#আমার_অদিতি
#পর্ব – ৪
#নয়োনিকা_নিহিরা
সকাল সকাল অদিতিকে নিয়ে কাজী অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে আহনাফ। অদিতির মায়ের থেকেও বেশি দুশ্চিন্তা এখন আহনাফের মনে। স্বামী হিসেবে নিজের অধিকার হারাতে চায় না সে। এ ধরনের দুশ্চিন্তা আগে যদিও আহনাফের মনে ছিলো না তবে ইদানিং তাদের মধ্যে বিদ্যমান অমীমাংসিত সম্পর্ক নিয়েই বেশিরভাগ সময় দুশ্চিন্তায় কাটে আহনাফের। নিজের অজান্তেই আহনাফের মনে এক প্রকার ভয় জন্ম নিয়েছে, অদিতিকে হারানোর ভয়। আহনাফ আশ্চর্যান্বিত হয় নিজের এই অদ্ভূত অনুরক্তির জন্য। অদিতি তো কখনোই তার পছন্দের মতো মেয়ে ছিলো না তবুও কেনো এত দুশ্চিন্তা আজ তার মনে সেই আনস্মার্ট, ভীতু মেয়েটার জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর আহনাফের জানা নেই কিংবা আহনাফ নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় না।
আহনাফকে গম্ভীর হয়ে ড্রাইভ করতে দেখে অদিতি শুধায়,” শুধু শুধু এই ফর্মালিটির কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? আমরা দুজনই জানি আমাদের সম্পর্ক অসংগতিপূর্ণ তবুও এতো আনুষ্ঠানিকতার কি দরকার? আমরা তো আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছি তাই না?”
অদিতির কথাগুলো কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই আহনাফের কান গরম হয়ে যায়। শরীরের রন্ধে রন্ধে ছড়িয়ে পড়ে অযাচিত রাগের উত্তপ্ত লেলিহান শিখা। কেনো অদিতি বারবার আলাদা হওয়ার কথা উল্লেখ করে তার সামনে? আহনাফের ভালো লাগে এখন এসব কথা।
আহনাফ রাগান্বিত স্বরে বলে,” তোমার পড়াশুনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হতে আরো কয়েক বছর লেগে যাবে। ততদিন পর্যন্ত নিজের দায়িত্ববোধ থেকে এই সম্পর্কের ভার আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে অদিতি। তোমার মা আমিনা আন্টির রিকোয়েস্টে আমি এই কাজ করছি। তাই আমার মাথা না খেয়ে এখন চুপচাপ বসে থাকো।”
অদিতি ভীষণ অসহায় বোধ করলো। কেনো আহনাফের সাথে বিয়ে দিলো তাকে তার অভিভাবকরা? একটু আর্থিক কষ্ট করে তাকে কি রাখা যেতো না বাসায়?
অদিতির ভীষণ অভিমান জন্ম নিলো তার পরিবারের উপর। অদিতি মনে মনে বললো,”একবার নিজের পড়াশুনা শেষ করে স্বাবলম্বী হয়ে নেই তারপর আমি আর কারো জীবনে বোঝা হয়ে থাকবো না। সবার জীবন থেকে হারিয়ে যাবো আমি।”
নিজেদের বিয়ের সকল ফরমালিটি শেষ করে আহনাফ অদিতিকে নিয়ে আবার বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। আহনাফের মেজাজ এখন বেশ ফুরফুরে। অদিতিকে হারানোর ভয় একটু হলেও কমেছে।
অদিতি সারা রাত জেগে পড়াশোনা করার কারণে গাড়ির মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আহনাফ আর ডাক দিলো না অদিতিকে। মেয়েটার ঘুমন্ত মুখখানা দেখলে আহনাফের আর ডাক দিতে ইচ্ছে হয় না তাকে।
আহনাফ গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন অদিতিকে কোলে করেই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। আলভী লিভিংরুমেই বসে ছিলো তাদের দুজনকে এই অবস্থায় দেখে আলভী দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো,” বাহ্ কি রোমান্টিক দৃশ্য! চোঁখ জুড়িয়ে গেলো!”
