অরুণিকা পর্ব-২১+২২+২৩

0
1155

#অরুণিকা
#লেখিকা_সামিয়া_বিনতে_হামিদ
||পর্ব-২১||

৩৮.
শেক্সপিয়র বলেছিলেন, “একজন ছেলে কখনো একজন মেয়ের বন্ধু হতে পারে না, কারণ এখানে আবেগ আছে, দৈহিক আকাঙ্খা আছে।”
এই কথাটিকে সত্য প্রমাণ করে দিয়েছে মাওশিয়াত আর সায়ন্তনী। সায়ন্তনী তার ভালো লাগার কথা ইমনকে জানানোর সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু মাওশিয়াত মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা হওয়ার হোক, সে তার ভালো লাগার কথা ইভানকে জানাবেই।

আজ কলেজের ক্লাস শেষ করে মাওশিয়াত ইভানের সামনে এসে দাঁড়ালো। ভাবলো, আজই সব জানিয়ে দেবে। তখনই ইভান মুচকি হেসে তাকে বললো,
“চলো, আজ তোমাকে বাসায় নিয়ে যাই।”

মাওশিয়াত খুশি হয়ে বলল,
“আজ তুমি তোমার বাসায় নিমন্ত্রণ করছো?”

“হ্যাঁ, ইমন তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছে।”

“শুধু এই জন্য? আর ও তো দেখা করতে চেয়েছে, কিন্তু একবারো যোগাযোগ করে নি।”

“আরেহ, ও উলটো তোমার উপর অভিমান করে বসে আছে।”

“কেন? আমি কি করেছি?”

“ওই যে তুমি ওর সাথে যোগাযোগ করো নি।”

মাওশিয়াত হেসে বললো,
“অভিমানী খেলোয়াড়। আমি তো কারো সাথেই রাখি নি।”

তারপর মাওশিয়াত লাজুক হেসে বলল,
“শুধু তোমার সাথেই আমার সব যোগাযোগ।”

ইভান কথাটি শুনে ভ্রূ কুঁচকে তাকালো। এদিকে বাসায় ঢুকেই ইমন মাওশিয়াতকে অরুণিকার সাথে খেলতে দেখে অবাক হলো।

মাওশিয়াত ইমনকে দেখে বলল, “কেমন আছো, ইমন?”

ইমন মাওশিয়াতের সামনে এসে বসলো। আর মাওশিয়াত গালে হাত রেখে বলল,
“তুমি নাকি আমার সাথে অভিমান করেছো?”

ইমন আড়চোখে ইভানের দিকে তাকালো, তারপর বলল,
“তুমি তো একবারো আসো নি এইদিকে। আমি কি তোমার বাসায় যেতে পারবো, বলো? তখন আংকেল-আন্টি কি না কি ভেবে বসে থাকবে!”

মাওশিয়াত হেসে বলল,
“আমার মা অনেক মিশুক মানুষ। আর বাসায় কে আসে না আসে, এসব দেখার মতো সময় বাবার নেই। ভাবছি তোমাদের সবাইকে একদিন বাসায় দাওয়াত করবো। মা, ইভানকেও দেখতে চায়।”

কথাটি বলেই মাওশিয়াত ইভানের দিকে তাকালো। ইমন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“বাকিদের দেখতে চায় না?”

মাওশিয়াত মাথা নেড়ে বলল,
“আরেহ, না। আমি তো ইভানের কথায় মাকে বলেছি। ও তো এখন আমার সাথে একই কলেজেও পড়ছে।”

তখনই তাহমিদ খাবার সাজিয়ে বলল,
“ইমন তুই ফ্রেশ হয়ে আয়। সবাই খেতে বসো, মাওশিয়াত তুমিও আসো। ব্যাচেলর সংসারের রাঁধুনির রান্না খেয়ে দেখো।”

তূর্য শতাব্দীকেও ডেকে নিয়ে এসেছিলো। শতাব্দী মাওশিয়াতকে বলল,
“মিষ্টিমশাই, মিষ্টি ছাড়া খাবারে ভীষণ ঝালও দেয়। একেবারে মুখ জ্বালিয়ে দেবে।”

অরুণিকা বলল,
“শতু আপু, তাহমিদ তো ইচ্ছে করেই মরিচ বেশি দিয়েছিল..”

তাহমিদ অরুণিকার মুখ চেপে ধরে বলল,
“অরুণিকা, বেশি কথা বলছো তুমি।”

মাওশিয়াত অরুণিকাকে তার কাছে টেনে এনে বলল,
“আমাকে কানে কানে বলো!”

অরুণিকা উঠে জোরে জোরেই বলল,
“শতু আপু ওইদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় তার বন্ধুর সাথে হাসছিলো তাই।”

শতাব্দী অবাক হয়ে তাহমিদের দিকে তাকালো। তাহমিদ আমতা-আমতা করে বলল, “মোটেও না।”

ইমন বলল, “আমি বলছি।”

তাহমিদ চোখ গরম করে ইমনের দিকে তাকালো। ইমন সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে বলল,
“শতাব্দী, তুমি তোমার ছেলে বন্ধুর সাথে হাসছিলে, এই জন্য সেই মরিচের শাস্তি পাও নি৷ শাস্তি পেয়েছো, তাহমিদকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে এসেছিলে তাই।”

শতাব্দী গোমড়া মুখে তাহমিদকে বললো,
“আমি মায়ের দিব্যি করে বলছি। আমি তোমাকে দেখি নি। হয়তো তোমার মনে হয়েছিল।”

