অবশেষে তুমি পর্ব-৩২+৩৩

0
754

#অবশেষে_তুমি
#লেখিকা_Nazia_Shifa
#পর্ব_৩২(সামথিং_স্পেশাল)
____________________
অবাক নয়নে পুরো কামরায় চোখ বুলাচ্ছে কাব্য। সে যা দেখছে আদৌ কি এসব সত্যি নাকি ভুল দেখছে?পুরো রুম ফুল আর ক্যান্ডেল দিয়ে সাজানো।টেবিলের ওপর জারের মধ্যে গোল্ডেন রঙের ফেইরি লাইট জ্বালানো।একবার জ্বলছে আবার বুজে যাচ্ছে। ছোট ছোট মোমবাতিও দেয়া আছে বেড সাইড টেবিলটায়।সুন্দর একটা স্মেল আসছে সেই মোমবাতিগুলো থেকে।হয়তো বেলীফুলের।হবে হয়তো।কাঠগোলাপ আর গোলাপ দিয়ে সাজানো পুরো বেড।বেডের ওপর ফুল দিয়ে লাভ শেপ করা আর তার মধ্যে একটা ছোট্ট বক্স।একটু এগিয়ে বক্সটা হাতে নিল কাব্য।আনবক্স করল সেটা। ভিতরে একটা ওয়াচ।ব্লাক কালারের।বক্সের সাথে দুইটা চিরকুট ও আছে।বক্সটা রেখে নীল রঙের কাগজে লিখা চিরকুট দুই’টা খুললো কাব্য।

”অবেলায় ধরনীর প্রশস্ত বুকে প্রাশান্তির চাদড়ে ছেয়ে যাওয়ার ভারি বর্ষনের ন্যায় আপনার আগমন আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে!যার স্থায়ীকাল অনন্ত,অফুরন্ত।”

“আমার একান্ত ব্যক্তিগত মানুষটার জন্য তার ‘তার’ পক্ষ থেকে সামান্য একটা উপহার।সাদরে গ্রহণ করবেন।

লেখাগুলো পড়তেই এক চিলতে হাসি জায়গা করে নিল কাব্যর ঠোঁট জোড়ায়।মন গহীনে প্রশান্তির ঢেউ খেয়ে গেল তার।আঁখি জোড়া এদিক ওদিক বুলাতে লাগলো।ব্যালকনির দিকে চোখ পরতেই দেখল দরজা লাগানো।বুঝলো কাব্য যে সেখানেই আছে তার মায়াময়ী।ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো সে।দরজা ঠেলে ব্যালকনিতে প্রবেশ করতেই বড়সড় ধাক্কা খেল।তার দিকে পিঠ করে দাড়িয়ে আছে নূর।পেছন থেকে নূরকে দেখেই তার হার্ট বিট মিস হলো কয়েকটা।দ্রুত গতিতে ওঠানামা করছে হৃদস্পন্দন।সেদিনের সেই সাদা,লাল পাড়ের শাড়ী,খোঁপা করা চুলে গোলাপ আর কাঠগোলাপের গাজরা,কানে সেই ঝুমকা জোড়া।’চুড়ী আর পায়েল ওগুলো কি পড়েছে?’প্রশ্নটা মাথায় আসতেই উঁকিঝুকি মেরে দেখার চেষ্টা করলো কাব্য।দেখতে পেল না।

কাব্যর উপস্থিতি টের পেয়ে নড়েচড়ে উঠলো নূর।নড়াচড়া করায় হাতে থাকা চুড়ি আর পায়ে থাকা পায়েলের রিনিঝিনি শব্দ হলো।কানে পৌছালো কাব্যর যার দরুন বুঝতে পারলো সেগুলো ও পড়েছে।নূরকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো যেয়ে। তার কাধে থুতনি রেখে ফিসফিসিয়ে বললো-

-আমাকে পাগল করার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করেছো তাই না?যদি তাই হয় তবে তুমি সফল কারণ পাগল হয়ে গেছি আমি তোমার আসক্তিতে। তোমার নেশায় একদম মাতোয়ারা এই কাব্য।

কাব্যর নেশা ভরা কণ্ঠে বলা বাক্যটুকু কানে আসতেই থমকালো নূর।কাব্য এত সন্নিকটে আসায় এতক্ষণ ধরে সাজানো গোছানো কথাগুলো এখন সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে সে।বুকের ভেতর টিপটিপ আওয়াজ হচ্ছে তার।এত জোরে মনে হচ্ছে বাইরে থেকে কাব্য ও শুনতে পাচ্ছে।নূরকে নিজের দিকে ফিরিয়ে ভালো করে পরখ করে নিল আরও একবার।’তার’ মায়াময়ীর মধ্যে এত মায়া কেন?ভেবে পায়না কাব্য।কিছু একটা মনে পড়তেই কপাল কুঁচকালো কাব্য।নূরকে ছেড়ে দিয়ে হাটু মুড়ে নিচে বসলো শাড়িটা পা থেকে একটু সরিয়ে দেখলো।তারপর জিজ্ঞেস করলো-

-আলতা পড়ো নি কেন?

-আসলে,,

-আলতার শিশিটা কোথায়?

-থাক না এখন

-বলো।

-রুমে ড্রেসিং টেবিলের ওপর।

নূরকে আর কিছু বলতে না দিয়ে রুমে এসে আলতার শিশিটা নিয়ে আবার ব্যালকনিতে গেল কাব্য।

আবারো হাটু মুড়ে বসলো।কাউচটা ইশারা করেনূরকে বললো-

-বসো।

-কিন্তু

-বসো।

কাউচে বসে পরলো নূর।নূরের পায়ে হাত দিতে গেলেই দ্রুত গতিতে সরে গেল সে।

-কি করছেন?

