#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৮৫. (প্রথমাংশ)
জয় আমির কবরে শায়িত হবার সাথে সাথে তাকে সর্বাধিক ভালোবাসা ও ঘৃণাকারী দুজন হাসপাতালের বেডে শায়িত হলো। মাহেজাবিণকে রিমি ও কবীর টেনেটুনে জোরপূর্বক ভর্তি করালো।
রিমির কত অভিমান জমেছে, তা জানে আরমিণ? সেই অভিমান নাকের ডগায় রেখে রিমি অভিযোগ করে, “একাটাবার আমায় অন্তত বলতে পারতেন, আপনার পেটে সন্তান। এটুকু বিশ্বাস করা যায় না, না? আমি খুব খারাপ মহিলা, হ্যাঁ? আপনার এইটুকু ব্যাপার জানার যোগ্যতা আর অধিকার নেই আমার…ʼʼ
মাহেজাবিণ রিমির হাতদুটো হাতের মুঠোয় জড়িয়ে ধরল, “রিমি, রিমি! শুনুন আমার কথা। আপনি পতিভক্তা, সরলা নারী। যদি ফাঁস হয়ে যেত একথা! জানেন এই ভয়ে কতরাত রবের কাছে কেঁদেছি আমার পেটটা যেন উঁচু অবধি না হয়, আমার যেন বমি না হয়, আমি যেন দূর্বল না হই… যতদিন পাপীরা বন্দিত্বে না যাচ্ছে।ʼʼ
রিমি কেঁদে ফেলল।
দিনকয়েক অবজার্ভেশনের পর ডাক্তারেরা হামজার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার একটি লম্বা ফিরিস্তি দিলেন।
এক্সিডেন্টের ফলে হামজার মেরুদণ্ডের স্পায়নাল কর্ডে যে ভয়াবহ ক্ষতিটা হয়েছিল, তাতে হামজার শরীর ধীরে ধীরে প্যারালাইজেশনে যাচ্ছিল। কিন্তু এর মাঝে তার মস্তিষ্ক অসহনীয় পর্যায়ে, নিউরোজেনিক শক পেয়েছে। তাতে প্রথমে ব্লাডপ্রেশার লো হয়েছে, সেক্ষেত্রে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুরজ্জুতে অক্সিজেন যাতায়াত কমেছে। কর্টিসলের মাত্রা বাড়ায় নিউরোটক্সিক-কন্ডিশন তৈরি হয়ে স্নায়ুসংযোগ নষ্ট হয়ে গেছে পুরোপুরি। তাদের অবজারভেশন তাদেরকে হামজার মোটর নিউরন ধ্বংসের বার্তাও দিয়েছে। এসব বর্ণনা রোগীর লোককে দেয়া হয় না। তারা বড়জোর সবাইকে জানিয়ে হামজাকে তার জীবনের সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত একটি বস্তুর সাথে জুড়ে দিতে পারে। সেটা হলো হুইল চেয়ার। যেখানে হামজা এক জীবন পক্ষাঘাতে কাটাবে।
কিন্তু হামজাকে কোন উপায়ে এই সাজা কবুল করানো যাবে? সে তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে ফাঁসিতে ঝুলে পড়বে। এক জীবন পঙ্গু হয়ে সে বাঁচবে না, জয়কে ছাড়া বাঁচবে না, সে যে ক্ষমতা-প্রতিপত্তির পেছনে নিজেকে ক্ষয় করেছে, তা হারিয়ে সে বাঁচবে না। তার কাছে না বাঁচার অসংখ্য কারণ থাকতে সে বেঁচে থেকে ভয়াবহ জীবন পাড় করার মতো উন্মাদ নয়।
সপ্তাহখানেক পর হাসপাতালে কবীর এসেছি মাহেজাবিণের কাছে। তুলি ওই তো মেঝের ওপর বসে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে। কোয়েলের সাহস নেই মায়ের কাছে গিয়ে আহ্লাদ করার। তার কথা শোনার, সাথে খেলার, আহ্লাদ দেখার একটা লোক আজ কয়টাদিন ফাঁকিবাজি করছে খুব। হাসপাতালের বারান্দায় আজ কতগুলো দিন ধরে অপেক্ষা করে সে রোজ। জয়টা কী পরিমাণ বেয়াদব হয়েছে ভাবা যায়? বড়মামা হাসপাতালে, আরমিণ মামণি হাসপাতালে, অথচ বেয়াদব জয় একটাবার এলো না দেখতে। তার মায়ের মেজাজটা এত খারাপ হয়েছে! যেন কোয়েলকে চেনেই না! আজ কয়টাদিন কবীর মামা তাকে খাওয়ায়, কবীর মামার কাছেই সে থাকছে, জয়ের কথা মনে পড়লে সে কবীর মামার গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করছে জয়ের কথা। কবীর মামা যে খুব ভালো কিছু করছে তা না। শুধু চেয়ে থাকছে কোয়েলের দিকে, মুখে একটুও হাসি নেই, কেমন চোখদুটো লাল হয়ে যায়, যেন কাঁদবে। মায়ের কাছে যেতে ভয় লাগে। কর্কশভাবে তাড়িয়ে দেয়, একা থাকতে চায়। কোয়েল খুব কষ্টে আছে। তার মনে আছে সেদিন সে জয়কে উঠিয়ে নিয়ে কিছু মানুষকে চলে যেতে দেখেছে। কোথায় নিয়ে গেছিল সেটা জানা হয়নি। মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করার অবস্থা নেই।
তুলিকে দেখতে পাগলিনী লাগে। সে খায় না কিছু। মাথায় তেল-চিরুণী পড়েনি বহুদিন যেন, শরীরের দুধ-আলতা রঙে আলকাতরার ছোপ পড়েছে। সে একটি নোংরা বাপের অবৈধ মেয়ে। মানুষ হয়েছে বাপের সৎ মায়ের কাছে। ছোট বোনের মতো একটা তরু ছিল, চলে গেছে। বিয়ে হয়েছিল এক নষ্ট পুরুষের সাথে। তাকে তার ভাইয়ের মতো দেখতে হামজা খুন করেছে। তার বাপের বোনের ছেলে, আত্মীয় বলতে একটা জয় ছিল, তাকে তুলি সপ্তাহখানেক আগে চারপায়া পালকিতে চড়ে পালাতে দেখেছে। সবাই কি তুলির দায়ভার উঠানোর ভয়ে এভাবে পালিয়ে যাচ্ছে? তার এখন এই মহাবিশ্বে কেউ নেই আর। সে একজনের আছে। তার মেয়ের মা সে। কিন্তু তার সাধ্যি নেই সেই মেয়ের ক্ষুধা নিবারণে এক ছটাক দুধ কিনে পান করানোর।
কোয়েলকে ডেকে নিয়ে মাহেজাবিণ কোলে বসায়। প্রগাঢ় স্নেহে দুটো সিক্ত চুমু খায়। মাথায় হাত বুলায়। এক এতিম শিশুকন্যা, ঠিক তারই মতো। যার দুনিয়ায় আপন বলতে এক অসহায় মা ছাড়া কেউ নেই।
কবীরটা থুতনি বুকের সাথে ঠেকিয়ে খুব কাঁদল অন্তূর কাছে। ছেলে মানুষের কান্না অদ্ভুত এক দৃশ্য! অন্তূর মায়া হয়। এক পাপীষ্ঠর জন্য এক যুবকের এই বুকভাঙা কান্নায় সে অবাক হয়। অদ্ভুত অনুভূতি হয় তার।
