়িয়ে ধরে রিমির হাঁটুর কাছে বসল।

-“সত্যি বলবে, তুমি চাও আমি আইনের কাছে নিজেকে সমর্পন করি?ʼʼ

-“এটা ঠিক করার আমি কে? আমার সাথে আর কী এমন করেছেন আপনি? অন্যায় যাদের সাথে হয়েছে তারা ঠিক করবে আপনার কী হবে।ʼʼ

হামজা সহ্য করতে পারল না। ডানহাত এগিয়ে ল্যাম্পটা তুলে দাঁত আটকে এক আঁছাড় মারল। এত শক্তি প্রয়োগের ফলে ক্ষতগুলো জেগে উঠল যেন। জোরে জোরে শ্বাস ফেলল হামজা। রিমি নির্লিপ্ত বসে রইল নিরুদ্দেশ দৃষ্টি মেলে।

-“তোমাকে কীভাবে বোঝালে বুঝবে আমার তোমাকে প্রয়োজন, হ্যাঁহ্? মানসিক, শারীরিক এবং সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে তোমাকে প্রয়োজন আমার। এই কঠিন সময়টায় এমন করছো কেন আমার সঙ্গে?ʼʼ

-“প্রয়োজন ব্যাপারটা কঠিন কিছু নয়, মেয়র সাহেব। বিকল্প দিয়ে দিব্যি মিটিয়ে নেয়া যায়।ʼʼ

-“চ্যাহ্! আমার রিমি, এমন সব কথা কে শিখিয়েছে তোমাকে? তোমার মনেহয় না এবার তুমি বাড়াবাড়ি করছো?ʼʼ

-“কী জানি! কেন আগে করতে পারিনি এই বাড়াবাড়ি?ʼʼ

রিমি তো! কতক্ষণ? তার মুখ নির্লিপ্ত থাকে, কিন্তু চোখের ওপর রিমির নিয়ন্ত্রণ নেই। ঝুপঝুপ করে আষাঢ়ে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ল নোনাজল। গলা ধরে এলো।

দাঁত কিড়মিড় করল হামজা, “এই এই এই, তোমরা মেরে ফেলবে আমায়? হ্যাঁহ্? সবাই মিলে পরিকল্পনা করে পেছনে লেগেছ? সব হারানোর পথে আমি। এত দিনে তিলে তিলে কামানো একেকটা খুঁটি আমার নড়বড়ে হয়ে উঠেছে।ʼʼ

রিমির হাতটা টেনে নিজের বুকে রাখে হামজা, “দেখো তো! টের পাও এখানকার অশান্তি?ʼʼ

-“বাহ্ রে! আপনার ভেতরে হৃদপিণ্ডও আছে নাকি? ওটার কাজ তো রক্তপাম্প করা। তার মানে আপনার শরীরে রক্তও আছে? রঙটা কী? মানুষের মতোই লাল?ʼʼ

হামজা হাসল, “পশুর রক্তও লালই হয়, রিমি। এত কথা আর এরকম কথা কবে শিখলে? কে শিখিয়েছে?ʼʼ

-“আপনার আন্দাজ সঠিক।ʼʼ

হামজা মাথা নাড়ে, “হু! এত ক্ষতি করল সে আমার!ʼʼ

রিমির বুক জ্বলে উঠল অজানা এক ঘেন্নার ব্যথায়। আচ্ছা এই লোক আরমিণকে ভয় পায়, সেই আরমিণকে কি নোংরাভাবে ছুঁয়ে এসেছে? রিমির পেট গুলিয়ে গলা অবধি এলো। হতেই পারে। অসম্ভব না।

যন্ত্রের মতো সে হাত বাড়িয়ে হামজার হাতটা নিজের খোলা পেট থেকে সরিয়ে দিতে চায় ঠেলে, যেন ছুটে এসে এক দলা ময়লা শরীরে লেগেছে। হামজা শক্ত করে হাত, হাতগুলো রিমির শরীরে গেঁথে দিতে পারলে হতো।

রিমি আবদার করে, “আপনি তালাক দিন আমায়। না না, আমি ছেড়ে যাব না কোথাও। রক্ষিতা হয়ে থাকব আপনার। ওটার ভার কম। রক্ষিতার আবার ধর্মজ্ঞান কী? মালিক যেমনই হোক দায় তার নয়। কিন্তু আপনার মতো পুরুষের স্ত্রীর পরিচয় খুব জঘন্য আর ভারী।ʼʼ

হামজা কীভাবে সহ্য করল কে জানে। শুধু বলল, “তোমার এসব কথা আরমিণের জন্য বিপজ্জনক হবে, রিমি। সত্যি বলছি। আমি তোমায় কিচ্ছু বলব না। এর প্রতিটা জবাব আরমিণ দেবে। তাই চাও?ʼʼ

রিমির শরীর শিউরে উঠল। এক লহমায় কঠিন, নির্বিকার মুখে নিদারুণ অসহায়ত্ব ও করুণা দেখা দিলো। হামজা খুশি হলো।

-“সে বেঁচে আছে?ʼʼ

হামজা মোটা একখানা সিগার ধরায়। পাঁজা পাঁজা ধোয়া তার, রিমির খোলা দেহ স্নান করে উঠল তাতে। হামজা সিগার ঠোঁটে চেপে রিমির ব্লাউজ খোলে। রিমি চোখ বুজে যেন মৃত্যুর অপেক্ষা করে। কিন্তু যখন অন্তর্বাস খুলতে যাবে, রিমি হামজার বাহুর দগদগে ঘা’তে নখের আচড় মেরে আর্তনাদ করে ওঠে—

