অলীকডোরে চন্দ্রকথা পর্ব-৩৪+৩৫+৩৬

0
462

#অলীকডোরে চন্দ্রকথা। (পর্ব-৩৪)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

বৃষ্টিমুখর চমৎকার আবহ। হিমেল বাতাসে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে মুন। প্রিয়তমের কলের অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে কখন চোখ লেগে গেছে সেই টেরটি পায়নি। ঘুম ভাঙল মায়ের করুণ ডাকে,
“মুন? তুই ঘুমাচ্ছিস! ওদিকে তো অঘটন ঘটে গেছে। ”

হন্তদন্ত হয়ে মেয়ের ঘরের এলেন তারিনা। আকস্মিক ডাকে কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল মুনের। ধরপড়িয়ে উঠে বসল। হকচকিয়ে বলল,
“কী হয়েছে?”

তারিনা করুণ গলায় বললেন, “আমার ছেলেটার কপালটাই খারাপ। কত চেষ্টা করল, তবু্ও ভাগ্য সহায় হলো না।”

ভাইয়ের রেজাল্ট এর কথা মনে করে মুন আঁতকে উঠল, “আসেনি?”

তারিনা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মুন গুমোট হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ কাঁপা গলায় বলল,
” ভাইয়ার বন্ধুদের ও আসেনি?”

তারিনা মলিন স্বরে বলল, “আমি ভিডিও কল দিয়েছিলাম। সবাই মন খারাপ করে বসে আছে। আসেনি বোধহয়। আহহারে, ছেলেগুলো কী পরিশ্রমটাই না করল!”

তারিনা আর্তনাদ করলেন। মুন একবার ভাবল রুবাবকে কল দিয়ে সান্ত্বনা দিবে। পরক্ষণেই মত বদলাল, নিজের ব্যর্থতার জন্য রুবাব বোনের সামনে লজ্জাবোধ করবে হয়তো।
ভাইয়ের পরে মুনের চোখে সৈকতের মুখটাই ভাসল। মানুষটা রাত দিন এক করে নাওয়া খাওয়া ভুলে এক মনে পড়েছে। তবুও সফল হলো না! ছেলের কত স্বপ্ন, বিসিএস হবে ওরা বিয়ের করবে। সব স্বপ্ন ভগ্ন হলো! মানতেই পারল না যেন মুন। কাঁপা হাতে সৈকতকে কল দিল। ভিডিও কল। প্রথমবার রিসিভ হলো না। মুনের ভয় বাড়ল। অস্থির হয়ে ফিরতি কল দিল। এবার রিসিভ হলো। সৈকতের গম্ভীর মুখখানা সামনে এলো। মুন অস্থির হয়ে বলল,
” ফোন ধরছিলে না কেন? রেজাল্ট পাওনি?”

সর্বদা প্রফুল্লচিত্তে থাকা মানুষটার চোয়ালে আজ হাসি নেই। মলিন হয়ে আছে। দেখেই বুক কাঁপল মুনের। কাঁপা স্বরে বলল,
” আসেনি?”

সৈকত ওর দিকে চাইল একপলক, তারপরই চোখ সরাল। কিছুই বলল না। ওর চোয়াল মলিন থেকে মলিন হলো। একটা ব্যর্থতার গাঢ় রেখা দেখা গেল। এতটা হতাশ সৈকতকে কখনো দেখেনি মুন। কী করুণ দেখাল ওকে! অন্তদহনে চোখ ভিজল মুনের। ছলছল চোখে চেয়ে বলল,
” আমার ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। বলো না?”

মুন শ্বাস আটকে আছে। সৈকত চোখ মেলে চাইল। তারপর খানিকক্ষণ থমকে রইল। মুনের মুখের অবস্থা দেখেই বোধহয় উত্তর দিতে বাধ্য হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একবারে ক্ষীণ, করুণ স্বরে ছোটো করে উত্তর দিল,
“এসেছে।”

বলেই কল কেটে দিল। মুন বিমূঢ় হয়ে বসে রইল। কিছু বুঝতেই পারল না। সৈকতের মুখের হতাশা বলছে, ভালো কিছু হয়নি। অথচ সৈকত বলছে রেজাল্ট এসেছে। রিটেনে রোল এসেছে, এতো মহা আনন্দের খবর। সৈকত কতদিন অপেক্ষা করেছে এই ক্ষণের। আজ এসেছে অথচ সৈকত খুশি না। কেন? হাজার প্রশ্ন খেলে গেল মনে। আবার কল ঘুরাল। এবার রিসিভ হলো না। মুন লাগাতার কল দিয়ে গেল। একবার, দুইবার, তিনবার… রিসিভ হলো না… দশতম কলে রিসিভ হলো না।

ফোনটা সৈকতের পাশেই পড়ে আছে। বেজে যাচ্ছে অনবরত। সৈকত দেখছে কিন্তু তুলছেনা। গুমোট হয়ে বসে আছে। রুবাব কিছুটা দূরে ছিল। কলারের নাম দেখেনি। বারবার কল বাজায় বিরক্ত হয়ে বলল,
” ফোন বাজছে শুনতে পাচ্ছিস না? তুলছিস না ক্যান?”

সৈকত নিজের অবস্থার পরিবর্তন না করল না। আগের মতোই বসে রইল। ফোন বেজে কেটে আবার বাজল। রুবাব মাথা উঠিয়ে চাইল এক পল। ফোনে চোখ যেতেই বোনের নামটা চোখে ভাসল। একবার ফোনের দিকে তাকাল আরেকবার সৈকতের দিকে। ঘটনার আঁচ করে ওর চোখে বিস্ময় দেখা গেল। গেল মুগ্ধতাও।

বোনের অবস্থা বুঝে নিজের ফোন থেকে কল দিল। ভিডিও কল। ভরা খরায় এত কিছু না ভেবেই কল ধরল মুন। ও মনে মনে ভাইয়ের মলিন মুখ দেখার প্রস্তুতি নিয়ে ফোনটা মুখের সামনে ধরল। কিন্তু এবারও ওর আশায় জল ঢেলে ভাইয়ের হাসিমুখটাই সামনে এলো। নরম স্বরে রুবাব বলল,
” কী অবস্থা আমার বোনটার?”

মুন অবাক হয়ে চাইল। রুবাব হাসছে, প্রাণবন্ত। ওর চোয়ালে হতাশারার লেশ মাত্র নেই। রুবাবের হাবভাবে মুন দ্বিধায় পড়ে গেল। খুশি নিয়ে বলল,
“ভাইয়া, তুমি মায়ের সাথে মজা করছিলে?”

রুবাব বোনের কথার অর্থ বুঝে বলল, “মজা করিনি, সত্যিই আমার রিটেনে ফেইল এসেছে ।”

রুবাবের স্বর এখনো অবিচল। মুন হতভম্ব হয়ে চাইল। রিটেনে আসেনি, এতে দুঃখ পাবার কথা অথচ হাসছে! হাসতে হাসতে বলছে, ফেইল এসেছে। হাসি আসছে কিভাবে? মুন বিরক্তি নিয়ে বলল,
“হাসছ কেন?”

রুবাব হেসে বলল, ” কারণ আমি একটা সিনেমা দেখতেছি। দেখবি?”

মুন ভ্রু কুঁচকাল, “কী সিনেমা? ”

রুবাব ফ্রন্ট ক্যামেরা বদলে ব্যাক ক্যামেরা অন করল। মুন মনোযোগ দিয়ে দেখল। রুমের এদিক ওদিকে তিনটা বিনব্যাগে বসে আছে নাহিদ, অন্তর, সৈকত। কারো গালে হাত, কারো কপালে, কারো মুখে। চোয়ালে গুমোটভাব স্পষ্ট। খানিক আগে ভিডিও কলে সৈকতকে যেমন দেখাচ্ছিল, এখনো তেমন দেখাচ্ছে। শুধু সৈকত না, নাহিদ অন্তরকেও তেমন বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে ওদের উপর কোন ঝড় বয়ে গেছে। যা ওদের সব খুশিকে কেড়ে নিয়েছে। মুন বলল,
” এদের কারো আসেনি?”

রুবাব হো হো করে হেসে বলল, ” এদের সবার এসেছে। তবুও মুখে হাসি নেই। কতটা নিরামিষ ভাব একবার!”

মুন অবিশ্বাস্য গলায় বলল, ” মানে! ”

“মানে হলো আমি ছাড়া সবার এসেছে। রেজাল্ট পেয়েও এরা খুশি না। রিটেনে রোল এসেছে, কোথায় হাসবে, নাচবে, ট্রিট দিবে, তা না করে সিনেমা করছে।”

কথার সারমর্ম এতক্ষণে বুঝতে পারল মুন। মুগ্ধতায় স্তব্ধ হয়ে গেল। চারজনের তিনজন টিকেছে, একজন ঝরে পড়েছে। টেকার আনন্দে উৎফুল্ল হবার কথা তিনজনের, কিন্তু তারা সামান্য হাসতে অবধি পারছে না। কেন? কারণ, তাদের এক বন্ধুর রেজাল্ট আসেনি।একসাথে প্রস্তুতি নিয়ে চারজন এক পথে যাওয়ার মনন ভেঙে গেছে, একজনের পথ আলাদা হয়ে গেছে। নিজেদের সফলতায় আনন্দিত হবার বদলে বন্ধুর ব্যর্থতায় তারা হতাশ হয়ে গেছে। একেকজনের মুখ দেখে মনে হচ্ছে, বন্ধু নয় ব্যর্থ হয়েছে তারা নিজেরাই। এমন বন্ধুত্ব ও হয়! বরাবরই এই বন্ধুত্বটা ওকে মুগ্ধ করে। আজ যে তা বাড়ি দিল। কী সুন্দর বন্ধুত্ব এদের! মুন বিমোহিত হয়ে চেয়ে রইল।

রুবাব তখনো বন্ধুদের দিকে তাক করে ফোন ধরে রেখেছে। ওর চোখেমুখ হতাশার লেশমাত্র নেই। বোধহয় তার প্রতি বন্ধুদের অগাধ ভালোবাসা দেখেই পালিয়েছে। রুবাব বলল,
“রিটেনে টিকে গেছস। ট্রিট দিবি না?”

