#আমার_অদিতি
#পর্ব – ৬
#নয়োনিকা_নিহিরা
আহনাফ আজ অদিতির জন্যে লাল টুকটুকে শাড়ি, লাল রঙের কাঁচের চুড়ি আর লাল গোলাপ ফুলের তোড়া কিনেছে। আজ যেভাবেই হোক অদিতির সাথে আহনাফ তার সম্পর্ক ঠিক করবে। অদিতির অভিমান ভেঙ্গে তাকে নিজের করে নিবে। গোলাপের তোড়া হাতে নিয়ে আহনাফ মৃদু হেসে বলে,” আজ তোমাকে সর্ম্পূণ আমার করে নিবো অদিতি। অনেক দূরে দূরে থেকেছো তুমি আমার কাছ থেকে আর না।”
অদিতির জন্যে কেনাকাটা করে আহনাফ খুশি মনে বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ি ফিরতেই আহনাফ নিজের রুমে না গিয়ে সরাসরি চলে যায় গেস্টরুমের দিকে।
গেস্টরুমের দরজার সামনে এসে আহনাফ উৎসাহিত কন্ঠে বলে,” প্লিজ দরজা খুলো বউপাখি আমার। দেখো তোমার জন্য আমি কতকিছু এনেছি। আচ্ছা ঠিকাছে তুমি ঠিক আর আমি ভুল। তোমাকে আর অবহেলা করবো না আমি অদিতি। তোমাকে নিয়ে আর কারো সামনে বিব্রতবোধ করবো না। তুমি যেমন আছো, যেভাবে আছো ঠিক সেভাবেই থাকো অদিতি,আমার কোনো আপত্তি নেই। তোমার আর আমার সম্পর্ক আর গোপন রাখবো না আমি। পুরো দুনিয়া জানবে অদিতি আহনাফের স্ত্রী।”
অদিতির কোনো সাড়া না পেয়ে আহনাফ এইবার গেস্টরুমের দরজার দিকে হাত বাড়ায়। দরজা খোলাই ছিল। আহনাফ সাথে সাথেই রুমে প্রবেশ করে। কিন্তু রুমের কোথাও অদিতিকে খুঁজে পায় না আহনাফ। আহনাফ হাতে থাকা উপহার গুলো বিছানায় রেখে অদিতিকে ডাকতে থাকে।
_” অদিতি তুমি কি ওয়াসরুমে? কথা বলছো না কেন?”
আহনাফ ওয়াসরুমে দিকে এগিয়ে যায়। অদিতি নেই সেখানে। আহনাফ এইবার চিন্তিত মুখে গেস্টরুম থেকে যেই না বেরোতে যাবে ওমনি তার নজর পড়ে ড্রেসিং টেবিলের উপরে রাখা একটি ছোট্ট চিরকুটের দিকে। আহনাফ সাথে সাথেই চিরকুটটি হাতে নিয়ে পড়া শুরু করে।
” আহনাফ সাহেব,এই চিরকুটটি যদি আপনার হাতে পৌঁছায় ধরে নিয়েন আপনার অদিতি আর নেই। আমি চলে যাচ্ছি সবাইকে ছেড়ে। অদিতিকে নিয়ে আর আপনাকে বিব্রতবোধ করতে হবেনা কারো সামনে। আপনারা সবাই অদিতিকে বোঝা মনে করেছেন। প্রথমে আমার পরিবার বোঝা ভেবে আমাকে আপনার সাথে বিয়ে দিয়ে দিলো। বিয়ের পর অদিতি হলো স্বামীর অস্বস্থির কারণ। আমি কতো করে মাকে আর ভাবীকে বললাম আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। তারা আমাকে আপনার এই অবহেলায়ই সহ্য করতে বললো। আর কত আমি সহ্য করবো আহনাফ সাহেব? আমি যদি কোনোদিন আপনার মনের মতো স্মার্ট হতে না পারি তাহলে কি আপনি কোনোদিন আমাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করবেন না? আপনাকে আর আমার দায়িত্ব নিতে হবে না আহনাফ সাহেব। অদিতি নামক বোঝা আর কাউকে বিরক্ত করবে না। আমার তো আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই তাই আমি এমন এক জগতে হারিয়ে যাবো যেখান থেকে আর কোনোদিন আমাকে খুঁজে বের করা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে না। অদিতি আপনার জীবন থেকে আজ চিরতরে হারিয়ে যাবে আহনাফ সাহেব। অদিতি শেষ করে দেবে নিজেকে। আপনি আজ থেকে দায়িত্ববোধের শিকল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। অদিতি আজ আপনাকে মুক্ত করে দিলো। ভালো থাকবেন।”
ইতি
“আপনার অদিতি”
অদিতির রেখে যাওয়া চিরকুটটি পড়ে আহনাফের আত্মার পানি শুকিয়ে গেলো। আতঙ্কে বুকের ভেতরে ধড়ফড় শুরু হলো। আহনাফ চিৎকার করে বললো,” না না না অদিতি না! তুমি এই কাজ করতে পারোনা! এটা তুমি কি করলে বোকা মেয়ে? না না কিছু হবে না! তোমার কিছু হতে দেবো না আমি! তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারো না!”