আহনাফ চোঁখ রাঙ্গিয়ে ফিসফিস করে বললো,” আস্তে কথা বল। আমার অদিতির ঘুম ভেঙ্গে যাবে।”
আলভী দুষ্টু হাসি দিয়ে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ থাকার ইশারা করলো। আহনাফ অদিতিকে নিজের রুমে নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দিলো। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ অদিতির দিকে। কি হচ্ছে এটা তার সাথে? নিজের পছন্দের সম্পূর্ণ বিপরীত একটা মানুষের প্রতি হঠাৎ করেই কিভাবে এতটা টান তৈরি হতে পারে? কেনো অদিতি চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে তাকে? এটা কি শুরু হয়েছে? কেনো শুরু হয়েছে?
আহনাফ আনমনে এসব ভাবতে ভাবতে অদিতির মুখের সামনে আসা চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো।
___
অদিতির ঘুম ভাঙ্গলো সন্ধ্যার দিকে। নিজেকে আহনাফের ঘরে দেখে আজ আর অবাক হলো না অদিতি। মৃদু হেসে বিছানা ছেড়ে উঠে আড়মোড়া ভাঙ্গলো অদিতি। হাত মুখ ধুয়ে লিভিংরুমে আসতেই আলভীর সাথে সাক্ষাৎ হলো তার।
আলভী উচ্ছাসিত গলায় বললো,”অবশেষে তোমার ঘুম ভাঙ্গলো ভাবী আর এইদিকে আমি কতক্ষন ধরে তোমাকে প্রিয়তার ছবি দেখানোর জন্য অস্থির হয়ে আছি।”
অদিতি অবাক কন্ঠে শুধালো,” প্রিয়তা কে?”
আলভী কৃত্রিম লাজুকতা দেখিয়ে বললো,” প্রিয়তাকে আমি পছন্দ করেছি ভাবী। একচুয়ালি প্রিয়তাকে দেখতেই আমি দেশে এসেছিলাম মায়ের কথায়। কাল তাকেই দেখতে গিয়েছিলেন আমি।”
অদিতি রাগে কোমড়ে হাত দিয়ে বলে,” কাজটা কিন্তু আপনি মোটেই ভালো করেননি আলভী ভাই। আমাদের বলেননি কেনো?”
আলভী দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো,” কারণ আমি তোমাদের সবাইকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম।”
আজমেরী ওয়াহিদ সব শুনে আলভীর কান মলে দিয়ে বললেন,” দুষ্টু ছেলে! এই জন্যেই আমি ভাবি হঠাৎ করে কাজকাম ছেড়ে এই আলভী মহারাজ দেশে ফিরে এলো কেনো? হ্যাঁ রে আমাকে বললে আমিও তো দেখে আসতে পারতাম প্রিয়তাকে।”
আলভী নিজের কানে হাত দিয়ে আহত স্বরে বলে,”উহঃ মামী, আমার কান ছাড়ো প্লিজ। আজকাল মানুষকে সারপ্রাইজ দিতে চাইলেও দোষ।”
অদিতি উৎসাহিত কন্ঠে শুধালো,” তাহলে কবে বিয়ে করছেন আপনি আলভী ভাইয়া?”
আলভী মৃদু হেসে বললো,” আপাতত বিদেশে ফিরে যাচ্ছি। ৮ মাস পর আবার দেশে ফিরে এসে প্রিয়তাকে একেবারে বিয়ে করে নিজের সাথে নিয়ে যাবো।”
তখনি আহনাফ বাসায় প্রবেশ করে হাতের মধ্যে কিছু একটা খাবারের প্যাকেট নিয়ে। আলভীর কথাগুলো শুনে আহনাফ মনে মনে স্বস্তি অনুভব করে। আহনাফ ভাবে,”যাক ভালোই হয়েছে এখন তার অদিতির মাঝে আর কেউ আসবে না।”
আহনাফ ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত করে আলভীকে উদ্দেশ্য করে বলে,” ওহ তো এই ব্যাপার! কিন্তু এতে সারপ্রাইজড হওয়ার কি আছে?”
_”কেনো ব্রো তোমরা সারপ্রাইজড হয় নাই?”
_”একদম না।”
_” তুমি সারপ্রাইজড না হলেও মিষ্টি ভাবী কিন্তু ঠিকই সারপ্রাইজড হয়েছে তাই না ভাবী?”
