আমার অদিতি পর্ব-০৫

0
2

#আমার_অদিতি
#পর্ব – ৫
#নয়োনিকা_নিহিরা

অদিতির বাবা মারা যাওয়ার পর প্রায় এক বছর পার হয়ে গিয়েছে। এই এক বছরে অদিতির প্রাণবন্ত মুখশ্রী কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোঁখ দুটো প্রায় সময় বিমূর্ষ হয়ে থাকে তার। মনে হয় রাত জেগে কান্নাকাটি করে।

আহনাফ সেই দিনের পর থেকেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে অদিতিকে সে আর ছাড়বে না। সারাজীবন আগলে রাখবে। তবুও অদিতির সাথে আহনাফের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি বরং আরো বিগড়ে গেছে বিভিন্ন কারণে। এখনো আলাদা রুমেই থাকে তারা।

এরই মধ্যে অদিতির এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর দুশ্চিন্তা ও মানসিক কষ্টের মাঝেই পরীক্ষার প্রিপারেশন নিতে হয়েছিল অদিতিকে। আহনাফ অবশ্য যতটুকু সম্ভব অদিতির যত্ন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। অদিতি খুব ভালো করেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরেছে।

অন্যদিকে,আলভী আর প্রিয়তার বিয়ের ডেট ডিলে হয়ে গিয়েছে আলভীর ব্যস্ততার কারণে। অদিতি প্রায়ই প্রিয়তার সাথে দেখা করতে যায়। প্রিয়তার সাথে অদিতির এখন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

তবে অদিতি এখন আর খুব বেশি প্রয়োজন না হলে আহনাফের রুমের সামনে ঘেঁষে না। উল্টো আহনাফই বিভিন্ন ছুতোয় অদিতির সাথে কথা বলার জন্যে গেস্টরুমে চলে যায়। অদিতির সাথে এক মনোমালিন্যের দ্বন্দ্ব চলছে তার। এর কারণটা অবশ্য আহনাফ নিজেই।

অদিতিকে ভালোবাসলেও সেই ভালোবাসাকে স্বীকার করার মানসিকতা এখনো তৈরি হয়নি আহনাফের। অদিতিকে আহনাফ ছাড়তে পারবে না কখনোই, অদিতিকে এখন তার লাগবেই কিন্তু আপাতত নিজের অনুভুতিকে সুপ্তই রাখতে চায় সে।

নিজের প্রেস্টিজকে সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে আহনাফ। আর আহনাফ জানে অদিতিকে সবার সামনে নিজের স্ত্রী হিসেবে ইন্ট্রোডিউস করার সাথে সাথেই শুরু হয়ে যাবে তাকে আর অদিতিকে ঘিরে একের পর এক রমরমা নিউজ।

অদিতিকে এখনো কোনো প্রশ্ন করা হলে সে সঠিক ভাবে তার উত্তর দিতে পারে না। জড়তা আর ভয়ে আমতা আমতা করতে থাকে। এগুলো দেখলে সবাই কানাঘুষা শুরু করে দিবে অদিতিকে নিয়ে। বলবে দেশের নামকরা বিসনেসম্যান আহনাফ ওয়াহিদ বিয়ে করেছে একটা আনস্মার্ট, আনকালচার্ড মেয়েকে। আহনাফ এসব শুনতে রাজি নয়। তাই বাহিরের দুনিয়ার সামনে আপাতত অদিতিকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে না আহনাফ। একজন টপ বিসনেসম্যান হিসেবে আহনাফের একটা প্রেস্টিজের ব্যাপার আছে। অদিতি পড়াশুনা করুক, স্মার্ট হোক,কমিউনিকেশন স্কিল শিখুক আগে তার পরেই সে অদিতিকে সবার সামনে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করাবে তার আগে নয়।

আহনাফ স্পষ্ট ভাষায় বলেছিল অদিতিকে,” ঘরের ভেতরে আমি তোমাকে সম্পূর্ণ স্ত্রীর মর্যাদা আর অধিকার দিবো অদিতি। কিন্তু নিজেদের বিয়ের এনাউন্সমেন্ট বাহিরের সবার সামনে এখন আমি করতে পারবো না। তোমাকে আমি অস্বীকার করবো না কখনো কিন্তু সবার সামনে স্বীকার করে নিতে সময় লাগবে আমার।”

