অ্যাডিক্টেড টু ইউ পর্ব-১৯+২০

0
585

#অ্যাডিক্টেড_টু_ইউ
#অরনিশা_সাথী
#পর্ব_১৯

প্রায় ঘন্টা খানেক বাদে হিয়াজকে ঘুম পাড়িয়ে মামির কাছে রেখে এলাম। পৌনে বারোটা নাগাদ বাজে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। ভাবতে ভাবতেই দরজা ঠেলে রুমে ঢুকলাম। সত্যি সত্যিই দেখলাম কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে উনি। কাবার্ড থেকে ব্লু কালার গেঞ্জি আর খয়েরী রঙের প্লাজু নিয়ে ওয়াশরুমে গেলাম চেঞ্জ করতে। রাতে গেঞ্জি আর প্লাজু পড়ে না শুলে ঘুম হয় না। চেঞ্জ করে এসে উনার পাশে বসলাম৷ মাথার চুলগুলো আলতো ভাবে নেড়ে দিলাম। কপালে গভীর একটা চুমু দিয়ে উনার পাশে শুয়ে পড়লাম৷

আচমকাই কোমড় টেনে ধরে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নিলেন। উনি কি তবে জেগে ছিলো এতক্ষণ? ইশ্ কি লজ্জা, কি লজ্জা। আদ্র আমার গলায় উনার নাক ঘঁষে ফিসফিস করে বললো,
–“আমার ঘুমানোর সুযোগ নিয়ে আমায় চুমু খাওয়া হচ্ছে? কিন্তু বউ এটা তো তোমার বর মানবে না। জাগ্রত অবস্থায় চুমু চাই আমি।”

উনার কথা শুনে আমার চক্ষু চড়কগাছ। লজ্জায় তো আমার এক্ষুনি মাটির নিচে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে। উনাকে চুমু দিবো কি করে আমি? ভাবতে ভাবতেই আবার উনার গলা শুনতে পেলাম,
–“কি হলো? ওয়েট করছি তো, কাম ফাস্ট এন্ড কিস মি।”

লজ্জায় গাল লাল হয়ে গেলো আমার। তবুও উনার একই কথা, কিস চাই মানে চাই-ই আর সেটা এই মূহুর্তেই দিতে হবে৷
–“চোখ বন্ধ করুন।”

–“নো।”

–“প্লিজ, তাহলে এভাবে আমি কিস করতে পারবো না।”

–“এত কিছু তো জানি না৷ আমি চোখ খোলা-ই রাখবো, এখন তুমি কিস কিভাবে করবে সেটা তোমার ব্যাপার৷”

উনার এহেন কথায় আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলাম, কি করে কিস করা যায়? কিছু একটা মনে হতেই চট করে উনার কপালে চুমু দিয়ে সরে এলাম আমি। ঘটনার আকস্মিকতায় উনি হতভম্ব হয়ে গেলেন৷ তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বাঁকা হেসে বললো,
–“কপালে চুমু দিলে কেন?”

–“আপনি ঘুমিয়েছেন ভেবে তখন তো কপালে চুমু দিলাম।”

–“কিন্তু এখন তো কপালে চুমু দিতে বলিনি আমি।”

–“নামও তো উল্লেখ করে দেননি।”

আদ্র বাঁকা হেসে বললো,
–“ওকে ব্যাপার না, সবে তো কপালে চুমু খেলে, ধীরে ধীরে গালে ঠোঁটে গলায়__সর্বাঙ্গে চুমু খাওয়ার ট্রেনিংটা দিয়ে ফেলবো আমার মতো।”

