#আকাশেও_অল্প_নীল
#পর্বঃ৩১
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি
৯৭,
রাইমার ঘরে বসে আছে রাইমা, শার্লিন, এবং মাহিশা। ঘরের দরজা লাগিয়ে দেওয়া। আর কাউকে রুমে ঢুকতে আপাতত বারণ করে দিয়েছে রাইমা। সময় টা দুপুর ৩টার কাছাকাছি। ১টা বাজতে বাজতে মাহিশা, তার বাবা মা স্বামী সহো এসেছে রাইমার বিয়ে উপলক্ষে। মাহিশাকে একা আসতে দিবে না বলেই তাদের আসতে এতোটা দেরি হলো। এরপর ফ্রেশ হওয়া, খাওয়া দাওয়ার পাট চুকাতে চুকাতে তিনটা বেজে গেলো। শাহনাজ বেগম তো মাহিশাকে এতোগুলো বছর পর দেখে ইমোশনাল হয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছিলেন। সব সামলে এতোক্ষণে কথা বলার সুযোগ হলো তাদের। রাইমা নিজের ব্যক্তিগত ভাবে মাহিশার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলো। খাটের দুই মাথায় বসে আছে দুজন। শার্লিন দাড়িয়ে দাড়িয়ে নখ খুটছে আর দুজনকে দেখছে। বাইরে সাউন্ড বক্সে গান চলছে, সেই সাথে বাচ্চাদের নাচানাচি, হইচইয়ের শব্দ কানে এসে বারি খাচ্ছে তাদের। চারপাশের পরিবেশ মোটেও শান্ত নয়। কিন্তু তাদের তিনজনের মাঝেই অস্থিরতার শান্ত স্রোতের ধারা বয়ে চলেছে। সব নিরবতা ভেঙে শার্লিনই বললো,
“তোমরা দুজন এতো চুপচাপ বসে থাকতে কি ঘরের খিল এঁটে বসে আছো? আমি আর একদণ্ডও চুপচাপ থাকতে পারছিনা৷”
“শালু, একটু চুপ থাক, এখনকার মতো। নয়তো বেরিয়ে যা। তুই নিজেই আমরা কি বলি শুনতে থেকে গেছিস। এখন হয় চুপ করে থাক। নয়তো চলে যা।”
রাইমা কিছু টা ধমকের সুরেই কথাগুলো বললো। শার্লিন রাইমার কথা শুনে বুকে হাত বেঁধে গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। মাহিশা একপলক শার্লিনকে দেখলো। জোড় করে হাসার চেষ্টা করলো একটু। এরপর বললো,
“আমার কার্বন কপি পুরোই। তাইনা?”
“হুম, তোর থেকে একটা বিষয়ে শুধু অমিল। তুই না জানিয়েই সব করতি, এ আমায় ছাড়া এক কদমও তুলতে ১০০বার ভাবে।”
“তাহলে তো বেশ ভালোই। আমার শূণ্যতা তোকে পোড়া”য়নি।”
“শূণ্যতা একজনের, তার শূণ্যতা অন্যজন কি করে পূরণ করে? সবাই সবার চেষ্টায় নিজের জায়গা তৈরি করে নেয় অন্যের জীবনে। অন্য কারোর জায়গা দখল করতে আসেনা।”
৯৮,
মাহিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“বাদ দে সেসব কথা। কেমন আছিস? আসার পর থেকে এই কথাও জানতে পারিনি, জানার সুযোগ টাই হয়নি।”
“আলহামদুলিল্লাহ যেমন রেখে গিয়েছিলি? তার থেকে অনেক বেশিই ভালো। তুই? ”
“আছি আলহামদুলিল্লাহ ভালোই।”
“অবশ্য ভালো থাকারই কথা। ভালো থাকতেই তো এতোগুলো মানুষকে বিপ”দে ফেলে রেখে গেছিলি। আচ্ছা তোর কি বিবেকে বাঁধেনি? একবারও আংকেল-আন্টি, ইফরাদ ভাইয়ের মুখটা চোখে ভাসেনি?”
“ভেসেছে, কিন্তু তারাও তো আমার কষ্ট টা বোঝেনি। সেই মেনে ঠিকই নিলো শেষে। শুধু মাঝখানে এতো ঘটনা ঘটে গেলো।”
“আমি বোধ হয় তোর জীবনের সেই মানুষ টা হতে ব্যর্থ হয়েছিলাম, যার কাছে দ্বিধা ছাড়াই সব বলা যায়,তাইনা? অথচ তোর কাছে আমার কিছুই আড়াল থাকতো না।”
“বাদ দে না অতীতের কথা। বর্তমান টা বেশি সুন্দর নয়?”
“অবশ্যই সুন্দর। কিন্তু তুই আংকেল আন্টির কাছে ফিরতে পারলি, তোর শোকে যে আরও একটা মানুষ রাত দিন মনে পরলেই কাঁদতো! তার কথা কি তোর মনে পরতো না? দেখা করতে ইচ্ছে হয়নি? একবার যোগাযোগ করার ইচ্ছে হয়নি?”
“তোকে মনে পরতোনা বললে ভুল হবে। মনে তো অবশ্যই পরতো। দেখে যেতাম, দূর থেকেই দেখে যেতাম। আমার জন্য যেই কথার আ”ঘাত আর অসম্মান সহ্য করতে হয়েছে তোর? আমি পারিনি তোর মুখোমুখি হওয়ার সাহস যোগাতে। কিন্তু সবাই যখন তোর বিয়ে উপলক্ষে একত্রিত হলো! লোভ টা সামলাতে পারিনি৷”
“মাঝে মাঝে হুটহাট যে গাড়ি নিয়ে বাড়ির সামনে দাড়িয়ে থাকতি! বাসায় ঢোকার সাহস হতো না? নাকি বাসায় ঢুকলে তোকে মে”রে ফেলতাম?”
“টের পেতি তুই?”
“আমি তো অন্ধ নই? তারমাঝে আমি কোন সময় কোথায় দাড়িয়ে থাকি! তুই-ই জানতি। সেই সময় বুঝেই তো যেতি। আমায় নিচে নামতে দেখলেই এই যে চলে যাওয়ার বিষয়টা! কেনো করতি? আমায় টেনশনে ফেলে কি শান্তি পেতি? চারটা বছর মাহিশা! চার চারটা বছর। তোকে মনে পরলে এভরি সিঙ্গেল সেকেন্ড আমার যে কি যন্ত্র”ণায় পার হয়েছে। আই উইশ যদি টের পেতি! তাহলে হয়তো বুঝতি, সম্পর্কের গভীরতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছিলো।”
রাইমা কথাগুলো বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলেছে প্রায়৷ মাহিশা ওকে আগলে ধরতে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসার আগেই শার্লিন দৌড়ে এসে রাইমাকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নেয়। মাহিশা তা দেখে মৃদু হেসে চোখের কোণায় জমা জল মুছে নেয়। রাইমা কাঁদতে কাঁদতেই বলে,
“ভালোবাসার মানুষগুলো একবার ঘৃণা করতে শুরু করলে সেই ঘৃণার পাহাড় সরানো দায় মাহি। আমি তোকে কখনও ক্ষমা করবোনা কখনও না। অবশ্য তাতে তোর কিছু যায় আসেনা। চার টা বছর থাকতে পারলে বাকি জীবনটাও পারবি। কারণ আমি জানি, আমি যে গুরুত্ব তোকে দিয়েছি, সেই গুরুত্ব তুই আমায় দিসনি। যে কারণে আজ এই পরিস্থিতিতে দাড়িয়ে আছি দুজনেই।”
“ঠিকই বলছিস হয়তো, তোর কাছে ক্ষমা আমি চাইবোনা। কারণ এটার যোগ্য আমি না। তবে আমি যা পারিনি, এই যে মিষ্টি মেয়ে! সে পেরেছে। তোর মতো নরম মানুষ টাকে আগলে রাখতে সে একাই পারবে। দুলাভাইও এসে গেলো জীবনে। তোকে নিয়ে আমার আর ভয় নেই।”
মাহিশা কথাগুলো বলেই শাড়ির আঁচল আকড়ে উঠে দাড়ালো। দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। যেতে যেতে চোখের জলের বয়ে চলা ধারা টা আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলো। আবেগের বয়স ছিলো, বাস্তবতা বুঝেনি, সম্পর্কের দায়ভার, দায়িত্ব, গুরুত্ব এসব কমই বুঝতো। ভালোবাসার মানুষ টাকে পেয়ে গেলে জীবন সুন্দর হবে, পরে তো সবাই মেনেই নিবে। এই ভেবে এতো মানুষকে যে কষ্ট দিয়ে ফেলেছিলো, এটা সব ঘটে যাওয়ার পর বুঝেছে সে। অপরাধ বোধে ভুগতে ভুগতে কোনো কিছু ফিরে পাওয়ার তাগিদ আর নেই তার। কারণ সে বুঝে গেছে সে এসবের যোগ্য না। সবাই যখন নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে, সেখানে ফেরত এসে আবার একটা ঝড় বইয়ে দেওয়ার মানে হয়নি। কিন্তু মাহিশা ভুলে গেছিলো, তার আরও একটা মা-বাবা, ভাইবোন ছিলো। সেটা আজ এখানে না আসলে বুঝতোই না। কিছু ভুল আছে শোধরানো যায় না। এই ভুলগুলো তো জমে জমে অপরাধের পাহাড় হয়ে দাড়িয়েছে। এই অপরাধের ক্ষমা হয় না, হয় শাস্তি। আর সবার থেকে এতো এতো দূরত্বই তার জন্য শাস্তি। সবার মনে যে জায়গা টায় সে ছিলো, চাইলেই সে আর সেই ভালোবাসা ফিরে পাবেনা। সবার আড়ালে পুকুরপাড়ে বড়ই গাছে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসবই ভাবছিলো সে। তখনই স্বামী সামিদ তাদের কন্যা সন্তান কোলে নিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখে মাহিশার। মাহিশা চট জলদী চোখ মুছে নিয়ে পিছন ফিরে তাকায়।
৯৯,
“কাঁদছিলে কেনো? রাই আপুর সাথে সব ঠিক আছে তো?”