কাজে বাধা পাওয়ায় বিরক্ত হলো কাব্য। মুখ দিয়ে ‘চ’ সূচক আওয়াজ করে তার বাম হাত নূরের একপায়ে রাখলো।নিরবে সন্তপর্ণে আলতা পরিয়ে দিচ্ছে তার দুই পায়ে।মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে নূর।কাজ শেষ করে কাব্য হালকা করে ফু দিল নূরের পায়ে।

-শুকিয়ে যাবে এমনি।

-আচ্ছা।

দুজনই নিরব।পূর্নিমার রাত।আকাশে থলের মতো চাঁদ উঠেছে।মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে সে।কখনো দেখা,যাচ্ছে তো আবার আড়াল হয়ে যাচ্ছে। সে দিকে তাকিয়েই নূর প্রস্তুত করছে নিজেকে। যাই হোক আজ সবকিছু বলবে।আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেঝেতে নিবদ্ধ করলো।কাব্যর দিকে তাকালো। আলতো স্বরে বললো-

-কিছু কথা ছিলো আমার।

-বলো।

ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়লো নূর তারপর আবার তাকালো কাব্যর পানে।তার দিকেই তাকিয়ে ছিল কাব্য।নূর বলা শুরু করলো-

-সবসময় ইচ্ছে ছিলো আমার আরেন্জ ম্যারিজ হোক।দেখতে আসবে,একা কথা বলতে দিবে,পরিচয় হবে,তারপর ভালো লাগা,বিয়ে এমন।তাই বাবা যখন রাজের সাথে বিয়ে ঠিক করে অমত করি নি।কিন্তু ভাগ্যে তো অন্যকিছুই ছিল।হুট করে সবকিছু হয়ে গেল।আপনার সাথে জড়িয়ে গেলাম সারাজীবনের জন্য।আপনি যাকে ছোটবেলা থেকেই কোনো কারণ ছাড়াই ভয় পেতাম,দূরে দূরে থাকতাম।গম্ভীর স্বভাবের আপনি আর আমি বকবক করা স্বভাবের। যদি আপনি বকা দেন এজন্য ধারে কাছে ও ঘেষতাম না আপনার।কিন্তু সেই আপনার সাথেই এখন থাকতে হবে সারাজীবনের জন্য।বিয়ের দিন মনে হাজারো প্রশ্ন নিয়ে আপনার রুমে প্রবেশ করেছিলাম।আমার ভুল ধারণাগুলোতে এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে সবকিছু পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন আপনি।সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।তারপর থেকে এ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত আপনাকে নতুন নতুন রুপে আবিষ্কার করছি।আমার সেই ভুল ধারনাগুলো বারবার ভাঙিয়েছেন আপনি।আপনার করা প্রতিটা কাজে মুগ্ধ হই প্রতিনিয়ত।এক্সিডেন্টের পর অনেক বেশি জ্বালিয়েছি আপনাকে।প্রতিবেলা খাবার,ঔষধ নিয়ে মতলবি করতাম।বিরক্ত হতেন না আপনি।আপনার কাজ শেষ হলে তবেই হাফ ছাড়তেন।টাইম মতো ঘুমাতে চাইতামনা জোর করে আপনার বুকে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন।প্রায় তিন/চার দিন মাথা ব্যথায় ঘুমাতে পারিনি রাতে।জেগে ছিলাম আমার সাথে আপনিও জেগে ছিলেন।একদিন তো ব্যথায় কেদেই দিয়েছিলাম।সেদিন আমার ব্যথায় আপনি কতটুকু কষ্ট পাচ্ছিলেন আপনার মুখশ্রীতে স্পষ্ট ছিল।আপনার এই ছোট ছোট জিনিসগুলোর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম তাই মাঝেমাঝে ইচ্ছে করেই ভুল করতাম।আপনি নিভৃতে আগলে রেখেছেন আমাকে।প্রকাশ করেননি নিজের অনুভূতিগুলো।বলেননি ভালোবাসি।আমিও বলবো না। শুধু এতটুকুই বলবো আমি আপনার সাথে থাকতে চাই।বাকিটুকু জীবন আপনার সাথে বাঁচতে চাই।আপনার আমার ছোট্ট একটা আলাদা দুনিয়া থাকবে।এখন আপনিহীনা আমি অস্তিত্বহীন কাব্য।

হাঁটু গেড়ে বসে ডান হাতটা পেছন থেকে সামনে আনলো।একগুচ্ছ কাঠগোলাপ তার হাতে।বাড়িয়ে দিল কাব্যর দিকে।মিহি কণ্ঠে বললো –

-আমার প্রিয় ফুল আমার প্রিয় মানুষটার জন্য।আমার আপনাকে চাই সারাজীবনের জন্য। থাকবেন আপনি একান্তই আমার হয়ে?আমার ব্যক্তিগত মানুষ হয়ে?

এক ধ্যানে নূরের কথাগুলো শুনছিলো কাব্য।অবাকচিত্তে তাকিয়ে আছে সে নূরের দিকে।এতগুলো কথা নূর তাকে বলেছে।তাও সামনাসামনি। তার লজ্জাবতী দেখি নিজের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে শিখে গেছে।সে নূরের প্রিয় মানুষ নিজ মুখে স্বীকার করেছে নূর।ভাবতেই প্রশান্তিতে ছেয়ে গেল বক্ষ পিঞ্জর।কাব্যর জবাব না পেয়ে মলিন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

-কি হয়েছে? কিছু বলছেন না কেন?

ভাবনার সুতো কাটলো কাব্যর।অক্ষিযুগল নিবদ্ধ করলো নূরের কৌতুহলি,মলিন মুখশ্রী তে।মনে মনে হাসলো কাব্য।হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো নূরের মুখোমুখি। তার হাত থেকে ফুল গুচ্ছ নিয়ে তাকিয়ে রইলো ফুলগুলোর দিকে।ফুলগুলো পাশে রেখে নূরের মুখখানা দু’হাতের আজলে নিয়ে অধরে অধর স্পর্শ করলো। তারপর ধীর কণ্ঠে বললো –

– আমি শুরু থেকেই তোমার ছিলাম। নিজেকে বরাদ্দ রেখেছি একমাত্র তোমার জন্য কিন্তু তুমি আমাকে বুঝতে ব্যর্থ।

কাব্যর কথা শুনে বুকটা ধক করে উঠলো নূরের। আসলেই সে কাব্যকে বুঝতে ব্যর্থ?কিছু বলতে যাবে তার আগেই কাব্য জিজ্ঞেস করলো-

-নূর তোমার বার্থডে তে তন্নী প্রতিবার তোমাকে দুইটা গিফ্ট দিত।একটা রাতে কেক কাটার পরে আর একটা তারপরের দিন।

-হ্যা।প্রতিবার ই দে।

-দুইটা গিফ্ট কিন্তু তন্নী দিত না।

-তাহলে?

