#আমার_মাঝে_তুমি
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
#পর্ব_৬(শেষ)
ইফা দরজা খুলে দরজায় ইজহান কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
” আপনি এখন, এখানে কেন? আব্বার সাথে দেখা করতে আসছেন?
সুনাইফার কথা শুনে মুচকি হেসে বলল,
” অতিথি কে বাইরে দাঁড়িয়ে রাখতে হয়। তাকে ভিতরে যেতে দেবে না? নাকি বাইরে দাঁড় করিয়েই বিদায় দেবে?
ইজহানের কথায় টনক নড়ে ইফা’র। জিভে কামড় খেয়ে বলে,
” আরেব্বাস, আমি তো বেমালুম ভুলে গেছিলাম। এইডা যদি আম্মা’য় জানতে পারে তাইলে আমার খবর কইরা ছাড়বে নে। আফনে ভিতরে আহেন।
ইফা’র রিয়াকশন দেখে মনে মনে হাসে ইজহান। ইজহান ভিতরে এসে শাশুড়ি কে সালাম দিয়ে সোফায় আরাম করে বসে। ইফা’র মা জামাইয়ের জন্য চা করে ইফা’র হাতে দিয়ে বলে ইজহান কে দিয়ে আসতে। ইফা চায়ের কাপ নিয়ে বসার ঘরে আসে। ইজহান কে ফোন ঘাটতে দেখে কিছু না বলে চা টা টেবিলের উপর রেখে চলে যেতে গেলে ইজহানের ডাকে পিছনে ফিরে তাকায়। মিনমিন স্বরে বলে,
” কিছু কইবেন?
ইজহান ফোন থেকে চোখ সরিয়ে ইফা’র দিকে তাকিয়ে বলে,
” কাছে এসে বসো।
ইফা চমকে ওঠে বলে,
” ক্যান।
” রোমান্স করার জন্য।
ইজহানের কথায় চোখ বড়বড় করে তাকায় বলে,
” কিহহ।
” তুমি কি সত্যি সত্যি মনে করলে। আরে পাগলি চুপচাপ এখানে এসে বসো। আমি মজা করে বলছি।
ইফা চুপচাপ এসে ইজহানের থেকে খানিকটা দুরত্ব রেখে বসে। সেটা দেখে ইজহান কিছু বলে না। পরে ঠিক হয়ে যাবে বলে মনে করে। ইজহান একটা প্যাকেট ইফার দিকে এগিয়ে দেয়। প্যাকেট দেখে অবাক হয়ে বলে,
” কি আছে এতে?
” তুমি খুলে দেখো।
ইজহানের কথায় প্যাকেটটা হাতে নেয় ইফা। তারপর সেটা খুলে দেখে চেচিয়ে বলে,
” ফোন। আপনে আমার লাইগা ফোন আনছেন এমপি মশাই। আমার কতদিনের শখ আমার একটা ফোন হইব। আমি ইচ্ছা মতো ছবি তুলমু।
ইফা’র চেচামেচি শুনে সবাই বসার ঘরে উপস্থিত হয়। সিরাজ মোল্লা মেয়ে’র কাছে এসে বলেন,
” বড়ো আম্মা, এমন চিৎকার চেচামেচি করছো কেন? জামাই বাবা কি ভাববো?
