#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৮২.
○
মিস ক্যাথারিন খানিক আগে দম আঁটকে ফেলেছিলেন কান্নার চোটে, কেননা তিনি দেখাতে চাইছিলেন না তাঁর ভেঙেচুড়ে কান্না আসছে। মাহেজাবিণ হাসল এতে। তার একটুও কান্না পাচ্ছে না! পাবার কারণ নেই। তার সন্তান তার পাশেই আছে, তার নামের সাথেই আছে। সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সে হয়েছে মাহেজাবিণ আমির।
আমজাদ সাহেব এক আওলিয়ার গল্প বলতেন। তাঁর নাম মনসুর হল্লাজ। লোকটা পাগল ছিল–এমনটা লোকে বলতো। তিনি নাকি ছিলেন মূলত আল্লাহর পাগল। ঘর, সংসার, দুনিয়াবী আয়েশ সব ছেড়ে রাস্তায় বেরোলেন নিঃস্ব এক পাগল হয়ে–আল্লাহকে সম্বল করে। আর কিছু নেই তখন তার। এ অবস্থায় একদিন গাছের নিচে অবচেতন হয়ে পড়ে থাকার কালে এক আলোর দ্যুতি সামনে এসে দাঁড়াল, এক ঝলক। দ্যুতি থেকে কেবল একটি শব্দ ভেসে এলো—
-“আনাল হক!ʼʼ (নাউযুবিল্লাহ) অর্থ হলো–’আমি সত্য, আমি রব।ʼ
আলোর দ্যুতি ফুরিয়ে যেতেই মনসুর উঠে বসলেন। কোথাও নেই সেই আলোর দ্যুতি, কোথাও নেই আল্লাহর নূর। এই বিরহ সইবার মতো নয়, তখন কেবল মনসুরের কাছে রয়ে গেল আলো থেকে ছুটে আসা দুটো শব্দ–’আনাল হক।ʼ প্রেমিকের কাছ থেকে প্রমিকা হারিয়ে গেলে সচরাচর দেখা যায় প্রেমিক পাগল হয়েছে, তার কাছে আজ প্রেমিকা নেই, আছে বুকপকেটে লুকানো প্রেমিকার একখানা রঙচটা ফটো, অথবা একাখানা হাতে কাজ করা রুমাল। এই তার সম্বল, শেষ স্মৃতিচিহ্ন। মানুষ প্রেমের বিরহ সইতে প্রেমের স্মৃতিকে আপন করে।
মনসুর হল্লাজের কাছে আল্লাহর প্রেমের একমাত্র শেষ সম্বল বা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ছিল আল্লাহর নূর হতে নিসৃত বাণী— আনাল হক। তিনি সেটুকুকে মৃত্যুর পর অবধি জবানে জপেছেন। লোকে এসব জানল না। শিরকের অপরাধে তাকে বন্দি করা হলো। শূলে চড়িয়ে পাঁচখণ্ড করা হলো, খণ্ডগুলো জ্বালিয়ে ভষ্ম করা হলো, তবু সেই ছাইয়ের ভেতর থেকে ধ্বনি আসে–’আনাল হক।ʼ
অন্তূর গর্ভে বাচ্চা এসেছিল, অন্তূ জানতে পারেনি। জয় আমির এক দানব পুরুষ। তার সেসবের হিসেব থাকেনি —টগবগে নারী পুরুষ আরেকটি প্রাণের উদ্ভাবক হতে পারে খুব সহজে। সে অন্তূকে কখনও জোর করে কাছে পেলে সকালে খুব জিতে যাবার খুশিতে পৌরুষ তেজে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু অন্তূর গর্ভ তা মানবে কেন? অন্তূ একদিন টের পেল তার ঋতুস্রাব চলছে না। সে রিমি হতে পারে না। নিজের সন্তানের খুনী অন্তূ হতে পারে না। এই সন্তান তার জীবনের শেষ অবলম্বন হতে পারে যেখানে সে বাপ, ভাই, পরিবারসহ সকল আশ্রয়হীনা। এই সন্তান জয় আমিরের সবচেয়ে বড় শাস্তি হতে পারে যখন এই সন্তানের ভাগ কেবল অন্তূর থাকবে।
কিন্তু অন্তূর সন্তানকে হারাতে হলো। কিন্তু সে মানতে পারল না। তার সন্তান পরিণত হয়েছিল না বলে নাম পায়নি, বংশের রক্ত তো পেয়েছিল! রক্তের নাম ‘আমির’। শেষ আমির। অন্তূ নিজের ‘অন্তূ’ ও ‘আরমিণকে’ ত্যাগ করে মাহেজাবিণ হবার কালে সেই ছোট্ট আমিরকে নিজের সাথে নিয়েছে; সন্তানকে মা কখনও আলাদা রাখতে পারে না। তার সন্তান নেই, সন্তানের রক্তের নামটুকু রয়ে গেছে কাছে। যতদিন অন্তূর শ্বাস চলবে, এই নাম তার নামের সাথে থাকবে।
মিস ক্যাথারিন খেয়াল করলেন, এখন গভীর রাত। এরকম অনেকগুলো সমন্বিত-নিশীথের গল্পই তিনি শুনতে শুনতে চলমান সময়কে ভুলে বসেছেন। তিনি অনেকক্ষণ পর নিজেকে সামলে শুধু জিজ্ঞেস করলেন—
-“মাহ্জাবিণ, তুমি ভালো কেন বাসলে না জয় আমিরকে?ʼʼ
মাহেজাবিণ মৃদু হাসল, ম্লান-আনমনা হাসি, “তার সন্তান গর্ভে ধারণ করেছি, তাকে আমি কতবার ভরসা করে বসেছি–এর অপরাধ কি কম লাগছে আপনার কাছে যে ভালোবাসার কথা বলছেন?ʼʼ
মাদাম কেমন করে যেন ডাকলেন, “মাহ্জাবিণ!ʼʼ
-“হু!ʼʼ
-“তার কোনো ফটো আছে? দেখতে সে কেমন বলতে পারো? কীভাবে তাকে বর্ণনা করলে আমার কাছে, আমি কেন ছটফটিয়ে যাচ্ছি এক পাপীষ্ঠ পুরুষকে দেখার জন্য?ʼʼ
মাহেজাবিণ হাসে, “চলুন দিনাজপুর। পাটোয়ারী বাড়িতে তার জন্য বরাদ্দ কামরার দেয়ালজুড়ে অনেকগুলো ফটো লাগানো ছিল। আজও আছে বোধহয়!ʼʼ
○
হাতের বাহু খসে পড়ার মতো যন্ত্রণা উঠল, রক্তও বোধহয় বেরিয়ে এলো ব্যান্ডেজের ভেতরে, উরুতে ভর সইছিল না একদম। তবু অন্তূর শরীরটা পাঁজাকোলে কোরে তুলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠে সে। একুশ বছর আগে উল্টো ঘুরে নেমে গিয়েছিল এই সিঁড়ি ভেঙে। সেদিন সে ছিল জয়নাল আমিরের কোলে, আজ তারই কোলে তার অদৃষ্টের তুলে দেয়া আমানত। গলা শুকনো খটখটে, পানি পান করতে পারলে হতো। বারবার ঢোক গিলতে চেয়েও লালা পায় না মুখ। সে সব ভুলে যাওয়া জয় আমির, তবু কোন সাহসে ভেতরটা আজ এই বাড়ির ওপর চরম অধিকারবোধ আর আকাঙ্ক্ষায় ভরে উঠছে? তার পরিচয়, তার রক্ত, ভিটেমাটি যা তাকে দুই যুগ আগে পর করেছে খুব নির্মমভাবে। এছাড়া তাকে খুব তাড়াতাড়ি এই আমানতকে সঙ্গে নিয়ে হোক অথবা ফের একেলা ফেরারি হতে হবে এসব ছেড়ে। এই টান ভালো না।