বাঁকা হেসে বললো কাব্য –

-আমি দিতাম।রাতে দেয়া গিফ্ট টা থাকত আমার তরফ থেকে।

-আপ,,আপনার তরফ থেকে মানে?

-হ্যা।

-কিন্তু তন্নী তো কখনো বলেনি আমায়।

-বললে কি আর গিফ্ট গুলো নিতে?হ্যা নিতে হয়তো তবে আমার বকা খাওয়ার ভয়ে ভালোবেসে না।তাই..

-মানে প্রতিবার তন্নী যে শাড়ি,চুড়ি গুলো দিত সব আপনার দেয়া?

-জ্বী ম্যাডাম।তোমাকে একটা নীল রঙের ডায়েরি দিয়েছিল না?সেটাও আমার দেয়া।

একটু থামলো কাব্য তারপর আবার বললো-

-জানো প্রতি বার্থডে তে তুমি যখন আমার দেয়া জিনিসগুলো পরতে।মনে হতো এই জিনিসগুলো একমাত্র তোমার জন্য ই বানানো।ইচ্ছে করতো তোমাকে সামনে বসিয়ে রাখি।প্রাণ ভরে দেখি।লুকিয়ে রাখি বুকের মধ্যিখানে।যেনো অন্য কেউ দেখতে না পারে।তোমাকে এই রুপে দেখার অধিকারটুকু শুধু আমারই থাক।কিন্তু পারতামনা সেই অধিকার যে ছিলনা।সে তো আমার অনুভূতিগুলোই বুঝতনা।তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মাথায় কিছু আসছিলোনা।বারবার একটা প্রশ্ন ই ঘুরপাক খাচ্ছিলো ‘হারিয়ে ফেললাম তোমাকে?’ অফিসের কাজে চট্টগ্রাম ছিলাম আমি।বিয়ের আগের দিন রাতের বেলা তন্নী ফোন দিয়ে জানায়। সেদিন রাতেই ছুটে এসেছিলাম।মামনিকে জিজ্ঞেস করলাম বললো -‘তুনমি মামার,সিদ্ধান্তে খুশি।কিন্তু আমিতো খুশি না আমার প্রেয়সীকে অন্য কারো হাতে তুলে দেই কিভাবে বলো।অনেক ভেবেচিন্তে প্ল্যান করলাম তুলে নিয়ে যাবো তোমাকে তারপর বিয়ে করে বাসায় ফিরব।আমার শশুর আব্বু আবার অতটাও হি*ট*লার না যে বিয়ের পর তোমাকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে দিবে।সবকিছু ঠিকঠাক ই ছিল প্ল্যান মোতাবেক।কিন্তু কিছু করার আগেই রাজ এসে বিয়ে ভেঙে দিল।সেদিন একটু স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম।নিজের মায়াময়ীকে আজীবন নিজের কাছে রেখে দেয়ার নিজের করে নেওয়ার সুযোগ টা নিজে এসে ধরা দিয়েছিল আমার কাছে আমিও লুফে নিয়েছি।তোমাকে সারাজীবনের জন্য নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়েছি। ঠিক কবে থেকে তোমার প্রতি এই অনুভূতিরা জাগ্রত হয়েছে জানিনা তবে সেই অনুভূতিদের স্থায়ী অনন্তকাল ধরে। আমার মনের রাজ্যে শুধই সে বিরাজমান এতটুকু জানি।

কাব্য কথা শেষ করে তাকালো নূরের দিকে।নূর কাঁদছে। কাঁদার মাঝেই বারবার হাত দিয়ে চোখ মুছছে কিন্তু কান্না থামছে না।কাব্য শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নূরের দিকে।হুট করেই নূরের মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরলো বুকে।কাব্যর সন্নিকটে এসে কান্নার পরিমাণ আরও দ্বিগুণ হলো তার।ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বললো –

-আমি সত্যি ই আপনার অনুভূতিগুলো বুঝতে ব্যর্থ কাব্য।এত বছরে একবারও বুঝিনি আমি আর না বিয়ের পর বুঝেছি। আমি আপনার যোগ্য না।আপনার দেয়া সেই ডায়েরিটাও সামলে রাখতে পারিনি আমি হারিয়ে ফেলেছি।আপনাকে বোঝার ক্ষমতা আমার নেই।আমি সত্যি ই আপনার যোগ্য…

-হুশশ..আমার মায়াময়ীর নামে আর কিছু বলবেনা।সে যেমনই হোক সে আমার মায়াময়ী, আমার প্রেয়সী,আমার অর্ধাঙ্গীনি।ওই ডায়েরি টা তুমি হারাওনি আমি নিয়ে নিয়েছি।বুঝেছ?

-হু কিন্তু কেন?

-তোমাকে কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়নি।তন্নীর কাছ থেকে জেনেছিলাম তুমি ডায়েরি লিখতে পছন্দ করো তাই দিয়েছিলাম।আর তোমার পছন্দ গুলো যদি জানতে পারি সেই উদ্দেশ্যেই এই ডায়েরিটা নেয়া।

-জেনেছেন?

-হ্যা কিন্তু আরও জানার আছে।

-এজন্যই বলি রাতারাতি সবকিছু কিভাবে হয়ে যেত।আপনিই করতেন।

-হুম।

খানিকক্ষণ চুপ রইলো দু’জন।তারপর কাব্য ই জিজ্ঞেস করলো-

-নূর যদি কখনো বলি আমি কোনো বিপদে আছি আর তোমার সাহায্য লাগবে।তুমি থাকবে আমার পাশে?সাহায্য করবে তো?