কেউ উত্তর দিল না। চাইল ও না। রুবাব সৈকতের সামনে গিয়ে বলল,
” এই সৈকত, তোর তো ডাবল খুশি। ডাবল ট্রিট দেয়া উচিত। ”

সৈকত এতক্ষণে মুখ খুলল। বিরক্তি নিয়ে বলল,
“তুই দে গা। আমার মনে এত রঙ লাগেনাই।”

রুবাব হেসে বলল, ” কদিন বাদে আমাদের বাড়ির জামাই হবি। ট্রিট আমারই তো দেয়া উচিত। এ্যাই ওঠ! চল আমি ট্রিট দিব। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, খিচুড়ি, ইলিশ মাছ, বেগুন ভাজা দিয়ে সেলিব্রিট করব। নাহিদ, অন্তর চল।”

কেউ নড়ল, উঠল না। গেল না খুশি সেলিব্রিট করতে। অন্যসময় হলে ট্রিটের কথা শুনে সবাই হা মলে পড়তো। কিন্তু আজ পড়ল না। ভোজনরসিক অন্তর অবধি কোন আগ্রহ দেখাল না। চারবন্ধুর তিনজন সফল, একজন ব্যর্থ এটা তারা মেনেই নিতে পারল না। ওকে দেখিয়ে হাসবে ওরা, সেলিব্রিট করবে! ওরা তো সবসময় বন্ধুদের দুঃখে কষ্টই পেয়ে এসেছে, আজ তবে কিভাবে খুশি হবে?

মুন দৃষ্টি আটকে আছে কেবল সৈকতের দিকে। এই মানুষটা বিগত বছরে ওর সাথে মিলে কত স্বপ্নকথা শুনিয়েছে। টিকে গেলে এই করব, ওই করবে। এই তো দু’দিন আগেও ওকে বলেছে, রিটেনে টিকে যাওয়ার সাথে সাথে ওকে নিয়ে বেরুবে। ওইদিন মুনের। যা ইচ্ছে শপিং করবে, খাবে ঘুরবে। ওরা সারাবেলা ঘুরে একসাথে ডিনার করে বাড়ি ফিরবে। দিনটাকে স্মৃতিবহুল করে রাখবে। অথচ আজ সেই ক্ষণ এলেও সৈকত খুশি তো দূরে থাক, হাসতে অবধি পারছেনা। বন্ধুর ব্যর্থতার দুঃখে আজকের দিনে ওকে অবধি রাখেনি। ওর সাথে ও কথা বলছেনা। সব আনন্দ যে ফিকে পড়েছে। আজকের সৈকতকে যেন প্রমাণ করছে, জীবনে বন্ধুত্বই সবার আগে ওর। মুন ভাইকে ডাকল,
“ভাইয়া?”

“হ্যাঁ? ”
” তুমি ভীষণ ভাগ্যবান। ”

ফ্রণ্ট ক্যামেরা অন করল রুবাব। বোনের দিকে চেয়ে প্রশ্রয়ের সুরে হাসল,
” বাবার সাথে কথা বলে তোকেও ভাগ্যবতী হবার ব্যবস্থা করব শীঘ্রই।”

চোখ ঘুরিয়ে একপলক চাইল সৈকতের দিকে।

_____________

সময় মানুষের চিন্তাকে আবহাওয়ার মতো বদলে দেয়। পরিবেশের মাফকাঠিতে চিন্তার উদয় হয়। চিন্তা সিদ্ধান্ত সব বদলে যায়। বদলায় স্বপ্ন ও। উৎফুল্লতা বদলে হয় বিষন্নতা। এই বদলটা সৈকতের মাঝে লক্ষ্য করেছে মুন। রিটেন রেজাল্ট হাতে পাবার পরেই শেখবাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে যেতে চাওয়া ছেলেটা রেজাল্ট হাতে পাওয়ার পর আজ দু’দিন বাদেও বিয়ের নামটি মুখে তুলছেনা। বিয়ের ব্যাপারে একবারে নির্বিকার। মুন মজা করে বলেছিল,
“রেজাল্ট তো পেয়ে গেলে, এবার শেখ বাড়িতে কবে আসছো?”

সৈকত শান্ত স্বরে তখন বলল, “আমরা অন্য ব্যাপারে কথা বলি?”

প্রসঙ্গ বদলেছে, হারিয়েছে কথার খেই ও। ফেইল করে রুবাব ফুরফুরে মেজাজে ঘুরছে আর তার শোকে বন্ধুরা বিষন্ন হয়ে দিন দুনিয়া ভুলেছে। দু’দিন ধরে দেখা সাক্ষাৎ নেই। সন্ধ্যেবেলা পড়তে বসে উদাস হয়ে এসবই ভাবছিল মুন। আনমনা হয়েই ডায়াল ঘুরাল সৈকতের নাম্বারে। রিং হবার সাথেসাথেই রিসিভ হলো। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,
” রুবাব বেরিয়েছে কি না দেখো তো। ফোন তুলছে না ও।”

ভাইয়ের খবর নিতে ফোন দিয়েছে, তার খবর নিতে নয়! চাপা অভিমান হলো মুনের। ফোন রেখে রুম থেকে বের হলো। ভাইয়ের রুমে যাবার সময় হলরুমে চোখ গেল। তাতেই চমকে গেল। এসব তবে তাকে রুম থেকে বের করানোর জন্য!

হলরুমে বাবার সাথে বসে আছে সৈকত। রুবাব ও আছে। বেশ গুরুগম্ভীর আলোচনা চলছে তাদের মাঝে। কী নিয়ে আলোচনা করছে! তাদের বিয়ে নিয়ে নয়তো! সৈকতের আজ আসার কথা ছিল না। ভাইয়া বলেছে বাবার সাথে কথা বলবে সেটাই বলছে কি? বুকটা ধুকধুক করে উঠল। ঠায় দাঁড়িয়ে গেল মুন। কথা বলতে বলতে চোখ ঘুরিয়ে উপরে চাইল সৈকত। চোখাচোখি হলো। শান্ত, শীতল গভীর চাহনির তীর বিঁধল মুনের বুকে। মুন কেঁপে উঠল। ইশারায় জিজ্ঞেস করল, কী চলছে ওখানে? সৈকত মনির শেখের দিকে ইশারা করল। এতে মুনের সন্দেহ গাঢ় হলো।

সৈকত চোখ ঘুরিয়ে মনির শেখের দিকে তাকাল। মনির শেখ রুবাবকে কী যেন বললেন, রুবাব উঠে চলে গেল। মনির শেখ চোখমুখ গম্ভীর করে সৈকতের সাথে কথা বলছেন। মুন খেয়াল করল, সৈকতের চোখমুখ ও গম্ভীর হয়ে গেছে। গুমোট হয়ে আছে। বাবা আলাদা করে সৈকতের সাথে কী কথা বলছেন! আর সৈকতের মুখ এমন হলো কেন? বাবা কি ওকে রিজেক্ট করেছে! মুন ভয় ভয় নিয়ে পরখ করল। বসার ঘরের আবহ গুমোট থেকে গুমোট হতে দেখল। মুন তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে এলো। রুবাব কিচেনে গিয়েছিল মায়ের কাছে। ফিরতি পথে মুন গিয়ে ভাইয়ের সামনে দাঁড়াল। আতঙ্ক ভাসা স্বরে বলল,
“ওরা কী কথা বলছে, ভাইয়া?”

রুবাব ভ্রু কুঁচকে বোনকে পরখ করল। মুনকে এতখানি ভয় পেতে দেখে বসার ঘরের দিকে চোখ ফেলল। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। বাবা সৈকতকে কী যেন জিজ্ঞেস করছেন। মুনের মুখভঙ্গি দেখে রুবাব রহস্য করল,
” তোর এত কী কাজ শুনে? ”

মুন উৎকন্ঠা নিয়ে বলল, ” আমার ভয় করছে। তুমি যাও না ওখানে! ”

“ভয় করছে কেন?”

