#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৮.
মার্জিয়ার চাচার বাড়ির লোকসকল আসছে। মার্জিয়া রান্না করছে যত্ন করছে। রাবেয়াও টুকটাক উৎসাহী। অন্তূকে বুঝিয়েছেন, দেখতে এলেই বিয়ে হয়না। তাছাড়া কুটুমও। আমজাদ সাহেব বাজার গেছেন হালকা পাতলা দই-মিষ্টির ব্যবস্থা করতে!
অন্তূর বুক ভার, মুখ গম্ভীর। টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে বইয়ে নজর বুলাচ্ছে। জানা নেই লোকগুলো কেমন হবে, তাদের সামনে বসার পর কী প্রশ্ন করবে, শেষ অবধি কী হবে! জীবনসঙ্গী আব্বুর মতো হতে হবে, কথা শেষ। অবশ্য এটুকু ভরসা আছে, যেন-তেন কারও কাছে সম্বন্ধ করবেন না আমজাদ সাহেব। বই ছেড়ে উঠে পড়ল, পড়ায় মনোযোগ আসছে না।
আলো-বাতাসপূর্ণ ঘরটা আমজাদ সাহেব অন্তূকে দিয়েছেন। বারান্দায় কিছু টব রাখা আছে। অ্যালোভেরা, পাথরকুচি, নয়নতারা, পাতাবাহার গাছ আছে। বারান্দা থেকে আলো ঠিকরে আসছে রুমে। রুমের মাঝে কিছুক্ষণ পায়চারী করল।
পরনে কালো সেলোয়ার-কামিজ। ওড়নাটা সিল্ক সুতির, গায়ে জড়ানো, যার আঁচল মাটি ছুঁয়ে ঝুলছে। চুলের বেণী খুলেছে অল্পক্ষণ, চুলগুলো এলোমেলো। ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া আসছে বারান্দার গ্রিল ভেদ করে খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরে। অন্তূ পায়চারী করতে করতে হঠাৎ-ই গেয়ে উঠল গুনগুনিয়ে,
~আগে কত বৃষ্টি যে দেখেছি শ্রাবণে, জাগেনি তো এত আশা, ভালোবাসা এ মনে…
অন্তূ থমকাল। সে এমন যুবতী সুলভ আচরণ সচরাচর করেনা! মুচকি হাসল।
ফর্সা দেহে কালো পরিচ্ছদ দারুণ চমকাচ্ছে, তার ওপর সূর্যরশ্মির প্রতিসরণাঙ্কন ঝিকিমিকি করে উঠছে মাঝেমধ্যেই! বাড়ির দরজায় কেউ এসেছে। পায়চারী থামাল, আবার শুরু করল।
আমজাদ সাহেব ফিরেছেন। রাবেয়া দরজা খুললেন। দৃশ্য অন্যকিছু। তিনটে যুবক দাঁড়িয়ে আছে। জয়ের পরনে চিরায়ত সাদা থানের লুঙ্গি। ছিপছিপে লম্বা দেহটাতে লুঙ্গি বেশ মানায় তার সাথে। হাসিমুখে সালাম দিলো সুন্দর করে, “আসসালামুআলাইকুম, চাচিমা! আমি জয় আমির! মেম্বারের ভাগ্নে!ʼʼ
রাবেয়া পিছিয়ে দাঁড়িয়ে হাসলেন, “ওহহো জয়! আয় আব্বা, ভিতরে আয়!ʼʼ
জয় ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “আপনি চেনেন আমাকে?ʼʼ
-“চেনবো না? রাস্তায় রাস্তায় পোস্টার দেখি তো! হামজার পাশে তোমার ছবি দেখি!ʼʼ
জয় চমৎকার লাজুক হাসল। রাবেয়া নাশতা আনতে গেলেন। জয় হাসল। আরমিণের মা খুব লোকসুলভ নারী। এদিক-ওদিক তাকিতুকি করল কাঙ্ক্ষিত মানুষটির দেখা পাবার আশায়। কবীর ও লিমনকে বলল, “মহাদেবের ভক্ত নাকি রে তোরা! আবার আলাদা করে বসার দাওয়াত দেব? বস।ʼʼ
অন্তূর রুম থেকে হালকা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। অন্তূর ধারণা মেহমান এসেছে। পরক্ষণে মনে হলো, পাওনাদার এসে আম্মার সাথে বিবাদ বাঁধিয়েছে! খানিক মানসিক প্রস্তুতির সাথে চুলগুলো হাত দিয়ে একটু এদিক-ওদিক থেকে সরিয়ে দ্রুত কালো ওড়নাটি জড়িয়ে নিলো মাথা-দেহে। ওড়নার বর্ধিত এক প্রান্ত দ্বারা মুখটা ঢাকলো আলতো করে।
বসার রুমে পা রাখতেই চোখাচোখি হলো জয়ের সাথে। ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠল শরীরটা অন্তূর। থমকানো হাতের শিথিলতায় মুখের আবরণ সরে ঠোঁট ফাঁকা হলো সামান্য!
জয় চোখ সরালো না বেহায়ার মতো গিললো অন্তূর সুরতটুকু। এর আগে সে তার চপল প্রতিদ্বন্দিনীকে দেখেনি। তার দৃষ্টিতে বহুকিছুর সংমিশ্রণ। প্রথমেক্রূর হাসি ছিল, সেটা এক সময় বিলীন হয়ে অভিভূত হয়েছে চোখদুটো, ধীরে ধীরে সময়ের আবর্তনে তাতে মিশেছে ক্রমশ মুগ্ধতা। বেশি হলে চার সেকেন্ডের ব্যবধানে অঘটন ঘটলো।
চোখের পলকে মুখের আবরণ তুলে নিলো অন্তূ। মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়াল, “আপনি? আপনি এখানে এসেছেন কেন? বাড়ি অবধি পৌঁছে গেছেন। আগে থেকেই চিনতেন আমার বাড়ি?ʼʼ
জয় নিজস্ব ভঙ্গিমায় নজর ফিরিয়ে নিলো। পায়ের ওপর পা তুলে বসল। সোফার উপরিভাগে একহাত ছড়িয়ে বেশ আরাম করে অন্তূর প্রশ্নের জবাব দিলো, “বাড়িতে অতিথি এলে এভাবে ট্রিট করো, আরমিণ! নট গুড! ছ্যাহʼʼ
-“অতিথি ভেদে আচরণের রঙ ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়!ʼʼ
-“হ। আমারে অতিথি হিসেবে একটু বেশিই পছন্দ হবারই কথা। আফটার অল আমি।ʼʼ
অন্তূ মুখের কাঠামো শক্ত করল। রাবেয়া এলেন। তার মুখে স্মিত হাসি। জয় নিজের ফর্ম চেঞ্জ করে ভদ্র হলো। রাবেয়ার হাতের ট্রের দিকে চেয়ে বলল, “আরে আন্টি! এসব কী? দুটো কথা বলতে এসেছি, তা না শুনে কীসব আয়োজনে লেগেছেন!ʼʼ
-“উমম! ছেলে বেশি কথা বলো।ʼʼ স্বর নরম করলেন, “খা বাপ। ঠাণ্ডা পানি আনি।ʼʼ
অন্তূ হতাশ হলো। তার মা’টা ভীষণ সরল। যেকোনো যুবক-যুবতীকে খাতির করেন। মহানবী যুবকদের ভালোবাসতেন, তাই। জয় এক টুকরো খাবার তুলে দাঁতের আগায় ছোট্ট কামড় দিয়ে রাবেয়ার চোখ বাঁচিয়ে অন্তূকে চোখ মারল। শয়তানের মতো হাসল। রাবেয়াকে জিজ্ঞেস করল, “আজ কোনো আয়োজন আছে নাকি বাড়িতে, চাচিমা? গমগম করছে বাড়ি কেমন?ʼʼ
রাবেয়া হাসলেন, “হ বাপ! আমার ছেলের শশুরবাড়ির লোক আসবে, সাথে অন্তূরে দেখতে আইতেছে।ʼʼ
জয় ভ্রু উচিয়ে হাসল, “আচ্ছা!ʼʼ
অন্তূ মায়ের ওপর বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত খিঁচল। কিন্তু ভেতরে গেল না। কী উদ্দেশ্যে এসেছে জয় আমির, তা অনিশ্চিত। রাবেয়া জিজ্ঞেস করলেন, “ক্যান আইছিলি বাপ?ʼʼ
জয় হাসল, “আসলে চাচিমা! ক্লাবের চাঁদা নিতে এসেছিলাম। জোর জবরদস্তি নেই কোনো, ইচ্ছে হলে..