ইফা উঠে দাড়িয়ে হাস্যজ্বল মুখে বলে,
” আব্বা, উনি আমার লাইগা ফোন আনছে। আপনারে অনেক কয়েও আমি একটা ফোন পাই নাই অথচ উনাকে না বলেই আমি ফোন পেয়ে গেছি। ইফা’র হাতে নতুন ফোন দেখে মুন্নিও খুশি হয়। তার আব্বার ভয়ে কোনোদিন মুখ ফুটে কিছু বলতে পারি নি। সিরাজ মোল্লা কিছু বলেন না। তিনি মেয়ে’র মুখের হাসির দিকে তাকিয়ে থাকেন। যে মেয়ে বিয়ে করবে না বলে কত কিছুই না করল। আর এখন সামান্য একটা ফোন পেয়ে ইজহান কে মিষ্টি কথা বলছে।
ইজহান হালকা পাতলা নাস্তা সেরে মোল্লা বাড়ি থেকে চলে আসে।
————————
দেখতে দেখতে কতগুলো দিন পেড়িয়ে গেছে। সব কিছু আর আগের মতো নেয়। ইফা আজ খুব খুশি। কারণ তার ভাই আজ দেশে আসছে। খুশিতে ভাইয়ের জন্য তার প্রিয় খুচুরি রান্না করছে। তাও আবার নিজের হাতে। ইফা ইন্টার ফাস্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছে। সময় থেমে থাকে না। সেরকমই তার আর তার এমপি মশাইয়ের সম্পর্ক টা অনেকটা গভীর হয়েছে। দুজন এখন রাত জেগে কথাও বলে। ইজহান সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে যখন প্রিয়তমার সাথে কথা বলে তখন তার সমস্ত ক্লান্ত মুছে যায়। আজ শেখ পরিবারের সবাই আসবে। ইফা ভাবছে তার ভাইয়ের জন্য আসছে। কিন্তু ইফা এটা জানে না তাকে তার আপন ঠিকানা থেকে চলে যাওয়ার সময় এসে গেছে৷ যার পাকা কথা বলতে আসছে শেখ পরিবার।
ইফা রান্না শেষ করে সবেমাত্র রুমে এসেছিল তখনই বাইরে থেকে গাড়ির আওয়াজ পেয়ে ছুটে আসে। দেখে তাদের বাড়ির সামনে পরপর দুইটা গাড়ি এসে থামে। প্রথম গাড়ি থেকে তার ভাই সোহান নামে আর পরের গাড়ি থেকে ইজহানের পরিবার।
ভাইকে দেখে দুই বোন দৌড়ে আসে। সোহান দুই হাত দিয়ে দুবোন কে আগলে নেয়। তারপর ইফা এবার তার শশুর বাড়ির সবার সাথে কুশল বিনিময় করে। সবাইকে ভিতরে আসতে বলে। সিরাজ মোল্লা শেখ পরিবারের সবাই কে সাদরে গ্রহণ করে ভিতরে নিয়ে আসেন।
*****
বসার ঘরে সবাই বসে আছেন। ইফা’র আম্মা চাচি দু’জন সবার জন্য নাস্তা রেডি করছেন। সবাই টুকটাক কথা বলছেন। এমন সময় ইজহানের বাবা বলেন,
” বেয়াই মশাই। এবার তাহলে ইফা মামনি কে আমার বাড়ির মেয়ে করে নিয়ে যায়। কি বলেন?
সিরাজ মোল্লা খানিকটা হেঁসে বলেন, আপনাদের বউমা আপনারা নিয়ে যাবেন এতে আমি আর কি বা বলতে পারি বেয়াই মশাই। আপনারা যা বলবেন সেটাই হবে।
ইফা সবার জন্য পানি নিয়ে আসছিল ঠিক তখনই এমন কথা শুনে চমকে ওঠে। তাকে এই বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে? অন্য জায়গায়, যেখানে সে কিছু ই চেনে না। ইফা এখনো পর্যন্ত তার শশুর বাড়ি যায়নি। পানির গ্লাস গুলো দিয়ে দ্রুত নিজের রুমে ছুটে চলে আসে। ইফা’র যাওয়ার পানে সকলেই তাকায়। সবাই বুঝতে পারে বাচ্চা মেয়েটা এই বাড়ি যেতে চাই না। কিন্তু এটাই যে প্রকৃতির নিয়ম। এটাই হয়ে আসছে।
সবাই খেতে ব্যস্ত তখন রুমে আসে সোহান। কতগুলো দিন পর বাড়ি আসছে। এসে বোন কে অন্য ঘরে বিদায় দিতে হবে। ইফা যখন বালিশে মুখ গুজে কান্না করছে তখন দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সোহান ডেকে ওঠে,
” ইফু বুড়ি৷
ভাইয়ের ডাক শুনে কান্না থামিয়ে তাকায়। সোহান বোনের কাছে এগিয়ে এসে বসে। ইফা ভাইকে জড়িয়ে ধরে কান্না মাখা কন্ঠে বলে,
” ভাইয়া আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাব না। তোমাদের ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হয়।
সোহান মৃদু স্বরে বলে, আমি জানি তো আমার ইফু বুড়ির খুব কষ্ট হয়। কিন্তু এটাই যে মেয়েদের নিয়তি। সবটা মেনে নিতে হয়। তুই প্লিজ কষ্ট পাস না। তোর যখন ইচ্ছে হবে তুই তখনই চলে আসবি।
-” হ্যাঁ তুই ঠিক বলছিস সোহান। তোর বোনের যখন ইচ্ছে হবে তখনই আসতে পারবে। খামাকা তাকে কাঁদতে মানা কারণ। তার কান্না কিন্তু একজনের সহ্য হয় না রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে ইজহান ।
সোহান মুচকি হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, কান্না থামা। নইলে তোর এই পাগলা জামাই ক্ষেপে যাবে। তখন আর রক্ষী নেই বলে রুম থেকে বেড়িয়ে যায় সোহান।
ইফা’র মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। দুজন দু’জন কে তুই তুকারি করে বলছে। ইনারা কি আগে থেকে পরিচিত। ইফা’র চমকানো মুখ দেখে ইজহান বলে,
” মুখটা এমন হুতুমপেঁচার মতো করে রাখছো কেন?