আদ্রর লাগামহীন কথায় লজ্জা বেড়ে চলছে আমার। কিন্তু লোকটা থামছে না কিছুতেই। ইনি একবার মুখ খুললেই আমি লজ্জায় মরে যাই৷ লোকটা এমন কেন? সবসময় খালি লজ্জায় ফেলে আমায়। আদ্র আমার মুখোমুখি হয়ে আমার দু পাশে হাত রাখে। গলায় মুখ লাগিয়ে দেয় তৎক্ষনাৎ। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আবার নিজের বালিশে গিয়ে শুয়ে পড়ে। বাহু ধরে একটান দিয়ে আমাকে উনার উপরে নিয়ে আসে। বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হুট করেই ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দেয়৷ চোখ বড়বড় হয়ে যায় আমার। লোকটা কি আদর করা ছাড়া আর কিচ্ছু পারে না? মোচড়ামুচড়ি করেওব্লাভ হবে না তাই শান্ত হয়ে রইলাম। হুট করেই আমার কি হলো আমি নিজেও বুঝতে পারলাম না৷ আচমকাই আমিও রেসপন্স করতে শুরু করলাম। উনার সাথে তালে তাল মিলিয়ে চুমু খেয়ে যাচ্ছি। আদ্র চোখ বড়বড় করে তাকিয়েছে আমার দিকে। উনিও যে বেশ অবাক হইছে আমার কাজে তা উনার মুখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

বেশ কিছুক্ষণ বাদে উনার থেকে জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। বালিশে শুয়ে বুকে হাত দিয়ে সমানে হাঁপিয়ে যাচ্ছি৷ এই লোকটা চুমু খাওয়ার সময় যেন আর নিজের মাঝে থাকে না। আদ্র বালিশে বা হাতের কুনইয়ে ভর দিয়ে হাতের তালুতে মাথা রেখে বললো,
–“আমার বউটা তো দেখছি আমার থেকেও ভালো পারফর্ম করে। আই লাইক ইট।”

কথাটা বলে চোখ মারলেন উনি। লজ্জায় আমি পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম। আমার কান্ডে শব্দ করে হাসলেন উনি। তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে উনিও শুয়ে পড়লেন।

নাস্তা শেষ করে আদ্র মাত্রই রুমে গেলেন। আমি আম্মুর হাতে হাতে কাজ কিছুটা এগিয়ে দিয়ে এক মগ কফি বানিয়ে রুমে এলাম। দেখলাম উনি টাই বাঁধছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। আমি বেড সাইড টেবিলে কফির মগটা রেখে বললাম,
–“কোথাও বের হচ্ছেন?”

আদ্র গায়ে কোর্ট জড়িয়ে, পারফিউম লাগিয়ে আমার দিকে ঘুরে বললো,
–“অফিস থেকে ফোন এসছিলো, ইমপোর্টেন্স মিটিং পড়ে গেছে৷”

–“ফিরবেন কখন?”

আদ্র কফির মগটা হাতে নিয়ে বললো,
–“দুপুরের দিকে চলে আসবো।”

এই বলে আমার মুখের সামনে কফির মগটা ধরলেন। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই উনি বললেন,
–“বউয়ের ঠোঁটের ছোঁয়া না পেলে মিষ্টি লাগবে না৷”

লোকটার পাগলামিতে মৃদু হেসে কফির মগে চুমুক দিলাম। আদ্র আমার খাওয়া জায়গায় মুখ রেখেই কফি মুখে নিলো৷ তারপর বললো,
–“বুঝলে বউ, কফির টেস্ট এখন একদম ঠিক আছে৷ এরপর থেকে আগে তোমার ঠোঁটের ছোঁয়া দিবে কফিতে, তারপরই আমি খাবো।”

এইটুকু বলে পুরো কফিটা শেষ করে, মগটা বেড সাইড টেবিলে রাখলো৷ তারপর আমার দিকে ঘুরে মিনিট দুয়েক জড়িয়ে রাখলো নিজের সাথে। কপালে গভীর একটা চুমু খেয়ে বললো,
–“আসছি, সাবধানে থেকো।”

