আমার অদিতি পর্ব-০১

0
2

#আমার_অদিতি
#পর্ব – ১
#নয়োনিকা_নিহিরা

“অদিতির সাথে এক রুমে স্বামী হিসেবে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয় মা। এটা তুমি আর অদিতি দুজনই খুবই ভালো মতো জানো। শুধুমাত্র নিজের দায়িত্ববোধ থেকে আমি অদিতিকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছি এর থেকে বেশি কিছু ওর জন্যে আমি করতে পারবো না মা।”

_”কিন্তু বাবা তোদের দুজনের তো বিয়ে হয়ে গেছে এখন এই সম্পর্ককে মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়?”

_” অসুবিধা আছে মা। তুমি অদিতিকে চিনো না! অদিতি কতটা আনস্মার্ট আর ভীতু একটা মেয়ে সেটা কি তোমার অজানা? ওকে আমি কোনো ইভেন্টে আমার সাথে নিয়ে গেলে ও একটা কথাও ঠিকমতো বলতে পারে না। সব সময় ভয় আর জড়তায় চুপসিয়ে থাকে। অদিতির জন্যে নিজের বন্ধু বান্ধব আর আত্মীয়ের কাছে আমাকে কতটা নিচু হতে হয় সেটা তুমি বুঝো?”

_” তাহলে তুই ওকে নিজের মতো করে তৈরি করে নিলেই তবে পারিস আহনাফ। মেয়েটা ভীষণ লক্ষি ভদ্র একটা মেয়ে। তোর কথামত চলবে সবসময়।”

_” মা, আমি সবসময় এমন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চেয়েছি যে আমার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবে। আমার কথামত উঠবস করা কোনো রোবট আমি চাইনি। একজন দেশের টপ বিসনেসম্যানের স্ত্রী হওয়ার কোনো যোগ্যতা কি আদৌ এই মেয়ের আছে?”

_” আহনাফ! ভুলে যাস না অদিতির বাবার জন্যেই আজ আমরা এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি। যে সময় তোর বাবা আশরাফ ওয়াহিদ প্যারালাইসড হয়ে গিয়েছিলেন সেই সময় অদিতির বাবাই কিন্তু সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছেন। আজ যেসব আত্মীয় স্বজনদের কটু কথার জন্যে তুই অদিতিকে গ্রহণ করতে চাইছিস না সেই সময় এসব আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কেউ আমাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। শুধুমাত্র এগিয়ে এসেছিলেন অদিতির বাবা ইলিয়াস আমিন।”

_” সেইজন্য আংকেলের কাছে আমি সবসময় চিরকৃতজ্ঞ থাকবো মা। কিন্তু তাই বলে অদিতিকে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অদিতির বাবার চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করার দায়িত্ব আমার সেটা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু অদিতির আম্মু আমিনা আণ্টি কেনো এরকম অন্যায় আবদার করে বসলেন? ওনার স্বামী সাহায্য করেছিলেন বলে কি আমরা ওনাদের গোলাম হয়ে গেছি? হাসপাতালে এমন ভাবে আমার সাথে কথা বললেন যেনো ওনার ফ্যামিলির সব দায় দায়িত্ব আমার! উনি কেনো আঙ্কেলকে দিয়ে সেই অবস্থায় এই প্রস্তাব দিলেন মা? আমার রাজি হওয়া ছাড়া আর কি কোনো উপায় ছিলো? আঙ্কেলকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না সেটা অদিতির আম্মু খুব ভালো করেই জানতেন। উনি ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছেন।”

এতক্ষন ধরে দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে নিজের স্বামীর মুখ থেকে বের হওয়া বিষবাক্য গুলো চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলো অদিতি। পুরো নাম ফাহমিদা জাহান অদিতি। আজ তার আর আহনাফের বিয়ের প্রায় তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। তবুও তাদের মধ্যে কোনো স্বামী স্ত্রীর মতো সম্পর্ক তৈরি হয়নি। এখনো স্বামীর বাসায় আলাদা রুমে থাকতে হয় অদিতিকে। তার অবশ্য কারণও আছে। আহনাফ সামনা সামনি অদিতির সাথে রুড ব্যবহার না করলেও অদিতিকে যে অহনাফ পছন্দ করে না সেটা অদিতি বুঝে ফেলেছে এই তিন মাসে। তাদের সম্পর্কের এই টানাপোড়ন দেখে অদিতির শাশুড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজের ছেলে আহনাফকে তিনি আজ বুঝাবেন।