সামিদের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যেতে চাইলো সামিদ। তাদের দুজনের জন্য এতো মানুষ আ”ঘাত পেয়েছে, এবং এখনও কষ্ট পায় জানলে সামিদ আর এখানে এক মুহুর্ত দাড়াবেনা। মাহিশাকে আসতেই দিতে রাজী ছিলো না সে। আসার পর যদি সকলে কথা শোনায়! মাহিশার রাইমার উপর ভরসা আছে যে, তেমন কিছু হবেনা। এজন্য সামিদকে বুঝিয়ে সাথে এনেছে৷ মাহিশাকে চুপ করে ভাবতে দেখে সামিদ মাহিশার গালে হাত দিয়ে নরম সুরে জিগাসা করলো,
“সব ঠিক আছে তো মাহিশা? চুপ করে আছো যে! এনিথিং রং?”
“না সব ঠিক আছে। এমনি অনেক দিন পর দেখা তো, ইমোশনাল হয়ে গেছিলাম। সবার মাঝে কাঁদলে অনেকের অনেক প্রশ্ন তৈরি হতো। এজন্য একা এখানে।”
“ওদিকে চলো রাই আপুকে হলুদ ছোয়ানো শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু এখমও রেডি হতে পারোনি তুমি।”
“রাই আমার বয়সীই। তোমার বড়ো নয়। এতো আপু আপু করতে হবেনা।”
“তবুও বড়ো শালী তো।”
“চুপ করো, চলো এখন। মেয়েকে তো তোমার ভরসায় দিয়ে রেখেছিলাম । রেডি করাতে পারোনি। আমিও রেডি হইনি। আগে রেডি হই। এরপর তোমার বড়ো শালী না ছোটো শালী বোঝাবো। চলো।”
সামিদকে একটু ঝাড়ি দিয়েই কথাগুলো বললো মাহিশা। এরপর দুজনেই একত্রে হাঁটা ধরলো বাড়ির ভেতর দিকে।
মাহিশা যাওয়ার পর রাইমাকে সামলে নিয়েছে শার্লিন। সবাই স্টেজে ডাকবে এখন। এজন্য সব বোনরা মিলে বসে গেছে সাজাতে। সাইরা, সাইফা, তিশা, শিখা, রেখা শার্লিনের হাতে হাতে সাজানোর জিনিসপত্র এগিয়ে দিচ্ছে। ওরা এতোক্ষণে রেডি হওয়া শেষ করে নিয়েছে। রাইমাকে কাচা হলুদ রঙের একটা সবুজ পারের শাড়ি করিয়ে তাজা সূর্যমূখী ও রজনীগন্ধা ফুলের ফোঁটা কলি দিয়ে তৈরি ফুলের গহনা পরিয়ে সাথে হালকা মেকআপের সাহায্যে সাজিয়ে দিলো শার্লিন। একহাতে ফুলের ব্রেসলেট অন্য হাতে হলুদ সবুজ মিশ্রণের শাড়ি। একদম সাধারণ একটা সাজে রাইমাকে সাজিয়ে তুললো শার্লিন। বাকি সব মেয়েরাও বাড়ির ছোটো থেকে বড়ো সব মেয়েরা ল্যাভেন্ডার রঙের শাড়ি সোনালী পারের শাড়ি পরবে এটাই বলে দিয়েছিলো রাইমা। তার কথামতোই সবাই একরকম শাড়ি পরেছে। সবকিছুই মেয়ের কথামতো ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আজাদ সাহেব। সবাইকে সাজাতে শহর থেকে দুটো পার্লারের মেয়েকেও আনিয়ে নিয়েছে রাইমা। কিন্তু নিজের সাজলো শার্লিনের হাতে। মাহিশা নিজের সংকোচের জন্য কারোর সাথে সেভাবে মিশছেনা। নিজের মতো দূরেই আছে সে। মাহিশাকে না দেখে এটাই ভেবে নিলো রাইমা । অথচ রাইমার বিয়ে নিয়ে কত্তো প্ল্যান করতো মাহিশা। এতো মানুষের মাঝেও এই একটা মানুষের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে।সাজানো শেষ হতেই শাহনাজ, সাহিরা, ডালিয়া, সাফিয়া বেগম চার জা, ননদ, বোন একসাথেই মেয়েদের ঘরে ঢোকেন। শাহনাজ বেগম মেয়েকে দেখে এগিয়ে এসে চোখ থেকে কাজল নিয়ে নজর টিকা লাগানোর বাহানায় বললেন,
“আমার মিষ্টি মেয়ের উপর কারোর নজর না লাগুক।”
রাইমা লজ্জা পেয়ে মুচকি হেসে মাথা নিচু করে নেয়। ডালিয়া বেগম এগিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুলে বসা রাইমার সামনে হাটুমুড়ে বসে হাত দুটো আকড়ে বললেন,
“আমার মেয়েকে তো আমি কাছেই পাইনি। কাছে পাওয়ার আগেই সে অন্যের ঘরে যাচ্ছে। কতো বড়ো হয়ে গেলো আমার মা।”
“আপা, এখন এমন ইমোশনাল কথাবার্তা বলে মেয়েটাকে কাদায়েন না। সাজগোজ নষ্ট হবে আবার।”
সাফিয়া বেগম এগিয়ে এসে বড়ো ননদকে কথাটা বললেন। শার্লিন কোমড়ে হাত দিয়ে হেসে বললো,
“না কাঁদে আন্টি, এখন সব মেকআপ ওয়াটার প্রুফ। সমুদ্রে ঝাপ দিলেও মেকআপ উঠবেনা।”
“পাজির শুধু পাকা পাকা কথা। দুঃখ আমার আর একজন ছেলে নেই। নয়তো তোকেই ছেলের বউ করতাম রে মেয়ে।”
১০০,
সাহিরা বেগম এগিয়ে এসে শার্লিনের পাশে এসে দাড়িয়ে কথাটা বললেন। তিশা বিছানায় বসে তার বড়ো ফুফুর কথা শুনে গালে হাত দিয়ে বললো,
“আমার ভাইটাও ছোটো ফুফু। নয়তো তাকে দিয়েই এই মজার মানুষ টিকে আমার ভাবী করতাম। কি ভুলটা করলো আমার ভাই। গডের কাছে রিকুয়েষ্ট করে এই পাজি মেয়েটার আগে দুনিয়া আসতে পারলো না?”