সেদিন অদিতির আত্মসম্মানে তীব্র আঘাত লেগেছিল। মন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিলো।

অদিতি ছলছল চোখে আহনাফের দিকে চেয়ে বলেছিল,”আপনার এই অল্পস্বল্প স্বীকৃতির কোনো প্রয়োজন আমার নেই। আমি চলে যাবো এই অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পর্ক ছেড়ে।”

আহনাফ অদিতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো,”এমন কেনো বলছো তুমি? আমি তো‌ ঠকাচ্ছি না তোমায়। আমি তো তোমারই থাকবো। শুধুমাত্র তোমাকে আমি এখন কারো সামনে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে পারবো না। আমার অফিসিয়াল কোনো পার্টি কিংবা ইভেন্টে স্ত্রী হিসেবে নিয়ে যেতে পারবো না।”

অদিতি রাগে অভিমানে কান্না করতে করতে আহনাফকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে ছাড়িয়ে গেস্ট রুমে গিয়ে দরজা নক করে দিয়েছিলো। আহনাফ অনেক মানানোর চেষ্টা করেছিল অদিতিকে কিন্তু অদিতি তার কোনো কথা শুনেনি।

এরপর থেকেই আহনাফের সাথে তার দূরত্ব আরো বেড়েছে। অদিতি এখন উপেক্ষা করে আহনাফকে। যার কাছে নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসার থেকে তার প্রেস্টিজ বেশি গুরুত্বপূর্ন সেই পুরুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিবে না অদিতি।

এই বিষয়টি নিয়েই মূলত দ্বন্দ্ব চলছে আহনাফ আর অদিতির মধ্যে। অদিতি অভিমানে অনেকবার চলে যেতে চেয়েছে আহনাফের বাড়ি থেকে। কিন্তু আহনাফ অদিতিকে খুঁজে আবার ফেরত নিয়ে এসেছে।

আহনাফের ভেতরেও এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে সবসময়। অদিতির প্রতি তার সুপ্ত ভালোবাসার অনুভূতিকে উপেক্ষা করতে পারেনা সে। অদিতিকে সেজন্য বাসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করে আহনাফ। অদিতির জন্যে নামী দামী গিফ্ট, শাড়ি, জুয়েলারি কিনে আনে আহনাফ। কিন্তু অদিতি রাগে অভিমানে সেইগুলো কখনো ছুঁয়েও দেখেনি।

অদিতিকে নিজের রুমেও ফিরে আসার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলো আহনাফ কিন্তু অদিতি আসেনি। অনেক সময় সে নিজেই গেস্টরুমে অদিতির নৈকট্য পাওয়ার জন্য ছুটে গিয়েছে। আহনাফ এই এক বছরে অনেকবার অদিতিকে স্ত্রী হিসেবে ভালোবেসে নিজের কাছে টেনে নিতে চেয়েছে কিন্তু অদিতি আত্মভিমানে আহনাফকে নিজের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি।

অদিতির সাথে যখনি ইন্টিমেট হতে চেয়েছে আহনাফ তখনি অদিতি কাটা কাটা প্রশ্নের তীর ছুঁড়ে দিয়েছে আহনাফের দিকে,” যেই মেয়েকে সবার সামনে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে বিব্রতবোধ হয় আপনার, বাসায় ফিরে সেই মেয়ের কাছে শান্তি পাওয়ার জন্য ছুটে আসেন কেনো? আমি না আনস্মার্ট, আনকালচার্ড, ভীতু টাইপের মেয়ে। তাহলে এখন আবার আমাকে চাই কেনো আপনার?”