-“আমারে ক্ষমা করে দিয়েন, ভাবী। আমি সেইদিন জাইনলে আপনারে সাথে করে নিয়ে ম্যালাদূর পালাইতাম। আপনারে ওই বাড়িত রাখে যাইতাম না। আরও কত পাপ করছি, আমারে ক্ষমা কইরেন…আমার কত ভুল হইছে, কত অকাম না বুঝেই করছি, কষ্ট দিছি আপনারে..ʼʼ
-“আপনি যা উল্লেখ করছেন সেগুলো আমার কাছে কোনো অপরাধ নয়। আপনি এটাই বা কেন ভাবছেন সেদিন আমি যেতাম আপনার সাথে? কোথায় যেতাম? কাদের সাথে? আপনাদের পথে চলে সুরক্ষিত থাকার লোভ আমার ছিল কবে? একটা কথা বলুন তো!ʼʼ
কবীর মাথা তোলে।
-“আপনাদের মনে হয় আমি নিজের সাথে ঘটা অন্যায় মাথায় তুলে রেখে প্রতিশোধের নেশায় এতকিছু করলাম?ʼʼ
কবীরের কাছে জবাব নেই।
মাহেজাবিণ মলিন হাসে, আনমনে, নিজমনে বলে, “আমি যেদিন বড়ঘরের বাচ্চাদেরকে দেখেছি, আমি একজন মুরসালীন মহানকে দেখেছি, আমার জীবন ও পরিস্থিতির ওপর থাকা সমস্ত ক্ষোভ পানি হয়ে গেছে। ধৈর্য বেড়ে অসীম হবার পথে। আমি এক এমন পুরুষকে দেখেছি, যার জীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষা, আদর্শ ও হারানোর সামনে আমার জীবনের ক্ষয় নেহাত তুচ্ছ। ওদেরকে দেখার পর থেকে আমি আর প্রতিশোধের কথা ভাবার ফুরসত পাইনি লজ্জায়। ছোট ছোট শিশুদের জীবনে যারা এমন দূর্ভোগ আনতে পারে, সেই তুলনায় আমার সাথে তারা কীইবা এমন করেছে!? আমি আপনার বড়ভাইদের কাছে কৃতজ্ঞ, আমাকে তুলনামূলক এত শান্তির জীবন দেবার জন্য। মুমতাহিণার তুলনায় আমি ভাগ্যবতী, মুরসালীন মহানের তুলনায়, তরু-রূপকথা আপা আর ছোট বাচ্চাদের তুলনায়… আমার এরপরেও জীবনের প্রতি ক্ষোভ থাকলে আমি অকৃতজ্ঞদের দলে পড়ে যাব। আমার রব আমাকে অবশ্যই ভালোবাসেন। আমি কিছুই হারাইনি। তিনি যা আমানত আমায় দিয়েছিলেন, তিনিই কেড়ে নিয়েছেন। কিছুই তো আমার নয়!ʼʼ
কবীর মাথা তুললই না অনুতাপ ও দুঃখে ব্যাকুল হয়ে পাগলের মতো বারবার ফুঁপিয়ে নাক টানতে লাগল, “জয় ভাই মুরসালীন মহানরে মারে নাই।ʼʼ
-“আর বাচ্চাদেরকে? ওদেরকেও কি মারেনি সে?ʼʼ মাহেজাবিণ যেন একটু সপ্রতিভ হয়।
-“আহাদরে জয় ভাই মারছে, সাথে আরও কয়ডারে…বাকি বাচ্চাগোরে এমপির কাছে দেয়া হইছিল। ওরা এহন গুম হইয়া গ্যাছে। নাই আর।ʼʼ
মাহেজাবিণ চোখ বোজে। মৃত মানুষটার ব্যাপারে আর ঘৃণিত সত্য শোনার শক্তি তার নেই। সে সত্যিই অনেক চেষ্টা করেছে জয় আমিরকে ক্ষমা করার। সে ব্যর্থ। বারবার যখন নিজের সাথে ঘটা সকল অন্যায়ের জন্য সাফ মনে জয় আমিরকে ক্ষমা করে দিতে সফল হয়েছে তখন তার এই পাপগুলো এসে তার চেয়েও বেশি ঘেন্না জড়ো করেছে বুকের ভেতরে। সে হাত উচিয়ে ধরে থামায় কবীরকে। কবীর মুখটা নুইয়ে অপরাধী হয়ে বসে রইল।
মাহেজাবিণের ভেতর থেকে ব্যথা সামান্য ঝাপসা হয়। কবীর তার ওপর যেন শুরু থেকে সদয় ছিল। তার মায়া হয় কবীরের ওপর। ইচ্ছে করে সান্ত্বণা দিতে। কিন্তু সে পারে না। তার মুখটা অন্তরের মতো নয়। নারকেল ভালো উদাহরণ তার ক্ষেত্রে। সে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে, “তার পাপ নিয়ে আপনার এত অপরাধবোধ!? কে আপনি জয় আমিরের? বন্ধু? সঙ্গী? আত্মার সম্পর্ক? কে?ʼʼ
কেমন করে মাথা নাড়ে কবীর, “জানা নাই। আমার জানা নাই।ʼʼ কবীর আবার কেমন কাতর হয়ে পড়ল এই প্রশ্নে।
মাহেজাবিণ তখন এক প্রশ্ন রাখে, “আপনি বিয়ে করেছেন, কবীর ভাই?ʼʼ
কবীর তাকায় অন্তূর দিকে। নিজেকে সামলায়। তার বুকে শান্তি আনে অন্তূর ডাক। সে তাচ্ছিল্য করে ব্যথিত হাসে, “যে বিয়ে দিবে সেই তো ফাঁকি দিয়ে পালাইছে…ʼʼ
-“তার ঘরওয়ালি হিসেবে আমি যদি দায়িত্বখানা নিই?ʼʼ
কবীর বিশ্বাস করতে পারে না। তার আধভেজা চোখদুটো বিস্ময় ও প্রশান্তি-উল্লাসে চিকমিক করে ওঠে।
মাহেজাবিণ বলে, “একজন সুন্দরী অসহায় কনে আছে আমার হাতে। তার আছে তার চেয়েও সুন্দরী নিষ্পাপ এক শিশুমেয়ে। বলুন, কবুল?ʼʼ
কবীর বিভ্রান্ত হয়। কথা বলতে পারে না। তার বুক কাঁপে দুরুদুরু করে।
মাহেজাবিণ তুলির দিকে ইশারা করে, “দেখুন তো, পছন্দ হয়?ʼʼ
কবীর একনজর তুলিকে দেখে। তার অস্থির লাগে। পাটোয়ারী বাড়ির মেয়ে! সবসময় সমীহের নজরে দেখা নারীকে সে হবু স্ত্রীর চোখে দেখতে গিয়ে থতমত খায়।
-“সেই লোক আপনাকেও বিয়ে দিতে চেয়েছিল, তাকেও। সে তো ভালো লোক ছিল না! ছিল এক নম্বরের সুযোগসন্ধানী। সুযোগ বুঝে ওয়াদা ছেড়েছুঁড়েই পালিয়েছে।ʼʼ
কবীর মাথা নত করে।
মাহেজাবিণ খুব সামান্য হাসে, “মাথা যদি সম্মতিতে নত হলো, তো আমি আপনার কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব, কবীর ভাই।ʼʼ
কবীর আপ্লুত হয়ে ছটফট করে ওঠে। নিজের মুখ-চোখে দুই হাত বুলায় অপ্রস্ততিতে। কোয়েল বুঝতে না পেরে একবার কবীর মামা আবার মামণির দিকে চায়।
কবীর শুধায়, “কোথায় যাবেন আপনে হাসপাতাল থেকে?ʼʼ
মাহেজাবিণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “একটা উপকার করুন আমার। এর কোনো দাম দিতে পারব না কিন্তু। আমার কাছে কিছু নেই।ʼʼ
-“লজ্জা দিতেছেন অধমরে?ʼʼ
মাহেজাবিণ মাথা নাড়ে, “রউফ কায়সারকে একটা খবর দেবেন। সে যেন একটু দেখা করে আমার সঙ্গে।ʼʼ