রাবেয়া উঠে দাঁড়ালেন, “এমনে বলতেছ ক্যান! পাড়ার ক্লাব তো আমাদের সুরক্ষা, হামজা, তুমি এরা তো সুনার ছেলে। দাঁড়া।ʼʼ
রাবেয়া গেলে অন্তূর ওপর খ্যাকখ্যাক করে উঠল জয়, “আম্মাজান তো ভালোই! তুমি শালি এরম খিটখিটে ক্যান?ʼʼ
অন্তূ ঝাঁজিয়ে উঠল, “দুর্ভাগ্যবশত আম্মা আপনার প্রকৃতি জানে না। কেন এসেছেন সেটা বলুন!ʼʼ
-“তোমারে দেখতে আইছিলাম। তুমি যা খ্যাচড়া!ʼʼ
-“ধন্য করলেন।ʼʼ
জয় ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেল। অন্তূ বেশ শান্ত করে বলল, “আপনাদের ক্লাবের জন্য চাঁদা চাইতে আসতে লজ্জা করল না? কী কাজে লাগে ওই শয়তানের ঘাটি?ʼʼ
জয় হাসল, “বাড়ি বয়ে এসে যদি থাপড়ে যাই, ব্যাপারটা খারাপ দেখাবে না, আরমিণ? চুপ করো, নয়ত তোমার মা টা মানবো বলে মনে হয় না, থাপড়ে চারটে দাঁত উপড়ে দেব। বাড়ি অবধি যখন চলে এসেছি, তোমার টুটি চেপে ধরে দম আঁটকে মারতে কতক্ষণ?ʼʼ
অন্তূ চুপ রইল। সে ভয় পাচ্ছেনা, এমন নয়। জয়ের মতো উগ্র ছাত্রনেতাদের ভয় পাওয়াই তো নিয়ম। ওরা জঙলি।
জয় মুখ ভেঙচায়, “আজ নাকি বলি দেয়া হবে তোমার। কোন মনসুর আসতেছে দেখতে?ʼʼ
নজর ঘুরিয়ে পুরো আপাদমস্তক উপর-নিচ করে দেখল অন্তূর। ভালোই লাগছে তার। অন্তূ সেই নজর লক্ষ্য করে জমে গেল যেন। বাড়ি বয়ে এসে এক অমানব তার শরীর মাপছে। আল্লাহ পাক কবে পিছু ছাড়াবেন এই শয়তানের থেকে? রাবেয়া উৎফুল্ল পায়ে রুমে ঢুকলেন। তার হাতে জড়ানো, মুচরানো দুটো শ টাকার নোট। জয় কবীরকে ইশারা নিতে। রাবেয়া বললেন, “চলবে এতে?ʼʼ
টাকা জয় দেখেইনি। তার নজর ছিল অন্তূর শরীরে। দ্রুত মাথা হেলিয়ে বলল, “চলবে? হ্যাঁ হ্যাঁ চলবে, চাচিমা। না চললে ধাক্কা মারব।ʼʼ
আমজাদ সাহেব ভেতরে ঢুকে একটু অবাক হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে সালাম দিলো জয়, “আসসালামুআলাইকুম, কাকা! ভালো আছেন? শরীর-টরীর ভালো!ʼʼ
আমজাদ সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে গম্ভীর হাসলেন, “ভালোই। কী ব্যাপার?ʼʼ
জয় বলল, “এইতো কাকা, বিশেষ কিছু নয়!ʼʼ
-“কবে এসেছ ঢাকা থেকে?ʼʼ
-“দিন কয়েক হলো। আপনি নাকি রিটায়ার করেছেন?ʼʼ
-“করতে তো সকলকেই হয় রে, বাপ।ʼʼ
আমজাদ সাহেব ভেতরে ঢুকে গেলেন। অন্তূ গেল না। রাবেয়া জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার আব্বা-আম্মারা সব ভালো আছে তো ,জয়?ʼʼ
জয় একটু বিপাকে পড়ল যেন এবার। ঠোঁট কামড়াল, “ওপারে ভালোই আছে মনেহয়। মরার পর আর দুঃখ কীসের মানুষের?ʼʼ
আঁতকে উঠলেন রাবেয়া, “সেকি! কেউ নেই?ʼʼ
জয় জবাব দিলো না। অন্তূ এই প্রথম জয়ের মুখটা কিঞ্চিৎ শুকনো দেখল, প্রথমবার রসিক জয়কে গম্ভীর দেখালো। রাবেয়ার মায়া হলো তাগড়া ছেলের ওমন নীরব অপারগ মুখ দেখে। সস্নেহে কাছে গিয়ে বসে চুলে হাত বুলালেন, “একা থাকো বাড়িতে?ʼʼ
জয় মাথা নাড়ল, “মামার কাছে থাকি। আচ্ছা, আজ আসি। আবার আসব!ʼʼ
রাবেয়া বলল, “আবার আসবে। মাঝেমধ্যেই আসবে কিন্তু। জয় বলে ফেলল, “আচ্ছা, আম্মা! চাচিআম্মা।ʼʼ ভুলেই বলল অথবা ইচ্ছে করে বোঝা গেল না।
-“আম্মা বললে পাপ হবে নাকি? বলতে মন চাইলে বলবে!ʼʼ
যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে ফিরে তাকাল অন্তূর দিকে। ঠোঁটের কোণে বাজে হাসি। অন্তূ চোখ নামিয়ে নিলো। বুকে অস্থিরতা, আতঙ্ক।
জয় বেরোনোর সময় সেদিন পাড়ার দুটো মহিলা ঢুকেছিল অন্তূদের বাড়িতে। জয় সহ কবীর, লিমনকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল তারা। অন্তূর ভয় হলো। বাঁকা নজর, বাকা চিন্তাধারা মহিলাদের! না-জানি কোথায় গড়ায় এই নীরব দৃষ্টি।
বাইরে বেরিয়ে রোদচশমা চোখে লাগাল। বাইরে রোদ। কবীর বলল, “ভাই! আমাদের ক্লাবের চাঁদার জন্য তো আগে এইদিক আসা হয় নাই!ʼʼ
-“তাতে কী?ʼʼ
-“গতকালের পিকনিক আজ আছে, সেইজন্য টাকা নিলেন?ʼʼ
জয় বিরক্ত হলো, “তোর মনে হয়, আমাদের পিকনিক এসব টাকায় হয় বা হবে? গু খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিস, নাকি বেশি খাচ্ছিস? এ ব্যাপারে আর প্রশ্ন করিস না।ʼʼ
কবীর গোমরা মুখে বলল, “কী করব এই টাকার?ʼʼ
জয় হাসল, “কত দিয়েছে?ʼʼ
-“দুইশো!ʼʼ
-“যা, আর কিছু লাগিয়ে এক প্যাকেট ব্যানসন এণ্ড হ্যাজেস আন। যদি হয়, তো এক বোতল বাংলা মালও আনতে পারিস। পিকনিকে যতক্ষণ রান্না শেষ না হয়, চলবে।ʼʼ
—
ক্লাবের পেছনে বিশাল খোলা মাঠ। সেখানে ব্যাডমিন্টনের তারজালি টানানো, লাইট লাগানো হয়েছে, কোট আঁকানো হয়েছে। কেউ কেউ র্যাকেট দিয়ে শার্টল কর্ক টুকাচ্ছে সেখানে।
ক্লাবের দোতলা মরিচা ধরা বিল্ডিং। দোতলার ওপরে পেছনের দিকে, মাঠের ওপরে খোলা বারান্দা বা ছাদ অথবা সিঁড়িঘরের মতো। সাত-আটজন ছেলেরা দাঁড়িয়ে-বসে আছে সেখানে। অর্ধেক কার্নিশের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আপনমনে সিগারেটের ধোঁয়া গিলছে জয়। এই সময় সে গা গরম রাখতে ব্যাডমিন্টনে নেমে পড়ে। জম্পেশ পিটিয়ে যায়। ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে যায় শরীর।
আজ রান্নার কাছে না গিয়ে বরং উদাস চোখে ওপরে উঠে এসেছে গিটারটা কাধে নিয়ে। তারপর থেকে একটা করে সিগারেট জ্বালাচ্ছে।
হামজা ঢুকল। সকলে একযোগে দাঁড়িয়ে সালাম ঠুকল। হামজা জয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী ভাবছিস?ʼʼ
-“ভাবছি না।ʼʼ
-“কী হয়েছে, কোনো সমস্যা?ʼʼ
-“সমস্যাই তো।ʼʼ
-“কী?ʼʼ
জয় তাকাল, “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমার জীবনে কোনো সমস্যা নাই। এই সমস্যাটা একটা সমস্যা না, ভাই?ʼʼ
হামজা গম্ভীর মুখে বলল,“সিগারেটটা দে।ʼʼ
জয় দিলো না। হামজা কেঁড়ে নিলো সিগারেটটা জয়ের ঠোঁট থেকে। তাতে টান দিয়ে বলল, “ভাবুক হয়ে আছিস কেন?ʼʼ
-“আজ আরমিণকে দেখলাম।ʼʼ
-“বিশেষ কিছু?ʼʼ
-“না, নতুন কিছু।ʼʼ
তাকায় হামজা। জয় স্বগতোক্তি করে, “চেহারা দেখেছি আজ ওর, ভাই।
-“তাতে কী?ʼʼ
-“শালী মেলা সুন্দরী আছে। মানে বহুতই তো দেখছি, এত ভালো লাগে নাই কাউরে দেইখা! একদম যারে কাড়াক টাইপের সুন্দরী! কী চোখ, নাক, ঠোঁট, মাইরি! তাক লাইগা গেছিল আমার, সিরিয়াসলি।ʼʼ
হামজা হেসে ফেলল, “মাথার সার্কিট ফিউজ হয়ে গেছে তোর?ʼʼ
-“হ। আগে বহু মাইয়া দেখছি, মাগার আমারে বিশেষভাবে আকর্ষণ করবার পারেনাই। আগেও ওর চোখ দেখছি, কিন্তু সেই রকমভাবে খেয়াল করি নাই। আজ কিছুক্ষণ খালি ভ্যাবলার মতো চাইয়া দেখছি। ছ্যহ! এমনিই যে ভাব শালীর, আবার যদি এমনে ঠুটকা খাই তাইলে তো…ʼʼ
-“অবশেষে বিশাল সমস্যায় পড়েছিস। অর্থাৎ তোর সমস্যা শেষ।ʼʼ
জয় হামজার চোখে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল, সাথে হামজাও। চট করে হাসি থামিয়ে বলল, “ইচ্ছে করে কানের নিচে চাইর খান বাজাই!ʼʼ
কথা শেষ করে ঢোক গিলল, যেন কথা ফুরায়নি তবুও থামল জয়। হামজা হাসল, “এরপর?ʼʼ
জয় হাসফাস করে উঠল, “এরপর থেকে শান্তি লাগতেছে না। বুকে বড় জ্বালা। আকাশের দিক তাকায়া আছি, মাঝেমধ্যেই ফর্সা মুখটা ভাইসা উঠতেছে। যেমনে আগে সিনেমায় দেখতাম, চিঠির পাতায় চিঠি প্রেরকের মুখ, ওমনে।ʼʼ
-“দেখতে খুব ভালো?ʼʼ
-“না। মেলা ফর্সা!ʼʼ নিজের হাতের পিঠ দেখিয়ে বলল, “মানে আমার গায়ের রঙের সাথে মিলবে না। হিংসা হচ্ছে আমার। আমার সাথে দাঁড়ালে আমারে কালা লাগবো দেখতে। কালা জামার ভিতর দিয়া হাটা সেই ফর্সা দেখা যাইতেছিল..ʼʼ
হামজা হেসে ফেলল, জয়ের আর সব ফিউজ হয়ে গিলেও সে জীবনে নিজের ভাব নষ্ট করে কারও তারিফ করে না। জীবনে একটা প্রেম করেনি। গার্লফ্রেন্ডের নাকি কথা মানতে হয়, তারিফ করতে হয়, রাগ মানাতে হয়! জয় নিজেও কপালে হাত রেখে চোখ বুজে হেসে ফেলল। ধপ করে চেয়ারে বসে হাসিমুখেই ঘাঁড়ে হাত ঘষে আকাশের দিকে চোখ বুজে মুখ তুলে আড়মোড়া ভাঙল। হঠাৎ-ই বলে উঠল, “আরমিণকে লাগবে আমার!ʼʼ
হামজা সিগারেট ফেলে দিলো, “লাগবে? গ্রোসারি শপের পণ্য নাকি?ʼʼ
-“ভাই, জ্বালানোর জন্য হইলেও লাগবে। আমার তো এই টুকুও সহ্য হইতেছে না, আমি ছাড়া কেউ ওরে দেখবো! আজ নাকি কোনো শালার ছেলে দেখতে আসছিল ওরে, ওই শালারে পোন্দাতে মন চাইতেছে। এই শালা কবীর আর লিমনও দেখছে। এই শালা, তোরা তাকাইছিস ক্যা? চোখ সংযত রাখতে পারো না শালা? পুরুষের মূল গুণ হইলো, চোখের পর্দা করা। কিলবিল করে, না?ʼʼ
কবীর জিজ্ঞেস করল ইতস্তত করে, “ভাই, আপনে কি মাইয়ার প্রেমে পড়ছেন?ʼʼ
গলা কাঁপিয়ে হাসল জয়, “হ। অত্যাধিক মাত্রার প্রেম। এই প্রেমের খাতিরে ওই চেংরিরে কুরবান করতেও রাজী আছি রে কইবরা!ʼʼ
সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলল, “ওসব আমার সিলেবাসের নাই হে! প্রেম হচ্ছে একটা কামিটমেন্ট, মানে আঁটকে থাকা। জয় আমির কোথাও কখনও কামিটেড হতে পারে না। ওসব ভুদাইদের কামকাজ। মেয়েবাজি আলাদা বিষয়, কিন্তু ওসব কাব্যিক প্রেম-পিরিতি আমার সিস্টেমে নাই! ছোটোলোকি কারবার।ʼʼ
নেমে গেল গিটারটা কাধে করে খোলা ছাদ থেকে। হামজা নেমে এলো জয়ের পিছু পিছু। বেশ ঠান্ডা পড়েছে। একটা স্লিভলেস শার্ট গায়ে জয়ের। কালো জ্যাকেটটা ঝুলছে কাধের ওপর।
বেশ কিছুক্ষণ একটানা র্যাকেট পিটালো। গা ঘেমে প্যাকপ্যাকে হয়ে উঠল। চিৎকার করল মিউজিক বক্সের পাশে বসা থাকা ছেলের ওপর, “গানের সাউন্ড বাড়া! ভাত খাও নাই শালা, দুপুরে! এনার্জি ড্রিংক কিনে এনে দেই একখান?ʼʼ
ধুম-ধারাক্কা গান বাজছে। জয় একাধারে র্যাকেট পিটিয়ে গেল। শার্টল কর্ক সামনে আসছে তো গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে পিটিয়ে যাচ্ছে। একবারও মাটিতে পড়ার সুযোগ দিলো না। এমনভাবে দাঁত খিঁচে খিঁচে পিটিয়ে আঘাত করছে যেন কোনো চাপা ক্ষোভ ঝারছে ওই পেটানোতে।
ক্লান্ত হয়ে এসে ভেজা ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল।
এই পথ আগেরই মতোন, ঠিক তেমনই আছে
এই রাত সেই রাতের কত কথা বলে..