আমি সম্মতি জানাতেই উনি মৃদু হেসে বেরিয়ে গেলেন। কফির মগ নিয়ে কিচেনে চলে এলাম৷ মগটা ধুয়ে রেখে দিলাম। তারপর আম্মুর রান্নায় খুঁটিনাটি হেল্প করলাম৷ যদিও বা আম্মু বারন করেছিলো বেশ কয়েকবার তবুও জোর করেই সাহায্য করতে লাগলাম। মাছ ভাজার জন্য তেল গরম করছে আম্মু৷ আম্মুর থেকে এক প্রকার জোর করেই মাছের বাটি হাতে নিলাম। উদ্দেশ্য মাছ ভাজবো৷ আম্মু দেখিয়েও দিলো কিভাবে ছাড়তে হবে৷ আম্মুর দেখানো মতোই গরম ত্রলে মাছ ছাড়তে লাগলাম৷ কিন্তু শেষ রক্ষাটা হলো না৷ লাস্ট মাছের পিছটা তেলে ছাড়তেই তেল ছিটে এসে ডান হাতের উপর পিঠে লাগে বেশ কিছুটা জায়গায়৷ মৃদু চিৎকার করে উঠলাম আমি৷ আম্মু দ্রুত ঠান্ডা পানি এনে তাতে হাত ডুবালো৷ তারপর ফ্রিজ থেকে ডিম বের করে সেটা ফেটিয়ে পোড়া অংশে মাখিয়ে দিলো ভালো করে৷ হাতের যন্ত্রণায় চোখ দিয়ে দু ফোটা অশ্রু গড়ালো গাল বেয়ে৷ আম্মু রাগারাগি করলেন বেশ কিছু সময়, আম্মুর বারন স্বত্তেও মাছ ভাজতে যাওয়ায়৷ তখনই আব্বু এলেন বাসায়৷ আম্মুর রাগারাগি শুনে কিচেনে এগিয়ে এলেন৷ আমার হাতের এই অবস্থা দেখে দ্রুত ডক্টর আংকেলকে কল করলেন৷ তারপর আম্মুকে রাগান্বিত স্বরে বললেন,
–“মেয়েটাকে দিয়ে মাছ ভাজতে দিয়েছো কেন? খেয়াল রাখতো পারো না একটু? দেখলে কতটা পুড়ে গেছে৷ কিন যন্ত্রণা হচ্ছে আমার আম্মুটার।”

–“তোমার মেয়ে আমার কথা শুনলে তো? কত্তবার বারন করা স্বত্তেও জেদ ধরে মাছগুলো ভাজতে নিলো৷ আমি তো বারন করেছিলাম শুনলো না কেন তোমার মেয়ে?”

–“মেয়ে জেদ ধরলো আর তুমিও দিয়ে দিলে খেয়াল রাখবে না একটু এদিকে? ইশ্ কতটা পুড়ে গেছে। আমার মেয়েটা কিভাবে কাঁদছে দেখছো?”

–“এমন করছো যেন মেয়েটা তোমার একারই। কষ্ট মনে হয় তোমার একাই হচ্ছে আমার আর হচ্ছে না।”

কথাটা বলে আম্মু চোখের কোনে জমা পানিটুকু মুছে৷ আবার রান্নায় মনোযোগ দিলেন। আমি গিয়ে আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
–“তুমি কাঁদছো কেন আম্মু? তুমি কাঁদবে না প্লিজ।”

আম্মু আমার দিকে ঘুরে বললো,
–“আমার কথা কেন শুনো না রুহি? দেখলে কতটা পুড়ে গেছে? হাতের চামড়া উঠে গেছে। এখন কত কষ্ট হচ্ছে তোমার।”

–“কিচ্ছু হবে না আম্মু৷ ডক্টর আংকেল তো আসছেন৷ ঠিক হয়ে যাবে দেইখো।”

কলিংবেল বাজতেই আব্বু গিয়ে দরজা খুলে দিলো৷ ডক্টর আংকেল এসেছেন৷ তিনি আব্বুর খুব পুরোনো বন্ধু, তাই তো আব্বুর একটা ফোন পেয়েই নিজের হসপিটাল রেখে ছুটে এসেছন আমাদের বাসায়। আংকেল পোড়া স্থান ড্রেসিং কিরে মলম লাগিয়ে দিলেন৷ তারপর কিছু মেডিসিন আর মলম লিখে দিয়ে চলে গেলেন উনি।

হাতে অসহ্য যন্ত্রণা করছে৷ তাই রুমে এসে শুয়ে পড়লাম৷ কখন ঘুমিয়েছি জানি না৷ আদ্রর স্পর্শ ঘুম ভাঙলো আমার। কপালে ভালোবাসার স্পর্শ এঁকেছেন৷ উনি আমার হাত ধরতেই আমি মৃদু চিৎকার করে চোখমুখ খিচে বন্ধ করে নেই৷ আদ্র আমার হাতের দিকে তাকিয়েই অস্থির গলায় বললো,
–“পু্ পুড়লো কি করে হাত? কখন কিভাবে হইছে? কতখানি পুড়ে গেছে, তুমি ফোন করোনি কেন আমাকে? যন্ত্রণা হচ্ছে খুব তাই না? মেডিসিন নিয়েছো? আমরা ডক্টরের কাছে যাবো এক্ষুনি, চলো।”

–“আরেহ আস্তে৷ একসাথে এত প্রশ্ন করলে কোনটা রেখে কোনটার উত্তর দিবো আমি?”