তিশার কথায় উপস্থিত সকলেই হাসলো। শার্লিন মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে বললো,
“আমি যার জন্য রহমত, গড আমায় তার জন্য সৃস্টি করেই পাঠিয়েছে।।তোমরা নিজেদের মাঝে আফসোস করা ওফ করো। চলো রাইকে নিয়ে স্টেজের দিকে চলো।”
শার্লিনের কথায় তাল মিলিয়ে সবাই উঠে দাড়ালো। রাইমার চাশী আর ফুফু দুপাশে দাড়িয়ে দুহাত ধরে স্টেজের দিকে নিতে পা বাড়ালেন। শাহনাজ বেগম বোনের হাত ধরে পেছনেই থাকলেন। একমাত্র মেয়েকে একটু একটু করে পরের ঘরে পাঠাতে প্রস্তুত করছেন তিনি। মায়ের বুকের মাঝে যে কি হাহাকার চলছে! উপরওয়ালা আর শাহনাজ বেগম জানতে পারছেন। আর কেউ নয়। ননদ আর জা-কে ছেড়ে বোন আর তিনি হাত ধরে নিয়ে গেলে হয়তো কথা উঠতো যতো গুরুত্ব বোনেরই। সেজন্য উনি বোনকে ইশারায় পিছিয়ে নিলেন। শার্লিন মেসেজ করে মেসবাহ আর ইফরাদকে বক্সে হলুদের গান জোড়ে সাউন্ড দিয়ে চালিয়ে দিতে বলে, রাইমার ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে বললো। ইফরাদ মেসেজ টা দেখতেই শার্লিনের কথামতো কাজ করে বারান্দার দিকে এগিয়ে আসে। সব মেয়েরা ঘর থেকে বেরুনোর পরপরই নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে। গতো দুদিন ধরে তো শিখা আর রেখার সাথে ডান্স প্রাক্টিস এবং গতকাল রাত জেগে বাকি বাকিদের সাথে নিয়ে এই ডান্স প্রাক্টিসই করে গেছে। একদিনেই তো নাচের তাল তোলা যায়না। যে যার মতো পারছে আনন্দে নাচ করছে। যদিওবা এই ডান্স, মিউজিক কিছু নিয়েই কারোর আগ্রহ ছিলো না। কিন্তু একমাত্র বান্ধবী এবং বোনের বিয়ে বলে কথা! এজন্য সবাই শার্লিনের আগ্রহের জন্য আনন্দ করতে নাচতে মত দিয়েছে। রাইমা হাসিমুখে সবার আনন্দ দেখছে তাকে ঘিরে। অথচ এই মানুষগুলোই তার বিদায়ের পর কান্নায় ভেঙে পরবে। এতো আনন্দের মাঝেও কোথাও একটা দুঃখের হাতছানি। নাচানাচির মাঝেই রাইমাকে স্টেজে আনা হলে একপাশে হামিদা বেগমকে অন্যপাশে আরফানকে বসিয়ে দিলো সাহিরা বেগম। রাইমার নানী বেঁচে নেই। থাকলে হয়তো উনাকেই বসিয়ে দেওয়া হতো। এরমাঝেই শার্লিন হন্তদন্ত হয়ে রাইমার সামনে এসে বসে বললো,
“রাই এদিকে তাকা।”
রাইমা ভাইকে কাছে পেয়ে আরফানের গাল টানছিলো। শার্লিনের কথামতো ওর দিকে তাকাতেই শার্লিন তার হাতে ফোন ধরিয়ে দেয়, ইশারা করে ফোনের দিকে তাকাতে। রাইমা ফোন নিয়ে ফোনের স্কিনে তার নজর দিতেই দিগন্তকে হলুদের সাজে তার মতোই স্টেজে বসে থাকতে দেখে। দিগন্ত গালে হাতে দিয়ে বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে তাকাতেই দিগন্ত চোখ টিপ মা”রে। রাইমা লজ্জা পায়৷ চোখ নামিয়ে নেয়। দুই জেলার মাঝে এতো দূরত্ব, কারোর বাড়িতে কেউ হলুদ মাখাতে যাবেনা। নিজেদের মতোই একটু আনন্দ করা হবে। এজন্যই রাইমাকে দেখতে ভিডিও কল দিয়ে বসেছে দিগন্ত। রাইমাকে লজ্জা পেতে দেখে দিগন্ত রাইমার উদ্দেশ্যে বলে,
“পুষ্পবতী, তাজা ফুলের মতোই আপনাকে স্নিগ্ধ লাগছে।”
চলবে?
#আকাশেও_অল্প_নীল
#পর্বঃ৩২
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি
১০১,
দিগন্তের মুখে পুষ্পবতী ডাকটা শুনে রাইমা লজ্জায় মিইয়ে যায়। এই ছেলেটা দিনদিন চরম মাত্রার নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে। দফায় দফায় তাকে লজ্জায় ফেলে দেয়। রাইমা কে চুপচাপ লাজুক রাঙা মুখে চাহনী নিচ দিকে করে তাকিয়ে থাকতে দেখে দিগন্ত ফের বললো,
“থাক লজ্জা পেতে হবে না। বেশি লজ্জা পেলে আবার আমার বাসর মাটি হবে পরে। বিয়ে জীবনে একবারই হবে ম্যাম। এক আপনাকেই বারবার বিয়ে করতে পারবোনা। অবশ্য আপনাকে বিয়ে করলেই আমার বিয়ের শখ ঘুচে যাবে।সো প্রতিটা সেকেন্ড ইনজয় করুন। আজ আর আপনাকে বিরক্ত করলাম না। যা বিরক্ত করার আগামীকাল ইনশা আল্লাহ ঘরে তুলে তবেই করবো।”
হামিদা বেগম পাশে বোসে বোসে নাতনী আর নাতনী জামাইয়ের কথাবার্তা দেখছিলেন। বয়স্ক মানুষ, ওতোশতো না বুঝলেও দিগন্তের কথার অংশবিশেষ উনার কানে গেলে উচ্চস্বরেই রাইমার গা ঘেষে বোসে বলেন,
” ও নাতজামাই! খালি জোয়ান বউডারে দেখলে হইবো! তারে পাইয়া বুড়ি বউরে ভুইলা গেলা নাকি?”
“আরে বড়ো বউ, ভুলবো কেন! অপেক্ষা করো নিতে আসতেছি। ছোটো বউ তো লজ্জাবতী লতা হয়ে যাচ্ছে। তার লজ্জা ছুটাতে তো তোমাকেই প্রয়োজন পরবে।”
দিগন্ত হামিদা বেগমের কথা শুনে বুঝে নিলো দাদী বা নানী সম্পর্কীয় কেউ হবে। তাই হেসে হেসে হামিদা বেগমের কথার জবাব দেয়। রাইমা মৃদু স্বরে ধমক দিয়ে দিগন্তকে বলে,
“চুপ করেন, কল কাটেন ফাজিল লোক। আশেপাশে এত্তো মানুষ, কলও ভিডিও কল এমনিও লাউড স্পিকারে। মানুষ শুনে হাসছে তো। রাখলাম আমি।”
রাইমা দিগন্তের মুখের উপর কল টা কেটে দেয়। দিগন্ত মাথার চুলে হাত চালিয়ে হেসে ফেলে। ইচ্ছে তো করছে ছুটে গিয়ে রাইমার পাশে বোসে পরতে। কিন্তু তার তো উপায় নেই। এতো দূরত্ব কেনো যে হতে হলো! ইচ্ছে করলে তো যাওয়া যেতো! কিন্তু তাকে ঘিরে এখানের মানুষের যে আনন্দ! তা মাটি হয়ে যেতো। দিগন্ত কল কাটার পরপরই তাকে হলুদ ছোয়ানো শুরু করে বড়োরা। সবাই একে একে আসছে আর হলুদ ছুইয়ে চলে যাচ্ছে। দিগন্ত বিরক্ত হয়ে গেছে এতো নিয়ম দেখে। টিস্যু দিয়ে বারবার গালে আর হাতে ছোয়ানো হলুদ মুছতে মুছতে দিগন্তের অবস্থা খারাপ। ইশা আর ঐশী স্টেজের সামনে সারি করে পাতানো চেয়ারে বোসে বোসে দিগন্তের এই অবস্থা দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে। দিগন্তের নজরে পরতেই সে বোনদের উদ্দেশ্যে বার কয়েক চোখ রাঙায়। তাতে ইশা আর ঐশীর হাসি কমেনা, উল্টে হাসির পরিমাণ বেড়ে যায়। এরমাঝেই স্নেহা আর মাহাদ মিলে দিগন্তের দুপাশে বোসে পরে হলুদ মাখাতে। একে একে দুজনে হলুদ মাখিয়ে দিগন্তের মুখে মিষ্টি পুরে দিতেই দিগন্ত চিবুতে চিবুতে বলে,
“বিয়ে করতে যে এত্তো প্যারা! জানলে রাইমা খন্দকারকে নিয়ে পালিয়ে যেতাম। বিয়ে করে ফিরতাম। বাপরে আপু, তুই এসব প্যারা সহ্য কি করে করেছিলি?”