চলে যাওয়ার বিষাদ সুর, এখনও হৃদয়ে বাজে
তারপরেও কেন যেন এইখানেই ফিরে আসে
সব ভুলে গিয়ে আবার হারাতে চাই…
তারপরেরটুকু আর গাইল না। আবার নতুন সুর তুলল গিটারে। এবারে ঝাঁজাল সুর উঠছে। ছেলেরা বিমোহিতের মতো ঢুলছে তালে তালে। জয়ের প্রানোচ্ছল চঞ্চলতা ক্লাবের ছেলেদের প্রাণশক্তি যোগায়। ওরা নেশাক্ত একেকটা জয়ের ওপর।
জয়ের গানের গলা অদ্ভুত সুন্দর। কেমন এক গা ছমছমে মাথায় কেঁপে ওঠে গলাটা! যখন সে গলা ছেড়ে ব্রান্ড পার্টির মতো মাথা নাড়িয়ে পাগলের মতো গান গায়। জয় আবার গাইল,
তুমি কি দেখেছ কভু, জীবনের পরাজয়
দুঃখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়
সকলে বিমোহিতের মতো চেয়ে রয় জয়ের বোজা চোখ দুটোর পানে। গলা ছেড়ে, মনের গভীর থেকে গান গাইছে। একমাত্র বোধহয় গান গাওয়ার সময় জয় মনের গভীরে ডুব দেয়, অন্যথায় তাকে কখনও সিরিয়াস বা ইমোশোনাল হতে দেখা যায় না। অথচ এই গিটার তার বহিঃপ্রকাশ, অল্প একটু সত্যতা আর পরম স্নেহের ধন। আবারও অন্য সুর তুলে গলা বাজিয়ে চেঁচিয়ে গাইল,
খাঁজার নামে পাগল হইয়া,
ঘুরি আমি আজমীর গিয়া রে
এত করে ডাকলাম তারে, তবু দেখা পাইলাম না
ওরে পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না, ওরে ….
মন পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না..
রান্নার কাজে এসব দেখাশোনায় খুব পটু। নিজের একার তদারকিতে ক্লাবের শত শত ছেলেকে পালছে। যারা ওর পাপ দেখেনা।
হাতাটা হাতে নিয়ে মাংসে নাড়া দিতে গলা ছাড়ল,
তুই পাগল তোর মন পাগল
পাগল পাগল করিস না
পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না…
হামজা ফোনে কথা বলছিল। দেখে মনে হয় সহ্য হলো না। দৌঁড়ে গিয়ে হামজার কাধে ওঠার চেষ্টা করল। হামজা তাল হারিয়ে পড়ে যেতে নিয়ে আবার ফোন-টোন রেখে মাঠের ওপারেই তেড়ে গেল জয়ের দিকে। জয় ছুটছে অন্ধকারের দিকে, পেছনে তেড়ে দৌড়াচ্ছে হামজা। এখন বেশ কিছুক্ষণ দুজন অন্ধকারে কাটাবে। মাঠের আঁলের ওপর বসে কীসের গল্প জমাবে। হামজার কাধে মাথা রাখবে জয়। এরপর রাত ফুরিয়ে যাবে।
দুজন দৌড়ে আবার ঘুরে এলো। হামজা হাঁপিয়ে গিয়ে বসল শিশির ভেজা মাঠের ওপর। খানিক বাদে কোত্থেকে দৌঁড়ে এসে হামজার কোলে মাথা রেখে ঠান্ডা ঘাসের ওপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল জয়।
জয়ের সামনে হামজা নেতৃত্ব ও গাম্ভীর্য কোনোদিন টেকে না। যত সিরিয়াস মুহুর্তই হোক, ওই জয়ের সাধ্যি আছে হামজাকে জ্বালিয়ে এক মুহুর্তে সব পণ্ড করার।
—
ভোটের হিরিক বেঁধেছে চারদিকে। শোরগোল লেগেছে এলাকা জুড়ে। পোস্টার লাগানোর ব্যস্ততা চলছে চারদিকে।
পিবিআই কার্যালয়ে নতুন ব্যস্ততা। আঁখির মর্গ-টেস্টের রিপোর্ট এসেছে। মুস্তাকিনের পূর্ব-ধারণা কাঁটায় কাঁটায় মিলেছে। তার সন্দেহ মাফিক কারও বিরুদ্ধেই কোনো প্রমাণ আসেনি রিপোর্টে। মুস্তাকিনের এখন ইচ্ছে করল রিপোর্ট তৈরী করা ডাক্তারের মুখের ভেতরে পিস্তলের নল ঢুকিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করতে, যে কারা আঙুল ঘুরিয়েছে রিপোর্ট অবাস্তব এবং স্ক্রিপটেড তৈরিতে!
বেশ কিছুক্ষণ রিপোর্ট দেখে সেটা ছুঁড়ে ফেলার মতো টেবিলে ছুঁড়ে ফেলল। এমন কিছুই রিপোর্টে নেই যা দ্বারা অপরাধী শনাক্ত করা যায় বা কোনো ক্লু পাওয়া যায়! পুরো নিরপেক্ষ একটা রিপোর্ট। যেখানে শুধু প্রকাশ পেয়েছে আঁখিকে মারা হয়েছে কীভাবে, তার দেহে কী কী ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
লাশ আঁখির বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। এখন আর ওদের বাড়িতে গিয়ে বিশদ জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া এই কেইস টানার এনাদার কোনো ওয়ে রইল না।
মুস্তাকিন বেরিয়ে এলো নিজের কেবিন থেকে। বাইরে কিছু কাজবাজ রয়েছে।
বোরকায় আবৃত একটা মেয়ে এগিয়ে আসছে কার্যালয়ের ভেতরে। দাঁড়াল মুস্তাকিন, ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল। মেয়েটাকে চোখে পরিচিত লাগছে। ভার্সিটি চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল, ধাক্কাও খেয়েছিল তার সঙ্গে এই মেয়েটাই!
চলবে..
[ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।]
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
৯.