কবীর জিজ্ঞেস করে না, কেন। চুপচাপ সম্মতিতে মাথা দুলায়। অন্তূ তুলি ও রিমিকে ডেকে নেয়। কবীর তাতে আরও দ্রুত দূরে সরে গেল। তার অদ্ভুত রকমের অস্থির লাগছে। তার একবার এক্ষুনি কবরস্থানে যাওয়া দরকার। তার বিয়ের কথা চলছে, বিয়ের ঘটক যে লোকের ঘরওয়ালি তার কাছে একটু ক্ষোভ ঝারা দরকার।
অন্তূর পেছনে এমপির গোটা পার্টি পড়ে আছে। এখন সে পুরস্কার-ঘোষিত নিখোঁজ ছাগলের মতো। যে যেখানে পাবে পুরস্কারের লোভে শিকার ধরে নিয়ে দিয়ে সম্মানী আদায় করবে। বাপ্পীর লোক হাসপাতালে আসেনি তার কারণ হামজাকে পাহারা দিতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে হাসপাতালে। সাথে কবীর নিজেদের গোটা দলবল আশাপাশে ভিড়িয়ে রেখেছে। হামলা হলে হাসপাতালে একটি সংঘর্ষ নিশ্চিত হবে।
—
পাটোয়ারী বাড়ি হামজার নামে। যৌথ মালিকানায় কেউ নেই। সুতরাং আইনতভাবে তার বাড়িটি সরকারীভাবে বাজেয়াপ্ত হবার কথা। কিন্তু হলো যেটা–হামজা যে বাড়ির ব্যবসায়িক গোডাউনে টর্চার সেলের মতো জাহান্নাম খুলে রেখেছিল সেই বিষয়টি চাপা দেয়া হলো। হামজা দলীয় কর্মী। তার বাড়িতে এমন কিছু রয়েছে, ঘটেছে, এটা সরাসরি জানতে দিলে জনগণের ভেতরে ক্ষোভ পয়দা হবে, বিষয়টা খুব খারাপ হবে। হাজার হোক হামজা সরকারী দলের কর্মী, তার কর্মের ক্রেডিট দলের নামে যায়।
সুতরাং ওটা ইস্পাত-লোহার গোডাউন হিসেবে রয়ে গেল। কিন্তু হামজার অপরাধ, এবং সেটা একটাই এমপির খুন। নয়ত বাকিগুলো ধরা হতো না। বাড়ির মালিকানায় কেবল সে আছে, তাই পাটোয়ারী বাড়িটাকে সিলগালা করা হলো। আইনত অনুমতি যদি পায় কখনও তবে ওখানে কেউ বসবাস করতে পারবে।
হামজার চিকিৎসার জন্য ওয়ার্কশপের কাঁচামাল খুব সুলভমূল্যে বিক্রি করল রিমি। লাভ হলো না কিছুই। থেরাপি মনের সান্ত্বণা বৈ কিছু নয়। মস্তিষ্কের ওপর হাত ঘুরানো মুশকিল। হামজার স্পাইনাল কর্ড পুরোপুরি ধ্বংস। জীবন্মৃত হয়ে উঠল হামজা। দেখলে মনে হয় না সে জীবিত আছে। চলমান জগতের সঙ্গে মানসিক ও শারিরীকভাবে সকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সে চলে গেছে সাবকনশ্যস রেনমে।
রিমির বাড়ি থেকে লোক এলো এতদিন পর। মেয়েকে তারা ত্যাগ করেছিল। যখন হামজার প্রতিপত্তি বাড়ছিল, কিন্তু তা রিমির বাপ-চাচাদের কাজে লাগেনি, তখন মাজহার কতবার বলেছে রিমিকে তালাক দিয়ে চলে আসতে। রিমি যায়নি। তার স্বামী কোনো স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার নয় এটা বলে অপমান করে তাড়িয়েছে। হামজা সচল থাকা অবস্থায় সাহস ছিল না ও বাড়ির কেউ রিমিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এমনকি মাজহারের মৃত্যুর পরেও না। মাজহার ও ঝন্টু সাহেব মরার পরেও সাহস হয়নি সরাসরি দুই ভাইয়ের ওপর আঙুল তোলার। কিন্তু এখন হামজার দিন ফুরিয়েছে, তারা রিমিকে ছাড়িয়ে নিতে এলো।
হামজার সামনেই রিমির বাবা দাঁড়িয়ে বলল, “তোরে বিয়ে দিয়ে দেয়া মানে বিক্রি করা রে? চল, বহুত হইছে। এক মরার ঘর করার জন্য পড়ে থাকবি? আর তার ঘরই বা কই? সরকারে তো সিল মারছে সেইখানেও। এই হাসপাতালে দাসীর মতোন পড়ে থাকবি? আমার সাথে চল। এই বয়সে এই সর্বনাশ, ক্যান মেয়ে কি আমি খেলা খেলতে জন্ম দিছি?আর কীসের আশায় পড়ে থাকবি? একটা সন্তান হইবো না, না খেয়ে মরা লাগবে..ʼʼ
খুব বড় বড় কথা বললেন আজ রিমির বাবা। হামজা এতগুলো দিনে চলমান পরিবেশের কোনোকিছুতে মনোযোগ দেয়নি। জয় আর নেই, এই কথাটা নিজেকে বিশ্বাস করানোর ব্যস্ততায় আর কোথাও মনোযোগ দেয়ার ফুরসত পায়নি। আজ আড়চোখে রিমির দিকে খেয়াল করে। তার চোখে রিমিকে আটকে রাখার প্রয়াস নেই, অধিপত্য নেই, শুধু নির্বাক এক পক্ষাঘাতগ্রস্থ হিসেবে সে দূর্বল চোখদুটো তুলে রিমির প্রতিক্রিয়া খেয়াল করতে চাইল।
রিমি বলে, “আব্বু, আপনি আমার স্বামীর ব্যাপারে কথা বলছেন। সে অসুস্থ, মৃত নয়। আর আমি তার সঙ্গে পালিয়ে আসিনি, আপনারা বিয়ে করিয়ে সঙ্গে দিয়েছিলেন। এরপর তার সঙ্গে থাকাটাই আমার জীবন। সেই ‘সঙ্গেʼ ঘর থাকুক ন। যদি কোনো দরকারে আপনার কাছে যাই, ফিরিয়ে দেবেন না এইটুকুই অনুরোধ। যেমন তার স্ত্রী আমি, আপনার মেয়েও। আপনাদের পার্টিতে কী হয়েছে তা মনে না রেখে মনে করুন না যে আপনার মেয়ের জামাই অসুস্থ। সে সুস্থ হোক তারপর নাহয় তার অপরাধ হিসেব করব!ʼʼ
রিমি বাবা মেয়েকে ধরে কেঁদে ফেললেন। তিনিই সতেরো বছর বয়স্কা ছোট্ট মেয়েকে এই রাক্ষসের কাছে বিক্রি করেছিলেন ক্ষমতার স্বার্থে, আজ এমনটাই উপলব্ধি হলো তাঁর। আজ মেয়ে নারী হয়েছে, বড় হয়েছে, ভারী কথা শিখে গেছে। কিন্তু হারিয়ে গেছে জীবনের সকল চাঞ্চল্য আর রঙ! পরনের শাড়িটা মলিন, মুখটায় যেন বার্ধক্য এসে জমেছে! বয়স এখনও তেইশ পেরোয়নি। এর দায় কার? তাঁর নিজের সিংহভাগ! মেয়ের কাছে বড় লজ্জিত হয়ে বুকে ব্যথা নিয়ে ফিরে গেলেন তিনি।
হামজার আজ তার আবার মরার শখ জাগে। তার মনে হলো রিমির সাথে সে জুলুম করেছে কিন্তু কী জুলুম? সে তো এমনই! তা মানতে পারল না কেন রিমি? রিমির কাছে সে ক্ষমা চাইবে? কী বলে ক্ষমা চাইবে? সে তো অপরাধ করেনি! তার পথটাই ছিল ওটা। সে যা করেছে সেটাই তার কাজ ও নীতি–রাজনীতি। দোষ রিমির। সে কেন আরমিণের মতাদর্শে লালিত হতে গেছে?