স্নেহা ভাইয়ের কথায় হেসে উত্তর দিলো,
“রাইকে বলিস বিয়ের মোমেন্ট ইনজয় করতে! আর তুই নিজে ডিস্টার্ব ফিল করছিস? এটা কেমন নিয়ম ভাই?”
“তুই শুনে নিয়েছিস?”
“হ্যাঁ শুনেছি, তোর স্টেজের পাশেই যে ছুটছি, তুই তো বউকে দেখায় ব্যস্ত থাকায় টেরও পাসনি।”
“তোমার ভাই জীবনের ২৮বছর একা কাটানোর পর বউ পাচ্ছে স্নেহা। দেখতে দাও। এভাবে লজ্জা দিয়ো না।”
মাহাদ পাশ থেকে স্নেহার কথার জবাবে বললো কথাটা। দিগন্ত মাহাদের পেটে নিজের হাতের কনুই দিতে গুঁতো দিয়ে বললো,
“আপনি তো ৩১বছরে পৌছে বউ পেয়েছেন মাহাদ ভাই। সে হিসেবে আমি জীবন যু”দ্ধে আপনার থেকে এগিয়ে আছি।”
“আসল জায়গায় অ”স্ত্র চালিয়ে দিলে ভাই! কি করবো বলো সবই উপরওয়ালা আর তোমার বোনের মর্জি।”
স্নেহা শাড়ি সামলে স্টেজ থেকে নামতে নামতে দুজনের কথার মাঝে ফোড়ন কেটে বললো,
“অনেক হয়েছে, চুপ করো দুজনেই। হলুদ শেষ করে এই যে বাচ্চাপার্টি নাচানাচি করবে, ওদের জন্য জায়গা ফাঁকা করে দাও। গ্রাম তো গ্রাম না দিনদিন শহরের মতো ইট পাথরের ঘরবাড়ি গেথে উঠোন নাই করে দিচ্ছে।”
১০২,
দিগন্তদের গ্রামের বাড়িটাও দুতলা বিল্ডিং। দুই ভাইয়ের জন্য দুতলা হিসেবেই বাড়ি বানিয়েছিলো দিগন্তের বাবা। বাড়ির সামনে ছোট্ট উঠোন। সেখানেই সব আয়োজন করা হয়েছে। ছাদে করলে পাড়ার মানুষ জন এসে আবার ছাদে উঠবে! বাড়ির ভিতর মানুষের ঠেলাঠেলি লেগে যাবে। এই ভেবে সব উঠোনেই আয়োজন করা হয়েছে। মাহাদ স্টেজ থেকে নেমে সাজানো চেয়ারগুলো জড়িয়ে অনেকটা জায়গা ফাঁকা করে দেয়। ইশা, ঐশী আশেপাশের বাড়ির বেশ কিছু মেয়ে মিলে ডান্স পারফর্ম করবে। বক্সে গান চালিয়ে তারা তাদের ডান্স শুরু করে। তাদের সাথে জয়েন করে দিগন্তের চাচাতো ভাই আয়মান ও ফুফাতো ভাই ইশফাক। পড়াশোনার খাতিরে দুজনই বাড়ি থেকে দূরে থাকায়, ছুটি পেতে পেতে দেরি হওয়ায় দিগন্তের বিয়ে উপলক্ষে তাদের আসতে আসতে হলুদের দিন সকালেই আসলো। দুজনই একই বয়সের হওয়ায় একই সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে পড়াশোনা করে দুজনই। দুজন দুজনের থেকে ২মাসের ছোটো বড়ো। এসেই ক্লান্ত শরীর ঘুমের চোটে এতোক্ষণ তাদের খোজ ছিলো না। দুজনের মায়েদের চিৎকার চেচামেচিতে উঠে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে উঠোনে এসে ডান্স পার্ট চোখে পরায় পারুক আর না পারুক ইশা ঐশীর সাথে শুরু করে দিয়েছে নাচানাচি। এটাকে নাচ করা না লাফালাফি করা কোনটা বলা চলে? ওদের অবস্থা দেখে বুঝতে পারলোনা স্নেহা। সে দিগন্তের পাশে বোসে পরেছে হাসতে হাসতে। দিগন্তও নিজের হাসি আটকাতে পারলো না। ইশা ঐশীর ডান্স পারফর্ম টাও নষ্ট করে ওরা ওদের মতো আনন্দে লাফাচ্ছে। এরমাঝে ওরা দুজনে এসে দিগন্তের হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ওদের সাথে নাচাতে। দিগন্ত থম মেরে সবার মাঝে দাড়িয়ে আছে। আয়মান একবার দিগন্তের এক হাত ধরে টেনে ঘুরিয়ে দেয় তো ইশফাক একবার ঘুরিয়ে দেয়। মাঝখানে বেচারা দিগন্তের টানাটানিতে অবস্থা কাহিল। স্নেহা দিগন্তের এই অবস্থা ভিডিও করে রাইমার কাছে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেয়।
দিগন্তের বাড়িতে গায়ে হলুদ নিয়ে যতোটা মাতামাতি হচ্ছে, তার থেকেও বেশি হচ্ছে রাইমার এখানে। শার্লিন, শিখা, রেখা, সাইরা, সাইফা, তিশা, রাহান, মিহাল, নিহাল, ইফরাদ, মেসবাহ মিলে পুরো গায়ে হলুদ মাতিয়ে তুলেছে। মাহিশা আর সামিদও ওদের সাথে খানিকক্ষণ আনন্দ করে তাদের মেয়ে কান্না করে উঠায় আর ইফরাদের মা নাতনীকে সামলাতে পারছিলেন না বলে মাহিশা মেয়েকে নিয়ে চেয়ারে বোসে ওদের আনন্দ দেখছে। তার মেয়েটা এতোক্ষণে শান্ত হয়ে এসেছে। মাহিশা সবার মাঝ থেকে সরে আসায় সামিদও ওর পাশে এসে বোসে আছে। যদি মাহিশার কোনো হেল্প লাগে তো! এইকারণেই বোসে গেছে সে। আর অন্যদিকে শার্লিন রা সব মিলে একের পর এক ডান্স পারফর্ম করেই যাচ্ছে। সুন্দর হোক বা না হোক নিজেদের আনন্দের জন্য রাইমাকে হাসানোর জন্য ক্ষুদ্র চেষ্টা তারা করছে। শতো হোক এই সময়গুলো চলে গেলে আর ফেরত আসবেনা। রাইমাকে সকলেরই হলুদ ছোয়ানো শেষ। হলুদ ছোয়ানো শেষ হওয়ার পরপরই সে গোসল করে সাজগোজ তুলে নরমাল একটা সুতির শাড়ি পরে এসে স্টেজে বোসে বোসে সবার ডান্স দেখছে। সবাই এখন আনন্দ মজা করে ক্লান্ত হয়ে পরলে এসব থামিয়ে দিবেন আজাদ সাহেব। রাতের বাজে প্রায় ১০টা। বড়োরা আর পাড়াপ্রতিবেশি দাওয়াতের মানুষজন উঠোনে গোল হয়ে চেয়ার পেতে বসেছেন। আর মাঝখানের জায়গা টায় শার্লিন রা নিজেদের ডান্স পারফর্ম করছে। সবার মুখে হাসি যেনো লেপ্টে আছে। রাইমা এতো আনন্দের মাঝেও কোথাও একটা কষ্ট অনুভব করছে। আর তো মাত্র কিছুঘন্টা। এরপর সবাইকে ছেড়ে ভিন্ন এক পরিচয় সাথে ভিন্ন সব মানুষকে নিজের কাছের মানুষ, আপন মানুষ হিসেবে মেনে নিতে হবে৷ আর আপন মানুষ, চেনা মানুষ গুলোই হয়ে যাবে পর। কোথাও তো একটা হাহাকার থেকেই যায়। রাইমা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
১০৩,