অদিতির কাটাকাটা প্রশ্নগুলো আহনাফের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে বারবার। আহনাফ অপরাধীর ন্যায় বলেছে,” আমি তো তোমাকে সবার সামনে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিবো অদিতি। আমি তো বলিনি আমি তোমাকে আর কখনোই স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করাবো না। কিন্তু সবার সামনে তোমাকে পরিচয় দেওয়ার সাথে সাথেই তোমাকে অনেক ধরনের প্রশ্ন করা হবে, কোনো ইভেন্ট কিংবা পার্টিতে তোমাকে আমার স্ত্রী হিসেবে নিয়ে যেতে হলে তোমাকে সেখানে কনফিডেন্টলি কথা বলতে হবে যেগুলো তুমি এখনো শিখোনি। আমার ব্যক্তিগত ভাবে এখন এসব বিষয় নিয়ে কোনো সমস্যা না থাকলেও আমি চাই না আমার স্ত্রীকে মানুষ আনস্মার্ট, আনকালচার্ড ভাবুক।”

অদিতি তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,” তাহলে যেদিন আমি স্মার্ট আর সাহসী হবো, যেদিন আমার কমিউনিকেশন স্কিল ভালো হবে সেইদিনই আমার কাছে স্বামীর অধিকার দাবি করতে আসবেন তার আগে নয়।”

আহনাফ অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো অদিতির দিকে। বুকের ভেতরটা যন্ত্রনায় কেঁপে কেঁপে উঠলো। আহনাফ মলিন মুখে গেস্টরুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই অদিতি গম্ভীর স্বরে বললো,” একদিন আপনি নিজে থেকে আপনার জড়তা, অস্বস্থি আর প্রেস্টিজ সবকিছু ভুলে পুরো দুনিয়ার সামনে চিৎকার করে আমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করবেন আহনাফ ওয়াহিদ কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তখন আপনি অদিতিকে আর কোথাও খুঁজে পাবেন না দেখে নিয়েন।”

আহনাফ অস্থির হয়ে অদিতির দুগালে আলতো করে স্পর্শ করে বললো,” এভাবে বলো না অদিতি। তোমাকে আমি কোথাও হারিয়ে যেতে দিবো না। তুমি সবসময় আহনাফের থাকবে। আমি তো বলেছি,তোমাকে সবার সামনে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করাবো আমি। কিন্তু এই মুহূর্তে না। একটু আমার দিকটা বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ। তোমার সব চাহিদা আমি পূরণ করবো। তুমি যা চাইবে তাই এনে দেবো আমি। তোমাকে আমার স্ত্রী হওয়ার সমস্ত অধিকার আমি দেবো অদিতি।”

_” সব অধিকার দেবেন অথচ দুনিয়ার মানুষের সামনে স্ত্রী হিসেবে পরিচয়ই দিতে পারবেন না। আমার ভালো লাগা খারাপ লাগার কোন মূল্য নেই আপনার কাছে। আপনার কাছে তো শুধু আপনার প্রেস্টিজ বড়। তাহলে আমাকে ছেড়ে এমন কোনো মেয়েকেই বিয়ে করুন যাকে সবার সামনে গর্ব করে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবেন।”

_” তোমাকে ছাড়া অন্য কারো কথা ভাবতে পারবো না আমি অদিতি। আমি তোমাকে..”

আহনাফ কথা সম্পূর্ণ না করে থেমে গেলো এক অব্যক্ত জড়তার কারণে। অদিতিও আহনাফের মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটি শুনার আগ্রহ দেখালো না। তার এরকম ঠুনকো ভালোবাসার কোনো প্রয়োজন নেই।

অদিতি গম্ভীর গলায় বললো,” আমার কাছে আর আসবেন না আপনি। এখন থেকে আর আপনাকে স্বামী হিসেবে মানি না আমি। আমার রুম থেকে বেরিয়ে যান।”
______

গেস্টরুমের দরজার দিকে মলিন চোঁখে চেয়ে আহনাফ আগের ঘটনাগুলো মনে করছিল। এখন আর অদিতি আহনাফের কোনো ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। আহনাফ যাতে যখন তখন গেস্টরুমে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য দরজা লক করে রাখে অদিতি। আজও অদিতি দরজা আটকিয়ে রেখেছে যাতে আহনাফ তার কাছে আসতে না পারে। আহনাফ গেস্টরুমের দরজা নক করে অনেকক্ষন অদিতিকে রিকুয়েস্ট করেছে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু অদিতি দরজা খুলেনি।

