অলীকডোরে চন্দ্রকথা পর্ব-৪০+৪১

0
481

#অলীকডোরে চন্দ্রকথা। (পর্ব- ৪০)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

হলদে-কমলা গাধাফুল আর হরেক রঙা আলোকবাতিতে সেজেছে শেখ বাড়ি। নাচে, গানে, হৈ-হুল্লোড়ে উল্লাসিত চারপাশ। বিশিষ্ট শিল্পপতি মনির শেখের এক নয়, দু’দুটো ছেলেমেয়ের একসাথে বিয়ে বলে কথা।
দিন তিনেক বাদে বিয়ে অথচ আত্মীয় স্বজন এসে জমা হয়েছে আজ থেকেই। অনেক কৌতুহলী সবাই। কারণ, বিয়ের দিনক্ষণ বড্ড অদ্ভুত। একমাত্র ছেলে রুবাবের বিয়ে হচ্ছে এখানকারই থানার ইন্সপেক্টরের বোনের সাথে। একমাত্র মেয়ে মুনের বিয়ে হচ্ছে, ছেলের বন্ধুর সাথে। দিন তিনেক বাদে ছেলের বিয়ে, ছেলের বৌভাতের দিন মেয়ের বিয়ে। বিয়ে আলাদা হলেও হলুদ ভাই-বোনের একসাথেই হবে। সেটা কাল। পরসু আবার সৈকতের হলুদ। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, মেয়ের হবু জামাই শেখ বাড়ির সব অনুষ্ঠানে অংশ নিবে, তাও ছেলের বন্ধু হিসেবে। এমন কি ছেলেও পরদিন বিয়ে রেখে বন্ধুর হলুদ করতে গ্রামের বাড়ি যাবে।
এমন নিয়ম কখনো কেউ দেখেনি। এবারই প্রথম। তাই কৌতুহলী নিয়ে আগে ভাগে এসে পড়েছে সবাই।

সৈকতের ভাবনা ছিল ওদের দুই বন্ধুর বিয়ে একই দিন, একই ভেন্যুতে হবে। কিন্তু পরবর্তীতে গভীর ভাবনার পর নিজের সিদ্ধান্ত বদলেছে সৈকত। কারণটা রুবাব। রুবাবের অতি আদরের একমাত্র বোন মুন। তার বিয়ে, বিদায়ে রুবাবের মনের উপর খুব প্রভাব পড়বে। ছেলেটা বোনের ব্যাপারে খুব ইমোশনাল। বিদায়ের পর নিজেকে ঠিক রাখতে পারবে না নিশ্চিত। বিয়ে রুবাবের জীবনে খুব আরাধ্য। বছর তিনেক ধরে এই দিনটার অপেক্ষা করছে। কত সাধনার পর পাচ্ছে সেঁজুতিকে। ভীষণ স্পেশাল। বোনের জন্য মলিন মুখে সেই বিশেষ দিনের বিশেষত্ব ঠিক রাখা সম্ভব হবে না। এত মন খারাপ নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারবেনা।
সেঁজুতির অনেক স্বপ্ন থাকতে পারে। মুনের জন্য সেসব ভেস্তে গেলে ওরও মন খারাপ হবে। এখানে ওর তো কোন দোষ নেই। কেন তবে ওর দিনটা খারাপ করবে? শুধু রুবাব নয়, একমাত্র মেয়ের বিদায়ের পর বাবা মায়ের বিক্ষিপ্ত মনে নতুন বউ নিয়ে আহ্লাদ করারা মন মানুষিকতা হবে? হবে না।
একমাত্র ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে মুনের ও অনেক শখ আহ্লাদ থাকতে পারে। নিজের বিয়ে বলে সেসব ও অপূর্ণ থেকে যাবে। শেখ পরিবার বাদে সৈকত এবং নাহিদ অন্তরের জন্য বেকায়দায় হবে? কে কোন পক্ষী হবে?
এক কথায়, একই দিন দুই ছেলেমেয়ে বিয়ে হলে সবার উপর খুব চাপ পড়ে যাবে। এসব ভেবেই একদিন আগে পরে দেয়া হলো।

বিয়ের শপিং এ তেমন একটা ঝামেলা হয়নি। একদিন বন্ধুরা মিলে গিয়েছে, অন্যদিন সেঁজুতি আর মুনকে সাথে নিয়েছে। বাদবাকি গুলো ননদ ভাবি মিলে সেরেছে। পরদিন সন্ধ্যেবেলা শেখবাড়ি দুই ছেলে মেয়ের হলুদ।

পার্লারের মেয়ে এসে সাজিয়ে দিয়ে গেছে মুনকে। নিজ ঘরেই বসা সে। সকাল থেকে নাহিদ অন্তর এখানে। রুবাবের সাথে মিলে আয়োজন তদারকি করছে। শেখ বাড়ির ছাদে হলুদের স্টেজ করা হয়েছে। সাউন্ড বক্সে গান বাজছে। একটুবাদেই অনুষ্ঠান শুরু হবে। মুন ফোন তুলে কল দিচ্ছে সৈকতকে। তোলার নাম নেই। বার পাঁচেকে ও তুলল না। মুন অনবরত ম্যাসেজ দিল। রিপ্লাই এলো না। মিনিট পনেরো বাদে রিপ্লাই করল,
” রেডি হয়েছো? ছবি দাও।”

“ছবি দিব মানে? তুমি আসছো না? ”

উত্তর এলো না। মুন বিস্ময় নিয়ে লিখল,
“সৈকত কোথায় তুমি!”

“বাড়িতে। ”

“আসবে না?”

” বাড়িতে অনেক কাজ তো। আমি আটকে গেছি। স্যরি! ”

মুনের মুখে আঁধার নামল। সৈকত ভিডিও কল দিল। মুন কেটে দিল। রেগে রিপ্লাই করল,
” থাকো তুমি তোমার কাজ নিয়ে। বিয়ের দিন শুধু আমাকে নিতে আসো, আমি ও যাব না। বিয়েও করব না। যার আমাকে দেখার সময় নেই, তাকে বিয়ে করার ও দরকার নেই আমার।

বলে ফোনই বন্ধ করে রাখল। মলিন মুখে বসে রইল। চারদিকে মানুষ গিজগিজ করছে, সব যেন বিরক্ত লাগছে। খানিক বাদে কাজিনরা এসে ওকে ছাদে নিয়ে গেল। রুবাব এসে বোনকে স্টেজে নিয়ে বসাল। মুনের মন খারাপ দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
” মুন? কী হয়েছে? মন খারাপ কেন? ভাইয়াকে বল!”

মুন নাক ফুলিয়ে বলল, “কিছু না। ”

তারিনা আর মনির শেখ এলেন। ছেলেমেয়েকে নিয়ে কেক কাটলেন। হলুদ ছোঁয়ালেন মেয়ের হাতে। মেয়ের মলিন মুখ দেখে বাবা মা ভাবল বিয়ে হবে ভেবে মন খারাপ করছে। মনির শেখ মেয়ের মাথা বুকে টেনে মাথায় চুমু খেলেন। কাতর সুরে বললেন,
“মন খারাপ করো না। অনেক সুন্দর জীবন অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। খুব সুখে থাকবে তুমি। বাবার দোয়া সবসময় তোমার সাথে আছে।”

মুন আবেগে আপ্লূত হয়ে গেল। এতক্ষণের বিক্ষিপ্ত মনটা যেন বাবার আদর পেয়ে ভালো হয়ে গেল। বাবা মা নেমে যাবার পর কেউ এলো না। অনেকক্ষণ ও একা বসে রইল। রুবাব স্টেজে বসে সেঁজুতির সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে। মুন একা বসে রইল। ওর কাজিনরা সবাই মুখিয়ে ছিল স্টেজে উঠবার। এখন উঠছেনা কেন? মুন ভ্রু কুঁচকাল। নাহিদ দায়িত্ববান ছেলের মতো মেহমান তদারকি করছে। অন্তর ক্যামরা নিয়ে ঘুরছে। মুন ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করল,
“কেউ আসছে না কেন ভাইয়া?”

অন্তর হেসে বলল, ” ১৪৪ধারা জারি করা আছে। ”

মুন বিভ্রান্ত হয়ে বলল, “কিসের!”