এগারোটা বাজতে বাজতেই আজাদ সাহেব সব গান বাজনা বন্ধ করে দেন। সবাইকে ফ্রেশ হয়ে ঘুমাতেও বলেন দিলেন। সকাল সকাল আবার বিয়ের আয়োজন। অনেক কাজ বাকি। রাইমা নিজের ঘরে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই যতো ক্লান্তি এসে তাকে ঘিরে ধরলো যেনো। বাকি সবাই ফ্রেশ হতে চলে গেছে। আসলেই সবাই জায়গা পেতে ঘুমিয়ে পরবে। এক খাটে তো আর সবাইকে আটবে না। রাইমা ওদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে নিজের ফোন টা হাতে নিয়ে ডাটা ওন করতেই দেখে E ধরে আছে। কয়েকটা ছবি সে দিগন্তকে পাঠাবে। ম”রার নেটের জন্য বোধ হয় সেটাও হবেনা। সে রাগে গজরাতে গজরাতে ফোন টা নিয়ে ঘরের জানালা খুলে হাত বাড়িয়ে দেয় বাইরের দিকে। H+ আসতেই হোয়াটসঅ্যাপে একগাদা মেসেজের সাথে স্নেহার পাঠানো ভিডিও টাও আসে। রাইমা সেটা ডাউনলোড করে দেখতেই অট্টহাসিতে ফেটে পরে। কি একট অবস্থা দিগন্তের। রাগের কুমিরকে সবাই নাচাচ্ছে! এরথেকে ভয়ানক ব্যাপার স্যাপার হতে পারে কি! রাইমা হাসতে হাসতে নিজের মুখে হাত দিয়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে পরে। আজ বোধ হয় এটা দেখে হাসতে হাসতে তার পেট ব্যাথায় ধরে যাবে। বেচারা বিয়ে করতে এসে কি নাচ না নাচছে। শার্লিন, শিখা, রেখা সহ বাকি মেয়েরা ফ্রেশ হয়ে শাড়ি পাল্টে নরমাল ড্রেস পরে রুমে এসে রাইমাকে বিছানায় শুয়ে মুখে হাত দিয়ে চেপে হাসতে দেখে শিখা রাইমার পাশ বোসতে বোসতে জিগাসা করে,
“কি গো আপু! এতো হাসছো কেনো?”
রাইমা জবাব দেয়না। শুধু নিজের ফোনটা এগিয়ে দেয়। শিখা ফোন হাতে নিয়ে দেখে একটা ভিডিও পাস করে রাখা। সেটা প্লে করতেই দিগন্তের অবস্থা চোখে পরে। একে একে সবাই ফোনটা নিয়ে ভিডিও টা দেখে একে অপরের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে রাইমার হাসির কারণ বুঝতে পেরে জোড়ে শব্দ করে হাসতে শুরু করে দেয়। সবাই দিগন্তকে না সামনাসামনি না দেখলেও ছবি দেখেছে। এজন্য চিনতে অসুবিধে হয়নি। এতগুলো মেয়ে একসাথে শব্দ করে হাসছে! বাড়ির কি অবস্থা তা কল্পনা করতেও কঠিন মনে হবেনা। পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে তারা। আজ রাতে ঘুম হয়ে গেলো তাদের। সারারাত যে বকবক চলবে এটাই বোঝা যাচ্ছে আপাতত। বাড়ির উঠোনে বিয়ের রান্নাবান্নার জন্য আদা, রসুন, পেয়াজের খোসা ছাড়ানো আর মশলা বাটাবাটির পাল্লা চলছিলো। আচমকা সবাই রাইমার ঘর থেকে এতো হাসির শব্দ শুনে ঘাবড়ে গেলেও সব মেয়েরা আনন্দ করছে বুঝে কেউ আর মাথা ঘামালো না। সবাই ব্যস্ত হয়ে পরলো কাজে।ইফরাদ, মেসবাহ, রাহান তো মিহাল আর নিহালের সাথে চলে গেছে মিহালদের বাড়ি। পাশাপাশি গ্রাম হওয়ায় যাওয়া আসায় অসুবিধা হয়না। এতো মানুষের মাঝে তাদের ঘুম হবেনা। আর ইফরাদ তো না ঘুমালে মাথা ব্যথায় টিকতেও পারবেনা। রইলো তো বিয়েতে কোনো কাজে সাহায্য তো দূর বিছানা ছাড়তে পারে কিনা! এজন্য ডালিয়া বেগমের পরামর্শে ওদের সাথে নিয়ে বাড়িতে চলে গেছে মিহাল। ভোর হতে হতে উঠেই ওরা চলে আসবে। মাহিশা আর সামিদকে পাশের বাড়িতে নিরিবিলি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন শাহনাজ বেগম। বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে হইচইয়ের মাঝে না থাকাই ভালো। সবাই সবার অবস্থানে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। আর মাত্র একটা রাত, একটা দিনের অর্ধেক বোধহয়। এরপরই তো সব আয়োজন থেমে যাবে। যার জন্য এতো আয়োজন! সেই চলে যাবে পরের ঘরে৷ পিতা আজাদ সাহেব এবৈ মাতা শাহনাজ বেগমের মনে যে কি ঝড়টা বয়ে চলেছে এই আন্দাজ টা রাইমা করতে পারছে। সবার সাথে আড্ডা, এতো হাসির মাঝেও তার মন টিকছেনা। তার ইচ্ছে করছে মা’কে বাবাকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলতে, ‘ বাবা মা আমায় তোমরা তোমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ো না। আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবোনা।’ আফসোস এমনটা হবেনা।
১০৪,
পরদিন সকালবেলায়, ১০টা বাজে প্রায়। বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। একপাশে চলছে রান্নার ধুম। অন্য পাশে চলছে সামিয়ানা টাঙিয়ে টেবিল সাজানোর কাজ। সাথে রাইমা আর দিগন্তকে বসানোর জন্য সাজানো হচ্ছে স্টেজ৷ রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জে যাতায়াতের সময় লাগবে প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা থেকে পাঁচ ঘন্টা (আন্দাজে লিখলাম, ভুল হলে ক্ষমা করে মানিয়ে নিবেন)। আসতে যেহেতু এতো সময় লাগবে, এজন্য পাত্রপক্ষ সকাল সকাল হতে হতেই বেরিয়ে পরবে বলে খবর এসেছে আজাদ সাহেবের কাছে। এজন্য তিনি হাসান সাহেব ও ভাই মজিদ সাহেব এবং মিহালের বাবাকে সাথে নিয়ে ছুটোছুটি করে সব আয়োজন করছেন। ইফরাদ, মেসবাহ, মিহাল এবং নিহালও বড়োদের হাতে হাতে সাহায্য করতে যথেষ্ট ছোটাছুটি করছে। সাথে তো ডেকোরেটরের লোকজন আছেই। সকাল সকাল রাইমাকে কাঁচা হলুদ বাটায় গোসল করিয়ে এনে তার ঘরে মাদুর পেতে বসিয়ে দিয়েছে তার প্রতিবেশী ভাইয়ের বউরা মিলে। যেহেতু তার নিজের ভাবী সম্পর্কীয় কেউ হয়নি এখনও। তাই উনারাই এসব করে দিয়ে গেছেন। বিয়েটা গ্রামে হচ্ছে যেহেতু, সেহেতু নিয়মকানুন অনেকটা গ্রামের মানুষদের কথামতোই মানা হচ্ছে। বিয়োর সাজগোজ, শাড়ি, গহনা তো দিগন্ত রা আনবে। আনার পর রাইমাকে সাজিয়ে দেওয়া হবে। আপাতত তাকে বাবার বাড়ির দেওয়া ভিজানো শাড়ি(গ্রাম্য ভাষায় যা বলে তাই লিখেছি) পরিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বোসে আছে শার্লিন সহো বাকি মেয়েরা। সবাই রাইমাকে নিয়ে দিগন্তের নাম নিয়ে হাসি ঠাট্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরমাঝেই মিহাল আর ইফরাদ ঘরের দরজায় এসে দাড়ায়। তাদের দেখে শার্লিন ভ্রু উঁচিয়ে জিগাসা করে,
“কিছু বলবে তোমরা? মেয়েদের ঘরের সামনে তোমাদের কি কাজ?”
