#আমার_মাঝে_তুমি
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
#সূচনা_পর্ব
বিয়ের আসরে বরের জায়গায় বর হিসেবে এমপি ইজহান শেখ কে দেখে হতভম্ব হয়ে যায় সুনাইফা। দু চোখ কোঠর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম । তাঁর ভাবতেই অবাক লাগছে এমপি ইজহান শেখের সাথে তাঁর বিয়ে। অসম্ভব এটা হতে পারে না। যাকে সে জমের মতো ভয় পায়। যার বয়স তার থেকে ১১ বছরের বেশি তাকে সে কিভাবে বিয়ে করবে ইম্পসিবল! সুনাইফা কিছু না ভেবেই দ্রুত তার রুমে চলে আসে। রুমে এসে দরজা আটকিয়ে পায়চারি করতে থাকে। কি করবে না করবে ভেবে পাচ্ছে না। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিছে। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাট হয়ে গেছে। তবুও মনে কিছুটা সাহস জুগিয়ে পালানোর কথা ভাবে। যেই ভাবা সেই কাজ সুনাইফা টেবিল থেকে খাতা বের করে একটা চিঠি লিখে টেবিলের উপরে রেখে দেয়। তারপর আশেপাশে ভালো করে খেয়াল করে রুম থেকে বের হয়। তার পরনে কালো রঙের জামদানি শাড়ি । মাথায় বড়ো ঘোমটা দিয়ে মুখে মাক্স পড়া। রাত হওয়ায় চারপাশ টা অন্ধকার হয়ে আছে। সেজন্য কারোর সামনে পরার চান্স নেই । হাতে তার বাটন ফোন। ফোনটা তার মা’য়ের। বিপদে পরে মা’য়ের ফোন টা নিতে বাধ্য হয়েছে সুনাইফা। তার কিছু করার নেই। এমন একটা বুইড়া বেডা কে বিয়ে করে তার জীবন টা নষ্ট করতে চাই না সে। ভাবতে ভাবতে বাড়ির পিছনের দরজার কাছে চলে আসে সে। এদিক টায় তেমন কেউ নেই। সবাই বাড়ির সদরেই আছে। সুনাইফাদের বাড়িটা একতলা ছাদ বিশিষ্ট। গ্রামে একমাত্র তাদেরই ছাদের বাড়ি। তার বাবা গ্রামের চেয়ারম্যান। সবাই তাকে খুব সম্মান করে। সুনাইফা বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে আসে। রাস্তায় এসে ঘটে আরেকটা বিপত্তি। বাড়ি থেকে টাকা আনতে ভুলে গেছে সে। এখন কি করে যাবে সে। নিজের মাথার চুল নিজেই খামচে ধরে বিড়বিড় করে বলে,
” শা*লা বুইড়া বেডার জন্য সব ভুইলা গেছি। এখন আমি কি করমু আল্লাহ! কিছু একটা করো প্লিজ! এখন তো আমি বাড়িও যেতে পারব না কি করি?
সুনাইফা আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে মুখ নিচু করে সামনে তাকাতেই দেখতে পায় একটা ছেলেকে। ছেলেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। সুনাইফা কিছু একটা ভেবে মুচকি হাসে, মুখের মাক্স টা সুন্দর করে আরেকটু গুছিয়ে নিয়ে সামনে হাঁটা ধরে৷ সুনাইফা ছেলেটার কাছে এগিয়ে যায়, ছেলেটা কান থেকে ফোন নামিয়ে পিছনে ঘুরে দেখে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সুনাইফা ছেলেটা কে দেখে আঁতকে ওঠে। দু’কদম পিছিয়ে যায়। ভয়ে থরথর করে কাপে, গলা শুকিয়ে গেছে, বারবার শুকনো ঢোক গিলছে। সুনাইফা কিছু না বলে দৌড় লাগায় রাস্তার দিকে। সুনাইফার দৌড়ানো দেখে ছেলেটা আশ্চর্য হয়ে যায়। আশ্চর্য হয়ে বিড়বিড় করে বলে,
” আজব! মেয়েটা এভাবে দৌড়াচ্ছে কেন? আর আমাকে দেখে এমন ভয় পেয়ে উঠলো কেন? কিছু কি ঘাপলা আছে?
ছেলেটার নাম ইজহান শেখ। যার সাথে সুনাইফার বিয়ে। অথচ ইজহান শেখ তার উডবি ওয়াইফ কে চিনতে পারল না বাট হোয়াই?