“বাবা যদি রিজেক্ট করে দেয়!” না ভেবেই বলল মুন। রুবাব হাসল এ পর্যায়ে।

কেমন গর্বিত স্বরে বলল,
“আমাদের ব্যাচের সবচেয়ে ব্রাইট স্টুডেন্ট সৈকত। শুধু টিচার না, সব গুরুজনের চোখের মণি ও। ওর ক্যারেক্টার, বিহেভিয়ার, চালচলন সব কিছু আকর্ষণীয়। বোল্ড, ব্রেভ পার্সোনালিটি ওর। কোন কিছুতে লুকোচুরি নেই। ফিউচার ও ব্রাইট। ওর জবটা ডিমান্ডেবল। নেক্সট মান্থ প্রমোশন পাবে। বিসিএসটাও হয়ে যাবে, আমি নিশ্চিত। বিসিএস হলে ওর অবস্থান কোথায় হবে, চিন্তার বাইরে তোর। ওকে রিজেক্ট করা এত সহজ! ”

ভাইয়ের কথায় মুনের ভেতরটাও প্রশান্তিতে ভরে গেল। প্রিয় মানুষটার প্রশংসা শুনার অনুভূতিটাই অন্যরকম। ভাইয়ের চোখে বন্ধুর জন্য গর্ব দেখে মুনের চোখেও দেখা গেল তা। মন বলে উঠল, এই মহান মানুষটা ওর। মুন একটুখানি হাসল। তারপর বলল,
” তাহলে কী বলছে ওরা? ভাব তো ভালো ঠেকছে না।”

রুবাব বলল, “চিন্তা করিস না। আমি দেখছি।”

রুবাব চলে গেল। সৈকতের পাশে গিয়ে বসল। আসোলেই সৈকতের মুখভঙ্গি ভালো ঠেকছেনা। রুবাব বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
” কী কথা হচ্ছে তোমাদের?”

মনির শেখ বললেন, ” মুনের জন্য একটা সমন্ধ এসেছে। ছেলে সৈকতের কলিগ। ছেলের সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছিলাম ওর থেকে।”

রুবাব হকচকিয়ে গেল। তড়িৎ চাইল সৈকতের পানে। সৈকতের চোখ লাল হয়ে আছে। রাগে চোখমুখ রক্তিম হয়ে গেছে। লক্ষণ ভালো না। রুবাব চোখমুখ কুঁচকে ফেলল। বাবা জিজ্ঞেস করার আর মানুষ পেল না। রুবাব গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
” বাবা,মুনের বিয়ের ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দাও। ”

থেমে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “সৈকত রুমে চল। ”

সৈকতকে নিয়ে উঠে এল রুবাব। রাগে ফোঁসফোঁস করছে সৈকত। রুবাব বলল,
” কুল ব্রো!”

সৈকত তীব্র রাগ নিয়ে হিসহিসিয়ে বলল, ” কুল হইতে দিছস তুই? বা* শর্ত দিছস।”

রুবাব চোখ রাঙাল, ” আমি তোর গুরুজন, সম্মান দিয়া কতা ক। এসব গালিগালাজ করবি বোন বিয়া দিব না।”

“দিস না। তোর বোনরে বিয়ে করার জন্য আমি কানতেছি না।”

“তোর মুখের যা হাল, কাইন্দাই দিবি। খালি আমি মুনের বড়ভাই বলে লজ্জায় কানতে পারতেছিস না। কান্দা আইলে কান, আমি কিছু মনে করব না। ” ওরা তখন সিড়িতে। রুবাব বন্ধুর পিঠে হাত বুলাল। সৈকতের রাগ বাড়ল। পিঠ থেকে হাত সরিয়ে বলল,
“শা লা মীরজাফর। ”

উপরের দিকে উঠে গেল সৈকত। রুবাব গেল না। নিচে ফিরে এলো।

চাপা রাগ নিয়েই হনহন করে রুবাবের রুমের দিকে এগুচ্ছিল সৈকত। আকস্মিক কে যেন হাত টেনে ধরল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই টেনে নিয়ে গেল ছাদের কাছে। জায়গাটা অন্ধকার ছিল বলে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তবে স্পর্শটা চেনা সৈকতের। তাই হকচকিয়ে গেল না। যেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেখানেই গেল। ছাদের সিড়িঘরে আলো জ্বলছে। সেই আলোতে দেখা গেল মুনের আতঙ্কভাসা মুখখানা। মুন পথ থামিয়ে বলল,
” তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? বাবা কী বলছিল?”

কথাটা যেন আগুনে ঘি ঢালল। সৈকত রক্তিম চোখে চাইল। তাতে মুন অবাক হয়ে বলল,
” আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছ কেন? আমি কী করেছি? আশ্চর্য! ”

সৈকত নাক ফুলিয়ে বলল, “কিছু না।”

“বাবাকে বলে দিয়েছো বিয়ের কথা? কী বলেছে বাবা? ”
সৈকত উত্তর দিল না। গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে রইল। মুন ওর হাত ধরল। সৈকতের চোখে চোখ রেখে নরম সুরে বলল,
” বাবার উত্তর না হলেও আমি তোমাকে ছাড়বনা। আমি কেবল তোমারই বউ হব। ”

‘আমি কেবল তোমারই বউ হব।’ কথাটাই যথেষ্ট ছিল সৈকতের উত্তাপ থামানোর জন্য। এই কথাটার পর হুট করেই সৈকতের সব অশান্তি উবে গেল। এক প্রসন্নতা দেখা গেল মুখে। গভীর চোখে এক পল চাইল মুনের পানে। তারপর একদম হুট করেই মুনকে কাছে টেনে নিল। নিবিড় হয়ে গম্ভীরমুখে বলল,
“ট্রাস্ট মি, আমি যদি রুবাবের শর্ত না মানতাম তবে এখন তুমি আমার বউ হয়ে আমার ঘরে থাকতে। তোমার বাবার আমার কাছে তোমার জন্য পাত্রের খোঁজ নেয়ার সুযোগ পেতেন না। ”

হৃদপুরুষ কাছের আসার অনুভূতিতে ভেসে যাচ্ছিল মুন। সেই ক্ষণে তার কথা শুনে প্রেমময় অনুভূতি ছেড়ে গেল। সৈকতের রাগের কারণ ধরতে পেরে হাসি পেল। এই ব্যাপার তবে! মুন হেসে ফেলল। সৈকত গম্ভীরমুখে বলল,
” হাসবে না একদম! না হয় আমার রাগটা তোমাতেই বিলীন করব”

মুনের হাসি থামল না, বরং বেড়ে গেল। শব্দ করেই হেসে ফেলল। রাগ কিংবা প্রিয়তমার কাছের আসার অনুভূতি কোন একটায় মাতাল হয়ে সৈকত ভয়ানক এক কান্ড করে বসল। মুনের হাসি থেমে গেল।
স্তব্ধ হয়ে গেল সে। চোখ বড় বড় করে চাইল। লজ্জায় আরক্তিম হলো দু’গাল।

মুক্তি দিয়ে সুন্দর হেসে সৈকত বলল, ” চন্দ্রকথা, তুমি শুধু আমার। ”

______________________

মনির শেখ ছেলেকে জুরুরি তলব করেছেন তার ঘরে। রুবাব গিয়ে বসতেই জানালেন দুর্দান্ত এক সমন্ধের কথা। এবার তিনি মেয়ে বিয়ে দিবেনই। রুবাব তৎক্ষনাৎ কিছু বলল না। কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
“বাবা, আমরা মুনের জন্য সৈকতকে দেখতে পারি না?”

চলবে…..

#অলীকডোরে চন্দ্রকথা। (পর্ব-৩৫)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

আজ শুক্রবার। কর্মজীবী মানুষের ছুটির দিন। সারা সপ্তাহ কাজ করে এই দিনটা বিশ্রামে কাটায় সৈকত। ঘুম ভাঙে বেলা করে। বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে ওঠে জুম’আর আজান দিলে। ঘড়ির কাটায় এখন বেলা এগারোটা। সবেই চোখ থেকে ঘুম ছুটেছে সৈকতের। চোখ মেলে প্রথমে হাতড়ে ফোন হাতে নিল। রাতে শেষ কথা বলা নাম্বারটায় ডায়াল করল। কানে দিয়ে আবার চোখ বন্ধ করল। খানিক বাদে ওপাশ থেকে সুরলা নারীকন্ঠ ভেসে এলো,
“গুড মর্নিং! ঘুম ভাঙল তবে!”

বন্ধ চোখেই প্রসম্ন হাসল সৈকত। ঘুমজড়ানো স্বরে বলল,
“অপেক্ষায় ছিলে না কি!”

” আমার কাজই এখন দিনরাত তোমার অপেক্ষা করা। ”
“আসব না কি!”
“আসো!”
“আমি সত্যিই আসব কিন্তু। ”

“আমি কি মিথ্যে আসতে বলছি না কি! সত্যিই বলছি আসো। নিজে তো প্রস্তাব নিয়ে আসবে না, কেউ আসলে বসে বসে দেখো।”

সৈকত প্রফুল্ল চিত্তে কথা বলছিল। হঠাৎ মুনের কথায় ভ্রু কুঁচকাল,
“কেউ আসলে মানে?”

মুন বড্ড করুণ স্বরে বলল, “আজ বাবা এক পাত্রকে ডেকেছেন লাঞ্চে। দেখে পছন্দ হলে বিয়ের জন্য হ্যাঁ বলবেন। ”

সৈকতের চোখ থেকে ঘুম উবে গেল। ধরপড়িয়ে উঠে বসল। হকচকিয়ে বলল,
“হোয়াট!”