ইফরাদ বললো,
“দিগন্ত ভাই আসলে গেইট আটকাবে না তোমরা? গেইট আটকানো নিয়ে দেখছি কারোর আগ্রহই নেই।”
তার কথা শুনে সবার টনক নড়লো। সবাই আড্ডায় এতোটাই মশগুল ছিলো। এই বিষয়টা বেমালুম ভুলে বোসেছে। সাইফা সবাইকে উঠার তাড়া দিয়ে হাসতে হাসতে বললো,
“সবাই উঠো উঠো, এখন ভাইয়ারা নিজেরা যেহেতু বলতে এসেছে। তারাই গেইট আটানোর আয়োজন করতে সাহায্য করবে। আমরা দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখবো চলো।”
মিহাল সাইফার কথা শুনে বললো,
“তাহলো গেইট আটকে যে টাকা পাবেন আপনারা, টাকাগুলোও আমরা নিয়ে নেবো। আপনারা দাড়িয়ে দাড়িয়ে তখন দেখবেন। অলসের দল কোথাকার।”
মিহালের জবাবে সবার মুখ চুপসে যায়। রাইমা ঠোঁট টিপে হাসে। সবার মুখ একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে মিহাল। সাইফা মিহালের কথা শুনে নিজেদের কথার মান বজায় রাখতে বললো,
“দাড়িয়ে দেখি না দৌড় দেয় পরে দেখা যাবে। আপাতত চলেন, আমরা এতোটাও অলস না যে কিছু করবোনা। এই চলোতো সবাই। আমরাও দেখিয়ে দিবো, আমরাও কাজ পারি। অলস নই।”
চলবে?
#আকাশেও_অল্প_নীল
#পর্বঃ৩৩
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি
১০৫,
বরের সাজে দিগন্ত কে সাজিয়ে দিয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে হাপাচ্ছে মাহাদ সহো আয়মান আর ইশফাক। শেরওয়ানির এক দোপাট্টা সেট করে দিতে গিয়ে তিনজনের বেশ বেগ পোহাতে হলো। যেভাবেই সেট করে দেয়, দিগন্ত বারবার বলে, পাজামা পাঞ্জাবিই ঠিক ছিলো। মেয়েদের ওরনার মতো! এটা পড়ানোর কি দরকার! এই কথা বলে বারবার সে খুলে ফেলছিলো। স্নেহা বিছানায় বোসে বোসে দিগন্তর কান্ড দেখছিলো। সবশেষে নিজে এক ধমক দেওয়ায় সে থেমে গেছে। এরপর মাহাদ পুরো রেডি করে দিয়ে পাগড়ির দিকে তাকিয়ে বললো,
“স্নেহা, এটা তো বড়োদের পড়ানোর দায়িত্ব। কে পড়াবে?”
“চাচাকে ডাক দাও তো ইশা। উনি এসে পড়াবেন এটা। সাথে ফুফাকেও ডেকে আনো।”
বরপক্ষ আগেই বাস ভর্তি হয়ে চলে গেছে কনেপক্ষের উদ্দেশ্যে। বাসায় মানুষজনের বালাই তেমন নেই। শুধু দিগন্তের সাথে বরের গাড়িতে আর বরের সাথে যেতে ভাইবোন ক’জনই আছে। ইশা স্নেহার কথামতো চাচা আর ফুফাকে ডেকে আনার পর স্নেহা তাদের উদ্দেশ্যে বললো,
“চাচা, বাবা তো নেই। আপনারা-ই বাবার দায়িত্ব টা পালন করেন।”
দিগন্তের চাচা ভাইয়ের কথা মনে করতেই চোখের কোণে জল জমে। দিগন্তের নিজের বাবার কথা ভীষণ মনে পরছে। কিন্তু কিছু করার নেই। দিগন্তের হাত ধরে তার চাচা বিছানায় বসিয়ে দেয়। এরপর তার চাচা ফুফা মিলিয়ে মাথায় পাগড়ি টা পরিয়ে দিলেন। দিগন্তকে পুরোপুরো তৈরি করে নিয়ে বের হলো সবাই। উঠোনে এসে চাচী আর ফুফুকে বিদায় দিয়ে তারা গাড়িতে উঠে বসলো। উনারা বাড়িতে রয়ে গেলেন নতুন বউকে বরণ করার অপেক্ষায়। এক গাড়িতে ছেলেরা সব উঠলো। অন্য গাড়িতে মেয়েরা সব উঠে বসলো। সাথে চাচা আর ফুফা। গাড়িতে বসার পরপরই গাড়ি চলতে শুরু করে।
গেইট সাজানো শেষ প্রায়। ইফরাদ ফিনিশিং টাচ দিয়ে গেইটের পাশে পরে থাকা চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিলো। শার্লিন সহো বাকি মেয়েরা ঘুরে ফিরে সব দেখছিলো। এরপর গালে হাত দিয়ে ভাবুক চিত্তে শার্লিন সবার উদ্দেশ্যে বললো,
“আচ্ছা দুলাভাইকে কি কি শরবত খাওয়ানো হবে? সেগুলো কে ডিসাইড করবে!”
“কেনো আপু! তুমি থাকতে আমাদের আআার চিন্তা কিসের?”
শিখার উত্তরে সবাই হেসে উঠলো। ইফরাদ কপাল চুলকে মৃদু স্বরে বললো,
“ও আছে এটাই মূল চিন্তা। না জানি বেচারা দিগন্ত ভাইকে বিয়ের দিন কোন ডোবার পানি খাইয়ে ছাড়ে!”
ইফরাদের কথা শুনে শার্লিন গাল ফুলিয়ে তাকায়। রেখা কপাল চাপড়ে বলে,
“হয়ে গেলো। এখানে ৩য় বি”শ্বযু’দ্ধ শুরু হওয়ার আগেই এদের কেউ সরিয়ে নিয়ে যাও।”
মেসবাহ একপাশে নিশ্চুপ দাড়িয়ে ছিলো। আরফানের আঙুলে আঙুল পেচানো ছিলো তার। আরফান জানিনা কি বুঝলো রেখার কথার। সে এগিয়ে এসে ইফরাদের হাত ধরে বললো,
“ইফরাদ ভাই, এখান থেকে চলেন। আমি চকলেট খাবো।”
১০৬,
ইফরাদ ভীত সশস্ত্র চাহনীতে শার্লিনকে দেখে আরফানকে নিয়ে মানে মানে কে”টে পরলো। সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে কয়েক কদম যেতেই শার্লিন পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললো,
“আসিয়েন শুধু আমায় বিয়ে করতে! সিরিয়াসলি সেদিন আমি যদি কচুর শরবত না খাইয়েছি! আমিও শার্লিন নই, নাম পাল্টে দিগন্ত ভাইয়ের শালী নাম রাখবো। আফটার অল আজকেই আমি শালী হিসেবে তাকে ডোবার পানি খাওয়াবো তাইনা!”
শার্লিনের কথা ইফরাদের কানে পরতেই সে পিছন ফিরে একবার তাকিয়ে কয়েকটা ফাঁকা ঢোল গিলে আরফানের হাত ধরে দ্রুত পদে চলে যায়। আর বাকিরা সবাই দাড়িয়ে তো হাসছে। শার্লিন সবাইকে তাড়া দিয়ে বললো,
“চলো চলো, অনেক কাজ বাকি। মিষ্টি সাজানো, শরবত বানানো। দিগন্ত ভাই আমাদের স্পেশাল দুলাভাই বলে কথা!”
