অলীকডোরে চন্দ্রকথা পর্ব-২৮+২৯+৩০

0
400

#অলীকডোরে চন্দ্রকথা। (পর্ব- ২৮)
আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

কী নামে ডেকে বলব তোমাকে
মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে….

ভার্সিটির জন্য তৈরি হচ্ছে সিফাত। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে গুনগুন করছে। চেহারায় উৎফুল্লতা, মেজাজ ফুরফুরে। ঠোঁটের কোণে হাসি বলে দিচ্ছে ওর খুশিভাবটা। এই খুশির কারণটা ওর প্রেয়সীর। আজ ঘুরতে যাবে ওরা। ঘুরবার কথা অবশ্য জানে না মেয়েটা। সিফাতের পরিকল্পনা হুটহাট মেয়েটা ঘুরতে নিয়ে গিয়ে চমকে দিবে। কেমন মুখভঙ্গি হবে মেয়েটার ভেবেই পুলকিত হচ্ছে সিফাত।
তৈরি হয়ে বেরুবার সময় মাকে বলল,
“আমি আমি বেরুচ্ছি। ফিরতে সন্ধ্যা হবে। চিন্তা করো না।”

সুরমা উত্তর দিলেন না। উদাস হয়ে চেয়ে রইলেন অন্যদিকে। মলিন মুখ তার। সিফাত এই মলিনতার কারণ জানে। বড়ো ছেলের জন্য মন কাঁদছে তার। রাগ দেখিয়ে চলে গেল ছেলেটা। তারপর থেকেই সুরমা মুখে আঁধার নেমেছে। সিফাত কাছে গিয়ে বলল,
“কী হয়েছে মা? এভাবে বইসা আছো ক্যান?”

সুরমা বাস্তবে ফিরলেন। করুণ গলায় বললেন,
“আমার বুকডা খাঁ খাঁ করতাছে। কেমন জানি লাগতাছে। কাইল রাত্তিরে খারাপ স্বপ্ন দেখছি। জানি না কী হইব? মনে হইতাছে বিপদ আইতাছে।”

সিফাত ওসব গ্রাহ্য করল না। হাওয়ায় উড়িয়ে বলল,
” ওসব কিছু না। তুমি বেশি ভাবছো। ভাইয়ার জন্য মন পুড়তেছে তোমার। ফোন দিয়ে কথা বলে নাও। ”

সুরমা আবার উদাস হলেন। সিফাত বিদায় নিয়ে বেরুলো। বাড়ির রাস্তায় যেতেই ফোন বেজে ওঠল তার। ফোন হাতে নিয়ে দেখল ভাইয়ের বন্ধুর কল। ভ্রু কুঁচকে ফোন ধরল। অপাশ থেকে ভেসে আসা কথায় থমকে গেল সিফাত। সকাল থেকে ভাসা চোয়ালের উৎফুল্লতা নিমিষেই গায়েব হলো। সিফাত কত কী বলতে চাইল। কিন্তু স্বর বেরুল না। ওপাশ থেকে হ্যালো হ্যালো বলে ক্লান্ত হলো। তারপর স্নেহের সুরে বলল,
” চিন্তা করো না সিফাত, আমরা সবাই এখানে আছি। আন্টি আংকেল ভেঙে পড়বেন বলে আমরা কাল জানাইনি। ভেবেছিলাম, আমরা সামলে নিব। সৈকত আউট অফ ডেঞ্জার হয়ে যাবে। কিন্তু ডাক্তার আশ্বাস না দেয়ায় আমরা বাধ্য হয়ে তোমাকে জানাচ্ছি। যদি কিছু…..

গলা কেঁপে ওঠল কলারের। সিফাত অসাড় হলো। ভাইয়ের অবস্থা শুনে ও যেন কথা বলতেও ভুলে গেছে। কাল যাবার সময় কত হাসিঠাট্টা করল ওরা। এই সময়েই তো। অথচ আজ না কি তার সেই হাসিখুশি ভাইটা মৃত্যুর দুয়ারে বসে আছে! সিফাতের বুক কেঁপে উঠল। ফোনটা রেখেই সে দৌড়ে বাড়ি ফিরল। গিয়ে দাঁড়াল মায়ের সামনে। সুরমা ওকে দেখে ভ্রু কুঁচকালেন,
“তুই না চইল্যা গেলি? ফিইরা আইলি ক্যান?”

সিফাত জোর প্রচেষ্টা চালালো কথাটা বলতে কিন্ত পারল না। সব কথা যেন গলায় আটকে গেছে। গলা কাঁপছে ওর, বুক ও কাঁপছে। সিফাত কিছুই বলতে পারল না। রুমে চলে গেল। মুখে হাত চেপে বসে রইল। নিজেকে স্বাভাবিক করার অপ্রাণ চেষ্টা। মাকে সামলাতে হবে ওর, মাকে নিয়ে ঢাকা যেতে হবে। এভাবে ভেঙে পড়লে হবে না। থম ধরে বসে রইল ও। তারপর ধীর পায়ে মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মৃদুস্বরে ডাকল,
“মা?”
“হু!”
” চলো ঢাকা যাই?”
“ঢাকা ক্যান যামু?” উলটো প্রশ্ন করলেন সুরমা। সিফাত চাপা শ্বাস ফেলল। সুরমা কী যেন ভাবলেন তারপর ভয় নিয়ে বললেন,
“আমার পোলাডা ভালা আছে? ওর কিছু হয়নাই তো? ”

মায়ের চোখে ভয়। মায়েদের কি সন্তানের বিপদ আগে থেকে জানা হয়ে যায়? সিফাত সচেতন হলো। মা হার্ট পেশেন্ট। স্ট্রেস নিতে মানা করেছেন ডাক্তার। আবার কোন প্রকার শক খেলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা আছে। এখন যদি ভাইয়ের অবস্থার কথা শুনে নিশ্চিত অঘটন ঘটে যাবে। এখন বলা যাবে না। হাসপাতালের কাছাকাছি গিয়ে কিছু অল্প সল্প করে বুঝিয়ে বলবে, যে সামান্য হয়েছে। দেখতে চাইলে বলবে, এখন ঘুমাচ্ছে। সিফাত বুক কাঁপা চেপে বলল,
” নাহ, কিছু হয়নি। ভাইয়া ঠিক আছে, শুধু মন খারাপ করছে। ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে। কাল ফেরার পর না কি তোমাকে কল দিয়েছে, তুমি কল ধরোনি। ভাইয়ার পরাণ পুড়তেছে তোমার জন্য। তাই ভাবতেছি, তোমাকে নিয়ে ভাইয়ার কাছে যাব। ”

সুরমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন, ” তোর বাপরে রাইখ্যা কেমনে যামু? ওরে আইতে ক।”

সিফাত নিশ্চুপ রইল অনেকক্ষণ। সুরমা কথা প্যাঁচালেন। সিফাত এবার অন্য বাহানা দিল,
“মা, এখান থেকে যাওয়ার পরই ভাইয়ার জ্বর উঠছে। এখন ১০২° জ্বর। উঠতে পারছে না। বাসায় কেউ নেই দেখার মতো।”

সুরমা বেগম রেগে গেলেন তা শুনেই।
“ভালা হইছে, আরও হোক অসুখ। মোর কী? মোর কথা হুনবো পোলা? একা যাই অসুঝ বাধাইয়্যা পইড়া আছে ওহন সেবার লাইগ্যা মারে যাইতো হইব? কইলাম বিয়া কইরা ল। বিয়াডা করলে তো আর অহন একলা পইড়া থাকতে হইতো না। কন শহরের মাইয়্যার লেইগ্যা পাগল হইছে, ওই মাইয়্যা করতে পারতেছে না সেবা? আমারে ক্যান যাইতে হইব? আমার কি ঠেকা লাগছে? আমি যামু না। ”

রাগে হনহন করে রুমে চলে গেলেন সুরমা। সিফাত মলিন মুখে মায়ের পিছু নিল। দেখল মা কাঁদতে কাঁদতে ব্যাগ গুছাচ্ছেন। অথচ খানিক আগে কী রাগ তার! যাবেন না একবারে। মাকে নিয়ে বেরুল। সারাপথ সুরমার চোখে জল দেখা গেল। একটু পরপর সিফাতকে তাড়া দিচ্ছেন, কল দিয়ে দেখ কী করতাছে? রুবাবরে ফোন দে? গিয়া পাশে বসতে ক। না জানি কেমন আছে আমার পোলাডা।

মায়ের অস্থিরতা দেখে সিফাতের মন ডুকরে উঠল। সামান্য জ্বর হওয়ার সংবাদে মা এমন করছেন, যদি জানেন জ্বর নয় তার ছেলে মৃত্যুর সাথে লড়ছে তবে কী করবেন? মাকে সামলানো যাবে? হাসপাতালে গিয়ে সৈকত আইসিউতে আছে জানলে কী করবেন? চিন্তায় অস্থির হলো সিফাত।

গাড়ি যখন ঢাকা গিয়ে সৈকতের বাসা পেরিয়ে হাসপাতালে ছুটছিল তখন সুরমা হকচকিয়ে গেলেন,
“বাসা পার হইয়্যা গেল ত। গাড়ি থামতে ক।”

সিফাত ঢোক গিলে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজেকে প্রস্তুত করছে সে। সুরমা হাজার প্রশ্ন করলেন, সিফাত রা করল না। হাসপাতালের সামনে নামার পর সুরমা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
“এইডা তো হাসপাতাল। এই হানে আনলি ক্যান মোরে? আমারে সৈকতের বাসায় নিয়া যা।”

সিফাত ভাড়া মিটিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়াল। এক হাতে মায়ের কাধ ধরে শান্ত স্বরে বলল,
“ভাইয়ার অসুখ বেশি হবে। একটু আগে রুবাব ভাইয়ারে এখানে এনে ভর্তি করিয়েছেন। এই ভাইরাস জ্বরটা খুব খারাপ।”

সুরমা থমকে গেলেন। হাসপাতালে ঢুকে ছেলের বন্ধুদের মুখ দেখেই তিনি আন্দাজ করে ফেললেন, তার ছেলের বড় কিছু হয়েছে। তিনি বললেন,
“জ্বর হইলে কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়? আমার সৈকতের অন্য কিছু হইছে। তুই আমাকে কইতাছস না। কী হইছে ক আমারে?”