সে জাভেদ ও হুমায়িরার মাঝখানের সদস্য ছিল, তার জন্য বরাদ্দ আলাদা কক্ষ হয়েছিল না, দাদু বলতো, ‘তুই আর কিছুটা বড় হলে সম্পত্তি থেকে বহিষ্কার করব তোকে। তোর মতো শয়তান আমার সম্পত্তির ভাগ পাবে না। তাই কোনো ঘরও দেয়া হবে না তোকে।ʼ
তাহলে আজ বউ নিয়ে কোন কক্ষে উঠবে সে? তার একটা কক্ষ আছে অবশ্য, সেখানে মাস্টার সাহেব তাকে পড়াতে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন।
বিছানায় চটা চটা ধুলো, ভ্যাপসা গন্ধ, ঘন মাকড়শার জাল। আলো বলতে আধখানা মোমবাতি। অভিজাত্যে রমরমা সেগুন কাঠের আসবাবের রঙ ময়লা হয়ে গেছে। একটানে চাদরটা তুলে ফেলে দিয়ে একহাতে ওড়নাটা বিছিয়ে অন্তূকে শোয়ালো তার ওপর। তার গলার ওড়না শুকনো রক্তে শক্ত হয়ে আছে। শার্টটা খুলে অন্তূর শরীর ঢেকে দিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। জিজ্ঞেস করল না কীভাবে এসব হয়েছে। তা শোনার জন্য যে শক্তি ভেতরে প্রয়োজন তার এক আনাও নেই।
ফজরের আজান হবে খুব শিগগির। শরীরটা তো ভালো না। উরুতে রক্ত ঝরছে। আর্ম স্লিং সে জিপেই খুলে ফেলে দিয়েছে কোথায়! অন্তূর পাশে একটু জায়গা নিয়ে শুয়ে পড়ল। খোলা শরীরে বাহুর ব্যান্ডেজের নিচে জমে ওঠা রক্ত দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। শ্বাস পড়ছে হাঁপানি রোগীদের মতো। আজকের আগে জয়ের এই অস্থিরতা কেউ দেখেনি কখনও। অন্তূ উঠতে চায়।
-“উঠো না। শুয়ে থাকো।ʼʼ
অন্তূ শার্ট ছেড়ে দিয়ে ওড়নাটা টেনে তুলে শরীরে পেচিয়ে খুব কষ্টে উঠে বসে।
-“উঠতে মানা করলাম না? আমার অবাধ্য হয়ে সুখ পাও?ʼʼ
-“আর কোথায় গুলি লেগেছে?ʼʼ
-“লাগেনি। শুতে বলছি আমি।ʼʼ
-“পুলিশের গুলি খেয়েছেন?ʼʼ
জয় চোখ বুজে হাসল, “তোমার পুলিশেরাই পৌঁছে দিয়ে গেল এখানে।ʼʼ
-“খুব শক্তিধর আপনি?ʼʼ
-“না। কে বলে?ʼʼ
বিশাল লম্বা শরীর। পরনে শুধু সাদা লুঙ্গি। টানটান হয়ে শুয়ে আছে, খাটের এধার-ওধার অবধি। লুঙ্গির ওপরে রক্তের ছোপ ভেসে উঠেছে। অন্তূ আস্তে আস্তে লুঙ্গিটা উরুর কিছুটা উপরে তুলল। কালো কুচকুচে লোমে ভর্তি পা। রক্তে ব্যান্ডেজ ভিজে উঠেছে। আশ্চর্য মানুষ! এ অবস্থায় তার ভর বয়ে কীভাবে দোতলায় তুলে এনেছে ভাবার বিষয়।
চুপচাপ শুয়ে আছে, শুধু শ্বাসের উঠানামা ভয়াবহ অস্বাভাবিক, কী ভাবছে কে জানে! কিছু ভাবছে এটা নিশ্চিত।
অন্তূ ব্যান্ডেজের ওপর আঙুল চালায়। জয় সেই আঙুলগুলো আলগোছে ধরে ফেলল।
-“আমাকে নরকে পাঠিয়ে আমার সন্তান নিয়ে বাঁচতে চাওয়া এই ছলনার ব্যাখ্যা দাও। সকাল হবার আগেই।ʼʼ
অন্তূ একবার তাকায়। আবার জয়ের ক্ষত দেখে বলে, “তিনটা মাস পেটে করে ঘুরলাম আমি, আজ ঘন্টাখানেকের মাঝে ও আপনার সন্তান হয়ে গেল?ʼʼ
জয় হাসে, “তুমি কে? ওর বাপের দাসী।ʼʼ
সঙ্গে সঙ্গে অন্তূর মলিন মুখটাতেই আত্মমর্যাদার ক্ষোভ ফুটে ওঠে, মুখ শক্ত, নাক শিউরায়, ফিরিয়ে নেয় জয়ের দিকে থেকে। সেই শক্ত অবয়ব বেয়ে এক ফোটা শীতল তরল থুতনিতে ঠেকে। জয় আলতো হাসে। আজও এত আত্ম- অহংকার! এখানেই কি মরণ হয়নি জয় আমিরের?
জয় লুঙ্গির পেছনে গোজা পিস্তলটা খুলে এনে ধীরে ধীরে গুজে দেয় অন্তূর হাতের মুঠোয়, “নাও! এত পাপ করলাম তোমার কাছে। বদলা নিলে না তো? আজ মেরে দাও, দেরি কোরো না। দেরি করলে গুলি চালাতে পারবে না। শ্যুট…ʼʼ
একটুও মিথ্যা নয় আবদার। অন্তূ স্পষ্প দেখে জয় আমিরের চোখে অসহনীয় যন্ত্রণা ও মৃত্যুর পিপাসা। পিপাসার্ত কারও পিপাসা মিটিয়ে দেয়া কখনও শাস্তি হতে পারে? অন্তূ জয় আমিরকে সর্বোচ্চ শাস্তিপ্রাপ্ত অবস্থায় চোখ ভরে দেখার আকাঙ্ক্ষা রাখে।
-“সারেন্ডার করবেন আপনি পুলিশের কাছে।ʼʼ
-“নাহ্!ʼʼ ঢোক গিলে মাথা নাড়ে জয়, “আইন না। বেআইনের পূজারী আমি। আইনে বন্দি করতে তুমি পারবে না, ঘরওয়ালি। মেরে দাও! নাহলে সঙ্গে চলো, কসম নয়ত আমি মেরে দেব তোমায়।ʼʼ
-“আমি কোত্থাও যাচ্ছি না।ʼʼ
অন্তূর নিষ্ঠুর জবাবেও কীসের এক সুপ্ত উৎসাহ হই হই করে ওঠে জয়ের কণ্ঠে, “তো কী? থাকবে এখানে? ব্যবস্থা করব? মেরামত করাবো বাড়ি?ʼʼ
-“কোথায় নিয়ে যাবেন আমায়? কারাগারে?ʼʼ
জয় অন্তূকে টেনে এনে বুকের ওপর ফেলল। কিছুক্ষণ অন্তূর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “কারাগারে কে যাচ্ছে? আমির পরিবারের ছেলে কারাবন্দি হয় না। এটা জেদ করার সময় না। আমি ছাড়া গতি কী তোমার?ʼʼ
-“মিছে অহংকার।ʼʼ
-“তোমারটা সত্যি?ʼʼ
-“পাপ করতে যার ভয় নেই সে বন্দিত্বকে এত ডরায় কেন?ʼʼ
অন্তূকে জোর করে নিজের সাথে লেপ্টে ধরে রেখে বলল, “চুপ। চুপচাপ শুয়ে থাকো কিছুক্ষণ, একটু ঘুমাতে দাও। নয়ত এখানেই মরে যাব। সত্যি বলছি। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, আর এখানেও।ʼʼ বুকে ইশারা করে জয়।
দুজনের কি কাঁদা উচিত? হাউমাউ করে? জীবনের এ পর্যায়ে এসে কোথাও কি দুজন মিশে গেছে এক দিগন্তে? দুজনের অসহায়ত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যত, সম্পর্কের পরিধি, হারানো সম্পদ… আজ জয়ের চাওয়ামতো দুজন দুজনের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়ানো কাঠি। কিন্তু আর কতক্ষণ?