আলভীর আহ্লাদী ডাক শুনে আহনাফের ভেতরটা আবার হিংসায় জ্বলে উঠলো। আহনাফ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”ওর নাম অদিতি। আর খবরদার আমার বউকে কোনো নিকনেমে ডাকবি না।”
_” কোথায় যেনো পুড়া পুড়া গন্ধ পাচ্ছি ব্রো। যাও ডাকবো না ভাবীকে কোনো নিকনেমে। নিকনেমে ডাকার মানুষ আমারো হচ্ছে, হুহ।”
অদিতি দুষ্টু হাসি দিয়ে শুধালো,” তা কি নামে ডাকবেন আপনি প্রিয়তাকে?”
আলভী হালকা কাশি দিয়ে বললো,” বেগম সাহেবা।”
অদিতি খিলখিল করে হেসে বলে,” বাহ্ বাহ্ এখনই কি টান!”
অদিতির দুষ্টুমিষ্টি প্রাণবন্ত মুখশ্রী দেখে আহনাফ বিভোর চোঁখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো অদিতির দিকে। অদিতিকে এতদিন খুব একটা লক্ষ্য করেনি আহনাফ। আসলে লক্ষ্য করতে চায়নি। তবে ইদানিং অদিতির প্রতিটি ছোট ছোট বিষয় নজরে পড়ছে আহনাফের। কেনো পড়ছে তা সে নিজেও জানে না। আহনাফ হারে হারে টের পেলো অদিতির প্রাণবন্ত রূপটা তার রগচটা স্বভাবের কারণেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
আলভী আহনাফের হাতে থাকা খাবারের প্যাকেট দেখে জিজ্ঞেস করে,” এটা তুমি কি এনেছো ব্রো?”
আহনাফ অদিতির দিকে ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়েই উত্তর দিলো,” ফুচকা এনেছি আমার অদিতির জন্যে।”
বিস্ময়ে অদিতি চোখ দুটো বড়বড়ো হয়ে গেল আহনাফের কথা শুনে। অদিতি অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলো,”কি!”
অদিতির কন্ঠস্বর শুনে ঘোর কাটলো আহনাফের। আহনাফ সাথে সাথেই বিব্রতবোধ করে বললো,” না মানে সবার জন্যে।”
তবে আলভী যা বুঝার ঠিকই বুঝে গেলো। দুষ্টু হাসি দিয়ে আহনাফকে পঁচানো শুরু করলো। আহনাফ গম্ভীর মুখে অদিতির হাতে খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো।
___
আজ আলভী গেস্ট রুমের থাকার কারণে অদিতিকে আবার আহনাফের রুমেই ফিরে আসতে হয়েছে। অদিতি গুটিগুটি পায়ে আহনাফের রুমে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলো। আহনাফ ল্যাপটপ হাতে নিয়ে ডিভানের বসে ছিলো। অদিতি রুমে আসার সাথে সাথেই আহনাফ ল্যাপটপ রেখে অদিতির দিকে নিজের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। অদিতি কোনো কথা না বলে চুপিসারে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে।
আহনাফ ডিভানে বসেই নিষ্প্রভ কন্ঠে বলে,” তোমার জন্মদিনের কথা আমাকে বলোনি কেনো?”
_” এমনি বলিনি। আমার জন্মদিন তো আপনার কাছে জরুরী কিছু না। আর আপনিই তো বলেছেন আপনার সাথে ফালতু কথা না বলতে।”
অদিতির পরিপক্ক উত্তর আহনাফের পছন্দ হলো না। মেয়েটা তার সামনে আসলেই ম্যাচিউর হয়ে যায়। নিজের স্বভাবসুলভ আচরণ করে না। কেমন যেন নিজের ব্যক্তিত্বের বিপরীতধর্মী অদৃশ্য এক প্রাচীর তৈরি করে ফেলে অদিতি আহনাফের সামনে।
আহনাফ গম্ভীর গলায় বললো,” তুমি যেমন আছো তেমনি থাকো অদিতি। আমার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য নিজেকে চেঞ্জ করার প্রয়োজন নেই।”
_” আমি আপনার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে চাই না। আমি শুধু চাই আমার আচরণে আপনি বিব্রতবোধ না করেন।”
আহনাফের এইবার ভীষণ রাগ অনুভূত হলো অদিতির উপর। ডিভান ছেড়ে উঠে অদিতির সামনে দাঁড়িয়ে আহনাফ চিৎকার করে বললো,”সমস্যা কি তোমার অদিতি? ভালো কথা বললেও প্যাঁচাও কেনো?”