–“আপাতত উত্তর দেওয়া লাগবো না, ডক্টরের কাছে যাবো চলো।”

–“রিল্যাক্স, শান্ত হোন আপনি৷ আব্বু ডক্টর আংকেলকে ফোন করেছিলেন উনি এসে ড্রেসিং করে মেডিসিন আর মলম দিয়ে গেছেন।”

–“পুড়লো কিভাবে?”

–“না মানে___”

–“সরাসরি বলো।”

–“মাছ ভাজতে গিয়েছিলাম, তখনই গরম তেল লেগে___”

ব্যাস! এইটুকুতেই আদ্র রেগে লাল হয়ে গেছে৷ চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
–“কিচেনে কেন গেছিলে তুমি? কে বলছিলো মাছ ভাজতে? এত পাকনামি করতে কে বলছে তোমায়? হাতের অবস্থা দেখছো? কত্তখানি পুড়ে গেছে।”

চলবে~

#অ্যাডিক্টেড_টু_ইউ
#অরনিশা_সাথী
#পর্ব_২০

সপ্তাহ খানেক পেরিয়েছে। হাতের পোড়া নিয়ে এ’কদিন বেশ ভুগতে হয়েছে। সেদিন বিকেলেই আদ্র আমাকে নিয়ে উনাদের বাসায় চলে আসেন। আর কড়া ভাবে জানিয়ে দেন সবাইকে আমার কিচেনে যাওয়া একদম নিষেধ। আদ্র’র কথা সকলে মেনেও নেন। লোকটা আমার সামান্য কিছুতেই একদম পাগল হয়ে যান। এ কদিন উনি নিজেই সকালে অফিস যাওয়ার আগে খাইয়ে দিয়ে যেতেন আর রাতে বাড়ি ফুরে রাতের খাবার খাওয়াতেন। দুপুরের খাবারটা মামনি, মাইশা বা তিন্নি ওদের মাঝে কেউ একজন খাইয়ে দিতো। এখন হাত মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে। নিজেরটা নিজেই করতে পারি।

সন্ধ্যা হয়েছে বেশ খানিকটা সময় হলো। হঠাৎই আমার ইচ্ছে হলো ছাদে যাওয়ার। আদ্র’ও বাসায় নেই। একা যাবো? নাকি মামনি আবার রাগ করবেন? এসব ভাবনার মাঝেই তিন্নি এলো রুমে। ভাবলাম ওকে নিয়েই যাবো৷ যেই ভাবা সেই কাজ। তিন্নিকে আলতো করে জড়িয়ে ধরতেই ও বললো,
–“কি ব্যাপার ভাবী? আজ এত ভালোবাসা দেখানো হচ্ছে যে? কোনো মতলব আছে নাকি?”

অভিমান করার ভাণ ধরে বললাম,
–“আমি বুঝি কোনো মতলবেই শুধু তোমায় জড়িয়ে ধরি?”

–“নাহ, তেমনটা না। তবে আজ কেন জানি মনে হচ্ছে অবশ্যই কোনো মতলব আছে। এখন ঝটপট বলে ফেলো তো কি মতলব আছে?”

–“চলো না, কফি বানিয়ে ছাদে যাই?”

–“তা কফি কে বানাবে শুনি?”

–“কেন আমি__”

–“তুমি আবার কিচেনে যাবে? না বাপু অকালেই ভাইয়ার হাতে মরার কোনো সাধ জাগেনি আমার। একবার কিচেনে গিয়ে হাত পুড়েছো মনে নেই?”