দুর্ভাগ্যবশত, অদিতি সেই সময়ই চা নিয়ে তার শাশুড়ি আজমেরী ওয়াহিদের রুমে প্রবেশের সময় অহনাফের বলা কথাগুলো শুনে ফেলে। কথাগুলো শুনে তীব্র অভিমান জন্ম নেয় অদিতির মনের গহীনে। অদিতি টলমল চোঁখে কিছু না বলেই চুপিসারে নিজের রুমের ভেতরে এসে দরজা বন্ধ করে ডুকরে কেঁদে উঠে।

এতো অপমান! এতো অবহেলা! এসবই কি লিখা ছিল তার কপালে? কেনো তার মা আহনাফের কাছে তার বাবার অসুস্থতার সময় তাকে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করলেন? সে কি জলে পড়ে গিয়েছিল? কতটা নিচু আর তাচ্ছিল্যের নজরে দেখে তার স্বামী তাকে! আহনাফের এই দয়ার কোনো প্রয়োজন কি আদৌ ছিলো? যে দয়া আর সহানুভূতি জুড়ে শুধু অসম্মান আর অপমান থাকে তাকে কি আদৌ সহানুভূতি বলে?
°°°°°

অদিতি আর আহনাফের বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় তিন মাস। তবুও অদিতির সাথে স্বামীর মতো আচরণ করতে পারেনি আহনাফ। এখনো একই বাসার ছাদের নিচে আলাদা আলাদা রুমে থাকে তারা দুইজন। যেইদিন থেকে অদিতির বাবার হার্ট সার্জারির জন্য তাকে হস্পিটালাইজ করা হয়েছে সেইদিন থেকেই অদিতির জীবন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলো অদিতি। কিন্তু বাবার অসুস্থতা, চিকিৎসা খরচ প্রভৃতির বিভিন্ন কারণে এই বছর পরীক্ষা দেওয়া হলো না তার। নিজের বড় ভাইয়ের স্ত্রী জুঁইয়ের কথায় প্রভাবিত হয়ে অদিতিকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন অদিতির মা আমিনা বেগম। হাসপাতালে নিজের বন্ধুকে দেখতে আসা আশরাফ ওয়াহিদের কাছে নিজের মেয়ের জন্যে অনুরোধ করে বসলেন তিনি।

আহনাফের বাবা আশরাফ ওয়াহিদ সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলেন নিজের ছেলে আহনাফ ওয়াহিদের সাথে তার বন্ধুর মেয়ে অদিতির বিয়ের জন্য। কিন্তু রাজি হলো না আহনাফ। তবুও মুখের উপর না করতে পারলো না সে এক অব্যক্ত কুণ্ঠার কারণে। যতোই হোক আজ অদিতির বাবার জন্যেই তার বাবাকে সুস্থ করতে পেরেছে সে। তখন যদি আঙ্কেল সাহায্যের হাত বাড়িয়ে না দিতেন আজ হয়তো তার বাবা এখনো হুইলচেয়ারে বসে দিনাতিপাত করতেন!

নিজের কৃতজ্ঞতাবোধের কারণেই অনেকটা বাধ্য হয়েছে আহনাফ অদিতিকে বিয়ে করার জন্য। বিয়ের পর অবশ্য অনেক চেষ্টা করেছে আহনাফ অদিতির সাথে এডজাস্ট করার। কিন্তু অদিতির চাল- চলন, কথা বলার ধরণ কোনো কিছুই আহনাফের মন মতো ছিলো না। থাকবেই বা কিভাবে? যেখানে আহনাফের বয়স প্রায় ৩০ বছরের কাছাকাছি সেখানে অদিতির বয়স মাত্র ১৭ বছর।

আহনাফ সবসময় একজন শিক্ষিত, স্মার্ট মেয়েকে নিজের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে চেয়েছিলো। যেই মেয়ে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে। যেহেতু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে আহনাফকে বিদেশের ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়, বিদেশে যেতে হয় তাই তার মতোই স্মার্ট কোনো মেয়েকে আহনাফ চেয়েছিলো তার কল্পনায়। সেখানে তার কপালে জুটলো তার থেকে তেরো বছরের ছোট্ট একটা আনস্মার্ট,ভীতু পিচ্চি মেয়ে। যাকে নিয়ে কোনো ইভেন্টে যাওয়া তো দূর কোনো রেস্টুরেন্টে পর্যন্ত নিয়ে যেতে অস্বস্থি হয় আহনাফের।