-“ছুঁবেন না। ছুঁবেন না। মরে যাব আমি। আমার ঘেন্না লাগছে। প্লিজ, মেরে ফেলুন। এত লাঞ্ছিত হয়ে বেঁচে থাকতে নেই নারীর।ʼʼ

হামজা সিগারের মোটা জলন্ত প্রান্তটি রিমির বুকের বিভাজনের মাঝে চেপে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “এই কথাটাও আরমিণ বলেছে। আরেকটা প্রাপ্তি বাড়ালে তুমি ওর।ʼʼ

রিমি কেঁদে উঠল চাপা শব্দে। তখনও জায়গাটি পুড়ছে চিরচির করে। রিমির কান্নার আওয়াজ থামাল হামজা—ঠোঁট চেপে ধরল, কামড়াল মূলত, ক্ষোভ ঝারা বললে সঠিক হয়। সাথে সিগারটা কোথাও ছুঁড়ে ফেলল। এরপর ঠোঁট ছেড়ে বুকের পোড়া ক্ষততে গাঢ় চুমু খেয়ে বলল—

“আমার বিরোধিতা করলে তোমার ভেতরটাও এভাবে পোড়াবো। তুমি জানো রিমি, পেট্রোলিয়ামকে কাছ থেকে পোড়াতে নেই। পোড়ানোর ইচ্ছে থাকলে দূর থেকে আগুন ছুঁড়তে হয়। এত কাছে এসে আমায় পোড়াবে, তুমি পুড়বে না, তা হতে নেই। আমার তো ধর্মই পোড়া, কিন্তু তোমার অদৃষ্ট। এখন আমায় খুশি করো, আই ওন্ট সাজেস্ট মোর।ʼʼ


অন্তূর সম্পূর্ণ চেতনা ফিরল দু’দিন পর। তখন তরতর করে রক্ত ছুটছে শরীর থেকে। নাকে এসে ঠেকে বিশ্রী দুর্গন্ধ। দুজন নার্সকে পেল অন্তূ চোখ খুলে। শরীরে অসহনীয় ব্যথা। তার অচেতন থাকা জরুরী, কিন্তু শরীর জেগে উঠেছে, কারণ অন্তূদেরকে ব্যথাহীন থাকতে নেই।
অন্তূর কিছুটা সময় লাগল মনে পড়তে যে তার কী হয়েছে। তারপর মনে হলো নার্স কেন এসেছে আবার? তার বাচ্চা তো পড়ে গেছে, এদের আর কী কাজ? আরও কিছু কি আছে অন্তূর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবার মতো? নাহ্ অসম্ভব। আর কিচ্ছু নেই। এই জগতে তার হারানোর মতো শেষ সম্পত্তিটুকুও অন্তূ বিসর্জন দেবার মাধ্যমে সে হলো সর্বোচ্চ শক্তিশালী ও দূর্বলতাহীন মানুষ।

নার্সরা কাছে আসতেই একটা ভাঙা মাটির ফুলদানি ছুঁড়ে মারল অন্তূ, “আমার কাছে আসবেন না। আপনাদের ভালোর জন্য বলছি। চলে যান, চলে যান। কী চাই আমার কাছে? প্রাণ নেবেন? না, এখন মরব না আমি। জয় আমিরের সাথে দেখা করা দরকার আমার। সে কোথায়? আসেনি? সে কি বেঁচে আছে? মরলে তার নিস্তার নেই। হাশরে একদম চেপে ধরব। কী পেয়েছে আমাকে? যা ইচ্ছে তাই না?ʼʼ

অন্তূর মনে পড়ল সে এখন আমির নিবাসে। এখানেই তার সাথে একটা চমৎকার ব্যাপার ঘটে গেছে। কিন্তু ভেতরের এই ব্যথাটা সহ্য করা যাচ্ছে না। নার্সদেরকে আগেই বিদায় করা যাবে না। একটা উপকার নার্সরা তার করতে পারে।

-“ঘুমের ওষুধ আছে? আছে, আছে? থাকলে দিন। তাহলে চিকিৎসা করতে দেব। সত্যি দেব। এনেছেন সাথে? আমি ঘুমাবো। ততক্ষণে যেন জয় আমির চলে আসে কেমন?ʼʼ

অন্তূর পরিকল্পনা হলো ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওষুধ নিয়ে তারপর কাছে আসলে আক্রমণ করে তাড়িয়ে দেয়া। তার তো চিকিৎসার দরকার নেই। সে কিছুক্ষণ উন্মাদের মতোন দলা পাকানো ভ্রুণের দিকে তাকিয়ে থাকল। জোরে হাসল কয়েকবার। তার খুবই আনন্দ লাগছে। অবশেষে সে পুরোপুরি নিঃস্ব হতে পেরেছে। এটাই তো উচিত। যার কাছে প্রায় কিছুই নেই, তার সামান্য কিছুও থাকা উচিত নয়। থাকবে না মানে কিছুই থাকবে না। কিন্তু সে তারপরেই যে স্বরে কেঁদে ফেলল চেহারা ভেঙে, তা সহ্য করা দায়। সেই কান্নার সুর ও মুখের কাঁকুতি অপার্থিব লাগে কেমন!