—
রউফ কায়সারের কাছে মাহেজাবিণ নিরাপত্তা চাইল। দিনাজপুর থাকার নিরাপত্তা। থার্ড ইয়ারের ফার্স সেমিস্টারের পরীক্ষা সে দিতে পারেনি। মনোয়ারা রহমানের কাছে গর্ভাবস্থাকালীন সংকটে অনুপস্থিতির আবেদন ও রিপোর্ট জমা দেবার পর মনোয়ারা রহমান কনসিডার করলেন। গোটা ভার্সিটি ও অঞ্চল থমকে গেছিল জয় আমিরের মৃত্যুর সংবাদে। কেউ কেউ লাশ দেখতে না পাবার আফসোসে গুম রইল। এ নিয়ে ভার্সিটি প্রাঙ্গনে মৃদু ক্ষোভ বইল, লাশ কেন ঘোড়াহাটেই দাফন করে শুধু খবর আনা হয়েছে! জয় আমিরের কী আছে ঘোড়াহাটে? সব তো বাঁশের হাট আর বিশ্ববিদ্যালয়ে তার! বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকার ছিল জয় আমিরের ওপর।
পরীক্ষা দেবার অনুমতি পেল মাহেজাবিণ। পড়ালেখার খরচ ও এতগুলো পেট চালাতে মাহেজাবিণের উপার্জন দরকার। সব ব্যবস্থা না করে মা ও ভাবীকে দিনাজপুর আনা যায় না। নিজের জন্য তখন দামী ওষুধের ফর্দ লিখে দিয়েছে ডাক্তার। সেই পেসক্রিপশন কোথাও হারিয়ে ফেলল সে! ওষুধ কেনার পয়সা নেই, পেসক্রিপশনের কী কাজ!
দিনাজপুর থাকা তখন বাঘের খাঁচায় মুরগীর মতো। রউফ কায়সার কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারে তাকে? স্বল্প পরিচয়, এছাড়া একজন সরকারী কর্মকর্তার কাছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আশা করাটা বেমানান।
আমজাদ সাহেবের বাড়ির পেছনে এককাঠা জমি পড়ে আছে এখনও, ছোট কস্তুরীর খাল হিসেবে। ওটুকু বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তূ কুষ্টিয়া যাবার প্রস্তুতি নেয়। অনুমতি সাপেক্ষে পাটোয়ারী বাড়িতে শেষবারের মতো ঢুকেছিল সে সেদিন। শুকনো রক্তে জড়ানো ড্রয়িং স্পেস পেরিয়ে অন্তূ সোজা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে যায়। আকাশ একটু মেঘলা, বাতাস বইছে খুব। তাতে ধারণা করা যায় বৃষ্টি নাও আসতে পারে।
মালিক নেই আজ কতগুলো দিন। তবু গুনলে কবুতর সংখ্যায় বেশি পাওয়া যাবে। এমনটা হতো। জয়ের কেনা কবুতর উড়াউড়ি শেষে সাথে নতুন কবুতর নিয়ে আসতো। কারণ কবুতররা জেনে গেছিল জয়ের ছাদে ভিআইপি খাবার মেলে। কত জাতের কবুতর! সবচেয়ে বেশি সাদা পায়রা। প্রত্যেক জাতের জন্য আলাদা আলাদা খোপ। আজ কয়দিনে ভীষণ নোংরা করে ফেলেছে ছাদ ও খোপগুলো। সাদা পায়রাগুলো দেখে অন্তূর চোখে বিভ্রম তৈরি হয়। কবুতর ঝাপসা হয়, সে দেখে বড়ঘরের কবুতরগুলোকে। সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি, পাজামা, টুপি পরা নিষ্পাপ কবুতরের ঝাঁক! ঠিক এদের মতোই বহুদিন না খাওয়া, পিপাসায় কাতর! অন্তূ ধপ করে বসে পড়ে ছাদের ওপর। অসুস্থ লাগে তার খুব। জয় আমির কী করেছে তাদের সাথে! সে কলঙ্কিত এক নারী। সে এমন এক পাপীষ্ঠর ঘরের স্ত্রী, যার পাপ নিকৃষ্টতাকে হার মানিয়েছে।
এই কবুতরগুলোকে ঠিক রোজ দানা খাইয়েছে জয় আমির, পানি পান করানোর জন্য কতগুলো সৌখিন পাত্র ছাদজুড়ে রাখা, কত রকম দামী শস্যের আয়োজন ছিল সাদা পায়রাগুলোর জন্য! অথচ নিষ্পাপ ছোট ছোট মানব সন্তানদের জন্য সামান্য প্রাণভিক্ষা দেবার প্রয়াস ছিল না যার মধ্যে তার বিধবা স্ত্রী হিসেবে মাহেজাবিণ আজ সাদা পায়রাগুলোর সম্মুখে অনেকক্ষণ বসে রইল।
নিজেকে ধিক্কার দিলো। তার হঠাৎ-ই মনে হলো বাংলাদেশের আইন জয় আমিরদেরকে শাস্তি দিতে প্রস্তুত নয়। আচ্ছা সে কি এই কাজটা করতে পারতো না? সে কেন পারেনি ঘুমের মাঝে জয় আমিরের গলাটা কেটে দিখণ্ডিত করে ফেলতে! হামজার পাটোয়ারী তার পাশের ঘরে কতরাত বেঘোরে ঘুমিয়েছে! কীসের আদর্শ মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছিল যে আদর্শে নিষ্পাপ শিশুগুলোর প্রাণ বাঁচাতে দুটো রাক্ষস বধ সে করতে পারেনি হাজার সুযোগ পেয়েও? যে দুটো নাগালে ছিল তাদেরকে বধ তো সে করতেই পারতো! এমন দুজন খুনীকে হত্যা করে এক জীবন কারাগারে কাটানোর চেয়ে সুখের আর কী হতো! এই ধিকৃত, ধ্বংসপ্রাপ্ত জীবন অসহনীয়! সে কোন আইনের আইনজীবী হতে চায়? আইন কোথায়? যেখানে আইন নেই, সেখানে আইনজীবীর কীসের? দেশ কোনদিকে হাঁটছে, কাদের হাত ধরে এগোচ্ছে? সেই দেশে কীসের আইনজীবী হবে সে? সে কী করে এক ভুল দেশে জন্মে এক ভুল স্বপ্ন লালন করেনি নিজের মাঝে?