আহনাফও দরজায় সামনে বসে বললো,” তুমি দরজা না খুললে আমি সারারাত এখানেই বসে থাকবো।”

আজমেরী ওয়াহিদ নিজের ছেলে আর ছেলের বউয়ের এসব কাণ্ড কারখানা দেখে হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছেন না। এই এক বছরে বাড়িতে এসব ঘটনাই ঘটে চলেছে। তাদের মধ্যকার মনোমালিন্য যে কবে শেষ হবে! আজমেরী ওয়াহিদ এক চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলেন নিজের রুমে।

আহনাফ সারারাত গেস্টরুমের দরজার বাহিরে বসে রয়েছিল এক পলক অদিতিকে দেখার জন্য। অপেক্ষা করতে করতে এক পর্যায়ে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে আহনাফ। সকালে ঘুম ভাঙ্গার পরও অনেক্ষন অদিতিকে ডেকেছে সে। অদিতি সারা না দেওয়ার আহনাফ বাধ্য হয়ে নিজের ঘরে চলে যায়।

আহনাফ উদাসীন হয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকে। যাওয়ার আগে গেস্ট রুমের দিকে অনেকক্ষন অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছে সে। অদিতির বিমুখতায় হৃদয় পুড়ছে আহনাফের। সাথে নিজের উপর প্রচন্ড রাগও উঠছে তার। কেনো সে গ্রহণ করতে পারছে না সবার সামনে অদিতিকে? হোকনা সে আনস্মার্ট কিংবা ভীতু। কিন্তু এই অদিতিকেই তো হৃদয়ে জায়গা দিয়ে ফেলেছে সে। কবে কাটবে তার এই জড়তা? এই অস্বস্থি?

___

অদিতি ভাবলেশহীন হয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। ধীরে ধীরে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে অদিতি। নিজের আশেপাশের প্রতেকটি মানুষের উপর এক আকাশ পরিমাণ অভিমান এসে ভর করেছে অদিতির মনে। আহনাফের যত্নগুলো আদিখ্যেতা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না অদিতির কাছে। বাবার বাসায়ও ফিরে যেতে পারে না সে মা আর ভাবীর জন্যে। কত করে অদিতি বলেছে আহনাফের সাথে সে থাকতে চায় না, আহনাফ তাকে নিয়ে বিব্রতবোধ করে সবার সামনে কিন্তু তার মা আর ভাবী একটা কথাই বলে অদিতিকে,” ধৈৰ্য্য ধর, সহ্য করে নে।”

আর কতো সহ্য করবে সে? কেনো সহ্য করবে? একদিন সাহস করে চলেও গিয়েছিল অদিতি। যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় সারারাস্তা এদিক সেদিক ঘুরে বেরিয়েছে। কিন্তু আহনাফ আবার খুঁজে বাসায় নিয়ে এসেছে তাকে।

অদিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে আহনাফ তাকে ডিভোর্স না দিলেও সে ঠিকই আহনাফকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে। বিভিন্ন জায়গায় পার্ট টাইম জব খুঁজার চেষ্টা করছে অদিতি। কিন্তু ভাগ্য সায় দিচ্ছে না। আহনাফের তার জন্যে কিনে আনা দামী দামী শাড়ি, গহনাগুলোর দিকে তাচ্ছিল্যের নজরে চেয়ে থাকে অদিতি। এতো দামী দামী জিনিসপত্র পেয়েই কি লাভ যদি স্বীকৃতিই না পায়?