সুরমা কেঁদে ফেললেন। সিফাত এসে সান্ত্বনা দিল, ” কিছু হয়নি মা। সামান্য অসুখ শুধু। ভাইয়া ঠিক হয়ে যাবে।”

” ও আছে কই? আমি দেখব আমার মানিকরে।”

সিফাত দেখাতে পারল না। সুরমা অস্থির হলে। সিফাতের উপর রেগে গেলেন। সিফাত না জানালে রুবাব নাহিদকে জিজ্ঞেস করল। নাহিদ এসে শান্ত স্বরে কিঞ্চিৎ সত্য বলল। গুলি লেগেছে সেটা বলেনি। বলেছে। সামান্য এক্সিডেন্ট হয়েছে। তাতেই সুরমা ব্যাকুল হলেন। কেঁদে ভাসালেন। মূর্ছা গেলেন।

________________

হাসপাতালের করিডোরে অস্থিরচিত্তে দাঁড়ানো চার যুবক। রক্তশূন্য সবার চোয়াল। চিন্তায় কপালে ভাঁজ। সিফাতের চোখে পানি। নাহিদ অন্তরের চোখে পানি নেই কিন্তু চোখের শিরা লাল। ২৪ঘন্টা পেরিয়ে গেছে, তবুও সৈকতের অবস্থার উন্নতি নেই। এখনো বিপদমুখ নয় সে। এটাই চিন্তার কারণ। ওরা চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে, এই বুঝি অবজারভেশনে কর্মরতরা এসে সংবাদ দিল, পেশেন্ট রেসপন্স করেছে। হি ইজ আউট অব ডেঞ্জার। কিন্তু কেউ আসছেনা, বলছে সে কথা। সুরমা হাসপাতালের নামাজঘরে গিয়ে সেজদায় পড়ে আছেন। অজস্র চোখের পানিতে ছেলের সুস্থতার দোয়া করছেন।

বিষন্ন চোয়ালে হাসপাতালে এসে ঢুকল রুবাব। ওকে উন্মাদের মতো দেখাচ্ছে। চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। । দম আটকে আসছে। সবার চেয়ে বেশি ধকল ওর উপর যাচ্ছে। এক নয় দুই রোগীর চিন্তা কি না তার। দুর্বল পায়ে বন্ধুদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,
” এখনো রেসপন্স আসেনি ?”

নাহিদ হতাশ শ্বাস ফেলে মাথা নাড়াল। অন্তর ফিরেছে আজ সকালবেলা। অন্তর উৎসুকভাবে বলল,
“মুনের কী অবস্থা এখন? ”

রুবাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ” ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। ”

আঁধার নামা চোয়ালগুলো আর কালো হলো। আফসোসে ভাসল বুক। একটা হতাশা ঝেঁকে বসল সবার মাঝে। নাহিদ উদাস হয়ে বলল,
“সৈকত জানেও না, ওর অসুখে কতগুলো জীবনে থেমে গেছে। ”

রুবাব অসাড় হয়ে আইসিইউর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজার গ্লাসে চোখ ফেলল। ভেতরে হাজার মেশিনের মাঝে অবচেতন হয়ে শুয়ে আছে তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু। সেই বন্ধুর চোয়ালের দিকে তাকাতেই রুবাবের বুক কাঁপল। করুণ স্বরে বলল,
“সৈকত প্লিজ তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা। আমার বোনটা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তুই ওকে বাঁচাতে গিয়ে ওকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে গেছিস। তোর কিছু হলে আমার বোনটা ম রে যাবে, একবারে শেষ হয়ে যাবে। আমি বন্ধু বোন কাউকে হারাতে চাইছিনা। তুই হারাস না ভাই, আমার বোনটাকে চিনিয়ে নিস না আমার কাছ থেকে। প্লিজ ফিরে আয় সৈকত! দুজন মিলে আর কত দম আটকে রাখবি আমার? ”

দুর্বোধ্য তরুণ রুবাবের চোখ বেয়ে গড়াল এক ফোঁটা জল। সেই জলে মিশে রইল বোন, বন্ধু হারানোর ভয়, ব্যাথা। ফিরে পাবার আকুলতা, অজস্র ভালোবাসা।

সেদিন হাসপাতালে মনির সাহেবের জবাবদিহিতা থেকে বাঁচিয়েছে নাহিদ। সে এসে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। বলেছে, সহিংসতার দিন সৈকতের ইন্টারভিউ ছিল বলে সকালে ফিরেছে। বিকেলবেলা ভার্সিটি থেকে ফেরার সময় ঝামেলায় আটকা পড়েছে মুন। রুবাব ওর ওর খোঁজ পাচ্ছিল না। তখন সৈকতকে ডেকে নিয়েছিল। দুজনে মিলে খুঁজতেছিল মুনের। দুজন মিলেই খোঁজাখুঁজির পর মুনকে পেয়েছে। ভয় একটা দোকানের চিপায় ঢুকে পড়ছিল। তখন ঝামেলা মিটে গেছে। নিশ্চিন্ত হয়ে যখন বেরুচ্ছিল তখন আবার হামলা শুরু হলো। মুনের দিকে গুলি আসছিল তা রুবাবের চোখে না পড়লেও সৈকতের চোখে পড়েছে। সে মুনকে সরিয়ে দিল। নিজে সরার আগেই গুলি এসে লেগে যায় তার গায়ে। বলা যায় মুনকে বাঁচাতে গিয়েই সৈকত নিজের গায়ে গুলি নিয়েছে।
মুখ চোখের সামনে তা দেখেছে। এমনকি মুনের চোখের সামনে এক লোককে কু পিয়ে হ ত্যা করেছে। মুন তা কাছ থেকে দেখেছে। মেয়েটা ভয় পেয়েছে। চোখের সামনে এতসব দেখে ঘোরে চলে গেছে। তাই এমন করছে। আর কিছু নয়।
নাহিদ ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে সৈকতকে নির্দোষ প্রমাণ করে ঘটনা উপস্থাপন করেছে। এতে মনির সাহেবের সন্দেহ সরল।
মুন এর পরেই জ্ঞান হারাল আবার। অজ্ঞান অবস্থাতেই বাড়ি নিয়ে আসা হয়েছে।
জ্ঞান ফেরার পর তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। শুধু কাঁদছে, না খাচ্ছে, না কিছু বলছে। শুধু কাঁধছে। আর ছুটে যেতে চাচ্ছে। বাবা মা এটাকে শকের কারণ ধরে নিয়েছেন।

নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে শরীর দুর্বল হয়ে গেছে, কেঁদে কেটে অসুস্থ হয়ে গেছে মুন। ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। জেগে উঠলেই উন্মাদের মতো করছে। করুণ করে কাঁদছে। চোখের সামনে প্রিয় মানুষটার ওমন হাল কিছুতেই ভুলতে পারছেনা। বারবার চোখে ভাসছে রক্তমাখা সৈকতের দেহখানা, চোখের সামনে সৈকতের হেলে পড়া, স্ট্রাকচারে লাশের মতো পড়ে থাকা। মুনকে পাগল করে দিচ্ছে দৃশ্যগুলো। একদিনেই গাল ভেঙে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। ওকে দেখতে পাগল পাগল লাগছে। মনির সাহেব, তারিনা চিন্তায় অস্থির। তার ভালো মেয়ে কী থেকে কী হয়ে গেল। অবস্থার উন্নতি না হলে মুনকেও হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। বন্ধু আর বোন দুজনের চিন্তায় রুবাব জ্বলছে একাই। বাবা মাকে বলতে পারছে না, সইতেও পারছে না।

_________________

আয়ু কিংবা মায়ের দোয়ার কল্যাণে শ্বাসরুদ্ধকর ক্ষণ পেরিয়ে সুখসময় এলো যেন। সবার দম আটকে রেখে ৩৫ঘন্টা পর সৈকত রেসপন্স করল। অবজারভেশনে থাকা ডাক্তার সংবাদ দিলেন খানিক বাদেই। চার যুবক তখনো অপেক্ষায় দাঁড়ানো বাইরে। ডাক্তার বেরুতেই তড়িঘড়ি করে এসে আশা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সৈকত রেসপন্স করেছে ডক্টর?”