বিয়ের প্রথম প্রথম অদিতিকে নিজের রুমেই থাকতে দিয়েছিলো আহনাফ কিন্তু অদিতি অহনাফের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এদিক সেদিক করে ফেলতো। অফিসে যেতেও লেট হয়ে যেতো আহনাফের। বিরুক্ত হয়ে অদিতিকে ধমক দিয়ে নিজের জিনিসপত্রে হাত দিতে নিষেধ করে দিয়েছিল আহনাফ। অদিতিও অহনাফের কথা মেনে চলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু একদিন অদিতি মাতব্বরি করে অহনাফের জন্যে কফি বানিয়ে টেবিলে রেখে দিয়েছিলো। অদিতি ভেবেছিলো আহনাফ হয়তো খুশি হবে কিন্তু অহনাফ ফোনে কথা বলতে বলতে টেবিলে রাখা কফির মগ খেয়াল না করে ভুলবশত ফেলে দেয়। ফলস্বরূপ, আহনাফের প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র কফিতে ভিজে একাকার হয়ে যায়।

আহনাফ রাগে চিৎকার করে অদিতিকে ধমকে বলে উঠে,” তোমাকে কে বলেছিল ফাইলগুলোর সামনে কফির মগ রাখতে? তোমাকে বলেছি আমি আমাকে কফি বানিয়ে দাও? আমার এতো দিনের এতো পরিশ্রম সব কিছু তোমার বোকামির জন্য ভিজে নষ্ট হয়ে গেলো। কোনো কাজ না পারলে চুপচাপ বাসার এক কোণায় পড়ে থাকতেই তো পারো? এতো পন্ডিতি কে করতে বলেছে তোমায়?”

সেইদিনের পর থেকেই শাস্তিস্বরুপ আহনাফের রুমের তীরসিমানায় পাড়া দেওয়া নিষেধ অদিতির জন্যে। আহনাফের সাথে বলতে গেলে কোনো যোগাযোগই নেই অদিতির। আহনাফ সকালে উঠে নাস্তা করে বেরিয়ে যায় অফিসে। ফিরে গভীর রাতে। তারপর ডিনার করে নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। অদিতির কোনো খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করে না আহনাফ।

এসব কিছু লক্ষ্য করে আহনাফের মা আজমেরী ওয়াহিদ আহনাফকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আহনাফ তো যেনো অদিতিকে তলারেটই করতে পারে না!

আর আজ শ্বাশুড়ির রুম থেকে আহনাফের বলা কথাগুলো শুনে মন ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেলো কিশোরী অদিতির। নিজের মায়ের সিদ্ধান্তের উপর প্রচন্ড ক্ষোভ জন্ম নিলো অদিতির মনে। অদিতি চোঁখের জল মুছে সিদ্ধান্ত নিলো সে আর এই অসংগতিপূর্ণ সম্পর্কে জোর করে পড়ে থাকবে না। আহনাফ অফিস থেকে ফিরে এলে সেও তার সমস্ত অভিমানের কথা বলে দিবে।
°°°°°

স্বভাবতই আজও গভীর রাত করে বাড়ি ফিরছে আহনাফ। এমনটা নয় যে আহনাফ সবসময়ই লেট করে বাড়ি ফিরে। বিয়ের আগে আহনাফ ঠিক টাইম মতোই বাড়ি ফিরতো। কিন্তু বিয়ের পর থেকে আহনাফের মধ্যে এই অনিহা চলে এসেছে। অদিতিকে এতটা অপছন্দ করার কারণ আহনাফ নিজেও জানে না।

আহনাফ সবসময় ম্যাচিওর আচরণ পছন্দ করে। কিন্তু অদিতির বাচ্চামী স্বভাব আহনাফের কাছে বিরক্ত লাগে। আহনাফও মাঝে মাঝে নিজেকে বোঝায় মেয়েটা তো বাচ্চাই। বয়স আর কতো হবে সতেরো। তবুও কেনো যেনো আহনাফ মেনে নিতে পারে না তার স্ত্রীর অপরিপক্ব আচরণ।

আজ সারাদিন অফিস আওয়ারে নিজের মায়ের বলা কথাগুলো ভেবে দেখেছে আহনাফ। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি সে। অদিতিকে নিজের প্রেয়সীর নজরে কল্পনা করতে পারে না অহনাফ। সেই অনুভূতিই কাজ করে না তার ভেতরে। মাঝে মাঝে নিজের রুড ব্যবহারের জন্য তার একটু অপরাধবোধ হয় শুধু। এসব চিন্তা করতে করতেই বাড়ি পৌঁছে যায় আহনাফ।

আজও অদিতি অপেক্ষা করছিল তার জন্য। মেয়েটাকে দেখলে মায়াও হয় না আহনাফের। আহনাফ আনমনেই বলে,” কোনো মায়াও তো নেই মেয়েটির মুখশ্রীতে। ভালো কিভাবে লাগবে?”