অদিতির অসহ্য লাগলো আজ। নিজের ভেতরের অভিমান আর লুকিয়ে রাখতে পারলো না সে। অদিতি বিছানা থেকে নেমে আহনাফের সামনে গিয়ে অশান্ত কন্ঠে বলল,” আমি যা বলি তাতেই তো আপনার সমস্যা। আমার ম্যাচিউর কথা বললে দোষ,না বললেও দোষ। আপনি সবসময় আমার খুঁত ধরে বেড়ান।”
অদিতি ছলছল চোখে কথাগুলো বলে আহনাফের রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। লিভিংরুমে এসে মুখ ভার করে ডিভানে বসে পড়লো অদিতি।
আহনাফও রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বিছানায় বসে পড়লো। তবে একটু পর মাথা ঠাণ্ডা হওয়ার সাথে সাথেই আহনাফের মনে খারাপ লাগা শুরু হলো। শুধু শুধু অদিতিকে কেনো ধমক দেয় সে?মেয়েটা তো সে যেমন আচরণ করতে বলছে তেমন আচরণই করছে। আহনাফের এবার নিজের উপরই রাগ উঠলো।
আহনাফ রুম থেকে বেরিয়ে অদিতিকে খুঁজতে শুরু করলো। তখনি আহনাফের চোখ পড়লো লিভিংরুমের দিকে। অদিতি ডিভানে বসে মুখ ফুলিয়ে টিভি দেখছে।
আহনাফ অদিতির সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বললো,”রুমে চলো অদিতি।”
অদিতি রিমোট হাতে নিয়ে টিভি চ্যানেল চেঞ্জ করতে করতে বললো,” আপনি নিশ্চিন্তে আপনার রুমে ঘুমিয়ে পড়ুন। আলভী ভাইয়া যদি কিছু জিজ্ঞেস করে তাহলে আমি বলে দিবো,” আমার ঘুম আসছে না তাই টিভি দেখছি।”
_” মিথ্যে বলতে হবে না তোমাকে অদিতি। রুমে চলো বলছি, রাগিও না আমায়।”
_”রাগার মতো কিছু বলিনি। আপনি নিজেই বারবার আমাকে খোঁচাচ্ছেন।”
আহনাফ জানে না কিভাবে কারো অভিমান ভাঙ্গাতে হয়। অন্য সময় হলে অদিতি কি করলো না করলো আহনাফ সেটা পাত্তাও দিতো না কিন্তু এখন আর অদিতিকে উপেক্ষা করতে পারেনা আহনাফ এক অজানা অনুরক্তির কারণে।
আহনাফ কোনো কথা না বলেই আচমকা অদিতিকে কোলে তুলে নিলো।
_” আরে কি করছেন আপনি? আমি বলেছি না যাবো না।”
_” তুমি আজকাল খুবই অশিষ্ট হয়ে গেছো অদিতি। কোনো কথা শুনতে চাও না। আমার সাথে বেশি বাড়াবাড়ি করবে না।”
আহনাফ অদিতিকে কোলে করে রুমে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়। অদিতি রাগে বিছানার একপাশে হেলান দিয়ে চুপটি করে বসে থাকে।
আহনাফ ড্রয়ার থেকে একটা গিফট বক্স বের করে অদিতির হাতে ধরিয়ে দেয়। গিফট বক্সটি দেখেই অদিতির চোঁখ দুটো কৌতূহলে জ্বলজ্বল করে উঠে। পরক্ষনেই আহনাফের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলিয়ে অদিতি নিজের মধ্যে আবার উদাসীন ভাব নিয়ে আসে।
আহনাফ অবাক কন্ঠে শুধায়,” কি হলো খুলে দেখবে না? এটা তোমার জন্য।”
_” কেনো এনেছেন?”