অন্তর রহস্য হাসল। ক্যামরা তাক করে বলল, “দেখি পিচ্চি, তোমার ক’টা সিঙ্গেল ছবি তুলি। পরে আর সুযোগ পাব না।”

অন্তরের স্বরে স্নেহ। ভাইসুলভ আচরণ আর সম্মোধনে হুট করে হেটে ফেলল মুন। বলল, “বউ সেজে বসে আছি। এখনো পিচ্চি ডাকবেন, ভাইয়া!”

অন্তর সস্নেহে বলল, ” ভাইদের কাছে বোন কখনো বড় হয়না। সবসময় ছোটোই থাকে। ”

পরপরই এদিক ওদিক চেয়ে বলল, “সেট আপ পছন্দ হয়েছে তোমার? পছন্দ না হলে বলো, চেঞ্জ করে দিই। এখনো সময় আছে। ”

মুন প্রাণ ভরে এলো। নাহিদ অন্তর ভাইয়ার ভাইসুলভ আচরণ সর্বদা মুগ্ধ করে ওকে। ভাইয়ের পর সবচেয়ে বেশি ভাইয়ের মতো মনে হয় অন্তরকে। অন্তরের বোন নেই। অন্তর মুনকে নিজের বোনের স্থানটাই দিয়েছে। প্রথম দিন দেখেই অন্তর বলেছিল, তুমি আজ থেকে আমার ও বোন। সৈকত-মুনের বিয়েতেও অন্তর কনেপক্ষ। বিয়ের দিনও শেখবাড়িতে থাকবে সে। নাহিদ বরযাত্রীর সাথে আসবে।

_________________

হলুদ ছোঁয়ার পর্বের কথা বেমালুম ভুলে নাচ গানের পর্ব শুরু হয়েছে। কাজিন মহলের সবাই একক, গ্রুপ ডান্স করছে। মুন নিশ্চুপ বসে দেখছে। বিরক্ত লাগছে তার। নিভে যাওয়া রাগটা আবার চেপে বসল। ইচ্ছে করছে সব ছেড়ে ছুঁড়ে চলে যেতে। ইচ্ছেদের লাই দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তখনই লাইট অফ হয়ে গেল। হৈচৈ পড়ে গেল চারদিকে। কিছুক্ষণ পর সেই শোরগোল ভেদ করে গান বেজে উঠল হেইয়্যা….. হেইয়্যা…

ফ্ল্যাশ লাইট ছাদের দরজার দিকে ফোকাস হলো। সেখান নাহিদ অন্তর সহ আরও কয়েকজনকে নাচতে দেখা গেল। সবার দৃষ্টি ওকে। মুন দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। আকস্মিক সামনে থেকে সরে গেল সবাই। নাচের তালে বেরিয়ে এলো নয়া মুখ, নয়া এক সুর। স্টেজের দিকে চেয়ে হেসে গাইল সে,

হিরিয়ে সেহরা বান্ধ কে ম্যায় তো আয়া রে
ডোলি বারাত ভি সাথ মে ম্যা তো লায়া রে
আব তো না হোতা হ্যায় এক রোজ ইন্তেজার

মুন বিস্ময়ে থমকে রইল এক পল। তারপর হুট করেই চিৎকার দিয়ে উঠল, ” সৈকুঅঅঅঅঅঅঅঅত….

হৈ হৈ পড়ে গেল চারদিকে। সৈকত নেচে গেয়ে এগিয়ে এল স্টেজের দিকে।
আজ না তো কাল হ্যায় তুঝকো তো বাস মেরি হোনি রে
তেনু লেকে ম্যা জাভাঙ্গা, দিল দেকে ম্যা জাভাঙ্গা…

মুন লোকলজ্জা ভুলে জড়িয়ে ধরল সৈকত। চোখে পানি ওর। যাক আজ ভয় পাচ্ছে না। ওর পাগলামো দেখে হাসি বাড়ল সৈকতের। আগলে নিয়ে বলল,
” কে যেন রাগ করেছে আমার সাথে? ”

মুন ছেড়ে দিল। চোখ গরম করে বলল, ” খুব তো আসবে না বলেছিলে, কেন এলে কেন?”

সৈকত গম্ভীরমুখে বলল, ” পুরো খানদান সমেত বউ নিতে এসে খালি হাতে ফিরলে আমার মান সম্মান শেষ হয়ে যেত। সেই সম্মান বাঁচাতে এসেছি।”

মুনের বিয়ে ভাঙার টিপ্পনী কাটল সৈকত। তা বুঝে মুন বলল, “তুমি সম্মান বাঁচাতে এসেছো!”

সৈকত একটুখানি হাসল। উত্তর দিল না। ওকে গভীর চোখে পরখ করে বলল, “হলদে অপ্সরা লাগছে, আমার চন্দ্রকথাকে। আমার আসা সার্থক। ”

মুনের মন প্রজাপতিটা উড়তে লাগল। ভালোলাগায় ভরে গেল মনটা। এই ক্ষণের অপেক্ষাতে তো ছিল সে। লাজুক হাসল সে। অন্তর ক্যামরা তাক করে বলল,
” দুলাভাই, প্রেমটাকে সাইডে রেখে আপাকে হলুদ ছোঁয়ান। আপনার ১৪৪ধারায় আমার বোনটা আটকা পড়েছে।”

সৈকত হলুদের কৌটা হাতে নিল। মুন বিস্মিত চোখে চাইল, একবার অন্তরের দিকে, আরেকবার সৈকতের দিকে। এর অর্থ, এতক্ষণ ওকে একলা রাখার পেছনের কারণটা সৈকতের আগমন! মুনের বিস্ময় লগ্নে আলতো করে গালে হলুদ ছুঁয়ে দিল সৈকত। প্রেম নিয়ে বলল,
” তোমার গালে আমার নামের হলুদ আমার ছোঁয়াতেই মিশে থাকুক। ছোঁয়া, চন্দ্রকথা সবই তো আমার! ”

মুন খেয়াল করে দেখল বাবা মা ভাই ওর হাতে হলুদ ছুঁয়েছে। কেউ গালে লাগাননি। সৈকত হলুদ ছোঁয়াবে বলে! এত আয়োজন ওকে ঘিরে! মুন বিমোহিত হয়ে গেল। আবেশে মিশে গেল। গাঢ় প্রেম নিয়ে চেয়ে রইল সৈকতের পানে। সৈকত চমৎকার হাসল। ধীরে বলল,
” আমি কি তোমার হলুদ ছোঁয়া পাব না?”

মুন হলুদ কৌটার দিকে হাত বাড়াল। আবার গুটিয়ে নিল। সৈকত ভ্রু কুঁচকাল! ওর ভ্রুয়ের ভাঁজ মিলিয়ে মুন নিজ গালে হাত ছুঁয়ে সৈকতের ছোঁয়ানো হলুদ নিল, সেই হাতই ছোঁয়ালে সৈকতের গালে। চঞ্চল স্বরে বলল,
” ভালোবাসার মতো হলুদে ও তুমি আমি মিশে থাকব। ”

___________________

” কে যেন বলছিল, আমি বউয়ে নয় বন্ধুর হলুদে যাব। ”
বন্ধুদের কাছে আসতেই হেয়ালি করে বলল নাহিদ। সৈকত মাথা চুলকে বলল,
“বশীকরণের বশে আস্ত আমিটাই হারিয়ে গেছি আর তুই কথার প্রসঙ্গ টানছিস!”
এক সাগর মুগ্ধতা সৈকতের চোখেমুখে। তা দেখে খুশিতে গদগদ হয়ে অন্তর বলল,

“দুলাভাই, আপনি তো দেখি এক্কেবারে গেছেন!”

সৈকত ওর কাধ চাপড়ে বলল, ” গেছি কি আর আজ! সেই যে গেলাম, আর তো ফিরতেই পারলাম না। কী করি বলুন তো শালাবাবু? ”

” দুঃখিত দুলাভাই, একটা বন্ধুর বোনের অভাবে আমার বাথরুম ছাড়া যাওয়ার কোন জায়গা হয়নাই। তাই আপনাকে কোন টিপস দিতে পারছি না।”
ভারি দুঃখের সাথে বলল অন্তর। রুবাব এতক্ষণ অন্যদিকে ছিল। এবার এলো। সৈকত হেসে বলল,
“কী অবস্থা বন্ধু? গালে হলুদ লাগাইয়্যা তো এক্কেবারে সরিষা ক্ষেত হইয়্যা গেছস!”