আহনাফ নিষ্প্রভ চাহনি নিয়ে এক পলক অদিতির দিকে চেয়ে আবার চোখ নামিয়ে চলে যেতে নিলে অদিতি শান্ত মন্থর কন্ঠে বলে,” আহনাফ ভাইয়া, আমার কিছু কথা বলার ছিলো।”

অদিতির কন্ঠস্বর শুনেই বিরক্তিতে চোঁখ মুখ কুঁচকে ফেলে আহনাফ।

_” যা বলার তাড়াতাড়ি বলো।”

_” আসলে ভাইয়া আপনি যেহেতু আমার সাথে বিয়ের এই সম্পর্কে থাকতে চাচ্ছেন না আমিও আপনাকে জোর করবো না আপনি চাইলে আমাকে ছেড়ে দিতে পারেন।”

আহনাফ ভাবেনি হঠাৎ অদিতি তাকে এইসব কথা বলবে। নিজেকে একটু শান্ত করে আহনাফ নিষ্প্রভ স্বরে বলে,”তুমি আর আমি চাইলেও এখন আমাদের আলাদা হওয়া সম্ভব নয় অদিতি। তোমার বাবা এখনো হসপিটালে। আর এই মুহূর্তে নিজের দায়িত্ববোধ আর বাবার দেওয়া কথা রাখতে আমি তোমাকে ছেড়ে দিতে পারবোনা। আর তুমিও যদি ডিভোর্স নিয়ে নিজের পরিবারে ফিরে যেতে চাও তাহলে তোমার মা আর ভাবী আবার তোমাকে আমার কাছেই ফিরে আসতে জোর করবেন। লাভের লাভ কিছুই হবে না, সিন ক্রিয়েট ছাড়া।”

আহনাফের যুক্তিপূর্ণ কথাগুলোর বিপরীতে পাল্টা কোনো যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে না অদিতি। চুপচাপ চোখ মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে থাকে আহনাফের সামনে।

আহনাফও অদিতির বক্তব্য শুনার অপেক্ষা করে না। হনহনিয়ে চলে যায় নিজের রুমের দিকে। অদিতি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ হয়ে।

____

আহনাফ লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বিছানায় বসে পড়ে ল্যাপটপ নিয়ে। এখন কিছুটা ফুরফুরে লাগছে তার। অদিতির বলা কথাগুলো নিয়ে অতটা মাথা ঘামায় না আহনাফ। ল্যাপটপ নিয়ে নিজের কাজে মগ্ন হয় সে। তখনি আহনাফের রুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে জড়তা কাটিয়ে ডোর নক করে অদিতি। কাজের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটায় আবার মেজাজ বিগড়ে যায় আহনাফের।

দরজা খুলে অদিতির দিকে রাগি দৃষ্টিতে চেয়ে আহনাফ শুধায়,” আবার রুমের সামনে এসেছো কেনো? কি চাই?”

অদিতি ভয়ে জড়সড়ো হয়ে বলে,” ভাইয়া, আমি আবার পড়া শুরু করতে চাই। আপনি যেই কথাগুলো বলেছেন সেগুলো আমি অনেক্ষন ধরে ভেবেছি। তারপর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি আবার এইচএসসি পরীক্ষা দিবো। পড়াশুনা শেষ করা পর্যন্ত আপনি একটু কষ্ট করে আমার দায়িত্ব নিন। একটা ভালো ভার্সিটিতে চান্স পেলে আমি হোস্টেলে চলে যাবো ভাইয়া। তারপর আপনাকে আর আমাকে সহ্য করতে হবে না। আর পড়া কমপ্লিট হলে আমি চাকরির চেষ্টা করবো আহনাফ ভাইয়া। তখন তো আর আমাকে ডিভোর্স দিতে আর কোনো দায়িত্ববোধ প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করবে না আপনার মধ্যে আর আমাকেও তখন মা আর ভাবী বোঝা মনে করবেন না।”