_” জন্মদিনের প্রেজেন্ট হিসাবে এনেছি।”
_” কিন্তু আমার জন্মদিন তো কালকেই চলে গেছে।”
_” কালকে জানতে পারলে কালকেই আনতাম।”
অদিতি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আহনাফের দিকে চেয়ে থাকে। অদিতির চোখের ভাষা বুঝতে পেরে আহনাফ ইতস্ততা বোধ করে বলে,” এতো প্রশ্ন না করে খুলে দেখো।”
অদিতি বক্সটা খুলে দেখলো ভেতরে একটি হার্ট শেপের ডায়মন্ডের লকেট। লকেটটার মধ্যে “A” লেখা। অদিতি অবাক বিস্ময়ে আহনাফের দিকে চেয়ে রইলো। যেই আহনাফ তাকে বিয়ের পর থেকে সহ্যই করতে পারতো না আজ সেই আহনাফ তাকে জন্মদিনের উপহার দিচ্ছে!
অদিতি লকেটটি হাতে নিয়ে বললো,” আপনি কেনো আমাকে এসব উপহার দিচ্ছেন? আমরা তো কয়েক বছর পর আলাদাই হয়ে যাবো।”
আহনাফ ভাবেনি অদিতি এই মুহূর্তে এসেও আলাদা হওয়ার কথা বলবে। প্রচন্ড রাগ উঠলো আহনাফের অদিতির উপর। আহনাফ কোনো উত্তর না দিয়ে বিছানা থেকে নেমে বালিশ হাতে নিয়ে ডিভানে শুয়ে পড়লো। অদিতি নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইলো আহনাফের দিকে। মনে মনে বললো,” এখন কেনো রাগ লাগছে আপনার? একসময় আপনি নিজেই তো আলাদা হতে চেয়েছেন।”
অদিতি লকেটের বক্সটি ড্রয়ারে রেখে দিয়ে শুয়ে পড়লো। অদিতি আর ডাকলো না আহনাফকে, মানানোর চেষ্টাও করলো না। আহনাফ অনেক চেয়েছিলো অদিতি তাকে ডাকুক, মানানোর চেষ্টা করুক। অদিতির এই বিমুখতা মন পোড়ালো আহনাফের। অদিতি এমন করছে কেনো? আবার কি আগের মতো হওয়া যায় না? এই ম্যাচিউর অদিতিকে ভালো লাগছে না আহনাফের। মেয়েটা আগে যেমন ছিলো তেমনি ভালো ছিলো।
___
দেখতে দেখতে আলভীর চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আলভী এরই মধ্যে প্রিয়তার সাথে দেখা করিয়েছে অদিতির। প্রিয়তার ভাই প্রত্যয় আহনাফেরই অফিসে কাজ করে কিন্তু বিষয়টি অদিতি জানে না।
আলভী ব্যাগপত্র গুছিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। আহনাফ মুড অফ করে ডিভানে বসে আছে । আলভী চলে যাচ্ছে মানে আবার অদিতি তার রুম ছেড়ে গেস্ট রুমে থাকতে চলে যাবে। অদিতিকে কিভাবে নিজের রুমে রাখা যায় সেটা নিয়েই আপাতত ভাবনায় মশগুল আহনাফ। এখনো অদিতির উপর অধিকারবোধ দেখানোর মতো কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়নি তাদের দুজনের মধ্যে। একটা অদৃশ্য জড়তার দূরত্ব রয়েই গেছে। অদিতিও চেষ্টা করেনি সেই দূরত্ব ঘুচানোর।
আলভী আহনাফকে জড়িয়ে ধরে বলে,” ব্রো আমি চলে যাচ্ছি বলে তুমি মুড অফ করে রেখেছো তাই না? চিন্তা করো না ৮ মাস পড়ে আমি এমনিতেও ফিরে আসবো।”
আহনাফ ভ্রু কুঁচকে মনে মনে ভাবে,” তোর জন্য কেনো আমি মুড অফ করে বসে থাকবো গর্দভ? আমি তো অদিতির কথা ভেবে মুড অফ করে বসে আছি।”
আহনাফ আলভীকে দূরে সরিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,”সরে দাঁড়া আলভী, ঢং করিস নাতো। খুব বিরক্ত লাগে কিন্তু আমার এসব। আর আমার সামনে ফালতু প্যাঁচাল পারবি না।”
আলভী ভ্রু কুঁচকে বলল,” আহনাফ ব্রো তুমি যে কখনোই মিষ্টি কথা বলবে না সেটা তো আমি জানি।”