প্রতিবার ডক্টর নিরাশ করলেও এবার নিরাশ করলেন না। প্রসন্ন মুখে বললেন,
“রেসপন্স করেছে। সেন্স ফিরতেছে ।”

আটকে রাখা শ্বাসটা এইক্ষণে ছাড়ল চার যুবক। মলিন মুখে হাসি ফুটল। রুবাব খুশিতে নাহিদকে জড়িয়ে ধরল। অন্তর বলল,
” আর কোন বিপদের আশঙ্কা নেই তো?”

” আপাতত নেই। বাকিটা অবজারভেশনের পর বলা যাবে।”
“আমরা কি দেখতে পারব?”

“নাহ, অবজারভেশনের পর পেশেন্টকে বেডে দিলে তখন দেখা করতে পারবেন।”

ডাক্তার চলে গেলেন। খুশির রেশ রয়ে গেল সবার মাঝে। সিফাত দৌড় দিল নামাজ ঘরের দিকে। মাকে বলতে হবে। শুনতেই সুরমা কেঁদে ফেললেন। আলহামদুলিল্লাহ পড়তে লাগলেন অবিরত। দুই রাকাত শোকরানা নামাজ পড়ে ফিরে এলেন। তার মুখে হাসি। নির্জীব শরীর গুলো যেন সজিব হয়ে গেছে।

অন্তর রুবাবের কাছে এসে রয়েসয়ে বলল, “রুবাব, মুনকে খবরটা দিবি না?”

রুবাব নড়ে উঠে বলল, “আমি বাড়ি যাচ্ছি। বেডে দিলে জানাস।”

হাঁটা ধরল রুবাব। নাহিদ পিছন থেকে বলল, “সাথে নিয়ে ফিরিস। দেখবি ত্যাগী আর বিরহিণী দুজনেই সুস্থ।”

রুবাব বাড়ি ফিরল। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। রুবাব সোজা বোনের ঘরে গেল। দেখল মুখ হাটুতে মুখ গুজে বসে আছে মুন। তারিনা বসা পাশেই। গায়ে হাত বুলিয়ে কত কী বলছেন। কিন্তু মুনের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না। তারিনা ছেলেকে দেখে কেঁদেই ফেললেন। করুণ স্বরে বললেন,
” মেয়েটার এমন অবস্থা আমার সহ্য হচ্ছে না।”

রুবাব মাকে যেতে বলল। তারিনা যেতেই রুবাব বোনের পাশে বসল। ডাকল,
“মুন? ”

ভাইয়ের কথা শুনেই মুন তড়িৎ মাথা তুলল। চোখে পানি ওর। ভাইকে দেখেই অস্থিরতা বাড়ল। কাঁপা স্বরে জানতে চাইল,
“ভাইয়া, সৈকত?”

রুবাব বোনের মাথায় হাত রাখল। কখনো বোনের সামনে সৈকতের নাম নিতেও জড়তা করা ছেলেটা এই ক্ষণে স্পষ্ট বলল,
” সৈকত ভালো আছে। সেন্স এসেছে। এবার কান্না বন্ধ কর।”

মুন চমকে তাকাল ভাইয়ের দিকে। তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আকস্মিক হেসে ফেলল। ওর চোখে পানি, গাল ভেজা, অথচ ঠোঁটে হাসি। চঞ্চল হয়ে বলল,
“সত্যি?”

রুবাবের মনে হলো তার প্রাণ ফিরে এসেছে। এই মেয়েটা হাসলেই শেখ বাড়ি হাসে। যেন মুন নয়, শেখ বাড়ি হেসে উঠল। রুবাব বোনের খুশি দেখল অন্তর্ভেদী চোখে। তারপর মাথা নাড়াল। মুন অতিব চঞ্চল হয়ে আবদার করল,
“ভাইয়া আমাকে নিয়ে যাবে? ”

রুবাব চেয়ে রইল বোনের পানে। বোনের আকুতি ফেলতে পারল না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ” আচ্ছা।”

মুন একপ্রকার লাফিয়ে উঠল। বলল, “চলো।”

মুনের গায়ে বাসার পোশাক। কাপড় কুঁচকানো। উসকোখুসকো হয়ে আছে চুল। চোখের পানিতে গাল ভেজা। কোন কিছুর ঠিক নেই। এভাবে যাবে মুন! অথচ মুন খুব পরিপাটি। বাইরে বেরুলো, সামান্য টিপটাও তার এদিক ওদিক থাকে না। ঘন্টা লাগিয়ে তৈরি হয়। সেই মেয়ে আজ নিজ স্বভাব ভুলে গেছে। একটা মানুষের জন্য কতটা ভালোবাসা থাকলে এমন পাগলামো করতে পারে, সব ভুলে যেতে পারে!

চলবে…..

#অলীকডোরে চন্দ্রকথা। (পর্ব- ২৯)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

“আমি যাব না ভাইয়া, আমার ভয় লাগছে। ” তীব্র ভয় নিয়ে বলল মুন। হাঁটার গতি থেমে গেছে। হুট করেই এক অজানা আতঙ্ক বুকে বিঁধেছে।

রুবাব থেমে গিয়ে বিস্মিত চোখে চাইল বোনের পানে। হাসপাতালে আসার জন্য সারারাত একটুখানি বসতে দেয়নি ওকে। মুন তো তখনই বাসার কাপড় পরে বেরিয়ে যাচ্ছিল, রুবাবই আটকাল। সৈকতকে বেডে দেয়া হবে পরদিন সকালবেলা। সে সংবাদ শুনে রুবাব বোনকে নিয়ে আর রাতে ফিরেনি, একাও যায়নি। কথাটা যায়নি না বলে যেতে পারেনি বলা ঠিক হবে। মুন যেতে দেয়নি, সারারাত ভাইকে পাশে বসিয়ে রেখেছে, খানিক বাদে বাদে জিজ্ঞেস করেছে, সকাল হতে আর কতক্ষণ ভাইয়া? কদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর শরীরটা একটু বিশ্রাম চাইছে। ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিল রুবাবের। তখনই মুন জাগিয়ে বলল,
“সকাল হয়ে গেছে তো ভাইয়া। এবার চলো।”

সৈকতের চিন্তায় এই মেয়ে পাগল হয়ে গেছে। হাসপাতালে না নেয়া অবধি শান্তি হবে না। রুবাব চাপা শ্বাস ফেলে মুনকে শান্ত করল। হাসপাতালে যাবার কথা বলে মুনকে দিয়ে কত কী করাল। নাস্তা করাল, শরীর অতিমাত্রায় দুর্বল বলে একটা স্যালাইন ও দিয়ে নিল।
বেলা গড়াতেই রওনা হলো। বাসা থেকে হাসপাতালের দুরত্ব বেশ। জ্যামে পড়ে এক ঘন্টার রাস্তা তিনঘণ্টা লেগে গেল। এত কষ্টের পর যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে তখন বলছে যাবে না! রুবাব বোনের দিকে তাকাল গম্ভীর চোখে। মুনের চোখেমুখে তীব্র ভয়। হারানোর ভয়। মুন ভয় পাচ্ছে, হাসপাতালে গিয়ে যদি দেখে সৈকতের অবস্থা আরও খারাপের দিকে গেছে, তখন! বা সৈকতের কিছু হয়ে গেছে। কত ভয় উঁকি দিচ্ছে। রুবাব চাপা শ্বাস ফেলল। বোনের হাত ধরে বলল,
“তুই অযথা ভয় পাচ্ছিস, আয়।”

মুনের পা চলছেনা। ওই যে হারানোর ভয়টা জেগেছিল, সেটা আর নিভেনি। জ্বলছে এখনো দাউদাউ করে। মনে হচ্ছে এই বুঝি সৈকতকে হারিয়ে ফেলল! খুব খারাপ একটা সংবাদ কানে এলো। মুনের শরীর অতি দুর্বল। শারিরীক দুর্বলতা, মানসিক চাপ দুটো মিলিয়ে মুন দাঁড়াবার শক্তি ও হারালো যেন। ঢলে পড়ে যাচ্ছিল। রুবাব এসে ধরল। আলতো হাতে আগলে নিয়ে এগিয়ে গেল।

__________________

সৈকতকে বেডে শিফট করা হয়েছে ঘন্টাখানেক হলো। সুরমা ছেলের শিওরে বসা তখন থেকে। ভাই বন্ধু সবাই এসে দেখে যাচ্ছে। কথা বলতে পারছে না সৈকত। ডান কাধে ব্যাণ্ডেজ, হাত গলায় ঝুলানো, বাঁ হাতে স্যালাইন চলছে। নড়াচড়া মানা। ঘা যেন না নড়ে। ফোলা চোখ দুটো হালকা মেলে চেয়ে আছে। সবাই কত কী বলছে, সে শুনছে। মা কাঁদছেন। সৈকত ইশারায় কাঁদছে মানা করছেন। কিন্তু সুরমার চোখের পানি ফুরাচ্ছে না। সৈকত চোখ বুলাল চারপাশে। কাকে যেন খুঁজল। সুরমা টের পেলেন না। একটু দূরে দাঁড়ানো বন্ধু নাহিদ বলল,
” রুবাব বাড়ি গেছিল, আসতেছে।”

কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা গেল সৈকতের। প্রেয়সীর চিন্তা তার মস্তিষ্ক জুড়ে। মেয়েটা ঠিক আছে তো? রুবাব বাড়িতে কেন? কোথাও মুনের কিছু হয়নি তো! চোখে মুখে ভয়ের চাপ ভাসল। বলা নেই, কওয়া নেই তবুও বন্ধুরা বুঝে গেল। অন্তর স্মিত হেসে বলল,
” কোন সমস্যা হয়নি। একদম ঠিক আছে। ”

সৈকতের কপালের ভাঁজ মেলাল। সে চোখ বুঝল। একটা স্বস্তি দেখা গেল তার চোখে মুখে। কাছে বসা সুরমা বুঝলেন না ওদের কথার মানে। অনেকক্ষণ যাবার পর নাহিদ সুরমাকে প্রস্তাব দিল, বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নেয়ার জন্য। গত দুদিন হাজারবার বলেও তাকে বাসায় পাঠানো যায়নি। এখন যেহেতু ছেলের হুশ ফিরেছে তবে গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে আসুক। বিকেলে না হয় আবার ফিরবেন। সিফাত সমেত যেতে বললেন। সুরমা রাজি হলেন না। শেষে সিফাত এক প্রকার জোর করে নিয়ে গেলেন। মা নিজেই অসুস্থ। ছেলের সেবা করতে গিয়ে না আবার বিছানায় পড়েন। মুন হাসপাতালে ঢোকার আগে নাহিদ, সিফাত আর সুরমাকে নিয়ে গেল তাদের ব্যাচলর বাসাটায়। অন্তর রয়ে গেল।
সুরমাকে এই গুরুগম্ভীর মুহূর্তে ছেলের প্রেমিকার মুখোমুখি করতে চাইছেনা কেউ। বাড়ি নেয়ার কারণ এটাও একটা ছিল।

মুনের ভয় সহজে কাটল না। ওর মনে হচ্ছে, ও সৈকতকে রুগ্ন অবস্থায় দেখতে পারবে না। সহ্য হবে না ওর। করিডোরের কাছে আসতেই বলল,
“আমি এখানে বসি। তুমি যাও।”

রুবাব ভ্রু কুঁচকে চাইল। জড়তার জন্য জোর করতে পারল না। বলল, ” তুই শিওর?”

মুন মাথা নাড়াল। এই মেয়ের মাথায় কী চলছে সে নিজেও জানে না বোধহয়। রুবাব চাপা শ্বাস ফেলে মুনকে বসাল চেয়ারে। অন্তর ছিল বাইরে। ওকে বলল,
“ওর দেখ, আমি সৈকতকে দেখে আসি।”

অন্তর সায় জানাল। রুবাব কেবিনে ডুকল। সৈকত চোখ বুঝে ছিল। রুবাব এক পল চাইল বন্ধুর পানে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
” একদম ঘুমের ভান করবি না, শা লা। মন চাইতেছে তোরে লা থ থি মাইরা মঙ্গলে পাঠাইতে। কামলা পাইছোস আমাগোরে? দুইদিন পর পর হাসপাতালে বিছানা নিবি, আর তোর সেবা করতে আমাগো কাজকাম ফালাইয়্যা ছুটতে হইব। আজাইরা বইসা আছি আমরা। কথা ক। উঠ শা লা।”

সৈকত চোখ মেলল। রুবাবকে দেখে ওর চোখে মুখে প্রসন্নতা দেখা গেল। সে বোধহয় বন্ধুর গালিটাকেই মিস করছিল। বন্ধুর কথার পর স্মিত হাসল। তাতে রাগ চড়াও হলো রুবাবের,
” একদম ঢং মারবি না শা লা। আমার বোন, জান দিলে আমি দিমু। তোরে বাংলা সিনেমার নায়ক সাইজ্জা বুক পাততে বলছি আমি? মহান সাজার ঢং মারোস, শা লা। ”

একটা মানুষ জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরেছে, তাকে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করার বদলে রাগ ঝাড়ছে। পারলে এখনই পিটিয়ে দেয়। সাধারণ চোখে এটাকে অমানবিক বলা গেলেও, বন্ধুত্বের চোখে এসব অস্বাভাবিক বলা যায়না। বন্ধুত্বের দরদটা পরোক্ষ। এই যে রুবাব গত দু’দিনে সৈকতের জন্য পারলে জানটাও দিয়ে দেয়। একা হাতে বোন বন্ধু সামলেছে। হাসপাতালে যত ফর্মালিটি সব রুবাব পূরণ করেছে। রোগী অভিভাবকের খাতায় রুবাবের নাম লেখা। এত ত্যাগের পর সামনে এসে এমন ভাব করছে যেন চির শত্রু ওরা। রুবাবের চোখ মুখ দেখে অপ্রকাশ্য ভালোবাসাটা আঁচ করে ফেলল সৈকত। ঠোঁটে বাকিয়ে হেসে শব্দহীন ভাবে বলল,
” আমি না, তুই আমার শা লা। সম্পর্কে ভুলে যাস কেন?”

রুবাব ওর লিপ্সিং ধরে নিয়ে ধমকে উঠল ” আমারে শা লা বললে থাপ ড়া ব ধরে। আমি ভাই হয়ে এতবছরেও আমার বোনের চোখে এক ফোঁটা পানি আনি নাই । আর দুইদিন আইসা আমার বোনটারে চোখের জলে ভাসাচ্ছিস। এই রাইট দিছে কে তোরে?
তোদের সম্পর্ক মানছি মুনের হ্যাপিনেস দেইখ্যা। আমি ভাবছিলাম, তুই ওরে কষ্ট দিবি না কখনো । এখন দেখতেছি, শা লা তুই-ই ওরে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিছস। মহান সাজতে গিয়া আমার বোনটারে মাইরাই ফালাইতেছিলি। এরাম হইলে আমি তোর কাছে বোন বিয়া দিতাম না। বিসিএস হইলেও না, যদি পা ধইরা মাফ চাস তাও দিমু না। আবিত্তা ম রবি তুই ”

গড়গড় করে হুশিয়ারি বানী সমেত রাগ ঝেড়ে শান্ত হলো রুবাব। রুবাবের মাঝে এক নার্স এলো। অবাক হয়ে চেয়ে রইল। বোধহয় কোন মুমূর্ষু রোগীর উপর চড়াও হতে এই প্রথম দেখল। কাছে এসে সতর্কবাণী ছুঁড়তেই রুবাব নার্সকেও ধমক দিল। নার্স ভয়ে চুপ হয়ে কেবিনই ছাড়ল ।

ইতিপূর্বে রুবাবের গালাগাল শুনে সৈকতের মুখে প্রসন্নতা বজায় থাকলেও মুনের প্রসঙ্গ আসতেই প্রসন্নতা উবে গেল। মুখে মেঘমেদুর নামল। মেয়েটার কী হয়েছে? সৈকত কাতর চোখে চাইল বন্ধুর পানে। প্রশ্নবিদ্ধ করল। রুবাব থেমে গেল। রাগ সরে গেল স্বর থেকে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
” তুই তো ওর জান বাঁচিয়েই খালাস। এরপর ওর কী হাল হয়েছে, সেটা আমি দেখেছি। দু’বার সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিল। আমার একটাই বোন, সৈকত। ওকে কষ্ট দিস না! আমার সহ্য হয়না। জান দেয়ার হলে আমি দিব। তোরা ভালো থাক। ”

এই প্রথমবার দুই বন্ধুর মাঝে মুনকে নিয়ে আলোচনা হলো। রুবাবের একেকটা কথা সৈকতের চেহারাকে আঁধার থেকে আঁধার বানিয়ে দিল। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। চোখে নামল অসহায়ত্ব। ওকে তখন কী ভীষণ বিষন্ন দেখাচ্ছিল! রুবাব স্পষ্ট দেখল বন্ধুর চোখে বোনের জন্য এক সমুদ্র অস্থিরতা। সৈকত দরজার দিকে তাকাল এক পল। তারপর রুবাবের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়াল, ” আসেনি?”