অন্তূর শরীর এতটাই খারাপ, সে জয়ের বুকের ওপর ঘুমিয়ে পড়ল, প্রতিবাদ অথবা প্রতিরোধের সাধ্যি ও মানসিকতা সে হারিয়েছে। নিস্তেজ মুখটা পড়ে ছিল ঠিক জয়ের বুকে থাকা রূপোলি লকেটটার ওপর। জয় অন্তূকে বিছানায় শুইয়ে অন্তূর শরীরের ওপর অর্ধেকটা শরীর তুলে ঘাঁড়ের নিচে হাত ঠেকিয়ে মুখ উচিয়ে শোয়। একটুও যেন ছোঁয়া না লাগে শরীরের সেই খেয়াল রাখল, পাছে ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু চেইনটা গিয়ে পড়ে রইল অন্তূর বুকের ওপর।
একখানা ওড়নার তলে অন্তূর নমনীয়, চোখ মাতানো সুন্দর দেহখানা। জয় বেহায়ার মতো দেখে নজর বুলিয়ে। একটু অস্বস্তি হয়। এটা আরমিণ। তাকে এভাবে দেখতে নেই। পরক্ষণেই মনে পড়ে, তার বউ। বিয়ে করা বউ। জয়ের মনে পড়ে কবুল বলার মুহুর্তটা। সে তো রবে ভরসা রাখে না, কাজী ‘আলহামদুলিল্লাহ কবুলʼ বললেও সে বলেছিল ‘কবুলʼ।
আজ আরও কিছুক্ষণ চোখ দুটো ভরে বউকে দেখে সে অস্ফূট স্বরে উচ্চারণ করে, ‘আলহামদুলিল্লাহ!ʼ
বুকের ব্যথা কীসের? তার হাত নিশপিশ করে উঠল—অন্তূকে তুলে এক্ষুনি কিছুক্ষণ বুকের সাথে মিশিয়ে রাখা দরকার। সূর্যের আলো আজ নিশীথের অন্ধকার দূর করার পর যে দিনটার আলো ফুটবে, সেই দিন কী হবে? দুজন কে কোথায় থাকবে? সময় কি থামতে পারে না? সময়ের উচিত ক্লান্ত হয়ে এখানেই থেমে যাওয়া, আর কতকাল চলবে আর গ্রাস করবে নিজের গহ্বরে অসংখ্য মুহুর্তের চাহিদাকে?
তার নিজের বলতে কেউ নেই যে তার সাথে সম্পর্কে বাঁধা। একজন এই মেয়েটা, বিয়ের সম্পর্কে বাঁধা। সঙ্গে সঙ্গে অন্তূর ঘাঁড়ের ওপর মুখ ডুবিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। শক্ত করে জড়িয়ে নিলো। উরুতে রক্ত তখনও চুইয়ে যাচ্ছে বোধহয়, তীরের ফলার মতোন সরু ব্যথা। তবু সে ঘুমিয়ে পড়ল। প্রথমবার, শেষবার, একবার সে অন্তূকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে শেষ নিশীথ প্রহরে বুকের ভেতর মরণসম হাহাকার নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
দুজনের শরীর সেদিন রক্তাক্ত, বুকে সন্তান হারানোর ক্ষত, অনিশ্চয়তায় মোড়ানো এক শেষরাত্রির প্রহর, মাঝখানের এক জীবনের বিরোধীতার প্রাচীর উপেক্ষা করে ঘুমানো দুই মানব-মানবীকে দেখল শেষরাতে উড়ে এসে বেলকনির কার্নিশে বসা দোয়েল পাখিটা। দুটো শিষ দিলো সে। তাতে কেমন ঘোর বিষণ্নতা!
—
দোলন সাহেব জানেন এমপিকে খুন হামজা করেছে। এমপির লাশ মাটি হলো ফজরের সময়। জানাজায় উপস্থিত হয়নি হামজা। এমপির ওখান থেকে মাঝরাতে বাড়ি ফিরে তার মানসিক ও শারিরীক দুই অসুস্থতাই বেড়েছে। জয় হাসপাতাল থেকে পালিয়েছে এটা সে জানল সকাল আটটায়। কিন্তু সে যে দু-দণ্ড বসে চিন্তায় মাথা খারাপ করবে যে জয় পালিয়ে সোজা আমির নিবাসে চলে গেছে নাকি– সেই সুযোগ তাকে দেয়া হলো না।
থানা পুলিশ এসে বসল, হাতে তাদের কয়েক টুকরো কাঁচ। হামজার ইচ্ছে করল নিজেকে টেনে ছিঁড়ে দুই টুকরো করতে। তার শরীরের পক্ষাঘাতগ্রস্থ অবস্থা এতটা মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে—সেদিন হাত অবশ হয়ে আসায় এসিডের বোতল ভেঙে পড়ে ছিল ভিক্টিম বডির পাশে। সেটা অপসারণ করার সময় হামজা পায়নি, পেলেও তার প্রায় প্যারালাইজড হাতের পেশী সঙ্গ দিতো না। কাঁচ খুটে তুলতে সূক্ষ্ণ স্নায়ু উদ্দীপনার প্রয়োজন পড়ে।
পুলিশ জিজ্ঞেস করল, “কাচের টুকরোগুলো চিনতে পারছেন?ʼʼ
-“কাচের টুকরোর বিশেষত্ব কী যে তা চেনা থাকা উচিত আমার?ʼʼ
-“বিশেষত্ব আছে বলেই তা আমাদের হাতে বয়ে আপনার বাড়ি অবধি এসেছে, মেয়র সাহেব।ʼʼ
-“বাহ্, কথার আকার-আকৃতি মজবুত লাগছে দেখি।ʼʼ
-“এই ক’দিনে যা মারপ্যাচ আপনি ও জয় আমির মেরেছেন, তা আমাদের মুখের শক্তি বাড়িয়েছে বৈকি।ʼʼ
হামজা গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার অস্থিরতা বাইরে এসে যাওয়ার উপক্রম। প্রেশার বাড়ছে, খুব বাড়া বাড়ছে। হামজার মনে হচ্ছে চারপাশে চারটে চিনের মহাপ্রাচীর, তার পিঠ ঠেকে গেছে।
-“আপনার বাড়ি সার্চ করতে চাই।ʼʼ
-“ওয়ারেন্ট আনেননি।ʼʼ
-“ঠিকাছে, খুব বেশি সময় হয়নি যে এমপি সাহেবের মরার। এত তাড়াতাড়ি ওয়ারেন্ট আনা যায় নাকি? তবে আনা যেতে যতক্ষণ, ততক্ষণ সময় আপনি পেলেন ধরুন।ʼʼ
হামজা গেড়ে বসে রইল। মার্ডারটা এমপির। হামজার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এখানে। সে বুঝল, ওই কাচের টুকরোর কোনো এক টুকরোতে নিশ্চিত তার ওয়ার্কশপ-গোডাউনের লেভেল লাগানো আছে। আঠার ফলে কাচের ওই টুকরোটুকু অক্ষতভাবে ভেঙেছে। রউফ কায়সারের হাতে পড়লে এক মুহুর্তে বের করে আনবে সব। বড়ঘর সার্চ করা হবে। ঠেকানোর উপায় নেই।
তাকে নজরে রাখা হবে অবশ্যই, তার সীমানা থেকে একটা ছেলেও এদিক-সেদিন বেরোলে তার পিছু নেবে পুলিশ। অনুসরণ করে পৌঁছে যাবে আমির নিবাসে, জিতে যাবে আরমিণ, সে ফুরিয়ে যাবে এক মুহুর্তে। তাহলে এবার কী হবে? জয় ফেরারি আসামি, গতরাত থেকে মিসিং। এতক্ষণে ক্রস ফায়ারের হুকুম জারি হয়নি কি?
হামজার অবস্থা দুপুর হতে হতে এত খারাপ হলো, ডাক্তার বাড়িতে এনে বাড়িতেই হার্ট-মনিটরিংসহ গোটা শরীর অবজারভেশনে রাখা হলো। ডাক্তার জানালেন, “পুরোপুরি প্যারালাইজেশনে যেতে হামজা সাহেব যদিওবা কিছুটা সময় পেতেন, কিন্তু উনি যা ট্রমা ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, খুব বেশিদিন আর এইটুকু সক্ষমতাও থাকবে না। খুব দ্রুত পক্ষাঘাতে চলে যাচ্ছে প্রতিটা অঙ্গ।ʼʼ
তুলি শুধু ভাবে, কতটা অপরাধের সাজা হিসেবে তরতাজা, বলবান হামজার দেহ নিথর হয়ে উঠছে? এ কী ধরণের শাস্তি? মৃত্যু সেসবের তুলনায় সত্যিই নগন্য, এমনও কিছু অবস্থা রয়েছে—এই যে হামজার শ্বাস চলবে, এর চেয়ে ভয়াবহ শাস্তি এখন আর কিছু নেই তার জন্য।
ডাক্তার আজ হামজাকেও জানিয়ে দিলেন, “তুমি সম্পূর্ণ অকেজো হতে চলেছ। নো মুভমেন্ট, অনলি ব্রেথ।ʼʼ
হুইল চেয়ার, অন্যের সহায়তায় জীবনধারণ, মেরুদণ্ডহীন পড়ে থাকা….হামজার চোখে তখনও অবিশ্বাস, মনে দুনিয়া ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু শরীরে অক্ষমতা। আরমিণ তার সঙ্গে কী করে ফেলেছে!