জননদ্বার মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ, হাত কাঁপে, চোখ জাপসা হয় দেখলে। কী বিভৎস! নার্সদের নারীমন অস্থির হয়। জোরপূর্বক ধরে ড্রেসিং করা হলো। গলগল করে রক্ত আসছে। এই মুহুর্তে ভালো চিকিৎসার দরকার। কীভাবে বেঁচে থাকবে এই মেয়ে, আছেই বা কী করে, কী সহ্য করে এমন নির্লিপ্ত উন্মাদের মতো আচরণ করছে মেয়েটা? এত সুন্দর দেখতে, তার কণ্ঠস্বর কী মধুর লাগে শুনতে, তার সঙ্গে এসব কী ঘটছে?

নার্স দুজন একটা রিস্কি কাজ করেছে। অন্তূর জন্য স্বাস্থ্যপযোগী খাবার তৈরি করে এনেছে। কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ নিজেরা কিনে এনেছে। হামজা তাদেরকে পাঠিয়েছে কেবল বাঁচিয়ে রাখার জন্য। অন্তূকে ধরে জোর করে সামান্য খাবার খাওয়ার পর গলগল করে বমি করে ফেলল। বমির সাথে পিত্তি উঠে এলো, আঠালো মিউকাস এলো। বমির চাপে নিম্নদেশে টান পড়ায় কেমন অমানুষিক আর্তনাদ করে অন্তূ। শোনা যায় না সেসব। বুকের মাঝখানটায় আঙুল চেপে ধরে পাগলের মতো শ্বাস ফেলে, কয়েকটা ঘুষিও মারল বুকের ওপর। বোধহয় হুমকি দিলো, আর ব্যথা পাবি না। খবরদার। আমার সহ্য ক্ষমতার অনেক উপর দিয়ে যাচ্ছে তোর তাণ্ডব।

আবারও ধরে কিছুটা গরম দুধ, ও স্যুপ খাইয়ে ওষুধ খাওয়ানো হলো। সেফট্রিয়াক্সোন, ডাইক্লোফেনাক, এবং অবশেষে ক্লোজিপাম দেয়া হলো। অন্তূ হামাগুড়ির মতো এগিয়ে গিয়ে তার বাচ্চার সামনে বসে। থুতনি ভেঙে হু হু করে কেঁদে ওঠে। এত অবহেলিত? কেমন ধুলোয় জড়ানো মেঝেতে পড়ে আছে, যে মেঝে তার অধিকার। অন্তূ চাতকের মতোন হাত বাড়ায়, অথচ সাহস হয় না ছোঁয়ার। থরথর করে কাঁপছে হাত। সে পেছায় কয়েক কদম। সে শুনতে পায় তাকে ডাকছে।

‘মা’ম্মা’ মা’ মা’ ‘আম্মা’…অন্তূর বুকের ওঠানামা অনিয়ন্ত্রিত হারে বাড়ল। নার্স দটো ভয় পেয়ে দ্রুত প্রেশার মাপে অন্তূর। দমদম করে বাড়ছে তা। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক।

তাকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলো, ভ্রুণে হাত দিতে গেলে ক্ষুব্ধ বাঘিনীর মতো আক্রমণ করে উঠল অন্তূ, “খবরদার ছুঁলে জান নিয়ে নেব। ওর বাপ এখনও দেখেনি ওকে, ছোঁয়নি ওকে। না না না, খবরদার না। আমাকে ডাকছে ও। ওর কাছে যাওয়া আমার দরকার। আমাকে কবে মারা হবে?ʼʼ

খানিক পর অন্তূ নিস্তেজ মতো কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল রক্তপিণ্ডের দিকে। চোখের পানি মেঝের ধুলোয় মিশে কাদা হয়ে উঠল। অন্তূ নির্বিকার। চোখে দৃষ্টি নেই, কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। অন্তূ দেখতেই থাকে তার নাড়িছেঁড়া ধনকে। লাল টকটকে, থকথকে এক দলা।


গুলি খাওয়ার পাঁচদিন পর ছয়দিনের রাতে মনে হলো তার পিঠ বোধহয় অর্ধেক ক্ষয় হয়ে গেছে, কারণ বিগত কয়েক বছর যাবৎ সে শুয়ে আছে এই বেডে। এখন তার ওঠা দরকার। সে উঠতে গেলে নার্স তাড়া দিলো,

-“না না, উঠবেন না। শুয়ে থাকতে হবে আপনাকে। প্লিজ উঠবেন না।ʼʼ

-“সর শালি। দূরে যা, হাওয়া আসতে দে। কইবরা! তোল আমারে। সুস্থ-সবল মাইনষেরে পঙ্গু বানাইতে সমিতি খুলে রাখছে এইখানে। তোল।ʼʼ

কবীর ওকে তুলে হেলান দিয়ে বসালো।

-“সিগারেট দে।ʼʼ

ছেলেদের খুশি কে দেখে? বাইরে পুলিশ বসা, সেটা বড় কথা নয়। ওরা থেকে থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছে। পাশের ওয়ার্ড ও কক্ষের রোগীর লোকজন ভয়ে ভয়ে এসে নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে তারা রাস্তা ভুল করে হাসপাতাল ভেবে কোনো রাজনৈতিক সম্মেলন অফিসে ঢুকে পড়েছে কিনা।