ইজহান সময় নষ্ট না করে বাসার ভিতরে ঢুকে সোফায় গিয়ে বসে পরে। তাদের বিয়েটা খুব ঘরোয়া ভাবেই হচ্ছে। ইজহান শেখ এই মুহূর্তে চাচ্ছে না বাইরের কেউ তাদের বিয়ের ব্যাপারে জানুক । সেজন্য এত লুকোচুরি। কিন্তু আদোও কি তাদের বিয়েটা হবে?
__________________
ইজহান সবে মাত্র সোফায় বসেছিল তখনই একটা মেয়ে ছুটে আসে ড্রয়িং রুমে। মেয়েটা দৌড়ে আসছে আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে,
” আব্বা, আব্বা, আপা ঘরে নেই! এমনকি বাড়ির কোথ্থাও আপাকে খুজে পাচ্ছি না।
কথাটা যেন বিস্ফোরণের ন্যায় ড্রয়িংরুমে ফেটে পড়ে। সিরাজ মোল্যা আতঙ্কিত হয়ে বললেন,
” কি বলছিস মুন্নি। সুনাইফা কোথায় গেলো? তুই ভালো করে সারা বাড়ি খুঁজে দেখেছিস।
” হ্যাঁ আব্বা। আমি সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুজে দেখেছি আপা কোনো জায়গায় নেই। আমার খুব ভয় করছে আব্বা। আপার কোনো বিপদ হইলো না তো।
ছোট মেয়ে মুৃন্নির কথা শুনে তাকে ধমকে বলেন, চুপ কর। কি বাজে বকছিস। সবাই মিলে ভালো করে খুজে দ্যাখ কোথাও আছে। এই রাতেই বা যাবে কোথায়? বাড়ির বাইরে যাওয়ার সাহস সুনাইফার নেই।
বাড়ির প্রতিটা মানুষ সারা বাড়ি খুজতে ব্যস্ত হয়ে পরে। সিরাজ মোল্যা ধপ করে সোফায় বসে পড়েন।
ইজহান এতক্ষণ চুপ করে সবটা শান্ত দৃষ্টিতে দেখছিল। সবার কথা কান পেতে শুনছিল। হুট করে তার একটু আগের ঘটনা মনে পরে। অদ্ভুত ভাবে মেয়েটার দৌড়ানো। মেয়েটার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। সব মিলিয়ে ইজহান শেখের কাছে সবটা পানির মতো পরিষ্কার লাগছে। ইজহান শেখ উঠে দাড়িয়ে সবার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” আমি একটু আসছি।
সিরাজ মোল্যা আঁতকে ওঠে বলেন,
” কোথায় যাচ্ছো বাবা? প্লিজ তুমি চলে যেও না? সুনাইফা বাড়ির কোনো না কোনো জায়গায় আছে। আমরা খুজলে তাকে পেয়ে যাব।
ইজহান বাঁকা হেঁসে বলল,
” ডোন্ট ওয়ারি আঙ্কেল আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমি একটু পরেই ফিরে আসছি। ততক্ষণে আপনারা সুনাইফা কে খুজে বের করুন। জাস্ট কয়েকটা মিনিটের ব্যাপার,আমি যাব আর আসব। তারপর গটগট পায়ে ড্রয়িংরুম ত্যাগ করে ইজহান শেখ। ইজহানের যাওয়ার পানে সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়। সবটা কেমন ঘোলাটে লাগছে তাদের কাছে। ইজহানের বাবা আমির শেখ ছেলের কাজকর্ম চুপ করে দেখছেন। অথচ কিছু বলছেন না। কারণ তিনি জানেন তার ছেলে সবসময় ঠান্ডা মাথায় কাজ করে। সবটা ঠান্ডা মাথায় সলভ করার চেষ্টা করে। তার ছেলেটা অন্য সবার থেকে আলাদা। এজন্য ছেলেকে নিয়ে তার বড্ড বেশি গর্ব।
সুনাইফা অনেকখানি পথ দৌড়ে এসে থেমে যায়। দৌড়ানোর আর শক্তি পাচ্ছে না। দাঁড়িয়ে ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছে, এটুকু দৌড়ে হাফিয়ে গেছে। আশেপাশে তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বেশ অনেক টা রাত হয়ে গেছে। সুনাইফা বাড়ি থেকে তেমন একটা বের হয়না। শুধু স্কুল আর প্রাইভেটে আসা যাওয়া করে। তাদের বাড়ির একটা নিয়ম আছে। বাড়ির মেয়েরা অকারণে বাইরে বের হতে পারবে না এটা সিরাজমোল্যা পছন্দ করেন না। মেয়েরা বেপর্দা চলাফেরা করতে পারবে না। সুনাইফা কাউকে না পেয়ে হতাশ হয়ে তার বান্ধবী কে ফোন করে কিন্তু নেটওয়ার্কের জন্য ফোন ঢুকছে না।