ছেড়ে দিয়ে পোষা পায়রা জয়ের। উড়িয়ে দেবার উপায় নেই। সারাদিন এদিক-ওদিক উড়ে এসে দানা খাওয়ার সময় অথবা সন্ধ্যা বেলায় ঠিক ফিরে আসে তারা জয় আমিরের তৈরি নীড়ে। মাহেজাবিণ আবার তাচ্ছিল্যে হাসে। সামান্য পায়রাকে কতটা স্বাধীনতা দিয়ে পালন করেছে লোকটা, অথচ মানুষ তার কাছে এই সুযোগ পায়নি। সে নিজেও বোধহয় পারেনি মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে! আজ পায়রাগুলোকে অন্তত মুক্ত করা যাক! এ বাড়িতে ওদেরকে দানা-পানি দেবার মতো আর কোনো প্রাণ থাকবে না।
সে তাদেরকে তাড়িয়ে দিতে চাইল। তারা মাহেজাবিণকে খুব চেনে। তারা বরং খুশি হয়েছে। বাড়ির লোক এসেছে, কিছু খাবার মিলবে। তারা উড়বে কেন? এটাই তো আবাস তাদের। তারা বাকবাকুম রবে জয় আমিরকে ডাকল কিনা কে জানে! তাদেরকে তাড়ানো গেল না। মাহেজাবিণ রুমে এসে গম পেল। সেগুলোর সাথে বাসি পানি তুলে নিয়ে গিয়ে শেষবার সে কবুতরগুলোকে খেতে দিলো। ঝেপে এলো সবগুলো তার পায়ের কাছে। দুটো সাদা পায়রা তুলে আদর করে মাহেজাবিণ। বাকিরা গা ঘেষে। তাদেরকেও হাতে তুলে আদর দেয়। আহ্লাদে সমস্বরে ডাকে। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। তাকে যেতে হবে। একবার পেছন ফিরে কবুতরগুলোকে দেখে নেমে এলো সিঁড়ি বেয়ে। এরপর বহুদিন কোনো মালিককে এবং খাবার না পেয়ে ওগুলো গন্তব্যহীন উড়াল দেবে পাটোয়ারী বাড়ি ছেড়ে। তখন এই বাড়ি পুরোপুরি প্রাণমুক্ত হবে!
অন্তূ নিজের রুমে এলো। নিজের রুম নয়। জয় আমিরের রুম! সে ভাগ পেয়েছিল। সেখানে ঢুকতেই তিন দেয়ালজুড়ে বড়বড় ফ্রেমে টাঙানো ছবি নজরে পড়ে। অন্তূ রুমটা দেখে। বিছানাটা পড়ে আছে। জয় আমিরের বালিশটাও। চাদরটা জড়ানো। রুমজুড়ে ভ্যাপসা একটা গন্ধ। জয় আমিরের শরীরের ঘাম-রক্ত-পারফিউমে মেশা বাসি গন্ধের সাথে আরও কিছু গন্ধ মিশে বদ্ধ ঘরটায় অদ্ভুত এক গন্ধ জড়ো হয়েছে।
আলমারী ভর্তি প্যান্ট-শার্ট, লুঙ্গি, পারফিউম, ঘড়ি…
রুমের আসবাব, বাথরুমের সরঞ্জাম, সেখানকার হ্যাঙ্গারে ঝুলছে তার গামছা, দুটো নোংরা তোয়ালে, বাথরুমের শুকনো মেঝেতে পড়ে আছে দুটো ভেজা লুঙ্গি। অন্তূর অস্থির লাগে। সে বসে মেঝের ওপর। মাগরিবের আজান হলো তখনই। সে আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে ওযু করে। বহুদিনের শুকনো বাথরুম ভিজে ওঠে তাতে। মাহেজাবিণ জয় আমিরের ঘরটাতে শেষবার মাগরিবের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে একাকিত্বের সুযোগে হু হু করে কাঁদে সে। তার সন্তান নেই, বাবা কবরে শায়িত, আজ কতকগুলো দিন আসামীও! জীবন খুব ভারী লাগে তার। সকাল থেকে কিছু খাওয়া নেই। খিদেও নেই। কান্না করার ফলে শরীর ও মন আরও অবসন্ন হয়ে এলো।
বেশ কয়েকবার বিভ্রম তৈরি হলো– ভারী পা মেলে জয় আমির ঢুকল অসময়ে হুট করে ঘরটায়। বেশিরভাগ সে রুমে আসতো তখন অন্তূ নামাজে থাকতো। আজও এলো, মাহেজাবিণ মোনাজাত ছাড়তেই জয় আমির এসে জায়নামাজের পাশে বসে। মাহেজাবিণ তাকায় না। তার অস্বস্তি হয়।
-“এত জ্বালাতন করছেন কেন?ʼʼ
-“তুই এসেছিস, আরমিণ। আমি তো এখানেই আছি।ʼʼ
-“এখানেই? এই ঘরে?ʼʼ
জয় আমির বেহায়ার মতোন মুচকি হেসে জায়নামাজের ওপর শোয়। অন্তূর কেমন অদ্ভুত আগে, গা ছমছম করে যেন। সব কেমন জীবন্ত লাগে। সে তাড়া দেয়, “নাপাক আপনি। উঠুন জায়নামাজ থেকে।ʼʼ
-“পাক তো তুমিও। তোমার ভেতরে জায়গা পেলাম যে!ʼʼ
-“পেলেন?ʼʼ
-“স্মৃতিতে পেলাম না? স্মৃতিই তো মানুষের ভেতর-ঘর, ঘরওয়ালি!ʼʼ
মাহেজাবিণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “ঘৃণিত স্মৃতি!ʼʼ
-“আরেহ্ উকিল ম্যাডাম, চলবে। আমি তো ঘেন্নাতেই থাকতে চেয়েছি, ভালোবাসা আমার পোষায় না। আপনার চোখের ঘেন্নায় আজীবন আমার বসবাস হোক, পরের জন্মে আবার সেই ঘেন্নার সাথেই ভার্সিটির মাঠে আমার-আপনার দেখা হোক!ʼʼ
-“একবার ধ্বংস করে তৃপ্ত হননি? আবারও সেই অভিশপ্ত সাক্ষাতের সাধই কেন?ʼʼ
এর জবাবে অন্তূ প্রতিধ্বনির মতো একটি আওয়াজ পায়,
“আমরা কেবল পুনরায় সাক্ষাতের জন্যই বিদায় নিই।ʼʼ
কথাটা বলে কি জয় আমির চোখ মারল? এরপরের মুহুর্তে মাহেজাবিণ গা শিউরে ওঠে, বিভ্রম ছোটে। আওয়াজটা কানে বাজে। জয় আমিরের কণ্ঠস্বর! বজ্রধ্বনির মতো তীক্ষ্ণ, গভীর-পৌরুষ ধ্বনি, যেন পাথরের ওপর গড়িয়ে চলা কোনো গম্ভীর নদীর, হিংসুটে স্রোতের গর্জন!
‘আমরা শুধু আবার দেখা হবার জন্যই বিদায় নিই।ʼ কথাটি সে শুনেছে। বিখ্যাত কেউ বলেছিলেন। ইংরেজি পঙক্তি!
‘We only part to meet againʼ
যতদ্রুত সম্ভব এখান থেকে বেরোতে হবে। রোজ স্বপ্নে অন্তূ প্যানিক অ্যাটাকের শিকার আজকাল। কখনও আব্বু, কখনও ছোট্ট একটি শিশু কখনও বা জয় আমির! কখনও বা একটি লোহার খাঁচায় অনেকগুলো রক্তাক্ত সাদা পায়রার ঝাঁক, তাকেই ডাকে, ডানা ঝাপটায়, সে তাদেরকে মুক্ত করতে হাত বাড়াতেই স্বপ্ন ভেঙে সে ক্ষুধার্ত দুনিয়ার জেগে ওঠে! যেখানে সে একজন ধ্বংপ্রাপ্ত নারকীয় জীবনের প্রতিনিধি!