রুবাব উঠে দাঁড়াল। সৈকতের কথার উত্তর না দিয়ে হাঁটা ধরল। যেতে যেতে বলল,
” আমি হাস্যজ্বল মুনকে নিয়ে বাসায় যাব। আমার হাসিখুশি বোন ফিরিয়ে দিবি।”

রুবাব কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল। সৈকত উত্তর পেয়ে গেছে। অস্থির চাহনি নিবদ্ধ করল দরজার দিকে। খানিক বাদে দরজার গ্লাসে দেখা গেল একটা অবয়ব। মাথা নিচু করে অসাড় দাঁড়িয়ে আছে। নড়চড় নেই তার। মুখ দেখা যাচ্ছে না। সৈকত অস্থির হয়ে উঠল। মেয়েটা আসছে না কেন! ও পারলে দৌড়ে গিয়ে ধরে আনে। অনেকক্ষণ বাদে দরজা মেলল কিছুটা। ধীর গতিতে একটা অবয়বের পদচারণ ঘটল কেবিনে। মুখ না দেখিয়ে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আলতো করে দরজা ভেজিয়ে দিল। সৈকত খেয়াল করল, হাতযুগল কাঁপছে। পা টলছে। সৈকত কাতর চোখে চেয়ে রইল, ঘুরানো মাথায়। এই বুঝি মুখটা সামনে এলো। কিছুক্ষণ বাদে ধীরে এদিকে ঘুরল। ভয় ভয় নিয়ে মুখ তুলে চাইল। সৈকতের গভীর চাহনিতে ধাক্কা খেল দৃষ্টি। থমকে চেয়ে রইল দুজন।

_______________

রুগ্ন, বিধ্বস্ত সৈকতকে দেখে আকস্মিক বুক ভারি হলো মুনের। ডুকরে উঠল সে। চোখ ফেরাল। দ্বিতীয়বার চাইল না। দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ঠোঁট চেপে কাঁদতে লাগল।

সৈকতের অস্থির চাহনি মুনের উপর থেকে সরল না এক মুহুর্তের জন্য। গভীর চোখে পরখ করছে প্রেয়সীকে। নাক মুখ রক্তিম হয়ে আছে। চোখ, মুখ ফুলে একাকার। চুল এলোমেলো, পরনের কাপড় কুঁচকানো। ওকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে বড়োঝড় ঝড় বয়ে গেছে ওর উপর। চোখমুখ বলে দিচ্ছে কতটা কেঁদেছে। ভীষণ রোগাটে লাগছে। আকস্মিক হাতের দিকে চোখ আটকাল। ক্যানলা আটকানো হাতের উল্টোপিঠে। এতটা অসুস্থ! সৈকত চমকে গেল। ভীষণ বিমর্ষ হলো ওর চোখ মুখ। ওর শোকে মেয়েটা নিজের কী হাল করেছে! দেখেই বুক কাঁপছে।

মুন অবিচল দাঁড়িয়ে আছে। চোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে অবিরত। কাছে টেনে চোখের পানি মুছে দেবার তীব্র ইচ্ছে হলো সৈকতের। কিন্তু নড়তে যার কষ্ট হয়, কাছে টানা তার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। নিজে যেতে না পেরে মুনকেই ডাকল কাছে। আলতো করে,
“চন্দ্রকথা?”

অতিব ক্ষীণ স্বর। পিনপতন নীরবতা মাড়ানো ঘরে ওই ডাকটা তীরের মতো বিঁধল মুনের কানে। অন্তর কাঁপল আবার। চোখ তুলে চাইল। সৈকত ইশারায় ডাকল,
” এদিকে এসো।”

এবার দ্বিরুক্তি করল না মুন। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সৈকতের পাশেই বসল। সৈকত নরম গলায় বলল,
” আমি ঠিক আছি তো।”

কান্না বন্ধের কথায় কান্না বন্ধ তো হলোই না, উলটো আরো বাড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি আপনাকে বুঝি হারিয়েই ফেলেছিলাম। ”

সৈকতের স্যালাইন চলছে। সুঁই পোড়ানো হাতটাই একটু উঠিয়ে মুনের হাতের উপর রাখল। ক্যানলার পাশে আঙুল আলতো করে ধরে ধীরে বলল,
“এই তো আমি। তোমার কাছেই আছি।”

মুন আঙুলের বাঁধন শক্ত করে ধরল, “আর কোথাও যাবেন না। আমি ম রে যাব।”

সৈকত চোখ রাঙাল। যার অর্থ এসব কথা বলবে না। পরপরই বলল, “আর যাব না। ”

হাত ধরে বসে রইল দুজন। কেউ কোন রা করল না। এক প্রগাঢ় ভালোবাসা ঘিরে রাখল ওদের। মুন মন ভরে দেখল মানুষটাকে। তারপর কাধের ব্যাণ্ডেজ় দেখে ব্যাথিত স্বরে বলল,
” আপনি অনেক ব্যাথা পেয়েছেন, না? খুব কষ্ট হচ্ছে?”

আবার চোখ ভরে এলো। সৈকত ঠোঁট নাড়াল। একটুখানি হেসে বলল, ” তোমার চেয়ে কম ব্যাথা লাগছে।”

মুন কাতর স্বরে বলল, “আমার চেয়ে কম কিভাবে? আমার গায়ে তো কোন ব্যাথাই লাগেনি। আপনার তো গুলি লেগেছে। কিভাবে পড়ে যাচ্ছিলেন আপনি! অপরেশনের পর কেমন করে শুয়ে ছিলেন। আমার মনে হচ্ছিল আপনি বোধহয়…..

মুনের কথা থেমে গেল। অপারেশনের পর লাশের মতো পড়ে থাকার দৃশ্য চোখে ভাসল। শিউরে ওঠল সে। আবার চোখ বেয়ে জল গড়াল।

সৈকত গভীর অনুভব করল মুনের ভালোবাসা। মুনের ব্যাথায় প্রকাশ্য ভালোবাসা। হাতের বন্ধন ছেড়ে। হাত টেনে গালে রাখল। হাতে ব্যাথা লাগল। তবুও হাত সরাল না। এই মুহুর্তে ওর প্রেয়সীর কান্না বন্ধ করার ওর প্রধান কাজ।
মৃদ্যু স্বরে ডাকল,
“চন্দ্রকথা!”

মুন চাইল। চোখাচোখি হলো। চোখের দিকে চেয়েই সৈকত ঠোঁট নাড়িয়ে বলল, “আমি তোমার হয়েই আছি, তোমার সাথে। এবার শান্ত হও। কেঁদেকেটে নিজের কী হাল করেছ, দেখছ? কান্না থামাও।”

মুন নিশ্চুপ চেয়ে রইল। ওর গাল ভিজল আবারও। সৈকত চাপা শ্বাস ফেলল। দুনিয়ার সবচেয়ে নাজুক মেয়েটা তার ভাগ্যে জুটেছে। এত কাঁদতে পারে মেয়েটা। সৈকত চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
“আর কান্না নয়। তোমার কান্না দেখতে ভালো লাগছে না। এবার একটু হাসো তো। ”

মুন কান্না থামাল ঠিকই। তবে হাসল না। মলিন স্বরে বলল,
“আমার হাসি আসছে না।”

সৈকতের হাতে খুব ব্যাথা করে উঠল। মুনের গাল থেকে হাত সরিয়ে ফেলল সে। মুন সচেতন হলো। ব্যাথিত স্বরে বলল,
” ব্যাথা লাগছে? ইশ! একটু সাবধান হবেন না! ”

মুন যত্ন করে হাতটা বেডে মেলে রাখল। ওর খেয়াল হলো, হাতটা লাল হয়ে আছে। রগ ফুলে আছে। মুনের ভীষণ মায়া হলো। কী ভেবে ঝুঁকে হাতের উপর গভীর চুমু খেল।

সৈকতের চোয়ালে বিদ্যুৎ খেলে গেল। বিস্ময় নিয়ে দেখে গেল প্রেয়সীর কান্ড। মুন মুখ তুলে চাইতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। সৈকত ভ্রু নাড়িয়ে হাসল। বলল,
” অসুখ হলে তো দেখি লাভ আছে! ”

মুনের হুশ হলো যেন এই ক্ষণে। এমন ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা থাকে না। ওই হাত ধরা অবধিই তার গণ্ডি। সেদিক থেকে এটা অবিশ্বাস্য কান্ড। মুনের গাল লাল হলো।

সৈকত বলল,
” লাভ শেষ না কি আরও পাব?”

মুন চোখ রাঙাল। সৈকত ঠোঁট কামড়ে হাসছে। রুগ্নতা ভিড়িয়ে চোখে মুখে উঁকি দিচ্ছে পূর্বের সেই দুষ্টুমি। ঠোঁটের কোণে সেই প্রাণবন্ত হাসি। এই হাসি, এই ভাব দেখে মুন অনুভব করল, এই তো তার মানুষটা। সেই দুষ্টুমিষ্টি ছেলেটা। এই তো ফিরে এসেছে। মুনের মন নেচে উঠল খুশিতে। ঠোঁটের কোণে হাসি ভীড় করল। মনের আলোড়নে ওর চঞ্চলতা ফিরল। উঠে গিয়ে সৈকতের শিওরের কাছে দাঁড়াল। আকস্মিক গালে অধর ছুঁয়ে দিল। কান্নাভেজা রক্তিম ফোলা গালে আনন্দ মিশিয়ে বলল,
“আমি এই আপনিটাকে ভালোবাসি।”

সৈকত এক মুহুর্তের জন্য থমকাল। পরক্ষণেই হেসে উঠল। শব্দহীন প্রাণবন্ত হাসি। লাজুক হাসি ফুটল মুনের ঠোঁটের কোণেও।

সৈকত- মুন দুজনে কিয়ৎক্ষণ আগেও ভীষণ রুগ্ন বোধ করছিল। আকস্মিক মনটা যেন ফুরফুরে হয়ে গেল। হুট করেই যেন অসুখ ভুলে বসেছে। সৈকত টুকটাক কত কথা বলছে! অথচ একটু আগে ঠোঁট নাড়ানো ছাড়া কোন স্বর বেরোয় নি। দুজনেই হাসছে প্রাণবন্ত, কী ভীষণ সুখী দেখাচ্ছে ওদের। অথচ একটু আগে ও কী বিধ্বস্ত ছিল! ভালোবাসার ছোঁয়া এত শক্তিশালী! রুবাব অন্তর ওদের দেখে বিমোহিত হয়ে চেয়ে রইল।

চলবে…..