তাহমিদ খাবারের বাটি নিয়ে উঠে একপাশে গিয়ে দাঁড়ালো। শতাব্দী মনে মনে বলল,
“মিষ্টি মশাই, তুমি বিনা অপরাধে আমাকে শাস্তি দিয়েছ। দাঁড়াও, আমিও তোমাকে ঝাল খাইয়ে ছাড়বো।”

এরপর দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে শতাব্দী আর মাওশিয়াত বসে অনেক গল্প করলো। আর তাদের গল্প শুনতে লাগলো অরুণিকা। বিকেলে মাওশিয়াত নিজেই সবার জন্য চা বানালো। চায়ের কাপ সবার হাতে দেওয়ার পর মাওশিয়াত ইভানের পাশে বসে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার জন্য আলাদাভাবে বানিয়েছি।”

ইভান ভ্রূ কুঁচকে বললো,
“চা আবার আলাদা হয় কিভাবে?”

“তুমি বুঝবে না।”

মাওশিয়াত মনে মনে হাসলো আর বলল,
“প্রেম দিয়েছি, প্রেম! বোকা ছেলে”

এদিকে ইমন ইভান আর মাওশিয়াতের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইমনের চোখ অনুসরণ করলো আরাফ আর তাহমিদ। এরপর মাওশিয়াত সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ইভানের হাত ধরে বলল,
“চলো, আমাকে বাসায় নামিয়ে দেবে!”

ইমন বলে উঠলো,
“আমি নামিয়ে দিয়ে আসি, চলো। সেই সুযোগে তোমার বাসাটাও চিনে নিতে পারবো।”

মাওশিয়াত ইভানের দিকে তাকিয়ে রইলো। সে চাইছে ইভান বলুক, সে নিজেই যাবে। কিন্তু ইভান বলল,
“ইমন নামিয়ে দিয়ে আসুক।”

মাওশিয়াত বলল,
“না, না। ও তো মাত্র বাসায় এসেছে। এখন একটু বিশ্রাম নিক।”

ইমন মাওশিয়াতের হাত ধরে তাকে টেনে বাইরে নিয়ে বলল,
“আমি একদম প্রস্তুত।”

মাওশিয়াত ইভানের দিকে এক নজর তাকিয়ে ইমনের সাথে বেরিয়ে পড়লো। পুরো রাস্তা ইমন মাওশিয়াতের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প করে গেছে। কিন্তু মাওশিয়াত তেমন কোনো জবাব দেয় নি। ইমন বারবারই দমে যাচ্ছিলো। কিন্তু পরক্ষণেই অন্য বিষয়ে কথা বলে মাওশিয়াতের হাসি দেখার অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু মাওশিয়াতের দৃষ্টি রাস্তার চলন্ত গাড়িগুলোর দিকেই আটকে আছে। ইমন তাকে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার হাসিটা অসম্ভব সুন্দর। আজ আমি সেই হাসি দেখার কতো চেষ্টা করেছি, কিন্তু পুরো রাস্তায় তুমি অন্যমনস্ক হয়ে বসে ছিলে। কেন মাওশিয়াত?”

মাওশিয়াত ভ্রূ কুঁচকে বলল,
“কোথায়? আমি তো তোমার সব কথা শুনেছি।”

“তাহলে উত্তর দাও। আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।”

মাওশিয়াত কপাল ভাঁজ করে বলল, “প্রশ্ন!”

“কিছুক্ষণ আগেই করলাম, তুমি কি রাজি আছো?”

মাওশিয়াত কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ রাজি আছি।”

যদিও সে কিছুই শুনে নি। কিন্তু সে ইমনকে তা বুঝতে না দেওয়ার জন্যই মিথ্যে বলল। ইমন মাওশিয়াতের উত্তর শুনে হাসলো আর বলল,
“তাহলে আগামী শুক্রবার দেখা হবে।”

মাওশিয়াত মাথা নেড়ে বাসায় ঢুকে পড়লো। আর ইমন মাওশিয়াতের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পরও এখনো সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। সে মাওশিয়াতের ঘরের বারান্দার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো, এখন কি মাওশিয়াত বের হয়ে দেখবে সে দাঁড়িয়ে আছে কি না? প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেলো। মাওশিয়াত আর বারান্দায় আসে নি। ইমনও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাঁটতে লাগলো।

একপাক্ষিক ভালোবাসাগুলো অনেক যন্ত্রণাদায়ক। এই ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্খা একটা মানুষকে তার নিজস্ব স্বকীয়তা থেকে দূরে ঠেলে দেয়। সেদিনের পর থেকেই ইমন কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায়। রাত-দিন তার চোখে মাওশিয়াত আর ইভানের একে-অপরের দিকে তাকিয়ে থাকাটা ভাসতে থাকে। সে কোনোভাবেই সেই মুহূর্তটা ভুলতে পারছে না।

এক সপ্তাহ পর শুক্রবার বিকেলে ইমন মাওশিয়াতকে তার ভালো লাগার কথা বলে দেয়। তবে মাওশিয়াত কোনো উত্তর না দিয়েই বাসায় চলে আসে। পরের দিন সকালে কলেজের জন্য বের হওয়ার সময় মাওশিয়াত ইমনের মুখোমুখি হলো। মাওশিয়াত তাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে আসতে যাবে, তখনই ইমন তার হাত ধরে বলল,
“তুমি বলেছিলে, রাজী আছো। তাহলে গতকাল চুপচাপ চলে এসেছো কেন?”