সে ওঠে। এই কক্ষের কোনায় কোনায় পাপী লোকটার ঘ্রাণ আর খেয়ালে জড়ানো তেতো স্মৃতিরা থমকে আছে। মাহেজাবিণকে দেখছে। এত এত স্মৃতিদের নজরের সামনে মাহেজাবিণ অসুস্থবোধ করল। কেমন মানুষের ঘর সে করেছে! তার নারীজীবনের সংসারজীবনের সাক্ষী এই কক্ষটা। আটমাসের সংসার। এই কক্ষে একটা জয় আমিরের গল্প আছে, একটা আরমিণের গল্প আছে। দুটো মিলিয়ে দুই বিরোধী পথিকের গল্প আছে।
নিজের বইপত্র গুছিয়ে নিয়ে সে আলমারী খোলে আবার। তার ভয় লাগতে লাগল। আবার না জানি লোকটা এসে পাশে দাঁড়ায়। সে অস্থিরবোধ করে। ছবিগুলোতে জয় আমিরের হাস্যজ্জ্বোল দুর্বোধ্য চোখ তাকেই দেখছে!
আলমারিতে সেই পায়ে পেষা সিগারেটখানা পায় সে। সিগারেটটা ছোঁয় না অন্তূ। ওটা অশুভ। আলমারি আটকানোর সময় একখানা কাগজ পায়। কাগজ দেখেই মাহেজাবিণ বোঝে জয় আমিরের হাতে রাখা ওটা, তার জন্যই রাখা–কাগজটা মুচড়ে গেছে, এলোমেলো অযত্নে পড়ে আছে তাকের ওপর। কাগজটা খুলে তার হৃদস্পন্দনের দ্রুতি বাড়ে। মুরসালীন মহানের চিঠি!
সে সকল গল্পকে দরজার পেছনে বন্দি করে বেরিয়ে আসে রুম থেকে। একটা বিছানা, তিনটে দেয়াল, একটি ড্রেসিং টেবিল, কাঠের আলমারী, কয়েকটি ফুলদানী, শার্ট ঝুলানোর হ্যাঙ্গার, কাউচটা গল্পগুলো গিলে চুপ করে শেষবার দেখে মাহেজাবিণকে।
—
মাহেজাবিণ জানে না মরিয়ম বেগম কোথায় থাকেন। সে গেল সেই বাড়িতে, যেখানে আনসারী মোল্লা ও রউফ কায়সারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল তারা। যাবার পথে আত্মরক্ষার জন্য সঙ্গে একটি ছুরি নেয়। রঙচটা পুরোনো জীর্ণ-শীর্ণ বাড়িটি বাঁশেরহাট থেকে কমবেশি বিশ মিনিটের পথ, সুইহারী আশ্রম ও দিনাজপুর সরকারী কলেজের মাঝামাঝিতে। হেঁটে গেলে ঘণ্টাদেড়েকের পথ।
মাহেজাবিণ পৌঁছাল বিকেলের দিকে। আশা রাখল, কাউকে অন্তত পাবে, তার কাছে মরিয়ম বেগমের ঠিকানা জেনে নেবে। তার বুক ধুকপুক করে। দেখা হলে সে কী করে একজন মায়ের কাছে বলবে, আপনার মুরসালীন মহান মুক্তি পেয়েছে, এই পরাধীন দেশ থেকে তার বিপ্লবী আত্মা স্বাধীন আসমানে উড়াল মেরেছে।
আশ্চর্যজনকভাবে একজন নারী বেরিয়ে এলেন সেদিন দরজা খুলে। মলিন কাপড়ের হিজাব, মুখটা আবৃত তার প্রান্তে। অন্তূ নিকাবের মুখ খুলে সালাম জানায়, “আসসালামুআলাইকুম, চাচিআম্মা!ʼʼ
-“ওয়ালাইকুমুসসালাম।ʼʼ উল্লাসিত হয়ে অন্তূকে জড়িয়ে ধরে কপালে-মুখে চুমু খান নারীটি। শরীরে কী সুন্দর মা মা ঘ্রাণ! অন্তূর অস্থির লাগে।
-“আপনি কি চেনেন আমাকে, চাচিআম্মা?ʼʼ
-“আগে ভেতরে আয়। আয়, আয়!ʼʼ
অন্তূকে নিয়ে গিয়ে মলিন এক বিছানায় বসায়।
-“তোর অপেক্ষায় আল্লাহর কাছে রোজ মোনাজাত করি, এতদিন পর আসলি। আমারে চিনিস না, না? আমি কিন্তু তোরে খুব চিনি।ʼʼ
-“কে আমি?ʼʼ
কী অদ্ভুত এক হাসি হাসেন নারীটি, “জয়ের বউ!ʼʼ
মাহেজাবিণ আজ লজ্জিতবোধ করে এই পরিচয়ে। তা সামলে শুধায়, “আপনি কে?
-“মুরসালীনের খোঁজ আনিস নাই?ʼʼ
অন্তূর হৃৎপিণ্ড দ্রিমদ্রিম করে বাড়ি পাড়তে লাগল। এটা কি মুরসালীন মহানদের বাড়ি? নারীটি কে? চেহারাখানা কি মুমতাহিণার মতো নয়? অন্তূ ঢোক গেলে।
মরিয়ম বেগম পানি আনলেন। কিছু খেজুর ও দুই পিস কেক এনে হাত ধরেন মাহেজাবিণের।
-“খা, মা। নে, মুখে দে। ঘরে আর কিচ্ছু নাই।ʼʼ
মাহেজাবিণ মায়ের স্নেহ অনুভব করতে লাগল।
-“মুরসালীনটা কোথায় রে এখন? তোর স্বামীর জাহান্নামে এখনও পচতেছে? জয়রে আনলি না! ও কেমন হইছে দেখতে? আমার কথা মনে আছে ওর? মনে থাইকলে আমার গর্ভের ধনগুলারে এমনে কোরবানী করতো না। মনে নাই ওর। ছোটবেলার কথা তো! সেই কবেকার কথা—ওরে আর মুরসালীন-মুস্তাকিনরে এক দস্তরখানে বসায়া দুইটা ডিম তিনজনরে ভাগ করে দিছি। জয় এতিম তো। ওরে একটা গোটা ডিম দিতে বলে যাইতো তোর চাচায়। নয়ত আল্লাহ নারাজ হয়। মুরসালীন আমার খুব খিটখিটে। কথা হইছে কোনোদিন ওর সাথে? ও আমার সাথে ঝামেলা করতো, ‘আম্মা ওই জয়রে আপনি বেশি ভালোবাসেন, আমার আর ভাইয়ের চাইতেও?ʼʼ
মরিয়ম বেগম হিজাবের এক প্রান্তে চোখ মুছে হাসেন, “জয় আসলে ওরে আমি খালি জিগাইতাম, ওর কি মনে পড়ে না কিছুই? আমার কথা মনে পড়লে আমার ছেলে দুইটারে কম ব্যথা দিতো। ওরে আনিস তো মা, এরপরের দিন। আমি তো চিনি না বাড়ি। কতবড় হইছে, বিশাল ব্যাটাছেলে হইছে না রে? তখন ছিল না। ওর খালি জ্বর আসতো। জ্বর আসলে পালায়ে মাদ্রাসা থেকে আমার কাছে আসতো লুকাইতে।দেখি নাই কতদিন। যাইতে চাইছি কতদিন। চিনলে কবে যাইতাম। হামজা আমারে চিনে না। জয় কি ভুলছে? মুরসালীন আমারে বাড়ি থেকে বাইর হইতে নিষেধ কইরে গ্যাছে। জাহিলটা আর ফিরে নাই। আমি চিনি না বলে যাইতে পারি না জয়ের কাছে। এখন কত কাছে থাকি। মুরসালীন বলছে, এই বাড়িটা খুব দূরে না। এখন আসছিস, জয় জানে?ʼʼ
মাহেজাবিণ আস্তে কোরে বলে, “জানে না।ʼʼ
-“না জানায়ে ক্যান আসছিস? জানলে যদি খারাপ হয়? কোথায় সে?ʼʼ
মাহেজাবিণ গভীর মনোযোগে এক কোমল, মমতাময়ী পৌঢ়া নারীকে দেখতে দেখতে বলে, “নেই সে।ʼʼ
বোঝেন না মরিয়ম, “নাই? নাই কী?ʼʼ
মাহেজাবিণের গলাটা কাঁপে, “আপনি আমায় দুজন মৃত মানুষের ব্যাপারে অনেক কথা শুনিয়ে দিলেন, চাচিআম্মা।ʼʼ
মরিয়ম বিশ্বাস করেন না। দুজন মৃত মানুষ? কারা মৃত? উনার হাতে এখনও এটো লেগে আছে জয়, মুরসালীন ও মুস্তাকিনের ভাত মেখে দেয়া এটো হাত। এরপর জয় হারিয়ে গেল। তবু তিনজনের হাত মাখতে হয়েছে। মুমতাহিণা, মুরসালীন, মুস্তাকিন…
মরিয়ম সহ্য করতে পারেন না, বিশ্বাস করার পদ্ধতি জানা তাঁর নেই। তার হাতে ভাত খাওয়া চারজন একে একে ফুরিয়ে গেছে! তাঁর হাত ও তিনি তো এখনও অক্ষত! এটা নিয়তির কেমন খেলা?