#অলীকডোরের চন্দ্রকথা। (পর্ব- ৩০)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

গভীর ভাবনায় মত্ত সুরমা বেগম। ছেলের চিন্তায় ভেতরটা কাঁদছে তার। এই একলা শহরে ছেলেকে রেখে যেতে হবে ভাবতেই বুক কাঁপছে। স্বামীর শরীর ভালো যাচ্ছেনা। বাড়িতে একা ফেলে এসেছেন। এখানে বেশিদিন থাকা সম্ভব হবে না তার। চলে যেতে হবে। ছেলেটা এখনো অসুস্থ, এই শহরে ওর আপন কেউ নেই। ওই বন্ধুরাই কেবল। ভাগ্য করে বন্ধু পেয়েছে বলেই রক্ষে, নয়তো কে দেখতো? আর বন্ধুরাই বা কদিন দেখবে, একটা পরিবারের তো দরকার আছে। কেউ একজনের তো দরকার যে ওর খেয়াল রাখবে। প্রতিবার ছেলে বাড়ি গেলে দেখেন,ছেলে আগের থেকে শুকিয়ে গেছে। ছেলের জন্য মন কাঁদে তার। প্রতিবেলা খেতে বসে মনে পড়ে তার ছেলে কী দিয়ে খেল? কী খায় না খায়। একটা বউ থাকলে তো সে রেঁধে বেড়ে খাওয়াবে। তার চিন্তা হতো না এত। মনে হতো না, দূর শহরে একলা আছে ছেলে। এসব ভেবেই ছেলের বিয়ের কথা উঠিয়েছেন তিনি। ভেবেছেন, গ্রাম্য সংসারি মেয়ে বিয়ে করিয়ে ছেলের জীবন গুছিয়ে দিবেন। কিন্তু ছেলে রাজি হলোনা। কোথাকার কোন শহুরে মেয়েতে মজেছে কে জানে? শহরে মেয়েরা সংসারি হয়না বলেই ধারণা তার। যদি সংসারি না হয় তবে তো তার ছেলের জীবন উচ্ছনে যাবে। ভয় হয় সুরমার।

“কী এত ভাবছ, মা?” মায়ের উদাসীনতা দেখে ভ্রু কুঁচকাল সিফাত। এই মুহুর্ত মা-ছেলে হাসপাতালের করিডরে বসা। ডাক্তার সৈকতের চেকাপ করছেন। সুরমার ধ্যান ভগ্ন হলো। এদিক ওদিক চেয়ে নিচু স্বরে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন,
” ওই মাইয়্যা আহে নাই?”

মায়ের কথা বুঝল না সিফাত,

“কোন মেয়ের কথা বলছো?”

“যার লাইগ্যা তোর ভাই পাগল হইয়্যা গেছে। চাইর দিন হইয়্যা গেল হাসপাতালে তো আইতে দেখলাম না। এই দরদের বালাই!”
বিরস মুখে বললেন সুরমা। এতক্ষণে সিফাত মায়ের কথার কেন্দ্রবিন্দু ধরতে পারল। সে ঠোঁট চেপে হাসল। আজ সকালবেলা ও তো মুন ভার্সিটির যাবার সময় নাস্তা নিয়ে এসেছিল। মায়ের সাথে কত কথা হলো। তবুও না কি দেখেন নি! সিফাত হাসি চেপে বলল,
“আসছে তো।”

সুরমা চমকালেন, “কবে আইল? আমারে দেখালি না ক্যান? দেখতাম ক্যামন মাইয়্যা পছন্দ করছে তোর ভাই।”

“ভাইয়ার সেন্স ফেরার পর এসেছে। ”

“তুই দেখছিলি? কিরাম দেখতে?”

সৈকতের সতর্কবাণী মনে করল সিফাত। হুশে ফেরার পরদিন সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে, কেউ যেন মুনের কথা মাকে না বলে। অবস্থা বুঝে সে নিজে জানাবে। সিফাত বলল,
“আমি তোমার সাথে বাসায় ছিলাম তখন। ”

“কে দেখছে? সৈকতের বন্ধুরা জানে? ওরা কইতে পারব?”

উৎসুক হলেন সুরমা। এবার গ্রামের ফেরার আগে একটা হেস্তনেস্ত করেই যাবেন তিনি। তারও দেখা চাই কেমন মেয়ে পছন্দ করেছে ছেলে। সিফাতের মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি চাপল। বলল,
” ভাইয়ের সাথে রুবাব ভাইয়ার বেশি ভাব। তুমি রুবাব ভাইকে জিজ্ঞেস করতে পারো।”

মা যখন রুবাব ভাইকে জিজ্ঞেস করবে সৈকতের গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কে, তখন রুবাবের চেহারা কেমন হবে ভাবতেই হাসি পেল সিফাতের। এমন একটা সিন মিস করা যাবে না। সম্পর্কে বেয়াই হবে কদিন বাদে। এক আধটু রসিকতা চলে।

মা-ছেলের কথার মাঝে মুনকে আসতে দেখা গেল। বিষয়টা বড় করে দেখলেন না সুরমা। সকালবেলা মুন ভার্সিটি যাবার পথে হাসপাতালে এসেছিল। বলে গিয়েছে, বিকেলে ভার্সিটি থেকে ফেরার সময় তাকে শেখ বাড়ি নিয়ে যাবে। সৈকতদের ব্যাচলর বাসায় খাওয়া দাওয়ার সমস্যা। তারিনাও ফোন দিয়ে ডেকেছেন। মুনকে দেখে সিফাত ঠোঁট চেপে হাসল। কাছাকাছি আসতেই বড় গলায় সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম, ভ…..

মুন চোখ বড় করে চাইল। তড়িঘড়ি করে বলল,
” ওয়া আলাইকুমুস সালাম ভাইয়া। আপনারা এখানে বসে আছেন কেন?”

সিফাত হেসে বলল, ” ভাইয়া মাকে বলেছে, তার পছন্দ আছে। মা এখন ভাইয়ার পছন্দ দেখতে চাইতেছেন। এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল। আপনি কি আমার ভাবিকে চিনেন?”

হবু দেবরের এমন রসিকতায় বিব্রতবোধ করল মুন। এদের ভাইদের ঠাট্টার স্বভাব। এত ফাজিল! মুন বিস্মিত ও হলো। সৈকত মাকে বলে দিয়েছে? ওকে তো বলেনি। মুনের বিস্ময়ের মাঝে সুরমা আগ্রহী গলায় জানতে চাইলেন,
“রুবাব কইছে কিছু? তুমি কি জানো সৈকতের পছন্দের মাইয়্যা কেডা?”

মুন কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না। সে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল। না স্বীকার করল, আর না অস্বীকার করল। সে বলল,
“আপনি বরং আপনার ছেলে থেকে জেনে নিয়েন আন্টি!”

পরপরই প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল, “আমি আপনাকে বাসায় নিয়ে যেতে এসেছি। তৈরি হয়ে নিন, আন্টি।”

ডাক্তার চেকাপ করে বের হবার পর সুরমা কেবিনে ডুকলেন তার ব্যাগ নিতে। খানিক বাদে ধীর পায়ে এলো মুন। সৈকতের দিকে তাকাল প্রথমেই। সৈকত ওকে দেখে চমৎকার হাসল। রুবাব ডাক্তারের সাথে বেরিয়েছে। অন্তর বাসায়। নাহিদ আছে সৈকতের পাশে। নাহিদ বলল,
“কী খবর বিরহিণী? কোথা থেকে এলে?”