দুপুর দুটোর মতো বাজে। শীতের রোদ বাইরে। মেয়েটা এসে দাঁড়াল মুস্তাকিনের সামনে। তার চোখে কোনো ইতস্তত ভাব নেই। দৃঢ় চোখের চাহনি, আত্মবিশ্বাস ভরপুর তাতে। মাহমুদ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডাম, কোনো প্রয়োজনে এসেছেন? কিছু বলতে চান?ʼʼ
মেয়েটা মাথা নাড়ল। মাহমুদ বলল, “জি, কার সঙ্গে কথা বলতে চান!ʼʼ
মেয়েটা মুস্তাকিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কি কিছুটা সময় দিতে পারবেন?ʼʼ
মুস্তাকিন ভ্রু জড়িয়ে মেয়েটাকে দেখে হাতঘড়িতে সময় দেখল। তারা বসল বাইরের একটি ডেস্কে।
চেয়ারে বসে টিবিলের ওপর হাত রেখে দু’হাত একত্র করে কয়েক সেকেন্ড দেখল মেয়েটাকে মুস্তাকিন। এরপর বলল, “জি বলুন, কী বলতে চান?ʼʼ কণ্ঠস্বর ভারী, কৌতূহলি।
-“আমি মাহেজাবিন আরমিণ অন্তূ। দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।ʼʼ
-“জি, চিনতে পেরেছি। কিন্তু আপনাকে কোন নামে সম্বোধন করা যায়?ʼʼ
-“লোকে আরমিণ অথবা অন্তূ ডাকে।ʼʼ
-“আমি কোন নামটা বেছে নেব?ʼʼ
-“আপনার ইচ্ছেমতো!ʼʼ
মুস্তাকিন এবার সোজা হয়ে বসল, “তো মিস অর মিসেস অন্তূ! কী বলতে চান?ʼʼ
-“মিস।ʼʼ
মুস্তাকিন ঘাঁড় কাত করল। অন্তূ বলল, “আপনাদের টিম রিসেন্ট যে কেইসে কাজ করছে, সে ব্যাপারে কথা বলার ছিল!ʼʼ
মুস্তাকিন সন্তর্পণে কপাল জড়াল, “আপনি কিছু জানেন? আই মিন, কী বলতে চান এ ব্যাপারে?ʼʼ
-“আপনারা কতদূর পৌঁছেছেন?ʼʼ
মুস্তাকিন মাথা নাড়ল, “দুঃখিত। আম জনতাকে আমাদের তদন্তের ব্যাপারে এভাবে তথ্য দিতে পারি না।ʼʼ
-“তা দিতে পারেন না। তবে তা না জানলে আমি গতিবিধি বুঝব কী করে?ʼʼ
জহুরী চোখে তাকাল মুস্তাকিন, “আপনি কীসের গতিবিধির কথা বলছেন? কী জানেন, খোলাশা করুন। বুঝতে পারছি না।ʼʼ
-“লাশ আসার পর আঁখিদের বাড়িতে গিয়েছিলেন?ʼʼ
-“না, যাইনি।ʼʼ
অন্তূ বলল, “আমি ওখান থেকেই আসছি। আবারও নতুন করে ঘা জেগে উঠেছে বাড়ির। আপনারা কাউকে সন্দেহ করছেন না? রিপোর্ট কী বলছে?ʼʼ
সরাসরি এভাবে একটা মেয়েকে এত দ্বিধাহীন এসব কথা বলতে শুনে একটু অপ্রস্তুত বোধ করল মুস্তাকিন। কথাগুলো খুব পেশাগতভাবে বলছে অন্তূ। মুস্তাকিন চোখ নামিয়ে ভাবুক হয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর বলল, “আপনি ঠিক কী বুঝাতে বা বলতে চাচ্ছেন, অন্তূ!ʼʼ
-“রিপোর্ট দিয়ে নিশ্চয়ই তেমন কিছু বের হয়নি, তাই না অফিসার!ʼʼ
মুস্তাকিন ভ্রু কুঁচকে ফেলল। অন্তূ বলল, “আমার প্রথমে জয় এবং হামজার ওপর সন্দেহ হয়েছিল।ʼʼ
-“আর এখন? এখন হচ্ছে না? হলে কেন হয়েছিল, আর না হলে কেন হচ্ছে না?ʼʼ
অন্তূ হাসল, “ব্যাপারটা অতটাও সরল-সহজ নয়, তা আপনিও জানেন, অফিসার! এভাবে ধারণার ওপর ভিত্তি করে কেইস মিলে যাবার মতো কেইস নয় এটা। আপনি কি এটা জানেন, কিছুদিন আগে আঁখির মেজো ভাই সোহান মারা গিয়েছে?ʼʼ
মুস্তাকিন জবাব না দিয়ে তাকিয়ে রয় অন্তূর দিকে। অন্তূ বলল, “এই ব্যাপারটা নিয়ে ঘাপলা কাজ করছিল আমার ভেতরে। আজ তো কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার মতো অবস্থায় নেই ও বাড়ির লোক। তবে আমার মনেহয় সোহানের মৃত্যুটা স্বাভাবিক ছিল না। এখানেও কোনো ব্যাপার আছে।ʼʼ
মুস্তাকিন হাত দুটো একত্র করে গুটিয়ে থুতনির কাছে নিয়ে এলো। শার্টের ওপর দিয়ে তার বাহুর পেশি ফুলে উঠেছে। কব্জিতে ঘড়ি। গলার কাছে শার্টের বোতাম খোলা, হাতা গোটানো কনুই অবধি। বিন্যস্ত পোশাক ও চেহারা। সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এসবে এত ইন্টারেস্ট নিচ্ছেন কেন?ʼʼ
অন্তূ চুপ রইল ক্ষণকাল। হঠাৎ-ই বলল, “আজ আমি চুপ থাকব, তামাশা দেখব। আঁখির পরের শিকারটা আমি হব না, এমন গ্যারান্টি কার্ড তো পাইনি! আর তাছাড়াও..ʼʼ
মুস্তাকিন সপ্রতিভ হয়ে চাইল, ভ্রু উচালো, “তাছাড়াও?ʼʼ
-“তাছাড়াও আঁখির পরিবার ভয়ে বারবার বলছে, বিচার চাইনা। ধরুন ওদের হয়ে সেই সকল জানোয়ারদের বিচার আমি চাই।ʼʼ চাপা তেজ বহির্ভূত হলো অন্তূর কণ্ঠস্বর ভেদ করে।
মুস্তাকিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তো আপনি কী চাইছেন? আমাদেরকে সাহায্য করতে
চান এই কেইসে?ʼʼ
-“উহু! সাধারণ মেয়ে আমি। এতখানি সক্ষমতা নেই, এরকম একটা ভয়ানক কেইসে মাথা ঢুকিয়ে এক্টিভিটির সাথে আপনাদের সহায়তা করব। তবে এটুকু দাবী জানাতে এসেছি, যেকোনো মূল্যে এই কেইসের শেষ দেখবেন আপনারা। আঁখির মৃত্যুর জন্য না হোক, মেনে নিলাম কোনো না কোনো একদিন মানুষের হায়াত ফুরোয়। সকলের কপালে স্বাভাবিক মৃত্যু লেখা থাকে না। কিন্থু ওর সম্মানহানি এবং ওর সাথে হওয়া অত্যাচার যেন চাপা না পড়ে যায় আপনাদের গাফলতির নিচে। এই অনুরোধটুকু করতে এসেছিলাম।ʼʼ
মুস্তাকিন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো না। কিছুক্ষণ চুপ রইল। পিবিআই এর কার্যালয়ে এসে পিবিআই অফিসারের কার্য গতিবিধিতে আঙুল তোলার সাথে সাথে বিচার দাবী করছে। ইন্টারেস্টিং লাগল মুস্তাকিনের কাছে ব্যাপারটা।
-“তবে প্রমাণ এবং ক্লুর খুব অভাব কেইসটাতে। এমন কোনো সূত্র এখন অবধি আমাদের টিম পায়নি, যা দ্বারা এই কেইস এগোতে পারে। এরকম আর কিছুদিন না পেলে কেইস এমনিতেই চাপা পড়ে যাবে। তবে আমাদের চেষ্টা জারি আছে।ʼʼ
অন্তূ বেরিয়ে এলো। কিছুক্ষণ চেয়ে দেখল মুস্তাকিন অদ্ভুত মেয়েটিকে।
অন্তূ রাস্তা পার হওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তার পাশে এসে দাঁড়াল। তখনই সামনে দিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল হামজার গাড়িটা। অন্তূ টের পেল না।
যতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, জয় ক্ষ্যাপা চোখে দেখল অন্তূকে।ঘাঁড় ফিরিয়ে হামজাকে বলল, “অন্তূ পিবিআই ডিপার্টমেন্টের সামনে? “কাহিনিই বুঝতে পারতেছি না শালীর!ʼʼ
হামজা গম্ভীর স্বরে বলল, “গরম রক্ত, প্রতিবাদ ভরা। হয়ত ওই মেয়েটার বিচারের জন্য লড়তে চাচ্ছে! তুই নজরদারী করছিস কেন ওর ওপর?ʼʼ
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল জয়, “তোমার সৎ নেতাগিরি আর নীতি পেছনের পকেটে রাখো! ওর সন্দেহ আমার আর তোমার ওপর! এবারেও কি তোমার নীতিকথা শোনাবে, নেতাজি!ʼʼ
হামজার হাতের পিঠে গাঢ় জখম। জয় যতদ্রুত সম্ভব গাড়ি চালাচ্ছে। চেপে রাখা টিস্যু রক্তে ভরে উঠেছে। অথচ হামজা নির্বিকার ভঙ্গিতে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “আমার-তোর ওপর কেন? আমি-তুই ওর কী করেছি?ʼʼ
জয় স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে জবাব দিলো, “চলো, জিজ্ঞেস করে আসি।ʼʼ
গাড়ি এসে থামলো এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। ভেতরে ভর্তি রয়েছে দলের কয়েকটা ছেলে। গতকাল মারামারি হয়েছে ভার্সটির মোড়ে ঝন্টু সাহেবের ছেলে মাজহারের লোকেদের সাথে। অবশেষে জয় যখন গিয়েছিল, শেষ পর্যায়ে তার হাত কেটেছে, কপাল ফেটেছে, পিঠে আস্ত একটা লাঠি ভেঙেছে। জয়ের টুকটাক ব্যান্ডেজ লাগলেও মাজহারের ছেলেদের অবস্থা খারাপ। কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত পেয়েছে হামজার সেক্রেটারী লতিফ।
দলের লোকেদের হামজা সর্বদা কেবিনেই এডমিট করায়। আম জনতার ভিড়ে রিস্ক থাকে এসব মামলায়। দুজন গিয়ে বেডের পাশে দাঁড়াতেই লতিফের বউ কাঁদতে কাঁদতে উঠে এলো। এখনও বেহুশ লতিফ। লতিফের কোমড়ের ওপর পেটের বাঁ পাশে ছু রি কা ঘা ত করা হয়েছে মারামারির কোনো একসময়ে। রাস্তার পাশে পড়ে ছিল সে। হামজা অবশ্য নির্বাচনের আগে প্রস্তুত ছিল এসবের জন্য একবার।