রুবাব চোখ রাঙাল, “সরিষা ক্ষেত দেইখা মোমাছির মতো ভনভন করা শুরু করবি না। সম্পর্কে তোর সমন্ধি, পা ধরে সালাম কর।”

সৈকত আতঙ্কিত হয়ে নাহিদের দিকে তাকাল, ” কী সমন্ধ করালি? বিয়ার আগে মেয়ের বড় ভাই পায়ে পড়তে বলতেছে! বিয়ের পর না জানি কোথায় কোথায় পড়তে বলবে! বিয়ার আগে মেয়ের ভাইয়ের সম্পর্কে একটু খোঁজ খবর নিবি না!”

নাহিদ ভারি আফসোসের সাথে বলল,
“খোঁজ নেয়ার সময় তো দিছো, মামা? তার আগেই তো তুই কমলার মতো কানতে কানতে বনবাস চইল্যা যাইতেছিলি। খালি শাড়ি পিন্দা আঁচল ছাইডা ‘আমার বিয়া, বিয়ায়া দেন গো চাচা… কইরা গান গাওয়া বাদ রাখছস। বিয়ার জন্য যে পাগল হইছস তুই! খোঁজ নেয়ার সময় নিলে তুই বিয়া করুম কইয়া কইয়া পাগলাগারদে ভরতি হইতি। শিরোনাম হইতো, বিয়ের জন্য পাগল হয়ে পাগলাগারদে ভরতি হলেন এক বিসিএস ক্যান্ডিডেট। এমন ফানি কন্টেন্ট থেইক্যা বাঁচার জন্য তাত্তারি বিয়া দিছি। এক চামচ কম পাগল হইলে খোঁজ দিতে পারতাম। সময় ত দিলি না। এখন শালার কথায় পড় কোথায় পড়বি।”

রুবাব আর অন্তর মুখ চেপে হাসছে। সৈকত রাগ নিয়ে বলল, ” পার্সোনাল অ্যাটাকে যাইতাছস ক্যান! ”

রুবাব হতাশ স্বরে বলল, “তোর লগে থাইক্যা আমার বোনটাও পাগল হইয়্যা গেছে।”

অন্তর বলল, ” পাগলাগারদে হানিমুন প্যাকেজ করতে হবে যা দেখছি। ”

হাসিঠাট্টার মাঝে হলুদ ছড়াছড়ির পর্ব হলো। রুবাকে তিন বন্ধু মিলে হলুদ দিয়ে গোসল করাল। সবচেয়ে বেশি উৎফুল্ল দেখাল সৈকতকে। মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখল, বাড়ির হবু জামাইয়ের কান্ড। কেউ উৎফুল্ল বলল, কেউ নির্লজ্জ। তাতে কী ভাটা পড়েছে! নাহ, বরং আরও বেড়েছে খুশির জোয়ার।

__________________

সেদিন রাত থাকল সবাই রুবাবের বাড়িতে। তারপর দিন সবাই মিলে গেল সৈকতের গ্রামের বাড়িতে। সৈকত হলুদ হবে একবারে গ্রামীণ প্রথায়। উঠোনে প্যান্ডেল করা হয়েছে। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা হৈ-হুল্লোড় করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। উঠোনের একদিকে বড়ো বড়ো পাতিলে বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। বয়স্ক পুরুষ সমাজ চেয়ার পেতে সেখানে গল্প করছেন। স্টেজে বসে আছে সৈকত। চারপাশে গান বাজছে। কাজিন মহল আর সিফাত এলোমেলো নাচছে। সৈকত চুপচাপ দেখতেছে। চারপাশে চেয়ে বন্ধুদের খুঁজল। হুট করে একটা চিন্তা ডুকেছে মাথায়। সেই চিন্তাতেই মশগুল। নাহিদকে দেখা গেল। এসে বসল সৈকতের পাশে। সৈকত বলল,
“গেছস কই?”

” বস ফোন দিছিল।”

“তুই এখনো রিজাইন দেস নাই?”

” কাল ঢাকা গিয়ে পাঠাব। বস এতদিন দোষ ধইরা ঝেড়ে আসছে। যেই রিজাইনের কথা বললাম, ওমনি গুনের নদী বইতেছে।”
“এবার তবে এসিস্ট্যান্ট কমিশনার নাহিদকে দেখতে পাব আমরা?”
নাহিদ হাসল। সৈকত চারদিকে চেয়ে বলল,
” রুবাব আর অন্তর কই?”

“রুবাব ফোন কথা কইতেছে আর অন্তর অবশ্যই খাওয়ার দিকে।” বলে হেসে ফেলল নাহিদ। হাসল সৈকত ও। একটুপর বলল,
” ওই শা লা ডিপ্রেসড, খেয়াল করেছিস?”

নাহিদ বলল, ” কদিন দৌড়াদৌড়িতে ছিলাম তো। ওর সাথে ছিলাম না, খেয়াল হয়নাই।”

রুবাব এসে ফোঁড়ন কাটল, ” কীসের কথা বলতেছিস তোরা?”
“অন্তরের কথা, অয় যে ডিপ্রেসড খেয়াল করেছিস!”

রুবাব আতঙ্কিত হয়ে বলল, “কিয়া নিয়া?”

“বিসিএস ভাইভার রেজাল্ট নিয়া। উপরে ও খুব হ্যাপি দেখালেও, ভেতরে অন্তর খুব হতাশায় আছে। অনেকদিন আমরা সবাই অবসরে সময় কাটাইনাই যে এ জন্য খেয়াল করিস নাই।” দীর্ঘশ্বাস ফেলল সৈকত। নাহিদ আর রুবাবের চোয়ালে আঁধার নামল। নাহিদ বলল,
” এবার তো একবারে একা হয়ে যাবে। নাহিদ আর তুই বিয়ে করছিস। নিউ লাইফ নিয়ে ব্যস্ত থাকবি। সৈকত মুনকে নিয়ে নতুন ফ্ল্যাটে মুভ করছিস। আমি ও চাকরি নিয়া দৌড়াদৌড়ি। কোথায় শিফট হই কে জানে। আমরা সবাই এদিক ওদিক চলে গেলে অন্তর একা হয়ে যাবে। ”

রুবাব চিন্তিত মুখে বলল, ” এই শালারে ধইরা বিয়া করাই দি। বউ নিয়া ব্যস্ত হইয়্যা যাক।”

সৈকত কোন কথা বলল না। খানিকবাদে নাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
” নুহার বিয়ে নিয়ে প্ল্যান থাকলে তুই ভাবতে পারিস।”

নাহিদ বিস্মিত চোখে তাকাল। হাওয়ায় উড়িয়ে দিল, “বাজে বকিস না। নুহা আর অন্তর! অসম্ভব! ”

রুবাব সৈকতকে বলল, ” শা লা তুই কি মাইনসের বইন বিয়া করার আর করানোর চাকরি নিছস?”

সৈকত হেসে বলল, “আমি শুধু তোগো ঘটকালির দায়িত্ব নিছি। ফ্রিতে পাইয়্যা যাইতেছস ত এজন্য দাম দেস না। ”

“তো দাম হিসেবে কিডনি লোইয়্যা যা!”

নাহিদ গম্ভীরমুখে বলল, “তোরা মজা করতেছিস!”

এবার রুবাব বলল, ” মজা না। বন্ধুদের মাঝে আরেকটা বিয়া হইলে খারাপ হইব না। দ্যাখ, ছেলে কিন্তু আমাদের খারাপ না। খালি একটু পেটুক আর বকে বেশি । নইলে একশোতে একশো।”

“তোরা সিরিয়াস!” অবাক হয়ে বলল নাহিদ! সৈকত বলল, ” এবার কি তোরে আমাদের সিরিয়াসনেস বুঝানোর জন্য আইসিইউতে নিয়া যাইতে হইব?”

নাহিদ থম ধরে বসে রইল। কিছুক্ষণ কথাই বলল না। তখন এক প্লেট বিরিয়ানি হাতে অন্যদিকে আসতে দেখা গেল। নাহিদ দূর থেকে ওকে দেখে বলল,
“ওয় কি সিরিয়াস? নইলে দেখা যাইব, সব ঠিক হওয়ার পর বিয়ার দিন বলব, আজ ফুড ফেস্টিভ্যাল আছে। বিয়া করতে মন চাইতেছে না। বিয়া আরেকদিন করব, আগে খাইয়া আসি।”

সৈকত আর রুবাব হেসে ফেলল। সৈকত বলল,
“ওর দ্বারা অসম্ভব না। একবার মনে আছে? আমাদের সিটি হচ্ছিল, পরীক্ষার মাঝে অন্তর বলল, আমার ক্ষিধা লাগছে, পরীক্ষা দিমুনা। খাইয়্যা আসি। সত্যিই বেরিয়ে গেছিল?”