মুন নিরব রইল। ওদিক থেকে কোন কথা এলো না, কেবল ফোঁপানোর শব্দ এলো। সৈকত এক মুহুর্তের জন্য হতবিহ্বল হয়ে গেল। কদিন আগেই তো রুবাবের সাথে কথা হলো। রুবাব সৈকতকে সরাসরি আশ্বাস দিয়েছে, সৈকতের ভাইবা রেজাল্টের আগ অবধি মুনের বিয়ে আটকে রাখবে সে। কোন সমন্ধ, পাত্রী দেখাদেখি কিছুই হবে না। বিয়ের ব্যাপারে বাবাকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব রুবাবের। সে কথা অনুযায়ী আজ পাত্র আসার কথা নয়। তবে আসছে কেন? রুবাব কি ওকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছে! চোখ লাল হলো সৈকতের। রাগত্ব স্বরে বলল,
” তুমি কোনভাবে পাত্রের সামনে যাবে না। আমি আসছি শেখবাড়িতে। আজ একটা বিহিত করেই যাব।”

মুনের পক্ষ থেকে কোন উত্তর এলো না। কাঁদছে না কি! সৈকত স্বর নরম করে বলল, “ডোন্ট ক্রাই! আমি আছি তো! ”

মুন ফোন কেটে দিল। সৈকত রাগে গরগর করতে লাগল। কল ঘুরাল রুবাবের নাম্বারে। বন্ধ এলো। রাগ বাড়ল সৈকতের।
খানিকবাদে অন্তর এলো দরজায়। সৈকত ঝাঁজালো স্বরে অন্তরকে বলল,
” রুবাবরে কইয়্যা দিবি আজ আমি ওখানে গেলে ওর শেষ দিন হইব। ”

“নাউজুবিল্লাহ! তুই গ্যাং স্টারদের মত কথা বলতেছিস ক্যান? ”
” আজ কোন পাত্রকে ডাকছে শেখবাড়ি। বিয়ের কথা এগোতে! রুবাব এমন করল আমার সাথে! ওরে আমি ছাড়ব না।”

সৈকতের রাগের বিপরীতে অন্তর বিমূঢ় হয়ে গেল। শান্ত স্বরে বলল,
“পাত্ররে চিনিস না তুই?”
“আমি ক্যামনে চিনব, আমারে তো আর ডাকে নাই।”

“তাইলে তুই রুবাবরে ছাড়িস না।”

“আজ যদি ওরা কোনপ্রকার বাড়াবাড়ি করে তবে আমি মুনকে নিয়ে সোজা কাজি অফিস চলে যাব। কারো কোনকথা শুনব না।” ভদ্র, নম্র ছেলেটা আজ যেন উগ্র হয়ে গেল। উদ্ভ্রান্তের মতো উঠে দাঁড়াল। ওর গায়ে বাসার কাপড় ছিল। ঝটপট চেঞ্জ লাগল।
অন্তর অবাক হয়ে চাইল। তারপর বন্ধুর পাশে এসে বলল,
“রিল্যাক্স! তুই সুন্দরভাবে রেড়ি হয়ে যা। আমি কনে পক্ষ। পাত্রী ভাগিয়ে আনার দায়িত্ব আমার।”

সৈকত শুনল কি শুনল না বুঝা গেল না। তাকে কিঞ্চিৎ শান্ত ও দেখাল না। উদ্ভ্রান্তের মতো বেরিয়ে পড়ল। অন্তর আতঙ্কিত চোখে চেয়ে রইল,
“আজ কোন লঙ্কাকাণ্ড বাঁধাবে কে জানে!”

_________________

অগ্নিশর্মা হয়ে শেখবাড়ির দরজায় পৌঁছাল সৈকত। প্রতিদিন গেইটে দাঁড়িয়ে রুবাবকে কল দেয়। রুবাব এসে দরজা খুলে দিলে নিঃশব্দে ভেতরে যায়। আজ সেই ভদ্রতার বালাই করল না। উগ্রভাবে কড়া নাড়ল। বিকট শব্দে কড়া নেড়ে গেল। পারলে দরজা ভেঙে ফেলে। তৎক্ষনাৎ দরজা খুলল না। সৈকতের ধৈর্য পরীক্ষা নিয়ে মিনিট দুয়েক বাদে দরজা খুলল মুন। সেই মুখখানা দেখে সৈকতের রাগ আকাশচুম্বী হলো।

মুন আজ পার্পল জর্জেটের থ্রি- পরেছে। মাথায় ঘোমটা টানানো। শুভ্র দেহে রঙ ভীষণ মানিয়েছে। চোয়ালে প্রসাধনীর আভা। হালকা সেজেছে বোধহয়। ঠোঁটে টিন্ট। সবমিলিয়ে চোখধাঁধানো সুন্দর লাগল মুনকে। এই রংরূপ আজ মুগ্ধ করতে পারল না সৈকতকে
সে গম্ভীরমুখে বলল,
” এত সেজেছো কেন?”

মুনের মুখে আজ হাসি নেই। সে থমথমে মুখে বলল, “মা বলেছে।”

” তুমি পাত্রের সামনে গিয়েছো?” ক্রুর চোখে প্রশ্ন করল সৈকত। ওকে দেখেই যেন আজ ভয় লাগছে মুনের। ভীত চোখে একবার সৈকতের দিকে তাকাল। তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে মাথা নাড়াল।

“আমি নিষেধ করেছিলাম।”

মুন ক্ষীণ স্বরে বলল, “ভাইয়া পাঠিয়েছেন।”

” আনবিলেভেবল! রুবাব আমার সাথে চিট করল! হাউ কুড হি ডু ইট! দেখে নিব ওরে। শা লা আছে কই?”

“হলরুমে বাবার সাথে পাত্রের……

পুরো কথা শেষ করতে দিল না সৈকত। রাগে গরগর করে বলল,
” আমি এখন গিয়ে তোমার বাবা ভাইয়ের সাথে কথা বলব। আপোষে মানলে মানবে নয়তো আমরা আজই বিয়ে করে ফেলব। তুমি প্রস্তুত থাকবে, ঠিক আছে?”

মুন মাথা নাড়াল। সৈকত তখনো গেইটের বাইরে দাঁড়ানো। মুন পকেট গেইট খুলে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। বাড়ি থেকে কেউ দেখছে না সৈকতকে। সৈকত ফিরতি বলল,
“দ্বিতীয়বার পাত্রের সামনে যাওয়ার সাহস ও করবে না। এখনই গিয়ে সাজগোজ উঠিয়ে ফেলবে। সেজেগুজে অন্যকারো জন্য ঘুরঘুর করতে দেখলে খুব খারাপ হয়ে যাবে। এখন সরো আমি ভেতরে যাব।”

মুন সরল না। বরং আরও গেইট ঘেঁষে বলল,
“এভাবে যাবে?”

রাগ নিয়েই সৈকত বাঁকা উত্তর দিল, “তোমার বাবাতো আমাকে ডাকেনাই যে, সেজেগুজে যাব।”

সৈকতের চুল এলোমেলো হয়ে আছে। মুন এলো চুল হাত দিয়ে গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
” হবু শ্বশুরের সামনে যাওয়ার সময় একটু পরিপাটি হয়ে যেতে হয়। নয়তো দেখা গেল, বাবা বিয়ের কথা ভেবেও তোমার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে রিজেক্ট করে দিল।”

সৈকত স্থির চোখে মুনের কাণ্ড দেখল। তারপর প্রশ্নবিদ্ধ মনে বলল, “তুমি এমনভাবে বলছো যেন আমিই পাত্র।”

মুন উত্তর দিল না। চমৎকার হাসল। সৈকত চোখাভাবে চেয়েছিল। ভ্রু কুঁচকে ছিল। হুট করেই ভ্রু ভাঁজ মিলিয়ে গেল। অবিশ্বাস্য চোখে বলল,
“সিরিয়াসলি! ”

সৈকতের বিস্ময় মাখা চোয়াল দেখে ফিক করে হেসে ফেলল। বলল,
” পাত্র হিসেবে আমার তো তোমাকেই পছন্দ। অন্যকেউ হবে কিভাবে?”

সৈকত তব্দা খেয়ে গেল। খানিকক্ষণ কথা বলতে পারল না। তারপর কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“তুমি আমার সাথে মজা করছিলে! জানো আমি কী পরিমাণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”

মুন মিটমিটে হাসল, “সে তোমাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে। ”

” বিয়ের ব্যাপারে তো আমাদের পক্ষ থেকে কোন কথা যায়নি। তবে এই চমৎকার হলো কিভাবে?”

“অল ক্রেডিট গোজ টু ভাইয়া।” হাস্যজ্বল মুখে বলল মুন। সৈকত ভ্রু নাড়াল! শা লা ভেতরে ভেতরে এত খিচুড়ি পাকাচ্ছিল! ও না জেনে কত কী ভেবে ফেলেছে। সৈকত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হুট করেই যেন প্রাণ ফিরে ফেল। বন্ধুর প্রতি রাগ উবে গেল। মনে মনে একটা ধন্যবাদ দিল। ওর ভাবনার মাঝে মুন বলল,
“দেখো তো আমায় কেমন লাগছে? শুধুমাত্র পাত্রের জন্য সেজেছি। পাত্রের পছন্দ হবে তো?”

এতক্ষণে সৈকতের চোয়াল প্রাণবন্ত হলো। স্থির চোখে মুনকে পরখ করল। ক্ষীণ হেসে বলল,
” মাশা আল্লাহ! পছন্দ না পাগল হবে পাত্র। দেখাদেখি পর্বের পর আলাদা করে কথা বলতে দিবে না কি ।”

সৈকতের চেহারায় দুষ্টুমির আভা। মুন লাজুক হাসল।

ওদের কথোপকথনের মাঝে পেছন থেকে আওয়াজ এলো,
“হ্যালো দুলাভাই! আপনার প্রেমালাপ শেষ হলে একটু সাইড দিন। ”

তড়িৎ ঘাড় ঘুরাল সৈকত। নাহিদ অন্তর দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটে প্রসন্ন হাসি। সৈকত প্রশ্ন করল,
“তোরা জানতি? ”

অন্তর বলল, ” ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন আমি কনেপক্ষ। আমার বোনের পাত্র আসবে, আর আমি জানব না, এটা হয় না কি!”