মারামারির সূত্রপাত ঘটেছে সকালের দিকে। মাজহারের ছেলেরা ক্লাবঘরে ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুঁড়ির মাধ্যমে ঘটনার শুরু। জয়ের মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা ক’দিন বাদে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দু’দিনের জন্য ঢাকা যাবে সে। ক্লাবে সে ছিল না তখন, হামজা পড়তে বসার জন্য চাপে রেখেছে, কিছুদিন কারবার থেকে দূরে থাকতে বলেছিল। কিন্তু ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মাজহারের ছেলেরা থামেনি। নোংরা ভাষায় হামজাকে গালি দিয়েছে। তখন হামজার ছেলেরা বেরিয়েছিল। দুপুর বেলা লতিফের সাথে এই অঘটন ঘটে যাবার পর জয় বিকেলে পড়ালেখা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যার পর ভার্সিটি মোড়ে তুমুল মারামারি শুরু হলো দুই দলের। লাঠিসোটা, ককটেল, সাথে ছুরি ছিল ছেলেদের হাতে। জয় দুটো ছেলেকে বেদম পিটিয়েছে, সেসময় প্রতিরোধ করার জ্ঞান থাকেনা জয়ের। এটা তার অপারগতা। যখন কাউকে মারতে শুরু করে, তাকে বৃষ্টির মতো মারা যায়, সে একনিষ্ঠ চিত্তে শুধু ছেলে দুটোকে মেরেছে। তার মাঝে নিজে জখম হয়েছে বেশ ভালোমতোই।
মাজহার নিজে উপস্থিত ছিল না। সকালে জয়কে না ডেকেই হামজা পৌঁছে গেছিল পলাশের ডেরায়। দিনাজপুরের নামকরা সন্ত্রাস পলাশ আকবর আর রাজন। দুজনের সাথে ভালো মিল মাজহারের। সাথে দুটোকে মহাজনও বলা চলে। কড়া সুদে টাকা ধার দেয় মানুষকে, পরে তার বদলে জমি, ঘরের জিনিস অথবা ব্যবসা কেঁড়ে নেয়ার বহু নজির আছে। সেখানে গিয়ে মেরে এসেছে হামজা মাজহারকে। জয় সেখান থেকে নিয়ে আসছে হামজাকে। এখন অবধি জিজ্ঞেস করেনি, মাজহারের কী অবস্থা। কীভাবে মেরেছে, কী হাল করেছে! হামজা খুব শান্ত-শীতল মেজাজের পুরুষ। যতক্ষণ না জয়কে আঘাত করা হয়, তাকে ক্ষেপতে দেখেনি ছেলেরা। কিন্তু লতিফের স্ত্রীর কান্নাকাটি দেখেছে সে রাতে, লতিফের বাচ্চাদুটোর শুকনো মুখ দেখেছে। লতিফের রক্তাক্ত শার্টখানা দেখেছে।
হামজাকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে জয় দ্রুত গেল নার্সকে ডাকতে। এই অসময়ে হাসপাতালে নার্সের সংখ্যা কম চারদিকে। ব্যস্ত নার্স দাঁড়াতে বলল জয়কে। হুট করে জয়ের মেজাজ চটলো, অমানুষের মতো হয়ে উঠল মুহুর্তে, দাঁত খিঁচে উঠল, “ওঠ, তাড়াতাড়ি ওঠ! তোর পাশে যে মগা দাঁড়ায়ে আছে ওরে বল, ক্যানোলা ঢুকায়ে দিক এই লোকের! তুই আমার সাথ চল। ভাইয়ের হাতে রক্ত পড়তেছে, শুনতেছিস না কথা!ʼʼ চেঁচিয়ে উঠল শেষের দিকে।
নার্স কেঁপে উঠল। দ্রুত উঠে দাঁড়াল। রাগে শরীর কাঁপছে জয়ের। এখানে হামজা থাকলে নির্ঘাত একটা থাপ্পড় মারত কোনো মেয়ের সাথে এমন দূর্ব্যবহারের ফলে। নার্সকে নিয়ে এসে দাঁড় করালো হামজার পাশে। আসলে অনেকটা রক্ত বেরিয়ে সাদা পাঞ্জাবী রঙিন হয়ে উঠেছে হামজার। গালের পাশে কালশিটে দাগ দেখা যাচ্ছে। এটা অস্বাভাবিক নয়, নির্বাচনের আগে এমন অঘটন ঘটারই ছিল। ঝন্টু সাহেব ও তার ছেলে যে চুপচাপ বসবে না, এটা জানা কথা। নার্স ভয়ার্ত গলায় বলল, “কিছু ওষুধ আনতে হবে।ʼʼ
জয় তাড়া দিলো, “হ্যাঁ, বলেন সিস্টার কী কী ওষুধ লাগবে? আমি এনে দিচ্ছি, দ্রুত বলেন!ʼʼ
নার্স অপ্রস্তুত হলো, কিছুক্ষণ আগে কী ব্যবহার ছিল, এখনই আবার সিস্টার বলছে! একটা কাগজে নাম লিখে দিলো। জয় কারও হাতে দিলো না কাগজখানা। নিজে দৌঁড়ে বেরিয়ে গেল ওষুধ আনতে। হামজা চেয়ে রইল জয়ের যাবার পথে। নিজের হাতের তালুতে ব্যান্ডেজ জড়ানো, কপালে ব্যান্ডেজ, কোমড়ে ঘা। সে ছুটছে ভাইয়ের ওষুধ আনতে। হামজা এটাই সবাইকে বোঝাতে পারেনা, পুরো পৃথিবীর জন্য জয় আমির জঘন্য এক নাম, সেও মানে। কিন্তু বিশেষভাবে তার জন্য ওই ছেলেটা বিশেষ!
লতিফের চিকিৎসার সমস্ত খরচা হামজা বহন করল। কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল সকলে। শেষ রাতের দিকে সার্জারি করা হয়েছে লতিফের। এখনও সেন্স ফেরেনি।
চিন্তিত মুখে নিজের ব্যথা ভুলে উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে পায়চারী করে চলল হামজা। সে কোনো সময় চায় না তার জন্য দলের ছেলেরা মূল্য দিক। সেদিন নিষেধ করে আসার পর হামজা নির্বাচন অফিসে গিয়ে ঝন্টু সাহেবের আপিল বাতিল করে এসেছে। তাতে যে ঝন্টু সাহেব ক্ষেপবেন তা জানা কথা। তবে আঘাতটা লতিফকে করে ওর পরিবারকে বিদ্ধস্ত করে তোলাটা ঠিক হয়নি ঝন্টু সাহেবের। মাজহার ভালো ঘা খেয়েছে। যতদিন নির্বাচন শেষ না হচ্ছে, ঝামেলা যে টুকটাক লেগেই থাকবে, এ-ও জানা কথা। নির্বাচনের পরেও কোনো বিশেষ ঝামেলা হওয়ার চান্স রয়েছে।
রাত করে বাড়ি ফিরল হামজা। জয় ঢুকে পড়ল নিজের ঘরে। তার পড়ালেখায় গাফলতি চলবে না এখন। ঘরে ঢুকেই চেঁচিয়ে ডাকল মামিকে। দ্রুত পায়ে তরু এগিয়ে গেল, “কী হয়েছে, জয় ভাইয়া? খালামণি অসুস্থ, ব্যথা বেড়েছে। কিছু দরকার?ʼʼ
জয় জ্যাকেটের চেইন খুলে ইশারা করল জ্যাকেটটা খুলে নিতে। তরু জ্যাকেট খুলে নিয়ে সেটা হ্যাঙ্গারে বাঁধিয়ে রাখল। জয় বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “এককাপ গরম কফি বানিয়ে দে তো। আমি মামির কাছ থেকে ঘুরে এসে খাবো। আর ঘরটা ঝাড়ু দে, পায়ে নোংরা বাঁধছে!ʼʼ
তরু ঝাড়ু দিতে দিতে দেয়ালের দিকে তাকায়। চারদিকে বড়-ছোট ফ্রেমে বাঁধানো জয়ের ছবি, ওয়ালমেটে ভর্তি ঘরের দেয়াল।
জয় যখন মামির রুমে এলো, দেখল, হামজা মায়ের মাথার কাছে বসে আছে। মামা বারান্দার পাশে চেয়ারে বসা। মুখ বাঁকাল জয়, “ওখানে বসে কি নিজেকে বীরপুরুষ প্রমাণ করতে চাইতেছ? বারান্দা দিয়ে ঠান্ডা আসছে না? পরে তো খেঁক খেঁক করে কাশবে। তোমার কাশির আওয়াজ শুনতে একটুও ভাল্লাগে না, মামা! দরজা আঁটকে বসো!ʼʼ
শাহানা ব্যথায় কুঁকড়ে গেছেন। হামজা মাথা নিচু করে বসে আছে মায়ের শিওরে। জয় বকে উঠল, “শালার ডাক্তাররা যদি কষ্টের সময়ে চিকিৎসা না করতে পারবে, তাইলে ডাক্তার ট্যাগ লাগানোর মানে কী? ব্যথা এখন, সার্জারি করবে মাস কয়েক পরে, এইটা কোনো চিকিৎসার মধ্যে পড়ে?ʼʼ
তুলি জবাব দিলো, “তুই চুপ থাক! না বুঝে চেঁচাবি না। সবকিছুই তো আর তোর মুখের বকার মতো সহজ না! আগে ওষুধ খাইয়ে, ভেতরে একটা সার্জারির মতো পরিবেশ তৈরী করে এরপর সঠিক সময়ে সার্জারি করবেন ডাক্তারেরা। তোর মতো পদার্থবিজ্ঞান পড়ে অপদার্থ হয়নি তারা। ডাক্তার ওরা ভালো বোঝে।ʼʼ
জয় দাঁত খিঁচে বকতে গিয়ে আবার চুপ করল। এখানে সবার মন খারাপ, এখন চুপ থাকা ভালো মানুষের কাজ। জয়ের ধারণা, সে খারাপ হলেও মাঝেমধ্যে একটু ভালো মানুষের মতো আচরণ দেখিয়ে লোককে চমকে দেয়া ভালো।
বাইরে বেরিয়ে এলো। বাড়িটা খুব বিষণ্ন লাগছে। জয়ের ভালো লাগছে না বিষয়টা। কালই গিয়ে কোয়েলকে আনতে হবে। ও থাকলে এখন দৌঁড়ে এসে কোলে উঠে আবদার করতো, “মামা! আমিও ব্যান্ডেজ লাগাবো। এরপর দুজন চক্কেত কিনতে যাব। ম্যাচিং ম্যাচিং হবে তোমার আমার ব্যান্ডেজ।ʼʼ
শরীরের ব্যথা রাত বাড়ার সাথে সাথে প্রকট হচ্ছে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো। কোমড়ের ক্ষততে টান ধরেছে, পুরো গা-হাত-পা বিষব্যথা হয়েছে, এখন বোঝা যাচ্ছে। জয়ের রুমটা বাড়ির পেছন দিকে। এখান থেকে বাড়ির পেছনের জঙ্গল চলে গেছে। বিশাল ফাঁকা পতিত জমি পড়ে আছে, সেখানে জঙলি গাছ-পালা জন্মেছে। তরু কফি রেখে চলে যাবার সময় জয় ডাকল, “খাবারটা রুমে দিয়ে যা তো!ʼʼ
জয় জানে, ও না বললেও মেয়েটা ঠিক নিয়ে আসতো। কেন এত যত্ন করে জানার বা বোঝার চেষ্টা করেনি কখনও জয়। তবে এই নিঃসঙ্গ পাপে ভরা জীবনে এই মেয়েটার বেশ মনোযোগ পায় সে। তরু খাবার আনল, জয় তখন বিছানায় বসা। তরু খাবার রেখে চলে গেল না। দাঁড়িয়ে রইল। জয় জিজ্ঞেস করল, “দাঁড়িয়ে আছিস কেন?ʼʼ
চিকন, মিষ্টি কণ্ঠস্বর তরুর, “আপনি নিজে খেতে পারবেন? আমি খাইয়ে দেব?ʼʼ
অবাক হলো না জয়, সে জানতো এমন কিছুই বলবে তরু। চেয়ে রইল তরুর মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড। এরপর মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। যত্ন করে খাওয়াতে বসল তরু। খাবার চিবোতে চিবোতে একবার তরুকে দেখে নিয়ে নিঃশব্দে হাসল জয়, “আমি খারাপ, লোকে নাম শুনলেই নাক ছিটকায়। তুই বিশেষ এই যত্ন কেন করিস?ʼʼ