আবার হেসে ফেলল সবাই। অন্তর খেতে খেতে স্টেজের কাছে গেল। “কী কইতাছস তোরা?”

বন্ধুরা চাপা হাসল। কেউ বলল। অন্তর ও টের পেল না কিছু। কিভাবে বুঝবে, কেউ কখনো শুনেছে বিয়ের বর স্টেজে বসে এক অগোছালো বন্ধুর জীবন গুছিয়ে দেয়ার চিন্তায় মত্ত থাকে।
বন্ধুমহলে একজন থাকে সে সুচিন্তক। সবার দিকে খেয়াল রাখে। সেই মানুষটা সৈকত। কেউ যা খেয়াল করেনি, তা ও খেয়াল রেখেছে। নিজের জীবন সাজানোর সাথে সাথে বন্ধুর জীবন ও সাজিয়ে দিতে চাইছে। ওরা সুখে থাকবে, ওর বন্ধু একাকীত্বে ঘেটে যাবে, এ আদৌ হতে দেয়া যায়!

____________

আজ রুবাব-সেঁজুতির বিয়ে। বহুপাক্ষিকতার দিন। বুক কাঁপছে রুবাবের। নার্ভাস লাগছে। নাহিদ অন্তর পাশে রইল সবসময়। সৈকতকে নিল মাঝপথ থেকে। সৈকত রুবাবের মুখ দেখে ভ্রু কুঁচকাল,
“এরাম কইরা আছস ক্যান?”

রুবাব নড়েচড়ে বসল। অন্তর বলল, ” এমন মোচড়ামুচড়ি করতেছিস ক্যান? টয়লেটে যাবি? গেলে এহনই যাইতে হইব। হলে গিয়ে শেরওয়ানি পরে বর টয়লেটে যাচ্ছে, এমন সিন দেখতে ফানি লাগবো। গাড়ি থামাব?”

রুবাব হতাশ চোখে তাকাল অন্তরের দিকে। বলল, “মজা নিবি না শা লা! এমনিতেই নার্ভাস লাগতেছে।”

“যে ভাব ধরতেছিস, যেন তুই জীবনে প্রথমবার গায়ে তেল মাইখ্যা শিঁধ কা টতে যাচ্ছিস। চিল ব্রো! তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস। চিল!”

নাহিদ বলল, “ফার্স্টটাইম বিয়ে করতেছিস তো, এইজন্য নার্ভাস লাগছে। সেকেন্ড টাইম ঠিক হইয়্যা যাইব।”

সেকেন্ড টাইম! রুবাব অবাক হয়ে বলল, “আমি কি বিয়ার নামতে পড়তে যাইতেছি, বিয়া একে এক, বিয়া দুগনা দুই! সেকেন্ড টাইম আইব কইত্তে! ”

“শালা কোথায় একটু সান্ত্বনা দিবি, তা না আরও মজা নিতেছস? ” রুবাব রেগে গেল।

সৈকত পিঠ চাপড়াল শুধরে দিল, ” আমি না, তুই আমার শালা। তোর শা লা সাদাত ভাই। যারে তুই আইজকা পা ধরে সালাম করে মিষ্টি খাওয়াইবি।”

রুবাবের চেহারা বদলে গেল, “কোন ভেজাল করব না তো শালা! আমার ক্যান জানি ভয় লাগতেছে।”

হেয়ালি ছেড়ে বন্ধুরা এবার সিরিয়াস হলো। দৃঢ় স্বরে বলল, “আমরা আছি না। ”

অন্তর বলল, ” মঙ্গল আর মিষ্টির প্যাকেট দুইডাই রেডি। কিছু হইলেই নাহিদের জাদুর ঠ্যাং দিয়া ছুঁড়ে মারব। নাহিদ, তোর ঠ্যাং এক্টিভ রাখ।”

সেন্টারে গিয়ে দেখল সেঁজুতি আসেনি তখনো। রুবাব স্টেজে গিয়ে বসল। সৈকত ইতিউতি করে মুনকে খুঁজল। মেয়েটা একবারে উধাও। ফোন দিল। মুন রিসিভ করতেই সৈকত বলল,
” চন্দ্রকথা তুমি কোথায়? একবার দেখা তো দাও!”

মুন চাপা হেসে বলল, ” দেখা দেয়া যাবে না। কাল বিয়ে । আজ না কি দেখাসাক্ষাৎ করা ঠিক না। ”

” মানে কী!”

“মানে হলো, আমার মা খালারা মিলে ১৪৪ধারা জারি করেছে, আজ তোমার সাথে আমার দেখা হওয়া যাবে না। ”
” আজব কথা! আমার বউ আমি দেখব, কার কী? কোথায় আছো বলো। আমি আসছি।” রেগে গেল সৈকত। মুন হেসে কুটিকুটি।

“আমি খোঁজ দিব না। পারলে নিজে খুঁজে বের করে নিয়ে যাও।”

মুন চাপা হেসে বসল। এখন দেখার পালা তার মা খালা ফুপি সবার মাঝ থেকে সৈকত কিভাবে নিয়ে যায় ওকে। কিছুক্ষণ পরেই এদিকে আসতে দেখা গেল। মুন লুকাল না। বরং হাসল। সৈকত সোজা এসে দাঁড়াল মুনের সামনে। কাউকে খেয়াল করেনি এমন ভান করে চঞ্চল স্বরে বলল,
” আমি তোমাকে খুঁজে হয়রান হচ্ছি, আর তুমি এখানে বসে আছো?”

মুন চোখ বড় বড় চেয়ে আছে। তারিনা চমকে বললেন,
“আরে বাবা তুমি! ভালো আছো?”

সৈকত এমন ভান করল, যেন সে দেখেই নি উনাকে। অবাক হয়ে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। ”

থেমে অতি বিনয়ের সাথে বলল, “স্যরি মা, আমি আপনাকে খেয়াল করিনি। ভালো আছেন? কোন অসুবিধে হচ্ছে না তো?”

অমায়িক কথায় গলে গেলেন তারিনা। হেসে বললেন,
“না কোন সমস্যা হচ্ছে না। তোমার কিছু লাগবে না কি?”

“ফটোশুটের জন্য ডাক পড়েছে। আমি কি মুনকে নিয়ে যেতে পারি মা?” অত্যন্ত শান্ত স্বরে শ্বাশুড়ি কাছে অনুমতি চাইল সৈকত। আশপাশের মুরুব্বি মহল থ। মুন চোখমুখ খিচে রইল লজ্জায়।
মুনের খালা বললেন,
” বিয়ের আগে এত ঘুরাফিরা তো ঠিক না। ”

” আমার নামের বালা, রিং, সব পরে আর বেঠিক কিছু আছে বলে মনে হয় না। কাল যেহেতু নিয়েই যাব, আজ যেয়ে খুব একটা অসুবিধা হবে বলে মনে হয়না। ” লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে বলে দিল সৈকত। মুন গাল লাল করে তাকিয়ে আছে। কী লজ্জা! সবাই কিভাবে হাসছে! তারিনা হেসে বললেন,
“যাও।”

তড়িৎ মুনের হাত ধরল সৈকত। বলল, “আসো।”

যেতে যেতে শ্বাশুড়িকে বলল, “থ্যাঙ্কিউ মা।”

তারিনা হেসে ফেললেন। বিয়ে ঠিক হবার পর কত নয়া রূপ সামনে আসছে। তিনি অবাক হচ্ছেন, মজা পাচ্ছেন।

কয়েক কদম বাড়িয়েই মুন সৈকতের গায়ে চিমটি কেটে বলল, “এভাবে কেউ বলে! নির্লজ্জ!”

গা ঢলতে ঢলতে সৈকত বলল, “কোলে তুলে আনিনি যে শোকর করো।”

” তুমি আমাকে কোলে নেয়ার কথা ভাবছিলে!” অবাক হয়ে বলল মুন। সৈকত ঠোঁট কামড়ে হাসল,
” এমন হুরের মতো সামনে এলে শুধু কোলে না আরও অনেক কিছু ভাবি আমি। ”

মুনের কান গরম হয়ে গেল। কী অসভ্য!
________________

চলবে…….