“ভার্সিটি থেকে এলাম, আন্টিকে নিয়ে যেতে।”

নাহিদ মজা করে বলল, “ত্যাগীকে ও নিয়ে যাও সাথে করে।”

মুন সৈকতের দিকে তাকাল। সৈকত হাসছে। শব্দহীন হয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে বলছে, ” আমার কোন আপত্তি নেই।”

মুন ও মজা করল। ব্যাগ হাতড়ে বলল, “স্যরি ভাইয়া, আমার ব্যাগে জায়গা নেই।”

ওদের কথা বুঝলেন না সুরমা। তিনি অন্যদিকে ফিরে বোরকা পরছেন। বোরকা পরে মাথায় ওড়না টেনে বললেন,
” কী নিতে হইব, আমারে দেও। আমার ব্যাগে জায়গা আছে।”

তার অবুঝপনায় সবাই বহুকষ্টে হাসি আটকাল। মুন হাসি আটকাতে ঠোঁটে হাত দিল। ওর গলায় সৈকতের দেয়া চাঁদ প্যান্ডেন্ট। মুন হাসতে হাসতে প্যান্ডেন্টটা হাতে নিল। তারপর আনমনা হয়ে মুখে দিল।

সুরমা তাড়া দিলেন। নাহিদ কোনভাবে বুঝিয়ে শান্ত করছে। সেদিকে তাকিয়ে মিটমিট হাসছে মুন। চোখ ফিরিয়ে সৈকতের দিকে তাকাতেই দেখল সৈকত ঠোঁট কামড়ে হাসছে। ওর চোখেমুখে দুষ্টুমি খেলা করছে। মুন চোখ ছোটো ছোটো করে তাকাল, এই লোকের মাথায় কী চলছে ওকে নিয়ে! সৈকতের হাসি বাড়ছে। মুন সতর্ক হলো। সৈকতের চাহনি বড্ড ঘোরের। কিভাবে যেন তাকিয়ে আছে। শিউরে উঠল মুন। কোন দিকে তাকিয়ে আছে পাজিটা! খতিয়ে দেখতে গিয়ে প্যান্ডেন্টের অবস্থান চোখে পড়ল। প্যান্ডেন্টটা তখন মুন ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে আছে। চমকে গিয়ে তড়িৎ ছেড়ে দিল। সৈকত ক্ষীণ শব্দ করে হেসে ফেলল তা দেখে। মুন অগ্নিচোখে চাইলে সৈকত কেবল ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলল।
মুনের কান দিয়ে ধোঁয়া বেরুল যেন। লজ্জায় গাল লাল হলো। বিড়বিড় করে ‘অসভ্য’ উচ্চারণ করল। চোখে চোখ মেলাতে পারল না। একপ্রকার দৌড়ে পালাল।

_______________

তখন রাত্রিবেলা। শেখ বাড়ির ডাইনিং এ বসে আছেন সুরমা। তারিনা টেবিল সাজাচ্ছেন। মুন দ্রুত হাতে কিচেন থেকে খাবার এনে টেবিলে সাজাচ্ছে। আজ দু’দিন যাবত এ বাড়িতে আছেন তিনি। মুনকে দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। কী লক্ষ্মীমন্তর মেয়ে! সকাল সকাল উঠে নাস্তা বানিয়ে তাকে নিয়ে হাসপাতালে যায়, সুরমাকে রেখে ভার্সিটি যায়। ফিরতি পথে আবার সুরমাকে নিয়ে আসে। সুরমা খেয়াল করেছেন, মুন বাসার মোটামুটি অনেক কাজ করে। বাবার ওষুধ, মায়ের খাবার, তার কী লাগবে না লাগবে সব দিকে খেয়াল থাকে তার। এত বড় বাড়ি, কাজের লোক নেই। অথচ স্বচ্ছ, সুন্দর। সাজানো গুছানো পরিপাটি। চারদিক যেন চকচক করছে। সব মুনের অবদান। কত গুণি মেয়ে! সুরমা ভেবেছেন, শহুরে মেয়েরা সংসারী গোছের হয়না, মুনকে দেখে তার ধ্যান বদলে গেল। মেয়েটার আচার ব্যাবহার, চাল চলন সব মুগ্ধ করল সুরমাকে। দেখতে কী মিষ্টি! সর্বগুণ সম্পূর্ণা এমন মেয়ে যার ভাগ্য যাবে তার কপাল খুলে যাবে। এই সময় সুরমার ভীষণ আফসোস হলো। শহরের মেয়ে যদি পছন্দই করবি, তো এই মেয়েটাকে করতে পারলি না?

হুট করে তার ইচ্ছে হলো মেয়েটাকে ছেলে বউ করার। সৈকতকে কোনভাবে তার প্রেমিকা থেকে ফিরিয়ে আনলে মুনের জন্য বলবেন। শহরে আছে, সৈকত হয়তো রাজি হবে। যদি রাজি না হয়! মনে মনে হিসহিসিয়ে উঠলেন তিনি, ” কেন যেন আকামডা করতে গেলি বাপ!”

চিন্তায় রাতে ঘুম ও হলো না। সকালবেলা হাসপাতালে গিয়েই সিফাতের কাছে আফসোস ব্যক্ত করলেন,
” রুবাবের বইনডা কী অমায়িক! তোর ভাইর চোখে ওরে পড়ল না ক্যান? কত্ত ভালা মাইয়্যা! ওই হইলে তো কথাই আছিলো না।”

সিফাত মায়ের কথা শুনে কতক্ষণ চুপ রইল। তারপর আকস্মিক শব্দ করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে ভাইয়ের কেবিনে চলে গেল। ভাইকে বলতে হবে। কাম তামাম হয়ে গেছে।

রাতে ছেলেরা সবাই হাসপাতালে ছিল। সৈকতের রুমে এক্সট্রা বেডে শুয়ে বসে গল্প করে রাত পার করেছে। রুবাব অন্তর বাইরে। নাহিদ খাটে বসা। মুন সাথে করে আনা খাবার নিয়ে বসেছে। হাতে আধঘন্টা সময় আছে। ভাবল আজ সবাইকে বেড়ে খাওয়ানোর দায়িত্ব নেয়া যাক।

রুবাব বাইরে ছিল। সুরমা ওকে পেয়ে ধরলেন,
” বাবা, একখান কতা হাচা কইরা কও তো?”

রুবাব বেশ সিরিয়াস। আন্টিকে মান্য করে সে। বিনয়ের সাথে জবাব দেবার প্রয়াস তার। রুবাবের ধারণা সৈকতের এক্সিডেন্ট নিয়ে প্রশ্ন করবেন। রুবাব মনোযোগ দিয়ে শুনে বলল,
” কী কথা আন্টি? বলুন, আমি অবশ্যই জবাব দিব।”

সুরমা বললেন, “সৈকত যেই ম্যাইয়ার লগে প্রেম করে ওরে চিনো তুমি? নাম ঠিকানা দিতে পারবা?”

রুবাব আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে গেল। সে থ বনে দাঁড়িয়ে রইল। সুরমা গোয়েন্দাচোখে চেয়ে আছে তার পানে। রুবাব বন্ধুর প্রেমিকা হিসেবে বোনের পরিচয় দিতে হবে ভেবেই খুখু করে কেশে উঠল। অন্তর শব্দ করেই হেসে ফেলল। সুরমা অবাক চোখে চাইলেন। রুবাব বিব্রত মুখে হাঁটা ধরল। অন্তর ও পিছু নিল।

কেবিনে গিয়ে রুবাবের কাঁচুমাচু মুখ দেখে সৈকত ভ্রু কুঁচকাল,
” কী হইছে রুবাব? কোষ্ঠকাঠিন্য রোগীর মত মুখটাকে এমন বানিয়ে রাখছস ক্যান? টয়লেটে সমস্যা?”

রুবাব রেগে তাকাল ওর দিকে। কিছু বলার আগেই হকচকিয়ে মুন বলে উঠল, “ছিঃ! এসব কী কথা!”

মুনের চোখে তীব্র অবিশ্বাস। ও যেন বিশ্বাসই করতে পারতেছে না সৈকত এমন ভাষায় কথা বলে। সৈকত চট করে চাইল ওর দিকে। বেশ চমকাল। ও বোধহয় ভুলে গিয়েছে মুনের উপস্থিতি। বিব্রতবোধ করল। কিছুতা অস্বস্তি নিয়ে বলল,
“ও তুমি ও আছো এখানে! বলবে না।”

মুন রাগ নিয়ে চাইল। সৈকত বিশেষ একটা প্রাধান্য দিল না। আপাতত রুবাবের সমস্যা সমাধান করা জুরুরি। সৈকতের কাধের ঘা শুকাচ্ছে। দুই একদিনের মাঝে রিলিজ দিবে। কথাবার্তা সব ঠিকঠাক। রুবাব থমথমে মুখে বসে আছে। সৈকত অন্তরকে ইশারায় জিজ্ঞেস করল, “কী হইছে ওর?”

অন্তর হাসি চেপে বলল, “আন্টি ওর কাছে তোর গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কে জানতে চাইছে। ”

এক মুহুর্তের জন্য পুরো কেবিনে নিরবতা চেয়ে গেল। বিষয়টা বুঝতে সময় লাগল সবার। বুঝে উঠতেই হাসির রোল পড়ল। সিফাত, নাহিদ, অন্তর, হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। হাসছে সৈকত ও। কেবল বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছে রুবাব, মুন। দুজনেই চোখ মুখ খিচে বসে আছে।
সৈকত হাসতে হাসতে বলল, “স্যরি শালাবাবু।”

রুবাব রাগ নিয়ে চাইল। সবাই হাসছে। সেই হাসি থামল সুরমা বেগমের আগমনে। ধীর পায়ে এসে বসেছেন সবার মাঝে। তার চেহারায় হতাশা আর গভীর চিন্তা। অন্তর ভেবেছে ওর হাসির জন্য সুরমা বেগম কষ্ট পেয়েছে। সে অপরাধবোধ নিয়ে বলল,
” আন্টি, আমি আপনার উপর হাসিনি, অন্যকারণে হেসেছে। মাইন্ড করবেন না।”

সুরমা বেগম উদাস হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। নাহিদ বলল,
“আন্টি আপনি কি সৈকতের বিয়ে নিয়ে ভাবতেছেন?”