তরুর চোখের ঘন পাপড়ি নড়ে উঠল। একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। আস্তে করে বলল, “হাঁ করুন!ʼʼ
জয় লোকমাটা গালে না নিয়ে আবার হাসল, “ভালোবাসির আমায়?ʼʼ
হাত থেমে গেল তরুর। চোখের কোণে জলের ছিটা জমেছে। জয় হালকা ব্যস্ত হলো, “এই পাগলি, এই! কাঁদছিস কেন? আমি স্বয়ং পাপ, আমাকে ভালোবাসতে নেই। এজন্য আমিও পাপকেই ভালোবাসি অবশেষে। জীবনে এমন সব নিকৃষ্ট পাপ করে রেখেছি, কেউ যদি তার শাস্তি কোনোদিন দেয় আমায়, তাহলে তা হবে আমার জঘন্য মৃত্যু! আবার আমার পাপের পেছনে এমন কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, যা শোনার পর মানুষ ইমোশনাল হবে, বা বলবে এই জন্য আমি বাধ্য হয়েছি বা এমন হয়েছি। সবই করেছি ক্ষমতার জোরে। তুই যে আমায় ভালোবাসিস, তুইও সমান পাপী। কারণ আমার মতো পাপীষ্ঠকে কোনো সুন্দর মনের মানুষ ভালোবাসতে পারেনা, তা জানি আমি। যে কোনোদিন আমায় ভালোবাসবে, বা বেসেছে, আমি জেনে নিই, তার ভেতরেও আমার মতোই পাপ আছে। নয়ত কেউ আমার পক্ষপাতিত্ব করতে পারেনা।ʼʼ
তরু চুপচাপ খাবার খাওয়ায় জয়কে। সযত্নে মলম লাগিয়ে দিলো পিঠের ক্ষততে। ওষুধগুলো খাইয়ে দিয়ে, জয়ের হাতের ঘড়ি, শার্টটা খুলে দিলো। শুইয়ে দিয়ে কম্বলটা গলা অবধি তুলে দিয়ে মাথার কাছে বসল। গভীর মনোযোগের সাথে জয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো, চুল টেনে দিলো, কপাল টিপে দিলো। জয় চোখ বুজে চুপচাপ নেয় সেই সেবাগুলো। একদৃষ্টে চেয়ে রয় তরু জয়ের মুখের দিকে। খোঁচা দাড়ির গালটা হাত দিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করছে। জয়ের নিঃশ্বাস ভারী ভারী পড়তে শুরু করে। বহুদিন এভাবে পাশেই শুয়ে পড়েছে সে জয়ের। অথচ সকালে উঠে নিজেকে অক্ষত অবস্থায় দেখে জয়ের প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে। একটা তাগড়া পুরুষের পাশে রাত কাটিয়ে যখন বোঝা যায়, পুরুষটি হাতও লাগায়নি নারী শরীরে, সেখানে প্রেম জাগার নয়? তরু মানে, জয় খারাপ। কিন্তু তার আপেক্ষিকতায় জয়ের খারাপের শিকার হয়নি সে, সুতরাং তার ভালোবাসা জায়েজ।
হঠাৎ-ই তরু একটা অকাজ করে বসল। গাঢ় একটা চুমু খেলো জয়ের কপালে। ফিসফিস করে বলল, “আপনাকে ভালোবাসা যদি পাপ হয়, আপনাকে ভালোবেসে আমায় যদি পাপী হতে হয়! তো পাপই ঠিক, আমি সেই পাপই করেছি। প্রেমিকা না হয়ে বরং আপনার পাপীষ্ঠা নারীই হয়েছি। তবুও আমি আপনাকে ভালোবেসেছি, জয় আমির! একথা অনস্বীকার্য, একথা চিরধার্য!ʼʼ
জয়ের ঠোঁটের এক কোণ প্রসারিত হয়ে উঠল। অবচেতন কানেই কথাগুলো শুনে ফেলল জয়? তরু আর বসল না, দৌঁড়ে বেরিয়ে গেল জয়ের রুম থেকে।
চলবে..
#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
১০.
সকাল নয়টায় হামজার ঘুম ভাঙল জয়ের গলাভাঙা গানে। হিরিক বেঁধে গেছে যেন গানের। সে কোনোসময় বিষণ্ন থাকেনা। সিচুয়েশন যেমনই হোক, অল টাইম চিল! এটা তার স্লোগান! ভেসে আসছে টুংটাং গিটারের সুর আর আধভাঙা গলায় তোলা সুর,
~মনে পড়ে বারবার, সময়ের কারবার, রাস্তারা ফেরোয়ার হারিয়েছে আজ..
চাওয়াদের শেষ নেই, জানি তবু পারি কই, চড়ে বসি বারবার স্বপ্ন জাহাজ..
চাইলে চলে যা যদি, না থাকে উপায়,
সুঁতোয় বাঁধা জীবন ছেড়ে পালাবি কোথায়…..
হাতের ব্যান্ডেজ নিয়েই শুরু করে দিয়েছে টুংটাং গিটার বাজানো!
নড়তে চড়তেই হামজার মুখচোখ কুঁচকে উঠল গায়ের ব্যথায়! রিমি নেই। রাত থেকে মেয়েটা কথা বলছে না। গলা বাড়িয়ে ডাকল, “জয়..জয়! এদিকে আয়। জয়..ʼʼ
জয় আওয়াজ দিলো, “জি সাহেব।ʼʼ
রুমে ঢুকে বলল, “চালু হয়ে গেছে তোমার ভাঙা রেডিও! ওটা থামাও তো, ঘ্যারঘ্যার করছে।ʼʼ
ধপ করে শুয়ে পড়ল বিছানার ওপর হামজার পাশে। হামজা জিজ্ঞেস করল, “আমার ডাক শুনতে ভাঙা রেডিওর মতো ঘ্যারঘ্যারে লাগছে?ʼʼ
-“এত ভালোও লাগেনা শুনতে। ওই ধরো..ʼʼ
কুশন তুলে মুখের ওপর ছুঁড়ল হামজা, “কীসের মতো লাগে তাইলে?ʼʼ
সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল জয়, “বললে চাকরি থাকবে না।ʼʼ
-“চাকরি তোর এমনিতেও থাকবে না। আমি যদি তোর গানের গুণগান করি, তুই তো মেয়েলোকের মতো হাত-পা আঁছড়ে কাঁদতে লেগে যাবি! সেই হিসেবে আর হারুণফাটা মার্কা গলায় গান গাইবি না, বাড়ি থেকে পাছায় লাত্থি মেরে বের করব তোকে।ʼʼ
জয় ভাব নিয়ে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্টের পকেটে একহাত রেখে দাঁড়াল, “তোমার বাপের এই ঘুনপোকা ধরা ভেঙরি বাড়িতে আমি আছি, শুকরিয়া আদায় করো!ʼʼ
-“বিশাল কামাই করছিস থেকে! যা ভাগ!ʼʼ
-“ও তুমি বুঝবা না, ব্রোহ! মামির কাছে জিজ্ঞেস কোরো, সে বুঝিয়ে দেবে, আমি হলাম সোনার ডিম দেয়া রাজহাঁস!ʼʼ অকপটে খোঁচা মারা কথা বলে দাঁড়িয়ে রইল জয়।
হামজা হাই তুলে বলল, “যা, গিয়ে পড়তে বস। তার আগে ওখান থেকে আমার তোয়ালেটা দে।ʼʼ
জয় চোখ ছোট করে তাকায়, “ক্যান, তুমি উঠতে পারতেছ না? পরনে কোনো জাঙ্গিয়া-টাঙ্গিয়াও নাই নাকি?ʼʼ
একলাফে বিছানা থেকে নামল হামজা, দাঁত খিঁচল, “এদিকে আয় শুয়োর, তোর জাঙ্গিয়া খুলে তোকে শহর ঘুরিয়ে আনবো আজ আমি!ʼʼ
দৌঁড়ে ঘর ছাড়তে ছাড়তে জয় চেঁচায়, “ছিহ ভাই! ছোট ভাইয়ের ইজ্জত মানে জাঙ্গিয়া নিয়ে টান পাড়াপাড়ি করতে বাঁধলো না তোমার? আমি ভার্জিন একটা, সরল-সহজ নিরীহ ছেলে, ভাই! সব রেখে সোজা জাঙ্গিয়াতে হামলা? নাউযুবিল্লাহ! এই মুখ আর সমাজে দেখানোর যোগ্য রাখলে না আমার!ʼʼ
হেসে ফেলল হামজা। হাতের কুশনটা সজোরে ছুঁড়ে মারল। গোসলে যাবার জন্য তোয়ালে ঘাঁড়ে করে রিমিকে ডাকল কয়েকবার। জবাব এলো না। খানিক বাদে তরু এলো, “কী হয়েছে, বড় ভাইয়া? কিছু দরকার?ʼʼ
গম্ভীর চেহারায় মাথা দুলালো হামজা, “তোর ভাবীকে দরকার!ʼʼ
মুখ লুকিয়ে ফিক করে ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল তরু। রিমি এলো। মুখ ভার। এসেই বিছানা গোটাতে শুরু করে রিমি। হামজা এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে জাপটে ধরল রিমিকে, কাধের ওপর থুতনি ঘঁষে বলল, “কী হয়েছে ম্যাডামের? কথা না বলার ব্রত রেখেছেন নাকি?ʼʼ
রিমি ছাড়ানোর চেষ্টা করল হামজাকে, হামজা আরও শক্ত করে পেট চেপে ধরল। তার লোমশ বুকটা ঠেকল রিমির পিঠে। দমল না রিমি, মুচরামুচরি করছে খুব। হামজা এবার রিমির হাত দুটো মুঠো করে চেপে ধরে নিজের দিকে ঘোরালো। হামজার বিশালদহী শরীরের তুলনায় নেহাত ছোটোখাটো অভিমানিনী মেয়েটা। হামজা কপট চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে, এমন করছ কেন? আমার দিকে তাকাও, রিমি!ʼʼ
তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় রিমি, জবাবদিহি চাওয়ার মতো শক্ত মুখে বলে, “মাজহার ভাইকে মেরেছেন আপনি? কেন?ʼʼ
হামজা নরম হলো, ব্যান্ডেজ করা হাতটা শিথিল করে রিমির থুতনিতে বুলাতে বুলাতে বলল, “তোমাকে বলেছি না! আমার কাজ এবং পার্টির ব্যাপারে না ভাবতে। এসব বিষয় তোমার মাথায় রাখতে হবে না, এই নিয়ে রাগ করে আছ? চ্যাহ! আমার দিকে তাকাও, এদিকে দেখো!ʼʼ থুতনি উচিয়ে ধরল হামজা।
-“আপনার পার্টির ব্যাপার? এটা আপনার পার্টির ব্যাপার বলে মনে হয়? মাজহার আমার চাচাতো ভাই!ʼʼ
হুট করে হামজা শক্ত হলো যেন, ঘাঁড় কাত করল, “আর আমি?ʼʼ
-“আর আপনি কী? অমানুষ স্বামী আমার! তাই তো? মাজহার ভাইকে ওভাবে কেন মেরেছেন জানোয়ারের মতো?ʼʼ
-“আমার ক্ষতগুলো নজরে আসছে না, তোমার?ʼʼ
-“আপনার ক্ষত? সেটা মাজহারকে মারতে না গেলে তো হতো না! ওকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কতটা মারলে তা করতে হয়? কী মার মেরেছেন ওকে? মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন? ও আপনাকে আগেই মেরেছে? নাকি আপনার জানোয়ার মার্কা হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে আপনাকে আঘাত করেছে?ʼʼ
হামজা শাসিয়ে উঠল, চোখ লাল হয়ে উঠেছে তার, ওভাবেই চিবিয়ে বলল, “মাজহার জয়কে মেরেছে। তুমি বেশি কথা বলছো, রিমি!ʼʼ