মাওশিয়াত বলল,
“আমি ওইদিন তোমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনি নি।”

“তাহলে মিথ্যে কেন বলেছো? সেদিনই এই কথা বলতে পার‍তে। এখন তুমি আমার মনে তো একটা আশা জাগিয়ে দিয়েছ!”

মাওশিয়াত বলল,
“তুমি যাও, ইমন। এই মুহূর্তে আমার বাসার সামনে কেন এসেছো? কেউ দেখলে কি মনে করবে?”

“তুমি বলেছ, তোমার মা অনেক মিশুক মানুষ। তুমি সত্যটাই বলবে। বলবে আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি সেই শুরু থেকেই।”

“কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি না।”

“তাহলে ইভান ভাইকে ভালোবাসো, তাই না?”

মাওশিয়াত কোনো উত্তর না দিয়ে একটা গাড়ি দাঁড় করিয়ে চলে গেলো। আর ইমন সেখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। মনে মনে বলল,
“সেদিন আমি তোমাকে কোনো প্রশ্ন করি নি। ইচ্ছে করে ওই কথা বলেছি। মাওশিয়াত, এখন তুমি আমাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবে। তুমি আমার মনে মিথ্যে আশা জাগিয়ে, কখনোই নিজেকে ভালো রাখতে পারবে না। তোমার এই ভাবনায় এবার আমাদের এক করবে। কিন্তু আমি আর তোমার কাছে আসবো না। তুমি নিজেই আমার কাছে আসবে।”

এদিকে ইমন কয়েকদিন ধরেই ইভানের কাছ থেকে দূরত্ব রাখার চেষ্টা করছে। কথাবার্তাও কম বলছে না। ইভান ইমনের এমন ভাব দেখে অনেক কষ্ট পাচ্ছে।

আজ ইভান ইমনের কাঁধে হাত রেখে বলল, “কেন এমন করছিস?”

ইমন হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, “আমি এখন ব্যস্ত আছি।”

ইভান ইমনের হাত থেকে ফোন কেঁড়ে নিয়ে বলল,
“আমার প্রশ্নের উত্তর দে, ইমন।”

ইমন চেঁচিয়ে বললো,
“তুই আগে আমার মাওশিয়াত ফিরিয়ে দে।”

ইভান অবাক হয়ে বলল,
“পাগল হয়ে গেছিস? কি বলছিস এসব!”

“তুই জানিস, আমি মাওশিয়াতকে ভালোবাসি। তবুও ওকে নিয়েই তোর ব্যস্ততা। তুই ফোনে ওর সাথেই চ্যাট করিস। তোরা সারারাত কথা বলিস। আর আমি এসব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি।”

ইভান ইমনের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আমাদের চ্যাট পড়ে দেখ, আমরা পড়া নিয়েই কথা বলি। ফোনেও পড়ার বিষয়ে কথা বলি।”

“হয়েছে। আমার এতোসব শুনার কোনো ইচ্ছে নেই। তোর সাথে আমার কোনো কথা নেই। তুই মনে করিস, বাবা-মার মতো সেদিন আমিও মারা গিয়েছিলাম। আমরা এখন থেকে রুমমেটের মতো থাকবো।”

কথাটি বলেই ইমন ইভানকে ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।

ইভান ইমনের ব্যবহারে অনেক কষ্ট পেয়েছে। বাবা-মাকে হারানোর পর আজ সে প্রথম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করেছে। ইভানকে কাঁদতে দেখে বাকি চারজন মুষড়ে পড়লো। তূর্য বিড়িবিড় করে বলল,
“আমি জানতাম, ওই মেয়ের জন্য একদিন তোদের মধ্যে কোনো না কোনো ঝামেলা হবে।”

ইভান কাঁপা কন্ঠে বললো, “ওর জন্য কেন ঝামেলা হবে?”

“কারণ ইমন শুরু থেকেই মাওশিয়াতকে পছন্দ করতো। কিন্তু মাওশিয়াত তোর ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখাতো। আগে কি ছিল জানি না। কিন্তু কিছুদিন আগে ও যখন বাসায় এসেছিল, তখন ওর হাবভাব দেখেই বুঝেছি, ও তোকে সত্যিই পছন্দ করে।”

ইভান শার্টের হাতায় চোখ মুছে বলল,
“কিন্তু আমি মাওশিয়াতকে ওই দৃষ্টিতে পছন্দ করি না। আমার জন্য ইমনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেউই নেই। আমি মাওশিয়াতের কাছ থেকে দূরত্ব রাখবো। যেই বন্ধুত্ব আত্মার সম্পর্ক নষ্ট করে, সেই বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ায় ভালো। কারণ বন্ধু ছাড়া আমি বেঁচে থাকবো, আত্মার সম্পর্ক ভেঙে গেলে আমি হেরে যাবো।”