তিন্নির কথায় মুখ ভাড় হয়ে এলো আমার। পরক্ষণেই আবার হাসি ফুটে উঠলো ওর কথা শুনেই। তিন্নি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
–“তুমি চাইলে কফি আমি বানিয়ে নিতে পারি।”

আমি সম্মতি জানাতেই ও কিচেনে চলে গেলো কফি করতে। আমি মামনির রুমে গেলাম পারমিশন নেওয়ার জন্য৷ মামনির রুমের দরজা কিছুটা চাপানো ছিলো, আর পাপা আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছেন। তাই দরজা নক করলাম। মামনি ভিতরে যেতে বলতেই গুটিগুটি পায়ে ভিতরে গেলাম।
–“কিছু বলবি রুহি?”

–“মামনি একটু ছাদে যাই?”

–“হ্যাঁ তো যা। এতে আবার বলার কি আছে বোকা মেয়ে? মাইশা বা তিন্নিকে নিয়ে যাস।”

আমি ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই মামনি আবার বললেন,
–“আদ্র’র কি বারন আছে নাকি ছাদে যাওয়ার?”

–“ন্ না, উনি তো তেমন ভাবে কিছু বলেনি।”

–“আচ্ছা তাহলে যা। বেশি রাত করিস না। আদ্র অফিস থেকে ফেরার আগেই চলে আসিস রুমে।”

–“আচ্ছা মামনি।”

মামনির রুম থেকে বেরোতেই দেখলাম তিন্নি আর মাইশা কফি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনজনেই ছাদের সিড়ির দিকে পা বাড়ালাম।

রেলিঙের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তিনজনে কফি খাচ্ছি আর আড্ডা দিচ্ছি। আশেপাশের বিল্ডিংয়ের ছাদগুলোতেও মানুষের আনাগোনা। চারিদিকে চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে৷ পাখির কিচিরমিচির ডাক। আশেপাশের বিল্ডিংয়ের ছাদের মানুষ গুলোর হই হুল্লোড় পরিবেশটাকে আরো মুখরিত করেছে৷ হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আদ্র’দের ডান পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে একটা ছেলে বারবার আড়চোখে আমার গতিবিধি লক্ষ্য করছে। ছেলেটার চাহনীও বেশ অস্বাভাবিক লাগছে আমার কাছে। তাই তিন্নি আর মাইশার সামনে গিয়ে ছেলেটাকে আড়াল করে দাঁড়ালাম আমি। ছেলেটা বারবার উঁকিঝুঁকি মারছে। অস্বস্তি লাগছে বেশ। তাই ওদের নিয়ে নিচে নেমে এলাম আবার।

রুমের ঢুকার আগেই আদ্র’র মুখামুখি হলাম। উনিও তখনই রুমে ঢুকছিলেন। আমাকে দেখে এক ভ্রু কুঁচকে ফেললেন উনি। অতঃপর ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
–“কোথায় গেছিলে এসময়? ওদিকে তো মাইশা তিন্নিদের রুম না।”

উনার এরকম প্রশ্নে হকচকিয়ে গেলাম আমি। এই অসময়ে ছাদের যাওয়ার কথা শুনলে কি রেগে যাবেন উনি? আমতা আমতা করে বললাম,
–“ছাদে গেছিলাম।”

তৎক্ষনাৎ চোখ পাকিয়ে তাকালেন আমার দিকে। মাথা নিচু করে নিলাম। উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
–“অসময়ে ছাদে গেছিলে কেন? একা গিয়েছিলে?”

–“মামনিকে বলে গেছিলাম তো, সাথে মাইশা তিন্নিও ছিলো।”

–“ফাস্ট টাইম বলে কিছু বললাম না। এরপর থেকে আর অসময়ে ছাদে যাবে না। বিকেলে গিয়ে ঘুরাঘুরি করতে পারো, তবে সন্ধ্যার আগেই ছাদ থেকে নামতে হবে।”

আদ্র’র কথায় ঘাড় নাড়িয়ে সায় জানালাম আমি৷ তারপর বললাম,
–“যদি রাতে যেতে ইচ্ছে করে তখন?”

