আমার মাঝে তুমি পর্ব-০২

0
27

#আমার_মাঝে_তুমি
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
#পর্ব_২

সুনাইফা দৌড়াতে গিয়ে শাড়িতে বেধে হোঁচট খেয়ে মাঝ রাস্তায় পড়ে যায়। ব্যথায় কুকিয়ে ওঠে। ব্যথা পাওয়ার কারণে চোখে অশ্রু এসে ভিড় করে।সুনাইফা অশ্রু সিক্ত চোখে পিছনে তাকিয়ে দেখে বাইকটা তার খুব নিকটে। সুনাইফা র সামনে এসে জোরে ব্রেক করে লোকটা। সুনাইফা ভয়ে কেঁপে ওঠে। নিজে নিজে ভাবে লোকটা কে? কেন তার পিছু নিয়েছে? কি চাই তার কাছে? সুনাইফা’র ভাবনার মাঝেই ছেলেটা বাইক থেকে নেমে মাথার হেলমেট খুলে বাইকের পিছনে ঝুলিয়ে রাখে। ছেলেটার এবার সুনাইফা র দিকে তাকায়। সুনাইফা এখনো নিচে পরে আছে। সুনাইফা ছেলেটার দিকেই তাকায় ছিল কিন্তু ছেলেটার ফেইস দেখে আঁতকে ওঠে। ছেলেটা যে আর কেউ নয়, স্বয়ং ইজহান শেখ। তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। যা দেখে সুনাইফা র গলা বুক শুকিয়ে গেছে। সুনাইফা আমতাআমতা করে বলে,

” আ-আপ-নি কে? আ-মা-র কা-ছে ক-কি চাই? আ-মা-র পথ কে-ন আটকিয়ে-ছেন?

ইজহান শেখের ঠোঁটের কোণে এখনো বাঁকা হাসি। তবে এবার শীতল কন্ঠে বলে,

” তোমাকে চাই। বলে সুনাইফার মুখ থেকে টান মেরে মাক্স টা খুলে ফেলে।

আকস্মিক স্পর্শে কেঁপে ওঠে সুনাইফা। রাতের ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে ও ঘামতে থাকে। বারবার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুখ কপাল, মুছছে।

ইজহান সুনাইফার দু’হাতের কবজি চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

” বাসা থেকে পালিয়েছো কেন? কোন সাহসে পালিয়েছো? তোমার সাহস কি করে হয় হ্যাঁ, আনসার মি?

সুনাইফা ভয়ে ভয়ে মাথা উচু করে ইজহানের দিকে তাকায়। তবে সাথে সাথে মাথা নিচু করে নেয়। কারণ ইজহানের চোখ অসম্ভব লাল হয়ে আছে। যেন তার চোখের আগুনে সুনাইফা কে ভস্ম করে দেবে।

সুনাইফা কে কোনো জবাব দিতে না দেখে খুব রেগে যায় ইজহান। এবার চিল্লিয়ে বলে ওঠে,

” এই মেয়ে কথা কানে যাচ্ছে না? আমার কথায় উত্তর দিচ্ছো না কেন? ইচ্ছে করছে এক ধরে সবগুলো দাত ফেলিয়ে দিতে।

সুনাইফা এবার কেঁদে ওঠে। আকস্মিক কান্নায় ঘাবড়ে যায় ইজহান। সে পুরো বেকুব বনে গেছে। কি এমন বলেছে যার জন্য ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে হবে।

তবে সুনাইফার কান্না মাখা মুখ দেখে কিছুটা শান্ত হয় ইজহান। শান্ত কন্ঠে বলল,

” ওঠো বাসায় ফিরতে হবে।

সাথে সাথে সুনাইফা জবাব দিলো,

” আমি বাসায় যাব না। এখানেই বসে থাকব, অথচ আপনার মতো বুইড়া বেডা কে আমি কিছুতেই বিয়ে করব না।

সুনাইফার কথা শুনে ভ্রু কুচকে তাকায়। তাকে বুড়ো বলল? মেয়েটা মজা করছে নাকি তাকে সত্যি সত্যি বুড়োর মতো দেখতে লাগে। তাকে বুইড়া বলে অপমান করল আশ্চর্য। ইজহান চোয়াল শক্ত করে বলল,

” আর একটা কথা বললে মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না কিন্তু। যা বলছি তাই করো হারিআপ।

সুনাইফা খিলখিল করে হেসে উঠে বলে, এখানে আপনি মাটি পেলেন কই? আমি তো পিচের পার বইসা আছি।