#অলীকডোরে চন্দকথা। (পর্ব-৪১)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

(দ্বিতীয় শেষাংশ।)
বিয়ের মহল। উচ্ছ্বসিত আনন্দ মহল। কনেপক্ষের মেয়েরা চুপিসারে আলাপ করছে, জুতো চুরির ব্যাপারে। কে জুতো নিয়ে পালাবে, কোথায় লুকাবে, কত পাওনা দাবি করবে চাপা গুঞ্জনে এমন পরিকল্পনা করছে। সৈকত, মুন, নাহিদ, রুবাবের সাথে ছবি তুলছে। বন্ধুদের গ্রুপ ছবি তোলা হয়েছে। এবার কাপল, সিঙ্গেল তোলা হচ্ছে। মুন স্টেজে উঠবার পর অন্তর নেমে গেল স্টেজ থেকে।
হাতে ক্যামরা তার। বেশ ভালো ছবি তুলে। শখ থেকেই কেনা ক্যামরা। স্টেজ থেকে নেমে নিজের ক্যামরায় কয়েকটা ছবি তুলল। ছবি তোলা শেষে ওর চোখে পড়ল বছর তিনেকের এক পুতুল কন্যা। ফ্লাপি ফ্রক পরে টুকটুক করে হেঁটে বেড়াচ্ছে। ভারি সুন্দর ঠেকল অন্তরের। ক্যামরায় ফোকাস করে একটা ছবি তুলল। বাচ্চাটার স্থান পরিবর্তন হলো, দৌড়ে গেল অন্যদিকে। সেদিকে ক্যামরার ফোকাস করতেই হঠাৎ সুন্দর এক মানবী ধরা পরা ক্যামরায়। পিচ কালার শাড়িতে অপরূপার প্রাণখোলা হাসিতে চোখ আটকাল। এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল অন্তর। ছবি ক্লিক হয়ে গেল। মেয়েটার এদিকে খেয়াল নেই। সে সমবয়সী এক মেয়ের সাথে গল্প করছে। গল্পের মাঝেই হেসে যাচ্ছে। সেই হাসি তীর হয়ে বিঁধল অন্তরের বুকে। মুগ্ধতায় স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। পরপরেই নিজ মনে বলল,
” ইম্পসিবল!”

___________________

চারদিকে হৈচৈ পড়েছে। বউ এসেছে, বউ এসেছে। পার্লার থেকে ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গেল সেঁজুতির। বউ আগমনের গুঞ্জন কানে আসতেই উত্তেজনায় কেঁপে উঠল রুবাবের বুক। স্থির চোখে চেয়ে রইল হলের দরজার দিকে। অফ হোয়াইট লেহেঙ্গার শুভ্রতায় অপ্সরা সেজে বধূর আগমন ঘটল খানিক বাদে। একবারে হালকা সাজ। কী স্নিগ্ধ লাগছে! রুবাব চোখ ফেরাতে পারল না। স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হয়ে রইল। এই দিন, এই সাজের জন্য ওদের কত অপেক্ষা। কত রাত জাগা গল্প, বিরহ। সব আজ সফল। এই তো তার জন্য বউ সেজে এসেছে সেঁজুতি। রুবাব তাকিয়ে থাকার মাঝে হেসে ফেলল। উঠে এগিয়ে গেল বধূর দিকে। সেঁজুতিকে ওর এক কাজিন ধরে নিয়ে আসছিল। রুবাব স্টেজের সিড়ির কাছে গিয়ে হাত বাড়াল। সেঁজুতি চাইল ওর দিকে। প্রেমিকের পাগল করা চাহনি দেখে হেসে হাত বাড়াল। রুবাব এত শক্ত করে হাত ধরল, মনে হচ্ছিল ছাড়লেই সেঁজুতি হারিয়ে যাবে। ডিভানের দিকে পা বাড়িয়ে রুবাব ধীর স্বরে বলল,
” সুন্দর লাগছে তো আমার বউটাকে! ”

কাজি এসে বসেছেন। বিয়ে পড়াবেন। সাদাত গম্ভীর মুখে এলো। ওর কোমরে তখনো রিভলভার রাখা। শত্রুপক্ষ কম নেই। কে কোনদিকে হামলা করে বলা যায়না। রিভলবারটা অন্তরের চোখে পড়তেই ডিভানের পিছনে রুবাবের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
” রুবাব, দ্যাখ তোর শা লা মিষ্টির বদলে পিস্তল নিয়া আইছে। তুই মঙ্গলের প্ল্যান ক্যান্সেল করে ভুল করছিস। এখনো সময় আছে, জাদুর ঠ্যাংগের সঠিক ব্যবহার কর।”

রুবাব দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “দোয়া ইউনুস পড়, খালি ভালোয় ভালোয় বিয়াটা হইয়্যা যাক। তারপর রিভলভারের জন্য দুই মিষ্টি বেশি খাওয়ামু।”

নাহিদ একটা টিস্যু ভাঁজ করে এগিয়ে দিল রুবাবের দিকে, ” বিয়া হইতাছে তোর। বকবক না করে একটু সরম কর। ”

কাজি বিয়ে পড়া শুরু করলেন। সেঁজুতি থম ধরে বসে রইল। কবুল বলার সময় কাঁদল খুব। রুবাব এক সেকেন্ড ও সময় নেয়নি। কবুল বলতে বলার সাথে সাথে তিনবার কবুল বলে ফেলেছে। ওর কবুল বলার ধরণ দেখে সবাই হেসে ফেলল। রুবাব অবিশ্বাস্য সুরে বলল,
“সেঁজুতি এখন আমার বউ হয়ে গেছে! সত্যিই!”

নাহিদ হেসে কাঁধ চাপড়াল, “সত্যিই!”

নাহিদ মিষ্টি নিয়ে এলো। অন্তর সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণের ভান করল। সবার আগে সাদাতকে খাওয়াল সৈকত। তারপর রুবাবকে গিয়ে বলল,
“ইদ মোবারক, বন্ধু। এবার দমটা ছাড়।”

_______________

কনভেনশন হলের একদিকে বুফেতে খাবারের আয়োজন হয়েছে। সারি সারি খাবার রাখা। বিয়ের পর অন্তর সেদিকে এলো। ভীষণ ক্ষিধে পেয়েছে। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। অন্তর প্লেট ভরতি খাবার নিয়ে বসল। গপাগপ যা পারছে তা গিলছে। মিষ্টি, , টক, ফুচকা, ড্রিংক, ডেজার্ট। ওকে হা-ভাতের মতো খেতে দেখে নাহিদ এসে বলল,
” এ্যাই, তোরে কী সাদাত ভাইয়ের পেটুক জ্বিনে আছর করছে। এমন কইরা খাইতাছস ক্যান?”

অন্তর খেতে খেতে রেগে বলল, “বোইন ত দিবি না, অন্তত খাইতে দে। নজর দিতাছস ক্যান?”

নাহিদ চোখ রাঙাল, ” কথায় কথায় বোন টানবি, দেয়ার হইলেও দিব না। ”

অন্তর হেয়ালি করে বলল, ” না টানলে দিবি!”

নাহিদ বলল, “এমন হা-ভাতের মতো খাইতে দেখলে তোর কাছে কোন ভাই তার বোন বিয়া দিব? মানুষ ভয়ে থাকবে, বিয়ার পর খানা না পাইলে তুই না শ্বশুরের বাড়ি ঘর, লেপ, কম্বল, খাওয়া শুরু করিস। বিয়া করবার আগে একটু শুধরাই যা, মামা।”

অন্তর নিজ মনে খেয়ে গেল। নাহিদ ওকে পরখ করে দেখল, অন্তরের স্বাস্থ্য আগের থেকে কিছু ভেঙে গেছে। মেদ ভুড়ি ও নেই। শরীরের সুগঠন আছে। দেখতে খারাপ লাগে না। ঠিকঠাক। প্রশ্ন হলো, এত খাওয়া যাচ্ছে কোথায়? সে ভ্রু কুঁচকে বন্ধুর পানে চাইল।বলল,

” আর খাইস না। এবার পেট ব্লাস্ট হবে। শিরোনাম হবে, ঢাকায় বন্ধুর বিয়েতে অতিরিক্ত খেয়ে পেট ব্লাস্ট হয়ে আহত অন্তর নামের এক যুবক। ”

“তোর তো ঠ্যাংয়ের মেলা জোর। আমার পেট ব্লাস্ট হইতে দেখলে তোর জাদুর ঠ্যাং দিয়া উইড়া মঙ্গলে যাইস গা। ”

ওদের পাশে ফুচকার স্টল। নাহিদ একটা ফুচকা নিল। অন্তরের প্লেটে টক ছিল। একটু নিতে গিয়ে অনেকটা পড়ে গেল ফুচকায়। ফেলে না দিয়ে সেই টক সমেতই মুখে নিল। অন্তর সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল,
“এত টক খাইতেছস! সুখবর দিবি না কি!”