____________
মোল্যা বাড়ির সবাই সুনাইফা কে হন্নে হয়ে খুজছে কিন্তু কোথাও পাচ্ছে না। সিরাজ মোল্যা দুশ্চিন্তায় বসে আছেন সোফায়। তার সামনে অনেক গুলো মানুষ। সবার সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলার সাহস পাচ্ছে না।
সারা বাড়ি খুঁজেও যখন সুনাইফা কে পাওয়া যায় নি। তখন মুন্নি ফের সুনাইফার রুমে আসে। সারা রুমটা এক নজর দেখে নেয়। মুন্নির চোখ গিয়ে পড়ে টেবিলের উপর। সেখানে সাদা একটা চিরকুট দেখতে পায়। মুন্নি সময় ব্যয় না করে টেবিলের কাছে গিয়ে হাতে তুলে নেয় চিরকুট টা। ভাজ খুলে পুরো চিঠি টা পড়ে নেয়। পড়া শেষ করে থমকে যায়। ভয়ে গলা বুক শুকিয়ে যায়। মুন্নি দ্রতু চিঠি টা নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসে। এতগুলো মানুষের সামনে কিভাবে বলবে ভেবে পাচ্ছে না। তবুও সাহস যুগিয়ে সিরাজ মোল্যার কাছে গিয়ে ডাক দেয়,
” আব্বা।
সিরাজ মোল্যা মাথা তুলে অশ্রু সিক্ত চোখে ছোটো মেয়ের দিকে তাকায়। গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
” কি হয়েছে?
মুন্নি চিঠিটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
” আব্বা,এটা আপার ঘরে পাইছি।
সিরাজ মোল্যা জড়ালো কন্ঠে সুধালো,
” কি আছে এতে?
” আপনি পড়ে দেখুন আব্বা। মেয়ের কথায় সেটা নিয়ে সোফা থেকে উঠে অন্য পাশে চলে আসে। চিঠি টা খুলে পড়তে শুরু করে।
– প্রিয় আব্বাজান।
প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ক্ষমা করবেন আমায়। আমি এই বিয়েটা করতে পারব না আব্বা। আপনিই বলুন আমার বয়স আর তার বয়সের পার্থক্য কত? গুনে গুনে তার থেকে আমি ১১ বছরের ছোটো। আপনি কিভাবে পারলেন একটা বুইড়া লোকের সাথে আমাকে বিয়ে দিতে? আমি কিভাবে মেনে নিতাম বলুন। আপনাকে বলার সাহস হয়নি। তাই চিঠি লিখে বাড়ি থেকে চলে আসছি। চিন্তা করবেন না আমি সেভ জায়গায় থাকবানে। কালকে সকালেই আমি বাড়ি ফিরে আসব। আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না।
ইতি
আপনার মেয়ে সুনাইফা
চিঠিটা পড়ে দুকদম পিছিয়ে যায়। মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়ে। এত দিনে তিলতিল করে গোড়া তার মানসম্মান সব ধুলোয় মিশে গেলে।
*****
সুনাইফা তার বান্ধবী কে ফোন করে এগিয়ে আসতে বলে গাড়ি খুজতে থাকে। তবে আজ মনে হয় কোনো গাড়ি পাবে না। বাটন ফোন অন করে দেখে আটটা বাজে। আশেপাশে ভ্যান বা কোনো অটোও দেখছে না। একটু পর কিছু মানুষের কথার শব্দ পেয়ে পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখে দুইটা ছেলে রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে। অচেনা ছেলে দুটো কে দেখে ভয় পায় সুনাইফা। ফের সামনে তাকিয়ে দেখে একটা বাইক তার দিকে এগিয়ে আসছে। সুনাইফা ভয়ে দু হাত দিয়ে শাড়ি উঁচু করে ধরে দৌড় লাগায়।
চলবে ইন শা আল্লাহ