-নিজের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করবো।তাতে যদি আমার মৃত্যু ও হয় তাহলেও..

-হুঁশশ,, যা বলেছো দ্বিতীয় বার যেন না শুনি।শুধু পাশে থাকলেই হবে।বিশ্বাস থাকলেই চলবে।

মাথা উপর নিচ করে সায় জানালো নূর।

কান্নার পরিমাণ কমলেও নূর এখনো কাব্যর বুকের সাথে লেপ্টে আছে।একটু পরই নূর কাব্যর বুক থেকে মাথা তুলে তার দিকে তাকিয়ে বললো –

-আপনি বলেছিলেন না আপনার ‘সে’ যদি পুরোপুরি আপনার হয় তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে সুন্দর গিফ্ট।

-হ্যা বলেছিলাম তো।

নূর নত মস্তকে ফিসফিসিয়ে বললো-

-আমার আমিটাকে সম্পূর্ণ বরাদ্দ রাখলাম আপনার জন্য। যার শিরায় শিরায় থাকবেন আপনি।থাকবে শুধু কাব্য নামক মানবের জন্য অনুভূতি।আমার সর্বত্র থাকবে তার বিচরণ।আমি সম্পূর্ণ আপনার।

কথাটুকু বলেই আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো কাব্য কে। কাব্য ও হাসিমুখে আগলে নিল তাকে।ঠোঁটে সেই স্নিগ্ধ হাসি। আজ যেন ঠোঁট থেকে হাসি সরছেই না তার।এত এত খুশি একসাথে পেয়েছে আজ।মিনিট পাঁচেক সেভাবেই রইলো দু’জন।তারপর হুট করেই নূরকে কোলে নিয়ে নিল কাব্য। ভড়কে গেল নূর তবে পরমুহূর্তেই সামলে নিল নিজেকে।রুমে যেয়ে নূরকে বেডে শুয়িয়ে দিয়ে এক এক করে সবগুলো মোমবাতি নিভিয়ে দিল।ফিসফিসিয়ে কাব্য বললো-

-আজ সত্যি সত্যি বাসরটা সেড়ে ফেলব।বলেই নূরের ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিল।কাব্যর সাদা রঙা টি-শার্ট টা খামচে ধরলো নূর।

#চলবে

#অবশেষে_তুমি
#লেখিকা_Nazia_Shifa
#পর্ব_৩৩
_____________________
প্রভাতের আলো ফুটে উঠেছে।পাখির কিচিরমিচির শব্দের রোল পড়ে গেছে চারিদিকে।জানালার কাচ ভেদ করে ভোরের আলো নূরের মুখশ্রীতে পড়তেই চোখ মুখ কুচকে এলো তার।নিভু নিভু চোখে তাকালো একটু নড়তে নিলেই বুঝতে পারলো কারো শক্ত বাধনে আবদ্ধ সে।আঁখি জোড়া ভালো করে মেলে তাকালো নূর।কাব্যর প্রশস্ত বুকের সাথে লেপ্টে আছে সে।সে নিজেও একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে কাব্যকে।নূরের নড়াচড়ায় কাব্যর ঘুৃম হালকা হয়ে গেল একটু।এবার আরও শক্ত করে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো।কাব্যর বুকের সাথে নূরের ঠোট এখন ছুঁই/ছুঁই প্রায়।মুখশ্রীতে লাল আভা ধরা দিল তার।অন্যদিনের চেয়ে আজকে অনেক বেশি হালকা লাগছে নিজেকে।কাব্যকে সব খুলে বলেছে সে।এতদিন মন গহীনে কথাগুলো লুকিয়ে রেখে ছিল।মনটা আনচান করছিলো কিভাবে বলবে?কবে বলবে?বলার পর কাব্য কি জবাব দিবে?এগুলো ভাবতে ভাবতেই পাগল প্রায় অবস্থা হচ্ছিল তার।কিন্তু এখন শান্তি আলহামদুলিল্লাহ।কাব্যকে ভালো করে পরখ করে নিল নূর।না ঘুমাচ্ছে সে।সেই সুযোগে কাব্যর উ*ন্মু*ক্ত বুকে ঠোঁট ছোঁয়াল নূর।বিদ্যুৎ এর ন্যায় ঝাঁকি দিয়ে উঠলো সমস্ত শরীর।তাড়াতাড়ি করে ওঠার চেষ্টা করতেই আবারো নড়েচড়ে উঠলো কাব্য। স্থির হয়ে গেলো নূর।গুটিশুটি মেরে মিশে রইলো কাব্যর বুকে।এই জায়গাটা তার।একান্তই তার।যেখানে মাথা রাখলে সমস্ত শরীর প্রশান্তিতে ছেয়ে যায়।বক্ষ মাঝের ধুকপুকানির তাল শুনতে পায় কাব্যর সাথে নিজের স্পন্দন ও যেন দ্বিগুণ মনে হয়।হালকা হাসলো নূর। একটু উচু হয়ে কাব্যর দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো-

-আপনার সাথে কাটানো সময়গুলো আমার জীবনে সবচেয়ে সুন্দর ও স্পেশাল।
.
.
বিগড়ানো মে*জা*জ নিয়ে কাব্যর দিকে তাকিয়ে আছে নূর। ভেজা চুলগুলো টাওয়াল দিয়ে একপাশে বেঁধে রাখা।শাওয়ার নিতে যাওয়ার আগে কাব্য কে ডেকে গিয়েছিল নূর।এক ঘন্টার লম্বা শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে দেখলো কাব্য এখনো ঘুমাচ্ছে।

-আপনি উঠবেন না পানি ঢে*লে দিব?

-জ্বা*লি*য়ো না তো নূর। ঘুম পেয়েছে প্রচুরর।

-সকাল আটটার বেশি বাজে এখন কিসের ঘুম হ্যা।সারারাত কি করেছেন তারা গুনেছেন?