আহনাফ গেস্টরুম থেকে বেরিয়ে দৌঁড়ে নিজের মায়ের রুমে চলে যায়।
_”মা, আমার অদিতি কোথায়? কোথায় গিয়েছে ও? কিসব আবোল তাবোল কথা লিখেছে দেখো! কোথায় সে?”
আজমেরী ওয়াহিদ শান্ত কন্ঠে শুধালেন,” আহনাফ, এতো অস্থির হচ্ছিস কেনো? কি হয়েছে? অদিতি তো বিকেলে কোথায় যেন বেরিয়ে গেলো।”
আহনাফ অস্থিরতায় চিৎকার করে বললো,” বেড়িয়ে গেছে মানে? কোথায় বেরিয়েছে? তুমি কিভাবে ওকে একা যেতে দিলে? আমাকে বলোনি কেনো?
আহনাফ অশান্ত হয়ে সজোরে নিজের চুল খামচে ধরে অস্থির কন্ঠে বলল,” এখন কোথায় খুঁজবো ওকে আমি? ফোনটাও তো গেস্টরুমে ফেলে রেখে গিয়েছে।”
_ “আহনাফ বাবা তুই একটু শান্ত হো। কি হয়েছে অদিতির? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
আহনাফ চিরকুটটি তার মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে একপ্রকার দৌঁড় দিয়েই বেরিয়ে যায় বাসা থেকে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে আহনাফ। বুকের ভেতরে যেনো উথাল পাথাল শুরু হয়েছে আহনাফের।
মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগে চোঁখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে আহনাফের। ড্রাইভ করতে করতেই আহনাফ অস্থির কন্ঠে বলতে থাকে,” প্লিজ কোনো পাগলামি করো না অদিতি। আর কোনোদিন তোমায় আমি অবহেলা করবো না। তোমার কিছু হলে শেষ হয়ে যাবো আমি। নিজেকে আর কোনোদিন আমি ক্ষমা করতে পারবো না। তুমি আমার জীবন হয়ে গেছো অদিতি। এতবড় শাস্তি আমাকে দিও না অদিতি প্লিজ।”
আহনাফ পাগলের মতো এদিক সেদিক অদিতিকে খুঁজে বেড়াতে থাকে। কিন্তু কোথায় খুঁজে পায়না আহনাফ তার অদিতিকে। অস্থিরতায় দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয় আহনাফের।
এদিকে অদিতির রেখে যাওয়া চিরকুটটির কথা শুনে কেঁদে কেটে নাজেহাল অবস্থা অদিতির মা আমিনা বেগমের। আহনাফ অদিতিদের বাসায় যেতেই আহনাফের শার্টের কলার চেপে আমিনা বেগম আহাজারি করে বলতে লাগলেন,” আমার মেয়েটার সাথে তুমি নিশ্চয়ই খারাপ আচরণ করেছো নাহলে আমার মেয়েটা এমন সিদ্ধান্ত কেনো নিলো? কত অনুরোধ করে আমার কাছে ফিরে আসতে চাইলো মেয়েটা আমি আসতে দিলাম না। সব দোষ আমার। আমার ফুলের মত মেয়েটা! ওকে আমার সেইদিনই ফিরিয়ে আনা উচিত ছিল।”
আহনাফ অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে বললো,” কিচ্ছু হবে না আমার অদিতির। ওকে আমি আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসবো আমার কাছে। আপনার মেয়ের কিচ্ছু হবে না আন্টি। আমি কথা দিলাম অদিতিকে আমি একেবারে সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় খুঁজে বের করবো।”