জয়ের সিগারেট জ্বালিয়ে দেয়া হলো। একহাত আর্ম স্লিংয়ে ঝুলছে, সে বসে যে উরুতে গুলি লেগেছে, সেই পা দুলাচ্ছে আর সিগারেট টানছে। এটা মূলত একটা এক্সপেরিমেন্ট। প্রথমত পা দুলানোর ফলে পায়ে ব্যথা সয়ে যাবে, দ্বিতীয়ত বোঝা যাবে কতটা ব্যথা এখনও রয়েছে, চলাফেলা কতটুকু করা যাবে।
ছয়দিনে মানুষ কথা বলতে পারে না ঠিকমতো। চারদিন আগেও লোকটা রক্তশূণ্যতায় কোমায় যাবার পথে। নার্স রাগে গজগজ করতে করতে ডাক্তার ডাকতে গেল। কবীর জয়কে ভুলেও খুশির সংবাদটা দিলো না। এই মুহুর্তে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটবে। সে নিজেও যায় না, সে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার, আলোর ব্যবস্থা করে দিয়ে এসেছে।

সে শুধু সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিটা বলল জয়কে। জয় সুস্থ হলে সে একবারে নিয়ে যাবে ওখানে জয়কে। জয় দুজন পুলিশকে ডেকে নিয়ে দাঁত বের করে হেসে সালাম দিলো। ব্যথায় শরীর ভেঙে আসার জো, এসব তার জন্য নতুন না। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণ কয়েকটা মরফিন বা হিরোইন গিলে একচোট ঘুম দিলে ব্যথা গায়েব।

সিনিয়র নার্সকে ডেকে নিয়ে বলল, “দু-চারটে মাল-মশলা দেন। এসব ব্যতা-বেদনা এক যুগ ধরে শুয়ে থেকে মোকাবেলা করার অভ্যাস আমার নাই। আসলে আমি ক্রিমিনাল তো। দ্রুত সুস্থ হয়ে আইনের হাতে নিজেকে সোপর্দ করতে হবে। ঠিক না, দুলাভাই? একশটিরিমলি সরি—স্যার।ʼʼ

নার্স বলল, “ওগুলো নিষিদ্ধ, অবৈধ। এ অবস্থায় আমরা আপনাকে ওগুলো সেবন করতে দিতে পারি না। আপনার চিকিৎসা চলছে, খুব শীঘ্রই রিকোভার করবেন বলে আশা করা যায়! ওসবের প্রয়োজন হবে না।ʼʼ

-“কী কয় শালীর মেয়ে? নীতিকথা আমার শরীরের চারপাশে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত জায়গার মধ্যে আসে না, কারণ নীতিকথা হলো জীবাণু, আর আমি ডেটল সাবান গিয়ে গোসল করি। কবীর, সিস্টারকে একটু সাঁতার শিখিয়ে আন তো।ʼʼ

পুলিশ দুজনকে পাশে বসিয়ে হেসে বলল, “আপনারা কি দিনাজপুরের স্থানীয়?ʼʼ

-“হু।ʼʼ

-“আগে দেখিনি। নতুন বদলী হয়েছেন নাকি?ʼʼ

-“হ্যাঁ, মাসখানেকের মতো।ʼʼ

-“শালা সরকারী চাকরি খুব খারাপ। কিন্তু আপনারা ভাগ্যবান পুরুষ। নিজের জেলায় বদলি হওয়া কম কথা না। আমাদের এরিয়াতেই নাকি?ʼʼ

সে হাসতে হাসতে চা-নাশতা করিয়ে পুলিশদের জন্ম-মৃত্যুর তথ্য এক কোরে ফেলল। কবীর কাগজে মুড়ে বেশ কিছুটা হিরোইন গুড়ো ও কয়েকটা মরফিন ক্যাপসুল নিয়ে এসেছিল। তাপ দেবার ব্যবস্থা নেই সুতরাং ধোঁয়া হিসেবে ব্যবহার করা গেল না, এছাড়া এখন নেশা করা নয়, ব্যথা কমানো জরুরী। পানিতে মিশিয়ে ইঞ্জেক্ট করল, কিছুটা নাকে টেনে নিলো, এরপর মরফিন ক্যাপসুল জিহ্বার নিচে নিয়ে শুয়ে রইল। এবার নিশ্চিন্ত লাগছে। সাধারণ ওষুধে তার পোষায় না।


মাঝে চারটা দিন হামজার শরীর আচমকাই যেন একেবারে শিথিল হয়ে উঠেছিল। দুটো ডাক্তার তার পেছনে চারটাদিন খুব খেটেছে। এর ফলে তার যে সমস্যা হলো, সে জয়কে দেখতে যেতে পারেনি, আর আরমিণের কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি। এর মাঝে থানা থেকে বেশ কয়েকবার লোক এসেছে তার সঙ্গে দেখা করবার জন্য। এখনও যেটুকু ক্ষমতা বাকি আছে তা দিয়ে ভাগানো হয়েছে।

এর মাঝে সে একটা সিদ্ধান্ত পাল্টেছে। সে আরমিণকে দেবে না এমপির কাছে। আরমিণের করা ক্ষতির পরিমাণ অনেক। সুতরাং শাস্তি পুরো হয়নি। এত দ্রুত ওরকম পর্যায়ের ভয়াবহ মহিলাকে ছেড়ে দিলে হামজার ইমেজ নষ্ট হবে। সে আরমিণকে বহুদিন ধরে নিজের কাছে বন্দিনী করে রাখবে, রোজ খুন করবে একটু কোরে। এই দুনিয়া সে খবর জানবে না। জয়কে হাসপাতালে থাকতে হবে এখনও বেশ কিছুদিন। ততদিনে সে সব ব্যবস্থা করবে।