-আমার কি দোষ? তোমাকে রাতে আদর করতে করতে ই ঘুমের বারোটা বেজে গেছে।এখন ডিস্টার্ব করোনা যাও।

-আব,,দে,,দেখুন আমি সত্যি সত্যি ই পানি ঢে*লে দিব কিন্তু।

নিরুত্তর কাব্য।

খানিক বাদে চোখে মুখে শীতল কিছুর স্পর্শ পেয়ে ঘুমের ঘোরে ই কপাল কুঁচকালো কাব্য। হাত দিয়ে মুখ স্পর্শ করতেই মুখশ্রী ভেজা ঠেকলো।বুঝতে বাকি রইলো না নূর সত্যি ই পানি ঢে*লে দিয়েছে। ফট করে উঠে পড়লো কাব্য। সামনে তাকাতেই দেখলো নূর এক হাত কোমরে রেখে আর এক হাতে পানির জগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে ভয়ে জবুথুবু অবস্থা নূরের।কিন্তু বাইরে থেকে স্বাভাবিক ভাবেই শ*য়*তা*নি হাসি দিয়ে দাড়িয়ে আছে।কাব্য ক্ষিপ্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

-কি করলে এটা?

নূর ভয় পেলেও যথাসম্ভব ঠান্ডা গলায় জবাব দল-

-বৃষ্টি পড়েছে।রুমের ছাদ ফু*টা হয়ে গেছে লোক ডেকে ঠিক করান তাড়াতাড়ি। নাহলে প্রায়শই এমন আকস্মিক বর্ষণ ঘটবে।

-মজা করছো?

-হ্যা মজা করার মতোই প্রশ্ন করেছেন।দেখছেনই তো পানি মে*রেছি তাহলে জিজ্ঞেস করছেন কেন?আজিব।

-কেন মে*রেছো?সাহস বেড়েছে খুব তাইনা?

-একটু আধটু তো বাড়াতেই হবেই কাব্য চৌধুরীর ওয়াইফ বলে কথা।

-তাই?এত সাহস তোমার?

-হ্যা হ্যা।

-ভালো।

নূরের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কাব্য। এই দৃষ্টির মানে নূর ঠিকই ঠাহর করতে পারছে।নিশ্চিত মাথায় কিছু চলছে।

নূর থেমে থেমে জিজ্ঞেস করলো-

-কি..হয়েছে? এভাবে কেন তাকিয়ে আছেন?

-কিছুনা তো।

‘কেটে পড়াই ভালো। হাবভাব ভালো ঠেকছে না।’কথাটুকু মস্তিষ্কে না*ড়া দিতেই যাওয়ার জন্য উদ্দত হলো নূর।হাতের গ্লাসটা টেবিলে রেখে ঘুরতে নিলেই হাতে টান পড়লো তার একটানে নূরকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল কাব্য।আকস্মিক ঘটনায় ভরকে গেল নূর। বুক দুরুদুরু করছে তার।দুই হাত নূরের কোমরে রেখে কাব্য জিজ্ঞেস করলো-

-তা মিসেস ওয়াইফ দেখি আপনার সাহস কতটুকু।ছাড়ান তো নিজেকে।

চুপসে গেল নূর। যত সাহসই দেখাক না কেন কাব্যর সামনে আসলে ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায় সে।চুপ করে রইলো নূর।ধাক্কা দিয়ে নূরকে বেডে শুয়িয়ে দিল কাব্য।চুল থেকে টাওয়াল খুলে মুখ ডু*বিয়ে দিল ভেজা চুলে।কাব্যর এহেন কান্ডে আরেক দফা চমকালো নূর।ঘাড়ে গভীর স্পর্শ আকলো।অতঃপর কপালে ঠোঁট ছুয়িয়ে দিল।গলা অব্দি চাদর টেনে দিয়ে বললো-

-তুমি ঘুমাও এখন।

ওয়াশরুমে চলে গেলো কাব্য।মিনিট দুয়েক বোকা বনে সেভাবেই শুয়ে রইলো নূর।সম্বিত ফিরে পেতেই তাড়াতাড়ি করে উঠে নিজেকে ঠিকঠাক করে রুম ত্যাগ করলো।
.
.
সকাল দশটা প্রায়।

-আজকে ভার্সিটি তে যাবনা আমি।(কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো নূর)।

-যাবেনা মানে কেন যাবেনা?

-এমনি যাবনা প্লিজ।

-কেমন কথা এটা?কি হয়েছে?(নূরের ডানগালে আলতো করে হাত ছুয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো কাব্য)

-তন্নীকে দেখতে আসবে আবার।

-হ্যা সেটা তো বিকেলে।এখন কি সমস্যা?

-সমস্যা সেটা না সমস্যা হচ্ছে তন্নীকে দেখতে আসতে দেয়া যাবেনা।

-মানে?কেন?

-কারণ,,তন্নী,,আসলে…

-ঠিক করে বলো(ধমকের সুরে)

হালকা কেঁপে উঠলো নূর।চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বললো-

-তন্নী আর রিদ ভাইয়া একজন আর একজনকে ভালোবাসে।

মিনিট দুয়েক পার হবার পরেও কাব্যর তরফ থেকে কোনো প্রতিত্তোর না পেয়ে চোখ পিটপিটিয়ে চাইলো নূর। গম্ভীর চাহনি দিয়ে তাকিয়ে আছে কাব্য। মৃদু ভয় পেল নূর।নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো-

-কি হয়েছে? কিছু বলছেন না কেন?

-সত্যি ই চাও তন্নীকে দেখতে না আসুক?

-হ্যা

ঠিক আছে রিদ কে ফোন দিয়ে বলে দিব।

-মানে?রিদ ভাইয়াকে কেন ফোন দিবেন?পাত্রপক্ষকে ফোন দিতে হবে।

-সেটাই তো বললাম।

-কি ‘সেটাই তো বললাম ‘।রিদ ভাইয়াকে কেন ফোন দিবেন পাত্র কি রিদ ভাইয়া,,এতটুকু বলেই থেমে গেল নূর।চোখ গোল গোল করে অবাক চাহনি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

-আমি যা ভাবছি সেটা কি সত্যি?