সেই রাতেই আহনাফ প্রেস কনফারেন্স ডেকে লাইভে এসে নিজের বিয়ের কথা স্বীকার করে বললো,” আমি অন্যায় করেছি অদিতি। আমাকে ক্ষমা করে দাও। তুমি যেখানেই আছো ফিরে আসো আমার কাছে প্লিজ। রাগের মাথায় কোনো পাগলামি করো না বউ আমার। আমি তোমাকে ভালোবাসি অনেক ভালোবাসি।”
সাথে সাথেই মিডিয়া জগতে আহনাফ আর অদিতিকে নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেলো। নিউজ চ্যানেলগুলোতে দেশের টপ বিসনেসম্যান আহনাফ ওয়াহিদের স্ত্রী অদিতির মিসিং হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লো সাথে সাথে।
আহনাফ তাড়াতাড়ি প্রেস কনফারেন্স শেষ করে আবার বেরিয়ে পড়লো অদিতির খোঁজে। কিন্তু না অদিতির কোনো হদিস খুঁজে পাওয়া গেলো না। এমনকি প্রিয়তার বাসায়ও যায়নি অদিতি। তবুও আহনাফ ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় খুঁজে চলেছে তার অদিতিকে। আহনাফ জানে না কোথায় খুঁজবে অদিতিকে। তবে আহনাফের হৃদয় তাকে বলছে,”যেকোনো জায়গায়,সে যেখানেই থাক ,অদিতি ফিরে আসবে তার কাছে।”
____
রাতের অন্ধকার আস্তে আস্তে কেটে যেতে থাকে। পূর্ব আকাশে প্রথম আলোর রেখা দেখা দেয়, আর চারপাশে মৃদু শীতল বাতাস বইতে থাকে। পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে জেগে ওঠে, প্রকৃতির সমস্ত কণ্ঠে নতুন দিনের আগমন সাড়া দেয়।
সারারাত অদিতিকে পাগলের মতো খুঁজে নিস্তব্ধ, নিস্তেজ হয়ে বাসায় ফিরে আসে আহনাফ। আহনাফের নাজেহাল অবস্থা দেখে আহনাফের বাবা আর মা ব্যাকুল হয়ে ছুটে আসেন তার দিকে।
_” অদিতির কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে?”
আহনাফ নিস্তেজ কন্ঠে বলে,” না,মা কোথাও খুঁজে পায়নি আমার অদিতিকে।”
তখনি আলভী আহনাফদের বাড়িতে প্রবেশ করে। আলভী দেশে ফিরে এসেছে আজ প্রায় কয়েকদিন হলো। এক মাস পরেই প্রিয়তার সাথে এনগেজমেন্ট হবে আলভীর।
আলভীকে দেখে আহনাফ অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,”তুইও তো অদিতিকে খুঁজতে বেরিয়ে ছিলি কোথায় পেয়েছিস ওকে?”
_” না ব্রো। সারা শহরে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি আমি। কিন্তু মিষ্টি ভাবীর কোনো হদিস খুঁজে পায়নি। এতক্ষনে ভাবী সত্যি সত্যিই আবার নিজের কোনো ক্ষতি…”
আলভী কথা শেষ করতে পারে না তার আগেই আহনাফ আলভীর নাক বরাবর পাঞ্চ মেরে তার মুখ বন্ধ করে দেয়।
_”একদম আজে বাজে কথা বলবি না আলভী। আমার অদিতির কিচ্ছু হবে না।”
আলভী নিজের নাক চেপে ধরে ক্ষিপ্ত স্বরে বললো,”এতোই যখন টান তো অবহেলা করেছো কেনো? তুমি কি ভাবো কিছুই জানি না আমি। সব কিছু শুনেছি আমি। তোমার জন্যই ভাবী এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
আহনাফ আর সহ্য করতে না পেরে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। রাগে, অস্থিরতায় একের পর এক জিনিসপত্র ভাংচুর করতে থাকে। যেখানে তার অদিতি নেই সেখানে অন্য কোনো জিনিসেরও দরকার নেই।