পরদিন সে প্রথমত এমপিকে কল করে বলল, ‘মামা, আসছি আমি। কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তার ওপর জয়ের এই অবস্থা, আবার যতকিছু ঘটল। একটা আলোচনা দরকার। জয়ের বউ যা করেছে, তা আমি মেনেই নিতে পারছি না। আপনি ভালো মানুষ জন্য ধৈর্য ধরছেন। সেই মেয়েলোকের সাথে কী করা হবে তারই আলোচনা করব আজ।ʼ

এমপি যে কী খুশি হলেন! নিজের প্রাইভেট সময়েই ডেকে নিলেন হামজাকে। সে গেল রাত একটায়। এমপি তখন নিজের বিনোদন ফ্ল্যাটে বিনোদনে রাত কাটাতে যান। নতুন নতুন দুটো মেয়ে থাকে সেবা দেবার জন্য আর মদের যথেষ্ট পরিমাণ মদের বোতল। স্বর্গীয় অনুভূতি!

হামজা মেয়েদুটোকে বলল, ‘তোমরা একটু রুমে যাও।ʼ ওরা এমপিকে ড্রয়িং রুমে রেখে রুমে গেল। হামজা গিয়ে বাইরে থেকে রুমের দরজা আঁটকে দিয়ে এলো। বিষয়টা বোঝার খুব একটা সময় এমপি পেলেন না। হামজা সময় নষ্ট করল না। সেটা ঝুঁকিপূর্ণ। একজন এমপির ব্যাপার-স্যাপার।

সে এমপিকে এসিড পান করালো। সালফিউরিক এসিড। বড়ঘরে লোহা ইলেক্ট্রোপ্লেটিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয় এ পদার্থ। এমপি সাহেবের ঠোঁটে কিছুটা ঢেলে পড়ার সাথে সাথে ঠোঁটদুটো ফুরিয়ে গেল। মাংসের দলা হয়ে পরে আবার সেটুকুও ক্ষয় হয়ে গেল। ঠোঁট ও মুখে মাংস নেই, হাড় বেরিয়ে গেল, তখনও এমপি হামজার পা দুটো জড়িয়ে ধরে আছেন। মুখ নেই জন্য আর্তনাদ করে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ নেই।

হামজা তাকে বলল, “মামা আমি আপনার মুখটা ঝলসালাম একটাই কারণে—এই মুখ দিয়েই আপনি জয়কে গুলি করার অর্ডার দিয়েছিলেন। একটাবার তো ভাবতেন জয়ের পেছনে হামজা দাঁড়িয়ে আছে। জয় তো একা না, মামা। ওর গায়ের রক্ত ঝরানো মানে আমার বুকে লাত্থি মারা। তাই আমি আপনার পা দুটোও কেটে নেব।ʼʼ

হামজা কেটে নিলো। অবশ্য আটকে রইল হাড়ের সাথে। তাতে সে এসিড ঢালল। ধোঁয়া উঠে গলে এড়িয়ে গেল শরীরের অঙ্গ। শেষে একটা ছোরা শুধু কণ্ঠনালির মাঝ বরাবর গেঁথে দিলো। অর্ধেকটার মতো এসিড তখনও বাকি। এটুকু ফিরিয়ে নিয়ে যাবার মানে নেই। এমপির পুরো শরীরে ফুল ছিটানোর মতো কোরে ছিটিয়ে ঢেলে দিলো সেটুকু। ব্যাস, একটা সুন্দর এমপি কাবাব তৈরি হয়ে গেল। মাংস ঝলসানোর বিশ্রী গন্ধে রুমটা ভরে উঠল।

কিন্তু হামজা কোনোকিছু হাতে ধরে রাখতে চাইলে তাকে এখন অতিরিক্ত জোর প্রয়োগ করতে হয়, স্বাভাবিক শক্তিতে হাত শিথিল, বস্তু থাকে না। এসিডের রেজিস্ট্যান্ট গ্লাস বোতলটি পড়ে গিয়ে চুরমার হয়ে গেল। তা তোলা হামজার পক্ষে সম্ভব নয়। তার হাত কাঁপে, স্নায়ু নিয়ন্ত্রণহীন প্রায়।

মেয়ে দুটোকে সে সঙ্গে নিয়ে এলো, বলল, ‘তার কাছে থাকলে প্রতি রাতের জন্য লাখ টাকা পেতে পারে তারা। কারণ সে নারীকে খুবই সম্মান করে। কমদামে সে কিনবে না তাদের।ʼ

তবে এটা মিথ্যা কথা। হামজা ওদেরকে বড়ঘরে চুল্লির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করবে। কোনোরকম ঝুঁকি রাখা যাবে না। একমাত্র সাক্ষী ওরা। বাকি প্রমাণ সে নষ্ট করে এসেছে যথাসাধ্য।


এ ঘটনার পরদিন যখন গোটা অঞ্চল তোলপাড় এমপির এমন মৃত্যুতে, হামজা তখন এমপির বাড়ির সোফায় মুখটা শুকনো করে বসে বিলাপ করছে। রাত দশটা বাজে। লাশ দেখার মতো অবস্থায় নেই।

জয় খবর শুনে হাসল সামান্য। বড়সাহেব ভয়াবহ কাজটা করে ফেলেছে। ব্যাপার না, সে এখান থেকে সটকে পড়ে একেবারে সামনে গিয়েই দাঁড়াবে। অনেকগুলো দিন হামজার ডাক শোনা হয়নি। সে পুলিশ দূটোকে ডেকে বলল, “আপনারা এখন মোট কয়জন আছেন?ʼʼ