নাহিদ সৈকতের পাশে দাঁড়িয়ে কাধ চাপড়ে বলল, ” আমরা থাকতে শেখ বাড়িতে মুনের অন্য কোথাও বিয়ের কথা আগাবে, এটা ভাবলি কী করে? মুনের কথা শুনেই দৌড় দিলি, একটাবার জিজ্ঞেস তো করবি!”

সৈকত কপাল চুলকে বলল, “এত কিছু মাথায় ছিল না। আমি ভেবেছি, আগেরবারের মতো এবারও রুবাব কিছু করতে পারবেনা। একটা ম্যাসেজ করে দিতি। এটলিস্ট পরিপাটি হয়ে আসতাম। এখন এভাবে যাব শ্বশুরমশাইয়ের সামনে?”

তখনই একটা শপিং নিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রুবাব। গেইটের কাছে জটলা পাকিয়ে আছে দেখে গমগমে সুরে বলল,
” কী হচ্ছে এখানে? এত চিল্লাচিল্লি কিসের? মনে রাখা উচিত, এটা মাছবাজার নয়, পাত্রীর বাড়ি। ”

অন্তর সৈকতকে ইশারা করে বলল, “দুলাভাই, উনি পাত্রীর বড়োভাই। ”

সৈকত হেসে রুবাবকে সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম, শালাবাবু!”

সৈকতকে পরখ করে বোনকে বলল, ” এই ছেলেকে পছন্দ তোর! তোর চয়েজ এত খারাপ! এর থেকে তো এন আর আই পাত্র আরও ভালো ছিল। তুই আমার একটামাত্র বোন। ভেবেছি হিরো দেখে বিয়ে দিব, কিন্তু তুই দেখি পাবনা ফেরত পাগলবেশী একটা ছেলেকে পছন্দ করে বসলি। কী করলি তুই! এ ছেলে কখনোই শেখবাড়ির জামাই হতে পারে না।আমি মানব না। তুই ওকে ভুলে যা। ”

রুবাবের ভাবখানা দেখে সে বোনের জীবনে ভিলেন। পাত্রকে তার পছন্দ হয়নি। নাহিদ সবার নাটক দেখছে। এ পর্যায়ে সে শব্দ করে হেসে বলল,
“পারফেক্ট মিশা সওদাগর।”

মুন এক মুহুর্তের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে গেল। রুবাবকে ভীষণ সিরিয়াস দেখাচ্ছে। পরক্ষণেই সৈকতের মুখে হাসি দেখে সেও হেসে ফেলল। নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
” তখন ভালো ছিল। এখন পাগল হয়ে গেছে। কী করব বলো? আমি কি এখন কেঁদে তোমাত কাছে ওকে ভিক্ষা চাইব, ভাইয়া?”

রুবাব হেসে ফেলল, ” আমি পাত্রীর বড়ভাই। তাই একটু গম্ভীর হচ্ছি। তুই কাঁদবি ক্যান? যা ভেতরে যা।”

মুনকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিল রুবাব। তারপর হাতের প্যাকেট থেকে পাঞ্জাবি বের করে সৈকতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
” আগে বাবার চোখে তুই শুধু আমার বন্ধু হিসেবে ছিলি। আজ আমার বন্ধুর সাথে সাথে মুনের জীবনসঙ্গী হিসেবে ও দেখবেন তোকে। এমন পাগল ছাগলের মত যাবি? এই পাঞ্জাবিটা পরে পরিপাটি হয়ে ভেতরে আয়।”

সৈকত পাঞ্জাবি হাতে নিল, পরল না। হাসিমুখে চাইল বন্ধুর দিকে। তারপর আকস্মিক জড়িয়ে ধরল। কৃতজ্ঞ স্বরে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ! ”

রুবাব ছিঃ ছিঃ করে বলল, “কথায় কথায় গা ঘেঁষবি না। কদিন বাদে বোনজামাই হবি, ভালো হয়ে যা। সর।”

নাহিদ হাসতে হাসতে বলল, “সৈকত আসার আগে পণ করেছে, তোকে ছাড়বে না।”

রুবাব করুণ গলায় বলল, “ভাই ছেড়ে দে। আমি শুধু সেঁজুতির।”

হাসির রোল পড়ল। কিছুদূর গিয়ে পিছু চাইল মুন। মুগ্ধ হয়ে দেখল সুন্দর একটা বন্ধুত্বকে। রুবাব নিজে সৈকতে পাঞ্জাবি পরতে সাহায্য করছিল। সেই সাথে সতর্ক করছিল,
“তুই মুনকে ভালোবাসিস, আমি সবাই জানি। কিন্তু বাবা জানেনা। বাবা তোকে ভালো জানে। তার চোখের সামনে দীর্ঘদিন ধরে তার মেয়ের সাথে প্রেম করছিস জানার পর ভালো নাও জানতে পারে, মেনে নাও নিতে পারে। তাই আমি চাইতেছি, এরেঞ্জ ম্যারেজ হিসেবে তুলে ধরতে। বাড়ি যাওয়ার পর এটা মাথায় রাখবি। আমি সব হ্যান্ডেল করতেছি। দোহাই লাগে বাংলা সিনেমা লাগিয়ে সব ভেস্তে দিস না।”

সৈকত ও আশ্বাস দিল, “রিল্যাক্স শালাবাবু। এতদিন টের পায়নি যেহেতু আজকেও পাবে না।

মুন শুনতেছিল, দেখতেছিল কী চমৎকার দৃশ্য!

____________________

বসার ঘরে সৈকতরা বসে কথা বলতেছে। মা রান্নায় ব্যস্ত। মুন সাজগোজ তুলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। আবার না মা টের পেয়ে যায়। মায়ের কাজে সাহায্য করছিল। সালাদ করছিল। তারিনা মাংস কষাচ্ছিলেন। খুন্তি নাড়ানোর ফাঁকে মেয়ের দিকে তাকালেন।

“সৈকতকে কেমন লাগে তোর?” সন্দিহান চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন তারিনা। কাল রাতেই মনির শেখ ছেলের আনা প্রস্তাব জানিয়েছেন স্ত্রীকে। তা শুনেই মেয়ের মতিগতি বোঝার চেষ্টা করলেন।

মুন মায়ের কথায় হকচকিয়ে গেল। শসা কাটার সময় এক স্লাইস মুখে নিয়েছে। চিবোতে থাকা শসা নাকে উঠে গেল। বিষম খেয়ে কাশতে লাগল।
রুবাব নাস্তার খবর নিতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল। বোনের কাশি শুনে দৌড়ে এলো। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,
“বিষম খেলি কিভাবে? একটু দেখেশুনে খাবি না!”

রুবাব পানি এনে দিল। পানি গলাধঃকরণ করে, কেশে টেশে বিষম কাটল। স্থির হলো মুন। তারিনা ফিরতি বললেন,
“কীরে বল?”

রুবাব ভ্রু উঁচাল, “কী বলবে?”

“সৈকতকে ওর কেমন লাগে।”

রুবাব তড়িৎ বোনের দিকে তাকাল। হুট করে কেশে উঠল সেও। মুন লজ্জায় আড়ষ্ট। ভাইয়ের কাশিতেই বিব্রতবোধ করল। মায়ের কাছে ধরা না খেয়ে যায় এই ভয়ে সালাদ করতে করতে দায়সারাভাবে জবাব দিল,
” যতটুকু চিনি তাতে খারাপ মনে হয়নি। তুমি আর ভাইয়া যে গল্প শুনিয়েছ তাতে ভালোই মনে হয়েছে।”

তারিনা ভাবুক হলেন। রুবাব চোখ কপালে তুলল, তাদের মা ছেলের গল্প শুনে ভালো মনে হয়েছে! ভাবখানা এমন যেন সৈকতকে মুন ভালোভাবে চিনেই না। অথচ মা জানলেও রুবাব জানে মুন সৈকতের সম্পর্কটা কতটা গাঢ়। একটু আগেও তো গেটের কাছে সৈকতের চুল ঠিক দিচ্ছিল, সে কি দেখিনি রুবাব? সম্পর্কে জেরে বিয়ে অবধি গড়াচ্ছে, আর বলছে সেভাবে চিনেনা! বোনের অভিনয় দেখে আপ্লূত রুবাব। বোনের পাশ ঘেঁষে ধীরে বলল,
” ওভারএক্টিং করিস না, ধরা খেয়ে যাবি।”

নাস্তানাবুদ হয়ে আবার কেশে উঠল মুন। অসহায় চোখে চাইল ভাইয়ের দিকে। তারপর কোনমতে পালিয়ে এলো। তারিনা বুঝলেন না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে সন্দিহান চোখে চেয়ে বলল,
“সৈকতকে মুন বোধহয় ভাইয়ের চোখে দেখে। মানিয়ে নিতে পারবে?”