-“একদম ঠিক বলেছেন, নেতাবাবু! আজ একটুও কম কথা বলার ইচ্ছে নেই আমার। জয়কে মেরেছে বলে আপনি ওকে মেরে ফেলার মতো করে মারবেন?ʼʼ
-“জীবিত কবর খুঁড়ে মাটি দিয়ে দেব। বুঝেছ তুমি! কেউ জয়ের গায়ে হাত লাগালে, তার হাতটা গুঁড়ো করে ফেলব ভেঙে।ʼʼ চিবিয়ে উঠল হামজা।
-“বাহ বা! নেতাবাবু! জয়ের সামনে সবাই পর, আর আপনি আপনার শীতল স্বভাবের বিপরীতে এক পশুর সমান? কেউ আপনার কেউ না? আমাকেও চিনতে পারছেন না? জয় এতই আপন আপনার?ʼʼ
-“তুমি তোমার নিজের কথা বলোনি, রিমি! মাজহারের হয়ে উকালতি করছো, দরদ দেখাচ্ছ। কেন? সে তোমার চাচাতো ভাই বলে? ওয়েল! তাহলে, জয় আমার জান। এবার বোঝো, ওর শরীর থেকে র ক্ত ঝরলে আমার কোথায় ব্যথা লাগে! তোমার চাচাতো ভাইকে বলে দিও, দরকার পড়লে আমাকে যেন কুপিয়ে চারভাগ করে ফেলে আমার ওপর রাগ থাকলে, কিন্তু জয়ের গায়ে আঁচ লাগলে, জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলব!ʼʼ
রিমি অবাক হবার সাথে সাথে কেঁদে ফেলল, গলা ও থুতনি ভেঙে এলো তার, “তার মানে আপনার কাছে নিজের অথবা আমার কোনো মূল্য নেই?ʼʼ এগিয়ে এসে হামজার ব্যান্ডেজ করা কব্জিতে হাত রাখল আলতো করে, “আপনার কিছু হলেও সমস্যা নেই? আমি তারপর ভেসে বেড়াব আপনাকে ছাড়া, তাতেও সমস্যা নেই আপনার? শুধু জয়ের কিছু হলে ব্যথা লাগে আপনার বুকে?ʼʼ
-“অবুঝের মতো কথা বলো না!ʼʼ হামজা নরম হলো একটু।
-“অবুঝের মতো তো এতদিন ছিলাম! আজ প্রথমবার বুঝলাম, আমার জায়গাটা কোথায় আপনার জীবনে! আমি শুধুই একটা অপশন অথবা উদ্বাস্তু হয়ে রয়ে গেছি আপনার কাছে! সামান্য এক জয়ের জায়গা নিতে পারিনি আপনার ভেতরে..ʼʼ
-“আমায় রাগিও না, রিমি! চেনোনি আমায়। একটা মানুষের ভেতরে সবার জন্য আলাদা আলাদা স্থান থাকে। জয়ের জন্যও তেমনই আলাদা একটা বিশেষ স্থান আছে আমার ভেতরে! তার মানে এই নয়, তোমাকে আমি ভালোবাসি না। ভালোবেসেই বিয়ে করে এনেছিলাম, ভুলে বসেছ সব? এক চাচাতো ভাইয়ের খাতিরে তুমি আমার অবস্থান ভুলে যাচ্ছ মনেহয়!ʼʼ
-“আপনিও তো জয়ের সামনে আমার অবস্থান ভুলে বসেছেন।ʼʼ
-“শুরুটা কাল রাত থেকে তুমি করেছ। আমি যখন জখম হয়ে রুমে এলাম, তোমাকে ডেকেও বারান্দা থেকে রুমে আনতে পারিনি, শরীরের ব্যথা নিয়ে ওভাবেই কাতরাতে কাতরাতে শুয়ে পড়েছি। তারপর টের পেয়েছিলে জয় উঠে এসে কম্বল টেনে দিয়ে, ব্যথার ওষুধ খাইয়ে, আবার একচোট ঝগড়া করে গিয়েছে রুম থেকে? জয় আমার জীবনে বিশেষ কিছু, এটা অনস্বীকার্য সত্য!ʼʼ
-“বিশেষ নয়, গোটাটাই ওর আপনি!ʼʼ
-“না বুঝে কথা বোলো না। জয় পুরো দুনিয়ার জন্য জঘন্য এক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠলেও, সেদিনও আমার কাছে, এবং চিরদিন ও আদরের। লোকের সাপেক্ষে না, আমার সাপেক্ষে বিচার করলে ওকে ভালোবাসা আমার জন্য জায়েজ।
-“কেন? সে কী এমন মহান লোক?ʼʼ
-“কোনোদিন ওর শার্টটা খুলে পিঠের দিকে নজর দিও। এখনও দগদগে একটা ঘায়ের দাগ বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে পিঠে। যখন তুমি এসেছিলে না আমার জীবনে যখন নেতা হয়ে উঠিনি আমি, সেকালেও জয় নিজের শরীরে গুলি খেতে আমার সামনে এসে পিঠ পেতে দিয়েছিল। তখন আমি ছাত্রনেতা হয়ে উঠিনি। ওর সেই পিঠ পেতে খাওয়া গুলি আজ আমায় বাঁচিয়ে না রাখলে তোমার ভালোবাসা অবধি পৌঁছাতাম না আমি। তার আগেই আমার কিচ্ছা ফুরিয়ে যেত। আমার বুকের গুলি পিঠে খাওয়া ওই নষ্ট ছেলেটাকে এই হামজা পাটোয়ারী খুব ভালোবাসে। ও আমার ফুপাতো ভাই না, আমার জান! পর্ববর্তীতে তুমি ওর বিপক্ষে কোনোদিন কথা বলতে এসো না। আমি চাই না এ নিয়ে কোনো ভাগাভাগি হোক! আমার জীবনে জয়ের তুলনা শুধু জয়, ও আমার বিজয়-জয়।ʼʼ
রিমি কেন জানি ফুঁপিয়ে উঠল। হামজা দুটো শ্বাস নিয়ে রিমির একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল, “রাজনীতিবিদের বউ হতে গেলে বহু পারিপার্শ্বিক বুঝ আর ধৈর্য্য থাকতে হয়। আমি ভাবতাম, তোমার তা আছে। আজ তা ভুল লাগছে। মাজহার তোমার চাচাতো ভাই হওয়ার আগে, আমার প্রতিপক্ষ। তার সঙ্গে ঝামেলা হলে তুমি তোমার স্বামী অথবা ভাই, কার পক্ষে থাকবে সেটা তোমার বিষয়। কিন্তু আমি আমার গতিবিধি থেকে পিছপা হতে পারি না। রাজনীতিতে চলতে গেলে, বহু সম্পর্কে জবাই করে সামনে এগোতে হয় এক পা এক পা করে। তাই করে এগিয়েছি! তুমি জানোনা সেসব।ʼʼ
-“তাহলে জয়কে জবাই করেননি কেন আজও? ওর সাথেকার সম্পর্ককে জবাই করবেন কবে?ʼʼ
কপাল জড়িয়ে ফেলল হামজা, খানিক পরে ধাতস্থ হয়ে জবাব দিলো, “ও কখনও আমার পথে বাঁধা হয়ে আসেনি।ʼʼ
-“আর যদি আসে?ʼʼ
কিছুক্ষণ রিমির জেদি মুখের দিকে চেয়ে থেকে হেসে ফেলল হামজা, “তুমি দেখছি জয়কে নিজের সতিনের মতো হিংসা করো!ʼʼ
একরোখা কণ্ঠে বলল রিমি, “তার চেয়েও খারাপভাবে। আমার ওকে সহ্য হচ্ছে না, একটুও না।ʼʼ
-“কেন?ʼʼ
-“ওর কাছে গিয়ে আপনি ভাগ হয়ে গিয়েছেন আমার থেকে। আজ আমার সাথে চোখ রাঙিয়ে, আমাকে শাসিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেননি। আর কিছু বললে গায়ে হাতও তুলতেন!ʼʼ
এবার হামজা একটু সপ্রতিভ হলো। কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে নরম সুরে নিজেকে উপস্থাপন করার সুরে বলল, “এতটা নিচু আর কাপুরুষ আমি কখনোই হতে পারব না যে, কোনো নারী, বিশেষ করে তোমার গায়ে হাত উঠবে। আর সবটাই ভুল ধারণা তোমার!ʼʼ
অভিমানে জড়ানো কণ্ঠে বলল রিমি, “তাই হোক, তবে এই ভুল নিয়েই বাঁচতে চাই।ʼʼ
-“এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তুমি।ʼʼ
হামজা আজ বের হলো না। জয়কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলো। সকাল দশটা অবধি ঘরে বসে থেকে দম আটকে গেল জয়ের। তরু এসে দুবার দেখে গেছে। ওষুধ দিয়ে গেছে সকালে।
ছাদে গিয়ে বসল। ছাদে দুটো বিভাজন। ছোট্ট এক টুকরো তরু চেয়ে নিয়ে ফুল গাছ লাগিয়েছে। বাকিটা ছাদটা জয়ের চিলেকোঠা, ছোটো আমগাছ, কবুতরের খাঁচা।
তরু এসেছিল কয়েকবার দেখতে। শরীর ভাঙা। রোদে বসে আছে।
তরু বলল “গোসল করবেন না? পানি ভরেছি।ʼʼ
-“পরে করব। থাক।ʼʼ
পা মেলে বসে বইয়ে চোখ বুলালো। গিটারটা তুলে নিয়ে গান গাইল, তো কখনও ঠান্ডা হয়ে পড়ে থাকা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে।
তরু এসে জিজ্ঞেস করল, “শরীর খারাপ লাগছে?ʼʼ
-“না। ঊনিশ শতকের মেয়েলোকের মতো ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছি, তো শরীর আর মন আবার লুঙ্গিডান্স দেবে নাকি এই অবস্থায়! যা তো তুই! কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করিস না, মা! মেজাজ চটে যাচ্ছে যেকোনো কিছুতেই! যাহ!ʼʼ
দুপুর দেড়টার দিকে এই শরীরেই বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। সম্ভব নয় এভাবে ঘরে পড়ে থাকা। হামজা তখন ব্যথার ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছে নিজের রুমে।
—
বেশ ভালো রোদ বেরিয়েছে দু’দিন বাদে। আগের দু’দিন সূর্যের তেজ কম ছিল। ক্লাস শেষে বিল্ডিং থেকে বের হয়ে শহীদ মিনারের সম্মুখে এসে দাঁড়াল অন্তূ।
-“অন্তূ!ʼʼ
পেছন ফিরে তাকাল অন্তূ। প্যান্ট-শার্টের ওপর সাদা রঙা বিশাল একটা শাল জড়ানো জয়ের শরীরে। উদ্ভট ব্যাপার। সাধারণত পরে লুঙ্গি। তাছাড়া কড়া রোদ বেরিয়েছে, তাতে চাদরের প্রয়োজন নেই। ঘৃণায় চোখ নত করল অন্তূ।
জয় সামনে এসে দাঁড়াল, “তোমার নাম কে রেখেছিল?ʼʼ
-“আপনার কাছে প্রয়োজনীয় কোনো টপিক থাকে না, তাই না? অবশ্য যুক্তিযুক্ত বিষয় আপনার সাথে যায়ও না!ʼʼ
-“তুমি শালী চটকানা খাবা। থাপড়ে তোমার মুখের নকশা বদলে দিই, তার আগে প্রশ্নের উত্তর দাও!ʼʼ
অন্তূ বিরক্তি গিলে চোখ বুজে বলল, “আব্বু রেখেছ। এখন আমি যাই?ʼʼ
জয় যেন শুনতে পেল না শেষের কথাটা, “তোমার বাপ এই ভেটকি মার্কা নাম ছাড়া মুল্লুক ঘুরে আর কোনো নাম পায় নাই? অন্তূ, আরমিণ! কীসব বেওড়া নামের বাহার!ʼʼ
অন্তূ নাক কুঁচকে তাকাল, বেওড়া কী?