মুরসালীন তো এই কথা দিয়ে যায়নি! এবার আর ক্ষমা নেই শয়তান ছেলের। সে বলে গেছে, ফিরে আসবে। কারণ উনার আর কেউ নেই। আল্লাহ এতটা নিষ্ঠুর হবেন কেন তাঁর ওপর? কী আশ্চর্য কথা! মরিয়ম বেগম তো দুশ্চিন্তাই করেন না। কারণ তিনি জানেন জয়ের কাছে বন্দি মুরসালীন। জয় কি মুরসালীনকেও মারবে? উনার ধারণা মারবে না। কারণ তিনি যে বোকা, এটা তিনি জানেন না। জয় তাঁর স্বামী ও বড় সন্তানকে নিজ হাতে মেরেছে, মেয়েটা জয়ের দোসরদের হাতে ইজ্জত হারিয়ে প্রাণ দিয়েছে, তবু সরলা নারী জয়ের ওপর ভরসা রেখে আজও বিশ্বাস করতে চান না মুরসালীনকেও ছাড়া হয়নি তার বুকে ফেরার জন্য।
মাহেজাবিণ চিঠিটা দেয়। মরিয়ম অল্প শিক্ষিতা। মুরসালীনের চিঠি পড়তে পারবেন। মুরসালীনকে বাংলা লেখা তিনিই তো শিখিয়েছেন! আজ কত বড় নিমোকহারাম হলে মুরসালীন সেই বাংলায় উনার কাছে শেষ চিঠি ছেড়ে যায়! এমন ছেলেদের না জন্ম দেয়া উচিত। তিনি বোকা নারী। তাই তিনটে সন্তানকে পরপর নয়মাস করে গর্ভে ধরে পথে ছেড়ে দিয়েছেন দুনিয়ার ক্ষুধা মেটাতে।
তিনি অবিশ্বাসের সাথে চিঠিটা খোলেন। এক অবাধ্য ছেলের এলোমেলো হাতের লেখা—
আমার প্রাণপ্রিয় আম্মা,
…..
আপনার মুরসালীন বেঁচে থাকবে, আম্মা। মুরসালীনদের মৃত্যু নেই। আপনি শুধু লাখোদের মাঝে খুঁজে নিতে পারলেই কতশত মুরসালীনকে পাবেন। আমি বেঁচে রইলাম।
আজ আর কিছু লিখব না। আজ শুধু ভাবব। মৃত্যু কি শেষ না শুরু! এই শহরে মৃত্যু কি আসক্তি নাকি অনীহা!
মরিয়ম কাঁদলেন না। চিঠিটাতে একটু পরপর চুমু খেলেন, অল্প হেসে চিঠিখানা বুকের সাথে বাহুডোরে চেপে ধরে আকাশের দিকে মুখ তুলে চেয়ে থাকলেন। যেমনটা শিশু জন্মালে নতুন মায়েরা শিশুকে কোলে তুলে করে, ওমন।
মাহেজাবিণের সহ্য হয় না। তার চোখ দিয়ে ঝুপঝুপ করে পানি ঝরে পড়ে। মুখটা শক্ত, অথচ থুতনিটা তার থরথর করে কাঁপে, বুকের উঠানামা অস্বাভাবিক বাড়ে। একটি মুরসালীন মহানের চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ব্যথায় হেসে ওঠা দৃঢ়প্রত্যায়ী এক সিংহপুরুষ! কানে বাজে মুরসালীনের খালি গলায় গেয়ে ওঠা বজ্রের মতো ধ্বনি–
সেদিন আর রবে না হাহাকার, অন্যায়-জুলুম-অবিচার
থাকবে না অনাচার, দূর্নীতি কদাচার,
সকলেই শান্তিতে থাকবে
সেইদিন আর নয় বেশি দূরে, কিছুপথ গেলেই মিলবে
কোনো একদিন এদেশের আকাশে…..
আছরের নামাজ মাহেজাবিণ মরিয়মের সাথে আদায় করলেন। মরিয়ম কাঁদলেন না। পাথরের মতো তার সহনশীলতা যেন। অস্বাভাবিক নয়। যে নারী যৌবন থাকতে বিধবা হয়েছেন তিন সন্তান নিয়ে, এরপর তিনজনের মৃত্যুর খবর তিনি পেয়েছেন জীবন্ত কানে, তার ভেতরে কতটা দৃশ্যমান উন্মাদনা অবশিষ্ট থাকতে আছে? তার বেঁচে থাকাই বাহুল্য আজ। তাঁর সিজদাগুলো লম্বা হলো। কে জানে রবের কাছে কী বা কী সন্ধি করলেন!
মাহেজাবিণ লজ্জায় মাথা তুলতে পারে না। সে আজ একটি মায়ের সামনে বসে আছে, এক নিকৃষ্ট পাপীর স্ত্রী হিসেবে, যে সেই মায়ের তিনটি সন্তান ও স্বামীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হত্যাকারী। তার আজ মনে হলো–এই গ্লানি ও লাঞ্ছনা সেদিন জয় আমিরের নাটকীয় আয়োজনে নষ্টা প্রামাণিত হবার চেয়ে বেশি। কেননা সেদিন মন অন্তত জানতো সে নষ্টা নয়। আজ মনটাই আগে জানে সে পাপীর স্ত্রী!