সৈকতকে ভাইয়ের চোখে দেখে? তাও তোমার মেয়ে! কী হাস্যকর কথা! মা তুমি যদি তোমার মেয়ের মন পড়তে পারতে, তবে হয়তো বুঝতে সৈকতের নামটা মুনের মনে ভাইয়া নয় সাইঁয়্যা নামে সেভ আছে লেখা আছে।
বিড়বিড় করল রুবাব। ওর এত হাসি পাচ্ছে। আরো কত কী দেখতে হবে কে জানে? রুবাব মুখভঙ্গি ঠিক রেখে বলল,
” আজ বলে কাল তো আর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না। দুই পরিবার মিলে ঠিকঠাক করে এনগেজমেন্ট করে ফেলি। সৈকতের ভাইবার রেজাল্ট অবধি সময় আছে। এর মধ্যে ওরা নিজেদের জেনে বুঝে নিবে। সমস্যা হবে না মনে হয়।”

তারিনা ভাবুক হয়ে বললেন,
“দেখা যাক, তোর বাবা কী বলে।”

চলবে……

#অলীকডোরে চন্দ্রকথা। (পর্ব-৩৬)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

হলরুমে শীতিল পরিবেশ। ভদ্রবেশে বসে আছে নাহিদ অন্তর, সৈকত। একবারে নিচু স্বরে কথা বলছে। মনির শেখ এখনো আসেননি। নিজ ঘরে আছেন । তারই অপেক্ষা সবার। খানিক বাদে পা রাখলেন হলরুমে। সবাই সালাম দিল। মনির শেখ সবার আগে তাকালেন, সৈকতের দিকে। গভীর চোখে এক পলে পরখ করলেন। এতদিন ছেলের বন্ধু হিসেবে দেখেছেন, আজ মেয়ের জামাতা হিসেবে, পর্যবেক্ষণ একটু বেশিই। লম্বা চওড়া বেশ। পেশল শরীর। চেহারা ও আকর্ষণীয়। সি- গ্রীণ পাঞ্জাবি পরনে, বোধহয় জুম’আ পড়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। চাহনি আর ভাবভঙ্গিমাতে তীব্র আত্মবিশ্বাস। ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বিনয়ী সুরে সালাম দিল তাকে। ভালোই লাগল মনির শেখের। তিনি স্মিত হেসে বললেন,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কেমন আছো তোমরা?”

” আমরা ভালো আছি, আংকেল। ” নম্র স্বরে উত্তর দিল নাহিদ।

ওরা আলাদা আলাদা সোফায় বসা ছিল। অন্তর উঠে তিন বন্ধুদের সাথে এক সোফায় বসে জায়গা করে দিল,
“বসুন, আংকেল।”

মনির শেখ বসলেন। সৈকত মাঝে একবার শেখ বাড়িতে এলেও নাহিদ, অন্তর অনেকদিন বাদে এসেছে। চাকরিতে জয়েন করার পর এটাই প্রথম আসা। মনির শেখ বললেন,
” ভাইবা কেমন গেল তোমাদের?”

” আলহামদুলিল্লাহ। ”

“ক্যাডারের আশা করা যায়?”

অন্তর বলল, “পরীক্ষা তো ভালোই হয়েছে। এখানে ভাগ্য ম্যাটার করে। ভাগ্য সহায় হলে আসবে। ”

মনির শেখ নাহিদ আর সৈকতের দিকে তাকালেন। বললেন,
“তোমাদের কী মনে হচ্ছে?”

এবারের উত্তরটা সৈকত দিল, ” ভাইবা বোর্ডকে হতাশ করে হতাশা নিয়ে ফিরিনি, একটা সন্তুষ্টি আর চেষ্টা নিয়েই ফিরেছি। আমার মনোবল বলছে, আশা করাই যায়, ভাগ্য সহায় হবে ইনশা আল্লাহ । ”
তীব্র আত্মবিশ্বাস খেলে গেল সৈকতের চোয়ালে। একটা দীপ্ত কিরণ ঝলমল করে উঠল চোখে মুখে। এটা নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, দৃঢ় মনোবল। এই মনোবল চোখে পড়া মাত্রই সম্মুখের মানুষ বিশ্বাস করতে বাধ্য হন, এর মাঝে একটা জ্যোতি আছে। যা ওকে সফল করবে।

সৈকতের দৃঢ় মনোবল বেশ লাগে মনির শেখের। আজকালকার ছেলেমেয়েরা জীবনের প্রতি উদাসীন, আত্মবিশ্বাসের অভাব বড্ড। চেষ্টা না করে ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেয়। অথচ ওরা জানে না, চেষ্টা তোমার ভাগ্য বদলে দেয়। তার ছেলেটাও এই পালের গরু। রিটেন দিয়ে এসে বলল, মনে হয় না আসবে। চেষ্টা ও করেনি ছেলেটা। এতেই ছেলের প্রতি রুষ্ট তিনি।
মনির শেখ একটু হাসলেন। বললেন,
“যাক ভালোই। তা কে কোথায় আছো এখন?”

নাহিদ বলল,
“আমি আর সৈকত মাল্টিন্যাশনালে কোম্পানিতে আছি।”

অন্তর বলল, “আমি ব্যাংকে আছি।”

রুবাব এসে বসল বাবার পাশে। বলল,
“আর আমি বাবার অফিসে জয়েন করেছি। বাবার ম্যানেজার হিসেবে।”

শীতল পরিবেশে রুবাবের কথাটা কৌতুকের রেশ এনে দিল। ছেলের রসিকতায় বাবা চোখ ঘুরিয়ে চাইলেন ওর দিকে। বললেন,
“ম্যানেজার সাহেব, আপনি নাস্তাপানি ম্যানেজ করুন।”

রুবাব হেসে বলল, ” বস, ম্যাডাম বলেছেন, আপনার মেয়েকে দিয়ে পাঠাবেন।”

আবার ঠাট্টা করল রুবাব। মনির শেখ গমগমে গলায় ছেলের বন্ধুদের বললেন,
“তোমরা ওকে বুঝাতে পারো না? অফিসে জয়েন করার পরও ঠিকমতো কাজে মন নেই। একদিন গেলে দুইদিন যায়না। কাজের ব্যাপারে একটু ও সিরিয়াস না। সবকিছুতে খামখেয়ালি। ”

অভিযোগের সুর মনির শেখের। ছেলেকে বুঝাতে বুঝাতে ক্লান্ত তিনি। একমাত্র ছেলে কোথায় বাবার ব্যবসা নিজের কাধে তুলে বাবাকে অবসরে পাঠাবে। তা না, এখনো হেয়ালিপনা করছে। এখন ছেলের বন্ধুরাই একমাত্র ভরসা। এদের কথা আবার ছেলে কানে তুলে।
বাবার অভিযোগে রুবাব প্রতিবাদ করল,
” আমি যথেষ্ট সিরিয়াস। একদিন অফিসে গিয়ে দু’দিনের কাজ করে আসি। আমার কাজ আমি ঠিকই করি। এর বেশি সিরিয়াস হতে হলে অফিসকে আইসিইউতে নিয়ে যেতে হবে। ”

‘অফিসকে আইসিইউতে নিয়ে যাবে’ এহেন অদ্ভুত কথায় ঠোঁট চেপে হাসল বন্ধুরা। সৈকত বেচারা পাত্র হয়ে এসে হাসতেও পারল না। পেট পাকিয়ে বসে রইল। মনির শেখ চোখ পাকিয়ে চাইলেন ছেলের দিকে। চোখে রাগ ভাসছে তার। চোখ দিয়েই ভাষ্প করে দিবেন, এমন ভাব। রুবাব গলা ঝেড়ে কোন মতে হলরুম ছাড়ল। যেতে যেতে বলল,
“রুমে আয় তোরা। একসাথে জুম’আর নামাজে যাব।”

বলে নাহিদ অন্তরকে ইশারা করল। রুবাব যেতেই মনির শেখ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“এই ছেলেটা যে কবে শুধরাবে!”

সৈকত রয়েসয়ে বলল, ” দায়িত্ব কাঁধে আসেনি তো, তাই এখনো দায়সারা। দায়িত্ব কাঁধে এলে ঠিক হয়ে যাবে।”

“পুরো অফিসের দায়িত্ব কাঁধে, তবু্ও আরও দায়িত্ব চাই ওর?” ছেলের প্রতি রুষ্ট হয়ে বললেন মনির শেখ। অন্তর বলল,

“আংকেল, আপনি ওকে বিয়েশাদি করিয়ে দিন। বউ ঘরে এলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“মেয়ের বিয়ের আগে ছেলের বিয়ে কী করে দিই বলো?”