চলবে–

#অরুণিকা
#লেখিকা_সামিয়া_বিনতে_হামিদ
||পর্ব-২২||

৩৯.
ইভান এক সপ্তাহ ধরে মাওশিয়াতের কাছ থেকে দূরত্ব রাখছে। এমনকি যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছে। তবে মাওশিয়াত ইভানের দূরত্ব রাখার কারণটা আন্দাজ করতে পেরেছে। তাই আজ সে কলেজে না গিয়েই ইমনের সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলো। এদিকে মাওশিয়াত দেখা করবে শুনে ইমন মনে মনে খুবই খুশি হলো। সে ভালোভাবে তৈরি হয়ে ফুরফুরে মেজাজে মাওশিয়াতের বলা স্থানে পৌঁছে গেলো। মাওশিয়াত তাকে দেখেই তার হাত ধরে পাশের একটা বেঞ্চে বসিয়ে বলল,
“আমি জানি না তুমি ইভানকে কি বলেছো। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, তোমার জন্যই ও আমার সাথে কথাবার্তা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।”

ইমন বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো। তার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেলো। মাওশিয়াত ইমনের হাত ধরে বলল,
“আমি ইভানকে ফেরত চাই। তোমার অনুভূতিগুলো তুমি ওর উপর চাপিয়ে দিও না। তুমি আমাকে পছন্দ করো, তার মানে আমিও তোমাকে পছন্দ করবো, এটা তো সম্ভব নয়, ইমন। আমি ইভানকে পছন্দ করি।”

ইমন মাওশিয়াতের হাত দু’টি নিজের হাতে মধ্যে আবদ্ধ করে বলল,
“মাওশিয়াত, তুমি ভুল ভাবছো। স্কুলে আমরা দু’বছর একসাথে ছিলাম। তুমি ভাইয়ের চেয়ে আমার সাথে বেশি কথাবার্তা বলেছো। এখন তোমাদের কলেজের ক্লাস শুরু হয়েছে এক বছরও হয় নি। আর তুমি এই কয়েক মাসে ভাইকে পছন্দ করে ফেলেছো? এটা তো আমি মানতে পারছি না।”

মাওশিয়াত বলল,
“তোমাকে এটাই মেনে নিতে হবে। প্লিজ, আমার আর ইভানের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি করো না, ইমন।”

“আমি তোমাকে ভালোবাসি, মাওশিয়াত। আমি তোমার আর ভাইয়ের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি করি নি। আমি তো তোমাকে চাইছি।”

“এটা সম্ভব না। কারণ আমি এটা চাই না।”

ইমন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“তাহলে ইভান তোমার অনেক যত্ন নেয়। আমার চেয়েও বেশি, তাই না?”

মাওশিয়াত মলিন মুখে বললো,
“আমি জানি তুমি আমাকে খুব পছন্দ করো। কিন্তু..”

ইমন মাওশিয়াতকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি ইভান মাহমুদকে বলবো, তোমাকে আমার ভাবী বানিয়ে নিতে। এরপর তো আমি তোমার দেবর হয়ে যাচ্ছি, তাই না?”

কথাটি বলেই ইমন চলে গেলো। আর মাওশিয়াত শূন্য দৃষ্টিতে ইমনের চলে যাওয়া দেখছে। ইমন আর ইভান আপন ভাই। তাহলে তো এই সম্পর্কে কেউই সুখী হবে না। ইমন তার ভালোবাসার মানুষকে ভাইয়ের স্ত্রী হিসেবে কিভাবে মেনে নিবে? আর ইভান তার ভাইয়ের ভালোবাসার মানুষকে কখনোই আপন করে নিতে পারবে না। মাওশিয়াত বিড়বিড় করে বলল,
“এটা এতোদিন কেন আমার মাথায় আসে নি? তাহলে কি ইভানকে আমি কখনোই পাবো না? কিন্তু ইভানও যদি আমাকে পছন্দ করে, তাহলে তো সম্ভব। ইমন একদিন অবশ্যই এটা মেনে নেবে।”

মাওশিয়াত ইভানকে সুযোগ বুঝে তার ভালো লাগার কথাটা জানিয়ে দিলো। ইভানও সরাসরি না করে দিলো। বলল,
“আমি তোমাকে কখনোই বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু মনে করি নি। এমন নয় যে আমি ইমনের জন্য তোমাকে মেনে নিচ্ছি না, বা আমার অন্য কাউকে পছন্দ। আমি কখনোই ভালোবাসা বা সম্পর্কে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ খুঁজে পাই নি।”

মাওশিয়াত ইভানের হাত ধরে বলল,
“আজ থেকে আমাদের বন্ধুত্বও শেষ। আমি তোমার উপর রাগ করে থাকবো না। ইমনের উপরও আমার কোনো ক্ষোভ নেই। ও সত্যিই আমাকে ভালোবাসতো। এখনো হয়তো ভালোবাসে। এটা আমি প্রথম দিন থেকেই বুঝেছিলাম। কিন্তু আমি মনে করতাম সম্পর্ক নিজের যোগ্যতার সাথে যাবে এমন মানুষের সাথে করা উচিত। আমার দৃষ্টিতে একজন মেয়ে ডাক্তার আর একজন পুরুষ সাহিত্যিক কখনোই একে অপরের জন্য মানানসই নয়। ঠিক তেমনি আমার পাশে ইমনের চেয়ে তোমাকেই বেশি মানানসই মনে হয়েছে। তাই আমি তোমাকেই চেয়েছিলাম।”

ইভান বলল,
“তুমি অনেক ভালো একটা মেয়ে। শুধু তোমার দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটা পরিবর্তন করা উচিত৷”