-“ছয়জন। আর আশপাশে কিছু মোতায়েন আছে অবশ্যই। কেন জিজ্ঞেস করছো?ʼʼ

-“বসুন। আরামে আলাপ করি।ʼʼ

সে তাদেরকে বলল, “আপনাদের কাছ থেকে গত পরশু আমি আপনাদের ঠিকানা-পরিচয় জানলাম না? তারপর আমার ছেলেরা খোঁজ করে আপনাদের বাড়িতে পৌঁছে গেছে। কী বিচ্ছু ভাবুন। আসলে ওরা গেছে আপনাদের বাড়ির অবস্থা দেখতে। যদি ধরুন কোনো কমতি বা অভাব থাকে সেটা আপনারা চাইলে পূরণ করে দেয়া হবে মামা দিয়ে। ওহ্ মামা মানে হলো টাকা। আমার ভাষা এটা।ʼʼ

পুলিশেরা অবাক। টাকা মানে মামা? কিন্তু তারা জানে না জয়ের এরকম আরও কিছু নিজস্ব ভাষা রয়েছে। থানা হলো শ্বশুরবাড়ি। কর্মকর্তারা তার শালা-সম্বন্ধি, কেউ দুলাভাইও। তার ভাষায় স্যান্ডেল হলো চশমা। মেয়েদের কামিজ হলো পাঞ্জাবী। এরকম বহুতকিছু।

সে বলল, “আর যদি ধরেন এটাতে রাজী না হন, তাহলে আপনাদের বাড়ির জনসংখ্যা কমানোর ফলে বাংলাদেশের পরবর্তী আদমশুমারিতে একটা অবদান রাখা হবে। আর যদি না চান বাংলাদেশের এই উপকার করতে, তাহলে আমি আজ রাতে কাল্টি খাব এখান থেকে, আপনারা পেছনে থাকবেন। চাইলে বাকিদের সাথে আলাপ করে নিতে পারেন।ʼʼ
শরীর তার অনুভূতিহীন প্রায়, খোঁচা মারলেও ব্যথা লাগছে না, চোখের পাতা তখনও কিছু ভারী। শরীরে দুটো দিন ভালো পরিমাণ ড্রাগ গেছে। রাত একটা বাজল। উঠে লুঙ্গি পাল্টে নিলো। গলার চেইন, হাতের রিস্টলেট, বালা, ঘড়ি, ব্ল্যাক টাংস্টেনের কালো আংটিখানা—সব খুলে নেয়া হয়েছিল, সেসব পরল।

তার নাকি পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা উঠল, টাকা খাওয়া দুটো নার্স ও ওয়ার্ডবয় এসে তাড়াহুড়ো লাগিয়ে দিলো এখনই একবার ব্যান্ডেজ খুলে দেখতে হবে, এক্সরে করতে হবে। হাসপাতালের সরকারী এক্স-রে নিম্নমানের। বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিতে হবে উন্নতমানের এক্স-রে করাতে। জয় সেই পুলিশদুটোকে সঙ্গে নিলো। তারা পাহারা দেবে যাতে জয় ভেগে না যেতে পারে। বাকিরা তখন ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে। যে লোক ব্যথায় আধমরা, এক্স-রে করতে যাচ্ছে, হাটার ক্ষমতা নেই সে কোথায় পালাবে? পালানোর উপায়ও নেই, চিকিৎসাও দরকার। তাছাড়া
রাত আসে ঘুমানোর জন্য, জয়ের মতো ক্রিমিনালকে পাহারা দিতে হবে তা ঘুম বোঝে না।

ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পেছনে জিপ অপেক্ষা করছিল, ছিনতাই করা জিপ। পুলিশদুটো জয়কে তুলে দিলো জিপে। জয় ছেলেদেরকে বলল, “পরিবারগুলোকে ছেড়ে দে, ওদের দুটোর জন্য ভালো একজন গোরখোদক দেখে কবর খুড়িস।ʼʼ

কবীর অবাক হয়ে ডাকে, “ভাই!ʼʼ

জয় অন্তূর সেই রক্তমাখা ওড়নাটা মুখ পেচাতে পেচাতে বলল, “ওরা দেশের শত্রু, কবীর। আমার টাকা আছে বলে আমার মতো ক্রিমিনাল পার পেয়ে যাবে, আরেকজনের না থাকলে সে মারা খাবে, এটা তো হলো না! তাছাড়া আমার কাছে ওদের স্যাটা ভরানোর মতোন এখন টাকা নাই। তো কী হলো? বেইমান কমলো দুটো আর আমার টাকাও অপচয় হলো না। অপচয়কারী শয়তানের ভাই কবীর। শয়তান আমার সম্বন্ধি।ʼʼ

কবীরের পিঠ চাপড়ে বলল, “যেখানেই থাকিস, সাবধানে থাকিস, চট্রগ্রামের পাহাড়ে-টাহারে ঘুরে আয় কিছু দিন। আবার দেখা হবে। জয় বাংলা।ʼʼ

কবীর জয়ের হাতে চাবি ধরিয়ে দিয়ে কেমন আপ্লুত কণ্ঠে বলে, “জয় বাংলা, ভাই! আপনার সুখের দিন সামনে। সত্যি বলতেছি। যান না যান, আমার কথা মিলিয়ে নিয়েন। এখন কিছু বলব না। ভাবীরে আমার সালাম জানাইয়েন।ʼʼ

