অ্যাডিক্টেড টু ইউ পর্ব-২৭

0
599

#অ্যাডিক্টেড_টু_ইউ
#অরনিশা_সাথী
#পর্ব_২৭

ঘড়ির কাটায় ঠিক রাত বারোটা বেজে এক মিনিট। আজ আমাদের বিয়ের এক বছর পূর্ণ হলো। সারারুম খুব সুন্দর করে লাল গোলাপ এবং ক্যান্ডেল দিয়ে সাজানো হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি। আদ্র ঠিক রাত বারোটায় আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে সারপ্রাইজ দেয়। পুরো রুম সাজিয়ে কেক টেক এনে উইশ করে আমাকে। উনার এহেন কান্ডে মুখে এক চিলতে হাসি ফুটলো আমার। হঠাৎই মনে হলো উনি একাই কেন সারপ্রাইজ দিবে আমাকে? আমিও তো সারপ্রাইজ দিতে পারি। যেই ভাবা সেই কাজ। চট করে বিছানা থেকে নেমে গেলাম। আমাকে নামতে দেখে আদ্র বললেন,
–“আরেহ, কি করছো? আস্তে নামো পরে যাবা তো। আর এভাবে কোথায় যাচ্ছো তুমি?”

আমি পেছন না ফিরেই বললাম,
–“একটু অপেক্ষা করুন, এখনই আসছি।”

কথাটা বলেই আলমারির কাছে চলে গেলাম। সেখান থেকে ছোট্ট একটা বক্স বের করে আবার উনার কাছে চলে এলাম। বক্সটা উনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে উনার গাঁ ঘেঁষে বসে পড়লাম আমি। আদ্র জিজ্ঞেস করলো,
–“কি আছে এতে?”

আমি মৃদু হেসে বললাম,
–“খুলেই দেখুন না।”

আমার কথামতো আদ্র বক্সটা খুললো। কাঁপা কাঁপা হাতে বক্সে থাকা কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা হাতে তুলে নিলো। প্রেগ্ন্যাসির রিপোর্ট হাতে নিয়ে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ আদ্র আমার দিকে ঘুরে আমার গালে হাত রেখে বললো,
–“স্ সত্যি এটা?”

আদ্র’র কথায় লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিলাম। আদ্র শক্ত করে আমাকে বুকে চেপে ধরলেন। আমিও মৃদু হেসে হাত রাখলাম উনার পিঠে৷ আদ্র সারা মুখ জুড়ে অজস্র চুমু খেয়ে বললো,
–“আ্ আমি কত খ্ খুশি হয়েছি তোমাকে ব্ বলে বোঝাতে পারবো না রুহি। বা্ বাবা হবো আমি…পৃথিবীর সবথেকে সুখময় অনুভূতিটা তুমি আজ আমাকে দিলে। আম্ আমি কি বলবো কি করবো কিচ্ছু ভেবে পাচ্ছি না বউ। আ’ম সো হ্যাপি বউ, সো হ্যাপি।”

আদ্র’র কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলা এই কথাগুলো আমার হৃদয়ে ঝংকার তুলে দিলো। অসম্ভব ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো মন। ফাইনালি আমরাও বাবা মা হবো। খুশিটা বোঝানোর মতো না। আদ্র আবার আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললো,
–“টেস্ট কবে করালে তুমি?”

আমি মাথা নিচু করে বললাম,
–“রেস্তোরাঁয় আপনাদের বসিয়ে রেখে আমি আর ফারাবী ভাইয়া একটু বেরিয়েছিলাম না? তখনই কাছের একটা হসপিটালে গিয়ে টেস্ট করিয়েছি।”

আদ্র এবার ছোট ছোট চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
–“তার মানে তুমি আগে থেকেই জানতে?”

আমি ইনোসেন্ট মুখ করে বললাম,
–“আন্দাজ করেছিলাম কিছুটা তবে পুরোপুরি সিউর ছিলাম না। তাই তো ফারাবী ভাইয়াকে নিয়ে গিয়ে টেস্ট করিয়েছিলাম।”

আদ্র এবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বললো,
–“এই যে মাথা চক্কর দিচ্ছে, খাবার দেখলে গাঁ গুলিয়ে আসছে, বমি বমি ভাব সবকিছুই তাহলে প্রেগ্ন্যাসির কারনে হচ্ছিলো?”