ইফা আনমনা হয়ে বলে, আপনি ভাইয়া কে আগে থেকে চেনেন?
” চিনি তো।
” কেমনে? আপনাদের কথা শুনে মনে হলো আপনারা হয়তো একই সাথে পড়তেন।
” ঠিক ধরছো। আমরা দু’জন বন্ধু। এখন বলো আমি কি তাহলে বুইড়া হয়ে গেছি। মানে তোমার ভাই যদি হ্যান্ডসাম হয় তাহলে আমি বুইড়া হই কেমনে।
ইজহানের কথায় চোখ ছোটো ছোটো করে তাকিয়ে বলে,আপনি সেই কথা এখনো মনে রাখছেন। আপনারা দুইডায় বুড়া। বুইড়া বয়সে এসে আমার মতো কচি বাচ্চা কে বিয়ে করছেন ব’লে চলে যেতে গেলে হেঁচকা টান দিয়ে ইফা’র কোমড় জড়িয়ে ধরে ইজহান , নাকে নাক ঘষা দিয়ে বলে, আর দুটো দিন জান৷ তারপর তুমি শুধু আমার, আমি শুধু তোমার। আমার প্রতিটা শ্বাস প্রশ্বাসে তুমি থাকবে৷ #আমার_মাঝে_তুমি থাকবে। তুমি চাইলেও কখনো আলাদা হতে পারবে না। ভালোবাসা কখনো বয়স দেখে হয় না। যেকোনো সময়ই হয়ে যেতে পারে। ইফা ইজহান কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। ইজহান হালকা করে ধরে ছিলো বিধায় ছুটাতে পেরেছে। ইফা ফ্লোরে তাকিয়ে বলে,
” দরজা খুলা আছে৷ এবার আপনি যান। ইজহানও কিছু বলে না মুচকি হাসতে হাসতে রুম থেকে বের হয়ে যায়। ইজহান চলে যেতেই হাফ ছেড়ে বাঁচে ইফা।
****
আজ ইজহান ইফা’র বিয়ে। গ্রামের গন্য মান্য ব্যক্তির মেয়ে’র বিয়ে। খুব ধুমধামে সহিত হচ্ছে। সারা বাড়ি খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। চারপাশে মানুষ গিজগিজ করছে। কিছুক্ষণ আগে দ্বিতীয় বারের মতো দু’জনের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। খাওয়া দাওয়া শেষ এখন বিদায়ের পালা। ইফা কান্না করতে করতে জ্ঞান হারিয়েছে। এই প্রথম কোনো কনে বিদায়ের সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ইজহান বউকে পাজা কোলে তুলে গাড়িতে বসিয়েছে। মোল্লা বাড়ির সবাই আদরের মেয়েকে বিদায় দিয়ে ভেঙে পড়েছে।
*****
জ্ঞান ফিরে নিজেকে একটা অচেনা রুমে আবিষ্কার করে ইফা। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে পড়নে তার লাল রঙের বেনারসি। ইফা’র মনে পড়ে যায় কয়েক ঘন্টা আগের কথা। তখনই দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে ইজহান। ইজহান কে দেখে নড়েচড়ে বসে। খাট থেকে নেমে ইজহান কে সালাম করার জন্য ঝুঁকে বসে কিন্তু সালাম করতে পারে না। ইজহান করতে দেয় না। বুকের সাথে জড়িয়ে নেয় প্রিয়তমা বউকে। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
” বউ, আজকে তুমি আমার হবে। আজ শুধু তুমি আর আমি। কেউ নেই। ইফা চুপটি করে ইজহানের বুকে লেপটে আছপ। নিরবতা সম্মতির লক্ষণ দেখে কোলে তুলে নেয় ইফা কে। তারপর বিছানায় শুইয়ে দেয়।
অতঃপর দুটি ভালোবাসা’র মানুষ একে অপরের প্রতি মেতে ওঠে। হারিয়ে যায় ভালোবাসার গহীন অতলে। সব ভালোবাসা এভাবেই পূর্ণতা পাক। ইজহান ইফা দু’জনে সুখে শান্তিতে থাকুক।
[ সমাপ্তি ]