মাওশিয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলো।

প্রেমানুভূতি এমন একটা রোগ, যেই রোগ বসন্তের হাওয়ার মতো জীবনে চলে আসে। কিন্তু কাউকে জানায় না সে এসেছে। যেমন বসন্তেও এখন আর আগের মতো ফুল ফুটে না।
আর সেই হাওয়া নতুন করে আরাফের কাছে ছুটে এসেছে। রুহানির মৃত্যুর পর সে দ্বিতীয় বার সেই জায়গায় কাউকে অনুভব করতে পারছে। কিন্তু এই কথা সে ঘুণাক্ষরেও সেই মেয়েটিকে জানাবে না। সে দূর থেকেই মেয়েটিকে ভালোবাসবে। কাছেও যাবে না।

সায়ন্তনী দোকান বন্ধ করে বের হতেই আরাফের মুখোমুখি হলো। আরাফ তাকে দেখেই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। সায়ন্তনী এদিক-ওদিক তাকিয়ে ইমনকে খুঁজতে লাগলো। কারণ প্রতিদিন ক্লাস শেষে ইমন সায়ন্তনীর দোকান এসে চা খেয়ে যায়। কিন্তু আজ আসে নি। সায়ন্তনী আরাফকে জিজ্ঞেস করলো,
“ইমন আসবে না?”

আরাফ শূন্য দৃষ্টিতে সায়ন্তনীর চোখের দিকে তাকালো। এই ছেলের দৃষ্টিতে আসলেই কিছু একটা আছে। সায়ন্তনী সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলো, এই গভীর চোখ দুটি অনেক কিছুই বুঝে ফেলে। আরাফের চোখ দু’টি অদ্ভুতভাবে মানুষের চোখের ভাষা পড়তে পারে। যেমন সে বুঝে ফেলেছে সায়ন্তনী ইমনকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু সায়ন্তনীও তার মতোই অপারগ। আরাফ সায়ন্তনীকে কখনোই তার ভালো লাগার কথা বলবে না, কারণ সে সায়ন্তনীর দায়িত্ব নেওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি। হয়তো পারবেও না। আর সায়ন্তনী ইমনকে তার ভালো লাগার কথা বলবে না, কারণ সে নিজেকে ইমনের অযোগ্য মনে করে আর এমনিতেই ইমনের মনে মাওশিয়াতের বসবাস।

ভালো লাগাগুলোও খুব অদ্ভুত হয়। এখানে তাকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছে যেমন থাকে, তাকে না পাওয়ার আক্ষেপও থাকে। তবুও চোখ একটুখানিও ভিজবে না। মনে উথাল-পাতাল সৃষ্টি হলেও চোখে থাকবে শূণ্যতা। তবুও ঠোঁটের হাসি মুছে যাবে না।

এদিকে সবাই যার যার সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত৷ তূর্য সারাদিন তার ভিডিও তৈরীর কাজে লেগে থাকে। ইভান আর ইমনের মধ্যে এখনো কোনো কথাবার্তা হয় না। ইমন রাতেই বাসায় ফিরে। সারাদিন আর বাড়িতে আসে না। অন্যদিকে ইভান কিছুদিনের জন্য তার কলেজ বন্ধুর সাথে থাকছে। আর আরাফ সায়ন্তনীর ভাবনায় ব্যস্ত, তাহমিদ সারাদিন দোকানে বা রেস্টুরেন্টে থাকে, আর সময় পেলে শতাব্দীর সাথে গল্প করে সময় পার করে। এদিকে আহনাফও যতির যন্ত্রণায় এক সেকেন্ড বাসায় থাকতে পারে না। তাকে ক্লাসের পর কোচিংয়ে, আর এরপর দোকানে যেতে হয়। আর বাকি সময়টা যতির জন্য বরাদ্ধ রাখতেই হবে। নয়তো সেদিনই যতি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আহনাফকে নাজেহাল করে ছাড়বে।

এসবের ভীড়ে অরুণিকাকে সবাই ভুলেই গেছে। মহল্লার একটা মেয়ের সাথেই অরুণিকা স্কুল থেকে বাসায় ফিরে। এখন সে আট বছরে পা দিয়েছে। সে মোটামুটি একা একা আসা যাওয়া করতে পারে। বাসায়ও একা থাকতে পারে। অরুণিকার জন্য গত মাসেই ছোট একটা টিভি কিনে এনেছিলো তূর্য। এখন টিভি দেখেই তার বাকি সময়টা কাটে। কিন্তু তার একা একা যাওয়া আসাটাই মহল্লার উঠতি বয়সী ছেলেদের চোখ এড়ায় নি। তারা মাঝে মাঝে অরুণিকার ব্যাগ টেনে নিয়ে ফেলে, হাত ধরে রাখে, ছোট ছোট ইটের ভাঙা টুকরো তার দিকে ছুঁড়ে দেয়। এরপর অরুণিকা বাসায় এসে কান্না করে। কিছুক্ষণ পর আবার ভুলে যায়।
আরাফ আর তাহমিদ সন্ধ্যার পর পরই বাসায় ফিরে আসে৷ বাকিরা রাত দশটার পরই ফিরে। কিন্তু বাসায় এসেই তারা পড়তে বসে যায়, বা ঘুমিয়ে পড়ে। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে অরুণিকার সাথে কিছুক্ষণ বসে কথা বলারও সময় হয় না। অরুণিকাও কাউকে কিছু জানায় নি। এমনকি তার মনেও থাকে না। মনে পড়লেও বলার সুযোগ পায় না। কারণ সেই সুযোগটা সে আর ছ’জনের কাছ থেকে পায় না।

চলবে–

#অরুণিকা
#লেখিকা_সামিয়া_বিনতে_হামিদ
||পর্ব-২৩||

৪০.
অরুণিকা কাঁদোকাঁদো কন্ঠে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে বলল,
“আমি বাসায় যাবো। আমাকে যেতে দিন।”

ছেলেটি অট্টহাসি দিয়ে বলল,
“যদি যেতে না দেই কি করবে?”