কবীর আস্তে কোরে ছেড়ে দেয় জয়ের হাতটা। যতক্ষণ জয়ের জিপখানা দেখা গেল, কবীর দাঁড়িয়ে রইল। তার চিন্তা হলো জয় এখনও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে, একহাত আর্ম স্লিংয়ে বাঁধানো। এই সময় তাকে জয়ের প্রয়োজন, কিন্তু জয় কবীরের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে না। তাদেরকে এখন যার যার মতো লুকাতে হবে কিছুদিন।

রাত শেষের দিকে। জয়ের বুক কাঁপে বাড়ির সীমানায় পা রেখে। অন্তূ বাচ্চাদের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে কী জবাব দেবে সে? কিন্তু অনুশোচনা মুখে রাখলে তো তার চলে না! সে গলা ফেঁড়ে ডাকতে ডাকতে তালা খুলল, “আরমেইণ! আরমেইণ!ʼʼ

অন্তূ তড়িঘড়ি উঠে বসে। এসেছে জয় আমির সত্যিই? এই নয়দিনে সে অসংখ্যবার আব্বু ও জয় আমিরের ডাক শুনেছে, দেখেছে পালাক্রমে দুজন এসে তার শিয়রে বসে, সেসব ছিল ধোঁকা। কিন্তু এবার শব্দ করে খুলে গেল শাল কাঠের কপাটদুটো।

পুরো হলরুমে সাতটা মোমবাতি জ্বলছে। হলদে আলো। আরমিণ পড়ে আছে মেঝের ওপর। পরনে একাখান ওড়না মাত্র। সারা মেঝেতে রক্ত, অন্তূ শুয়ে আছে শুকনো রক্তের ওপর। জয়ের হাত ও হাঁটু জুড়ে শিরশির করে একটা কাঁপুনি নিচে নেমে গেল। তারপর বুক থরথর করে উঠে নিঃশ্বাসের গতি বাড়ল, একসময় তা প্রচণ্ড হলে আটকে এলো। কেবল অস্ফূট স্বরে ডাকে সে, “আরমেণ!ʼʼ

-“জয় আমির! জয়?ʼʼ

ঢোক গিলতে পারলেও জয় পা চালাতে পারে না। ওটা কী পড়ে আছে আরমিণের পায়ের দিকে? জয়ের মাথাটা চিড়ে উঠল, ওটা কি করাত? জয়ের মস্তিষ্ককে দুইভাগ করে ফেলল চিড়ে? বুকের ভেতরে কী হচ্ছে? ওটা কী পড়ে আছে? এই রক্ত কীসের? আরমিণের কী হয়েছে?

জয় থরথর করে কাঁপা খোঁড়া হাঁটু টেনে নিয়ে গিয়ে আরমিণের সামনে ছেড়ে দেয়। ধপ করে মেঝেতে বসে। বসতে দেরি হলো, অন্তূর দেহটা এসে পাগল স্রোত-তরঙ্গের মতো তার বুকের ওপর আছড়ে পড়তে সময় নিলো না। জয় একটু দুলে ওঠে। চোখটা শক্ত করে চেপে বুজে নেয়। আরমিণ হেরে গেল আজ। জয় আমির বলেছিল এই জনমেই আরমিণ তাকে ভালোবাসবে। ব্যাস, হেরে গেছে চ্যালেঞ্জে আরমিণ। এই যে আছড়ে পড়া, শার্টটা খামচে ধরে হুহু করে কেঁদে ফেলা, জয়ের বুকের ভেতর ঢুকে যেতে চাইবার যে উন্মাদ প্রচেষ্টা, কান্নার তরে জয়ের শরীরটাও অন্তূর সাথে সমান হারে দুলে ওঠা, বুকের ভিজে ওঠা পশম—জয়ের কি এই সংক্ষিপ্ত জীবনে আর কিছু পাবার আছে? না, এই তো প্রাপ্তির খাতা পূর্ণ আজ!

অন্তূর কান্না ধীরে ধীরে চিৎকারে রূপ নিলো। সরু আর্তনাদে শিউরে উঠল আমির নিবাসের ভীত। জয়ের বা ভেতরে কী হলো! সে একটানে অন্তূর গায়ে আলতো কোরে জড়ানো ওড়নাটা একটানে খুলে ফেলল। সম্পূর্ণ অনাবৃত অন্তূ। জয় অন্তূর যোনীদ্বারে হাত ছুঁয়ে চুইয়ে আসা রক্ত হাতে মাখে। চলন্ত কোনো ইঞ্জিনের মতোন থরথর করে কাঁপে জয়ের হাত। রক্ত থেকে দূর্গন্ধ আসছে। জয় প্রাণভরে সেই গন্ধ টেনে নেয় ভেতরে। তার দম পড়ে না। কিন্তু সেই দুর্গন্ধযুক্ত রক্তের ওপর টুপ করে দুই ফোঁটা জল পড়ে গুলিয়ে যায় রক্তের সাথে। জয় কাঁদে না। সে কাঁদতে পারে না। এখনও কাঁদছে না, মাড়ির দাঁত আটকানো, শক্ত চোয়াল দেখে বোঝা যায়। কিন্তু চোখে পানি কেন?