আমি মাথা নিচু করেই ছোট্ট করে জবাব দিলাম,
–“হুম।”

আদ্র এবার রাগান্বিত স্বরে বললেন,
–“তাহলে আগে জানালে না কেন আমায়? তখনও যে বললাম চলো ডক্টরের কাছে নিয়ে যাই তখনো গেলে না। অথচ পরে ঠিকই ফারাবীকে নিয়ে গেছিলে।”

আমি আদ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম,
–“আপনাকে যদি নিয়ে যেতাম তাহলে এখন কি এই সারপ্রাইজটা দিতে পারতাম বলুন?”

আমার কথায় আদ্র ঠোঁট কামড়ে ধরে হেসে ফেললেন। তারপর আমার গাল টেনে দিয়ে বললেন,
–“আমার পিচ্চি বউটাও মা হবে। আমার ঘরে লিটেল রুহি আসবে, ইশ্ ভাবা যায়?”

আমি আদ্র বুক থেকে মুখ তুলে বললাম,
–“মোটেও না, আমার লিটেল আদ্র চাই।”

আদ্র জোড় গলায় বললো,
–“উঁহু, আমার লিটেল রুহিই চাই।”

আমি মুখ গোমড়া করে বললাম,
–“একদমই না, আমার লিটেল আদ্রকে চাই।”

আমার বাচ্চামোতে আদ্র হেসে ফেললেন, তারপর বললেন,
–“আচ্ছা, আমাদের লিটেল রুহি এবং আদ্র দুজনকেই চাই। কেমন?”

উনার এমন কথায় লজ্জায় গাল লাল হয়ে এলো আমার। তা দেখে উনি শব্দ করে হাসলেন। উনার হাসিতে লজ্জাটা আরো বেড়ে গেলো আমার, দ্রুত উনার বুকে মুখ লুকালাম।

সারা বাড়িতে উৎসব উৎসব কলরব। চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলের প্রথম সন্তান আসছে বলে কথা। সারা বাড়িতে উৎসবের আমেজ আজ। কাল সারা-রাত আদ্র না নিজে ঘুমিয়েছে আর না আমায় ঘুমোতে দিয়েছে। আজ সকাল সকাল উঠে আদ্র সবাইকে আমাদের বাবু হওয়ার খবরটা জানানোর পর থেকেই বাড়িতে হই হুল্লোড় লেগে আছে৷ মামনি নানান ধরনের রান্না করছে। যার বেশিরভাগই আমার পছন্দের খাবার। তারউপর আবার আব্বু আম্মুকেও ডেকেছেন আদ্র। মাইশা সকাল সকালই এসে পড়েছে ফুপ্পি হওয়ার আনন্দে। আমার কাজিনমহলও এসে হাজির ইতিমধ্যেই। যেখানে সবাই আমাকে নিয়ে ব্যস্ত সেখানে আমিই সকাল থেকে ঘুমিয়ে কাটাচ্ছি। আদ্র’র সাথে সারা রাত জাগার পর সকালের দিকে চোখ লেগে এসেছে আমার। তাই আজ আদ্র আর ডাকেনি আমায়। নিচে আমাকে নিয়েই সবাই মাতামাতি করছে, আমার জন্যই আজ সকলে এখানে উপস্থিত অথচ আমিই নিচে কারো সঙ্গে নেই। উপরে নিজের ঘরে বেঘোরে ঘুমোচ্ছি আমি। মাইশা এসে বেশ ক’বার ডাকতে চেয়েছে আমায়। কিন্তু আদ্র’র কড়া নিষেধ, আমাকে ডাকা যাবে না। রাতে ঘুম হয়নি আমার।