“তোমায় মাথায় কি দুষ্টমি ঘুরছে শার্লিন?”
মাহিশার কণ্ঠ শুনে সেদিকে দৃষ্টি দেয় সকলে৷ মেয়েকে কোলে নিয়ে শার্লিনের থেকে একটু দূরেই দাড়িয়ে আছে। সবকিছু জানার পর মাহিশাকে একদমই পছন্দ না শার্লিনের। সে মাহিশাকে এড়িয়ে যাবে সবার মাঝে সেটারও উপায় নেই। সে একটু নিজেকে সামলে নিয়ে বিরক্তি চেপে উত্তর দেয়,
“না আপু, দুষ্টমি না। আমি গুড গার্ল। ভালো কিছুই মেইক করবো। ট্রাস্ট মি আমি উল্টাপাল্টা কিছু করবোনা।”
এরপর সবাইকে সাথে নিয়ে পা বাড়ায় শরবত বানানোর কাজে লাগতে। মিহাল নিহাল তো কথার ফাঁকে আগেই কেটে পরেছে। এই মেয়েরা কি শরবত বানিয়ে দিগন্তকে হাসায় না কাদায়! তার ঠিক নেই। দায়ভার টা নিজেদের ঘাড়ে আসার আগেই তারা সরে গেছে। ব্যস এটাই শান্তি।
মাহিশা সবার যাওয়ার পানে দাড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জানে সে নিজের কৃতকর্মের জন্যই আজ এই পরিস্থিতিতে পরেছে। তাই আফসোস করা ব্যতিত আর কোনো কাজ নেই তার। সেই সময় সামিদ এসে মাহিশার কাঁধে হাত রাখে। মাহিশা তার দিকে তাকাতেই সে বলে,
“মেয়েকে রেডি করতে হবে, তোমার নিজেরও রেডি হতে হবে। সময়ের ব্যাপার। এখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কি করছো?”
“নাথিং, চলো মেয়েকে তৈরি করা যাক।”
আড়াই বছরের ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটা কিছু বুঝেনা। কিন্তু মায়ের মলিন মুখটার দিকে শুধু টল-টলে চাহনীতে তাকিয়ে থাকে। হয়তো সে-ও তার চঞ্চল মায়ের এই নিশ্চুপ রুপটার সাথে পরিচিত নয়। কিন্তু সে তো এই দুনিয়ার তিক্ততা বোঝে না। পরিচিত আপন মানুষ টাকে কাছে পেয়েও কাছে যাওয়ার অধিকার না পাওয়ার মতো যন্ত্র”ণা দুটো হয়না। অধিকার ছেড়ে দিয়ে অধিকার চাওয়ার মতো বিড়ম্বনা! আদৌও আর দুটোতে হয়? ভেবে পেলোনা মাহিশা। ধীর গতিতে তাদের জন্য ঠিক করে দেওয়া রুমটায় চলে গেলো।
এদিকে শার্লিন রা গেইট ধরার সব তৈরি করে সাজিয়ে ঢেকে রেখে সবাই চলে গেলো গোসল করে রেডি হতে। কলপাড়ে যে সিরিয়াল! তাতে গোসল দেওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলো সব। পরে আবার রাইমার প্রতিবেশী এক চাচাতো বোনের কথায় তাদের বাড়িতে নিরবিলি জায়গায় চলে গেছে সব নিজেদের ড্রেস আর সাজগোজের জিনিস নিয়ে। ওদের বাড়ির ভেতর উঠোন পেরিয়ে শান বাধানো ঘাটের পুকুরে নেমে পরেছে সব। শার্লিন তো ভীষণ খুশি। এতো আনন্দ এই জীবনে তার পাওয়া হয়নি। এতো এতো আনন্দের বিনিময়ে নিজের আত্মার বান্ধবী টাকে হারাতে হবে! এই কথা মনে আসলেই শার্লিনের চোখ জলে ভরে আসছে। তবুও সবার মাঝে কাদার বিষয়টা! ভীষণ অসস্তিকর। এজন্য পুকুরের পানিতে দাড়িয়ে মুখে বারংবার পানির ঝাপটা দেওয়ার বাহানায় কেঁদে নিচ্ছে। কি করবে! সবার সামনে কাঁদলে তো হাজার প্রশ্ন। এতো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো তার ধৈর্যশক্তি নেই।
১০৭,
বাইরে হইচই শোনা যাচ্ছে বর এসেছে আর এসেছে। রাইমার সাথে বোসে ছিলো সব মেয়েরা। ঘরে উপচে পরা ভীর ছিলো। মুহুর্তে ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেলো। শার্লিন রা তো ছুট লাগিয়েছে গেইট ধরবে বলে। বিয়ের সবথেকে মজার পার্ট তো এটাই মনে হয় তার কাছে। রাইমা ঘরটা ফাঁকা পেয়ে হাফ ছেড়ে জোড়ে কয়েকটা নিঃশ্বাস নেয়। এতো ভীড়ভাট্টা তার পছন্দ নয়। অল্প মানুষের মাঝে কমফোর্ট ফিল করা মানুষের জন্য বিয়ে মনে হয় একটা আতঙ্ক। বাবারে এতো মানুষকে সহ্য করা! এরথেকে আজীবন মানুষের কথা শুনে সিঙ্গেল থাকা ভালো মনে হলো রাইমার। বয়স ২৩এর কোঠায় ঠেকেছে বলে এতোদিন যারা বলতো, ‘বিয়ে কবে দিবে বাবা মা! পছন্দের কেউ আছে কিনা!’ আজকের পর তো আর বলবেনা বিয়ে কবে দিবে? উল্টে বর সহো দেখলে বলবে, ওমাহ! বিয়ে হয়ে গেলো! জামাই কি করে? কতো টাকা বেতন! কি করে বিয়ে হলো? কবে হলো? মনে হয় তারা বিয়েতে ভাঙচি দিতে না পেরে এক আকাশ হতাশায় ভুগতে শুরু করবে। এই বিষয়গুলো জঘন্য লাগে তার কাছে। রাইমার এই আকাশ কুসুম চিন্তার মাঝে মাহিশা মেয়ের হাত ধরে রাইমার ঘরের দরজার কাছে দাড়িয়ে জিগাসা করে,
“ভেতরে আসতে পারি রাই?”
রাইমা নিজের চিন্তাভাবনা ফেলে মাহিশার গলা শুনে দরজার দিকে তাকায়। মেয়েটার মুখে মলিনতার ছাপ স্পষ্ট। হয়তো তাকে দেখার পর কষ্ট টা আরও প্রগাড় হয়েছে। পরনে ছাই রঙা শাড়িটায় বেশ মানিয়েছে ওকে। আগে মাহিশা শাড়ি পরলেই রাইমা মুগ্ধতা নিয়ে দেখতো। মপয়েটা বেশ সুন্দরী। সে তার তুলনায় নগণ্য। তবুও সে তার নিজের সৌন্দর্যে অনন্য। যার যার জায়গায় সে সে সুন্দর। নির্ঘাত নিজের ভাইটা তার বড়ো হলে মাহিশাকে নিজের ভাইয়ের বউ করে ফেলতো রাইমা। সে আনমনে এসব চিন্তা করতে করতে বললো,
“আয়, আসতে আবার অনুমতি লাগে?”
“কিছুই তো আর আগের মতো নেই! তো কি করবো বল?”
ঘরে এসে বসতে বসতে মাহিশা জবাবে কথাটা বললো। রাইমা মাহিশার মেয়ের সামনে হাটুমুড়ে বোসে মাহিশার মেয়ের আঙুলে আঙুল ছুইয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আলতো স্বরে বললো,
“মায়ের নামটা কি! এসে থেকে তোর সাথেই কথা হয়ে যাচ্ছে। আম্মগর নামটাই জানা হয়নি।”
“আদ্রিশা ওর নাম।”
রাইমা চকিতে মাহিশার দিকে তাকায়। নামটা তার বড্ড প্রিয়। মাহিশার সাথে আগে খুনশুটি করতে করতে সে নিজেই বলতো মাহিশার মেয়ে হলে নাম রাখবে আদ্রিশা। মাহিশা যে তার পছন্দের খেয়াল টা এতো বছর পরও রেখেছে এটাই বেশি। মাহিশাও রাইমার দিকেই তাকিয়ে ছিলল। সে মুচকি হাসি ফেরত দিলো রাইমার তাকানোর বদলে। রাইমা বললো,
“অনেক চঞ্চল ছিলি, এতো ভার কি করে হয়ে গেলি?”