আজমেরী ওয়াহিদ অনেকক্ষন আহনাফের রুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। আহনাফ রাগে চিৎকার করে বলে,” আমাকে একা থাকতে দাও মা, প্লিজ।”
ভাংচুর করতে করতে এক পর্যায়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ে আহনাফ। আহনাফের মনে হচ্ছে তার হৃদপিন্ডটা কেউ শক্ত করে খামচে ধরেছে।অদিতির রেখে যাওয়া চিরকুট হাতে নিয়ে বুকের বাঁ পাশ শক্ত করে চেপে ধরে সে।
তখনি আহনাফের কাছে একটা ফোনে একটা কল আসে। আহনাফ সাথে সাথেই উতলা হয়ে কল রিসিভ করে। ওপাশ থেকে আহনাফের লোকরা তাকে বলে,”স্যার, নীল রংয়ের থ্রিপিস পড়া একটি মেয়ের কার এক্সিডেন্ট হয়েছে কাল রাতে। আপনার স্ত্রীর বয়সী হবে। একটু হসপিটালে এসে চেক করে যান তো।”
কথাটি শুনে আহনাফের হাত থেকে ধপ করে মোবাইল ফোন পড়ে যায়। হৃদস্পন্দন গতি হারায়। চোঁখ থেকে গড়িয়ে পড়ে নোনাজল। আহনাফ মেঝে থেকে উঠে হুড়মুড় করে লিভিংরুমে এসে অস্থির কন্ঠে পুরো ঘটনা বললে আলভী অবাক হয়ে চোখ ছানাবড়া করে তাকায়।
_” এটা হতেই পারে না ব্রো। ওইটা অন্য কোনো মেয়ে হবে। I’m damn sure. দাঁড়াও আমিও আসছি তোমার সাথে।”
আলভী আজমেরী ওয়াহিদকে শান্ত থাকার ইশারা করে আহনাফের সাথে বেরিয়ে যায়। সারারাস্তা আহনাফ অস্থিরতায় হায় হুতাশ করতে থাকে। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর আহনাফের খানিকটা স্বস্থি হয়। মেয়েটা অদিতি না, অদিতির বয়সী অন্য কেউ।
_” দুঃখিত, স্যার। আমরা চিনতে পারিনি।”
আলভী রেগে বলে,” আশ্চর্য! চিনতে পারবেন না কেনো? ছবি ভালোমতো দেখেননি নাকি?”
কিন্তু এই ঘটনার পর আহনাফের আতঙ্ক আরো বেড়ে যায়। আহনাফ অস্থির হয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গাড়িতে বসতে বসতে বলে,” তুই বাসায় চলে যা আলভী। আমি অদিতিকে আবার খুঁজতে বের হবো।”
আলভী কিছুক্ষণ আহনাফের যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে। আলভী ফোস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে কাকে যেনো ম্যাসেজ পাঠায়। তারপর কিছু খাবার কিনে একটি ভাড়া করা ফ্ল্যাটে চলে আসে।
আলভী আসতেই প্রিয়তা হাসিমুখে আলভির দিকে এগিয়ে যায়। প্রিয়তাকে দেখে আলভী দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,” আহনাফ ব্রোয়ের নাজেহাল অবস্থা হয়ে গেছে।”
প্রিয়তা ভ্রু কুঁচকে বলে,” ঠিকই আছে। অবহেলা করার আগে মনে ছিলো না। বুঝুক এবার।”
_” তবুও আমার না আহনাফ ব্রোয়ের জন্যে মায়া লাগছে। বেচারা ভাই আমার।”
_” আরে তুমি তো দেখছি আহ্লাদে একেবারে গদগদ হয়ে গিয়েছো।”
_” তা গদগদ হবো না যতোই হোক বড়ো ভাই আমার। আর ভাবী কোথায়? মিষ্টি ভাবী তাড়াতাড়ি নিচে এসো।”
আলভীর ডাক শুনে অদিতি সিঁড়ি বেয়ে তাড়াহুড়া করে নিচে নেমে এসে শুধায়,” উনি এখন কি করছেন? কেমন আছেন?”