বেলা এগারোটা নাগাদ ঘুম ভাঙলো আমার। আড়মোড়া ভেঙে শোয়া থেকে উঠে বসতেই নিচ থেকে হই হুল্লোড়ে মেতে থাকা সকলের কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম আমি। অলস ভঙ্গিতে বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। একেবারে শাওয়ার নিয়ে বেরোতে বেরোতে সাড়ে এগারোটা/পৌনে বারোটা নাগাদ বেজে গেলো। পিত্তি কালারের জর্জেট শাড়ি পড়েছি আজ। চুলগুলো ভালো করে মুছে নিয়ে সাইডে সিথি করে ছেড়ে দিলাম চুলগুলো। তারপর অলস ভঙ্গিতেই রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। অন্যমনস্ক ভাবে সিড়ি দিয়ে নামতে গেলেই শাড়িতে পা বেজে পড়ে যাচ্ছিলাম। তখনই দু হাতে কেউ একজন আমাকে আগলে নেয়। চোখ তুলে তাকাতেই তিন্নিকে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এই মূহুর্তে আদ্র হলে তো কোনো কথাই ছিলো না। আবার একগাদা কথা শুনিয়ে দিতো সাবধানে চলাফেরা না করার জন্য। তিন্নি আমাকে ঠিক ভাবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললো,
–“ভাবী এখন তো আর তুমি একা নও, একটু সাবধানে চলাফেরা করবে তো।”

আমি মৃদু হেসে বললাম,
–“স্যরি, খেয়াল ছিলো না।”

–“তা খেয়াল থাকবে কেন? থাকো তো সারাদিন অন্য দুনিয়ায়। আচ্ছা কি নিয়ে এত ভাবো বলো তো? পড়াশোনা নিয়েও তো চিন্তা করো না তাহলে কি নিয়ে ভাবো? এখন থেকে শাড়ি পড়া বন্ধ তোমার৷ আমাদের বেবি দুনিয়াতে আসুক, বড় হোক তারপর আবার শাড়ি পড়বে।”

আদ্র’র কন্ঠস্বর শুনেই চমকে উঠলাম। যার ভয় পাচ্ছিলাম তাই হলো। সেই, লোকটা দেখেই ফেললো। আমি মুখ গোমড়া করে কিচেনে মামনির কাছে গিয়ে বললাম,
–“দেখলে মামনি? তোমার ছেলে বকছে আমাকে। আমি কি ইচ্ছে করে পড়ে যাচ্ছিলাম নাকি?”

মামনি আলতো হেসে আমার গালে হাত রেখে বললো,
–“আচ্ছা আদ্র’কে বকে দিবো আমি। কিন্তু তোরও সাবধানে চলাফেরা করতে হবে মা।”

–“হুম।”

মামনি হেসে আমার কপালে চুমু খেলেন, তারপর বললেন,
–“টেবিলে খাবার দিচ্ছি, আদ্রকে নিয়ে বসে পড়। আমার ছেলেটাও খায়নি তোর সাথে খাবে বলে।”

আদ্র’র পাগলামিতে দু চোখ জলে ভরে উঠলো আমার। লোকটা এমন কেন? ভাবতে ভাবতেই আদ্র কাছে এসে পড়লাম। তারপর উনার দিকে তাকিয়ে রাগী স্বরে বললাম,
–“কত বেলা হয়েছে, এখনো খাননি কেন?”

আদ্র আমার নাক টেনে দিয়ে বললেন,
–“আমার বউটাও যে খায়নি সেজন্য। এখন চলো তো, ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে আমার।”

কথাটা বলেই আমার হাত ধরে ডাইনিংয়ে নিয়ে গেলেন। চেয়ার টেনে দিয়ে আমাকে বসিয়ে উনি নিজেও আমার পাশে বসলেন।

দেখতে দেখতে আমার বাবু ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে এসেছে। কয়েকদিন বাদেই ডেলিভারি ডেট দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রচুর ঘাবড়ে আছি আমি। আদ্র মামনি সবাই সাহস দিচ্ছে আমাকে। কিন্তু আমার ভয় কাটছে না কিছুতেই। দিন পনেরো আগেই বাবার বাড়ি চলে এসেছি আমি। এ নিয়ে আদ্র’র ভীষণ বারন ছিলো। ও কিছুতেই আমাকে বাবার বাড়ি যেতে দিবে না। শেষে আমার জেদের কাছে হার মেনেই রাজি হয় আমাকে বাবার বাড়ি পাঠাতে। তবে আদ্র’ও আমার সাথেই ছিলেন। ওর এক কথা, যাই হোক না কেন? যে যা ভাবার ভাবুক, ও আমার সাথেই থাকবে। ওর এমন পাগলামিতে আদ্র’দের বাড়ির এবং আমাদের বাড়ির সকলেই বেশ হাসি তামাশা করেছে। পাপা মামনি মাঝে মাঝেই এ বাড়িতে এসে আমাকে দেখে যায়৷ মাইশা আর ইরান ভাইয়াও এসেছিলো কয়েকবার। আর তিন্নি তো প্রায় প্রতিদিনই ক্লাশ শেষে একবার আমাদের বাড়ি ঢুঁ মেরে যায়। আর আদ্র’র কথা কি বলবো? উনি সারাদিন অফিস করে রাতে এ বাড়ি আসে। আবার সকাল হতেই ব্রেকফাস্ট সেরে অফিস চলে যায়। এভাবেই চলছে সবকিছু।