–“আমি নিয়ে যাবো।”

কথাটা বলেই আমার হাত ধরে রুমে প্রবেশ করে দরজা লক করে দিলেন। অফিস ব্যাগটা সোফার উপর রেখে কাবার্ড থেকে গেঞ্জি পেন্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলেন ফ্রেস হতে। আমি বিছানায় বসে পা দুলাচ্ছি। বিশ/পঁচিশ মিনিটের মাথায় আদ্র একেবারে শাওয়ার নিয়ে বের হলো। উনার হাত থেকে টাওয়াল নিয়ে ব্যালকোনিতে মেলে রেখে এলাম।

উনার জন্য এক মগ কফি করে রুমে আসতেই দেখি আবারো ল্যাপটপ নিয়ে বসেছেন উনি। মাত্রই তো অফিস থেকে ফিরলো। আবারো কাজ? রাগ হলো আমার কিন্তু প্রকাশ করলাম না। বেড সাইড টেবিলে কফির মগ রেখে বললাম,
–“কাজ ছাড়া আর কিছু বুঝেন না আপনি? অফিস থেকে এসে আবারো সেই ল্যাপটপ নিয়েই বসেছেন।”

আমার কথায় আদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো আমার দিকে। তারপর ল্যাপটপ বেডে রেখে আমাকে ঘুড়িয়ে উনার কোলে বসালেন। আচমকা এমন করাতে উনার গলা জড়িয়ে ধরলাম আমি। উনি আমার নাকের সাথে উনার নাক ঘঁষে দিয়ে বললেন,
–“বুঝি তো বউ, অনেক কিছুই বুঝি। কাজের ভিতর না ডুবে থাকলে যে তোমার ভিতর ডুবে থাকতে ইচ্ছে করে। অলওয়েজ তোমার মাঝে ডুবে থাকতে দিবে? তাহলে কাজ/টাজ সবই একেবারে ছেড়ে তোমাতে মত্ত থাকবো।”

–“চুপ, কিসব বলছেন?”

মিহি কন্ঠে বললাম। আদ্র মৃদু হেসে বললো,
–“সপ্তাহ খানেকের জন্য অফিসের কাজে চিটাগং যেতে হবে পরশু। তাই এখনই এদিকের কাজ কিছুটা গুছিয়ে রাখছিলাম।”

নিমিষেই মন খারাপ হয়ে গেলো। সাতদিনের জন্য আমার চোখের আড়ালে থাকবে? উনাকে না দেখে তো এক মূহুর্ত থাকতে পারি না। সাতদিন কিভাবে থাকবো? উনি বোধহয় আমার মন খারাপটা বুঝতে পারলেন। মুচকি হেসে আমাকে আর একটু গভীর ভাবে ধরলেন। তারপর বললেন,
–“মন খারাপ?”

–“উঁহু।”

–“তাহলে চোখে পানি কেন?”

আমি অন্যদিকে ঘুরে চোখের কোনে জমা পানিটুকু মুছে নিয়ে বললাম,
–“কই চোখে পানি? নেই তো।”

আদ্র আমার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
–“আমাকে মিথ্যে বলছো? আমাকে?”

এবার আমি আর কিছু বললাম না। চুপচাপ উনার কোল থেকে উঠতে গেলে আবারো শক্ত করে চেপে ধরলো। তাই বাধ্য মেয়ের মতো সেখানেই বসে রইলাম। আদ্র কফির মগ হাতে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। বিনা বাক্যে এক ছিপ নিয়ে নিলাম। কারন আমি কফি না খেলে উনি কিছুতেই খেতেন না। আমি খাওয়ার পর এবার উনি খেতে শুরু করলেন।

সবাই একসাথে রাতের খাবার শেষ করলাম। আমি মামনির হাতে হাতে ডাইনিং থেকে সবকিছু কিচেনে নিয়ে রাখছিলাম। খাওয়া শেষ হতেই উনি বললেন,
–“রুহি রুমে এসো।”

–“আপনি যান আমি আসছি।”

আমার কথায় উনি সন্তুষ্ট হলেন না। তা উনার মুখ দেখেই বেশ বোঝা গেলো। মিনিট দুয়েক বাদে উনি আবারো বললেন,
–“রুমে আসতে বললাম তো, ঘুমাবো আমি।”

–“আপনি গিয়ে ঘুমান। আমি কাজগুলো সেরেই আসছি।”

আদ্র এবার রাগান্বিত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে থমথমে পায়ে উপরে উঠে গেলেন। উনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। মামনি বললো,
–“দিলি তো ছেলেটাকে রাগিয়ে৷ রুমে যা তুই, এইটুকু আমি করে নিতে পারবো।”

–“ছাড়ো তো তোমার ছেলের কথা।”