বেড থেকে টাইটা নূরের হাতে দিতে দিতে বললো –

-জ্বী মিসেস ওয়াইফি সত্যি।

-কিন্তু আপনি জানলেন কিভাবে?

-নূর তন্নী আমার বোন আর রিদ সেই তেরো বছর বয়স থেকে আমার সাথে আছে।তাদের মধ্যকার ব্যাপারটা জানা আমার জন্য খুব বেশি কঠিন না।

-মামনি বাবা ওনারা জানেন?

-হ্যা বলেছি।

-বাহ ত*লে ত*লে ট্রেন চলে আর আমি বললেই হ*রতাল। (ঠোঁট উল্টে বললো নূর)

-মানে?

-আমি কিছু জানিনা কেন?

-এইযে জানালাম।একটু শক দিতে চেয়েছিলাম এই আর কি। দেরি হয়ে যাচ্ছে ধরো।

-হু।টাইটা ভালোভাবে বেঁধে দিয়ে কাব্য কে বললো-

‘তাড়াতাড়ি আসুন নাস্তা করতে।

-দাড়াও।

-কেন?

ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে ছোট্ট নীল রঙের একটা বক্স বের করলো কাব্য। বক্সটা খুলতেই সাদা রংয়ের পাথরের একটা নোজ পিন দেখা গেল।চকচক করছে সাদা পাথরটা।পুরোনো নোজ পিনটা খুলে নিজ হাতে সন্তপর্ণে পড়িয়ে দিল নতুন নোজ পিনটা।অতঃপর নাকে যে জায়গাটায় নোজ পিন তার একটু ওপরে ছোট্ট করে চুমু খেল।আবেশে চোখ বুজে নিল নূর।তার দুই বাহু তে ধরে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

-পছন্দ হয়েছে?

-হ্যা।ধন্যবাদ।

-মাই প্লেজার জান।বলেই মুচকি হাসি টেনে রুম থেকে বেরিয়ে এলো নূরের সাথে।

দুপুর একটা সময়।কেবিনে বসে কাজ করছিলো কাব্য।ফোন বেজে উঠল তার।রিসিভ করে বললো-

-সিয়াম কেমন আছিস?

-ভালো। কাব্য রিয়াকে এখনো বাড়ি ফেরাতে পারিনি।এত বার বলার পরেও ও বাসায় আসতে রাজি হচ্ছে না।কি করবো আমি?কোথায় আছে তাও জানিনা।

-কথা হয়েছে কবে?

-আজকে সকালে হয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিলাম।কিন্তু ওর একটাই কথা ও কিছুদিন একা থাকতে চায়।
তুই একটু খু*জে দিতে পারবি তোর লোক দিয়ে?

-আচ্ছা দেখছি

-ঠিক আছে রাখি তাহলে।

-হুম।
ফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো কাব্য।মনে মনে আওড়ালো-

-শীঘ্রই অবসান ঘটবে এসবের আর মাত্র দুই কি তিনদিন।সব ঝামেলা শেষ করে দিব শুধু সময়ের অপেক্ষা।
.
.
দুপুর সাড়ে তিনটা প্রায়।তন্নীর রুমে বেডে পা ঝুলিয়ে বসে আছে নূর। মুচকি মুচকি হাসছে সে মূলত তন্নীকে জ্বালাতে।তন্নী ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে তন্নী।তন্নী তপ্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-

-হাসছিস কেন?

-তো কি করবো?

-কি করবি মানে? আমি কাঁদছি দেখছিসনা?

-তুই কান্না করছিস হুহ সবই টিস্যু শেষ করার ধান্দা।জানি আমি ড্রামা কুইন।সময় নষ্ট না করে রেডি হয়ে নে।

-নূররর

-চে*চাচ্ছিস কেন তন্নু?

-আবারও তন্নু বলছিস না করেছি না।

-বছর খানেক হবে তোর এই সুন্দর নামটা ধরে ডাকিনা আজকে কেন ডাকলাম বলতো?নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে আজকে।

-মা*র খাবি।কিছু কর নূর।আমি এই বিয়ে করবোনা।

নূর গা ছাড়া ভাব দেখিয়ে বললো-

-আমি কি করবো?

মুখ বাকিয়ে ক্রো*ধা*ন্বিত কণ্ঠে বললো –

-হ্যা তুই কি করবি।তোর কাছে তো এখন আমার ভাই আছে আমার না বপ্পেন থু*ক্কু মনে ধরা জামাই হারাতে যাচ্ছে তোর তো কিছুনা।

-নাটক করিস না তো।দেখতে আসছে উঠিয়ে নিয়ে যেতে আসছেনা তোকে সো টেক আ চিল*পিল।দেখা যাবে।ওকে?

-তুই বলছিস এ কথা কালকেও তো টেনশনে ছিলি দেখতে আসবে বলে।

-হ্যা ছিলাম এখন মুড সুইং হয়েছে।

-আল্লাহ দ*ড়ি ফা*লাও উইঠা যাই আমি এই বিয়া করতামনা।

-ছিহ তন্নী ভাষার কি ছি*রি।পাত্র পক্ষ যদি এই ভাষা শোনে তাহলে মনে হয় উল্টায় পাল্টায় দৌড় দিবে।

-কথা বলবিনা যা তুই

-হ্যা যাবো তো। তোকে নিয়েই যাব। ভালো করে রেডি হয়ে নে।যাতে রি..মানে ছেলের হ্যা ছেলের পলক ই না পড়ে।বলেই বোকা বোকা ফেস করে হাসি দিল নূর। আর একটু হলে ধরা পড়ে যেত।

-নূর তন্নী রেডি হয়েছে?

মিসেস রেহানার কণ্ঠ স্বর পেয়ে দরজার দিকে তাকালো নূর।হাল্কা হাসি দিয়ে বললো –

-হ্যা মামনি হয়ে গেছে।ওনারা কি এসে পড়েছেন?