—
বিকেল হয়ে গেছিল, জয়ের ঘুম ভাঙল না। নেশার প্রভাব ও রক্তপাতে শরীর অবসন্ন। শীতের দিনেও এসি চালিয়ে ঘুমানো জয় আমির একুশ বছরের অবরুদ্ধ বাপের ভিটায় ঘামে ভিজেও কীসের ঘুম যে সেদিন ঘুমালো!
অন্তূ সেদিন লম্বা সময় ধরে জয় আমিরকে দেখল। সে কখনোই এত খেয়াল করে জয়কে দেখেনি আগে, কখনও তাকাতে রুচি হয়নি। অন্তূর মনে হলো এই যে অভিজাত্যে মুড়ানো বাড়িখানা, এর সাথে লোকটার চেহারার মিল গভীর। ভ্রু-তে আভিজাত্য, কালো ঠোঁটে, গভীর চোখে, মুখের গড়নে, ঘন চুলে। কঠোর সুদর্শন চেহারা। কিন্তু সেই আভিজাত্য ঢাকা পড়েছে নোংরা ব্যক্তিত্বের আবরণে।
বিকেলের পর জাগল জয়। চোখ কচলে জড়ানো কণ্ঠে বলল, “ডাকোনি কেন?
-“ডেকে কী? ঘুমাচ্ছিলেন আপনি।ʼʼ
অন্তূর দুটো ওড়নাতেই রক্ত মাখা। সে মুখ খুলেই ঘোড়াহাঁটের মোড় থেকে খাবার কিনে আনলো। পুলিশ চারদিকে ছড়িয়ে গেছে, এখানে আসতে খুব বেশি সময় নেবে না।
-“এভাবেই আপনি বাইরে গেছিলেন?ʼʼ
-“পুলিশের চোখে পড়ি নাই বলে খারাপ লাগছে?ʼʼ
-“লাগছে।ʼʼ
জয় ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু হাসে। ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে দ্বিগুণ ব্যথা। লুঙ্গির ভাজে গুজে রাখা মোড়ানো কাগজটা বের করে কিছুটা পাউডার হাতের ওপর নিয়ে উন্মত্তের মতো নাক দিয়ে শুষলো।
ব্যথায় কাতর অন্তূ চেয়ে বসল, “আমি নেব। আমাকেও দিন।ʼʼ
জয় মাথা নাড়ে, “হিরোইন! পাক দেহে নাপাক শুষতে নাই।ʼʼ
-“সেটা আপনি হলে?ʼʼ
-“আমি? বৈধ। তাই তুমি এখনও পাক। আমি না, ধর্ম বলে।ʼʼ
-“ওটাই সবচেয়ে বড় অধর্ম।ʼʼ
-“হলো! আমি ধর্ম-অধর্ম খুব একটা বুঝি না। হাঁ করো।ʼʼ
-“খাব না।ʼʼ
-“আজ অবাধ্য হবে না। ভেতরে আর জায়গা নাই কারও অভিযোগ রাখার।ʼʼ
-“ওটা তো আপনার প্রিয় ছিল।ʼʼ
-“তখন জায়গা খালি ছিল।ʼʼ
-“আজ ভয় পান?ʼʼ
-“ভয় না, ব্যথা!ʼʼ
-“ব্যথাকেই তো ভয় তাহলে।ʼʼ
-“পেলে কী? ব্যথা পাওয়া না-জায়েজ আমার জন্য?ʼʼ
-“যার জন্য মানুষকে ব্যথা দেয়া সহজ, সে ব্যথা পাবে কেন?ʼʼ
-“যতদিন ব্যথা দেয়া সহজ ছিল, ততদিন ব্যথা লাগতো না।ʼʼ
-“এখন কঠিন মনে হয়?ʼʼ
-“এত প্রশ্ন না কোরো না। খাবারটুকু খাও। ওষুধ কে দিয়ে গেছে?ʼʼ
-“দুটো নার্স আসে।ʼʼ
-“কার হুকুমে?ʼʼ
অন্তূ জবাব দেবার আগেই জয় কেমন অদ্ভুতভাবে ছটফট করে উঠে ঠোঁটে আঙুল চেপে মাথা নাড়ল। সে জবাব শুনতে চায় না। অন্তূ বলতে চাইছিল, ‘ওরা নিজেরাই আসে। অন্তূর ওপর দয়া করে।ʼ আজ জয়ের মুখের কোথাও একরত্তি রসিকতা নেই, অসহনীয় ব্যথা গম্ভীরতা রূপে মুখটায় ছেপে আছে।
-“ওরা দুজনই কাজটা করেছে?ʼʼ
-“চারজন।ʼʼ
-“কখন আসে ওরা? আজও আসবে?ʼʼ
-“আসলে সন্ধ্যার পর আসবে।ʼʼ
জয় আর প্রশ্ন করে না। অন্তূ সামান্য খায়। জয় তার চেয়েও কম। খেলে বমি পাচ্ছে, মাথায় একটা ঝিমুনি ধরে গেছে। জয় আমির নামটা জানতে চায়নি একবারও যে কে তার প্রাণভোমড়া কেঁড়েছে।
-“আপনি জিজ্ঞেস করলেন না, কে এসেছিল আমির নিবাসে?ʼʼ
-“জিজ্ঞেস করিনি যখন, বলতে চাইছ কেন?ʼʼ
-“সহ্য করতে পারবেন কিনা এই ভয় পাচ্ছেন?ʼʼ
-“আমার সহ্যক্ষমতাকে আন্ডার্স্টিমেট কোরো না।ʼʼ
-“আপনি কাঁপছেন, জয় আমির।ʼʼ
জয় অপ্রস্তুত হয়। শক্তমুখে তাকায় ঠিকই, কিন্তু কাতর এক ঢোক গিলে। একটু পর কেমন করে যেন জিজ্ঞেস করে, কে এসেছিল?