নাহিদ বলল, ” ছেলেমেয়ে দুজনের বিয়ে একসাথে দিয়ে দিন। এক মেয়ে বিদায় হয়ে আরেক মেয়ে আসবে। ”
থেমে বলল, “তা ছাড়া রুবাবের তো পছন্দ আছে। পাত্রী খোঁজার ও ঝামেলা নেই।”

“একটা মেয়ের কথা বলেছিল তো, ভাই পুলিশ। ওই মেয়ের কথা বলছো?” ভ্রু কুঁচকালেন মনির শেখ। মেয়ের জন্য পাত্র দেখতে গিয়ে ছেলের বিয়ের কথা উঠবে, ভাবেননি তিনি।

বন্ধুরা সমস্বরে সায় জানাল, “হ্যাঁ, ওই মেয়েটাই। নাম সেঁজুতি। ওর বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য প্রেশার দিচ্ছে। রুবাব এসব নিয়েই আপসেট, ঠিকঠাক কাজে মন দিতে পারছেনা। আমরা নিশ্চিত আপনি সেঁজুতিকে মেনে নিলে, রুবাব আপনার সব কথা মানবে।”

সব উপায় প্রয়োগ করেও ব্যর্থ মনির শেখ, এই একটা উপায়ই এখন একমাত্র ভরসা। যদি বিয়ে করার ছেলের সুমতি হয় তবে মনির শেখ নির্দ্বিধায় ছেলেকে বিয়ে করাবেন। ছেলে মেয়ের একসাথে বিয়ে হলে মন্দ হয়না। বুদ্ধিখানা মনে ধরল মনির শেখের। তিনি প্রসন্ন মনে বললেন,
“আমি ব্যাপারটা ভেবে দেখব। তোমরা ওকে বুঝিয়ো।”

উনাদের কথার মাঝে নাস্তার ট্রে হাতে হলরুমে পা রাখল মুন। মনির শেখ একবার মেয়ের দিকে তাকালেন। মুনের নজর ট্রের দিকে। কোনদিকে তাকাচ্ছে। মনির শেখ এবার চোখ ফেললেন সৈকতের পানে। অন্তর্ভেদী চোখে চেয়ে রইলেন ওর দিকে। তার মনে সন্দেহের দানা বিঁধেছে। কোথাও তার অগোচরে এরা সম্পর্কে জড়িয়ে বসেনি তো! এটা পরখ করতেই আজকে সৈকতকে ডাকা। সেই সাথে সৈকতের ভাবনা জেনে নেয়া।
সৈকতের হাতে ফোন। গভীর মনোযোগ দিয়ে ফোন দেখছে। এদিকে খেয়াল নেই। ফোন দেখার সময় কাউকে কল দিয়ে উঠে গেল। আবছা স্বরে ‘বাবা’ শব্দটা কানে এলো। বাবার সাথে কথা বলছে বোধহয়। মুন নাস্তার ট্রে সেন্টার টেবিলে রেখে গেল। এই সময়টায় সৈকতকে একবার ও মুনের দিকে তাকাতে দেখেননি তিনি।
মনির শেখ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

নাহিদ অন্তর কেবল লেমনেডটাই নিল। আর কিছু নিল না।

সৈকত কথা বলা শেষ করে এসে বন্ধুদের পেল না। কেবল মনির শেখকে বসা দেখল। সৈকত বুঝল এখন তার ইন্টার্ভিউ শুরু হবে। সে চাপা শ্বাস ফেলল। মনির শেখ ওকে দেখে বললেন,
” তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, বসো কথা বলি।”

সৈকত বসল। মনির শেখ চায়ের কাপ এগিয়ে দিলেন,
“চা নাও।”

সৈকত নির্দ্বিধায় চা নিল। তিনি নড়েচড়ে বসে প্রশ্ন করলেন,
“তা তোমার ফিউচার প্ল্যান কী?”

চায়ে চুমুক দিয়ে সৈকত বলল, ” বিসিএস রেজাল্টের উপর নির্ভর করবে। বিসিএস হলে সরকারি জবে টার্ণ করব।”

“কোথায় সেটেল্ড হবে?”

“ঢাকাতেই। ”

“বিয়ে শাদী নিয়ে ভাবছো না?”

‘আমি পারলে তো এখনই করে ফেলি। কিন্তু আপনার ছেলে শর্ত পর্ত দিয়েই সব ভেস্তে দিয়েছে।’ কথাটা মনে ভাসল। মনের কথা মনে চেপে বলল,
” পরিবার থেকে চাপ দিচ্ছে। তবে আমি রেজাল্ট অবধি অপেক্ষা করতে চাইছি। সেটেল্ড হয়ে ভাববো।”

‘ওয়াইজ ডিসিশন। ‘ উৎসাহিত করলেন মনির শেখ। পরপরই বললেন,
” তোমার পরিবার কোথায় সেটেল্ড হবে?”

“চাকরি পাওয়ার পর থেকেই বাবা মাকে ঢাকাতে আনার চেষ্টা করছি। কিন্তু বাবা মা ঢাকা আসতে রাজি নন। আসোলে তারা মুক্ত পরিবেশে থাকতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বাবা মা গ্রামেই স্থায়ী আবাস গড়েছেন। ”

“তুমি এখানে, তোমার বাবা-মা গ্রামে। বিয়ের পর বউকে রাখবে কোথায়?”

এতক্ষণে কথার কেন্দ্রবিন্দু ধরতে পারল সৈকত। শ্বশুরমশাই মেয়ের থাকা নিয়েই চিন্তিত। তার শহুরে মেয়ে গ্রামীণ জীবনে অভ্যস্ত হতে পারবে না। সৈকত একটু হাসল। নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আংকেল, মা আমার বিয়ের চাপ দিচ্ছেন, পুত্রবধূকে তার সাথে রাখতে নয়, তার একলা শহরে একা থাকা ছেলের পরিবার গড়তে। আমি যদি ঢাকা থাকি, সেও আমার সাথে ঢাকা থাকবে।”

থেমে বলল, “তবে আমার যদি অন্য কোথাও জব হয়। এবং তার পড়াশোনা যদি ঢাকাতে হয়, তবে সে ঢাকাতে থেকেই পড়াশোনা শেষ করবে। তার ড্রিমস, ক্যারিয়ারের জন্য সে যদি হোস্টেল, বাবার বাড়ি কিংবা দেশের বাইরেও যেতে চায় তবে আমার পক্ষ থেকে কোন আপত্তি থাকবেনা।”

সৈকতের স্বর দৃঢ়। সে অল্প ক’টা কথাতেই শ্বশরের সব ভয় ঝেড়ে ফেলেছে। পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, আপনি চিন্তা করবেন না, মুনের পড়ার ক্ষতি হবে না।

মনির শেখ মুগ্ধ হয়ে গেলেন সৈকতের কথা শুনে। ঠিক এই ভরসাটুকুই আশা করছিলেন তিনি। তিনি চান, তার মেয়ে আত্মনির্ভরশীল হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াক। এই শহরেই থাকুক। সৈকতকের কথায় তার বুক থেকে পাথর সরে গেল। তিনি বিমোহিত হলেন, ছেলেটার সুন্দর ভাবনায়। কটা ছেলে বউয়ের স্বপ্নের ভার নিতে চায়!
মনির শেখ আরও অনেক প্রশ্ন সাজিয়ে রেখেছিলেন, সৈকতকে করবেন বলে। কিন্তু এখন সেই প্রশ্নদের উড়িয়ে দিয়েছেন। এই ছেলের মধ্যে একটা ব্যাপার আছে , যা তাকে মুগ্ধ করছে। তাকে ভাবতে বাধ্য করছে যে এই ছেলে তার মেয়েকে ভালো রাখবে।
তাছাড়া ছেলে তো অপরিচিত নয়। অনেক বছর ধরে চিনেন। সবচেয়ে বড়ো কথা রুবাবের বন্ধু। একটা ছেলে সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানে তার বন্ধু। সেই বন্ধু যখন তার বোন বিয়ে দিতে চাইছে, তার মানে ছেলেটা পারফেক্ট। দোষ থাকলে নিশ্চয়ই রুবাব সমন্ধ আনতো না। রুবাবকে চিনেন তিনি। বোনের ব্যাপারে ভীষণ সিরিয়াস। দুনিয়া একদিকে আর বোন আরেকদিকে। সেই বোনের জন্য সৈকতকে বেছে নেয়া মানে সৈকত সুপাত্র, তার অভিযোগ সাজে না। তবুও তিনি যাচাই করলেন। হতাশ হননি। বরং মুগ্ধ হয়েছেন।

আর কোন প্রশ্ন করলেন না তিনি। বললেন,
” তোমার বন্ধুরা রুবাবের ঘরে। যাও।”

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উঠে গেল সৈকত। ধীর পায়ে সিড়ি বেয়ে দোতলায় গেল। এক কোণে মুন অপেক্ষায় দাঁড়ানো। ওকে দেখামাত্র দৌড়ে এলো। কৌতুহল নিয়ে বলল,
“ইন্টার্ভিউ কেমন ছিল?”

সৈকত ক্লান্ত শ্বাস ফেলে বলল, “এত প্রশ্ন তো ভাইবা বোর্ডেও জিজ্ঞেস করেনি। তোমার বাবা জটিল মানুষ। ”

মুন হেসে ফেলল, ” আমি তো পাশ করে বালাও পেয়ে গেছি। এবার তোমার পালা।”

থেমে মজাস্থলে বলল, ” তোমাকে পছন্দ হলে আমার বাবা ও তোমাকে বালা পরিয়ে দিবেন।”

মুন উদাস চোখে কল্পনা করল সৈকতকে বাবা বালা পরিয়ে দিচ্ছেন। ভেবেই হেসে কুটিকুটি হলো। সৈকত কপট রাগ নিয়ে বলল, ” আজব! আমি বালা পরব কেন?”