-হ্যা তোকে খুঁজছে। আয়।

-আচ্ছা।

-ওনারা আমাকে দেখতে এসেছে তাহলে নূরকে কেন খুজবে?(তন্নী)

-বাড়ির একমাত্র বউ নূর ওকে খুজবে না তো কাকে খুঁজবে? নূর আয়।

-হ্যা চলো।
.
সোফায় বসেছিল রিদ আর তার মা মিসেস রনিতা। অন্য পাশের সোফায় বসে আছে কাব্য আর তার বাবা আয়মান চৌধুরী।নূর যেয়ে মিসেস রনিতার ঘা ঘেঁষে বসে পরলো।সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

-আসসালামু আলাইকুম আন্টি কেমন আছো?

মিসেস রনিতা নূরের মাথায় হাত রেখে মিষ্টি হাসি দিয়ে জবাব দিলেন –

-আলহামদুলিল্লাহ মা।তুমি কেমন আছো?

-আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

-আমাকে কি কারো চোখে পড়েনা?(মন খারাপ করে বললো রিদ)

-না পড়েনা। তোমার যেমন আমাকে চোখে পড়ে না তেমন আমারও পড়েনা।

-কেন?কি করেছি আমি?

-কিছুনা। কিছু ই করোনি।

-এমন করিস কেন?না বললে বুঝবো কিভাবে?

-বললাম তো কিছুনা।আমি আসছি আন্টি।

ড্রয়িং রুম থেকে উঠে কিচেনে আসলো নূর।মিসেস রেহানার সাথে নাস্তা বানাতে হেল্প করতে নিলেই উনি বললেন –

-এগুলো আমি করছি তুই যেয়ে দেখতো তন্নীর হলো কি না।

-হু।

-কি হয়েছে?

-তন্নীকে যে আজকে রিদ ভাইয়াই দেখতে আসবে সেটা কালকে বলো নি কেন?

-কাব্য না করেছিল কিভাবে বলতাম।

-হ্যা তোমার ছেলের কাজ ই তো এগুলো।সব তার ইচ্ছা ই।হুহ।

হাসতে হাসতে মিসেস রেহেনা বললেন –

-এত রাগ দেখাচ্ছিস যে কাব্যর সামনে তো তুই ও ভে*জা বেড়াল হয়ে যাস।

চুপসে গেল নূর। হ্যা ঠিকই তো বলেছে।

-ঠিক আছে আমি গেলাম তন্নীকে নিয়ে আসতে।

-ঠিক আছে।

নূর যেতেই আবারো হেসে দিলেন মিসেস রেহেনা।

সোফায় নত মস্তকে বসে আছে তন্নী।একটিবারের জন্য ও মাথা উঁচিয়ে তাকায়নি সামনে।নূর কানের কাছে ফিসফিস করে বললো-

-ইশশ তন্নী অনেক হ্যান্ডসাম একবার তাকিয়ে দেখ।

-তুই দেখ বেশি করে।

-আমার তো আছেই দেখার মানুষ।

-তাহলে ওইদিকে নজর দিচ্ছিস কেন?

-কি ফিসফিস করছিস দুইজন?(রিদ)

চেনা চেনা কণ্ঠ পেয়ে ফট করে চোখ তুলে তাকালো তন্নী। তাকাতেই একশো ভোল্টের ঝ*টকা খেল যেন।যা দেখছে আদৌ কি সত্যি নাকি ভুল দেখছে?নূরের দিকে তাকাতেই দেখলো সে মুচকি মুচকি হাসছে।ফিসফিসিয়ে বললো-

-কেমন লাগলো নন্দিনী?আমি কিন্তু কিছু করিনি সব তোর ভাই করেছে।

তন্নী টাস্কি খেয়ে বসে আছে।সবাই কি আলোচনা করছে সে ব্যাপারে কোনো হেল দোল নেই তার।শুধু কাব্যর শেষ উক্তি টুকু কর্ণধার হলো-

-আজকেই এনগেজমেন্ট করে রাখবো।তন্নী রিদকে তোর রুমে নিয়ে যা।

কোনোরকম কথা না বলে মাথা নাড়িয়ে সায় দিল তন্নী।নিচু স্বরে বললো-

-আসুন।
.
.
তন্নীর রুমে বেডে বসে আছে রিদ। তন্নী বেড থেকে একটু দূরে কাবার্ডের কোণ ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে।

-কি হয়েছে এমন তব্দা মে*রে আছো কেন?

হকচকিয়ে রিদের দিকে তাকালো তন্নী।নির্লিপ্ত গলায় বললো –

-কিছুনা।

-খুব তো ভালোবাসো ভালোবাসো বলে চেচামেচি করছিলে এখন কি হয়েছে?

এবার মুখটা কাঁদো কাঁদো করে তন্নী বললো-

-আপনি আগে বলেন নি কেন জানেন আমি কত ভয় পাচ্ছিলাম।কত উ*দ্ভট চিন্তাভাবনায় মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো আমার।

বেড থেকে উঠে তন্নীর সামনে দাড়ালো রিদ।এক হাত তন্নীর গালে রেখে ফিচেল কণ্ঠে বললো –

-তোমাকে ভালোবাসি এতদিন স্বীকার করিনি।কিন্তু স্বীকার যেহেতু করে নিয়েছি হারাতে দিব না কোনো মতেই।

আলতো করে অধর ছুয়ে দিল তন্নীর কপালে।আবেশে চোখ বুঁজে নিল তন্নী।এই প্রথম কোনো ছেলে তার এত কাছে।প্রথম কোনো ছেলের স্পর্শ পেয়েছে।তাও ভালোবাসার মানুষটার কাছ থেকে।লজ্জায় রক্তিম বর্ণ ধরা দিয়েছে মুখশ্রীতে।তন্নীর লজ্জা রাঙা মুখ দেখে মনে মনে হাসলো রিদ।দূরে সরে দাঁড়ালো সে।তন্নী হাত মুঠ করে কাবার্ডে পিঠ ঠেকে দাড়িয়ে আছে।