সন্দেহের চোখে তাকাল নাহিদের পেটে। নাহিদ বিষম খেল। নাকে মুখে উঠে কাশতে লাগল। অন্তর পিঠ ঢলার নাম করে দুমদুম কিল দিতে লাগল। আর বলল,
“ছিঃ! নাহিদ ছিঃ! বিয়ের আগেই এসব! আমি তোকে ভালো ভাবছিলাম। ”

নাহিদ কথা বাড়াল না। ওর মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেছে। ঠাট্টা আসছে না। সৈকত এলো তখন। নাহিদের মলিন মুখ দেখে বলল,
“কাহিনি কী?”
“তুই ঠিক বলেছিস, এই ব্যাটা ডিপ্রেসড। ”

” তোর কাছে স্বীকার করছে?”

” জিমে না যাইয়্যা ফিট হইয়্যা গেছে। ” হেয়ালি করল নাহিদ। অথচ ওর মন বড্ড বিষাদ। কেন যে অন্তরের বিসিএসটা হলো না!

সৈকত শান্ত স্বরে বলল,
“আমি কি কথা বলব?”

নাহিদ অনেকটা সময় নিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “বল।”

নাহিদ চলে গেল অন্যদিকে। অন্তর আর সৈকত রইল। অতিব ধীরে বলায় এতক্ষণের আলাপ শুনেনি অন্তর। সৈকতকে দেখে অন্তর মুখ চেপে বলল, ” তুই ও নাহিদের মত সুখবরের টক খাবি না কি!”

“না, আমি এখনো হালাল হইনাই। তুই খা।”

অন্তর খাওয়ায় মিন দিল। সৈকত ওর দিকে তাকিয়ে হুট করে ডাকল,
“অন্তর?”
“ক?”
“তুই কি সিরিয়াস?”
” কী ব্যাপারে? নাহিদের সুখবর কি না এই ব্যাপারে?”

অন্তর এখনো হেয়ালি করছে। সৈকত ভরাট স্বরে বলল,
“নাহিদরে শা লা বানানোর ব্যাপারে? ”

অন্তরের চোয়ালে বিস্ময় দেখা গেল। হকচকিয়ে বলল,
“মানে কী?”

” ডু ইউ হ্যাভ এ্যানি ফিলিংস ফর নুহা?”

সৈকতের প্রশ্নে বিষম খেল অন্তর। কাশতে লাগল। সৈকত পানি এনে দিয়ে বলল,
” ফিলিংস থাকলে বলে দে। নাহিদকে মানানোর দায়িত্ব আমার।”

কাশি থেমে গেল। অন্তর হেয়ালি করে বলল,
“আরে আমি ত মজা করি বলি ওসব।”

” পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করছিস। সেলারিও ভালো, সিরিয়াল ও আছে। এবার বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাব। নাহিদের বোনটা বেশ ভালো। মুনের মতো তারে তুই বোনটোন ও ভাবিস না। সো অন্যকিছু ভাবতেই পারিস। ”

সৈকতের চোখমুখ গম্ভীর। বেশি সিরিয়াস বুঝাই যাচ্ছে। ওর সিরিয়াসনেস দেখে খাদ্যপ্রাণ অন্তরের মুখে খাবার উঠল না। স্তব্ধ হয়ে গেল। সৈকত হেয়ালি করে বলল,

“তাড়াতাড়ি বিয়ে কর, তুই আমি রুবাব মিলে বালি হানিমুন ট্রিপ দিব। ”

অন্তর বিভ্রান্ত স্বরে বলল,
“তুই কি সিরিয়াস?”

“আমি রুবাব দুজনেই সিরিয়াস। তুই ও সিরিয়াস হ।”

সবসময় হেয়ালিপনা করা ছেলেটার মুখ গম্ভীর হলো। ওর ঠিক কী বলা উচিত, কী ভাবা উচিত বুঝে উঠতে পারল না। নাহিদের বোনের কথা ভেবে নয়, সে এমনিই ঠাট্টা করে। সেটা যে বন্ধুরা ধরে বসবে তা অকল্পনীয় ছিল।

___________________

সন্ধেবেলা বিয়ে হয়েছে। উপহার, বিদায় সহ যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দ’শটা বাজল। শেখবাড়ির দরজায় গাড়ি থামাল। সেঁজুতিকে ধরে নামাল মুন। রুবাব গাড়ি থেকে নেমে নাহিদ আর সৈকতকে বিদায় দিচ্ছে। কাল বিয়ে বলে আজ বাড়ি আসবে না সৈকত। তার এখন বাড়ি ফেরার পালা। সৈকতের সাথে নাহিদ আর তার পরিবার যাচ্ছে। বরপক্ষ সে । অন্তর কনে পক্ষ হিসেবে এ বাড়িতে থাকবে।

শেখ বাড়ির রীতি আছে নতুন বউ হেঁটে ভেতরে আসে না। তাকে শ্বশুরপক্ষের পুরুষ কেউ কোলে করে আনে। কে যেন হাসিঠাট্টা করে কোলে নিচ্ছিল সেঁজুতিকে। কথা থামিয়ে তেড়ে এলো রুবাব। সেঁজুতিকে কোলে তুলে বলল,
“আমার বউ আমি কোলে নিব। ”

সেঁজুতি বিদায়বেলা কেঁদেকেটে অস্থির। রুবাবের কান্ডে সেই অস্থিরতা উবে গেল। লজ্জায় গাল লাল হলো। চারদিকে হাসির রোল পড়ল। মুনের খালা বললেন,
“তারিনা, তোর ছেলেটা তো এখনই বউপাগল হয়ে গেছে। কত দরদ!”

রুবাব স্পষ্ট গলায় বলল, ” কত কষ্টের পর শালারে ম্যানেজ করে বিয়া করছি। দরদ না থামলে এমনি এমনি! আমার বউ, আমারই তো দরদ থাকবে। ”

সবাই হাসাহাসি করছে। রুবাব দায়সারা। এদিকে সেঁজুতি লজ্জায় মরিমরি অবস্থা। সেঁজুতি গলা জড়িয়ে চোখ মুখ খিঁচে রইল। এই ছেলের মুখে লাগাম নেই। এত চঞ্চল কেন? রুবাব বউকে কোলে তুলে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। হলরুমে না থেমে সোজা সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। তারিনা এসে চেঁচালেন,
” ওকে নিচ্ছিস কেন? এখনো কত নিয়ম বাকি!

রুবাব বিরক্তির সাথে বলল, “আবার কী! ”

“ওরে কেউ উপহার দেয়, মিষ্টিমুখ করায়নি। হলরুমে বসা।” তারিনা আদেশ দিলেন। রুবাব বউকে সোফায় বসিয়ে বিরক্তমাখা স্বরে বলল,
“দশমিনিটের মধ্যে শেষ করো। আমি ওরে নিয়া রুমে যাব।”

রুবাবের অবস্থা থেকে আত্মীয় স্বজন হেসে খু ন। এমন পাগল জামাই তারা এর আগে দেখেন নি। সেঁজুতিকে টিপ্পনী কা ট ছে সবাই। সেঁজুতি পারলে লজ্জায় কেঁদে দেয়।

সবার অবস্থা দেখে অন্তর এগিয়ে এলো বন্ধুর কাছে।
” তোরই বউ। সারাজীবন পাশে পাবি। কেউ নিয়ে যাচ্ছেনা। এত অধৈর্য হচ্ছিস ক্যান?”