এইটুকু বলে আবারো সবকিছু গুছাতে শুরু করলাম। আমার উপর রাগ দেখাচ্ছে দেখাক, নিজে তো পরশু চলেই যাবে। এখন এত ভালোবাসা দেখাতে হবে না। মন খারাপ করে ভাবছি এসব। মামনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললো,
–“রুমে যা। টেম্পারেচার হাই আছে কিন্তু, আর একটু লেট হলেই ব্লাস্ট করবে।”

আমি মামনির দিকে তাকাতেই মামনি আমার গালে হাত রেখে বললো,
–“দুজনের কি ঝগড়া হয়েছে? মন খারাপ কেন?”

–“তোমার ছেলে পরশু চিটাগং যাচ্ছে অফিসের কাজে সাতদিনের জন্য।”

মুখ গোমড়া করে কথাটা বলতেই মামনি হেসে দিলেন। তারপর বললেন,
–“এজন্যই বুঝি মন খারাপ?”

কিছু না বলে মাথা নিচু করে নিলাম। মামনি আলতো হেসে বললো,
–“মক্ন খারাপ করে না বোকা, কিছুদিনেরই তো ব্যাপার। এখন রুমে যা।”

আমি সম্মতি জানিয়ে রুমে চলে এলাম। আদ্র সোফায় বসে মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কিছু একটা করছিলেন। আমি উনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ উনি একবার তাকিয়ে আবারো চোখ সরিয়ে নিলেন। উনার কোল থেকে ল্যাপটপ নামিয়ে টি-টেবিলে রেখে দিলাম। এবার উনি পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন,
–“কাজ করছিলাম তো।”

–“একটু আগেই নিচে না বললেন ঘুম পেয়েছে? তাহলে এখন না ঘুমিয়ে ল্যাপটপে কি করছিলেন?”

–“তখন একজন আমাকে টোটালি ইগনোর করেছে৷ এখন কি আমার উচিত না তাকেও ইগনোর করা?”

–“একদমই না।”

–“কেন?”

–“কারন আপনি জানেন, আপনি যদি তাকে ইগনোর করে তাহলে সে কেঁদে-কেটে নাকের জল চোখের জল এক করে ফেলবে৷ আর আপনি নিশ্চয়ই তার চোখের পানি সহ্য করতে পারেন না।”

আদ্র উঠে দাঁড়িয়ে একটানে কোলে তুলে নিলেন আমায়। বিছানার দিকে এগোতে এগোতেই বললেন,
–“তাহলে তার এটাও জেনে রাখা উচিত, শুধু তার চোখের পানিই না, তার সামান্য মন খারাপটাও আমি সহ্য করতে পারি না।”

কথাগুলো বলে বিছানায় শুইয়ে দিলেন আমাকে। আমি উনার গলা জড়িয়ে রেখেই বললাম,
–“তাহলে আপনিও এটা জেনে রাখুন, তার মন খারাপটা কিন্তু বেশি সময় আপনার জন্যই হয়।”

আদ্র আমার নাক টেনে দিয়ে বললো,
–“জাস্ট এ মিনিট, আসছি তার মন খারাপটা সারিয়ে তুলতে।”

কথাগুলো বলেই উনি গিয়ে রুমের লাইট অফ করে দিলেন। ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন আমার দিকে। আমি উলটো ঘুরে চোখমুখ খিচে শুয়ে রইলাম। উনার ভিতরে এখন কি চলছে তা বোঝার বাকি নেই আমার। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন আমায়। পেট থেকে শাড়ি সরিয়ে উম্মুক্ত পেট খামচে ধরলেন। উনার ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠলাম আমি৷ উনার দিকে ঘুরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মুখ লুকালাম উনার বুকে। মুখের উপর উপচে পড়া চুলগুলো কানের পিঠে গুজে দিয়ে কানের লতিতে কামড় বসালেন। জোড়ে জোরে শ্বাস নিচ্ছি। বুক উঠানামা করছে দ্রুত। আদ্র আমাকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে আমার উপর উঠে গেলো। বুক থেকে শাড়ির আঁচল সরিয়ে গলায় মুখ ডুবালেন। প্রচন্ড উত্তেজনায় খামচে ধরলাম উনার চুল।

চলবে~