___

আহনাফ মাত্র মিটিং শেষে নিজের ক্যাবিনে এসে বসেছে। অদিতিকে ইতোমধ্যে তিন থেকে চার বার কল করেছে আহনাফ। কিন্তু অদিতি তার কোনো কল রিসিভ করেনি। হৃদয় শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে আহনাফের। আর পারছে না সে নিজেও এভাবে থাকতে। অদিতির ফ্যাকাশে মুখটা দেখলে আহনাফের দমবন্ধ হয়ে আসে।

আহনাফ স্বগোতক্তি করে বলতে থাকে,” আর পারবো না আমি তোমাকে এভাবে অবহেলা করতে। যে যাই বলুক সবার সামনে এইবার আমি নিজের স্ত্রী হিসেবে তোমাকে স্বীকার করে নিবো অদিতি। নিজের সমস্ত বন্ধু বান্ধব, আত্মীয়স্বজন আর কর্মক্ষেত্রের কারো কাছ থেকে আমি আর বিব্রতবোধ করে তোমাকে লুকিয়ে রাখবো না। তোমাকে সবার সামনে স্বীকৃতি দেবো আমি। সবার সামনে চিৎকার করে বলবো তুমি আমার অদিতি, আহনাফের অদিতি, আহনাফের বিয়ে করা স্ত্রী।”

তখনি নাবিলা আহনাফের ক্যাবিনে প্রবেশ করে। আহনাফের মলিন মুখশ্রীর দিকে চেয়ে মৃদু হাসি দেয় নাবিলা। এই এক বছরে বিভিন্নভাবে আহনাফকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার চেষ্টা নাবিলা করেছে। কিন্তু আহনাফ কখনোই ফিরে তাকায়নি তার দিকে। ধীরে ধীরে নাবিলার আহনাফের প্রতি মোহ কেটে গিয়েছে। প্রত্যয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গাঢ় হয়েছে। প্রত্যয়ের কাছ থেকেই নাবিলা জেনেছে আহনাফের বিয়ের কথা।

প্রিয়তা অদিতির বান্ধবী হওয়ায় প্রিয়তার কাছে সকল বিষয়ই শেয়ার করে অদিতি। প্রিয়তার মাধ্যমেই প্রত্যয় জেনেছে আহনাফের বিয়ের ব্যাপারে আর তার মাধ্যমে জেনেছে নাবিলা। তবে তারা অফিসের অনন্যা স্টাফদের কাছে বিষয়টা না রটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রত্যয় আর নাবিলাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আহনাফ কি করে সেটা দেখার জন্য।

নাবিলা নিজের কৌতুহল আর দমিয়ে রাখতে না পেরে বলেই ফেলে,” স্যার, বিয়ে যখন করেছেন অ্যানাউন্সমেন্টটা এইবার করেই ফেলেন।”

নাবিলার কথা শুনে আহনাফ অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার দিকে।

নাবিলা মৃদু হেসে বলে,” প্রত্যয়ের কাছ থেকে আমি এসব কিছু জেনেছি। প্রত্যয়ের বোন নাকি আপনার স্ত্রীর মানে ম্যাডামের বান্ধবী। তবে আমরা কিন্তু আর কাউকে আপনার বিষয়ে কিছু বলিনি,স্যার।”

আহনাফ এইবার ইতস্ততা বোধ করে বলে,” আপনার ম্যাডামের সাথে আমার মান অভিমান চলছে। আমার বেগম খুবই রেগে আছেন।”

নাবিলা ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত করে বলে,” রেগে থাকার মতো কাজ করলে রাগবে না।”

আহনাফ ফোস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো,”মিস. নাবিলা আপনার কাছে আমার অনুরোধ এখন অফিসে কিছু রটাবেন না। আমি চাই আমার মুখেই সবাই আমার স্ত্রীর ব্যাপারে জানুক। কালকেই একটা প্রেস কনফারেন্স ডেকে আমি সবার সামনে আমার স্ত্রী অদিতিকে পরিচয় করিয়ে দিবো।”

নাবিলা মুচকি হেসে বলে,” ওকে স্যার।”

আহনাফ মনে মনে ভাবে,” আমার বেগম সাহেবা আপনার অভিমান এইবার ভাঙ্গাবার পালা। আজকে বাসায় গিয়ে তোমার সব রাগ অভিমান দূর করবে তোমার স্বামী।”

কিন্তু আহনাফ কি আর জানে বাসায় তার জন্যে এক ভয়াবহ ঝড় অপেক্ষা করছে!

চলবে…