ডেলিভারি ডেটের সাত/আট দিন আগেই পেইন উঠে আমার। দুপুর সোয়া দুইটা নাগাদ বাজে। আব্বু মসজিদে গেছে নামায পড়তে। কিছুক্ষণের মাঝেই চলে আসবে। আম্মু নামায আদায় করে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিলেন। আমি রুমে বসে আদ্র’র সাথে কথা বলছিলাম ফোনে। লোকটা প্রতিদিনই এসময় ফোন করবে। উনার অফিসে লাঞ্চ টাইম চলছে এখন। লাঞ্চ করার আগে সবসময়ই ফোন করে জেনে নিবেন আমি খেয়েছি কিনা? নিয়ম মোতাবেক আজও ফোন দিয়েছেন। আদ্র খেতে খেতেই কথা বলছে আমার সাথে। এর মাঝে আম্মুও বেশ ক’বার খেতে ডেকেছে আমাকে। কথা বলতে বলতে একসময় হঠাৎ করেই ভীষণ পেইন উঠে আমার। পানি ভাঙছে খুব। ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে কেঁদে উঠি। আমার চিৎকারে আম্মু দ্রুত দৌড়ে আমার রুমে আসেন। আদ্র’ও ফোনের ওপাশে অ/স্থি/র হয়ে আছেন। আম্মু ফোন হাতে নিতেই আদ্র দ্রুত বললেন,
–“মামনি আপনারা রুহিকে নিয়ে বের হোন আমি সরাসরি হসপিটালে গিয়ে সবকিছু এরেঞ্জ করছি।”

আম্মু হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানাতেই আদ্র ফোন কেটে দিলেন। আব্বুও ততক্ষণে চলে এসেছেন। অতঃপর আম্মু রুপ ভাইয়াকে ফোন করে দ্রুত বাসায় ডাকলেন। মিনিট পাঁচেকের মাথায়ই রুপ ভাইয়া গাড়ি নিয়ে হাজির হলেন। রুপ ভাইয়া আমাকে কোলে করে গাড়িতে উঠালেন। তখনো ব্যাথায় চিৎকার করছি আমি।

হসপিটালে পৌঁছাতেই আদ্র দৌড়ে আমার কাছে এলেন। আমার হাত ধরে আমাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করছেন উনি। আমার মন মানছে না কিছুতেই। আদ্র আমার গালে হাত দিয়ে বললো,
–“ভয় পেও না, সবকিছু ঠিকঠাক হবে দেইখো।”

আমি আদ্র হাত ধরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম,
–“ভ্ ভয় হচ্ছে খুব আমার। আমি আ্ আপনাকে হা্ হারিয়ে ফেলবো না তো?”

আদ্র আমার কপালে ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে বললেন,
–“হুশ! একদম উ/ল্টা/পা/ল্টা চিন্তা করবে না। কিচ্ছু হবে না তোমার।”

কথাগুলো বলতে বলতে আমাকে ওটির সামনে নিয়ে এলো। ততক্ষণে মামনি পাপা মাইশা ওরা সকলেই এসে পড়েছে। প্রচন্ড ভয়ে বুক কাঁপছে আমার। আদ্র’র চোখেও পানি। লোকটা ভেজা চোখেই বিদায় দিলেন আমাকে। আমিও অশ্রুসিক্ত নয়নেই তাকিয়ে রইলাম উনার দিকে।

চলবে~