ইজহান চোখ ছোটো ছোটো করে সুনাইফার দিকে তাকায়। সে জানত সুনাইফা দুষ্টু তবে এতটা সেটা জানত না। মুখ টা অন্য দিকে ঘুরিয়ে হাসে যেটা সুনাইফার চোখে পরে না।

ইজহান সময় নষ্ট না করে সুনাইফার হাত ধরে টেনে দাঁড় করায়। সুনাইফা এমনিতেই আগে থেকে ইজহান কে ভয় পায়। আর আজ এতটা মুখোমুখি আবার হাত ধরে দাড় করানো সবটা মুখ বুজে হজম করছে। নইলে যে তার কপাল খানায় বহুত দুষ্ক আছে। ইজহান সুনাইফা কে নিয়ে বাইকের কাছে দাড় করিয়ে বাইকে উঠতে যাবে এমন সময় একটা মেয়েলি কন্ঠ স্বর পেয়ে থেমে যায়। পিছনে ঘুরে দেখে একটা মেয়ে। মেয়েটাকে দেখে সুনাইফা তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

” এতক্ষণে আসার সময় হলো বেবি। আরেকটু আগে আসলে আমাকে এই দিন দেখতে হতো না।

সুনাইফার কথায় মেয়েটা জবাব দেয়, এই তো আমি চলে এসেছি আর কোনো চিন্তা নেই বেবি। তোকে ওই বুইড়া এমপি কে বিয়ে করতে হবে না। সামিয়ার কথায় জিভে কামড় খায় সুনাইফা! এবার তো সে গেছে। তার আর রক্ষি নেই।

মেয়েটার কথা শুনে ইজহান হতবাক হয়ে যায়। ডিরেক্টলি তাকে বুইড়া বলে অপমান করা হচ্ছে। আর সহ্য হয় না তার। এবার সে বলে,

” মেডাম আমাকে দেখতে কি বুইড়ার মতো লাগে?

ইজহানের কথায় সামিয়া ভালো করে লক্ষ্য করে দেখে, না ছেলেটা দেখতে শুনতে মাশাল্লাহ! দেখতে হ্যান্ডসাম, ফর্সা মুখ, মাথায় ঘন কালো চুল, চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা, এক কথায় মারাত্মক দেখতে। বয়স কতই বা হবে সর্বোচ্চ সাতাশ আটাশ হবে। সামিয়া লাজুক হেঁসে বলে,

” আরে আপনি এসব কি বলছেন। আপনি বুইড়া হতে যাবেন কেন? বুইড়া তো আমার ফ্রেন্ডের উডবি জামাই। আপনি দেখতে শুনতে মাশাল্লাহ!

ইজহান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তাহলে আমাকে বুইড়া বলছপন কেন?

” আরে আজব তো? আমি কখন বললাম আপনি বুইড়া। আমও তো বলছি বুইড়া ওর জামাই হাত দিয়ে দেখিয়ে।

সুনাইফা সামিয়ার হাত চেপে ধরে বারবার চুপ করতে বলে। তবে সামিয়ার থামার কোনো নামগন্ধ নেই। নিজের মতো বকবক করতেই আছে। সুনাইফা র ভয়ে জান যায় যায় অবস্থা। সামিয়া সুনাইফার হাত ঝাড়া মেরে ফেলে দিয়ে বলে,

” আচ্ছা মশাই তো আপনি। খামাকা পায়ে পা দিয়ে মেয়েদের মতো ঝগড় করছেন কেন?

” কেন শুনতে চান?

” অবশ্যই।

” আমিই সেই মহান ব্যক্তি, অ্যাই আমি আপনার বেবির বুইড়া উডবি জামাই বুঝতে পারছেন।

ইজহানের কথা শুনে সুনাইফার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি বলছে। সুনাইফা কাঁদো কাঁদো ফেইস নিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যা বলে। সামিয়া দ্রুত দুকদম পিছিয়ে আসে। তখনই আরেকজন ছেলে সেখানে উপস্থিত হয়ে বলল,

” বাহ্! বাহ্! কি অপরুপ দৃশ্য! মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝগড়া। ইজহান তুই কবে থেকে মেয়েদের সাথে ঝগড়া করা শুরু করছিস রে?

অচেনা একটা ছেলেকে নাক গলাতে দেখে সামিয়া চেতে উঠে বলে,

” এই আপনি কেন আমাদের মধ্যে কথা বলছেন হ্যাঁ। চুপচাপ কেটে পড়েন। ঝাড়ি মেরে কথাটা বলে।

সামিয়ার কথা শুনে ছেলেটার মুখ হা হয়ে যায়। এ মেয়ে বলে কি? এদিকে ইয়াদের রিয়াকশন দেখে হেসে ফেলে ইজহান। ইজহান কে হাসতে দেখে রেগে যায় ইয়াদ। রাগি গলায় বলে,

” ইজহানের বাচ্চা তুই হাসছিস ক্যান?