অন্তূ কিচ্ছু বলে না। দুজন শুধু কয়েক মুহুর্ত দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্তূর শক্ত মুখটা বেয়ে টুপটুপ করে জল গড়ায়, জয় চোখ-নাক খিঁচে মুখ ফেরায়। সে বিশ্বাস করবে না, একটুও না। আরমিণ সবসময় চেয়েছে হামজার ব্যাপারে জয়কে ভড়কাতে, আজও চাইছে। জয় বোকা নয়।
সে বিরবির করল, ‘অপবাদ দিস না, আরমিণ। অপবাদ না।ʼ
অন্তূ সুখে চোখ বোজে। কৃতজ্ঞতায় অন্ধ, কাঙাল জয় আমিরের চোখে তার দেবতার জন্য এই ঘৃণার দ্বিধা অন্তূর ভেতর থেকে এক মুহুর্তের জন্য সমস্ত ব্যথা লাঘব করে দেয়। জয় পাথরের মতো নিথর বসে রইল।
নার্সদুটো এসেছে। জয় তাদেরকে ওপরে নিয়ে আসে। তারা ভয় পাচ্ছিল। ওভাবেই আরমিণকে সেদিনের সেবাটুকু দিলো। জয় বলল, “আরও দুজন ছিল আপনাদের সাথে। আমি তাদের সঙ্গে দেখা করতে চাই। চলুন।ʼʼ
অন্তূ শুধায়, “কোথায় যাচ্ছেন?ʼʼ
জবাবে অন্তূর কপালে একটা গাঢ় চুমু খেয়ে জয় বেরিয়ে যায়। অন্তূকে বলার সুযোগ দেয় না, ‘আপনার দোহাই লাগে মেয়র সাহেবের কিছু করবেন না। মেরে ফেলবেন না উনাকে, অনুরোধ আমার। আপনি শুধু সারেন্ডার করুন। বাকিটা আমার…ʼ
নার্সগুলো চেনে কারা হামজার সাথে এসেছিল সেদিন। জয় পাটোয়ারী বাড়িতে ঢুকল, তখন বারোটা ছুঁইছুঁই। সে মূল ফটক দিয়েই ঢুকল। তখন পুলিশ আশপাশে নেই বোধহয়। ফটক আটকে দেবার পর পাটোয়ারী বাড়ি একখানা সংরক্ষিত দুর্গের মতোই। জয় সোজা উঠে যায় দোতলায়। দরজা খুলে তুলি জয়কে দেখে আপ্লুত হয়। জয়ের সাথে চারজন নার্স। তুলির ধারণা এদেরকে হামজার দেখভালের জন্য এনেছে জয়।
হামজা বসার ঘরের সোফায় বসা। তাকে হাঁটাচলার ওপর রাখা হয়েছে। ডাক্তার প্রেশার মাপছেন। আশপাশে বসে আছে ছয়টা ছেলে। জয় নার্সদের থেকে জেনে নেয় কে কে গেছিল হামজার সাথে।
হামজা জয়কে যতটা অস্থির হয়ে দেখল, জয়ের দৃষ্টি হামজার ওপরে ঠিক ততটাই স্থির, অটল। নার্সগুলো কী করে জয়ের সাথে এসেছে। হামজার রক্তচাপ হুরহুর করে বাড়তে লাগল। কেমন কোরে ঢোক গিলল সে, “জয়! কোথা থেকে আসছিস রে? কোথায় ছিলি?ʼʼ
জয়ের জবাবের অপেক্ষা না করে স্ফিগম্যানোমিটারের আর্মব্যাগটা বাহু থেকে ঝেরে খুলে ফেলে উঠতে চায়। মেরুদণ্ডে উদ্দীপনা নেই, ধরে উঠিয়ে দিলে সে এসে জয়ের সামনে দাঁড়ায় ব্যাকুল হয়ে, শরীরটা থরথর করে কাঁপে।
বিক্ষিপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে, “আগে এখানে আয়।ʼʼ শক্ত করে চেপে ধরে জয়কে বুকের সাথে। কিছুক্ষণ পর বলে, “তোর হাতের আর্ম-স্লিং কই? কোথায় ছিলি রে সারারাত? কিছু খেয়েছিস? দেখি, পায়ের হাল দেখি?ʼʼ
জয় কাঠের আসবাবের মতো দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ব্যথা হৃদস্পন্দন হয়ে ছুটছে।
-“কথা বলছিস না কেন? কী হয়েছে? কী বলতে চাস? কী বলবি তুই হামজাকে? হ্যাঁহ্? ওমন করে দেখছিস কেন?ʼʼ
জয় শুধুই অপলক হামজাকে দেখে যায়। হামজার কলিজাটা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করে উঠল। জয় একটাবারও ভাই বলে ডাকেনি। অথচ সে বাড়িতে ঢোকার সময় ফটকের সামনে থেকে গলা ফাঁড়তে ফাঁড়তে ঢোকে।
হামজা বিস্ময়ে কয়েক কদম পেছায়। শরীর থরথর করে কাঁপে তার। তার কি মরে যাওয়া উচিত? জয়ের চোখের ভাষা কী বলছে? ওটা কি ঘেন্না?
জয় হাঁটু মুড়ে বসে ওড়নায় মোড়ানো মৃত ভ্রুণটা মেঝের ওপর মেলে রেখে উঠে দাড়ায়। রিমিটা যে কোত্থেকে দৌড়ে এসে পাগলের মতো ওটার ওপর পড়ে কেঁদে উঠল!
হামজা আরেকটু পেছায়, ঠিক যেমনটা সাপ দেখলে মানুষ পেছায়। জয় তখনও নজর সরায়নি, ওটাই ভয়। হামজার ভয় হয় জয়ের চোখে চোখ রাখতে। ভ্রুণটার দিকে তাকিয়ে হাঁটু শিথিল হয়, ধুপ করে বসে পড়ে সোফার ওপর।
তুলি রিমির পাশে বসে একবার ভ্রুণটা দেখল আবার ভাইকে। তার চোখ ভরে ওঠে। আরমিণের হয়ে সে এবার সাক্ষ্য দেবে, হামজার বিরুদ্ধে দেবে, কিন্তু সাক্ষ্য চাওয়াওয়ালী সেই হতভাগী কোথায়?
নার্স ও মহিলা ডাক্তারটার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো। কাঁপতে লাগল তারা। জয় দুটো ছেলেকে বলল, ‘বড়ঘর থেকে পিটবুলগুলোকে নিয়ে আয় তো!ʼ
সে নিজের রুমে গিয়ে সেই কুড়ালটা আনলো। পিটবুল চারটে প্রায় আজ সপ্তাহখানেক না খাওয়া। গলার দড়ি ওদের যেন ধরে রাখতে পারছিল না। তাদের মালিক তাদেরকে ছোট থেকে মাংস খাইয়ে পালন করেছে, শুকনো ভ্রুণের দলাটা উপাদেয় খাবারের মতো লাগছিল। একটি বুল হাত থেকে ছুটে দৌড়ে আসে ভ্রুণটার দিকে। জয় মুহুর্তের মাঝে কুড়াল তুলে এক কোপ মারল বুলটার ঠিক ঘাঁড় বরাবর। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে গায়ে পড়ে, মাথাটা আলাদা হয়ে জয়ের পায়ের কাছে পড়ে, সেটার ওপর পাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে জয় নার্সদের দিকে দেখিয়ে ছেলেদেরকে বলল, “ওদেরকে মামার ঘরে নিয়ে যাবি। তার আগে কাপড়-চোপড় মুক্ত কর। আমি চাই না ওদেরকে খেতে বুলগুলোর কোনো সমস্যা হোক। এমনিতেই একটা সঙ্গি হারিয়েছে ওরা, তার জন্য আমি দুঃখিত!ʼʼ
নার্স তিনটে কাঁপছিল, একজন এর মধ্যে দৌড়ে পেছনের দিকে ছুটতেই জয় থাবা মেরে পেছন থেকে চুলের মুঠি ধরে টেনে এনে মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলল ছেলেদের দিকে।
-“কাপড়-চোপড় খুলে নে রে। দেরি করিস না।ʼʼ
ছেলেরা নিজেদের পরিণতি নিয়ে চিন্তিত, তারা বুঝতে পারছিল না কী করা উচিত। জয় পশুর মতোন গর্জে উঠল, “যা বললাম, করো হে ভ্যাড়াচ্চুদারা। সারারাত নাই আমার হাতে।ʼʼ
তুলি উঠে এসে জয়ের সামনে দাঁড়ায়, “পাগল হয়েছিস তুই? কী সব হচ্ছে বলতো? তোরা এমন কেন…ʼʼ
জয় আলগোছে তুলিকে বুকের সাথে চেপে ধরল। নোংরা দৃশ্য দেখা থেকে বাঁচাল নাকি সান্ত্বণা দিলো জানা নেই। ওদের কান্নাকাটিতে ভরে উঠল ড্রয়িং স্পেস। হামজা নীরব দর্শক। সে ঘটমান পরিস্থিতি নয়, সে দেখছে জয়কে। জয় তুলির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। রিমি ভ্রুণটাকে চোখ ভরে দেখল, পাশে যা হচ্ছে তাতে তার অবাক হবার নেই।
একটা মেয়ে এসে জয়ের পা দুটো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল, “আমায় ছেড়ে দিন। আমার বাচ্চা আছে ঘরে। সেদিন ওই কাজ না করলে উনি মেরে ফেলতেন আমাদেরকে।ʼʼ
-“তো মরে যেতি। আজও তো মরতেই হচ্ছে। তবু কাজটা করার ছিল না।ʼʼ
মেয়েটার মুখের ওপর কষে এক লাত্থি মেরে এগিয়ে দিলো ছেলেদের দিকে। মেয়ে তিনটিকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে হুমায়ুন পাটোয়ারীর শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। জয় পিটবুলগুলোর দিকে তাকিয়ে সামান্য মাথা নেড়ে শুধু ইশারা করতেই ওরা ঢুকে পড়ল। বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দেয়া হলো। মাংস ছিঁড়ে খাওয়া, টানা-হেঁচড়া, চিৎকার, ছুটতে চাওয়ার প্রয়াস, ঘর এলোমেলো হওয়া, কাচের আসবাব ভাঙা, নারী কণ্ঠের আর্তনাদ—সকল আওয়াজ একত্র হয়ে গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হলো। সবাই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে, নিশ্বাস বন্ধ সবার। মহিলা ডাক্তারটা ঠকঠক করে কাঁপছে তখন।
জয় কুড়ালের কোপে তার হাতদুটো কেটে নিয়ে রেখে দিলো হামজার সামনে, সেন্টার-টেবিলের ওপর। রক্তে কাচটা ঘোলা হয়ে গেল। হামজা দেখল—শরীর থেকে আলাদা হয়েও নড়ছে হাতদুটো, গলগল হয়ে রক্ত ঝরছে। শুধু হাত দিয়ে গর্ভপাত করানোতে হাত কাটল জয়, সহায়তা করায় কুকুরের খাবার হলো নার্স, সে যে নির্দেশদাতা, আয়োজক। জয় তার সঙ্গে কী করবে?