-এদিকে এসো।

ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো তন্নী।

-বসো।

নিঃশব্দে বেডে বসলো সে।তন্নীর থেকে যথাসম্ভব দূরত্ব রেখেই বসেছে রিদ।রিদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো –

-দেখ তনিমা স্যার আমার ওপর বিশ্বাস রেখে তোমাকে আমার হাতে তুলে দিচ্ছেন।তুমি এখন যেমন আছো বা যেভাবে আছো বিয়ের পর ঠিক সেরকম বিলাসিতায় হয়তো রাখতে পারবো না কিন্তু তোমার জীবনে সুখের অভাব হবেনা কথা দিচ্ছি।নিজের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করবো তোমাকে খুশি রাখার।তবে ধৈর্য ধরতে হবে। আর তোমার সাহায্য ও তো প্রয়োজন।মান-অভিমান হবে আমি ভাঙাবো,আমি ই আদর করবো আবার কিন্তু ছেড়ে যাওয়ার কথা বলা যাবেনা কখনো।এবার বলো তুমি বিয়েতে রাজি?চাইলে সময় নিতে পারো।

রিদের মুখে তনিমা নামটা শুনে প্রশান্তর ঢেউ বয়ে গেলো হৃদ গহীনে।তনিমা তন্নী তার পুরো নাম।কিন্তু তনিমা কেউ ই ডাকেনা বলতে গেলে।তার দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছে তন্নী।নেহাৎ ই খুশির কান্না।আবেগে আপ্লূত হয়ে তন্নী ঝাপিয়ে পড়লো রিদের বুকে।তন্নীর হেন কান্ডে রিদ চমকালো একটু।আলতোভাবে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো তাকে।বুকের দিকে শার্টটায় গরম অনুভব হতেই কাধ ধরে তন্নীকে বুক থেকে আলগা করলো।

-কাঁদছো কেন?

তন্নী নাক টানতে টানতে ই বললো-

-খুশির ঠে*লায় কাঁদছি।

তন্নীর কথা শুনে শব্দ করে হাসলো রিদ।তাকে ছেড়ে দিয়ে বললো –

-আমার প্রশ্নের উত্তর?

তীক্ষ্ণ নজরে তাকালো তন্নী।বললো-

-এখনো উত্তর লাগবে আপনার।

-হ্যা

তন্নী তপ্ত কণ্ঠে বললো –

-করবোনা আপনাকে বিয়ে লাগবেনা আপনাকে।

-সত্যি?

-হ্যা হ্যা সত্যি।

-তাহলে চলে যাই।বলে উঠে যাওয়া ধরলো রিদ।

পেছন থেকে তন্নী বিচলিত কণ্ঠে বললো –

-এই না না করবো তো আপনাকেই বিয়ে করবো।মজা করছিলাম। এমন করেন কেন?

-আচ্ছা।
.
.
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে গগনতলে।ভাদ্রের কাঠফাটা রোদের তীব্রতায় অসহ্য, অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।গরমের তীব্রতা যেন দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।ব্যালকনির গ্রিলে দুই হাত রেখে মাথা ঠেকিয়ে কাউচে বসে আছে নূর।পাশেই তন্নী ফোন নিয়ে গুঁতা*গুঁতি করছে।তন্নী আর রিদের আংটি বদল হয়েছে শুধু।তন্নীর অনার্স কমপ্লিট হলে বিয়ে হবে।রিদরা চলে গেছে মিনিট বিশেক হবে।নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে আকাশ পানে তাকিয়ে আছে নূর।লালাভ মেঘের আনাগোনা সাথে সাদা রংয়ের মেঘ গুলোও যেন দলা পাকিয়ে আছে।হালকা বেগে বাতাস বইছে।আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তন্নীর দিকে তাকালো নূর।

-তোর কি আর কাজ নেই?এবার ফোনটা রাখ। সারাদিন ওইটা নিয়েই পড়ে থাকিস।কি করিস এত?

-লুক নূর বে*বি আমার ফোন আমার আবেগ তাই এটা নিয়ে কিছু বলবিনা।ওকে।

-আবেগ না ছাই।

-যা মনে করিস।আচ্ছা শোন।

-বল

-রিদ ভাইয়া ই যে আমাকে দেখতে আসবে আগে বলিস নি কেন?

-আমি ই তো সকালে জানলাম।

-সারাদিনেও তো বলিসনি।

-তুই যেমন এত বছরেও বলিসনি আমিও বলিনি।

-মানে?

-কিছুনা।আযান দিয়ে দিবে অযু করতে যাবো।তুই ও নামায পড়তে যা।পরে কথা হবে এগুলো নিয়ে।

-হু।
.
.
রাত আটটার কাছাকাছি সময়।টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কতগুলো ফাইল। একটা একটা করে সব চেক করছে কাব্য।তখনই ফোন বেজে উঠল তার।স্ক্রিনে রিদের নাম দেখে কপাল কুচকালো কাব্য।একটু আগেই তো কথা হয়েছিল।তাহলে?তাড়াহুড়ো করে ফোন রিসিভ করলো কাব্য। রিসিভ করতেই রিদ বিচলিত কণ্ঠে বললো –

-স্যার তাড়াতাড়ি …… হসপিটালে চলে আসুন।তাড়াতাড়ি আসুন।

রিদের কথার প্রতিত্তোরে কিছু বলবে তার আগেই ওপাশ থেকে টুট টুট শব্দ জানান দিল ফোন কেটে গেছে।তাড়াহুড়ো করে ফোনটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো কাব্য কাউকে না জানিয়ে ই।
.
.
হাতে সাদা রংয়ের কাগজের রিপোর্টটা নিয়ে থম মেরে দাড়িয়ে আছে কাব্য।রিদ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কাব্যর দিকে।তার এক্সপ্রেশন বোঝার চেষ্টা করছে মূলত।

-আমার হাতে বেশি সময় নেই তাই না কাব্য।

#চলবে