বাঁধন পেছন থেকে এসে অরুণিকার সামনে দাঁড়ালো। অরুণিকা বাঁধনের দিকে তাকিয়ে রইলো। বাঁধন অপরিচিত ছেলেটিকে বলল,
“ভাইয়া, এই মেয়ের জন্য আহনাফ ভাই আর তাহমিদ ভাই সেদিন আমাকে মেরেছিল। ওর জন্য বাবা-মা আমাকে মেরেছে। এখনো বাবা আমাকে ওই বিষয় নিয়ে বকা দেয়। স্কুলে পাশ করি নি, তাই বাবা পুরো মহল্লার সামনে আমাকে পিটিয়েছে। আর বলেছে আমার মগজে নাকি সব নোংরামি, তাই পরীক্ষার ফল খারাপ এসেছে। এর আগে কখনোই বাবা আমাকে বকে নি। ওর জন্য আমি মার খেয়েছি। ভাইয়া, এই মেয়েকে একটা শাস্তি দাও। এতো মাস আমি সুযোগ পাচ্ছিলাম না। আজ সুযোগ হয়েছে।”

আগন্তুক ছেলেটি সাড়ে এগারো বছরের ছেলে বাঁধনের মুখে এমন কথা শুনে অবাকই হলো। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি ছেলেদের উদ্দেশ্য করে বলল,
“বাঁধন বড় হলে ওকে আমাদের গ্রুপে নেবো। এর দ্বারাই চাঁদাবাজি সম্ভব।”

বাঁধন হেসে বলল,
“ভাইয়া আমি যাই এখন। ওর বেনামি পরিচালকগুলো আসার খবর পেলে তোমাকে জানিয়ে দেবো।”

মহল্লার বাইরে থেকেই অরুণিকাকে টেনে নিয়ে গেলো আশিস। আশিস পাশের এলাকায় থাকে। সারাদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাঁদাবাজি করবে, আর স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের উত্যক্ত করে সময় পার করবে। রাতে জুয়া খেলবে বা মাতাল হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকবে। আশিস অরুণিকাকে নিয়ে যাওয়ার সময় মাওশিয়াত রিকশা থেকে নামলো। মাওশিয়াত অরুণিকাকে আশিসের সাথে দেখে দৌঁড়ে এলো। ক্ষুব্ধ কন্ঠে আশিসকে বলল,
“এই ছেলে, ওকে ছাড়ো৷ কি করছো তুমি?”

আশিস কলার উঠিয়ে মাওশিয়াতের মুখে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল,
“তুমি কে? রাস্তা ছাড়ো। নয়তো তোমাকেও তুলে নিয়ে যাবো।”

পাশের ছেলেটি বলল,
“আশিস ভাই, শেষ কথাটা ফেলে না দেওয়ায় ভালো।”

মাওশিয়াত রাগী কন্ঠে বললো,
“আগে হাত লাগিয়ে দেখাও। তারপর বুঝিয়ে দেবো আমি কি জিনিস।”

ছেলেটি মজার ছলে মাওশিয়াতের গায়ে হাত লাগাতেই মাওশিয়াত ছেলেটির গালে চড় লাগিয়ে দিলো। আশিস ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলল,
“এই মেয়েকে ধর।”

মাওশিয়াত আশিসের নাক বরাবর ঘুষি মারতেই আশিস নাক ধরে দূরে সরে দাঁড়ালো। বাকি ছেলেগুলো মাওশিয়াতকে ধরতে এলেই, সে কয়েকটা ঘুষি দিয়ে তাদের মাটিতে ফেলে দিলো। অরুণিকা হাঁ হয়ে মাওশিয়াতকে দেখছে। আশেপাশে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। শতাব্দী স্কুল থেকে ফিরে মাওশিয়াতকে মারপিট কর‍তে দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। অরুণিকা শতাব্দীর কাছে দৌঁড়ে এসে বলল,
“শতু আপু, মাওশিয়াত আপু ওদের মারছে। তুমিও মারো।”

শতাব্দী অরুণিকার হাত ধরে বলল,
“কিন্তু মারছে কেন?”

“ছেলেগুলো বাঁধনের কথায় আমাকে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছিল।”

শতাব্দী রাগী দৃষ্টিতে ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে তার ব্যাগ দিয়েই ছেলেগুলোকে পেছন থেকে মারতে লাগলো। তাদের মধ্যে একটা ছেলে শতাব্দীর চুল ধরে তাকে মাটিতে ফেলে দিলো। আর তখনই শতাব্দী উঠে দাঁড়ালো। এরপর চেঁচিয়ে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদের উদ্দেশ্য করে বললো,
“ইশ, এই গুলো মানুষ নাকি উল্লুক। এভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে এদের গণ ধোলাইয়ের জন্য এগিয়ে আসুন। একটা মেয়ে মারছে, আর আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন? নির্লজ্জ কোথাকার।”

লোকগুলো শতাব্দীর কথা শুনে এগিয়ে আসতে যাবে তখনই আশিস পালিয়ে গেলো। আশিসকে পালাতে দেখে বাকিরাও পালালো। এরপর অরুণিকা আর শতাব্দী মাওশিয়াতের কাছে এলো। অরুণিকা বলল,
“আপু, তুমি ওদের কিভাবে মেরেছো? তোমার এতো শক্তি? তোমার কাছে কি পাওয়ার আছে?”