আব্বু বলতো, ‘অন্তূ রে! আমরা যখন সিজদা দিই, সিজদার স্থানটা তখন আর জমিন থাকে না, ওটা আল্লাহর পাক কদম হয়ে যায়। আমরা তখন ভক্তিভরে কপালটা ঠেকাই মহান রবের পায়ের ওপর।ʼ মাহেজাবিণ তাই সিজদায় রবের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে এক জীবনের এই লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি ও ক্ষমা চায়। ডুকরে কাঁদে পাগলের মতো। থরথর করে কাঁপে তার সিজদারত শরীর। মরিয়ম তাকে সামলান। উষ্ণ বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলেন, “আমার মুমতাহিণা আজ কতদিন পর নামাজ পড়ল আমার সাথে বসে।ʼʼ
মাহেজাবিণ কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয় মরিয়মের কাছে একটি মুমতাহিণা হতে পেরে। মুমতাহিণা হতে ভাগ্য লাগে। সে ঠিক করে ফেলে মার্জিয়ার মেয়ে হলে আজ এই মুহুর্তে তার নাম হলো মুমতাহিণা। মাহেজাবিণ আজীবন এই নামে ডাকবে অন্তিকের মেয়েকে, প্রতিবার মুমতাহিণা জেগে উঠবে তার ডাকে।
মাহেজাবিণ ফজলে রাব্বীকে পেল। যে মরিয়ম বেগমের দেখাশোনা করে। দাওরাহ্ বিভাগের ছাত্র ছিল। মাদ্রাসা বন্ধ হবার পর মুরসালীন ভাইয়ের মায়ের সেবায় রয়ে গেছে। এটা তার কাছে ইবাদতের মতো।
মাহেজাবিণ মরিয়মের দুটো হাত জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করে ওঠে, “আপনি আমার সাথে যাবেন, চাচিআম্মা! এখানে আর কে রইল আপনার? আমার আম্মু আছে আপনার মতো। স্বামী-সন্তান আল্লাহ নিয়ে গেছেন। তার শুধু একটা অন্তূ আছে। সেই অন্তূ আপনারও হতে চাইলে আপত্তি হবে খুব?ʼʼ
মরিয়ম এবার কাঁদলেন, “যাতে তুইও ধোকা দিতে পারিস আমারে? যেমনে ওই তিনটায় দিছে?ʼʼ
মরিয়ম রাজী হন না। তার কাছে ওসব চিঠির মূল্য নেই। মুরসালীন তাকে এখানে অপেক্ষা করতে বলে গেছিল, তিনি করবেন। ফিরবে কিনা সেটা মুরসালীন জানে। তিনি দেখতে চান মুরসালীন কতবড় অবাধ্য হয়েছে!
মাহেজাবিণ ব্যর্থ হয়। এক মায়ের জেদ ও মায়ার কাছে হার মানতে হয় সেদিন। তার একটা শখ ছিল এক নজর মুস্তাকিন মহানের ফটো দেখার। মুস্তাকিনের ছদ্মবেশে পরাগ আজগরের কাছে প্রতারিত হয়ে সে জীবনে সর্বপ্রথম পরপুরুষের ছোঁয়ায় নাপাক হয়েছে। তার দেখতে মনে চায় এমন মায়ের গর্ভে জন্মানো আসল মুস্তাকিন কেমন ছিল? সে সেই স্থলে থাকলে নিশ্চয়ই নিজের সবটুকু দিয়ে অন্তূকে রক্ষা করতো সেদিন!
—
তারপর মাহেজাবিণ কবীরের সাথে কুষ্টিয়া গেছিল দু’দিন পর। একটা পার্টি দেখে ফেলেছে কবীর। জমিটুকু বিক্রি হয়ে যাবে আশা করা যায়। মাহেজাবিণ তুলি ও কোয়েলকে সাথে নিলো। রিমি ও হামজা তখনও হাসপাতালে। পুলিশ পাহারায় হামজার চিকিৎসা চলছে তখন। নির্দিষ্ট মাত্রার সুস্থতা না এলে তাকে আদালতে হাজির করা যাবে না। মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেবার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা দাঁড়িয়ে যাবে।
মাহেজাবিণ কবীর, তুলি ও কোয়েলকে নিয়ে কুষ্টিয়া পৌছানোর পর মাহেজাবিণ অন্তিকের মেয়েকে পায়। এবারের ঈদুল ফিতরের চাঁদরাত্রির শেষভাগে মার্জিয়ার নাড়ি ছিঁড়ে এতিম কন্যা দুনিয়ায় এসেছে, যখন জয় আমির দুনিয়ার মায়ার সুঁতো ছিড়ে দুনিয়া থেকে পালিয়েছে। মার্জিয়া মাহেজাবিণকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ভাসায়। যেন তার কত যুগের প্রতীক্ষা পুরো করে মাহেজাবিণ তার চৌকাঠে পদার্পন করেছে।
মাহেজাবিণ তখন আবারও উপলব্ধি করে তার ধ্বংসপ্রাপ্ত জীবনটা কতগুলো জীবনের ভরসাস্থল! এখন তার নিজের জন্য নয়, বাঁচতে হবে অনেকগুলো বাঁচতে চাওয়া প্রাণের জন্য। সে বুঝতে পারে না কবে হয়ে উঠেছে সে এমন ভরসার কেন্দ্র? সে চাইছিল মরে যেতে, চাইছিল কারাবরণ করতে! অথচ কতগুলো মুখ তার দিকে মুখ তুলে চেয়ে! মার্জিয়ার চোখের ভরসা মাহেজাবিণকে বাঁচতে শেখালো। রাবেয়ার হাসিমুখের ডুকরে কেঁদে ওঠা তাকে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে বলল। সদ্য জন্মানো এক অভাগী শিশু প্রথমবার কোলে চড়ে তার আঙুলটা মুঠপাকানো হাতে চেপে ধরে রইল। মাহেজাবিণকে বলল, বেঁচে থাকতে। বলল, তার প্রতিশ্রুতি আদায় করতে, ফুপু কম, বাপ হয়ে পালন করতে।
জমটুকু চারলাখের বেশিতে বিক্রি করা গেল না। একে তো পেছনের জায়গা, তার ওপর কস্তুরীর খাল। আমজাদ সাহেবের পরিত্যক্ত বাড়িটা হয়ে উঠল একটি অসহায় নারী-শিশুদের আশ্রম। যেটার দেখভালের দায় মাহেজাবিণ আরমিণ অন্তূর। তুলি, কোয়েল, রাবেয়া, মার্জিয়া, মার্জিয়ার মেয়ে…
কবীর মাহেজাবিণের সহকারী। তার ছেলেরা সেখানকার পাহারাদার।
হামজার আদালতের তারিখ পেছালো। কয়েকমাস অবধি পিছিয়ে গেল। পুলিশ হেফাজতে তার যথাসম্ভব চিকিৎসার চেষ্টা চলতে লাগল। যা ব্যর্থ! হামজাকে ট্রমা থেকে বের করা অসম্ভব, যা তার স্নায়ুকে প্রতিক্ষণে পুরোপুরি মৃত করে তুলছিল। তার মস্তিষ্ক অবজার্ভ করার পর নিউরোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিস্টদের সম্মিলিত বোর্ড বসতে লাগল। উপরমহল থেকে টুকটাক গোপন প্রচেষ্টাও চলতে লাগল তাকে বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থায়। হাজার হোক সে একজন সম্ভাবনাময় নেতাকর্মী ছিল। তার সুস্থতা সবার কাম্য।
সেই সময়টাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কিছুটা কমে এসেছে। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরের ১২ তারিখ। বিকেলের দিকে মাহেজাবিণের দরজায় দোলন সাহেব এলেন। সঙ্গে একখানা মাঝারি ফাইল।
দোলন সাহেব সোফায় বসে চারপাশটা দেখতে দেখতে মাহেজাবিণের হাতে ধরিয়ে দিলেন ফাইলটা। ভেতরে দুটো কাগজ। দুটোই হাতে লেখা। প্রথমটা খুলে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী ও আইনজীবী হবার স্বপ্নদেখা মাহেজাবিণের মনে হলো এটা কোনো হাতে লেখা উইলপত্র–হলোগ্রাফিক উইল।
নিচে জয় আমিরের হস্তসাক্ষর।
তারিখ– ২৩ এপ্রিল, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ।
চলবে…