অহনাফ অদিতির পরিপক্ক কথাবার্তা শুনে কিছু মুহুর্তের জন্য থমকে যায়। মেয়েটার মাথায় এতো বুদ্ধি এলো কোত্থেকে?আজ প্রথমবার অদিতির কথা শুনে বিরক্তিবোধ হয় না আহনাফের।

আহনাফ গম্ভীর স্বরে বলে,” Not a bad Idea. ঠিকাছে তাহলে তুমি পড়া কমপ্লিট করার সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছো পড়া কমপ্লিট করতে পারো। তোমার ভর্তির সমস্ত ফিস আমি দিয়ে দিবো।”

অদিতি খুশিতে আরো কিছু বলার আগেই অহনাফ তার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে চলে যায়। আহনাফের এই কান্ডে মূহূর্তেই অদিতির খুশিতে ঝলমল করা মুখখানা মলিনতায় ছেয়ে যায়। অদিতি মুখ ভার করে চলে যায় নিজের জন্য বরাদ্দকৃত গেস্টরুমে।

নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে অদিতি নিজে নিজেই বলতে থাকে,” আপাতত অপমান সহ্য করে কষ্ট করে পড়াশুনাটা শেষ কর অদিতি। তারপর সবার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে পারবি তুই। তারপর আর কারো অপমান, অবহেলা আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য সহ্য করতে হবে না তোকে। ব্যস শুধু কয়েকটা বছর। একদিন সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।”
____

অদিতির সাথে কথা শেষ করার পর আহনাফ আর নিজের কাজে মন বসাতে পারে না। রাগে ল্যাপটপ বন্ধ করে বিছানার এপাশ ওপাশ করতে থাকে। নিজের মনের অজান্তেই অদিতির হঠাৎ করে বলা ম্যাচিওর কথাবার্তা গুলো ভাবিয়ে তুলে গম্ভীর স্বভাবী আহনাফকে।

আহনাফ আনমনেই বলে,” অদিতিও কি আমার সাথে থাকতে চায় না? এতো তাড়া তার আমার কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার? অবশ্য তাতে আমার কি? আমারো কি খুব শখ নাকি তার সাথে থাকার? বাধ্য হয়ে এই সম্পর্কের বোঝা টানছি আমি।”

আহনাফ আনমনেই এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমানোর চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু আজ আর ঘুমাতে পারে না সে। বিছানা ছেড়ে উঠে বসে পড়ে বিভিন্ন চিন্তার আনাগোনায়।

_” অদিতি তো এতদিন ছাড়াছাড়ির কথা বলেনি। হঠাৎ তাহলে এসব কথা বললো কেনো? হ্যাঁ বললে বলেছে। তাতে আহামরি কি হয়েছে? আমিও তো এটাই চাই। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। পড়াশুনা করলে যদি একটু বুদ্ধিশুদ্ধি হয়, ম্যানার্স শিখে তাহলে তো ভালোই হবে ওকে নিয়ে আর ক্লাইন্টদের সামনে এমবারেসমেন্টে পড়তে হবে না আমায়।”

আহনাফ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই অদিতির কথা গুলো আবার তার কর্ণকুহরে বাজতে থাকে।

“পড়া কমপ্লিট হলে আমি চাকরির চেষ্টা করবো আহনাফ ভাইয়া। তখন তো আর আমাকে ডিভোর্স দিতে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা আপনার থাকবে না।”

আহনাফ বিছানা ছেড়ে উঠে ডিভানে বসে সিগারেট বের করে সুখটান দিতে থাকে। অদিতিকে নিয়ে আজ প্রথমবার এতো চিন্তা করেছে আহনাফ। কেমন যেন অন্যরকম লাগছে সবকিছু! আহনাফ মস্তিষ্ককে অন্যদিকে বিমুখ করার জন্য মোবাইল ফোন বের কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে থাকে।

“কি এক ঝড়, সে যে থামবে কবে?
আমি সারাদিন বসে জানালায়
যোগ-বিয়োগ করে আর কি হবে?
যদি ভাগ করে সুখে থাকা যায়।

থেকে যাও না, কেন চাও না
বলে গেলে কি এসে যায়?
ফিরে চাও না, কেন চাও না ?
না বেশি দেরি হয়ে যায়।”

চলবে…