মাওশিয়াত হেসে বলল,
“আমি তোমার বয়স থেকেই জুডো শিখেছি।”

“জুডো কি?”

“তুমি যেমন ছবি আঁকার জন্য ড্রয়িং ক্লাসে যাও। শতাব্দী যেমন নাচ শেখার জন্য নৃত্যের ক্লাস করে, তেমনি এমন বদমাশ ছেলেদের মারার জন্য আমি জুডো শিখেছি।”

শতাব্দী অবাক হয়ে বলল,
“মাওশিয়াত দিদি, তুমি আসলেই জিনিয়াস। ইমন তোমার কথা বলেছিলো।”

মাওশিয়াত বলল,
“কি বলেছিল ইমন?”

“বলেছে তুমি দেখতে যেমন সুন্দরী, পড়াশুনায়ও অনেক ভালো। আর তোমার কথাবার্তা শুনলে শুনতেই ইচ্ছে করবে। আর এখন দেখছি তুমি মারামারিও করতে জানো।”

মাওশিয়াত অরুণিকার হাত ধরে তাকে বাসায় নিয়ে এলো। এরপর তিনজন একসাথে মেঝেতে বসলো। মাওশিয়াত অরুণিকাকে জিজ্ঞেস করলো,
“ইমন কোথায়?”

“ও তো অনেক দেরীতে বাসায় আসে।”

“ইভান!”

“ইভান তো অনেকদিন বাসায় আসে না। জানো আপু, ইভান আর ইমন আঁড়ি নিয়েছে। ওরা এখন আর কথা বলে না।”

“আরাফ আর তাহমিদ কোথায়?”

শতাব্দী বলল,
“তাহমিদ তো এই সময় রেস্টুরেন্টে থাকে। ওখানে কাজ নিয়েছে তো। আর আরাফ হয়তো টিউশন করাতে গেছে।”

অরুণিকা বলল,
“সবাই সন্ধ্যায় বাসায় আসে। কেউ কেউ রাতে।”

মাওশিয়াত অরুণিকার গালে হাত রেখে বলল,
“আর তুমি বাসায় একা থাকো?”

“হ্যাঁ। অন্ধকার হওয়ার আগেই তাহমিদ চলে আসে। আমার তো অন্ধকারে ভয় লাগে। আর এর আগে আমি বাসায় এসে টিভি দেখি।”

মাওশিয়াত ইভানকে ফোন করে বলল,
“আজ তোমাদের অবহেলার জন্য অরুণিকা অনেক বড় একটা বিপদে পড়তে যাচ্ছিলো। ভাগ্যিস ইমনের সাথে দেখা করার জন্য এখানে এসেছিলাম। ওকে একা রেখে তোমরা কোথায় থাকো?”

ইভান ফোন রেখেই টিউশন থেকে বেরিয়ে পড়লো। বাকিদেরও মেসেজ করে জানালো। সবাই কাজ ফেলেই বাসায় চলে এলো। আহনাফ সেই মুহূর্তে যতির সাথে ছিল। তাই সেও আহনাফের সাথে বাসায় চলে এলো। বাসায় এসে সব শোনার পর আরাফ অরুণিকার দুই হাত ধরে বলল,
“এগুলো ক’দিন ধরে হচ্ছে?”

অরুণিকা বলল,
“অনেকদিন। মুরাদ আর ওর বন্ধুরা আমাকে অনেকদিন ধরেই বিরক্ত করছিলো। কিন্তু এই ছেলেটা আজই এসেছে।”

ইভান রাগী কন্ঠে বলল,
“তাহলে এতোদিন আমাদের বলো নি কেন?”

অরুণিকা মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মাওশিয়াত রাগী কন্ঠে বললো,
“ওকে বকছো কেন? তোমাদের তো ওর যত্ন নেওয়ারও যোগ্যতা নেই। এতোদিন ভেবে এসেছি তাহমিদ ওর আপন ভাই। কিন্তু এখন শতাব্দী থেকে জানলাম তোমরা কেউই ওর ভাই না।”

যতি কথাটি শুনে অবাক হলো। যতি বলল,
“অরুণিকা তোমাদের আপন বোন না? আহনাফ, তাহলে তুমি আমাকে মিথ্যে কেন বলেছো?”

ইমন বলল,
“আমরা এসব কথা কাউকে জানায় নি। মহল্লার কেউই জানে না। শুধু শতাব্দীরা, আর চাচা-চাচীরা জানে।”

“শতাব্দী, জানলে আমিও জানতে পারতাম। আমি তো আহনাফের গার্লফ্রেন্ড। আহনাফ আমার কাছ থেকে এতো বড় সত্য লুকিয়েছে কেন?”

আহনাফ রাগী কন্ঠে বলল,
“আল্লাহর ওয়াস্তে তুমি চুপ থাকো। আমার মাথা খেও না। এই মুহূর্তে তোমার এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় আমার কাছে নেই।”

তূর্য হাঁটু গেড়ে অরুণিকার সামনে বসে বলল,
“টুইংকেল, তুমি আমাদের বলো নি কেন?”