সে একদৃষ্টে সেই রক্ত দেখে আর বলে, “আমা..র র..রক্ত! আরমেইণ! আ..মার র…ক্ত, হ্যাঁ? আমিরদের রক্ত এটা?ʼʼ

আরও তিনফোটা পানি হাতের রক্তের প্রলেপে পড়ে রক্তের ঘনত্ব কমিয়ে আনে। জয় ডাকে, “এই, এইহ্! এ..টা ক..কী?ʼʼ

অন্তূ শুধু কাঁদে। জয়ের গোটা দেহ মৃগী রোগীর মতো কেঁপে কেঁপে ওঠে। জয় মেঝেতে পড়ে থাকা চাপড়া ধরা রক্ত তুলে হাতে মাখে, পাগলের মতো গায়ে মাখে। এই রক্ত তার, আরমিণের গর্ভে স্থান পাবার পর আবার পরিত্যক্ত নাপাক রক্ত তার!

সে হাঁ করে বিশাল বড় বড় শ্বাস ফেলে। তার দম ফুরিয়ে আসে। সে ভ্রুণের টুকরো তুলে হাতের তালুতে নেয়। নাহ্ সে বাপ হিসেবে কোলে নিতে পারবে না এটাকে, ততবড় হতেই দেয়া হয়নি! গর্ভ ছিঁড়ে বের করে এনে এই নোংরা মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। এত কেন অবহেলিত তার রক্তরা আগে পরেই? একটুও কদর পেল না আমিরদের রক্ত কখনও। তার নিজের রক্তও সেই ছোটবেলা থেকে রাস্তায় রাস্তায় মিশে গেছে, মানুষ পায়ে মাড়িয়ে চলে গেছে।

এই রক্তপিণ্ডের চোখ, নাক, কান কি বোঝা যাচ্ছে? এটা তার সন্তান? জয় আমিরের সন্তান এটা? সন্তান কেমন হয়? জয় তো জানে না। কবে হলো এসব? তার ঘরওয়ালি কী করে ফেলেছে তার সাথে? জয়ের তো কখনও সাহসই হয়নি এই আসমানসম আকাঙ্ক্ষাটুকু প্রকাশ করার! সেও কি সন্তানের বাপ হতে পারে? আরমিণের গর্ভে তার রক্ত স্থান পেতে পারে? শালির মেয়ে বলেছিল এ জন্মে ভালোবাসবে না। ভালোবাসা কী? এই তো! আরমিণের ভেতরে সে স্থান পেয়েছে! এটা ছাড়া আর কী চাই জয় আমিরের?

কিন্তু এভাবে তাকে গর্ভছাড়া কে করেছে? জয়ের চোখ অন্ধকার লাগে। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। শরীর ঘেমে শার্ট ভিজে উঠেছে। সে কেমন অন্ধের মতো হাতরে বুকে টেনে নেয় অন্তূকে। বুকের সাথে এত জোরে চেপে ধরল যেন যতক্ষণ আরমিণ তার কলিজা ফুঁড়ে ভেতরে না ঢুকবে সে কিছুতেই এই আরমিণকে বুক থেকে আলগা হতে দেবে না।

-“আমি বলেছিলাম না আপনাকে? আমার রবের লাঠি আওয়াজহীন হয়। তিনি বিচার করলে এই জগতের কোনো শক্তি তা এড়াতে পারে না! আমি বলেছিলাম আপনাকে, তিনি মহাবিচারক। তার বিচারে একটুও না-ইনসাফ থাকে না। কী করেছেন আপনি? মেরে ফেলেছেন বাচ্চাগুলোকে?ʼʼ

আরমিণকে চুপ করানো দরকার। জয়ের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমির নিবাসের ছাদ উপেক্ষা করে একুশটা বছর পর সে সৃষ্টিকর্তার তরে আকাশের পানে তাকায়। কেউ আছেন ওখানে? সত্যিই আছেন নাকি? কে আছেন? তিনি ডাক শোনেন? তিনি বিচারও করেন? কেমন বিচার করেন সেই সত্ত্বা।

-“মহা বিচারক তিনি। কিন্তু আজ কি তার বিচারে একটু ভুল হয়নি, জয় আমির? কিন্তু তিনি তো ভুল করেন না! ভুলের ঊর্ধ্বে। তবু আজ একটা গড়মিল কেন হলো, বলুন না? বলুন বলুন, আমাকে বলুন। আমি আপনার স্ত্রী বলে? যাকে কখনও স্বামী হিসেবে মনকে মানাতেই পারলাম না, সেই পুরুষের স্ত্রী হওয়ার মাশুল কেন দেব আমি? কেন দেবোওওও?ʼʼ

অন্তূ চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। জয় ঢোক গেলে দুটো। অন্তূকে একদম মিশিয়ে ধরল বুকের মাঝে। যেন ছেড়ে দিলেই হারাবে, আর তা হতে দেয়া সূর্যকে রাতে দেখার মতোই অসম্ভব জয়ের জন্য! অন্তূকে আরও একটু বাহুডোরে আঁকড়ে নিয়ে বুকের মাঝখানটায় চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “সেদিন কাজী সাহেব তোর খোদার নামের কালাম পাঠ করে তোকে আমার সাথে জুড়েছিলেন, মনে আছে? আজ আমার সবকিছুর অর্ধেকটা তোরও, আরমিণ। আমার পাপ, তাপ, অভিশাপ সবেতে তোর ভাগ লেখা হয়ে গেছে। তোর ভেতরের সবটুকু ঘেন্না শুধু আমার, আমার পাপের অর্ধেক তোর।ʼʼ

চলবে…

[ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। আজ রাত আমার মন্তব্য পড়ার রাত। ]