রুবাব ক্ষ্যাপা স্বরে বলল,
“বিয়া করসনাই তো, জ্বালা বুঝবি না। ”

উপহার আর পান চিনির পর্ব শুরু হয়েছে, কিন্তু শেষ হবার নাম নেই। রুবাবের দাদার পক্ষের মানুষ গ্রামে থাকে। ফুফু দাদীরা বিভিন্ন গ্রামীণ প্রথা মানেন। কড়া আদেশে সেসবই পালন করছেন। তারিনাও নিরুপায় তাদের কাছে।
দশ মিনিটের জায়গায় ঘন্টা পেরিয়ে গেল, এখনো সবাই আসছে, বসছে ছবি তুলছে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, রিং পরাচ্ছে, গলায় চেইন পরিয়ে দিচ্ছে। রুবাব দেখতে দেখতেই ক্লান্ত, না জানি সেঁজুতি কিভাবে সহ্য করছে। চোখমুখে রাগ দেখা গেল ওর। গুমোট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল একদিকে। অবস্থা বেগতিক দেখে অন্তর মুনকে বলল,
” ৯ নম্বর সংকেত চলতেছে মুন। যে কোন সময় ঘূর্ণিঝড় এসে চড়াও হবে। তাড়াতাড়ি ভাবিকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাও। ”

মুন ভাইয়ের দিকে তাকাল তড়িৎ। তারপর ভাবির দিকে। সেঁজুতির মুখ দেখে তার ভয় হলো, ক্লান্তিতে মুখখানা এতটুকু হয়ে গেছে। কিছু বলতে পারছেনা। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মিষ্টি কেক খেতে চাইছেনা সে, তবুও সবাই জোর করে খাওয়াচ্ছে। মুরুব্বিমহল বুঝতে চাইছেনা ওকে। এসব মুনকে কালকে ফেস করতে হবে! ভাবতেই গায়ে কা টা দিল। তার মুখখানা দেখে অন্তর বলল,
” তোমাকে এই মেঘা সিরিয়ালে পড়তে হবে না। কাল তোমার দুইমাত্র ভাই যাবে তোমার সাথে। তুমি শুধু একটা কথা বলবে, আমার উপহার আমার ভাইয়ের কাছে জমা দিন। বিনিময়ে ফিফটি পার্সেন্ট কমিশন তোমার। চিল!”

অন্তরের কথায় হেয়ালি থাকলেও সুরে স্নেহ টের পেল মুন। ওকে বুঝিয়ে দিল, এই কঠিন মুহুর্তে আমি তোমার সাথে থাকব। মুন জানে এটা হেয়ালি নয়, সত্যিই অন্তর খেয়াল রাখবে। এমনকি সৈকতকেও সাবধান করবে। মুনের ভয়টা কেটে গেল। প্রসন্ন হাসল সে। বলল,
” আমার ভাগের কেক মিষ্টি ও যদি খেতে নিতে পারেন তবে হান্ড্রেড পার্সেন্টই আপনার।”

অন্তর খুশি হয়ে বলল, ” এবার তো আমি লোভে পড়ে যাচ্ছি। মাসে এমন দুই একটা বিয়ে পেলে আর চাকরি করা লাগতো না। প্রফেশনাল ভাই হয়ে যাব না কি!”

মুন হেসে সেঁজুতির কাছে গেল। মাকে বলল, “ভাবিকে এবার ছাড়ো। সারাদিন অনেক ধকল গেছে। রেস্ট নিক। ”

সবার অসন্তোষ পরোয়া না করেই বের করে আনল সেঁজুতিকে। ভাইয়ের কাছে নিয়ে বলল,
” ধরো ভাইয়া, তোমার বউকে তোমার কাছে জমা দিলাম।”

রুবাব ফোঁসফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। শান্ত হবার বদলে আরও অশান্ত হয়ে গেল। হনহন করে উঠে গেল উপরে। সেঁজুতি অবাক হয়ে তাকাল। মুন হেসে বলল,
” ভাইয়ার এসব রীতিনীতি পছন্দ না। এ জন্য আমাদের গ্রামের বাড়ির কোন আত্মীয়ের বিয়েতেও যায়নি কোনদিন। ”

মুন ভাই বৌকে দোতলায় নিল। ভাইয়ের রুমের সামনে নিয়ে বলল, “আমার জার্ণি এতটুকুই ভাবি। তোমার বাদ বাকি জার্ণি ভাইয়ার সাথে। আমি দোতলাতেই আছি। কিছু লাগলে ফোন দিও। ”

পরপরই ভাইকে ডেকে বলল, ” ভাইয়া ভাবিকে বুঝে নাও। আমি গেলাম।”

মুন চলে গেল। সেঁজুতি চারদিক চাইল চোখ মেলে। ফুলে ফুলে সাজিয়েছে বেডটাকে। এক ঝাঁক লজ্জা এসে হানা দিল। রুবাব ঘরে নেই। সেঁজুতি ঘরের মাঝেই দাঁড়িয়ে রইল। খানিক বাদেই কেউ একজন ঝড়ের বেগে এসে টেনে নিল কাছে। ঘন উৎফুল্ল হয়ে বলল,
“আমি তোমাকে পেয়ে গেছি সেঁজুতি! ”

সেঁজুতি অবাক হয়ে চাইল, এ ছেলে না সবে রেগে ছিল! অথচ এখন মুখে খুশি ছাড়া কিচ্ছুটি নেই। কী খুশি দেখাচ্ছে ওকে। সেঁজুতি ছলছল চেয়ে হেসে বলল,
“হ্যাঁ পেয়ে গেছো।”

রুবাব ওর কপালে গাঢ় পরশ দিল। তারপর অধরে। আবেশে রইল অনেকক্ষণ। প্রেয়সীর মাথাটা বুকে টেনে নিরবতায় গা ঢাকল। শক্ত করে জড়িয়ে বলল,
” আজ থেকে তুমি আমার, শুধুই আমার। আমার সাথেই থাকবে। কোথাও যাবে না।”

রুবাবের চোখেমুখে পাগলামো। ছেলেটা মেয়েটাকে পেতে কম কষ্ট করেনি। কত সাধনার পর পেল, অবশেষে। রুবাবের বিশ্বাস হচ্ছেনা যেন। সব স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে। সাধারণত, প্রেমে পূর্ণতা পেলে মেয়েরা পাগলামো করে, এখানে পাগলামো করছে ছেলে। সেঁজুতি তো কাঁদছে নিশ্চুপে। কত মার খেল এই ছেলের জন্য। দিনের পর দিন বন্দী থেকেছে। একটুখানি দেখার জন্য কথা বলার জন্য ছটফট করেছে। কত রাত কাটিয়েছে কেঁদে। অবশেষে পেল তাকে! প্রিয় মানুষটাকে পাবার খুশিতে বিগলিত হলো দুজনেই। ঘোরে গেল দুজনে। মুগ্ধতা, স্তব্ধতা, ভালোবাসায় ঢেউ তুলল মনে ঘরে।

_____________________

” বিয়ে” দুই অক্ষরের শব্দ। অথচ এর মাঝে লুকিয়ে আছে, জীবন, হাজারো স্বপ্ন, সুখ ভালোবাসা, নতুন এক পথ চলা। সেই সুখটা দিগুণ হয় যখন প্রিয় মানুষটাকে পথ চলার সঙ্গী হিসেবে চিরকালের জন্য পাওয়া যায়। এক বুক স্বপ্ন পূরণ হয়। সেই সুখ, সেই স্বপ্ন পূরণের আনন্দে মেতেছে দুই প্রান্তে থাকা কপোত-কপোতী। রাতভর ঘুম হয়নি, সকালের অপেক্ষায়। ভোরের আলো নামতেই মুনের বুকটা কেঁপে উঠল, আজই বরবেশে সৈকত আসবে। নিয়ে যাবে ওকে সঙ্গী করে, বধূ করে। আর তো মাত্র কয়েক ঘন্টা। দুপুর গড়ালেই হাজির হবে। চোখমুখে চাপা উৎকন্ঠা দেখা গেল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। পরক্ষণেই মন খারাপ হলো, আজ বাবা-মাকে ছেড়ে চলে যাবে। সেভাবে আর এখানে থাকা হবে না। এই ঘর, এই পরিবার সবাইকে ছাড়তে হবে। রাত পোহালেই দেখা পাব না মাকে। মেয়েদের জীবন চক্র এত অদ্ভুত কেন? দীর্ঘশ্বাস ফেলল মুন। হুট করেই কান্না পেল। টুপ করে ক’ফোটা জল গড়াল চোখ থেকে।