অরুণিকা একবার আরাফের দিকে তাকালো, আরেকবার তূর্যের দিকে। তারপর বলল,
“তুমি আর আরাফ আগে আমার সাথে গল্প করতে, তাই না?”

তূর্য মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।”

“এখন তো করো না। বাসায়ও থাকো না। যখন আসো, তখন আমি ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে স্কুলে চলে যাই, আর সময় পাই না৷ আমি তো বাসায় একাই থাকি। তোমরা বাসায় আসলেও আমার কথা শুনো না। আমি কিভাবে বলবো?”

আরাফ একপাশে বসে রইলো। তার এই মুহূর্তে নিজের উপর রাগ হচ্ছে। কলেজ ছুটির পর সে দুই ঘন্টা সময় পায়। কিন্তু সে তখন সায়ন্তনীর দোকানে সময় কাটিয়ে আসে। সেই মুহূর্তে চাইলে সে বাসায় এসে অরুণিকার সাথে সময় কাটাতে পারতো।

আহনাফ অরুণিকার গালে হাত রেখে বলল,
“আমি তোমাকে আর এক সেকেন্ডও একা থাকতে দিবো না। ক্লাস শেষে বাসায় চলে আসবো।”

যতি কথাটি শুনে মনে মনে ক্ষেপে গেলো। নিজের মনেই বলল,
“অরুণিকা আহনাফের আপন বোন নয়৷ তবুও ও সারাদিন অরুণিকার কথা বলবে। তাহলে আহনাফ কি অরুণিকাকে নিয়ে অন্য চিন্তা করে? আমার এদের আলাদা করতেই হবে। নয়তো আহনাফ যদি ওর সাথে থাকতে থাকতে ওকে ভালোবেসে ফেলে? মনের উপর তো কারো জোর নেই। বাকিদের এমন অনুভূতি সৃষ্টি হলে কোনো সমস্যা নেই৷ কিন্তু আহনাফ তো আমার বয়ফ্রেন্ড। আমি এই অরুণিকাকেই এদের থেকে আলাদা করে দেবো। ও এই বাসায় আহনাফের সাথে কখনোই থাকতে পারবে না।”

এদিকে যতিকে বাসায় পৌঁছে না দিয়ে আহনাফ বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো। যতি মনে মনে ক্ষুব্ধ হলেও সে প্রকাশ করলো না। বাকিরা মাওশিয়াতকে ধন্যবাদ দিলো। মাওশিয়াত ইমনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইমন, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভালো হতো যদি আমাকে বাসায় দিয়ে আসতে।”

ইমন ইভানের দিকে তাকালো। ইভান চুপচাপ অন্যদিকে সরে দাঁড়ালো। ইমন বলল,
“আমি মাত্র বাসায় এসেছি। এখন একটু বিশ্রাম নিতে হবে।”

বাকিরা ইমনের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইমন আরাফকে বলল,
“আরাফ, ওকে রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে আসতে পারবি?”

আরাফ মাওশিয়াতকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো। মাওশিয়াত যাওয়ার আগে একবার ইমন আরেকবার ইভানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“আমার জন্য তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে, তাই আমিই এই ঝামেলা দূর করবো। তুমি অনেক ভালো, ইমন। দেরীতে হলেও আমি বুঝেছি, মাঝে মাঝে যারা আমাদের ভালোবাসে, আমাদের যত্ন নেয়, তাদেরই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এক পাক্ষিক ভালোবাসা কষ্টের হলেও এখানে কোনো শান্তি নেই। ইভানকে ভালোবেসে আমি শান্তি পাই নি। যতোটা শান্তি তোমাকে নিয়ে ভেবে পাচ্ছি, ইমন।”

এদিকে তূর্য বাসা থেকে বেরিয়ে আহনাফকে ফোন করলো। আহনাফ বলল,
“আমি মুরাদকেও ছাড়বো না। ওই আশিসকেও ছাড়বো না।”

তূর্য বলল,
“তুই একা না। আমিও ছাড়বো না। কোথায় আছিস বল। আজই ওদের উচিত শিক্ষা দেবো।”

আহনাফ আর তূর্য দু’জন মিলে প্রথমে মুরাদ ও তার সঙ্গীদের মারলো। তারপর আশিসকে মারতে গেলো। আশিসের সঙ্গপাঙ্গও ইচ্ছে মতো আহনাফ আর তূর্যকে পিটিয়েছে। কেউ কাউকে ছাড়ে নি৷ রাত দশটায় মার খেয়ে একেবারে মুখ ফুলিয়ে বাসায় এলো তূর্য আর আহনাফ। বাকিরা তাদের দেখে অবাক হলো। আহনাফ বলল,
“এই মার কিছুই না। এগুলো অরুর দিকে খেয়াল না রাখার শাস্তি। কিন্তু আশিস আর মুরাদ ওই দুইটা এক সপ্তাহ আর বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবে না।”

তাহমিদ বলল,
“আশিসের কথা বাদ দিলাম। কিন্তু মুরাদের বাবা-মা যদি মামলা করে দেয়?”

তূর্য বলল,
“করুক মামলা। জেল হবে আর কি। শাস্তি পাবো, সমস্যা নেই। ওদের মেরেই এখন শান্তি লাগছে। মারতে না পারলে আজ রাতে ঘুমাতে পারতাম না। কাল সকালে ওই বাঁধনকে ধরতে হবে। ও তো এখন বাসা থেকেই পালিয়েছে।”

চলবে–