খুব চিৎকার করছিল মহিলা, জয় তার চুল ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে দেয়ালের সাথে কষে এক বাড়ি মারল মাথাটা, মাথার করোটি বোধহয় গুড়ো যদি নাও হয় তো থেতলে গেল, চিৎকার বন্ধ, পরিবেশ ঠান্ডা। ওদিকের চিৎকার ও বুলের গর্জন ও দাঁতের ঘর্ষণের শব্দ তখনও আসছে।
আরমিণ কখনও মুখটাও দেখায়নি কাউকে। গর্ভবতী আরমিণকে অনাবৃত করে গর্ভপাত করিয়েছে নার্সগুলো। জয়ের চোখে আবছা হয়ে ভেসে ওঠে বহুবছর আগের একটা দৃশ্য। একটি গর্ভবতী নারী, কয়েকটি পুরুষ। হামজার সাথে যাওয়া ছেলেদেরকে ওপর সেই পুরুষগুলোই ভেসে উঠল কিনা! জয় পাগলের মতো খুবলে ধরে এনে পায়ের নিচে করল একজনকে। গলার ওপর পাড়া দিয়ে বলল, আমার জন্য নাকি জান দিতে পারিস রে তোরা? সবাই কেন মিথ্যা আশ্বাস দিস বল তো আমায়?
কাচা গাছের খড়ির মতো কুড়াল তুলে কুপালো ছেলেটাকে। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল মানবদেহটি। মাংস-রক্ত ছিটে-ছুটে একাকার হলো। জয় জোরে শ্বাস ফেলে তখনও জিজ্ঞেস করছে, “থামালি না কেন তোরা সেদিন মেয়রকে? বললি না কেন জয় আমিরের ছেলে ওটা? তোরা জানিস না কেউ নাই জয়ের। বাপ নাই, চাচা নাই, মা নাই, ভাই…একটা ভাই নাই রে জয় আমিরের। ওরা তোদের সামনে মেরেছে না আমাকে? কত কী নিয়েছিস আমার কাছে! দেইনি তোদের? আমায় কী দিলি?ʼʼ
চারজনকে ঘরের মেঝেতে কুপিয়ে কয়েক খণ্ড করে ফেলে রাখলো। কারও হাত ঝুলে রইল, কারও বুক ফেঁড়ে যাওয়ায় হৃদপিণ্ড দেখা যাচ্ছিল। কান কেটে আলাদা হয়ে পড়ে রইল একটা। তুলি বমি করে ভাসিয়ে দিলো। জয়ের শরীর রক্তে জুবজুবে। দাঁত টকটকে লাল, পেটে রক্ত গেছে অবশ্যই। পেট মুচড়ে এলো রিমির। সবশেষে হামজার ডাক্তার যে ডাক্তার মানুষ, সেও বমি করে ফেলল অসুস্থ দৃশ্যে। তুলি দৌড়ে গিয়ে কোয়েলের রুমটা বাইরে থেকে আঁটকে দিয়ে এলো।
জয়ের হাতের ব্যন্ডেজ থেকে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে তখন। সে কুড়ালটা ছুঁড়ে মারে, মেঝের টাইলস ভেঙে যায়।
খোঁড়াতে খোঁড়াতে হামজার সামনে এসে দাঁড়ায় জয়, “জিন্নাহ্ কোথায়?ʼʼ
হামজা জবাবহীন। রক্তে ভেজা জয়কে সে বহুবার দেখেছে, আজ হামজার বিরুদ্ধাচারণের রক্ত গায়ে মেখে এসে দাঁড়িয়েছে জয়। তবু জয়ের কণ্ঠস্বর ভঙ্গুর, স্থির। মানুষ বিশ্বাস ও ভরসার কাছে হেরে গেলে সমস্ত শক্তি অর্থহীন হয়ে পড়ে। জয় এত তাণ্ডব হামজার কথামতো কাজ করা সামান্য পেয়াদাদের ওপর করল, কিন্তু রাজার সামনে এসে সে শুধু নিস্তেজ কণ্ঠে হিসেব চায়!
আবার শুধায়, কোথায় জিন্নাহ? কবে সরিয়েছ ওকে? আমার তো জানা দরকার কতদিন যাবৎ তোমার পালিত কুকুরের কাজ করে আসতেছি।
-“জয়!ʼʼ শাসিয়ে উঠল হামজা, “স্পর্ধা বেশি হবে না তোর আমার সামনে।ʼʼ
জয় অনড় দাঁড়িয়ে রইল।
হামজা উঠে গিয়ে জয়ের সামনে দাঁড়ায়, “মেরে ফেলবি আমায়? মার না, মার! তোর মনেহয় আমি ধোঁকা দিয়েছি তোকে? তুই আমায় ধোকা দিয়েছিস, তুই আমায়। তুই নিমোকহারাম জয়। তুই তোর পথ ভুলে গেছিস।ʼʼ
জয়ের কাষ্ঠল বুকে সজোরে হাত মারল হামজা, “তুই ভুলে গেছিস আমরা কে, আমরা কী? আমাদের গন্তব্য ও জীবনরেখা কেমন? আমরা কোথা থেকে উঠে এসেছি, সব ভুলে গেছিস। এই কথা ছিল না তোর-আমার। কে জিন্নাহ্, তুই কে? তোর পরিচয় কী? আজ তোর বউয়ের সাথে দুটো দিন বাপের ভিটায় উঠে বাপের ব্যাটা হয়ে গেছিস, জয়? আমিরের ব্যাটা হয়ে গেছিস তুই? মার, আরও লোক মার। ওদের মারলি আমাকে মারবি না? কেটে নে, আমার হাতদুটোও কেটে নে। এই হাতেই মেরেছি জিন্নাহ্কে, মার কোপ। কত জোর তোর হাতে, দেখি জয়? এক কোপে হামজার হাত কেটে পড়ে যাওয়া চাই।ʼʼ
রিমি বিস্ময়ে কেঁপে উঠল। হামজার চোখের তারায় টলমলে মতোন ওটা কী? অশ্রু? নিজের সন্তান হারানোতেও এই অশ্রু স্থান পায়নি লোকটার চোখে।
হামজা জয়ের সামনে নিজের হাতদুটো মেলে ধরে, “এই দেখ, দেখ! এই দুই হাতে তোর ছোট্ট হাতের মুঠো চেপে ধরে আমি তোকে দুনিয়ায় চলতে শিখিয়েছি। আজ তোর হাত খুব শক্ত, খুব অস্ত্র চালাতে শিখেছে, শত্রু দমন করে নিজের জন্য জায়গা বানাতে শিখেছে। আমি…আমি তোকে হাতে ধরে সেই শক্তি দিয়েছি। নয়ত শালা তোর মতো এতিমকে কবে এই ভুখা দুনিয়া গিলে খেয়ে বমি করে ফেলতো। তুই জানিস না দুনিয়াকে? যে মারতে জানে না তাকে মরে যেতে হয়। যার পিছুটান থাকে সে ধ্বংস হয়। তোকে টিকিয়ে রাখার দায়টা আমার এই দুই হাতের ছিল সেদিন, আজ নেই? তাকিয়ে দেখ নিজেকে। এক টুকরো জীবনের নেশা তোকে কোথায় নিয়ে এসেছে। জয় তোর-আমার মতো মানুষদের পিছুটান থাকতে নেই। বলিনি তোকে আমি?