প্রিয়তা অদিতিকে হালকা ধাক্কা মেরে বলে,” তোমার উনিকে আরেকটু নাকানি চুবানি খাওয়ানো বাকি আছে বুঝলে।”
আলভী ডিভানে গা এলিয়ে দিয়ে বলল,” ভাবী ভাইয়ার চেহারাটা যদি একবার দেখতে। পুরাই দেবদাস হয়ে গেছে একদিনে। তবে যেইদিন ভাইয়া জানবে তাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমরাই তোমাকে লুকিয়ে রেখেছি তখন ভাইয়া আমার অবস্থা নাজেহাল করে দিবে।”
প্রিয়তা কাঠ কাঠ কন্ঠে বললো,” ঠিকই আছে। এতো কিউট একটা ওয়াইফ থাকতে তাকে নিয়ে নাকি বিব্রতবোধ করে তোমার বড়ো ব্রো। আহনাফ ভাইয়ের এই শিক্ষা সারাজীবন মনে থাকবে, হুঁহ্।”
তখনি আলভীর ফোনে আজমেরী ওয়াহিদের ফোন আসে। আলভী কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আজমেরী ওয়াহিদ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলেন,” আলভী অদিতি ঠিক আছে না।”
_”হ্যাঁ মামী, ভাবী একদম ঠিক আছে। ওইটা অন্য কোনো মেয়ে ছিলো। তারা চিনতে ভুল করেছে।”
আজমেরী ওয়াহিদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,” আমি তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। ছেলেটার মুখটা দেখেছিস কেমন হয়ে গিয়েছে। ওর সামনে আর মিথ্যে নাটক করতে পারছি না আমি আলভী। এইবার বলে দেই সত্যিটা।”
_ ” এখন না মামী। ব্রো আরেকটু উতলা হোক তারপর।”
_” তুই শুধরাবি না দুষ্টু ছেলে। এইবার অদিতিকে একটু ফোনটা দে আমি কথা বলতে চাই ওর সাথে।”
আলভী অদিতির দিকে চেয়ে দুষ্টু হাসি দিয়ে ফোন এগিয়ে দেয়।
___
আহনাফ আর অদিতির মধ্যকার মনোমালিন্য প্রায় এক বছর ধরে চলছিল। আজমেরী ওয়াহিদ অনেকবার আহনাফকে বলেছে অদিতিকে এভাবে লুকিয়ে না রাখতে। কিন্তু আহনাফ জড়তার কারণে অদিতিকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে পারিনি।
এমনকি আহনাফের বাসায় একদিন বিদেশ থেকে ক্লায়েন্টরা আসলে অদিতি ভুলবশত তাদের চোঁখের সামনে পড়ে যায়। আহনাফের কাছে তারা মেয়েটির পরিচয় জানতে চাইলে আহনাফ ইতস্ততা বোধ করে বলেছিল,” আমাদের বাসার পেয়িংগেস্ট।”
সেইদিনই অদিতি রাগে অভিমানে চলে গিয়েছিলো। কিন্তু আহনাফ অদিতিকে খুঁজে আবার বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। হাঁটু গেঁড়ে বসে অদিতির কাছে মাফও চেয়েছে। কিন্তু অদিতি ক্ষমা করতে পারেনি আহনাফকে। এরপর থেকেই অদিতির সাথে আহনাফের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে।
আহনাফের এই আচরণে আজমেরী ওয়াহিদ আর আহনাফের বাবা আশরাফ ওয়াহিদও রেগে ছিলেন আহনাফের উপর। অদিতিও এরপর থেকে আহনাফকে উপেক্ষা করা শুরু করেছে। প্রিয়তার কাছে অদিতি প্রায়ই এসব বিষয় শেয়ার করতো। এরই মধ্যে আলভীও দেশে ফিরে আসে। আলভী দেশে ফিরে আসলে প্রিয়তার কাছ থেকে এসব ঘটনা শুনে খুবই শকড হয়। যদিও এক বছর আগেই আলভী বুঝেছিল অদিতি আর আহনাফের মধ্যকার সম্পর্ক ভালো নয় কিন্তু সে বিষয়টা বুঝেও না বুঝার ভান করেছে। তবে প্রিয়তার কাছ থেকে এসব ঘটনা শুনে আলভীরও আহনাফের উপর প্রচন্ড রাগ অনুভূত হয়।
অদিতির প্রতি আলভীর সবসময় একটা মায়া কাজ করে।তাই আলভী আর প্রিয়তা মিলে এই প্ল্যান বানায় আহনাফকে শায়েস্তা করার জন্য। আজমেরী ওয়াহিদ প্রথমে এসবে রাজি না হলেও এক পর্যায়ে অদিতির মুখের দিকে চেয়ে রাজি হয়ে যান। তবে বেশি বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন তিনি।