এবার ইয়াদের কথা শুনে সুনাইফা আর সামিয়া খিলখিল করে হেঁসে ওঠে। হাসতে হাসতে সুনাইফা বলল,

” আপনি উনাকে বাচ্চা বলছেন অথচ উনি আস্ত একটা বুইড়া। কথাটা বলে সুনাইফা জিভে কামড় খেয়ে মনে মনে বলে, এই রে ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলছি। আমি এবার শেষ! সুনাইফা রে তোকে কেউ আর বাঁচাতে পারবে না। এই বুইড়া সাদা বিলাই তোকে আজ আস্থ রাখবে না। আচমকা সুনাইফা কে চুপ থাকতে দেখে সামিয়া হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে,

” এই ইফু বেবি তোর আবার কি হলো রে! কি এত ভাবছিস।

ইফাদ নামের ছেলেটা ইজহানের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসেই যাচ্ছে। আর ইজহান সাপের মতো রাগে গজ গজ করছে।

কোনো কথা না বলে সুনাইফার হাত শক্ত করে ধরে ইয়াদের দিকে তাকিয়ে বলল,

” সামিয়া কে তোর বাইকে নিয়ে আমার পিছু পিছু আয়। তার পর সুনাইফা কে জোর করে নিজের বাইকে বসিয়ে রওনা হয় মোল্লা বাড়ির দিকে। ইজহান আর সুনাইফ চলে গেলেও এখনো দাঁড়িয়ে আছে ইয়াদ সামিয়া। সামিয়া ইয়াদের বাইকে যাবে না বলে পণ করে দাঁড়িয়ে আছে। আর ইয়াদ চুপচাপ সেটা অনেক্ক্ষণ যাবত দেখে যাচ্ছে। শেষ মেষ সহ্য করতে না পেরে বলল,

” বান্ধবীর বিয়ে যদি খেতে চাও তাহলে ঝটপট আমার বাইকে উঠে পড়ো। আর না চাইলে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারো আমার প্রবলেম নেই। তোমার জন্য আমি আমার বন্ধুর বিয়ে খেতে মিস দিতে পারব না। বলে বাইকে উঠে পরে। সামিয়া উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে ইয়াদের বাইকে উঠে পরে।

__________

সিরাজ মোল্লা এখনো অতিথিদের কে বলিনি সুনাইফা কোথায়? তিনি ইজহানের আসার অপেক্ষায় আছেন। তার বিশ্বাস ইজহান সুনাইফা কে নিয়ে আসবে। সত্যি সত্যি সিরাজ মোল্লার মনের কথাটা সত্যি হয়ে গেলো। সত্যি সত্যি সুনাইফার হাত ধরে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করছে। দুজন কে এক সাথে দেখে স্বস্তি পেলে অনেক রেগে যান সিরাজ মোল্লা। তিনি ঝড়ের বেগে দু’জনের সামনে গিয়ে সুনাইফার গালে ঠাসস কইরা চড় বসিয়ে দেন। চড় খেয়ে সুনাইফা পড়ে যেতে গেলে হাত ধরে ফেলে ইজহান। সিরাজ মোল্লা ফের মারতে গেলে হাত টা ধরে ফেলে ইজহান। তারপর বলে,

” একটাই যথেষ্ট আঙ্কেল। আর মারতে হবে না। রাগটা কন্ট্রোল করুন।

সুনাইফার মা আফরোজা বেগম এসে বললেন,

” কোথায় চলে গিছিল তুই। এত রাতে বাড়ির বাইরে পা রাখার সাহস কি করে হয় তোর।

ইজহান বুঝতে পারে সবাই খুব রেগে আছে। সেজন্য নিজের পরিবারের লোকেদের দিকে তাকিয়ে, দরজায় সামিয়া কে আসতে দেখে বলল,

” আন্টি ও ওর বান্ধবী কে এগিয়ে আনতে গিছিল।
আপনি কিছু বইলেন না। এবার বিয়েটা ভালোই ভালোই মিটে গেলেই শান্তি।

সুনাইফা নিজের বাবা মা য়ের দিকে অশ্রু সিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছে। তার আব্বা তাকে মারতে পারল। রাগে দুঃখে কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেলো।

চলবে ইনশা আল্লাহ