আজ তুই বড় ন্যায়-অন্যায়, বিশ্বাস-ভরসার গুণগান গাইতে জানিস, দেখি! সেদিন আমি আমার এই দুই হাতে তোর পেট ভরানোর জন্য রক্তমাখা পয়সায় দু-মুঠো চাল কিনে এনেছি, সেদিন এই অ-ভরসা জাগেনি তোর এই হাতের ওপর? খুব বড় হয়ে গেছিস তুই? নিজের সংসার গোছাতে, আমার সঙ্গ ছাড়তে তোর খুব বেশি দ্বিধা বাকি নেই ভেতরে! অথচ আমায় দেখছিস? আমি আজও মোহহীন, সঙ্গহীন, সংসারহীন, পরিচয় ও নামহীন। আমার একটা পরিচয় আছে আমি তোর হামজা ভাই। আজও তোকে নিয়ে আর কিছুদূর চলতে লড়াই করছি। যেখান থেকে উঠে এসে, যা যা সহ্য করে তুই-আমি আজ এখানে এসেছি না, সেখানে তোর বংশপরিচয় না, হামজার বুকটা পেতে দেয়া ছিল তোকে আড়াল করে দুনিয়ার উপযুক্ত করতে।ʼʼ
হামজা দম টেনে নিয়ে চিৎকার করে উঠল, “আমি তোকে না হারাতে এই দুনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করতে পারি। তোর বউ, সন্তান, ভাই এমন আর কী? বুঝেছিস তুই? আমাদের পথে পরিবার আসতে নেই। আমি তোকে ছোটবেলা থেকে বুঝিয়ে আসছি, পাপীরা পাপে বিরতি দিলে তারা ধ্বংস হয়ে যায়। বিবেক তাদের মৃত্যু। দেখ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে তুই-আমি? আর কত ক্ষয় করে থামবি? একটাবার বুকে হাত দিয়ে দেখলি না তোর জন্য কতখানি জায়গা এখানে রেখে দিয়েছি। আমার কেউ নেই কোনো কূলে। তোকে হারাবো কোন সাহসে? বলে দে। দুজনের মাথার ওপরে ফাঁসির দড়ি দেখছিস? চল ঝুলে পড়ি। চল আমার সাথে।ʼʼ
হামজাকে টানে জয়। জয় পর্বতের মতোন অটল। চোখদুটো রক্তের মতোন টগবগে লাল। থুতনি ও বুক তিরতির করে কাঁপছে। চোখদুটো শুধু বিক্ষুব্ধ হামজাকে দেখছে।
-“তুই পরিবার চাস, জয়? পরিবার তোর আছে? পরিবার থাকলে কেউ তোর মতো জয় হয়? একুশ বছর আগে পরিবার হারানো এতিম পরিবারের ওপর দায়বদ্ধতায় হামজাকে মারতে এসেছে! শ্যাহ্! হামজাকে তোর বউ না চিনুক, তুই চিনিস না? হ্যাঁহ্? তুই তোর বউকে বলিসনি হামজা তোর বাপ? তোর পরিবার তোকে ধুকে ধুকে মরার জন্য এই ক্ষুধার্ত দুনিয়ায় একলা ফেলে সেই কবে চলে গেছে? বলিসনি তুই তোকে?ʼʼ
জয় উপর-নিচ মাথা নাড়ে। ক্ষণকাল পর বলে, “তুমি বুঝবে না আমার রক্তের কদর। এটাই তো স্বাভাবিক। তুমি আমার রক্তের কেউ না।ʼʼ
হামজা নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। চোখে অবিশ্বাস, বুকে কাঁপছে ঠকঠক করে।
-“আমি তোমার ভালোবাসার হিসেব বুঝতে পারি নাই আজও। তুমি আমায় আপন করলে আমার পরিবার আর রক্ত থেকে আমারে ছিঁড়ে নিয়ে? এভাবে রক্ত না জন্ম মোছা যায় না, বোঝো না?ʼʼ
-“নাহ্! না রে জয়। কী করে বুঝব বল তো, আমার তো রক্ত আর জন্মপরিচয় নাই। তোদের মতোন জমিদারি পরিচয় আর বড়লোকি রক্তের নাম তো আমার নাই!ʼʼ
জয়কে যেন একটুও স্পর্শ করল না হামজার হৃদয়বিদারক বাক্যদুটো। সে নিষ্ঠুর কসাইয়ের মতো হামজার কলারটা ধরে এক ঝাঁকুনি মেরে দাঁত পিষে গর্জে ওঠে, “তুমি জয়কে খুঁজলে, জয়ের ভেতরটা বুঝলে না! তুমি যেই হাতে জয়কে বাঁচিয়ে রাখলে, সেই হাতে কী করে মেরেও ফেললে?ʼʼ
জয় বুকের মাঝখানটায় আঙুল রেখে খোঁচায়, “তুমি কখনও এখানটায় হাত রেখে টের পাবার চেষ্টা করছো, এখানে কী চলে? তুমি তোমার পরিবারকে চেনো না অবধি, চিনলে জানলে তুমি পরিচয় ছেড়ে দিতে? যেখানে এই পালিত পরিবারের পরিচয় নিজের নামের সাথে লাগিয়ে আজ চৌত্রিশটা বছর বেঁচে ফিরতেছো। হামজা পাটোয়ারী, হামজা পাটোয়ারী। আর আমি আমার পরিবাররে চোখের সামনে রক্তে ডুবে যাইতে দেখা জয় আমির। তুমি আমায় শেখাবে না আজ। আজ তুমি আমার রক্তের কেউ হলে তোমার হাতের সাধ্যি হতো না আমার রক্তকে এতটা অবহেলা করার। তুমি বললে না আমি জিন্নাহ্কে কেন খুঁজেছি চিরকাল? আজ জিন্নাহ্ হলে আরমিণের গর্ভ থেকে ওর চাচাতো ভাইয়ের রক্তের দলা ওভাবে ছিঁড়ে এনে মাটিতে ফেলে আসতে পারতো না, বিশ্বাস করো। ওই দেখো পড়ে আছে তোমার জয় আমির। দেখো, দেখো! এই যে এটা দেখছো না বিশাল লম্বা দাঁড়িয়ে আছে না? এই খোসার ভেতরে জয় আমির নেই। থাকে না। পুরুষ নিজের বীর্যের সাথে বয়ে যায়। এবার রক্তদলাটুকু দেখো, আর ভাবো জয় আমির তোমার বদৌলতে কোথায়?
দেখাবো হ্যাঁ? দেখবে? কলিজাটা চিড়ে দেখাই এইখানে কী চলতেছে জয়ের? একটা মজার কথা শুনবে? জয় পুরোপুরি অমানুষ হতে পারেনি, আজও কখনও কখনও হৃদপিণ্ডটা লাফায়, ঠিক মানুষের মতোন। টের পাও?
হামজার শরীররটা কেমন ভর ছেড়ে দিলো। জয়ের মুখে-চোখে হাত ছোঁয়ায় হামজা। হাতে পিস্তল গুজে দিতে দিতে জয়ের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে, পিস্তলের মুজেল টেনে বুকের সাথে তাক করে বলে, “গুলি চালা। তোর চোখের ঘৃণা আমার দেখতে নেই। একদম এখানটায় চালা গুলি। খুব ছটফট করছে এখানে, চালা তো জয়, থামিয়ে দে ছটফটানিটা। খুব অসহ্য, বুঝলি? চালা না রে!ʼʼ
জয় পিস্তলটা এক আঁছাড় মারল মেঝের ওপর। নিজের বুকের ওপর তর্জনী আঙুল রেখে বলল, এই যে এখানকার হিসেবটা আছে না? এটা খুব একপেশে। হয় এখানে চেপে জড়িয়ে ধরতে হয়, নয় আঘাত হানতে হয়। তুমি পারো দুটোই। আমার জন্য একটাই সই?