-“তখন গিয়ে শুধরে দিয়ে আসতেন, তা তো আর দেননি। এখন সেই পুরনো পুঁথি গাওয়ার মানে হয়না। কোনো প্রয়োজন আছে আমার সঙ্গে?ʼʼ
চমৎকার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, “হু! আছে তো, সুইটহার্ট! তোমার সাথে বহুত প্রয়োজন আছে আমার। তবে আপাতত কথা আছে তোমার সঙ্গে।ʼʼ
-“আমার সঙ্গে কী কথা আছে, আপনার?ʼʼ
জয় পিছনের দলের উদ্দেশ্যে মুখ বেঁকিয়ে অসহায়ত্বের ভান করে বলল, “উফফ! কেউ বোঝা একে, আমার সাথে তেজ না দেখাতে। আমি ডিস্টার্বড হই খুব।ʼʼ
অন্তূ তাড়া দিলো, “জলদি বলুন। আমার কাজ আছে।ʼʼ
জয় নাক টানলো আবারও, গলার স্বর বসে গেছে, শুনতে আতিফ আসলামের মতো লাগছে কণ্ঠস্বর, “উহহু রে! এত হুটোপাটা করলে তোমাকে দেখতে আরও বেশি গরম লাগছে, সুইটহার্ট!ʼʼ
-“সুইটহার্ট!ʼʼ
কাধ ঝাঁকালো জয়, “ইয়াপ! সুইট-হার্ট! আমার সাপেক্ষে তুমি একখান সুইটহার্ট। আমি তো ভালো না। মাগায তোমার কাছে একটা সুন্দর, মিষ্টি হৃদয় আছে, সুতরাং তুমি সুইট-হার্ট অথবা মিষ্টি-হৃদয়!ʼʼ
অন্তূ তাচ্ছিল্য হাসল, “সেই সূত্র অনুসারে তো আমি সকলেরই সুইট-হার্ট!ʼʼ
জয় হুট করে দাঁতে দাঁত পিষলো, “জানে মেরে ফেলব, খালাস হয়ে যাবে একদম দুনিয়া থেকে, আমি বাদে তুমি আর যার যার সুইটহার্ট! আমি ডেকেছি এই নামে, সুতরাং শুধুই আমি ডাকব।ʼʼ
নিজস্বতা দেখানোর এই ভঙ্গিমাটাও কেবলমাত্র জয়ের রসিকতারই অংশ, বুঝে অন্তূ চুপ রইল।
-“চলো! কোথাও বসি!ʼʼ
অন্তূ হাসল, “আপনার মাথা নষ্ট, সিনিয়র।ʼʼ
ঘাঁড় নেড়ে সম্মতি জানায় জয়, “ঠুকছো সিস্টার! তা একটু আধটু অবশ্যই! তাই বলে তুমি খোঁটা দিতে পারো না
আমায়!ʼʼ
অন্তূ সুন্দর করে হাসল, “নাটক শেষ হয়েছে আপনার? শো শেষ হলে এবার আমি যাই?ʼʼ
জয় মাড়ির দাঁতে জিহ্বা ঠেকিয়ে হাসল, “নাটক ভালো লেগেছে তোমার? ভালো লাগলে আর একটু করি!ʼʼ
-“খুব বাজে ছিল!ʼʼ
জয় ঘাঁড় চুলকালো, “হু! শুনেছিলাম, প্রেমে পড়লে মানুষের মেধা হারিয়ে যায়। আমারও নাটক কথার গুণ হারিয়ে গেছে, তোমার প্রেমে পড়ে। উফফ! কী যে প্রেম প্রেম পাচ্ছে তোমায় দেখে! ইচ্ছে করতেছে, দাঁত চোপড়ার স্ট্রাকচার বদলে দিই। এত প্রেম কেন তোমার মধ্যে? প্রেমের গোডাউন যেন!ʼʼ
জয়ের নাটক দেখে অন্তূর ঘৃণার উদ্রেক হওয়ার সাথে সাথে হাসিও পেল। একটা মানুষ কতটা খারাপ মানসিকতার হলে কাউকে জ্বালাতন করতে এমন বাজে পন্থা অবলম্বন করতে পারে?
শহীদ মিনারের সিঁড়ির ওপর বসল জয়। বসার সময় চাদর উঠে যাওয়ায় ক্ষত দেখা গেল। পৈশাচিক এক আনন্দ হলো অন্তূর।
-“আরমিণ!ʼʼ
-“হু!ʼʼ
-“চলো বিয়েশাদী করে ফেলি! কত বয়স হয়ে গেল আমার, কতকাল একা ঘুমাব অত বড় বিছানায়?ʼʼ
অন্তূ অতি ধৈর্য্যের সাথে হাসল, “ভাবনাটা ভালো। তবে সব ভাবনা বাস্তবায়িত করতে হবে কেন?ʼʼ
-“ভাবনা বাস্তবায়িত না করলে চলে। কিন্তু, চাহিদা! সেটা পূরণ না করলে কী করে চলবে?ʼʼ
ঠোঁট উল্টে সায় দিলো অন্তূ, “যুক্তি আছে যুক্তিতে! এই সৌভাগ্য আমার কোনো নেকির ফল, যে আমি আপনার চাহিদা হয়ে উঠেছি!ʼʼ
জয় বেশ উৎসাহিত কণ্ঠে বলল, “এক্সাক্টলি! কোনো না কোনো নেকির কাজ তো করেছিলেই জীবনে, এজন্যই তো আমি তোমার প্রেমে মজে যাচ্ছি দিন দিন। কী জাদুটাই করলে, শালী তুমি! মেরে ফেলো আমায়!ʼʼ
কবীর একটু নড়েচড়ে উঠল এবার, কাশল গলা খাঁকারি দিয়ে। জয় দ্রুত পিছে ফিরল, “কী রে! তুই আবার অস্ত্র বের করছিস নাকি? আরে শালা, প্রেমিকার প্রেমে মরা আর তোর মতো ব্রয়লারের অস্ত্রের আঘাতে মরা এক না রে পাগলা! তার ওপর প্রেমিকার সামনে তোর হাতে জখম হয়ে মরলে মান-ইজ্জত কিছু থাকবে?ʼʼ
অন্তূ জিজ্ঞেস করল, “আপনার জরুরি কথাটা বললেন না এখনও!ʼʼ
-“আ’লাভিউ! প্রেমে পড়ে যাও আমার!ʼʼ
অন্তূ হাসল, “এই জনমে তো না!ʼʼ
-“পরের জনম অবধি অপেক্ষা করতে বলছো?ʼʼ
-“জি, একদম! যেটার কোনো অস্তিত্ব নেই।ʼʼ
-“তাহলে তো যা হওয়ার আর করার, এই জনমেই করতে হবে।ʼʼ
-“এত খারাপ দিন আমার জীবনে কোনোদিন আসবে না।ʼʼ অন্তূর শীতলভাবটা কেমন ন্যাপথলিনের টুকরোর মতো বাষ্প হয়ে যাচ্ছে যেন, কড়া হয়ে উঠছে কণ্ঠস্বর।
জয় উঠে দাঁড়াল, “তোমার জীবনে এত ভালো দিন আমি রাখব না যে, তুমি আমায় ভালো না বেসে পার পাবে! চ্যালেঞ্জ কোরো না আমায়। আমি সিরিয়াস হয়ে গেলে খুব বাজেভাবে ফেঁসে যাবে!ʼʼ
কথাটা দারুণ প্রভাবিত করল অন্তূকে। কর্কশ গলায় বলে উঠল, “ধরুন, চ্যালেঞ্জ করলাম! এতটুকু দৃঢ়তা তো আমার এই আমি’র ওপর রাখি আমি যে, এমন কোনো দূর্বলতার অস্তিত্ব নেই এই জগতে, যেটা আপনার মতো সভ্যতাহীন, আদিম পশুকে ভালোবাসতে বাধ্য করতে পারে আমায়! যেখানে স্বয়ং মৃত্যুকে আমি চ্যালেঞ্জ করছি এর পেক্ষিতে। মরণ স্বীকার করলাম আপনার কথার বিপরীতে।ʼʼ
সতর্ক করার মতো করে করে শান্ত স্বরে বলল জয়, “আরমিণ, তোমার এসব কনফিডেন্স আমায় আবার সিরিয়াস না কোরে তোলে, দেখো!ʼʼ
অটল হলো অন্তূর কণ্ঠস্বর, “আপনার এই কথাটাই আমার জিদের আগুনে কেরোসিনের দ্রবণ ঢালছে।ʼʼ
-“খুব খারাপভাবে হারবে, তুমি!ʼʼ
-“খুব ভালোভাবে পিছু হটবেন আপনি। আমার মান-মর্যাদা ও সম্মান ছাড়া আমার এই গোটা জীবনে দ্বিতীয় কোনো পিছুটান বা দূর্বলতা রাখিনি আমি।ʼʼ
জয় আর কথা বলল না। চমৎকার মুচকি হাসল।
চলবে..
[ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করবেন।]