“পরো সুন্দর লাগবে।” আবার হাসতে লাগল মুন। সৈকত স্থির চোখে ওই হাসি দেখল। হুট করে গাল টেনে আদুরে স্বরে বলল,
” চন্দ্রকথা, তোমার এই হাসিটা বড্ড প্রিয় আমার। সবসময় হাসিখুশি থাকবে।”

মুনের হাসি থেমে গেল হঠাৎ মন্তব্যে। চোখে চোখ রেখে দেখল সৈকত মোহাচ্ছন্ন হয়ে ওকেই দেখছে। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল মুনের। লাজ এসে ঘিরে ধরল ওকে। এভাবে বলে কেউ। ওর লাজ বাড়িয়ে সৈকত বলল,
” এখনু লজ্জা পেলে হবে? লজ্জা সব জমিয়ে রাখো, বাসরে জমা দিও।”

______________________

সৈকত বন্ধুদের কাছে গেল। রুবাব যেন শ্বাস আটকে বসে ছিল। সৈকত যেতেই বোনের মত কৌতুহলী প্রশ্ন করল। সৈকত হেসে বলল,
” দুঃখের তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিয়ে বিয়ের জন্য প্রস্তুত হ। দুই বন্ধু একসাথে বিয়ে করব।”

রুবাব ভ্রু কুঁচকাল, “এখানে আমার বিয়ের কথা আসছে কেন?”
” একমাত্র জোয়ান শা লা ঘরে রেখে বিয়ে করতে আমার বিবেকে বাঁধছে। বিবেকের তাড়নায় তোর একটা হিল্লে করছি।”

রুবাব অবাক হয়ে চাইল, ” তুই না নিজের বিয়ের জন্য এসেছিস?”

সৈকত বন্ধুর কাঁধ চাপড়ে বলল, ” আমাদের কী কথা হইছিল? আমার বিয়ের ব্যবস্থা করার দায় তোর, আর তোর বিয়ের ব্যবস্থা করার দায় আমার। ভুলে যাইতাছস ক্যা? ”

“তাই বলে পাত্র হয়ে এসে আমার সমন্ধ তুলে দিয়ে যাবি?”

“আলবাৎ যাবে। ওয়াদা খালি তুই একাই রাখতে পারোস, আমরা পারিনা। ” সুর মিলাল নাহিদ।

“তোরাও!” চকিতে চাইল রুবাব। বন্ধুদের কান্ডে বিহ্বল ও। ওর ভাব দেখে রুবাব নিশ্চিত সবাই মিলে ওর বিয়ের ব্যাপারে বাবার কান ভাঙিয়ে এসেছে। ও যে সেঁজুতিকে নিয়ে চিন্তিত, সে তো কাউজে বলেনি। তবুও বন্ধুরা বুঝল কিভাবে? এত ভাবে ওরা! রুবাবের মন প্রফুল্ল হলো। অন্তর এসে বলল,
“হ, আমরাও। এই শুক্রবার শেখবাড়িতে এসেছি, আগামী শুক্রবার যাব সেঁজুতিদের বাড়িতে। তারপর কোন এক শুক্রবার জিন্দেগী তামা কইরা দুই বন্ধু এক লগে বিয়া কইরা ফেলবি। তোগো জীবন ফুল বাগান হইয়্যা যাইব । সৈকত চান পাইব, তুই সূর্য পাবি। নাহিদ আর আমারে চান্দে ও চিনে না সুর্য ও চিনে না। আমরা বইসা বইসা তোগো তামাশা দেখব আর মামা চাচা হবো।”

অন্তর উদ্ভট কথা বলে যাচ্ছে। এতে বিরক্ত হবার কথা রুবাব সৈকতের। অথচ ওরা বিরক্ত হচ্ছে না। বরং হাসছে প্রাণবন্ত। রুবাব এসে সহাস্যে বন্ধুকে বলল,
“কান্দিস না, আইজকা জুম’আর জিলাপি পাইলে তোরে দিয়া দিমু। জিলাপি খাইতে খাইতে আল্লাহর কাছে দোয়া করিস আল্লাহ যাতে তোর আর নাহিদরেও বাপ্পারাজের জিন্দেগী থেইক্যা মুক্তি দেয়। দোয়া কবুল হইলে তোর জিন্দেগী ও ফুলবাগান হইয়্যা যাইব। ব্যাক টু ব্যাক চাচা বানাবি। তারপর বিশ্বকাপের টিম আমাদের চার বন্ধুর ঘর থেইক্যা লঞ্চ হইব। ”

সৈকত নাহিদকে বলল, “তোর জিলাপি লাগব না? ”

নাহিদ বলল, ” নাহ, । আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করে আমৃত্যু কারাদণ্ড গ্রহন করব না। আমি বিন্দাস আছি। আমার জিলাপি ও অন্তরকে দে। শা লা রে ভূতে কিলাচ্ছে। বিয়া শাদী কইরা আলমারির ভাঁজ করা কাপড়ের মত পইড়া থাকুক। ”

অন্তর প্রতিবাদ করল, ” তুই আবিত্তা ম র। আমি বিয়ার কাঙাল, বিয়া করুম। জীবন ফুল বাগান করব।”

নাহিদ তিরষ্কার করল, “ফুল বাগানে উইড়া আসা ভিমরুল যখন পালা পালা করব, তখন আমার দুয়ারে কাঁদতে আসবি না।”

অন্তর সরু চোখে চেয়ে বাকি দুই বন্ধুকে বলল, ” এই ব্যা টা কি বিয়া বিদ্বেষী হইয়্যা গেছে? লক্ষণ ত ভালা না।”

সৈকত অন্তরকে সান্ত্বনা দিল, ” বিয়ার অভিজ্ঞতা খারাপ হইলে আমি ঘটক লাগিয়ে ওরে বিয়া করাব আগে। আমরা দুঃখে কানব, আর আসমানে উড়বে, এইটা হইতে দেয়া যায় না। কানলে চার বন্ধু এক লগে কানব। ”

হাসি ঠাট্টার মাঝে ওরা জুম’আর জন্য বের হলো। মনির শেখ ও ছিলেন সাথে। মসজিদ থেকে ফিরে একসাথে খেতে বসলেন। পুরোটা সময় মনির শেখ সৈকতকে পরখ করলেন। যাবার কালে বললেন,
” নেক্সট ফ্রাইডে ফ্রি থাকলে পরিবার নিয়ে আসো! ”

ওরা সব বন্ধুরা একসাথেই ছিল। মনির শেখের কথায় সবার মাঝে আনন্দ বিরাজ করল। হাসি ফুটল সবার ঠোঁটে। সবচেয়ে বেশি খুশি দেখাল রুবাবকে। কেমন হৈচৈ করে উঠল।
ওর খুশিতে ভাটা দিয়ে সৈকত বলল,
” আংকেল, আমি তো যে কোন ফ্রাইডে তে আসতে পারব। হাতে অফুরন্ত সময়। আমার মনে হয়, নেক্সট ফ্রাইডেতে সেঁজুতির বাসার প্ল্যান করা উচিত। ব্যাপারটা সিরিয়াস। রুবাবের জীবন অগোছালো রেখে আমি জীবন গোছাতে পারব না। ”

এত বহুপাক্ষিকতার ক্ষণ কেউ এভাবে ঠেলে দেয়! অবাক হলো বন্ধুরা। রুবাব বিমূঢ় হয়ে গেল। বিহ্বল চোখে চাইল। রুবাব কিছু বলতে গেল, সৈকত ওর বিস্ময় বাড়িয়ে বলল,
” সেঁজুতির বাসা থেকে বিয়ের কথা আগাচ্ছে। কথা পাকাপাকি হয়ে যাবে যে কোন সময়। সেঁজুতির ভাই, বেশ সিরিয়াস এবার। এখনই প্রস্তাব না গেলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। রুবাব মানসিক চাপে আছে বেশ। আপনাকে বলতে গেছে বারবার, কিন্তু আপনার আগ্রহ মুনের বিয়ের দিকে দেখে জোর দিতে পারেনি। ”

থামল সৈকত। তারপর নম্র স্বরে বলল, ” কেবল আমরা বন্ধুরাই জানি সেঁজুতি রুবাবের লাইফে কতটা জুড়ে আছে। সেটা না জানলেও আপনার জানা উচিত, সেঁজুতিকে হারালে আপনার ছেলেটা শেষ হয়ে যাব। এই সিচুয়েশনে আপনার পদক্ষেপ নেয়া উচিত আংকেল।”

রুবাব চেয়ে রইল ওভাবেই। সৈকত এত কিছু কিভাবে জানল? সে তো ব্যাপারটা কারো সাথে শেয়ার করেনি। তবে? সৈকত বন্ধুর পানে চেয়ে অভয় দিল। হাসল মৃদু। যেন বলল, তোর কী মনে হয়, তুই না বললে আমি কিছু জানব না?’

মনির শেখ ছেলের দিকে তাকালেন। ছেলের বিমর্ষতা চোখে পড়ল তার। মনির শেখের মায়া হলো। তিনি ছেলের বন্ধুদের বুদ্ধি কানে তুলেছেন আগেই। সেই পরিপ্রেক্ষিতে গম্ভীরমুখে বললেন,
” ছেলে যখন পছন্দ করেই ফেলেছে তখন তো আমাদের কাছে মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু একটা শর্ত আছে। আমি বিয়ে মেনে নিলে ওকে ব্যবসায় মন দিতে হবে। কোন ফাঁকিবাজি করবে না। যদি রাজি হয় তবে আমি প্রস্তাব নিয়ে যাব। ”

আবার এক চিলতে হাসি খেলে গেল সবার মাঝে। রুবাব খুশিতে কথা বলতে পারল না। ওর চোখে পানি চলে এসেছে। বুক থেকে পাথর সরে গেছে। অন্তর বলল,
” ওর নিশ্চয়তা আমরা দিচ্ছি আংকেল। আপনি শুধু সেঁজুতির ভাইয়ের সাথে কথা বলুন। ”

সৈকত রুবাবের কাধ চাপড়ে বলল, “ইদ মোবারক শালা বাবু।”

উত্তরে রুবাব জড়িয়ে ধরল বন্ধুকে। একই দিনে দুটো পূর্ণতা দেখল বন্ধুরা।

__________________

চলবে……