জয় এক কদম কোরে পেছায়, আমি যখন আঘাত পেলাম, শেষবারও তোমার কাছে এসে উৎসব করে গেলাম। কিন্তু তোমার বেলায় তুমি আমায় পাবে না।
হামজার মেরুদণ্ড ভেঙে আসে, সে মেঝের ওপর উপুড় হয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। শরীর অবসন্ন হয়ে গেল নাকি? কেমন কোরে যেন ডাকে, “জয়! শোন ভাই, জয়..ʼʼ
রিমি ছুটে আসে জয়ের দিকে, “এইহ্, কোথায় যাচ্ছেন আপনি? আরমিণ কোথায়? কোথায়, কেমন আছে?
জয় হাসে, আমার কবুতরগুলো দেখবেন। ওরা দিনে চারবার দানা খায়। দু সপ্তাহ পর পর ওদের বাসাটা পরিষ্কার করতে হয়।
তুলিকে বলল, তোর একটা বিয়ে দেয়া দরকার ছিল। পাখির ডিম ঘুমাচ্ছে নাকি রে? জেগে উঠে আমায় খুঁজলে বলিস জয় আমির তীর্থে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি ফিরবে।
তুলি ডুকরে উঠল। বাইরে তখন বাঁশির আওয়াজ, অনেকগুলো পায়ের চলাচল, ফটকে ধাক্কাধাক্কি, মাইকে পরিচিত কিছু বাক্য আসছে—জয় আমির, আমরা জানি আপনি ভেতরের আছেন। সারেন্ডার করুন। পালানোর চেষ্টা করলে গুলি চালাতে বাধ্য হবো। পালাতে পারবেন না, চারদিক থেকে ঘেরাও করা হয়েছে আপনাকে।
জয় এক টুকরো হাসে। তরু তো এলো না দেখা করতে? রাগ করেছে নাকি? একটু এসে ফ্যাচফ্যাচ করে না কাঁদলে জয় যেতে পারছে না তো! জয় চারপাশে খোঁজে তরুকে। তরুর ঘরটার দিকে তাকায়। ওখান থেকেই বেরিয়ে আসার কথা। চোখ ছলছল করবে বলে মাথাটা নিচু করে বেরোবে। ঘরটা বাইরে থেকে আঁটকানো। কোয়েল খুব কাদছে আর দরজা ধাক্কাচ্ছে ভেতর থেকে। কিন্তু তরুর কোনো সাড়াশব্দ নেই। মেয়েটার অভিমান তীব্র। আজ যে চলে যাচ্ছে বাড়ি ছেড়ে, তবু অভিমান ছেড়ে একটাবার এসে হু হু করে কেঁদে উঠল না।
রক্তে মাখামাখি লুঙ্গি দেখল একবার। খুলে যাবার উপক্রম, তাই মুড়ে আবার শক্ত করে গিট্টু দিলো। হামজা উঠে কীভাবে যে উন্মাদের মতোন দৌড়ে রুমে যায়, ফিরে আসে পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে।
জয়ের হাত চেপে ধরে, “জয়! চল, চল আমার সাথে। তাড়াতাড়ি।ʼʼ
জয় শান্ত, স্থির দাঁড়িয়ে বলে, “কোথায়?ʼʼ
-“মেরে ফেলব একদম, শুয়োরের বাচ্চা। চুপচাপ যা বলি কর। এখন আর কীভাবে তোকে এয়ারপোর্টে পৌছে দেব? হিলি বন্দর দিয়ে ভারতে ঢুকবি। আয় আমার সাথে, আয়।ʼʼ
-“রিমি, একটা প্যান্ট নিয়ে এসো।ʼʼ পশুর মতো গর্জে উঠল, “যাও।ʼʼ
লুঙ্গি খুলে প্যান্ট পরে জয়। লোহার ফটক ভাঙতে একটু সময় লাগবে। প্রাচীর অতিরিক্ত উঁচু, তার ওপর কাঁচের টুকরোর সুরক্ষা। কিন্তু বেশিক্ষণ এভাবে ঠেকানো যাবে না তো! হামজা জয়ের হাতটা মুঠছাড়া করে না। ধাক্কায় জয়কে, “বেরিয়ে যা। যাহ্ যা। পেছন ফিরে তাকাবি না। জোপের কোল দিয়ে একদম গিয়ে উঠবি উপজেলার বাইরে। খবরদার মেইন রোডে উঠবি না।ʼʼ
জয় চুপচাপ দেখে হামজাকে। হামজা অধৈর্য হয়ে তাড়া দিলো, “যা শুয়োরের বাচ্চা, যাহ্।ʼʼ
হাত ধরে টেনে হিচড়ে লম্বা বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়িঘরের কাছে যায়। জয় উদ্ভ্রান্তের মতো পিছু চলে। চাবি দিয়ে তালা খোলার সাধ্যি হামজার আর নেই, তার হাতে সেই উদ্দীপনাবাহী স্নায়ু অচলপ্রায়।
জয় অন্ধকারেই হামজার মুখের দিকে তাকিয়ে তালা খোলে। হামজার মুখটায় নিদারুণ কাতরতা, জয়ের বুকে বোধহয় চাপ অনুভব হয়। তবু সে একবার হামজাকে কষে জড়িয়ে ধরে না। তার রক্তে টান পড়ল বোধহয়। কিন্তু জড়িয়ে ধরতে না পারার ব্যথায় জয়ের চোখ জ্বলে উঠল ঠিকই।
বড়ঘর পেরিয়ে নিচতলার পেছনের দরজার ওপারে প্রাচীরের সীমানা। সেই গেইট খুললেই পেছনে বিশাল ডোবা। সেখানে বড়ঘরের জ্বালানি বর্জ্য নিষ্কাশিত হয়। সেদিকে জয়কে ছেড়ে দিয়ে বলল, “যাহ্, চলে যা। দেখা হবে আবার।ʼʼ
জয় দাঁড়িয়ে থাকে। কিচ্ছু বলার নেই কি তার? তবু কেন দাঁড়িয়ে?
-“দ্রুত যা, জয়। ওরা এক্ষুনি ভেতরে ঢুকে পড়বে।ʼʼ
জয় ধীরে ধীরে কয়েক কদম এগোয়। হামজা তক্ষুনি ডেকে ওঠে, “শোন!ʼʼ
পা থামে জয়ের। হামজা দৌঁড়ে যায়,একখানা কাপড় দুই ভাগ করে ছিঁড়ে এক টুকরো বাহুতে বেঁধে দেয়। রক্ত পড়ছিল সেখানে। বাহিনী বোধহয় বাড়ির সীমানায় ঢুকে পড়েছে, দুটো গুলি ফুটলো। হামজা একবার কষে জয়কে চেপে ধরে বুকের সাথে। কিচ্ছু বলার নেই কারও। হামজা দুই সেকেন্ড অপেক্ষা ঠিকই করল জয় একটাবার তাকে চেপে ধরবে। ধরল না জয়। হামজা ছেড়ে দিলো। বসে পড়ল ওখানেই। নিজের অতবড় শরীরের ভাড় রাখা দায় হলো হামজার পক্ষে। তার স্নায়ুতে সেই জোর নেই। কিন্তু কীসের জোরে যে সে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত ফটক আটকায়, তালা লাগায়। বড়ঘর বন্ধ করে দোতলায় উঠে যায়। নয়ত পুলিশ সন্দেহ করবে এদিক দিয়ে জয়কে বের করে দেয়া হয়েছে। পিছু নেবে জয়ের।
জয় চলতি পথে নিজের ওপর খুব হাসে। উন্মাদের মতোন হাসে। রাত একটা বাজছে। তার গন্তব্য কোথায় এখন? সে কোথায় যাবে? কতক্ষণ পুলিশ তাকে ধরতে পারবে না? সে পেছনে কোথাও পাসপোর্ট আর ভিসাটা ফেলে দিয়েছে।
এরকম এক চমৎকার মাঝরাতে তার একটা গান গাইতে ইচ্ছে করছে। সে গলা ছেড়ে গান ধরল,
আমি কতজনে কত কী দিলাম
আরেহ্ যাইবার কালে একজনারও দেখা না পাইলাম
আমার সঙ্গের সাথী কেউ হইল না রে…
রইব না আর বেশিদিন তোদের মাঝারে…
ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে…
চলবে…
[ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। অনেক অপেক্ষা করিয়েছি, তার জন্য দুঃখিত। কিন্তু যে বিশাল পর্ব দিয়েছি চারটার সমান।]