আলভী উৎসাহিত হয়ে আজমেরী ওয়াহিদকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,” নো টেনশন মামী, ব্রোকে একটু শক না দিলে ব্রো সোজা হবে না। আম সো এক্সিটেড, ব্রোয়ের এক্সপ্রেশন দেখার জন্য।”
আলভী আজমেরী ওয়াহিদের কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে অদিতিকে একটি ভাড়া করা ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে নিয়ে আসে আহনাফের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার জন্য। প্রিয়তাও অদিতির সাথে এখানেই থাকবে।
আর সেই ড্রামাটিক চিরকুটটিও আলভীই লিখিয়েছে প্রিয়তাকে দিয়ে। যাতে আহনাফের অবস্থা আরো নাজেহাল হয়।
অদিতিও তাদের এসব কাজে আর মানা করেনি। আহনাফের উপর প্রচন্ড অভিমান অদিতির। অনেক কষ্ট দিয়েছে আহনাফ অদিতিকে। সবসময় নিজের প্রেস্টিজকে গুরুত্ব দিয়েছে সে।
অদিতি নিজের শ্বাশুড়ীর সাথে কথা শেষ করে রুমে চলে যায়। প্রিয়তার মোবাইল ফোন থেকে কাল প্রেস কনফারেন্সে আহনাফের করা স্বীকারোক্তির ভিডিওগুলো দেখতে থাকে। অভিমানে চোঁখ দুটো ছলছল করে ওঠে তার। এখন কেনো উনি অদিতি অদিতি করছেন? এতদিন না এই অদিতিকেই পরিচয় দিতে ওনার অস্বস্তি হয়েছিল।অদিতি সহজে ধরা দিবে না আহনাফের কাছে। আহনাফেরও হৃদয় পুড়ুক, সেও ক্ষতবিক্ষত হোক।
অদিতি ফোন বন্ধ করে প্রিয়তার হাতে ধরিয়ে দেয়।
_” তুমি যে আমার সাথে থাকবে তোমার বাসায় কৈফিয়ত দিতে হবে না।”
_” আরে চিল অদিতি। বাসায় আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি। এমনিতেও প্রত্যয় ভাইয়া জানলে সাথে সাথেই আহনাফ ভাইয়ার কাছে খবর পৌঁছে যেতো। আহনাফ ভাইয়া তো আমাদের বাসায় গিয়েও তোমার খোঁজ করেছে জানো সেটা।”
আহনাফের কথা শুনে অদিতি নিশ্চুপ হয়ে যায়। অদিতি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ ঘর গুছাতে থাকে।
___
এদিকে পুরো শহরের আনাচে কানাচে অদিতিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে আহনাফ। কিন্তু আজও একরাশ হতাশা ছাড়া আহনাফ কিছুই খুঁজে পায় না।
আহনাফ ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে আবার বাসায় ফিরে আসে। আজমেরী ওয়াহিদের এইবার প্রচন্ড খারাপ লাগে আহনাফের জন্য কিছু বলতে গিয়েও আলভীর ইশারায় থেমে যান তিনি।
আহনাফ আর নিজের রুমে যায় না। সরাসরি গেস্টরুমে গিয়ে দরজা আটকিয়ে দেয়। দমবন্ধ হয়ে এক ভয়ংকর যন্ত্রণা হচ্ছে আহনাফের হৃদয়ে। সব সময় পরিপাটি থাকা আহনাফের চুলগুলো উস্কোখুস্কো হয়ে গিয়েছে। চোঁখে মুখে দুশ্চিন্তা আর আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
আহনাফ আলমারি থেকে অদিতির রেখে যাওয়া শাড়িগুলো বের করে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে বসে পড়ে। বুকের ভেতরে শূন্যতার গভীর চাপ সৃষ্টি হয়। অদিতিকে হারানোর ভয়ে হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে আহনাফের।আর দমিয়ে রাখতে পারে না আহনাফ নিজের অনুভূতিকে। চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে আহনাফ।
” কোথায় চলে গেলে তুমি অদিতি! এখন আমি কিভাবে বাঁচবো? আমি তো বলেছিলাম তোমাকে আমি স্বীকার করবো সবার সামনে। এটা তুমি কি করলে জানবাচ্চা আমার! এতো অভিমান ছিলো তোমার আমার উপর। একবার শুধু বলতে তুমি আমাকে। তুমি আর সহ্য করতে পারছো না শুধু একবার বলতে। আমি তোমার সব কথা মেনে নিতাম। ফিরে আসো আমার কাছে অদিতি। তোমাকে আর কোনদিন কষ্ট দিবো না আমি। প্লিজ ফিরে আসো তোমার স্বামীর কাছে। ভালোবাসি অদিতি, ভীষণ ভালোবাসি তোমাকে।”
চলবে…