একটু বেলা গড়াতেই শেখ বাড়িতে হৈচৈ বেঁধে গেল। আজ একটা বিয়ে, একটা বৌ-ভাত। সৈকত গ্রাম থেকে বরযাত্রী নিয়ে আসবে, সেঁজুতির বাবার পক্ষ থেকে অতিথিরা আসবে বৌভাতে। হাজার মানুষ জমা হবে। কত কাজ! অনুষ্ঠান সন্ধেবেলা হবার কথা ছিল, কিন্তু সৈকতরা বৌ নিয়ে গ্রামে ফিরবে বলে দুপুরবেলা করা হচ্ছে। সন্ধ্যেবেলা হলে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যেত। পথঘাট নিরাপদ না।

মুন ঠিকঠাকভাবে দুঃখ ও প্রকাশ করতে পারল না। তার আগেই পার্লারের মেয়েরা এসে হাজির। দুটো ব্রাইড। সেঁজুতিকে মুনের ঘরে আনা হয়েছে। সদ্যস্নাত সেঁজুতি বেগুনি শাড়ি পরেছে। কী স্নিগ্ধ লাগছে ওকে! মুনে সুখী সুখী ভাব ফুটে উঠেছে। মুন বলল,
“ভাবি তোমাকে কিউট লাগছে তো!”

সেঁজুতি একটু হাসল। বলল, “থ্যাঙ্কিউ। ”

গলাটা জ্বলছে ভীষণ। সেঁজুতি গলায় হাত দিয়ে মুখ কুঁচকাল। দেখে মুন মুখ চেপে হেসে বলল,
” আমার কাছে ফুল কাভারেজ ফাউন্ডেশন আছে, দিব না কি ভাবি!”

সেঁজুতি প্রথমে লজ্জা পেল। লাজুক হাসল। পরক্ষণেই মুখ চেপে হেসে বলল,
” রাখো, কাল তোমার কাজে দিবে।”

এবার মুনের হাসি থেমে গেল। আকস্মিক খু খু করে কেশে উঠল। লজ্জায় গাল লাল হলো। সেঁজুতি হাসি বাড়িয়ে বলল,
“ওমা ননদিনী দেখি লজ্জা পাচ্ছে। এত লজ্জা পেলে তো ফাউন্ডেশন দুটো লাগবে।”

বিউটিশিয়ানরা মুখ চেপে হাসছে। মুন লজ্জায় কাঁচমাচু করে উঠল। সেঁজুতি শব্দ করে হেসে উঠল। ঠিক তখনই ওকে ডাকতে ডাকতে এদিকে এলো রুবাব।
“সেঁজুতি? এদিকে আসো তো একটু।”

সেঁজুতি চমকে গেল। মুখে নেমে এলো লাজুকলতা। রুবাবের সামনে যাবে না ও। তাই অসাড় হয়ে বসে রইল। রুম থেকে উত্তর দিল, ” আমি সাজতে বসেছি। শেষ করে আসছি।”

মুন ডাকল, “ভাইয়া, ভেতরে আসো!”

রুবাব এলো না। সেঁজুতি ফের ডাকতে লাগল। মুন বলল, ” ভাইয়ার বোধহয় তোমাকে লাগবে। যাও ভাবি!”

সেঁজুতি মুখখানা লাল করে এগিয়ে গেল। কদম বাড়াতেই তারিনার গলার আওয়াজ কানে এলো।
“গলায় হাত দিয়ে এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? গলায় কী হইছে?”

রুবাব চোখমুখ লাল করে কেশে উঠল। সেঁজুতি গিয়ে দেখল, রুবাব ইতস্ততভাবে মুনের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। গলায় হাত। সেঁজুতির হাত ও তখন গলায়। তারিনা ভ্রু কুঁচকালেন। কিছু বলতে যাবেন তার আগেই রুবাব বলল,
“সাদাত ভাই ফোন দিয়েছে, সেঁজুতির সাথে কথা বলতে চাইছেন। তাই ডাকতে এসেছি।”

বলে হড়বড় করে রুমের দিকে ফিরে গেল। তারিনা কী বুঝলেন কে জানে। ফিরতি পথ ধরে বললেন, ” সেঁজুতি যাও ভাইয়ের সাথে কথা বলে এসো।”

____________________

সকাল গড়িয়ে দুপুরে নেমেছে বেলা। শেখ বাড়ির উঠোনে ভোজনের আয়োজন করা হয়েছে একদিকে খোলা আকাশের নিচে দুটো স্টেজ। একটা বিয়ের অন্যটা রিসিপশনের ফটো জোন। মানুষ দলে দলে আসতে শুরু করেছে। অন্তর দায়িত্ববান ছেলের মতো দেখাশোনা করছে। রুবাব ও গিয়ে যোগ হয়েছে। সেঁজুতির সাজ শেষ। সে সিম্পল মেকওভার নিয়েছে। মুনের সাজ চলছে। আজ সে রয়াল রেড ব্রাইড সাজতেছে। আর অনেকক্ষণ সময় লাগবে। সেঁজুতির বাবার বাড়ির লোক এসেছে। সে নিজের ঘরে গিয়ে মায়ের পাশে বসা।

মুনের চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুঝে বসে আছে। মেয়েটা তখন সবে কন্টোর করছে গালে। সেই ক্ষণে কানে এলো হৈ-হুল্লোড়ের কলরব ‘বর এসে বর এসেছে। ‘
মুনের বুকটা কেঁপে উঠল। চট করে উঠে বসল। বিউটিশিয়ান বিরক্ত স্বরে বলল, “আপু আপনি নড়বেন না। ”

মুন কাঁপা স্বরে বলল, “আমি বর দেখব।”

বলে সব ছেড়ে উঠে জানালায় দৌড় দিল। ওই তো মেরুন শেরওয়ানিতে বরবেশী সৈকতকে দেখা যাচ্ছে। ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে দাঁড়িয়ে আছে গেটে। কনেপক্ষ আটকেছে। সৈকত নিশ্চুপ। দূর থেকে বরকে দেখে মুনের শ্বাস আটকে এলো। কী সুন্দর লাগছে সৈকতকে! মুন চেয়ে রইল। এর মাঝে একবার সৈকত এদিকে তাকাল। কী দেখল কে জানে, ভ্রু নাড়িয়ে চমৎকার হাসল। মুন বুকে হাত দিয়ে বলল,
“আমি শ্যাষ!”

_________________

গেইটে দুই পক্ষীয় দ্বন্দ্ব বেঁধেছে। সৈকতের দিক থেকে, সিফাত, নাহিদ আর সৈকতের অফিস কলিগ, কাজিনরা ঠাট্টা করছে। তারা দাবি মানবে না।
কনে পক্ষ থেকে মুনের কাজিন মহল দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বেশি তর্ক করছে অন্তর। অন্তর হতাশ স্বরে বলল,
” রাত দিন অন্ধকার করে আমরা আমাদের একমাত্র চাঁদকে দুলাভাইয়ের কাছে দিয়ে দিচ্ছি। খুশিতে বাবার ভিটেও আমাদের নামে লিখে দেবার কথা। অথচ আপনারা কিনা ক’টা টাকা জন্য তর্ক করছেন! দুলাভাই এটা আপনার থেকে আশা করিনি। ”

নাহিদ ভ্রু কুঁচকাল, ” লাখ টাকা তোর কাছে ক’টা টাকা?

” কোটিতে এক মেয়ের জন্য লাখটাকা কম চাইছি। এর কম হলে বিয়ে ক্যান্সেল। ”

নাহিদ সৈকতকে বলল, ” এই শা লা আজকে বেশি উড়তেছে না।”

সৈকত দোতলা ঘরের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে জবাব দিল, “আমার চাঁদ তাদের ভাগে, উড়ারই কথা। ”

থেমে বলল, “যা চাচ্ছে দিয়ে দে। চাঁদ ভাসুক আকাশে।”

দ্বিধা তর্কের পর হাজার পঞ্চাশেক টাকায় মুক্তি পেল সৈকত। শেখ বাড়ির চৌকাঠ পেরুবার সময় একটা বিজয়ী হাসি ফুটল ঠোঁটের কোণে।

তারপর এলো বিবাহক্ষণ……

চলবে….

ধন্যবাদ।