আলভী এইবার অদিতির দিকে চেয়ে দুরন্ত হাসি দিয়ে বললো,”মিষ্টি ভাবী ভাইয়াকে মিষ্টি মিষ্টি কথা কিভাবে বলতে হয় সেটা শিখিয়ে দিও। আর তোমার পরীক্ষার জন্যে শুভ কামনা রইলো।”
_” ওর নাম অদিতি, মিষ্টি না। তোকে না করেছি না আমার স্ত্রীকে কোনো নিকনেম দিবি না।”
_”উফস ভুলে গিয়েছিলাম আমি। সো স্যরি ব্রো।”
আলভী আরো কিছুক্ষন কথা বলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। আলভীর সাথে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত গিয়েছিলো আহনাফ। রাত ১১ টার দিকে আলভীর ফ্লাইট। আলভীকে বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে আসতে প্রায় ১২টা বেজে যায় আহনাফের।
রুমের ভেতরে প্রবেশ করতেই বুকের ভেতরটা শূন্যতায় খাঁ খাঁ করে ওঠে আহনাফের। অদিতি নেই কোথাও। চলে গিয়েছে আবার গেস্টরুমে। আহনাফের ভীষণ অভিমান হলো আজ। সে কি বলেছে আলভী যাওয়ার পর অদিতি আর তার রুমে থাকতে পারবে না। তীব্র অভিমানে হায় হুতাশ করতে থাকে আহনাফ।
আহনাফ অভিমানে হাসফাঁস করে বলতে থাকে,” চলো গিয়েছো তো যাও। যা ইচ্ছা তাই করো। আমিও আর খোঁজ নিবো না তোমার।”
আহনাফ রাগে – অভিমানে কটমট করে ল্যাপটপ হাতে নিয়ে ডিভানে বসে পড়ে। তখনি হঠাৎ আহনাফের কর্ণকুহরে অদিতির কান্নাজড়িত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। আহনাফের হৃদয়টা অদ্ভূত যন্ত্রনায় ধক করে ওঠে। আহনাফ হুড়মুড় করে গেস্ট রুমের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। অদিতি মেঝেতে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে। আহনাফের বুকের ভেতরটা অস্থিরতায় ছটফট করে ওঠে। তার অদিতি কান্না করছে! কষ্ট পাচ্ছে! অন্তকরণে সূক্ষ্ম এক অনুভূতির সৃষ্টি হয় আহনাফের।
আহনাফ নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারে না। দৌঁড়ে ছুটে এসে অদিতিকে নিজের বুকের মধ্যখানে নিয়ে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে অস্থির কন্ঠে আহনাফ শুধায়,”কি হয়েছে অদিতি? তো.. তুমি কান্না করছো কেনো? কি হয়েছে আমাকে বলো! আমি আছি না। ভয় পাচ্ছো তুমি একা থাকতে? চলো রুমে চলো একা থাকতে হবে না তোমায়।”
অদিতি আহনাফের বুক থেকে মুখ তুলে অশ্রুসিক্ত টলমল চোঁখে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে,” বাবা মারা গেছেন। ভাইয়া হসপিটাল থেকে ফোন করে তাড়াতাড়ি যেতে বলেছেন। বাবা আর অদিতি আম্মু বলে ডাক দিবেন না আমায়! আর বাবার কন্ঠস্বর শুনতে পাবো না আমি!”
কথাগুলো বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে উঠলো অদিতি। আহনাফ ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কি বলে অদিতিকে সান্ত্বনা দিবে জানা নেই আহনাফের। আহনাফ আগলে নিলো তার অদিতিকে নিজের প্রশস্ত বাহুডোরে। অদিতির চোঁখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া তপ্ত নোনাজলগুলো তীরের মতো বিঁধলো আহনাফের হৃদয়ে। আহনাফ আজ উপলব্ধি করতে পারলো তার মন তার পছন্দের বিপরীত স্রোতে প্রবাহিত হয়ে সর্বনাশ করে ফেলেছে! সেই আনস্মার্ট, ভীতু টাইপের মেয়ে অদিতিকেই ভালোবেসে ফেলেছে।
চলবে…