“আসলে আমি বদলাইনি। কিন্তু সময়টা অনেকটা পেরিয়ে গিয়ে অনেক জড়তা এসে গেছে সব সম্পর্কে । তাই চাইলেও আগের মতো হতে পারছিনা। তুই পছন্দ করবি কিনা কে জানে! কি বলতো ঐ বয়সটায় না ফ্যান্টাসি কাজ করতো! মনে হয়েছিলো এই তো পালিয়ে আসলাম, বিয়ে হবে, বাচ্চা হবে। মা বাবার সামনে গিয়ে দাড়াবো। তারা মেনে নিবে। তোর সামনে এসে কোলে মেয়েকে তুলে দিলে তুইও খুশি হয়ে আমায় বুঝবি! কিন্তু হলো কি বলতো! বাবা মায়ের অসম্মান, তোরও অসম্মান সাথে এতো অপমান মানুষের। সবাই এতোটা কষ্ট পেলো, আ’ঘাত পেলো। সবটাই আমার জন্য। আমি পজেটিভ দিকটা ভেবেছিলাম, এটার নেগেটিভিটি বলেও যে একটা ইফেক্ট থাকবে আমি কল্পনাও করিনি। ফ্যান্টাসিতে ভেসে বেরিয়েছি। সবকিছুরই লিমিট থাকে। আমি সেই লিমিট ক্রস করে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে নিজের সত্ত্বা খুইয়ে বসেছি। কিন্তু এই যে পিচ্চি পরি। এনার সামনে আমি কখনও গম্ভীর হইনা। কারণ সে ছোটো থেকে যা দেখবে তা দেখেই বড়ো হবে। আমি চাইনা আমার মেয়ে গম্ভীর হউক, ছোটো কিছু হলেই ওভার থিংকিং এ ডুবে যাক। চাই সে চটপটে হোক। প্রতিটা পরিস্থিতি পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ার ক্ষমতা রাখুক। এজন্য সত্যি বলতে নিজের চঞ্চল সত্ত্বা পুরো বিসর্জন দিতে পারিনি।’
মাহিশার দীর্ঘ কথা শুনে রাইমা একটু হাসলো। আদ্রিশার সাথে দুষ্টমিতে মেতে উঠলো। মাহিশা বুঝিয়ে দিলো রাইমা তার আরও একটা মায়ের মতো আন্টি। ডাকতে শিখিয়ে দিলো ছোটো মা বলে। আদো আদো বুলিতে তো সে সবই বলতে পারে। তাই রাইমাকে ডাকতে ডাকটাও চট করে রপ্ত করে ফেলে বাচ্চাটা।
১০৮,
মাহিশা আর রাইমার কথোপকথন একপাশে চলছে, অন্যপাশে চলছে গেইটে একপ্রকার তর্ক প্রতিযোগিতা। শার্লিন-রা দাবী করে তর্ক করে যাচ্ছে এক এমাউন্ট। দিগন্তের ভাইরা তার অর্ধেক দিবে বলে তর্ক করছে। এরমাঝে শার্লিন আর বাকি মেয়েদের বানানো স্পেশাল শরবত! যে মুখে দিয়েছে, সেই ছিটকে ফেলেছে। তা দেখে শার্লিনদের তো হাসি থামেনা। ছোটো ছোটো কাঁচা আম এনে তার শরবত সাথে একগাদা লবণ, মাল্টার শরবতের সাথে হলুদ মরিচের গুড়ো। সাদা পানির ভিতরও লবণ রাখতে ভুলেনি। মিষ্টি খাইয়ে দিগন্তের মুখে সাদা পানি দিতেও সে ছিটকে বের করে দিয়েছে। এরপর শার্লিনদের আর পায় কোথায়! উপস্থিত সকলে হেসেই খু'”ন। লটারিতে তিনটা এমাউন্ট লিখে টেবিলে ফেলে রেখেছিলো তারা। তারমাঝে মিডিয়াম এমাউন্ট টাই তুলেছে দিগন্ত। এতো তর্কাতর্কিতে দিগন্তের মাথা ধরে যাচ্ছিলো। ইফরাদ তো পাশে দাড়ানো মেসবাহকে বলেই বোসে,
“আপনার এটা বোন নাকি রেডিও এফএম ভাই! সারাক্ষণ বাজতেই থাকে! আমার যে কি অবস্থা হবে? আমি কল্পনা করতেও ভয় পাই রিতীমতো।”
“দেখেশুনে পঁচা শামুকে পা কেটেছো। সহ্য করো কি আর করবে!”
মেসবাহ ইফরাদের কথার জবাবে কথাটা বললো। ইফরাদ আলতো হেসে তর্ক রত শার্লিনের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ও পঁচা শামুক নয় ভাইয়া। ও রত্ন। ওকে যে বুঝবে, সে ওকে সব মানুষের মাঝেই খুজে বেড়াবে।”
মেসবাহ হাসলো ইফরাদের জবাবে। সে তো ইফরাদের শার্লিন সম্পর্কে ধারণা জানতে বোন সম্পর্কে ওভাবে বলেছিলো। যাক এদের ভালোবাসা ভুল নয়। মেসবাহ সস্তির নিশ্বাস ছাড়লো। এদিকে দিগন্ত তর্কাতর্কির মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া দেখে সবাইকে থামানোর উদ্দেশ্যে পকেট থেকে শার্লিনদের কাঙ্খিত এমাউন্ট টা বের করে টেবিলে রেখে বললো,
“থেমে যাও শালীকা-রা আমার। এতো ছোট্ট একটা আবদার করেছো! দুলাভাই হয়ে অস্বীকার কি করে করি!, এবার ঝটপট গেইট ছাড়ো। বউকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। দীর্ঘপথ, মাথা ধরে গেছে আমার।।এতো টাকা দিলাম, বিনিময়ে এবার বসিয়ে একটু খাতিরদারি করো। নয়তো আমার বাড়ি নিয়ে একেকটাকে এই কাঁচা অপরিপক্ব আমের শরবতে চুবিয়ে রাখবো।”
শার্লিনরা টাকা পেয়ে খুশিতে লাফিয়ে উঠেছে। গেইট ছাড়িয়ে দিয়ে সরে যায় সবাই। মাহাদ দিগন্তের পাশে হাটতে হাটতে বলে,
“বিয়ের আগেই শালীদের কাছে হাড়লে! এবার তৈরি থাকো সারাজীবন হেরে হেরে হেরো ভূত হয়ে বোসে থাকবে।”
“টাকা দিয়ে উপরে থেকে গেলাম দুলাভাই। বলতে পারবেনা ওরা রাইকে যে, রাইয়ের স্বামী কিপ্টে।”
“বাপরে ভাই আমার, বউয়ের জন্য কতো চিন্তা!”
আয়মান পাশ থেকে দিগন্তের কথা শুনে কথাটা বলে। ওরা হাসতে হাসতেই স্টেজে গিয়ে বোসে। আজাদ সাহেব নিজে এসে দিগন্তকে নিয়ম মাফিক বসিয়ে দিয়ে যান। এদিকে বরপক্ষ সব আগেই চলে এসেছিলো যারা, সবাইকে খাওয়ানোর ধুম চলছে। স্নেহা সহো সব মেয়েরা লাগেজ নিয়ে সোজা চলে যায় রাইমার কাছে। হামিদা বেগম এসে ওদের নিয়ে যায়। এখন বউকে সাজিয়ে নিয়ে বিয়ে পরিয়ে সব নিয়ম শেষ করে বাড়িতে নিয়ে যেতে বাঁচে সব। এতো দূরের জার্নি করে সবার অবস্থা কাহিল।
চলবে?