পরিস্থিতি গুমোট হয়ে এলো। সবাই গম্ভীর হয়ে সুরমা বেগমের দিকে তাকিয়ে আছে। সৈকতের চোখে ভয়, বাড়িতে ওর জন্য পাত্রী দেখেছে শুনলেই মুন মন খারাপ করবে। ওকে সামলানো কষ্টকর হয়ে যাবে। সৈকতের ভয়ের মাঝে সুরমা বেগম উত্তর দিলেন,
” ভাবতেই তো চাইছিলাম, কিন্তু পোলা রাজি হইল কই? গোঁ ধইরা বইসা আছে অহন বিয়া করব না। পরীক্ষায় টিকলে করব। এগুলো কোন কথা হইল?”

হতাশা চেয়ে গেল সুরমার স্বরে। সৈকত থম ধরে বসে আছে। ওর চোয়াল গম্ভীর। মুন এক পলক চাইল ওর দিকে। তারপর চোখ ফিরিয়ে সুরমা বেগমের দিকে তাকাল। নাহিদ বলল,
” ওর কথা তো খারাপ না, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বিয়ে করলে দায়িত্ব নড়বড়ে হয়ে যায়। এখন তো ওর নিজেরই চলতে কষ্ট হচ্ছে, বউ চালাবে কিভাবে? সেটেল্ড হয়েই বিয়ে করুক, সমস্যা কোথায়?”

” সমস্যা হইতাছে বাবা, পোলা এই শহরে একলা থাহে। অসুখে বিসুখে কেউ দেখবার নাই। আমার মন পুড়ে। বউ হইলে ত দেখবার কেউ থাকতো। আর আমাগো বয়স হইয়্যা যাইতাছে। তোমার আংকেল আর আমি দুইজনরেই অসুখে ধরছে। কোনদিন মইরা যাই ঠিক নাই। মরবার আগে নাতি পুতির মুখ দেখবার চাইতেছি। পোলা বিয়া দিলে বোর কোলে নাতি পুতি….

খুব মনোযোগ দিয়ে সুরমার কথা শুনছিল মুন। প্রথম দিকের কথা ঠিকঠাকভাবে নিতে পারলেও শেষ দিকে নাতিপুতির কথা আসতেই আকস্মিক বিষম খেল। চোখমুখ খিঁচে খু খু করে কেশে উঠল। মুনের আকস্মিক কাশিতে কথা থেমে গেল সুরমা বেগমের।

হুট করেই পরিবেশটাই বদলে গেল। এতক্ষণের গুমোট ভাব উবে গিয়ে আবার হাসিতে মুখরিত হলো চারপাশ। সুরমার কথায় মুনের দিকে ইঙ্গিত না গেলেও মুনের কাশিতে সবার মনে পড়ল, সুরমা বেগম ভবিষ্যতের মুনের কোলেই বাচ্চার আনার কথা বলেছেন, অজান্তেই। সুরমা বেগম ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। হতবাক হয়ে সবার হাসি দেখলেন। অবাক হয়ে বললেন,
“তোমার হাসছো কেন?”

হাসির জন্য কেউ উত্তর দিতে পারল না। সুরনা বেগমের চোখ পড়ল কাশতে থাকা মুনের দিকে। তিনি এগিয়ে গেলেন। মুনের পিঠ ঢলে বললেন,
“আমি তো আমার নাতিপুতির কতা কইতেছিলাম। তুমি কাইশা উঠলা ক্যান?”

এবার মুনের লজ্জার পরিমাণ আরও বাড়ল। সবার মাঝে আবার হাসির রোল পড়ল। সৈকতের চোয়াল থেকেও গম্ভীরতা উবে গিয়ে একটা রসিকতা দেখা যাচ্ছে। মুনের চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। সবার হাসিতে মেয়েটা লজ্জা বেড়ে গেছে। সৈকত আশপাশে পানি খুঁজল। রুবাবের পাশে পানি। রুবাবের সেদিকে খেয়াল নেই। সে হাসছে না, গম্ভীরমুখে বসে আছে। বিব্রত এবং চিন্তিত। ডাক্তার যাবার পর সৈকত রুবাবকে ডাকল। রুবাব গভীর চিন্তায় মগ্ন। বোনের ভবিষ্যত নিয়েই ভয় হচ্ছে তার। আবার না বোনটা গিয়ে গ্রামীণ বদ্ধ জীবনে পড়ে থাকে। পড়াশোনা ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে সংসার বাচ্চাকাচ্চায় জীবন পার করে। মুনের ব্রাইট ফিউচার। ওকে নিয়ে রুবাবের অনেক স্বপ্ন। বিয়ে হলেও পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হবে, এমনই আশা ওর। কিন্তু এখন শঙ্কা লাগছে….

সৈকত বলল,
“পানি তো দিবি শা লা? ”

রুবাব পানি এগিয়ে দিল গম্ভীর ভঙ্গিতে। সৈকত ওকে খেয়াল করল, কিন্তু কিছু বলল না। মুনের লজ্জাবনত মুখ দেখে সবাইকে ধমকে উঠল,
“এবার থাম তোরা।”

সৈকত খেয়াল করল মুন এখানে থাকতে অস্বস্তিবোধ করছে। এসব ব্যাপার স্যাপারে সে ঠাট্টা করবে পরে, এখন এত বেশি অস্বস্তি ফেলা ঠিক হবে না। সৈকত বলল,
” মুন তুমি ভার্সিটি যাচ্ছো না? দশটা বেজে যাচ্ছে।”

মুন সৈকতের দিকে তাকাল সরু চোখে। সৈকত ইশারা করল, চলে যেতে। মুন ব্যাগ নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, যাচ্ছি আমি।”

তড়িঘড়ি করে বের হয়ে গেল মুন। সুরমার কথা আবার জোড়া লাগল। এবার নাহিদ অন্তত আলাপে অংশ নিল। বলল,
” আন্টি আপনারা একটু বেশিই ভাবছেন। অসুস্থ হলে ডাক্তার আছে। ঢাকা এসে পড়বেন আমরা ভালো ডাক্তার দেখিয়ে দিব। ভালো হয়ে যাবেন। আল্লাহ ভরসা। সৈকতের যেহেতু পছন্দ আছে, সেহেতু বিয়ের ব্যাপারটা ওর উপর ছেড়ে দিন। মেয়ের পরিবার মানার ও একটা ব্যাপার আছে। তারা তো আর বেকার ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিবেনা। প্রতিষ্ঠিত হোক, বিয়ে তখন করবে না হয়।”

” কেমন না কেমন মাইয়্যা পছন্দ করছে, যদি কোন দোষ থাকে!” শঙ্কা দেখা গেল সুরমার চোয়ালে। রুবাবের চোয়াল শক্ত হলো।
ও কিছু বলার আগেই অন্তর বলল,
“কোন দোষ নাই আন্টি, মেয়ে আমাদের লাখে এক। সর্বগুণ সম্পূর্ণা। আপত্তির কোন কারণ পাবেন না।”

“তোমরা চিনো?”

নাহিদ হেসে বলল, ” আমাদের বোনই বলতে পারেন। সৈকতের বন্ধু হিসেবে আমাদের উপর যদি আপনার ভরসা থাকে, তবে এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আন্টি। আমাদের বোনের ভালো হওয়ার নিশ্চিয়তা আমরা দিচ্ছি।”

নাহিদ অন্তরের ভাব দেখে মনে হলো, মুন ওদেরই বোন। বড়ো ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করছে। ওদের দৃঢ়তা দেখে সুরমা বেগম শান্ত হলেন। এই ছেলেগুলোকে ভরসা করা যায়। ওরা যখন বলছে, ভালো নিশ্চয়ই ভালো হবে। তিনি আগ্রহী হলেন। বলল,
“পোলাডারে এত কইরা কইলাম, দেখাইলো না। তোমরাই দেখাও তোমাগো বইনরে। ”

মায়ের আগ্রহ দেখে সৈকত যারপরনাই অবাক। কদিন আগ অবধি এই মেয়ের কথাও শুনতে চাননি, এখন মেয়ে দেখার জন্য পাগল হচ্ছেন! যাক ভালোই। প্রসন্নতা দেখা গেল সৈকতের মুখে। সেই প্রসন্নতা বাড়ল সিফাতের কথা শুনে। সিফাত যখন বলল, মা মুনকে পছন্দ করেছেন তখন সৈকত মনে হচ্ছিল ও সাত আসমানে চলে গেছে। এত খুশি লাগছে…

______________

বিকেলবেলা ক্লাস শেষ করে হাসপাতালে এসেছে মুন। কেবিনে ডুকতেই সৈকত হাত টেনে কাছে বসিয়ে মাকে বলল,
” মা আমি এই মেয়েটাকে আমার জন্য বেছে নিয়েছি। ”

চলবে…..